📄 সম্পর্ক ছিন্ন করার নিয়তে নিজেদের দেয়া কোনো কিছু স্ত্রীদের থেকে ফেরত নেয়া হারাম
وَلَا يَحِلُّ لكُمْ أَنْ تَأْخُذُوا مِمَّا أَتَيْتُمُوهُنَّ شَيْئًا إِلَّا أَنْ يُخَافَا أَلَّا يُقِيمَا حُدُودَ اللهِ ، فَإِنْ خِفْتُمْ أَلا يُقِيمَا حُدُودَ اللهِ ، فَلَا جُنَاحَ عَلَيْهِمَا فِيْمَا افْتَدَتْ به تِلْكَ حُدُورُ اللَّهِ فَلَا تَعْتَدُوهَا ، وَمَنْ يُتَعَدَّ حُدُودَ اللَّهِ فَأُولَئِكَ هُمُ الظَّلِمُونَ (البقرة : ২২৯)
“আর নিজেদের দেয়া কোনো কিছু স্ত্রীদের থেকে ফিরিয়ে নেয়া তোমাদের জন্যে জায়েয নেই। কিন্তু যে ক্ষেত্রে স্বামী-স্ত্রী উভয়েই এ ব্যাপারে ভয় করে যে, তারা আল্লাহর নির্দেশ বজায় রাখতে পারবে না, তাহলে সে ক্ষেত্রে স্ত্রী যদি বিনিময় স্বরূপ কিছু দিয়ে অব্যাহতি পেতে চায়, তবে উভয়ের কারোই কোনো গুনাহ নেই। এই হলো আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত সীমা। কাজেই একে 'অতিক্রম করো না। যারা আল্লাহর সীমালংঘন করবে তারাই যালিম।” - (সূরা আল বাকারা : ২২৯)
কোনো কোনো অত্যাচারী স্বামী তার স্ত্রীকে রাখার নিয়ত রাখে না। এমতাবস্থায় তাকে তালাকও দেয় না আবার তার অধিকার আদায় করারও চিন্তা করে না। এতে স্ত্রী যখন অতীষ্ঠ হয়ে পড়ে, সেই সুযোগ নিয়ে স্ত্রীর নিকট থেকে কিছু অর্থকড়ি আদায় করার বা মোহর মাফ করিয়ে নেয়ার বা ফেরত নেয়ার দাবী করে বসে। অনেক সময় কলে-কৌশলে স্ত্রীকে দেয়া গহনা বা কাপড়-চোপড় কেড়ে নিয়ে তাকে খালি হাতে বিদায় দেয়। আল কুরআন এ ধরনের কাজকে হারাম ঘোষণা করেছে। ইরশাদ হচ্ছে:
وَلَا يَحِلُّ لكُمْ أَنْ تَأْخُذُوا مِمَّا أَتَيْتُمُوهُنَّ شَيْئًا . “আর তোমাদের স্ত্রীদের দেয়া কোনো কিছু তাদের থেকে ফেরত নেয়া তোমাদের জন্যে হালাল নয়।”
অর্থাৎ তালাকের পরিবর্তে তোমাদের দেয়া অর্থ-সম্পদ বা মোহর ফেরত নেয়া হারাম। অবশ্য একটি ব্যাপারে তা থেকে স্বতন্ত্র ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, যাতে মোহর ফেরত নেয়া বা ক্ষমা করিয়ে নেয়া যেতে পারে। তা হচ্ছে এই যে, যদি স্ত্রী এমন অনুভব করে "মনের গরমিলের কারণে আমি স্বামীর হক আদায় করতে পারিনি" এবং স্বামীও যদি তাই বোঝে, তবে এমতাবস্থায় মোহর ফেরত নেয়া বা তা ক্ষমা করিয়ে নেয়া এবং এর পরিবর্তে তালাক নেয়া জায়েয হবে। -(মাআরেফুল কুরআন)
