📘 আল কুরআনে নারী 📄 কারো ঘরে প্রবেশের অনুমতি গ্রহণ : দেখা-সাক্ষাতের শিষ্টাচার

📄 কারো ঘরে প্রবেশের অনুমতি গ্রহণ : দেখা-সাক্ষাতের শিষ্টাচার


يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لا تَدْخُلُوا بُيُوتًا غَيْرَ بُيُوتِكُمْ حَتَّى تَستَأْنِسُوا وَتُسَلِّمُوا عَلَى أَهْلِهَا ، ذَلِكُمْ خَيْرٌ لَّكُمْ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُونَ ، فَإِنْ لَّمْ تَجِدُوا فِيهَا أَحَدًا فَلَا تَدْخُلُوهَا حَتَّى يُؤْذَنَ لَكُمْ وَإِنْ قِيلَ لَكُمْ ارْجِعُوا فَارْجِعُوا هُوَ أَزْكَى لَكُمْ ط وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُوْنَ عَلِيمٌ لَيْسَ عَلَيْكُمْ جُنَاحٌ أَنْ تَدْخُلُوا بُيُوتًا غَيْرَ مَسْكُونَةٍ فِيهَا مَتَاعٌ لَّكُمْ وَاللَّهُ يَعْلَمُ مَا تُبْدُونَ وَما تَكْتُمُونَ )

"হে তোমরা যারা ঈমান এনেছ! তোমরা নিজেদের ঘর ছাড়া অন্য কারো ঘরে তাদের অনুমতি ছাড়া এবং তাদের সালাম না করে প্রবেশ করো না। এ নিয়ম তোমাদের জন্য কল্যাণময়, তোমরা এ দিকে খেয়াল রাখবে বলে আশা করা যায়। যদি তোমরা ঘরে কাউকেও না পাও তবে তাতে প্রবেশ করবে না, যতক্ষণ না তোমাদের অনুমতি দেয়া হয়। আর যদি তোমাদের বলা হয়, 'ফিরে যাও' তবে তোমরা ফিরে যাবে; এটা তোমাদের জন্য পবিত্রতম কর্মনীতি। তোমরা যাকিছু করো, আল্লাহ তা ভাল করেই জানেন। অবশ্য তোমাদের জন্য এমন ঘরে প্রবেশ করায় কোনো দোষ নেই যাতে কেউ বসবাস করে না। আর সেখানে তোমাদের কোনো জিনিসপত্রও রয়েছে। আল্লাহ তো জানেন যা তোমরা প্রকাশ করো আর যা তোমরা গোপন করো।"-সূরা আন নূর: ২৭-২৯

কারও ঘরে প্রবেশের অনুমতি গ্রহণ: দেখা-সাক্ষাতের শিষ্টাচার

ইসলাম তার ইপ্সিত পরিচ্ছন্ন ও সৎ সমাজ গড়ার ব্যাপারে কেবল কোনো অপরাধ সংঘটিত হয়ে গেলে তার শাস্তি বিধানের উপরই নির্ভর করে না, বরং সবকটির আগে ইসলাম প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের উপরই গুরুত্ব আরোপ করে। ইসলাম অপরাধ সৃষ্টির সকল চোরাপথ বন্ধ করার ব্যবস্থা (Preventive Check) নিয়ে থাকে। আলোচ্য আয়াতে কারো ঘরে প্রবেশের পূর্বে অনুমতি গ্রহণ সংক্রান্ত বিধান উন্নত সমাজের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ইসলামী ব্যবস্থা। ইসলাম মুসলমানদের বাড়ী-ঘরকে এতটা পবিত্র ও সুরক্ষিত করেছে যে, ইসলাম বাড়ী-ঘরের পবিত্রতা বিনষ্ট করার প্রাথমিক ধাপকেই নস্যাৎ করে দিয়েছে। তাই তো কোনো আগন্তুকের গৃহকর্তার অনুমতি না নিয়ে কারো ঘরে প্রবেশ করা ইসলাম কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে।

জাহেলী যুগে এমন রীতি প্রচলিত ছিল যে, একজন আরব অতর্কিতে অন্যের ঘরে ঢুকে পড়তো আর বলতো, 'ঢুকে পড়েছি'। এভাবে কখনো গৃহকর্তাকে স্বীয় স্ত্রীর সাথে এমন অবস্থায় দেখতে পেতো যা অন্য কারো উচিত নয়। অথবা নারী বা পুরুষকে নগ্ন কিংবা দেহের গোপনীয় অংশ অনাবৃত অবস্থায় দেখতে পেতো। এসব কারণে আল্লাহ তা'আলা মুসলমানদেরকে এ উঁচুমানের আদব ও ভদ্র আচরণ শিক্ষা দিয়েছেন যে অন্যের ঘরে প্রবেশ করতে হলে ঘরের অধিবাসীর অনুমতি নিতে হবে। তাদেরকে সালাম দিয়ে তাদের আপন করে নিতে হবে এবং তাদের মন থেকে যাবতীয় বিরূপ ভাব ও শংকা দূর করতে হবে।

আলোচ্য আয়াতে কারো ঘরে ঢুকতে হলে কি করতে হবে সে সম্পর্কে বলা হয়েছে حَتَّى تَسْتَأْنِسُوا وَتُسَلِّمُوا عَلَى أَهْلِهَا অর্থাৎ “যতক্ষণ না গৃহকর্তার সন্তোষময় অনুমতি নাও ও ঘরে বসবাসকারীদের প্রতি সালাম না পাঠাও।” এখানে تَستأنسوا শব্দ এসেছে استیناس থেকে, যার মাদা বা মূল হলো اُنس শব্দ। استیناس শব্দের অর্থ দাঁড়ায় 'পরিচয় জানা' অথবা 'নিজের সাথে পরিচিত করা' 'তাহলে আয়াতের যথার্থ মানে দাঁড়ায়, 'অন্যদের ঘরে প্রবেশ করো না যতক্ষণ না তাদেরকে পরিচিত করে নাও।"

