📘 আল কুরআনে নারী 📄 স্ত্রীদের মোহর তাদেরকেই দিতে হবে সন্তুষ্ট চিত্তে উদার মনে

📄 স্ত্রীদের মোহর তাদেরকেই দিতে হবে সন্তুষ্ট চিত্তে উদার মনে


وَآتُوا النِّسَاءَ صَدُقَتِهِنَّ نِحْلَةً ، فَإِنْ طِبْنَ لَكُمْ عَنْ شَيْءٍ مِّنْهُ نَفْسًا فَكُلُوهُ هَنِيئًا مَرِيئًا (النساء : ৪)

"তোমরা তোমাদের স্ত্রীদের মোহর খুশী মনে আদায় করে দাও। অবশ্য তারা যদি নিজেদের খুশীতে মোহরানার কিছু অংশ তোমাদের মাফ করে দেয়, তবে তোমরা তা স্বাচ্ছন্দে ভোগ করতে পার।"-(সূরা নিসা: ৪)

স্ত্রীদের মোহরানার টাকা পরিশোধের ব্যাপারে তখনকার দিনে নানা ধরনের যুলুম অত্যাচার চলতো। যেমন মোহরানার টাকা স্ত্রীদের হাতে না পৌঁছিয়ে পৌঁছানো হতো অভিভাবকদেরকে। আর অনেক সময় অভিভাবকরা তা আদায় করে নিজেরাই আত্মসাৎ করতো। তাই উক্ত আয়াতে আল্লাহ তা'আলা স্বামীর প্রতি নির্দেশ দিয়েছেন যে, মোহরানার টাকা তাকেই পরিশোধ কর, অন্যকে নয়। এখানে অভিভাবকদের প্রতিও এ নির্দেশ দেয়া হয়েছে যে, মোহরানা আদায় করে তা যার প্রাপ্য তার হাতেই অর্পণ কর। তার অনুমতি ছাড়া অন্য কেউ যেন তা খরচ না করে।

দ্বিতীয়তঃ স্ত্রীর মোহরানা পরিশোধ করার ব্যাপারে কোনো প্রকার সংকীর্ণতা ও তিক্ততা থাকতে পারবে না। তখনকার দিনে মোহরানা পরিশোধ করাকে জরিমানা দেয়ার মতো মনে করা হতো। স্বামীর এ অনাচার ও অভিভাবকদের সংকীর্ণতা রোধ করার লক্ষ্যেই রাব্বুল আলামীন نِحْلَةٌ (নিহলাতান) শব্দ ব্যবহার করেছেন। অভিধানে نِحْلَةٌ বলতে ঐ দানকে বলা হয় যা অত্যন্ত খুশীমনে ও আন্তরিকতা সহকারে প্রদান করা হয়। মূলত স্ত্রীদের মোহরানা অবশ্য পরিশোধ ঋণ বিশেষ। এ ঋণ পরিশোধ করা অত্যন্ত জরুরী। অন্যান্য ঋণ যেমন সন্তুষ্টচিত্তে অবশ্য দেনা হিসেবে পরিশোধ করা হয়, স্ত্রীর মোহরানাও তেমনি হৃষ্টচিত্তে ও উদারমনে পরিশোধ করা কর্তব্য।

তৃতীয়তঃ অনেক স্বামী স্ত্রীকে অসহায় অবলা পেয়ে নানাভাবে চাপ প্রয়োগ করে বা কৌশল অবলম্বন করে মোহরানা মাফ করিয়ে নিয়ে থাকে। তখনকার দিনেও এমনটি করা হতো। কিন্তু এভাবে মাফ করিয়ে নিলে প্রকৃতপক্ষে তা মাফ হয় না। কারণ এ ধরনের মাফ করা তো স্বেচ্ছায় না হয়ে পরিবেশ পরিস্থিতির চাপের মুখে হয়ে থাকে। এ ধরনের যুলুম প্রতিরোধ করার জন্যে আল্লাহর নির্দেশ হলো: فَإِنْ طِبْنَ لَكُمْ عَنْ شَيْ مِنْهُ نَفْسًا فَكُلُوهُ هَنِيئًا مَّرِيئًا . অর্থাৎ "যদি স্ত্রী নিজের পক্ষ থেকে স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে মোহরানার কিছু অংশ ক্ষমা করে দেয়, তবেই তোমরা হৃষ্টমনে তা ভোগ করতে পার।" সুতরাং চাপ প্রয়োগ কিংবা কোনো প্রকার জোর-জবরদস্তি করে ক্ষমা করিয়ে নেয়ার অর্থ কোনোক্রমেই ক্ষমা হিসেবে গণ্য হবে না।

