📄 স্ত্রীকে কষ্ট ও যন্ত্রণা দেয়ার উদ্দেশ্যে বিবাহ বন্ধনে আটকে রাখা নিষেধ
وَإِذَا طَلَّقْتُمُ النِّسَاءَ فَبَلَغْنَ أَجَلَهُنَّ فَا مَسْكُوهُنَّ بِمَعْرُوفِ أَوْ سَرِّحُوهُنَّ بِمَعْرُوفِ من وَلَا تُمْسِكُوهُنَّ ضَرَارًا لِتَعْتَدُوا ، وَمَنْ يَفْعَلْ ذَلِكَ فَقَدْ ظَلَمَ نَفْسَهُ ، وَلَا تَتَّخِذُوا آيَاتِ اللَّهِ هُزُوًا : (البقرة : ২৩১)
"যখন তোমরা স্ত্রীদের তালাক দিয়ে দাও, তারপর তারা নির্ধারিত ইদ্দত শেষ করে নেয়। তখন তোমরা হয়ত নিয়মানুযায়ী তাদেরকে রেখে দাও, না হয় সহানুভূতির সাথে মুক্ত করে দাও। তোমরা তাদের জ্বালাতন করার উদ্দেশ্যে রেখে দিয়ে বাড়াবাড়ী করো না। আর যে ব্যাক্ত এমনটি করবে সে অবশ্য তার নিজের উপরই যুলুম করবে। আল্লাহর বাণীকে তামাশার বিষয়ে পরিণত করো না।" (সূরা আল বাকারা : ২৩১)
তালাক প্রাপ্তা স্ত্রী যখন ইদ্দত অতিক্রম করার কাছাকাছি পৌঁছে যায়, তখন স্বামীর দু'টো অধিকার থাকে। একটি হচ্ছে তালাক প্রত্যাহার করে বিবাহ বন্ধনে রেখে দেয়া। দ্বিতীয়টি হচ্ছে তালাক প্রত্যাহার না করে বৈবাহিক সম্পর্ক ছিন্ন করা। এ দু'টি অধিকার বা ভূমিকা পালনে সে মুক্ত নয়, বরং কুরআন এ ক্ষেত্রে উভয় অবস্থায়ই শর্ত আরোপ করেছে। এখানে আল্লাহ তা'আলা "বিল-মারূফ" শব্দ প্রয়োগ করে উভয় অবস্থাতেই শর্ত ও নিয়ম- নীতি অনুসরণের নির্দেশ দিয়েছেন। উভয় অবস্থায় যেটাই করা হোক তা করতে হবে শরীয়তের নিয়মানুযায়ী। কেবল সাময়িক খেয়াল খুশী বা আবেগের তাগিদে কোনো কিছু করা চলবে না।
যেমন তালাক দেয়ার পর বিচ্ছিন্নতার ভয়াবহতা ও পরিণাম সম্পর্কে চিন্তা করে যদি তালাক প্রত্যাহার করে স্ত্রীকে বিয়েতে বহাল রাখার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, তবে সে জন্যে শরীয়তের নিয়ম হচ্ছে মনোমালিন্যতাকে অন্তর থেকে ধুয়ে মুছে সুন্দর সুখী জীবন-যাপন এবং পরস্পরের অধিকার ও কর্তব্য যথাযথভাবে আদায় করার মনোভাব থাকতে হবে। স্ত্রীকে যন্ত্রণা ও কষ্ট দেয়ার উদ্দেশ্যে তা করা যাবে না।
হযরত ইবনে আব্বাস (রা) বলেন, লোকেরা তাদের স্ত্রীদের হাস্যচ্ছলে তালাক দিতো, আসলে তাদের অন্তরে তালাক দেয়ার নিয়ত রাখতো না। অতঃপর আল্লাহ এ আয়াত নাযিল করেন, "وَلَا تَتَّخِذُوا آيَاتِ اللهِ هُزُوًا "তোমরা আল্লাহর আয়াত নির্দেশকে হাস্যকর বিষয়ে পরিণত করো না।" আল্লামা ইবনে কাসীর তাঁর বিখ্যাত তাফসীর গ্রন্থে হযরত ইবাদাহ ইবনে সামিত (রা) উপরোক্ত আয়াতের প্রসংগ লিপিবদ্ধ করেছেন। তা হচ্ছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সময় লোকেরা একে অপরকে বলতো, আমি তোমার বোনকে বিবাহ করলাম। কিন্তু পরে বলতো, তা তো তামাশা করে বলেছিলাম। আবার কেউ কেউ বলতো তোমাকে আযাদ করে