📘 আল কুরআনে নারী 📄 বিচ্ছেদের বিকল্প না থাকলে আল্লাহই প্রত্যেকের সহায়

📄 বিচ্ছেদের বিকল্প না থাকলে আল্লাহই প্রত্যেকের সহায়


وَإِنْ يَّতَفَرَّقَا يُغْنِ اللَّهُ كُلاً مِّنْ سَعَتِهِ ، وَكَانَ اللَّهُ وَاسِعًا حَكِيمًا

"স্বামী-স্ত্রী যদি পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তবে আল্লাহ তার প্রাচুর্য দিয়ে তাদের প্রত্যেককে অভাবমুক্ত করে দিবেন। আল্লাহ প্রাচুর্যময় প্রজ্ঞাময়।"-(সূরা আন নিসা : ১৩০)

ইসলামী সমাজের জন্য বিবাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। বিবাহের মাধ্যমে সমাজের একটি ভিত্তি অর্থাৎ পরিবার গড়ে উঠে। মূলত এ বিবাহ প্রথা একটি সমাজের অপরিহার্য আবশ্যকীয় ইউনিট। যে সমাজে এ ভিত্তি যত মযবুত হবে সে সমাজ তত সুন্দর ও সুশৃংখল হবে। তাই ইসলামী শরীয়ত বিবাহ ব্যবস্থাকে সর্বদিক থেকে সুদৃঢ় ও সুশৃংখলভাবে আনজাম দানের ও সংরক্ষণের বিভিন্ন বিধি বিধান দিয়েছে। বিবাহ বিচ্ছেদ ইসলামের দৃষ্টিতে অত্যন্ত ঘৃণিত কাজ। এজন্যে আল কুরআন স্বামী-স্ত্রীকে যেমন একদিকে ন্যায্য অধিকার লাভের আইনগত সুযোগ দিয়েছে; অন্যদিকে ধৈর্য, সংযম ও পারস্পরিক সুসম্পর্ক সৃষ্টি ও সংরক্ষণের প্রতি উৎসাহিত করেছে। আর বিবাহ বিচ্ছেদ থেকে যথাসাধ্য বিরত থাকার জন্য শিক্ষা দিয়েছে। এমনকি সম্পর্কের অবনতি ঘটার আশংকা দেখা দিলে উভয় পক্ষকেই কিছু কিছু ত্যাগ স্বীকার করে হলেও সমঝোতায় আসতে উদ্বুদ্ধ করেছে। এতদসত্ত্বেও যদি আল্লাহ না করুন—কোথাও এমন পরিস্থিতির উদ্ভব হয় যে, স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক রক্ষা করা সাধ্যের বাইরে চলে গেছে, তখন উভয়ের বৃহত্তর স্বার্থে উদ্ভূত অস্বস্থিকর অবস্থার অবসানে ও অসহনীয় দুর্ভোগপূর্ণ জীবনের শৃংখলমুক্ত হওয়ার জন্য অগত্যা বিবাহ বিচ্ছেদ বা তালাক দেয়া জায়েয। এহেন চরম পরিস্থিতিতেই ইসলামে তালাকের ব্যবস্থা রয়েছে।

বিবাহ বিচ্ছেদের ফলে স্বামীর চেয়ে স্ত্রী অধিক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সে জন্যে স্ত্রী নিজ অধিকারের অংশবিশেষ পরিত্যাগ করে হলেও স্বামীর সাথে সন্ধি করতে পারে। কিন্তু সন্ধির যাবতীয় সম্ভাবনা ব্যর্থ হয়ে গেলে পরস্পর বিচ্ছিন্ন হওয়ার অনুমতি আছে। এমতাবস্থায় আল্লাহ তার অসাধারণ ক্ষমতার বলে এদের পরস্পরকে উভয়ের অমুখাপেক্ষী করে দিতে পারেন। আল্লাহ তা'আলাই সর্ববিষয়ে কর্ম বিধায়ক। আল্লাহ স্ত্রীর জন্য তালাকদাতা স্বামীর চেয়ে শ্রেয় স্বামীর ব্যবস্থা করে দিতে পারেন; আবার স্বামীর জন্য পরিত্যক্ত স্ত্রীর চেয়ে ভাল স্ত্রী মিলিয়ে দিতে পারেন।

