📄 নির্দিষ্ট গুণবৈশিষ্ট্যের সকল পুরুষ-নারীর জন্য রয়েছে আল্লাহর অভিন্ন ক্ষমা ও পুরস্কার
إِنَّ الْمُسْلِمِينَ وَالْمُسْلِمَتِ وَالْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَتِ وَالْقُنِتِينَ وَالْقُنِتَتِ وَالصَّدِقِينَ وَالصَّدِقَتِ وَالصَّبِرِينَ وَالصَّبِرْتِ وَالْخَشِعِينَ وَالْখُشِعْتِ وَالْمُتَصَدِّقِينَ وَالْمُتَصَدِّقَتِ وَالصَّائِمِينَ وَالصَّمْتِ وَالْحَفِظِينَ فُرُوجَهُمْ وَالْحَفِظْتِ وَالذُّكِرِينَ اللَّهَ كَثِيرًا وَالذَّكِرَتِ * أَعَدَّ اللَّهُ لَهُمْ مَّغْفِرَةً وَأَجْرًا عَظِيمًا
“মুসলমান পুরুষ ও মুসলমান নারী, মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারী, অনুগত পুরুষ ও অনুগত নারী, সত্যবাদী পুরুষ ও সত্যবাদী নারী, সবরকারী পুরুষ ও সবরকারী নারী, বিনীত পুরুষ ও বিনীত নারী, দানশীল পুরুষ ও দানশীল নারী, রোযাদার পুরুষ ও রোযাদার নারী, যৌন অঙ্গ হেফাযতকারী পুরুষ ও যৌন অঙ্গ হেফাযতকারী নারী, আল্লাহকে অধিক স্মরণকারী পুরুষ ও অধিক স্মরণকারী নারী—এঁদের সকলের জন্য আল্লাহ তাআলা ক্ষমা ও মহা প্রতিদান রেখে দিয়েছেন।” -সূরা আল আহযাব : ৩৫
আদম সন্তান পুরুষ ও নারী—দুটো শ্রেণীতে বিভক্ত। মানব বংশ সংরক্ষণ ও বিস্তারের জন্য এতদোভয়ের সৃষ্টি, উভয়ের দৈহিক মানসিক গঠন পার্থক্য এবং তদানুযায়ী উভয়ের মধ্যে কর্মবণ্টন আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের সৃষ্টি রহস্যের একটা গুরুত্বপূর্ণ দিকবিশেষ। মর্যাদা, অধিকার ও কর্মফল প্রাপ্তির দিক থেকে তাদের মধ্যে ইসলাম কোনোই পার্থক্য করে না। পার্থক্য করেছে কেবল কর্মবণ্টন ও দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে। ভরণ-পোষণের সার্বিক দায়িত্ব দেয়া হয়েছে স্বামীর উপর। এতে নর হত্যাকে যতটুকু পাপ নারী হত্যাও ঠিক ততটুকুই পাপ।
কুরআনুল কারীমের নির্দেশাবলীর সাধারণ নীতি হলো এতে মানব জাতিকে সম্বোধন করা হয়েছে পুরুষ বাচক শব্দ দিয়ে আর নারীদেরকে এর অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে পরোক্ষভাবে। যেমন يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟। এতে ইংগিত রয়েছে যে, নারীদের সকল বিষয়ই প্রচ্ছন্ন ও গোপনীয় থাকবে- এরি মধ্যে তাদের মর্যাদা নিহিত। কুরআনুল কারীমের এ প্রকাশভংগি এক বিশেষ প্রজ্ঞা, যৌক্তিকতা ও কল্যাণের ভিত্তিতেই অনুসৃত হয়েছিল; কিন্তু এতে নারীদের হীনমন্যতার উদ্রেক হওয়াই ছিল একান্ত স্বাভাবিক ব্যাপার। নারীগণ রসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খেদমতে আরজ করেছিল— আমরা দেখতে পাচ্ছি আল্লাহ পাক কুরআনের সর্বত্র পুরুষদেরই উল্লেখ করেছেন, তাদেরকেই সম্বোধন করেছেন। এতে বুঝা যায় যে, আমাদের (নারীদের) মধ্যে কোনো পুণ্য ও কল্যাণ নেই।
