📄 পুরুষ পাবে তার অর্জিত অংশ আর নারী পাবে তার অর্জিত অংশ
وَلا تَتَمَنَّوْا مَا فَضَّلَ اللهُ بِهِ بَعْضَكُمْ عَلَى بَعْضٍ لِلرِّজَالِ نَصِيبٌ مِّمَّا اكْتَسَبُوا ، وَلِلنِّسَاءِ نَصِيبٌ مِّمَّا اكْتَسَبْنَ ، وَاسْتَلُوا اللَّهَ مِنْ فَضْلِهِ ، إِنَّ اللهَ كَانَ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمًا (النساء : ৩২)
“তোমরা এমন বিষয়ে আকাঙ্ক্ষা করো না যাতে আল্লাহ তা'আলা তোমাদের একের উপর অপরের শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন। পুরুষরা যা অর্জন করে সেটা তাদের অংশ, আর নারীরা যা অর্জন করে সেটা তাদের অংশ। আর আল্লাহর কাছে তাঁর অনুগ্রহ প্রার্থনা কর। নিসন্দেহে আল্লাহ সর্ব বিষয়ে সম্যক জ্ঞাত।"-(সূরা আন নিসাঃ ৩২)
উপরোক্ত আয়াতে আল্লাহ তা'আলা নারী-পুরুষকে এমন সব বিষয়ের আকাঙ্ক্ষা করতে নিষেধ করেছেন। যেসব বিষয়ে আল্লাহ নিজেই কাউকে দান করেছেন যেমন কারো পুরুষ হয়ে জন্ম হওয়া, কারো ধনী হওয়া, কারো সৈয়দ বংশে জন্ম হওয়া, কারো সুন্দর স্বাস্থ্যবান হওয়া-ইত্যাদি। এসব বিষয়ই মানুষের আয়ত্বের বাইরে আল্লাহর বিশেষ ইচ্ছায় এরূপ হয়ে থাকে।
আলোচ্য আয়াত নাযিল হওয়া প্রসংগে বর্ণিত আছে যে, একবার হযরত উম্মে সালমা (রা) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট প্রশ্ন উত্থাপন করেছিলেন যে, আমাদের নারীদের জন্য ওয়ারিশী সম্পত্তিতে পুরুষদের অর্ধেক নির্ধারিত হয়েছে। এমনি ধরনের আরো কতিপয় বিষয়ে নারীদের বেলায় বৈষম্য করা হলো কেন? তাঁর প্রশ্ন করার উদ্দেশ্য আপত্তি উত্থাপন নয় বরং এ আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করা, "আমরাও যদি পুরুষ হতাম তবে তাদের মত আমাদের প্রাধান্য থাকত।" কোনো কোনো মহিলা আক্ষেপ করেছিলেন আমরাও পুরুষ হলে জিহাদে অংশগ্রহণ করে অধিক মর্যাদা লাভ করতে পারতাম। তাছাড়া জনৈক স্ত্রীলোক একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে প্রশ্ন করেছিলেন, আমরা ওয়ারিশী স্বত্বের অর্ধেক পাই, সাক্ষীর বেলায়ও আমরা দু'জন নারী একজন পুরুষের সমান গণ্য হই। তাহলে কি আমরা আমাদের ইবাদাতের ফলও অর্ধেক পাব? এসব প্রশ্নের জবাবে উপরের দুটো আয়াত নাযিল হয়েছে।
হযরত উম্মে সালমা (রা)-এর প্রশ্নের জবাবে বলা হয়েছে যে আল্লাহ বিশেষ হিকমতের কারণে কারো উপর কারো মর্যাদা দিয়েছেন, সে জন্য তোমরা অযথা মনক্ষুণ্ণ হয়ো না। এটা আল্লাহর সৃষ্টি কৌশল। এর রহস্য তিনি ছাড়া আর কেউ জানে না। এগুলো তো মানুষের আয়ত্বাধীন বিষয় নয়। সুতরাং এ জাতীয় বিষয়ে সন্তুষ্ট থাকা ও আল্লাহর শোকর করাই বাঞ্ছনীয়।