আলোচ্য আয়াতে স্বামীদের তুলনায় স্ত্রীদের প্রতিই অধিকতর সান্ত্বনার বাণী ঘোষিত হয়েছে। কারণ, স্বামী-স্ত্রীর বিচ্ছেদের ফলে স্বামীর তুলনায় স্ত্রীই অধিকতর ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সাধারণত স্ত্রীরাই তো অসহায় অবলা বিধায় একটা সম্পর্ক বিনষ্ট হওয়ার পর দ্বিতীয় কোনো সুবিধাজনক সম্পর্ক স্থাপনের সম্ভাবনায় তারা বিচলিত হয়ে পড়ে। বিশেষত আজকের সমাজে তাই পরিলক্ষিত হয়। আলোচ্য আয়াতে উভয়ের মধ্যে কেবল সবল পক্ষের সুবিধাজনক অবস্থানের কথা নাকচ করে দেয়া হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা উভয়ের পূর্বাবস্থার একটি সন্তোষজনক নতুন অবস্থার সূচনা করতে পারেন। আল্লাহ বিপুল, ব্যাপক ইহসান, রহমত ও কৃপার মালিক। তিনি সকল কাজে প্রজ্ঞাময়, কৌশলী ও সুক্ষ্মজ্ঞানী। আল্লাহ সর্বাবস্থায় মানুষের কল্যাণের ব্যবস্থা করেন।

আয়াতে আল্লাহ একটা সান্ত্বনার বাণী ব্যক্ত করে বলেছেন يُغْنِ اللَّهُ كُلا مِنْ سَعَتِهِ "আল্লাহ স্বামী-স্ত্রীর উভয়কে তার প্রাচুর্য দিয়ে অভাবমুক্ত করে দেবেন।" যখন পরস্পর সন্ধি-সমঝোতার যাবতীয় পথ রুদ্ধ হয়ে যায়-শত আন্তরিকতা সত্ত্বেও কোনোভাবেই যদি বিচ্ছেদের বিকল্প না থাকে। তখন আল্লাহ তা'আলাই তার প্রাচুর্য থেকে উভয়কেই পরস্পর থেকে আরও ভাল অবস্থায় নিয়ে যেতে পারেন। উভয়কে উভয়ের অভাবমুক্ত করে অধিকতর উত্তম ব্যবস্থা করা আল্লাহর জন্য অতি সহজ।

وَاللَّهُ أَعْلَمُ

📘 আল কুরআনে নারী 📄 মু’মিনগণ কি কোনো অমুসলিমকে বিয়ে করতে পারে?

📄 মু’মিনগণ কি কোনো অমুসলিমকে বিয়ে করতে পারে?


وَالْمُحْصَنَتُ مِنَ الْمُؤْمِنَتِ وَالْمُحْصَنَتُ مِنَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَبَ مِنْ قَبْلِكُمْ إِذَا أَتَيْتُمُوهُنَّ أُجُورَهُنَّ مُحْسِنِينَ غَيْرَ مُسَافِحِينَ وَلَا مُتَّخِذِى أَخْدَانٍ * وَمَنْ يُكْفُرُ بِالْإِيْمَانِ فَقَدْ حَبِطَ عَمَلُهُ : وَهُوَ فِي الْآخِرَةِ مِنَ الْخَسِرِينَ

"তোমাদের জন্যে হালাল করা হলো, মু'মিন সচ্চরিত্রা নারী আর তোমাদের আগে যাদের কিতাব দেয়া হয়েছিল তাদের সচ্চরিত্রা নারী; যখন তোমরা তাদের মোহর দাও তাদের স্ত্রী করার জন্যে; কামনা-বাসনা চরিতার্থ করার জন্যে কিংবা গুপ্ত প্রেমে লিপ্ত হওয়ার জন্যে নয়। আর যে কেউ ঈমানের নীতি অনুযায়ী চলতে অস্বীকার করে তার সকল আমল বরবাদ হয়ে যাবে এবং আখিরাতে সে মহাক্ষতির সম্মুখীন হবে।" -(সূরা আল-মায়িদাহ্: ৫)

