📘 আল কুরআনে নারী 📄 যাদের সাথে মহিলাদের পর্দা না করা ও দেখা দেয়া জায়েয

📄 যাদের সাথে মহিলাদের পর্দা না করা ও দেখা দেয়া জায়েয


وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا لِبُعُولَتِهِنَّ أَوْ آبَائِهِنَّ أَوْ آبَاءِ بُعُولَتِهِنَّ أَوْ أَبْنَائِهِنَّ أَوْ أَبْنَاءِ بُعُولَتِهِنَّ أَوْ إِخْوَانِهِنَّ أَوْ بَنِي إِخْوَانِهِنَّ أَوْ بَنِي أَخَوَتِهِنَّ أَوْ نِسَائِهِنَّ أَوْ مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُهُنَّ أَوِ التَّابِعِينَ غَيْرِ أُولِي الْإِرْبَةِ مِنَ الرِّجَالِ أَوِ الطِّفْلِ الَّذِينَ لَمْ يَظْهَرُوا عَلَى عَوْرَتِ النِّسَاءِ مِن وَلَا يَضْرِبْنَ بِأَرْجُلِهِنَّ لِيُعْلَمَ مَا يُخْفِينَ مِن زِينَتِهِنَّ وَتُوبُوا إِلَى اللَّهِ جَمِيعًا أَيُّهَ الْمُؤْمِنُونَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ

"মুসলিম নারীগণ তাদের সাজ-সজ্জা প্রকাশ করতে পারবে কেবল তাদের স্বামী, তাদের পিতা, তাদের শ্বশুর, তাদের ছেলে, তাদের স্বামীর (অন্য স্ত্রীর) ছেলে, তাদের ভাই, তাদের ভাইয়ের ছেলে, তাদের বোনের ছেলে, তাদের মেলা-মেশার মহিলাগণ, নিজেদের অধিকারভুক্ত দাসীগণ, যৌন কামনামুক্ত পুরুষ এবং এমন বালকগণ, যারা নারীদের গোপন বিষয় সম্পর্কে ওয়াকিফহাল নয়। তারা যেন এমনভাবে পদচারনা না করে যাতে তাদের গোপন করা সাজ-সজ্জা প্রকাশিত হয়ে পড়ে, আর তোমরা মুমিনগণ, সবাই আল্লাহর কাছে তাওবা করো যেন সফলকাম হতে পার।"-সূরা আন নূর : ৩১

যাদের সাথে মহিলাদের পর্দা না করা ও দেখা দেয়া জায়েয

আলোচ্য আয়াতে মহিলাদের যাদের সাথে দেখা দেয়া পর্দা না করা যাবে তাদের সম্পর্কে উল্লেখ করা হয়েছে। এখানে বারজন এমন পুরুষের উল্লেখ করা হয়েছে যাদের সাথে পর্দা করা প্রয়োজনীয় নয়-যাদের সামনে মহিলারা সাজগোজ করে দেখা দিতে পারে। আয়াতে বর্ণিত ৮ প্রকার মুহাররম পুরুষ এবং ৪ প্রকার অন্যান্য পুরুষের বর্ণনা দেয়া হয়েছে। পর্দার ব্যতিক্রমী এ বারজন থেকে মহিলাদের পর্দা না করার কারণ দুটো। এক. পর্দার ব্যতিক্রমী এ বারজন পুরুষ এমন যে, এদের থেকে মহিলাদের কোনো অনর্থের বা সমস্যা দেখা দেয়ার আশংকা নেই। তারা এমন স্বভাবের যে আল্লাহ তা'আলা তাদের স্বভাবকে সৃষ্টিগতভাবে এমন করে তৈরি করেছেন যে, এরা নারীর সতীত্ব রক্ষা করে। স্বয়ং তাদের পক্ষ থেকে কোনো অনর্থের আশংকা নেই। দুই. সদাসর্বদা একই জায়গায় বসবাস করার প্রয়োজনেও মানুষ পরস্পর সরল-সহজ সম্পর্ক বজায় রাখে। উল্লেখ্য, স্বামী ছাড়া অন্যান্য যেসব ব্যতিক্রমী পুরুষ রয়েছে-এতি পর্দার বিধান থেকে ব্যতিক্রমী-গোপন অংগ অনাবৃত করা থেকে ব্যতিক্রম নয়। নারীর যেসব অংগ নামাযে খোলা রাখা জায়েয নয় তা দেখা মুহাররমদের জন্যও জায়েয নয়।

ফিকাহবিদদের পরিভাষায় যাদের সাথে বিবাহ জায়েয নেই তাদেরকে মুহাররম বলা হয়। কিন্তু আলোচ্য আয়াতে সেই অর্থ উদ্দেশ্য নয়। আলোচ্য আয়াতে উল্লিখিত বার প্রকারের ব্যতিক্রমী পুরুষের বিবরণী নিম্নরূপ: প্রথম, স্বামী; যার সাথে স্ত্রীর কোনো অংগের পর্দা নেই। তবে বিনা প্রয়োজনে বিশেষ অংগ না দেখাই উত্তম। হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রা) বলেন, مَا رَأَى مِنّى وَمَا رَأَيْتُ مِنْهُ অর্থাৎ রসূলুল্লাহ (স) আমার বিশেষ অংগ দেখেননি, আর আর্মিও তাঁর দেখিনি। দ্বিতীয় পিতা; দাদা, পরদাদা সবাই এর অন্তর্ভুক্ত। তৃতীয়, শ্বশুর; তাতেও স্বামীর দাদা, পরদাদা অন্তর্ভুক্ত আছে। চতুর্থ, নিজ গর্ভজাত পুত্র। পঞ্চম, স্বামীর অন্য স্ত্রীর গর্ভজাত পুত্র। ষষ্ঠ, ভাই, সহোদর, বৈমাত্রেয় ও বৈপিত্রেয় সবাই এর অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু মামা, খালা ও ফুফুর পুত্র-যাদের সাধারণ ভাই বলা হয়ে থাকে, তারা এ ব্যতিক্রমীদের অন্তর্ভুক্ত নয়। অর্থাৎ তাদের সাথে দেখা দেয়া জায়েয নেই। সপ্তম, ভাতিজা (ভাইয়ের পুত্র) এখানেও শুধু সহোদর, বৈমাত্রেয় ও বৈপিত্রেয় ভ্রাতার পুত্র বুঝানো হয়েছে। অন্যরা এর অন্তর্ভুক্ত নয়। অষ্টম, বোনের ছেলে। এখানেও সহোদরা, বৈমাত্রেয় ও বৈপিত্রেয় বোন বুঝানো হয়েছে। এ আট প্রকার পুরুষ হলো মুহাররাম। নবম, أَوْ نِسَائِهِنَّ অর্থাৎ নিজেদের স্ত্রীলোক উদ্দেশ্য মুসলিম নারী। তাদের সামনেও যেসব অংগ খোলা যায় যেগুলো নিজ পিতা ও পুত্রের সামনে খোলা যায়। পূর্বেও বলা হয়েছে, এ ব্যতিক্রম পর্দার বিধান থেকে গোপন অংগ আবৃত করা থেকে নয়। তাই নারী যেসব অংগ মুহাররাম পুরুষের সামনে খুলতে পারে না সেসব অংগ কোনো মুসলিম মহিলার সামনেও খোলা জায়েয নয়। তবে চিকিৎসা ইত্যাদি প্রয়োজনে খোলা ভিন্ন কথা। 'মুসলিম নারী' বলার কারণে কাফির মুশরিক নারীদের থেকেও পর্দা করা ওয়াজিব। তারা বেগানা পুরুষদের মধ্যে গণ্য। দশম, প্রকার ব্যতিক্রমী পুরুষ হলো নারীদের মালিকানাধীন লোক। এতে দাস-দাসী উভয়ই অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু অধিকাংশ ফিকহবিদের মতে এখানে শুধু দাসী বুঝানো হয়েছে। পুরুষ দাস এ হুকুমের অন্তর্ভুক্ত নয়। তাদের কাছে সাধারণ মুহাররমের মত পর্দা করা ওয়াজিব। হযরত সাঈদ ইবনে মুসাইয়েব তাঁর সর্বশেষ উক্তিতে বলেন: لا يغرنكم اية النور فانه في الاماء دون الذكور আয়াতে এ অর্থ গ্রহণ করো না যে ملکت ايمانكم শব্দের মধ্যে দাসরাও শামিল রয়েছে। এ আয়াতে শুধু দাসীদেরকে বুঝানো হয়েছে। পুরুষ দাস এর অন্তর্ভুক্ত নয়। একাদশ, পর্দার ব্যতিক্রমী পুরুষ হলো যৌন কামনা মুক্ত পুরুষ লোক। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) বলেন, এখানে এমন নির্বোধ ও ইন্দ্রিয়বিকল ধরনের লোক বুঝানো হয়েছে যাদের নারীর প্রতি কোনো আগ্রহ, উত্তেজনা ও ঔৎসুক্যই নেই। আয়াতে এমনসব পুরুষকে বুঝানো হয়েছে যাদের মধ্যে নারীদের প্রতি কোনো আগ্রহ ও কামভাব নেই এবং তাদের রূপগুণের প্রতিও কোনো ঔৎসুক্য নেই যে, অপরের কাছে গিয়ে বর্ণনা করবে। তবে নপুংসক ধরনের লোক যারা নারীদের বিশেষ গুণাবলীর সাথে সম্পর্ক রাখে তাদের থেকেও পর্দা করা ওয়াজিব। হযরত আয়েশা (রা)-এর হাদীসে আছে, জনৈক নপুংসক ব্যক্তি রসূলুল্লাহ (স)-এর বিবিদের কাছে আসা-যাওয়া করতো। বিবিগণ তাকে আয়াতে বর্ণিত কামভাবমুক্ত পুরুষ মনে করে তার সামনে আগমন করতেন। রসূলুল্লাহ (স) তাকে গৃহে প্রবেশ করতে নিষেধ করে দিলেন। এ কারণেই ইবনে হজর মক্কী মিনহাজের টীকায় বলেন, পুরুষ যদিও পুরুষত্বহীন লিংগ কর্তিত অথবা খুব বেশী বৃদ্ধ হয় তবুও সে غير أولى الاربة শব্দের অন্তর্ভুক্ত নয়। তার থেকে পর্দা করা ওয়াজিব। দ্বাদশ প্রকার, এমন অল্প বয়স্ক বালক যে নারীদের বিশেষ আকর্ষণ, কমনীয়তা ও গতিবিধি সম্পর্কে সম্পূর্ণ বেখবর। ইমাম জাস্সাস বলেন, এখানে এমন বালককে বুঝানো হয়েছে যে বিশেষ কাজ-কারবারের দিক থেকে নারী ও পুরুষের মধ্যে কোনো পার্থক্য বুঝে না।

