📄 নারীর গর্ভস্থ সন্তান আল্লাহর রাহে মান্নত করার ইতিহাস প্রসংগ
إِذْ قَالَتِ امْرَأَتُ عِمْرَنَ رَبِّ إِنِّي نَذَرْتُ لَكَ مَا فِي بَطْنِي مُحَرِّرًا فَتَقَبُلُ مِنِّي ، إِنَّكَ أَنْتَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ (ال عمران : ৩৫)
“স্মরণ কর যখন ইমরানের স্ত্রী বললো, হে রব! আমার গর্ভস্থিত সন্তানকে তোমার জন্যে একান্তভাবে মান্নত করলাম। তুমি মেহেরবানী করে তা কবুল করে নাও। নিশ্চয়ই তুমি সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞ।” -(সূরা আলে ইমরান: ৩৫)
পূর্ববর্তী নবীদের যুগে তাঁদের শরীয়ত অনুযায়ী আল্লাহর নামে সন্তান উৎসর্গ করার রীতি প্রচলিত ছিল। কোনো একটি সন্তানকে আল্লাহর কাজের জন্যে নির্দিষ্ট করে দেয়া হতো এবং তাকে কোনো পার্থিব কাজে ব্যবহার করা হতো না। এ প্রথানুসারে মরিয়মের মাতা নিজের গর্ভস্থ সন্তান সম্পর্কে মান্নত করলেন যে, তাকে বিশেষভাবে বায়তুল মুকাদ্দাসের খেদমতে নিয়োজিত করা হবে এবং অন্য কোনো জাগতিক কাজে নিযুক্ত করা হবে না। কিন্তু প্রসবান্তে যখন দেখলেন যে এটা তো কন্যা সন্তান। কন্যাকে কি আল্লাহর ঘরের খেদমতে নিয়োজিত করা যাবে? এই ভেবে তিনি আক্ষেপ করে বললেন : رَبِّ اني وَضَعَتُهَا أُنثَى “হে রব ! আমি তো প্রসব করলাম একটা কন্যা সন্তান।"
একজন ঈমানদার নিজের জান-মাল ও সন্তান সন্তুতিকে আল্লাহর রাহে উৎসর্গ করার বাসনা থাকা তার ঈমানেরই দাবী। যুগে যুগে মানব ইতিহাস থেকেও তাই প্রমাণিত। তাছাড়া সন্তানাদিকে সৎপথে চলার উপযোগী করে গড়ে তোলায় মাতা-পিতার ভূমিকাই কার্যকরী হয়ে থাকে অধিক। তবে মাতার যোগ্যতা ও মানসিকতা এ ক্ষেত্রে অধিকতর দায়ী ও ফলপ্রসূ। সন্তানের শিক্ষা-দীক্ষা ও লালন-পালনে যেমন মাতার দায়িত্ব ও ভূমিকা বেশী তেমনি তাদের উপর অধিক প্রভাব থাকে মাতার। কারণ তারা পিতার তুলনায় মাতার সাহচর্য পায় অনেক বেশী। মরিয়ম জননীর এ ইতিহাস থেকে প্রমাণ পাওয়া যায় যে, মাতারাও সন্তানাদির জীবন গঠনের পরিকল্পনা করতেন। সুতরাং আধুনিক নারী সমাজ প্রাচীন নারী সমাজের চেয়ে অগ্রসরতার দাবী করবে কিসের ভিত্তিতে? ইমরানের স্ত্রী মরিয়মের মাতা গর্ভস্থ সন্তান (অর্থাৎ মরিয়ম)-কে আল্লাহর জন্যে উৎসর্গ করে আল্লাহর দরবারে দোয়া করলেন, “তুমি মেহেরবানী করে এ মান্নত কবুল কর। নিশ্চয়ই তুমি সবকিছু শুন ও জান।”