এ ধরনের বহু নির্যাতন মূলক প্রথা তৎকালীন জাহেলী যুগে প্রচলিত ছিল। কুরআন সেসব জুলুমের উচ্ছেদ করেছে। কিন্তু পরিতাপের বিষয় আজও মুসলিম সমাজে অনুরূপ নির্যাতন দেখা যায়। আল-কুরআন সর্বপ্রকার নারী নির্যাতনসহ মোহর সংক্রান্ত জুলুমকেও পরিহার করার নির্দেশ দিয়েছে।

হযরত মাওলানা মুফতি শফী (র) তাঁর তাফসীরে মা'আরেফুল কুরআনে বলেন, "আজকের যুগে স্ত্রীরা মনে করেন যে, স্বাভাবিকভাবে যেহেতু মোহরানা পাওয়াই যাবে না, বরং দাবী করলে তিক্ততা সৃষ্টি এমনকি সম্পর্কের ফাটল সৃষ্টি হওয়াও বিচিত্র নয় সেহেতু তারা মোহরানার দাবী মাফ করে দিয়ে থাকেন। কিন্তু এ ধরনের ক্ষমার দ্বারা মোহরানা ঋণ কখনো মাফ হয় না।

হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (র) বলতেন, মোহরানার অর্থ স্ত্রীর হাতে দেয়ার পর স্ত্রী যদি তা ইচ্ছা মত খরচ করার সুযোগ লাভ করা সত্ত্বেও স্বামীকে দিয়ে দেয়। কেবলমাত্র তখনই সেটাকে মাফ করার পর্যায়ে গণ্য করা যেতে পারে।

মীরাসের বেলায়ও একই কথা প্রযোজ্য। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় পিতার মৃত্যুর পর পরিত্যক্ত সম্পত্তি ছেলেরাই দখল করে বসে। বোনদের অংশ দেয়া প্রয়োজন মনে করে না, কেউ কেউ দ্বীনদারীর খেয়ালে বোনদের থেকে মাফ চেয়ে নেয়। বোনরা যেহেতু মনে করে তাদের পাওনা আদায় করা সহজ নয়, তাই অনিচ্ছা সত্ত্বেও ভাইদের মন রক্ষার জন্যে মুখে মাফ করে দেয়। পিতার মৃত্যুর পর মায়ের অংশ বিশেষত বিমাতার প্রাপ্য অংশ নিয়েও একই অবস্থার সৃষ্টি হয়। এসব অংশীদারের প্রাপ্য যে আন্তরিক তুষ্টির সাথে ক্ষমা করা হয় না বিধায় যুলুমের অন্তর্ভুক্ত, তা স্বতঃসিদ্ধ।

স্ত্রীর মোহরানা পরিশোধের বিষয়টি ইসলামী শরীয়তে অনেক গুরুত্ব সহকারে বিবেচিত। কিন্তু মুসলিম সমাজ অন্যান্য জরুরী বিষয়ের ব্যাপারে যেমন উদাসীনতা প্রদর্শন করে ঠিক স্ত্রীর মোহরানার বেলায়ও তাই করে আসছে। অধিকন্তু আজকের মুসলিম সমাজে বিজাতীয়দের অনুকরণে যৌতুকের অভিশাপ জেঁকে বসেছে অত্যন্ত ব্যাপকভাবে। মেয়েদের মীরাস থেকে বঞ্চিত করার মত জঘন্য তৎপরতাও এজন্যে কম দায়ী নয়। এমনকি ইসলামের মৌলিক ইবাদাত পালনে অভ্যস্ত দীনদার ব্যক্তিরাও দীনের সঠিক তাৎপর্য অনুধাবনে পশ্চাদপদ বিধায় এমনিভাবে দীনের বহু মৌলিক বিষয় সম্পর্কে উদাসীনতা প্রদর্শন করে থাকে। ফলে সমাজে দেখা দিয়েছে নানান অনাচার ও ইসলামী শরীয়ত পরিপন্থী রীতিনীতি। আর বাস্তব জীবনে মুসলিম-অমুসলিমের জীবন ধারা একাকার হয়ে পড়েছে। পরিণামে পৃথিবীর মানব সাধারণ বঞ্চিত হচ্ছে ইসলামী জীবন বিধানের অনিবার্য সুফল থেকে।