আলোচ্য আয়াতসমূহে নারীদের সান্ত্বনা ও স্বস্তি প্রদান এবং তাদের আমল গ্রহণযোগ্য হওয়ার শর্তাবলী সংশ্লিষ্ট বিশেষ আলোচনা রয়েছে। বলা হয়েছে আল্লাহ তাআলা সমীপে মান-মর্যাদা ও তাঁর নৈকট্য লাভের ভিত্তি হলো সৎকার্যাবলী, আল্লাহর আনুগত্য ও বশ্যতা স্বীকার করা। এ ক্ষেত্রে পুরুষ হওয়া বা নারী হওয়ার মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। মুসলিম জাতি সত্ত্বার বিশাল প্রাসাদটি গড়ে উঠার মত ভিত্তির জন্য যেসব গুণাবলীর প্রয়োজন, এ আয়াতে ওসব গুণাবলীর বহু মূল্যবান নির্দেশিকা বর্ণিত হয়েছে।
ইসলামী যিন্দিগীর অনুসারী নারী-পুরুষরাই 'মুসলিম'। যারা ইসলামকে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান হিসেবে কবুল করে নিয়েছে। তাওহীদ ভিত্তিক অবিভক্ত চেতনা-বিশ্বাসই হচ্ছে মুসলিমের দুনিয়ার জীবনের প্রতিটি ধাপের মূল চালিকাশক্তি ও নিয়ন্ত্রক চাবিকাঠি। দ্বিতীয় বিষয়টি হচ্ছে 'ঈমান'। যারা আন্তরিকভাবেই ইসলামের পথনির্দেশকে সত্য, সঠিক ও নির্ভুল বলে স্বীকার করে। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈমান স্বরূপ বর্ণনা করেছেন, ذَاقَ طَعْمُ الْإِيمَانَ مَنْ رَضِيَ بِاللهِ رَبًّا وَبِالْإِسْلَامِ دِينًا وَبِمُحَمَّدٍ رَّسُولًا।
তৃতীয় বিষয়টি হচ্ছে 'আনুগত্য' (কানেত)। অনুগত নারী-পুরুষ বলতে বুঝায় সেসব মুসলিমকে যারা ইসলামের বিধান বাস্তবে যথাযথ অনুসরণ করে থাকে। চতুর্থ বৈশিষ্ট্য হলো 'সত্যবাদিতা'। মিথ্যা, ধোঁকা, প্রতারণা, অসদুদ্দেশ্য ও ধূর্তামি প্রভৃতি দোষ তাদের জীবনে পাওয়া যাবে না। পঞ্চম বিষয়টি হচ্ছে 'সবর-ধৈর্য'। আল্লাহর দীন কায়েমের ব্যাপারে যত বাধা-বিপত্তির সম্মুখীন হতে হয়— তা সবই তারা পূর্ণ ধৈর্য-সহিষ্ণুতা সহকারে বরদাশত করে নেয়। ষষ্ঠ বিষয় হলো 'বিনয়-নম্রতা' (খাশেয়ীন)। গৌরব, অহংকার, দাম্ভিকতা হতে তাদের অন্তর হবে মুক্ত। সপ্তম বিষয় হলো 'দানশীলতা' (মুতাসাদ্দেকীন)। কেবল ফরয যাকাত আদায় করা এর অর্থ নয়। সাধারণ দান-খয়রাতও এর মধ্যে শামিল। অষ্টম গুণটি হলো 'সওম বা রোযা'। রোযাদার নারী-পুরুষকে তার সিয়াম পালন আত্ম নিয়ন্ত্রণের শক্তি পয়দা করে। নবম বৈশিষ্ট্য হলো 'লজ্জাস্থানের হেফাযত'। তারা যিনা-ব্যভিচার থেকে পবিত্র থাকে এবং নগ্নতা ও উলঙ্গতা পরিহার করে।
দশম ও সর্বশেষ গুণ-বৈশিষ্ট্য হলো, 'আল্লাহ তাআলাকে বেশী বেশী করে স্মরণ করা।' এর অর্থ হলো মুখে সর্বাবস্থায় সর্বক্ষণে কোনো না কোনোভাবে আল্লাহর নাম উচ্চারিত হবে। খাওয়ার শুরুতে 'বিস্মিল্লাহ'। চর্বন করতে 'সুবহানাল্লাহ', গিলতে 'আলহামদুলিল্লাহ বলবে। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলো, ইয়া রাসূলাল্লাহ! মুজাহিদদের মধ্যে সবচেয়ে বেশী পুণ্য ও পুরস্কার লাভ করবে কে ? তিনি বললেন, তাদের মধ্যে যে সবচেয়ে বেশী আল্লাহর যিকির করবে।