পুরুষরা তাদেরকে আল্লাহ পুরুষ বানানোর কারণে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করবে তেমনি নারীগণও তাদের নারী বানানোর কারণে আল্লাহর উপর রাজী থাকবে। অন্যথা উপরোক্ত অর্থহীন আকাঙ্ক্ষা পোষণ করে মানসিক যন্ত্রণা ছাড়া আর কোনো লাভ নেই। অবশ্য মানুষের আয়ত্বাধীন যেসব বিষয় রয়েছে সেসব বিষয়ে চেষ্টা-সাধনা ও প্রতিযোগিতা করলেই সাফল্য লাভের আশা করা যেতে পারে। পরবর্তীতে বলা হয়েছে পুরুষ যা অর্জন করে তা তার অংশ, আর নারী যা অর্জন করে তা তার অংশ। অর্থাৎ পুরুষগণ যাকিছু চেষ্টা-সাধনা করে অর্জন করবে তারা তার অংশ পাবে। আর নারীরা যাকিছু অর্জন করবে তার অংশ পাবে তারা।
এখানে ইংগিত করা হয়েছে যে, গুণ-বৈশিষ্ট্য ও কর্মদক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করার চেষ্টা ব্যর্থ হবে না। প্রত্যেকেই তার প্রচেষ্টার ফল অবশ্যই লাভ করবে। নর-নারীর কোনো বিশেষ পার্থক্য এ ক্ষেত্রে মোটেই থাকবে না। আয়াত থেকে আরও শিক্ষণীয় যে, অপরের জ্ঞান-গরিমা ও চারিত্রিক গুণ-বৈশিষ্ট্য দেখে সেরূপ গুণ-বৈশিষ্ট্যের আকাঙ্ক্ষা করা বাঞ্ছনীয় ও প্রশংসনীয়। আয়াত থেকে সুস্পষ্টভাবে জানা যায় যে, কোনো চেষ্টাকারীর চেষ্টাই বৃথা যাবে না। স্ত্রী-পুরুষ নির্বিশেষে প্রত্যেকেই নিজ নিজ চেষ্টা ও আমলের ফল পাবে।
"আর আল্লাহর কাছে তাঁর অনুগ্রহ প্রার্থনা কর।” এ বলে নির্দেশ দেয়া হয়েছে যে, তোমরা যদি অন্যকে কোনো বিষয়ে তোমাদের চেয়ে সমৃদ্ধ দেখতে পাও, তবে তার সেটুকু কেড়ে নেয়ার অনর্থক চেষ্টা করার পরিবর্তে তুমি নিজের জন্য আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহের প্রার্থনা করতে থাক। কেননা আল্লাহর অনুগ্রহ প্রত্যেকের ক্ষেত্রেই বিশেষভাবে বর্ষিত হতে থাকে। কারো প্রতি সেই অনুগ্রহ দেখা দেয় ধন-সম্পদের আকারে আর কারো প্রতি দেখা দেয় দারিদ্র আকারে। কেননা তা না হলে প্রথম ব্যক্তি হয়তো ঈমান হারা হয়ে পড়তো, আর দ্বিতীয় ব্যক্তি জড়িয়ে পড়তো নানা প্রকার গুনাহর কাজে। কার জন্য কোন্ বস্তু বা কোন্ অবস্থান উপকারী বা কল্যাণকর, তা একমাত্র সর্বজ্ঞ আল্লাহ তা'আলাই ভালভাবে জানেন এবং তিনি সেভাবেই মানুষের জন্য তাঁর অনুগ্রহের দরযা খুলে দেন। মানুষের মধ্যে কাউকে পুরুষ রূপে সৃষ্টি করা কাউকেও নারী রূপে সৃষ্টি করা তাঁর হিকমতের বহিঃপ্রকাশ মাত্র।
📄 ঈমান ও আমলের পুরস্কার প্রাপ্তিতে নারী-পুরুষের কোনো পার্থক্য নেই
وَمَنْ يَعْمَلْ مِنَ الصَّلِحَتِ مِنْ ذَكَرٍ أَوْ أُنثَى وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَأُولَئِكَ يَدْخُلُونَ الْجَنَّةَ وَلَا يُظْلَمُونَ نَقِيرًا (النساء : ১২৪)
