📄 স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কচ্ছেদের আশংকায় সালিসের মাধ্যমে মীমাংসার নির্দেশ
وَإِنْ خِفْتُمْ شِقَاقَ بَيْنِهِمَا فَابْعَثُوا حَكَمًا مِنْ أَهْلِهِ وَحَكَمًا مِّنْ أَهْلِهَا إِنْ يُرِيدَا إِصْلَاحًا يُوَفِّقِ اللَّهُ بَيْنَهُمَا ، إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلِيمًا خَبِيرًا
"আর যদি তোমরা স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কছেদ হওয়ার মত পরিস্থিতির আশংকা কর তবে স্বামীর আত্মীয়-স্বজন থেকে একজন আর স্ত্রীর আত্মীয় স্বজন থেকে একজন সালিস নিযুক্ত কর। তারা দু'জনই সংশোধন ও মিটমাট চাইলে আল্লাহ তাদের তাওফীক দিবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ সবকিছু জানেন, সবকিছুর খবর রাখেন।"-(সূরা আন নিসা: ৩৫)
স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার মনোমালিন্য পরস্পরের মধ্যেই মীমাংসা হয়ে যাওয়া উভয়ের জন্য মঙ্গলজনক। কিন্তু আল্লাহ না করুন যদি অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায় যে, এখন আর দু'জনের মধ্যে ঘরোয়াভাবে মীমাংসিত হওয়ার মত অবস্থায় থাকলো না বরং তা ঘরের বাইরে নিয়ে যাওয়া অপরিহার্য হয়ে পড়ে, তখনো বিষয়টি অন্ততঃ আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে সীমিত রেখে তাদের মাধ্যমেই বিবাদ মীমাংসার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
আলোচ্য আয়াতে স্বামী-স্ত্রীর আত্মীয়-স্বজন, মুসলমানদের জামায়াত ও সরকারী প্রশাসনকে সম্বোধন করে এমন এক পূত-পবিত্র পন্থা বলে দেয়া হয়েছে যাতে করে উভয় পক্ষের উত্তেজনা প্রশমিত হয়ে যেতে পারে এবং সেই সাথে পরস্পরের অপবাদ আরোপের পথ বন্ধ হয়ে আপোষ মীমাংসার পথ বেরিয়ে আসতে পারে। তাছাড়া ঘরের বিবাদ ঘরে মীমাংসা হতে না পারলেও তা যেন পরিবারের মধ্যেই সমাধা হয়ে যায়—আদালতে মামলা রুজু করার ফলে বিষয়টি যেন হাট-বাজারে বিস্তার লাভ করতে না পারে। সমাজে যেন ঘটনাটি ছড়িয়ে না পড়ে।
আর তার পদ্ধতি হলো, সরকার উভয় পক্ষের মুরব্বী-অভিভাবক অথবা মুসলমানদের কোনো শক্তিশালী জামায়াত বা সংস্থা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে আপোষ করিয়ে দেয়ার বা ফায়সালায় পৌঁছে দেয়ার জন্য দু'জন সালিস ঠিক করে দেবেন। একজন স্বামীর পরিবার থেকে, একজন স্ত্রীর পরিবার থেকে। এখানে সালিস অর্থে 'হাকাম' শব্দ প্রয়োগ করে কুরআন নির্বাচিত সালিসদ্বয়ের প্রয়োজনীয় গুণবৈশিষ্ট্যও বর্ণনা করেছে। তাহলো সালিসদ্বয়ের মধ্যে মীমাংসা করে দেয়ার যোগ্যতা ও গুণ থাকতে হবে। আর এ গুণটি তো এমন ব্যক্তির মধ্যেই থাকতে পারে যিনি হবেন বিজ্ঞ এবং তৎ সংগে বিশ্বস্ত ও দিয়ানতদার।
আয়াতে উভয় পক্ষের সালিস নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে, কিন্তু তারা কি কি কাজ করবেন, তারা কোন্ পদ্ধতি প্রয়োগে মীমাংসায় পৌঁছবেন, আয়াতে সে কথা বলে দেয়া হয়নি। অবশ্য এ প্রসংগে বলা হয়েছে: إِن يُرِيدَا إِصْلَاحًا يُوَفِّقِ اللَّهُ بَيْنَهُمَا ، অর্থাৎ "তারা উভয়ে যদি সমস্যার সমাধান চায়, তাদের পরস্পরের মধ্যে সমঝোতার মনোভাব থাকে, তাহলে আল্লাহ তা'আলা তাদের কাজে সহায়তা করবেন আর স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সদ্ভাব সৃষ্টি করে দেবেন।"
আয়াতে তারা উভয় মানে দু'জন সালিস অথবা স্বামী-স্ত্রী-দু'টোর একটা অথবা দু'টোই হতে পারে। প্রত্যেক বিবাদেরই একটা মীমাংসা হওয়া সম্ভব, কিন্তু শর্ত হলো উভয় পক্ষকে অবশ্যই সন্ধি প্রিয় হতে হবে, আর যারা সালিস করে বা মধ্যস্থ হয় তাদেরও আন্তরিকতা সহকারে যে কোনোভাবে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সমঝোতা করিয়ে দেয়ার মানসিকতা ও সর্বাত্মক চেষ্টা থাকতে হবে।
