📘 আল কুরআনে নারী 📄 সম্পত্তি বণ্টনে কন্যার অংশই হলো মূলভিত্তি

📄 সম্পত্তি বণ্টনে কন্যার অংশই হলো মূলভিত্তি


يُوصِيكُمُ اللَّهُ فِي أَوْلَادِكُمْ لِلذَّكَرِ مِثْلُ حَظِ الْأُنثَيَيْنِ ، فَإِنْ كُنْ نِسَاءً فَوْقَ اثْنَتَيْنِ فَلَهُنَّ ثُلُثَا مَا تَرَكَ ، وَإِنْ كَانَتْ وَاحِدَةً فَلَهَا النِّصْفُ وَلَابَوَيْهِ لِكُلِّ وَاحِدٍ مِنْهُمَا السُّدُسُ مِمَّا تَرَكَ إِنْ كَانَ لَهُ وَلَدٌ، فَإِنْ لَّمْ يَكُنْ لهَ وَلَدٌ وَوَرِثَةَ أَبَاهُ فَلَامِهِ الثُّلُثُ ، فَإِنْ كَانَ لَهُ إِخْوَةٌ فَلَامِهِ السُّدُসُ مِنْ بَعْدِ وَصِيَّةٍ يُوصِي بِهَا أَوْدَيْنِ (النساء : ১১)

"আল্লাহ তোমাদের সন্তানদের ব্যাপারে তোমাদের এ বিধান দিচ্ছেন যে, একজন পুরুষের অংশ দু'জন নারীর অংশের সমান। যদি (মৃতের ওয়ারিশ) কন্যা হয় দু'য়ের অধিক, তবে তাদের জন্যে পরিত্যক্ত সম্পত্তির দুই-তৃতীয়াংশ। আর যদি একজন কন্যা থাকে তবে তার জন্যে মোট সম্পত্তির অর্ধেক। মৃতের মাতা-পিতা প্রত্যেকে পাবে ত্যাজ্য সম্পত্তির এক-ষষ্ঠাংশ, যদি তার সন্তান থাকে। যদি তার সন্তান না থাকে এবং তাঁর ওয়ারিশ থাকে কেবল মাতা-পিতা। তবে সে ক্ষেত্রে মাতা পাবে এক- তৃতীয়াংশ। ভাই-বোন থাকলে মাতা পাবে এক-ষষ্ঠাংশ। উপরোক্ত বিধান তখন কার্যকর হবে যখন মৃতের অসিয়ত ও করয পরিশোধ করার পর তার সম্পত্তি বাকী থাকে।"-(সূরা আন নিসা: ১১)

আলোচ্য আয়াতে মৃত ব্যক্তির সম্পত্তি বণ্টনের বিধান বর্ণনা করা হয়েছে। কুরআনুল কারীমে কন্যাদের অংশ দেয়ার প্রতি এতবেশী গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে যে, কন্যাদের অংশকে আসল ভিত্তি সাব্যস্ত করে এর অনুপাতে পুত্রদের অংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। বলা হয়েছে لِلذَّكَرِ مِثْلُ حَظِ الْأُنثَيَيْنِ “এক পুত্রের অংশ দুই কন্যার অংশের সম পরিমাণ" এভাবে বলা হয়নি যে, দুই কন্যার অংশ এক পুত্রের অংশের সমপরিমাণ। সূরা নিসার ১৭৬নং আয়াতেও এ বিষয়ে একই হুকুম দেয়া হয়েছে।

মৃত ব্যক্তির সম্পত্তি সম্পর্কে ইসলামী শরীয়তের বিধান হলো, প্রথমতঃ সমস্ত সম্পত্তি থেকে মৃতের কাফন ও দাফনের খরচ নির্বাহ করা হবে। এতে অপব্যয় ও কৃপণতা-উভয়ই নিষিদ্ধ। তারপর দ্বিতীয় পর্যায়ে মৃতের ঋণ পরিশোধ করা হবে। ঋণ পরিশোধে সমস্ত সম্পত্তি নিঃশেষ হয়ে গেলে কেউ ওয়ারিশী স্বত্ব পাবে না এবং কোনো অসিয়তও কার্যকর হবে না। যদি কোনো ঋণ না থাকে অথবা ঋণ শোধ করার পরও সম্পত্তি বাকী থাকে তবে তৃতীয় পর্যায়ে অবশিষ্ট সম্পত্তির এক-তৃতীয়াংশ দিয়ে বৈধ অসিয়ত কার্যকর করা হবে। তার সমস্ত সম্পত্তি অসিয়ত করলে তা এ এক-তৃতীয়াংশ দিয়েই পালন করা যাবে—এর অধিক দিয়ে অসিয়ত পালন করা জায়েয নেই। ওয়ারিশদের বঞ্চিত করার নিয়তে অসিয়ত করা গুনাহের কাজ। চতুর্থ পর্যায়ে বাকী সম্পত্তি নির্দিষ্ট ওয়ারিশদের মধ্যে কুরআন-হাদীস অনুযায়ী বণ্টন করা হবে।

