📘 আল কুরআনে নারী 📄 যে ১৪ প্রকার মহিলাকে বিয়ে করা হারাম

📄 যে ১৪ প্রকার মহিলাকে বিয়ে করা হারাম


حُرِّمَتْ عَلَيْكُمْ أُمَّهَتُكُمْ وَبَنْتُكُمْ وَأَخَوَتُكُمْ وَعَمْتُكُمْ وَخَلْتُكُمْ وَبَنْتُ الْآخِ وَبَنْتُ الأُخْتِ وَأُمَّهَتُكُمُ الَّتِي أَرْضَعْنَكُمْ وَأَخَوَاتُكُمْ مِّنَ الرَّضَاعَةِ وَأُمَّهْتُ نِسَائِكُمْ وَرَبَائِبُكُمُ الَّتِي فِي حُجُورِكُمْ مِّن نِّسَائِكُمُ الَّتِي دَخَلْتُمْ بِهِنَّ : فَإِنْ لَّمْ تَكُونُوا دَخَلْتُمْ بِهِنَّ فَلَا جُنَاحَ عَلَيْكُمْ ، وَحَلَائِلُ أَبْنَائِكُمُ الَّذِينَ مِنْ أَصْلَابِكُمْ ، وَأَنْ تَجْمَعُوا بَيْنَ الْأُخْتَيْنِ (النساء : ২৩)

"তোমাদের উপর হারাম করা হয়েছে তোমাদের মা, তোমাদের কন্যা, তোমাদের বোন, তোমাদের ফুফু, তোমাদের খালা, ভাইঝি, ভাগ্নী, আর তোমাদের সেসব মা- যারা তোমাদের দুধ খাওয়ায়েছেন, তোমাদের দুধ বোন, তোমাদের স্ত্রীদের মা, তোমাদের স্ত্রীদের কন্যা- যারা তোমাদের কোলে লালিত পালিত হয়েছে, সেসব স্ত্রীর কন্যারা যাদের সাথে তোমাদের স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছে। অবশ্য যদি স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক স্থাপিত না হয়ে থাকে তবে তোমাদের কোনো গুনাহ হবে না, আপন ঔরসজাত পুত্রের স্ত্রীগণ, তাছাড়া দুই সহোদরা বোনকে একত্রে বিবাহ করাও (তোমাদের উপর হারাম করা হয়েছে।)"-(সূরা আন নিসা: ২৩)

হযরত ইবনে আব্বাস (রা) বলেছেন, সাত প্রকারের মহিলা বংশগত কারণে আর সাত প্রকারের মহিলা বৈবাহিক সূত্রের কারণে বিবাহ করা হারাম হয়েছে। একথা বলে তিনি উক্ত আয়াত তিলাওয়াত করেছেন।

উপরোক্ত আয়াতে তোমাদের 'মা' বলতে কেবল গর্ভধারিণী মাকেই বুঝায় না, বরং সাথে সাথে দাদী, নানীও أُمَّهَتْ শব্দের অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তেমনিভাবে بَنَاتُكُمْ তোমাদের কন্যা বলতে স্বীয় ঔরষজাত কন্যা, কন্যার কন্যা ও পুত্রের কন্যা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। اَخَوَاتُكُمُ মানে তোমাদের সহোদরা বোন। তেমনি বৈমাত্রেয়া ও বৈপিত্রেয় বোনকেও বিয়ে করা হারাম। عَمَّتُكُمْ মানে তোমাদের ফুফু। অর্থাৎ পিতার সহোদরা বৈমাত্রেয়া বৈপিত্রেয়া-তিন প্রকারের ফুফুকেই বিয়ে করা হারাম। خَلْتُكُمْ খালাগণ। এখানেও মায়ের তিন প্রকার বোন অন্তর্ভুক্ত। بَنْتُ الْأَخِ ভাইয়ের কন্যা বলতেও তিন প্রকার ভাইয়ের কন্যাকে বুঝাবে بَنْتُ الْأُخْتِ বোনের কন্যাও ঐ তিন প্রকার বোনের কন্যা বুঝাবে।

যেসব মহিলার দুধ পান করা হয়েছে। তারা গর্ভধারিণী মা না হলেও মায়ের পর্যায়ভুক্ত বিধায় তাদের বিয়ে করা হারাম। এ দুধপান একবার হোক বা একাধিকবার হোক আর দুধ কম পান করুক অথবা বেশী পান করুক সর্বাবস্থায় দুধ মাকে বিয়ে করা হারাম। ফিক্হ শাস্ত্রের পরিভাষায় এ হারাম হওয়াকে হুরমতে রাদায়াত (حرمة رضاعة) বলে।

