📄 পৃথিবীর প্রথম জঘন্য অশ্লীলতা ও সেজন্য আল্লাহর গযব
وَلُوطًا إِذْ قَالَ لِقَوْمِهِ أَتَأْتُونَ الْفَاحِشَةَ مَا سَبَقَكُمْ بِهَا مِنْ أَحَدٍ مِّنَ الْعَلَمَيْنَ إِنَّكُمْ لَتَأْتُونَ الرِّجَالَ شَهَوَةً مِنْ دُونِ النِّسَاءِ ، بَلْ أَنْتُمْ قَوْمٌ مُّسْرِفُونَ (الاعراف : ৮০ - ৮১)
"আর লুতকে আমি নবী করে পাঠালাম। সে তার জাতিকে বললো, তোমরা কি এমন অশ্লীল কাজ করছো যা তোমাদের আগে সারা বিশ্বে কখনো কেউ করেনি? তোমরা যৌনবাসনা চরিতার্থ করার জন্য স্ত্রীদের ছেড়ে পুরুষদের কাছে গমন করছো। আসলে তোমরা একেবারেই সীমা লঙ্ঘনকারী জাতি।"-(সূরা আল আ'রাফ ৮০-৮১)
হযরত লূত (আ) ছিলেন হযরত ইবরাহীম (আ)-এর ভ্রাতুষ্পুত্র। তাঁকেও নবুয়ত দান করে আল্লাহ তা'আলা জর্ডান ও বায়তুল মোকাদ্দাসের মধ্যবর্তী সাদুমের অধিবাসীদের হেদায়েতের জন্য প্রেরণ করেন। এ এলাকার ভূমি ছিল খুবই উর্বর ও শস্য-শ্যামল। বিলাস-ব্যসন, কাম-প্রবৃত্তি ও লোভ-লালসার জালে তারা এমনভাবে আবদ্ধ হয়ে পড়েছিল যে, লজ্জা-শরম ও ভাল-মন্দের স্বভাবজাত পার্থক্যও বিস্তৃত হয়ে যায়। তারা এমন প্রকৃতি বিরুদ্ধ নির্লজ্জতা ও অশ্লীলতায় লিপ্ত হয়ে পড়ে যা সুস্থ স্বভাবের কাছে ঘৃণ্য। তারা নারীর পরিবর্তে পুরুষকে দিয়ে যৌন ক্ষুধা মিটাতো। হযরত লূত (আ) তার জাতিকে হুশিয়ার করে বলেছিলেন: "তোমরা কি এমন অশ্লীল কাজে প্রবৃত্ত হচ্ছো যা তোমাদের পূর্বে পৃথিবীর কেউ করেনি।"
সমমৈথুন একান্তই প্রকৃতি বিরোধী। আল্লাহ তা'আলা সকল জীব-জন্তুর মধ্যে স্ত্রী-পুরুষ সৃষ্টি করেছেন কেবল বংশ রক্ষার উদ্দেশ্যে। কিন্তু মানবজাতির ব্যাপারে বংশ রক্ষা ছাড়াও আরেকটি মহৎ উদ্দেশ্য রয়েছে-পরিবার গঠন এবং তার ভিত্তিতে সমাজ ও সভ্যতা গড়ে তোলা। সমমৈথুনের সাহায্যে যৌন স্বাদ আস্বাদনকারী একই সাথে কয়েক প্রকারের অপরাধ সংঘটিত করে। এক, নিজের গঠন-প্রকৃতি ও মনস্তাত্বিক প্রকৃতির সাথে যুদ্ধ করে এক বিরাট ও চরম বিকৃতি ঘটায়। দুই, সে প্রকৃতির সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে। তিন, সে মানব সমাজের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে এবং নারীর যৌন উচ্ছৃঙ্খলতার দুয়ার খুলে দেয়।
