📄 বিবাহে মোহরানা নির্ধারণ করা ফরয
وَأُحِلَّ لَكُمْ مَّا وَرَاءَ ذَلِكُمْ أَنْ تَبْتَغُوا بِأَمْوَالِكُم مُّحْصِنِينَ غَيْرَ مُسَافِحِينَ ، فَمَا اسْتَمْتَعْتُمْ بِهِ مِنْهُنَّ فَاتُوهُنَّ أُجُورَهُنَّ فَرِيضَةً ، وَلَا جُنَاحَ عَلَيْكُمْ فِيمَا تَرَاضَيْتُم بِهِ مِنْ بَعْدِ الْفَرِيضَةِ ، إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلِيمًا حَكِيمًا (النساء : ২৪)
"উপারিউক্ত মহিলাগণ ছাড়া তোমাদের সকল নারী হালাল করা হলো; তোমরা তাদেরকে তোমাদের সম্পদের বিনিময়ে তলব করবে বিবাহে আবদ্ধ করার জন্যে-যৌন কামনা চরিতার্থ করার জন্যে নয়। অতপর এতে করে তাদের দিয়ে দাম্পত্য জীবনের যে স্বাদ তোমরা লাভ করবে সে জন্যে তাদেরকে তাদের পাওনা (মোহরানা) ফরয হিসেবে আদায় করবে। অবশ্য মোহরানা নির্ধারণের পর পারস্পরিক সন্তুষ্টি সহকারে যদি তোমাদের মধ্যে সমঝোতা হয়ে যায়, তবে তাতে কোনো দোষ নেই। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বজ্ঞ, মহাবিজ্ঞানী।"-(সূরা আন নিসা: ২৪)
পূর্বোক্ত আয়াতে বর্ণিত নির্দিষ্ট মহিলাদের ছাড়া বাকী মহিলাদের মধ্য হতে মোহরানার বিনিময়ে বিয়ে করার হুকুম এ আয়াতে বর্ণনা করা হয়েছে। বলা হয়েছে ওসব নারীগণ ছাড়া বাকীসব নারী তোমাদের জন্যে হালাল করা হয়েছে। যেমন চাচার কন্যা, খালার মেয়ে, মামাত বোন, মামা ও চাচার স্ত্রী তাদের মৃত্যুর পর—যদি তারা অন্য কোনো সম্পর্ক দ্বারা হারাম না হয়। আর পালক পুত্রের স্ত্রী—যদি সে তাকে তালাক দিয়ে দেয়, কিংবা সে মারা যায়, স্ত্রী মারা গেলে তার বোন ইত্যাদি অসংখ্য প্রকারের মহিলাই مَا وَرَاءَ ذَلِكُمْ -এর অন্তর্ভুক্ত।
তবে কুরআনের অন্য আয়াতে চারজনের অধিক সংখ্যক নারীকে বিবাহ করতে নিষেধ করা হয়েছে। অর্থাৎ সর্বোচ্চ চারজনকে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ রাখা যেতে পারে। আয়াত থেকে বুঝা গেল মোহরানা ছাড়া বিবাহ হতে পারে না। এমনকি স্বামী-স্ত্রী উভয় যদি মোহরানা ছাড়া বিবাহে সম্মত হয়, তবুও মোহরানা অবশ্যই আদায় করতে হবে। তবে বিবাহের আকদ হওয়ার সময় যদি মোহরানার পরিমাণ উল্লেখ না করা হয়ে থাকে তবুও বিবাহ কার্যকর হয়ে যাবে। আর সে অবস্থায় 'মোহরে মেছেল' ওয়াজিব হবে। কোনো অবস্থাতেই বিবাহ মোহরানা ছাড়া জায়েয হবে না। অবশ্য মোহরানা আদায়ের ব্যাপারে স্ত্রীর পূর্ণ ক্ষমতা রয়েছে। সে ইচ্ছা করলে কোনো প্রকার চাপ ছাড়া স্বেচ্ছায় মোহরানা আংশিক বা সম্পূর্ণ মাফ করে দিতে পারে। 'মোহরে মেছেল' বলতে মেয়ের অন্যান্য বোন, ফুফু, চাচাত, জেঠাতো বোনদের মোহরের সমপরিমাণ মোহরানা বুঝায়।