“যে ব্যক্তি কোনো সৎকাজ করে সে পুরুষ হোক বা নারী হোক, সে ঈমানদার হয়ে থাকলে, এরূপ লোকেরাই জান্নাতে প্রবেশ করবে; তাদের প্রতি তিল পরিমাণও যুল্ম করা হবে না।" -(সূরা আন নিসা : ১২৪)
যে ব্যক্তি যথাযথভাবে ঈমান রাখে আর কুরআন নির্দেশিত পথে থেকে দুনিয়ার জীবন অতিবাহিত করে, সে জান্নাত লাভ করবে। তার ঈমান ও আমলের প্রতিদান প্রদানে তিল পরিমাণও যুল্ম করা হবে না। চাই সে ব্যক্তি পুরুষ হোক অথবা হোক মহিলা। সে কুরআন ছাড়া অন্য কোনো আসমানী কিতাবের আহল হলেও। অর্থাৎ যে যাই থাকুক না কেন যদি সে শেষ নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর ঈমান রাখে আর ঈমান রাখে যাবতীয় বিশ্বাস্য বিষয়ের প্রতি এবং আমল করে তদানুযায়ী। তবে তো সে হলো মুসলিম, আর তার ঈমানের ও আমলের পুরস্কারও সে পাবে পুরোপুরি। পূর্বে অন্য কিতাবধারী বা ধর্মাবলম্বী হওয়ার কারণে অথবা বর্তমানে নর বা নারী হওয়ার কারণে কারো ঈমান ও আমলের পুরস্কারে কোনো প্রকার তারতম্য করা হবে না। দুনিয়ার নিযাম বা শৃংখলা রক্ষার জন্য মানুষ নারী- পুরুষে বিভক্ত হলেও ঈমান ও আমলের ক্ষেত্রে তাদের মধ্যে কোনো প্রকার পার্থক্য করা হবে না।
মানুষ নারী ও পুরুষ হওয়ার কারণে দৈহিক-মানসিক শক্তিতেও তারতম্যের অধিকারী হয়েছে। প্রকৃতিগতভাবেই নর-নারীর এ পার্থক্য রয়েছে, আর সেভাবেই তাদের মধ্যে ইসলামী জীবন বিধানে দায়িত্ব বণ্টন ও কর্তব্য কাজের সীমারেখা সূচিত হয়েছে। মূলত এ তারতম্য তাদের কাউকেও অধিক সম্মানী আর কাউকেও স্বল্প সম্মানী হওয়ার ব্যাপারে পার্থক্য নিরূপণ করে না।
সূরা আল আহযাবের ৩৫ নম্বর আয়াতে ইরশাদ হচ্ছে:
"নিশ্চয় মুসলমান পুরুষ, মুসলমান নারী, ঈমানদার পুরুষ, ঈমানদার নারী, অনুগত পুরুষ, অনুগত নারী, সত্যবাদী পুরুষ, সত্যবাদী নারী, ধৈর্যশীল পুরুষ, ধৈর্যশীল নারী, বিনীত পুরুষ, বিনীত নারী, দানশীল পুরুষ, দানশীল নারী, রোযা পালনকারী পুরুষ, রোযা পালনকারী নারী, যৌনাঙ্গ হেফাজতকারী পুরুষ, যৌনাঙ্গ হেফাজতকারী নারী, আল্লাহর অধিক যিকরকারী পুরুষ যিকরকারী নারী-এদের জন্য আল্লাহ প্রস্তুত রেখেছেন ক্ষমা ও মহা পুরস্কার।"-(সূরা আল আহযাব: ৩৫)
কুরআন শরীফের যাবতীয় আহকাম নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্য প্রযোজ্য হলেও বিভিন্ন আয়াতে মানুষকে সম্বোধন করা হয়েছে পুরুষ বাচক শব্দ দিয়ে, আর নারীকে ধরা হয়েছে পুরুষ বাচক শব্দেরই মাধ্যমে। মুফতী মুহাম্মদ শফী (র)-এর মতে এতে এ ইঙ্গিত রয়েছে যে, নারীদের সকল বিষয় থাকবে গোপনীয়, আর এর মধ্যেই তাদের প্রকৃত মর্যাদা নিহিত রয়েছে। কুরআনুল কারীমে দেখা যায় যে, হযরত মারইয়াম