📄 আল্লাহর শাস্তি অথবা সন্তুষ্টি লাভ মানুষের পুরুষ বা নারী হওয়ার কারণে নয়
لِيُعَذِّبَ اللهُ الْمُنْفِقِينَ وَالْمُنْفِقْتِ وَالْمُشْرِكِينَ وَالْمُشْرِكْتِ وَيَتُوبَ اللَّهُ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَتِ ، وَكَانَ اللَّهُ غَفُورًا رَّحِيمًا
"যাতে আল্লাহ শাস্তি দেন মুনাফিক পুরুষ ও মুনাফিক নারী এবং মুশরিক পুরুষ ও মুশরিক নারীকে। আর আল্লাহ তাওবা কবুল করেন মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীগণের। আল্লাহ অতিশয় ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু।"-সূরা আল আহযাব: ৭৩
আলোচ্য আয়াতের পূর্বের আয়াতে 'আল্লাহর আমানত' মানবজাতি কিভাবে নিজের কাঁধে তুলে নিল, সে বিষয়ে বলা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেছেন, "আমি এ আমানত আকাশজগত, যমীন ও পাহাড়ের সামনে পেশ করেছিলাম। তারা তা বহন করতে অস্বীকার করলো, তারা ভয় পেয়ে গেল' কিন্তু মানুষ তা নিজের কাঁধে তুলে নিল। মানুষ যে বড় যালেম ও মূর্খ-জাহেল তাতে সন্দেহ নেই।"-সূরা আল আহযাব: ৭২। অতপর আলোচ্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন, "আমানতের এ বোঝা গ্রহণ করার অনিবার্য পরিণাম এই যে, আল্লাহ মুনাফিক পুরুষ ও মুনাফিক নারী এবং মুশরিক পুরুষ ও মুশরিক নারীদের শাস্তি দিবেন; আর মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদের (ক্ষমা) তাওবা কবুল করবেন। আল্লাহ তো বড়ই ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।"
এখানে আমানত (امانت) বলতে খিলাফত (خلافت) বুঝানো হয়েছে। কুরআনের ঘোষণা মতে এই যমীনে মানুষকে এ খিলাফতের মর্যাদা দান করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা মানুষকে আল্লাহর আনুগত্য ও নাফরমানী করার যে আযাদী দান করেছেন এবং এ আযাদী ভোগ ও ব্যবহার করার জন্য আল্লাহর সৃষ্টির উপর হস্তক্ষেপ করার ও কর্তৃত্ব চালাবার যে এখতিয়ার দিয়েছেন, তার অনিবার্য ফল এই যে, মানুষ তার নিজের ইচ্ছাধীন কাজ কর্মের জন্য নিজেই দায়ী হবে। ভাল নীতি অনুসরণ করলে তার পুরস্কার লাভ করার এবং মন্দ নীতি অনুযায়ী কাজ করলে তার শাস্তি ভোগ করার সে-ই হবে উপযুক্ত জিম্মাদার।
এই আমানত কত বড় গুরুত্বপূর্ণ ও সাংঘাতিক, সে বিষয়ে ধারণা দেয়ার জন্য আল্লাহ রব্বুল আলামীন বলেছেন। আসমান ও যমীন বিপুল বিরাটত্ব সত্ত্বেও এবং পাহাড়-পর্বত আয়তনে বিরাট-বিশাল ও কঠিন হওয়া সত্ত্বেও এ আমানত মাথায় তুলে নেয়ার সাহস ও শক্তি পায়নি। মাটি-বাতাস, আগুন-পানি আল্লাহর বান্দা। তোমার আমার কাছে জড় হলেও স্রষ্টার কাছে জীব। কাজেই আল্লাহ তাদের সামনে এ কঠিন দায়িত্বের আমানত পেশ করছেন আর তারা তা দেখে ভয়ে কেঁপে উঠেছে। তারা মালিকের এখতিয়ারাধীন খাদেম হয়েই থাকতে চেয়েছে। নাফরমানী করার স্বাধীনতা ও এখতিয়ার লাভ করে তার হক আদায় করতে না পারা অবস্থায় মালিকের শাস্তি ভোগ করা তাদের সহ্যের অতীত ব্যাপার।