দ্বিতীয়ত, ঘরের অধিবাসীদের প্রতি সালাম দেয়া কর্তব্য। কোনো কোনো তাফসীরকারক আয়াতের অর্থ করেছেন কারো ঘরে প্রবেশের জন্য প্রথমে অনুমতি নেবে অতপর ঘরে ঢোকার সময় সালাম করবে। ইমাম বুখারী (র) আদাবুল মুফরাদ গ্রন্থে হযরত আবু হুরাইরা থেকে বর্ণনা করেন, যে ব্যক্তি প্রথমে অনুমতি চায় তাকে অনুমতি দিও না। কারণ সে আগে সালাম না দিয়ে সুন্নাত তরিকার খেলাফ করেছে। আবু দাউদ শরীফের এক হাদীসে আছে, বনী আমেরের জনৈক ব্যক্তি রসূলুল্লাহ (স)-এর কাছে এসে বাইর থেকে বললো أَأَدْخُلُ । আমি কি ঢুকে পড়বো? তখন তিনি খাদেমকে বললেন, লোকটি অনুমতি চাওয়ার নিয়ম জানে না। বাইরে গিয়ে তাকে নিয়ম শিখিয়ে দাও। সে যেন বলে, السَّلَامُ عَلَيْكُمْ أَأَدْخُلُ - অর্থাৎ সে যেন সালাম দিয়ে বলে "আমি কি ভিতরে আসতে পারি?” রসূলুল্লাহ (স)-এর এ উক্তি বর্ণনা হয়েছে, لا تأذنوا لمن لم يبدأ بالسلام যে প্রথমে সালাম করে না তাকে ভিতরে আসার অনুমতি দিও না।

আমাদের সমাজে ইসলামের এমন রুচীশীল মার্জিত আচরণ বিলুপ্ত প্রায়। কেউ কেউ তো দরজা নক করে মাত্র। সালাম তো করেই না। অধিকন্তু দরজা নক করার আওয়ায শুনে যদি ভিতর থেকে জিজ্ঞেস করা হয়-কে? তখন জবাবে বলে দেয় 'আমি'। কিন্তু আমি শব্দ দ্বারা তো প্রশ্নের উত্তর হলো না, বরং তা গৃহকর্তার জন্য আরও বিভ্রান্তিকর ও আশংকার কারণ হয়ে পড়ে। একদিন হযরত জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (রা) রসূলুল্লাহ (স)-এর দ্বারে উপস্থিত হয়ে অনুমতির জন্যে দরজার কড়া নাড়লেন। রসূলুল্লাহ (স) ভিতর থেকে প্রশ্ন করলেন, কে? উত্তরে জাবের বললেন- 'আমি' বলে জবাব দিলেন। এতে রসূলুল্লাহ (স) তাকে শাসিয়ে বললেন, আন?? অর্থাৎ আমি, আমি বললে কাউকেও চেনা যায় নাকি?

দরজা নক্ করার পর যদি কোনো জবাব না আসে অথবা অন্য কোনোভাবে জানা যায় যে, ঘরে কোনো লোক নেই, তখন ঘরের ভিতরে প্রবেশ করার চেষ্টা করা যাবে না। অথবা যদি ভিতর থেকে ফিরে যাওয়ার জন্য বলা হয়, তখন বিরক্ত না হয়ে ফিরে যেতে হবে। এ নিয়ম বলে দেয় যে গৃহকর্তা কি কারণে এখন চলে যেতে বললো-তা তো জানা যায়নি, তবুও নিজের আত্মসম্মানবোধের চেয়ে গৃহকর্তার সুবিধা-অসুবিধার প্রতি গুরুত্ব দিয়ে ফিরে যাওয়ার মধ্যেই রয়েছে হেকমত।

কারো দরজায় অনুমতি চাওয়ার পর যদি ভিতর থেকে জবাব না আসে, তবে দ্বিতীয়বার ও তৃতীয়বার অনুমতি চাওয়া সুন্নাত। তৃতীয়বারও যদি জবাব না আসে তবে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ রয়েছে। হযরত আবু মূসা আশআরী (রা) বর্ণনা করেন, একবার রসূলুল্লাহ (স) বললেন: إذا استأذن أحدكم ثلاثا فَلَمْ يُؤْذَنَ لَهُ فَلْيَرْجِعْ "তিনবার অনুমতি চাওয়ার পরও যদি জবাব না আসে তবে ফিরে যাওয়া উচিত।"

অবশ্য কোনো বিশিষ্ট আলেমে দীন বা বুযুর্গের দরজায় অনুমতি না চেয়ে তাঁর অপেক্ষায় বসে থাকে- আশা রাখে যে তিনি বেরিয়ে আসলে সাক্ষাত করবে, তবে তা উপরোক্ত বিধানের অন্তর্ভুক্ত নয়। বরং এটাই আদব ও উচ্চপর্যায়ের শিষ্টাচার।

হযরত আবু বকর (রা) থেকে বর্ণিত, যখন কারো বসবাসের ঘরে বিনা অনুমতিতে প্রবেশ করা নিষেধ সম্পর্কিত আয়াত নাযিল হলো, তখন তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-এর কাছে আরজ করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ, এ নিষেধাজ্ঞার পর কুরাইশ ব্যবসায়ী লোকেরা কি করবে? মক্কা ও মদীনা থেকে সুদূর শ্যাম দেশ পর্যন্ত তারা বাণিজ্যিক সফর করে পথিমধ্যে স্থানে স্থানে সরাইখানা আছে। তারা এগুলোতে অবস্থান করে না। এখানে অনুমতি চাওয়ার কি উপায়? এরি প্রেক্ষিতে নাযিল হয়ঃ لَيْسَ عَلَيْكُمْ جُنَاحٌ أَنْ تَدْخُلُوا بُيُوتًا غَيْرَ مَسْكُونَةٍ فِيهَا مَتَاعٌ লَّكُمْ . "তোমাদের জন্য এমন ঘরে প্রবেশ করায় কোনো দোষ নেই, যাতে কেউ বসবাস করে না; অথচ সেখানে তোমাদের কোনো জিনিসপত্রও রয়েছে।"

