📄 সতী নারীর প্রতি অপবাদ শাস্তিযোগ্য অপরাধ—সেই অপরাধীর সাক্ষ্য কখনও গ্রহণযোগ্য নয়
وَالَّذِيْنَ يَرْمُوْنَ الْمُحْصَنَتِ ثُمَّ لَمْ يَأْتُوْا بِأَرْبَعَةِ شُهَدَاءَ فَاجْلِدُوْهُمْ ثَمْنِيْنَ جَلْدَةً وَلَا تَقْبَلُوْا لَهُمْ شَهَادَةً أَبَدًا ، وَأُولَئِكَ هُمُ الْفَسِقُوْনَ إِلَّا الَّذِيْنَ تَابُوْا مِنْ بَعْدِ ذَلِكَ وَأَصْلَحُوْا فَإِنَّ اللَّهَ غَفُوْরٌ رَّحِيْمٌ
"যারা পবিত্র চরিত্রের নারীদের প্রতি অপবাদ আরোপ করে, অতপর স্বপক্ষে চারজন সাক্ষী উপস্থিত করতে না পারে; তাদেরকে আশিটি কোড়া মারবে, আর কখনো তাদের সাক্ষ কবুল করবে না। ওরা নিজে রাই তো ফাসেক। অবশ্য এরপর যারা তাওবা করে আর নিজেদের সংশোধন করে নেয়, তবে আল্লাহ তো অতিশয় ক্ষমাশীল পরম দয়ালু।" -সূরা আন নূর : ৪-৫
সমাজে সতী-সাধ্বী নারী বা চরিত্রবান পুরুষদের বিরুদ্ধে মিথ্যা ব্যভিচারের অপবাদ দেওয়াকে ইসলাম 'কযফ' নামে অভিহিত করে এবং এটি একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। যারা এ ধরনের তোহমত আরোপ করে অথচ চারজন চাক্ষুষ সাক্ষী আনতে পারে না, তাদের শাস্তি হলো আশিটি বেত্রাঘাত এবং চিরতরে সাক্ষদানের অযোগ্যতা। এটি সমাজে কুৎসা রটানো ও নৈতিক বিপর্যয় রোধ করার জন্য কঠোর ব্যবস্থা।
'কযফ' এর শাস্তি কার্যকর হওয়ার জন্য কিছু শর্ত রয়েছে। অপবাদকারীকে প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ বিবেকসম্পন্ন এবং স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হতে হবে। যার বিরুদ্ধে অপবাদ দেওয়া হয়েছে তাকেও সুস্থ, বালেগ, মুসলিম, স্বাধীন এবং পবিত্র চরিত্রের হতে হবে। অভিযোগটি হতে হবে সুস্পষ্ট। এই বিধানের মূল উদ্দেশ্য হলো মুসলিম সমাজের মান-সম্মান রক্ষা করা এবং অকারণে ফেতনা-ফাসাদ সৃষ্টি বন্ধ করা। কেউ যদি একা কাউকে অপরাধ করতে দেখে, তবুও সাক্ষী ছাড়া তা প্রকাশ করা উচিত নয়; বরং অপরাধীর সংশোধনের চেষ্টা করা এবং নিজের জিহ্বা সংযত রাখাই ইসলামের শিক্ষা।
টিকাঃ
(তাফহীমুল কুরআন)
(তদাব্বুরে কুরআন)
(জাস্সাস সূত্রে মাআরেফুল কুরআন)
(ফী যিলালিল কুরআন)
📄 নিজের স্ত্রীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করলেও সাক্ষ্য-প্রমাণ দিতে হবে
وَالَّذِينَ يَرْمُونَ أَزْوَاجَهُمْ وَلَمْ يَكُن لَّهُمْ شُهَدَاءُ إِلَّا أَنْفُسُهُمْ فَشَهَادَةُ أَحَدِهِمْ أَرْبَعُ شَهَدَتْ بِاللَّهِ إِنَّهُ لَمِنَ الصَّدِقِينَ وَالْخَامِسَةُ أَنَّ لَعْنَتَ اللَّهِ عَلَيْهِ إِنْ كَانَ مِنَ الْكَذِبِينَ وَيَدْرَوُا عَنْهَا الْعَذَابَ أَنْ تَشْهَدَ أَرْبَعَ شَهدَتْ بِاللَّهِ إِنَّهُ لَمِنَ الْكَذِبِينَ وَالْخَامِسَةَ أَنَّ غَضَبَ اللَّهِ عَلَيْهَا إِنْ كَانَ مِنَ الصَّدِقِينَ وَلَوْلَا فَضْلُ اللهِ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَتُهُ وَأَنَّ اللَّهَ تَوَّابٌ حَكِيمٌ
"যারা নিজেদের স্ত্রী সম্পর্কে ব্যভিচারের অভিযোগ উত্থাপন করে, অথচ নিজেরা ছাড়া তাদের কাছে (এ অপবাদের পক্ষে) কোনো সাক্ষী না থাকে; তাদের প্রত্যেকের সাক্ষ্য এই হবে যে, সে চারবার আল্লাহর নামে কসম করে বলবে যে, সে অবশ্যই (তার আনীত অভিযোগে) সত্যবাদী। আর পঞ্চমবারে বলবে যে, সে মিথ্যাবাদী হলে তার উপর আল্লাহর লানত পড়ুক। পক্ষান্তরে, স্ত্রীর শান্তি রহিত হবে-যদি সেও চারবার আল্লাহর নামে কসম করে বলে যে সে (পুরুষটি তার অভিযোগের ব্যাপারে) মিথ্যাবাদী। তারপর (সেও) পঞ্চমবারে বলবে সে (স্বামী) সত্যবাদী হলে তার নিজের উপর আল্লাহর গযব নেমে আসুক। আর যদি তোমাদের উপর (হে মুমিনগণ) আল্লাহর অনুগ্রহ ও দয়া না থাকতো (তাহলে স্ত্রীদের উপর অভিযোগের বিষয়ে তোমরা বড় জটিলতার সম্মুখীন হতে) বস্তুত আল্লাহ তো তাওবা কবুলকারী, প্রজ্ঞাময়।" -সূরা আন নূর : ৬-১০