আলোচ্য আয়াতের শেষাংশে বলা হয়েছে : وَلَا يَضْرِبْنَ بِأرجلهن لِيُعْلَمَ مَا يُخْفِينَ مِنْ زَيْنَتِهِنَّ "মুমিন নারীগণ যেন এমনভাবে পদচারণা না করে যাতে করে তাদের গোপন রাখা সাজসজ্জা প্রকাশিত হয়ে পড়ে।" এ পর্যায়ে নবী করীম (স) এ হুকুমকে কেবলমাত্র অলংকারাদির সুর-ঝংকার পর্যন্ত সীমিত রাখেননি। বরং তিনি এ থেকে এ মূলনীতি ঠিক করেছেন যে, দৃষ্টি ছাড়াও যেসব জিনিস যৌন অনুভূতিকে উত্তেজিত করে সেসবও ঐ উদ্দেশ্যের খেলাফ, যে জন্যে আল্লাহ তা'আলা নারীদেরকে নিজেদের সৌন্দর্য প্রকাশ করতে নিষেধ করেছেন। এজন্যেই তো তিনি নারীদের নির্দেশ দিলেন, "সুগন্ধি লাগিয়ে বের হবে না।"

হযরত আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত আছে, নবী করীম (স) বলেছেন: لا تَمْنَعُوا إِمَاءَ الله مَسجِد الله ولكن ليخرجن وهن تفلات . "আল্লাহর বান্দী নারীদেরকে আল্লাহর মসজিদ থেকে নিষেধ করো না। তবে তারা যেন সুগন্ধি মেখে বাইরে না আসে।" আরেকটি হাদীসে বলা হয়েছে, এক মহিলা মসজিদ থেকে বের হয়ে যাচ্ছিল, হযরত আবু হুরাইরা (রা) তার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি অনুভব করলেন যে মহিলাটি সুগন্ধি ব্যবহার করেছে। তিনি তাকে থামিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, হে মহাশক্তিমান আল্লাহর বান্দী! তুমি মসজিদ থেকে আসছো? সে বললো, জি-হাঁ। তিনি বললেন, আমি আমার প্রিয়নবী আবুল কাসেম (স)-কে বলতে শুনেছি-যে মহিলা মসজিদে সুগন্ধি মেখে আসবে, তার নামায ততক্ষণ পর্যন্ত কবুল হয় না, যতক্ষণ পর্যন্ত সে ঘরে গিয়ে অপবিত্রতার গোসল-ফরয গোসল সেরে না নেয়। হযরত আবু মূসা আশআরী (রা) বলেন, নবী করীম (স) বলেছেন: إذَا اسْتَعْطَرَتِ الْمَرْأَةُ فَمَرَّتْ عَلَى الْقَوْمِ لِيَجْدُوا رِيْحِهَا فَهِيَ كَذْ وَكَذَا ......... قَالَ قَوْلاً شَدِيدًا - "যে মহিলা আতর-সুগন্ধি লাগিয়ে পথে-ঘাটে চলাফেরা করে এ উদ্দেশ্যে যে এতে লোকেরা মেতে উঠবে-সে তো এমন এমন ............ খুব শক্ত কথাই বললেন তিনি।

প্রয়োজন ছাড়াও মহিলারা নিজেদের কণ্ঠস্বর পর-পুরুষদের শোনাবে -তা নবী করীম (স) আদৌ পসন্দ করতেন না। প্রয়োজন বশতঃ কথা বলার অনুমতি তো স্বয়ং কুরআন মজীদই দিয়েছে। নবী করীম (স)-এর স্ত্রীগণ তো লোকদেরকে দীনি বা নৈতিক মাসয়ালা-মাসায়েল বলে দিতেন। যেখানে এমন কোনো দীনি প্রয়োজন বা নৈতিক ফায়দা নেই, সেখানে পর-পুরুষদেরকে মহিলাদের আওয়ায শুনানো আদৌ সমর্থনযোগ্য নয়। এজন্যে নামাযে ইমাম ভুল করলে কেবল পুরুষ নামাযীদের হুকুম করা হয়েছে, তারা 'আল্লাহু আকবার' বা 'সুবহানাল্লাহ' বলে ইমামকে সংশোধন করে দেবে। অথচ মহিলাদের বলা হয়েছে, তারা হাতে হাত মেরে শব্দ করে ইমামকে সাবধান করবে। বলা হয়েছে, التسبيح للرجال والتصفيق للنساء।

নারীর অলংকারের আওয়ায বেগানা পুরুষকে শোনানো জায়েয নেই। আয়াতের শুরুতে বেগানা পুরুষদের কাছে নারীদের সাজসজ্জা প্রকাশ করতে নিষেধ করা হয়েছে। উপসংহারে এর প্রতি আরও জোর দেয়া হয়েছে যে, সাজসজ্জার স্থান মস্তক, বক্ষদেশ ইত্যাদি আবৃত করা তো ওয়াজিব ছিলই-গোপন সাজসজ্জা যে কোনোভাবেই প্রকাশ হোক, তাও জায়েয নয়। অলংকারাদির ভিতর এমন জিনিস রাখা যদ্দরুণ অলংকার ঝংকৃত হতে থাকে কিংবা অলংকারাদির পারস্পরিক সংঘর্ষের কারণে বাজা, কিংবা মাটিতে সজোরে পা রাখা, যার ফলে অলংকারের শব্দ হয় এবং তা বেগানা পুরুষের কানে পৌঁছে-এসব বিষয় আলোচ্য আয়াতের আলোকে নাজায়েয। এজন্যেই অনেক ফিকহবিদ বলেন, যখন অলংকারের আওয়ায বেগানা পুরুষকে শোনানো এ আয়াত দ্বারা অবৈধ প্রমাণিত হলো, তখন স্বয়ং নারীর আওয়ায আরও কঠোর এবং প্রশ্নাতীতরূপে অবৈধ হবে। তাই তাঁরা নারীর আওয়াযকেও গোপন অংগের অন্তর্ভুক্ত করেছেন। 'নাওয়াযেল' গ্রন্থে বলা হয়েছে যতদূর সম্ভব নারীগণকে কুরআন শিক্ষা নারীদের থেকেই গ্রহণ করা উচিত। অবশ্য নিরুপায় অবস্থায় পুরুষদের থেকে গ্রহণ করা জায়েয।

সহীহ আল বুখারী ও মুসলিম শরীফে বর্ণিত হয়েছে, নামাযে যদি কেউ মুসল্লির সম্মুখ দিয়ে পথ অতিক্রম করতে থাকে তবে পুরুষ মুসল্লির উচিত 'সুবহানাল্লাহ' বলে তাকে সতর্ক করে দেয়া। কিন্তু নারী আওয়ায করতে পারবে না; বরং সে এক হাতের পিঠে অন্য হাত মেরে তাকে সতর্ক করে দেবে। এতে আরও প্রমাণিত হয় যে, নারীরাও মসজিদে নামাযের জামায়াতে শরীক হতো।

নারীর আওয়ায গোপন অংগের অন্তর্ভুক্ত কিনা এবং বেগানা পুরুষকে আওয়ায শোনানো জায়েয কিনা-এ সম্পর্কে ইমামদের মতভেদ রয়েছে। ইমাম শাফেঈ (র)-এর গ্রন্থসমূহে নারীর আওয়াযকে গোপন অংগের অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। হানাফীগণের উক্তি বিভিন্নরূপ। ইবনে হুমাম নাওয়াযেল-এর বর্ণনার ভিত্তিতে গোপন অংগের অন্তর্ভুক্ত করেছেন। হানাফীগণের মতে মহিলার আযান মাকরূহ। তবে হাদীস দ্বারা প্রমাণিত আছে যে, রসূলুল্লাহ (স)-এর স্ত্রীগণ পর্দার আয়াত নাযিল হওয়ার পরেও পর্দার আড়ালে থেকে বেগানা পুরুষদের সাথে কথাবার্তা বলেছেন। উপরোক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বিশুদ্ধ ও অধিক সত্য কথা এই যে, যেখানে মহিলার আওয়াযের কারণে অনর্থ সৃষ্টি হওয়ার আশংকা থাকে সেখানে তা নিষিদ্ধ; আর যেখানে আশংকা নেই সেখানে তা জায়েয। (জাস্সাস) কিন্তু অপ্রয়োজনে পর্দার অন্তরাল থেকেও কথাবার্তা না বলার মধ্যে সাবধানতা নিহিত। নারী বাইরে যাওয়ার প্রয়োজন থাকলে সে বাইরে যাবে। তবে পর্দা সহকারে। এবং সুগন্ধি লাগিয়ে নয়। কেননা, সুগন্ধিও গোপন সাজ- সজ্জারও অন্তর্ভুক্ত। বেগানা পুরুষের কাছে ঐ সুগন্ধি পৌঁছা 'নাজায়েয'। তিরমিযী শরীফে হযরত আবু মূসা আশআরীর হাদীসে সুগন্ধি লাগিয়ে বাইরে গমনকারী নারীর নিন্দা করা হয়েছে। সুশোভিত বোরকা পরিধান করে বের হওয়াও জায়েয নয়। ইমাম জাস্সাস বলেন, কুরআনুল করীম নারীর আওয়াযকেও যখন নিষিদ্ধ করেছে, তখন সুশোভিত রঙীন ও কারুকার্যখচিত বোরকা পরিধান করে বের হওয়া আরও কঠোররূপে নিষিদ্ধ। এতে আরও বুঝা গেল যে, নারীর চেহারা যদিও গোপন অংগের অন্তর্ভুক্ত নয়, কিন্তু তা সৌন্দর্যের সর্ববৃহৎ কেন্দ্র হওয়ার কারণে একেও আবৃত রাখা ওয়াজিব। তবে প্রয়োজনের কথা স্বতন্ত্র।