মীমাংসার পন্থা সম্পর্কে তাফহীমুল কুরআনে বলা হয়েছে এভাবে যে, স্বামী ও স্ত্রীর পরিবারের এক একজন লোক একত্রিত হবে এবং অনৈক্যের মূল কারণ অনুসন্ধান করে সম্মিলিতভাবে চিন্তা করে উভয়ের মধ্যে মিল সৃষ্টির পথ খুঁজে বের করবে। কিন্তু এ পঞ্চায়েত বা সালিস নিযুক্তির কাজ কে করবে-এ প্রশ্নের জবাব আল্লাহ তা'আলা এখানে অস্পষ্টই রেখেছেন। তাই স্বামী-স্ত্রীই ইচ্ছা করলে নিজ নিজ আত্মীয়-স্বজনের মধ্য থেকে এক একজন লোক নিজেদের অনৈক্য মীমাংসার জন্য নিযুক্ত করবে। তা না হলে উভয় পরিবারের মুরব্বীগণ হস্তক্ষেপ করে পঞ্চায়েত নিযুক্ত করবে। আর আদালত পর্যন্ত মোকদ্দমা দায়ের হলে আদালত নিজেই কোনো সিদ্ধান্ত করার পূর্বে পারিবারিক পর্যায়ে পঞ্চায়েত নিযুক্ত করে মীমাংসার চেষ্টা করবে।
সালিসের ক্ষমতা-ইখতিয়ার কতটুকু থাকবে-এ ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে। ফিকহবিদদের একদলের মত হলো, সালিসগণ চূড়ান্ত ফায়সালা করতে পারবে না, মীমাংসার যে পন্থা কার্যকরী হতে পারে বলে তারা মনে করবেন, তারা কেবল তার সুপারিশ করতে পারবে মাত্র; তা মেনে নেয়া বা না নেয়া দম্পতির মর্জির উপর নির্ভর করবে। কিন্তু দম্পতি যদি তালাক, খোলা অথবা অন্য কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে ফায়সালা করার জন্য তাদেরকে নিজেদের উকিল নিযুক্ত করে, তবে তাদের ফায়সালা মেনে নেয়া দম্পতির উপর ওয়াজিব হবে। এটা হানাফি ও শাফেয়ী মাযহাবের আলেমদের মত। অন্য ফকীহদের মতে উভয়ের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটানোর অধিকার তাদের নেই। হাসান বসরী, কাতাদাহ প্রমুখ একথাই বলেছেন। ফকীহদের আরেক দলের মতে দম্পতির মধ্যে মিলন কিংবা বিচ্ছেদ ঘটানোর পূর্ণ ইখতিয়ার সালিসদের রয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রা) সাঈদ ইবনে যুবাইর, ইবরাহীম নখয়ী, শাবী, মুহাম্মদ ইবনে সীরীন এবং অন্যান্য ফকীহগণ এ মত ব্যক্ত করেছেন।
হযরত ওসমান (রা) ও হযরত আলী (রা) বিভিন্ন ফয়সালার যেসব নজীর আমাদের সম্মুখে রয়েছে, তা থেকে জানা যায় যে, তাঁরা দু'জনই সালিস নিযুক্ত করে আদালতের পক্ষ থেকে সালিসদের রাজকীয় ক্ষমতা দান করতেন। হযরত আকীল ইবনে আবু তালিব এবং তাঁর স্ত্রী ফাতিমা বিনতে উতবা ইবনে রাবিয়ার মোকদ্দমা যখন হযরত ওসমান (রা)-এর আদালতে পেশ করা হলো, তখন তিনি স্বামীর পরিবার থেকে হযরত ইবনে আব্বাস (রা)-কে, স্ত্রীর পরিবার থেকে হযরত মুআবিয়া (রা) ইবনে আবি সুফিয়ান (রা)-কে সালিস নিযুক্ত করলেন, আর তাদের বললেন: আপনারা দু'জনই যদি এদের মধ্যে বিচ্ছেদ করে দেয়া যুক্তিযুক্ত মনে করেন, তবে তাই করে দেবেন। তাছাড়া হযরত আলী (রা)ও একটি মোকদ্দমায় সালিস নিযুক্ত করে তাকে বলেছিলেন : হয় মিলন, না হয় বিচ্ছেদ—দু'টির একটি করে দিন। এ থেকে প্রমাণিত হয় যে, সালিস নিজে কোনো আদালতী ক্ষমতার মালিক নয়, তবে আদালত যদি সালিস নিযুক্ত করার সময় তাদের এখতিয়ার দেয় তবে তাদের ফায়সালা আদালতের ফায়সালার ন্যায়ই কার্যকর হবে।
হযরত আলী (রা)-এর সময়কার একটি ঘটনা সুনানে বায়হাকী গ্রন্থে হযরত ওবায়দা সালমানীর রেওয়ায়েত ক্রমে বর্ণিত হয়েছে যে, একজন পুরুষ ও একজন মহিলা হযরত আলী (রা)-এর খেদমতে হাজির হলো। তাদের উভয়ের সাথে ছিল বহু লোকের এক এক দল। হযরত আলী (রা)-এর নির্দেশে পুরুষের পরিবার থেকে একজন এবং স্ত্রীর পরিবার থেকে একজন হাকাম বা সালিস নির্ধারণ করা হলো। তাদের সম্বোধন করে হযরত আলী (রা) বললেন, তোমরা কি তোমাদের দায়িত্ব সম্পর্কে জান? আর তোমাদের কি করতে হবে তা কি তোমরা অবগত? শোন, তোমরা যদি এ স্বামী-স্ত্রীকে একত্রে রাখার ব্যাপারেও তাদের পারস্পরিক আপোষ করে দেয়ার ব্যাপারে একমত হতে পার, তবে তাই কর। পক্ষান্তরে তোমরা যদি মনে কর যে তাদের মধ্যে আপোষ মীমাংসা করা সম্ভব