আয়াতে 'মুহসানাত' محصنت শব্দের দু'টো অর্থ হতে পারে। এক, স্বাধীন ও মুক্ত, যার বিপরীত শব্দ ক্রীতদাসী। দুই, সচ্চরিত্রা ও সতী-সাধ্বী। অধিক সংখ্যক সাহাবী ও তাবেঈ আলিমের মতে এখানে দ্বিতীয় অর্থই প্রযোজ্য। অবশ্য এর অর্থ এ নয় যে, যারা সচ্চরিত্রা বা সতী-সাধ্বী নয় তাদের বিয়ে করা হারাম। বরং আয়াতের মর্মার্থ হলো মু'মিনদের উত্তম ও চরিত্রবানদের বিবাহ করার প্রতি উৎসাহিত করা। অর্থাৎ ব্যভিচারিণী বা পাপাচারিণী মহিলাদের বিবাহ করা কোনো সম্ভ্রান্ত মুসলিমের কাজ নয়। (মা'আরেফুল কুরআন, তাফসীরে মাযহারী থেকে)

আয়াতে الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَبَ "যাদের কিতাব দেওয়া হয়েছিল” বলে 'আহলে কিতাব' বা কিতাবী সম্প্রদায়কে বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ যাদের উপর আসমানী কিতাব নাযিল হয়েছিল। বর্তমানকালে ইয়াহুদী বা খৃষ্টান ছাড়া আর কোনো সম্প্রদায়কে আহলে কিতাব বলা যায় না। কারণ, আহলে কিতাব বলতে বুঝায় ঐসব সম্প্রদায়কে যারা কোনো আসমানী কিতাব পেয়েছে বা আসমানী কিতাবের অনুসারী বলে দাবী করে-আর তা কুরআন-সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত। তাওরাত ও ইনজীলই এমন কিতাব আজকের বিশ্বে যার অনুসরণের কিছু কিছু দাবীদার বর্তমানে বিদ্যমান রয়েছে। কিন্তু কুরআন মজীদের আরেকটি আয়াতে وَلَا تَنْكِحُوا الْمُشْرِكْتِ حَتَّى يُؤْمِنَّ “কোনো মুশরিক নারীকে বিয়ে করবে না, যতক্ষণ না তারা ঈমান আনে।” এ আয়াতের মর্মানুসারে বর্তমান বিশ্বের ইয়াহুদী খৃষ্টান মহিলাদের বিয়ে করাও নাজায়েয। কারণ, তারা ঈসা (আ)-কে সহ তিন খোদায় বিশ্বাসী এবং নানা প্রকার শিরকে লিপ্ত। হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে ওমর (রা)-এরও এ মত। (মা'আরেফুল কুরআন, আহকামুল কুরআন)

সূরা মায়িদাহ্র উক্ত আয়াতে আহলে কিতাব মহিলাদের বিয়ে করা হালাল বুঝালেও এ ধরনের বিয়ের ফলে কোনো মু'মিনের নিজের, তার সন্তান-সন্তুতির এবং সমগ্র মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য বাস্তবে যে অবশ্যম্ভাবী ক্ষতি ও অনিষ্ট দেখা দেবে তার প্রেক্ষিতে অধিকাংশ সাহাবী ও তাবেঈর মতে অমুসলিম আহলে কিতাব মহিলাকে বিয়ে করা মাকরূহ বা অনুচিত।

বর্ণিত আছে, হযরত হোযায়ফা ইবনে ইয়ামান (রা) মাদায়েন পৌঁছে জনৈকা ইয়াহুদী স্ত্রীলোকের পানি গ্রহণ করেন। হযরত ওমর ফারুক (রা) সংবাদ পেয়ে তাঁকে পত্র লিখে বললেন, "স্ত্রীলোকটিকে তালাক দিয়ে দাও।" হযরত হোযায়ফা উত্তরে লিখলেন, "সেকি আমার জন্য হারাম?” হযরত ওমর (রা) উত্তরে লিখলেন, "আমি হারাম বলছি না, কিন্তু ইয়াহুদী মহিলারা সাধারণত সচ্চরিত্রা বা সতী-সাধ্বী নয়। তাই আমার আশংকা, এ পথে না জানি তোমাদের পরিবারেও অশ্লীলতা ও ব্যভিচারের অনুপ্রবেশ ঘটে।" (আহকামুল কুরআন-জাস্সাস)

