📘 আল কুরআনে নারী 📄 নারীরাও সাক্ষী হিসেবে গণ্য

📄 নারীরাও সাক্ষী হিসেবে গণ্য


وَاسْتَشْهِدُوا شَهِيدَيْنِ مِن رِّجَالِكُمْ ، فَإِنْ لَّমْ يَكُونَا رَجُلَيْنِ فَرَجُلٌ وَامْرَأَتُنِ مِمَّنْ تَرْضَوْنَ مِنَ الشُّهَدَاء أَنْ تُضِلَّ إِحْدُهُمَا فَتُذَكَّرَ إِحْدُهُمَا الْأُخْرَى -

"আর তোমাদের পুরুষদের মধ্য হতে দু'জনকে সাক্ষী বানাও। যদি দু'জন পুরুষ না পাওয়া যায়, তবে একজন পুরুষ ও দু'জন মহিলাকে সাক্ষী বানাবে। অবশ্য সাক্ষীরা হবে এমন যাদের সাক্ষ্যদানে তোমরা বিশ্বাস রাখতে পার। মহিলা দু'জনের একজন যদি ভুলে যায় তবে যেন অপরজন স্মরণ করিয়ে দিতে পারে।" (সূরা আল বাকারা : ২৮২)

আলোচ্য আয়াতাংশে লেনদেনে দলীল লেখা ও লেখানোর জরুরী মূলনীতি ব্যক্ত করা হয়েছে। ইসলামে লেনদেনে দলীল সম্পাদনার সাথে সাথে সাক্ষ্য রাখার জন্যে বিধান দেয়া হয়েছে। যেন কখনো কোনো পারস্পরিক কলহ দেখা দিলে আদালতে সাক্ষীদের সাক্ষ্য দ্বারা ফায়সালা করা যেতে পারে। কিন্তু ফিক্হ শাস্ত্রবিদগণের মতে কেবল লেখা শরীয়ত সম্মত প্রমাণ নয় সাথে সাথে সাক্ষীও থাকতে হবে। সাক্ষী ছাড়া কেবল লেখার উপর ভিত্তি করে বিচার ফায়সালা করা শরীয়তসম্মত নয়।

শরীয়ত সাক্ষীর সংখ্যাও নির্ধারণ করে দিয়েছে, সমাজে গ্রহণযোগ্য দু'জন মুসলমান পুরুষ সাক্ষী থাকতে হবে। যদি দু'জন পুরুষ না পাওয়া যায় তবে অন্তত একজন পুরুষ ও দু'জন নারীকে সাক্ষ্য বানাতে হবে। যাতে করে একজন নারী বিষয়টি ভুলে গেলে অপরজন তা স্মরণ করিয়ে দিতে পারে।

আলোচ্য আয়াতে সাক্ষ্য গ্রহণের কতিপয় জরুরী নীতিমালা বর্ণিত হয়েছে। যেমন :
(১) সাক্ষীর সংখ্যা হবে দু'জন পুরুষ।
(২) সাক্ষীদ্বয় মুসলিম হতে হবে।
(৩) দু'জন পুরুষ না পেলে অন্তত একজন পুরুষ ও দু'জন নারী সাক্ষী হবে।
(৪) সাক্ষী করতে হবে এমন সব লোককে যারা নিজেদের নৈতিক চরিত্র ও বিশ্বস্ততার কারণে লোক সমাজে নির্ভরযোগ্য বলে বিবেচিত।
(৫) একা একজন পুরুষ অথবা কেবল দু'জন স্ত্রীলোক সাক্ষীর জন্য যথেষ্ট নয়।

📘 আল কুরআনে নারী 📄 পার্থিব নেয়ামতসমূহের মধ্যে নারীর স্থান শীর্ষে

📄 পার্থিব নেয়ামতসমূহের মধ্যে নারীর স্থান শীর্ষে


زُيِّنَ لِلنَّاسِ : حُبُّ الشَّهَوَاتِ مِنَ النِّسَاءِ وَالْبَنِينَ وَالْقَنَاطِيرِ الْمُقَنْطَرَةِ مِنَ الذَّهَبِ وَالْفِضَّةِ وَالْخَيْلِ الْمُسَوَّمَةِ وَالْأَنْعَامِ وَالْحَرْثِ ، ذَلِكَ مَتَاعُ الْحَيَوةِ الدُّنْيَا وَاللَّهُ عِنْدَهُ حُسْنُ الْمَابِ (ال عمران : ১৪)