দুধ পান বলতে কেবল শিশুকালীন দুধ পান করাকেই বুঝাবে। ইমাম আবু হানিফা (র)-এর মতে সেই সময় হলো শিশুর বয়স যখন আড়াই বছর পর্যন্ত থাকে। সুতরাং শিশুর বয়স আড়াই বছরের মধ্যে সে যেই মহিলার দুধ পান করবে তার সাথে সেই শিশুর বয়ঃপ্রাপ্ত অবস্থায় বিয়ে জায়েয নেই। কোনো বালক-বালিকা যদি উক্ত বয়সের পরে কোনো স্ত্রীলোকের দুধ পান করে, তবে এতে হুরমতে রাদায়াত বা দুধ পানজনিত অবৈধতা প্রমাণিত হবে না।

সকল প্রকার দুধ বোনকে বিয়ে করা হারাম। বংশগত সম্পর্কের কারণে যাদের বিয়ে করা হারাম হয়ে যায়, দুধ পানের সম্পর্কের কারণেও সেসব লোকদের সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করা হারাম হয়ে যায়। হাদীস শরীফে আছে :
يحرم من الرضاعة ما يحرم من الولادة
ان الله حرم من الرضاعة ماحرم من النسب
"দুধ পানে বিয়ে হারাম হয়, যারা জন্মের কারণে হারাম হয়।" "আল্লাহ তা'আলা দুধ পানে হারাম করেছেন যাদের বংশের কারণে হারাম করেছেন।"

স্ত্রীদের মাতা অর্থাৎ শ্বাশুড়ীকে বিয়ে করা হারাম। তেমনি স্ত্রীদের দাদী, নানী, বংশগত ও দুধ গত সবাই এর অন্তর্ভুক্ত।

যে মহিলাকে বিয়ে করে সহবাস করেছে সেই মহিলার অন্য স্বামীর ঔরষজাত কন্যা, পৌত্রী ও দৌহিত্রীও হারাম হয়ে যায়। তাদের কাউকে বিয়ে করা জায়েয নয়।

ঔরষজাত সন্তানের স্ত্রীকে বিয়ে করা হারাম। এখানে ঔরষজাত পুত্রের মধ্যে পৌত্র ও দৌহিত্র সবাই অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং তাদের স্ত্রীকেও বিয়ে করা জায়েয নেই। কিন্তু সন্তান বা পুত্র যদি ঔরসজাত না হয় অর্থাৎ পোষ্য বা পালক পুত্র হয়, তবে তার স্ত্রীকে বিবাহ করা হারাম নয়। এখানে স্মরণ রাখা আবশ্যক যে, দুধপুত্র বংশগত পুত্রের পর্যায়ভুক্ত, কাজেই তার স্ত্রীকেও বিয়ে করা হারাম।

দুই বোনকে একই সময় স্ত্রী হিসেবে রাখা হারাম। চাই তারা বংশগত হোক, দুধ পানজনিত হোক অথবা বৈমাত্রেয় বা বৈপিত্রেয় হোক। একজনের মৃত্যু বা তালাকের পর অন্য বোনকে বিয়ে করা জায়েয।

উপরের আয়াতের ১৩জন মহিলা এবং পরবর্তী আয়াতের একজন সহ (অন্যের স্ত্রী) মোট ১৪জন স্ত্রীলোককে বিবাহ করা হারাম।

📘 আল কুরআনে নারী 📄 স্ত্রী গ্রহণ করার ব্যাপারে আল্লাহর মীমাংসা

📄 স্ত্রী গ্রহণ করার ব্যাপারে আল্লাহর মীমাংসা


وَالْمُحْصَنَتُ مِنَ النِّسَاءِ إِلَّا مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ كِتُبَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ

"আর সেসব নারীও তোমাদের জন্যে হারাম, যারা অন্য কারো বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ। অবশ্য তোমাদের অধিকারভুক্ত দাসীগণ এর ব্যতিক্রম। এটা তোমাদের জন্য আল্লাহর বিধান।" -(সূরা আন নিসা: ২৪)

