📘 আল কুরআনে নারী 📄 পবিত্রতা নারীদের উচ্চ-মর্যাদায় উন্নীত করে

📄 পবিত্রতা নারীদের উচ্চ-মর্যাদায় উন্নীত করে


وَإِذْ قَالَتِ الْمَلئِكَةُ يَمَرْيَمُ إِنَّ اللَّهَ اصْطَفَكِ وَطَهَّرَكِ وَاصْطَفَكِ عَلَى نِسَاء الْعَلَمِينَ (ال عمران : ৪২)

"তারপর এমন সময় উপস্থিত হলো যখন ফেরেশতাগণ বললো, হে মারইয়াম আল্লাহ তা'আলা তোমাকে উচ্চ সম্মানে মহিমান্বিত করেছেন, তোমাকে পবিত্রতা দান করেছেন, আর তোমাকে পৃথিবীর নারীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন।"-(সূরা আলে ইমরান: ৪২)

হযরত মারইয়ামের মাতার মান্নত অনুযায়ী তৎকালীন শরীয়তের রীতি অনুসারে তিনি বায়তুল মোকাদ্দাসের খাদেমা ছিলেন। তিনি ছিলেন পূত-পবিত্র চরিত্রের অধিকারিনী। তিনি সারা রাত আল্লাহর ইবাদাতে রত থাকতেন। মুজাহিদ বলেন: হযরত মারইয়াম (আ) রাত্রিতে দীর্ঘ সময় ইবাদাতে মশগুল থাকার কারণে উভয় পাঁয়ে খুঁত এসে গিয়েছিল। আল্লাহ তাঁকে তৎকালীন বিশ্বের নারীদের মধ্যে সর্বোচ্চ মর্যাদা দান করেছিলেন। এবং আল্লাহ যে দুনিয়ার যাবতীয় শৃংখলা ও কার্যাবলী আনজাম দান করেন এবং কোনো কিছুই আপনা আপনি যেমন সংগঠিত হয় না; তেমনি প্রাকৃতিক নিয়মেই সবকিছু হয় না; বরং প্রাকৃতিক নিয়ম-নীতিও আল্লাহই নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন। তারই নিদর্শন স্বরূপ হযরত ঈসা (আ) মারইয়ামের গর্ভে স্বাভাবিক নিয়মের বাইরে আল্লাহর অসীম কুদরতে পিতা ছাড়াই জন্ম নিলেন। এবং জন্মের পরেই নিজের পরিচয় দিয়ে লোকদের সাথে কথা বলতে থাকেন।

আল্লাহ তা'আলা হযরত আদম (আ)-কে তৈরী করেছেন মাতা-পিতা ছাড়া। আর হযরত ঈসা (আ)-কে সৃষ্টি করলেন পিতা ছাড়া কেবল মাতা থেকে। আল্লাহর এ কুদরতের নিদর্শন দেখানোর জন্যে এমন এক নারী অর্থাৎ হযরত মারইয়ামকে নির্বাচন করলেন যিনি রাতভর আল্লাহর ইবাদাতে মশগুল থাকতেন এবং তিনি ছিলেন নির্মল নিষ্কলুষ চরিত্রের অধিকারিণী।

আল্লামা ইবনে কাসীর হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত একটি হাদীস এ প্রসংগে উদ্ধৃত করেছেন। রাসূলুল্লাহ (স) বলেছেন, বিশ্বে চারজন মহিলা শ্রেষ্ঠ। মারইয়াম বিনতে ইমরান, ফিরাউনের স্ত্রী আসিয়া, খাদিজা বিনতে খুওয়াইলাদ এবং ফাতেমা বিনতে রাসূলুল্লাহ (স)। তিরমিযি একাই এ হাদীস রেওয়াত করেছেন আর একে বিশুদ্ধ বলে দাবী করেছেন।

এ আয়াতের অবতারণা হয়েছে আল্লাহ তা'আলার নির্দেশ সম্পর্কে ফেরেশতাগণ হযরত মারইয়ামের সাথে যে সমস্ত কথাবার্তা বলেছেন তা হুজুর (স)-কে অবহিত করার উদ্দেশ্যে অর্থাৎ মহান আল্লাহ তার অধিক ইবাদাত, দুনিয়া বিরাগ ও পূত-পবিত্রতার দরুন তাকে সর্বপ্রকার মলীনতা ও অপবিত্রতা থেকে পাক-সাফ করে নির্বাচন করেছেন আর তাঁর এসব মহত্বের দরুন তাকে বিশ্ব নারী সমাজের উপর মর্যাদা দিয়েছেন।

টিকাঃ
(ইবনে কাসীর)