আমাদের সমাজে পিতার মৃত্যুর পর ছেলেরা মেয়েদের অংশ দেয় না বা দিতে গড়িমসি করে বা যথার্থ অংশ দেয় না। অনেক সময় বোনেরা ভাইদের সাথে তাদের প্রাপ্য অংশের জন্যে কিছু বলে না। কারণ তারা অংশ তো পাবেই না, শুধু শুধু ভাইদের সাথে সম্পর্ক নষ্ট করে কি লাভ? বোনেরা একথা চিন্তা করে অনিচ্ছা সত্ত্বেও চক্ষু লজ্জায় তাদের প্রাপ্য ক্ষমা করে দেয় বা তাদের দাবী উত্থাপন করে না। এ জাতীয় ক্ষমা করা বা দাবী না করা প্রকৃতপক্ষে শরীয়তী ক্ষমা নয়। বরং ভাইদের জিম্মায় বোনদের অংশ ও হক পাওনা থেকে যায়। যারা এভাবে ওয়ারিশী সম্পত্তি না দিয়ে তা আত্মসাৎ করে, তারা কঠোর গুনাহগার হবে। এদের মধ্যে নাবালেগ কন্যাও থাকে। তাদের অংশ না দেয়া দ্বিগুণ গুনাহর কাজ। এক গুনাহ শরীয়তসম্মত ওয়ারিশের অংশ না দিয়ে তা আত্মসাৎ করার; আর দ্বিতীয় গুনাহ ইয়াতীমের সম্পত্তি হজম করে ফেলার।

অতপর আলোচ্য আয়াতে কারিমায় কন্যাদের মীরাস সম্পর্কে ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে যদি পুত্র সন্তান না থাকে, কেবল দুই বা দু'য়ের অধিক কন্যা সন্তান থাকে তবে তারা পাবে মোট সম্পত্তির দুই-তৃতীয়াংশ। বাকী এক-তৃতীয়াংশ পাবে মৃত ব্যক্তির মাতা-পিতা, স্ত্রী অথবা স্বামী প্রমুখ ওয়ারিশগণ। যদি পুত্র সন্তান মোটেই না থাকে আর কন্যা থাকে একজন। তখন সে পাবে অর্ধেক। অবশিষ্ট অর্ধেক পাবে অন্যান্য ওয়ারিশগণ।

📘 আল কুরআনে নারী 📄 নারীরা যেমন বংশগত ওয়ারিশ তেমনি তারা বৈবাহিক ওয়ারিশও

📄 নারীরা যেমন বংশগত ওয়ারিশ তেমনি তারা বৈবাহিক ওয়ারিশও


وَلَكُمْ نِصْفُ مَا تَرَكَ أَزْوَاجُكُمْ إِنْ لَّمْ يَكُنْ لَهُنَّ وَلَدٌ ، فَإِنْ كَانَ لَهُنَّ وَلَدٌ فَلَكُمُ الرُّبُعُ مِمَّا تَرَكْنَ مِنْ بَعْدِ وَصِيَّةٍ يُوصِينَ بِهَا أَوْ دِيْنِ ، وَلَهُنَّ الرُّبُعُ مِمَّا تَرَكْتُمْ إِنْ لَّمْ يَكُنْ لَكُمْ وَلَدٌ ، فَإِنْ كَانَ لَكُمْ وَلَدٌ فَلَهُنَّ الثُّمُنُ مِمَّا تَرَكْتُمْ مِنْ بَعْدِ وَصِيَّةٍ تُوْصُونَ بِهَا أَوْ دَيْنِ (النساء : ১২)

