📘 আল কুরআনে নারী 📄 বিচ্ছিন্নতার চেয়ে আপোষ-মীমাংসা উত্তম

📄 বিচ্ছিন্নতার চেয়ে আপোষ-মীমাংসা উত্তম


وَإِنِ امْرَأَةً خَافَتْ مِنْ بَعْلِهَا نُشُورًا أَوْ إِعْرَاضًا فَلَا جُنَاحَ عَلَيْهِمَا أَنْ يُصْلِحَا بَيْنَهُمَا صُلْحًا ، وَالصُّلْحُ خَيْرٌ وَأُحْضِرَتِ الْأَنْفُسُ الشُّحَّ ، وَإِنْ تُحْسِنُوا وَتَتَّقُوا فَإِنَّ اللَّهَ كَانَ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرًا (النساء : ১২৮)

"কোনো স্ত্রী যদি তার স্বামী থেকে দুর্ব্যবহার ও উপেক্ষার আশংকা করে, তবে তারা আপোষ-নিষ্পত্তি করতে চাইলে তাদের কোনো দোষ নেই; আপোষ নিষ্পত্তিই উত্তম। মানুষ লোভের কারণে স্বভাবতই কৃপণ। আর তোমরা যদি ইহসানকারী ও মুত্তাকী হও, তবে তোমরা যা করো আল্লাহ তার খবর রাখেন।"-(সূরা আন নিসা : ১২৮)

ইসলামী সমাজের জন্য বিবাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। বিবাহের মাধ্যমে সমাজের একটি ভিত্তি অর্থাৎ পরিবার গড়ে উঠে। মূলত এ বিবাহ প্রথা একটি সমাজের অপরিহার্য আবশ্যকীয় ইউনিট। যে সমাজে এ ভিত্তি যত মযবুত হবে সে সমাজ তত সুন্দর ও সুশৃংখল হবে। তাই ইসলামী শরীয়ত বিবাহ ব্যবস্থাকে সর্বদিক থেকে সুদৃঢ় ও সুশৃংখলভাবে আনজাম দানের ও সংরক্ষণের বিভিন্ন বিধি বিধান দিয়েছে। বিবাহ বিচ্ছেদ ইসলামের দৃষ্টিতে অত্যন্ত ঘৃণিত কাজ। এজন্যে আল কুরআন স্বামী-স্ত্রীকে যেমন একদিকে ন্যায্য অধিকার লাভের আইনগত সুযোগ দিয়েছে; অন্যদিকে ধৈর্য, সংযম ও পারস্পরিক সুসম্পর্ক সৃষ্টি ও সংরক্ষণের প্রতি উৎসাহিত করেছে। আর বিবাহ বিচ্ছেদ থেকে যথাসাধ্য বিরত থাকার জন্য শিক্ষা দিয়েছে। এমনকি সম্পর্কের অবনতি ঘটার আশংকা দেখা দিলে উভয় পক্ষকেই কিছু কিছু ত্যাগ স্বীকার করে হলেও সমঝোতায় আসতে উদ্বুদ্ধ করেছে। এতদসত্ত্বেও যদি আল্লাহ না করুন—কোথাও এমন পরিস্থিতির উদ্ভব হয় যে, স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক রক্ষা করা সাধ্যের বাইরে চলে গেছে, তখন উভয়ের বৃহত্তর স্বার্থে উদ্ভূত অস্বস্থিকর অবস্থার অবসানে ও অসহনীয় দুর্ভোগপূর্ণ জীবনের শৃংখলমুক্ত হওয়ার জন্য অগত্যা বিবাহ বিচ্ছেদ বা তালাক দেয়া জায়েয। এহেন চরম পরিস্থিতিতেই ইসলামে তালাকের ব্যবস্থা রয়েছে।

বিবাহ বিচ্ছেদের ফলে স্বামীর চেয়ে স্ত্রী অধিক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সে জন্যে স্ত্রী নিজ অধিকারের অংশবিশেষ পরিত্যাগ করে হলেও স্বামীর সাথে সন্ধি করতে পারে। কিন্তু সন্ধির যাবতীয় সম্ভাবনা ব্যর্থ হয়ে গেলে পরস্পর বিচ্ছিন্ন হওয়ার অনুমতি আছে। এমতাবস্থায় আল্লাহ তার অসাধারণ ক্ষমতার বলে এদের পরস্পরকে উভয়ের অমুখাপেক্ষী করে দিতে পারেন। আল্লাহ তা'আলাই সর্ববিষয়ে কর্ম বিধায়ক। আল্লাহ স্ত্রীর জন্য তালাকাদাতা স্বামীর চেয়ে শ্রেয় স্বামীর ব্যবস্থা করে দিতে পারেন; আবার স্বামীর জন্য পরিত্যক্ত স্ত্রীর চেয়ে ভাল স্ত্রী মিলিয়ে দিতে পারেন।