বিনা অনুমতিতে কারো ঘরে প্রবেশাধিকারের কিছু ব্যতিক্রমও আছে। যেমন, কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে আগুন ধরে গেলে, বাসগৃহ ধ্বসে পড়তে লাগলে, চোর ডাকাত ঢুকলে তাদের সাহায্যের জন্য বিনা অনুমতিতেই ঘরে প্রবেশাধিকার রয়েছে। কোনো বাড়ীর মালিকের দূতের সাথে ঐ ঘরে প্রবেশের অনুমতির প্রয়োজন নেই। দূতের সাথে থাকাটাই অনুমতি।

এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, কারো ঘরে প্রবেশ করার অনুমতি গ্রহণের উক্ত নির্দেশ কেবল পুরুষদের জন্যই প্রযোজ্য নয় বরং নারী-পুরুষ সকলের বেলায় তা কার্যকর। সাহাবায়ে কিরামের স্ত্রীরা কারো ঘরে যেতে প্রথমে অনুমতি নিতেন। হযরত উম্মে আয়াস (রা) বলেন, আমরা চারজন মহিলা প্রায়ই হযরত আয়েশা (রা)-এর ঘরে যেতাম এবং প্রথমে তাঁর অনুমতি চাইতাম। তিনি অনুমতি দিলে আমরা ভিতরে প্রবেশ করতাম। মুহরিম আত্মীয়-স্বজনদের কাছে যেতে হলেও অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। ইমাম মালেক মুয়াত্তা গ্রন্থে আতা ইবনে ইয়াসার (রা) থেকে বর্ণনা করেন, জনৈক ব্যক্তি রসূলুল্লাহ (স)-কে জিজ্ঞেস করলেন, "আমি কি আমার মায়ের কাছে যেতেও অনুমতি চাইবো? তিনি বললেন, হাঁ, অনুমতি চাইবে। লোকটি বললো, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি তো আমার মায়ের ঘরেই বসবাস করি। তিনি বললেন, তবুও তুমি অনুমতি ছাড়া ঘরে প্রবেশ করবে না। আতুহিব্বু আন তরাহা উরইয়ানাহ (أَتُحِبُّ أَنْ تَرَاهَا عُرْيَانَةً؟) তুমি কি তোমার মাকে উলঙ্গ অবস্থায় দেখা পসন্দ করো? সে বললো, না। তিনি বললেন, তাই অনুমতি চাওয়া আবশ্যক।

যে ঘরে শুধু নিজের স্ত্রী থাকে সে ঘরে প্রবেশ করার জন্য অনুমতি গ্রহণ ওয়াজিব না হলেও সুন্নাত-মোস্তাহাবের পর্যায়ভুক্ত। পদধ্বনী বা গলা ঝেড়ে হুঁশিয়ার করে ঘরে যাওয়া দরকার। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা)-এর স্ত্রী বলেন, আবদুল্লাহ যখন বাইর থেকে ঘরে আসতেন তখন প্রথমে দরজার কড়া নেড়ে আমাকে হুঁশিয়ার করে দিতেন।

আয়াতে বলা হয়েছে ঘরে প্রবেশের অনুমতি না পেলে আগন্তুক ফিরে যাবে। তেমনি এক হাদীসে বাড়ীওয়ালার কর্তব্যও বলে দেয়া হয়েছে। আন্না লিজাউরিকা আলাইকা হাক্কান (أَنَّ لِزَوْرِكَ عَلَيْكَ حَقًّا) সাক্ষাত প্রার্থী ব্যক্তির হক আছে আপনার (বাড়ী ওয়ালার) উপর। তাকে কাছে ডাকুন, বাইরে এসে তার সাথে সাক্ষাত করুন, তার কথা শুনুন, তার সম্মান করুন এবং গুরুতর ওযর না থাকলে সাক্ষাত করতে অস্বীকার করবেন না। এটাই তার হক।

টিকাঃ
-(ফী যিলালিল কুরআন), (তাফহীমুল কুরআন), (মাআরেফুল কুরআন), (ইবনে কাসীর), (তাদাব্বুরে কুরআন), (তাফসীরে মাযহারী থেকে মাআরেফুল কুরআন)

📘 আল কুরআনে নারী 📄 যে তিন সময়ে মা-বাবার কক্ষে প্রবেশের আগে অনুমতি নিতে হবে

📄 যে তিন সময়ে মা-বাবার কক্ষে প্রবেশের আগে অনুমতি নিতে হবে


يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لِيَسْتَأْذِنْكُمُ الَّذِينَ مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ وَالَّذِينَ لَمْ يَبْلُغُوا الْحُلْمَ مِنْكُمْ ثَلْثَ مَرَّتٍ ط مِنْ قَبْلِ صَلٰوةِ الْفَجْرِ وَحِينَ تَضَعُوْনَ ثِيَابَكُمْ مِّنَ الظَّهِيرَةِ وَمِنْ بَعْدِ صَلٰوةِ الْعِشَاءِ ، ثَلَثُ عَوْرَتٍ لَّكُمْ لَيْسَ عَلَيْكُمْ وَلَا عَلَيْهِمْ جُنَاحٌ بَعْدَهُنَّ ، طَوَّفُوْنَ عَلَيْكُمْ بَعْضُكُمْ عَلَى بَعْضٍ ، كَذٰلِكَ يُبَيِّنُ اللَّهُ لَكُمُ الْآيٰتِ ، وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ .

"হে তোমরা যারা ঈমান এনেছ! তোমাদের মালিকানাধীন লোক আর তোমাদের মধ্যে যারা প্রাপ্তবয়স্ক হয়নি তারা তোমাদের কক্ষে প্রবেশ করতে তিন সময় যেন তোমাদের কাছে অনুমতি গ্রহণ করে-ফজরের নামাযের পূর্বে, দুপুরে যখন তোমাদের পোশাক শিথিল করো এবং ইশার নামাযের পরে। এ তিন সময় তোমাদের গোপনীয়তার সময়। এ তিন সময় ছাড়া তোমাদের ও তাদের কোনো গুনাহ নেই-তোমাদের একে অপরের কাছে তো যাতায়াত করতেই হয়। আল্লাহ এভাবেই তোমাদের জন্য তাঁর আয়াতসমূহ বিবৃত করেন। আল্লাহ তো সর্বজ্ঞ প্রজ্ঞাময়।"-সূরা আন নূর: ৫৮