দিলাম। পরে বলতো তাতো হাসি-ঠাট্টা করে বলেছিলাম। তারপর আল্লাহ তা'আলা উপরোক্ত আয়াত অবতীর্ণ করেন। হযরত আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত আছে: ثلث جدهُنَّ جدّ وهَزْلُهُنَّ جدّ النِّكَاحُ وَالطَّلَاقُ وَالرُّجْعَةُ : বিষয় এমন আছে যেগুলো ইচ্ছা করে বলা আর হাসি তামাশা করে বলা সমান। (১) বিবাহ, (২) তালাক ও (৩) রাজয়াত বা তালাক প্রত্যাহার। সুতরাং দু'জন স্ত্রী ও পুরুষ বিয়ের ইচ্ছা ছাড়াও যদি হাসতে হাসতে ইজাব কবুল করে নেয়, তবে বিবাহ হয়ে যাবে। তেমনিভাবে তালাক তালাক প্রত্যাহার ও দাস মুক্তির ব্যাপারেও একই বিধান।
টিকাঃ
(মাআরেফুল কুরআন)
📄 অভিভাবক বা পূর্ব স্বামী মহিলার নির্বাচিত স্বামী গ্রহণে বাধা দিতে পারবে না
وَإِذَا طَلَّقْتُمُ النِّسَاءَ فَبَلَغْنَ أَجَلَهُنَّ فَلَا تَعْضُلُوهُنَّ أَنْ يُنْكِحْنَ أَزْوَاجَهُنَّ إِذَا تَرَاضُوا بَيْنَهُمْ بِالْمَعْرُوفِ ، ذَلِكَ يُوعَظُ بِهِ مَنْ كَانَ مِنْكُمْ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ ذَلِكُمْ أَرْكَى لَكُمْ وَأَطْهَرُ ، وَاللَّهُ يَعْلَمُ وَأَنْتُمْ لَا تَعْلَمُونَ .
"যখন তোমরা তোমাদের স্ত্রীদের তালাক দিয়ে দাও, তারপর তারা নির্ধারিত ইদ্দত পালন করে, তখন তাদের পূর্ব স্বামীর সাথে পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে নিয়মানুযায়ী বিয়ে করতে বাধা দান করো না। এ উপদেশ তাদেরকে দেয়া যাচ্ছে যারা আল্লাহ ও আখিরাতকে বিশ্বাস করে। তোমাদের জন্যে এতে রয়েছে পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতা। আল্লাহ (তোমাদের পবিত্রতা ও মঙ্গল) ভালভাবেই জানেন, তোমরা তা জান না।" -(সূরা আল বাকারা : ২৩২)
কোনো স্ত্রীলোককে তার স্বামী যদি তালাক দেয় এবং ইদ্দত পালনের মধ্যে তাকে ফিরিয়ে না লয় এবং ইদ্দত শেষ হওয়ার পর উভয়ই যদি পুনর্বিবাহিত হতে রাজি হয়, তবে স্ত্রীলোকটির অভিভাবক বা আত্মীয়-স্বজনগণ এ কাজে তাকে বাধা দেয়া উচিত নয়। আয়াতের দ্বিতীয় অর্থ হচ্ছে, স্ত্রী ইদ্দত পালন শেষ করে পূর্ব স্বামীর বন্ধন থেকে মুক্ত হওয়ার পর যদি অন্য কোনো স্থানে নিজের বিবাহ ঠিক করতে চায়, তখন পূর্ব স্বামীর পক্ষে এটা কিছুতেই উচিত হবে না যে, সে ঐ মহিলার দ্বিতীয় বিবাহ বন্ধ করে রাখার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়।