যে চৌদ্দ প্রকার স্ত্রীলোককে বিবাহ করা হারাম করা হয়েছে উপরে তার তের প্রকারের বিবরণ দেয়া হয়েছে। এখানে চৌদ্দতম প্রকারের মহিলার উল্লেখ করা হয়েছে; আর তারা হচ্ছে অন্যের বিবাহে আবদ্ধ স্ত্রীলোক। প্রকাশ থাকে যে, পূর্ববর্তী আয়াতে ও এ আয়াতের প্রথমাংশে যে চৌদ্দ প্রকারের স্ত্রী লোককে বিবাহ করা হারাম ঘোষণা করা হয়েছে, তাদের মধ্যে রয়েছে (১) বংশের কারণে হারাম, (২) দুধ পানের কারণে হারাম, (৩) বৈবাহিক সম্পর্কের কারণে হারাম। -এ তিন কারণে হারাম ঘোষিত মহিলারা চিরদিনের জন্যে হারাম। এদের বলা হয় মুহাররামাতে আবাদিয়া (مُحَرَّمَاتُ أَبَدِيةُ) বা চিরতরে হারাম। উক্ত চৌদ্দ প্রকারের নারীর মধ্যে শেষ দুই প্রকারের হারাম ঘোষিত মহিলা কোনো কোনো সময় হালাল হয়ে থাকে। যেমন, এক বোন বিবাহ বন্ধনে থাকা পর্যন্ত অপর বোন সেই ব্যক্তির জন্যে হারাম হলেও প্রথম বোন মারা গেলে অথবা তার সাথে বিবাহ সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে গেলে অপর বোনকে বিবাহ করা বৈধ। তেমনি পর স্ত্রী যতক্ষণ পর্যন্ত পর স্ত্রী থাকে ততক্ষণ পর্যন্ত তাকে অন্য পুরুষ বিয়ে করতে না পারলেও সেই লোকের মৃত্যু অথবা সে তালাক দিলে ঐ মহিলাকে অন্য পুরুষ বিয়ে করতে পারে। সুতরাং চৌদ্দ প্রকারের শেষ দুই প্রকারের মহিলা মুহাররামাতে আবাদিয়া (চির হারাম) মহিলার অন্তর্ভুক্ত নয়।

আয়াতে "অধিকারভুক্ত দাসী"গণকে হালাল ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু এ বিষয়টি সম্পর্কে অধুনা এক শ্রেণীর মুসলিম চিন্তাবিদদের মধ্যেও বিভ্রান্তি বিরাজ করছে। যেসব স্ত্রীলোক যুদ্ধ ক্ষেত্র থেকে বন্দী হয়ে আসে আর তাদের কাফের স্বামী যদি দারুল হরবে (বা কাফের শত্রু দেশে) থেকে যায়, তবে সেসব স্ত্রীলোককে গ্রহণ করা হারাম নয়। কেননা দারুল হরব থেকে দারুল ইসলামে চলে আসার কারণে তাদের বিবাহ বন্ধন ছিন্ন হয়ে গেছে। এ ধরনের স্ত্রীলোকদের বিবাহ করা যেতে পারে, কারো মালিকানাধীন দাসী হিসাবে থাকলে তার সাথে সঙ্গমও করা যেতে পারে। অবশ্য স্বামী-স্ত্রী উভয়ই একত্রে বন্দী হয়ে আসলে তাদের ব্যাপারে ফিকহবিদদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। ইমাম আবু হানিফা (র) ও তাঁর শিষ্যদের মতে তাদের বিবাহ বহাল থাকবে। কিন্তু ইমাম শাফিঈ (র)-এর মতে তাদের বিবাহ বহাল থাকবে না।

