📘 আল কুরআনে নারী 📄 স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক মর্যাদার মূলনীতি

📄 স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক মর্যাদার মূলনীতি


وَلَهُنَّ مِثْلُ الَّذِي عَلَيْهِنَّ بِالْمَعْرُوفِ ۚ وَلِلرِّجَالِ عَلَيْهِنَّ دَرَজَةٌ ۗ وَاللَّهُ عَزِيزٌ حَكِيمٌ (البقرة : ২২৮)

"আর নারীদের জন্যেও ন্যায়সংগতভাবেই ঠিক সেসব অধিকার রয়েছে যেমন তাদের উপর রয়েছে পুরুষদের অধিকার। অবশ্য তাদের উপর পুরুষদের বিশেষ মর্যাদা রয়েছে। আর আল্লাহ তা'আলা মহাপরাক্রমশালী ও মহাজ্ঞানী।"-(সূরা আল বাকরা : ২২৮)

নারীদের উপর যেমন পুরুষদের অধিকার রয়েছে। তেমনি পুরুষদের উপরও রয়েছে নারীদের অধিকার। আর উভয়কেই উভয়ের অধিকার প্রদান করা একান্ত কর্তব্য। তবে এতটুকু পার্থক্য আছে যে, পুরুষদের মর্যাদা নারীদের তুলনায় কিছুটা অধিক। এ আয়াতে সেই দিকেই ইংগিত করে বলা হয়েছে : وَلِلرِّجَالِ عَلَيْهِنَّ دَرَজَةٌ অর্থাৎ নারীদের তুলনায় পুরুষদের রয়েছে বিশেষ মর্যাদা।

সূরা নিসায় বিষয়টি আরও স্পষ্ট করে বলা হয়েছে। ইরশাদ হচ্ছে : الرِّجَالُ قَوَّامُونَ عَلَى النِّسَاءِ بِمَا فَضَّلَ اللَّهُ بَعْضَهُمْ عَلَىٰ بَعْضٍ وَبِمَا أَنْفَقُوا مِنْ أَمْوَالِهِمْ ۚ -(النساء : ৩৪)

"পুরুষরা নারীদের উপর কর্তৃত্বশীল। কারণ, আল্লাহ তাদের একের উপর অপরকে বিশেষ মর্যাদায় ভূষিত করেছেন এবং এ জন্যে যে পুরুষরা নারীদের পেছনে তাদের সম্পদ ব্যয় করেছে।"

আল কুরআনে সূরা আল বাকারার এ ছোট আয়াতাংশে নর-নারীর দায়িত্ব ও কর্তব্যের বিরাট বিষয়কে তুলে ধরা হয়েছে। এতে নারী-পুরুষের অধিকার সম্পর্কিত মূলনীতি বর্ণনা করা হয়েছে। এখানে উভয়ের অধিকার ও কর্তব্য পালন সমভাবে ওয়াজিব করে দেয়া হয়েছে। অধিকন্তু আয়াতাংশে স্ত্রীলোকদের অধিকারের কথা পুরুষদের অধিকারের পূর্বে বর্ণনা করা হয়েছে। অর্থাৎ পুরুষদের উচিত তারা যেন অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে নারীদের অধিকার প্রদান করে। কারণ, পুরুষ তো নিজের বাহুবলে ও আল্লাহ প্রদত্ত মর্যাদা বলে নারীর কাছ থেকে নিজের অধিকার আদায় করে নেয়। কিন্তু পুরুষদের উচিত নারীদের অধিকারের কথা চিন্তা করা। কেননা সাধারণত নারীরা শক্তি দিয়ে নিজ অধিকার আদায় করতে পারে না।

আল্লাহর বাণীর শব্দাবলী খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। এখানে مُثْل শব্দ দিয়ে স্বামী ও স্ত্রীর কর্তব্য ও অধিকারের সমতার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ উভয়ের প্রতি উভয়ের অধিকার সমান। তাই বলে এর মানে এ নয় যে, উভয়কেই একই ধরনের কাজ করতে হবে এবং তাদের কর্মস্থল অভিন্ন হবে। কারণ প্রকৃতিগতভাবেই তাদেরকে দৈহিক আকৃতি, গঠন, শক্তি ও সামর্থের পার্থক্য করা হয়েছে। যে কারণে তারা সামাজিক ও পারিবারিক কাজে পরস্পরের বিকল্প নয় বরং পরিপূরক বা সম্পূরক।

