📄 প্রাচীন মিশর সম্রাট-এর স্ত্রীর কাণ্ড
وَرَاوَدَتْهُ الَّتِي هُوَ فِي بَيْتِهَا عَنْ نَّفْسِهِ وَغَلَّقَتِ الْأَبْوَابَ وَقَالَتْ هَيْتَ لَكَ ، قَالَ مَعَاذَ اللَّهِ إِنَّهُ رَبِّي أَحْسَنَ مَثْوَاى ط إِنَّهُ لَايُفْلِحُ الظَّلِمُونَ وَلَقَدْ هَمَّتْ بِهِ ، وَهَمَّ بِهَا لَوْلَا أَنْ رَأَبُرْهَانَ رَبِّهِ ، كَذَلِكَ لِنَصْرِفَ عَنْهُ السُّوءَ وَالْفَحْشَاءَ ، إِنَّهُ مِنْ عِبَادِنَا الْمُخْلَصِينَ وَاسْتَبَقَا الْبَابَ وَقَدَّتْ قَمِيصَهُ مِنْ دُبُرٍ وَالْفَيَا سَيِّدَهَا لَذَا الْبَابِ ، قَالَتْ مَا جَزَاءُ مَنْ أَرَدَ بِأَهْلِكَ سُوهُ إِلَّا ط أَنْ يُসْجَنَ أَوْ عَذَابٌ أَلِيمٌ قَالَ هِيَ رَا وَدَتْنِي عَنْ نَّفْسِي وَشَهِدَ شَاهِدٌ مِّنْ أَهْلِهَا ، إِنْ كَانَ قَمِيصَهُ قُدَّ مِنْ قُبُلٍ فَصَدَقَتْ وَهُوَ مِنَ الْكَذِبِينَ وَإِنْ كَانَ قَمِيصَهُ قُدَّ مِنْ دُبُرٍ فَكَذَبَتْ وَهُوَ مِنَ الصَّدِقِينَ فَلَمَّا رَأَ قَمِيصَهُ قُدَّ مِنْ دُبُرٍ قَالَ إِنَّهُ مِنْ كَيْدِ كُنَّ ط إِنَّ كَيْدَ كُنَّ عَظِيمٌ يُوسُفُ أَعْرِضْ عَنْ هذَا سَكْتَهُ وَاسْتَغْفِرِي لِذَنْبِكِ : إِنَّكِ كُنْتِ مِنَ الْخُطِئِينَ وَقَالَ نِسْوَةٌ فِي الْمَدِينَةِ امْرَأَتُ الْعَزِيزِ تُرَاوِدُ فَتْهَا عَنْ نَفْسِهِ : قَدْ شَغَفَهَا حُبًّا طَ إِنَّا لَنَرْبهَا فِي ضَلَلٍ مُّبِيْنٍ فَلَمَّا سَمِعَتْ بِمَكْرِهِنَّ أَرْسَلَتْ إِلَيْهِنَّ وَاعْتَدَتْ لَهُنَّ مُتَّكَا وَاتَتْ كُلَّ وَاحِدَةٍ مِّنْهُنَّ سِكَيْنًا وَقَالَتِ اخْرُجْ عَلَيْهِنَّ ، فَلَمَّا رَأَيْنَهُ أَكْبَرْنَهُ وَقَطَّعْنَ أَيْدِيَهُنَّ وَقُلْنَ حَاشَ لِلَّهِ مَا هُذَا بَشَرًا وَ إِنْ হ্যَا إِلَّا مَلَكٌ كَرِيمٌ ، قَالَتْ فَذَلِكُنَّ الَّذِي لُمْتُنَّনِي فِيْهِ ، وَلَقَدْ رَاوَدْتُهُ عَنْ نَّفْسِهِ فَسْتَعْصَمَ ، وَلَئِنْ لَّমْ يَفْعَلْ مَا أَمْرُهُ لَيُسْجَنَنَّ وَلَيَكُونَا مِنَ الصَّغِرِينَ
“আর তাঁকে (ইউসুফ আ.-কে) ফুসলাতে লাগলো মহিলাটি (জুলায়খা), যার ঘরে তিনি ছিলেন। সে মহিলা ঘরের দরজাগুলো বন্ধ করে বললো, 'এসো!' তিনি বললেন, আল্লাহর পানাহ চাই। আমার রব তো আমার থাকার সুব্যবস্থা করে দিয়েছেন। (আমি কি এ কাজ করতে পারি?) নিশ্চয়ই যালিমরা সফলকাম হতে পারে না।" মহিলা তো তার প্রতি আশক্ত হয়েই পড়েছে, আর তিনিও মহিলার প্রতি আশক্ত হয়ে পড়তেন যদি তিনি তাঁর রবের বুরহান বা নিদর্শন দেখতে না পেতেন। এমনিভাবে হলো, যাতে করে আমি তার থেকে মন্দ ও নির্লজ্জতা দূর করে দিয়েছি। নিশ্চয়ই সে আমার বাছাইকৃত বান্দাদের একজন। তারা উভয়ে ঘরের দরজার দিকে দৌড়ে গেল, আর