📘 আল কুরআনে নারী 📄 নারী হত্যাকারী যে-ই হোক না কেন, তার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড

📄 নারী হত্যাকারী যে-ই হোক না কেন, তার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড


كُتِبَ عَلَيْكُمُ الْقِصَاصُ فِي الْقَتْلَى الْحُرُّ بِالْحُرِّ وَالْعَبْدُ بِالْعَبْدِ وَالْأُنثَى بالأنثى - ( البقرة : ১৭৮)

“(হে যারা ঈমান এনেছ) তোমাদের জন্যে নর হত্যার কিসাস গ্রহণ সম্পর্কিত বিধান দেয়া হলো। স্বাধীন ব্যক্তির বদলে স্বাধীন ব্যক্তি, ক্রীতদাসের বদলে ক্রীতদাস ও নারীর বদলে নারী।" -(সূরা আল বাকারা : ১৭৮)

স্বাধীন ব্যক্তির হত্যাকারী কোনো স্বাধীন ব্যক্তি হলে যেমন তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হবে, তেমনি কোনো ক্রীতদাস বা কোনো নারী হত্যার বদলেও হত্যাকারী স্বাধীন ব্যক্তিকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হবে। স্ত্রী হত্যার অপরাধে পুরুষকে এবং পুরুষ হত্যার অপরাধে স্ত্রীলোককে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হবে। কোনো প্রভাবশালী ক্ষমতাধর ব্যক্তিকে যেমন, কোনো একজন প্রভাবশালী পুরুষ লোকের কিসাস স্বরূপ মৃত্যুদণ্ড দেয়া হবে, তেমনি তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হবে একজন অসহায় নারী হত্যার কিসাসেও।

ইসলাম পূর্ব জাহেলী যুগে একজন নিহত ব্যক্তির হত্যাকারীর মৃত্যুদণ্ডকে যথেষ্ট মনে করা হতো না, বরং তারা প্রতিপক্ষের বহুলোককে হত্যা করা ছাড়া তাদের প্রতিশোধ স্পৃহা অবদমিত হতো না তেমন দাস বা নারী হত্যার কিসাসে তারা স্বাধীন পুরুষদের বহু লোককে হত্যা করার আগে শান্ত হতো না।

উপরোক্ত আয়াতে যে স্বাধীনের বদলে স্বাধীন, দাসের বদলে দাসের এবং নারীর বদলে নারীর মৃত্যুদণ্ডের কথা বলা হয়েছে, তা ছিল জাহেলী যুগের এক বিশেষ ঘটনাকে কেন্দ্র করে। আল্লামা ইবনে কাসীর (র)-এর বর্ণনা অনুযায়ী ইসলাম পূর্ব আরব গোত্রের মধ্যে এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ঘটে। এতে স্বাধীন পুরুষ, নারী ও কৃতদাসের বহু লোক নিহত হয়। তাদের পরস্পরের মধ্যে বিষয়টির নিষ্পত্তি হওয়ার পূর্বেই ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠিত হয়, আর তারা উভয় গোত্রই ইসলাম গ্রহণ করে। ইসলাম গ্রহণের পর তাদের মধ্যে কিসাস সম্পর্কে কথাবার্তা চলছিল। তাদের প্রবল গোত্রটি দাবী করে বলে যে, তাদের প্রত্যেক নিহত পুরুষ, নারী ও কৃতদাসের পরিবর্তে অপর গোত্রের, এক একজন স্বাধীন লোককে হত্যা না করা পর্যন্ত তারা কোনো মীমাংসায় পৌঁছবে না। তাদের এহেন জাহেলিয়া সুলভ দাবীর জবাবে উপরোক্ত আয়াত অবতীর্ণ হয়। যাতে তাদের মীমাংসার জন্যে কিসাস স্বরূপ স্বাধীন পুরুষের বদলে স্বাধীন পুরুষ, নারীর বদলে নারী, ক্রীতদাসের বদলে ক্রীতদাসকে মৃত্যুদণ্ড দেয়ার বিধান দেয়া হয়েছে। ইসলামে হত্যাকারীকেই হত্যার বদলে মৃত্যুদণ্ড দেয়ার ইনসাফ ভিত্তিক বিধান জারী করা হয়েছে।

