📘 আল কুরআনে নারী 📄 ইয়াতীম মেয়ে ও ইয়াতীম শিশুদের হক সংরক্ষণে তাকীদ

📄 ইয়াতীম মেয়ে ও ইয়াতীম শিশুদের হক সংরক্ষণে তাকীদ


وَيَسْتَفْتُونَكَ فِي النِّسَاءِ قُلِ اللَّهُ يُفْتِيْكُمْ فِيهِنَّ وَمَا يُتْلَى عَلَيْكُمْ فِي الْكِتَبِ فِي يَتْمَى النِّসَاءِ الَّتِي لَا تُؤْتُونَهُنَّ مَا كُতِبَ لَهُনَّ وَتَرَغَبُونَ أَنْ تَنْكِحُوهُنَّ وَالْمُسْتَضْعَفِينَ مِنَ الْوِلْدَانِ ، وَأَنْ تَقُومُوا لِلْيَتَمَى بِالْقِسْطِ وَمَا تَفْعَلُوا مِنْ خَيْرٍ فَإِنَّ اللَّهَ كَانَ بِهِ عَلِيمًا (النساء : ১২৭)

"লোকেরা তোমাকে বিধান জিজ্ঞেস করছে। বল, আল্লাহ তাদের ইয়াতীম মহিলাদের বিষয়ে বিধান দিচ্ছেন। আর কুরআনে তোমাদের যা যা তিলাওয়াত করে শুনানো হয় ঐসব পিতৃহীনা নারীদের বিধান যাদেরকে তোমরা নির্ধারিত অধিকার দাও না অথচ তাদের বিবাহ করতে আগ্রহ রাখ, আর অক্ষম শিশুদের বিধান। আল্লাহ আরও বিধান দিচ্ছেন যে, তোমরা ইয়াতীমদের প্রতি ইনসাফপূর্ণ ব্যবহার করবে।" -(সূরা আন নিসা : ১২৭)

এ সূরার শুরুতে ইয়াতীম ও নারীদের অধিকার ও হক সম্পর্কে বিশেষ বিধান দিয়ে তা আদায় করার প্রতি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। কারণ, জাহেলী যুগে অনেকে তাদের মীরাস দিতো না, কেউ তাদের মীরাস সূত্রে প্রাপ্ত সম্পদ ও সম্পত্তি বেমালুম হজম করে ফেলতো, আর কেউ কেউ তাদের বিয়ে করে পূর্ণ মোহরানা দিতো না। কুরআনে ইতিপূর্বে এহেন গর্হিত কাজ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল। কিন্তু কতিপয় লোক মনে করতে লাগলো যে, উপরোক্ত নির্দেশ হয়তো কিছুসংখ্যক লোককে সাময়িকভাবে দেয়া হয়েছিল, শেষ পর্যন্ত ঐ বিধান রহিত হয়ে যাবে। অনেকে ইয়াতীম মেয়েদের সম্পর্কিত উক্ত বিধান রহিত হওয়ার অপেক্ষায় দিন গুনতে থাকে। অবশেষে যখন তা রহিত হলো না, তখন তারা পরামর্শ করে স্থির করলো যে, এ বিষয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করা হবে। সে মতে তারা রাসূলের কাছে গিয়ে এ বিষয়ে প্রশ্ন করতে শুরু করলো। ইবনে জারীর ও ইবনুল মুনযিরের বর্ণনা অনুযায়ী এ প্রশ্নই হচ্ছে আয়াতটি নাযিল হওয়ার কারণ।

ইমাম বুখারী (র) বর্ণনা করেছেন, হযরত আয়েশা (রা) বলেন : যেসব ইয়াতীম বালিকা সম্পদের মালিক হলেও সুন্দরী ছিল না, তাদের (গায়র মুহরম) অভিভাবক তাদের রূপহীনতার কারণে তাদের বিবাহ করতে চাইতো না। অথচ তার সম্পদের লোভে অন্যের কাছেও বিবাহ দিতো না। এভাবে তারা অসহায় বালিকার বিবাহ ঠেকিয়ে রাখতো। এ জাতীয় লোকদের সম্পর্কে এ আয়াত নাযিল হয়েছে।

হযরত ইবনে আব্বাস (রা) থেকে আলী ইবনে আবি তালহা এ আয়াতাংশের ব্যাখ্যায় বলেছেন, জাহেলী যুগে কারো অভিভাবকত্বে ইয়াতীম বালিকা থাকলে সে তার গায়ে নিজের কাপড় রেখে দিতো। এরূপ করার কারণে সেই বালিকাকে আর কেউ কখনো বিবাহ করতে পারতো না। বালিকাটি রূপসী হলে সে নিজেই তাকে বিবাহ করতো, আর এভাবেই তার সম্পদ আত্মসাৎ করে নিতো। আর বালিকাটি রূপসী না হলে সে নিজে তো তাকে বিবাহ করতো না, অন্যকেও বিবাহ করার সুযোগ দিতো না। এভাবে সে তার মৃত্যুর পর তার সম্পত্তির উত্তরাধিকার লাভ করতো। এ আয়াতে আল্লাহ তা'আলা ইয়াতীম মেয়েদের প্রতি এরূপ অত্যাচার করতে তাদের নিষেধ করেছেন।