যে তিন সময়ে মা-বাবার কক্ষে প্রবেশের আগে অনুমতি নিতে হবে

আল্লাহ তা'আলা ঈমানদারদের সম্বোধন করে বলেছেন, "হে ঈমানদারগণ! তোমাদের দাস-দাসী তথা চাকর-চাকরানীগণ আর তোমাদের যারা এখনো বুদ্ধির পরিপক্কতার পর্যায়ে পৌছেনি অর্থাৎ প্রাপ্তবয়স্ক হয়নি, তারা তোমাদের কক্ষে যেতে হলে এমন তিনটি সময় আছে যখন ওরা তোমাদের কাছ থেকে প্রবেশের অনুমতি গ্রহণ করবে। কারণ এ তিনটি সময় হচ্ছে তোমাদের পর্দার সময়। অর্থাৎ এ তিনটি সময় মানুষের সাধারণ অভ্যাস অনুযায়ী একান্তবাস ও বিশ্রাম নেয়ার সময়। এ সময় মানুষ খোলামেলা থাকতে চায়, একান্তে এ সময়ে কখনো কখনো আবৃত অংগও খুলে যায় অথবা শরীর হালকা করার জন্য মানুষ কিছুটা অনাবৃত অবস্থায় থাকে বা প্রয়োজনে কোনো অংগ খোলা হয়ে থাকে। তাই এমন তিনটি সময়ে নিজের চাকর-চাকরানী বা ছেলেমেয়েরা তোমাদের কক্ষে যেতে হলে অবশ্যই আগে তোমাদের অনুমতি নিতে হবে। সেই তিনটি সময় হলো: ১. ফজরের নামাযের পূর্বে, ২. দুপুরে যখন তোমরা দেহের শিথিলতাকল্পে কিছুটা অনাবৃত হয়ে থাক, ৩. ইশার নামাযের পর। এ তিন সময় ছাড়া ওদের তোমাদের কাছে তোমাদের কক্ষে প্রবেশ করতে কোনো বাধা নেই।

আল কুরআনে উক্ত তিন সময়কে বলা হয়েছে ثَلْتُ عَوْرَات অর্থাৎ এ হচ্ছে তোমাদের জন্য তিনটি 'আওরাত'। আরবীতে 'আওরাত' বলতে সাধারণত স্ত্রীলোকদের বুঝায়। শব্দটির অর্থ 'ফাঁক ও বিপদের স্থান'। আর যে স্থান উন্মুক্ত হয়ে যাওয়ায় লজ্জার কারণ হয় কিংবা যার প্রকাশিত হয়ে যাওয়া অবাঞ্জনীয় তাকেও 'আওরাত' বলা হয়। অরক্ষিত জিনিসকেও আওরাত বলা হয়। এ তিনটি সময়ে একাকী কিংবা নিজের স্ত্রীকে নিয়ে এমন অবস্থায় পড়ে থাকো, যখন ঘরের ছেলেমেয়েদের চাকর-চাকরাণীদের হঠাৎ করে তোমাদের কাছে এসে পড়া বাঞ্ছনীয় নয়।

এ তিন সময় ছাড়া অন্য যে কোনো সময়ে নাবালেগ ছেলেমেয়েও ঘরের চাকর-চাকরানী নারী-পুরুষের কাছে তাদের কক্ষে বা নিভৃত স্থানে অনুমতি ছাড়া যেতে পারবে। এ সময় তোমরা যদি অসতর্ক অবস্থায় থাক, আর তারা পূর্বানুমতি ছাড়াই তোমাদের কক্ষে প্রবেশ করে বসে তাহলে তোমাদের কড়া কথা বলার বা শাসানোর অধিকার থাকবে না। কারণ, তোমরা ঘরের ছেলে মেয়েদের এবং খাদেম-চাকরদের এমনি ধরনের সুশিক্ষা দাওনি। এ তিনটি সময় ছাড়া অন্য সবসময়ে ছেলেমেয়েদের ও দাস-দাসীদের কক্ষে প্রবেশের সাধারণ অনুমতি দেয়া হয়েছে।

পূর্বে সূরা আন নূরের ৩১ আয়াতে ঘরে প্রবেশের জন্য অনুমতি গ্রহণের যে শর্ত আরোপ করা হয়েছিল, তা থেকে বালক এবং নাবালেগ শিশুদের বাদ রাখা হয়েছিল। অতপর তাদের জন্যও এ শর্ত আরোপ করা হয়েছে। উক্ত তিন সময়ে মুহরিম আত্মীয়-স্বজন এমনকি সমঝদার অপ্রাপ্তবয়স্ক বালক-বালিকা এবং দাস-দাসীদের আদেশ করা হয়েছে যে, তারা যেন কারও নির্জন কক্ষে অনুমতি ছাড়া প্রবেশ না করে। মস্তবড় হেকমত হলো অসাবধানতা ও পর্দাহীনতার হাত থেকে রক্ষা পাওয়া। ফজরের পূর্বের আর ইশার পরের সময়ে সাবধানতার বিষয়টি তো পরিষ্কার। বাকী দুপুরের সময়টাও সাধারণত বিশ্রামের সময় বিশেষত আরব দেশে গরমের দেশ হওয়ার কারণে এ সময় লোকেরা কায়লুলা করে থাকে। 'কায়লুলা' মানে দুপুরের খাবার পর বিশ্রামের উদ্দেশ্যে শুয়ে পড়া। এ সময় শিশু-কিশোরগণ অনুমতি ছাড়া কক্ষে ঢুকে পড়লে সম্ভাবনা থাকে যে, ওরা কক্ষের লোকদের এমন অবস্থায় দেখে ফেলবে যে অবস্থায় তাদেরকে দেখা অপসন্দনীয়।

তবে এসব নাবালেগ শিশুরাও অনুমতি গ্রহণ থেকে ব্যতিক্রমধর্মী হবে তখন পর্যন্ত যখন পর্যন্ত তারা নাবালেগ থাকে। বালেগ হওয়ার পর তাদের উপরও ঐসব শর্তাদী ও বিধি-বিধান কার্যকর হবে যা অন্যদের বেলায় প্রযোজ্য। ওরা শিশুকাল থেকে তো এ ঘরে আসা-যাওয়া করে আসছে— এ অজুহাতে ওদের জন্য কোনো ছাড় নেই। আলোচ্য ৫৮ আয়াতের সাথে ৫৯ আয়াত মিলিয়ে দেখলে বুঝা যাবে যে, পরবর্তী আয়াত পূর্বোক্ত আয়াতের বিধানের ব্যাখ্যা স্বরূপ বর্ণিত হয়েছে।