আলোচ্য আয়াতে বর্ণিত দশটি গুণ-বৈশিষ্ট্যের কথা আলোচনা করে বলা হয়েছে যে, এসব গুণাবলী যেসব নারী-পুরুষের মধ্যে পাওয়া যাবে, তাদের জন্য রয়েছে আল্লাহর ক্ষমা ও মহাপ্রতিদান। ইসলামের মৌলিক মূল্যমান (Basic Values) সমূহ এ একটি আয়াতেই বলে দেয়া হয়েছে। এ মূল্যমান সমূহের দৃষ্টিতে নারী ও পুরুষের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। হযরত উম্মে সালমা রা. এবং অন্যান্য কজন মহিলা সাহাবী বললেন, এ কেমন কথা! আল্লাহ তাঁর কালামের সর্বত্র কেবল পুরুষদের সম্বোধন করেছেন- মহিলাদের নয়? তাঁর এ কথার জবাবে আলোচ্য আয়াত নাযিল হয়েছে।
কুরআনের অধিক সংখ্যক স্থানেই তো কেবল পুরুষদের সম্পর্কে বলা হয়েছে—নারীদের সম্পর্কে নয়। তাছাড়া এ আয়াতের পূর্ববর্তী আয়াতসমূহে শুধু নবী পত্নীদের কথা বলা হয়েছে, সাধারণ নারী সমাজের কথা কিছুই বলা হয়নি। মহিলাদের এসব কথার প্রেক্ষিতে এ আয়াত নাযিল হয়েছে। এখানে নারীদের শান্ত্বনা দিয়ে বুঝানো হয়েছে যে, নারী হোক বা পুরুষ হোক—কারো পরিশ্রম ও উপার্জন আল্লাহর দরবারে বিনষ্ট হতে দেয়া হয় না।
টিকাঃ
মাআরেফুল কুরআন।
তাফহীমুল কুরআন।
মুসনাদে আহমাদ।
মাওলানা সালাহুদ্দীন ইউসুফ: আল কুরআনুল করীম।
শায়খুল ইসলাম হযরত মাওলানা শাব্বীর আহমদ উসমানী রহ.: তাফসীরে উসমানী।
📄 আল্লাহর শাস্তি অথবা সন্তুষ্টি লাভ মানুষের পুরুষ বা নারী হওয়ার কারণে নয়
لِيُعَذِّبَ اللهُ الْمُنْفِقِينَ وَالْمُنْفِقْتِ وَالْمُشْرِكِينَ وَالْمُشْرِكْتِ وَيَتُوبَ اللَّهُ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَتِ ، وَكَانَ اللَّهُ غَفُورًا رَّحِيمًا
"যাতে আল্লাহ শাস্তি দেন মুনাফিক পুরুষ ও মুনাফিক নারী এবং মুশরিক পুরুষ ও মুশরিক নারীকে। আর আল্লাহ তাওবা কবুল করেন মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীগণের। আল্লাহ অতিশয় ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু।"-সূরা আল আহযাব: ৭৩
আলোচ্য আয়াতের পূর্বের আয়াতে 'আল্লাহর আমানত' মানবজাতি কিভাবে নিজের কাঁধে তুলে নিল, সে বিষয়ে বলা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেছেন, "আমি এ আমানত আকাশজগত, যমীন ও পাহাড়ের সামনে পেশ করেছিলাম। তারা তা বহন করতে অস্বীকার করলো, তারা ভয় পেয়ে গেল' কিন্তু মানুষ তা নিজের কাঁধে তুলে নিল। মানুষ যে বড় যালেম ও মূর্খ-জাহেল তাতে সন্দেহ নেই।"