"তোমাদের স্ত্রীদের সন্তান না থাকলে তোমরা তাদের অর্ধেক সম্পত্তি পাবে। যদি তাদের সন্তান থাকে তবে তোমরা তাদের ত্যাজ্য সম্পত্তির এক-চতুর্থাংশ পাবে। এ বিধান কার্যকর হবে তাদের করয ও অসিয়ত থাকলে, তা পরিশোধ করার পর। আর তারা পাবে তোমাদের ত্যাজ্য সম্পত্তির এক-চতুর্থাংশ, যদি তোমাদের কোনো সন্তান না থাকে। আর যদি তোমাদের সন্তান থাকে তবে তারা তোমাদের ত্যাজ্য সম্পত্তির এক-অষ্টমাংশ পাবে। এখানেও তোমাদের করয ও অসিয়ত কার্যকর করার পর এ হুকুম পালিত হবে।"-(সূরা আন নিসা: ১২)

আলোচ্য আয়াতে কারিমায় স্বামী ও স্ত্রীদের মীরাস সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। ইসলামী শরীয়ত অনুযায়ী নারীগণও পুরুষদের মত বংশগত ও জন্মগত সম্পর্কের কারণে মৃত ব্যক্তির ত্যাজ্য সম্পত্তির ওয়ারিশ হয়ে থাকে। মীরাস পাওয়ার ব্যাপারে যে যে অবস্থায় পুরুষদের অধিকার রয়েছে সে সে অবস্থায় নারীদেরও অধিকার রয়েছে। হযরত মাওলানা মুফতী মোহাম্মদ শফী (র) তাঁর তাফসীরে মা'আরেফুল কুরআনে নারীদের মোহরানাকে করযের অন্তর্ভুক্ত করেছেন। শরীয়তে স্ত্রীর মোহরানার সমস্ত অর্থ তার হাতে দেয়ার বিধান আছে। তাদের আন্তরিক ও স্বেচ্ছায় ক্ষমাকৃত অংশ ছাড়া বাকী সম্পূর্ণ মোহরানার টাকাই স্বামীর জিম্মায় স্ত্রীর পাওনা।

মীরাসী আইনের চারটি স্তর: (১) দাফন-কাফন (২) ঋণ, (৩) অসিয়ত, (৪) মীরাস, ধারাবাহিকভাবেই বণ্টিত হয়ে থাকে। দাফন-কাফন ও ঋণ পরিশোধে যদি মৃত ব্যক্তির সমস্ত ত্যাজ্য সম্পত্তি নিঃশেষ হয়ে যায় তবে অসিয়ত ও মীরাস কার্যকর হবে না।

স্ত্রীর মোহরানার অর্থ পরিশোধ করা বাকী থাকলে তাও উপরে বর্ণিত ঋণের অন্তর্ভুক্ত হবে। সুতরাং অসিয়ত ও মীরাস বণ্টনের পূর্বেই স্ত্রীর প্রাপ্য মোহরানা অবশ্যই পরিশোধ করতে হবে। এমনকি তাতে ত্যাজ্য সম্পদের সবটুকুই নিঃশেষ হলে অসিয়ত ও মীরাস কার্যকর হবে না। স্ত্রীগণ যদি স্বেচ্ছায় ও আন্তরিকভাবে মোহরানার অংশ বা সম্পূর্ণ ক্ষমা করে দিয়ে থাকে তবে তা স্বতন্ত্র কথা। কিন্তু যেসব স্বামীরা কৌশলে মোহরানা মাফ করিয়ে নেয় বা স্ত্রীদের বাধ্য করিয়ে থাকে এবং স্ত্রীরা অগত্যা কোনো অকাম্য পরিস্থিতির উদ্ভবের ভয়ে বাধ্য হয়ে মাফ করার কথা প্রকাশ করে; এমতাবস্থায় শরীয়তের বিধান অনুযায়ী ঐ মোহরানার অর্থ স্বামীর কাছে স্ত্রীর পাওনা থেকে যায়।

📘 আল কুরআনে নারী 📄 নারীকে অপরাধী সাব্যস্ত করার বিষয়ে কঠোরতা আরোপ

📄 নারীকে অপরাধী সাব্যস্ত করার বিষয়ে কঠোরতা আরোপ


وَالَّتِي يَأْتِينَ الْفَاحِشَةَ مِنْ نِسَائِكُمْ فَاسْتَشْهِডُوا عَلَيْهِنَّ أَرْبَعَةً مِّنْكُمْ ، فَإِنْ شَهِدُوا فَأَمْسِكُوهُنَّ فِي الْبُيُوتِ حَتَّى يَتَوَفَّهُنَّ الْمَوْتُ أَوْ يَجْعَلَ اللَّهُ لَهُنَّ سَبِيلاه (النساء : ১৫)