দাসীর সাথে সংগম
অধিকারভুক্ত দাসীদের সাথে সঙ্গম করার বিষয়ে সৃষ্ট ভুল ধারণা নিরসনের জন্যে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো ভাল করে বুঝে নেয়া দরকার।
(১) যুদ্ধ ক্ষেত্র থেকে বন্দী হয়ে আসলেই তাদের সাথে কোনো লোক সঙ্গম করতে পারবে না। বরং তা হবে যিনার শামিল। ইসলামী শরীয়ত মতে এ জাতীয় মহিলারা (ইসলামী) সরকারের অধীন থাকবে। আর সরকার ইচ্ছা করলে তাদের স্বাধীন করে দিতে পারে। বিনিময় মূল্য নিয়ে রেহাই দিতে পারে, শত্রু পক্ষের হাতে বন্দী মুসলমানের সাথে বিনিময় করতে পারে। তাছাড়া মুসলিম সৈনিকদের মধ্যে বণ্টন করার ইখতিয়ার (ইসলামী) সরকারের আছে। মূলত একজন সৈনিক কেবলমাত্র সেই বন্দী স্ত্রীলোকের সাথেই সঙ্গম করতে পারে, যাকে সরকার যথারীতি তার মালিকানায় ছেড়ে দিয়েছে।
(২) এরূপ শরীয়ত সম্মত উপায়ে মালিকানাধীন স্ত্রীর সাথে সঙ্গম করতে হলেও ইদ্দত পালনের পরই তা বৈধ হতে পারে। অর্থাৎ একবার মাসিক ঋতু হওয়া বা তার গর্ভ ধারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার পরই কেবল তা বৈধ।
(৩) এরূপ বন্দী নারীর আহলে কিতাব হওয়া শর্ত নয়, বরং যে কোনো ধর্মের নারীর সাথে সঙ্গম জায়েয।
(৪) যার মালিকানাধীন বণ্টন করে দেয়া হয়েছে সে ছাড়া অন্য কেউ তার সাথে সঙ্গম করতে পারবে না।
(৫) এ মালিকানা হস্তান্তরযোগ্য।
(৬) সরকার কারো মালিকানায় সপর্দ করার পর পুনরায় তাকে ফেরত নেয়ার অধিকার সরকারের থাকবে না।
(৭) কোনো সেনাধ্যক্ষ এরূপ মহিলাকে তার কোনো সৈনিকের কাছে যৌন লালসা চরিতার্থ করতে দিলে তা ইসলামী শরীয়তে সম্পূর্ণ না-জায়েয কাজ হবে। এটা প্রকাশ্য যিনা বা ব্যভিচারের শামিল।
কোনো মহিলা যদি দারুল হরবে মুসলমান হয়ে যায় আর তার স্বামী কাফের থাকে তবে শরীয়তের বিচারক তাকে ইসলাম গ্রহণ করতে বলবে। সে তা অস্বীকার করলে বিচারক তাদের বিবাহ বিচ্ছেদ করে দিবে। এ বিচ্ছেদ তালাক বলে গণ্য হবে।

একজন মহিলা একই সময় একাধিক স্বামী গ্রহণ করতে পারবে না
অধুনা মূর্খ ধর্মদ্রোহী ও ইসলাম বিদ্বেষীদের মতে একজন পুরুষ যেমন একাধিক নারী গ্রহণ করতে পারে, একজন নারীরও তেমনি একাধিক স্বামী গ্রহণের অধিকার থাকা চাই। তাদের এ দাবী আলোচ্য আয়াতের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। তারা একথাটি বুঝে না যে, পুরুষের জন্যে একাধিক বিবাহ একটা নিয়ামত ও সামাজিক শৃংখলার চাবিকাঠি। এটা প্রত্যেক ধর্মেই স্বীকৃত এবং ঐতিহাসিক সত্য। পক্ষান্তরে একজন নারীর জন্যে একাধিক স্বামী স্বয়ং নারীর জন্যেই বিপদের কারণ, আর তা স্বামীদের জন্যেও নির্লজ্জতা এবং সামাজিক বিপর্যয়ের উৎস। কোনো সমাজে এ নীতি চালু থাকলে তা আর মানুষের সমাজ থাকে না। এতে মানব বংশ এক চরম বিপর্যয়ের সম্মুখীন হতে বাধ্য। আজকের পাশ্চাত্যই তার উজ্জ্বলতম সাক্ষী।