কিন্তু আজকের মুসলিম সমাজে দেখা যায়, জনক-জননীরা সন্তান পাওয়ার জন্যে যেমন শিরকের পথ ধরে, তেমনি সন্তান লালন-পালনেও শিরকে লিপ্ত হয়ে পড়ে। সন্তান কামনা করে কোনো মাযার বা কোনো অলীর কাছে। আবার সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর তার নাম রাখা থেকে তার শিক্ষা-দীক্ষা ইত্যাদিতেও প্রকাশ্য শিরকে নিমজ্জিত হয়ে পড়ে। হাদীস শরীফের ভাষায় সন্তানাদি স্বভাব ধর্ম ইসলামের উপর জন্ম নেয়, কিন্তু মাতা-পিতা তাকে ইয়াহুদী, নাসারা ও মাজুসী (অগ্নিপূজক) বানিয়ে ছাড়ে। অথচ প্রাচীনকালের ইতিহাসে দেখা যায়, মরিয়মের মাতা পুরো তাওহীদী আকীদায় সন্তান কামনা করেছিলেন। এভাবে মান্নত মানার ব্যাপারেও মুসলমানদের প্রাচীন ইতিহাসে তাওহীদের শিক্ষা পাওয়া যায়।
📄 বন্ধা নারী ও বৃদ্ধ স্বামীর সন্তান লাভ
قَالَ رَبِّ أَنَّى يَكُونُ لِي غُلْمٌ وَقَدْ بَلَغَنِي الْكِبَرُ وَامْرَأَتِي عَاقِرُ ، قَالَ كَذَلِكَ اللَّهُ يَفْعَلُ مَا يَشَاءُ (ال عمران : ৪০)
তিনি বললেন, হে আমার রব! আমার ছেলে হবে কিভাবে? আমি যে বার্ধক্যে পৌঁছে গেছি! আর আমার স্ত্রীও যে বন্ধ্যা! আল্লাহ বললেন, এ অবস্থায়ই, আল্লাহ যা ইচ্ছা তাই করতে পারেন।" -(সূরা আলে ইমরান : ৪০)
প্রসংগঃ বায়তুল মুকাদ্দাসের খেদমতে নিবেদিত শিশু মারইয়ামের লালন- পালনের দায়িত্বে ছিলেন হযরত যাকারিয়া (আ)। তিনি ছিলেন মারইয়াম (আ)-এর খালু। হযরত যাকারিয়া (আ) যখনই মারইয়ামের কক্ষে প্রবেশ করতেন তিনি সেখানে আশ্চর্য ধরনের খাবার অসময়ের ফল দেখতে পেতেন। তালাবদ্ধ কক্ষে এসব খাবার দেখে হযরত যাকারিয়ার মনে সন্তান পাওয়ার আকঙ্ক্ষা জাগলো। তিনি ভাবলেন যে, আল্লাহ তালাবদ্ধ কক্ষে এ বাচ্চাকে আশ্চর্য ধরনের খাবার দিতে পারেন, তিনি আমার এ বৃদ্ধাবস্থায় আমাকেও তো একটা সন্তান দিতে পারেন। হযরত মারইয়ামের লালন-পালনে অসাধারণ খোদায়ী নিদর্শন দেখে তিনি নিজের জন্যে দোয়া করে বললেন, 'হে রব! তোমার পক্ষ থেকে আমাকে পবিত্র সন্তান দান কর। তুমি নিশ্চয়ই দোয়া শ্রবণকারী।"
অতপর একদিন হযরত যাকারিয়া (আ) মেহরাবে দাঁড়িয়ে নামায পড়ছিলেন। ফেরেশতারা তখন তাঁকে ডেকে বললো, আল্লাহ আপনাকে একটা পুত্র সন্তানের সুসংবাদ দিচ্ছেন। সে সন্তান অনেকগুলো গুণেরও অধিকারী হবেন। আল্লাহর পাঠানো এ সুসংবাদের জবাবে উপরোক্ত আয়াতে বর্ণিত কথাগুলো বলেছিলেন। হযরত যাকারিয়া (আ) সন্দেহের কারণে এসব প্রশ্ন করেননি; বরং তাঁর তো আল্লাহর শক্তি-সামর্থের উপর যথেষ্ট বিশ্বাস এবং আল্লাহর কুদরতের উপর প্রগাঢ় ঈমান ছিলই। তবুও তিনি জানতে চাইলেন যে, তাদের স্বামী-স্ত্রীর বার্ধক্য ও বন্ধাত্ব বহাল রেখেই সন্তান দেয়া হবে, না এতে কোনোরূপ পরিবর্তন করা হবে? আল্লাহ বললেন, অবস্থা যা আছে তাই থাকবে। এ অবস্থায়ও আল্লাহর ইচ্ছায় সন্তান হবে।