"তোমাদের স্ত্রীদের মধ্যে যারাই নির্লজ্জ কাজ ব্যভিচারে লিপ্ত হয় তাদের বিরুদ্ধে তোমাদের পুরুষদের চারজন সাক্ষী নাও। যদি চারজন লোক ব্যভিচারের সাক্ষ্য দেয় তবে তাদেরকে ঘরের মধ্যে বন্ধী করে রাখ- যতদিন না তাদের মৃত্যু হয় অথবা আল্লাহর পক্ষ থেকে কোনো ফায়সালা ঘোষিত হয়।"-(সূরা আন নিসা : ১৫)

আলোচ্য আয়াতে ব্যভিচারে লিপ্ত নারীর বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ করতে হলে চারজন পুরুষ সাক্ষী গ্রহণের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এখানে নারীকে অপরাধী সাব্যস্ত করার বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়া হয়েছে এবং এ ব্যাপারে শরীয়ত অত্যন্ত কঠোর বিধান দিয়েছে। প্রথমত এ জাতীয় ঘটনায় চারজন সাক্ষী তলবের নির্দেশ এবং তাদের সাক্ষ্য পাওয়া গেলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। চারজন সাক্ষী স্বচক্ষে দেখেছে এমন সাক্ষ্যই গ্রহণযোগ্য হবে। দ্বিতীয়তঃ ঐ চারজন সাক্ষী হতে হবে পুরুষ-কোনো নারীর সাক্ষ্য এতে গ্রহণযোগ্য নয়। এ জাতীয় কাজে চারজন সাক্ষী পাওয়া বড়ই দুরূহ। তাই বলে এর অর্থ এ নয় যে, শরীয়ত বুঝি ব্যভিচারকে তেমন একটা ভর্ৎসনা ও তিরস্কার করে না। বরং এ ব্যাপারে নিরীহ নারী সমাজের প্রতি যাতে কোনো প্রকারের যুলুম-অত্যাচার করার কোনো অবকাশ না থাকে, সে জন্যেই এ কঠোরতা আরোপ করা হয়েছে। কারণ, এ কঠোরতা না থাকলে যে কেউ ব্যক্তিগত জিঘাংসার বশবর্তী হয়ে অহেতুক অপবাদ দিতে অথবা শত্রুতা উদ্ধারের সুযোগ খুঁজে পেতে পারে। অবলা-অসহায়া নারীকুলের রক্ষাকবচ স্বরূপ তাদের বিরুদ্ধে উত্থিত অভিযোগ প্রমাণিত করার পথে উপরোক্ত কঠোরতা আরোপ করা হয়েছে।

চারজন পুরুষ সাক্ষী যদি বাস্তবিকই যথারীতি সাক্ষ্যদান করতে পারে তবেই অভিযুক্ত মহিলাকে শাস্তি দেয়া যাবে। এ শাস্তি ঐ নারীকে গৃহের অভ্যন্তরে আবদ্ধ রেখে যন্ত্রণা দেয়া অথবা আল্লাহর কোনো চূড়ান্ত নির্দেশনার অপেক্ষা করার কথা আয়াতে বলা হয়েছে। উল্লেখ্য এ সম্পর্কে আল্লাহর চূড়ান্ত নির্দেশের বিষয়টি পরবর্তীকালে সূরা আন নূরে অবতীর্ণ হয়েছিল। বলা হয়েছে, ব্যভিচারী ও ব্যভিচারিণী উভয়কেই একশত বেত্রাঘাত করে শাস্তি দাও। অবশ্য এ একশত বেত্রাঘাত হলো অবিবাহিতের বিধান। আর বিবাহিতের বিধান হলো পাথর বর্ষণ করে হত্যা করা।

হযরত ইবনে আব্বাস (রা) উক্ত আয়াতে أَوْيَجْعَلَ اللَّهُ لَهُنَّ سَبِيلاً অথবা "আল্লাহর পক্ষ থেকে কোনো ফায়সালা ঘোষিত হয়” এর তাফসীর প্রসংগে বলেন: يَعْنِي الرَّجْمُ لِلثَّيِّب وَالْجِلْدُ لِلْبِكْرِ অর্থাৎ “বিবাহিতের জন্যে পাথর বর্ষণে হত্যা করা আর অবিবাহিতের জন্যে বেত্রাঘাত করা। রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মায়েয ইবনে মালেক (রা) ও ইযদ গোত্রের জনৈকা মহিলার উপর ব্যভিচারের শাস্তি প্রয়োগ করেছিলেন। তারা উভয়ে বিবাহিত ছিল বিধায় তাদেরকে প্রস্তর বর্ষণে হত্যা করা হয়েছিল। তাছাড়া একজন ইয়াহুদীকেও ব্যভিচারের শাস্তি স্বরূপ প্রস্তর বর্ষণে হত্যা করা হয়েছিল।