জাহেলী যুগে এভাবে অপ্রাপ্ত বয়স্ক সন্তান ও কন্যা সন্তানকে তাদের উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করা হতো। উপরিউক্ত আয়াতে তাদের প্রতি যুলুম থেকে বিরত থাকার জন্যও বলা হয়েছে।

আয়াতের শেষাংশে আল্লাহ তা'আলা ইয়াতীমদের প্রতি ইনসাফপূর্ণ ব্যবহারের যে নির্দেশ দিয়েছেন, তার তাৎপর্য হযরত সাঈদ ইবনে যুবাইর (রা) এভাবে ব্যাখ্যা করেছেন যে, ইয়াতীম বালিকা রূপসী ও ধনবতী হলে তোমরা যেমন তাদের বিবাহ করতে আগ্রহী হও, তারা রূপহীনা আর নির্ধন হলেও ঠিক তেমনি তাদের বিবাহ করবে।

পৃথিবীতে অনেক সময় মানুষ মারা যায়, আর তাদের ছেলে-মেয়েরা হয়ে পড়ে অভিভাবকহীন অসহায়। দুনিয়ার মানুষ ধন-সম্পদের প্রতি এতই লোভী হয়ে আছে যে, তারা যদি এরূপ পিতা-মাতা হারা কোনো ইয়াতীম সন্তানের অভিভাবক হয়ে থাকে, তবে এসব ইয়াতীমের সম্পদ আত্মসাতে মেতে উঠে। তারা একটুও চিন্তা করে না যে, তার সন্তানদেরও এমনি অবস্থা হতে পারে। পরের সন্তানের অসহায়তার প্রতি তারা দয়াদ্র না হয়ে বরং সুযোগ সন্ধানী মনোভাবাপন্ন হয়ে উঠে। ঈমানদারগণ কখনো এমন পাষণ্ড হতে পারে না। সকল আশ্রয়হীনের আশ্রয় হলেন আল্লাহ তা'আলা; সকল অসহায়ের সহায় হলেন আল্লাহ তা'আলা। কাজেই যে ব্যক্তি ইয়াতীম-অসহায়কে আশ্রয় দিল সে যেন আল্লাহর পক্ষে দায়িত্ব পালন করলো, যেন আল্লাহর কাজে সহযোগিতা করলো।

আয়াতের শেষাংশে আল্লাহ তা'আলা মানুষকে এরূপ ভাল কাজ করতে উদ্বুদ্ধ ও উৎসাহিত করছেন। তোমাদের সমস্ত ভাল কাজ সম্পর্কে আল্লাহ অবহিত আছেন। তিনি তোমাদের সমস্ত সৎকাজের পুরো পুরস্কার দিয়ে দেবেন।

কাজেই নিজের শ্রম, সময় ও অর্থ ব্যয় করে কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় ত্যাগ স্বীকার করা একজন আন্তরিকতা সম্পন্ন ঈমানদারের কাজ। স্বার্থপর লোকেরাই উপস্থিত লাভের সন্ধানে থাকে। আল্লাহতে অগাধ বিশ্বাস স্থাপনকারী ব্যক্তি বৈষয়িক লাভ ক্ষতির দিকে না তাকিয়ে অত্যন্ত ধৈর্য সহকারে কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কাজ করে থাকেন। আল্লাহর পথে ব্যয় করতে, ইয়াতীম ও অসহায়কে অকাতরে দান করতে যদি কোনো মানুষ নাও জানে, তবুও মহান আল্লাহ তো সবকিছু দেখেন ও জানেন। সুতরাং ভাল কাজের সুফল তিনি অবশ্যই দেবেন।

টিকাঃ
(মা'আরেফুল কুরআন), (ইবনে কাসীর)

📘 আল কুরআনে নারী 📄 মীরাসের মাল নারীদের দ্বিগুণ পাবে পুরুষরা

📄 মীরাসের মাল নারীদের দ্বিগুণ পাবে পুরুষরা


وَإِنْ كَانُوا إِخْوَةً رِجَالًا وَنِسَاءً فَلِلذَّكَرِ مِثْلُ حَظِّ الْأُنْثَيَيْنِ يُبَيِّنُ اللَّهُ لَكُمْ أَنْ تَضِلُّوا ، وَاللَّهُ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ (النساء : ১৭৬)

"আর তারা যদি ভাই-বোন উভয় থাকে তবে একজন পুরুষ পাবে দু'জন নারীর অংশের সমান। আল্লাহ তোমাদের জন্য বিষয়টি পরিষ্কার করে বর্ণনা করছেন, যেন তোমরা ভ্রষ্ট হয়ে না যাও। আর আল্লাহ তো সকল বিষয়ে পরিজ্ঞাত।"-(সূরা আন নিসা: ১৭৬)

আলোচ্য আয়াতটি সূরা আন নিসার সর্বশেষ আয়াত। সূরা নিসায় মীরাস সম্পর্কিত আলোচনাই প্রাধান্য পেয়েছে। সর্বশেষ আয়াতটিতে তাই মূল বক্তব্যকে অধিকতর স্মরণীয় করার জন্য মীরাসের একটি মৌলিক নির্দেশিকা বর্ণিত হয়েছে বলে তাফসীরকারগণ মন্তব্য করেছেন।