টিকাঃ
-(তাফহীমুল কুরআন), (মাআরেফুল কুরআন), (তাদাব্বুরে কুরআন)

📘 আল কুরআনে নারী 📄 যেসব বৃদ্ধার জন্য পর্দার বিধান শিথিলযোগ্য

📄 যেসব বৃদ্ধার জন্য পর্দার বিধান শিথিলযোগ্য


وَالْقَوَاعِدُ مِنَ النِّسَاءِ الَّتِي لَا يَرْجُونَ نِكَاحًا فَلَيْسَ عَلَيْهِنَّ جُنَاحٌ أَنْ يَضَعْنَ ثِيَابَهُنَّ غَيْرَ مُتَبَرِّجَتْ بِزِينَةٍ ، وَأَنْ يَسْتَعْفِفْنَ خَيْرٌ لَّهُنَّ وَاللَّهُ سميع عليم .

“নারীদের মধ্য হতে যারা যৌবনকাল অতিবাহিত করেছে, বিবাহ করার আকাংখী নয়; তারা নিজেদের চাদর খুলে রাখলে কোনো দোষ নেই। অবশ্য যদি তারা সৌন্দর্য প্রদর্শনকারী না হয়। তবে তা থেকে বিরত থাকাটাই তাদের জন্য উত্তম। আল্লাহ তো সর্বশ্রোতা সর্বজ্ঞ।” -সূরা আন নূর: ৬০

ইসলামী শরীয়তে পর্দার বিধানের কঠোরতা অঘটনের আশংকার উপর নির্ভরশীল। যেখানে স্বভাবত কোনো অঘটনীয় কাজের আশংকা থাকে না সেখানে পর্দার বিধান শিথিলযোগ্য। যেমন এমন নারী যে বিবাহের উপযুক্ততা হারিয়ে ফেলেছে অর্থাৎ যার কোনো প্রকার যৌন আকাংখা আর নেই এবং যাকে দেখলে কোনো পুরুষ আকর্ষিত হয় না। এ ধরনের বৃদ্ধা নারীরা শরীরের পর্দার জন্য ব্যবহৃত কাপড় গায়রে মুহরিম পুরুষদের সামনেও খুলে রাখতে পারবে—এতে তাদের গুনাহ হবে না। তবে শর্ত হলো এতে করে তাদের মনে যেন কোনো প্রকার সৌন্দর্য দেখানোর ভাব না থাকে। অর্থাৎ মুখাবয়ব, হাতের তালু এবং কারো কারো মতে পদযুগল খোলা রাখতে পারবে। কিন্তু অঘটনের আশংকা থাকলে যুবতী নারীর মুখাবয়ব, হাতের তালু ও পদযুগল ইত্যাদির পর্দা জরুরী। বৃদ্ধা মহিলার জন্য এসব খোলা রাখার অনুমতি থাকলেও এ থেকে বিরত থাকাই তাদের জন্য উত্তম। কারণ এর উদ্দেশ্য পর্দাহীনতাকে সম্পূর্ণভাবে উচ্ছেদ করা।

আলোচ্য আয়াতে নারীদের পর্দার একটা ব্যতিক্রম অবস্থার উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ যে বৃদ্ধা নারীর প্রতি কেউ আকর্ষণবোধ করে না, আর সে বিবাহেরও যোগ্য নয় তার জন্য পর্দার বিধান এমনভাবে শিথিল করা হয়েছে যে, একজন অনাত্মীয় ব্যক্তিও তার জন্য মুহরিমের মত হয়ে যায়। মুহুরিমের সামনে যেসব অংগ আবৃত করা জরুরী নয় এ বৃদ্ধা নারীর জন্য বেগানা পুরুষদের সামনেও সেসব অংগ আবৃত করা জরুরী নয়। কিন্তু তবুও সাবধানতা রক্ষার জন্যে তাদের এমনটি না করাই শ্রেয়।

আলোচ্য আয়াতে الْقَواعد من النِّسَاء-এর অর্থ যেসব মহিলা বসে গেছে অর্থাৎ বিবাহের বয়স যাদের আর বাকী নেই। এখানে বসে যাওয়া মহিলা বলে এমন সব মহিলাকে বুঝানো হয়েছে, যারা সন্তান হওয়ার বিষয়ে নিরাশ হয়ে গেছে। যাদের সন্তান ধারণের ক্ষমতা নিঃশেষ হয়ে গেছে। যাদের নিজেদের যৌন কামনা-বাসনা অবশিষ্ট নেই যাদের দেখে পুরুষদের মনে যৌন-বাসনা জাগ্রত হয় না। আয়াতে বলা হয়েছে: ফালয়সা আলাইহিন্না জুনাহুন আন ইয়াদানা ছিয়া বাহুন্না (فَلَيْسَ عَلَيْهِنَّ جُنَاحٌ أَنْ يَضَعْنَ ثِيَابَهُنَّ) তাদের কাপড় খুলে রাখাতে কোনো গুনাহ হবে না। এখানে কাপড় খুলে রাখার মানে সম্পূর্ণ বিবস্ত্র হয়ে যাওয়া বা উলংগ হয়ে যাওয়া নয়। এ ব্যাপারে সকল ফেকাহবিদ ও তাফসীরকার একমত হয়ে এর অর্থ করেছেন এখানে কাপড় মানে সেই চাদর যা দিয়ে মহিলাদের দেহের সৌন্দর্য ঢেকে রাখার জন্য সূরা আহযাবে বলা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে: ইউদনিনা আলাইহিন্না মিন জালাবি বিহীন (يُدْنِينَ عَلَيْهِنَّ مِنْ جَلَابِيْهِنَّ) "তারা যেন তাদের চাদর দিয়ে শরীর ঢেকে রাখে।"