📘 আল কুরআনে নারী 📄 নারীদের জান-মালে বলপ্রয়োগ অবৈধ

📄 নারীদের জান-মালে বলপ্রয়োগ অবৈধ


يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ لَا يَحِلُّ لَكُمْ أَن تَرِثُوا۟ ٱلنِّسَآءَ كَرْهًا ۖ وَلَا تَعضلُوهُنَّ لِتَذْهَبُوا۟ بِبَعْضِ مَّآ ءَاتَيْتُمُوهُنَّ إِلَّآ أَن يَأْتِينَ بِفَٰحِشَةٍ مُّبَيِّنَةٍ ۚ وَعَاشِرُوهُنَّ بِٱلْمَعْرُوفِ ۚ فَإِن كَرِهْتُمُوهُنَّ فَعَسَىٰٓ أَن تَكْرَهُوا۟ شَيْـًٔا وَيَجْعَلَ ٱللَّهُ فِيهِ خَيْرًا كَثِيرًا (النساء : ১৯)

“হে তোমরা যারা ঈমান এনেছ! জোরপূর্বক স্ত্রীলোকের উত্তরাধিকার হয়ে বসা তোমাদের জন্যে মোটেই হালাল নয়। আর তাদেরকে এজন্যে আটক করে রেখো না, যাতে করে তোমরা তাদের যে মোহরানা দিয়েছ তার কিছু অংশ আত্মসাৎ করে নিতে পার। অবশ্য তারা প্রকাশ্যে কোনো অশ্লীলতা করে বসলে সেটা ভিন্ন কথা। আর তাদের সাথে সদ্ভাবে জীবন- যাপন কর।"-(সূরা আন নিসা : ১৯)

জাহেলী যুগে নারীদের উপর স্বামীদের পক্ষ থেকে যেমন উৎপীড়ন- নির্যাতন চলতো, তেমনি চলতো ওয়ারিশদের পক্ষ থেকেও। ইসলাম উভয় ধরনের উৎপীড়নকে হারাম ঘোষণা করেছে। আল কুরআন বৈবাহিক উৎপীড়ন ও ওয়ারিশী উৎপীড়ন—দু'টোকেই হারাম করে দিয়েছে আর নারীদের সাথে সদ্ভাবে জীবন যাপনের নির্দেশ দিয়েছে।

জাহেলী যুগে নারীদের প্রতি বিভিন্ন ধরনের নির্যাতন চলতো। যেমন পুরুষ নিজেকে স্ত্রীর জান-মালে মালিক মনে করতো। নারীরা যার বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতো, সে স্ত্রীর প্রাণকে নিজের মালিকানাধীন মনে করতো। স্বামীর মৃত্যুর পর তার ওয়ারিশরা যেমন তার ত্যাজ্য সম্পত্তির ওয়ারিশ ও মালিক হতো, তেমনি তারা তার স্ত্রীরও ওয়ারিশ ও মালিক হয়ে বসতো। ইচ্ছা করলে নিজেই তাকে বিয়ে করতো কিংবা অন্যের কাছ থেকে অর্থ নিয়ে তাকে বিয়ে দিয়ে দিতো। স্ত্রীর প্রাণের যখন এ অবস্থা তখন তার ধন-সম্পদের বিষয়টি তো বলার অপেক্ষা রাখে না। এ ধরনের ভ্রান্তির ফলে নারীদের উপর চলতো নানা ধরনের নির্যাতন। ঐসব উৎপীড়ন-নির্যাতনের কতিপয় উদাহরণ নিম্নে প্রদান করা হলো:
এক: স্ত্রীদের উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত অথবা পিত্রালয় থেকে উপঢৌকনা হিসেবে প্রাপ্ত অর্থ-সম্পদ হজম করে ফেলা হতো।
দুই: কোনো নারী নিজের অর্থ-সম্পদের উপর অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারলেও পুরুষরা তাকে অন্যত্র বিয়ে করতে বাধা দিতো। যেন ধন-সম্পদ বাইরে না যায়।
তিন: কোনো কোনো সময় স্ত্রীর কোনো দোষ না থাকলেও শুধু স্বভাবগত কারণে স্বামী তাকে অপছন্দ করতো, আবার তাকে তালাক দিয়ে মুক্তও করতো না; যেন শেষ পর্যন্ত অতিষ্ঠ হয়ে প্রদত্ত টাকা ফেরত দেয় অথবা মোহরানা ক্ষমা করে দেয়।
চার: কখনো কখনো স্বামী স্ত্রীকে তালাক দিয়েও তাকে অন্যত্র বিয়ে করতে দিতো না। যেন প্রদত্ত মোহরানা ফেরত দেয় অথবা আদায়যোগ্য মোহরানা ক্ষমা করে দেয়।
পাঁচ: কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্বামীর মৃত্যুর পর ওয়ারিশরা বিধবাকে অন্যত্র বিয়ে করতে দিতো না।