📘 আল কুরআনে নারী 📄 মর্যাদাবান নারীরা সমাজ বিমুখ থাকে না

📄 মর্যাদাবান নারীরা সমাজ বিমুখ থাকে না


يُمَرِيمُ اقْنُتِي لِرَبِّكِ وَاسْجُدِي وَارْكَعِي مَعَ الرَّكِمِينَ

"হে মারইয়াম! তোমার রবের আনুগত্য কর, তাঁকে সিজদা কর এবং রুকূ'কারীদের সাথে তুমিও রুকূ' কর।" -(সূরা আলে ইমরান: ৪৩)

পূর্বের আয়াতে হযরত মারইয়াম (আ)-কে তৎকালীন নারী কুলের শ্রেষ্ঠতম মর্যাদা দানের ঘোষণা করা হয়েছে। এখানে তাঁকে স্বীয় রবের অনুগত হওয়ার জন্যে, রবের সিজদা করার জন্যে এবং রুকূ'কারীদের সাথে রুকূ' করার জন্যে স্বয়ং রাব্বুল আলামীন নির্দেশ দিয়েছেন। মানব সমাজের প্রত্যেক পর্যায়ে সকল কালের নর-নারীরা জীবনের সামগ্রিক কার্যাবলীতে হয়ত সত্য পথে চলেছে নয়ত চলেছে বাতিলের পথে। সকল নর-নারীকে নিজ নিজ কর্ম অনুযায়ী হকপন্থী ও বাতিল পন্থী-এ দু' ভাগে বিভক্ত করা যেতে পারে। মর্যাদাবান নারীরা বাস্তবে অন্যান্য মর্যাদার অধিকারীদেরই দলভুক্ত হয়ে চলবে এটাই স্বাভাবিক। রুকূ'কারীদের সাথে রুকূ' করার অর্থ সমাজের সৎপন্থীদের দলভুক্ত থাকা এবং ব্যক্তিগতভাবেও সৎকাজ করা। দ্বিতীয়তঃ এর অর্থ এও হতে পারে যে, নামাযীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে নামায আদায়ে অভ্যস্থ হও। তৃতীয়তঃ সমাজের অন্যান্য নারীদের সাথে সদাচরণ ও নম্রব্যবহার করার নির্দেশ দেয়াও এ আয়াতের অর্থ হতে পারে। অর্থাৎ সমাজে যারা সদাচারী ও নম্র ব্যবহারে অভ্যস্ত-যাদের দ্বারা সমাজের লোকেরা কোনো কষ্ট পায় না, তুমিও তাদের দলভুক্ত হও। সামাজিক শান্তি প্রতিষ্ঠাকামীদের সাথী হয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠায় পরস্পরকে সহযোগিতা কর। যেমন আরেকটি আয়াতে রুকূ'র এ অর্থই গ্রহণ করা হয়েছে। যেমন বলা হয়েছে:
الَّذِينَ يُقِيمُونَ الصَّلوةَ وَيُؤْتُونَ الزَّكَوةَ وَهُمْ رَاكِعُونَ (المائدة : ৫৫)

এখানে প্রথমে সালাতের কথা বলা হয়েছে বিধায় পরবর্তীতে রুকূ' করা বলতে অনেক মুফাস্সির উপরোক্ত অর্থ গ্রহণ করেছেন। অর্থাৎ তারা সালাত কায়েম করে, যাকাত দেয় এবং সমাজে শান্তি-শৃংখলা প্রতিষ্ঠা করে থাকে।

সমাজের জনসংখ্যার অর্ধেক যেমন নারী তেমনি বিশ্ব সৌন্দর্য সংস্থাপনে নরের মত নারীর ভূমিকাও কম নয়। ইসলাম নারীদেরকেও নির্ধারিত পরিমণ্ডলে ও নির্দিষ্ট গণ্ডীতে থেকে সামাজিক শান্তি স্থাপনে ও সমাজের উন্নতি বিধানে সম্ভাব্য ভূমিকা রাখার অবকাশ দিয়েছে। এমন নয় যে, কেবল নরেরাই সমাজে সক্রিয় থাকবে আর নারীরা থাকবে নিষ্ক্রীয় হয়ে। বস্তুত নারীদের নিষ্ক্রীয় থাকা বা সমাজ বিমুখ থাকা বা সার্বিক কর্মকাণ্ডে কোনো ভূমিকা না রাখা, কখনো কোনো মর্যাদাশীল জাতি মাত্রেরই কাম্য হতে পারে না। ইসলামের গৌরবময় যুগেও নারীদের ভূমিকা ছিল সমাজের সার্বিক কল্যাণধর্মী কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত। রাসূলের যুগে নারীরা জিহাদের জন্য যুদ্ধ ময়দানেও গিয়েছিলেন।