আয়াতটির প্রথম থেকে 'কালালা'-র মীরাস সম্পর্কিত প্রশ্নের জবাব দেয়া হয়েছে। 'কালালা' বলা হয় এমন মৃত ব্যক্তিকে যার সন্তানাদি ও মাতা-পিতা নেই, কিন্তু বোন অথবা ভাই-বোন উভয়ই রয়েছে। এক বোন থাকলে পাবে মোট সম্পত্তির অর্ধেক। বাকীটা পাবে আসাবারা। 'আসাবা' না থাকলে সবটুকু পাবে বোন। দুই বোন থাকলে পাবে তিন ভাগের দুই ভাগ। বাকীটা পূর্বের ন্যায়। আর যদি মৃত ব্যক্তির বোন ও ভাই থাকে তবে ভাইয়েরা পাবে বোনদের দ্বিগুণ।

কেবল ভাই-বোন উত্তরাধিকারী থাকলে তাদের মীরাসের বিষয়ে বিস্তারিত বর্ণনা দেয়ার পর আল্লাহ তা'আলা মানবজাতির দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন এমনটি অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের প্রতি। আর তা হচ্ছে, সাধারণত মীরাস বণ্টনের ব্যাপারে, বিশেষত নারীদের মীরাস দেয়ার ব্যাপারে যেন কেউ ভ্রষ্ট হয়ে না পড়ে, বিভ্রান্তিতে পড়ে না যায়। কারণ জাহেলিয়াতের যুগে মীরাসের ব্যাপারে বড়ই যুলম করা হতো। যেমনটি হচ্ছে আধুনিক যুগেও। জাহেলী যুগে নারীদের উপর নানাভাবে যুলম করা হতো, ইয়াতীমদের হক নষ্ট করা হতো, বিশেষত ইয়াতীম বালিকাদের হক এবং নারীদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হতো। রাব্বুল আলামীন আল কুরআনে সকলকে তাদের অধিকার দানের বিষয়ে বিস্তারিত নির্দেশনা দিয়েছেন। অবশেষে বিশ্ববাসীকে বিশেষত মু'মিনদের সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন : "আল্লাহ তোমাদের জন্য পরিষ্কার করে বর্ণনা করেছেন যেন তোমরা বিভ্রান্ত না হয়ে যাও।"

মানুষ আল্লাহর বিধানের রহস্য অনুধাবন না করে অনেক সময় নিজ নিজ বদ্ধমূল ধারণার ভিত্তিতে আল্লাহর বিধান নিয়ে বিচার-বিশ্লেষণ করার দুঃসাহস দেখিয়ে থাকে। যেমন উপরিউক্ত আয়াতে "একজন পুরুষ পাবে দু'জন নারীর অংশের সমান"-কথার বাহ্যিক অর্থের পরে ভিত্তি করে তারা বলতে থাকে যে ইসলাম নারীদের ঠকিয়েছে, নারী-পুরুষের অধিকারে বৈষম্য রেখেছে। কিন্তু তারা তো আল্লাহর বিধানের সার্বিক দিকগুলোর প্রতি একটুও দৃষ্টি দিতে না পারার কারণেই হয়তো এমনটি বলে থাকে অথবা চিন্তার বক্রতার কারণে এভাবে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে সমাজে অশান্তির সৃষ্টি করে। প্রথমতঃ তাদের জানা উচিত যে, ইসলামই নারীদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছে, অন্য কোনো ধর্ম বা মতবাদ তা করেনি। দ্বিতীয়তঃ নারীদের বিবাহদান পর্যন্ত তাদের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব থাকে পিতার উপর। বিবাহের পর স্বামীর উপর সমস্ত দায়িত্ব অর্পিত হয়। তৃতীয়তঃ বিবাহের সময় মোহরানার অর্থ পেয়ে গেলে স্ত্রী একটা উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থের মালিকানা লাভ করতে পারে। এতে স্বামীর বিন্দুমাত্র অধিকার থাকে না। স্ত্রী এ অর্থ নিজের মর্জি মাফিক কোনো ব্যবসায়ে বা কোনো উৎপাদনমূলক কাজে বিনিয়োগ করতে পারে। চতুর্থতঃ স্ত্রীর যাবতীয় ভরণ-পোষণ এমনকি প্রসাধনী ব্যয়ও স্বামীকেই বহন করতে হয়। স্ত্রীর যদি কোনো ব্যবসা অথবা চাকুরীও থাকে, তবুও তার খোর-পোষের পুরো দায়িত্ব স্বামীর। পঞ্চমতঃ স্ত্রী তার ভাইয়ের সাথে যে এক অংশ পেয়েছিল, সে সম্পদ তো তার পুরোটাই অব্যয় অক্ষয় থেকে যায়; কিন্তু তার ভাইকে তো নিজের স্ত্রীর দায়-দায়িত্বও বহন করতে হয়। সুতরাং এক ভাই দুই বোনের অংশের সমান মীরাস পাওয়াটা একেবারেই যুক্তিযুক্ত। বাকী আল্লাহর হুকুম-আহকামের রহস্য তিনিই ভাল জানেন। তাঁর সকল হুকুম আন্তরিকতা সহকারে মেনে নেয়া আমাদের কর্তব্য। ব্যষ্টিক দৃষ্টিকোণ থেকে সমালোচনার পথ পরিহার করে সামষ্টিক দৃষ্টিতে পর্যালোচনায় নিরপেক্ষতা রক্ষা করতে পারলে মানুষের চিন্তার বক্রতা কেটে যেতে পারে। আল্লাহ সবাইকে তাওফীক আতা করুন। আমীন।