আলোচ্য আয়াতের সর্বশেষে বলা হয়েছে: وَتُوبُوا إِلَى اللَّهِ جَمِيعًا أَيُّهَا الْمُؤْمِنُونَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ . "তোমরা সবাই আল্লাহর কাছে তাওবা করো, হে মুমিনগণ! যেন তোমরা কল্যাণ ও সফলতা লাভ করতে পারো।" আলোচ্য আয়াতে প্রথমে পুরুষদেরকে দৃষ্টি নত রাখার ও লজ্জাস্থান হেফাযতের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তারপর মহিলাদেরও তেমনি হুকুম দেয়া হয়েছে অতপর নারীদেরকে বেগানা পুরুষদের থেকে পর্দা করার জন্য আলাদা আলাদা আদেশ দেয়া হয়েছে। সর্বশেষে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাইকে যে নির্দেশ দেয়া হয়েছে, তাহলো কাম-প্রবৃত্তি ব্যাপারটি খুবই সূক্ষ্ম। অপরের তা জানা কঠিন। কিন্তু আল্লাহ তা'আলার কাছে প্রত্যেক প্রকাশ্য অপ্রকাশ্য বিষয় সমান দেদীপ্যমান। তাই উপরোল্লিখিত বিধানসমূহে যদি কোনো সময় কারো দ্বারা কোনো ত্রুটি হয়ে যায়, তবে সে জন্যে তাওবা করা খুবই জরুরী। সে অতীত কর্মের জন্য তাওবা করে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইবে এবং ভবিষ্যতে এরূপ না করার জন্য দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করবে।

এ ক্ষেত্রে প্রদত্ত হুকুম আহকাম নাযিল হওয়ার পর নবী করীম (স) কুরআনের ভাবধারা অনুসারে ইসলামী সমাজে যেসব সংশোধনী কার্যকর করেছিলেন, তার অতি সংক্ষিপ্ত কিছু বিষয় নিম্নরূপ: এক. নবী করীম (স) কোনো মুহরিম আত্মীয়ের অনুপস্থিতিতে অন্য লোকদের সাথে (এমনকি আত্মীয় হলেও) কোনো মহিলার একাকীত্বে দেখা-সাক্ষাত করা বা একত্রে বসা ও চলাফেরা করা নিষেধ করে দিয়েছেন। যেমন হযরত যাবের ইবনে আবদুল্লাহ (রা) বলেন, নবী করীম (স) বলেছেন: لَا تَلْجُوا عَلَى الْمُغِيِّبَاتِ فَإِنَّ الشَّيْطَانَ يَجْرِي مِنْ أَحَدِكُمْ مَجْرَى الدَّمِ “স্বামী অনুপস্থিত—এমন স্ত্রীলোকদের কাছে তোমরা যাবে না। কেননা শয়তান তোমাদের প্রত্যেকের রক্ত ধারায় (শিরা-উপশিরায়) প্রবাহিত হয়।” তাঁর অপর এক বর্ণনায় বলা হয়েছে, নবী করীম (স) বলেছেন: مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَلَا يَخْلُوْا بِامْرَأَةٍ لَيْسَ مَعَهَا ذُوْ مُحْرِمٍ مِنْهَا - فَإِنَّ ثَالِثَهُمَا الشَّيْطَانُ - "যে লোক আল্লাহ ও পরকালের উপর ঈমান রাখে সে কখনো একাকিত্বে কোনো মহিলার সাথে বসবে না, যতক্ষণ সে মহিলার সাথে তার কোনো মুহরিম পুরুষ উপস্থিত না থাকবে। কেননা তা করলে সেখানে তৃতীয় লোক থাকে শয়তান।” ইমাম আহমদ আমের ইবনে রবীআ প্রায় এরূপ অর্থেরই আর একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন। এ ব্যাপারে নবী করীম (স)-এর নিজের সতর্কতার অবস্থা ছিল এই: একবার রাত্রিকালে তিনি হযরত সফিয়া (রা)-কে সাথে করে তাঁর ঘরের দিকে ফিরছিলেন। পথিমধ্যে দুজন আনসারী তাঁদের অতিক্রম করে যাচ্ছিলেন। তিনি তাদের থামিয়ে বললেন, “আমার সাথে আমার স্ত্রী সফিয়া, অন্য কেউ নয়। তাঁরা বললেন, হে রসূল! আল্লাহ পাক তো পবিত্র। আপনার সম্পর্কে কি আমাদের কোনো খারাপ ধারণা হতে পারে?” নবী করীম (স) বললেন, “শয়তান ব্যক্তির দেহে রক্তের মতই প্রবাহিত হয়। সে তোমাদের মনে আমার সম্পর্কে যেন কোনো খারাপ ধারণা সৃষ্টি করতে না পারে সে আশংকায়ই আমি তোমাদের কাছে একথা বলা দরকার মনে করেছি।”

দুই. বুখারী ও মুসলিমে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত আছে, নবী করীম (স) এক ভাষণে বলেছিলেন: لَا يَخْلُونَ رَجُلٌ بِامْرَأَةٍ إِلَّا وَمَعَهَا ذُو مُحْرِمٍ وَلَا تُسَافِرُ الْمَرْأَةُ إِلَّا مَعَ ذى مُحْرِمِ কোনো পুরুষ কোনো পরনারীর সাথে নিভৃতে মিলিত হবে না, যতক্ষণ না তার সাথে কোনো মুহরিম পুরুষ উপস্থিত থাকে। আর কোনো মহিলা কোনো মুহরিম পুরুষ সংগী ছাড়া একাকিনী কোনো দূরবর্তী স্থানে সফর করবে না। এক ব্যক্তি বলে উঠলো, আমার স্ত্রী হজ্জে যাচ্ছে। আর আমার নাম তো অমুক অভিযানে গমনকারীদের তালিকায় লিস্ট ভুক্ত হয়ে আছে। এখন কি করা যাবে? নবী করীম (স) বললেন: فَانْطَلِقُ فَحَجَ مَعَ امْرَأَتِكَ “তাহলে তুমি চলে যাও, তোমার স্ত্রীর সাথে গিয়ে হজ্জ করো।” নির্ভরযোগ্য হাদীস গ্রন্থাবলীতে এ বিষয়ে বহু সংখ্যক হাদীস ইবনে উমর (রা), আবু সাঈদ খুদরী (রা) ও আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত ও উদ্ধৃত হয়েছে। এসব হাদীসের বক্তব্যে শুধু সফরের মেয়াদ কিংবা দূরত্বের ব্যাপারে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। কিন্তু সব কটি হাদীসই একত্রে ঘোষণা করে যে, আল্লাহ ও আখিরাতে বিশ্বাসী কোনো মহিলার পক্ষে কোনো মুহরিম পুরুষ ছাড়া একাকী সফর করা জায়েয নয়। এ জাতীয় হাদীস-সমূহের শিক্ষা হলো মেয়াদ কিংবা দূরত্ব নির্বিশেষে প্রচলিত অর্থের যে কোনো সফরে কোনো মহিলা মুহরিম পুরুষ ছাড়া সফর করতে পারবে না।

নারীদের জুমআ ও জামায়াত
নবী করীম (স) নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা বন্ধ করার কার্যত চেষ্টাও করেছিলেন, মুখে সুস্পষ্টভাবে নিষেধ করেছেন। ইসলামে জুমআ ও জামায়াতের যে গুরুত্ব, তা অভিজ্ঞ কারো অজানা নয়। জুমআর নামায তো আল্লাহ নিজে ফরয করেছেন। আর জামায়াতের সাথে নামাযের গুরুত্ব এভাবে উপলব্ধি করা যায়, যে ব্যক্তি বিনা ওজরে মসজিদে অনুপস্থিত থেকে নিজের ঘরে বসে নামায আদায় করলো, নবী করীম (স)-এর ঘোষণা মতে তার নামাযই কবুল হয় না। কিন্তু নবী করীম (স) মহিলাদের জন্য জুমআর নামায ফরয করেননি। আর তিনি মহিলা সমাজকে জামায়াতে শরীক হয়ে নামায আদায়ে বাধ্য করেননি; বরং তার অনুমতি দিয়েছেন এ ভাষায় যে, তারা যদি আসতেই চায়, তাহলে তাদের নিষেধ করবে না। তার সাথে একথাও স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, তাদের জন্য ঘরের নামায মসজিদের নামায অপেক্ষা উত্তম। আবু হুরাইরা (রা) বর্ণনা করেছেন, নবী করীম (স) বলেছেন لَا تَمْنَعُوا أَمَاءَ اللَّهِ مَسَاجِدَ الله আল্লাহর দাসীদের আল্লাহর ঘরে (মসজিদে) আসতে নিষেধ করো না। এরি অনুরূপ ইবনে উমর (রা)-এর আরেকটি বর্ণনা হলো: ائْذَنُوا النِّسَاء إِلَى الْمَسَاجِد باللَّيْلِ মহিলাদের রাত্রেবেলায় মসজিদে আসতে দাও। আরেকটি বর্ণনার ভাষা হলো: لَّهُنَّ - لا تَمْنَعُوا نِسَائِكُمُ الْمَسْجِدَ وَبيتُوهُنَّ خَيْرٌ "তোমাদের মহিলাদের মসজিদে আসতে নিষেধ করো না, যদিও তাদের ঘরই তাদের জন্য অধিক উত্তম।"