📘 আল কুরআনে নারী 📄 আমলের ক্ষেত্রে আল্লাহর কাছে নর-নারীর কোনো পার্থক্য নেই

📄 আমলের ক্ষেত্রে আল্লাহর কাছে নর-নারীর কোনো পার্থক্য নেই


فَاسْتَجَابَ لَهُمْ رَبُّهُمْ أَنِّي لا أُضِيعُ عَمَلَ عَامِلٍ مِنْكُمْ مِّنْ ذَكَرٍ أَوْ أُنثَى : بَعْضُكُمْ مِّنْ بَعْضٍ : (ال عمران : ১৯৫)

"অতপর তাদের পালনকর্তা তাদের দোয়া এই বলে কবুল করে নিলেন, আমি তোমাদের মধ্য হতে কোনো আমলকারীর আমল বৃথা যেতে দেই না; চাই আমলকারী নর হোক বা নারী। তোমরা তো পরস্পরের সম্পূরক।"-(সূরা আলে ইমরান: ১৯৫)

পূর্ববর্তী আয়াতসমূহৈ আমলী ঈমানদার লোকদের কতিপয় দোয়া- মুনাযাতের বর্ণনা ছিল। আলোচ্য আয়াতে সে দোয়ার মনজুরী এবং আমলী লোকদের নেক আমলের বিপুল প্রতিদানের সুসংবাদ দেয়া হয়েছে। সৎকাজ যেই করুক না কেন সেই তার পুরোপুরি প্রতিদান ও সওয়াব পাবে। কাজটি চাই কোনো পুরুষই করুক অথবা কোনো নারীই করুক। প্রতিদান প্রাপ্তিতে উভয়ের জন্যে একই নিয়ম। আল্লাহর দরবারে এমন কোনো নিয়ম নেই যে, একই কাজ যদি পুরুষ করে তবে এক প্রকার ফল পাবে, আর যদি স্ত্রীলোকেরা করে তবে অন্য প্রকারের ফল পাবে। আল্লাহ নর ও নারীর পার্থক্যের দরুন তাদের আমলের প্রতিফলের মধ্যে কোনো পার্থক্য করেন না। এ ক্ষেত্রে আল্লাহর কথা হলো- بَعضُكُم مِن بَعض "তোমরা (নর-নারী) পরস্পরের অংশ বিশেষ।" কাজেই আমলের ফলাফলের দিক থেকেও কোনো তারতম্য নেই বা থাকবে না।

ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞ বা স্বল্প ধারণার লোকেরা মনে করে থাকে যে, ইসলাম কেবল পুরুষদের প্রাধান্য ও গুরুত্ব দেয়। নারীদের কোনো মর্যাদা বা অধিকার ইসলামে নেই। এমনকি আজকের সমাজে কিছু নামধারী মুসলিম যুবক-যুবতীদেরও এমনি ধারণা রয়েছে। উপমহাদেশের মুসলিম সমাজে ইসলামী তাহজীব-তমদ্দুনের যথার্থ ধারণা ও আমল না থাকার কারণে এবং আন্তর্জাতিক ইসলাম বিদ্বেষীদের ষড়যন্ত্রের ফলে মুসলমানদের একটি অংশের মধ্যে অতি সুকৌশলের এ জাতীয় বিষক্রিয়ার সংক্রমণ ঘটেছে।

ইসলামের শিক্ষা সম্পর্কে সত্যিকার ধারণা না থাকার কারণে মুসলিম সমাজের কতিপয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দও বিশ্বের অমুসলিমদের ইসলাম বিরোধী শ্লোগান নিজেদের মধ্যে প্রচলন বরং নিজেরা তা গ্রহণ ও বরণ করে নিচ্ছে। যেমন 'সাম্প্রদায়িকতা'। যে ইসলাম সাম্প্রদায়িকতার মূলোৎপাটনকারী সার্বজনীন আদর্শ। সে ইসলামকেই দুর্নাম করা হচ্ছে সাম্প্রদায়িকতার নামে। আল-কুরআনের উপস্থাপিত নারী পুরুষের মর্যাদার পার্থক্যহীনতা বরং নর-নারীদের যথোপযুক্ত মর্যাদার ঘোষণা আজকের বিশ্বে কার্যকর না থাকার দরুণ উদ্ভূত পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্যে নারী দিবস শিশু দিবস ইত্যাদি দিবসগুলো আন্তর্জাতিকভাবে উদযাপন করা হচ্ছে। কিন্তু ইসলামের বিধি-বিধানগুলো সমাজে বাস্তবায়িত হলে এসব দিবস পালনের কি প্রয়োজন হতো?