নয়; কিংবা তা করে দিলে শেষ পর্যন্ত টিকে থাকবে না এবং তোমরা উভয়েই একমত হয়ে তাদের পৃথক করে দেয়া ভাল মনে কর—এতেই মঙ্গল বিবেচনা কর, তবে তাই করবে। একথা শুনে মহিলাটি বললো, আমি একথা মেনে নিলাম। উভয় সালিস আল্লাহর আইন অনুসারে যে ফায়সালা করবে—তা আমার মতের পক্ষে হোক অথবা বিরোধী হোক, আমি তাই মেনে নেব। কিন্তু পুরুষটি বললো, পৃথক হয়ে যাওয়া বা তালাক হয়ে যাওয়া আমি কোনোক্রমেই সহ্য করবো না। অবশ্য সালিসদের এ অধিকার দিচ্ছি যে, তারা আমার উপর যে কোনো রকম আর্থিক জরিমানা আরোপ করে তাকে (স্ত্রীকে) সম্মত করিয়ে দিতে পারে। হযরত আলী (রা) বললেন, তা হয় না। তোমারও সালিসদের তেমনি ক্ষমতা দেয়া উচিত। যেমন স্ত্রী দিয়েছে। এ ঘটনা থেকে কোনো কোনো মুজতাহিদ ইমাম নিয়ম উদ্ভাবন করেছেন যে, সালিসদের এখতিয়ার সম্পন্ন হওয়া উচিত। যেমন হযরত আলী স্বামী স্ত্রীকে বলে সালিসদের ক্ষমতা সম্পন্ন করেছেন। কিন্তু ইমাম আযম হযরত আবু হানিফা (রা) ও হযরত হাসান বসরী (র) সাব্যস্ত করেছেন যে, উল্লিখিত সালিসদের যদি ক্ষমতা সম্পন্ন হওয়াই অপরিহার্য হতো, তবে হযরত আলী কর্তৃক উভয় পক্ষের (স্বামী-স্ত্রীর) সম্মতিলাভের চেষ্টা করার কোনো প্রয়োজনীয়তাই ছিল না। সুতরাং উভয়ের সম্মতি আদায়ের চেষ্টাই প্রমাণ করে যে, প্রকৃতপক্ষে এ সালিসদ্বয় ক্ষমতাসম্পন্ন নয়। অবশ্য স্বামী-স্ত্রী যদি অধিকার বা ক্ষমতা দেয়, তবে তারা ক্ষমতা সম্পন্ন হয়ে যাবে। কুরআনুল কারীমের এ শিক্ষার মাধ্যমে মানুষের পারিবারিক বিবাদ বিসম্বাদ মীমাংসার ক্ষেত্রে অতি চমৎকার এক নতুন পথের উন্মোচন হয়েছে। যে পথে মামলা মোকদ্দমা আদালতে যাবার পূর্বেই পারিবারিক কিংবা সামাজিক পঞ্চায়েতের মাধ্যমে মীমাংসা করা যেতে পারে।
টিকাঃ
-(মা'আরেফুল কুরআন), (তাফহীমুল কুরআন)
📄 বিচ্ছিন্নতার চেয়ে আপোষ-মীমাংসা উত্তম
وَإِنِ امْرَأَةً خَافَتْ مِنْ بَعْلِهَا نُشُورًا أَوْ إِعْرَاضًا فَلَا جُنَاحَ عَلَيْهِمَا أَنْ يُصْلِحَا بَيْنَهُمَا صُلْحًا ، وَالصُّلْحُ خَيْرٌ وَأُحْضِرَتِ الْأَنْفُسُ الشُّحَّ ، وَإِنْ تُحْسِنُوا وَتَتَّقُوا فَإِنَّ اللَّهَ كَانَ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرًا (النساء : ১২৮)
"কোনো স্ত্রী যদি তার স্বামী থেকে দুর্ব্যবহার ও উপেক্ষার আশংকা করে, তবে তারা আপোষ-নিষ্পত্তি করতে চাইলে তাদের কোনো দোষ নেই; আপোষ নিষ্পত্তিই উত্তম। মানুষ লোভের কারণে স্বভাবতই কৃপণ। আর তোমরা যদি ইহসানকারী ও মুত্তাকী হও, তবে তোমরা যা করো আল্লাহ তার খবর রাখেন।"-(সূরা আন নিসা : ১২৮)
ইসলামী সমাজের জন্য বিবাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। বিবাহের মাধ্যমে সমাজের একটি ভিত্তি অর্থাৎ পরিবার গড়ে উঠে। মূলত এ বিবাহ প্রথা একটি সমাজের অপরিহার্য আবশ্যকীয় ইউনিট। যে সমাজে এ ভিত্তি যত মযবুত হবে সে সমাজ তত সুন্দর ও সুশৃংখল হবে। তাই ইসলামী শরীয়ত বিবাহ ব্যবস্থাকে সর্বদিক থেকে সুদৃঢ় ও সুশৃংখলভাবে আনজাম দানের ও সংরক্ষণের বিভিন্ন বিধি বিধান দিয়েছে। বিবাহ বিচ্ছেদ ইসলামের দৃষ্টিতে অত্যন্ত ঘৃণিত কাজ। এজন্যে আল কুরআন স্বামী-স্ত্রীকে যেমন একদিকে ন্যায্য অধিকার লাভের আইনগত সুযোগ দিয়েছে; অন্যদিকে ধৈর্য, সংযম ও পারস্পরিক সুসম্পর্ক সৃষ্টি ও সংরক্ষণের প্রতি উৎসাহিত করেছে। আর বিবাহ বিচ্ছেদ থেকে যথাসাধ্য বিরত থাকার জন্য শিক্ষা দিয়েছে। এমনকি সম্পর্কের অবনতি ঘটার আশংকা দেখা দিলে উভয় পক্ষকেই কিছু কিছু ত্যাগ স্বীকার করে হলেও সমঝোতায় আসতে উদ্বুদ্ধ করেছে। এতদসত্ত্বেও যদি আল্লাহ না করুন—কোথাও এমন পরিস্থিতির উদ্ভব হয় যে, স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক রক্ষা করা সাধ্যের বাইরে চলে গেছে, তখন উভয়ের বৃহত্তর স্বার্থে উদ্ভূত অস্বস্থিকর অবস্থার অবসানে ও অসহনীয় দুর্ভোগপূর্ণ জীবনের শৃংখলমুক্ত হওয়ার জন্য অগত্যা বিবাহ বিচ্ছেদ বা তালাক দেয়া জায়েয। এহেন চরম পরিস্থিতিতেই ইসলামে তালাকের ব্যবস্থা রয়েছে।