ইমাম মুহাম্মদ ইবনে হাসান 'কিতাবুল আছার' গ্রন্থে এ ঘটনাকে ইমাম আবূ হানীফা (রহ)-এর অভিমত বলে বর্ণনা করেছেন। তাতে বলা হয়েছে, দ্বিতীয়বার হযরত ওমর (রা) হোযায়ফাকে পত্রে বলেন: اعزم عليك ان لا تضع كتابي حتى تخلى سبيلها فاني اخاف ان يقتر يك المسلمون فيختاروا نساء اهل الذمة لجما لهن وكفى بذالك فتنة لنساء المسلمين অর্থাৎ “তোমাকে কসম দিয়ে বলছি, পত্র পাঠান্তে তা রেখে দেয়ার পূর্বেই তাকে তালাক দিয়ে মুক্ত করে দাও। আমার আশংকা, অন্য মুসলিমরাও না জানি তোমার পদাংক অনুসরণ করে বসে। ফলে তারা যিম্মী আহলে কিতাব মহিলাদের রূপ-সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে মুসলিম মহিলাদের পরিবর্তে তাদের বেশি পছন্দ করতে শুরু করে দেবে। মুসলিম মহিলাদের জন্য এ বড় বিপদ!" (কিতাবুল আছার: ১৫৬ পৃঃ)

আল্লামা ইবনে হুমাম 'ফতহুল কাদীর' গ্রন্থে বর্ণনা করেন, শুধু হোযায়ফা নয়, তালহা এবং কা'ব ইবনে মালেকও এরূপ ঘটনার সম্মুখীন হন। তাঁরাও সূরা মায়েদার এ আয়াত দৃষ্টে আহলে কিতাব মহিলাদের বিয়ে করেছিলেন। খলীফা হযরত ওমর (রা) এ সংবাদ পেয়ে তাদের প্রতি খুব অসন্তুষ্ট হন এবং তালাক দেয়ার নির্দেশ দেন। (তাফসীরে মাযহারী থেকে মা'আরেফুল কুরআন)

মুফতী মুহাম্মদ শফী (রহ) 'মা'আরেফুল কুরআনে' বলেন, ফারূকে আযমের যুগ ছিল সর্বোত্তম যুগ। কোনো ইয়াহুদী বা খৃষ্টান মহিলা মুসলমানদের সহধর্মিনী হয়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে চক্রান্ত করার সম্ভাবনা তখন ছিল না। তাদের মধ্যে ব্যভিচারের অভ্যাস মুসলমানদের পরিবার কলুষিত করতে পারে আর তাদের রূপ-সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে মুসলমানরা তাদের অগ্রাধিকার দিবে এবং মুসলিম মহিলারা বিপদের সম্মুখীন হবে- এটাই ছিল তখনকার যুগের একমাত্র আশংকা। এতটুকুন অনিষ্টকে সামনে রেখেই ফারুকে আযমের দূরদৃষ্টি উপরিউক্ত সাহাবীদের তাদের 'আহলে কিতাব' স্ত্রীদের তালাক দিতে বাধ্য করেছিলেন। যদি আজকালের চিত্র তাঁদের সামনে থাকতো, তবে অনুমান করুন, একে প্রতিরোধ করতে গিয়ে তাঁরা কত কঠোর কর্মপন্থাই না অবলম্বন করতেন? আজকাল যারা আদম শুমারীর খাতায় নিজেদেরকে ইয়াহুদী-খৃষ্টান নামে লিপিবদ্ধ করায় তাদের অনেকেই বিশ্বাসের দিক থেকে খৃষ্টবাদ ও ইয়াহুদীবাদকে অভিশাপ মনে করে। তারা যেমন তাওরাত-ইনজীলে বিশ্বাস করে না, তেমনি হযরত মূসা-ঈসাকে আল্লাহর রাসূল বলে স্বীকার করে না। বরং বিশ্বাসের দিক থেকে তারা পুরোপুরি নাস্তিক। শুধু জাতিগত কিংবা প্রথাগতভাবে নিজেদেরকে ইয়াহুদী বা খৃষ্টান বলে থাকে।