মহিলাটি ইউসুফের জামা পেছন থেকে টেনে ছিঁড়ে ফেললো। উভয়েই মহিলার স্বামীকে দরজার কাছে পেল। অমনি মহিলাটি বলে উঠলো, "যে তোমার পরিজনের সাথে কুকর্মের ইচ্ছা করে, তাকে জেলে পাঠানো অথবা অন্য কোনো কঠোর শাস্তি দেয়া ছাড়া তার আর কি সাজা হতে পারে?” ইউসুফ বললেন, সে-ই তো আমাকে দিয়ে কুকর্ম করাতে ফুসলিয়েছে।" মহিলাটির পরিবার বর্গের এক (ব্যক্তি) শিশু ইংগিতসূচক সাক্ষ দিয়ে বললো, "ইউসুফের জামা যদি সামনের দিকে ছেঁড়া থাকে, তাহলে মহিলাটি সত্যবাদিনী আর সে মিথ্যাবাদী। কিন্তু যদি তার জামা পেছনের দিক থেকে ছেঁড়া থাকে, তাহলে মহিলাটি মিথ্যুক আর সে সত্যবাদী।” অতপর গৃহস্বামী যখন দেখল ইউসুফের জামা পেছন দিক থেকে ছেঁড়া, তখন সে বললো, "নিশ্চয়ই এটা তো মহিলাদেরই শঠতা, নিসন্দেহে মহিলাদের শঠতা ও কৌশল মারাত্মকই হয়ে থাকে। ইউসুফ! তুমি প্রসংগটি বাদ দাও, আর হে নারী! তুমি নিজের অপরাধের জন্য ক্ষমা চাও, নিসন্দেহে তুমিই অপরাধিনী।" শহরের নারীরা বলাবলি করতে লাগলো, "আযীযের স্ত্রী নিজের ক্রীতদাসকে কুমতলব চরিতার্থ করার জন্য ফুসলায়। সে ওর প্রেমে উন্মত্ত হয়ে গেছে। আমরা তো দেখছি সে সুস্পষ্ট ভ্রান্তিতে লিপ্ত।" যখন তাদের চক্রান্ত তার কানে গেল, সে তাদের দাওয়াত করলো বৈঠকখানায় তাদের প্রত্যেককে (ফল কাটার জন্য) একখানা করে ছুরি দিল। এদিকে ইউসুফকে তাদের সামনে আসার নির্দেশ দিল। মহিলারা ইউসুফকে দেখে হতভম্ব হয়ে গেল, তারা (ফলের পরিবর্তে) নিজেদের হাত কেটে ফেললো। তারা বললো, "আল্লাহর কসম, এতো কোনো মানুষ নয়, এতো কোনো সম্মানিত ফেরেশতা ছাড়া কিছু নয়।"
আযীযের স্ত্রী বললো, "দেখ, এ-ই তো সে ব্যক্তি, যার সম্পর্কে তোমরা আমাকে ভৎর্সনা করেছিলে। আসলে তো আমিই তাকে ফুসলিয়েছি, কিন্তু সে নিজেকে পবিত্র রেখেছে। আর আমি যা আদেশ করি সে যদি তা না করে তবে সে অবশ্যই কারাগারে প্রেরিত হবে ও অপদস্ত হবে। ইউসুফ বললেন, ও রব! তারা আমাকে যে কাজের দিকে ডাকছে, তার চেয়ে কারাগারই আমার পসন্দনীয়। যদি তুমি তাদের চক্রান্ত আমার উপর থেকে প্রতিহত না করো তাহলে আমি তাদের চক্রান্তের জালে আটকে যাব আর জাহেলদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়বো। অতপর তাঁর রব তাঁর দুআ কবুল করেছেন এবং মহিলাদের চক্রান্ত তাঁর থেকে প্রতিহত করে দিলেন। নিশ্চয়ই তিনি সবকিছু শুনেন ও সবকিছু জানেন।" -সূরা ইউসুফ ২৩-৩৪