📘 আল কুরআনে নারী 📄 মুমিনগণ নারী-পুরুষ নির্বিশেষে নেক আমলের ফলে (হায়াতে তাইয়্যেবা) ‘পবিত্র জীবন’ লাভ করতে পারে

📄 মুমিনগণ নারী-পুরুষ নির্বিশেষে নেক আমলের ফলে (হায়াতে তাইয়্যেবা) ‘পবিত্র জীবন’ লাভ করতে পারে


مَنْ عَمِلَ صَالِحًا مِنْ ذَكَرٍ أَوْ أُنْثَى وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَلَنُحْيِيَنَّهُ حَيَوةً طَيِّبَةً ، وَلَنَجْزِيَنَّهُمْ أَجْرَهُمْ بِأَحْسَنِ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ ০

"যে ব্যক্তি নেক আমল করবে—চাই সে পুরুষ হোক বা নারী—সে মুমিন হলে অবশ্যই তাকে দুনিয়াতে ‘হায়াতে তাইয়্যেবা’ (পবিত্র জীবন) দান করবো। আর আখিরাতে তাদের কাজের প্রতিফল দেব উত্তমভাবে, যা তারা আমল করতো।" -সূরা আন নাহল : ৯৭

আলোচ্য আয়াতে সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করা হয়েছে যে, কুরআনের দৃষ্টিতে নারী ও পুরুষের কর্মফল ও সফলতার নিয়ম এক ও অভিন্ন। অর্থাৎ নারী ও পুরুষ নির্বিশেষে নিজ নিজ অবস্থার প্রেক্ষিতে নেক কাজ করে দুনিয়াতে যেমন পবিত্র জীবন লাভে সক্ষম হয়, আখিরাতেও তেমনি নেক আমলসমূহের উত্তম সুফল পেতে থাকবে। এখানে সমস্ত নেক আমল সম্পর্কে একটা সাধারণ নিয়ম বর্ণনা করা হয়েছে। সংক্ষেপে বলা যায়, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে যে কেউ নেক আমলের অভ্যাস করে, আর নেক আমলগুলোও বাহ্যিক দৃষ্টিতেই নয়; বরং প্রকৃতপক্ষেই যদি নেক হয়ে থাকে, তাহলে আল্লাহ তাআলা এমনসব লোকদের দুনিয়ার জীবনে উত্তম ও পবিত্র জীবনযাপন করাবেন।

আয়াতটির তরজমা এভাবেও বুঝতে পারি, যে ব্যক্তি নেক আমল করে অর্থাৎ আল্লাহর বিধান ও রসূলের আদর্শের ভিত্তিতে দুনিয়ার জীবন অতিবাহিত করে, তাকে আল্লাহ তাআলা ‘হায়াতে তাইয়্যেবা’ দান করবেন; সে ব্যক্তি নারী হোক কিংবা পুরুষ।

সূরা আন-নাহলের এ আয়াতটিতে সুস্পষ্ট করে নারী ও পুরুষের জন্য আল্লাহ তাআলার এ ওয়াদা ব্যক্ত করা হয়েছে। এখানে নারী ও পুরুষকে পৃথকভাবে উল্লেখ করার কারণ, সেই যুগে মুসলিম পুরুষ যেভাবে নিজের ঈমান নিয়ে বেঁচে থাকার জন্য কঠোর পরীক্ষার সম্মুখীন হতো, তেমনিভাবে অনেক মহিলাও নিজের ঈমান বাঁচাতে গিয়ে প্রাণপণ লড়াই করতে হতো। কিন্তু মহিলারা অবলা হওয়ার কারণে তাদের পরীক্ষা ছিল পুরুষের পরীক্ষা থেকে কঠোরতর। তাই এখানে পবিত্র কুরআন পুরুষদের সাথে মহিলাদের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করে তাদের সান্ত্বনা ও প্রেরণা যুগিয়েছে। তারা যদি ঈমান ও নেক আমলের সংকল্প করে নেয়, তাহলে আল্লাহ তাআলা অবশ্যই তাদের পবিত্র জীবনযাপন করাবেন। শয়তান তাদেরকে এ নিয়ামত থেকে বঞ্চিত করতে পারবে না। আল্লাহ শয়তানদের সেই সুযোগই দিবেন না।