ছাড়া অন্য কোনো মহিলার নাম কুরআনে উল্লেখ করা হয়নি। যেখানে কোনো নারী বিশেষের কথা এসেছে সেখানে সংশ্লিষ্ট পুরুষের সাথে সম্পর্ক সূচক শব্দে তাদের উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন ফিরাউন পত্নী ও নূহ পত্নী ইত্যাদি। হযরত মারইয়াম (আ)-এর নাম উল্লেখের কারণও ছিল এই যে, হযরত ঈসা (আ)-এর পিতা না থাকায় মাতার নামের সাথে তাঁর সম্পর্ক স্থাপন করার কোনো বিকল্প ছিল না।
কুরআনুল কারীমের এ প্রকাশভংগী যদিও এক বিশেষ প্রজ্ঞা, যৌক্তিকতা ও মঙ্গলের ভিত্তিতেই অনুসৃত হয়েছিল, তবুও আল্লাহর গোপন রহস্য মানুষের বোধগম্যের বাইরে বিধায় এ কারণে নারীগণের মধ্যে হীনমন্যতার উদ্রেক হওয়া ছিল একান্ত স্বাভাবিক ব্যাপার। তাই হাদীসের বিভিন্ন রেওয়ায়াত মতে নারীগণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খেদমতে আরয করলো যে, আল্লাহ পাক কুরআনে মানুষকে সম্বোধন করতে গিয়ে কেবল পুরুষ বাচক শব্দ ব্যবহার করেছেন। এতে বুঝা যায় আমাদের (নারীদের) মধ্যে কোনো কল্যাণ বা পুণ্য নেই-আর সে জন্য আমাদের ইবাদাতও কবুল হয় না। ইমাম বাগবীর রেওয়ায়াত অনুযায়ী প্রশ্নটি উত্থাপিত হয়েছিল পুণ্যবতী নারীগণের পক্ষ থেকে। তিরমিযি শরীফে হযরত উম্মে আম্মারা থেকে, কোনো কোনো বর্ণনা মতে হযরত আসমা বিনতে উমায়েস থেকেও এ ধরনের প্রশ্ন উত্থাপনের কথা বর্ণিত আছে। জবাবে সূরা আহযাবের ৩৫নং আয়াত নাযিল হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আয়াতে ঘোষণা করা হয়েছে যে, যেসব ঈমানদার লোক ভাল কাজ করবে তাদের জন্য আল্লাহ পাক ক্ষমা ও মহা প্রতিদান প্রস্তুত রেখেছেন। পুরুষ বা নারী হওয়ার কারণে কোনো মানুষের ঈমান ও আমলের ফলাফলের মধ্যে কোনো প্রকার তারতম্য বা বেশকম করা হবে না। আল্লাহ তা'আলাই সর্বাধিক জ্ঞাত।
দুনিয়াতে মীরাস বণ্টনে কিছুটা পার্থক্য থাকার দায়িত্ব ও দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রের ব্যাপারে তারতম্য থাকা ইত্যাদি সর্বজ্ঞ ও মহাকৌশলী রাব্বুল আলামীনের সেই হেকমতেরই অন্তর্ভুক্ত-যে কারণে তিনি নারী-পুরুষকে গঠন প্রকৃতিতেও পার্থক্য করেছেন। নারীগণ দৈহিক গঠনে যেমন পুরুষের চেয়ে ভিন্ন রকমের, তেমনি তারা মন-মানসিকতার ব্যাপারেও স্বতন্ত্র ধরনের। নারী হওয়ার কারণে পুরুষদের থেকে তাদের যে দৈহিক পার্থক্য রয়েছে, তাছাড়াও প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গেও রয়েছে বিরাট পার্থক্য। শরীরতত্ত্ববিদদের দৃষ্টিতে নারী-পুরুষের যেসব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বাহ্যত একই রকম মনে হয়; প্রকৃতপক্ষে