ইউসুফ আ. যখন যৌবনের স্তরে উপনীত হন, তিনি যখন আঠার-বিশ বছর বয়সের এক সুদর্শন যুবক এবং সুষমামণ্ডিত দেহ আর ভরা যৌবনের অধিকারী তখন তার মালিকের স্ত্রী যুলায়খা ইউসুফের রূপ-সৌন্দর্যে আকৃষ্ট হয়ে গোটা পরিবেশটাকেই ইউসুফের জন্য অস্বস্থিকর করে তুলেছিল। যুলায়খা ইউসুফকে বালাখানায় ঢুকিয়ে ক্রমাগত দরজাসমূহ বন্ধ করতে করতে ভিতরে নিয়ে গেল। সর্বশেষ কক্ষে ঢুকে তালাবন্ধ করে দিয়ে যুলায়খা ইউসুফকে বললো, هَيْتَ لَكَ "শুন, তোমাকে বলছি, এসো।" যুলায়খা তার কুমতলব চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে ইউসুফকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করছিল কিন্তু ইউসুফ তাকে ডাকছিল প্রকৃত সত্য তথা আল্লাহর পথের দিকে।
অবস্থার নাযুকতা উপলব্ধি করা যায় আল্লাহর বাণী এ আয়াত থেকেঃ وَلَقَدْ هَمَّتْ بِهِ وَهَمَّ بِهَا لَوْلَا أَنْ رَّا بُরহَانَ رَبِّهِ - "মহিলা তো আশক্ত হয়েই পড়েছে, আর তিনিও মহিলার প্রতি আশক্ত হয়ে পড়তেন, যদি তিনি তাঁর রবের বুরহান না দেখতে পেতেন।" 'রব' এর 'বুরহান' বা প্রমাণ সম্পর্কে তাফসীরবিদগণ বিভিন্ন মতামত ব্যক্ত করেছেন। কুরআন পাক যতটুকু বর্ণনা করেছে ততটুকু নিয়েই ক্ষান্ত থাকা দরকার। অর্থাৎ ইউসুফ আ. এমন কিছু দেখেছেন, যার কারণে তাঁর মন থেকে সীমালংঘন করার সামান্য ধারণাও বিদূরীত হয়ে গেছে। যুলায়খার সেই নির্জন কক্ষে আল্লাহর প্রমাণ প্রত্যক্ষ করার সাথে সাথেই ইউসুফ আ. সেখান থেকে পলায়োনদ্যত হলেন এবং বাইরে চলে যাওয়ার জন্য দরজার দিকে দৌড় দিলেন। আযীয পত্নী যুলায়খা তাকে ধরার জন্য পেছনে দৌড় দিল এবং তাঁর জামা ধরে তাকে বাইরে যেতে বাধা দিতে চেষ্টা করলো। ফলে তাঁর জামা পেছন দিক থেকে ছিঁড়ে গেল। ইউসুফ আ. দৌড়িয়ে দরজার ধারে পৌঁছামাত্র যুলায়খার বন্ধ করা তালাগুলো আপনা আপনি খুলে নীচে পড়ে যেতে থাকে।
দরজার বাইরে এসেই দেখলো আযীযে মেছের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। যুলায়খা চমকে উঠলো, আর সম্পূর্ণ বিপরীত দোষ ও অপবাদ চাপিয়ে দিল ইউসুফের উপর। সে স্বামীকে বললো, যে লোক তোমার পরিজনের সাথে কুকর্মের ইচ্ছা করে তার শাস্তি ছাড়া আর কি হতে পরে। এবার ইউসুফ মুখ খুলতে বাধ্য হলেন। তিনি বলে উঠলেন: هِيَ رَا وَدَتْنِي عَنْ نَّفْسِي - "সে-ই তো নিজের কুমতলব চরিতার্থ করার জন্য আমাকে ফুসলাচ্ছিল।” ঠিক এ সময় আল্লাহ তা'আলা এক অলৌকিক ব্যবস্থা করে দিলেন। ঐ পরিবারেই অবস্থানরত একটি কচি শিশুকে আল্লাহ তা'আলা বিজ্ঞ ও দার্শনিকসুলভ বাকশক্তি দান করলেন। সে বললো, ইউসুফের জামা যদি সামনের দিকে ছিন্ন থাকে তবে যুলায়খার কথা সত্য, পক্ষান্তরে যদি জামাটি পেছন দিকে ছিন্ন থাকে তাহলে যুলায়খা মিথ্যুক আর ইউসুফ সত্যবাদী। শেষ পর্যন্ত ইউসুফের জামাটি পেছনের দিকে ছেঁড়া দেখে বাদশাহ নিশ্চিত হয়ে গেলেন যে দোষ যুলায়খারই।