উম্মে হুমাইদ সায়েদীয়া বলেন, আমি নিবেদন করলাম, "ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনার পেছনে নামায আদায় করতে আমার বড় ইচ্ছে করে। তিনি বললেন, তোমাদের নিজেদের কামরায় নামায আদায় করা দহলিজে নামায আদায় করার চেয়ে উত্তম। তোমাদের নিজেদের ঘরে নামায আদায় করা মসজিদে নামায আদায় করার চেয়ে উত্তম। আর তোমাদের মহল্লার মসজিদে নামায আদায় করা জামে মসজিদে নামায আদায় করার চেয়ে উত্তম। প্রায় এ রকম কথাই বর্ণিত হয়েছে আবু দাউদ শরীফে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা) থেকে। হযরত উম্মে সালমা (রা)-এর বর্ণনায় নবী করীম (স)-এর ভাষা নিম্নরূপ: خَيْرُ مَسَاجِد النِّسَاءِ قَعْرُ بُيُوتِهِنَّ মহিলাদের জন্য সর্বোত্তম মসজিদ হচ্ছে তাদের ঘরের নিভৃততম কক্ষ। কিন্তু হযরত আয়েশা (রা) বনী উমাইয়া যুগের পরিবেশ দেখে বলেছিলেন, "নবী করীম (স) যদি মহিলাদের বর্তমান সময়ের চাল-চলন নিজ চক্ষে দেখতে পেতেন, তাহলে তিনি তাদের মসজিদে আসা তেমনিভাবে বন্ধ করে দিতেন যেমন বনী ইসরাঈলীদের মহিলাদের মসজিদে আসা বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। মসজিদে নববীতে মহিলাদের জন্য নবী করীম (স) আলাদা প্রবেশ পথ নির্দিষ্ট করে দিয়েছিলেন। হযরত উমর (রা) তাঁর খেলাফত আমলে পুরুষদেরকে সে পথে যাতায়াত করতে কঠোরভাবে নিষেধ করে দিয়েছিলেন। জামায়াতে মহিলাদের কাতার রাখা হতো পুরুষদের পেছনে। আর নামায শেষ করে সালাম ফিরিয়ে নবী করীম (স) কিছুক্ষণ দেরী করতেন, যেন পুরুষদের উঠার আগেই মহিলারা বের হয়ে চলে যেতে পারে।

নারীদের সাজসজ্জা করার জন্য নবী করীম (স) অনুমতি দিয়েছেন, বরং সে জন্যে তিনি তাদের উপদেশও দিয়েছেন। কিন্তু এ ব্যাপারে সীমালংঘন করতে তিনি কঠোর ভাষায় নিষেধ করেছেন। তৎকালে যে ধরনের সাজ-সজ্জা করা নারীদের মধ্যে রেওয়াজ ছিল, তার মধ্যে নিম্নোক্তগুলোকে তিনি লানত যোগ্য এবং অভিসম্পাতের কারণরূপে নির্ধারিত করেছেন: ১. নারীদের পরচুলা লাগিয়ে অধিক লম্বা বা ঘন বানাতে চেষ্টা করা, ২. দেহের বিভিন্ন অংগে নকশা বা ছবি অংকন করা, ৩. কৃত্রিমভাবে তিল রচনা করা, ৪. চুল উপড়িয়ে ভ্রূ-কে বিশেষ ধরনের বানানো, ৫. লোম খুঁচে খুঁচে মুখ পরিষ্কার করা, ৬. দাঁত ঘষে ঘষে চিকণ ও শাণিত করানো, ৭. দাঁতসমূহের মধ্যে কৃত্রিম ফাঁক সৃষ্টি করা, ৮. জাফরান বা পাউডারের কৃত্রিম সংযোগে চেহারার কৃত্রিম রঙ বানানো। সীহাহ সিত্তাহ মুসনাদে আহমদ-এ হযরত আয়েশা (রা) হযরত আসমা বিনতে আবু বকর (রা) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা), আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা), আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) এবং আমীর মুআবিয়া (রা) থেকে নির্ভরযোগ্য সূত্রে এসব নিষেধ বর্ণিত হয়েছে।

আল্লাহ ও রসূলের এসব সুস্পষ্ট হেদায়াত দেখে নেয়ার পর একজন ঈমানদারের জন্য দুটো পথ খোলা রয়েছে: (ক) সে এসব মেনে নিয়ে নিজের ঘর ও পরিবেশকে এসব ফেতনা ও বিপর্যয়মূলক আপদ থেকে পবিত্র করে নেবে অথবা (খ) সে নিজের ঈমানী দুর্বলতার কারণে এসব নির্দেশের বা কোনো কোনোটির বিরোধীতা করবে, তবে এটাকে গুনাহ মনে করেই করবে। এ সবের অপব্যাখ্যা করে গুনাহকে সওয়াবের কাজ বানাবে না। বস্তুত পাশ্চাত্য কৃষ্টি ও সভ্যতার হুবহু অনুসরণ করেও মুসলিম নাম ধারণ করার মত আত্ম প্রবঞ্চনার উদাহরণ পৃথিবীতে দ্বিতীয়টি হতে পারে না। আল্লাহ মুসলিম উম্মাহর হেফাযত করুন।

টিকাঃ
-(মাআরেফুল কুরআন), (ইবনে কাসীর), (তাফহীমুল কুরআন), (জাস্সাস থেকে মাআরেফুল কুরআন), (তাফহীমুল কুরআন অনুসরণে)

📘 আল কুরআনে নারী 📄 বিবাহযোগ্য নর-নারীর বিয়ের ব্যবস্থা করে দেয়া... অসমর্থরা যেন চারিত্রিক পবিত্রতা রক্ষা করে

📄 বিবাহযোগ্য নর-নারীর বিয়ের ব্যবস্থা করে দেয়া... অসমর্থরা যেন চারিত্রিক পবিত্রতা রক্ষা করে


وَأَنْكِحُوا الْأَيَامَى مِنْكُمْ وَالصَّالِحِينَ مِنْ عِبَادِكُمْ وَإِمَائِكُمْ إِنْ يَكُونُوا فُقَرَاءَ يُغْنِهِمُ اللَّهُ مِنْ فَضْلِهِ ۖ وَاللَّهُ وَاسِعٌ عَلِيمٌ ۞ وَلْيَسْتَعْفِفِ الَّذِينَ لَا يَجِدُونَ نِكَاحًا حَتَّىٰ يُغْنِيَهُمُ اللَّهُ مِنْ فَضْلِهِ ۗ

“তোমাদের মধ্যে যারা জুড়িহীন, তাদের বিয়ে সম্পাদন করে দাও। তাছাড়া তোমাদের দাস-দাসীদের যারা চরিত্রবান তাদেরও। তারা যদি অভাবগ্রস্ত হয়ে থাকে তবে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদের অভাবমুক্ত করে দেবেন। আল্লাহ তো প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ। আর যাদের বিয়ে করার সামর্থ নেই, তারা যেন নৈতিক পবিত্রতা অবলম্বন করে। যতক্ষণ না আল্লাহর নিজ অনুগ্রহে তাদের অভাবমুক্ত করে দেন।” -সূরা আন নূর: ৩২-৩৩

বিবাহযোগ্য নর-নারীর বিয়ের ব্যবস্থা করে দেয়া অভিভাবক ও সমাজপতিদের কর্তব্য। অসমর্থরা যেন চারিত্রিক পবিত্রতা রক্ষা করে।

আলোচ্য আয়াতে أَيَّامَىٰ (আয়ামা) শব্দটি أَيِّمٌ শব্দের বহুবচন। এর অর্থ যে পুরুষের স্ত্রী নেই অথবা যে নারীর স্বামী নেই। আয়াতের তরজমায় ‘জুড়িহীন’ শব্দ দিয়ে একথাটি বুঝানো হয়েছে। শব্দটি ব্যাপক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থাৎ যে নারী বা পুরুষের এখনো বিয়ে হয়নি, অথবা বিয়ে হয়েছে; কিন্তু নারীটির স্বামী বা পুরুষটির স্ত্রী মারা গেছে; অথবা তালাক হয়ে গেছে। এসবের যে কোনো কারণে স্বামী-স্ত্রীবিহীন নর-নারীকে বিয়ে করানোর নির্দেশ রয়েছে আলোচ্য আয়াতে।

ইসলাম যেমন একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান। তেমনি ইসলামী শরীয়ত একটি সুষম শরীয়ত। এর যাবতীয় বিধি-বিধানে সমতা নিহিত আছে। একদিকে মানুষের স্বভাবগত কামনা-বাসনার প্রতি লক্ষ রাখা হয়েছে, আর অপরদিকে এসব ব্যাপারে বাড়াবাড়ী ও সীমালংঘনকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। তাই একদিকে মানুষকে অবৈধ পন্থায় নিজ কামপ্রবৃত্তি চরিতার্থ করা থেকে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে, অপরদিকে স্বভাবগত চাহিদা ও কামনা-বাসনার প্রতি লক্ষ রেখে এর বৈধ বিশুদ্ধ পথও বলে দেয়া হয়েছে। তাছাড়া মানব জাতির অস্তিত্ব অক্ষুণ্ণ রাখার উদ্দেশ্যে কতিপয় সীমার ভেতরে থেকে নর-নারীর মেলামেশার কোনো পন্থা প্রবর্তন করাটা যুক্তি ও শরীয়তের দাবী। কুরআন-সুন্নাহর পরিভাষায় এ পন্থার নাম বিবাহ। আলোচ্য আয়াতে এ সম্পর্কে স্বাধীন নর-নারীদের অভিভাবক এবং দাস-দাসীদের মালিকদেরকে এদের বিবাহ সম্পাদন করার আদেশ দেয়া হয়েছে।

আলোচ্য আয়াতের বর্ণনাভংগী থেকে একথা প্রমাণিত হয় এবং এ ব্যাপারে ইমামগণও একমত যে নিজের বিয়ে নিজেই সম্পাদন করার জন্য কোনো পুরুষ ও নারীর প্রত্যক্ষ পদক্ষেপ নেয়ার পরিবর্তে অভিভাবকদের মাধ্যমে একাজ সম্পাদন করাই বিবাহের মসনূন তরিকা ও উত্তম পন্থা। এতে অনেক ধর্মীয় ও পার্থিব উপকারিতা আছে। বিশেষত মেয়েদের বিবাহ, তারা নিজেরাই সম্পন্ন করবে-এটা যেমন একটা নির্লজ্জ কাজ, তেমনি এতে অশ্লীলতার পথ খুলে যাওয়ারও সমূহ সম্ভাবনা থাকে। এ কারণেই কোনো কোনো হাদীসে নারীদেরকে অভিভাবকদের মাধ্যম ছাড়া নিজেদের বিবাহ নিজে সম্পাদন করা থেকে বাধাও দেয়া হয়েছে। ইমাম আযম ও অন্য ইমামের মতে এ বিধানটি একটি বিশেষ সুন্নাত ও শরীয়তগত নির্দেশের মর্যাদা রাখে। যদি কোনো প্রাপ্তবয়স্কা বালিকা নিজের বিবাহ অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া 'কুফু' সম্মত তথা সমতুল্য লোকের সাথে সম্পাদন করে, তবে বিবাহ শুদ্ধ হয়ে যাবে। যদিও সুন্নাতের খেলাপ হওয়ার কারণে বালিকাটি তিরষ্কারের যোগ্য হবে, যদি সে কোনোরূপ বাধ্যবাধকতার পরিপ্রেক্ষিতে এ পদক্ষেপ না নিয়ে থাকে। ইমাম শাফেঈ ও অন্য ইমামের মতে অভিভাবকদের মাধ্যমে না হলে প্রাপ্তবয়স্কা বালিকার বিবাহও বাতিল বলে গণ্য হবে। আলোচ্য আয়াত থেকে অধিকতরভাবে একথাই প্রমাণিত হয় যে, বিবাহে অভিভাবকের মধ্যস্থতা বাঞ্ছনীয়। এখন কেউ যদি অভিভাবকের মধ্যস্থতা ছাড়াই বিবাহ করে, তবে তা শুদ্ধ হবে কিনা আয়াত সে ব্যাপারে নিরব। বিশেষত এ কারণেই যে আয়ামী শব্দের মধ্যে প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ ও নারী উভয়ই অন্তর্ভুক্ত। প্রাপ্তবয়স্ক বালকদের বিবাহ অভিভাবকের মধ্যস্থতা ছাড়া সবার মতেই শুদ্ধ-কেউ এটাকে বাতিল বলে না। এমনিভাবে বাহ্যত বুঝা যায় যে, প্রাপ্তবয়স্কা বালিকা নিজের বিবাহ নিজেই সম্পাদন করলে তাও শুদ্ধ হয়ে যাবে। তবে সুন্নাত পরিপন্থী হওয়ার কারণে উভয়কেই তিরস্কার করা হবে।