স্ত্রীদের নিকট থেকে নিজের দেয়া সম্পদের কিছু ফেরত নেয়া জায়েয নেই। কিন্তু যে ক্ষেত্রে স্বামী ও স্ত্রী উভয়ই এ ব্যাপারে ভয় করে যে, তারা আল্লাহর নির্দেশ বজায় রাখতে পারবে না, আর সে ক্ষেত্রে স্ত্রী যদি বিনিময় দিয়ে অব্যাহতি নিয়ে নেয়, তবে এতে কারো পাপ নেই।
অবশ্য স্ত্রী যদি স্বামীর কোনো অপরাধ ছাড়া তার থেকে অব্যাহতি চায়, তবে তাতে গুনাহ রয়েছে। হযরত ইবনে জারীর থেকে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, "স্বামীর বিনা অপরাধে স্ত্রী যদি তার কাছে তালাক প্রার্থনা করে তাহলে জান্নাতের ঘ্রাণও তার নসীব হবে না।" -(ইবনে কাসীর)
হাবীবা বিনতে সহল (রা) সাবিত ইবনে কায়েস (রা)-এর স্ত্রী ছিলেন। কিন্তু সাবিত (রা) ছিলেন অত্যন্ত কুৎসিত ব্যক্তি। তাই হাবীবা (রা) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে স্বামীর ব্যাপারে অভিযোগ করে বললেন, আল্লাহর কসম, আমার যদি আল্লাহর ভয় না থাকতো তাহলে তিনি আমার কাছে আসলেই আমি তার মুখে থু থু মেরে দিতাম। তখন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তোমাকে দেয়া তার বাগানটি কি তাকে ফিরিয়ে দিতে রাজি আছ? তিনি উত্তরে বললেন, হ্যাঁ, রাজি আছি। তিনি বাগানটি তাকে ফিরিয়ে দেন। অতপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের উভয়কে বিচ্ছিন্ন করে দেন। ইসলামের পরিভাষায় এ বিচ্ছিন্নতাকে 'খোলা' বলে। অবশ্য খোলার ব্যাপারে স্বামীর স্ত্রীকে দেয়া বস্তুর চেয়ে বেশী নেয়া জায়েয কিনা সে বিষয়ে ইমামগণের মধ্যে মতপার্থক্য আছে।
অল্প-বেশী, তুচ্ছ-মূল্যবান যাকিছু স্ত্রীর আছে তা সবই গ্রহণ করা যাবে একমাত্র চুলের বেণী ছাড়া। ইমাম আবু হানিফা (র)-এর সহচরবৃন্দের অভিমত হলো, স্ত্রীর দোষে খোলা হয়ে থাকলে স্বামী তার প্রদত্ত সব সম্পদই গ্রহণ করতে পারবে। তার অতিরিক্ত গ্রহণ বৈধ নয়। হ্যাঁ, স্ত্রী স্বেচ্ছায় অতিরিক্ত দান করলে তা জায়েয হবে। পক্ষান্তরে স্বামীর দোষে খোলা হয়ে থাকলে স্বামী কিছুই ফেরত পাবে না। তবে স্ত্রী স্বেচ্ছায় দান করলে তা স্বামীর জন্যে বৈধ। ইমাম আহমদ (র), আতা, সাঈদ ইবনে মুসাইয়্যেব প্রমুখের মতে যে কোনো অবস্থায় স্বামী নিজের দেয়া বস্তুর অতিরিক্ত গ্রহণ করা জায়েয নেই। হযরত আলী (রা) বলেন, খোলা গ্রহণকারী মহিলা থেকে তাকে প্রদত্ত বস্তুর চেয়ে অধিক কিছু গ্রহণ করো না। ইমাম আওযাঈ বলেন, বিচারকগণ স্ত্রীর নিকট থেকে স্বামীর প্রদত্ত বস্তুর অধিক কিছু গ্রহণ করা স্বামীর জন্যে বৈধ মনে করেন না।-(তাফসীরে ইবনে কাসীর)