এ আয়াতে أَن تَبْتَغُوا بِأَمْوَالِكُمْ (তোমাদের সম্পদের বিনিময়ে তলব করবে) বলে বুঝানো হয়েছে যে, বিবাহের উদ্দেশ্যে মহিলাদের সন্ধান কর তোমাদের সম্পদ তাদের মোহরানা হিসেবে দিয়ে। অর্থাৎ মোহরানা প্রদান করে বিবাহ কর। ফকীহগণ এ আয়াত থেকে প্রমাণ পেশ করেছেন যে, 'মোহরানা' বিবাহের একটি অত্যাবশ্যকীয় অংশ বা উপাদান, তার পরিমাণ নির্দিষ্ট হোক বা না-ই হোক। এ আয়াত থেকে প্রমাণ হয় 'মোহরানা' ছাড়া বিবাহ অনুষ্ঠিত হতে পারে না। তা অপরিহার্য, চাই তার পরিমাণ নির্দিষ্ট হোক বা না-ই হোক।
মোহরানার উপর্যুপরি তাকীদ থেকে প্রতিভাত হয় যে, নারীদের অধিকার সংরক্ষণে যত্নবান হওয়া ইসলামী আইনে কতটা বাঞ্ছনীয়। মূল আর্থিক ব্যয় বিবাহ এবং যিনা উভয় ক্ষেত্রেই অভিন্ন। পার্থক্য এই যে, বিবাহের দ্বারা জীবনটা মানুষের মত সুশৃংখল ও অনুগত হয়ে যায়। পক্ষান্তরে যিনার দ্বারা মানুষ পশুর মত হীন পর্যায়ে উপনীত হয়। আয়াতের শেষাংশে বিবাহের জুড়ি তালাসের জন্য পুরুষকে সম্বোধন করে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। যেন বিবাহের প্রস্তাবটা হবে পুরুষের কাজ আর গ্রহণ বা অনুমোদন করা হবে নারীর কাজ।
টিকাঃ
(বায়যাবী), (মাদারিক), (তাফসীরে মাজেদী)
📄 বিয়ে করবে স্বাধীন মুসলিম নারীকে
وَمَنْ لَّمْ يَسْتَطِعْ مِنْكُم طَوْلاً أَنْ يُنْكِحَ الْمُحْصَنَتِ الْمُؤْمِنَتِ فَمِنْ مَّا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ مِنْ فَتَيْتِكُمُ الْمُؤْمِنَتِ ، وَاللَّهُ أَعْلَمُ بِإِيْمَانِكُمْ ، বَعْضُكُمْ مِنْ بَعْضٍ :
"আর তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি স্বাধীন মুসলিম নারীকে বিয়ে করার সামর্থ রাখে না, সে তোমাদের অধিকারভুক্ত মুসলিম ক্রীতদাসীকে বিয়ে করবে। আল্লাহ তোমাদের ঈমান সম্পর্কে ভালভাবে ওয়াকিফ আছেন। তোমরা সবাই মূলত একই বংশীয়।"-(সূরা আন নিসা: ২৫)
একজন মুসলিম বিয়ে করবে একজন স্বাধীন সম্ভ্রান্ত মুসলিম মহিলাকে। কিন্তু কেউ যদি সম্ভ্রান্ত বংশের মুসলিম পাত্রী (মুহসানাত)-কে বিয়ে করার পুরো সামর্থ না রাখে, তবে সে নিজেদের মধ্যকার শরীয়তসম্মত মালিকানাধীন দাসীদের বিয়ে করবে। কেননা অধিকাংশ দাসীর মোহরানা ও খরচাদি কম হয়ে থাকে এবং তাদের গরীবের ঘরে বিয়ে দিতে সংকোচ করা হয় না। আর দাসীকে বিয়ে করতে কোনো পুরুষের সংকোচ করাও উচিত নয়। কেননা ধার্মিকতা ও ঈমানদারীর দিক