আলোচ্য আয়াতে আল্লাহর কুদরতের ঐতিহাসিক সত্যতা বর্ণনা করা হয়েছে। হযরত যাকারিয়া (আ) ছিলেন বৃদ্ধ আর তাঁর স্ত্রী ছিলেন বন্ধা। সন্তান লাভের জাগতিক অবস্থা তখন তাদের ছিল না। সেই অসম্ভব অবস্থায়ও হযরত যাকারিয়া মারইয়ামের কাছে অসম্ভব পরিবেশে অলৌকিকভাবে অসময়ের ফল দেখে আল্লাহর কুদরতের উপর প্রগাঢ় ঈমান থাকায় তিনি সন্তান প্রার্থনা করলেন। আজকের সমাজে একদিকে নিঃসন্তানেরা সন্তান পাওয়ার জন্যে ধর্ণা দেয় পীর, বুজর্গদের মাজারে, পথ ধরে শিরকের, সর্বশক্তিমান আল্লাহকে বাদ দিয়ে তাওহীদ পরিপন্থী বিশ্বাস ও কর্মের দিকে তারা এগিয়ে যায়। অন্যদিকে জীবন যাত্রার মান উন্নয়নের লক্ষ্যে সন্তান উৎপাদনক্ষম যুগলেরা জন্মনিয়ন্ত্রণের পথ ধরে। সন্তান দেয়ার ব্যাপারে আল্লাহর যে পূর্ণ কুদরত বিরাজিত তা যেমন মরিয়ম (আ)-এর বিশ্বাস তেমনি হযরত যাকারিয়া (আ) এ বিষয়ে পূর্ণ ঈমান রাখতেন, কিন্তু আমাদের সমাজের লোকেরা এ ধরনের কাজে শিরকের পথে ধাবিত হয় অহরহ। অথচ হযরত যাকারিয়া (আ) বাহ্যিক অবস্থায় সন্তান প্রাপ্তির বয়স না থাকলেও সর্বশক্তিমান আল্লাহর কুদরতের উপর প্রগাঢ় বিশ্বাস থাকায় তিনি একমাত্র তারই নিকট সন্তান প্রার্থনা করেছিলেন। হযরত যাকারিয়া (আ) যখন দেখলেন যে, আল্লাহ তা'আলা মারইয়ামকে শীতকালে গ্রীষ্মকালের ফলমূল এবং গ্রীষ্মকালে শীতকালীন ফলমূল দিয়ে জীবিকা দান করছেন, তখন তাঁর বার্ধক্যেও সন্তান লাভের আকাঙ্ক্ষা জন্মিল। যদিও তাঁর সার্বিক অবস্থা ছিল সন্তান লাভের সম্পূর্ণ বিপরীত। তিনি নিজে বার্ধক্য জনিত দুর্বলতার সম্মুখীন ছিলেন, চুলগুলো সাদা হয়ে গিয়েছিল আর তাঁর স্ত্রীও ছিল বন্ধা। এতদসত্ত্বেও সন্তান লাভের আকুতি তাঁর অন্তরের গভীরে দানা বেঁধে উঠলে তিনি নিবৃত্তে আকুল কণ্ঠে নিবেদন করতে থাকেন।
رَبِّ هَبْ لِي مِن لَّدُنْكَ ذُرِّيَّةً طَيِّبَةً إِنَّكَ سَمِيعُ الدُّعَاءِ
"হে রব! আপনি দয়া করে আপনার পক্ষ থেকে আমাকে একটা নেক সন্তান দিন। নিশ্চয়ই আপনি দোয়া শ্রবণকারী।" উত্তরে আল্লাহ তা'আলা ফেরেশতা মারফত সুসংবাদ পাঠালেন : إِنَّ اللَّهَ يُبَشِّرُكَ بِيَحْيى "আল্লাহ আপনাকে ইয়াহইয়া নামক সন্তানের সুসংবাদ দিচ্ছেন।” অর্থাৎ সন্তান তো দিচ্ছেন-তার নামও আল্লাহই নির্ধারণ করে দিলেন। আল্লাহ তা'আলা সর্ব যুগে সর্বাবস্থায়ই তাঁর কুদরতের রহস্য দেখাতে পারেন। প্রয়োজন কেবল প্রগাঢ় ঈমানের।
📄 মহান আল্লাহ নর ছাড়া শুধু নারী থেকে সন্তান দিয়েছেন (মারইয়াম আ.)
