📘 আল কুরআনে নারী 📄 সম্ভ্রান্ত স্বাধীন মহিলাকে বিয়ে করার সামর্থ না থাকলে সবর করাই উত্তম

📄 সম্ভ্রান্ত স্বাধীন মহিলাকে বিয়ে করার সামর্থ না থাকলে সবর করাই উত্তম


فَانكِحُوهُنَّ بِإِذْنِ أَهْلِهِنَّ وَاتُوهُنَّ أُجُورَهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ مُحْصَنَتِ غَيْرَ مُسْفِحْتِ وَلَا مُتَّخِذْتِ أَخْدَانٍ ، فَإِذَا أُحْصِنَّ فَإِنْ آتَيْنَ بِفَاحِشَةٍ فَعَلَيْهِنَّ نِصْفُ مَا عَلَى الْمُحْصَنَتِ مِنَ الْعَذَابِ ، ذَلِكَ لِمَنْ خَشِيَ الْعَنَتَ مِنْكُمْ ، وَأَنْ تَصْبِرُوا خَيْرٌ لَّكُمْ ، وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ (النساء : ২৫)

“তাদেরকে (দাসীদেরকে) তাদের মালিকের অনুমতিক্রমে বিয়ে কর এবং যথাবিধি তাদের মোহরানা আদায় কর। এমতাবস্থায় যে তারা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হবে—ব্যভিচারিণী কিংবা উপপতি গ্রহণকারিণী হবে না। অতপর তারা যখন বিবাহ বন্ধনে এসে যায় তখন যদি কোনো অশ্লীল কাজ করে, তবে তাদেরকে স্বাধীন নারীদের অর্ধেক শাস্তি ভোগ করতে হবে। এ হুকুম তাদের জন্য, তোমাদের মধ্যে যারা ব্যভিচারে লিপ্ত হয়ে পড়ার আশংকা করে। আর সবর করাই তোমাদের জন্য উত্তম। আল্লাহ ক্ষমাশীল, করুণাময়।”-(সূরা আন নিসা: ২৫)

কোনো পুরুষ সম্ভ্রান্ত স্বাধীন মহিলাকে বিয়ে করতে সমর্থ না হলে এবং তার ব্যভিচারে লিপ্ত হয়ে পড়ার আশংকা থাকলে, সে মুসলিম দাসী নারীকে বিয়ে করবে। কিন্তু তার জন্যে উত্তম যৌন সংযম অবলম্বন করা এবং সামর্থ হওয়ার অপেক্ষায় থাকা, যেন সে একজন স্বাধীন নারীকে বিয়ে করতে পারে। কেউ যদি যৌন সংযমে সক্ষম হওয়া সত্ত্বেও দাসী নারীকে বিয়ে করে বসে, তবে আল্লাহ তাকে পাকড়াও করবেন না, তাকে ক্ষমা করবেন। তিনি তো ক্ষমাশীল করুণাময়।

দাসী বিয়ে করলে তিনটি বিষয়ের প্রতি লক্ষ্য রাখতে উক্ত আয়াতে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। (১) মালিকদের অনুমতি নিয়ে তাদের বিয়ে করতে হবে, অন্যথা বিয়ে শুদ্ধ হবে না। কারণ, দাসীদের নিজের উপরও কোনো কর্তৃত্ব নেই। গোলামের অবস্থাও অনুরূপ, সে প্রভুর অনুমতি ছাড়া বিয়ে করতে পারবে না। (২) তাদের বিয়ে করতে হবে উত্তম পন্থায় মোহরানা আদায় করে দিয়ে। কোনো প্রকার টালবাহান করা, পুরোপুরি আদায় না করা কিংবা দাসী ভেবে কোনো প্রকার কষ্ট দেয়া যাবে না। (৩) তারা যেন সতী-সাধ্বী হয়, প্রকাশ্য ব্যভিচারিণী বা গোপন সম্পর্ক স্থাপনকারী না হয়। এমনকি স্বাধীন ব্যভিচারিণী নারী থেকেও বেঁচে থাকা উত্তম।