ইউসুফের প্রতি যুলায়খার আসক্তির বিষয়টি জনসমক্ষে রটে গেল। যুলায়খা একদিন ওসব মহিলাকে ভোজসভায় আহ্বান করলো এবং প্রত্যেক মহিলাকে একটি করে চাকুও দিল। মহিলারা খাবার কাটতে উদ্যত হচ্ছিল, এমন সময় যুলায়খা পাশের কক্ষ থেকে ইউসুফকে মহিলাদের সামনে হাজির করলো। মহিলারা ইউসুফকে দেখে তাঁর রূপ সৌন্দর্যে স্থির থাকতে পারলো না। তারা ইউসুফের প্রতি বিমোহিত হয়ে আপলকনেত্রে তাকিয়ে চাকু দিয়ে খাবারের পরিবর্তে নিজে নিজ হাত কেটে ফেললো। তারা হতভম্ব হয়ে বলতে লাগলো: حَاشَ لِلَّهِ مَا هَذَا بَشَرًا إِنْ هَذَا إِلَّا مَلَكُ كَرِيمٌ "হায় আল্লাহ! এতো মানুষ নয়, অবশ্যই তিনি একজন সম্মানিত ফেরেশতা।” যুলায়খা যখন দেখলো সমাগত মহিলাদের সামনে তার গোপন ভেদ ফাঁস হয়ে গেছে, তখন সে মহিলাদের সামনেই ইউসুফকে ভয় দেখাতে লাগলো। ইউসুফ আ. বললেন, "হে রব! তারা আমাকে যে কাজের দিকে আহ্বান করে, তার চেয়ে আমি কারাগারকেই পসন্দ করি।" অতপর আল্লাহ তার দুআ কবুল করে তাকে ওদের চক্রান্ত থেকে বাঁচিয়ে রাখলেন।
📄 ইউসুফ আ.-এর চারিত্রিক স্বচ্ছতা সম্পর্কে মিশর সম্রাটের স্ত্রীর স্বীকারোক্তি
قَالَ مَا خَطْبُكُنَّ إِذْ رَاوَدْتُنَّ يُوسُفَ عَنْ نَفْسِهِ ، قُلْنَ حَاشَ لِلَّهِ مَا عَلِمْنَا عَلَيْهِ مِنْ سُوْءٍ ، قَالَتِ امْرَأَتُ الْعَزِيزِ الْفَـنَ حَصْحَصَ الْحَقُّ أَنَا رَا وَدْتُهُ عَنْ نَّفْسِهِ وَإِنَّهُ لَمِنَ الصَّدِقِينَ
"বাদশাহ মহিলাদের বললো, তোমাদের অবস্থা কেমন যখন তোমরা ইউসুফকে দিয়ে নিজেদের মনষ্কামনা পূরণে তাকে ফুসলিয়েছিলে?" তারা বললো, "আল্লাহরই মহত্ব, আমরা তো তার মধ্যে সামান্যতম খারাপীও দেখিনি।” বাদশাহর স্ত্রী বলে উঠলো, "এখন তো সত্য প্রকাশিত হয়ে গেছে। আমিই তাকে ফুসলিয়েছিলাম, সে তো সত্যবাদী।” -সূরা ইউসুফ: ৫১
এ হচ্ছে মিশর সম্রাটের স্ত্রীর কাণ্ডের আরেক দিক। এখানে 'আযীযে মেছের'-এর স্ত্রীই নয় বরং সমাজের অন্যান্য মহিলারাও যে হযরত ইউসুফের চরিত্রের স্বচ্ছতা সম্পর্কে সাক্ষ্য দিয়েছিল সেকথা ফুটে উঠেছে। সংক্ষেপে ঘটনা হলো, মিশর সম্রাটের অনুপস্থিতিতে তার স্ত্রী ইউসুফকে নিজের কুমতলব চরিতার্থ করার জন্য ফুসলিয়েও ব্যর্থ হয়ে সম্রাটের সামনে উল্টো ইউসুফের ঘাড়েই সমস্ত দোষ চাপিয়ে দিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত মিশর সম্রাটও প্রকৃত ঘটনা বুঝতে পেরে নিজের স্ত্রীকে ভর্ৎসনা করলেও লোক সমক্ষে স্ত্রীর মুখ বাঁচানোর জন্য ইউসুফকে জেলখানায় পাঠানো হলো। জেলখানায় তাঁকে বন্দী জীবনযাপন করতে হয়েছিল দীর্ঘ আট-নয় বছর।
