📘 আল কুরআনে নারী 📄 স্ত্রীকে ‘মায়ের মত’ বললে সে তার মা হয়ে যায় না

📄 স্ত্রীকে ‘মায়ের মত’ বললে সে তার মা হয়ে যায় না


الَّذِينَ يُظْهِرُونَ مِنْكُمْ مِّنْ نِّসَائِهِمْ مَّاهُنَّ أُمَّهَتِهِمْ إِنْ أُمَّهُتُهُمْ إِلَّا الَّتِي وَلَدْنَهُمْ ، وَإِنَّهُمْ لَيَقُولُونَ مُنْكَرًا مِّنَ الْقَوْلِ وَزُوْرًا ، وَإِنَّ اللَّهَ لَعَفُوٌّ غَفُورُهُ

"তোমাদের মধ্যে যারা নিজেদের স্ত্রীদের সাথে যিহার করে, তাদের স্ত্রীরা তাদের মা নয়। তাদের মা তো তারা যারা তাদের জন্ম দিয়েছে। এ লোকেরা তো একটা অসংগত ও অসত্য কথা বলে। নিশ্চয়ই আল্লাহ পাপ মোচনকারী ও বড়ই ক্ষমাশীল।"-সূরা মুজাদালা: ২

তৎকালীন জাহেলিয়াতের যুগে এ যিহার করলে যিহারকারীর স্ত্রী তার জন্য মায়ের মতই হারাম হয়ে গেছে বলে তাকে আর স্ত্রীরূপে গণ্য করা হতো না। এ যুগেও অনেক অজ্ঞ-মূর্খ লোক ঝগড়া-ঝাটি করে না বুঝেশুনে নিজের স্ত্রীকে নিজের মা, বোন ও মেয়ের সাথে তুলনা দেয়। বলে, তুই আমার জন্য আমার মায়ের মত, তুই আমার জন্য আমার বোনের মত, তুই আমার জন্য আমার মেয়ের মত। এমন কথার স্পষ্ট অর্থ দাঁড়ায়, সে নিজের স্ত্রীকে এখন আর স্ত্রী মনে করে না, বরং তাকে সেই নারীদের মধ্যে গণ্য করে, যারা তার জন্য মুহরিম। এ ধরনের কথা বলাকে ফিকহের ভাষায় যিহার (ظهار) বলে। আরবী ভাষায় এ যিহার শব্দ যাহরুন থেকে নির্গত। এ র অর্থ সওয়ারী-যার ওপর সওয়ার হওয়া যায়। জনুযানকে আরবীতে যাহরুন (ظهر) বলা হয়। কেননা এর পিঠের উপর আরোহণ করা হয়। জাহেলিয়াতের সমাজে লোকেরা নিজের স্ত্রীকে নিজের জন্য হারাম করে দেয়ার উদ্দেশ্যে বলতো, তোমাকে 'যাহর'- সাওয়ারী বানানো আমার জন্য নিজের মাকে সাওয়ারী বানানোর মতই হারাম। এ কারণে এ ধরনের বাক্য বা উক্তি মুখে উচ্চারণ করাকে যিহার (ظهر) বলা হতো।