হত্যা জঘন্য অপরাধ। একটি জীবন, চাই তা স্বাধীন ব্যক্তির হোক, অথবা গোলামের জীবন হোক; চাই তা পুরুষের হোক, অথবা হোক কোনো নারীর। হত্যার পরিবর্তে হত্যাই হলো ইনসাফপূর্ণ কাজ আর তা ভবিষ্যতের জন্য সামাজিক নিরাপত্তার গ্যারান্টিও বটে। অপরাধের বিচার যথার্থ ও ইনসাফপূর্ণ না হলে সে সমাজে মানব জীবনে শান্তি ও নিরাপত্তার সম্ভাবনা থাকে না। রাব্বুল আলামীন তাই সামাজিক অনাচারের মূলোৎপাটনের ব্যবস্থাই করেছেন এ আয়াতের নির্দেশে।

'قصاص' (কিসাস)-এর শাব্দিক অর্থ সমপরিমাণ বা অনুরূপ। অর্থাৎ কারো উপর যতটুকু যুলুম করা হয়েছে তার সমপরিমাণ প্রতিশোধ গ্রহণ করা মাযলুমের জন্য জায়েয। তার চাইতে বেশী করা জায়েয নয়। এ সূরার ১৯৪ আয়াতে এর ব্যাখ্যা প্রসংগে বলা হয়েছে : فَاعْتَدُوا عَلَيْهِ بِمِثْلِ مَا اعْتَدَى عَلَيْكُمْ অর্থাৎ "তার উপর ততটুকু বাড়াবাড়ী কর যতটুকু বাড়াবাড়ী সে তোমাদের উপর করেছে।" তেমনিভাবে সূরা নহলের ১২৬ আয়াতে রয়েছে وَإِنْ عَاقَبْتُمْ فَعَاقِبُوا بِمِثْلِ مَا عُوقِبْتُم بِهِ "আর যদি তোমরা তাদের থেকে প্রতিশোধ নিতে চাও তবে ততটুকু প্রতিশোধ নাও, তারা তোমাদেরকে যতটুকু কষ্ট দিয়েছে।"

হত্যার অপরাধে যেমন স্বাধীন ব্যক্তির হত্যাকারী স্বাধীন ব্যক্তিকে মৃতুদণ্ড দেয়া হবে, তেমনি কোনো ক্রীতদাসের বেলায়ও কোনো স্বাধীন ব্যক্তিকে মৃতুদণ্ডে দণ্ডিত করা হবে। ঠিক তেমনিভাবে নারী হত্যার অপরাধে পুরুষকে এবং পুরুষ হত্যার অপরাধে স্ত্রী লোককেও মৃত্যুদণ্ড দেয়া হবে। আলোচ্য আয়াতে স্বাধীন ব্যক্তির বদলায় স্বাধীন ব্যক্তি এবং স্ত্রীলোকের বদলায় স্ত্রীলোককে মৃত্যুদণ্ড দেয়ার যে কথা বলা হয়েছে, তা কেবল একটা বিশেষ ঘটনার প্রতি ইংগিত করে বলা হয়েছে যে, বিশেষ ঘটনার প্রেক্ষিতে আলোচ্য আয়াত নাযিল হয়েছিল। আয়াতের মর্মার্থ এটাই সাব্যস্ত হয় যে, যে ব্যক্তি হত্যা করেছে কেবল সেই ব্যক্তিই কিসাসে দণ্ডিত হবে। সুতরাং কোনো নারীকে যদি কোনো পুরুষ হত্যা করে থাকে তবে ঐ নারীর কিসাসে তার হত্যাকারী সেই পুরুষকেই মৃত্যুদণ্ড দেয়া হবে।

টিকাঃ
(মুফতী মুহাম্মদ শফী (র), তাফসীরে মাআরেফুল কুরআন)

📘 আল কুরআনে নারী 📄 অপরাধী পুরুষ বা মহিলা—তাদের শাস্তি সমান

📄 অপরাধী পুরুষ বা মহিলা—তাদের শাস্তি সমান


وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا جَزَاءً بِمَا كَسَبَا نَكَالًا مِنَ اللَّهِ وَاللَّهُ عَزِيزٌ حَكِيمٌ ( المائدة : ৩৮)

"আর চোর ও চোরনীর হাত কেটে দাও। এটা তাদের কর্মের শাস্তি, আল্লাহর পক্ষ থেকে দৃষ্টান্তমূলক দণ্ড। আল্লাহ তো পরাক্রমশালী প্রজ্ঞাময়।"-(সূরা আল-মায়িদাহ্: ৩৮)