ইউসুফ আ.-এর সাথে আরও দুই যুবকও জেলখানায় আটক ছিল। তারা হযরত ইউসুফকে অত্যন্ত সৎ, চরিত্রবান ও সুবিজ্ঞ জানতে পেরে তাঁর কাছে নিজ নিজ স্বপ্নের তা'বীর জানতে চাইলো। ইতিমধ্যে তাদের একজন স্বপ্নের ব্যাখ্যানুযায়ী জেলখানা থেকে মুক্তিও পেয়ে গেল। একদিন মিশর সম্রাট দরবারের লোকদের ডেকে তার এক আশ্চর্য স্বপ্নের ব্যাখ্যা জানতে চাইলো। সে সময় সেখানে জেলখানা থেকে মুক্তিপ্রাপ্ত যুবকটিও উপস্থিত ছিল। সে বললো, আমি আপনাদেরকে এ স্বপ্নের তা'বীর বলে দেব, আমাকে একটু জেলখানায় ইউসুফের কাছে পাঠিয়ে দিন। যুবকটিকে জেলখানায় পাঠানো হলো এবং ইউসুফ আ. বাদশাহর স্বপ্নের তা'বীর বলে দিলেন। বাদশাহ বললো, "তাকে আমার কাছে নিয়ে আস।" বাদশাহর পাঠানো লোক যখন ইউসুফের কাছে গিয়ে এ সুসংবাদ দিল, তখন ইউসুফ তাকে বললেন, আগে তুমি তোমার মালিকের কাছে ফিরে গিয়ে তার কাছ থেকে জেনে আস তো, ঐসব মহিলাদের কি অবস্থা, যারা নিজেদের হাত কেটেছিল?
এ খবর বাদশাহর কাছে গেলে তিনি সেসব মহিলাদের একত্র করে তাদের কাছ থেকে ইউসুফ সম্পর্কে জানতে চাইলেন। আলোচ্য আয়াতে বাদশাহর সেই জিজ্ঞাসা ও মহিলাগণ থেকে সেই জিজ্ঞাসার জবাব এবং মিশর বাদশাহর স্ত্রীর স্বীকৃতি কুরআনের ভাষায় ব্যক্ত করা হয়েছে। জবাবে মহিলারা একবাক্যে বললো, "আল্লাহরই মহত্ব, আমরা তার মধ্যে খারাপির লেশমাত্রও দেখতে পাইনি। বাদশাহর স্ত্রী যখন দেখলো প্রকৃত সত্য বেরিয়ে এসেছে, তখন সেও মূল ঘটনার প্রকৃত রহস্য উন্মোচিত করলো। সে স্বীকার করলো যে আসলে দোষী তো সে নিজে। সে বলে উঠলো, আমিই তাকে দিয়ে আমার মনষ্কামনা পূরণের চেষ্টা করেছিলাম। সে নিশ্চয়ই পবিত্র চরিত্রের অধিকারী।
ইউসুফ আ. ধৈর্যের চরম পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করেছিলেন। যখন তাঁকে জেলখানা থেকে নিয়ে আসতে বলা হলো, ইউসুফ তা প্রত্যাখ্যান করলেন। তিনি চাইলেন তাঁর নির্দোষ হওয়ার বিষয়টি আগে জনসমক্ষে আসতে হবে, তারপর তিনি জেল থেকে বেরুবেন। এখানে প্রসংগত এ বিষয়টিও প্রনিধানযোগ্য যে, ইউসুফকে মুক্তির কথা শুনালে তিনি হাত কর্তনকারীনী মহিলাদের কথা বললেন, অথচ ঘটনার মূল কেন্দ্রবিন্দু বাদশার স্ত্রীর কথা বলেননি। তিনি যেভাবে নিজের পবিত্রতা প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন, তাতে বাদশাহর স্ত্রীর কথা বললে সরাসরি তার বিরুদ্ধেই অভিযোগ বুঝা যেতো। তিনি এভাবে বাদশাহকে অপমানিত করতে চাননি। মোটকথা; বাদশাহর জিজ্ঞাসার উত্তরে এলাকার সকল মহিলাই ইউসুফের পবিত্রতা ও নির্দোষিতার বিষয় স্বীকার করল। সেই পরিস্থিতিতে বাদশাহর স্ত্রী যুলায়খাও নিজের দোষী হওয়ার কথা স্বীকার করে ইউসুফের নিষ্কলুষ ও চরিত্রবান হওয়ার কথা প্রকাশ করল।
📄 পুরুষ বিহীন সমাজ নারীদের জন্য বিপজ্জনক ও শাস্তিতুল্য
وَإِذْ قَالَ مُوسَى لِقَوْمِهِ اذْكُرُوا نِعْمَةَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ إِذْ أَنْجَكُمْ مِّنْ آلِ فِرْعَوْنَ يَسُومُونَكُمْ سُوءَ الْعَذَابِ وَيُذَبِّحُوْنَ أَبْنَاءَكُمْ وَيَسْتَحْيُونَ نِسَاءَكُمْ ، وَفِي ذَلِكُمْ بَلَاءٌ مِّنْ رَّبِّكُمْ عَظِيمٌ