দাসী নারীদের বিয়ে হওয়ার পর যদি তাদের সতী-সাধ্বী থাকার ব্যবস্থা হয়ে যায়। তখনও যদি তারা যিনা করে বসে, তবে তারা স্বাধীন যিনাকারী নারীগণের নির্ধারিত শাস্তির অর্ধেক ভোগ করবে। এখানে অবিবাহিতা স্বাধীন নারীকে বুঝানো হয়েছে। অবিবাহিত স্বাধীন পুরুষ বা নারী যিনা করলে তাদের একশত বেত্রাঘাত করার বিধান রয়েছে।

ذَلِكَ لِمَنْ خَشِيَ الْعَنَتَ مِنْكُمْ অর্থাৎ দাসীদের বিয়ে করার অনুমতি ঐ ব্যক্তির জন্য যার যিনায় লিপ্ত হওয়ার আশংকা থাকে। সুতরাং যিনায় লিপ্ত হয়ে পড়ার আশংকা না থাকলে দাসী বিয়ে করার প্রয়োজন নেই। অবশ্য তবুও কেউ করে ফেললে তো আল্লাহর অনুমতি রয়েছেই।

সর্বশেষে আল্লাহ তা'আলা আল্লাহর ঘোষণা হলো, যিনার আশংকা থাকা সত্ত্বেও সবর করা এবং নিজেকে পবিত্র ও সৎ রাখতে পারা দাসীকে বিয়ে করার চেয়ে উত্তম। যারা বিয়ে করার সামর্থ রাখে না, খোরপোষ দেয়ার মত যাদের আর্থিক সচ্ছলতা নেই তাদের উচিত সবর করা এবং নিজেকে সৎ ও পবিত্র রাখা। আর আল্লাহর পক্ষ থেকে ব্যবস্থা হয়ে যাওয়ার অপেক্ষা করা।

📘 আল কুরআনে নারী 📄 পুরুষগণ নারীদের উপর কর্তৃত্বশীল

📄 পুরুষগণ নারীদের উপর কর্তৃত্বশীল


الرِّجَالُ قَوَّامُونَ عَلَى النِّسَاءِ بِمَا فَضَّلَ اللهُ بَعْضَهُمْ عَلَى بَعْضٍ وَبِمَا أَنْفَقُوا مِنْ أَمْوَالِهِمْ ، فَالصَّلِحْتُ قُنِتُتُ حَفِظْتُ لِلْغَيْبِ بِمَا حَفِظَ اللهُ .

“পুরুষরা নারীদের উপর কর্তৃত্বশীল। এজন্যে যে আল্লাহ একের উপর অন্যের মর্যাদা দিয়েছেন আর এ জন্য যে, তারা তাদের অর্থ ব্যয় করে। সতী নারীগণ হয় অনুগত লোক চক্ষুর অন্তরালে ও সেসবের হেফাজত করে। যেসব কিছু আল্লাহ হেফাজতযোগ্য করে দিয়েছেন।” -(সূরা আন নিসাঃ ৩৪)

অন্য এক আয়াতে আল্লাহ ঘোষণা করেছেন, وَلِلرِّجَالِ عَلَيْهِنَّ دَرَجَةً “আর পুরুষদের রয়েছে নারীদের উপর মর্যাদা। আয়াতে পুরুষদের প্রধান্যের বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে বিশেষ ভংগিতে। পুরুষদের এ মর্যাদা নারীদের সামগ্রিক কল্যাণের বিষয় বিবেচনা করেই ব্যক্ত করা হয়েছে। এ প্রাধান্য নারীদের খাটো করা অথবা তাদের অধিকার খর্ব করার উদ্দেশ্যে নয়, বরং তাদের দৈহিক, মানসিক ও স্বভাবগত অবস্থানের প্রতি লক্ষ্য রেখেই এ ঘোষণা দেয়া হয়েছে। এ ঘোষণা তো দিয়েছেন তিনি, যে সত্ত্বা অত্যন্ত সুনিপুণভাবে সৃষ্টি করেছেন নর ও নারীকে। এখানে বলা হয়েছে, الرِّجَالُ قَوْامُونَ عَلَى النساء পুরুষরা নারীদের উপর কর্তৃত্বশীল বা দায়িত্বশীল। আরবীতে قَوَّامُ, قيام ও قَيْمٌ বলতে বুঝায় এমন ব্যক্তিকে যে কোনো কাজের পরিচালক, দায়িত্বশীল বা তত্ত্বাবধায়ক। তাই এ আয়াতের তরজমা করা হয় পুরুষরা স্ত্রীলোকদের পরিচালক বা অভিভাবক। সাধারণত কোনো যৌথ কাজ কারবারের জন্য যেমন একজন পরিচালক বা অভিভাবকের প্রয়োজন, তেমনি পরিবার পরিচালনার জন্যও আবশ্যক একজন পরিচালক বা অভিভাবক। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন পরিবার পরিচালনার দায়িত্ব শিশু বা স্ত্রীলোকের উপর অর্পণ না করে, তা অর্পণ করেছেন পুরুষের উপর। কারণ, সৃষ্টিগত দিক থেকে সংসার জীবনের দৈনন্দিন কার্যাদি পরিচালনা ও এতদসংক্রান্ত সমস্যাদি মুকাবিলা করার মানসিক যোগ্যতা ও দৈহিক ক্ষমতা শিশু ও নারীর তুলনায় পুরুষের অনেক বেশী।