মোটকথা, মোহরানা, অলংকার ও কাপড় ইত্যাদি যাকিছু স্বামী স্ত্রীকে দিয়েছে, তার কোনো একটি জিনিসও সে ফিরে পেতে পারে না-সে অধিকার তার নেই। কেউ কোনো ব্যক্তিকে উপহার, হেবা ইত্যাদি বাবদ কিছু দিয়ে থাকলে তা পুনরায় ফেরত নেয়া ইসলামের সাধারণ নৈতিক নিয়মের বিপরীত। এরূপ হীন ও নিকৃষ্ট কাজকে হাদীস শরীফে এমন কুকুরের সাথে তুলনা করা হয়েছে, যে নিজের বমি নিজে ভক্ষণ করে। বিশেষত নিজ স্ত্রীকে তালাক দিয়ে বিদায় করার সময় তাকে প্রদত্ত সবকিছু কেড়ে নেয়া স্বামীর পক্ষে বাস্তবিকই অত্যন্ত লজ্জাস্কর কাজ। বরং ইসলাম তো এ চরিত্র শিক্ষা দিয়েছে যে, তালাক দিয়ে বিদায় করার সময় স্ত্রীকে কিছু না কিছু দিয়েই বিদায় করা উচিত।
টিকাঃ
-(তাফহীমুল কুরআন), (মাআরেফুল কুরআন), (ইবনে কাসীর)
📄 যখন তালাক প্রত্যাহারের সুযোগ থাকে না
فَإِنْ طَلَّقَهَا فَلَا تَحِلُّ لَهُ مِنْ بَعْدُ حَتَّى تَنْكِحَ زَوْجًا غَيْرَهُ ۖ وَإِنْ طَلَّقَهَا فَلَا جُنَاحَ عَلَيْهِمَا أَنْ يَتَرَاجَعَا إِنْ ظَنَّا أَنْ يُقِيمَا حُدُودَ اللَّهِ ۚ وَتِلْكَ حُدُودُ اللَّهِ يُبَيِّنُهَا لِقَوْمٍ يَعْلَمُونَ ﴿البقرة : ২৩০﴾
"অতপর যদি স্বামী (তৃতীয়) তালাক দিয়ে বসে, তাহলে অন্য স্বামীর ঘর করার পূর্বে সে এই ব্যক্তির জন্যে হালাল হবে না। দ্বিতীয় স্বামী যদি তাকে তালাক দিয়ে দেয় (অথবা মৃত্যুবরণ করে) তাহলে প্রথম স্বামীর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারে। এতে তাদের কোনো গুনাহ হবে না, যদি তাদের আত্মবিশ্বাস থাকে যে, তারা আল্লাহর নির্ধারিত সীমারেখায় থাকতে পারবে। এ হচ্ছে আল্লাহর নির্ধারিত সীমা, যা আল্লাহ বুঝের লোকের জন্যে বর্ণনা করেন।" -(সূরা আল বাকারা : ২৩০)
এ আয়াতটি পূর্ববর্তী আয়াতসমূহেরই শেষাংশ বা ধারাবাহিকতার শেষ সীমা। কেউ তার স্ত্রীকে দুই তালাক দেয়ার পর যদি পুনরায় তৃতীয় তালাক দিয়ে বসে তবে বৈবাহিক বন্ধন সম্পূর্ণরূপে ছিন্ন হয়ে যায়। দ্বিতীয় তালাকের পরে ইদ্দতের মধ্যে প্রত্যাহার করার অথবা ইদ্দত শেষ হওয়ার পর বিবাহ নবায়ন করার যে সুযোগ ছিল, এখন (তৃতীয় তালাকের পর) আর ঐ সুযোগ থাকলো না। কেননা এমতাবস্থায় ধরা যায় যে, স্বামী সবকিছু বুঝে শুনেই স্ত্রীকে তৃতীয় তালাক দিয়েছে। তাই এখন তার শাস্তি হলো তারা উভয়ে একমত হলেও বিবাহের নবায়নও করতে পারবে না। তাদের পুনর্বিবাহের শর্ত হলো স্ত্রী ইদ্দত শেষে অন্য স্বামী গ্রহণ করবে। দ্বিতীয় স্বামীর সাথে সহবাসের পর যদি সেও তাকে তালাক দিয়ে দেয় অথবা সে মারা যায়, তাহলে ইদ্দত শেষ হওয়ার পর প্রথম স্বামীর সাথে পুনরায় বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারবে।