উপরিউক্ত আয়াতটি চুরি কর্মের দণ্ডবিধি সম্পর্কিত। এখানে বলা হয়েছে চোর পুরুষ হোক আর নারী হোক তাদের উভয়ের হাত কেটে দাও। এখানে প্রণিধানযোগ্য যে, কুরআনী বিধি-বিধানে কোনো বিষয়ে হুকুম করা হলে পুরুষদের সম্বোধন করে নির্দেশ দেয়া হয় আর নারীরা পুরুষদের সাথে অন্তর্ভুক্ত থাকে। নামায, রোযা, হজ্জ, যাকাত ও অন্যান্য বিধি-বিধানে কুরআন-সুন্নাহর রীতি তাই। কিন্তু চুরি ও যিনার শাস্তির বেলায় পুরুষ ও নারীকে পৃথকভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এর কারণ, এই বিধানটি হচ্ছে হুদূদ বা দণ্ডবিধি সম্পর্কিত। আর কোনো প্রকার সন্দেহ দেখা দিলে হুদূদ রহিত হয়ে যায়। এজন্যে এখানে পুরুষদের অধীনস্থ করে নারীদের সম্বোধন করা হয়নি। বরং নারীর কথা পৃথক করে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে।

প্রসংগত লক্ষণীয় যে, চুরির শাস্তির ব্যাপারে কুরআনে السَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ বলে প্রথমে পুরুষের এবং পরে নারীর উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু যিনার ব্যাপারে الزَّانِيَةُ وَالزَّانِي বলে প্রথমে নারী ও পরে পুরুষের কথা বলা হয়েছে। তাফসীরবিদগণ এই আগ-পর করার অনেক কারণ বর্ণনা করেছেন। চুরির অপরাধ মহিলাদের তুলনায় পুরুষদের ক্ষেত্রে অধিক গুরুতর। কারণ, আল্লাহ তা'আলা জীবিকা উপার্জনের যে শক্তি পুরুষকে দিয়েছেন তা নারীর মধ্যে নেই। জীবিকার এতসব পথ খোলা থাকা সত্ত্বেও চুরির মত হীন অপরাধে লিপ্ত হওয়া পুরুষের অপরাধকে আরও গুরুতর করে দিয়েছে। যিনা বা ব্যভিচারের ক্ষেত্রে অবস্থা এই যে, আল্লাহ তা'আলা নারীদের স্বাভাবিক লজ্জা-শরম ছাড়াও তাদের জন্য যিনা থেকে বেঁচে থাকার মত উপযুক্ত পরিবেশও দিয়েছেন। তারপরও যদি সে নির্লজ্জতায় মত্ত হয়ে যিনার মত বেহায়ায়ী কাজে লিপ্ত হয়ে পড়ে, তবে তা হবে জঘন্য অপরাধ। তাই চুরির আয়াতে আগে পুরুষের কথা পরে নারীর কথা এবং যিনার আয়াতে আগে মহিলার কথা পরে পুরুষের কথা বলা হয়েছে।

চুরি করার জন্য সাহসের প্রয়োজন হয়, আর সাহস সাধারণত পুরুষের মধ্যেই বেশি থাকে; পক্ষান্তরে যিনা হয় শাহ্ওয়াত (কামনা) থেকে, আর শাহ্ওয়াত (কামনা) সাধারণতঃ নারীর মধ্যেই বেশি থাকে। আবার কেউ কেউ বলেন, যিনার কাজ নারীর অনিচ্ছায় সংঘটিত হওয়া কঠিন বিধায় একাজে নারীর ভূমিকাই অধিক থাকে, তাই নারীর কথা আগে উল্লেখ করা হয়েছে। চুরির কাজ হাত দ্বারা হয়ে থাকে বিধায় চুরির কারণে হাত কাটার বিধান রয়েছে। কিন্তু যিনার কাজ পুরুষাঙ্গ দিয়ে হলেও যিনার শাস্তিতে পুরুষাঙ্গ কেটে ফেলার নির্দেশ দেয়া হয়নি; কারণ তাতে বংশবৃদ্ধি লোপ পাবে।