ইসলাম পুরুষদের উপর নারীদের অধিকার ততটুকুই দিয়েছে, যতটুকু অধিকার পুরুষদের দিয়েছে নারীদের উপর। অর্থাৎ কুরআন ও হাদীস নারী-পুরুষের অধিকারের বেলায় পরস্পরের মধ্যে কোনো পার্থক্য করেনি। কিন্তু একটি বিষয়ে স্ত্রীর উপর দিয়েছে স্বামীর প্রাধান্য। আর তা হচ্ছে পরিবারে স্বামী হবে স্ত্রীর অভিভাবক, তত্ত্বাবধায়ক ও দায়িত্বশীল। তবে আল কুরআন এ বিষয়ে সুস্পষ্ট করে ঘোষণা করেছে যে, এ অভিভাবকত্ব স্বৈরাচারমূলকভাবে প্রয়োগ করার অধিকার স্বামীর নেই। বরং এ অভিভাবকত্ব হবে শরীয়াতের বিধি-বিধান ও পারস্পরিক পরামর্শের নীতিমালার অধীন। স্বামী নিজের খেয়াল-খুশী মাফিক যা ইচ্ছা তাই করতে পারবে না। বরং তাকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে : وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ "স্ত্রীদের সাথে সদাচরণ করে জীবন যাপন কর।" তেমনি আরেকটি আয়াতে বলা হয়েছে : عَنْ تَرَاضِ مِّنْهُمَا وَتَشَاوَرٍ অর্থাৎ পরিবারিক ও সাংসারিক কাজকর্ম স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক সন্তুষ্টি ও পরামর্শের ভিত্তিতে আনজাম দেবে। কাজেই স্বামীর অভিভাবকত্ব জনিত প্রাধান্য স্ত্রীর জন্য কোনো প্রকার ক্ষোভ বা অসন্তুষ্টির কারণ হতে পারে না। বরং স্বামীর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেয়ে তার দায়িত্ব পালন করার প্রতি অধিক জোর দেয়া হয়েছে।

রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তোমার সর্বত্তম স্ত্রী হবে সে যাকে তুমি দেখলে তোমার মন তৃপ্ত হবে, তাকে কোনো কাজের আদেশ করলে সে তা মেনে চলবে, আর তোমার অনুপস্থিতিতে সে তোমার সম্পদের ও তার নিজের হেফাজত করবে। স্বামীর আনুগত্য করা স্ত্রীর কর্তব্য, কিন্তু রাব্বুল আলামীন আল্লাহর দাসত্বের গুরুত্ব অনেক বেশী। সুতরাং কোনো স্বামী যদি তার স্ত্রীকে আল্লাহর নাফরমানীমূলক কোনো কাজের আদেশ করে অথবা নির্ধারিত ফরয পালনে বাধার সৃষ্টি করে, তবে স্বামীর সেই হুকুম পালন করতে অস্বীকার করা স্ত্রীর কর্তব্য। আল্লাহর কোনো নাফরমান অবাধ্য স্বামী যদি স্ত্রীকেও আল্লাহর নাফরমানী ও অবাধ্যতার কাজের প্রতি বাধ্য করে, তবে তাকে অমান্য করা স্ত্রীর ঈমানী দায়িত্ব। তখন যদি সে স্বামীর হুকুম পালন করে তবে সে গুনাহগার হবে। অবশ্য স্বামী কখনো কোনো নফল নামায-রোযা না করতে বললে, তা মেনে চলা স্ত্রীর কর্তব্য।