'যিহার' সম্পর্কে ইসলামের ফায়সালা হলো, কেউ যদি নির্লজ্জের মত নিজের স্ত্রীকে মা'র মত বলে, তবে তার একথায় সেই স্ত্রী তার মা হয়ে যেতে পারে না; না মার মত মর্যাদা, সম্ভ্রম ও পবিত্রতা পেতে পারে। মায়ের মা হওয়া একটা প্রকৃত ও বাস্তব ব্যাপার। কেননা সেই তো তাকে গর্ভে ধারণ করেছে, প্রসব করেছে। এ কারণে পুত্রের জন্য সে চিরতরে হারাম, চির সম্মানার্হ। কিন্তু যে নারী তাকে গর্ভে ধারণ করেনি, তাকে কেবল মুখে মা বললেই সে মা হয়ে যেতে পারে না। সাধারণ বিবেক-বুদ্ধি, নৈতিকতা; আইন কোনো একটি দিক দিয়ে কি তার জন্য সেই মর্যাদা-সম্ভ্রম ও পবিত্রতা হতে পারে যা বাস্তবতার কারণে প্রকৃত গর্ভধারিণী ও জন্মদায়িনী মা'র জন্য রয়েছে? এ কারণে জাহেলিয়াতের যুগের নিয়মকে আল্লাহ তাআলা বাতিল ঘোষণা করেছেন। তখন যিহারকারী স্বামীর সাথে তার স্ত্রীর বিবাহ সম্পর্ক চিরতরে ছিন্ন হয়ে যেতো এবং সে তার জন্য তার মায়ের মতই চিরকালের জন্য হারাম হয়ে যেতো। আল্লাহর এই ঘোষণার ফলে এ বদ রসমের চির অবসান হয়ে গেল।

স্ত্রীকে মায়ের সাথে তুলনা করা—বলে দেয়া যে তুমি আমার মায়ের মত। এতো এক হাস্যকর, অর্থহীন ও অত্যন্ত লজ্জাকর ব্যাপার। কোনো সুস্থ মস্তিষ্কের লোক—কোনো ভদ্র ব্যক্তি এর কল্পনাও করতে পারে না, করা উচিত নয়। মুখে উচ্চারণ করা তো দূরের কথা। দ্বিতীয়ত, একথা আসলেও মিথ্যা। কেননা কেউ যদি বলে তার স্ত্রী এখন তার মা হয়ে গেছে, তাহলে সে তো সম্পূর্ণ মিথ্যা কথা বলে ফেললো। আর যদি সে এরূপ কথা বলে বুঝাতে চায় যে, তার স্ত্রী এখন তার মায়ের মতই হারাম হয়ে গেছে, সে তাকে তার মায়ের মর্যাদা দিয়েছে, তবে তাও সম্পূর্ণ অসত্য কথা, পুরোপুরি মিথ্যাবাদী। কেননা কেউ যদি নিজ ইচ্ছা মত কোনো স্ত্রীলোককে কখনো নিজ স্ত্রী বানাবে, আবার কখনো মায়ের মর্যাদা দিবে—এরূপ অধিকার আল্লাহ তাআলা তাকে দেননি। আইন-বিধান রচয়িতা সে নিজে নয়—আল্লাহই শরীয়ত রচয়িতা বিধানদাতা।

আর আল্লাহ তাআলা তো প্রসবকারিণী মা'র সাথে দাদী, নানী ও শাশুড়ী, দুধ সেবন করিয়েছে যে নারী এবং নবীর স্ত্রীগণকে মায়ের মর্যাদায় ভূষিত করেছেন। কেউ নিজের ইচ্ছামত অপর কোনো নারীকে এর মধ্যে শামিল করার অধিকার আল্লাহ কাউকে দান করেননি। যে মহিলা তার স্ত্রী হয়ে আছে তাকে 'এর মধ্যে গণ্য করার তো প্রশ্নই আসে না। আল্লাহ তাআলার উক্ত ঘোষণা থেকে আইনের এ ধারাটি জানা গেল যে, 'যিহার' করা অতি বড় গুনাহ ও হারাম কাজ। যে লোক এ কাজ করে, সে কঠিন শাস্তি পাওয়ার যোগ্য।

কিন্তু আল্লাহ তাআলার অসীম অনুগ্রহ এই যে, তিনি প্রথমত 'যিহার' সংক্রান্ত জাহেলিয়াতের প্রথাকে বাতিল ঘোষণা করে মুমিনদের পারিবারিক ও দাম্পত্য জীবনকে বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করেছেন। আর দ্বিতীয়ত, এ কাজ যারা করে তাদের জন্য অত্যন্ত সহজ ও হালকা ধরনের শাস্তি নির্দিষ্ট করেছেন। এমন কাজের শাস্তি এর চেয়ে অধিক সহজ ও হালকা আর কি হতে পারে? তাছাড়া আল্লাহর বড় অনুগ্রহ এই যে, এ শাস্তি কোনো বেত্রাঘাত কিংবা নির্যাতন রূপে নয় বরং কয়েকটি ইবাদাত ও নেক কাজ রূপেই ধার্য হয়েছে। এ কাজগুলো এমন যে এতে করে মুমিনদের নফসের পরিশুদ্ধি করণ এবং মুমিনদের সমাজে কল্যাণ প্রসারে বিশেষ কার্যকর।