“মানুষের জন্যে আকর্ষণীয় করা হয়েছে নারী, সন্তান-সন্ততি, সোনা-রূপার স্তূপ, বাছাই করা ঘোড়া, গবাদি পশু ও কৃষি ভূমি। এসবই হচ্ছে পার্থিব জীবনের ভোগ্যবস্তু। আর একমাত্র আল্লাহরই কাছে রয়েছে উত্তম আশ্রয়।”-(সূরা আলে ইমরান : ১৪)

আলোচ্য আয়াতে দুনিয়ার ছয়টি প্রধান নেয়ামতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। (১) নারী, (২) সন্তানাদি, (৩) সোনা-রূপার ভাণ্ডার, (৪) উৎকৃষ্ট ঘোড়া (বাহন), (৫) গৃহপালিত জন্তু, (৬) শষ্য ক্ষেত। এসব উল্লেখযোগ্য প্রধান নেয়ামতসমূহের মধ্যে নারী হচ্ছে শীর্ষস্থানীয়। হাদীস শরীফের ভাষায় اَلْمَرْأَةُ الصَّالِحَةُ خَيْرُ مَا يَكْنِزُ الْمَرْءُ "তন্মধ্যে সর্বোৎকৃষ্ট হচ্ছে সতী নারী।”

নারীর সতীত্বের ব্যাখ্যায় হাদীস শরীফে বলা হয়েছে—“স্বামী যখন তার প্রতি দৃষ্টিপাত করে তখন সে তাকে সুখী করে, তাকে কোনো আদেশ করলে, সে আনুগত্য স্বীকার করে, তাকে ঘরে রেখে গেলে সে নিজের পবিত্রতা রক্ষা করে ও স্বামীর ধন-সম্পদের হেফাজত করে।” অন্য এক হাদীসে আছে, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “আমার কাছে নারী ও সুগন্ধি খুবই প্রিয় বস্তু। তবে নামাযে আমার হৃদয় মনে প্রশান্তি আসে।”

মানুষকে দুনিয়ার জীবনে আল্লাহর দেয়া উক্ত ছয়টি নেয়ামতের মধ্যে সর্বপ্রথম ও প্রধান হলো নারী। বাকীগুলো মূলতঃ নারীকে কেন্দ্র করেই এবং নারীর কারণেই। আল্লাহ তা'আলা মানুষের মনে এসব নেয়ামতের প্রতি স্বভাবগতভাবেই আসক্তি ও আকর্ষণ সৃষ্টি করে দিয়েছেন। মানব স্বভাবের মধ্যে এসবের আসক্তি সৃষ্টির পেছনে আল্লাহ তা'আলার অনেক রহস্য বিদ্যমান রয়েছে। যেমন, (১) এসবের প্রতি আসক্তি ও আকর্ষণ না থাকলে পৃথিবীর সমস্ত ব্যবস্থাপনা ও শৃঙ্খলা ধ্বংস হয়ে যেত। মানুষকে দুনিয়াতে আল্লাহর প্রতিনিধি করে পাঠানোর কোনো মূল্য হতো না আর পৃথিবী বে-আবাদ হয়ে পড়তো। (২) মানুষের মনে জাগতিক নেয়ামতের প্রতি আসক্তি ও ভালবাসা না থাকলে তারা পরকালীন প্রশান্তি কামনার্থে সৎকাজে উদ্বুদ্ধ হতো না এবং অসৎকাজ থেকে বিরত থাকার মানসিকতা অর্জন করতে পারতো না। (৩) এসব আকর্ষণীয় নেয়ামতের প্রতি মানুষের অন্তরে ভালবাসা ও আসক্তি সৃষ্টি করে মূলত তাদের পরীক্ষা নেয়া হয়ে থাকে। আল্লাহ দেখতে চান কারা এসবের মধ্যে ডুবে থেকেও আল্লাহর সাথে সাক্ষাত হওয়ার কথা স্মরণ রেখে এগুলোকে আল্লাহর দেয়া সীমারেখার মধ্যে রেখে ব্যবহার করে ও নির্ধারিত গণ্ডীর মধ্য থেকে নশ্বর দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী জীবন অতিবাহিত করে। পক্ষান্তরে কারা দুনিয়ার এসব চাকচিক্য ও তাল-তামাশার মোহে আচ্ছন্ন হয়ে নিয়ন্ত্রণবিহীন জীবনযাপন করে। যেমন আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন: إِنَّا جَعَلْنَا مَا عَلَى الْأَرْضِ زِينَةً لَهَا لِنَبْلُوَهُمْ أَيُّهُمْ أَحْسَنُ عَمَلاه "আমি পৃথিবীর সমস্ত বস্তু পৃথিবীর সৌন্দর্যের জন্যে সৃষ্টি করেছি। যাতে তাদের মধ্যে কে সৎকাজ করে তা পরীক্ষা করে দেখতে পারি।" -(সূরা আল কাহাফ: ৭)