মুসলিম ও কাফির সমাজের যেসব সংকীর্ণমনা ও সংকীর্ণ দৃষ্টির ধৈর্যহীন লোক অজ্ঞতা ও ভুলবশত মনে করে যে, সততা, বিশ্বস্ততা, আমানতদারী ও পরহেজগারীর নীতি অবলম্বন করলে আখিরাতের জীবনে যত কল্যাণই লাভ হোক না কেন, দুনিয়ায় অবশ্যই বড় ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়—আলোচ্য আয়াতে তাদের সেই ভুল ধারণার নিরসন করা হয়েছে। তাদের জবাব স্বরূপ আল্লাহ তাআলা বলছেন, তোমাদের এহেন খেয়াল মোটেই ঠিক নয়। সঠিক ও নির্ভুল নীতিপন্থা অবলম্বনে কেবল আখিরাতে কল্যাণ লাভ হয় না, দুনিয়াতেও কল্যাণ লাভ হয়ে থাকে। যারা সত্যিকার ঈমানদার, সত্যপন্থী ও সঠিকভাবে কাজ সম্পন্নকারী, তাদের বৈষয়িক জীবনও বেঈমান ও অসত্যপন্থীদের চেয়ে অবশ্যই উত্তম হয়ে থাকে। নির্মল নৈতিক চরিত্রের কারণে তারা যে প্রভাব-প্রতিপত্তি ও সম্মান-মর্যাদা লাভ করে থাকে, অন্য কেউ তা কিছুতেই লাভ করতে পারে না। যে সুস্থতা, শুভ্রতা ও পবিত্রতা লাভ তাদের সৌভাগ্যে হয়ে থাকে, তা থেকে অন্যরা বঞ্চিতই থেকে যায়। কেননা তারা চরম নিকৃষ্ট ও খারাপ আচরণ করে বলে ব্যর্থতা তাদের ভাগ্যলিপি হয়ে থাকে। নেক লোকেরা দরিদ্র হয়েও মনের যে প্রশান্তি লাভ করে থাকে, তাদের অন্তর্জগতে যে ধীরতা স্থিরতা বিরাজ করে, তার শতাংশের একাংশও ফাসেক-ফাজের লোকেরা পেতে পারে না।

আলোচ্য আয়াতে সৎকর্মশীল মুমিন নর-নারীকে আল্লাহ তাআলা 'হায়াতে তাইয়্যেবা' (পবিত্র জীবন বা উন্নত জীবন) দান করার' ওয়াদা করেছেন। কিন্তু 'হায়াতে তাইয়্যেবা' বলতে কি বুঝায়? এ বিষয়ে মুফাস্সিরীনের বিভিন্ন কথা বর্ণিত আছে। হযরত ইবনে আব্বাস রা., সাঈদ ইবনে যুবাইর রা., যাহ্হাক ও আতা বলেন, দুনিয়াতে হালাল রিষ্ক ভাগ্য হওয়া আর আখিরাতে নেক আমলের উত্তম ফল লাভ করার নাম 'হায়াতে তাইয়্যেবা'। হযরত হাসান বসরী ও ওহাব ইবনে মুম্বা বলেন, অল্পে তুষ্ট থেকে জীবনযাপন করা হায়াতে তাইয়্যেবা। কারণ, কোটিপতি হলেও যদি অন্তরে তৃপ্তি না থাকে বরং আরও বেশী পেতে মন অস্থির থাকে, তাহলে কোনো নিয়ামতের তৃপ্তিই পাওয়া যায় না। ইমাম জাফর সাদেক রহ. বলেন, আল্লাহর হুকুম মেনে জীবনযাপন করাটাই হায়াতে তাইয়্যেবা। আবু বকর ওররাক রহ. বলেন, আল্লাহর আনুগত্যে সাহায্য পাওয়া হায়াতে তাইয়্যেবা। সহল তসতরী বলেন, নিজের সমস্ত চেষ্টা-তদবীর আল্লাহর উপর ছেড়ে দিয়ে নিশ্চিত জীবনযাপন হায়াতে তাইয়্যেবা। হযরত মাওলানা আবদুল হক দেহলভী রহ.-এর মতে দুনিয়ার জীবন সুস্থ ও সুনামের সাথে অতিবাহিত করা, আল্লাহর সন্তুষ্টি ও আখিরাতের পাথেয় উপার্জন করে সাথে নেয়া এবং মৃত্যুর সময় সুনাম ও সুকর্ম রেখে যাওয়ার নাম 'হায়াতে তাইয়্যেবা।

কেউ কেউ বলেন, কাফির ও শত্রুদের থেকে নিরাপদ থাকা, মান-সম্ভ্রম নিয়ে জীবন যাপন করা, কাফির ও শত্রুদের দ্বারা শাসিত হয়ে জীবনযাপন না করা 'হায়াতে তাইয়্যেবা'। তাছাড়া সাহাবায়ে কিরাম যেহেতু ইসলামের প্রথম পর্যায়ে খুব দৈন্যাবস্থায় ছিলেন, তাই তাঁদেরকে উন্নত জীবনের ওয়াদা করা হয়েছে যা অতিসত্বর পূরণ হয়েছিল। আগেকার সেসব বিত্তহীন দরিদ্র ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হওয়ার যুগ পর্যন্ত থাকায় অতিসত্বর সুবজ-শ্যামল রাজ্যের রাজা ও ন্যায়বিচারক হয়ে গেলেন। শেষ পর্যন্ত পৃথিবীতে আরবদের জাতীয় মর্যাদা প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল।