থেকে একজন দাসী একজন স্বাধীন নারীর চেয়েও উত্তম হতে পারে। ব্যক্তির শ্রেষ্ঠত্বের ভিত্তিই হলো ঈমান ও তাকওয়া। তোমাদের মধ্যে ঈমানের দিক থেকে কে শ্রেষ্ঠ আর কে নিকৃষ্ট, তা কেবল আল্লাহই ভাল জানেন। কারণ এটা তো অন্তরের সাথেই সম্পৃক্ত, আর অন্তরের পূর্ণ খবর তো আল্লাহরই ভাল জানা আছে। পার্থিব দিক থেকে সংকোচের বড় কারণ হচ্ছে বংশগত পার্থক্য থাকা অথচ বংশের মূল উৎস হলেন হযরত আদম ও হাওয়া (আ)। উৎসের অভিন্নতার কারণে তোমরা সবাই পরস্পর সমান, সবাই একই বংশোদ্ভূত। সুতরাং সংকোচের কোনো কারণ থাকা মোটেই সমীচীন নয়।
অবশ্য আয়াতের ভাষ্যে বলা হয়েছে স্বাধীন নারীকে বিয়ে করার অর্থ সামর্থ না থাকলে ঈমানদার দাসীদের বিয়ে করা যায়। সুতরাং যথাসম্ভব স্বাধীন নারীকেই বিয়ে করার চেষ্টা করতে হবে। আর যদি দাসীদেরই বিয়ে করতে হয়, তবে ঈমানদার দাসী খোঁজ করতে হবে। হযরত ইমাম আবু হানিফা (র)-এর মত এটাই। তাঁর মতে স্বাধীন সম্ভ্রান্ত মুসলিম নারীকে বিয়ে করার সামর্থ থাকা সত্ত্বেও দাসী কিংবা ইয়াহুদী খৃষ্টান দাসীকে বিয়ে করা মাকরূহ। ইমাম শাফিঈ (র) ও অন্যান্য ইমামের মতে স্বাধীন নারীকে বিয়ে করার শক্তি সামর্থ থাকা সত্ত্বেও দাসীকে অথবা ইয়াহুদী খ্রীষ্টান দাসীকে বিয়ে করা সর্বাবস্থায় অবৈধ। চিন্তাশীল উলামায়ে কিরামের মতে স্বাধীন ইয়াহুদী-খ্রীষ্টান নারীকে বিয়ে করা বৈধ হলেও তা থেকে বেঁচে থাকা উত্তম। বর্তমান যুগে এর গুরুত্ব অত্যধিক।
আয়াতে বলা হয়েছে, "স্বাধীন মহিলাকে বিয়ে করার সামর্থ না থাকলে দাসী ঈমানদার মহিলাকে বিয়ে করবে।" সুতরাং মুতাআ বৈধ নয়। কারণ, স্বাধীন নারীকে বিয়ে করার সামর্থ না থাকা অবস্থায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির জন্যে মুতাআ ছিল সহজতম পথ। এতে যৌন বাসনারও পরিতৃপ্তি হতো এবং আর্থিক বোঝাও বিয়ের তুলনায় অনেক কম হতো। অথচ আল্লাহ তা'আলা স্বাধীন নারীকে বিবাহ করতে অসমর্থ হলেও মুতাআর অনুমতি দেননি। কাজেই মুতাআ সর্বাবস্থায় হারাম।
টিকাঃ
-(মাআরেফুল কুরআন)
📄 সম্ভ্রান্ত স্বাধীন মহিলাকে বিয়ে করার সামর্থ না থাকলে সবর করাই উত্তম
فَانكِحُوهُنَّ بِإِذْنِ أَهْلِهِنَّ وَاتُوهُنَّ أُجُورَهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ مُحْصَنَتِ غَيْرَ مُسْفِحْتِ وَلَا مُتَّخِذْتِ أَخْدَانٍ ، فَإِذَا أُحْصِنَّ فَإِنْ آتَيْنَ بِفَاحِشَةٍ فَعَلَيْهِنَّ نِصْفُ مَا عَلَى الْمُحْصَنَتِ مِنَ الْعَذَابِ ، ذَلِكَ لِمَنْ خَشِيَ الْعَنَتَ مِنْكُمْ ، وَأَنْ تَصْبِرُوا خَيْرٌ لَّكُمْ ، وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ (النساء : ২৫)