সেসব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গেও নারীরা পুরুষদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। বস্তুত এসব কিছু দুনিয়ার নিযাম ও শৃংখলা বিধানের জন্যই এভাবে সৃষ্টি করা হয়েছে। তাই বলে সে কারণে নর ও নারীর ঈমান-আমল তথা বিশ্বাস ও কর্ম ফলের ব্যাপারে কোনোই পার্থক্য করা হবে না। নর বা নারী হওয়ার কারণে কারো কর্মফলে তিল পরিমাণও পার্থক্য করা হবে না।
📄 ইয়াতীম মেয়ে ও ইয়াতীম শিশুদের হক সংরক্ষণে তাকীদ
وَيَسْتَفْتُونَكَ فِي النِّسَاءِ قُلِ اللَّهُ يُفْتِيْكُمْ فِيهِنَّ وَمَا يُتْلَى عَلَيْكُمْ فِي الْكِتَبِ فِي يَتْمَى النِّসَاءِ الَّتِي لَا تُؤْتُونَهُنَّ مَا كُতِبَ لَهُনَّ وَتَرَغَبُونَ أَنْ تَنْكِحُوهُنَّ وَالْمُسْتَضْعَفِينَ مِنَ الْوِلْدَانِ ، وَأَنْ تَقُومُوا لِلْيَتَمَى بِالْقِسْطِ وَمَا تَفْعَلُوا مِنْ خَيْرٍ فَإِنَّ اللَّهَ كَانَ بِهِ عَلِيمًا (النساء : ১২৭)
"লোকেরা তোমাকে বিধান জিজ্ঞেস করছে। বল, আল্লাহ তাদের ইয়াতীম মহিলাদের বিষয়ে বিধান দিচ্ছেন। আর কুরআনে তোমাদের যা যা তিলাওয়াত করে শুনানো হয় ঐসব পিতৃহীনা নারীদের বিধান যাদেরকে তোমরা নির্ধারিত অধিকার দাও না অথচ তাদের বিবাহ করতে আগ্রহ রাখ, আর অক্ষম শিশুদের বিধান। আল্লাহ আরও বিধান দিচ্ছেন যে, তোমরা ইয়াতীমদের প্রতি ইনসাফপূর্ণ ব্যবহার করবে।" -(সূরা আন নিসা : ১২৭)
এ সূরার শুরুতে ইয়াতীম ও নারীদের অধিকার ও হক সম্পর্কে বিশেষ বিধান দিয়ে তা আদায় করার প্রতি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। কারণ, জাহেলী যুগে অনেকে তাদের মীরাস দিতো না, কেউ তাদের মীরাস সূত্রে প্রাপ্ত সম্পদ ও সম্পত্তি বেমালুম হজম করে ফেলতো, আর কেউ কেউ তাদের বিয়ে করে পূর্ণ মোহরানা দিতো না। কুরআনে ইতিপূর্বে এহেন গর্হিত কাজ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল। কিন্তু কতিপয় লোক মনে করতে লাগলো যে, উপরোক্ত নির্দেশ হয়তো কিছুসংখ্যক লোককে সাময়িকভাবে দেয়া হয়েছিল, শেষ পর্যন্ত ঐ বিধান রহিত হয়ে যাবে। অনেকে ইয়াতীম মেয়েদের সম্পর্কিত উক্ত বিধান রহিত হওয়ার অপেক্ষায় দিন গুনতে থাকে। অবশেষে যখন তা রহিত হলো না, তখন তারা পরামর্শ করে স্থির করলো যে, এ বিষয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করা হবে। সে মতে তারা রাসূলের কাছে গিয়ে এ বিষয়ে প্রশ্ন করতে শুরু করলো। ইবনে জারীর ও ইবনুল মুনযিরের বর্ণনা অনুযায়ী এ প্রশ্নই হচ্ছে আয়াতটি নাযিল হওয়ার কারণ।