এমতাবস্থায় তাদের মহিলারা মুসলমানদের জন্য কিছুতেই হালাল নয়। যদি ধরে নেয়া যায় যে, তারা স্বীয় ধর্মের অনুসরণ করে, তবুও তাদের মুসলিম পরিবারে স্থান দেয়া গোটা পরিবারের জন্য দুনিয়া-আখিরাতের ধ্বংস ডেকে আনার শামিল। সুতরাং কুরআন-সুন্নাহ ও সাহাবায়ে কেরামের আদর্শের প্রেক্ষিতে আজকালকার তথাকথিত আহলে কিতাব মহিলাদের বিয়ে করা থেকে মুসলমানদের বিরত থাকা কর্তব্য।

📘 আল কুরআনে নারী 📄 স্ত্রীকে ‘মায়ের মত’ বললে সে তার মা হয়ে যায় না

📄 স্ত্রীকে ‘মায়ের মত’ বললে সে তার মা হয়ে যায় না


الَّذِينَ يُظْهِرُونَ مِنْكُمْ مِّنْ نِّসَائِهِمْ مَّاهُنَّ أُمَّهَتِهِمْ إِنْ أُمَّهُتُهُمْ إِلَّا الَّتِي وَلَدْنَهُمْ ، وَإِنَّهُمْ لَيَقُولُونَ مُنْكَرًا مِّنَ الْقَوْلِ وَزُوْرًا ، وَإِنَّ اللَّهَ لَعَفُوٌّ غَفُورُهُ

"তোমাদের মধ্যে যারা নিজেদের স্ত্রীদের সাথে যিহার করে, তাদের স্ত্রীরা তাদের মা নয়। তাদের মা তো তারা যারা তাদের জন্ম দিয়েছে। এ লোকেরা তো একটা অসংগত ও অসত্য কথা বলে। নিশ্চয়ই আল্লাহ পাপ মোচনকারী ও বড়ই ক্ষমাশীল।"-সূরা মুজাদালা: ২

তৎকালীন জাহেলিয়াতের যুগে এ যিহার করলে যিহারকারীর স্ত্রী তার জন্য মায়ের মতই হারাম হয়ে গেছে বলে তাকে আর স্ত্রীরূপে গণ্য করা হতো না। এ যুগেও অনেক অজ্ঞ-মূর্খ লোক ঝগড়া-ঝাটি করে না বুঝেশুনে নিজের স্ত্রীকে নিজের মা, বোন ও মেয়ের সাথে তুলনা দেয়। বলে, তুই আমার জন্য আমার মায়ের মত, তুই আমার জন্য আমার বোনের মত, তুই আমার জন্য আমার মেয়ের মত। এমন কথার স্পষ্ট অর্থ দাঁড়ায়, সে নিজের স্ত্রীকে এখন আর স্ত্রী মনে করে না, বরং তাকে সেই নারীদের মধ্যে গণ্য করে, যারা তার জন্য মুহরিম। এ ধরনের কথা বলাকে ফিকহের ভাষায় যিহার (ظهار) বলে। আরবী ভাষায় এ যিহার শব্দ যাহরুন থেকে নির্গত। এ র অর্থ সওয়ারী-যার ওপর সওয়ার হওয়া যায়। জনুযানকে আরবীতে যাহরুন (ظهر) বলা হয়। কেননা এর পিঠের উপর আরোহণ করা হয়। জাহেলিয়াতের সমাজে লোকেরা নিজের স্ত্রীকে নিজের জন্য হারাম করে দেয়ার উদ্দেশ্যে বলতো, তোমাকে 'যাহর'- সাওয়ারী বানানো আমার জন্য নিজের মাকে সাওয়ারী বানানোর মতই হারাম। এ কারণে এ ধরনের বাক্য বা উক্তি মুখে উচ্চারণ করাকে যিহার (ظهر) বলা হতো।