বস্তুত আল্লাহ, রাসূল ও আখিরাতে বিশ্বাসী লোকদের ঈমানী দায়িত্ব হলো সমাজে প্রচলিত এসব যুলুম-অত্যাচার থেকে দূরে থাকা। স্ত্রীর মোহরানার টাকা ও বোনদের প্রাপ্য মীরাস এবং ভাইদের মৃত্যুর পর ভাতিজা ও ভাইঝীদের মীরাস ও যাবতীয় সম্পদ সংরক্ষণ করা এবং প্রাপকদের পাওনা হিসাব-নিকাশ করে পুরোপুরি তাদের পরিশোধ করা। নামায-রোযার চেয়ে এসবের গুরুত্ব দেয়া উচিত। কারণ নামায-রোযা তো আল্লাহর হক, অথচ এসবই হচ্ছে বান্দার হক। আল্লাহ সবাইকে সহীহ সমুঝ দান করুন।

📘 আল কুরআনে নারী 📄 পূর্ব পুরুষ ও অধস্তন পুরুষের স্ত্রীদের বিয়ে করা হারাম

📄 পূর্ব পুরুষ ও অধস্তন পুরুষের স্ত্রীদের বিয়ে করা হারাম


وَلَا تَنْكِحُوا مَا نَكَحَ آبَاؤُكُم مِّنَ النِّسَاء إِلَّا مَا قَدْ سَلَفَ إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً ومقتا ، وَسَاءَ سَبِيلاً (النساء : ২২)

"তোমরা সেসব স্ত্রীলোককে বিবাহ করবে না যাদের বিবাহ করেছে তোমাদের বাপ-দাদারা। অবশ্য পূর্বে এরূপ কিছু হয়ে থাকলে তা ভিন্ন কথা। নিশ্চয়ই তা খুবই নির্লজ্জ ও ঘৃণ্য এবং অত্যন্ত খারাপ পথ।" -(সূরা আন নিসা: ২২)

জাহেলী যুগে পিতার মৃত্যুর পর তার স্ত্রীকে পুত্ররা নির্দ্বিধায় বিয়ে করে নিত। আলোচ্য আয়াতে আল্লাহ তা'আলা এ নির্লজ্জ কাজটি নিষিদ্ধ করে দিয়েছেন। আর আল্লাহ একে আল্লাহর অসন্তুষ্টির কারণ বলে অভিহিত করেছেন। এতো এক কুরুচী ও কুস্বভাবের কাজ। দীর্ঘদিন যাকে মা বলে সম্বোধন করা হয়ে আসছে, পিতার মৃত্যুর পর তাকে স্ত্রী করে রাখা মানব চরিত্রের জঘন্যতম অপমৃত্যু ছাড়া আর কি হতে পারে?

মুফতী মুহাম্মদ শফী (র) তাফসীরে মা'আরেফুল কুরআনে এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, তোমরা ঐ নারীকে বিয়ে করো না যাদেরকে তোমাদের পিতা, দাদা, নানা বিয়ে করেছেন। তবে অতীতে এমন কিছু হয়ে থাকলে তা ধর্তব্য নয়। ভবিষ্যতে যেন এমনটি কিছুতেই না হতে পারে। নিশ্চয়ই এ কাজটি যুক্তির দিক থেকে অশ্লীল, সুস্থ বিবেকের লোকের পরিভাষায় অত্যন্ত ঘৃণ্য এবং শরীয়তের আইনেও নেহায়াত মন্দ পথ।

আয়াতে مَا قَدْ سَلَفَ "অবশ্য পূর্বে এরূপ কিছু হয়ে থাকলে তা ভিন্ন কথা"-তাফহীমুল কুরআনে বলা হয়েছে "এর দু'টো অর্থ হতে পারে- প্রথমতঃ অজ্ঞতা বা মূর্খতার সময়ে তোমরা যে ভুল-ভ্রান্তি করেছিলে তা ধর্তব্য হবে না যদি আল্লাহর বিধান নাযিলের পর তোমরা নিজেদের কর্মনীতি সংশোধন করে লও এবং ভুল কাজ পরিত্যাগ কর। দ্বিতীয়তঃ পূর্বের কোনো কাজকে বর্তমানে হারাম ঘোষণা করা হলে তার মানে এ নয় যে, পূর্বের প্রচলন বা অতীত আইনের অস্তিত্বকে অস্বীকার করা হয়েছে। দৃষ্টান্ত স্বরূপ বলা যায়, পূর্বে যারা সৎমাকে বিবাহ করার কারণে তাদের ঔরসে যে সন্তানের জন্ম হয়েছিল তাকে অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। কারণ সে কাজটি ছিল মূর্খতার কারণে অথবা শরীয়তের বিধান নাযিল হওয়ার পূর্বে।”