স্বভাব-প্রকৃতি আর সাধারণ যুক্তিতেও এমন নারীর জন্যে একাধিক স্বামী থাকার কোনো বৈধতা দেখা যায় না। কারণ, বিয়ের বুনিয়াদী লক্ষ্য হলো বংশ বিস্তার ও সামাজিক শৃংখলা সংরক্ষণ। একজন পুরুষ দ্বারা তো একাধিক মহিলা গর্ভধারণ করতে পারে; কিন্তু একজন নারী একাধিক পুরুষ দ্বারা গর্ভবতী হতে পারে না। সে তো গর্ভধারণ করে একজন থেকেই। তাই একাধিক স্বামীর অবশিষ্ট সব স্বামীর শক্তি বিনষ্ট হবে, কাম-প্রবৃত্তি চরিতার্থ ছাড়া তাদের কোনো কাজ থাকবে না। দ্বিতীয়ত সৃষ্টিগতভাবেই নারী অবলা এবং অনেক সময় সে থাকে স্বামীর সহবাসের অযোগ্য। কোনো কোনো সময় একজন স্বামীর হক আদায় করাও তার দ্বারা সম্ভব হয় না। একাধিক স্বামীর তো প্রশ্নই উঠে না। তৃতীয়ত সাধারণ পুরুষ নারীর তুলনায় অধিক শক্তিশালী। এমতাবস্থায় কোনো স্বামীর যৌনশক্তি স্বাভাবিকের চেয়ে বেশী হলে সে একজন নারী দ্বারা সন্তুষ্ট হতে পারে না। তখন তার আরেকজন স্ত্রী না থাকলে সে অবৈধ পথে গিয়ে গোটা সমাজকে দুষিত করে ছাড়বে। কিন্তু নারী দ্বারা এমনটি হওয়ার আশংকা কম।

টিকাঃ
-(মা'আরেফুল কুরআন), (তাফহীমুল কুরআন), (মা'আরেফুল কুরআন: মুফতী মুহাম্মদ শফী (র))

📘 আল কুরআনে নারী 📄 বিবাহে মোহরানা নির্ধারণ করা ফরয

📄 বিবাহে মোহরানা নির্ধারণ করা ফরয


وَأُحِلَّ لَكُمْ مَّا وَرَاءَ ذَلِكُمْ أَنْ تَبْتَغُوا بِأَمْوَالِكُم مُّحْصِنِينَ غَيْرَ مُسَافِحِينَ ، فَمَا اسْتَمْتَعْتُمْ بِهِ مِنْهُنَّ فَاتُوهُنَّ أُجُورَهُنَّ فَرِيضَةً ، وَلَا جُنَاحَ عَلَيْكُمْ فِيمَا تَرَاضَيْتُم بِهِ مِنْ بَعْدِ الْفَرِيضَةِ ، إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلِيمًا حَكِيمًا (النساء : ২৪)

"উপারিউক্ত মহিলাগণ ছাড়া তোমাদের সকল নারী হালাল করা হলো; তোমরা তাদেরকে তোমাদের সম্পদের বিনিময়ে তলব করবে বিবাহে আবদ্ধ করার জন্যে-যৌন কামনা চরিতার্থ করার জন্যে নয়। অতপর এতে করে তাদের দিয়ে দাম্পত্য জীবনের যে স্বাদ তোমরা লাভ করবে সে জন্যে তাদেরকে তাদের পাওনা (মোহরানা) ফরয হিসেবে আদায় করবে। অবশ্য মোহরানা নির্ধারণের পর পারস্পরিক সন্তুষ্টি সহকারে যদি তোমাদের মধ্যে সমঝোতা হয়ে যায়, তবে তাতে কোনো দোষ নেই। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বজ্ঞ, মহাবিজ্ঞানী।"-(সূরা আন নিসা: ২৪)

পূর্বোক্ত আয়াতে বর্ণিত নির্দিষ্ট মহিলাদের ছাড়া বাকী মহিলাদের মধ্য হতে মোহরানার বিনিময়ে বিয়ে করার হুকুম এ আয়াতে বর্ণনা করা হয়েছে। বলা হয়েছে ওসব নারীগণ ছাড়া বাকীসব নারী তোমাদের জন্যে হালাল করা হয়েছে। যেমন চাচার কন্যা, খালার মেয়ে, মামাত বোন, মামা ও চাচার স্ত্রী তাদের মৃত্যুর পর—যদি তারা অন্য কোনো সম্পর্ক দ্বারা হারাম না হয়। আর পালক পুত্রের স্ত্রী—যদি সে তাকে তালাক দিয়ে দেয়, কিংবা সে মারা যায়, স্ত্রী মারা গেলে তার বোন ইত্যাদি অসংখ্য প্রকারের মহিলাই مَا وَرَاءَ ذَلِكُمْ -এর অন্তর্ভুক্ত।