আলোচ্য আয়াতের শুরু করা হয়েছে এই বলে : لِيُعَذِّبَ اللهُ الْمُنْفِقِينَ وَالْمُنْفِقْت এখানে অব্যয়টি বক্তব্যের কারণ ও উদ্দেশ্য বর্ণনা অর্থে ব্যবহৃত হয়নি; বরং আরবী ব্যাকরণের পরিভাষায় এ ল্যাম-এ-আকেবাত (لام عاقبة) বলা হয়। আয়াতের অর্থ এই যে, পরিণামে আল্লাহ তাআলা মুনাফিক পুরুষ ও মুনাফিক নারীদেরকে এবং মুশরিক পুরুষ ও মুশরিক নারীদেরকে শাস্তি দিবেন। আর মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদেরকে পুরস্কৃত করবেন। প্রত্যেক জন্মগ্রহণকারীর পরিণাম মৃত্যু এবং প্রত্যেক নির্মাণের পরিণাম ধ্বংস।
মানুষ যে আমানতের বোঝা বহন করেছে, এর পরিণামে মানুষ দু দলে বিভক্ত হয়ে যাবে: এক. কাফের ও মুনাফিক ইত্যাদি যারা অবাধ্য হয়ে আমানত নষ্ট করে দেবে তাদেরকে শাস্তি দেয়া হবে। দুই. মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারী। যারা আনুগত্যের মাধ্যমে আমানতের হক আদায় করবে। তাদের সাথে অনুগ্রহ ও ক্ষমাসুন্দর ব্যবহার করা হবে। এভাবে রাব্বুল আলামীনের দেয়া এখতিয়ার বা ইচ্ছাশক্তির ব্যবহার অনুযায়ী আদম সন্তান আল্লাহর সন্তুষ্টি অথবা বিরাগের ভাগী হবে। কে পুরুষ আর কে নারী, এখানে সে তারতম্য মোটেই বিবেচনাযোগ্য নয়।
আলোচ্য আয়াতের মূল ঘোষণা হলো শির্ক ও নিফাক মানুষকে আল্লাহর আযাবের যোগ্য করে, আর ঈমান যোগ্য করে আল্লাহর ক্ষমা ও রহমতের। মানুষটি নারী কি পুরুষ—তা মোটেই বিবেচ্য নয়।
টিকাঃ
তাফহীমুল কুরআন।
মাআরেফুল কুরআন।
📄 মানব সৃষ্টি একজন পুরুষ ও একজন নারী থেকে। মানব মর্যাদার মূলভিত্তি ‘তাকওয়া’
يأَيُّهَا النَّاسُ إِنَّا خَلَقْنَكُمْ مِّنْ ذَكَرٍ وَأُنْثَى وَجَعَلْنَكُمْ شُعُوبًا وَقَبَائِلَ لِتَعَارَفُوا ، إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِنْدَ اللَّهِ أَتْقُكُمْ ، إِنَّ اللَّهَ عَلِيمٌ خَبِيرٌه
"হে মানুষেরা! আমিই তোমাদের সৃষ্টি করেছি একজন পুরুষ ও একজন নারী হতে, আর তোমাদের বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে, যাতে তোমরা পরস্পর পরিচিত হতে পার। তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই আল্লাহর কাছে অধিক মর্যাদাবান, যে তোমাদের মধ্যে অধিক মুত্তাকী। নিশ্চয়ই আল্লাহ সবকিছু জানেন, সমস্ত খবর রাখেন।" -সূরা আল হুজুরাত: ১৩
আলোচ্য আয়াতে সমগ্র মানব জাতিকে সম্বোধন করে মহান আল্লাহ তাদের মূল যে এক ও অভিন্ন সে বিষয়ে এক বাস্তব ও ঐতিহাসিক সত্য ঘোষণা করেছেন। হে মানবজাতি! আমি তোমাদেরকে একজন পুরুষ ও একজন স্ত্রী থেকে সৃষ্টি করেছি; অতপর তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে করে তোমরা পৃথিবীতে পরস্পর পরিচিত হতে পার। জেনে রেখ, তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে তাকওয়াবান ব্যক্তিই সবচেয়ে মর্যাদার অধিকারী।
এর তাৎপর্য হলো, বহু বর্ণে ও জাতিতে বিভক্ত হে মানব সমাজ! তোমাদের মূল এক ও অভিন্ন। বর্ণ, ভাষা, স্বভাব, চরিত্র, প্রতিভা ও যোগ্যতার বিভিন্নতা একটা সৃষ্টিগত বৈচিত্র মাত্র। এ বিভিন্নতা বিবাদ-বিসম্বাদ ও শত্রুতা দাবী করে না, বরং দাবী করে মানব জাতির সকল দায়িত্ব বহনে ও সকল চাহিদা পূরণে পারস্পরিক সহযোগিতা। বর্ণ, বংশ, ভাষা, ভূমি এবং এ ধরনের অন্য সকল উপকরণের কোনো মূল্য আল্লাহর দৃষ্টিতে নেই। আল্লাহর দৃষ্টিতে মানুষের মর্যাদা পরিমাপ করার ও শ্রেষ্ঠত্ব নির্ণয় করার একটি মাত্র মানদণ্ড আছে। আর সেই মানদণ্ড হচ্ছে 'তাকওয়া'।