তাফহীমুল কুরআনে আরও বলা হয়েছে, 'ইসলামী আইনে এটা ফৌজদারী অপরাধ বিশেষ এবং পুলিশের সরাসরি হস্তক্ষেপের উপযোগী ব্যাপার। আবু দাউদ, নাসায়ী ও মুসনাদে আহমাদের সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে যে, নবী করীম (সা) এমন অপরাধীকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আর সাথে সাথে তাদের সমস্ত সম্পত্তি (সরকার কর্তৃক) বাজেয়াপ্ত করার শাস্তিও দিয়েছেন। ইবনে মাযাহ গ্রন্থে ইবনে আব্বাস (রা) থেকে যে হাদীস বর্ণিত হয়েছে তা থেকে জানা যায় নবী করীম (সা) মূলনীতি স্বরূপ বলেছেন :
মَنْ وَقَعَ عَلَى ذَاتِ مُحْرِمٍ فَاقْتُلُوهُ .
"যে ব্যক্তি মুহাররাম আত্মীয়ার সাথে ব্যভিচার করে তাকে হত্যা কর।"
ইমাম আহমদ (র)-এর মতে এ অপরাধীকে হত্যা করা ও তার ধন-সম্পত্তি ক্রোক করা আবশ্যক। ইমাম মালেক (র) ও ইমাম শাফেয়ী (র)-এর মতে তাকে ব্যভিচারির শাস্তি দিতে হবে।

আল্লামা ইবনে কাসীরের একটি বর্ণনায় তাফহীমুল কুরআনের উপরিউক্ত বর্ণনার সমর্থন পাওয়া যায়। তাফসীরে ইবনে কাসীরে বলা হয়েছে, কিনানা ইবনে খুযাইমা স্বীয় পিতার স্ত্রীকে বিবাহ করেছিল, সেই সূত্রে নযর ইবনে কিনানার জন্ম হয়েছিল। এ নযর ইবনে কিনানা সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (স)-এর মন্তব্য হলো, সে তো মাতা-পিতার বৈধ মিলনের মাধ্যমে জন্ম নিয়েছে— ব্যভিচারের মাধ্যমে নয়। এ থেকে বুঝা যায় এ প্রথা পূর্ব থেকে প্রচলিত ছিল আর তখন একে বৈধ বিবাহ বলে গণ্য করা হতো। প্রকৃতপক্ষে إِلَّا مَا قَدْ سَلَفَ "অবশ্য পূর্বে এরূপ কিছু হয়ে থাকলে তা ভিন্ন কথা”—এ বাক্যের ব্যাখ্যায় তাফহীমুল কুরআনে বর্ণিত দু'টো অর্থ তাফসীরে ইবনে কাসীরের উপরিউক্ত আলোচনার সাথে সম্পূর্ণ মিল রয়েছে।

আতা ইবনে আবু রিবাহ (র) বলেন : এ শব্দের তাৎপর্য হলো এটা আল্লাহর রুচী বিরুদ্ধ আর وَسَاءَ سَبِيلاً অর্থাৎ "রীতিনীতিের দিক থেকে এটা সর্বাপেক্ষা নিকৃষ্টতম রীতি।"

📘 আল কুরআনে নারী 📄 যে ১৪ প্রকার মহিলাকে বিয়ে করা হারাম

📄 যে ১৪ প্রকার মহিলাকে বিয়ে করা হারাম


حُرِّمَتْ عَلَيْكُمْ أُمَّهَتُكُمْ وَبَنْتُكُمْ وَأَخَوَتُكُمْ وَعَمْتُكُمْ وَخَلْتُكُمْ وَبَنْتُ الْآخِ وَبَنْتُ الأُخْتِ وَأُمَّهَتُكُمُ الَّتِي أَرْضَعْنَكُمْ وَأَخَوَاتُكُمْ مِّنَ الرَّضَاعَةِ وَأُمَّهْتُ نِسَائِكُمْ وَرَبَائِبُكُمُ الَّتِي فِي حُجُورِكُمْ مِّن نِّسَائِكُمُ الَّتِي دَخَلْتُمْ بِهِنَّ : فَإِنْ لَّمْ تَكُونُوا دَخَلْتُمْ بِهِنَّ فَلَا جُنَاحَ عَلَيْكُمْ ، وَحَلَائِلُ أَبْنَائِكُمُ الَّذِينَ مِنْ أَصْلَابِكُمْ ، وَأَنْ تَجْمَعُوا بَيْنَ الْأُخْتَيْنِ (النساء : ২৩)