'যিহার' সম্পর্কে ইসলামের ফায়সালা হলো, কেউ যদি নির্লজ্জের মত নিজের স্ত্রীকে মা'র মত বলে, তবে তার একথায় সেই স্ত্রী তার মা হয়ে যেতে পারে না; না মার মত মর্যাদা, সম্ভ্রম ও পবিত্রতা পেতে পারে। মায়ের মা হওয়া একটা প্রকৃত ও বাস্তব ব্যাপার। কেননা সেই তো তাকে গর্ভে ধারণ করেছে, প্রসব করেছে। এ কারণে পুত্রের জন্য সে চিরতরে হারাম, চির সম্মানার্হ। কিন্তু যে নারী তাকে গর্ভে ধারণ করেনি, তাকে কেবল মুখে মা বললেই সে মা হয়ে যেতে পারে না। সাধারণ বিবেক-বুদ্ধি, নৈতিকতা; আইন কোনো একটি দিক দিয়ে কি তার জন্য সেই মর্যাদা-সম্ভ্রম ও পবিত্রতা হতে পারে যা বাস্তবতার কারণে প্রকৃত গর্ভধারিণী ও জন্মদায়িনী মা'র জন্য রয়েছে? এ কারণে জাহেলিয়াতের যুগের নিয়মকে আল্লাহ তাআলা বাতিল ঘোষণা করেছেন। তখন যিহারকারী স্বামীর সাথে তার স্ত্রীর বিবাহ সম্পর্ক চিরতরে ছিন্ন হয়ে যেতো এবং সে তার জন্য তার মায়ের মতই চিরকালের জন্য হারাম হয়ে যেতো। আল্লাহর এই ঘোষণার ফলে এ বদ রসমের চির অবসান হয়ে গেল।

স্ত্রীকে মায়ের সাথে তুলনা করা—বলে দেয়া যে তুমি আমার মায়ের মত। এতো এক হাস্যকর, অর্থহীন ও অত্যন্ত লজ্জাকর ব্যাপার। কোনো সুস্থ মস্তিষ্কের লোক—কোনো ভদ্র ব্যক্তি এর কল্পনাও করতে পারে না, করা উচিত নয়। মুখে উচ্চারণ করা তো দূরের কথা। দ্বিতীয়ত, একথা আসলেও মিথ্যা। কেননা কেউ যদি বলে তার স্ত্রী এখন তার মা হয়ে গেছে, তাহলে সে তো সম্পূর্ণ মিথ্যা কথা বলে ফেললো। আর যদি সে এরূপ কথা বলে বুঝাতে চায় যে, তার স্ত্রী এখন তার মায়ের মতই হারাম হয়ে গেছে, সে তাকে তার মায়ের মর্যাদা দিয়েছে, তবে তাও সম্পূর্ণ অসত্য কথা, পুরোপুরি মিথ্যাবাদী। কেননা কেউ যদি নিজ ইচ্ছা মত কোনো স্ত্রীলোককে কখনো নিজ স্ত্রী বানাবে, আবার কখনো মায়ের মর্যাদা দিবে—এরূপ অধিকার আল্লাহ তাআলা তাকে দেননি। আইন-বিধান রচয়িতা সে নিজে নয়—আল্লাহই শরীয়ত রচয়িতা বিধানদাতা।

আর আল্লাহ তাআলা তো প্রসবকারিণী মা'র সাথে দাদী, নানী ও শাশুড়ী, দুধ সেবন করিয়েছে যে নারী এবং নবীর স্ত্রীগণকে মায়ের মর্যাদায় ভূষিত করেছেন। কেউ নিজের ইচ্ছামত অপর কোনো নারীকে এর মধ্যে শামিল করার অধিকার আল্লাহ কাউকে দান করেননি। যে মহিলা তার স্ত্রী হয়ে আছে তাকে 'এর মধ্যে গণ্য করার তো প্রশ্নই আসে না। আল্লাহ তাআলার উক্ত ঘোষণা থেকে আইনের এ ধারাটি জানা গেল যে, 'যিহার' করা অতি বড় গুনাহ ও হারাম কাজ। যে লোক এ কাজ করে, সে কঠিন শাস্তি পাওয়ার যোগ্য।

