📘 আল কুরআনে নারী 📄 সন্তান হত্যা করো না আর ব্যভিচারের ধারেও যেয়ো না

📄 সন্তান হত্যা করো না আর ব্যভিচারের ধারেও যেয়ো না


وَلَا تَقْتُلُوا أَوْلَادَكُمْ خَشْيَةَ إِمْلَاقٍ، نَحْنُ نَرْزُقُهُمْ وَإِيَّاكُمْ ، إِنَّ قَتْلَهُمْ كَانَ خِطْاً كَبِيرًا وَلَا تَقْرَبُوا الزِّنِّى إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً ، وَسَاءَ سَبِيলা

"তোমরা দারিদ্রের ভয়ে তোমাদের সন্তানদের হত্যা করো না। আমিই তো তাদের রিস্ক দিয়ে থাকি, আর তোমাদেরও। নিশ্চয়ই তাদেরকে হত্যা করা মারাত্মক অপরাধ। আর যেনার ধারেও যেয়ো না। নিশ্চয়ই এটা খুবই অশ্লীল কাজ এবং অত্যন্ত খারাপ পথ।" -সূরা বনী ইসরাঈল : ৩১-৩২

জাহেলী যুগে আরবদের মধ্যে এমন প্রথা ছিল যে, তারা ভরণ-পোষণের ভয়ে সন্তানদেরকে বিশেষ করে কন্যা সন্তানদের হত্যা করতো। এই আয়াতে আল্লাহ তা'আলা তাদের এই কর্মপন্থাটি যে অত্যন্ত জঘন্য তা তুলে ধরেছেন। আল্লাহ বলেন যে তিনিই রিজিকদাতা, সন্তানরা তোমাদের রিজিক খাবে না বরং আমিই তাদের রিজিক দেব। সন্তান হত্যা মহাপাপ ও অমার্জনীয় অপরাধ। আধুনিক বিশ্বে জন্মনিয়ন্ত্রণের নামে যে আন্দোলন চলছে তার পেছনেও জাহেলী আরবের সেই বর্বরতার ভাবধারা বিরাজিত। ইসলাম জনসংখ্যা হ্রাস করার ধ্বংসাত্মক প্রচেষ্টা পরিত্যাগ করে গঠনমূলক প্রচেষ্টায় শক্তি নিয়োগ করতে বলে।

দ্বিতীয় আয়াতে যিনা বা ব্যভিচারের ধারেও না যেতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। দারিদ্রের ভয়ে বিবাহ থেকে বিরত থাকলে অবৈধ সম্পর্কের পথ প্রশস্ত হয়। নির্দেশটি ব্যক্তি এবং সমাজ উভয়ের প্রতি। যিনা এবং যিনার উদ্বোধক যাবতীয় কার্যক্রম থেকেও দূরে থাকতে হবে। ইসলাম নগ্নতা, অশ্লীলতা, বেহায়াপনা, মদ, গান-বাজনা প্রভৃতি যিনা-ব্যভিচারের নিকটতর কাজসমূহ নিষিদ্ধ করেছে। যিনা হারাম হওয়ার কারণ হলো এটি একটি জঘন্য অশ্লীল কাজ যাতে লজ্জা-শরম লোপ পায়। এর ক্ষতির দিকগুলো হলো: ১. বংশের পরিচয় বিলুপ্ত হওয়া, ২. সামাজিক অরাজকতা ও সহিংসতা বৃদ্ধি, ৩. পারিবারিক শান্তি বিনষ্ট হওয়া, ৪. মানুষ ও পশুর মধ্যে পার্থক্য লোপ পাওয়া।

টিকাঃ
(মাআরেফুল কুরআন)
(তাফসীরে হাক্কানী)
(তদাব্বুরে কুরআন)
(তাফহীমুল কুরআন)
(সূরা আল আলাক: ৬-৭)

📘 আল কুরআনে নারী 📄 স্বাধ্বী নারী সম্মুখীণ হলেন কঠিন পরীক্ষার, শিকার হলেন অসহনীয় তোহমতের

📄 স্বাধ্বী নারী সম্মুখীণ হলেন কঠিন পরীক্ষার, শিকার হলেন অসহনীয় তোহমতের


فَاتَتْ بِهِ قَوْমَهَا تَحْمِلُهُ ، قَالُوا يُمَرْيَمُ لَقَدْ جِئْتِ شَيْئًا فَرِيَّا بِأُخْتَ هُرُونَ مَا كَانَ أَبُوكِ امْرَأَ سَوْءٍ وَمَا كَانَتْ أُمُّكِ بَগِيًّا

“সে (মারইয়াম) সন্তানকে নিয়ে নিজ জাতির লোকদের নিকট উপস্থিত হলো। তারা বললো, ও মারইয়াম! তুমি তো বড় পাপের কাজ করে বসেছ। ও হারুনের বোন! তোমার বাপ তো অসৎ ব্যক্তি ছিল না আর তোমার মাও তো কোনো চরিত্রহীনা নারী ছিল না।" -সূরা মারইয়াম : ২৭-২৮