তবে কুরআনের অন্য আয়াতে চারজনের অধিক সংখ্যক নারীকে বিবাহ করতে নিষেধ করা হয়েছে। অর্থাৎ সর্বোচ্চ চারজনকে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ রাখা যেতে পারে। আয়াত থেকে বুঝা গেল মোহরানা ছাড়া বিবাহ হতে পারে না। এমনকি স্বামী-স্ত্রী উভয় যদি মোহরানা ছাড়া বিবাহে সম্মত হয়, তবুও মোহরানা অবশ্যই আদায় করতে হবে। তবে বিবাহের আকদ হওয়ার সময় যদি মোহরানার পরিমাণ উল্লেখ না করা হয়ে থাকে তবুও বিবাহ কার্যকর হয়ে যাবে। আর সে অবস্থায় 'মোহরে মেছেল' ওয়াজিব হবে। কোনো অবস্থাতেই বিবাহ মোহরানা ছাড়া জায়েয হবে না। অবশ্য মোহরানা আদায়ের ব্যাপারে স্ত্রীর পূর্ণ ক্ষমতা রয়েছে। সে ইচ্ছা করলে কোনো প্রকার চাপ ছাড়া স্বেচ্ছায় মোহরানা আংশিক বা সম্পূর্ণ মাফ করে দিতে পারে। 'মোহরে মেছেল' বলতে মেয়ের অন্যান্য বোন, ফুফু, চাচাত, জেঠাতো বোনদের মোহরের সমপরিমাণ মোহরানা বুঝায়।

এ আয়াতে أَن تَبْتَغُوا بِأَمْوَالِكُمْ (তোমাদের সম্পদের বিনিময়ে তলব করবে) বলে বুঝানো হয়েছে যে, বিবাহের উদ্দেশ্যে মহিলাদের সন্ধান কর তোমাদের সম্পদ তাদের মোহরানা হিসেবে দিয়ে। অর্থাৎ মোহরানা প্রদান করে বিবাহ কর। ফকীহগণ এ আয়াত থেকে প্রমাণ পেশ করেছেন যে, 'মোহরানা' বিবাহের একটি অত্যাবশ্যকীয় অংশ বা উপাদান, তার পরিমাণ নির্দিষ্ট হোক বা না-ই হোক। এ আয়াত থেকে প্রমাণ হয় 'মোহরানা' ছাড়া বিবাহ অনুষ্ঠিত হতে পারে না। তা অপরিহার্য, চাই তার পরিমাণ নির্দিষ্ট হোক বা না-ই হোক।

মোহরানার উপর্যুপরি তাকীদ থেকে প্রতিভাত হয় যে, নারীদের অধিকার সংরক্ষণে যত্নবান হওয়া ইসলামী আইনে কতটা বাঞ্ছনীয়। মূল আর্থিক ব্যয় বিবাহ এবং যিনা উভয় ক্ষেত্রেই অভিন্ন। পার্থক্য এই যে, বিবাহের দ্বারা জীবনটা মানুষের মত সুশৃংখল ও অনুগত হয়ে যায়। পক্ষান্তরে যিনার দ্বারা মানুষ পশুর মত হীন পর্যায়ে উপনীত হয়। আয়াতের শেষাংশে বিবাহের জুড়ি তালাসের জন্য পুরুষকে সম্বোধন করে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। যেন বিবাহের প্রস্তাবটা হবে পুরুষের কাজ আর গ্রহণ বা অনুমোদন করা হবে নারীর কাজ।

টিকাঃ
(বায়যাবী), (মাদারিক), (তাফসীরে মাজেদী)

📘 আল কুরআনে নারী 📄 বিয়ে করবে স্বাধীন মুসলিম নারীকে

📄 বিয়ে করবে স্বাধীন মুসলিম নারীকে


وَمَنْ لَّمْ يَسْتَطِعْ مِنْكُم طَوْلاً أَنْ يُنْكِحَ الْمُحْصَنَتِ الْمُؤْمِنَتِ فَمِنْ مَّا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ مِنْ فَتَيْتِكُمُ الْمُؤْمِنَتِ ، وَاللَّهُ أَعْلَمُ بِإِيْمَانِكُمْ ، বَعْضُكُمْ مِنْ بَعْضٍ :

"আর তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি স্বাধীন মুসলিম নারীকে বিয়ে করার সামর্থ রাখে না, সে তোমাদের অধিকারভুক্ত মুসলিম ক্রীতদাসীকে বিয়ে করবে। আল্লাহ তোমাদের ঈমান সম্পর্কে ভালভাবে ওয়াকিফ আছেন। তোমরা সবাই মূলত একই বংশীয়।"-(সূরা আন নিসা: ২৫)