চোরের হাত কাটার বিষয়টি প্রসংগে কোন্ হাত কতটুকু কাটতে হবে—এ বিষয়ে তাফসীরবিদগণ বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। হাত বলা হয় আঙুলের অগ্রভাগ থেকে কাঁধ পর্যন্ত অঙ্গকে। এজন্যে খারেজীদের মতে চোরের হাত কাঁধ থেকে কেটে ফেলতে হবে। কিন্তু মুসলিম সমাজের সর্বকালের কব্জি থেকে কাটার নিয়ম চলে আসছে। এর উপরই ইজমা সংগঠিত হয়েছে। চোরের ডান হাত কাটতে হবে। আয়াতে হাত বলতে ডান হাতকেই বুঝানো হয়েছে আর একথার উপরই 'ইজমা' হয়েছে। চুরির দণ্ড একটি হাত মাত্র। ইসলামী মিল্লাত এ ব্যাপারে একমত যে প্রথম চুরির ক্ষেত্রে ডান হাত কাটতে হবে। নবী করীম (সা) বলেছেন, لا قطع على خائن - "খিয়ানতকারীর হাত কাটা হবে না।" কারণ, খিয়ানত করাটা চুরি নয়।

কত মূল্যের জিনিস চুরি করলে হাত কাটা হবে তা নির্ধারণের ব্যাপারে ইসলামী ফিক্‌হবিদদের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে। ইমাম আবু হানিফা (রহ)-এর মতে এর পরিমাণ দশ দিরহাম। ইমাম মালেক (রহ), শাফেঈ (রহ) ও আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ)-এর মতে এক চতুর্থাংশ দীনার। অনেক জিনিস এমন আছে যা চুরি করার দরুন চোরের হাত কাটার দণ্ড দেয়া যাবে না। যেমন-ফল ও তরকারী, খাদ্যবস্তু, সামান্য জিনিস, পাখি, বা বনের জন্তু এবং বায়তুলমালের জিনিস চুরি করলে হাত কাটার শাস্তি দেয়া যাবে না। কিন্তু এর মানে এ নয় যে, এসব অপরাধের কোনো শাস্তি নেই। শাস্তি তো দিতেই হবে, কিন্তু হাত কাটার দণ্ড এসব ব্যাপারে প্রয়োগ করা যাবে না।

আলোচ্য আয়াতে চুরির শাস্তি বর্ণনা করার পর দু'টো বাক্য উল্লেখ করা হয়েছে। এক, جَزَاءُ بِمَا كَسَبًا "এই শাস্তি হচ্ছে তাদের (চোর বা চোরনীর) কৃতকর্মের ফল।” দুই, نَكَالًاً مِّنَ الله “আল্লাহর পক্ষ থেকে সাজা” হিসেবে (এ হাত কাটার বিধান)। نکال শব্দে বুঝায় দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিকে। অর্থাৎ যা দেখে অন্যরাও শিক্ষা লাভ করতে পারে এবং অপরাধ থেকে বিরত থাকতে পারে। চুরির অপরাধের দু'টো দিক রয়েছে। এক, চোর অন্যের উপার্জিত মালামাল অন্যায়ভাবে নিয়ে যায়। এটা মালিকের ওপর বিরাট জুলুম। এটি বান্দার হক বিধায় মালিক ক্ষমা করলে মাফ হতে পারে। দুই, চোর চুরি করে আল্লাহর হুকুমের বিরুদ্ধাচারণ করে থাকে। এটি আল্লাহর হক (হক্কুল্লাহ)। তাই মালিক চোরকে ক্ষমা করে দিলেও আল্লাহর এই হক মাফ হবে না।

অন্যের মাল তার অনুমতি ছাড়া হেফাজতের স্থান থেকে গোপনে নিয়ে যাওয়াকে ‘চুরি বলে’। চুরি প্রমাণের জন্য কয়েকটি লক্ষণীয় দিক হলো: ১. মালটি কোনো ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গের মালিকানাধীন হতে হবে। ২. মালটি হেফাজতে থাকতে হবে। ৩. বিনা অনুমতিতে মাল নিতে হবে। ৪. মালটি গোপনে নিতে হবে। প্রকাশ্যে নিয়ে গেলে তা হবে ডাকাতি, যার শাস্তি ভিন্ন।

টিকাঃ
(মা'আরেফুল কুরআন: মুফতী মুহাম্মদ শফী (রহ))
(তাফসীরে মাযহারী)
(তাফহীমুল কুরআন)
(আহকামুল কুরআন-জাস্সাস)
(কিতাবুল আছার: ১৫৬ পৃঃ)