“তাদেরকে (দাসীদেরকে) তাদের মালিকের অনুমতিক্রমে বিয়ে কর এবং যথাবিধি তাদের মোহরানা আদায় কর। এমতাবস্থায় যে তারা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হবে—ব্যভিচারিণী কিংবা উপপতি গ্রহণকারিণী হবে না। অতপর তারা যখন বিবাহ বন্ধনে এসে যায় তখন যদি কোনো অশ্লীল কাজ করে, তবে তাদেরকে স্বাধীন নারীদের অর্ধেক শাস্তি ভোগ করতে হবে। এ হুকুম তাদের জন্য, তোমাদের মধ্যে যারা ব্যভিচারে লিপ্ত হয়ে পড়ার আশংকা করে। আর সবর করাই তোমাদের জন্য উত্তম। আল্লাহ ক্ষমাশীল, করুণাময়।”-(সূরা আন নিসা: ২৫)
কোনো পুরুষ সম্ভ্রান্ত স্বাধীন মহিলাকে বিয়ে করতে সমর্থ না হলে এবং তার ব্যভিচারে লিপ্ত হয়ে পড়ার আশংকা থাকলে, সে মুসলিম দাসী নারীকে বিয়ে করবে। কিন্তু তার জন্যে উত্তম যৌন সংযম অবলম্বন করা এবং সামর্থ হওয়ার অপেক্ষায় থাকা, যেন সে একজন স্বাধীন নারীকে বিয়ে করতে পারে। কেউ যদি যৌন সংযমে সক্ষম হওয়া সত্ত্বেও দাসী নারীকে বিয়ে করে বসে, তবে আল্লাহ তাকে পাকড়াও করবেন না, তাকে ক্ষমা করবেন। তিনি তো ক্ষমাশীল করুণাময়।
দাসী বিয়ে করলে তিনটি বিষয়ের প্রতি লক্ষ্য রাখতে উক্ত আয়াতে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। (১) মালিকদের অনুমতি নিয়ে তাদের বিয়ে করতে হবে, অন্যথা বিয়ে শুদ্ধ হবে না। কারণ, দাসীদের নিজের উপরও কোনো কর্তৃত্ব নেই। গোলামের অবস্থাও অনুরূপ, সে প্রভুর অনুমতি ছাড়া বিয়ে করতে পারবে না। (২) তাদের বিয়ে করতে হবে উত্তম পন্থায় মোহরানা আদায় করে দিয়ে। কোনো প্রকার টালবাহান করা, পুরোপুরি আদায় না করা কিংবা দাসী ভেবে কোনো প্রকার কষ্ট দেয়া যাবে না। (৩) তারা যেন সতী-সাধ্বী হয়, প্রকাশ্য ব্যভিচারিণী বা গোপন সম্পর্ক স্থাপনকারী না হয়। এমনকি স্বাধীন ব্যভিচারিণী নারী থেকেও বেঁচে থাকা উত্তম।
দাসী নারীদের বিয়ে হওয়ার পর যদি তাদের সতী-সাধ্বী থাকার ব্যবস্থা হয়ে যায়। তখনও যদি তারা যিনা করে বসে, তবে তারা স্বাধীন যিনাকারী নারীগণের নির্ধারিত শাস্তির অর্ধেক ভোগ করবে। এখানে অবিবাহিতা স্বাধীন নারীকে বুঝানো হয়েছে। অবিবাহিত স্বাধীন পুরুষ বা নারী যিনা করলে তাদের একশত বেত্রাঘাত করার বিধান রয়েছে।
ذَلِكَ لِمَنْ خَشِيَ الْعَنَتَ مِنْكُمْ অর্থাৎ দাসীদের বিয়ে করার অনুমতি ঐ ব্যক্তির জন্য যার যিনায় লিপ্ত হওয়ার আশংকা থাকে। সুতরাং যিনায় লিপ্ত হয়ে পড়ার আশংকা না থাকলে দাসী বিয়ে করার প্রয়োজন নেই। অবশ্য তবুও কেউ করে ফেললে তো আল্লাহর অনুমতি রয়েছেই।