📘 আল কুরআনে নারী 📄 অবাধ্য স্ত্রীকে সংশোধন করে নেয়ার নির্দেশ

📄 অবাধ্য স্ত্রীকে সংশোধন করে নেয়ার নির্দেশ


وَالَّتِي تَخَافُونَ نُشُوزَهُنَّ فَعِظُوهُنَّ وَاهْجُرُوهُنَّ فِي الْمَضَاجِعِ وَاضْرِبُوهُنَّ فَإِن أَطَعْنَكُمْ فَلَا تَبْغُوا عَلَيْهِنَّ سَبِيلا (النساء : ৩৪)

“আর যেসব নারীর মধ্যে অবাধ্যতার আশংকা কর; তাদের উপদেশ দাও, তাদের শয্যা ত্যাগ কর, তাদের (মৃদু) প্রহার কর। তারপর যদি তারা তোমাদের আনুগত্য করে তবে তাদের বিরুদ্ধে কোনো অজুহাত তালাশ করবে না।”-(সূরা আন নিসাঃ ৩৪)

যদি কখনো কোনো স্ত্রী থেকে অবাধ্যতা দেখা যায়, তবে তাকে সংশোধনের জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে এবং সে জন্যে এ আয়াতে তিনটি পর্যায় বর্ণিত হয়েছে। প্রথমত, তাকে স্বাভাবিকভাবে নরম সুরে উপদেশ সহকারে বুঝাতে থাকবে। যাতে করে সে তার ভুল, দোষ-ত্রুটি বুঝে উঠতে সক্ষম হয়। যদি এতে সে সংশোধিত না হয়ে তার পূর্বের অবস্থায় থেকে যায় বা দোষ থেকে বিরত না হয়, তবে দ্বিতীয় পর্যায়ে তার থেকে পৃথক হয়ে রাত্রি যাপন করবে। এখানে বিছানা পৃথক করে দেয়ার নিয়ম বলে দেয়া হয়েছে—পৃথক ঘরে রাত যাপনের কথা বলা হয়নি। বিছানা পৃথক করে দিলে সে স্বামীর অসন্তুষ্টি উপলব্ধি করতে পেরে নিজের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হতে পারে। ঘর পৃথক করে দিলে যেমন তার মনে অধিক দুঃখ ও আঘাত লাগতে পারে। তেমনি কোনো অঘটনও ঘটে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে অধিক।

একজন সাহাবী বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করলাম, আমাদের উপর আমাদের স্ত্রীদের হক কি? তিনি বললেন, তোমরা খেলে তাকেও খাওয়াবে, তুমি পরিধান করলে তাকেও পরতে দেবে, তার চেহারায় মারবে না। তার বদনাম করবে না, আর তার থেকে পৃথক থাকবে না, তবে একই ঘরে পৃথক থাকতে পার। বস্তুত যদি এত ভদ্রোজনোচিত শাসন এবং শাস্তিতেও সে সংশোধিত না হয়, তবে তাকে মৃদু প্রহার করার অনুমতি আছে। কিন্তু তার মুখের উপর মারা সম্পূর্ণভাবে নিষেধ করা হয়েছে। প্রথম দু'টো পর্যায়ের সংশোধনী একান্তই ভদ্রজনোচিত, তাই সে ব্যাপারে নবী-রাসূল বুযুর্গ-মনীষীগণের মৌখিক অনুমতি রয়েছে এবং বাস্তবেও তা করে প্রমাণিত করেছেন। কিন্তু তৃতীয় পর্যায়ের সংশোধন পদ্ধতির অনুমতি থাকলেও সে সম্পর্কে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। হাদীসে বলা হয়েছে: وَمَنْ لَّمْ تَضْرِبُ خياركم "আর তোমাদের যারা স্ত্রীকে মারবে না তারা উত্তম লোক। নবী রাসূলদের থেকে এ ধরনের কাজ সংঘটিত হওয়ার কোনো প্রমাণ নেই।"