জাতির এ পশুত্বের পর্যায়ের পাপাচার যখন চরম পর্যায়ে পৌঁছল এবং তারা লূত (আ) ও তাঁর অনুসারী নেক চরিত্রবানদের সমাজ থেকে বের করে দেওয়ার উপক্রম করল, তখন আল্লাহর তরফ থেকে তাদের ধ্বংস করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত কার্যকর হলো। আল-কুরআন ওদের শাস্তি সম্পর্কে বলেছে: "আমি তাদের উপর পাথর বৃষ্টি বর্ষণ করেছিলাম। দেখ, এসব অপরাধীর পরিণতি কেমন ছিল।" অন্যত্র বলা হয়েছে: "আমি বস্তিটিকে উল্টে দিলাম, আর তাদের উপর বর্ষণ করলাম প্রস্তর স্তরে স্তরে।" সেই ভয়াবহ দৃশ্যের নিদর্শন হিসেবে বায়তুল মোকাদ্দাস ও জর্ডান নদীর মাঝখানে আজও 'লুত সাগর' বা 'মৃত সাগর' বিদ্যমান রয়েছে।
টিকাঃ
(তাফসীরে মা'আরেফুল কুরআন)
(তদাব্বুরে কুরআন)
(তাফহীমুল কুরআন)
(সূরা আল আলাক: ৬-৭)
(সূরা আল আ'রাফ: ২২)
(সূরা হূদ: ৮২)
(সূরা হিজর: ৭৩)
📄 সন্তান হত্যা করো না আর ব্যভিচারের ধারেও যেয়ো না
وَلَا تَقْتُلُوا أَوْلَادَكُمْ خَشْيَةَ إِمْلَاقٍ، نَحْنُ نَرْزُقُهُمْ وَإِيَّاكُمْ ، إِنَّ قَتْلَهُمْ كَانَ خِطْاً كَبِيرًا وَلَا تَقْرَبُوا الزِّنِّى إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً ، وَسَاءَ سَبِيলা
"তোমরা দারিদ্রের ভয়ে তোমাদের সন্তানদের হত্যা করো না। আমিই তো তাদের রিস্ক দিয়ে থাকি, আর তোমাদেরও। নিশ্চয়ই তাদেরকে হত্যা করা মারাত্মক অপরাধ। আর যেনার ধারেও যেয়ো না। নিশ্চয়ই এটা খুবই অশ্লীল কাজ এবং অত্যন্ত খারাপ পথ।" -সূরা বনী ইসরাঈল : ৩১-৩২
জাহেলী যুগে আরবদের মধ্যে এমন প্রথা ছিল যে, তারা ভরণ-পোষণের ভয়ে সন্তানদেরকে বিশেষ করে কন্যা সন্তানদের হত্যা করতো। এই আয়াতে আল্লাহ তা'আলা তাদের এই কর্মপন্থাটি যে অত্যন্ত জঘন্য তা তুলে ধরেছেন। আল্লাহ বলেন যে তিনিই রিজিকদাতা, সন্তানরা তোমাদের রিজিক খাবে না বরং আমিই তাদের রিজিক দেব। সন্তান হত্যা মহাপাপ ও অমার্জনীয় অপরাধ। আধুনিক বিশ্বে জন্মনিয়ন্ত্রণের নামে যে আন্দোলন চলছে তার পেছনেও জাহেলী আরবের সেই বর্বরতার ভাবধারা বিরাজিত। ইসলাম জনসংখ্যা হ্রাস করার ধ্বংসাত্মক প্রচেষ্টা পরিত্যাগ করে গঠনমূলক প্রচেষ্টায় শক্তি নিয়োগ করতে বলে।
দ্বিতীয় আয়াতে যিনা বা ব্যভিচারের ধারেও না যেতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। দারিদ্রের ভয়ে বিবাহ থেকে বিরত থাকলে অবৈধ সম্পর্কের পথ প্রশস্ত হয়। নির্দেশটি ব্যক্তি এবং সমাজ উভয়ের প্রতি। যিনা এবং যিনার উদ্বোধক যাবতীয় কার্যক্রম থেকেও দূরে থাকতে হবে। ইসলাম নগ্নতা, অশ্লীলতা, বেহায়াপনা, মদ, গান-বাজনা প্রভৃতি যিনা-ব্যভিচারের নিকটতর কাজসমূহ নিষিদ্ধ করেছে। যিনা হারাম হওয়ার কারণ হলো এটি একটি জঘন্য অশ্লীল কাজ যাতে লজ্জা-শরম লোপ পায়। এর ক্ষতির দিকগুলো হলো: ১. বংশের পরিচয় বিলুপ্ত হওয়া, ২. সামাজিক অরাজকতা ও সহিংসতা বৃদ্ধি, ৩. পারিবারিক শান্তি বিনষ্ট হওয়া, ৪. মানুষ ও পশুর মধ্যে পার্থক্য লোপ পাওয়া।