হযরত মারইয়াম (আ) আল্লাহর নির্দেশে নিভৃতে ছিলেন। জিবরাঈল (আ) মানুষের বেশে এসে তাকে একটি পবিত্র পুত্র সন্তান দানের সুসংবাদ দেন। মারইয়াম আশ্চর্য হয়ে নিজের কুমারীত্বের কথা জানালে ফেরেশতা বলেন এটি আল্লাহর জন্য সহজ এবং এটি একটি নিদর্শন। মারইয়াম যখন গর্ভধারণের লক্ষণ অনুভব করলেন তখন তিনি লোকালয় থেকে দূরে চলে গেলেন। প্রসব বেদনা শুরু হলে তিনি খেজুর গাছের নীচে আশ্রয় নিলেন এবং দুর্নামের ভয়ে অত্যন্ত বিচলিত হয়ে পড়লেন। আল্লাহর সাহায্যে তিনি খাবার ও পানীয় লাভ করলেন।

সন্তান প্রসবের পর মারইয়াম নবজাতক ঈসাকে নিয়ে লোকালয়ে এলে লোকেরা তাকে বড় পাপের অপরাধে অভিযুক্ত করল। মারইয়াম নিজে কোনো উত্তর না দিয়ে শিশুর দিকে ইশারা করলেন। লোকেরা উপহাস করতে চাইলে কোলের শিশু ঈসা অলৌকিকভাবে কথা বলে উঠলেন: "আমি আল্লাহর বান্দাহ। আল্লাহ আমাকে কিতাব দিয়েছেন ও নবী বানিয়েছেন।" এভাবে মারইয়ামের সতীত্ব ও পবিত্রতা অলৌকিকভাবে প্রমাণিত হলো।

ঈসা (আ)-এর জন্ম নিয়ে খ্রিষ্টান ও ইহুদীদের মধ্যে নানা বিভ্রান্তি ছিল। খ্রিষ্টানরা তাঁকে আল্লাহর পুত্র এবং ইহুদীরা তাঁকে অপবিত্র অপবাদ দিয়েছিল। আল কুরআন এই দুই চরমপন্থার অবসান ঘটিয়ে তাঁকে আল্লাহর সম্মানিত নবী ও মোকাররম বান্দা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

টিকাঃ
(তাফহীমুল কুরআন ও মাআরেফুল কুরআন)
(আল কুরআনুল কারীম : মাওলানা শাব্বীর আহমদ উসমানী রহ.)
(তাফসীরে কুরতুবী)

📘 আল কুরআনে নারী 📄 ব্যভিচার মানব বংশ বিধ্বংসী ও দণ্ডনীয় অপরাধ

📄 ব্যভিচার মানব বংশ বিধ্বংসী ও দণ্ডনীয় অপরাধ


الزَّانِيَةُ وَالزَّانِي فَاجْلِدُوا كُلَّ وَاحِدٍ مِّنْهُمَا مِائَةَ جَلْدَةٍ مِّن وَلَا تَأْخُذْكُمْ بِهِمَا رَأْفَةٌ فِي دِينِ اللَّهِ إِنْ كُنْتُمْ تُؤْمِنُوْনَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِج وَلْيَشْهَدْ عَذَابَهُمَا طَائِفَةٌ مِّنَ الْمُؤْمِنِينَ

"যিনাকারিণী নারী ও যিনাকারী পুরুষ—উভয়ের প্রত্যেককে একশ করে কোড়া মার। আল্লাহর দীনের ব্যাপারে তাদের প্রতি যেন তোমাদের মনে দয়ার উদ্রেক না হয়; যদি তোমরা আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি ঈমান রাখ। আর তাদের শাস্তির সময় যেন মুমিনদের একটি দল উপস্থিত থাকে।"-সূরা আন নূর : ২

ইসলামে মানবিক অপরাধসমূহের মধ্যে ব্যভিচারের শাস্তি সবচেয়ে কঠোর। এটি সামাজিক ধ্বংসের মূল কারণ। যিনার শাস্তি হিসেবে কুরআনে অবিবাহিত নারী-পুরুষের জন্য একশ করে কোড়া মারার বিধান দেওয়া হয়েছে। হাদীসের আলোকে বিবাহিতদের জন্য পাথর নিক্ষেপ করে হত্যার (রজম) শাস্তি নির্ধারিত হয়েছে। যিনা বা ব্যভিচার মানব বংশের স্থিতি ও পারিবারিক শৃংখলা সমূলে বিনষ্ট করে দেয়।