আলোচ্য আয়াতে অভিভাবক ও মুসলিম সমাজকে আদেশ দেয়া হয়েছে তারা যেন প্রাপ্তবয়স্ক ছেলেমেয়েদের বিয়ে সম্পাদন করে দেয়। অধিকাংশ ইমাম ও তাফসীরকারের মতে এ আদেশ বাধ্যতামূলক নয়, বরং উপদেশ- মূলক। তাদের প্রমাণ হলো রসূলের যুগে অনেক লোক স্বামীহীন স্ত্রীহীন অবস্থায় জীবন কাটিয়েছে। তাদের তো বিয়ে দেয়া হয়নি। এ আয়াতের আদেশ বাধ্যতামূলক হলে তাদেরকে অবশ্যই বিয়ে দেয়া হতো। কিন্তু কোনো কোনো মুফাস্সিরের মতে এ আদেশ অবশ্যই বাধ্যতামূলক। তবে তা এ অর্থে নয় যে, রাষ্ট্র ও সরকার স্বামী-স্ত্রীহীন নর-নারীকে বিয়ে করতে বাধ্য করবে। বরং তার অর্থ এই যে, তাদের মধ্যে যারা বিয়ে করতে ইচ্ছুক, তাদেরকে আর্থিক সহায়তা দিয়ে তাদের সতীত্ব ও শ্লীলতাকে নিরাপদ রাখা ও সংরক্ষণ করা ইসলামী সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য অবশ্য কর্তব্য বা ওয়াজিব। কেননা বিয়ে হচ্ছে সতীত্বকে কার্যকরভাবে সংরক্ষণ এবং সমাজকে ব্যভিচার ও অশ্লীলতা থেকে পবিত্র করা ও পবিত্র রাখার পন্থা ও উপায়। সমাজকে ব্যভিচার থেকে পবিত্র রাখা যখন ওয়াজিব, তখন তার পন্থা ও উপায় অবলম্বন করাও ওয়াজিব।

ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা হিসেবে যাবতীয় অর্থনৈতিক সমস্যার মৌলিক সমাধানও দিয়ে থাকে। তাই ইসলাম সকল সুস্থ ও সবল মানুষকে নিজের যাবতীয় মৌলিক প্রয়োজন পূরণের উপযোগী অর্থ ও জীবিকা উপার্জনের সমর্থ বানায়। মানুষ যেন অপরের মুখাপেক্ষী না থাকে সে ব্যবস্থা করে থাকে। সকল নাগরিকের কর্মসংস্থান ও পর্যাপ্ত পারিশ্রমিকের ব্যবস্থা করাকে ইসলাম রাষ্ট্রের কর্তব্যরূপে ধার্য করে দেয়। এতদসত্ত্বেও ইসলামী সমাজে যদি কখনো এমন কিছু অবিবাহিত নর-নারী বিদ্যমান থাকে, যাদের নিজস্ব সহায় সম্পদ বিয়ের খরচের জন্য যথেষ্ট নয়, তাহলে তাদের বিয়ের ব্যবস্থা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। তবে তাদের অভিভাবক যতক্ষণ তাদের বিয়ের ব্যবস্থা করতে সক্ষম, ততক্ষণ এটা তাদেরই দায়িত্ব থাকবে। নারী হোক বা পুরুষ হোক যারা বিয়ের যোগ্য ও বিয়ে করতে ইচ্ছুক, তাদের বিয়ে শুধু অর্থাভাবে আটকে থাকবে, এটা অন্যায় ও অবৈধ। মনে রাখতে হবে, জীবিকা আল্লাহর হাতে। আর আল্লাহই তাদের অভাব দূর করার নিশ্চয়তা দিয়েছেন যদি তারা নিজেদের সতীত্ব ও শ্লীলতা রক্ষার পবিত্র পথ অবলম্বন করে। তারা যদি অভাবী হয় তবে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদের অভাব দূর করে দেবেন। রসূলুল্লাহ (স) বলেছেন, "তিন ব্যক্তির সাহায্য করা আল্লাহর দায়িত্ব : আল্লাহর পথে জিহাদকারী, যে পরাধীন ব্যক্তি মুক্তিপণ দিয়ে মুক্তিলাভে ইচ্ছুক এবং যে ব্যক্তি বিয়ে করে নিজের সতীত্ব ও শ্লীলতাকে নিরাপদ করতে চায়।

সমাজ ও রাষ্ট্র কর্তৃক স্বামীহীন নারী ও স্ত্রীহীন পুরুষকে বিয়ে দেয়ার উদ্যোগ গ্রহণের পূর্ব পর্যন্ত তারা যাতে নিজেদের সতীত্ব ও শ্লীলতা রক্ষায় সচেষ্ট থাকে, সে জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে পরবর্তী আয়াতে। বলা হয়েছে, যারা বিয়ে করার সামর্থবান নয় তাদের উচিত নিজ নিজ শ্লীলতা রক্ষা করা-যতক্ষণ না আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদের অভাবমুক্ত করেন ...... বস্তুত আল্লাহ তা'আলা সৎজীবন যাপনে ইচ্ছুকদের পথ সংকীর্ণ করেন না। কেননা তিনি তাদের ইচ্ছা ও সততা সম্পর্কে ওয়াকিফহাল। এভাবে ইসলাম সমস্যার বাস্তবানুগ সমাধান দেয়। বিয়ের যোগ্য কোনো ব্যক্তি কেবল আর্থিক অক্ষমতার কারণে বিয়ে করতে না পারলে সে তাকে আর্থিক আনুকূল্য দিয়ে বিয়ে করার ক্ষমতা যোগায়। বিয়ে করার পথে সম্ভবত অর্থাভাবই সবচেয়ে দুর্লংঘ বাধা।

এখানে ৩২ আয়াতের শেষাংশে বলা হয়েছে: إِنْ يَكُونُوا فُقَرَاءَ يُغْنِهِمُ اللَّهُ مِنْ فَضْلِهِ - "তারা যদি অভাবগ্রস্ত হয়ে থাকে তবে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদের অভাবমুক্ত করে দেবেন।” এর অর্থ এ নয় যে, যে ব্যক্তিরই বিবাহ সম্পন্ন হবে তাকেই আল্লাহ খুব মাল-দৌলত দিয়ে দেবেন। বরং এর মানে বিয়ে করার ব্যাপারে লোকেরা যেন বড় হিসাবী হয়ে না দাঁড়ায়। রিষকের সংকীর্ণতা এসে যাওয়ার আশংকা যেন কাউকে কাবু করে না বসে। বস্তুত এখানে কন্যা পক্ষকে এ হেদায়াত দেয়া হয়েছে যে, কোনো ভাল চরিত্রের ছেলের পক্ষ থেকে যদি তাদের কাছে বিয়ের পয়গাম পাঠায়, তবে কেবল তার দরিদ্র অবস্থার কথা চিন্তা করে যেন তা প্রত্যাখ্যান করে না বসে। পক্ষান্তরে ছেলের পক্ষের প্রতি হেদায়াত এই যে, ছেলে এখনো বেশী কামাই রোজগার করতে পারছে না বলে তাকে যেন অবিবাহিত না রাখা হয়। আর সাধারণভাবে সকল যুবকের প্রতি হেদায়াত ও শিক্ষা এই যে, অধিক আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য ও প্রাচুর্যের আশায় বিয়ের ব্যাপারটিকে মূলতবী করে রাখা তাদের উচিত হবে না। অল্প আয় হলেও আল্লাহর উপর ভরসা করে বিয়ে করা উচিত। অনেক সময় শুধু বিয়ের ফলেই মানুষের আর্থিক অবস্থা স্বচ্ছল হয়ে যায়। স্ত্রীর সাহায্যে ব্যয় নির্বাহের কাজটা সহজ ও নিয়ন্ত্রিত হয়। তাছাড়া দায়িত্ব মাথার উপর এসে গেলে মানুষ অধিক পরিশ্রম করতে ও আয় বৃদ্ধি করতে স্বতঃই প্রবৃত্ত হয়। রুজী রোজগারের ব্যাপারে স্ত্রীও সহযোগীর ভূমিকা পালন করে থাকে। আর সবচেয়ে বড় কথা, কার ভাগ্যে ভবিষ্যতের জন্য কি লেখা আছে তা কেউ বলতে পারে না। ভাল অবস্থাও পরিবর্তিত হয়ে খারাপ হয়ে যেতে পারে আবার খারাপ অবস্থাও পরিবর্তিত হয়ে ভাল হয়ে যেতে পারে। সুতরাং অত্যধিক হিসেবী হয়ে চলা ভাল কাজ নয়।