প্রসংগত উল্লেখ্য, ইসলামে কোনো কোনো অপরাধের শাস্তি বিধানে কাফ্ফারা স্বরূপ কতিপয় ইবাদাত নির্দিষ্ট করা হয়েছে। এ পর্যায়ের ইবাদাতগুলোতে ইবাদাত ও শাস্তি-এ দুটো দিকই পুরো মাত্রায় বর্তমান। এসব পালন করতে যেমন শাস্তির কষ্ট ভোগ করতে হয় তেমনি সেই সাথে একটি নেক ও ইবাদাতের কাজ করে নিজের গুনাহের প্রায়শ্চিত্তও করে নিতে পারে।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা.-এর বর্ণনা অনুযায়ী ইসলামের যুগে যিহার সংক্রান্ত ব্যাপার সর্বপ্রথম হযরত আউস ইবনে সামেত দ্বারা সংঘটিত হয়েছিল। তাঁর স্ত্রী হযরত খাওলার আকুল আর্তনাদের ফলেই যিহারের কারণে উদ্ভূত সমস্যার সমাধান স্বরূপ এ আয়াতসমূহ নাযিল হয়।

সূরার ২য় ও ৩য় আয়াতে যিহারের সমাধান সম্পর্কে নির্দেশ নাযিল হয়। যার তরজমা হলো এই- "যারা নিজেদের স্ত্রীদের সাথে 'যিহার' করে, পরে নিজের সেই কথা থেকে ফিরে যায়, যা তারা বলেছিল। পরস্পরকে স্পর্শ করার পূর্বেই তাদেরকে একটি দাস মুক্ত করতে হবে। একথা দিয়ে তোমাদের উপদেশ দেয়া হচ্ছে। তোমরা যাকিছু করো আল্লাহ সে বিষয়ে অবহিত আছেন। যে মুক্ত করার জন্য দাস পাবে না সে যেন একাধারে দু মাস রোযা রাখে পরস্পরকে স্পর্শ করার পূর্বে। আর যে লোক এটাও করতে সমর্থ নয় সে যেন ষাটজন মিসকীনকে খাবার খাওয়ায়। এ নির্দেশ এজন্যে যে তোমরা যেন আল্লাহ ও তাঁর রসূলের প্রতি ঈমান আন। এটাই আল্লাহর দেয়া সীমারেখা। আর কাফিরদের জন্য রয়েছে মর্মান্তিক শাস্তি।

উপরোক্ত আয়াত দুটোতে কেউ যিহার করলে তার প্রতিবিধান স্বরূপ তিনটে বিকল্প ইবাদাতমূলক কাজ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ যিহারকারী তার স্ত্রীকে স্ত্রী হিসেবে রাখার জন্য তার যিহার করার অযৌক্তিক অন্যায় কথার কাফ্ফারা স্বরূপ তাকে একটি গোলাম আযাদ করতে হবে। তার যদি গোলাম আযাদ করার সামর্থ না থাকে তাহলে একাধারে ষাট দিন রোযা রাখতে হবে, আর যদি সে রোযা রাখার সমর্থও না রাখে তবে তার কাফ্ফারা হলো ষাটজন মিসকীনকে খাবার খাওয়াবে। ব্যাস, যিহারকারী উপরোক্ত তিনটি কাজের মধ্য থেকে সামর্থানুযায়ী যে কোনো একটি কাজ করলেই তার স্ত্রীকে পূর্বের ন্যায় স্ত্রী হিসেবে গণ্য করতে পারবে।

ফন্ট সাইজ
15px
17px