সতী নারীকে অপবাদ দেওয়ার শাস্তির বিধান নাযিল হওয়ার পর প্রশ্ন দেখা দেয় যে, কেউ যদি নিজ স্ত্রীর ব্যভিচার স্বচক্ষে দেখে কিন্তু সাক্ষী না পায় তবে সে কী করবে? এর সমাধানে 'লিআন' (لعان)-এর বিধান নাযিল হয়। হিলাল ইবনে উমাইয়া যখন তাঁর স্ত্রীর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনেন এবং সাক্ষী দিতে না পারায় শাস্তির সম্মুখীন হওয়ার উপক্রম হয়, তখন এই আয়াতগুলো নাযিল হয়।
'লিআন' পদ্ধতি অনুযায়ী স্বামী চারবার আল্লাহর নামে কসম করে নিজেকে সত্যবাদী ঘোষণা করবে এবং পঞ্চমবার বলবে যে সে মিথ্যাবাদী হলে তার ওপর আল্লাহর লানত পড়ুক। অনুরূপভাবে স্ত্রীও চারবার কসম করে স্বামীকে মিথ্যাবাদী বলবে এবং পঞ্চমবার বলবে স্বামী সত্যবাদী হলে তার ওপর আল্লাহর গযব পড়ুক। এর ফলে স্বামী-স্ত্রীর বিবাহ নাকচ হয়ে যায় এবং তারা চিরতরে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এ ক্ষেত্রে ভূমিষ্ঠ সন্তান মায়ের পরিচয় বহন করবে। এই ব্যবস্থা মুমিনদের পারিবারিক জটিলতা থেকে মুক্তির এক বিশেষ খোদায়ী রহমত।
টিকাঃ
(তাফহীমুল কুরআন)
(মাআরেফুল কুরআন)
(তাফসীরে মাযহারী)
(বুখারী, মুসলিম)
📄 নিষ্কলুষ সম্ভ্রান্ত নারীর বিরুদ্ধেও অপবাদ রটানো হয়
إِنَّ الَّذِينَ جَاءُوْ بِالْإِفْكِ عُصْبَةٌ مِّنْكُمْ ، لَا تَحْسَبُوهُ شَرًّا لَّكُمْ ، بَلْ হُوَ خَيْرٌ لَّكُمْ ، لِكُلِّ امْرِئٍ مِّنْهُمْ مَا اكْتَسَبَ مِنَ الْإِثْمِ وَالَّذِي تَوَلَّى كِبْرَهُ مِنْهُمْ لَهُ عَذَابٌ عَظِيمٌ .
"যারা এ মিথ্যা অভিযোগ রচনা করেছে তারা তো তোমাদের মধ্যেরই কতিপয় লোক। এটাকে তোমরা নিজেদের জন্য ক্ষতিকর ভেবো না, বরং এটা তোমাদের জন্য কল্যাণকর; ওদের প্রত্যেকের জন্য রয়েছে ওদের কৃত পাপের ফল। আর ওদের মধ্যে যে ব্যক্তি এ ব্যাপারে প্রধান ভূমিকা নিয়েছে তার জন্য রয়েছে মহাশাস্তি।"-সূরা আন নূর: ১১
ষষ্ঠ হিজরীতে মুনাফিক সরদার আবদুল্লাহ ইবনে উবাই উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রা)-এর বিরুদ্ধে এক জঘন্য মিথ্যা অপবাদ (ইফক) রটনা করেছিল। বনী মুস্তালিক যুদ্ধ থেকে ফেরার পথে হযরত আয়েশা (রা) কাফেলা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লে সাহাবী সাফওয়ান ইবনে মুআত্তাল (রা) তাকে সসম্মানে মদিনায় ফিরিয়ে আনেন। এই সরল ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে মুনাফিকরা মুসলিম সমাজে বিভেদ ও নবীর পরিবারে অশান্তি সৃষ্টির উদ্দেশ্যে তোহমত রটায়। প্রায় এক মাস এই অস্বস্তিকর পরিস্থিতির পর আল্লাহ তা'আলা হযরত আয়েশা (রা)-এর পবিত্রতা ঘোষণা করে দশটি আয়াত নাযিল করেন।
এই ঘটনাটি মুমিনদের জন্য কল্যাণকর ছিল কারণ এর মাধ্যমে মুনাফিকদের স্বরূপ উন্মোচিত হয়, মুমিনদের ঈমানী পরীক্ষা হয় এবং সামাজিক শুদ্ধির জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ আহকাম নাযিল হয়। যারা এই অপবাদ রচনায় প্রধান ভূমিকা নিয়েছিল তাদের জন্য কঠোর শাস্তির কথা বলা হয়েছে। উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রা) ছিলেন পুণ্যবতী ও সিদ্দীকা, যাঁর নির্দোষিতা স্বয়ং আল্লাহ কুরআন নাযিলের মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন।
টিকাঃ
(ফী যিলালিল কুরআন)
(তাদাব্বুরে কুরআন)
(তাফহীমুল কুরআন)
(মাআরেফুল কুরআন)
(তিরমিযী, আবু দাউদ, বুখারী, মুসলিম)
(সীরাতে ইবনে হিশাম)
📄 নিষ্কলুষ সম্ভ্রান্ত নারীর অপবাদ শুনে মুমিনদের কি করা উচিত?