এ অবাধ্যতার ধরন ও মাত্রা সম্পর্কে স্বামীকে অবশ্যই সচেতনতা ও সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। সাধারণ মতপার্থক্যকে কেন্দ্র করে এমনটি হওয়া অনভিপ্রেত ও অসংগত। পক্ষান্তরে, আল্লাহর নাফরমান কোনো স্বামী যদি স্ত্রীর দীনি কাজ-কর্ম ও শরীয়তী আমল সম্পর্কে আপত্তি উত্থাপন করে, তবে তার আনুগত্য করা স্ত্রীর জন্য আবশ্যকীয় নয়। বিশেষত কোনো ফরয কাজে বাধা দিলে তা অমান্য করাই হবে স্ত্রীর কর্তব্য। বস্তুত দাম্পত্য জীবনেও তেমনি সহনশীলতা দরকার, যেমন তা প্রয়োজন সামাজিক জীবনে। আয়াতের শেষাংশে সাবধান করে দেয়া হয়েছে যে, যদি এ তিনটি পর্যায়ের যে কোনো অবস্থায় বা পর্যায়ে যদি তোমাদের স্ত্রীরা তোমাদের মানতে আরম্ভ করে দেয়, তবে তোমরা আর বাড়াবাড়ী করতে যাবে না, বরং অতীত পর্যালোচনা ছেড়ে দিয়ে তাদের সাথে স্বাভাবিক আন্তরিকতাপূর্ণ ব্যবহার করবে। স্ত্রীরা নমনীয়তা প্রদর্শন করার পরেও কথায় কথায় তাদের দোষ-ত্রুটির পথ খুঁজতে যাবে না, তাদের দোষ ধরে বেড়াবে না। জেনে রেখ, আল্লাহ তা'আলা তোমাদের নারীদের উপর কোনো উচ্চ মর্যাদা দান করেননি, আল্লাহর মহত্ব ও ক্ষমতা তোমাদের উপরও বিরাজিত, তোমরা অযথা বাড়াবাড়ী করলে তার শাস্তি তোমাদেরকেও ভোগ করতে হবে।

এ আয়াতে আল্লাহ তা'আলা সংশোধনী মনোভাবাপন্ন নারী-পুরুষ তথা স্বামী-স্ত্রীর সুন্দর সুষ্ঠু দাম্পত্য জীবনের এক চমৎকার ব্যবস্থা দিয়েছেন। এতে করে পরিবারের বিষয়টি ঘরের মধ্যে পরস্পরের সমঝোতায় একটা অনুকূল ও সুন্দর পরিবেশ গড়ে উঠতে পারে। স্বামী-স্ত্রী—দু'জনের বিবাদ-বিসংবাদ, ভুল বুঝাবুঝি তাদের দু'জনের মধ্যেই মীমাংসা হয়ে যেতে পারে। তৃতীয় কোনো লোকের মধ্যস্থতার আবশ্যক হয়না। নিজেদের কথা বাইরের কেউ জানতেও পারেনা। ফলে উভয়ের পারস্পরিক গোপনীয়তা, মানসম্ভ্রম ও সামাজিক মর্যাদাও অক্ষুণ্ণ থাকে。

📘 আল কুরআনে নারী 📄 স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কচ্ছেদের আশংকায় সালিসের মাধ্যমে মীমাংসার নির্দেশ

📄 স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কচ্ছেদের আশংকায় সালিসের মাধ্যমে মীমাংসার নির্দেশ


وَإِنْ خِفْتُمْ شِقَاقَ بَيْنِهِمَا فَابْعَثُوا حَكَمًا مِنْ أَهْلِهِ وَحَكَمًا مِّنْ أَهْلِهَا إِنْ يُرِيدَا إِصْلَاحًا يُوَفِّقِ اللَّهُ بَيْنَهُمَا ، إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلِيمًا خَبِيرًا

"আর যদি তোমরা স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কছেদ হওয়ার মত পরিস্থিতির আশংকা কর তবে স্বামীর আত্মীয়-স্বজন থেকে একজন আর স্ত্রীর আত্মীয় স্বজন থেকে একজন সালিস নিযুক্ত কর। তারা দু'জনই সংশোধন ও মিটমাট চাইলে আল্লাহ তাদের তাওফীক দিবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ সবকিছু জানেন, সবকিছুর খবর রাখেন।"-(সূরা আন নিসা: ৩৫)