আলোচ্য আয়াতে স্বামীদের তুলনায় স্ত্রীদের প্রতিই অধিকতর সান্ত্বনার বাণী ঘোষিত হয়েছে। কারণ, স্বামী-স্ত্রীর বিচ্ছেদের ফলে স্বামীর তুলনায় স্ত্রীই অধিকতর ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সাধারণত স্ত্রীরাই তো অসহায় অবলা বিধায় একটা সম্পর্ক বিনষ্ট হওয়ার পর দ্বিতীয় কোনো সুবিধাজনক সম্পর্ক স্থাপনের সম্ভাবনায় তারা বিচলিত হয়ে পড়ে। বিশেষত আজকের সমাজে তাই পরিলক্ষিত হয়। আলোচ্য আয়াতে উভয়ের মধ্যে কেবল সবল পক্ষের সুবিধাজনক অবস্থানের কথা নাকচ করে দেয়া হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা উভয়ের পূর্বাবস্থার একটি সন্তোষজনক নতুন অবস্থার সূচনা করতে পারেন। আল্লাহ বিপুল, ব্যাপক ইহসান, রহমত ও কৃপার মালিক। তিনি সকল কাজে প্রজ্ঞাময়, কৌশলী ও সুক্ষ্মজ্ঞানী। আল্লাহ সর্বাবস্থায় মানুষের কল্যাণের ব্যবস্থা করেন। আয়াতে আল্লাহ একটা সান্ত্বনার বাণী ব্যক্ত করে বলেছেন يُغْنِ اللَّهُ كُلا مِنْ سَعَتِهِ "আল্লাহ স্বামী-স্ত্রীর উভয়কে তার প্রাচুর্য দিয়ে অভাবমুক্ত করে দেবেন।" যখন পরস্পর সন্ধি-সমঝোতার যাবতীয় পথ রুদ্ধ হয়ে যায়-শত আন্তরিকতা সত্বেও কোনোভাবেই যদি বিচ্ছেদের বিকল্প না থাকে। তখন আল্লাহ তা'আলাই তার প্রাচুর্য থেকে উভয়কেই পরস্পর থেকে আরও ভাল অবস্থায় নিয়ে যেতে পারেন। উভয়কে উভয়ের অভাবমুক্ত করে অধিকতর উত্তম ব্যবস্থা করা আল্লাহর জন্য অতি সহজ।

আলোচ্য আয়াতে আল্লাহ তা'আলা স্বামী তার স্ত্রী থেকে বীতস্পৃহ ও পরাস্সুম হওয়ার অবস্থায় তাদের পালনীয় বিধান বলে দিয়েছেন। কোনো স্ত্রীর ব্যাপারে তার স্বামী বিরাগভাজন বা উপেক্ষার ভাব দেখে যদি স্ত্রী তার প্রাপ্য বা দাবীর আংশিক ছেড়ে দিয়েও ঐ স্বামীর সাথে থাকতে চায় আর স্বামী এ সুযোগ গ্রহণ করে স্ত্রীর প্রস্তাবে সম্মত হয়; তবে এ ধরনের আপোষ মীমাংসার বিষয়ে-আলোচ্য আয়াত নাযিল হয়েছে। আয়াতে এ জাতীয় আপোষ-মীমাংসায় শরীয়তের কোনো বাধা নেই। বাহ্যিকভাবে এটা ঘুষের মত মনে হলেও এটা আসলে কোনো গুনাহর কাজ নয়। ঘুষের মত মনে হওয়ার কারণ, এতে স্বামীকে মোহরানা বা অন্যান্য পাওনা থেকে অব্যাহতির প্রলোভন দেখিয়ে দাম্পত্য বন্ধন অটুট রাখা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে এতে উভয়ই কিছু কিছু স্বার্থ ত্যাগ করে সমঝোতা ও মধ্যপন্থা অবলম্বন করে মাত্র। সুতরাং এটা সম্পূর্ণ জায়েয।

ইমাম বুখারী (র) বলেন, হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত আছে, এমনো দেখা যায়, কোনো স্ত্রী বৃদ্ধা হয়ে যাওয়ার কারণে স্বামী তার প্রতি বিরাগ হয়ে তাকে তালাক প্রদান করতে চায়, এতে স্ত্রী স্বামীর কাছে নিজের পাওনা হকের দাবী ত্যাগ করেও তাকে স্বামী হিসাবে বহাল রাখতে চায়। এ ব্যাপারেই আলোচ্য আয়াত নাযিল হয়েছে।

হযরত ইবনে আব্বাস (রা) থেকে ধারাবাহিকভাবে ইকরামা, সিমাক ইবনে হারব, সুলাইমান ইবনে মুআয ও আবু দাউদ আত তায়ালেসী বর্ণনা করেন, হযরত সাওদা (রা) আশংকা করেছিলেন যে, নবী করীম (স) তাঁকে তালাক দিতে পারেন। তখন তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে তালাক দিবেন না। আমার সাথে আপনার রাত যাপন বিষয়ক হক আমি আয়েশা (রা)-কে দিচ্ছি। নবী করীম (সা) তাই করলেন। তখন আলোচ্য আয়াতটি নাযিল হয়।

একদা জনৈক ব্যক্তি হযরত আলী (রা)-এর কাছে এসে তাঁকে আলোচ্য আয়াতের ব্যাখ্যা জিজ্ঞেস করলে হযরত আলী (রা) বললেন, কেউ তাঁর স্ত্রীর রূপহীনতা, বার্ধক্য, কর্কশ স্বভাব অথবা অপরিপচ্ছন্নতার কারণে তার প্রতি বীতরাগ ও বীতস্পৃহ হয়ে তাকে তালাক দিতে চাইলে এবং স্ত্রীর কাছে তালাক অনভিপ্রেত ও অনাকাঙ্ক্ষিত হলে স্ত্রী যদি মোহরানার অংশবিশেষের দাবী অথবা স্বামীর কাছে তার রাত্রী যাপনের অংশ বিশেষের দাবী ত্যাগ করে, তবে তা জায়েয ও বৈধ। স্বামীর উক্ত সুবিধা গ্রহণ করায় কোনো দোষ নেই।