ইমাম বুখারী (র) বর্ণনা করেছেন, হযরত আয়েশা (রা) বলেন : যেসব ইয়াতীম বালিকা সম্পদের মালিক হলেও সুন্দরী ছিল না, তাদের (গায়র মুহরম) অভিভাবক তাদের রূপহীনতার কারণে তাদের বিবাহ করতে চাইতো না। অথচ তার সম্পদের লোভে অন্যের কাছেও বিবাহ দিতো না। এভাবে তারা অসহায় বালিকার বিবাহ ঠেকিয়ে রাখতো। এ জাতীয় লোকদের সম্পর্কে এ আয়াত নাযিল হয়েছে।
হযরত ইবনে আব্বাস (রা) থেকে আলী ইবনে আবি তালহা এ আয়াতাংশের ব্যাখ্যায় বলেছেন, জাহেলী যুগে কারো অভিভাবকত্বে ইয়াতীম বালিকা থাকলে সে তার গায়ে নিজের কাপড় রেখে দিতো। এরূপ করার কারণে সেই বালিকাকে আর কেউ কখনো বিবাহ করতে পারতো না। বালিকাটি রূপসী হলে সে নিজেই তাকে বিবাহ করতো, আর এভাবেই তার সম্পদ আত্মসাৎ করে নিতো। আর বালিকাটি রূপসী না হলে সে নিজে তো তাকে বিবাহ করতো না, অন্যকেও বিবাহ করার সুযোগ দিতো না। এভাবে সে তার মৃত্যুর পর তার সম্পত্তির উত্তরাধিকার লাভ করতো। এ আয়াতে আল্লাহ তা'আলা ইয়াতীম মেয়েদের প্রতি এরূপ অত্যাচার করতে তাদের নিষেধ করেছেন।
জাহেলী যুগে এভাবে অপ্রাপ্ত বয়স্ক সন্তান ও কন্যা সন্তানকে তাদের উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করা হতো। উপরিউক্ত আয়াতে তাদের প্রতি যুলুম থেকে বিরত থাকার জন্যও বলা হয়েছে।
আয়াতের শেষাংশে আল্লাহ তা'আলা ইয়াতীমদের প্রতি ইনসাফপূর্ণ ব্যবহারের যে নির্দেশ দিয়েছেন, তার তাৎপর্য হযরত সাঈদ ইবনে যুবাইর (রা) এভাবে ব্যাখ্যা করেছেন যে, ইয়াতীম বালিকা রূপসী ও ধনবতী হলে তোমরা যেমন তাদের বিবাহ করতে আগ্রহী হও, তারা রূপহীনা আর নির্ধন হলেও ঠিক তেমনি তাদের বিবাহ করবে।
পৃথিবীতে অনেক সময় মানুষ মারা যায়, আর তাদের ছেলে-মেয়েরা হয়ে পড়ে অভিভাবকহীন অসহায়। দুনিয়ার মানুষ ধন-সম্পদের প্রতি এতই লোভী হয়ে আছে যে, তারা যদি এরূপ পিতা-মাতা হারা কোনো ইয়াতীম সন্তানের অভিভাবক হয়ে থাকে, তবে এসব ইয়াতীমের সম্পদ আত্মসাতে মেতে উঠে। তারা একটুও চিন্তা করে না যে, তার সন্তানদেরও এমনি অবস্থা হতে পারে। পরের সন্তানের অসহায়তার প্রতি তারা দয়াদ্র না হয়ে বরং সুযোগ সন্ধানী মনোভাবাপন্ন হয়ে উঠে। ঈমানদারগণ কখনো এমন পাষণ্ড হতে পারে না। সকল আশ্রয়হীনের আশ্রয় হলেন আল্লাহ তা'আলা; সকল অসহায়ের সহায় হলেন আল্লাহ তা'আলা। কাজেই যে ব্যক্তি ইয়াতীম-অসহায়কে আশ্রয় দিল সে যেন আল্লাহর পক্ষে দায়িত্ব পালন করলো, যেন আল্লাহর কাজে সহযোগিতা করলো।
আয়াতের শেষাংশে আল্লাহ তা'আলা মানুষকে এরূপ ভাল কাজ করতে উদ্বুদ্ধ ও উৎসাহিত করছেন। তোমাদের সমস্ত ভাল কাজ সম্পর্কে আল্লাহ অবহিত আছেন। তিনি তোমাদের সমস্ত সৎকাজের পুরো পুরস্কার দিয়ে দেবেন।