স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার মনোমালিন্য পরস্পরের মধ্যেই মীমাংসা হয়ে যাওয়া উভয়ের জন্য মঙ্গলজনক। কিন্তু আল্লাহ না করুন যদি অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায় যে, এখন আর দু'জনের মধ্যে ঘরোয়াভাবে মীমাংসিত হওয়ার মত অবস্থায় থাকলো না বরং তা ঘরের বাইরে নিয়ে যাওয়া অপরিহার্য হয়ে পড়ে, তখনো বিষয়টি অন্ততঃ আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে সীমিত রেখে তাদের মাধ্যমেই বিবাদ মীমাংসার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

আলোচ্য আয়াতে স্বামী-স্ত্রীর আত্মীয়-স্বজন, মুসলমানদের জামায়াত ও সরকারী প্রশাসনকে সম্বোধন করে এমন এক পূত-পবিত্র পন্থা বলে দেয়া হয়েছে যাতে করে উভয় পক্ষের উত্তেজনা প্রশমিত হয়ে যেতে পারে এবং সেই সাথে পরস্পরের অপবাদ আরোপের পথ বন্ধ হয়ে আপোষ মীমাংসার পথ বেরিয়ে আসতে পারে। তাছাড়া ঘরের বিবাদ ঘরে মীমাংসা হতে না পারলেও তা যেন পরিবারের মধ্যেই সমাধা হয়ে যায়—আদালতে মামলা রুজু করার ফলে বিষয়টি যেন হাট-বাজারে বিস্তার লাভ করতে না পারে। সমাজে যেন ঘটনাটি ছড়িয়ে না পড়ে।

আর তার পদ্ধতি হলো, সরকার উভয় পক্ষের মুরব্বী-অভিভাবক অথবা মুসলমানদের কোনো শক্তিশালী জামায়াত বা সংস্থা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে আপোষ করিয়ে দেয়ার বা ফায়সালায় পৌঁছে দেয়ার জন্য দু'জন সালিস ঠিক করে দেবেন। একজন স্বামীর পরিবার থেকে, একজন স্ত্রীর পরিবার থেকে। এখানে সালিস অর্থে 'হাকাম' শব্দ প্রয়োগ করে কুরআন নির্বাচিত সালিসদ্বয়ের প্রয়োজনীয় গুণবৈশিষ্ট্যও বর্ণনা করেছে। তাহলো সালিসদ্বয়ের মধ্যে মীমাংসা করে দেয়ার যোগ্যতা ও গুণ থাকতে হবে। আর এ গুণটি তো এমন ব্যক্তির মধ্যেই থাকতে পারে যিনি হবেন বিজ্ঞ এবং তৎ সংগে বিশ্বস্ত ও দিয়ানতদার।

আয়াতে উভয় পক্ষের সালিস নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে, কিন্তু তারা কি কি কাজ করবেন, তারা কোন্ পদ্ধতি প্রয়োগে মীমাংসায় পৌঁছবেন, আয়াতে সে কথা বলে দেয়া হয়নি। অবশ্য এ প্রসংগে বলা হয়েছে: إِن يُرِيدَا إِصْلَاحًا يُوَفِّقِ اللَّهُ بَيْنَهُمَا ، অর্থাৎ "তারা উভয়ে যদি সমস্যার সমাধান চায়, তাদের পরস্পরের মধ্যে সমঝোতার মনোভাব থাকে, তাহলে আল্লাহ তা'আলা তাদের কাজে সহায়তা করবেন আর স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সদ্ভাব সৃষ্টি করে দেবেন।"

আয়াতে তারা উভয় মানে দু'জন সালিস অথবা স্বামী-স্ত্রী-দু'টোর একটা অথবা দু'টোই হতে পারে। প্রত্যেক বিবাদেরই একটা মীমাংসা হওয়া সম্ভব, কিন্তু শর্ত হলো উভয় পক্ষকে অবশ্যই সন্ধি প্রিয় হতে হবে, আর যারা সালিস করে বা মধ্যস্থ হয় তাদেরও আন্তরিকতা সহকারে যে কোনোভাবে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সমঝোতা করিয়ে দেয়ার মানসিকতা ও সর্বাত্মক চেষ্টা থাকতে হবে।