পুরুষের ব্যাপারে বিয়ে না করে থাকার সাধারণ কারণ হলো দারিদ্র। দরিদ্র ব্যক্তি কোনো পরিবারের দায়িত্ব গ্রহণে প্রথমে নিজেই তো শংকিত হয়ে যায়। এমতাবস্থায় কোনো মহিলা নিজেকে ঐ ধরনের পুরুষের সাথে বিয়ের সূত্রে আবদ্ধ হতে সম্মত হবে কি করে? এ ধরনের প্রতিবন্ধকতা বিদূরীত করার জন্য আল্লাহ তা'আলা সুসংবাদ দিয়েছেন যে, যারা দরিদ্র তারা এবং অপরপক্ষও যেন নিশ্চিন্ত থাকে যে বিবাহ দারিদ্র বৃদ্ধি করে না বরং আল্লাহর রিযক ও অনুগ্রহের বৃদ্ধি সাধন করে থাকে। যে লোক নিজের ঈমান ও চরিত্রের হেফাযতের জন্যে বিবাহ করে তার প্রতি আল্লাহ তা'আলার কৃপাদৃষ্টি বর্ষিত হয় ও তার প্রতি সাহায্যের হাত সম্প্রসারিত করা হয়। পুরুষ যতদিন পর্যন্ত স্ত্রীবিহীন থাকে ততদিন সে যাযাবর জীবন যাপন করে এবং তার অনেক যোগ্যতা সংকুচিত ও প্রদমিত হয়ে থাকে। তেমনিভাবে মহিলা যতদিন স্বামীহীন অবিবাহিতা থাকে তার উদাহরণ হলো সেই লতা-গুল্মের মত যা কোনো ভর না পাওয়ার কারণে প্রসারণ, বর্ধন ও ফলন থেকে বঞ্চিত থাকে। তবে স্ত্রীলোক যখন স্বামী পেয়ে যায় আর পুরুষ যদি স্ত্রীর সান্নিধ্য লাভ করতে পারে, তাহলে উভয়ের যোগ্যতা বৃদ্ধিলাভ করে। জীবন ক্ষেত্রে যখন তারা উভয়ে মিলে চেষ্টা-সাধনা চালায়, তখন আল্লাহ তা'আলা তাদের সেই চেষ্টা-সাধনায় বরকত দান করেন আর তখন তাদের অবস্থার সার্বিক পরিবর্তন সূচিত হয়।

এতো গেল স্বল্প আয়ের লোকদের কথা। পরবর্তী আয়াতে বলা হয়েছে وَلْيَسْتَعْففِ الَّذِيْنَ لَا يَجِدُونَ نِكَاحًا "আর যাদের বিয়ে করার সামর্থ নেই, তারা যেন নৈতিক পবিত্রতা অবলম্বন করে।" এখানে সেসব লোকদের কথা বুঝানো হয়েছে যারা এতই অসচ্ছল যে তাদের পক্ষে বিয়ে করা মোটেই সম্ভব নয়। এ ধরনের লোকদের হেদায়াত দেয়া হয়েছে তারা যেন আল্লাহর অনুগ্রহে অভাবমুক্ত হওয়া পর্যন্ত সবর করে আর নিজেদের পবিত্র রাখে। এ পর্যায়ে নবী করীম (স)-এর একটি হাদীস খুবই প্রণিধানযোগ্য। তাহলো হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা) বর্ণনা করেন, নবী করীম (স) বলেছেন: يَا مَعْشَرَ الشَّبَابِ مَنِ اسْتَطَاعَ مِنْكُمُ الْبَائَةَ فَلْيَتَزَوَّجَ فَإِنَّهُ أَغَضُّ لِلْبَصَرِ وَاحْصَنُ لِلْفَرَجِ وَمَنْ لَّمْ يَسْتَطِعْ فَعَلَيْهِ بِالصَّوْمِ فَإِنَّهُ لَهُ وَجَاءَ - "হে যুব সমাজ! তোমাদের মধ্যে যে বিবাহ করতে সক্ষম সে যেন বিবাহ করে। কেননা, বিবাহ খারাপ দৃষ্টি থেকে আত্ম রক্ষার এবং নিজের পবিত্রতা রক্ষা করার বড় উপায়। আর যে লোক এর সামর্থ রাখে না সে যেন রোযা রাখে। কেননা রোযা তার যৌন প্রবৃত্তিকে দমন করে রাখে।"

হযরত আবু হুরাইরা (রা) বর্ণনা করেন, নবী করীম (স) বলেছেন: ثلثة حق على الله عونهم الناكح يريد العفاف والمكاتب يريد الأداء والغازي في سبيل الله - "তিনজন লোকের সাহায্য আল্লাহর জিম্মায়। একজন সেই ব্যক্তি যে পবিত্র-চরিত্র থাকার উদ্দেশ্যে বিয়ে করে। দ্বিতীয় চুক্তিকারী দাস যে মালিকের প্রাপ্য আদায় করার নিয়ত রাখে। তৃতীয় সেই ব্যক্তি যে আল্লাহর পথে জিহাদের উদ্দেশ্যে বের হয়।"

এ পরবর্তী আয়াত ৩৩ এ ব্যক্তিগত দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে বলা হয়েছে। পূর্বের আয়াতে ছিল সমাজের প্রতি হেদায়াত আর এ আয়াত ৩৩ এ ব্যক্তির নৈতিক দায়িত্ব ব্যক্তির উপরই বর্তাবে বলে ঘোষণা দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ কোনো ব্যক্তি যদি বিবাহ করার মত সামর্থ থেকে বঞ্চিত থাকে, তাহলে তার এ বঞ্চনা কোনো অবস্থাতেই নৈতিকতা বিরোধী কাজের কারণ হিসেবে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এ ধরনের লোকের কর্তব্য হলো তারা নিজেদেরকে নিজেরা নিয়ন্ত্রণে রাখবে। আবার আল্লাহর রহমত ও করুণার জন্য অপেক্ষা করবে। যে ব্যক্তি নিজের ঈমান ও চরিত্রের হেফাযতের জন্য এভাবে জিহাদ করতে থাকবে, আল্লাহ তা'আলা তার জন্য পথ করে দেবেন। আয়াতের শব্দগুলো থেকে একথাই প্রকাশ পায়।

টিকাঃ
-(মাআরেফুল কুরআন), (ফী যিলালিল কুরআন), (তাফহীমুল কুরআন), (তাদাব্বুরে কুরআন)

📘 আল কুরআনে নারী 📄 কারো ঘরে প্রবেশের অনুমতি গ্রহণ : দেখা-সাক্ষাতের শিষ্টাচার

📄 কারো ঘরে প্রবেশের অনুমতি গ্রহণ : দেখা-সাক্ষাতের শিষ্টাচার


يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لا تَدْخُلُوا بُيُوتًا غَيْرَ بُيُوتِكُمْ حَتَّى تَستَأْنِسُوا وَتُسَلِّمُوا عَلَى أَهْلِهَا ، ذَلِكُمْ خَيْرٌ لَّكُمْ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُونَ ، فَإِنْ لَّمْ تَجِدُوا فِيهَا أَحَدًا فَلَا تَدْخُلُوهَا حَتَّى يُؤْذَنَ لَكُمْ وَإِنْ قِيلَ لَكُمْ ارْجِعُوا فَارْجِعُوا هُوَ أَزْكَى لَكُمْ ط وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُوْنَ عَلِيمٌ لَيْسَ عَلَيْكُمْ جُنَاحٌ أَنْ تَدْخُلُوا بُيُوتًا غَيْرَ مَسْكُونَةٍ فِيهَا مَتَاعٌ لَّكُمْ وَاللَّهُ يَعْلَمُ مَا تُبْدُونَ وَما تَكْتُمُونَ )

"হে তোমরা যারা ঈমান এনেছ! তোমরা নিজেদের ঘর ছাড়া অন্য কারো ঘরে তাদের অনুমতি ছাড়া এবং তাদের সালাম না করে প্রবেশ করো না। এ নিয়ম তোমাদের জন্য কল্যাণময়, তোমরা এ দিকে খেয়াল রাখবে বলে আশা করা যায়। যদি তোমরা ঘরে কাউকেও না পাও তবে তাতে প্রবেশ করবে না, যতক্ষণ না তোমাদের অনুমতি দেয়া হয়। আর যদি তোমাদের বলা হয়, 'ফিরে যাও' তবে তোমরা ফিরে যাবে; এটা তোমাদের জন্য পবিত্রতম কর্মনীতি। তোমরা যাকিছু করো, আল্লাহ তা ভাল করেই জানেন। অবশ্য তোমাদের জন্য এমন ঘরে প্রবেশ করায় কোনো দোষ নেই যাতে কেউ বসবাস করে না। আর সেখানে তোমাদের কোনো জিনিসপত্রও রয়েছে। আল্লাহ তো জানেন যা তোমরা প্রকাশ করো আর যা তোমরা গোপন করো।"-সূরা আন নূর: ২৭-২৯

কারও ঘরে প্রবেশের অনুমতি গ্রহণ: দেখা-সাক্ষাতের শিষ্টাচার

ইসলাম তার ইপ্সিত পরিচ্ছন্ন ও সৎ সমাজ গড়ার ব্যাপারে কেবল কোনো অপরাধ সংঘটিত হয়ে গেলে তার শাস্তি বিধানের উপরই নির্ভর করে না, বরং সবকটির আগে ইসলাম প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের উপরই গুরুত্ব আরোপ করে। ইসলাম অপরাধ সৃষ্টির সকল চোরাপথ বন্ধ করার ব্যবস্থা (Preventive Check) নিয়ে থাকে। আলোচ্য আয়াতে কারো ঘরে প্রবেশের পূর্বে অনুমতি গ্রহণ সংক্রান্ত বিধান উন্নত সমাজের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ইসলামী ব্যবস্থা। ইসলাম মুসলমানদের বাড়ী-ঘরকে এতটা পবিত্র ও সুরক্ষিত করেছে যে, ইসলাম বাড়ী-ঘরের পবিত্রতা বিনষ্ট করার প্রাথমিক ধাপকেই নস্যাৎ করে দিয়েছে। তাই তো কোনো আগন্তুকের গৃহকর্তার অনুমতি না নিয়ে কারো ঘরে প্রবেশ করা ইসলাম কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে।