সর্বশেষে আল্লাহ তা'আলা আল্লাহর ঘোষণা হলো, যিনার আশংকা থাকা সত্ত্বেও সবর করা এবং নিজেকে পবিত্র ও সৎ রাখতে পারা দাসীকে বিয়ে করার চেয়ে উত্তম। যারা বিয়ে করার সামর্থ রাখে না, খোরপোষ দেয়ার মত যাদের আর্থিক সচ্ছলতা নেই তাদের উচিত সবর করা এবং নিজেকে সৎ ও পবিত্র রাখা। আর আল্লাহর পক্ষ থেকে ব্যবস্থা হয়ে যাওয়ার অপেক্ষা করা।
📄 পুরুষগণ নারীদের উপর কর্তৃত্বশীল
الرِّجَالُ قَوَّامُونَ عَلَى النِّسَاءِ بِمَا فَضَّلَ اللهُ بَعْضَهُمْ عَلَى بَعْضٍ وَبِمَا أَنْفَقُوا مِنْ أَمْوَالِهِمْ ، فَالصَّلِحْتُ قُنِتُتُ حَفِظْتُ لِلْغَيْبِ بِمَا حَفِظَ اللهُ .
“পুরুষরা নারীদের উপর কর্তৃত্বশীল। এজন্যে যে আল্লাহ একের উপর অন্যের মর্যাদা দিয়েছেন আর এ জন্য যে, তারা তাদের অর্থ ব্যয় করে। সতী নারীগণ হয় অনুগত লোক চক্ষুর অন্তরালে ও সেসবের হেফাজত করে। যেসব কিছু আল্লাহ হেফাজতযোগ্য করে দিয়েছেন।” -(সূরা আন নিসাঃ ৩৪)
অন্য এক আয়াতে আল্লাহ ঘোষণা করেছেন, وَلِلرِّجَالِ عَلَيْهِنَّ دَرَجَةً “আর পুরুষদের রয়েছে নারীদের উপর মর্যাদা। আয়াতে পুরুষদের প্রধান্যের বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে বিশেষ ভংগিতে। পুরুষদের এ মর্যাদা নারীদের সামগ্রিক কল্যাণের বিষয় বিবেচনা করেই ব্যক্ত করা হয়েছে। এ প্রাধান্য নারীদের খাটো করা অথবা তাদের অধিকার খর্ব করার উদ্দেশ্যে নয়, বরং তাদের দৈহিক, মানসিক ও স্বভাবগত অবস্থানের প্রতি লক্ষ্য রেখেই এ ঘোষণা দেয়া হয়েছে। এ ঘোষণা তো দিয়েছেন তিনি, যে সত্ত্বা অত্যন্ত সুনিপুণভাবে সৃষ্টি করেছেন নর ও নারীকে। এখানে বলা হয়েছে, الرِّجَالُ قَوْامُونَ عَلَى النساء পুরুষরা নারীদের উপর কর্তৃত্বশীল বা দায়িত্বশীল। আরবীতে قَوَّامُ, قيام ও قَيْمٌ বলতে বুঝায় এমন ব্যক্তিকে যে কোনো কাজের পরিচালক, দায়িত্বশীল বা তত্ত্বাবধায়ক। তাই এ আয়াতের তরজমা করা হয় পুরুষরা স্ত্রীলোকদের পরিচালক বা অভিভাবক। সাধারণত কোনো যৌথ কাজ কারবারের জন্য যেমন একজন পরিচালক বা অভিভাবকের প্রয়োজন, তেমনি পরিবার পরিচালনার জন্যও আবশ্যক একজন পরিচালক বা অভিভাবক। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন পরিবার পরিচালনার দায়িত্ব শিশু বা স্ত্রীলোকের উপর অর্পণ না করে, তা অর্পণ করেছেন পুরুষের উপর। কারণ, সৃষ্টিগত দিক থেকে সংসার জীবনের দৈনন্দিন কার্যাদি পরিচালনা ও এতদসংক্রান্ত সমস্যাদি মুকাবিলা করার মানসিক যোগ্যতা ও দৈহিক ক্ষমতা শিশু ও নারীর তুলনায় পুরুষের অনেক বেশী।