পৃথিবীতে যেসব বস্তুকে আল্লাহ তা'আলা মানুষের চোখে সুশোভিত করে দিয়েছেন শরীয়তসম্মত পন্থায় সেগুলো প্রয়োজন অনুযায়ী পরিমিত উপার্জন ও যথাবিধি ব্যবহার করলে উভয় জাহানেই সাফল্য নিশ্চিত। পক্ষান্তরে ওসব বস্তু অবৈধ পন্থায় উপার্জন ও ব্যবহার করলে সামগ্রিক ধ্বংস অনিবার্য।

উদাহরণ স্বরূপ প্রধান আসক্তির বস্তু হিসেবে নারীকে নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে। নারীর প্রতি আসক্তি পুরুষের স্বভাবজাত কামনা বাসনা আল্লাহ নিজেই সৃষ্টি করে দিয়েছেন। যার মূলে রয়েছে পৃথিবীর সামগ্রিক শৃংখলা ও সৌন্দর্য রক্ষা ও বিশ্বের উৎকর্ষ সাধনের নিয়ামক স্বরূপ ভূমিকা রাখা। এখন কেউ যদি এ কামনা বাসনাকে বিধি বহির্ভূত পন্থায় ও শরীয়ত বিরোধী উপায়ে ব্যবহার করে সামাজিক কাঠামো ভেঙ্গে দেয়ার পরিবেশ সৃষ্টিতে মত্ত হয়ে পড়ে তবে তাদের আল্লাহ স্বয়ং তা থেকে প্রতিহত করবেন না। আল্লাহ তো তাদের একদিকে হক-বাতিল, ভাল-মন্দ, নেক-বদ ইত্যাদির পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন অন্যদিকে মানুষকে দিয়েছে ইচ্ছার স্বাধীনতা। কর্মের স্বাধীনতা নির্বাচন স্বাধীনতা। আল্লাহ পরীক্ষা করছেন মানুষ এসব স্বাধীনতা কিভাবে ভোগ করে।

নর-নারীর পারস্পরিক যৌন সম্পর্ক যখন নিয়ন্ত্রণহীনভাবে পরিচালিত হয় তখন তা পশুত্ব ছাড়া আর কিছু নয়। পক্ষান্তরে শরীয়তসম্মত পন্থায় যদি তা সুনিয়ন্ত্রিত থাকে তবেই তাতে যেমন সেরা সৃষ্টি মানুষের সম্ভ্রম বজায় থাকে তেমনি তাতে সামাজিক ভিত্তিমূল সুদৃঢ় থেকে বিশ্ব সভ্যতায় সূচিত হয় সত্যিকারের প্রগতি ও সমৃদ্ধি। আজকের পাশ্চাত্য জগতও তাদের সম্পর্কে প্রকাশিত সমকালীন পত্র-পত্রিকা যে অবাধ যৌন আচরণে অশুভ পরিণতির সাক্ষ্য বহন করছে তা আজকের পৃথিবীর অজানা নয়।