উপরোক্ত আয়াতের শানেনুযুল বর্ণনা করতে গিয়ে মাওলানা মুফতী শফী (র) বুখারী শরীফের একটি হাদীসের উদ্ধৃতি দিয়েছেন। হযরত মা'কাল ইবনে ইয়াসার তাঁর বোনকে এক ব্যক্তির সাথে বিয়ে দিয়েছিলেন। সে ব্যক্তি তাকে তালাক দেয় এবং পরে কৃতকর্মের জন্যে অনুতপ্ত হয়ে তাকে পুনরায় বিবাহ করতে মনস্থ করে। তার তালাক প্রাপ্তা স্ত্রীও তাতে সম্মত হয়। কিন্তু যখন লোকটি এ প্রস্তাব মা'কালের নিকট পেশ করে, তখন তিনি যেহেতু তালাক দেয়াতে তার প্রতি অসন্তুষ্ট ছিলেন, তাই তিনি উত্তর দিলেন, আমি তোমাকে সম্মান করেই তোমার নিকট আমার বোনকে বিয়ে দিয়েছিলাম, কিন্তু তুমি সে সম্মানের মূল্য না দিয়ে তাকে তালাক দিয়ে দিলে। এখন তাকে পুনরায় বিয়ে করতে চাইছো! জেনে রেখ, আল্লাহর কসম সে আর তোমার বিবাহাধীন যাবে না।
সাহাবীগণ আল্লাহ ও রাসূলের অত্যন্ত অনুরক্ত ছিলেন। আয়াত শোনা মাত্রই হযরত মা'কালের সমস্ত ক্রোধ পড়ে যায় এবং তিনি স্বয়ং ঐ ব্যক্তির নিকট উপস্থিত হয়ে বোনের পুনর্বিবাহ তারই সাথে দিয়ে দেন। আর কসমের কাফ্ফারাও আদায় করেন।
এখানে উল্লেখ্য যে, কোনো মহিলার পসন্দমত ব্যক্তির সাথে বিয়ের বাধা সৃষ্টি করা যাবে না তখন; যদি তাদের সম্মতিটা হয় শরীয়ত সম্মত পদ্ধতিতে। অন্যথায় বাধাদান বরং শক্তি প্রয়োগও উচিত হবে। যেমন, বিয়ে ছাড়াই পরস্পর স্বামী-স্ত্রীর মত বসবাস করতে শুরু করলে, তিন তালাকের পর অন্যত্র বিয়ে ছাড়াই যদি পুনর্বিবাহ করতে চায়, অথবা ইদ্দতের মধ্যেই অন্যের সাথে বিয়ের ইচ্ছা করে, তখন সকল মুসলমানের বিশেষত তাদের সাথে সম্পর্কিত লোকদের সম্মিলিতভাবে বাধা দিবে ও প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগ করে তা প্রতিহত করবে। তেমনিভাবে কোনো মেয়ে যদি স্বীয় অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া কুফু হীনতার স্থানে বা বংশের প্রচলিত মোহরের কমে বিয়ে করতে চায় যাতে এর কুপ্রভাব বংশের উপর পড়তে পারে, তবে এমন ক্ষেত্রেও তারা বাধা প্রদান করতে পারে।
এটা আল্লাহ ও আখিরাতে বিশ্বাসীদের জন্য গ্রহণীয় উপদেশ বলার অর্থ, ঈমানদারদের এর ব্যতিক্রম করা বা এতে শিথিলতা প্রদর্শন করা উচিত নয়। এ উপদেশ সম্বলিত নির্দেশের ব্যতিক্রম করা পাপ মগ্নতা ও ফিতনা ফাসাদের কারণ হতে পারে। কারণ প্রাপ্তবয়স্কা বুদ্ধিমতি যুবতী মেয়েকে সাধারণভাবে বিয়ে থেকে বিরত রাখা একদিকে তার প্রতি অত্যাচার করা, তাকে অধিকার থেকে বঞ্চিত করা; অপরদিকে তার সতিত্ব পবিত্রতা ও মান-ইজ্জতকে আশংকায় ফেলে রাখার নামান্তর।
আয়াতের শেষাংশে বলা হয়েছে, পবিত্রতা ও কল্যাণ সম্পর্কে আল্লাহই সম্যক অবগত আছেন। মানুষ তার ভবিষ্যত কল্যাণ সম্পর্কে একেবারেই অজ্ঞ। সুতরাং মানুষ আল্লাহর নির্দেশের কাছে আত্মসমর্পণ করার মধ্যে তার ব্যষ্টিক ও সামষ্টিক কল্যাণ নিহিত রয়েছে।
টিকাঃ
-(মাআরেফুল কুরআন, তাফহীমুল কুরআন ও তাফসীরে ইবনে কাসীর)
📄 সহবাসের পূর্বেও যদি স্বামী মারা যায় তবুও স্ত্রীকে ইদ্দত পালন করতে হবে