وَالصَّلْحُ خَيْرٌ - "আপোষ নিষ্পত্তিই উত্তম।" আয়াতাংশের স্বাভাবিক তাৎপর্য এই যে, স্ত্রীকেই স্বীয় অধিকারের অংশবিশেষ ত্যাগ করা এবং স্বামী কর্তৃক এর বিনিময়ে স্ত্রীকে তালাক প্রদান থেকে বিরত থাকা তাদের বিচ্ছেদ অপেক্ষা অধিকতর শ্রেয়। হযরত সাওদা বিনতে যামআ (রা) কর্তৃক নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে প্রাপ্য রাত্রিবাসের অধিকার হযরত আয়েশা (রা)-কে দেয়ার বিনিময়ে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কর্তৃক তাকে তালাক প্রদান থেকে বিরত থাকার ঘটনা উক্ত আয়াতে বর্ণিত সন্ধির একটি দৃষ্টান্ত। আর নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মাতের জন্য এ দৃষ্টান্ত স্থাপন করে যান। প্রকৃত কথা এই যে, 'তালাক' আল্লাহর কাছে অনভিপ্রেত বিষয়। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা) থেকে বর্ণিত। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, হালাল কাজসমূহের মধ্যে আল্লাহর কাছে অধিকতর অনভিপ্রেত কাজ হচ্ছে তালাক।

وَإِنْ تُحْسِنُوا وَتَتَّقُوا فَإِنَّ اللَّهَ كَانَ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرًا - "আর তোমরা যদি ইহসানকারী ও মুত্তাকী হও, তবে তোমরা যা কর আল্লাহ তার খবর রাখেন।"-অর্থাৎ তোমাদের অপসন্দনীয় ও অনভিপ্রেত স্ত্রীদের ত্রুটি ও অযোগ্যতা তোমরা সহ্য করে তাদের সাথে বৈষম্যহীন আচরণ করলে আল্লাহ তোমাদের সে আচরণ ও কাজ সম্পর্কে সম্যক অবগত থাকেন, আর তিনি সে জন্য তোমাদের পূর্ণ পুরস্কার প্রদান করবেন।”

وَأُحْضِرَتِ الْأَنْفُسُ الشُّحَّ - আয়াতাংশের আরেক তরজমা হলো, “নফস স্বভাবতঃ সংকীর্ণতার দিকেই ঝুঁকে পড়ে।” এ অর্থে স্বামী-স্ত্রীর সংকীর্ণতার তাৎপর্য হলো স্ত্রীলোক যদি নিজের মধ্যে স্বামীর চোখে অবাঞ্ছিতা হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে বলে মনে করে, আর তা সত্ত্বেও সে যদি বাঞ্ছিতা স্ত্রীর মত ব্যবহার পাওয়ার প্রত্যাশা করে, তবে এটাই হবে তার সংকীর্ণতা। পক্ষান্তরে যে স্ত্রীলোকটির স্থান স্বামীর মন থেকে মুছে যাওয়ার পরও সে ঐ স্বামীর সাথেই অবস্থান করতে চায়, আর স্বামী যদি এ স্ত্রীকে অত্যধিক কোণঠাসা করতে চায় এবং তার অধিকার চরম- ভাবে হরণ করতে চায়, তবে এটা হবে স্বামীর দিক থেকে সংকীর্ণতা।

জাহেলী যুগে এক এক ব্যক্তি সীমা সংখ্যাহীন স্ত্রী গ্রহণ করতে পারতো, এ ব্যাপারে তার ছিল পূর্ণ স্বাধীনতা। অথচ সেই অসংখ্য স্ত্রীদের ছিলো না কোনো নির্দিষ্ট অধিকার। সূরা আন-নিসার প্রাথমিক আয়াতসমূহে এ স্বাধীনতার উপর দু' ধরনের বিধিনিষেধ আরোপ করা হলো। এক: স্ত্রীদের সংখ্যা চার পর্যন্ত সীমাবদ্ধ হয়ে গেল-এর অধিক এক সাথে বিবাহ করা হারাম ঘোষিত হলো। দুই: এ একাধিক স্ত্রী গ্রহণের ব্যাপারেও 'আদল' বা সর্বক্ষেত্রে সাম্য প্রতিষ্ঠার শর্ত আরোপ করা হলো। এমতাবস্থায় প্রশ্ন উত্থাপিত হলো, কারো স্ত্রী যদি বন্ধা বা চির রুগ্না হয় অথবা স্বামীর সাথে সম্পর্ক রক্ষা করার যোগ্য না হয়, আর স্বামী যদি দ্বিতীয় স্ত্রী গ্রহণে বাধ্য হয়, তখন উভয় স্ত্রীর প্রতি সমান আকর্ষণ রাখা, সমান ভালবাসা পোষণ করা, দৈহিক সম্পর্কের ব্যাপারেও পূর্ণ সমতা রাখা কি তার জন্য অবশ্য কর্তব্য হবে? আর সে যদি তা না করে তবে দ্বিতীয় বিবাহ করার পূর্বে প্রথমা স্ত্রীকে তালাক দেয়াই কি উপরোক্ত শর্তের দাবী? অধিকন্তু প্রথম স্ত্রী যদি বিচ্ছিন্ন হতে না চায়, তবে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে এমন কোনো সমঝোতা হতে পারে কি, যাতে করে অবাঞ্ছিতা স্ত্রী নিজের কোনো অধিকার ও দাবী ত্যাগ করে স্বামীকে তালাক দেয়া থেকে বিরত রাখবে? বস্তুত আলোচ্য আয়াতসমূহে এসব প্রশ্নেরই উত্তর দেয়া হয়েছে।