সংখ্যাগরিষ্ঠ তাফসীরবিদগণের মতে এখানে হায়াতে তাইয়্যেবা বলে দুনিয়ার পবিত্র ও আনন্দময় জীবন বুঝানো হয়েছে। অবশ্য এর অর্থ এ নয় যে, যাকে 'হায়াতে তাইয়্যেবা' দেয়া হবে সে কখনো অনাহার-উপবাস ও অসুখ-বিসুখের সম্মুখীন হবে না। বরং এর অর্থ এই যে, মুমিন ব্যক্তি কোনো সময় আর্থিক অভাব-অনটন কিংবা কষ্টে পতিত হলেও দুটি বিষয় তাকে উদ্বিগ্ন হতে দেয় না। এক. অল্পে তুষ্ট ও অনাড়ম্বর জীবনযাপনের অভ্যাস -যা দারিদ্রের মাঝেও কেটে যায়। দুই. তার এ বিশ্বাস যে দুনিয়ার অভাব-অনটন ও অসুস্থতার বিনিময়ে আখিরাতে সুমহান চিরস্থায়ী নিয়ামত পাওয়া যাবে। কাফির ও পাপিষ্ট ব্যক্তির অবস্থা এর বিপরীত। সে অভাব-অনটন ও দুরবস্থায় পতিত হলে তার সান্ত্বনার কোনো ব্যবস্থা নেই। ফলে সে কাণ্ডজ্ঞান হারিয়ে ফেলে। কখনো কখনো আত্মহত্যা করে বসে। আর সে যদি স্বচ্ছল ব্যক্তি হয় তবে আরও পাওয়ার লোভ তাকে শান্তিতে থাকতে দেয় না। কারণ সে কোটিপতি হয়ে থাকলেও আরও অধিক পাওয়ার জন্য জীবনটাকে বিড়ম্বনাময় করে তোলে।

'পবিত্র জীবন' মানে দুনিয়ার জীবনে হালাল রুযী অল্পে তুষ্ট, অন্তরের প্রশান্তি, ধীরতা-স্থীরতা, আল্লাহর যিকিরের স্বাদ ও তৃপ্তি, আল্লাহ প্রেমের স্বাদ, ফরয কাজ ও ইবাদাতে মনের সন্তুষ্টি, পরবর্তী জীবনে সফলতা লাভের আশা, আল্লাহর সাথে সম্পর্কের মাধুর্য ইত্যাদি। যা হোক, অল্পে তুষ্ট মুমিনের পবিত্র ও তৃপ্তিময় জীবনের শুরু হয়, আর কবরে গিয়ে এর রং আরও ফুটে উঠে। শেষ পর্যন্ত এ 'হায়াতে তাইয়্যেবা' এমন পর্যায়ে উপনীত হয় যে সম্পর্কে বলা হয়েছে:
حَيَاةُ بِلا مَوْتِ وَغِنِّى بِلا فَقْرٍ وَصِحَّةُ بِلَا سُقْمٍ وَمُلْكُ بِلَا هَلْكٍ وَسَعَادَةُ - بِلا شَقَاوَةٍ
"মৃত্যুহীন জীবন, অভাবশূন্য ধন, নিঃরোগ স্বাস্থ্য, চিরস্থায়ী রাজ্য, অশেষ সৌভাগ্য।”

পরম করুণাময় আল্লাহ তাআলা আমাদের হায়াতে তাইয়্যেবা নসীব করুন। আমরা মাওলায়ে কারীম রাহমানুর রাহীমের দরবারে এ মুনাজাত করি:
هر قسم کی مرض سے تو دے شفا اور حیات طیبه تو کرعطا اپنی رحمت هم پراب مبذول کر به مناجات اور دعا مقبول کر
"তুমি আমাদের সকল প্রকার রোগ (বাহ্যিক ও আভ্যন্তরীণ, দৈহিক ও মানসিক) থেকে আরোগ্য দান করো। আর 'হায়াতে তাইয়্যেবা' নসীব করো। তোমার রহমত আমাদের উপর বর্ষিত করো। এ দুআ-মুনাজাত কবুল করো।"

টিকাঃ
শায়খুল ইসলাম মাওলানা শাব্বীর আহমদ উসমানী।
মাওলানা আমীন আহসান ইসলাহী: তাদাব্বুরে কুরআন।
সাইয়েদ আবুল আ'লা মওদূদী-তাফহীমুল কুরআন।
হযরত মাওলানা আবদুল হক দেহলভী: তাফসীরে হাক্কানী।
মাআরেফুল কুরআন: মুফতী শফী র।

📘 আল কুরআনে নারী 📄 মুহাম্মদ স.-এর স্ত্রীগণ মুমিনদের মাতা হওয়ার তাৎপর্য

📄 মুহাম্মদ স.-এর স্ত্রীগণ মুমিনদের মাতা হওয়ার তাৎপর্য


النَّبِيُّ أَوْلَى بِالْمُؤْمِنِينَ مِنْ أَنْفُسِهِمْ وَأَزْوَاجُهُ أُمَّهُتُهُمْ -