কুরআন ও হাদীসের বাণী এবং সাহাবায়ে কিরাম ও তাবেয়ীগণের কার্যপদ্ধতিতে দেখা যায়, যখন কোনো দম্পতির তালাক ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প থাকে না, তখনই কেবল তালাক দেয়ার পথে এগুবে। আর তখন উত্তম পন্থাই অবলম্বন করবে। তা হচ্ছে এমন তহুরে তালাক দিবে যাতে সহবাস করা হয়নি। এক তালাক দিয়েই ছেড়ে দেবে। ইদ্দত শেষ হলে বিবাহ সম্পর্ক এমনিতেই ছিন্ন হয়ে যাবে। এটাই তালাকের উত্তম পন্থা। আর তারা ভাল মনে করলে ইদ্দতের মধ্যে তালাক প্রত্যাহার করলেই চলবে। ইদ্দত শেষে বিবাহ ভঙ্গ হয়ে থাকলেও তারা ইচ্ছা করলে তা নবায়ন করতে পারে।
কেউ যদি উত্তম পন্থার ভ্রূক্ষেপ না করে ইদ্দতের মধ্যে আরো এক তালাক দিয়ে বসে, তবে সে বিবাহ ছিন্ন করার দ্বিতীয় পর্যায়ে এগিয়ে গেল। এবারও সে পূর্বের মত ইদ্দতের মধ্যে তালাক প্রত্যাহার অথবা ইদ্দত শেষে বিবাহ নবায়ন করতে পারে। অবশ্য দ্বিতীয় পর্যায়ে সম্পর্ক রক্ষার সর্বশেষ স্তরে উপনীত হয়ে গেলো। এখন সে এমন এক সীমারেখায় পদার্পণ করলো যে, আর এক তালাক দিলে তাদের সম্পর্ক চিরতরে ছিন্ন হয়ে যায় এবং স্বামী তার অধিকারের পথ চিরতরে রুদ্ধ করে দিলো।
তালাকের নিকৃষ্ট পন্থা ইসলামে তালাক মূলত একটি অপসন্দনীয় কাজ। জায়েয কাজসমূহের মধ্যে এটি হচ্ছে নিকৃষ্টতম। এতদসত্ত্বেও এছাড়া কোনো উপায় না থাকলে তখন উপরোক্ত উত্তম পন্থায়ই এ কাজ করা যেতে পারে। কিন্তু কেউ যদি এক সাথে তিন তালাক দিয়ে বসে তবে তাতেও তালাক কার্যকর হবে সত্য, তবে তা হচ্ছে সমস্ত উম্মতের দৃষ্টিতে নিকৃষ্ট পন্থা। কেউ কেউ একে নাজায়েযও বলেছেন। এতে তিন তালাকই হয়ে যাবে এবং তালাক প্রত্যাহার তো দূরের কথা বিবাহ নবায়ন করার সুযোগটুকুও আর থাকবে না। মাওলানা আবু যাহেদ সরফরাজ তাঁর "উমদাতুল আসার" গ্রন্থে এ'সাসআলা বিষদভাবে উল্লেখ করেছেন। মাহমুদ ইবনে লবীদের ঘটনা নাসাইর উদ্ধৃতি দিয়ে উল্লেখ করা হয়েছে যে, তিন তালাক এক সাথে দেয়াতে হুজুর খুব অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। এমনকি কোনো কোনো সাহাবী তাকে হত্যার যোগ্য বলেও মনে করেছেন। কিন্তু এতদসত্ত্বেও হুজুর একে প্রত্যাহারযোগ্য তালাক ঘোষণা করার কোনো বর্ণনা কোথায়ও পাওয়া যায়নি।