-সূরা আল আহযাব: ৭২। অতপর আলোচ্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন, "আমানতের এ বোঝা গ্রহণ করার অনিবার্য পরিণাম এই যে, আল্লাহ মুনাফিক পুরুষ ও মুনাফিক নারী এবং মুশরিক পুরুষ ও মুশরিক নারীদের শাস্তি দিবেন; আর মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদের (ক্ষমা) তাওবা কবুল করবেন। আল্লাহ তো বড়ই ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।"
এখানে আমানত (امانت) বলতে খিলাফত (خلافت) বুঝানো হয়েছে। কুরআনের ঘোষণা মতে এই যমীনে মানুষকে এ খিলাফতের মর্যাদা দান করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা মানুষকে আল্লাহর আনুগত্য ও নাফরমানী করার যে আযাদী দান করেছেন এবং এ আযাদী ভোগ ও ব্যবহার করার জন্য আল্লাহর সৃষ্টির উপর হস্তক্ষেপ করার ও কর্তৃত্ব চালাবার যে এখতিয়ার দিয়েছেন, তার অনিবার্য ফল এই যে, মানুষ তার নিজের ইচ্ছাধীন কাজ কর্মের জন্য নিজেই দায়ী হবে। ভাল নীতি অনুসরণ করলে তার পুরস্কার লাভ করার এবং মন্দ নীতি অনুযায়ী কাজ করলে তার শাস্তি ভোগ করার সে-ই হবে উপযুক্ত জিম্মাদার।
এই আমানত কত বড় গুরুত্বপূর্ণ ও সাংঘাতিক, সে বিষয়ে ধারণা দেয়ার জন্য আল্লাহ রব্বুল আলামীন বলেছেন। আসমান ও যমীন বিপুল বিরাটত্ব সত্ত্বেও এবং পাহাড়-পর্বত আয়তনে বিরাট-বিশাল ও কঠিন হওয়া সত্ত্বেও এ আমানত মাথায় তুলে নেয়ার সাহস ও শক্তি পায়নি। মাটি-বাতাস, আগুন-পানি আল্লাহর বান্দা। তোমার আমার কাছে জড় হলেও স্রষ্টার কাছে জীব। কাজেই আল্লাহ তাদের সামনে এ কঠিন দায়িত্বের আমানত পেশ করছেন আর তারা তা দেখে ভয়ে কেঁপে উঠেছে। তারা মালিকের এখতিয়ারাধীন খাদেম হয়েই থাকতে চেয়েছে। নাফরমানী করার স্বাধীনতা ও এখতিয়ার লাভ করে তার হক আদায় করতে না পারা অবস্থায় মালিকের শাস্তি ভোগ করা তাদের সহ্যের অতীত ব্যাপার।
আলোচ্য আয়াতের শুরু করা হয়েছে এই বলে : لِيُعَذِّبَ اللهُ الْمُنْفِقِينَ وَالْمُنْفِقْت এখানে অব্যয়টি বক্তব্যের কারণ ও উদ্দেশ্য বর্ণনা অর্থে ব্যবহৃত হয়নি; বরং আরবী ব্যাকরণের পরিভাষায় এ ল্যাম-এ-আকেবাত (لام عاقبة) বলা হয়। আয়াতের অর্থ এই যে, পরিণামে আল্লাহ তাআলা মুনাফিক পুরুষ ও মুনাফিক নারীদেরকে এবং মুশরিক পুরুষ ও মুশরিক নারীদেরকে শাস্তি দিবেন। আর মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদেরকে পুরস্কৃত করবেন। প্রত্যেক জন্মগ্রহণকারীর পরিণাম মৃত্যু এবং প্রত্যেক নির্মাণের পরিণাম ধ্বংস।
