📘 আল কুরআনে নারী 📄 মানব সৃষ্টি একজন পুরুষ ও একজন নারী থেকে। মানব মর্যাদার মূলভিত্তি ‘তাকওয়া’

📄 মানব সৃষ্টি একজন পুরুষ ও একজন নারী থেকে। মানব মর্যাদার মূলভিত্তি ‘তাকওয়া’


يأَيُّهَا النَّاسُ إِنَّا خَلَقْنَكُمْ مِّنْ ذَكَرٍ وَأُنْثَى وَجَعَلْنَكُمْ شُعُوبًا وَقَبَائِلَ لِتَعَارَفُوا ، إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِنْدَ اللَّهِ أَتْقُكُمْ ، إِنَّ اللَّهَ عَلِيمٌ خَبِيرٌه

"হে মানুষেরা! আমিই তোমাদের সৃষ্টি করেছি একজন পুরুষ ও একজন নারী হতে, আর তোমাদের বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে, যাতে তোমরা পরস্পর পরিচিত হতে পার। তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই আল্লাহর কাছে অধিক মর্যাদাবান, যে তোমাদের মধ্যে অধিক মুত্তাকী। নিশ্চয়ই আল্লাহ সবকিছু জানেন, সমস্ত খবর রাখেন।" -সূরা আল হুজুরাত: ১৩

আলোচ্য আয়াতে সমগ্র মানব জাতিকে সম্বোধন করে মহান আল্লাহ তাদের মূল যে এক ও অভিন্ন সে বিষয়ে এক বাস্তব ও ঐতিহাসিক সত্য ঘোষণা করেছেন। হে মানবজাতি! আমি তোমাদেরকে একজন পুরুষ ও একজন স্ত্রী থেকে সৃষ্টি করেছি; অতপর তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে করে তোমরা পৃথিবীতে পরস্পর পরিচিত হতে পার। জেনে রেখ, তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে তাকওয়াবান ব্যক্তিই সবচেয়ে মর্যাদার অধিকারী।

এর তাৎপর্য হলো, বহু বর্ণে ও জাতিতে বিভক্ত হে মানব সমাজ! তোমাদের মূল এক ও অভিন্ন। বর্ণ, ভাষা, স্বভাব, চরিত্র, প্রতিভা ও যোগ্যতার বিভিন্নতা একটা সৃষ্টিগত বৈচিত্র মাত্র। এ বিভিন্নতা বিবাদ-বিসম্বাদ ও শত্রুতা দাবী করে না, বরং দাবী করে মানব জাতির সকল দায়িত্ব বহনে ও সকল চাহিদা পূরণে পারস্পরিক সহযোগিতা। বর্ণ, বংশ, ভাষা, ভূমি এবং এ ধরনের অন্য সকল উপকরণের কোনো মূল্য আল্লাহর দৃষ্টিতে নেই। আল্লাহর দৃষ্টিতে মানুষের মর্যাদা পরিমাপ করার ও শ্রেষ্ঠত্ব নির্ণয় করার একটি মাত্র মানদণ্ড আছে। আর সেই মানদণ্ড হচ্ছে 'তাকওয়া'।

আলোচ্য আয়াতটিতে সমগ্র মানব জাতিকে সম্বোধন করে এমন এক চরম ভ্রান্তি ও গোমরাহীমূলক বিষয়ে সংশোধন করতে চাওয়া হয়েছে যা গোটা বিশ্বে এক সর্বাত্মক মারাত্মক বিপর্যয় ও চরম অশান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাহলো বংশ, বর্ণ, ভাষা, দেশ ও জাতীয়তার বিদ্বেষ। মানুষ সাধারণত মনুষ্যত্বকে ভুলে গিয়ে নিজেদের চতুষ্পার্শে এমন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পরিবেষ্টনী রচনা করে নিয়েছে যার ভিতরে জন্মগ্রহণকারীকে সে আপন বলে গ্রহণ করেছে আর তার বাইরে জন্মগ্রহণকারীকে ভিন্ন, অপর বা শত্রুরূপে চিহ্নিত করেছে। ইহুদীরা এরই ভিত্তিতে বনী ইসরাঈলকে আল্লাহর পসন্দ করা বিশেষ জাতিরূপে গণ্য করে। হিন্দু সমাজের বর্ণ বিচার এ পার্থক্যবোধের কারণেই গড়ে উঠেছে। উঁচু জাতের লোকদের তুলনায় সমস্ত মানুষকে নীচ ও অপবিত্র বলে ঘোষণা করা হয়েছে। শ্বেতাঙ্গ ও কৃষ্ণাঙ্গের পার্থক্য আফ্রিকায় ও আমেরিকায় কৃষ্ণাঙ্গ লোকদের উপর যে অমানুষিক যুলুম ও নিপীড়ন চালিয়েছে তার মর্মান্তিক কাহিনী তো ইতিহাসের পাতায় খুঁজতে হবে না। পাশ্চাত্যের জাতি-সমূহের হিংস্র জাতীয়তাবাদ এক একটি জাতিকে অন্যান্য জাতিগুলোর জন্য হিংস্র পশুতে পরিণত করেছে।

হে পৃথিবীর মানব জাতি! তোমাদের সকলের-সমস্ত মানুষের মূল ও উৎস এক ও অভিন্ন। একজন পুরুষ ও একজন মহিলা হতেই গোটা মানবজাতি অস্তিত্ব লাভ করেছে। বর্তমানে দুনিয়াতে মানুষের যত বংশ বা গোত্র রয়েছে তা সবই মূলত একটি প্রাথমিক বংশেরই শাখা-প্রশাখা মাত্র। আর এর সূচনা হয়েছিল এক পিতা ও এক মাতা থেকে। মানব সৃষ্টির নিয়াম-পদ্ধতিও সম্পূর্ণ অভিন্ন। তোমরা সকলে একই পিতা-মাতার সন্তান। সকলের দেহে একই পিতা-মাতার শোণিতধারা প্রবাহিত। মানুষের প্রাথমিক যুগল ভিন্ন ভিন্ন ছিল না এবং দুনিয়ার বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন জনতা ভিন্ন ভিন্ন নিয়ম-পদ্ধতিতে জন্মগ্রহণ করেনি।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন প্রথম মানুষ হযরত আদম আ. থেকে সৃষ্টি করেছেন তাঁর স্ত্রী হাওয়া আ.-কে, আর এ দুজন থেকে সকল বনী আদমকে। মানব জাতির অস্তিত্ব লাভে, তাদের স্থিতি, বৃদ্ধি ও সংরক্ষণে নারী-পুরুষের মাধ্যম আল্লাহর গৃহীত সাধারণ নীতি। আলোচ্য আয়াতে বিশ্ব মানুষের কৃত্রিম সাম্প্রদায়িকতা ও জাতীয়তাসহ সকল প্রকারের সংকীর্ণতার জাল ছিন্ন করে পৃথিবীর সকল মানুষের প্রকৃত সম্পর্ক এবং তাদের শ্রেষ্ঠত্বের বৈশিষ্ট্য আলোচিত হয়েছে অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে। আজকের পৃথিবীতে একটা বিশ্ব-পরিবার গঠন বা বিশ্বায়ণের প্রবক্তা ও অনুরূপ চিন্তা-গবেষণার ধারকদের জন্যে এর চেয়ে উদার ও সার্বজনীন অমোঘ বিধানের নযীর আর কোথায়ও কি আছে?

টিকাঃ
ফী যিলালিল কুরআন।
তাফহীমুল কুরআন।

ফন্ট সাইজ
15px
17px