একজন মুসলিম বিয়ে করবে একজন স্বাধীন সম্ভ্রান্ত মুসলিম মহিলাকে। কিন্তু কেউ যদি সম্ভ্রান্ত বংশের মুসলিম পাত্রী (মুহসানাত)-কে বিয়ে করার পুরো সামর্থ না রাখে, তবে সে নিজেদের মধ্যকার শরীয়তসম্মত মালিকানাধীন দাসীদের বিয়ে করবে। কেননা অধিকাংশ দাসীর মোহরানা ও খরচাদি কম হয়ে থাকে এবং তাদের গরীবের ঘরে বিয়ে দিতে সংকোচ করা হয় না। আর দাসীকে বিয়ে করতে কোনো পুরুষের সংকোচ করাও উচিত নয়। কেননা ধার্মিকতা ও ঈমানদারীর দিক থেকে একজন দাসী একজন স্বাধীন নারীর চেয়েও উত্তম হতে পারে। ব্যক্তির শ্রেষ্ঠত্বের ভিত্তিই হলো ঈমান ও তাকওয়া। তোমাদের মধ্যে ঈমানের দিক থেকে কে শ্রেষ্ঠ আর কে নিকৃষ্ট, তা কেবল আল্লাহই ভাল জানেন। কারণ এটা তো অন্তরের সাথেই সম্পৃক্ত, আর অন্তরের পূর্ণ খবর তো আল্লাহরই ভাল জানা আছে। পার্থিব দিক থেকে সংকোচের বড় কারণ হচ্ছে বংশগত পার্থক্য থাকা অথচ বংশের মূল উৎস হলেন হযরত আদম ও হাওয়া (আ)। উৎসের অভিন্নতার কারণে তোমরা সবাই পরস্পর সমান, সবাই একই বংশোদ্ভূত। সুতরাং সংকোচের কোনো কারণ থাকা মোটেই সমীচীন নয়।

অবশ্য আয়াতের ভাষ্যে বলা হয়েছে স্বাধীন নারীকে বিয়ে করার অর্থ সামর্থ না থাকলে ঈমানদার দাসীদের বিয়ে করা যায়। সুতরাং যথাসম্ভব স্বাধীন নারীকেই বিয়ে করার চেষ্টা করতে হবে। আর যদি দাসীদেরই বিয়ে করতে হয়, তবে ঈমানদার দাসী খোঁজ করতে হবে। হযরত ইমাম আবু হানিফা (র)-এর মত এটাই। তাঁর মতে স্বাধীন সম্ভ্রান্ত মুসলিম নারীকে বিয়ে করার সামর্থ থাকা সত্ত্বেও দাসী কিংবা ইয়াহুদী খৃষ্টান দাসীকে বিয়ে করা মাকরূহ। ইমাম শাফিঈ (র) ও অন্যান্য ইমামের মতে স্বাধীন নারীকে বিয়ে করার শক্তি সামর্থ থাকা সত্ত্বেও দাসীকে অথবা ইয়াহুদী খ্রীষ্টান দাসীকে বিয়ে করা সর্বাবস্থায় অবৈধ। চিন্তাশীল উলামায়ে কিরামের মতে স্বাধীন ইয়াহুদী-খ্রীষ্টান নারীকে বিয়ে করা বৈধ হলেও তা থেকে বেঁচে থাকা উত্তম। বর্তমান যুগে এর গুরুত্ব অত্যধিক।

আয়াতে বলা হয়েছে, "স্বাধীন মহিলাকে বিয়ে করার সামর্থ না থাকলে দাসী ঈমানদার মহিলাকে বিয়ে করবে।" সুতরাং মুতাআ বৈধ নয়। কারণ, স্বাধীন নারীকে বিয়ে করার সামর্থ না থাকা অবস্থায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির জন্যে মুতাআ ছিল সহজতম পথ। এতে যৌন বাসনারও পরিতৃপ্তি হতো এবং আর্থিক বোঝাও বিয়ের তুলনায় অনেক কম হতো। অথচ আল্লাহ তা'আলা স্বাধীন নারীকে বিবাহ করতে অসমর্থ হলেও মুতাআর অনুমতি দেননি। কাজেই মুতাআ সর্বাবস্থায় হারাম।

টিকাঃ
-(মাআরেফুল কুরআন)

ফন্ট সাইজ
15px
17px