"আর স্মরণ করো, মূসা যখন তার জাতির লোকদের বলেছিল, তোমরা আল্লাহর সেই নিয়ামতের কথা স্মরণ করো যে তিনি তোমাদেরকে ফেরাউনের সম্প্রদায় থেকে মুক্তি দিয়েছেন। যারা তোমাদের অত্যন্ত নিকৃষ্ট ধরনের শাস্তি দিচ্ছিল। আর তারা তোমাদের ছেলেদের হত্যা করতো এবং মেয়েদের জীবিত রাখতো। এতে তোমাদের জন্য তোমাদের রবের পক্ষ থেকে ছিল কঠিন পরীক্ষা।"-সূরা ইবরাহীম: ৬
আলোচ্য আয়াতে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে হযরত মূসা (আ)-এর যামানার এক জঘন্য ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দেয়া হয়েছে। এ আয়াতটি হযরত মূসা (আ) তার জাতিকে যে ভাষণ দিয়েছিলেন সেই ভাষণের মমার্থস্বরূপ। এ ভাষণে মূসা (আ) তাঁর কওমকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন যে, ফিরাউন ও তার সম্প্রদায় থেকে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে ও দয়ায় তোমাদের নাজাত দিয়েছিলেন। হযরত মূসা (আ)-এর সময়কার ইতিহাস মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যামানার ইসরাঈলীদের শুনিয়ে দেয়ার উদ্দেশ্য হলো, সমসাময়িক ইসরাঈলীরা যে মূসা (আ)-এর সেই শিক্ষা ভুলে গিয়ে শয়তানের পথে পা দিচ্ছে এবং ইসলামের বিরোধীতায় মত্ত হয়ে নতুন করে নিজেদের দুর্ভাগ্যই ডেকে আনছে- সে কথা তাদের স্মরণ করিয়ে দেয়া।
সূরা ইবরাহীমের এ হচ্ছে ষষ্ঠ আয়াত। শব্দের সামান্য পার্থক্য সহ এ আয়াতটি সূরা আল বাকারার ৪৯ আয়াতে এবং সূরা আল আরাফের ১৪১ আয়াতেও উল্লেখ করা হয়েছে। ফিরাউন স্বপ্নে দেখলো যে, বনী ইসরাঈল বংশে এমন এক লোক জন্মগ্রহণ করবে যে তার কর্ম ও রাজত্ব ধ্বংস করে দেবে। তখন ফিরাউন এক ফরমান জারি করে বলে দিল যে, বনী ইসরাঈলের ঘরে কোনো ছেলের জন্ম হলে তাকে হত্যা করে দিবে আর মেয়ে জন্ম নিলে তাকে খিদমতের জন্য জীবিত রাখবে। কিন্তু আল্লাহ হযরত মূসা (আ)-কে সৃষ্টি করে জীবিত রাখলেন।
আল্লাহ তা'আলা প্রথম মানুষ হযরত আদম (আ)-কে সৃষ্টি করে তাঁর থেকে তাঁর জোড়া হিসেবে সৃষ্টি করলেন বিবি হাওয়া (আ)-কে। অতপর মানব সমাজের বৃদ্ধি ও সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে নারী-পুরুষ সৃষ্টির ধারা জারি করেন। নারী বিহীন পুরুষের জীবন অসম্পূর্ণ তেমনি পুরুষ বিহীন নারীর জীবন বৃথা। বরং নারী-পুরুষ পরস্পরের সম্পূরক বিধায় উভয়েই একে অন্যের অভাবে অসার জীবনযাপন করে। শক্তি-সামর্থ ও দায়িত্ব-কর্তব্যের প্রাকৃতিক বিভাজন অনুযায়ী পুরুষ বিহীন সমাজ নারী-জীবনের জন্য বিপজ্জনক। ফিরাউন সেই প্রাকৃতিক বিভাজন বিনষ্টকারী ও সমাজ শৃংখলা ধ্বংসকারী পদক্ষেপ নিয়েছিল।