পুনর্বিবাহের একটি ঘৃণ্যতম ও অভিশপ্ত গন্থা স্ত্রীকে তালাক দেয়ার পর তাকে পুন গ্রহণ করার একটি কঠিন পথ হলো দ্বিতীয় স্বামী ঐ মহিলাকে স্বেচ্ছায় তালাক দেয়ার পর ইদ্দত সমাপান্তে প্রথম স্বামী তাকে পুন বিবাহ করা। শরীয়তের পরিভাষায় যা হাল্লালা বা হীলা নামে পরিচিত। এ ক্ষেত্রে দ্বিতীয় বিবাহ সম্পর্কে কোনো ষড়যন্ত্র কিংবা কোনো পূর্বশর্ত আরোপ সম্পূর্ণ হারাম। কেউ যদি তার তালাক দেয়া স্ত্রীকে পুন হালাল করার উদ্দেশ্যে ষড়যন্ত্র কিংবা পূর্ব প্রস্তুতি সহকারে অথবা তালাক দেয়ার শর্ত আরোপ করে অন্য কারো কাছে বিবাহ দেয় তবে তা সম্পূর্ণ না-জায়েয হবে। তাদের বিবাহ ও তালাক দু'টোই হতে হবে স্বাভাবিক নিয়মে। হাল্লালার জন্যে কেউ বিবাহ করলেও তালাক দিলে উভয়ই গুনাহগার ও অভিশপ্ত হবে। হযরত ওমর (রা) বলেন, যে নারী-পুরুষ হাল্লালার শর্তে বিয়ে করবে আমি এরূপ স্বামী-স্ত্রীকে রজম (পাথর নিক্ষেপ) করে ছাড়বো। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরূপ হাল্লালাকারী ও যার জন্যে হাল্লালা করা হয়েছে উভয়কে কঠোর লা'নত করেছেন। মূলতঃ শর্তারোপ, চাপ প্রয়োগ, ষড়যন্ত্র যে কোনোভাবে হাল্লালার জন্যে বিবাহ দিলে তাকে বিবাহই বলা যাবে না। বরং এতে ব্যভিচারই হবে। তাই এরূপ বিবাহ ও তালাক দ্বারা স্ত্রীলোকটি প্রথম স্বামীর জন্যে কিছুতেই হালাল হবে না।
টিকাঃ
-(মুফতী মুহাম্মদ শফী (র)-মাআরেফুল কুরআন), (সাইয়েদ আবুল আ'লা মওদূদী-তাফহীমুল কুরআন ও মুজীবুল্লাহ নদভী-ইসলামী ফিক্হ)
📄 স্ত্রীকে কষ্ট ও যন্ত্রণা দেয়ার উদ্দেশ্যে বিবাহ বন্ধনে আটকে রাখা নিষেধ
وَإِذَا طَلَّقْتُمُ النِّسَاءَ فَبَلَغْنَ أَجَلَهُنَّ فَا مَسْكُوهُنَّ بِمَعْرُوفِ أَوْ سَرِّحُوهُنَّ بِمَعْرُوفِ من وَلَا تُمْسِكُوهُنَّ ضَرَارًا لِتَعْتَدُوا ، وَمَنْ يَفْعَلْ ذَلِكَ فَقَدْ ظَلَمَ نَفْسَهُ ، وَلَا تَتَّخِذُوا آيَاتِ اللَّهِ هُزُوًا : (البقرة : ২৩১)
"যখন তোমরা স্ত্রীদের তালাক দিয়ে দাও, তারপর তারা নির্ধারিত ইদ্দত শেষ করে নেয়। তখন তোমরা হয়ত নিয়মানুযায়ী তাদেরকে রেখে দাও, না হয় সহানুভূতির সাথে মুক্ত করে দাও। তোমরা তাদের জ্বালাতন করার উদ্দেশ্যে রেখে দিয়ে বাড়াবাড়ী করো না। আর যে ব্যাক্ত এমনটি করবে সে অবশ্য তার নিজের উপরই যুলুম করবে। আল্লাহর বাণীকে তামাশার বিষয়ে পরিণত করো না।" (সূরা আল বাকারা : ২৩১)