টিকাঃ
(মাআরেফুল কুরআন)
(তাফসীরে হাক্কানী)
(তদাব্বুরে কুরআন)
(তাফহীমুল কুরআন)
(সূরা আল আলাক: ৬-৭)
📄 স্বাধ্বী নারী সম্মুখীণ হলেন কঠিন পরীক্ষার, শিকার হলেন অসহনীয় তোহমতের
فَاتَتْ بِهِ قَوْমَهَا تَحْمِلُهُ ، قَالُوا يُمَرْيَمُ لَقَدْ جِئْتِ شَيْئًا فَرِيَّا بِأُخْتَ هُرُونَ مَا كَانَ أَبُوكِ امْرَأَ سَوْءٍ وَمَا كَانَتْ أُمُّكِ بَগِيًّا
“সে (মারইয়াম) সন্তানকে নিয়ে নিজ জাতির লোকদের নিকট উপস্থিত হলো। তারা বললো, ও মারইয়াম! তুমি তো বড় পাপের কাজ করে বসেছ। ও হারুনের বোন! তোমার বাপ তো অসৎ ব্যক্তি ছিল না আর তোমার মাও তো কোনো চরিত্রহীনা নারী ছিল না।" -সূরা মারইয়াম : ২৭-২৮
হযরত মারইয়াম (আ) আল্লাহর নির্দেশে নিভৃতে ছিলেন। জিবরাঈল (আ) মানুষের বেশে এসে তাকে একটি পবিত্র পুত্র সন্তান দানের সুসংবাদ দেন। মারইয়াম আশ্চর্য হয়ে নিজের কুমারীত্বের কথা জানালে ফেরেশতা বলেন এটি আল্লাহর জন্য সহজ এবং এটি একটি নিদর্শন। মারইয়াম যখন গর্ভধারণের লক্ষণ অনুভব করলেন তখন তিনি লোকালয় থেকে দূরে চলে গেলেন। প্রসব বেদনা শুরু হলে তিনি খেজুর গাছের নীচে আশ্রয় নিলেন এবং দুর্নামের ভয়ে অত্যন্ত বিচলিত হয়ে পড়লেন। আল্লাহর সাহায্যে তিনি খাবার ও পানীয় লাভ করলেন।
সন্তান প্রসবের পর মারইয়াম নবজাতক ঈসাকে নিয়ে লোকালয়ে এলে লোকেরা তাকে বড় পাপের অপরাধে অভিযুক্ত করল। মারইয়াম নিজে কোনো উত্তর না দিয়ে শিশুর দিকে ইশারা করলেন। লোকেরা উপহাস করতে চাইলে কোলের শিশু ঈসা অলৌকিকভাবে কথা বলে উঠলেন: "আমি আল্লাহর বান্দাহ। আল্লাহ আমাকে কিতাব দিয়েছেন ও নবী বানিয়েছেন।" এভাবে মারইয়ামের সতীত্ব ও পবিত্রতা অলৌকিকভাবে প্রমাণিত হলো।
ঈসা (আ)-এর জন্ম নিয়ে খ্রিষ্টান ও ইহুদীদের মধ্যে নানা বিভ্রান্তি ছিল। খ্রিষ্টানরা তাঁকে আল্লাহর পুত্র এবং ইহুদীরা তাঁকে অপবিত্র অপবাদ দিয়েছিল। আল কুরআন এই দুই চরমপন্থার অবসান ঘটিয়ে তাঁকে আল্লাহর সম্মানিত নবী ও মোকাররম বান্দা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
টিকাঃ
(তাফহীমুল কুরআন ও মাআরেফুল কুরআন)
(আল কুরআনুল কারীম : মাওলানা শাব্বীর আহমদ উসমানী রহ.)