জাহেলী যুগে এমন রীতি প্রচলিত ছিল যে, একজন আরব অতর্কিতে অন্যের ঘরে ঢুকে পড়তো আর বলতো, 'ঢুকে পড়েছি'। এভাবে কখনো গৃহকর্তাকে স্বীয় স্ত্রীর সাথে এমন অবস্থায় দেখতে পেতো যা অন্য কারো উচিত নয়। অথবা নারী বা পুরুষকে নগ্ন কিংবা দেহের গোপনীয় অংশ অনাবৃত অবস্থায় দেখতে পেতো। এসব কারণে আল্লাহ তা'আলা মুসলমানদেরকে এ উঁচুমানের আদব ও ভদ্র আচরণ শিক্ষা দিয়েছেন যে অন্যের ঘরে প্রবেশ করতে হলে ঘরের অধিবাসীর অনুমতি নিতে হবে। তাদেরকে সালাম দিয়ে তাদের আপন করে নিতে হবে এবং তাদের মন থেকে যাবতীয় বিরূপ ভাব ও শংকা দূর করতে হবে।

আলোচ্য আয়াতে কারো ঘরে ঢুকতে হলে কি করতে হবে সে সম্পর্কে বলা হয়েছে حَتَّى تَسْتَأْنِسُوا وَتُسَلِّمُوا عَلَى أَهْلِهَا অর্থাৎ “যতক্ষণ না গৃহকর্তার সন্তোষময় অনুমতি নাও ও ঘরে বসবাসকারীদের প্রতি সালাম না পাঠাও।” এখানে تَستأنسوا শব্দ এসেছে استیناس থেকে, যার মাদা বা মূল হলো اُنس শব্দ। استیناس শব্দের অর্থ দাঁড়ায় 'পরিচয় জানা' অথবা 'নিজের সাথে পরিচিত করা' 'তাহলে আয়াতের যথার্থ মানে দাঁড়ায়, 'অন্যদের ঘরে প্রবেশ করো না যতক্ষণ না তাদেরকে পরিচিত করে নাও।"

দ্বিতীয়ত, ঘরের অধিবাসীদের প্রতি সালাম দেয়া কর্তব্য। কোনো কোনো তাফসীরকারক আয়াতের অর্থ করেছেন কারো ঘরে প্রবেশের জন্য প্রথমে অনুমতি নেবে অতপর ঘরে ঢোকার সময় সালাম করবে। ইমাম বুখারী (র) আদাবুল মুফরাদ গ্রন্থে হযরত আবু হুরাইরা থেকে বর্ণনা করেন, যে ব্যক্তি প্রথমে অনুমতি চায় তাকে অনুমতি দিও না। কারণ সে আগে সালাম না দিয়ে সুন্নাত তরিকার খেলাফ করেছে। আবু দাউদ শরীফের এক হাদীসে আছে, বনী আমেরের জনৈক ব্যক্তি রসূলুল্লাহ (স)-এর কাছে এসে বাইর থেকে বললো أَأَدْخُلُ । আমি কি ঢুকে পড়বো? তখন তিনি খাদেমকে বললেন, লোকটি অনুমতি চাওয়ার নিয়ম জানে না। বাইরে গিয়ে তাকে নিয়ম শিখিয়ে দাও। সে যেন বলে, السَّلَامُ عَلَيْكُمْ أَأَدْخُلُ - অর্থাৎ সে যেন সালাম দিয়ে বলে "আমি কি ভিতরে আসতে পারি?” রসূলুল্লাহ (স)-এর এ উক্তি বর্ণনা হয়েছে, لا تأذنوا لمن لم يبدأ بالسلام যে প্রথমে সালাম করে না তাকে ভিতরে আসার অনুমতি দিও না।

আমাদের সমাজে ইসলামের এমন রুচীশীল মার্জিত আচরণ বিলুপ্ত প্রায়। কেউ কেউ তো দরজা নক করে মাত্র। সালাম তো করেই না। অধিকন্তু দরজা নক করার আওয়ায শুনে যদি ভিতর থেকে জিজ্ঞেস করা হয়-কে? তখন জবাবে বলে দেয় 'আমি'। কিন্তু আমি শব্দ দ্বারা তো প্রশ্নের উত্তর হলো না, বরং তা গৃহকর্তার জন্য আরও বিভ্রান্তিকর ও আশংকার কারণ হয়ে পড়ে। একদিন হযরত জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (রা) রসূলুল্লাহ (স)-এর দ্বারে উপস্থিত হয়ে অনুমতির জন্যে দরজার কড়া নাড়লেন। রসূলুল্লাহ (স) ভিতর থেকে প্রশ্ন করলেন, কে? উত্তরে জাবের বললেন- 'আমি' বলে জবাব দিলেন। এতে রসূলুল্লাহ (স) তাকে শাসিয়ে বললেন, আন?? অর্থাৎ আমি, আমি বললে কাউকেও চেনা যায় নাকি?

দরজা নক্ করার পর যদি কোনো জবাব না আসে অথবা অন্য কোনোভাবে জানা যায় যে, ঘরে কোনো লোক নেই, তখন ঘরের ভিতরে প্রবেশ করার চেষ্টা করা যাবে না। অথবা যদি ভিতর থেকে ফিরে যাওয়ার জন্য বলা হয়, তখন বিরক্ত না হয়ে ফিরে যেতে হবে। এ নিয়ম বলে দেয় যে গৃহকর্তা কি কারণে এখন চলে যেতে বললো-তা তো জানা যায়নি, তবুও নিজের আত্মসম্মানবোধের চেয়ে গৃহকর্তার সুবিধা-অসুবিধার প্রতি গুরুত্ব দিয়ে ফিরে যাওয়ার মধ্যেই রয়েছে হেকমত।

কারো দরজায় অনুমতি চাওয়ার পর যদি ভিতর থেকে জবাব না আসে, তবে দ্বিতীয়বার ও তৃতীয়বার অনুমতি চাওয়া সুন্নাত। তৃতীয়বারও যদি জবাব না আসে তবে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ রয়েছে। হযরত আবু মূসা আশআরী (রা) বর্ণনা করেন, একবার রসূলুল্লাহ (স) বললেন: إذا استأذن أحدكم ثلاثا فَلَمْ يُؤْذَنَ لَهُ فَلْيَرْجِعْ "তিনবার অনুমতি চাওয়ার পরও যদি জবাব না আসে তবে ফিরে যাওয়া উচিত।"

অবশ্য কোনো বিশিষ্ট আলেমে দীন বা বুযুর্গের দরজায় অনুমতি না চেয়ে তাঁর অপেক্ষায় বসে থাকে- আশা রাখে যে তিনি বেরিয়ে আসলে সাক্ষাত করবে, তবে তা উপরোক্ত বিধানের অন্তর্ভুক্ত নয়। বরং এটাই আদব ও উচ্চপর্যায়ের শিষ্টাচার।

হযরত আবু বকর (রা) থেকে বর্ণিত, যখন কারো বসবাসের ঘরে বিনা অনুমতিতে প্রবেশ করা নিষেধ সম্পর্কিত আয়াত নাযিল হলো, তখন তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-এর কাছে আরজ করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ, এ নিষেধাজ্ঞার পর কুরাইশ ব্যবসায়ী লোকেরা কি করবে? মক্কা ও মদীনা থেকে সুদূর শ্যাম দেশ পর্যন্ত তারা বাণিজ্যিক সফর করে পথিমধ্যে স্থানে স্থানে সরাইখানা আছে। তারা এগুলোতে অবস্থান করে না। এখানে অনুমতি চাওয়ার কি উপায়? এরি প্রেক্ষিতে নাযিল হয়ঃ لَيْسَ عَلَيْكُمْ جُنَاحٌ أَنْ تَدْخُلُوا بُيُوتًا غَيْرَ مَسْكُونَةٍ فِيهَا مَتَاعٌ লَّكُمْ . "তোমাদের জন্য এমন ঘরে প্রবেশ করায় কোনো দোষ নেই, যাতে কেউ বসবাস করে না; অথচ সেখানে তোমাদের কোনো জিনিসপত্রও রয়েছে।"

বিনা অনুমতিতে কারো ঘরে প্রবেশাধিকারের কিছু ব্যতিক্রমও আছে। যেমন, কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে আগুন ধরে গেলে, বাসগৃহ ধ্বসে পড়তে লাগলে, চোর ডাকাত ঢুকলে তাদের সাহায্যের জন্য বিনা অনুমতিতেই ঘরে প্রবেশাধিকার রয়েছে। কোনো বাড়ীর মালিকের দূতের সাথে ঐ ঘরে প্রবেশের অনুমতির প্রয়োজন নেই। দূতের সাথে থাকাটাই অনুমতি।

এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, কারো ঘরে প্রবেশ করার অনুমতি গ্রহণের উক্ত নির্দেশ কেবল পুরুষদের জন্যই প্রযোজ্য নয় বরং নারী-পুরুষ সকলের বেলায় তা কার্যকর। সাহাবায়ে কিরামের স্ত্রীরা কারো ঘরে যেতে প্রথমে অনুমতি নিতেন। হযরত উম্মে আয়াস (রা) বলেন, আমরা চারজন মহিলা প্রায়ই হযরত আয়েশা (রা)-এর ঘরে যেতাম এবং প্রথমে তাঁর অনুমতি চাইতাম। তিনি অনুমতি দিলে আমরা ভিতরে প্রবেশ করতাম। মুহরিম আত্মীয়-স্বজনদের কাছে যেতে হলেও অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। ইমাম মালেক মুয়াত্তা গ্রন্থে আতা ইবনে ইয়াসার (রা) থেকে বর্ণনা করেন, জনৈক ব্যক্তি রসূলুল্লাহ (স)-কে জিজ্ঞেস করলেন, "আমি কি আমার মায়ের কাছে যেতেও অনুমতি চাইবো? তিনি বললেন, হাঁ, অনুমতি চাইবে। লোকটি বললো, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি তো আমার মায়ের ঘরেই বসবাস করি। তিনি বললেন, তবুও তুমি অনুমতি ছাড়া ঘরে প্রবেশ করবে না। আতুহিব্বু আন তরাহা উরইয়ানাহ (أَتُحِبُّ أَنْ تَرَاهَا عُرْيَانَةً؟) তুমি কি তোমার মাকে উলঙ্গ অবস্থায় দেখা পসন্দ করো? সে বললো, না। তিনি বললেন, তাই অনুমতি চাওয়া আবশ্যক।