"তোমাদের উপর হারাম করা হয়েছে তোমাদের মা, তোমাদের কন্যা, তোমাদের বোন, তোমাদের ফুফু, তোমাদের খালা, ভাইঝি, ভাগ্নী, আর তোমাদের সেসব মা- যারা তোমাদের দুধ খাওয়ায়েছেন, তোমাদের দুধ বোন, তোমাদের স্ত্রীদের মা, তোমাদের স্ত্রীদের কন্যা- যারা তোমাদের কোলে লালিত পালিত হয়েছে, সেসব স্ত্রীর কন্যারা যাদের সাথে তোমাদের স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছে। অবশ্য যদি স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক স্থাপিত না হয়ে থাকে তবে তোমাদের কোনো গুনাহ হবে না, আপন ঔরসজাত পুত্রের স্ত্রীগণ, তাছাড়া দুই সহোদরা বোনকে একত্রে বিবাহ করাও (তোমাদের উপর হারাম করা হয়েছে।)"-(সূরা আন নিসা: ২৩)

হযরত ইবনে আব্বাস (রা) বলেছেন, সাত প্রকারের মহিলা বংশগত কারণে আর সাত প্রকারের মহিলা বৈবাহিক সূত্রের কারণে বিবাহ করা হারাম হয়েছে। একথা বলে তিনি উক্ত আয়াত তিলাওয়াত করেছেন।

উপরোক্ত আয়াতে তোমাদের 'মা' বলতে কেবল গর্ভধারিণী মাকেই বুঝায় না, বরং সাথে সাথে দাদী, নানীও أُمَّهَتْ শব্দের অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তেমনিভাবে بَنَاتُكُمْ তোমাদের কন্যা বলতে স্বীয় ঔরষজাত কন্যা, কন্যার কন্যা ও পুত্রের কন্যা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। اَخَوَاتُكُمُ মানে তোমাদের সহোদরা বোন। তেমনি বৈমাত্রেয়া ও বৈপিত্রেয় বোনকেও বিয়ে করা হারাম। عَمَّتُكُمْ মানে তোমাদের ফুফু। অর্থাৎ পিতার সহোদরা বৈমাত্রেয়া বৈপিত্রেয়া-তিন প্রকারের ফুফুকেই বিয়ে করা হারাম। خَلْتُكُمْ খালাগণ। এখানেও মায়ের তিন প্রকার বোন অন্তর্ভুক্ত। بَنْتُ الْأَخِ ভাইয়ের কন্যা বলতেও তিন প্রকার ভাইয়ের কন্যাকে বুঝাবে بَنْتُ الْأُخْتِ বোনের কন্যাও ঐ তিন প্রকার বোনের কন্যা বুঝাবে।

যেসব মহিলার দুধ পান করা হয়েছে। তারা গর্ভধারিণী মা না হলেও মায়ের পর্যায়ভুক্ত বিধায় তাদের বিয়ে করা হারাম। এ দুধপান একবার হোক বা একাধিকবার হোক আর দুধ কম পান করুক অথবা বেশী পান করুক সর্বাবস্থায় দুধ মাকে বিয়ে করা হারাম। ফিক্হ শাস্ত্রের পরিভাষায় এ হারাম হওয়াকে হুরমতে রাদায়াত (حرمة رضاعة) বলে।

দুধ পান বলতে কেবল শিশুকালীন দুধ পান করাকেই বুঝাবে। ইমাম আবু হানিফা (র)-এর মতে সেই সময় হলো শিশুর বয়স যখন আড়াই বছর পর্যন্ত থাকে। সুতরাং শিশুর বয়স আড়াই বছরের মধ্যে সে যেই মহিলার দুধ পান করবে তার সাথে সেই শিশুর বয়ঃপ্রাপ্ত অবস্থায় বিয়ে জায়েয নেই। কোনো বালক-বালিকা যদি উক্ত বয়সের পরে কোনো স্ত্রীলোকের দুধ পান করে, তবে এতে হুরমতে রাদায়াত বা দুধ পানজনিত অবৈধতা প্রমাণিত হবে না।