এখানে আন ইয়াদানা ছিয়া বাহুন্না (أَنْ يَضَعْنَ ثِيَابَهُنَّ) অর্থাৎ "বৃদ্ধা মহিলার কাপড় খুলে রাখলে কোনো দোষ নেই” বলে সে কাপড়কে বুঝানো হয়েছে, যা মহিলারা সেলোয়ার-কামীসের উপরে বড় চাদর অথবা বোরকা ইত্যাদি ব্যবহার করে থাকে। তবে শর্ত হলো কাপড় খুলে রাখার উদ্দেশ্যে যেন নিজের সৌন্দর্য ও দেহের গঠন দেখানো না হয়। এর মানে কোনো মহিলা নিজের যৌন আকর্ষণ হারিয়ে যাওয়ার পরেও যদি সেজেগুজে দেহের গঠন প্রদর্শনী করার রোগে আক্রান্ত হয়, তাহলে পর্দার এ শিথিলতা তার বেলায় প্রযোজ্য হবে না। বরং তাকে পুরোপুরি শরয়ী পর্দা করতে হবে।

আলোচ্য সূরা আন নূরের ৬০ আয়াতে চাদর খুলে রাখার এ অনুমতি সেসব বৃদ্ধা মহিলার জন্য দেয়া হয়েছে যাদের মধ্যে সেজেগুজে থাকার প্রবনতা আর অবশিষ্ট নেই, যাদের যৌন স্পৃহা ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। কিন্তু এ ঠাণ্ডা হয়ে যাওয়া আগুনের কোনো স্ফুলিঙ্গ এখনো বাকী থেকে থাকে আর তা তার রূপ-সৌন্দর্য প্রদর্শনে পরিণত হয়, তাহলে এমন মহিলার জন্য এ বিধান প্রযোজ্য হবে না।

আয়াতের শেষাংশে বলা হয়েছে وَاللَّهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ -আল্লাহ সর্বশ্রোতা সর্বজ্ঞ-অর্থাৎ তিনি সবকিছু শুনেন ও সবকিছু জানেন। মানুষ মুখে কি বলেন, সে সম্পর্কে যেমন তিনি অবগত আছেন তেমনি মনের গভীরে কি সব জল্পনা-কল্পনা চলে সে সম্পর্কেও তিনি অবগত আছেন। কারণ গোটা বিষয়টি হচ্ছে বিবেক নির্ভর ও সদিচ্ছা নির্ভর।

টিকাঃ
-(মাআরেফুল কুরআন), (আল কুরআনুল করীম: মাওলানা সালাহুদ্দীন ইউসুফ), (তাফহীমুল কুরআন), (ফী যিলালিল কুরআন)

📘 আল কুরআনে নারী 📄 মুসলিম নারীগণ প্রয়োজনে বাড়ীর বাইরে যাবে কিভাবে?

📄 মুসলিম নারীগণ প্রয়োজনে বাড়ীর বাইরে যাবে কিভাবে?


يَٰٓأَيُّهَا ٱلنَّبِىُّ قُل لِّأَزْوَٰجِكَ وَبَنَاتِكَ وَنِسَآءِ ٱلْمُؤْمِنِينَ يُدْنِينَ عَلَيْهِنَّ مِن جَلَٰبِيبِهِنَّ ۚ ذَٰلِكَ أَدْنَىٰٓ أَن يُعْرَفْنَ فَلَا يُؤْذَيْنَ ۗ وَكَانَ ٱللَّهُ غَفُورًا رَّحِيمًا

“হে নবী! তোমার স্ত্রীগণ, মেয়েরা এবং মুমিন নারীদের বলে দাও, তারা যেন তাদের চাদরের কিছু অংশ নিজেদের মুখাবয়বের উপর টেনে দেয়, এতে করে তাদের চিনতে পারা অনেকটা আসান হবে; ফলে তাদের উত্যক্ত করা হবে না। আল্লাহ ক্ষমাশীল ও পরম দয়াবান।” -সূরা আল আহযাব: ৫৯

মুসলিম নারীগণ প্রয়োজনে বাড়ীর বাইরে যাবে কিভাবে?

নারী-পুরুষের মাঝে, কর্মবণ্টন অনুযায়ী নারীগণের প্রধান কর্মক্ষেত্র পরিবার। পারিবারিক কার্যাবলী সম্পাদন বাড়ীর অভ্যন্তরে হলেও কখনো প্রয়োজনে বাড়ীর বাইরেও তাদের যাতায়াত আবশ্যকীয় হয়ে পড়ে। মুসলিম নারীগণ বিভিন্ন পারিবারিক, সামাজিক ও জাতীয় কার্যক্রমে বাড়ীর বাইরে যেতে কুরআন ও হাদীস নিষেধ করে দেয়নি। তবে তারা বের হবে পর্দা করে শালীনতা সহকারে।

আলোচ্য আয়াতে আল্লাহ তা'আলা তাঁর রসূলকে নির্দেশ দিয়েছেন যেন তাঁর স্ত্রী-কন্যা ও মুসলিম মহিলাদেরকে প্রয়োজনীয় কাজে বাইরে যাওয়ার সময় সমস্ত শরীর, মাথা ও বুকের খোলা অংশ আচ্ছাদিত করার আদেশ দেন। সর্বাংগ আচ্ছাদনকারী একটা জিলবাব বা বড় চাদর দিয়ে শরীরটাকে ঢেকে নিতে হবে। এ পোশাক তাদেরকে অন্যান্য নারীদের মধ্য থেকে আলাদা বৈশিষ্ট্য এনে দিবে আর দুষ্কৃতকারী ও বখাটে লোকদের উত্যক্তি থেকে রক্ষা করবে। এ আয়াতে 'জিলবাব' পরিধানের নির্দেশ লক্ষণীয়।