قَالَتْ رَبِّ أَنِّى يَكُونُ لِي وَلَدٌ وَلَمْ يَمْسَسْنِي بَشَرٌ، قَالَ كَذلِكَ اللَّهُ يَخْلُقُ مَا يَشَاء ، إِذَا قَضَى أَمْرًا فَإِنَّمَا يَقُولُ لَهُ كُنْ فَيَكُونُ (ال عمران : ৪৭)
"মারইয়াম (আ) বললেন, হে রব! আমার পুত্র হবে কোত্থেকে? আমাকে তো কোনো লোক স্পর্শ করতেও পারেনি! বললেন, এভাবেই আল্লাহ যা ইচ্ছা সৃষ্টি করেন। তিনি কোনো কিছু সৃষ্টির ইচ্ছা করলে বলেন, "হয়ে যাও। অমনি তা হয়ে যায়।"-(সূরা আলে ইমরান: ৪৭)
ফেরেশতারা হযরত মারইয়ামকে বললেন, "হে মারইয়াম আল্লাহ তাঁর পক্ষ থেকে একটা বাণীর সুসংবাদ দিচ্ছেন, যার নাম হবে 'ঈসা ইবনে মারইয়াম।' তিনি ইহ-পরকালের সম্মানিত ও আল্লাহর ঘনিষ্টদের অন্তর্ভুক্ত। যিনি দোলনায় ও কোলে থেকে মানুষের সাথে কথা বলবেন। আর যিনি পুণ্যবানদের একজন। তখন হযরত মারইয়াম আশ্চর্য হয়ে বললেন, "আমার গর্ভে কি করে সন্তান জন্মিবে! আমি তো বিবাহিতা নই। আমি ব্যভিচারিণীও নই।" কারণ স্বাভাবিক নিয়মে তো নর-নারীর যৌন মিলনের ফলে সন্তানের জন্ম হয়ে থাকে। তিনি বলেন, "আমাকে তো কখনো কোনো নর স্পর্শ পর্যন্ত করেনি। নাকি আমাকে বিবাহের নির্দেশ দেয়া হবে!" আল্লাহর পক্ষ থেকে জবাব আসলো। "অবস্থা এমনিই থাকবে।" ঠিক অমনিভাবে বলা হয়েছিল হযরত যাকারিয়া (আ)-কে। তাঁকেও বলা হয়েছিল তোমার বার্ধক্য ও তোমার স্ত্রীর বন্ধাত্ব অবস্থা বহাল থাকা অবস্থায়ই তোমাদের সন্তান দান করা হবে।
অতপর আল্লাহর সৃষ্টির পদ্ধতি সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, তিনি কোনো কিছু সৃষ্টি করার ইচ্ছা করলেই তা সৃষ্টি হয়ে যায়। তিনি বলেন, كُن (হয়ে যাও) অমনি তা হয়ে যায়। আল্লাহর দেয়া স্বাভাবিক নিয়ম-নীতির মধ্যে তো তা হয়ে থাকে। আর স্বাভাবিক নিয়মের বাইরেও তাঁর অসীম কুদরাতের দ্বারা কোনো কিছুর সৃষ্টি হতে পারে। এ ক্ষেত্রে ইয়াহুদী ও খৃষ্টানগণ আল্লাহর কুদরতে বিশ্বাসী হতে পারেনি। খৃষ্টানগণ হযরত ঈসা (আ)-কে খোদার পুত্র ও খোদা বলে বিশ্বাস করে থাকে। এ আয়াতে তাদের এ ভুল ধারণার নিরসন করা হয়েছে। মাত্র ছয় মাস পূর্বে হযরত ইয়াহইয়া (আ)-এর জন্ম যেমন একটা মুযিজা ছিল; ঠিক তেমনি হযরত ঈসা (আ)-এর জন্মও অপর একটি মুযিজা। ইয়াহ্ইয়া যদি অস্বাভাবিক ও আশ্চর্যজনকভাবে জন্মগ্রহণ করে খোদা না হয়ে থাকেন, তাহলে ঈসা কেন অস্বাভাবিক নিয়মে জন্মগ্রহণ করায় খোদা বা খোদার পুত্র হতে পারেন? এ ভাষণে খৃষ্টানদের সেই ভুল বুঝিয়ে দেয়াই উদ্দেশ্য।