এসব আয়াতে বর্ণিত আল্লাহর নির্দেশাবলীর মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলা পুরুষদের মধ্যে উদারতার ভাবধারা জাগ্রত করতে চান। আল্লাহ তা'আলা পুরুষকে তার স্ত্রীর প্রতি কোনো আকর্ষণ না থাকলেও স্ত্রীলোকটির সাথে ভাল ব্যবহার ও সদাচরণের আহ্বান জানিয়েছেন। কারণ স্ত্রীলোকটি তো তার সাথে দীর্ঘ সময় জীবন কাটিয়েছে। বহু বছর পর্যন্ত সে পুরুষটির জীবন সংগিনী হয়ে রয়েছে। সাথে সাথে সেই আল্লাহকে ভয় করে চলার নির্দেশ দিয়েছেন, যিনি কোনো মানুষের দোষ-ত্রুটির কারণে নিজের অনুগ্রহের দৃষ্টি অন্য দিকে ফিরিয়ে নিলে এবং তার ভাগ্যের অংশ হ্রাস করে দিলে এ দুনিয়ায় তার আশ্রয় গ্রহণের দ্বিতীয় কোনো স্থানই অবশিষ্ট থাকে না।

وَأُحْضِرَتِ الْأَنْفُسُ الشُّحَّ - আয়াতাংশের অপর একটি তরজমা হলো, "প্রত্যেক অন্তরেই লোভ বিদ্যমান রয়েছে।" এর তাৎপর্য হলো, স্ত্রী হয়তো মনে করবে যে, আমাকে বিদায় করে দিলে সন্তানাদির জীবন বরবাদ হবে, অথবা অন্যত্র আমার জীবন হয়তো আরও দুর্বিসহ হয়ে পড়বে। তার চেয়ে বরং এখানে কিছু ত্যাগ স্বীকার করে পড়ে থাকাই ভাল। পক্ষান্তরে স্বামী হয়তো মনে করবে যে দায়-দায়িত্ব হতে যখন অনেকটা রেহাই পাওয়া গেল, তখন তাকে বিবাহ বন্ধনে রাখতে ক্ষতি কি? অতএব এভাবে অনায়াসে সমঝোতা হতে পারে।

টিকাঃ
-(মা'আরেফুল কুরআন-মুফতী মুহাম্মদ শফী (র)), (ইবনে কাসীর), (তাফহীমুল কুরআন)]

📘 আল কুরআনে নারী 📄 এক স্ত্রীর প্রতি ঝুঁকে গিয়ে অন্য স্ত্রীকে ঝুলন্ত রেখো না

📄 এক স্ত্রীর প্রতি ঝুঁকে গিয়ে অন্য স্ত্রীকে ঝুলন্ত রেখো না


وَلَنْ تَسْتَطِيعُوا أَنْ تَعْدِلُوا بَيْنَ النِّسَاءِ وَلَوْ حَرَصْتُمْ فَلَا تَمِيلُوا كُلَّ المَيْلِ فَتَذَرُوهَا كَالْمُعَلَّقَةِ ، وَإِنْ تُصْلِحُوا وَتَتَّقُوا فَإِنَّ اللَّهَ كَانَ غَفُورًا رَّحِيمًا (النساء : ১২৯)

"আর তোমরা যতই ইচ্ছা করো না কেন, তোমাদের স্ত্রীদের প্রতি সমান ব্যবহার কখনোই করতে সক্ষম হবে না। সুতরাং তোমরা একজনের দিকে সম্পূর্ণরূপে ঝুঁকে পড়ো না, আর অন্যকে ঝুলন্ত অবস্থায় রেখো না। তোমরা যদি নিজেদের সংশোধন করো আর সাবধান হও, তবে আল্লাহ ক্ষমাশীল পরম দয়ালু।" -(সূরা আন নিসা: ১২৯)

আলোচ্য আয়াতে একাধিক স্ত্রীর সাথে বৈষম্যহীন আচরণ সম্পর্কিত একটি বাস্তব অবস্থা ও পরিস্থিতির কথাই ব্যক্ত করা হয়েছে। আল্লাহ বলেন, তোমরা কখনো স্ত্রীদের সাথে বৈষম্যহীন আচরণ বজায় রাখতে সক্ষম হবে না। যদিও স্ত্রীদের মধ্যে সমান আচরণ করতে তোমরা আন্তরিকও হও। কারণ, স্ত্রীদের সাথে রাতযাপনে বা দৈহিক সম্পর্ক স্থাপনে বাহ্যিক সাম্য বজায় রাখা সম্ভব হলেও অন্তরের আকর্ষণ, ভালবাসা ও যৌন মিলনে বৈষম্য ও তারতম্য অবশ্যই থেকে যাবে। এটা হযরত ইবনে আব্বাস (রা), উবায়দা আসলামী, মুজাহিদ ও হাসান বসরী প্রমুখেরও ব্যাখ্যা।

হযরত ইবনে আবু সুলায়কা বলেন, আয়াতটি হযরত আয়েশা (রা) সম্পর্কে নাযিল হয়েছে। কারণ নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত আয়েশা (রা)-কে অন্য যে কোনো স্ত্রীর চেয়ে বেশী ভালবাসতেন। হযরত আয়েশা (রা) থেকে আবদুল্লাহ ইবনে ইয়াযীদ, আবু কুলাবা, আইউব ও হাম্মাদ ইবনে সালমা প্রমুখ রাবীর সূত্রে ইমাম আহমদ এবং সুনান সংকলকগণ বর্ণনা করেছেন: রাসূলুল্লাহ (স) নিজ স্ত্রীদের বৈষম্যহীন নীতি অনুসরণ করে চলতেন আর বলতেন, "আয় আল্লাহ যে বিষয়ে আমার ক্ষমতা রয়েছে সে বিষয়ে আমি এরূপ বণ্টন করলাম। যে বিষয়ে কেবল তোমরাই ক্ষমতা রয়েছে আমার ক্ষমতা নাই, সে বিষয়ে আমাকে ভর্ৎসনা করো না। তিনি ক্ষমতা বহির্ভূত বিষয় বলতে মনের আকর্ষণকে বুঝিয়েছেন। (ইবনে কাসীর)