বিবাহ বিচ্ছেদের ফলে স্বামীর চেয়ে স্ত্রী অধিক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সে জন্যে স্ত্রী নিজ অধিকারের অংশবিশেষ পরিত্যাগ করে হলেও স্বামীর সাথে সন্ধি করতে পারে। কিন্তু সন্ধির যাবতীয় সম্ভাবনা ব্যর্থ হয়ে গেলে পরস্পর বিচ্ছিন্ন হওয়ার অনুমতি আছে। এমতাবস্থায় আল্লাহ তার অসাধারণ ক্ষমতার বলে এদের পরস্পরকে উভয়ের অমুখাপেক্ষী করে দিতে পারেন। আল্লাহ তা'আলাই সর্ববিষয়ে কর্ম বিধায়ক। আল্লাহ স্ত্রীর জন্য তালাকাদাতা স্বামীর চেয়ে শ্রেয় স্বামীর ব্যবস্থা করে দিতে পারেন; আবার স্বামীর জন্য পরিত্যক্ত স্ত্রীর চেয়ে ভাল স্ত্রী মিলিয়ে দিতে পারেন।
আলোচ্য আয়াতে স্বামীদের তুলনায় স্ত্রীদের প্রতিই অধিকতর সান্ত্বনার বাণী ঘোষিত হয়েছে। কারণ, স্বামী-স্ত্রীর বিচ্ছেদের ফলে স্বামীর তুলনায় স্ত্রীই অধিকতর ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সাধারণত স্ত্রীরাই তো অসহায় অবলা বিধায় একটা সম্পর্ক বিনষ্ট হওয়ার পর দ্বিতীয় কোনো সুবিধাজনক সম্পর্ক স্থাপনের সম্ভাবনায় তারা বিচলিত হয়ে পড়ে। বিশেষত আজকের সমাজে তাই পরিলক্ষিত হয়। আলোচ্য আয়াতে উভয়ের মধ্যে কেবল সবল পক্ষের সুবিধাজনক অবস্থানের কথা নাকচ করে দেয়া হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা উভয়ের পূর্বাবস্থার একটি সন্তোষজনক নতুন অবস্থার সূচনা করতে পারেন। আল্লাহ বিপুল, ব্যাপক ইহসান, রহমত ও কৃপার মালিক। তিনি সকল কাজে প্রজ্ঞাময়, কৌশলী ও সুক্ষ্মজ্ঞানী। আল্লাহ সর্বাবস্থায় মানুষের কল্যাণের ব্যবস্থা করেন। আয়াতে আল্লাহ একটা সান্ত্বনার বাণী ব্যক্ত করে বলেছেন يُغْنِ اللَّهُ كُلا مِنْ سَعَتِهِ "আল্লাহ স্বামী-স্ত্রীর উভয়কে তার প্রাচুর্য দিয়ে অভাবমুক্ত করে দেবেন।" যখন পরস্পর সন্ধি-সমঝোতার যাবতীয় পথ রুদ্ধ হয়ে যায়-শত আন্তরিকতা সত্বেও কোনোভাবেই যদি বিচ্ছেদের বিকল্প না থাকে। তখন আল্লাহ তা'আলাই তার প্রাচুর্য থেকে উভয়কেই পরস্পর থেকে আরও ভাল অবস্থায় নিয়ে যেতে পারেন। উভয়কে উভয়ের অভাবমুক্ত করে অধিকতর উত্তম ব্যবস্থা করা আল্লাহর জন্য অতি সহজ।
আলোচ্য আয়াতে আল্লাহ তা'আলা স্বামী তার স্ত্রী থেকে বীতস্পৃহ ও পরাস্সুম হওয়ার অবস্থায় তাদের পালনীয় বিধান বলে দিয়েছেন। কোনো স্ত্রীর ব্যাপারে তার স্বামী বিরাগভাজন বা উপেক্ষার ভাব দেখে যদি স্ত্রী তার প্রাপ্য বা দাবীর আংশিক ছেড়ে দিয়েও ঐ স্বামীর সাথে থাকতে চায় আর স্বামী এ সুযোগ গ্রহণ করে স্ত্রীর প্রস্তাবে সম্মত হয়; তবে এ ধরনের আপোষ মীমাংসার বিষয়ে-আলোচ্য আয়াত নাযিল হয়েছে। আয়াতে এ জাতীয় আপোষ-মীমাংসায় শরীয়তের কোনো বাধা নেই। বাহ্যিকভাবে এটা ঘুষের মত মনে হলেও এটা আসলে কোনো গুনাহর কাজ নয়। ঘুষের মত মনে হওয়ার কারণ, এতে স্বামীকে মোহরানা বা অন্যান্য পাওনা থেকে অব্যাহতির প্রলোভন দেখিয়ে দাম্পত্য বন্ধন অটুট রাখা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে এতে উভয়ই কিছু কিছু স্বার্থ ত্যাগ করে সমঝোতা ও মধ্যপন্থা অবলম্বন করে মাত্র। সুতরাং এটা সম্পূর্ণ জায়েয।
ইমাম বুখারী (র) বলেন, হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত আছে, এমনো দেখা যায়, কোনো স্ত্রী বৃদ্ধা হয়ে যাওয়ার কারণে স্বামী তার প্রতি বিরাগ হয়ে তাকে তালাক প্রদান করতে চায়, এতে স্ত্রী স্বামীর কাছে নিজের পাওনা হকের দাবী ত্যাগ করেও তাকে স্বামী হিসাবে বহাল রাখতে চায়। এ ব্যাপারেই আলোচ্য আয়াত নাযিল হয়েছে।