আল্লাহর জাত ও সিফাতে যে কাউকে সমকক্ষ মনে করা শিরক তেমনি মানুষের কোনো সিফাত-বৈশিষ্ট্যকে আল্লাহর সাথে সম্পৃক্ত করাও শিরক। ইয়াহুদীরা বলতো ওযায়ের আল্লাহর বেটা আর খৃষ্টানরা বলতো ঈসা আল্লাহর বেটা। এভাবে আল্লাহর কিতাবের আহল হয়েও এ দু'টো সম্প্রদায়-ইয়াহুদী ও খৃষ্টানরা আল্লাহর সাথে মানুষের একটা বৈশিষ্ট্য জন্মদান ও যৌন কর্মকে সম্পৃক্ত করে আল্লাহর মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করে শিরকে লিপ্ত হয়ে পড়ে।
আল্লাহর সৃষ্টি পদ্ধতির একটা দিক উক্ত আয়াতে বর্ণিত হয়েছে। কোনো কিছু সৃষ্টিতে আল্লাহ কোনো কারণ উপকরণের মুখাপেক্ষী নন। বরং তিনি কিছু সৃষ্টির ইচ্ছা করলে বলেন, 'হও' তখনই তা হয়ে যায়। মুফাস্স্সির ও মুহাক্কিক আলিমগণের মতে আল্লাহকে কোনো কিছু সৃষ্টি করার উদ্দেশ্যে 'কুন্' শব্দটিও বলতে হয় না। তাঁদের মতে 'কুন্' বলতে যতটুকু সময় লাগে আল্লাহর ইচ্ছা বলে কোনো কিছু ততটুকু সময়ের মধ্যেই সৃষ্টি হয়ে যায়। অর্থাৎ কোনো কিছু সৃষ্টি করার জন্য আল্লাহ তা'আলা 'কুন্' বলার প্রতিও মুহতাজ নন। বরং সে জন্যে তাঁর ইচ্ছা করাই যথেষ্ট। আল্লাহর অসীম কুদরতে তিনি আদম (আ)-কে সৃষ্টি করেছেন পুরুষ-স্ত্রী ছাড়া, হাওয়াকে সৃষ্টি করেছেন পুরুষ (আদম) থেকে, আর ঈসা (আ)-কে সৃষ্টি করেছেন নারী (মারইয়াম) থেকে। এটা আল্লাহর কুদরত। কিন্তু আল্লাহর কুদরত প্রকাশ পায় বিশেষ কোনো কারণে, বিশেষ কোনো সময়ে। তাছাড়া সবকিছুই সাধারণত আল্লাহর আদত অনুসারেই প্রকাশ পায়। দুনিয়ার সাধারণ নিয়মই হলো আল্লাহর আদত। নাস্তিকরা যাকে বলে প্রকৃতি। বস্তুত প্রকৃতি বলতে কোনো কিছুরই অস্তিত্ব নেই। আল্লাহই ভাল জানেন।
📄 নিরপরাধ মারইয়ামকে দোষী সাব্যস্ত করার পরিণতি
وَبِكُفْرِهِمْ وَقَوْلِهِمْ عَلَى مَرْيَمَ بُهْتَانًا عَظِيمًا (النساء : ১৫৬)
"(আর তারা অর্থাৎ ইয়াহুদীরা অভিশপ্ত হয়েছিল) কুফরী করার কারণে এবং মারইয়ামের বিরুদ্ধে জঘন্য অপবাদ দেয়ার কারণে।" -(সূরা আন নিসা: ১৫৬)
আল কুরআনের আলোচ্য আয়াত এর পূর্ববর্তী ও তৎপরবর্তী কয়েকটি আয়াতে ইয়াহুদী জাতির কতগুলো জঘন্যতম গুনাহর বিষয় আলোচনা করা হয়েছে। এসব গুনাহ তাদের উপর আল্লাহর গযব ডেকে এনেছিল আর তাদের আল্লাহর হেদায়াত ও সত্য পথ থেকে বিভ্রান্ত করেছিল ও বহুদূরে নিক্ষেপ করেছিল। উপরিউক্ত আয়াতাংশে ইয়াহুদীদের উপর আল্লাহর গযব আসার দু'টো কারণ উল্লেখ করা হয়েছে। একটি তাদের নবী কর্তৃক আনীত আল্লাহর সত্যদীনকে অস্বীকার করা, দ্বিতীয়টি হচ্ছে মারইয়ামের উপর জঘন্য তোহমত আরোপ করা।