কিন্তু আল্লাহ তাআলার অসীম অনুগ্রহ এই যে, তিনি প্রথমত 'যিহার' সংক্রান্ত জাহেলিয়াতের প্রথাকে বাতিল ঘোষণা করে মুমিনদের পারিবারিক ও দাম্পত্য জীবনকে বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করেছেন। আর দ্বিতীয়ত, এ কাজ যারা করে তাদের জন্য অত্যন্ত সহজ ও হালকা ধরনের শাস্তি নির্দিষ্ট করেছেন। এমন কাজের শাস্তি এর চেয়ে অধিক সহজ ও হালকা আর কি হতে পারে? তাছাড়া আল্লাহর বড় অনুগ্রহ এই যে, এ শাস্তি কোনো বেত্রাঘাত কিংবা নির্যাতন রূপে নয় বরং কয়েকটি ইবাদাত ও নেক কাজ রূপেই ধার্য হয়েছে। এ কাজগুলো এমন যে এতে করে মুমিনদের নফসের পরিশুদ্ধি করণ এবং মুমিনদের সমাজে কল্যাণ প্রসারে বিশেষ কার্যকর।

প্রসংগত উল্লেখ্য, ইসলামে কোনো কোনো অপরাধের শাস্তি বিধানে কাফ্ফারা স্বরূপ কতিপয় ইবাদাত নির্দিষ্ট করা হয়েছে। এ পর্যায়ের ইবাদাতগুলোতে ইবাদাত ও শাস্তি-এ দুটো দিকই পুরো মাত্রায় বর্তমান। এসব পালন করতে যেমন শাস্তির কষ্ট ভোগ করতে হয় তেমনি সেই সাথে একটি নেক ও ইবাদাতের কাজ করে নিজের গুনাহের প্রায়শ্চিত্তও করে নিতে পারে।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা.-এর বর্ণনা অনুযায়ী ইসলামের যুগে যিহার সংক্রান্ত ব্যাপার সর্বপ্রথম হযরত আউস ইবনে সামেত দ্বারা সংঘটিত হয়েছিল। তাঁর স্ত্রী হযরত খাওলার আকুল আর্তনাদের ফলেই যিহারের কারণে উদ্ভূত সমস্যার সমাধান স্বরূপ এ আয়াতসমূহ নাযিল হয়।

সূরার ২য় ও ৩য় আয়াতে যিহারের সমাধান সম্পর্কে নির্দেশ নাযিল হয়। যার তরজমা হলো এই- "যারা নিজেদের স্ত্রীদের সাথে 'যিহার' করে, পরে নিজের সেই কথা থেকে ফিরে যায়, যা তারা বলেছিল। পরস্পরকে স্পর্শ করার পূর্বেই তাদেরকে একটি দাস মুক্ত করতে হবে। একথা দিয়ে তোমাদের উপদেশ দেয়া হচ্ছে। তোমরা যাকিছু করো আল্লাহ সে বিষয়ে অবহিত আছেন। যে মুক্ত করার জন্য দাস পাবে না সে যেন একাধারে দু মাস রোযা রাখে পরস্পরকে স্পর্শ করার পূর্বে। আর যে লোক এটাও করতে সমর্থ নয় সে যেন ষাটজন মিসকীনকে খাবার খাওয়ায়। এ নির্দেশ এজন্যে যে তোমরা যেন আল্লাহ ও তাঁর রসূলের প্রতি ঈমান আন। এটাই আল্লাহর দেয়া সীমারেখা। আর কাফিরদের জন্য রয়েছে মর্মান্তিক শাস্তি।

উপরোক্ত আয়াত দুটোতে কেউ যিহার করলে তার প্রতিবিধান স্বরূপ তিনটে বিকল্প ইবাদাতমূলক কাজ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ যিহারকারী তার স্ত্রীকে স্ত্রী হিসেবে রাখার জন্য তার যিহার করার অযৌক্তিক অন্যায় কথার কাফ্ফারা স্বরূপ তাকে একটি গোলাম আযাদ করতে হবে। তার যদি গোলাম আযাদ করার সামর্থ না থাকে তাহলে একাধারে ষাট দিন রোযা রাখতে হবে, আর যদি সে রোযা রাখার সমর্থও না রাখে তবে তার কাফ্ফারা হলো ষাটজন মিসকীনকে খাবার খাওয়াবে। ব্যাস, যিহারকারী উপরোক্ত তিনটি কাজের মধ্য থেকে সামর্থানুযায়ী যে কোনো একটি কাজ করলেই তার স্ত্রীকে পূর্বের ন্যায় স্ত্রী হিসেবে গণ্য করতে পারবে।

ফন্ট সাইজ
15px
17px