এ আয়াতে فَتَذَرُوهَا كَالْمُعَلَّقَةِ অর্থ স্ত্রীলোকটির অবস্থা এমন যে, স্বামী থেকেও না থাকার মত অথচ সে তালাক প্রাপ্তাও নয়। হযরত আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে লোকের দু'টো স্ত্রী রয়েছে সে যদি এক স্ত্রীর প্রতি সম্পূর্ণ রূপে ঝুঁকে পড়ে থাকে, তবে কিয়ামতের দিন তার শরীরের এক অংশ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় উপস্থিত হবে। (ইবনে কাসীর)

আলোচ্য আয়াতের ভাবার্থ হলো, মানুষ দুই বা ততোধিক স্ত্রীর মধ্যে পূর্ণ সমতা রাখতে পারে না। কারণ একজন সুন্দরী অপরজন কুশ্রী, একজন যুবতী অন্যজন বয়স্কা, একজন রুগ্ন আরেকজন স্বাস্থ্যবতী, একজন কঠোর স্বভাবের, অন্যজন মধুর মেজাযের-স্ত্রীদের মধ্যে এরূপ আরও অনেক পার্থক্য থাকতে পারে। যে কারণে একজনের প্রতি স্বভাবতই অধিক আকর্ষণ ও অন্যজনের প্রতি কম আকর্ষণ হওয়া অসম্ভব কিছু নয়। এমতাবস্থায় প্রেম, ভালবাসা, মনের আকর্ষণ ও দৈহিক সম্পর্কের দিক থেকে উভয়ের সাথে সমতা রক্ষা করে চলতে হবে-আইন এমনটি দাবী করেনি। বরং আইনের দাবী হলো আকর্ষণের তারতম্য থাকা সত্ত্বেও যখন তুমি একটা স্ত্রীকে তালাক দাওনি এবং তাকে তোমার নিজের ইচ্ছায় অথবা তার বাসনায় এখনো স্ত্রী হিসেবেই রেখেছ। তখন তার সাথে এতটুকু সম্পর্ক অবশ্যই রাখতে হবে যাতে করে সে স্বামীহীনার মত হয়ে না পড়ে। উপরিউক্ত অবস্থায় একজন অপেক্ষা আরেকজনের প্রতি অধিক আকর্ষণ বা কম আকর্ষণ থাকা একেবারেই স্বাভাবিক ব্যাপার। কিন্তু তাই বলে তাকে এমনভাবে ফেলে রাখা যাবে না যাতে করে মনে হতে পারে যে তার কোনো স্বামী নেই। (তাফহীমুল কুরআন)

এ আয়াত থেকে কোনো কোনো লোক সিদ্ধান্ত নেয়ার চেষ্টা করেছে যে, কুরআন একদিকে সমতা রক্ষার শর্ত সাপেক্ষে বহু বিবাহের অনুমতি দিয়েছে, আর অপরদিকে সমতা রক্ষা অসম্ভব বলে সেই অনুমতিকে কার্যত বাতিল করে দিয়েছে। প্রকৃতপক্ষে এরূপ সিদ্ধান্ত নেয়ার কোনো অবকাশই এ আয়াতে নেই। কারণ, কুরআন যদি "তোমাদের স্ত্রীদের মধ্যে সমতা রক্ষা করতে পারবে না" বলেই কথা শেষ করে দিতো, তাহলে এরূপ একটা সিদ্ধান্ত নেয়ার যুক্তি দেখানো যেত। কিন্তু কুরআনে একটু পরেই বলা হয়েছে "একজন স্ত্রীকে একদিকে ঝুলিয়ে রেখে অন্যজনের দিকে একেবারেই ঝুঁকে পড়বে না।” একথা বলে উপরিউক্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার কোনো অবকাশ রাখেনি। আসলে খ্রীষ্টান ইউরোপের অনুসরণ করতে গিয়েই লোকেরা এরূপ সিদ্ধান্ত নিতে আগ্রহী হয়ে উঠে। (তাফহীমুল কুরআন)

আয়াতের শেষাংশের বক্তব্যও অনিচ্ছাকৃত মনের আকর্ষণকে দোষণীয় বলে প্রকাশ করা হয়নি। বলা হয়েছে: وَإِنْ تُصْلِحُوا وَتَتَّقُوا فَإِنَّ اللَّهَ كَانَ غَفُورًا رَّحِيمًا - অর্থাৎ "তুমি যদি নিজে যুলম করা থেকে নিজেকে বিরত রাখ, আর ইনসাফ করার যথাসাধ্য চেষ্টা কর, তবে স্বাভাবিক দুর্বলতার কারণে অনিচ্ছাকৃত কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতি হয়ে গেলে আল্লাহ নিশ্চয় তা মাফ করবেন।"

وَاللَّهُ أَعْلَمُ

📘 আল কুরআনে নারী 📄 বিচ্ছেদের বিকল্প না থাকলে আল্লাহই প্রত্যেকের সহায়

📄 বিচ্ছেদের বিকল্প না থাকলে আল্লাহই প্রত্যেকের সহায়


وَإِنْ يَّতَفَرَّقَا يُغْنِ اللَّهُ كُلاً مِّنْ سَعَتِهِ ، وَكَانَ اللَّهُ وَاسِعًا حَكِيمًا