এ আয়াতের ব্যাখ্যা সম্পর্কে সুদ্দী বলেছেন, মদীনার কিছু পাপাচারী বখাটে লোক রাতের আঁধার নেমে এলেই মদীনার অলিগলিতে বেরিয়ে পড়তো এবং মেয়েদের খোঁজ করতো। মদীনা ছিল ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা। তাই রাত হলে মহিলারা প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে বাইরে বেরিয়ে যেতো, আর পাপাচারী বখাটেরা এ সুযোগের অপেক্ষায় থাকতো। তবে কোনো মহিলাকে চাদর দিয়ে আপাদমস্তক আবৃত দেখলে তারা বলতো এতো 'সম্ভ্রান্ত পরিবারের মহিলা'। কাজেই তার ব্যাপারে তারা সংযত থাকতো। আর যখন তারা দেখতো যে, কেউ বড় চাদর দিয়ে শরীর না ঢেকেই বেরিয়েছে, তখন তারা বলতো, এতো দাসী-বাঁদী বা নিম্নস্তরের মহিলা। এই বলেই তারা মহিলার উপর আক্রমণ চালাতো।

মুজাহিদ বলেছেন, 'জিলবাব' বা বড় চাদর পরিধানের আদেশ দেয়া হয়েছে এজন্যে, যেন বুঝা যায় তারা স্বাধীন ও সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়ে। ফলে কোনো অপরাধপ্রবণ লোক তাদের কোনোভাবে উত্যক্ত করতে চেষ্টা করবে না। আর 'আল্লাহ ক্ষমাশীল ও দয়ালু'-একথার অর্থ হলো অজ্ঞতাবশত জাহেলী যুগে যেসব অন্যায় হয়ে গেছে, তা আল্লাহ ক্ষমা করবেন।

আলোচ্য আয়াতে বলা হয়েছে মহিলাদের ঘরের বাইরে যাওয়ার সময় বড় চাদর বা বোরকা পরিধান করে শালীন পোশাকে পর্দা সহকারে বের হতে হবে। তাছাড়া রসূলুল্লাহ (স) এক হাদীসে স্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন যে, প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রসমূহে মহিলাদের ঘর থেকে বের হওয়ার জন্য কোনো বাধা-নিষেধ নেই। রসূলের পবিত্র সহধর্মীনীদেরকে সম্বোধন করে বলা হয়েছে যে, তারা পর্দা সহ বাইরে যেতে পারবে। তদুপরি পর্দার আয়াত নাযিল হওয়ার পরেও রসূলুল্লাহ (স)-এর আমল এ সাক্ষ্য প্রদান করে যে, প্রয়োজনে মেয়েদের ঘরের বাইরে যাওয়ার অনুমতি রয়েছে। যেমন হজ্জ ও ওমরার সময় রসূলুল্লাহ (স)-এর সাথে তাঁর বিবিগণের গমনের কথা বহু বিশুদ্ধ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। তেমনিভাবে তাঁর (স) সাথে তাঁদের বিভিন্ন যুদ্ধে যাওয়ারও প্রমাণ রয়েছে। আবার অনেক রেওয়ায়াতে এ প্রমাণও পাওয়া যায় যে, নবীজীর পুণ্যবতী স্ত্রীগণ পিতা-মাতা ও অন্যান্য মুহরিম আত্মীয়গণের সাথে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে নিজেদের বাড়ী থেকে বের হতেন এবং আত্মীয়স্বজনের রোগ-ব্যাধির খবর নিতে যেতেন ও শোকানুষ্ঠান প্রভৃতিতে অংশগ্রহণ করতেন। এছাড়া রসূলে করীম (স)-এর জীবদ্দশায় তাঁর স্ত্রীগণের মসজিদে যাওয়ারও অনুমতি ছিল।

কুরআন পাকের ইংগিত, নবী করীম (স)-এর আমল ও সাহাবায়ে কেরামের ইজমা অনুসারে প্রয়োজনের সময় মুসলিম নারীগণের ঘরের বাইরে যাওয়ার বিষয়টি আল্লাহর বাণী وَقَرْنَ فِي بُيُوتِكُنَّ “তোমরা তোমাদের ঘরে অবস্থান করো" এর হুকুমের অন্তর্ভুক্ত নয়। যেমন হজ্জ- ওমরা ইত্যাদি। আর স্বাভাবিক প্রয়োজনাদি, নিজের পিতা-মাতা ও মুহরিম আত্মীয়গণের সাথে সাক্ষাত, এদের অসুস্থতায় সেবা-শুশ্রূষা করা, অনুরূপভাবে যদি কারো জীবিকা নির্বাহের সামান বা বিকল্প কিছু না থাকে তবে চাকুরী করার জন্য বা কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে মহিলাদের বাহির হওয়াও এ হুকুমের অন্তর্ভুক্ত নয়। অর্থাৎ এসব উদ্দেশ্যে মহিলাদের বের হওয়ার পথে ইসলাম বাধা দেয় না। অবশ্য বের হওয়ার জন্য শর্ত হলো অংগ সৌষ্ঠব ও সৌন্দর্য প্রদর্শন করে বের না হওয়া-বরং বোরকা বা বড় চাদর দিয়ে পর্দার সাথে বের হওয়া।

আলোচ্য আয়াতে কুরআনের ভাষা হলো, يُدْنِينَ عَلَيْهِنَّ مِنْ جَلابيبهن "তারা যেন তাদের উপর তাদের জিলবাব ঝুলিয়ে রাখে।" আরবী ভাষায় 'জিলবাব' বলা হয় বড় চাদরকে। এখানে من শব্দ দ্বারা বুঝায় বড় চাদরের অংশবিশেষ। এবং পুরো আয়াতের অর্থ দাঁড়ায় এই যে, 'মহিলারা যেন নিজেদের গায়ে বড় চাদরটি ভালভাবে পরিধান করে সেটার একটা অংশ কিংবা তার গুণ্ঠন নিজের উপর হতে ঝুলিয়ে নেয়। আর আমাদের ভাষায় এটাই হচ্ছে 'ঘোমটা দেয়া'।