তালাক প্রাপ্তা স্ত্রী যখন ইদ্দত অতিক্রম করার কাছাকাছি পৌঁছে যায়, তখন স্বামীর দু'টো অধিকার থাকে। একটি হচ্ছে তালাক প্রত্যাহার করে বিবাহ বন্ধনে রেখে দেয়া। দ্বিতীয়টি হচ্ছে তালাক প্রত্যাহার না করে বৈবাহিক সম্পর্ক ছিন্ন করা। এ দু'টি অধিকার বা ভূমিকা পালনে সে মুক্ত নয়, বরং কুরআন এ ক্ষেত্রে উভয় অবস্থায়ই শর্ত আরোপ করেছে। এখানে আল্লাহ তা'আলা "বিল-মারূফ" শব্দ প্রয়োগ করে উভয় অবস্থাতেই শর্ত ও নিয়ম- নীতি অনুসরণের নির্দেশ দিয়েছেন। উভয় অবস্থায় যেটাই করা হোক তা করতে হবে শরীয়তের নিয়মানুযায়ী। কেবল সাময়িক খেয়াল খুশী বা আবেগের তাগিদে কোনো কিছু করা চলবে না।
যেমন তালাক দেয়ার পর বিচ্ছিন্নতার ভয়াবহতা ও পরিণাম সম্পর্কে চিন্তা করে যদি তালাক প্রত্যাহার করে স্ত্রীকে বিয়েতে বহাল রাখার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, তবে সে জন্যে শরীয়তের নিয়ম হচ্ছে মনোমালিন্যতাকে অন্তর থেকে ধুয়ে মুছে সুন্দর সুখী জীবন-যাপন এবং পরস্পরের অধিকার ও কর্তব্য যথাযথভাবে আদায় করার মনোভাব থাকতে হবে। স্ত্রীকে যন্ত্রণা ও কষ্ট দেয়ার উদ্দেশ্যে তা করা যাবে না।
হযরত ইবনে আব্বাস (রা) বলেন, লোকেরা তাদের স্ত্রীদের হাস্যচ্ছলে তালাক দিতো, আসলে তাদের অন্তরে তালাক দেয়ার নিয়ত রাখতো না। অতঃপর আল্লাহ এ আয়াত নাযিল করেন, "وَلَا تَتَّخِذُوا آيَاتِ اللهِ هُزُوًا "তোমরা আল্লাহর আয়াত নির্দেশকে হাস্যকর বিষয়ে পরিণত করো না।" আল্লামা ইবনে কাসীর তাঁর বিখ্যাত তাফসীর গ্রন্থে হযরত ইবাদাহ ইবনে সামিত (রা) উপরোক্ত আয়াতের প্রসংগ লিপিবদ্ধ করেছেন। তা হচ্ছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সময় লোকেরা একে অপরকে বলতো, আমি তোমার বোনকে বিবাহ করলাম। কিন্তু পরে বলতো, তা তো তামাশা করে বলেছিলাম। আবার কেউ কেউ বলতো তোমাকে আযাদ করে দিলাম। পরে বলতো তাতো হাসি-ঠাট্টা করে বলেছিলাম। তারপর আল্লাহ তা'আলা উপরোক্ত আয়াত অবতীর্ণ করেন। হযরত আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত আছে: ثلث جدهُنَّ جدّ وهَزْلُهُنَّ جدّ النِّكَاحُ وَالطَّلَاقُ وَالرُّجْعَةُ : বিষয় এমন আছে যেগুলো ইচ্ছা করে বলা আর হাসি তামাশা করে বলা সমান। (১) বিবাহ, (২) তালাক ও (৩) রাজয়াত বা তালাক প্রত্যাহার। সুতরাং দু'জন স্ত্রী ও পুরুষ বিয়ের ইচ্ছা ছাড়াও যদি হাসতে হাসতে ইজাব কবুল করে নেয়, তবে বিবাহ হয়ে যাবে। তেমনিভাবে তালাক তালাক প্রত্যাহার ও দাস মুক্তির ব্যাপারেও একই বিধান।