"স্বামী-স্ত্রী যদি পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তবে আল্লাহ তার প্রাচুর্য দিয়ে তাদের প্রত্যেককে অভাবমুক্ত করে দিবেন। আল্লাহ প্রাচুর্যময় প্রজ্ঞাময়।"-(সূরা আন নিসা : ১৩০)

ইসলামী সমাজের জন্য বিবাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। বিবাহের মাধ্যমে সমাজের একটি ভিত্তি অর্থাৎ পরিবার গড়ে উঠে। মূলত এ বিবাহ প্রথা একটি সমাজের অপরিহার্য আবশ্যকীয় ইউনিট। যে সমাজে এ ভিত্তি যত মযবুত হবে সে সমাজ তত সুন্দর ও সুশৃংখল হবে। তাই ইসলামী শরীয়ত বিবাহ ব্যবস্থাকে সর্বদিক থেকে সুদৃঢ় ও সুশৃংখলভাবে আনজাম দানের ও সংরক্ষণের বিভিন্ন বিধি বিধান দিয়েছে। বিবাহ বিচ্ছেদ ইসলামের দৃষ্টিতে অত্যন্ত ঘৃণিত কাজ। এজন্যে আল কুরআন স্বামী-স্ত্রীকে যেমন একদিকে ন্যায্য অধিকার লাভের আইনগত সুযোগ দিয়েছে; অন্যদিকে ধৈর্য, সংযম ও পারস্পরিক সুসম্পর্ক সৃষ্টি ও সংরক্ষণের প্রতি উৎসাহিত করেছে। আর বিবাহ বিচ্ছেদ থেকে যথাসাধ্য বিরত থাকার জন্য শিক্ষা দিয়েছে। এমনকি সম্পর্কের অবনতি ঘটার আশংকা দেখা দিলে উভয় পক্ষকেই কিছু কিছু ত্যাগ স্বীকার করে হলেও সমঝোতায় আসতে উদ্বুদ্ধ করেছে। এতদসত্ত্বেও যদি আল্লাহ না করুন—কোথাও এমন পরিস্থিতির উদ্ভব হয় যে, স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক রক্ষা করা সাধ্যের বাইরে চলে গেছে, তখন উভয়ের বৃহত্তর স্বার্থে উদ্ভূত অস্বস্থিকর অবস্থার অবসানে ও অসহনীয় দুর্ভোগপূর্ণ জীবনের শৃংখলমুক্ত হওয়ার জন্য অগত্যা বিবাহ বিচ্ছেদ বা তালাক দেয়া জায়েয। এহেন চরম পরিস্থিতিতেই ইসলামে তালাকের ব্যবস্থা রয়েছে।

বিবাহ বিচ্ছেদের ফলে স্বামীর চেয়ে স্ত্রী অধিক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সে জন্যে স্ত্রী নিজ অধিকারের অংশবিশেষ পরিত্যাগ করে হলেও স্বামীর সাথে সন্ধি করতে পারে। কিন্তু সন্ধির যাবতীয় সম্ভাবনা ব্যর্থ হয়ে গেলে পরস্পর বিচ্ছিন্ন হওয়ার অনুমতি আছে। এমতাবস্থায় আল্লাহ তার অসাধারণ ক্ষমতার বলে এদের পরস্পরকে উভয়ের অমুখাপেক্ষী করে দিতে পারেন। আল্লাহ তা'আলাই সর্ববিষয়ে কর্ম বিধায়ক। আল্লাহ স্ত্রীর জন্য তালাকদাতা স্বামীর চেয়ে শ্রেয় স্বামীর ব্যবস্থা করে দিতে পারেন; আবার স্বামীর জন্য পরিত্যক্ত স্ত্রীর চেয়ে ভাল স্ত্রী মিলিয়ে দিতে পারেন।

আলোচ্য আয়াতে স্বামীদের তুলনায় স্ত্রীদের প্রতিই অধিকতর সান্ত্বনার বাণী ঘোষিত হয়েছে। কারণ, স্বামী-স্ত্রীর বিচ্ছেদের ফলে স্বামীর তুলনায় স্ত্রীই অধিকতর ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সাধারণত স্ত্রীরাই তো অসহায় অবলা বিধায় একটা সম্পর্ক বিনষ্ট হওয়ার পর দ্বিতীয় কোনো সুবিধাজনক সম্পর্ক স্থাপনের সম্ভাবনায় তারা বিচলিত হয়ে পড়ে। বিশেষত আজকের সমাজে তাই পরিলক্ষিত হয়। আলোচ্য আয়াতে উভয়ের মধ্যে কেবল সবল পক্ষের সুবিধাজনক অবস্থানের কথা নাকচ করে দেয়া হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা উভয়ের পূর্বাবস্থার একটি সন্তোষজনক নতুন অবস্থার সূচনা করতে পারেন। আল্লাহ বিপুল, ব্যাপক ইহসান, রহমত ও কৃপার মালিক। তিনি সকল কাজে প্রজ্ঞাময়, কৌশলী ও সুক্ষ্মজ্ঞানী। আল্লাহ সর্বাবস্থায় মানুষের কল্যাণের ব্যবস্থা করেন।

আয়াতে আল্লাহ একটা সান্ত্বনার বাণী ব্যক্ত করে বলেছেন يُغْنِ اللَّهُ كُلا مِنْ سَعَتِهِ "আল্লাহ স্বামী-স্ত্রীর উভয়কে তার প্রাচুর্য দিয়ে অভাবমুক্ত করে দেবেন।" যখন পরস্পর সন্ধি-সমঝোতার যাবতীয় পথ রুদ্ধ হয়ে যায়-শত আন্তরিকতা সত্ত্বেও কোনোভাবেই যদি বিচ্ছেদের বিকল্প না থাকে। তখন আল্লাহ তা'আলাই তার প্রাচুর্য থেকে উভয়কেই পরস্পর থেকে আরও ভাল অবস্থায় নিয়ে যেতে পারেন। উভয়কে উভয়ের অভাবমুক্ত করে অধিকতর উত্তম ব্যবস্থা করা আল্লাহর জন্য অতি সহজ।

وَاللَّهُ أَعْلَمُ

📘 আল কুরআনে নারী 📄 মু’মিনগণ কি কোনো অমুসলিমকে বিয়ে করতে পারে?