📘 আল কুরআনে নারী 📄 পৃথিবীর প্রথম জঘন্য অশ্লীলতা ও সেজন্য আল্লাহর গযব

📄 পৃথিবীর প্রথম জঘন্য অশ্লীলতা ও সেজন্য আল্লাহর গযব


وَلُوطًا إِذْ قَالَ لِقَوْمِهِ أَتَأْتُونَ الْفَاحِشَةَ مَا سَبَقَكُمْ بِهَا مِنْ أَحَدٍ مِّنَ الْعَلَمَيْنَ إِنَّكُمْ لَتَأْتُونَ الرِّجَالَ شَهَوَةً مِنْ دُونِ النِّسَاءِ ، بَلْ أَنْتُمْ قَوْمٌ مُّسْرِفُونَ (الاعراف : ৮০ - ৮১)

"আর লুতকে আমি নবী করে পাঠালাম। সে তার জাতিকে বললো, তোমরা কি এমন অশ্লীল কাজ করছো যা তোমাদের আগে সারা বিশ্বে কখনো কেউ করেনি? তোমরা যৌনবাসনা চরিতার্থ করার জন্য স্ত্রীদের ছেড়ে পুরুষদের কাছে গমন করছো। আসলে তোমরা একেবারেই সীমা লঙ্ঘনকারী জাতি।"-(সূরা আল আ'রাফ ৮০-৮১)

হযরত লূত (আ) ছিলেন হযরত ইবরাহীম (আ)-এর ভ্রাতুষ্পুত্র। তাঁকেও নবুয়ত দান করে আল্লাহ তা'আলা জর্ডান ও বায়তুল মোকাদ্দাসের মধ্যবর্তী সাদুমের অধিবাসীদের হেদায়েতের জন্য প্রেরণ করেন। এ এলাকার ভূমি ছিল খুবই উর্বর ও শস্য-শ্যামল। বিলাস-ব্যসন, কাম-প্রবৃত্তি ও লোভ-লালসার জালে তারা এমনভাবে আবদ্ধ হয়ে পড়েছিল যে, লজ্জা-শরম ও ভাল-মন্দের স্বভাবজাত পার্থক্যও বিস্তৃত হয়ে যায়। তারা এমন প্রকৃতি বিরুদ্ধ নির্লজ্জতা ও অশ্লীলতায় লিপ্ত হয়ে পড়ে যা সুস্থ স্বভাবের কাছে ঘৃণ্য। তারা নারীর পরিবর্তে পুরুষকে দিয়ে যৌন ক্ষুধা মিটাতো। হযরত লূত (আ) তার জাতিকে হুশিয়ার করে বলেছিলেন: "তোমরা কি এমন অশ্লীল কাজে প্রবৃত্ত হচ্ছো যা তোমাদের পূর্বে পৃথিবীর কেউ করেনি।"

সমমৈথুন একান্তই প্রকৃতি বিরোধী। আল্লাহ তা'আলা সকল জীব-জন্তুর মধ্যে স্ত্রী-পুরুষ সৃষ্টি করেছেন কেবল বংশ রক্ষার উদ্দেশ্যে। কিন্তু মানবজাতির ব্যাপারে বংশ রক্ষা ছাড়াও আরেকটি মহৎ উদ্দেশ্য রয়েছে-পরিবার গঠন এবং তার ভিত্তিতে সমাজ ও সভ্যতা গড়ে তোলা। সমমৈথুনের সাহায্যে যৌন স্বাদ আস্বাদনকারী একই সাথে কয়েক প্রকারের অপরাধ সংঘটিত করে। এক, নিজের গঠন-প্রকৃতি ও মনস্তাত্বিক প্রকৃতির সাথে যুদ্ধ করে এক বিরাট ও চরম বিকৃতি ঘটায়। দুই, সে প্রকৃতির সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে। তিন, সে মানব সমাজের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে এবং নারীর যৌন উচ্ছৃঙ্খলতার দুয়ার খুলে দেয়।

জাতির এ পশুত্বের পর্যায়ের পাপাচার যখন চরম পর্যায়ে পৌঁছল এবং তারা লূত (আ) ও তাঁর অনুসারী নেক চরিত্রবানদের সমাজ থেকে বের করে দেওয়ার উপক্রম করল, তখন আল্লাহর তরফ থেকে তাদের ধ্বংস করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত কার্যকর হলো। আল-কুরআন ওদের শাস্তি সম্পর্কে বলেছে: "আমি তাদের উপর পাথর বৃষ্টি বর্ষণ করেছিলাম। দেখ, এসব অপরাধীর পরিণতি কেমন ছিল।" অন্যত্র বলা হয়েছে: "আমি বস্তিটিকে উল্টে দিলাম, আর তাদের উপর বর্ষণ করলাম প্রস্তর স্তরে স্তরে।" সেই ভয়াবহ দৃশ্যের নিদর্শন হিসেবে বায়তুল মোকাদ্দাস ও জর্ডান নদীর মাঝখানে আজও 'লুত সাগর' বা 'মৃত সাগর' বিদ্যমান রয়েছে।