আলোচ্য আয়াতে কারিমায় উপরোক্ত কয়েকটি বিশেষ লোভনীয় বস্তুর উল্লেখ করার পর এগুলো সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলার ঘোষণা হলো: ذَالِكَ مَتَاعُ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَاللَّهُ عِنْدَهُ حُسْنُ الْمَلْبِ অর্থাৎ "এসব নেয়ামত সামগ্রী হচ্ছে পার্থিব জীবনে ব্যবহার করার জন্যে। (এগুলোকে জীবনের লক্ষ্য হিসেবে স্থির করার জন্যে নয়।) আর আল্লাহর কাছে রয়েছে উত্তম ঠিকানা।" অন্য কথায় দুনিয়ার নেয়ামতসমূহ ঠিক তেমনি অস্থায়ী যেমন অস্থায়ী দুনিয়ার জীবন। পক্ষান্তরে পরকালীন জীবন যেমন স্থায়ী তেমনি স্থায়ী সে জীবনের নেয়ামতসমূহ। এজন্যেই আল্লাহর ঘোষণা হলো একমাত্র আল্লাহর কাছেই রয়েছে উত্তম ঠিকানা যার নিয়ামতসমূহ না ধ্বংস হবে না হ্রাস পাবে। বুদ্ধিমান তো সে ব্যক্তি, যে অস্থায়ী সুখ-শান্তি ও চাকচিক্যে মত্ত না হয়ে স্থায়ী শান্তি ও সার্বিক সাফল্য প্রাপ্তির চেষ্টায় নিজেকে নিয়োজিত রাখে।

📘 আল কুরআনে নারী 📄 পুত্রের চেয়ে যে কন্যার শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষিত হয়েছিল

📄 পুত্রের চেয়ে যে কন্যার শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষিত হয়েছিল


فَلَمَّا وَضَعَتْهَا قَالَتْ رَبِّ إِنِّي وَضَعَتْهَا أُنثَى وَاللَّهُ أَعْلَمُ بِمَا وَضَعَتْ . وَلَيْسَ الذَّكَرُ كَالأُنثى ، وَإِنِّي سَمَّيْتُهَا مَرْيَمَ وَإِنِّي أُعِيدُهَا بِكَ وَذُرِّيَّتَهَا مِنَ الشيطن الرجيم (ال عمران : ৩৬)

"তারপর যখন সে প্রসব করলো, তখন বললো, হে আমার রব! আমি তো কন্যা সন্তান প্রসব করলাম। অথচ আল্লাহ ভালভাবেই জানেন, কি সে প্রসব করেছিল। পুত্র কন্যার মত নয়। আমি তার নাম রাখলাম মারইয়াম। আমি তার ও তার সন্তানাদির জন্যে তোমার আশ্রয় চাচ্ছি অভিশপ্ত শয়তানের কবল থেকে।" -(সূরা আলে ইমরান: ৩৬)

আলোচ্য আয়াতে হযরত মারইয়াম (আ)-এর জন্ম বৃত্তান্তের প্রতি ইংগিত রয়েছে। তাঁর মাতা ইমরানের স্ত্রী ছিলেন নিঃসন্তান। একদা তিনি একজন পথিককে দেখলেন, সে তার বাচ্চাকে দুধ পান করাচ্ছে। এতে তাঁর অন্তরে সন্তান লাভের তীব্র আকাঙ্ক্ষা ও আকুতি জাগ্রত হয়। তিনি কায়মনো বাক্যে আল্লাহর কাছে সন্তান প্রাপ্তির আবেদন জানালেন। আল্লাহ তাঁর দোয়া কবুল করলেন এবং তিনি গর্ভধারণ করেন।

তখনকার শরীয়তে প্রচলিত ইবাদাত পদ্ধতির মধ্যে আল্লাহর নামে সন্তান উৎসর্গ করার রেওয়াজও ছিল। কোনো সন্তানকে আল্লাহর নামে নির্দিষ্ট করে দেয়া হতো এবং তাকে কোনো পার্থিব কাজে লাগানো হতো না। এ পদ্ধতি মোতাবেক হযরত মারইয়ামের মাতা নিজের গর্ভস্থ সন্তানকে বিশেষভাবে বায়তুল মোকাদ্দাসের খেদমতে নিয়োজিত করার মান্নত করলেন। গর্ভস্থ সন্তান ছেলে হবে কি মেয়ে হবে তা তাঁর জানা ছিল না। সন্তান প্রসব করার পর যখন দেখলেন যে, তিনি তো একটি কন্যা সন্তান প্রসব করেছেন। তখন আল্লাহর দরবারে ফরিয়াদ করে বললেন, আয় আল্লাহ! আমি তো আমার গর্ভস্থ সন্তানকে তোমার ঘরের খেদমতের জন্যে মান্নত করেছিলাম। কিন্তু এ কি ব্যাপার! এযে একটা কন্যা সন্তান!