সকল প্রকার দুধ বোনকে বিয়ে করা হারাম। বংশগত সম্পর্কের কারণে যাদের বিয়ে করা হারাম হয়ে যায়, দুধ পানের সম্পর্কের কারণেও সেসব লোকদের সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করা হারাম হয়ে যায়। হাদীস শরীফে আছে :
يحرم من الرضاعة ما يحرم من الولادة
ان الله حرم من الرضاعة ماحرم من النسب
"দুধ পানে বিয়ে হারাম হয়, যারা জন্মের কারণে হারাম হয়।" "আল্লাহ তা'আলা দুধ পানে হারাম করেছেন যাদের বংশের কারণে হারাম করেছেন।"

স্ত্রীদের মাতা অর্থাৎ শ্বাশুড়ীকে বিয়ে করা হারাম। তেমনি স্ত্রীদের দাদী, নানী, বংশগত ও দুধ গত সবাই এর অন্তর্ভুক্ত।

যে মহিলাকে বিয়ে করে সহবাস করেছে সেই মহিলার অন্য স্বামীর ঔরষজাত কন্যা, পৌত্রী ও দৌহিত্রীও হারাম হয়ে যায়। তাদের কাউকে বিয়ে করা জায়েয নয়।

ঔরষজাত সন্তানের স্ত্রীকে বিয়ে করা হারাম। এখানে ঔরষজাত পুত্রের মধ্যে পৌত্র ও দৌহিত্র সবাই অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং তাদের স্ত্রীকেও বিয়ে করা জায়েয নেই। কিন্তু সন্তান বা পুত্র যদি ঔরসজাত না হয় অর্থাৎ পোষ্য বা পালক পুত্র হয়, তবে তার স্ত্রীকে বিবাহ করা হারাম নয়। এখানে স্মরণ রাখা আবশ্যক যে, দুধপুত্র বংশগত পুত্রের পর্যায়ভুক্ত, কাজেই তার স্ত্রীকেও বিয়ে করা হারাম।

দুই বোনকে একই সময় স্ত্রী হিসেবে রাখা হারাম। চাই তারা বংশগত হোক, দুধ পানজনিত হোক অথবা বৈমাত্রেয় বা বৈপিত্রেয় হোক। একজনের মৃত্যু বা তালাকের পর অন্য বোনকে বিয়ে করা জায়েয।

উপরের আয়াতের ১৩জন মহিলা এবং পরবর্তী আয়াতের একজন সহ (অন্যের স্ত্রী) মোট ১৪জন স্ত্রীলোককে বিবাহ করা হারাম।

📘 আল কুরআনে নারী 📄 স্ত্রী গ্রহণ করার ব্যাপারে আল্লাহর মীমাংসা

📄 স্ত্রী গ্রহণ করার ব্যাপারে আল্লাহর মীমাংসা


وَالْمُحْصَنَتُ مِنَ النِّسَاءِ إِلَّا مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ كِتُبَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ

"আর সেসব নারীও তোমাদের জন্যে হারাম, যারা অন্য কারো বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ। অবশ্য তোমাদের অধিকারভুক্ত দাসীগণ এর ব্যতিক্রম। এটা তোমাদের জন্য আল্লাহর বিধান।" -(সূরা আন নিসা: ২৪)

যে চৌদ্দ প্রকার স্ত্রীলোককে বিবাহ করা হারাম করা হয়েছে উপরে তার তের প্রকারের বিবরণ দেয়া হয়েছে। এখানে চৌদ্দতম প্রকারের মহিলার উল্লেখ করা হয়েছে; আর তারা হচ্ছে অন্যের বিবাহে আবদ্ধ স্ত্রীলোক। প্রকাশ থাকে যে, পূর্ববর্তী আয়াতে ও এ আয়াতের প্রথমাংশে যে চৌদ্দ প্রকারের স্ত্রী লোককে বিবাহ করা হারাম ঘোষণা করা হয়েছে, তাদের মধ্যে রয়েছে (১) বংশের কারণে হারাম, (২) দুধ পানের কারণে হারাম, (৩) বৈবাহিক সম্পর্কের কারণে হারাম। -এ তিন কারণে হারাম ঘোষিত মহিলারা চিরদিনের জন্যে হারাম। এদের বলা হয় মুহাররামাতে আবাদিয়া (مُحَرَّمَاتُ أَبَدِيةُ) বা চিরতরে হারাম। উক্ত চৌদ্দ প্রকারের নারীর মধ্যে শেষ দুই প্রকারের হারাম ঘোষিত মহিলা কোনো কোনো সময় হালাল হয়ে থাকে। যেমন, এক বোন বিবাহ বন্ধনে থাকা পর্যন্ত অপর বোন সেই ব্যক্তির জন্যে হারাম হলেও প্রথম বোন মারা গেলে অথবা তার সাথে বিবাহ সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে গেলে অপর বোনকে বিবাহ করা বৈধ। তেমনি পর স্ত্রী যতক্ষণ পর্যন্ত পর স্ত্রী থাকে ততক্ষণ পর্যন্ত তাকে অন্য পুরুষ বিয়ে করতে না পারলেও সেই লোকের মৃত্যু অথবা সে তালাক দিলে ঐ মহিলাকে অন্য পুরুষ বিয়ে করতে পারে। সুতরাং চৌদ্দ প্রকারের শেষ দুই প্রকারের মহিলা মুহাররামাতে আবাদিয়া (চির হারাম) মহিলার অন্তর্ভুক্ত নয়।