মীমাংসার পন্থা সম্পর্কে তাফহীমুল কুরআনে বলা হয়েছে এভাবে যে, স্বামী ও স্ত্রীর পরিবারের এক একজন লোক একত্রিত হবে এবং অনৈক্যের মূল কারণ অনুসন্ধান করে সম্মিলিতভাবে চিন্তা করে উভয়ের মধ্যে মিল সৃষ্টির পথ খুঁজে বের করবে। কিন্তু এ পঞ্চায়েত বা সালিস নিযুক্তির কাজ কে করবে-এ প্রশ্নের জবাব আল্লাহ তা'আলা এখানে অস্পষ্টই রেখেছেন। তাই স্বামী-স্ত্রীই ইচ্ছা করলে নিজ নিজ আত্মীয়-স্বজনের মধ্য থেকে এক একজন লোক নিজেদের অনৈক্য মীমাংসার জন্য নিযুক্ত করবে। তা না হলে উভয় পরিবারের মুরব্বীগণ হস্তক্ষেপ করে পঞ্চায়েত নিযুক্ত করবে। আর আদালত পর্যন্ত মোকদ্দমা দায়ের হলে আদালত নিজেই কোনো সিদ্ধান্ত করার পূর্বে পারিবারিক পর্যায়ে পঞ্চায়েত নিযুক্ত করে মীমাংসার চেষ্টা করবে।

সালিসের ক্ষমতা-ইখতিয়ার কতটুকু থাকবে-এ ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে। ফিকহবিদদের একদলের মত হলো, সালিসগণ চূড়ান্ত ফায়সালা করতে পারবে না, মীমাংসার যে পন্থা কার্যকরী হতে পারে বলে তারা মনে করবেন, তারা কেবল তার সুপারিশ করতে পারবে মাত্র; তা মেনে নেয়া বা না নেয়া দম্পতির মর্জির উপর নির্ভর করবে। কিন্তু দম্পতি যদি তালাক, খোলা অথবা অন্য কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে ফায়সালা করার জন্য তাদেরকে নিজেদের উকিল নিযুক্ত করে, তবে তাদের ফায়সালা মেনে নেয়া দম্পতির উপর ওয়াজিব হবে। এটা হানাফি ও শাফেয়ী মাযহাবের আলেমদের মত। অন্য ফকীহদের মতে উভয়ের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটানোর অধিকার তাদের নেই। হাসান বসরী, কাতাদাহ প্রমুখ একথাই বলেছেন। ফকীহদের আরেক দলের মতে দম্পতির মধ্যে মিলন কিংবা বিচ্ছেদ ঘটানোর পূর্ণ ইখতিয়ার সালিসদের রয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রা) সাঈদ ইবনে যুবাইর, ইবরাহীম নখয়ী, শাবী, মুহাম্মদ ইবনে সীরীন এবং অন্যান্য ফকীহগণ এ মত ব্যক্ত করেছেন।

হযরত ওসমান (রা) ও হযরত আলী (রা) বিভিন্ন ফয়সালার যেসব নজীর আমাদের সম্মুখে রয়েছে, তা থেকে জানা যায় যে, তাঁরা দু'জনই সালিস নিযুক্ত করে আদালতের পক্ষ থেকে সালিসদের রাজকীয় ক্ষমতা দান করতেন। হযরত আকীল ইবনে আবু তালিব এবং তাঁর স্ত্রী ফাতিমা বিনতে উতবা ইবনে রাবিয়ার মোকদ্দমা যখন হযরত ওসমান (রা)-এর আদালতে পেশ করা হলো, তখন তিনি স্বামীর পরিবার থেকে হযরত ইবনে আব্বাস (রা)-কে, স্ত্রীর পরিবার থেকে হযরত মুআবিয়া (রা) ইবনে আবি সুফিয়ান (রা)-কে সালিস নিযুক্ত করলেন, আর তাদের বললেন: আপনারা দু'জনই যদি এদের মধ্যে বিচ্ছেদ করে দেয়া যুক্তিযুক্ত মনে করেন, তবে তাই করে দেবেন। তাছাড়া হযরত আলী (রা)ও একটি মোকদ্দমায় সালিস নিযুক্ত করে তাকে বলেছিলেন : হয় মিলন, না হয় বিচ্ছেদ—দু'টির একটি করে দিন। এ থেকে প্রমাণিত হয় যে, সালিস নিজে কোনো আদালতী ক্ষমতার মালিক নয়, তবে আদালত যদি সালিস নিযুক্ত করার সময় তাদের এখতিয়ার দেয় তবে তাদের ফায়সালা আদালতের ফায়সালার ন্যায়ই কার্যকর হবে।