ইসলাম পুরুষদের উপর নারীদের অধিকার ততটুকুই দিয়েছে, যতটুকু অধিকার পুরুষদের দিয়েছে নারীদের উপর। অর্থাৎ কুরআন ও হাদীস নারী-পুরুষের অধিকারের বেলায় পরস্পরের মধ্যে কোনো পার্থক্য করেনি। কিন্তু একটি বিষয়ে স্ত্রীর উপর দিয়েছে স্বামীর প্রাধান্য। আর তা হচ্ছে পরিবারে স্বামী হবে স্ত্রীর অভিভাবক, তত্ত্বাবধায়ক ও দায়িত্বশীল। তবে আল কুরআন এ বিষয়ে সুস্পষ্ট করে ঘোষণা করেছে যে, এ অভিভাবকত্ব স্বৈরাচারমূলকভাবে প্রয়োগ করার অধিকার স্বামীর নেই। বরং এ অভিভাবকত্ব হবে শরীয়াতের বিধি-বিধান ও পারস্পরিক পরামর্শের নীতিমালার অধীন। স্বামী নিজের খেয়াল-খুশী মাফিক যা ইচ্ছা তাই করতে পারবে না। বরং তাকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে : وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ "স্ত্রীদের সাথে সদাচরণ করে জীবন যাপন কর।" তেমনি আরেকটি আয়াতে বলা হয়েছে : عَنْ تَرَاضِ مِّنْهُمَا وَتَشَاوَرٍ অর্থাৎ পরিবারিক ও সাংসারিক কাজকর্ম স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক সন্তুষ্টি ও পরামর্শের ভিত্তিতে আনজাম দেবে। কাজেই স্বামীর অভিভাবকত্ব জনিত প্রাধান্য স্ত্রীর জন্য কোনো প্রকার ক্ষোভ বা অসন্তুষ্টির কারণ হতে পারে না। বরং স্বামীর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেয়ে তার দায়িত্ব পালন করার প্রতি অধিক জোর দেয়া হয়েছে।
রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তোমার সর্বত্তম স্ত্রী হবে সে যাকে তুমি দেখলে তোমার মন তৃপ্ত হবে, তাকে কোনো কাজের আদেশ করলে সে তা মেনে চলবে, আর তোমার অনুপস্থিতিতে সে তোমার সম্পদের ও তার নিজের হেফাজত করবে। স্বামীর আনুগত্য করা স্ত্রীর কর্তব্য, কিন্তু রাব্বুল আলামীন আল্লাহর দাসত্বের গুরুত্ব অনেক বেশী। সুতরাং কোনো স্বামী যদি তার স্ত্রীকে আল্লাহর নাফরমানীমূলক কোনো কাজের আদেশ করে অথবা নির্ধারিত ফরয পালনে বাধার সৃষ্টি করে, তবে স্বামীর সেই হুকুম পালন করতে অস্বীকার করা স্ত্রীর কর্তব্য। আল্লাহর কোনো নাফরমান অবাধ্য স্বামী যদি স্ত্রীকেও আল্লাহর নাফরমানী ও অবাধ্যতার কাজের প্রতি বাধ্য করে, তবে তাকে অমান্য করা স্ত্রীর ঈমানী দায়িত্ব। তখন যদি সে স্বামীর হুকুম পালন করে তবে সে গুনাহগার হবে। অবশ্য স্বামী কখনো কোনো নফল নামায-রোযা না করতে বললে, তা মেনে চলা স্ত্রীর কর্তব্য।