ইমাম ইবনে জারীর তাবারী বলেন : يُدْنِينَ عَلَيْهِنَّ مِنْ جَلَابِیْبِهِنَّ-অর্থাৎ ভদ্র স্ত্রীলোকেরা নিজেদের পোশাক-অশাক দাসীদের মত পরিধান করে যেন ঘর থেকে বের না হয়, আর তাদের চেহারা ও মাথার চুল যেন খোলা না থাকে। বরং তারা যেন তাদের গায়ের চাদরের এক অংশ ঝুলিয়ে রাখে, যাতে কোনো ফাসেক লোক তাদের মুখ ও চেহারা দেখার সাহস না পায়। আল্লামা আবু বকর জাস্সাস বলেন, "এ আয়াত প্রমাণ করে যে, যুবতী মহিলাদেরকে তাদের মুখাবয়ব ঢেকে রাখার হুকুম দেয়া হয়েছে এবং ঘর থেকে বের হওয়ার সময় পূর্ণ আবরণ ও পবিত্র চরিত্রবতী হওয়ার প্রমাণ প্রকাশমান থাকতে হবে। আল্লামা জামাখশারী বলেন, يُدْنِينَ عَلَيْهِنَّ مِنْ جَلَابِیْبِهِنَّ অর্থ তারা তাদের চাদরের একাংশ উপর থেকে ঝুলিয়ে নিবে এবং তা' দিয়ে তাদের চেহারা ও চারিপাশকে ভালভাবে আবৃত করে রাখবে। আল্লামা নিজামুদ্দীন নিশাপুরী বলেন, يُدْنِينَ عَلَيْهِنَّ مِنْ جَلَابِیْبِهِنَّ অর্থ নিজের উপর দিয়ে চাদরের একটা অংশ ঝুলিয়ে নিবে। এভাবে মেয়েদের চেহারা ও মাথা ঢেকে রাখার হুকুম দেয়া হয়েছে। ইমাম রাজী বলেন, এরূপ হুকুম দিয়ে লোকদের একথা জানিয়ে দিতে চাওয়া হয়েছে যে, এরা চরিত্রহীনা স্ত্রীলোক নয়। কেননা চেহারা বা মুখমণ্ডল 'সতর' এর মধ্যে শামিল না হলেও যে স্ত্রীলোক তার চেহারা ঢেকে রাখবে, সে অপর কোনো ব্যক্তির সামনে তার চেহারা খুলতে রাজী হওয়ার বিষয়ে কোনো ব্যক্তিই সাহস করতে পারে না। বরং সবাই বুঝতে পারবে যে, এ তো পর্দানশীন স্ত্রীলোক।

একটি সন্দেহের অপনোদন
বিভিন্ন তাফসীর আলোচনা করলে দেখা যায় যে, আলোচ্য আয়াতে স্বাধীন নারীদেরকে এক বিশেষ ধরনের পর্দার আদেশ দেয়া হয়েছে। তা এই যে, তারা মাথার উপর দিক থেকে তাদের চাদর লটকিয়ে দিয়ে চেহারা ঢেকে ফেলবে, যাতে বাঁদীদের থেকে তাদের স্বাতন্ত্র ফুটে উঠে এবং তারা দুষ্টদের কবল থেকে নিরাপদ হয়ে যায়। কিন্তু এর মানে এ নয় যে, ইসলাম সতীত্ব সংরক্ষণে স্বাধীন নারী ও বাঁদীদের মধ্যে কোনোরূপ পার্থক্য করেছে এবং স্বাধীন নারীদের সতীত্ব সংরক্ষণ করে বাঁদীদের ছেড়ে দিয়েছে। বরং প্রকৃতপক্ষে এরূপ পার্থক্য লম্পটরা ও দুষ্ট লোকেরাই করে রেখেছিল। তারা স্বাধীন নারীদের প্রতি হস্তক্ষেপ করার দুঃসাহস করতো না। কিন্তু বাঁদীদেরকে উত্যক্ত করতে কসুর করতো না। শরীয়ত তাদের সৃষ্ট পার্থক্যকে এভাবে কাজে লাগিয়েছে যে, অধিকাংশ নারী তাদেরই স্বীকৃত নীতির মাধ্যমে আপনা আপনি নিরাপদ হয়ে গেছে। এখন বাঁদীদের সতীত্ব সংরক্ষণের ব্যাপারটিও ইসলামে স্বাধীন নারীদের অনুরূপ ফরয ও জরুরী। কিন্তু সে জন্যে আইনগত কঠোরতা অবলম্বন ছাড়া গত্যন্তর নেই। তাই পরবর্তী আয়াতে সেই আইনও ঘোষণা করা হয়েছে যে, যারা এ কুকর্ম থেকে বিরত হবে না তাদেরকে কিছুতেই ক্ষমা করা হবে না বরং যেখানেই পাওয়া যাবে সেখানেই পাকড়াও করা হবে ও শাস্তি দেয়া হবে।

লয়িন লাম ইয়ান্তাহিল মুনাফিকুনা ওয়াল্লাজিনা ফি কুলুবিহিম মারাদুন ওয়াল মুরজিফুনা ফিল মদিনাতি লানুগরিয়ান্নাকা বিহিম ছুম্মা লা ইউজাওয়িরুনাকা ফিহা ইল্লা কলিলা (لَئِنْ لَّمْ يَنْتَهِ الْمُنْفِقُونَ وَالَّذِينَ فِي قُلُوبِهِمْ মَّرَضٌ وَالْمُرْجِفُونَ فِي الْمَدِينَةِ لَنُغْرِيَنَّكَ بِهِمْ ثُمَّ لَا يُجَاوِرُونَكَ فِيهَا إِلَّا قَلِيلًا) মালউনিনা আইনামা ছুকিফু উখিজু ওকুত্তিলু তাক্তিলা (مَّلْعُوْنِيْنَ أَيْنَمَا ثُقِفُوا أُخِذُوا وَقُتِلُوا تَقْتِيلا) অর্থাৎ মুনাফিকরা এবং যাদের অন্তরে ব্যাধি আছে এবং মদীনায় গুযব রটনাকারীরা যদি এ থেকে বিরত না হয় তবে আমি অবশ্যই তাদের বিরুদ্ধে আপনাকে প্রবল করে দেব। তারপর এ শহরে আপনার প্রতিবেশী অল্পই থাকবে। তাদের উপর চারদিক থেকে লানত বর্ষিত হবে। অভিশপ্ত অবস্থায় তাদেরকে যেখানেই পাওয়া যাবে সেখানে ধরা হবে এবং নির্দয়ভাবে হত্যা করা হবে।

টিকাঃ
-(ফী যিলালিল কুরআন), (মাআরেফুল কুরআন), (তাফহীমুল কুরআন)

ফন্ট সাইজ
15px
17px