لَوْلَا إِذْ سَمِعْتُمُوهُ ظَنَّ الْمُؤْمِنُونَ وَالْمُؤْمِنَتُ بِأَنْفُسِهِمْ خَيْرًا * وَقَالُوا هُذَا إِفْكٌ مُّبِينٌ لَوْلَا جَاءُ وْ عَلَيْهِ بِأَرْبَعَةِ شُهَدَاءَ ، فَإِذْ لَمْ يَأْتُوا بِالشُّهَدَاءِ فَأُولَئِكَ عِنْدَ اللَّهِ هُمُ الْكَذِبُوْنَ وَلَوْلَا فَضْلُ اللَّهِ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَتُهُ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ لَمَسَّكُمْ فِي مَا أَفَضْتُمْ فِيْهِ عَذَابٌ عَظِيمٌ
"তোমরা যখন একথা শুনতে পেয়েছিলে, তখন মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীরা নিজেদের সম্পর্কে ভাল ধারণা পোষণ করলো না? আর কেনই বা বলে দিল না যে এটা তো নির্জলা অপবাদ? ওরা কেন এ ব্যাপারে চারজন সাক্ষী উপস্থিত করলো না? এখন যেহেতু ওরা চারজন সাক্ষী পেশ করলো না, কাজেই ওরাই আল্লাহর কাছে মিথ্যুক। তোমাদের প্রতি দুনিয়া ও আখিরাতে যদি আল্লাহর অনুগ্রহ ও দয়া না থাকতো, তাহলে তোমরা যেসব কথাবার্তায় জড়িত হয়ে পড়েছিলে, সে জন্যে গুরুতর আযাব তোমাদের গ্রাস করতো।"-সূরা আন নূর: ১২-১৪
হযরত আয়েশা (রা)-এর বিরুদ্ধে রটানো মিথ্যা অপবাদ শোনার পর মুমিনদের দায়িত্ব ছিল একে প্রথম চোটেই অস্বীকার করা। আল্লাহর নবীর স্ত্রীর মর্যাদা ও চারিত্রিক পবিত্রতা সম্পর্কে মুমিনদের মনে সুদৃঢ় আস্থা থাকা উচিত ছিল। যারা এই রটনা শুনেছিল, তাদের উচিত ছিল নিজেদের সম্পর্কে এবং নিজেদের সমাজের লোকদের সম্পর্কে ভালো ধারণা পোষণ করা। যারা সাক্ষ্য প্রমাণ ছাড়া এই জাতীয় আলোচনায় লিপ্ত হয়েছিল, তাদের প্রতি আল্লাহর সতর্কবাণী উচ্চারিত হয়েছে। আবু আইয়ুব আনসারী (রা) ও তাঁর স্ত্রীর দৃষ্টান্ত ছিল অনুকরণীয়, তাঁরা একে সুস্পষ্ট তোহমত বলে বিশ্বাস করেছিলেন।
ইসলামী সমাজের চারিত্রিক মূলনীতি হলো: যতক্ষণ পর্যন্ত কোনো অকাট্য প্রমাণ না পাওয়া যায়, ততক্ষণ প্রত্যেক মুমিন অন্য মুমিনের প্রতি সুধারণা পোষণ করবে এবং তার মান-সম্মান রক্ষা করবে। অন্যের কুৎসা রটনা করা বা সেই আলোচনায় শরীক হওয়া ঈমানী আদর্শের পরিপন্থী। যে মুসলমান অন্য মুসলমানের দুর্নাম রটায়, সে আসলে নিজেরই দুর্নাম রটায়, কারণ মুমিনরা সবাই একই দেহের ন্যায়।
টিকাঃ
(তাফহীমুল কুরআন)
(ফী যিলালিল কুরআন)
(তাদাব্বুরে কুরআন)
(মাআরেফুল কুরআন)