আল কুরআন এসব নির্যাতনের প্রতিকার কল্পে ঘোষণা করেছে, তোমাদের জন্যে এটা মোটেই হালাল নয় যে, তোমরা বলপ্রয়োগে নারীদের মালিক হয়ে বসবে। আলোচ্য আয়াতে কার্হান্ (کرها) বা 'জোরপূর্বক' কথাটিকে শর্ত হিসেবে বলা হয়নি। কারণ, তখন অর্থ হবে নারীদের সম্মতিতে তাদেরকে নিজের মালিকানাধীন করে নেয়া ঠিক হবে। শরীয়তসম্মত ও যুক্তিসংগত কারণ ছাড়া নারীদের মালিক হয়ে যাওয়াটাই মূলতঃ তাদের বলপ্রয়োগে নিজের মালিকানাধীন করে নেয়ার সামিল। কোনো বুদ্ধিমতি, জ্ঞানী ও প্রকৃতিস্থ নারী এতে সম্মত হতে পারে না। কোনো নারী নির্বুদ্ধিতা বশত কারো মালিকানাধীন হতে রাজী হলেও ইসলামী আইন একে মোটেই স্বীকার করে না যে, কোনো স্বাধীন মানুষ কারো মালিকানাধীন চলে যাবে।

আয়াতে "তোমরা স্ত্রীদের মালিক হয়ে বসো না"-এভাবে সরাসরি নিষেধ আরোপ না করে বলা হয়েছে, 'জোরপূর্বক স্ত্রীদের উত্তরাধিকার হয়ে বসা মোটেই হালাল নয়।" এতে করে ব্যাপারটির কঠোরতা প্রকাশিত হয়েছে। সুতরাং যদি কেউ কোনো প্রাপ্ত বয়স্কা নারীকে তার সম্মতি ও অনুমতি ছাড়া বিয়ে করে তবে এ বিয়ের দ্বারা উভয়ের মধ্যে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক স্থাপিত হয় না। আর তাতে উত্তরাধিকার স্বত্ব ও বংশের বিধানাবলীও কায়েম হয় না।

তেমনিভাবে কেউ যদি জোর করে তার স্ত্রী থেকে প্রদত্ত মোহরানা ফেরত গ্রহণ করে কিংবা আদায়যোগ্য মোহরানা মাফ করিয়ে নেয়, তবে এ জোরপূর্বক ফেরত গ্রহণ ও মাফ শরীয়তের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয়। ফলে গ্রহণকৃত অর্থ-মাল স্বামীর জন্যে হালাল হয় না এবং কোনো প্রাপ্যও মাফ হয় না। অবশ্য স্ত্রী যদি ব্যভিচার ও অবাধ্যতা প্রদর্শন করে আর পুরুষ সে জন্যে বাধ্য হয়ে তালাক দিয়ে দেয়, তবে স্ত্রীর দোষের কারণে মোহরানা ফেরত গ্রহণ বা নির্ধারিত মোহরানা মাফ করানো পর্যন্ত স্ত্রীকে বিবাহে আবদ্ধ রাখার অধিকার স্বামীর রয়েছে। তবে সেটা নির্ধারণ করবে কোনো ইসলামী আদালত। কোনো ব্যক্তি নিজে ব্যক্তিগতভাবে করলে তাও গ্রহণযোগ্য হবে না।

ফন্ট সাইজ
15px
17px