وَالَّذِيْنَ يُتَوَفَّوْنَ مِنْكُمْ وَيَذَرُونَ أَزْوَاجًا بِتَرَبَّصْنَ بِأَنْفُسِهِنَّ أَرْبَعَةَ أَشْهُরٍ وعَشْرًا ، فَإِذَا بَلَغْنَ أَجَلَهُنَّ فَلَا جُنَاحَ عَلَيْكُمْ فِيمَا فَعَلْنَ فِي أَنْفُسِهِنَّ بِالْمَعْرُوفِ ، وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرٌ (البقرة : ২৩৪)
"আর তোমাদের মধ্যে যারা মারা যায় এবং তাদের স্ত্রীদের রেখে যায়। তবে তারা নিজেদেরকে চার মাস দশ দিন (বিবাহ থেকে) বিরত রাখবে। যখন তাদের ইদ্দত পূর্ণ হয়ে যাবে তখন নিজের ব্যাপারে নীতি সংগত ব্যবস্থা নিতে কোনো দোষ বা গুনাহ নেই। আল্লাহ তোমাদের যাবতীয় কাজ-কারবারের ব্যাপারে সম্যক অবগত আছেন।" -(সূরা আল বাকারা: ২৩৪)
যেসব স্ত্রীলোকের বিবাহের পর স্বামীর সাথে নির্জনবাস সংঘটিত হওয়ার পূর্বেই স্বামী মারা গেছে, স্বামীর মৃত্যুজনিত ইদ্দত তাদেরও পালন করতে হবে। আয়াতে يَتَرَبَّصْنَ بِأَنফُسِهِن "নিজেদেরকে বিরত রাখতে হবে"-এর অর্থ কেবল এটাই নয় যে, এ সময়ে বিবাহ করবে না। বরং সেই সাথে নিজেকে সকল প্রকার অলংকার ও সাজগোজ থেকেও বিরত রাখতে হবে। হাদীস শরীফে স্পষ্ট ভাষায় সে সম্পর্কে নির্দেশ দেয়া হয়েছে এবং ইদ্দত পালনকালে স্ত্রীদের রঙ্গীন পোশাক, অলংকার সুরমা, সুগন্ধি, মেহেদী ও খেজাব ব্যবহার না করতে এবং কেশ বিন্যাস থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে।
অবশ্য এ সময় স্ত্রীদের ঘর থেকে বাইরে যাওয়া সম্পর্কে কিছুটা মতভেদ আছে। হযরত ওমর (রা), উসমান (রা), ইবনে ওমর (রা), যায়েদ ইবনে সাবেত (রা) ও ইবনে মাসউদ (রা) প্রমুখ সহ বারো ইমাম এ মত প্রকাশ করেছেন যে, যেই ঘরে স্বামী মারা গেল, তার বিধবা স্ত্রী সে ঘরেই ইদ্দত পালন করবে। অবশ্য তখনও দিনের বেলায় প্রয়োজনে বাইরে যেতে পারবে। কিন্তু সে ঘরেই তাকে বসবাস করতে হবে। পক্ষান্তরে হযরত আলী (রা), হযরত আয়েশা (রা), হযরত ইবনে আব্বাস (রা) প্রমুখের মতে স্ত্রীলোকটি যেখানে ইচ্ছা ইদ্দত পালন করতে পারবে এবং প্রয়োজনে দেশান্তরেও গমন করতে পারবে।
ইদ্দত সংক্রান্ত কতিপয় হুকুম: ১. স্বামী মারা গেলে ইদ্দতের মধ্যে সুগন্ধি ব্যবহার, সাজ-সজ্জা, সুরমা-তৈল ব্যবহার নিষ্প্রয়োজনে ঔষধ সেবন করা, অলংকার ব্যবহার করা, রঙিন কাপড় পরিধান করা জায়েয নয়। বিয়ের জন্য আলোচনা করাও দুরস্ত নেই। রাতে অন্য ঘরে থাকাও জায়েয নেই। যে স্ত্রীলোক বায়েন তালাক প্রাপ্তা অর্থাৎ যার তালাক প্রত্যাহারযোগ্য নয়, তাদের ক্ষেত্রে স্বামী গৃহে ইদ্দত পালনকালে দিনের বেলায় অতি প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হওয়াও সম্পূর্ণ রূপে নিষিদ্ধ। ২. চাঁদ রাতে যদি স্বামীর মৃত্যু হয়, তবে এ মাসটি ৩০ দিনের হোক অথবা ২৯ দিনের হোক অবশিষ্ট চাঁদের হিসেবেই ইদ্দত পূরণ করতে হবে। আর যদি চাঁদ রাতের পরে মৃত্যু হয় তবে প্রত্যেক ৩০ দিনে এক মাস ধরে ৪ মাস ১০ দিন ইদ্দত পালন করতে হবে। তাতে মোট ১৩০ দিন পূর্ণ হবে। এ সময় অতিবাহিত হয়ে যখন মৃত্যুর তারিখটি ঘুরে আসবে তখনই ইদ্দত শেষ হবে। আর কেউ যদি শরীয়ত বিরোধী কোনো কাজ করে, তবে অন্যকেও সাধ্যানুযায়ী বাধা দেয়া ওয়াজিব। কেউ যদি বাধা না দেয় তবে তারাও গুনাহগার হবে।