মানুষ যে আমানতের বোঝা বহন করেছে, এর পরিণামে মানুষ দু দলে বিভক্ত হয়ে যাবে: এক. কাফের ও মুনাফিক ইত্যাদি যারা অবাধ্য হয়ে আমানত নষ্ট করে দেবে তাদেরকে শাস্তি দেয়া হবে। দুই. মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারী। যারা আনুগত্যের মাধ্যমে আমানতের হক আদায় করবে। তাদের সাথে অনুগ্রহ ও ক্ষমাসুন্দর ব্যবহার করা হবে। এভাবে রাব্বুল আলামীনের দেয়া এখতিয়ার বা ইচ্ছাশক্তির ব্যবহার অনুযায়ী আদম সন্তান আল্লাহর সন্তুষ্টি অথবা বিরাগের ভাগী হবে। কে পুরুষ আর কে নারী, এখানে সে তারতম্য মোটেই বিবেচনাযোগ্য নয়।
আলোচ্য আয়াতের মূল ঘোষণা হলো শির্ক ও নিফাক মানুষকে আল্লাহর আযাবের যোগ্য করে, আর ঈমান যোগ্য করে আল্লাহর ক্ষমা ও রহমতের। মানুষটি নারী কি পুরুষ—তা মোটেই বিবেচ্য নয়।
টিকাঃ
তাফহীমুল কুরআন।
মাআরেফুল কুরআন।
📄 মানব সৃষ্টি একজন পুরুষ ও একজন নারী থেকে। মানব মর্যাদার মূলভিত্তি ‘তাকওয়া’
يأَيُّهَا النَّاسُ إِنَّا خَلَقْنَكُمْ مِّنْ ذَكَرٍ وَأُنْثَى وَجَعَلْنَكُمْ شُعُوبًا وَقَبَائِلَ لِتَعَارَفُوا ، إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِنْدَ اللَّهِ أَتْقُكُمْ ، إِنَّ اللَّهَ عَلِيمٌ خَبِيرٌه
"হে মানুষেরা! আমিই তোমাদের সৃষ্টি করেছি একজন পুরুষ ও একজন নারী হতে, আর তোমাদের বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে, যাতে তোমরা পরস্পর পরিচিত হতে পার। তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই আল্লাহর কাছে অধিক মর্যাদাবান, যে তোমাদের মধ্যে অধিক মুত্তাকী। নিশ্চয়ই আল্লাহ সবকিছু জানেন, সমস্ত খবর রাখেন।" -সূরা আল হুজুরাত: ১৩
আলোচ্য আয়াতে সমগ্র মানব জাতিকে সম্বোধন করে মহান আল্লাহ তাদের মূল যে এক ও অভিন্ন সে বিষয়ে এক বাস্তব ও ঐতিহাসিক সত্য ঘোষণা করেছেন। হে মানবজাতি! আমি তোমাদেরকে একজন পুরুষ ও একজন স্ত্রী থেকে সৃষ্টি করেছি; অতপর তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে করে তোমরা পৃথিবীতে পরস্পর পরিচিত হতে পার। জেনে রেখ, তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে তাকওয়াবান ব্যক্তিই সবচেয়ে মর্যাদার অধিকারী।
এর তাৎপর্য হলো, বহু বর্ণে ও জাতিতে বিভক্ত হে মানব সমাজ! তোমাদের মূল এক ও অভিন্ন। বর্ণ, ভাষা, স্বভাব, চরিত্র, প্রতিভা ও যোগ্যতার বিভিন্নতা একটা সৃষ্টিগত বৈচিত্র মাত্র। এ বিভিন্নতা বিবাদ-বিসম্বাদ ও শত্রুতা দাবী করে না, বরং দাবী করে মানব জাতির সকল দায়িত্ব বহনে ও সকল চাহিদা পূরণে পারস্পরিক সহযোগিতা। বর্ণ, বংশ, ভাষা, ভূমি এবং এ ধরনের অন্য সকল উপকরণের কোনো মূল্য আল্লাহর দৃষ্টিতে নেই। আল্লাহর দৃষ্টিতে মানুষের মর্যাদা পরিমাপ করার ও শ্রেষ্ঠত্ব নির্ণয় করার একটি মাত্র মানদণ্ড আছে। আর সেই মানদণ্ড হচ্ছে 'তাকওয়া'।