📄 মু’মিনগণ কি কোনো অমুসলিমকে বিয়ে করতে পারে?


وَالْمُحْصَنَتُ مِنَ الْمُؤْمِنَتِ وَالْمُحْصَنَتُ مِنَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَبَ مِنْ قَبْلِكُمْ إِذَا أَتَيْتُمُوهُنَّ أُجُورَهُنَّ مُحْسِنِينَ غَيْرَ مُسَافِحِينَ وَلَا مُتَّخِذِى أَخْدَانٍ * وَمَنْ يُكْفُرُ بِالْإِيْمَانِ فَقَدْ حَبِطَ عَمَلُهُ : وَهُوَ فِي الْآخِرَةِ مِنَ الْخَسِرِينَ

"তোমাদের জন্যে হালাল করা হলো, মু'মিন সচ্চরিত্রা নারী আর তোমাদের আগে যাদের কিতাব দেয়া হয়েছিল তাদের সচ্চরিত্রা নারী; যখন তোমরা তাদের মোহর দাও তাদের স্ত্রী করার জন্যে; কামনা-বাসনা চরিতার্থ করার জন্যে কিংবা গুপ্ত প্রেমে লিপ্ত হওয়ার জন্যে নয়। আর যে কেউ ঈমানের নীতি অনুযায়ী চলতে অস্বীকার করে তার সকল আমল বরবাদ হয়ে যাবে এবং আখিরাতে সে মহাক্ষতির সম্মুখীন হবে।" -(সূরা আল-মায়িদাহ্: ৫)

আয়াতে 'মুহসানাত' محصنت শব্দের দু'টো অর্থ হতে পারে। এক, স্বাধীন ও মুক্ত, যার বিপরীত শব্দ ক্রীতদাসী। দুই, সচ্চরিত্রা ও সতী-সাধ্বী। অধিক সংখ্যক সাহাবী ও তাবেঈ আলিমের মতে এখানে দ্বিতীয় অর্থই প্রযোজ্য। অবশ্য এর অর্থ এ নয় যে, যারা সচ্চরিত্রা বা সতী-সাধ্বী নয় তাদের বিয়ে করা হারাম। বরং আয়াতের মর্মার্থ হলো মু'মিনদের উত্তম ও চরিত্রবানদের বিবাহ করার প্রতি উৎসাহিত করা। অর্থাৎ ব্যভিচারিণী বা পাপাচারিণী মহিলাদের বিবাহ করা কোনো সম্ভ্রান্ত মুসলিমের কাজ নয়। (মা'আরেফুল কুরআন, তাফসীরে মাযহারী থেকে)

আয়াতে الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَبَ "যাদের কিতাব দেওয়া হয়েছিল” বলে 'আহলে কিতাব' বা কিতাবী সম্প্রদায়কে বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ যাদের উপর আসমানী কিতাব নাযিল হয়েছিল। বর্তমানকালে ইয়াহুদী বা খৃষ্টান ছাড়া আর কোনো সম্প্রদায়কে আহলে কিতাব বলা যায় না। কারণ, আহলে কিতাব বলতে বুঝায় ঐসব সম্প্রদায়কে যারা কোনো আসমানী কিতাব পেয়েছে বা আসমানী কিতাবের অনুসারী বলে দাবী করে-আর তা কুরআন-সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত। তাওরাত ও ইনজীলই এমন কিতাব আজকের বিশ্বে যার অনুসরণের কিছু কিছু দাবীদার বর্তমানে বিদ্যমান রয়েছে। কিন্তু কুরআন মজীদের আরেকটি আয়াতে وَلَا تَنْكِحُوا الْمُشْرِكْتِ حَتَّى يُؤْمِنَّ “কোনো মুশরিক নারীকে বিয়ে করবে না, যতক্ষণ না তারা ঈমান আনে।” এ আয়াতের মর্মানুসারে বর্তমান বিশ্বের ইয়াহুদী খৃষ্টান মহিলাদের বিয়ে করাও নাজায়েয। কারণ, তারা ঈসা (আ)-কে সহ তিন খোদায় বিশ্বাসী এবং নানা প্রকার শিরকে লিপ্ত। হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে ওমর (রা)-এরও এ মত। (মা'আরেফুল কুরআন, আহকামুল কুরআন)

সূরা মায়িদাহ্র উক্ত আয়াতে আহলে কিতাব মহিলাদের বিয়ে করা হালাল বুঝালেও এ ধরনের বিয়ের ফলে কোনো মু'মিনের নিজের, তার সন্তান-সন্তুতির এবং সমগ্র মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য বাস্তবে যে অবশ্যম্ভাবী ক্ষতি ও অনিষ্ট দেখা দেবে তার প্রেক্ষিতে অধিকাংশ সাহাবী ও তাবেঈর মতে অমুসলিম আহলে কিতাব মহিলাকে বিয়ে করা মাকরূহ বা অনুচিত।