হযরত আলী (রা)-এর সময়কার একটি ঘটনা সুনানে বায়হাকী গ্রন্থে হযরত ওবায়দা সালমানীর রেওয়ায়েত ক্রমে বর্ণিত হয়েছে যে, একজন পুরুষ ও একজন মহিলা হযরত আলী (রা)-এর খেদমতে হাজির হলো। তাদের উভয়ের সাথে ছিল বহু লোকের এক এক দল। হযরত আলী (রা)-এর নির্দেশে পুরুষের পরিবার থেকে একজন এবং স্ত্রীর পরিবার থেকে একজন হাকাম বা সালিস নির্ধারণ করা হলো। তাদের সম্বোধন করে হযরত আলী (রা) বললেন, তোমরা কি তোমাদের দায়িত্ব সম্পর্কে জান? আর তোমাদের কি করতে হবে তা কি তোমরা অবগত? শোন, তোমরা যদি এ স্বামী-স্ত্রীকে একত্রে রাখার ব্যাপারেও তাদের পারস্পরিক আপোষ করে দেয়ার ব্যাপারে একমত হতে পার, তবে তাই কর। পক্ষান্তরে তোমরা যদি মনে কর যে তাদের মধ্যে আপোষ মীমাংসা করা সম্ভব নয়; কিংবা তা করে দিলে শেষ পর্যন্ত টিকে থাকবে না এবং তোমরা উভয়েই একমত হয়ে তাদের পৃথক করে দেয়া ভাল মনে কর—এতেই মঙ্গল বিবেচনা কর, তবে তাই করবে। একথা শুনে মহিলাটি বললো, আমি একথা মেনে নিলাম। উভয় সালিস আল্লাহর আইন অনুসারে যে ফায়সালা করবে—তা আমার মতের পক্ষে হোক অথবা বিরোধী হোক, আমি তাই মেনে নেব। কিন্তু পুরুষটি বললো, পৃথক হয়ে যাওয়া বা তালাক হয়ে যাওয়া আমি কোনোক্রমেই সহ্য করবো না। অবশ্য সালিসদের এ অধিকার দিচ্ছি যে, তারা আমার উপর যে কোনো রকম আর্থিক জরিমানা আরোপ করে তাকে (স্ত্রীকে) সম্মত করিয়ে দিতে পারে। হযরত আলী (রা) বললেন, তা হয় না। তোমারও সালিসদের তেমনি ক্ষমতা দেয়া উচিত। যেমন স্ত্রী দিয়েছে। এ ঘটনা থেকে কোনো কোনো মুজতাহিদ ইমাম নিয়ম উদ্ভাবন করেছেন যে, সালিসদের এখতিয়ার সম্পন্ন হওয়া উচিত। যেমন হযরত আলী স্বামী স্ত্রীকে বলে সালিসদের ক্ষমতা সম্পন্ন করেছেন। কিন্তু ইমাম আযম হযরত আবু হানিফা (রা) ও হযরত হাসান বসরী (র) সাব্যস্ত করেছেন যে, উল্লিখিত সালিসদের যদি ক্ষমতা সম্পন্ন হওয়াই অপরিহার্য হতো, তবে হযরত আলী কর্তৃক উভয় পক্ষের (স্বামী-স্ত্রীর) সম্মতিলাভের চেষ্টা করার কোনো প্রয়োজনীয়তাই ছিল না। সুতরাং উভয়ের সম্মতি আদায়ের চেষ্টাই প্রমাণ করে যে, প্রকৃতপক্ষে এ সালিসদ্বয় ক্ষমতাসম্পন্ন নয়। অবশ্য স্বামী-স্ত্রী যদি অধিকার বা ক্ষমতা দেয়, তবে তারা ক্ষমতা সম্পন্ন হয়ে যাবে। কুরআনুল কারীমের এ শিক্ষার মাধ্যমে মানুষের পারিবারিক বিবাদ বিসম্বাদ মীমাংসার ক্ষেত্রে অতি চমৎকার এক নতুন পথের উন্মোচন হয়েছে। যে পথে মামলা মোকদ্দমা আদালতে যাবার পূর্বেই পারিবারিক কিংবা সামাজিক পঞ্চায়েতের মাধ্যমে মীমাংসা করা যেতে পারে।

টিকাঃ
-(মা'আরেফুল কুরআন), (তাফহীমুল কুরআন)

ফন্ট সাইজ
15px
17px