আলোচ্য আয়াতটিতে সমগ্র মানব জাতিকে সম্বোধন করে এমন এক চরম ভ্রান্তি ও গোমরাহীমূলক বিষয়ে সংশোধন করতে চাওয়া হয়েছে যা গোটা বিশ্বে এক সর্বাত্মক মারাত্মক বিপর্যয় ও চরম অশান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাহলো বংশ, বর্ণ, ভাষা, দেশ ও জাতীয়তার বিদ্বেষ। মানুষ সাধারণত মনুষ্যত্বকে ভুলে গিয়ে নিজেদের চতুষ্পার্শে এমন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পরিবেষ্টনী রচনা করে নিয়েছে যার ভিতরে জন্মগ্রহণকারীকে সে আপন বলে গ্রহণ করেছে আর তার বাইরে জন্মগ্রহণকারীকে ভিন্ন, অপর বা শত্রুরূপে চিহ্নিত করেছে। ইহুদীরা এরই ভিত্তিতে বনী ইসরাঈলকে আল্লাহর পসন্দ করা বিশেষ জাতিরূপে গণ্য করে। হিন্দু সমাজের বর্ণ বিচার এ পার্থক্যবোধের কারণেই গড়ে উঠেছে। উঁচু জাতের লোকদের তুলনায় সমস্ত মানুষকে নীচ ও অপবিত্র বলে ঘোষণা করা হয়েছে। শ্বেতাঙ্গ ও কৃষ্ণাঙ্গের পার্থক্য আফ্রিকায় ও আমেরিকায় কৃষ্ণাঙ্গ লোকদের উপর যে অমানুষিক যুলুম ও নিপীড়ন চালিয়েছে তার মর্মান্তিক কাহিনী তো ইতিহাসের পাতায় খুঁজতে হবে না। পাশ্চাত্যের জাতি-সমূহের হিংস্র জাতীয়তাবাদ এক একটি জাতিকে অন্যান্য জাতিগুলোর জন্য হিংস্র পশুতে পরিণত করেছে।
হে পৃথিবীর মানব জাতি! তোমাদের সকলের-সমস্ত মানুষের মূল ও উৎস এক ও অভিন্ন। একজন পুরুষ ও একজন মহিলা হতেই গোটা মানবজাতি অস্তিত্ব লাভ করেছে। বর্তমানে দুনিয়াতে মানুষের যত বংশ বা গোত্র রয়েছে তা সবই মূলত একটি প্রাথমিক বংশেরই শাখা-প্রশাখা মাত্র। আর এর সূচনা হয়েছিল এক পিতা ও এক মাতা থেকে। মানব সৃষ্টির নিয়াম-পদ্ধতিও সম্পূর্ণ অভিন্ন। তোমরা সকলে একই পিতা-মাতার সন্তান। সকলের দেহে একই পিতা-মাতার শোণিতধারা প্রবাহিত। মানুষের প্রাথমিক যুগল ভিন্ন ভিন্ন ছিল না এবং দুনিয়ার বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন জনতা ভিন্ন ভিন্ন নিয়ম-পদ্ধতিতে জন্মগ্রহণ করেনি।
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন প্রথম মানুষ হযরত আদম আ. থেকে সৃষ্টি করেছেন তাঁর স্ত্রী হাওয়া আ.-কে, আর এ দুজন থেকে সকল বনী আদমকে। মানব জাতির অস্তিত্ব লাভে, তাদের স্থিতি, বৃদ্ধি ও সংরক্ষণে নারী-পুরুষের মাধ্যম আল্লাহর গৃহীত সাধারণ নীতি। আলোচ্য আয়াতে বিশ্ব মানুষের কৃত্রিম সাম্প্রদায়িকতা ও জাতীয়তাসহ সকল প্রকারের সংকীর্ণতার জাল ছিন্ন করে পৃথিবীর সকল মানুষের প্রকৃত সম্পর্ক এবং তাদের শ্রেষ্ঠত্বের বৈশিষ্ট্য আলোচিত হয়েছে অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে। আজকের পৃথিবীতে একটা বিশ্ব-পরিবার গঠন বা বিশ্বায়ণের প্রবক্তা ও অনুরূপ চিন্তা-গবেষণার ধারকদের জন্যে এর চেয়ে উদার ও সার্বজনীন অমোঘ বিধানের নযীর আর কোথায়ও কি আছে?
টিকাঃ
ফী যিলালিল কুরআন।
তাফহীমুল কুরআন।