(তাফসীরে কুরতুবী)
📄 ব্যভিচার মানব বংশ বিধ্বংসী ও দণ্ডনীয় অপরাধ
الزَّانِيَةُ وَالزَّانِي فَاجْلِدُوا كُلَّ وَاحِدٍ مِّنْهُمَا مِائَةَ جَلْدَةٍ مِّن وَلَا تَأْخُذْكُمْ بِهِمَا رَأْفَةٌ فِي دِينِ اللَّهِ إِنْ كُنْتُمْ تُؤْمِنُوْনَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِج وَلْيَشْهَدْ عَذَابَهُمَا طَائِفَةٌ مِّنَ الْمُؤْمِنِينَ
"যিনাকারিণী নারী ও যিনাকারী পুরুষ—উভয়ের প্রত্যেককে একশ করে কোড়া মার। আল্লাহর দীনের ব্যাপারে তাদের প্রতি যেন তোমাদের মনে দয়ার উদ্রেক না হয়; যদি তোমরা আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি ঈমান রাখ। আর তাদের শাস্তির সময় যেন মুমিনদের একটি দল উপস্থিত থাকে।"-সূরা আন নূর : ২
ইসলামে মানবিক অপরাধসমূহের মধ্যে ব্যভিচারের শাস্তি সবচেয়ে কঠোর। এটি সামাজিক ধ্বংসের মূল কারণ। যিনার শাস্তি হিসেবে কুরআনে অবিবাহিত নারী-পুরুষের জন্য একশ করে কোড়া মারার বিধান দেওয়া হয়েছে। হাদীসের আলোকে বিবাহিতদের জন্য পাথর নিক্ষেপ করে হত্যার (রজম) শাস্তি নির্ধারিত হয়েছে। যিনা বা ব্যভিচার মানব বংশের স্থিতি ও পারিবারিক শৃংখলা সমূলে বিনষ্ট করে দেয়।
ইসলাম কেবল দণ্ড বিধান নয় বরং প্রতিরোধের (Preventive Measure) ব্যবস্থাও গ্রহণ করে। এর জন্য ঈমানী সংশোধন, পর্দার বিধান, বিবাহের সহজলভ্যতা এবং অশ্লীলতার পথ বন্ধ করার পদক্ষেপ নেওয়া হয়। যিনাকারীকে অপরাধী সাব্যস্ত করা যাবে তখনই যখন সে স্বেচ্ছায় একাজ করে। জোরজবরদস্তির শিকার নারীকে শাস্তি দেওয়া হয় না। যিনা প্রমাণের জন্য অন্তত চারজন প্রত্যক্ষদর্শী নির্ভরযোগ্য সাক্ষীর প্রয়োজন অথবা অপরাধীর নিজের স্বীকারোক্তি থাকতে হবে। আল্লাহর দীনের আইন কার্যকর করার ক্ষেত্রে দয়া প্রদর্শন করে শাস্তি কমানো বা রদবদল করা যাবে না। শাস্তি দিতে হবে প্রকাশ্যে জনসাধারণের সামনে, যেন অন্যেরা তা দেখে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে।
টিকাঃ
(মাআরেফুল কুরআন)
(তাফহীমুল কুরআন)
(মুসলিম, কিতাবুল হাদ্দ, হাদ্দুয যিনা অধ্যায়)
(কুরআনুল কারীম: মাওলানা সালাহুদ্দীন ইউসুফ)
(আবু দাউদ, তিরমিযী, ইবনে মাজাহ, আহমদ, নাসাঈ)
(বুখারী ও মুসলিম)