আলোচ্য আয়াতটিতে সমগ্র মানব জাতিকে সম্বোধন করে এমন এক চরম ভ্রান্তি ও গোমরাহীমূলক বিষয়ে সংশোধন করতে চাওয়া হয়েছে যা গোটা বিশ্বে এক সর্বাত্মক মারাত্মক বিপর্যয় ও চরম অশান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাহলো বংশ, বর্ণ, ভাষা, দেশ ও জাতীয়তার বিদ্বেষ। মানুষ সাধারণত মনুষ্যত্বকে ভুলে গিয়ে নিজেদের চতুষ্পার্শে এমন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পরিবেষ্টনী রচনা করে নিয়েছে যার ভিতরে জন্মগ্রহণকারীকে সে আপন বলে গ্রহণ করেছে আর তার বাইরে জন্মগ্রহণকারীকে ভিন্ন, অপর বা শত্রুরূপে চিহ্নিত করেছে। ইহুদীরা এরই ভিত্তিতে বনী ইসরাঈলকে আল্লাহর পসন্দ করা বিশেষ জাতিরূপে গণ্য করে। হিন্দু সমাজের বর্ণ বিচার এ পার্থক্যবোধের কারণেই গড়ে উঠেছে। উঁচু জাতের লোকদের তুলনায় সমস্ত মানুষকে নীচ ও অপবিত্র বলে ঘোষণা করা হয়েছে। শ্বেতাঙ্গ ও কৃষ্ণাঙ্গের পার্থক্য আফ্রিকায় ও আমেরিকায় কৃষ্ণাঙ্গ লোকদের উপর যে অমানুষিক যুলুম ও নিপীড়ন চালিয়েছে তার মর্মান্তিক কাহিনী তো ইতিহাসের পাতায় খুঁজতে হবে না। পাশ্চাত্যের জাতি-সমূহের হিংস্র জাতীয়তাবাদ এক একটি জাতিকে অন্যান্য জাতিগুলোর জন্য হিংস্র পশুতে পরিণত করেছে।
হে পৃথিবীর মানব জাতি! তোমাদের সকলের-সমস্ত মানুষের মূল ও উৎস এক ও অভিন্ন। একজন পুরুষ ও একজন মহিলা হতেই গোটা মানবজাতি অস্তিত্ব লাভ করেছে। বর্তমানে দুনিয়াতে মানুষের যত বংশ বা গোত্র রয়েছে তা সবই মূলত একটি প্রাথমিক বংশেরই শাখা-প্রশাখা মাত্র। আর এর সূচনা হয়েছিল এক পিতা ও এক মাতা থেকে। মানব সৃষ্টির নিয়াম-পদ্ধতিও সম্পূর্ণ অভিন্ন। তোমরা সকলে একই পিতা-মাতার সন্তান। সকলের দেহে একই পিতা-মাতার শোণিতধারা প্রবাহিত। মানুষের প্রাথমিক যুগল ভিন্ন ভিন্ন ছিল না এবং দুনিয়ার বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন জনতা ভিন্ন ভিন্ন নিয়ম-পদ্ধতিতে জন্মগ্রহণ করেনি।
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন প্রথম মানুষ হযরত আদম আ. থেকে সৃষ্টি করেছেন তাঁর স্ত্রী হাওয়া আ.-কে, আর এ দুজন থেকে সকল বনী আদমকে। মানব জাতির অস্তিত্ব লাভে, তাদের স্থিতি, বৃদ্ধি ও সংরক্ষণে নারী-পুরুষের মাধ্যম আল্লাহর গৃহীত সাধারণ নীতি। আলোচ্য আয়াতে বিশ্ব মানুষের কৃত্রিম সাম্প্রদায়িকতা ও জাতীয়তাসহ সকল প্রকারের সংকীর্ণতার জাল ছিন্ন করে পৃথিবীর সকল মানুষের প্রকৃত সম্পর্ক এবং তাদের শ্রেষ্ঠত্বের বৈশিষ্ট্য আলোচিত হয়েছে অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে। আজকের পৃথিবীতে একটা বিশ্ব-পরিবার গঠন বা বিশ্বায়ণের প্রবক্তা ও অনুরূপ চিন্তা-গবেষণার ধারকদের জন্যে এর চেয়ে উদার ও সার্বজনীন অমোঘ বিধানের নযীর আর কোথায়ও কি আছে?
টিকাঃ
ফী যিলালিল কুরআন।
তাফহীমুল কুরআন।