হযরত ইবনে মাসউদ (রা) জিজ্ঞাসিত হন যে, একটি লোক বিবাহ করার পর স্ত্রীর সাথে সহবাস হওয়ার আগেই সে মারা যায়। তার জন্য কোনো মোহরও ধার্য হয়নি। এ স্ত্রীলোকটির ব্যাপারে কি সিদ্ধান্ত হবে? তারা কয়েকবার তাঁর কাছে যাওয়ার পর তিনি বলেন, এর সিদ্ধান্ত আমি আমার নিজের মতানুসারে দিচ্ছি। ঠিক হলে বুঝবে আল্লাহর পক্ষ থেকে হয়েছে আর ভুল হলে বুঝবে আমার ও শয়তানের পক্ষ থেকে হয়েছে-এ ক্ষেত্রে আল্লাহ ও রাসূল তা থেকে পবিত্র। শোন! সে স্ত্রীকে পূর্ণ মোহর দিতে হবে। তবে এটা স্বামীর আর্থিক অবস্থার উপর বিবেচ্য। এতে কোনো রকম বেশকম করা যাবে না। স্ত্রীকে ইদ্দত পালন করতে হবে। আর সে স্বামীর উত্তরাধিকারীও হবে। এটা শুনে মা'কাল ইবনে ইয়াসার আল-আশজায়ী (রা) উঠে বললেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বারু বিনতে ওয়াশিক সম্পর্কেও এরূপ ফায়সালা দিতে শুনেছি। এটা শুনে আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা) খুব খুশী হলেন।
তবে স্বামীর মৃত্যুর সময় স্ত্রী গর্ভবতী থাকলে এ হুকুম নয়। কারণ, তার ইদ্দত হলো সন্তান প্রসব করা পর্যন্ত সময়। হযরত ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত আছে, গর্ভবতীর ইদ্দত হলো সন্তান প্রসবের পর আরও ৪ মাস ১০ দিন। তাই সবচেয়ে দীর্ঘ ও প্রলম্বিত ইদ্দত হচ্ছে গর্ভবতীদের ইদ্দত। এ বর্ণনাটি বেশ উত্তম এবং শক্তিশালীও বটে। মুহাম্মদ ইবনে সহ বহু আলিম এবং আহলে যাহেরদের অনেকের মতে এ আয়াত দ্বারা আযাদ ও দাসীদের ইদ্দতকাল সমান বলে প্রমাণিত। কেননা ইদ্দত একটি হুকুম আর তা সকল মানুষের বেলায় সমানভাবে প্রযোজ্য। কিন্তু জমহুর উলামার মতে আযাদ মহিলা থেকে দাসীদের হুকুম ভিন্ন। তাদের ইদ্দত হচ্ছে আযাদ মহিলাদের অর্ধেক অর্থাৎ দু' মাস পাঁচ দিন। দাসীদের শাস্তি যেমন আযাদের অর্ধেক তাদের ইদ্দতও অর্ধেক।
টিকাঃ
-(তাফহীমুল কুরআন), (মাআরেফুল কুরআন), (তাফসীরে ইবনে কাসীর)
📄 ইশারা-ইংগিতে বিধবাদের বিবাহ পয়গাম জায়েয কিন্তু গোপনে বিবাহ-চুক্তি বৈধ নয়
وَلَا جُنَاحَ عَلَيْكُمْ فِيمَا عَرَّضْتُم بِهِ مِنْ خِطْبَةِ النِّسَاءِ أَوْ أَكْنَنْتُمْ فِي أَنْفُسِكُمْ . عَلِمَ اللَّهُ أَنَّهُ سَتَذْكُرُونَهُنَّ وَلَكِنْ لا تُوَاعِدُوهُنَّ سِرًّا إِلَّا أَنْ تَقُولُوا قَوْلًا مَعْرُوفًا ، وَلَا تَعْزِمُوا عُقْدَةَ النِّكَاحِ حَتَّى يَبْلُغَ الْكِتَابُ أَجَلَهُ .