তেমনি তাদের আরেকটি শ্লোগান 'ধর্মনিরপেক্ষতা'। মুসলিম রাষ্ট্রে অমুসলিমদের অধিকার ও নিরাপত্তা স্বার্থে তারা এ শ্লোগানটি উচ্চারণ করেন। কিন্তু ইসলামী জীবন বিধানে অমুসলিমদেরকে অধিকার ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা রয়েছে, তা তথাকথিত কোনো ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রেও যে নেই, সেই সত্যটুকু জানা না থাকার কারণেই অথবা জেনে বুঝে বিদ্বেষবশতঃ এ শ্লোগানটি উচ্চারণ করা হচ্ছে। এভাবে নারীর অধিকার ও মর্যাদার বিষয়, দাদার বর্তমানে পিতার মৃত্যুতে দাদার সম্পত্তিতে নাতির অংশ, নারীদের পর্দা ব্যবস্থা-ইত্যাদি বিষয়ে ইসলামের বিধি-বিধান নিয়ে এদের আপত্তি! এসব বিষয়ে এরা অমুসলিম, নারী ও ইয়াতীম নাতির নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে অস্থির! এ যেন মায়ের চেয়ে মাসীর দরদ। যে আল্লাহ সৃষ্টিকর্তা ও পালনকারী, তাঁর চেয়ে যেন সৃষ্টির জন্য এদের দরদ বেশী!

📘 আল কুরআনে নারী 📄 পূর্বপুরুষদের সম্পত্তিতে নারী-পুরুষ উভয়েরই অংশ নির্ধারিত

📄 পূর্বপুরুষদের সম্পত্তিতে নারী-পুরুষ উভয়েরই অংশ নির্ধারিত


لِلرِّجَالِ نَصِيبٌ مِمَّا تَرَكَ الْوَالِدَنِ وَالْأَقْرَبُونَ وَ لِلنِّسَاءِ نَصِيبٌ مِمَّا تَرَكَ مِن الْوَالِدَنِ وَالْأَقْرَبُونَ مِمَّا قَلَّ مِنْهُ أَوْ كَثْرَ ، نَصِيبًا مُفْرُوضَا

"পুরুষদের জন্যে পিতা-মাতা ও নিকটাত্মীয়দের পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে যেমন প্রাপ্য অংশ রয়েছে। তেমনি নারীদের জন্যেও পিতা-মাতা ও নিকটাত্মীয়দের পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে অংশ রয়েছে। চাই তা কম হোক অথবা বেশী হোক, উভয়ের এ অংশ (আল্লাহর পক্ষ থেকেই) নির্ধারিত।" -(সূরা আন নিসা: ৭)

আলোচ্য আয়াতে পূর্বপুরুষদের রেখে যাওয়া সম্পত্তিতে উত্তরাধিকার আইনের সুস্পষ্ট বিধান প্রদানের পূর্বে তার ভিত্তি ঘোষণা করা হয়েছে। এখানে দু'টো আইনগত নির্দেশ ঘোষিত হয়েছে। একটি নির্দেশ হলো মীরাস কেবল পুরুষদেরই প্রাপ্য নয়, নারীরাও মীরাসের হকদার। দ্বিতীয় নির্দেশটি হলো মীরাসের পরিমাণ যা-ই হোক না কেন, তা অবশ্যই ওয়ারিশদের মাঝে বণ্টিত হতে হবে। তাছাড়া এ আয়াতে একথাও সুস্পষ্ট হয়ে উঠে যে, মীরাস আইন সকল প্রকার ধন-সম্পত্তির উপর কার্যকর হবে— স্থাবর, অস্থাবর, কৃষি-শিল্প সর্বপ্রকার সম্পত্তিই এর আওতায় আসবে।