হযরত ইবনে আব্বাস (রা) থেকে ধারাবাহিকভাবে ইকরামা, সিমাক ইবনে হারব, সুলাইমান ইবনে মুআয ও আবু দাউদ আত তায়ালেসী বর্ণনা করেন, হযরত সাওদা (রা) আশংকা করেছিলেন যে, নবী করীম (স) তাঁকে তালাক দিতে পারেন। তখন তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে তালাক দিবেন না। আমার সাথে আপনার রাত যাপন বিষয়ক হক আমি আয়েশা (রা)-কে দিচ্ছি। নবী করীম (সা) তাই করলেন। তখন আলোচ্য আয়াতটি নাযিল হয়।
একদা জনৈক ব্যক্তি হযরত আলী (রা)-এর কাছে এসে তাঁকে আলোচ্য আয়াতের ব্যাখ্যা জিজ্ঞেস করলে হযরত আলী (রা) বললেন, কেউ তাঁর স্ত্রীর রূপহীনতা, বার্ধক্য, কর্কশ স্বভাব অথবা অপরিপচ্ছন্নতার কারণে তার প্রতি বীতরাগ ও বীতস্পৃহ হয়ে তাকে তালাক দিতে চাইলে এবং স্ত্রীর কাছে তালাক অনভিপ্রেত ও অনাকাঙ্ক্ষিত হলে স্ত্রী যদি মোহরানার অংশবিশেষের দাবী অথবা স্বামীর কাছে তার রাত্রী যাপনের অংশ বিশেষের দাবী ত্যাগ করে, তবে তা জায়েয ও বৈধ। স্বামীর উক্ত সুবিধা গ্রহণ করায় কোনো দোষ নেই।
وَالصَّلْحُ خَيْرٌ - "আপোষ নিষ্পত্তিই উত্তম।" আয়াতাংশের স্বাভাবিক তাৎপর্য এই যে, স্ত্রীকেই স্বীয় অধিকারের অংশবিশেষ ত্যাগ করা এবং স্বামী কর্তৃক এর বিনিময়ে স্ত্রীকে তালাক প্রদান থেকে বিরত থাকা তাদের বিচ্ছেদ অপেক্ষা অধিকতর শ্রেয়। হযরত সাওদা বিনতে যামআ (রা) কর্তৃক নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে প্রাপ্য রাত্রিবাসের অধিকার হযরত আয়েশা (রা)-কে দেয়ার বিনিময়ে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কর্তৃক তাকে তালাক প্রদান থেকে বিরত থাকার ঘটনা উক্ত আয়াতে বর্ণিত সন্ধির একটি দৃষ্টান্ত। আর নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মাতের জন্য এ দৃষ্টান্ত স্থাপন করে যান। প্রকৃত কথা এই যে, 'তালাক' আল্লাহর কাছে অনভিপ্রেত বিষয়। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা) থেকে বর্ণিত। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, হালাল কাজসমূহের মধ্যে আল্লাহর কাছে অধিকতর অনভিপ্রেত কাজ হচ্ছে তালাক।
وَإِنْ تُحْسِنُوا وَتَتَّقُوا فَإِنَّ اللَّهَ كَانَ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرًا - "আর তোমরা যদি ইহসানকারী ও মুত্তাকী হও, তবে তোমরা যা কর আল্লাহ তার খবর রাখেন।"-অর্থাৎ তোমাদের অপসন্দনীয় ও অনভিপ্রেত স্ত্রীদের ত্রুটি ও অযোগ্যতা তোমরা সহ্য করে তাদের সাথে বৈষম্যহীন আচরণ করলে আল্লাহ তোমাদের সে আচরণ ও কাজ সম্পর্কে সম্যক অবগত থাকেন, আর তিনি সে জন্য তোমাদের পূর্ণ পুরস্কার প্রদান করবেন।”
وَأُحْضِرَتِ الْأَنْفُسُ الشُّحَّ - আয়াতাংশের আরেক তরজমা হলো, “নফস স্বভাবতঃ সংকীর্ণতার দিকেই ঝুঁকে পড়ে।” এ অর্থে স্বামী-স্ত্রীর সংকীর্ণতার তাৎপর্য হলো স্ত্রীলোক যদি নিজের মধ্যে স্বামীর চোখে অবাঞ্ছিতা হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে বলে মনে করে, আর তা সত্ত্বেও সে যদি বাঞ্ছিতা স্ত্রীর মত ব্যবহার পাওয়ার প্রত্যাশা করে, তবে এটাই হবে তার সংকীর্ণতা। পক্ষান্তরে যে স্ত্রীলোকটির স্থান স্বামীর মন থেকে মুছে যাওয়ার পরও সে ঐ স্বামীর সাথেই অবস্থান করতে চায়, আর স্বামী যদি এ স্ত্রীকে অত্যধিক কোণঠাসা করতে চায় এবং তার অধিকার চরম- ভাবে হরণ করতে চায়, তবে এটা হবে স্বামীর দিক থেকে সংকীর্ণতা।