"নবী মুহাম্মদ স. মুমিনদের জন্য তাদের নিজের চেয়ে ঘনিষ্টতর আর তাঁর স্ত্রীগণ তাদের মাতা।"-সূরা আল আহযাব: ৬

এ হচ্ছে সূরা আল আহযাবের ষষ্ঠ আয়াতের অংশ বিশেষ। সাইয়্যেদুল মুরসালীন খাতামুন নাবীয়্যীন মুহাম্মাদুর রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে মুমিনগণের সম্পর্ক কি ধরনের এবং তিনিই বা মুমিনগণের জন্য কতটুকু কল্যাণকামী ও হিতাকাংখী-এখানে মুমিনগণের দুনিয়ার জীবনে অনুসরণীয় সেই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি অতি সংক্ষেপে তুলে ধরা হয়েছে। এখানে আলোচিত দুটো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের একটি হলো, নবী করীম স. মুমিনদের জন্য তাদের নিজেদের চেয়ে অধিক কল্যাণকামী। অর্থাৎ মানবজাতির প্রত্যেক ব্যক্তিই তো দুনিয়ার সবকিছুর উর্ধে নিজের স্বার্থকেই বেশী করে দেখে থাকে। মুমিনগণও স্বাভাবিকভাবেই নিজের কল্যাণকে অন্যসব কিছুর চেয়ে অধিক গুরুত্ব দিয়ে থাকে। এদিক থেকে মুমিনদের সাথে নবীর সম্পর্ক অতি আশ্চর্যজনকভাবে ব্যতিক্রমধর্মী। কারণ, একজন মুমিন স্বাভাবিকভাবে তার নিজের জন্য যতটুকু কল্যাণকামী, নবী করীম স. সেই মুমিনের জন্য তার চেয়ে অধিক কল্যাণকামী।

মুসলমানদের সাথে নবী করীম স.-এর এবং নবী করীম স.-এর সাথে মুসলমানদের যে সম্পর্ক-তা সকল প্রকার মানবীয় সম্পর্কের ঊর্ধে একটা ভিন্ন ধরনের সম্পর্ক। নবী করীম স. এবং ঈমানদারদের মধ্যকার সম্পর্ক ও আত্মীয়তার সাথে দুনিয়ার অপর কোনো আত্মীয়তা বা সম্পর্কের কোনো তুলনা হতে পারে না। নবী করীম স. মুসলমানদের জন্য তাদের মাতা-পিতা অপেক্ষাও অধিক বাৎসল্যপূর্ণ ও দয়ার্দ্র এবং তিনি তাদের জন্য তাদের নিজেদের চেয়েও অধিক কল্যাণকামী। তাদের পিতা-মাতা ও তাদের সন্তান তাদের ক্ষতি করতে পারে, তাদের সাথে ওরা স্বার্থপরতার আচরণ করতে পারে, ওরা তাদেরকে গোমরাহ করতে পারে, ওরা তাদের দিয়ে ভুল কাজ করাতে পারে, ওরা তাদেরকে জাহান্নামের দিকে ঠেলে দিতে পারে। কিন্তু নবী করীম স. তো তাদের কেবল তাই করেন যাতে তাদের প্রকৃত কল্যাণ নিহিত। তাছাড়া তারা অজ্ঞতার কারণে নিজেদের পায়ে কুঠার চালাতে পারে, নির্বুদ্ধিতার কারণে নিজেদের হাতেই নিজেদের ক্ষতি করতে পারে অথচ নবী করীম স. তাদের জন্য কেবল সেই ব্যবস্থাই গ্রহণ করবেন যাতে সত্যই তাদের কল্যাণ হতে পারে। প্রকৃত অবস্থা যখন এমনি ধরনের, তখন মুসলমানদের উপর নবী করীম স.-এরও এ অধিকার রয়েছে যে, তারা তাঁকে নিজের পিতা-মাতা, সন্তান-সন্ততি এমনকি নিজেদের প্রাণ অপেক্ষাও অধিক ভালবাসবে। দুনিয়ার সবকিছুর তুলনায় তাঁর প্রতি সর্বাধিক ভালবাসা ও দরদ অনুভব করবে। নিজের মতের চেয়ে তাঁর মতকে এবং নিজের সিদ্ধান্তের উপর তাঁর সিদ্ধান্তকে অগ্রাধিকার দিবে, তাঁর প্রত্যেকটি নির্দেশের সামনে মাথানত করে দিবে।

নবী করীম স. একথাটি বলেছেন সেই হাদীসে যা বুখারী, মুসলিম ও অন্যান্য হাদীস গ্রন্থে সামান্য শাব্দিক পার্থক্য সহকারে উদ্ধৃত হয়েছে। হাদীসটি হলো: لَايُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى أَكُونَ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِنْ وَالِدِهِ وَوَلَدِهِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ "তোমাদের কেউই মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ আমি তার কাছে তার মাতা-পিতা, সন্তান ও সমস্ত মানুষ অপেক্ষা অধিক প্রিয় না হবো।"