📄 মুশরিক সমাজে কন্যা সন্তানের জন্ম অসহনীয় ও মনস্তাপে ক্লিষ্ট হওয়ার কারণ
وَإِذَا بُشِّرَ أَحَدُهُمْ بِالْأنْثَى ظَلَّ وَجْهُهُ مُسْوَدًا وَهُوَ كَظِيمٌ ، يَتَوَارَى مِنَ الْقَوْمِ مِنْ سُوْءِ مَا بُشِّرَبِهِ ، أَيُمْসِكُهُ عَلَى هُوْنٍ أَمْ يَدُسُهُ فِي التَّرَابِ أَلَا سَاءَ مَا يَحْكُمُونَ
"যখন তাদের কাউকে কন্যা সন্তান হওয়ার সুসংবাদ দেয়া হয় তখন তার চেহারা কাল হয়ে যায়। আর সে অসহনীয় মনস্তাপে ক্লিষ্ট হয়। তাকে শোনানো সুসংবাদের দুঃখে সে তার কওম থেকে আত্মগোপন করে। সে ভাবে, এ অপমান সহ্য করে ওকে থাকতে দেবে, না ওকে মাটিতে পুতে ফেলবে। দেখ, তাদের সিদ্ধান্ত কতইনা নিকৃষ্ট।" -সূরা আন নহল: ৫৮-৫৯
আলোচ্য আয়াতে রসূলের সময়ে আরবের মুশরিকদের কতিপয় ভ্রান্ত চিন্তা ও আচরণের মধ্যে একটির উল্লেখ করা হয়েছে। আর তাহলো যখন ওদের কোনো ব্যক্তির কন্যা সন্তানের জন্ম হওয়ার খবর পিতার কানে পৌঁছতো, তখন পিতার চেহারা কালো হয়ে যেতো, রাগে ও ক্ষোভে তার মন অস্থির হয়ে উঠতো আর সে অসহনীয় মনস্তাপে ক্লিষ্ট হতো। এর গ্লানি হেতু সে তার কওম থেকে আত্মগোপন করতো- সমাজের লোকদের মুখ দেখাবে কিভাবে-এ ছিল তার মানসিক প্রতিক্রিয়া। মেয়ে বড় হলে তাকে অন্য কোনো ছেলের কাছে বিয়ে দিতে হবে ভেবে সে লজ্জায় অস্থির হয়ে পড়তো। এ হীনতা সত্ত্বেও সে কন্যাটাকে রাখবে, না মাটিতে পুঁতে ফেলবে-এ ছিল তার দুঃচিন্তা।
তারা তো আল্লাহর ফেরেশতাদের আল্লাহর কন্যা বলে বিশ্বাস করে কন্যাদের আল্লাহর সাথে সম্পর্ক স্থাপন করে রেখেছে। অথচ কন্যা সম্পর্কে তাদের নিজেদের অবস্থা এই যে, কাউকে কন্যা হওয়ার খবর দিলে তার চেহারা কালো হয়ে যায়, আর তখন থেকে সে মনের ক্ষোভে মনের জ্বালায় অস্থির হয়ে পড়ে। কন্যা হওয়াটাকে নিজের জন্য লজ্জার বিষয় মনে করে সমাজ থেকে সে আত্মগোপন করতে থাকে আর সর্বক্ষণ এ দ্বিধা-দ্বন্দ্বে থাকে যে, এ অপমান সহ্য করে কন্যাটাকে জীবিত রাখবে, নাকি ওকে মাটিতে দাফন করে সেই অপমান থেকে নিস্তার লাভ করবে।
জাহেলী যুগে অনেক নিষ্ঠুর পিতা কন্যাদের হত্যা করতো অথবা যমীনে জীবন্ত দাফন করতো। ইসলাম এসব মন্দ প্রথার উচ্ছেদ করে এবং এমনভাবে তার মূলোৎপাটন করে ফেলে যে ইসলামের স্বর্ণযুগে এ নিষ্ঠুরতার একটি দৃষ্টান্তও খুঁজে পাওয়া যাবে না। কন্যাদের সম্পর্কে তাদের যে নির্যাতনমূলক সিদ্ধান্ত ছিল, তার চেয়ে অধিক নিকৃষ্ট সিদ্ধান্ত হলো এই যে, তারা আল্লাহর সন্তান সাব্যস্ত করে থাকে। তাও আবার কন্যা সন্তান, যার ব্যাপারে নিজেদের অবস্থা হলো অসহনীয় অপমানবোধ। যেন তাদের জন্য চাই উত্তম বস্তু, আর আল্লাহর জন্যে নিকৃষ্ট বস্তু!