জাহেলী যুগে এক এক ব্যক্তি সীমা সংখ্যাহীন স্ত্রী গ্রহণ করতে পারতো, এ ব্যাপারে তার ছিল পূর্ণ স্বাধীনতা। অথচ সেই অসংখ্য স্ত্রীদের ছিলো না কোনো নির্দিষ্ট অধিকার। সূরা আন-নিসার প্রাথমিক আয়াতসমূহে এ স্বাধীনতার উপর দু' ধরনের বিধিনিষেধ আরোপ করা হলো। এক: স্ত্রীদের সংখ্যা চার পর্যন্ত সীমাবদ্ধ হয়ে গেল-এর অধিক এক সাথে বিবাহ করা হারাম ঘোষিত হলো। দুই: এ একাধিক স্ত্রী গ্রহণের ব্যাপারেও 'আদল' বা সর্বক্ষেত্রে সাম্য প্রতিষ্ঠার শর্ত আরোপ করা হলো। এমতাবস্থায় প্রশ্ন উত্থাপিত হলো, কারো স্ত্রী যদি বন্ধা বা চির রুগ্না হয় অথবা স্বামীর সাথে সম্পর্ক রক্ষা করার যোগ্য না হয়, আর স্বামী যদি দ্বিতীয় স্ত্রী গ্রহণে বাধ্য হয়, তখন উভয় স্ত্রীর প্রতি সমান আকর্ষণ রাখা, সমান ভালবাসা পোষণ করা, দৈহিক সম্পর্কের ব্যাপারেও পূর্ণ সমতা রাখা কি তার জন্য অবশ্য কর্তব্য হবে? আর সে যদি তা না করে তবে দ্বিতীয় বিবাহ করার পূর্বে প্রথমা স্ত্রীকে তালাক দেয়াই কি উপরোক্ত শর্তের দাবী? অধিকন্তু প্রথম স্ত্রী যদি বিচ্ছিন্ন হতে না চায়, তবে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে এমন কোনো সমঝোতা হতে পারে কি, যাতে করে অবাঞ্ছিতা স্ত্রী নিজের কোনো অধিকার ও দাবী ত্যাগ করে স্বামীকে তালাক দেয়া থেকে বিরত রাখবে? বস্তুত আলোচ্য আয়াতসমূহে এসব প্রশ্নেরই উত্তর দেয়া হয়েছে।
এসব আয়াতে বর্ণিত আল্লাহর নির্দেশাবলীর মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলা পুরুষদের মধ্যে উদারতার ভাবধারা জাগ্রত করতে চান। আল্লাহ তা'আলা পুরুষকে তার স্ত্রীর প্রতি কোনো আকর্ষণ না থাকলেও স্ত্রীলোকটির সাথে ভাল ব্যবহার ও সদাচরণের আহ্বান জানিয়েছেন। কারণ স্ত্রীলোকটি তো তার সাথে দীর্ঘ সময় জীবন কাটিয়েছে। বহু বছর পর্যন্ত সে পুরুষটির জীবন সংগিনী হয়ে রয়েছে। সাথে সাথে সেই আল্লাহকে ভয় করে চলার নির্দেশ দিয়েছেন, যিনি কোনো মানুষের দোষ-ত্রুটির কারণে নিজের অনুগ্রহের দৃষ্টি অন্য দিকে ফিরিয়ে নিলে এবং তার ভাগ্যের অংশ হ্রাস করে দিলে এ দুনিয়ায় তার আশ্রয় গ্রহণের দ্বিতীয় কোনো স্থানই অবশিষ্ট থাকে না।
وَأُحْضِرَتِ الْأَنْفُسُ الشُّحَّ - আয়াতাংশের অপর একটি তরজমা হলো, "প্রত্যেক অন্তরেই লোভ বিদ্যমান রয়েছে।" এর তাৎপর্য হলো, স্ত্রী হয়তো মনে করবে যে, আমাকে বিদায় করে দিলে সন্তানাদির জীবন বরবাদ হবে, অথবা অন্যত্র আমার জীবন হয়তো আরও দুর্বিসহ হয়ে পড়বে। তার চেয়ে বরং এখানে কিছু ত্যাগ স্বীকার করে পড়ে থাকাই ভাল। পক্ষান্তরে স্বামী হয়তো মনে করবে যে দায়-দায়িত্ব হতে যখন অনেকটা রেহাই পাওয়া গেল, তখন তাকে বিবাহ বন্ধনে রাখতে ক্ষতি কি? অতএব এভাবে অনায়াসে সমঝোতা হতে পারে।
টিকাঃ
-(মা'আরেফুল কুরআন-মুফতী মুহাম্মদ শফী (র)), (ইবনে কাসীর), (তাফহীমুল কুরআন)]
📄 এক স্ত্রীর প্রতি ঝুঁকে গিয়ে অন্য স্ত্রীকে ঝুলন্ত রেখো না
وَلَنْ تَسْتَطِيعُوا أَنْ تَعْدِلُوا بَيْنَ النِّسَاءِ وَلَوْ حَرَصْتُمْ فَلَا تَمِيلُوا كُلَّ المَيْلِ فَتَذَرُوهَا كَالْمُعَلَّقَةِ ، وَإِنْ تُصْلِحُوا وَتَتَّقُوا فَإِنَّ اللَّهَ كَانَ غَفُورًا رَّحِيمًا (النساء : ১২৯)
"আর তোমরা যতই ইচ্ছা করো না কেন, তোমাদের স্ত্রীদের প্রতি সমান ব্যবহার কখনোই করতে সক্ষম হবে না। সুতরাং তোমরা একজনের দিকে সম্পূর্ণরূপে ঝুঁকে পড়ো না, আর অন্যকে ঝুলন্ত অবস্থায় রেখো না। তোমরা যদি নিজেদের সংশোধন করো আর সাবধান হও, তবে আল্লাহ ক্ষমাশীল পরম দয়ালু।" -(সূরা আন নিসা: ১২৯)
আলোচ্য আয়াতে একাধিক স্ত্রীর সাথে বৈষম্যহীন আচরণ সম্পর্কিত একটি বাস্তব অবস্থা ও পরিস্থিতির কথাই ব্যক্ত করা হয়েছে। আল্লাহ বলেন, তোমরা কখনো স্ত্রীদের সাথে বৈষম্যহীন আচরণ বজায় রাখতে সক্ষম হবে না। যদিও স্ত্রীদের মধ্যে সমান আচরণ করতে তোমরা আন্তরিকও হও। কারণ, স্ত্রীদের সাথে রাতযাপনে বা দৈহিক সম্পর্ক স্থাপনে বাহ্যিক সাম্য বজায় রাখা সম্ভব হলেও অন্তরের আকর্ষণ, ভালবাসা ও যৌন মিলনে বৈষম্য ও তারতম্য অবশ্যই থেকে যাবে। এটা হযরত ইবনে আব্বাস (রা), উবায়দা আসলামী, মুজাহিদ ও হাসান বসরী প্রমুখেরও ব্যাখ্যা।