কাজেই নিজের শ্রম, সময় ও অর্থ ব্যয় করে কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় ত্যাগ স্বীকার করা একজন আন্তরিকতা সম্পন্ন ঈমানদারের কাজ। স্বার্থপর লোকেরাই উপস্থিত লাভের সন্ধানে থাকে। আল্লাহতে অগাধ বিশ্বাস স্থাপনকারী ব্যক্তি বৈষয়িক লাভ ক্ষতির দিকে না তাকিয়ে অত্যন্ত ধৈর্য সহকারে কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কাজ করে থাকেন। আল্লাহর পথে ব্যয় করতে, ইয়াতীম ও অসহায়কে অকাতরে দান করতে যদি কোনো মানুষ নাও জানে, তবুও মহান আল্লাহ তো সবকিছু দেখেন ও জানেন। সুতরাং ভাল কাজের সুফল তিনি অবশ্যই দেবেন।
টিকাঃ
(মা'আরেফুল কুরআন), (ইবনে কাসীর)
📄 মীরাসের মাল নারীদের দ্বিগুণ পাবে পুরুষরা
وَإِنْ كَانُوا إِخْوَةً رِجَالًا وَنِسَاءً فَلِلذَّكَرِ مِثْلُ حَظِّ الْأُنْثَيَيْنِ يُبَيِّنُ اللَّهُ لَكُمْ أَنْ تَضِلُّوا ، وَاللَّهُ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ (النساء : ১৭৬)
"আর তারা যদি ভাই-বোন উভয় থাকে তবে একজন পুরুষ পাবে দু'জন নারীর অংশের সমান। আল্লাহ তোমাদের জন্য বিষয়টি পরিষ্কার করে বর্ণনা করছেন, যেন তোমরা ভ্রষ্ট হয়ে না যাও। আর আল্লাহ তো সকল বিষয়ে পরিজ্ঞাত।"-(সূরা আন নিসা: ১৭৬)
আলোচ্য আয়াতটি সূরা আন নিসার সর্বশেষ আয়াত। সূরা নিসায় মীরাস সম্পর্কিত আলোচনাই প্রাধান্য পেয়েছে। সর্বশেষ আয়াতটিতে তাই মূল বক্তব্যকে অধিকতর স্মরণীয় করার জন্য মীরাসের একটি মৌলিক নির্দেশিকা বর্ণিত হয়েছে বলে তাফসীরকারগণ মন্তব্য করেছেন।
আয়াতটির প্রথম থেকে 'কালালা'-র মীরাস সম্পর্কিত প্রশ্নের জবাব দেয়া হয়েছে। 'কালালা' বলা হয় এমন মৃত ব্যক্তিকে যার সন্তানাদি ও মাতা-পিতা নেই, কিন্তু বোন অথবা ভাই-বোন উভয়ই রয়েছে। এক বোন থাকলে পাবে মোট সম্পত্তির অর্ধেক। বাকীটা পাবে আসাবারা। 'আসাবা' না থাকলে সবটুকু পাবে বোন। দুই বোন থাকলে পাবে তিন ভাগের দুই ভাগ। বাকীটা পূর্বের ন্যায়। আর যদি মৃত ব্যক্তির বোন ও ভাই থাকে তবে ভাইয়েরা পাবে বোনদের দ্বিগুণ।
কেবল ভাই-বোন উত্তরাধিকারী থাকলে তাদের মীরাসের বিষয়ে বিস্তারিত বর্ণনা দেয়ার পর আল্লাহ তা'আলা মানবজাতির দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন এমনটি অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের প্রতি। আর তা হচ্ছে, সাধারণত মীরাস বণ্টনের ব্যাপারে, বিশেষত নারীদের মীরাস দেয়ার ব্যাপারে যেন কেউ ভ্রষ্ট হয়ে না পড়ে, বিভ্রান্তিতে পড়ে না যায়। কারণ জাহেলিয়াতের যুগে মীরাসের ব্যাপারে বড়ই যুলম করা হতো। যেমনটি হচ্ছে আধুনিক যুগেও। জাহেলী যুগে নারীদের উপর নানাভাবে যুলম করা হতো, ইয়াতীমদের হক নষ্ট করা হতো, বিশেষত ইয়াতীম