টিকাঃ
(তাফসীরে মা'আরেফুল কুরআন)
(তদাব্বুরে কুরআন)
(তাফহীমুল কুরআন)
(সূরা আল আলাক: ৬-৭)
(সূরা আল আ'রাফ: ২২)
(সূরা হূদ: ৮২)
(সূরা হিজর: ৭৩)

📘 আল কুরআনে নারী 📄 সন্তান হত্যা করো না আর ব্যভিচারের ধারেও যেয়ো না

📄 সন্তান হত্যা করো না আর ব্যভিচারের ধারেও যেয়ো না


وَلَا تَقْتُلُوا أَوْلَادَكُمْ خَشْيَةَ إِمْلَاقٍ، نَحْنُ نَرْزُقُهُمْ وَإِيَّاكُمْ ، إِنَّ قَتْلَهُمْ كَانَ خِطْاً كَبِيرًا وَلَا تَقْرَبُوا الزِّنِّى إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً ، وَسَاءَ سَبِيলা

"তোমরা দারিদ্রের ভয়ে তোমাদের সন্তানদের হত্যা করো না। আমিই তো তাদের রিস্ক দিয়ে থাকি, আর তোমাদেরও। নিশ্চয়ই তাদেরকে হত্যা করা মারাত্মক অপরাধ। আর যেনার ধারেও যেয়ো না। নিশ্চয়ই এটা খুবই অশ্লীল কাজ এবং অত্যন্ত খারাপ পথ।" -সূরা বনী ইসরাঈল : ৩১-৩২

জাহেলী যুগে আরবদের মধ্যে এমন প্রথা ছিল যে, তারা ভরণ-পোষণের ভয়ে সন্তানদেরকে বিশেষ করে কন্যা সন্তানদের হত্যা করতো। এই আয়াতে আল্লাহ তা'আলা তাদের এই কর্মপন্থাটি যে অত্যন্ত জঘন্য তা তুলে ধরেছেন। আল্লাহ বলেন যে তিনিই রিজিকদাতা, সন্তানরা তোমাদের রিজিক খাবে না বরং আমিই তাদের রিজিক দেব। সন্তান হত্যা মহাপাপ ও অমার্জনীয় অপরাধ। আধুনিক বিশ্বে জন্মনিয়ন্ত্রণের নামে যে আন্দোলন চলছে তার পেছনেও জাহেলী আরবের সেই বর্বরতার ভাবধারা বিরাজিত। ইসলাম জনসংখ্যা হ্রাস করার ধ্বংসাত্মক প্রচেষ্টা পরিত্যাগ করে গঠনমূলক প্রচেষ্টায় শক্তি নিয়োগ করতে বলে।

দ্বিতীয় আয়াতে যিনা বা ব্যভিচারের ধারেও না যেতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। দারিদ্রের ভয়ে বিবাহ থেকে বিরত থাকলে অবৈধ সম্পর্কের পথ প্রশস্ত হয়। নির্দেশটি ব্যক্তি এবং সমাজ উভয়ের প্রতি। যিনা এবং যিনার উদ্বোধক যাবতীয় কার্যক্রম থেকেও দূরে থাকতে হবে। ইসলাম নগ্নতা, অশ্লীলতা, বেহায়াপনা, মদ, গান-বাজনা প্রভৃতি যিনা-ব্যভিচারের নিকটতর কাজসমূহ নিষিদ্ধ করেছে। যিনা হারাম হওয়ার কারণ হলো এটি একটি জঘন্য অশ্লীল কাজ যাতে লজ্জা-শরম লোপ পায়। এর ক্ষতির দিকগুলো হলো: ১. বংশের পরিচয় বিলুপ্ত হওয়া, ২. সামাজিক অরাজকতা ও সহিংসতা বৃদ্ধি, ৩. পারিবারিক শান্তি বিনষ্ট হওয়া, ৪. মানুষ ও পশুর মধ্যে পার্থক্য লোপ পাওয়া।

টিকাঃ
(মাআরেফুল কুরআন)
(তাফসীরে হাক্কানী)
(তদাব্বুরে কুরআন)
(তাফহীমুল কুরআন)
(সূরা আল আলাক: ৬-৭)

ফন্ট সাইজ
15px
17px