আয়াতে "অধিকারভুক্ত দাসী"গণকে হালাল ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু এ বিষয়টি সম্পর্কে অধুনা এক শ্রেণীর মুসলিম চিন্তাবিদদের মধ্যেও বিভ্রান্তি বিরাজ করছে। যেসব স্ত্রীলোক যুদ্ধ ক্ষেত্র থেকে বন্দী হয়ে আসে আর তাদের কাফের স্বামী যদি দারুল হরবে (বা কাফের শত্রু দেশে) থেকে যায়, তবে সেসব স্ত্রীলোককে গ্রহণ করা হারাম নয়। কেননা দারুল হরব থেকে দারুল ইসলামে চলে আসার কারণে তাদের বিবাহ বন্ধন ছিন্ন হয়ে গেছে। এ ধরনের স্ত্রীলোকদের বিবাহ করা যেতে পারে, কারো মালিকানাধীন দাসী হিসাবে থাকলে তার সাথে সঙ্গমও করা যেতে পারে। অবশ্য স্বামী-স্ত্রী উভয়ই একত্রে বন্দী হয়ে আসলে তাদের ব্যাপারে ফিকহবিদদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। ইমাম আবু হানিফা (র) ও তাঁর শিষ্যদের মতে তাদের বিবাহ বহাল থাকবে। কিন্তু ইমাম শাফিঈ (র)-এর মতে তাদের বিবাহ বহাল থাকবে না।

দাসীর সাথে সংগম
অধিকারভুক্ত দাসীদের সাথে সঙ্গম করার বিষয়ে সৃষ্ট ভুল ধারণা নিরসনের জন্যে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো ভাল করে বুঝে নেয়া দরকার।
(১) যুদ্ধ ক্ষেত্র থেকে বন্দী হয়ে আসলেই তাদের সাথে কোনো লোক সঙ্গম করতে পারবে না। বরং তা হবে যিনার শামিল। ইসলামী শরীয়ত মতে এ জাতীয় মহিলারা (ইসলামী) সরকারের অধীন থাকবে। আর সরকার ইচ্ছা করলে তাদের স্বাধীন করে দিতে পারে। বিনিময় মূল্য নিয়ে রেহাই দিতে পারে, শত্রু পক্ষের হাতে বন্দী মুসলমানের সাথে বিনিময় করতে পারে। তাছাড়া মুসলিম সৈনিকদের মধ্যে বণ্টন করার ইখতিয়ার (ইসলামী) সরকারের আছে। মূলত একজন সৈনিক কেবলমাত্র সেই বন্দী স্ত্রীলোকের সাথেই সঙ্গম করতে পারে, যাকে সরকার যথারীতি তার মালিকানায় ছেড়ে দিয়েছে।
(২) এরূপ শরীয়ত সম্মত উপায়ে মালিকানাধীন স্ত্রীর সাথে সঙ্গম করতে হলেও ইদ্দত পালনের পরই তা বৈধ হতে পারে। অর্থাৎ একবার মাসিক ঋতু হওয়া বা তার গর্ভ ধারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার পরই কেবল তা বৈধ।
(৩) এরূপ বন্দী নারীর আহলে কিতাব হওয়া শর্ত নয়, বরং যে কোনো ধর্মের নারীর সাথে সঙ্গম জায়েয।
(৪) যার মালিকানাধীন বণ্টন করে দেয়া হয়েছে সে ছাড়া অন্য কেউ তার সাথে সঙ্গম করতে পারবে না।
(৫) এ মালিকানা হস্তান্তরযোগ্য।
(৬) সরকার কারো মালিকানায় সপর্দ করার পর পুনরায় তাকে ফেরত নেয়ার অধিকার সরকারের থাকবে না।
(৭) কোনো সেনাধ্যক্ষ এরূপ মহিলাকে তার কোনো সৈনিকের কাছে যৌন লালসা চরিতার্থ করতে দিলে তা ইসলামী শরীয়তে সম্পূর্ণ না-জায়েয কাজ হবে। এটা প্রকাশ্য যিনা বা ব্যভিচারের শামিল।
কোনো মহিলা যদি দারুল হরবে মুসলমান হয়ে যায় আর তার স্বামী কাফের থাকে তবে শরীয়তের বিচারক তাকে ইসলাম গ্রহণ করতে বলবে। সে তা অস্বীকার করলে বিচারক তাদের বিবাহ বিচ্ছেদ করে দিবে। এ বিচ্ছেদ তালাক বলে গণ্য হবে।