ইসলামের মীরাস-আইন প্রবর্তনের পূর্বে আরব-অনারব জাতিসমূহের মধ্যে মৃত ব্যক্তির পরিত্যক্ত সম্পত্তি বণ্টনের ক্ষেত্রে চলতো নানা ধরনের যুলুম-অত্যাচার। মুশরিকদের নিয়মে পিতার বড় ছেলে সকল সম্পত্তির মালিক হতো। মেয়েরা ও ছোট ছেলেরা হতো সম্পূর্ণভাবে বঞ্চিত। আবার কোনো কোনো জাতির নিয়মে এতীম বালক-বালিকা ও নারীগণ মীরাসের বিষয়ে চরম যুলুমের শিকার হতো। আরবদের নিয়ম ছিল, যারা অশ্বারোহণ করে ও শত্রুদের মোকাবিলা করে অর্থ-সম্পদ লুট করে আনার যোগ্যতা রাখতো, কেবল তারাই উত্তরাধিকার হতে পারতো। কোনো কোনো জাতির মধ্যে স্ত্রীরা স্বামীর কোনো অংশই পাওয়ার যোগ্য ছিল না। ইসলাম উপরোক্ত আয়াতের ঘোষণা দিয়ে পূর্বপুরুষদের রেখে যাওয়া সম্পত্তি বণ্টন সংক্রান্ত যাবতীয় জুলুম অত্যাচার রহিত করে পুরুষের ন্যায় নারীকেও অংশীদার ঘোষণা করে। ইসলাম দুর্বল ও নারীদের ন্যায্য অধিকার প্রদান করে, আর সে অধিকার সংরক্ষণেরও চমৎকার ব্যবস্থা করে দেয়।

রাসূলুল্লাহ (স)-এর সময়কার একটি ঘটনা এখানে উল্লেখযোগ্য। আউস ইবনে সাবেত (রা) তার স্ত্রী, দুই কন্যা ও এক নাবালেগ পুত্র সন্তান রেখে মৃত্যু মুখে পতিত হন। প্রাচীন আরবীয় প্রথানুসারে তাঁর দুই চাচাত ভাই সমস্ত সম্পত্তি দখল করে নিয়ে গেল—স্ত্রী ও সন্তানদের কিছুই দিল না। কারণ তাদের মীরাসী আইনে নারীগণ কোনো অবস্থাতেই মীরাস পেত না। ফলে স্ত্রী ও দুই কন্যা এমনিতেই বঞ্চিতা হয়ে গেল। আর প্রাপ্ত বয়স্ক না হওয়ার কারণে পুত্রও বাদ পড়ে গেল। আউস ইবনে সাবেতের স্ত্রী রাসূলুল্লাহ (স)-এর কাছে এ অবস্থার বর্ণনা করে সন্তানদের অসহায়ত্বের অভিযোগ করলো। তখন পর্যন্ত উত্তরাধিকার সম্পর্কিত কুরআন পাকের কোনো হুকুম নাযিল হয়নি। তাই রাসূলুল্লাহ (স) উত্তর না দিয়ে ওহীর অপেক্ষায় রইলেন। তখন উপরোক্ত আয়াত নাযিল হয়।

আলোচ্য আয়াতে কুরআন পাকের বাচনভংগী লক্ষণীয়। এখানে মৃত ব্যক্তির মীরাস বণ্টনের মৌলিক আলোচনায় পুরুষ ও নারীদের ওয়ারিশ হওয়ার কথা পৃথকভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যান্য স্থানের ন্যায় পুরুষ ও নারীকে একত্রে উল্লেখ করা হয়নি। বরং এখানে পুরুষদের হক যেভাবে সবিস্তারে আলোচনা করা হয়েছে; নারীদের হকও পৃথকভাবে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। এতে করে পুরুষদের হক যেমন স্বাতন্ত্র ও গুরুত্বের দাবী রাখে, তেমনি নারীদের হকও স্বাতন্ত্র ও গুরুত্বের দিক থেকে কোনো অংশে কম নয় বলে প্রতিভাত হয়েছে। এভাবে ইসলাম নারীদের অধিকার ও মর্যাদার যথার্থতার ঘোষণা দিয়েছে। অন্যসব গোত্রের ও সম্প্রদায়ের ন্যায় ইসলাম কেবল বড় ছেলেকে অথবা কেবল ছেলেদেরকে অথবা শুধু কর্মক্ষম ছেলেদেরকে পৈত্রিক সম্পত্তির অধিকারী ঘোষণা করেনি বরং ছেলে ও মেয়েদের হক পৃথকভাবে নির্ধারণ করে দিয়েছে। আবার এ মেয়েরা তাদের স্বামীদেরও মীরাসের মালিক বলে ইসলাম ঘোষণা দিয়েছে।

মৃত ব্যক্তির সম্পত্তির এ বণ্টন মূলনীতি বর্ণনার শেষ দিকে বলা হয়েছে "চাই তা কম হোক অথবা বেশী হোক।" এই বলে মানুষের মূর্খতাসূলভ যুলুমপূর্ণ প্রথার নিরসন করা হয়েছে। কেননা কেউ কেউ নির্দিষ্ট কিছু সম্পদ কেবল যুবক পুরুষদের জন্যে নির্ধারিত বলে সেভাবেই তা বণ্টন করতো।

ফন্ট সাইজ
15px
17px