টিকাঃ
(মাআরেফুল কুরআন)
📄 অভিভাবক বা পূর্ব স্বামী মহিলার নির্বাচিত স্বামী গ্রহণে বাধা দিতে পারবে না
وَإِذَا طَلَّقْتُمُ النِّسَاءَ فَبَلَغْنَ أَجَلَهُنَّ فَلَا تَعْضُلُوهُنَّ أَنْ يُنْكِحْنَ أَزْوَاجَهُنَّ إِذَا تَرَاضُوا بَيْنَهُمْ بِالْمَعْرُوفِ ، ذَلِكَ يُوعَظُ بِهِ مَنْ كَانَ مِنْكُمْ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ ذَلِكُمْ أَرْكَى لَكُمْ وَأَطْهَرُ ، وَاللَّهُ يَعْلَمُ وَأَنْتُمْ لَا تَعْلَمُونَ .
"যখন তোমরা তোমাদের স্ত্রীদের তালাক দিয়ে দাও, তারপর তারা নির্ধারিত ইদ্দত পালন করে, তখন তাদের পূর্ব স্বামীর সাথে পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে নিয়মানুযায়ী বিয়ে করতে বাধা দান করো না। এ উপদেশ তাদেরকে দেয়া যাচ্ছে যারা আল্লাহ ও আখিরাতকে বিশ্বাস করে। তোমাদের জন্যে এতে রয়েছে পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতা। আল্লাহ (তোমাদের পবিত্রতা ও মঙ্গল) ভালভাবেই জানেন, তোমরা তা জান না।" -(সূরা আল বাকারা : ২৩২)
কোনো স্ত্রীলোককে তার স্বামী যদি তালাক দেয় এবং ইদ্দত পালনের মধ্যে তাকে ফিরিয়ে না লয় এবং ইদ্দত শেষ হওয়ার পর উভয়ই যদি পুনর্বিবাহিত হতে রাজি হয়, তবে স্ত্রীলোকটির অভিভাবক বা আত্মীয়-স্বজনগণ এ কাজে তাকে বাধা দেয়া উচিত নয়। আয়াতের দ্বিতীয় অর্থ হচ্ছে, স্ত্রী ইদ্দত পালন শেষ করে পূর্ব স্বামীর বন্ধন থেকে মুক্ত হওয়ার পর যদি অন্য কোনো স্থানে নিজের বিবাহ ঠিক করতে চায়, তখন পূর্ব স্বামীর পক্ষে এটা কিছুতেই উচিত হবে না যে, সে ঐ মহিলার দ্বিতীয় বিবাহ বন্ধ করে রাখার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়।
উপরোক্ত আয়াতের শানেনুযুল বর্ণনা করতে গিয়ে মাওলানা মুফতী শফী (র) বুখারী শরীফের একটি হাদীসের উদ্ধৃতি দিয়েছেন। হযরত মা'কাল ইবনে ইয়াসার তাঁর বোনকে এক ব্যক্তির সাথে বিয়ে দিয়েছিলেন। সে ব্যক্তি তাকে তালাক দেয় এবং পরে কৃতকর্মের জন্যে অনুতপ্ত হয়ে তাকে পুনরায় বিবাহ করতে মনস্থ করে। তার তালাক প্রাপ্তা স্ত্রীও তাতে সম্মত হয়। কিন্তু যখন লোকটি এ প্রস্তাব মা'কালের নিকট পেশ করে, তখন তিনি যেহেতু তালাক দেয়াতে তার প্রতি অসন্তুষ্ট ছিলেন, তাই তিনি উত্তর দিলেন, আমি তোমাকে সম্মান করেই তোমার নিকট আমার বোনকে বিয়ে দিয়েছিলাম, কিন্তু তুমি সে সম্মানের মূল্য না দিয়ে তাকে তালাক দিয়ে দিলে। এখন তাকে পুনরায় বিয়ে করতে চাইছো! জেনে রেখ, আল্লাহর কসম সে আর তোমার বিবাহাধীন যাবে না।