বর্ণিত আছে, হযরত হোযায়ফা ইবনে ইয়ামান (রা) মাদায়েন পৌঁছে জনৈকা ইয়াহুদী স্ত্রীলোকের পানি গ্রহণ করেন। হযরত ওমর ফারুক (রা) সংবাদ পেয়ে তাঁকে পত্র লিখে বললেন, "স্ত্রীলোকটিকে তালাক দিয়ে দাও।" হযরত হোযায়ফা উত্তরে লিখলেন, "সেকি আমার জন্য হারাম?” হযরত ওমর (রা) উত্তরে লিখলেন, "আমি হারাম বলছি না, কিন্তু ইয়াহুদী মহিলারা সাধারণত সচ্চরিত্রা বা সতী-সাধ্বী নয়। তাই আমার আশংকা, এ পথে না জানি তোমাদের পরিবারেও অশ্লীলতা ও ব্যভিচারের অনুপ্রবেশ ঘটে।" (আহকামুল কুরআন-জাস্সাস)

ইমাম মুহাম্মদ ইবনে হাসান 'কিতাবুল আছার' গ্রন্থে এ ঘটনাকে ইমাম আবূ হানীফা (রহ)-এর অভিমত বলে বর্ণনা করেছেন। তাতে বলা হয়েছে, দ্বিতীয়বার হযরত ওমর (রা) হোযায়ফাকে পত্রে বলেন: اعزم عليك ان لا تضع كتابي حتى تخلى سبيلها فاني اخاف ان يقتر يك المسلمون فيختاروا نساء اهل الذمة لجما لهن وكفى بذالك فتنة لنساء المسلمين অর্থাৎ “তোমাকে কসম দিয়ে বলছি, পত্র পাঠান্তে তা রেখে দেয়ার পূর্বেই তাকে তালাক দিয়ে মুক্ত করে দাও। আমার আশংকা, অন্য মুসলিমরাও না জানি তোমার পদাংক অনুসরণ করে বসে। ফলে তারা যিম্মী আহলে কিতাব মহিলাদের রূপ-সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে মুসলিম মহিলাদের পরিবর্তে তাদের বেশি পছন্দ করতে শুরু করে দেবে। মুসলিম মহিলাদের জন্য এ বড় বিপদ!" (কিতাবুল আছার: ১৫৬ পৃঃ)

আল্লামা ইবনে হুমাম 'ফতহুল কাদীর' গ্রন্থে বর্ণনা করেন, শুধু হোযায়ফা নয়, তালহা এবং কা'ব ইবনে মালেকও এরূপ ঘটনার সম্মুখীন হন। তাঁরাও সূরা মায়েদার এ আয়াত দৃষ্টে আহলে কিতাব মহিলাদের বিয়ে করেছিলেন। খলীফা হযরত ওমর (রা) এ সংবাদ পেয়ে তাদের প্রতি খুব অসন্তুষ্ট হন এবং তালাক দেয়ার নির্দেশ দেন। (তাফসীরে মাযহারী থেকে মা'আরেফুল কুরআন)

মুফতী মুহাম্মদ শফী (রহ) 'মা'আরেফুল কুরআনে' বলেন, ফারূকে আযমের যুগ ছিল সর্বোত্তম যুগ। কোনো ইয়াহুদী বা খৃষ্টান মহিলা মুসলমানদের সহধর্মিনী হয়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে চক্রান্ত করার সম্ভাবনা তখন ছিল না। তাদের মধ্যে ব্যভিচারের অভ্যাস মুসলমানদের পরিবার কলুষিত করতে পারে আর তাদের রূপ-সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে মুসলমানরা তাদের অগ্রাধিকার দিবে এবং মুসলিম মহিলারা বিপদের সম্মুখীন হবে- এটাই ছিল তখনকার যুগের একমাত্র আশংকা। এতটুকুন অনিষ্টকে সামনে রেখেই ফারুকে আযমের দূরদৃষ্টি উপরিউক্ত সাহাবীদের তাদের 'আহলে কিতাব' স্ত্রীদের তালাক দিতে বাধ্য করেছিলেন। যদি আজকালের চিত্র তাঁদের সামনে থাকতো, তবে অনুমান করুন, একে প্রতিরোধ করতে গিয়ে তাঁরা কত কঠোর কর্মপন্থাই না অবলম্বন করতেন? আজকাল যারা আদম শুমারীর খাতায় নিজেদেরকে ইয়াহুদী-খৃষ্টান নামে লিপিবদ্ধ করায় তাদের অনেকেই বিশ্বাসের দিক থেকে খৃষ্টবাদ ও ইয়াহুদীবাদকে অভিশাপ মনে করে। তারা যেমন তাওরাত-ইনজীলে বিশ্বাস করে না, তেমনি হযরত মূসা-ঈসাকে আল্লাহর রাসূল বলে স্বীকার করে না। বরং বিশ্বাসের দিক থেকে তারা পুরোপুরি নাস্তিক। শুধু জাতিগত কিংবা প্রথাগতভাবে নিজেদেরকে ইয়াহুদী বা খৃষ্টান বলে থাকে।

এমতাবস্থায় তাদের মহিলারা মুসলমানদের জন্য কিছুতেই হালাল নয়। যদি ধরে নেয়া যায় যে, তারা স্বীয় ধর্মের অনুসরণ করে, তবুও তাদের মুসলিম পরিবারে স্থান দেয়া গোটা পরিবারের জন্য দুনিয়া-আখিরাতের ধ্বংস ডেকে আনার শামিল। সুতরাং কুরআন-সুন্নাহ ও সাহাবায়ে কেরামের আদর্শের প্রেক্ষিতে আজকালকার তথাকথিত আহলে কিতাব মহিলাদের বিয়ে করা থেকে মুসলমানদের বিরত থাকা কর্তব্য।

ফন্ট সাইজ
15px
17px