হযরত ইবনে আবু সুলায়কা বলেন, আয়াতটি হযরত আয়েশা (রা) সম্পর্কে নাযিল হয়েছে। কারণ নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত আয়েশা (রা)-কে অন্য যে কোনো স্ত্রীর চেয়ে বেশী ভালবাসতেন। হযরত আয়েশা (রা) থেকে আবদুল্লাহ ইবনে ইয়াযীদ, আবু কুলাবা, আইউব ও হাম্মাদ ইবনে সালমা প্রমুখ রাবীর সূত্রে ইমাম আহমদ এবং সুনান সংকলকগণ বর্ণনা করেছেন: রাসূলুল্লাহ (স) নিজ স্ত্রীদের বৈষম্যহীন নীতি অনুসরণ করে চলতেন আর বলতেন, "আয় আল্লাহ যে বিষয়ে আমার ক্ষমতা রয়েছে সে বিষয়ে আমি এরূপ বণ্টন করলাম। যে বিষয়ে কেবল তোমরাই ক্ষমতা রয়েছে আমার ক্ষমতা নাই, সে বিষয়ে আমাকে ভর্ৎসনা করো না। তিনি ক্ষমতা বহির্ভূত বিষয় বলতে মনের আকর্ষণকে বুঝিয়েছেন। (ইবনে কাসীর)
এ আয়াতে فَتَذَرُوهَا كَالْمُعَلَّقَةِ অর্থ স্ত্রীলোকটির অবস্থা এমন যে, স্বামী থেকেও না থাকার মত অথচ সে তালাক প্রাপ্তাও নয়। হযরত আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে লোকের দু'টো স্ত্রী রয়েছে সে যদি এক স্ত্রীর প্রতি সম্পূর্ণ রূপে ঝুঁকে পড়ে থাকে, তবে কিয়ামতের দিন তার শরীরের এক অংশ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় উপস্থিত হবে। (ইবনে কাসীর)
আলোচ্য আয়াতের ভাবার্থ হলো, মানুষ দুই বা ততোধিক স্ত্রীর মধ্যে পূর্ণ সমতা রাখতে পারে না। কারণ একজন সুন্দরী অপরজন কুশ্রী, একজন যুবতী অন্যজন বয়স্কা, একজন রুগ্ন আরেকজন স্বাস্থ্যবতী, একজন কঠোর স্বভাবের, অন্যজন মধুর মেজাযের-স্ত্রীদের মধ্যে এরূপ আরও অনেক পার্থক্য থাকতে পারে। যে কারণে একজনের প্রতি স্বভাবতই অধিক আকর্ষণ ও অন্যজনের প্রতি কম আকর্ষণ হওয়া অসম্ভব কিছু নয়। এমতাবস্থায় প্রেম, ভালবাসা, মনের আকর্ষণ ও দৈহিক সম্পর্কের দিক থেকে উভয়ের সাথে সমতা রক্ষা করে চলতে হবে-আইন এমনটি দাবী করেনি। বরং আইনের দাবী হলো আকর্ষণের তারতম্য থাকা সত্ত্বেও যখন তুমি একটা স্ত্রীকে তালাক দাওনি এবং তাকে তোমার নিজের ইচ্ছায় অথবা তার বাসনায় এখনো স্ত্রী হিসেবেই রেখেছ। তখন তার সাথে এতটুকু সম্পর্ক অবশ্যই রাখতে হবে যাতে করে সে স্বামীহীনার মত হয়ে না পড়ে। উপরিউক্ত অবস্থায় একজন অপেক্ষা আরেকজনের প্রতি অধিক আকর্ষণ বা কম আকর্ষণ থাকা একেবারেই স্বাভাবিক ব্যাপার। কিন্তু তাই বলে তাকে এমনভাবে ফেলে রাখা যাবে না যাতে করে মনে হতে পারে যে তার কোনো স্বামী নেই। (তাফহীমুল কুরআন)
এ আয়াত থেকে কোনো কোনো লোক সিদ্ধান্ত নেয়ার চেষ্টা করেছে যে, কুরআন একদিকে সমতা রক্ষার শর্ত সাপেক্ষে বহু বিবাহের অনুমতি দিয়েছে, আর অপরদিকে সমতা রক্ষা অসম্ভব বলে সেই অনুমতিকে কার্যত বাতিল করে দিয়েছে। প্রকৃতপক্ষে এরূপ সিদ্ধান্ত নেয়ার কোনো অবকাশই এ আয়াতে নেই। কারণ, কুরআন যদি "তোমাদের স্ত্রীদের মধ্যে সমতা রক্ষা করতে পারবে না" বলেই কথা শেষ করে দিতো, তাহলে এরূপ একটা সিদ্ধান্ত নেয়ার যুক্তি দেখানো যেত। কিন্তু কুরআনে একটু পরেই বলা হয়েছে "একজন স্ত্রীকে একদিকে ঝুলিয়ে রেখে অন্যজনের দিকে একেবারেই ঝুঁকে পড়বে না।” একথা বলে উপরিউক্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার কোনো অবকাশ রাখেনি। আসলে খ্রীষ্টান ইউরোপের অনুসরণ করতে গিয়েই লোকেরা এরূপ সিদ্ধান্ত নিতে আগ্রহী হয়ে উঠে। (তাফহীমুল কুরআন)
আয়াতের শেষাংশের বক্তব্যও অনিচ্ছাকৃত মনের আকর্ষণকে দোষণীয় বলে প্রকাশ করা হয়নি। বলা হয়েছে: وَإِنْ تُصْلِحُوا وَتَتَّقُوا فَإِنَّ اللَّهَ كَانَ غَفُورًا رَّحِيمًا - অর্থাৎ "তুমি যদি নিজে যুলম করা থেকে নিজেকে বিরত রাখ, আর ইনসাফ করার যথাসাধ্য চেষ্টা কর, তবে স্বাভাবিক দুর্বলতার কারণে অনিচ্ছাকৃত কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতি হয়ে গেলে আল্লাহ নিশ্চয় তা মাফ করবেন।"
وَاللَّهُ أَعْلَمُ
📄 বিচ্ছেদের বিকল্প না থাকলে আল্লাহই প্রত্যেকের সহায়
وَإِنْ يَّতَفَرَّقَا يُغْنِ اللَّهُ كُلاً مِّنْ سَعَتِهِ ، وَكَانَ اللَّهُ وَاسِعًا حَكِيمًا