আল্লাহর তো জানা আছেই যে, তিনি কন্যা সন্তান প্রসব করেছেন। কন্যাকে দিয়ে বায়তুল মোকাদ্দাসের খেদমত করানো যাবে কিভাবে? মারইয়ামের মাতার এ সংশয়ের জবাবে আল্লাহ তা'আলা বললেন : وَلَيْسَ الذِّكَرُ كَالانثى "এ কন্যা সন্তানের মত কোনো পুত্র সন্তান নেই।” অর্থাৎ তুমি যে পুত্র চেয়েছিলে সে তো তোমাকে দেয়া কন্যার সমকক্ষা নয়। বরং তোমার আন্তরিকতার বরকতে এ কন্যা বিশ্বের কন্যাদের মধ্যে বিশেষ মর্যাদার অধিকারী। তার এমন সব গুণ বৈশিষ্ট্য রয়েছে যে, অনেক পুত্র সন্তান তার সমকক্ষ নয়। আয়াতের তরজমা করতে গিয়ে তাফসীর কারকগণ বলেছেন: وَلَيْসَ الذَّكَرُ الَّذِي طَلَبَتِ كَالْأُنثَى الَّتِي وهبت - "যে পুত্র সন্তান তুমি চেয়েছো সেতো এ কন্যা সন্তানের মত নয়। অর্থাৎ তোমার চাহিত পুত্র সন্তানের চেয়ে তোমাকে প্রদত্ত কন্যা সন্তান আরও বেশী গুণাবলী ও মর্যাদার অধিকারী।"

মারইয়ামের মাতা কন্যাকে আল্লাহর ঘরের খেদমত করার অযোগ্য মনে করেছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন তার মান্নত মতে নিজের কন্যাকে দিয়ে বায়তুল মোকাদ্দাসের খেদমতের কাজ করানো কি সম্ভব? ছেলে হলেই সে তার মান্নত পূরণ করা যেতো। কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছা ছিল বিপরীত। সেই কন্যাকে দিয়েই আল্লাহ তার মাতার মান্নত পূরণ করার মত যোগ্যতা ও গুণ বৈশিষ্ট্য সৃষ্টি করে দিলেন। আল্লাহ তা'আলা মাতার আন্তরিকতার প্রতি তাকিয়ে কন্যাকেই কবুল করে নিলেন। "আমি তার নাম রাখলাম মারইয়াম।" কথাটি-মারইয়ামের মাতার। এ প্রসংগে মুফতী মুহাম্মদ শফী (র) বলেন, এ থেকে বুঝা যায় যে, সন্তানের নাম রাখার অধিকার মাতারও রয়েছে। সন্তানের লালন-পালন ও শিক্ষা-দীক্ষার ব্যাপারে মাতার ভূমিকা যথার্থ ও কাম্য। এ বিষয়ে তার অধিকার স্বীকৃত।

ইমরানের স্ত্রী নিজের কন্যা মারইয়ামকে শয়তানের আক্রমণ থেকে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করে ছিলেন। আল্লামা ইবনে কাসীর হযরত আবু হুরাইরা (রা) থেকে একটি হাদীস নকল করেছেন। যাতে বলা হয়েছে যখনই কোনো সন্তান জন্মগ্রহণ করে, তখনই শয়তান তাকে স্পর্শ করে। এবং শয়তানের স্পর্শের কারণে সন্তান চিৎকার করে। তবে হযরত মারইয়াম এবং তার সন্তান এর ব্যতিক্রম। তাদেরকে শয়তান স্পর্শ করতে পারেনি। এটা তাদের প্রতি আল্লাহর বিশেষ করুণা স্বরূপ।

📘 আল কুরআনে নারী 📄 পবিত্রতা নারীদের উচ্চ-মর্যাদায় উন্নীত করে

📄 পবিত্রতা নারীদের উচ্চ-মর্যাদায় উন্নীত করে


وَإِذْ قَالَتِ الْمَلئِكَةُ يَمَرْيَمُ إِنَّ اللَّهَ اصْطَفَكِ وَطَهَّرَكِ وَاصْطَفَكِ عَلَى نِسَاء الْعَلَمِينَ (ال عمران : ৪২)