হযরত মারইয়াম ছিলেন বনী ইসরাঈলের অতীব শরীফ, খ্যাতিমান ও প্রসিদ্ধ ধর্মীয় পরিবারের এক অবিবাহিতা কন্যা। আল্লাহর কুদরত প্রকাশে পুরুষের মিলন ছাড়াও যে আল্লাহ সন্তান দিতে পারেন, তারই একমাত্র নযীর হিসেবে হযরত ঈসা (আ) পিতা ছাড়া বিবি মারইয়ামের গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর জন্মের ব্যাপারটি ইয়াহুদী জাতির নিকট প্রকৃতপক্ষে মোটেই সন্দেহের বিষয় ছিল না। যেদিন তিনি জন্মগ্রহণ করেন সেদিনই আল্লাহ তা'আলা সমস্ত ইয়াহুদী জাতিকে সাক্ষী রেখে জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, এতো এক অসাধারণ ব্যক্তিত্বসম্পন্ন শিশু, এর জন্মই একটি মুযিজা, এর সাথে নৈতিক অপরাধের কোনো সম্পর্ক নেই। অবিবাহিতা কন্যা মারইয়াম যখন কোলে বাচ্চা নিয়ে আসল, তখন জাতির ছোট-বড় শত-সহস্র লোক এসে সে ঘরে ভিড় জমায়। তারা বাচ্চা সম্পকে মারইয়ামকে জিজ্ঞেস করলে সে এ সম্বন্ধে কোনো কথাই বলেনি। সে চুপচাপ থেকে হাতের ইশারায় বাচ্চাকে জিজ্ঞেস করতে বললো। উপস্থিত জনতা সবিস্ময়ে বললো দোলনায় শায়িত এ শিশুকে আমরা কি জিজ্ঞেস করতে পারি? আল্লাহর কুদরতে সে শিশুই কথা বলে তাদের জবাব দিল। সদ্যজাত শিশুটি স্পষ্ট ও বিশুদ্ধ ভাষায় বলে দিল:
إِنِّي عَبْدُ اللَّهِ أَتْنِي الْكِتَابَ وَجَعَلَنِي نَبِيًّا -
“আমি আল্লাহর বান্দাহ, তিনি আমাকে কিতাব দিয়েছেন, আর আমাকে নবী বানিয়েছেন।”-(সূরা মারইয়াম : ৩০)
এভাবে হযরত ঈসা (আ)-এর জন্ম সম্পর্কিত সকল প্রকার সন্দেহ-শোবাহর মূলোৎপাটন করে দিলেন স্বয়ং আল্লাহ তা'আলা। তাই হযরত ঈসা (আ)-এর যৌবন কাল পর্যন্ত কেউ না মারইয়ামের প্রতি ব্যভিচারের দোষ চাপিয়েছে, না ঈসা (আ)-কে অবৈধ সন্তান বলে কোনো খোঁচা দিয়েছে। কিন্তু যখন হযরত ঈসা ত্রিশ বছর বয়সে উপনীত হওয়ার পর নবুয়াতের দায়িত্ব পালন শুরু করলেন, ইয়াহুদীদের যাবতীয় বদ কাজের জন্য তিরস্কার করতে লাগলেন, তাদের নৈতিক পতনের বিষয়ে সাবধান করতে লাগলেন; আল্লাহর দ্বীন কায়েমের জন্য ত্যাগ স্বীকার করতে, দুঃখ-কষ্ট সহ্য করতে, আর প্রত্যেক ক্ষেত্রে শয়তানী শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করে যাওয়ার আহ্বান জানালেন, তখন ইয়াহুদীরা এ নির্ভিক ও সততার আওয়ায স্তব্ধ করে দেয়ার সকল অসদুপায় অবলম্বন করতে লাগলো। বিগত ত্রিশ বছর পর্যন্ত তারা যা বলেনি এখন তাই বলতে শুরু করলো। তারা বলতে লাগলো (নাউযুবিল্লাহ) “মারইয়াম ব্যভিচারিণী ছিলেন, ঈসা অবৈধ সন্তান।”- অথচ তারা নিসন্দেহে জানতো এ মা ও সন্তান উভয়ই ওসব মলিনতা ও কদর্য থেকে পূত-পবিত্র। তাই তাদের এ দোষারোপ আসলে কোনো সন্দেহের কারণে ছিল না, বরং তা ছিল একেবারেই মিথ্যা। তারা তো জেনে বুঝে সত্যের বিরোধিতার জন্যই এরূপ বলছিল, এজন্যে আল্লাহ তা'আলা তাদের এ আচরণকে যুল্ম ও মিথ্যা না বলে তাকে 'কুফর' বলে অভিহিত করেছিলেন। কারণ, এতে করে তাদের উদ্দেশ্য ছিল দীনের পথে বাধা সৃষ্টি করা মাত্র।