আয়াতে আলোচিত দ্বিতীয় বিষয়টি হলো, "নবী করীম স.-এর স্ত্রীগণ মুমিনগণের মাতা।” নবী করীম স.-এর একটি বিশেষত্ব এই যে, মুসলমানদের মুখ-ডাকা মা কোনো দিক দিয়েই মা না হলেও রসূলুল্লাহ স.-এর স্ত্রীগণ তাদের জন্য ঠিক আপন মায়ের মতই হারাম। এ বিশেষ ব্যবস্থা দুনিয়ার মানুষের মধ্যে কেবলমাত্র নবী করীম স.-এর ব্যাপারেই গ্রহণ করা হয়েছে, অপর কারও এ বৈশিষ্ট্য নেই।

এখানে একথাও বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য যে, হযরতের স্ত্রীগণের মুসলমানদের মা হওয়ার অর্থ এই যে, তাদেরকে ঠিক আপন মায়ের মত সম্মান-শ্রদ্ধা মুসলমানদের জন্য ওয়াজিব, তাঁদের সাথে কোনো মুসলমানের বিবাহ সম্পর্ক স্থাপিত হতে পারে না। কিন্তু অন্যান্য কোনো ব্যাপারেই তাঁরা আপন মায়ের মত নন। যেমন, তাদের আপন আত্মীয় ছাড়া অন্যসব মুসলমানই তাঁদের জন্য গায়রে মুহরিম; তাঁদের সাথে পর্দা করা ওয়াজিব ছিল, তাঁদের কন্যা সন্তানগণ মুসলমানদের আপন বোন ছিলেন না— যাদের বিবাহ করা মুসলমানদের জন্য নিষিদ্ধ ছিল না; তাঁদের ভাইবোন মুসলমানদের মামা-খালার মত ছিলেন না এবং আপন মায়ের সম্পত্তি থেকে যেমন মীরাসের অংশ পাওয়া যায়, তাঁদের মীরাস থেকে তা পাওয়া যেত না।

উপরোক্ত আয়াতাংশের শেষে হযরত ইবনে মাসউদের কেরাতে আরও একটি বাক্যাংশ অতিরিক্ত যোগ করা হয়েছে। তাতে আছে: وَأَزْوَاجَةٌ أُمَّهُتُمْ وَهُوَ أَبٌ لَّهمْ - "তাঁর স্ত্রীগণ মুমিনদের মাতা আর তিনি তাদের (ধর্মীয়/রূহানী) পিতা।" মুজাহিদ বলেন, প্রত্যেক নবীই উম্মতের পিতা; আর এজন্যেই সকল উম্মত পরস্পর ভাই ভাই। অর্থাৎ সমস্ত ঈমানদার একই রূহানী পিতার (নবীর) সন্তান।

অন্যত্র আল্লাহ যা বলেছেন : مَا كَانَ مُحَمَّدٌ أَبَا أَحَدٍ مِنْ رِجَالِكُمْ - মুহাম্মদ স. তোমাদের কোনো পুরুষের পিতা নন-তা পূর্বের বাক্যাংশ وَهُوَ أَبْ لَهُمْ (তিনি তাদের পিতা) কথাটির সাথে সাংঘর্ষিক নয়। কারণ এখানে পিতা হওয়া আর নবীর স্ত্রীগণ মাতা হওয়ার অর্থ রূহানী মাতা-পিতা-বংশীয় মাতা-পিতা নয়। আর এ আয়াতে তোমাদের কোনো পুরুষের পিতা নয় বলে বংশীয় পিতা না হওয়ার কথা বলা হয়েছে। আর একথা তো সবারই জানা যে, পিতা বলতে সাধারণত বংশীয় পিতা বা দৈহিক পিতাকেই বুঝানো হয়ে থাকে।

আয়াতে وَأَزْوَاجُةٌ أَمَّهُتُهُمْ (আর নবীর স্ত্রীগণ মুসলমানদের মাতা) বলার অর্থ যেভাবে প্রত্যেক মুসলমানদের জন্য মায়ের সম্মান ও আদব রক্ষা করা ওয়াজিব তেমনি নবীর স্ত্রীগণের প্রতি আদব-সম্মান প্রদর্শন ওয়াজিব এবং মায়ের সাথে বিবাহ যেমন হারাম, তেমনি নবী পত্নীদের সাথেও হারাম। কিন্তু নবী পত্নীগণের কন্যাগণ এ হুকুমের মধ্যে শামিল নন। তাদের সাথে তো মুসলমানদের বিবাহ জায়েয। এ আয়াতাংশে পুণ্যবতী নবী পত্নীগণকে উম্মতে মুসলিমার মা বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। এর অর্থ ভক্তি শ্রদ্ধা ইত্যাদির ক্ষেত্রে তাঁরা মায়ের অন্তর্ভুক্ত, মা-ছেলের সম্পর্ক সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন আহকাম- যথা পরস্পর বিয়ে-শাদী হারাম হওয়া। কিন্তু মুহরিম হওয়ার প্রেক্ষিতে পরস্পর পর্দা না করা এবং মীরাসের অংশীদার হওয়া প্রভৃতি ক্ষেত্রে একথা প্রযোজ্য নয়।

টিকাঃ
তাফহীমুল কুরআন।
বুখারী।
তাফসীরে হাক্কানী।
মাআরেফুল কুরআন।

ফন্ট সাইজ
15px
17px