আল কুরআন জাহেলী যুগ তথা মুশরেকী সমাজের কুপ্রথা—কন্যা সন্তানের জন্ম সংবাদে স্বয়ং জন্মদাতা পিতার প্রতিক্রিয়া ও ভূমিকা সম্পর্কে এখানে আলোকপাত করেছে। ইসলামী সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার ফলে কন্যা সন্তানের সেই ভয়াবহ অবস্থার অবসান ঘটে। আল্লাহর নবী কন্যা সন্তানের লালন-পালন করাকে বিভিন্নভাবে উৎসাহিত করেছেন। ইসলাম মানব জাতিকে মান-সম্ভ্রম নিয়ে নর-নারীর সেই সম্পর্ক স্থাপন ও রক্ষার ব্যবস্থাও শিখিয়েছে। কিন্তু যুগে যুগে মানুষ তাদের রব আল্লাহ তা'আলার সেই কল্যাণকর বিধান থেকে বিচ্যুত হয়ে বহুমুখী সমস্যা ও যন্ত্রনার শিকার হয়ে আসছে।
জাহেলী যুগের জাহেলী ধ্যান-ধারণা আধুনিক যুগেও বিরাজমান রয়েছে। হয়তো ধরণ কিছুটা পাল্টিয়েছে। তখনকার যুগে কেবল কন্যার জন্ম হওয়াকে গ্লানি ও অপমানকর মনে করা হতো কিন্তু আজকের বিশ্বের উন্নয়নমুখী দেশে তো সন্তানের আগমনকেই অসহনীয় ভাবা হচ্ছে। বিশ্বসমাজে দেখা যায় প্রাচুর্যের দেশ (Affluent Country) বলে কথিতরা উন্নয়নমুখী জাতি (Developing Nations) সমূহকে জন্মনিরোধের সবক দিয়ে যাচ্ছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, যে ইসলামী জীবন বিধান বিশ্বের বুকে নারী মুক্তির ব্যবস্থা করেছে, সেই জীবন বিধানকেই তো কেউ কেউ নারী মুক্তির অন্তরায় ভাবছে।
বস্তুত প্রাচীন জাহেলিয়াত ও আধুনিক জাহেলিয়াতের ইসলাম দ্রোহীতার ব্যাপারে রয়েছে এক আত্যাশ্চর্য সামঞ্জস্য। প্রাচীন জাহেলিয়াতে কন্যা সন্তানকে জীবন্ত কবর দেয়া হতো আর নব্য জাহেলিয়াতে কন্যা বা ছেলে নির্বিশেষে যে কোনো সন্তানের জন্মনিরোধের ব্যবস্থা নেয়া হয়। প্রাচীন জাহেলিয়াতে শুধু কন্যার জন্মকে লজ্জাকর মনে করা হতো আর নব্য জাহেলিয়াতে যে কোনো প্রকারের সন্তানই অকাম্য ও অনভিপ্রেত। প্রাচীন জাহেলিয়াতে সন্তান দুনিয়াতে আসার পর ব্যবস্থা নেয়া হতো আর আধুনিক জাহেলিয়াতে সন্তান যাতে জন্মই নিতে না পারে সে ব্যবস্থাই করা হয়। প্রাচীন জাহেলিয়াতের যুক্তি ছিল অভাব-অনটন, মান-মর্যাদা ও সামাজিক রীতিপ্রথা; আধুনিক জাহেলিয়াতের যুক্তি জীবনযাত্রার মান সংরক্ষণের নামে প্রাচীন জাহেলিয়াতেরই অনুরূপ।