সাহাবীগণ আল্লাহ ও রাসূলের অত্যন্ত অনুরক্ত ছিলেন। আয়াত শোনা মাত্রই হযরত মা'কালের সমস্ত ক্রোধ পড়ে যায় এবং তিনি স্বয়ং ঐ ব্যক্তির নিকট উপস্থিত হয়ে বোনের পুনর্বিবাহ তারই সাথে দিয়ে দেন। আর কসমের কাফ্ফারাও আদায় করেন।
এখানে উল্লেখ্য যে, কোনো মহিলার পসন্দমত ব্যক্তির সাথে বিয়ের বাধা সৃষ্টি করা যাবে না তখন; যদি তাদের সম্মতিটা হয় শরীয়ত সম্মত পদ্ধতিতে। অন্যথায় বাধাদান বরং শক্তি প্রয়োগও উচিত হবে। যেমন, বিয়ে ছাড়াই পরস্পর স্বামী-স্ত্রীর মত বসবাস করতে শুরু করলে, তিন তালাকের পর অন্যত্র বিয়ে ছাড়াই যদি পুনর্বিবাহ করতে চায়, অথবা ইদ্দতের মধ্যেই অন্যের সাথে বিয়ের ইচ্ছা করে, তখন সকল মুসলমানের বিশেষত তাদের সাথে সম্পর্কিত লোকদের সম্মিলিতভাবে বাধা দিবে ও প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগ করে তা প্রতিহত করবে। তেমনিভাবে কোনো মেয়ে যদি স্বীয় অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া কুফু হীনতার স্থানে বা বংশের প্রচলিত মোহরের কমে বিয়ে করতে চায় যাতে এর কুপ্রভাব বংশের উপর পড়তে পারে, তবে এমন ক্ষেত্রেও তারা বাধা প্রদান করতে পারে।
এটা আল্লাহ ও আখিরাতে বিশ্বাসীদের জন্য গ্রহণীয় উপদেশ বলার অর্থ, ঈমানদারদের এর ব্যতিক্রম করা বা এতে শিথিলতা প্রদর্শন করা উচিত নয়। এ উপদেশ সম্বলিত নির্দেশের ব্যতিক্রম করা পাপ মগ্নতা ও ফিতনা ফাসাদের কারণ হতে পারে। কারণ প্রাপ্তবয়স্কা বুদ্ধিমতি যুবতী মেয়েকে সাধারণভাবে বিয়ে থেকে বিরত রাখা একদিকে তার প্রতি অত্যাচার করা, তাকে অধিকার থেকে বঞ্চিত করা; অপরদিকে তার সতিত্ব পবিত্রতা ও মান-ইজ্জতকে আশংকায় ফেলে রাখার নামান্তর।
আয়াতের শেষাংশে বলা হয়েছে, পবিত্রতা ও কল্যাণ সম্পর্কে আল্লাহই সম্যক অবগত আছেন। মানুষ তার ভবিষ্যত কল্যাণ সম্পর্কে একেবারেই অজ্ঞ। সুতরাং মানুষ আল্লাহর নির্দেশের কাছে আত্মসমর্পণ করার মধ্যে তার ব্যষ্টিক ও সামষ্টিক কল্যাণ নিহিত রয়েছে।
টিকাঃ
-(মাআরেফুল কুরআন, তাফহীমুল কুরআন ও তাফসীরে ইবনে কাসীর)