"আর তোমরা যদি (বিধবাদের) ইদ্দত পালনকালে সেই নারীদের বিবাহ করার ইচ্ছা ইশারা-ইংগিতে প্রকাশ কর অথবা তা মনের মাঝে লুকিয়ে রাখ, তবে উভয় অবস্থায় তা দোষের কাজ নয়। আল্লাহ জানেন তাদের কথা তোমাদের মনে জাগবেই। কিন্তু সাবধান! তাদের সাথে গোপনে কোনো চুক্তি-প্রতিশ্রুতি দিয়ে রেখো না। তবে হ্যাঁ, কিছু বলতে হলে প্রথানুসারে বিধিসম্মতভাবে বলবে। আর ইদ্দত পূর্ণ হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত বিবাহ বন্ধনের সিদ্ধান্ত নিবে না।" -(সূরা আল বাকারা : ২৩৫)
আলোচ্য আয়াতে ইদ্দত পালনরত বিধবাদের ইশারা-ইংগিতে বিবাহ প্রস্তাব প্রদান সম্পর্কে বলা হয়েছে। এ ধরনের প্রস্তাব জায়েয হলেও বিবাহ কার্যের গোপন চুক্তি জায়েয নয় এবং ইদ্দতের মধ্যে যথারীতি প্রকাশ্যে প্রস্তাব দিয়েও বিবাহ জায়েয নয়। ইদ্দত শেষ হওয়ার পর ইসলামী শরীয়তের নিয়ম-রীতি অনুযায়ী বিবাহ কার্য সম্পাদন করা যেতে পারে। সকল ইমামের এ বিষয়ে ইজমা রয়েছে যে, ইদ্দত শেষ হওয়ার পূর্বে বিবাহ শুদ্ধ নয়।
mৃত স্বামীর বিধবা স্ত্রীকে অস্পষ্ট ভাষায় বিবাহের প্রস্তাব দেয়া জায়েয আছে। তেমনিভাবে তালাক প্রাপ্তাকেও এভাবে বিবাহ প্রস্তাব দেয়া বৈধ। এ প্রসংগে অফসীরে ইবনে কাসীরে রাসূলুল্লাহ (স)-এর সময়কার একটি ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে।
ফাতিমা বিনতে কায়েস (রা)-কে যখন তার স্বামী আবু আমর ইবনে হাফস (রা) তৃতীয় তালাক দিয়েছিলেন, তখন রাসূলুল্লাহ (স) তাকে বললেন, তুমি ইবনে মাকতুমের ঘরে ইদ্দত পালন কর। তিনি আরো বললেন, ইদ্দত পালন শেষ হলে আমাকে জানাবে। অতপর ইদ্দত পালন শেষ হলে উসামা ইবনে যায়েদ (রা) তাকে বিয়ের প্রস্তাব দেন এবং উসামার সাথে তার বিবাহ সম্পন্ন হয়।
এখানে স্মরণ রাখা আবশ্যক যে, উপরিউক্ত বিধানাবলী হলো বিধবা অথবা বায়েন তালাক প্রাপ্তা স্ত্রীর ব্যাপারে। সুতরাং তালাকে রাজঈর ইদ্দত চলাকালে স্বামী ছাড়া অন্য কারো জন্যে পয়গাম দেয়া জায়েয নয়।
টিকাঃ
উৎস:-তাফসীর ইবনে কাসীর। -তাফসীরে মাআরেফুল কুরআন। -তাফহীমুল কুরআন।