বালিকাদের হক এবং নারীদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হতো। রাব্বুল আলামীন আল কুরআনে সকলকে তাদের অধিকার দানের বিষয়ে বিস্তারিত নির্দেশনা দিয়েছেন। অবশেষে বিশ্ববাসীকে বিশেষত মু'মিনদের সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন : "আল্লাহ তোমাদের জন্য পরিষ্কার করে বর্ণনা করেছেন যেন তোমরা বিভ্রান্ত না হয়ে যাও।"
মানুষ আল্লাহর বিধানের রহস্য অনুধাবন না করে অনেক সময় নিজ নিজ বদ্ধমূল ধারণার ভিত্তিতে আল্লাহর বিধান নিয়ে বিচার-বিশ্লেষণ করার দুঃসাহস দেখিয়ে থাকে। যেমন উপরিউক্ত আয়াতে "একজন পুরুষ পাবে দু'জন নারীর অংশের সমান"-কথার বাহ্যিক অর্থের পরে ভিত্তি করে তারা বলতে থাকে যে ইসলাম নারীদের ঠকিয়েছে, নারী-পুরুষের অধিকারে বৈষম্য রেখেছে। কিন্তু তারা তো আল্লাহর বিধানের সার্বিক দিকগুলোর প্রতি একটুও দৃষ্টি দিতে না পারার কারণেই হয়তো এমনটি বলে থাকে অথবা চিন্তার বক্রতার কারণে এভাবে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে সমাজে অশান্তির সৃষ্টি করে। প্রথমতঃ তাদের জানা উচিত যে, ইসলামই নারীদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছে, অন্য কোনো ধর্ম বা মতবাদ তা করেনি। দ্বিতীয়তঃ নারীদের বিবাহদান পর্যন্ত তাদের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব থাকে পিতার উপর। বিবাহের পর স্বামীর উপর সমস্ত দায়িত্ব অর্পিত হয়। তৃতীয়তঃ বিবাহের সময় মোহরানার অর্থ পেয়ে গেলে স্ত্রী একটা উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থের মালিকানা লাভ করতে পারে। এতে স্বামীর বিন্দুমাত্র অধিকার থাকে না। স্ত্রী এ অর্থ নিজের মর্জি মাফিক কোনো ব্যবসায়ে বা কোনো উৎপাদনমূলক কাজে বিনিয়োগ করতে পারে। চতুর্থতঃ স্ত্রীর যাবতীয় ভরণ-পোষণ এমনকি প্রসাধনী ব্যয়ও স্বামীকেই বহন করতে হয়। স্ত্রীর যদি কোনো ব্যবসা অথবা চাকুরীও থাকে, তবুও তার খোর-পোষের পুরো দায়িত্ব স্বামীর। পঞ্চমতঃ স্ত্রী তার ভাইয়ের সাথে যে এক অংশ পেয়েছিল, সে সম্পদ তো তার পুরোটাই অব্যয় অক্ষয় থেকে যায়; কিন্তু তার ভাইকে তো নিজের স্ত্রীর দায়-দায়িত্বও বহন করতে হয়। সুতরাং এক ভাই দুই বোনের অংশের সমান মীরাস পাওয়াটা একেবারেই যুক্তিযুক্ত। বাকী আল্লাহর হুকুম-আহকামের রহস্য তিনিই ভাল জানেন। তাঁর সকল হুকুম আন্তরিকতা সহকারে মেনে নেয়া আমাদের কর্তব্য। ব্যষ্টিক দৃষ্টিকোণ থেকে সমালোচনার পথ পরিহার করে সামষ্টিক দৃষ্টিতে পর্যালোচনায় নিরপেক্ষতা রক্ষা করতে পারলে মানুষের চিন্তার বক্রতা কেটে যেতে পারে। আল্লাহ সবাইকে তাওফীক আতা করুন। আমীন।