"তারপর এমন সময় উপস্থিত হলো যখন ফেরেশতাগণ বললো, হে মারইয়াম আল্লাহ তা'আলা তোমাকে উচ্চ সম্মানে মহিমান্বিত করেছেন, তোমাকে পবিত্রতা দান করেছেন, আর তোমাকে পৃথিবীর নারীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন।"-(সূরা আলে ইমরান: ৪২)

হযরত মারইয়ামের মাতার মান্নত অনুযায়ী তৎকালীন শরীয়তের রীতি অনুসারে তিনি বায়তুল মোকাদ্দাসের খাদেমা ছিলেন। তিনি ছিলেন পূত-পবিত্র চরিত্রের অধিকারিনী। তিনি সারা রাত আল্লাহর ইবাদাতে রত থাকতেন। মুজাহিদ বলেন: হযরত মারইয়াম (আ) রাত্রিতে দীর্ঘ সময় ইবাদাতে মশগুল থাকার কারণে উভয় পাঁয়ে খুঁত এসে গিয়েছিল। আল্লাহ তাঁকে তৎকালীন বিশ্বের নারীদের মধ্যে সর্বোচ্চ মর্যাদা দান করেছিলেন। এবং আল্লাহ যে দুনিয়ার যাবতীয় শৃংখলা ও কার্যাবলী আনজাম দান করেন এবং কোনো কিছুই আপনা আপনি যেমন সংগঠিত হয় না; তেমনি প্রাকৃতিক নিয়মেই সবকিছু হয় না; বরং প্রাকৃতিক নিয়ম-নীতিও আল্লাহই নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন। তারই নিদর্শন স্বরূপ হযরত ঈসা (আ) মারইয়ামের গর্ভে স্বাভাবিক নিয়মের বাইরে আল্লাহর অসীম কুদরতে পিতা ছাড়াই জন্ম নিলেন। এবং জন্মের পরেই নিজের পরিচয় দিয়ে লোকদের সাথে কথা বলতে থাকেন।

আল্লাহ তা'আলা হযরত আদম (আ)-কে তৈরী করেছেন মাতা-পিতা ছাড়া। আর হযরত ঈসা (আ)-কে সৃষ্টি করলেন পিতা ছাড়া কেবল মাতা থেকে। আল্লাহর এ কুদরতের নিদর্শন দেখানোর জন্যে এমন এক নারী অর্থাৎ হযরত মারইয়ামকে নির্বাচন করলেন যিনি রাতভর আল্লাহর ইবাদাতে মশগুল থাকতেন এবং তিনি ছিলেন নির্মল নিষ্কলুষ চরিত্রের অধিকারিণী।

আল্লামা ইবনে কাসীর হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত একটি হাদীস এ প্রসংগে উদ্ধৃত করেছেন। রাসূলুল্লাহ (স) বলেছেন, বিশ্বে চারজন মহিলা শ্রেষ্ঠ। মারইয়াম বিনতে ইমরান, ফিরাউনের স্ত্রী আসিয়া, খাদিজা বিনতে খুওয়াইলাদ এবং ফাতেমা বিনতে রাসূলুল্লাহ (স)। তিরমিযি একাই এ হাদীস রেওয়াত করেছেন আর একে বিশুদ্ধ বলে দাবী করেছেন।

এ আয়াতের অবতারণা হয়েছে আল্লাহ তা'আলার নির্দেশ সম্পর্কে ফেরেশতাগণ হযরত মারইয়ামের সাথে যে সমস্ত কথাবার্তা বলেছেন তা হুজুর (স)-কে অবহিত করার উদ্দেশ্যে অর্থাৎ মহান আল্লাহ তার অধিক ইবাদাত, দুনিয়া বিরাগ ও পূত-পবিত্রতার দরুন তাকে সর্বপ্রকার মলীনতা ও অপবিত্রতা থেকে পাক-সাফ করে নির্বাচন করেছেন আর তাঁর এসব মহত্বের দরুন তাকে বিশ্ব নারী সমাজের উপর মর্যাদা দিয়েছেন।

টিকাঃ
(ইবনে কাসীর)

ফন্ট সাইজ
15px
17px