একজন মহিলা একই সময় একাধিক স্বামী গ্রহণ করতে পারবে না
অধুনা মূর্খ ধর্মদ্রোহী ও ইসলাম বিদ্বেষীদের মতে একজন পুরুষ যেমন একাধিক নারী গ্রহণ করতে পারে, একজন নারীরও তেমনি একাধিক স্বামী গ্রহণের অধিকার থাকা চাই। তাদের এ দাবী আলোচ্য আয়াতের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। তারা একথাটি বুঝে না যে, পুরুষের জন্যে একাধিক বিবাহ একটা নিয়ামত ও সামাজিক শৃংখলার চাবিকাঠি। এটা প্রত্যেক ধর্মেই স্বীকৃত এবং ঐতিহাসিক সত্য। পক্ষান্তরে একজন নারীর জন্যে একাধিক স্বামী স্বয়ং নারীর জন্যেই বিপদের কারণ, আর তা স্বামীদের জন্যেও নির্লজ্জতা এবং সামাজিক বিপর্যয়ের উৎস। কোনো সমাজে এ নীতি চালু থাকলে তা আর মানুষের সমাজ থাকে না। এতে মানব বংশ এক চরম বিপর্যয়ের সম্মুখীন হতে বাধ্য। আজকের পাশ্চাত্যই তার উজ্জ্বলতম সাক্ষী।

স্বভাব-প্রকৃতি আর সাধারণ যুক্তিতেও এমন নারীর জন্যে একাধিক স্বামী থাকার কোনো বৈধতা দেখা যায় না। কারণ, বিয়ের বুনিয়াদী লক্ষ্য হলো বংশ বিস্তার ও সামাজিক শৃংখলা সংরক্ষণ। একজন পুরুষ দ্বারা তো একাধিক মহিলা গর্ভধারণ করতে পারে; কিন্তু একজন নারী একাধিক পুরুষ দ্বারা গর্ভবতী হতে পারে না। সে তো গর্ভধারণ করে একজন থেকেই। তাই একাধিক স্বামীর অবশিষ্ট সব স্বামীর শক্তি বিনষ্ট হবে, কাম-প্রবৃত্তি চরিতার্থ ছাড়া তাদের কোনো কাজ থাকবে না। দ্বিতীয়ত সৃষ্টিগতভাবেই নারী অবলা এবং অনেক সময় সে থাকে স্বামীর সহবাসের অযোগ্য। কোনো কোনো সময় একজন স্বামীর হক আদায় করাও তার দ্বারা সম্ভব হয় না। একাধিক স্বামীর তো প্রশ্নই উঠে না। তৃতীয়ত সাধারণ পুরুষ নারীর তুলনায় অধিক শক্তিশালী। এমতাবস্থায় কোনো স্বামীর যৌনশক্তি স্বাভাবিকের চেয়ে বেশী হলে সে একজন নারী দ্বারা সন্তুষ্ট হতে পারে না। তখন তার আরেকজন স্ত্রী না থাকলে সে অবৈধ পথে গিয়ে গোটা সমাজকে দুষিত করে ছাড়বে। কিন্তু নারী দ্বারা এমনটি হওয়ার আশংকা কম।

টিকাঃ
-(মা'আরেফুল কুরআন), (তাফহীমুল কুরআন), (মা'আরেফুল কুরআন: মুফতী মুহাম্মদ শফী (র))

ফন্ট সাইজ
15px
17px