যে ঘরে শুধু নিজের স্ত্রী থাকে সে ঘরে প্রবেশ করার জন্য অনুমতি গ্রহণ ওয়াজিব না হলেও সুন্নাত-মোস্তাহাবের পর্যায়ভুক্ত। পদধ্বনী বা গলা ঝেড়ে হুঁশিয়ার করে ঘরে যাওয়া দরকার। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা)-এর স্ত্রী বলেন, আবদুল্লাহ যখন বাইর থেকে ঘরে আসতেন তখন প্রথমে দরজার কড়া নেড়ে আমাকে হুঁশিয়ার করে দিতেন।

আয়াতে বলা হয়েছে ঘরে প্রবেশের অনুমতি না পেলে আগন্তুক ফিরে যাবে। তেমনি এক হাদীসে বাড়ীওয়ালার কর্তব্যও বলে দেয়া হয়েছে। আন্না লিজাউরিকা আলাইকা হাক্কান (أَنَّ لِزَوْرِكَ عَلَيْكَ حَقًّا) সাক্ষাত প্রার্থী ব্যক্তির হক আছে আপনার (বাড়ী ওয়ালার) উপর। তাকে কাছে ডাকুন, বাইরে এসে তার সাথে সাক্ষাত করুন, তার কথা শুনুন, তার সম্মান করুন এবং গুরুতর ওযর না থাকলে সাক্ষাত করতে অস্বীকার করবেন না। এটাই তার হক।

টিকাঃ
-(ফী যিলালিল কুরআন), (তাফহীমুল কুরআন), (মাআরেফুল কুরআন), (ইবনে কাসীর), (তাদাব্বুরে কুরআন), (তাফসীরে মাযহারী থেকে মাআরেফুল কুরআন)

📘 আল কুরআনে নারী 📄 যে তিন সময়ে মা-বাবার কক্ষে প্রবেশের আগে অনুমতি নিতে হবে

📄 যে তিন সময়ে মা-বাবার কক্ষে প্রবেশের আগে অনুমতি নিতে হবে


يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لِيَسْتَأْذِنْكُمُ الَّذِينَ مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ وَالَّذِينَ لَمْ يَبْلُغُوا الْحُلْمَ مِنْكُمْ ثَلْثَ مَرَّتٍ ط مِنْ قَبْلِ صَلٰوةِ الْفَجْرِ وَحِينَ تَضَعُوْনَ ثِيَابَكُمْ مِّنَ الظَّهِيرَةِ وَمِنْ بَعْدِ صَلٰوةِ الْعِشَاءِ ، ثَلَثُ عَوْرَتٍ لَّكُمْ لَيْسَ عَلَيْكُمْ وَلَا عَلَيْهِمْ جُنَاحٌ بَعْدَهُنَّ ، طَوَّفُوْنَ عَلَيْكُمْ بَعْضُكُمْ عَلَى بَعْضٍ ، كَذٰلِكَ يُبَيِّنُ اللَّهُ لَكُمُ الْآيٰتِ ، وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ .

"হে তোমরা যারা ঈমান এনেছ! তোমাদের মালিকানাধীন লোক আর তোমাদের মধ্যে যারা প্রাপ্তবয়স্ক হয়নি তারা তোমাদের কক্ষে প্রবেশ করতে তিন সময় যেন তোমাদের কাছে অনুমতি গ্রহণ করে-ফজরের নামাযের পূর্বে, দুপুরে যখন তোমাদের পোশাক শিথিল করো এবং ইশার নামাযের পরে। এ তিন সময় তোমাদের গোপনীয়তার সময়। এ তিন সময় ছাড়া তোমাদের ও তাদের কোনো গুনাহ নেই-তোমাদের একে অপরের কাছে তো যাতায়াত করতেই হয়। আল্লাহ এভাবেই তোমাদের জন্য তাঁর আয়াতসমূহ বিবৃত করেন। আল্লাহ তো সর্বজ্ঞ প্রজ্ঞাময়।"-সূরা আন নূর: ৫৮

যে তিন সময়ে মা-বাবার কক্ষে প্রবেশের আগে অনুমতি নিতে হবে

আল্লাহ তা'আলা ঈমানদারদের সম্বোধন করে বলেছেন, "হে ঈমানদারগণ! তোমাদের দাস-দাসী তথা চাকর-চাকরানীগণ আর তোমাদের যারা এখনো বুদ্ধির পরিপক্কতার পর্যায়ে পৌছেনি অর্থাৎ প্রাপ্তবয়স্ক হয়নি, তারা তোমাদের কক্ষে যেতে হলে এমন তিনটি সময় আছে যখন ওরা তোমাদের কাছ থেকে প্রবেশের অনুমতি গ্রহণ করবে। কারণ এ তিনটি সময় হচ্ছে তোমাদের পর্দার সময়। অর্থাৎ এ তিনটি সময় মানুষের সাধারণ অভ্যাস অনুযায়ী একান্তবাস ও বিশ্রাম নেয়ার সময়। এ সময় মানুষ খোলামেলা থাকতে চায়, একান্তে এ সময়ে কখনো কখনো আবৃত অংগও খুলে যায় অথবা শরীর হালকা করার জন্য মানুষ কিছুটা অনাবৃত অবস্থায় থাকে বা প্রয়োজনে কোনো অংগ খোলা হয়ে থাকে। তাই এমন তিনটি সময়ে নিজের চাকর-চাকরানী বা ছেলেমেয়েরা তোমাদের কক্ষে যেতে হলে অবশ্যই আগে তোমাদের অনুমতি নিতে হবে। সেই তিনটি সময় হলো: ১. ফজরের নামাযের পূর্বে, ২. দুপুরে যখন তোমরা দেহের শিথিলতাকল্পে কিছুটা অনাবৃত হয়ে থাক, ৩. ইশার নামাযের পর। এ তিন সময় ছাড়া ওদের তোমাদের কাছে তোমাদের কক্ষে প্রবেশ করতে কোনো বাধা নেই।

আল কুরআনে উক্ত তিন সময়কে বলা হয়েছে ثَلْتُ عَوْرَات অর্থাৎ এ হচ্ছে তোমাদের জন্য তিনটি 'আওরাত'। আরবীতে 'আওরাত' বলতে সাধারণত স্ত্রীলোকদের বুঝায়। শব্দটির অর্থ 'ফাঁক ও বিপদের স্থান'। আর যে স্থান উন্মুক্ত হয়ে যাওয়ায় লজ্জার কারণ হয় কিংবা যার প্রকাশিত হয়ে যাওয়া অবাঞ্জনীয় তাকেও 'আওরাত' বলা হয়। অরক্ষিত জিনিসকেও আওরাত বলা হয়। এ তিনটি সময়ে একাকী কিংবা নিজের স্ত্রীকে নিয়ে এমন অবস্থায় পড়ে থাকো, যখন ঘরের ছেলেমেয়েদের চাকর-চাকরাণীদের হঠাৎ করে তোমাদের কাছে এসে পড়া বাঞ্ছনীয় নয়।

এ তিন সময় ছাড়া অন্য যে কোনো সময়ে নাবালেগ ছেলেমেয়েও ঘরের চাকর-চাকরানী নারী-পুরুষের কাছে তাদের কক্ষে বা নিভৃত স্থানে অনুমতি ছাড়া যেতে পারবে। এ সময় তোমরা যদি অসতর্ক অবস্থায় থাক, আর তারা পূর্বানুমতি ছাড়াই তোমাদের কক্ষে প্রবেশ করে বসে তাহলে তোমাদের কড়া কথা বলার বা শাসানোর অধিকার থাকবে না। কারণ, তোমরা ঘরের ছেলে মেয়েদের এবং খাদেম-চাকরদের এমনি ধরনের সুশিক্ষা দাওনি। এ তিনটি সময় ছাড়া অন্য সবসময়ে ছেলেমেয়েদের ও দাস-দাসীদের কক্ষে প্রবেশের সাধারণ অনুমতি দেয়া হয়েছে।

পূর্বে সূরা আন নূরের ৩১ আয়াতে ঘরে প্রবেশের জন্য অনুমতি গ্রহণের যে শর্ত আরোপ করা হয়েছিল, তা থেকে বালক এবং নাবালেগ শিশুদের বাদ রাখা হয়েছিল। অতপর তাদের জন্যও এ শর্ত আরোপ করা হয়েছে। উক্ত তিন সময়ে মুহরিম আত্মীয়-স্বজন এমনকি সমঝদার অপ্রাপ্তবয়স্ক বালক-বালিকা এবং দাস-দাসীদের আদেশ করা হয়েছে যে, তারা যেন কারও নির্জন কক্ষে অনুমতি ছাড়া প্রবেশ না করে। মস্তবড় হেকমত হলো অসাবধানতা ও পর্দাহীনতার হাত থেকে রক্ষা পাওয়া। ফজরের পূর্বের আর ইশার পরের সময়ে সাবধানতার বিষয়টি তো পরিষ্কার। বাকী দুপুরের সময়টাও সাধারণত বিশ্রামের সময় বিশেষত আরব দেশে গরমের দেশ হওয়ার কারণে এ সময় লোকেরা কায়লুলা করে থাকে। 'কায়লুলা' মানে দুপুরের খাবার পর বিশ্রামের উদ্দেশ্যে শুয়ে পড়া। এ সময় শিশু-কিশোরগণ অনুমতি ছাড়া কক্ষে ঢুকে পড়লে সম্ভাবনা থাকে যে, ওরা কক্ষের লোকদের এমন অবস্থায় দেখে ফেলবে যে অবস্থায় তাদেরকে দেখা অপসন্দনীয়।

তবে এসব নাবালেগ শিশুরাও অনুমতি গ্রহণ থেকে ব্যতিক্রমধর্মী হবে তখন পর্যন্ত যখন পর্যন্ত তারা নাবালেগ থাকে। বালেগ হওয়ার পর তাদের উপরও ঐসব শর্তাদী ও বিধি-বিধান কার্যকর হবে যা অন্যদের বেলায় প্রযোজ্য। ওরা শিশুকাল থেকে তো এ ঘরে আসা-যাওয়া করে আসছে— এ অজুহাতে ওদের জন্য কোনো ছাড় নেই। আলোচ্য ৫৮ আয়াতের সাথে ৫৯ আয়াত মিলিয়ে দেখলে বুঝা যাবে যে, পরবর্তী আয়াত পূর্বোক্ত আয়াতের বিধানের ব্যাখ্যা স্বরূপ বর্ণিত হয়েছে।

টিকাঃ
-(তাফহীমুল কুরআন), (মাআরেফুল কুরআন), (তাদাব্বুরে কুরআন)

ফন্ট সাইজ
15px
17px