ইসলাম কেবল দণ্ড বিধান নয় বরং প্রতিরোধের (Preventive Measure) ব্যবস্থাও গ্রহণ করে। এর জন্য ঈমানী সংশোধন, পর্দার বিধান, বিবাহের সহজলভ্যতা এবং অশ্লীলতার পথ বন্ধ করার পদক্ষেপ নেওয়া হয়। যিনাকারীকে অপরাধী সাব্যস্ত করা যাবে তখনই যখন সে স্বেচ্ছায় একাজ করে। জোরজবরদস্তির শিকার নারীকে শাস্তি দেওয়া হয় না। যিনা প্রমাণের জন্য অন্তত চারজন প্রত্যক্ষদর্শী নির্ভরযোগ্য সাক্ষীর প্রয়োজন অথবা অপরাধীর নিজের স্বীকারোক্তি থাকতে হবে। আল্লাহর দীনের আইন কার্যকর করার ক্ষেত্রে দয়া প্রদর্শন করে শাস্তি কমানো বা রদবদল করা যাবে না। শাস্তি দিতে হবে প্রকাশ্যে জনসাধারণের সামনে, যেন অন্যেরা তা দেখে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে।

টিকাঃ
(মাআরেফুল কুরআন)
(তাফহীমুল কুরআন)
(মুসলিম, কিতাবুল হাদ্দ, হাদ্দুয যিনা অধ্যায়)
(কুরআনুল কারীম: মাওলানা সালাহুদ্দীন ইউসুফ)
(আবু দাউদ, তিরমিযী, ইবনে মাজাহ, আহমদ, নাসাঈ)
(বুখারী ও মুসলিম)

📘 আল কুরআনে নারী 📄 সতী নারীর প্রতি অপবাদ শাস্তিযোগ্য অপরাধ—সেই অপরাধীর সাক্ষ্য কখনও গ্রহণযোগ্য নয়

📄 সতী নারীর প্রতি অপবাদ শাস্তিযোগ্য অপরাধ—সেই অপরাধীর সাক্ষ্য কখনও গ্রহণযোগ্য নয়


وَالَّذِيْنَ يَرْمُوْنَ الْمُحْصَنَتِ ثُمَّ لَمْ يَأْتُوْا بِأَرْبَعَةِ شُهَدَاءَ فَاجْلِدُوْهُمْ ثَمْنِيْنَ جَلْدَةً وَلَا تَقْبَلُوْا لَهُمْ شَهَادَةً أَبَدًا ، وَأُولَئِكَ هُمُ الْفَسِقُوْনَ إِلَّا الَّذِيْنَ تَابُوْا مِنْ بَعْدِ ذَلِكَ وَأَصْلَحُوْا فَإِنَّ اللَّهَ غَفُوْরٌ رَّحِيْمٌ

"যারা পবিত্র চরিত্রের নারীদের প্রতি অপবাদ আরোপ করে, অতপর স্বপক্ষে চারজন সাক্ষী উপস্থিত করতে না পারে; তাদেরকে আশিটি কোড়া মারবে, আর কখনো তাদের সাক্ষ কবুল করবে না। ওরা নিজে রাই তো ফাসেক। অবশ্য এরপর যারা তাওবা করে আর নিজেদের সংশোধন করে নেয়, তবে আল্লাহ তো অতিশয় ক্ষমাশীল পরম দয়ালু।" -সূরা আন নূর : ৪-৫

সমাজে সতী-সাধ্বী নারী বা চরিত্রবান পুরুষদের বিরুদ্ধে মিথ্যা ব্যভিচারের অপবাদ দেওয়াকে ইসলাম 'কযফ' নামে অভিহিত করে এবং এটি একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। যারা এ ধরনের তোহমত আরোপ করে অথচ চারজন চাক্ষুষ সাক্ষী আনতে পারে না, তাদের শাস্তি হলো আশিটি বেত্রাঘাত এবং চিরতরে সাক্ষদানের অযোগ্যতা। এটি সমাজে কুৎসা রটানো ও নৈতিক বিপর্যয় রোধ করার জন্য কঠোর ব্যবস্থা।

'কযফ' এর শাস্তি কার্যকর হওয়ার জন্য কিছু শর্ত রয়েছে। অপবাদকারীকে প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ বিবেকসম্পন্ন এবং স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হতে হবে। যার বিরুদ্ধে অপবাদ দেওয়া হয়েছে তাকেও সুস্থ, বালেগ, মুসলিম, স্বাধীন এবং পবিত্র চরিত্রের হতে হবে। অভিযোগটি হতে হবে সুস্পষ্ট। এই বিধানের মূল উদ্দেশ্য হলো মুসলিম সমাজের মান-সম্মান রক্ষা করা এবং অকারণে ফেতনা-ফাসাদ সৃষ্টি বন্ধ করা। কেউ যদি একা কাউকে অপরাধ করতে দেখে, তবুও সাক্ষী ছাড়া তা প্রকাশ করা উচিত নয়; বরং অপরাধীর সংশোধনের চেষ্টা করা এবং নিজের জিহ্বা সংযত রাখাই ইসলামের শিক্ষা।

টিকাঃ
(তাফহীমুল কুরআন)
(তদাব্বুরে কুরআন)
(জাস্সাস সূত্রে মাআরেফুল কুরআন)
(ফী যিলালিল কুরআন)

ফন্ট সাইজ
15px
17px