"স্বামী-স্ত্রী যদি পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তবে আল্লাহ তার প্রাচুর্য দিয়ে তাদের প্রত্যেককে অভাবমুক্ত করে দিবেন। আল্লাহ প্রাচুর্যময় প্রজ্ঞাময়।"-(সূরা আন নিসা : ১৩০)
ইসলামী সমাজের জন্য বিবাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। বিবাহের মাধ্যমে সমাজের একটি ভিত্তি অর্থাৎ পরিবার গড়ে উঠে। মূলত এ বিবাহ প্রথা একটি সমাজের অপরিহার্য আবশ্যকীয় ইউনিট। যে সমাজে এ ভিত্তি যত মযবুত হবে সে সমাজ তত সুন্দর ও সুশৃংখল হবে। তাই ইসলামী শরীয়ত বিবাহ ব্যবস্থাকে সর্বদিক থেকে সুদৃঢ় ও সুশৃংখলভাবে আনজাম দানের ও সংরক্ষণের বিভিন্ন বিধি বিধান দিয়েছে। বিবাহ বিচ্ছেদ ইসলামের দৃষ্টিতে অত্যন্ত ঘৃণিত কাজ। এজন্যে আল কুরআন স্বামী-স্ত্রীকে যেমন একদিকে ন্যায্য অধিকার লাভের আইনগত সুযোগ দিয়েছে; অন্যদিকে ধৈর্য, সংযম ও পারস্পরিক সুসম্পর্ক সৃষ্টি ও সংরক্ষণের প্রতি উৎসাহিত করেছে। আর বিবাহ বিচ্ছেদ থেকে যথাসাধ্য বিরত থাকার জন্য শিক্ষা দিয়েছে। এমনকি সম্পর্কের অবনতি ঘটার আশংকা দেখা দিলে উভয় পক্ষকেই কিছু কিছু ত্যাগ স্বীকার করে হলেও সমঝোতায় আসতে উদ্বুদ্ধ করেছে। এতদসত্ত্বেও যদি আল্লাহ না করুন—কোথাও এমন পরিস্থিতির উদ্ভব হয় যে, স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক রক্ষা করা সাধ্যের বাইরে চলে গেছে, তখন উভয়ের বৃহত্তর স্বার্থে উদ্ভূত অস্বস্থিকর অবস্থার অবসানে ও অসহনীয় দুর্ভোগপূর্ণ জীবনের শৃংখলমুক্ত হওয়ার জন্য অগত্যা বিবাহ বিচ্ছেদ বা তালাক দেয়া জায়েয। এহেন চরম পরিস্থিতিতেই ইসলামে তালাকের ব্যবস্থা রয়েছে।
বিবাহ বিচ্ছেদের ফলে স্বামীর চেয়ে স্ত্রী অধিক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সে জন্যে স্ত্রী নিজ অধিকারের অংশবিশেষ পরিত্যাগ করে হলেও স্বামীর সাথে সন্ধি করতে পারে। কিন্তু সন্ধির যাবতীয় সম্ভাবনা ব্যর্থ হয়ে গেলে পরস্পর বিচ্ছিন্ন হওয়ার অনুমতি আছে। এমতাবস্থায় আল্লাহ তার অসাধারণ ক্ষমতার বলে এদের পরস্পরকে উভয়ের অমুখাপেক্ষী করে দিতে পারেন। আল্লাহ তা'আলাই সর্ববিষয়ে কর্ম বিধায়ক। আল্লাহ স্ত্রীর জন্য তালাকদাতা স্বামীর চেয়ে শ্রেয় স্বামীর ব্যবস্থা করে দিতে পারেন; আবার স্বামীর জন্য পরিত্যক্ত স্ত্রীর চেয়ে ভাল স্ত্রী মিলিয়ে দিতে পারেন।
আলোচ্য আয়াতে স্বামীদের তুলনায় স্ত্রীদের প্রতিই অধিকতর সান্ত্বনার বাণী ঘোষিত হয়েছে। কারণ, স্বামী-স্ত্রীর বিচ্ছেদের ফলে স্বামীর তুলনায় স্ত্রীই অধিকতর ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সাধারণত স্ত্রীরাই তো অসহায় অবলা বিধায় একটা সম্পর্ক বিনষ্ট হওয়ার পর দ্বিতীয় কোনো সুবিধাজনক সম্পর্ক স্থাপনের সম্ভাবনায় তারা বিচলিত হয়ে পড়ে। বিশেষত আজকের সমাজে তাই পরিলক্ষিত হয়। আলোচ্য আয়াতে উভয়ের মধ্যে কেবল সবল পক্ষের সুবিধাজনক অবস্থানের কথা নাকচ করে দেয়া হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা উভয়ের পূর্বাবস্থার একটি সন্তোষজনক নতুন অবস্থার সূচনা করতে পারেন। আল্লাহ বিপুল, ব্যাপক ইহসান, রহমত ও কৃপার মালিক। তিনি সকল কাজে প্রজ্ঞাময়, কৌশলী ও সুক্ষ্মজ্ঞানী। আল্লাহ সর্বাবস্থায় মানুষের কল্যাণের ব্যবস্থা করেন।
আয়াতে আল্লাহ একটা সান্ত্বনার বাণী ব্যক্ত করে বলেছেন يُغْنِ اللَّهُ كُلا مِنْ سَعَتِهِ "আল্লাহ স্বামী-স্ত্রীর উভয়কে তার প্রাচুর্য দিয়ে অভাবমুক্ত করে দেবেন।" যখন পরস্পর সন্ধি-সমঝোতার যাবতীয় পথ রুদ্ধ হয়ে যায়-শত আন্তরিকতা সত্ত্বেও কোনোভাবেই যদি বিচ্ছেদের বিকল্প না থাকে। তখন আল্লাহ তা'আলাই তার প্রাচুর্য থেকে উভয়কেই পরস্পর থেকে আরও ভাল অবস্থায় নিয়ে যেতে পারেন। উভয়কে উভয়ের অভাবমুক্ত করে অধিকতর উত্তম ব্যবস্থা করা আল্লাহর জন্য অতি সহজ।
وَاللَّهُ أَعْلَمُ