আল কুরআনে পুরুষদের বিশেষ মর্যাদা দানের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়েছে وَلِلرِّجَالِ عَلَيْهِنَّ دَرَজَةٌ পুরুষদের জন্যে নারীদের তুলনায় বিশেষ মর্যাদা রয়েছে। এখানে পুরুষদেরকে স্ত্রীদের তত্ত্বাবধায়ক ও জিম্মদার ঘোষণা করা হয়েছে। যেমন সূরা আন নিসায় قَوَّামُونَ বলে পুরুষদেরকে কর্তৃত্বশীল বানিয়ে দেয়া হয়েছে। এ তত্ত্বাবধান ও কর্তৃত্ব দান এজন্যে যে, পুরুষদের দৈহিক গঠন ও মানসিকতার সৃষ্টিগত পার্থক্যের দরুন তারা কর্তৃত্ব করারই উপযোগী। তাছাড়া স্ত্রীদের যাবতীয় ভরণ পোষণের দায়িত্ব স্বামীরই উপর বর্তায়। আর স্ত্রীগণ হচ্ছে তাদের সহযোগী মাত্র। আল-কুরআনের ভাষায় স্ত্রীদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যেমন জঘন্য অন্যায় তেমনি তাদের বল্লাহীনভাবে পুরুষদের আওতা মুক্ত করে দেয়াও নিরাপদ নয়। বৈষয়িক জীবনে স্ত্রীদের পুরুষদের সম্পূর্ণ আওতামুক্ত করা নিতান্ত ভয়ের কারণ। এতে করে পৃথিবীতে রক্তপাত, ফিতনা-ফাসাদ ও বিবাদ-বিষম্বাদের সৃষ্টি হয়ে থাকে। আর সমাজে বিস্তার লাভ করে লজ্জাহীনতা, অশ্লীলতা ও বেহায়াপনা। হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন সমাজকে করে কলুষিত।

আজকের বিশ্বে নারী প্রগতি ও নারীর অধিকারের নামে নারীকে পুরুষদের বিকল্প হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। অথচ সৃষ্টি রহস্যে নর-নারী হলো পরস্পরের পরিপূরক বা সম্পূরক। আল-কুরআন নারীকে তার স্বাভাবিক মর্যাদা দিয়েছে। কিন্তু তথাকথিত প্রগতিবাদীরা নারীকে স্বভাব-প্রকৃতির বিরুদ্ধে পুরুষদের কর্মস্থলে টেনে এনে সমান অধিকারের কথা বলে তাদের কাঁধে দিয়ে বসেছে দ্বিগুণ বোঝা। স্বভাব-প্রকৃতির দেয়া নারীত্বের দায়িত্ব আর তারই সাথে কথিত প্রগতিবাদীদের আরোপিত পুরুষের সমান পুরুষোচিত দায়িত্ব। এতে করে নারীদের প্রতি বাড়তি যুলুমই চাপিয়ে দেয়া হয়েছে মাত্র। প্রকৃতিগতভাবে নারীত্ব ও মাতৃত্বের দায়িত্ব তাদের পালন করতেই হচ্ছে। আবার পুরুষদের কর্মক্ষেত্রে তাদের প্রতিযোগী হয়ে উপার্জনের দায়িত্বও তাদের উপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

সামাজিক শান্তি শৃংখলা মানব চরিত্রের স্বাভাবিক প্রবণতা, সর্বোপরি স্ত্রীলোকদের সুবিধার্থেই পুরুষকে স্ত্রীদের উপর কিছুটা প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। অধিকন্তু তা পালন করা ফরয করেও দেয়া হয়েছে। এর অর্থ অবশ্যই এ নয় যে, পুরুষরা স্ত্রীদের সাথে যথেচ্ছ আচরণ করবে অথবা স্বামীরা স্ত্রীদের ঘরের আসবাবপত্র বা গৃহপালিত জন্তু-জানোয়ারের মত ব্যবহার করবে। বরং পুরুষদের এ বিশেষ মর্যাদাটুকু রাব্বুল আলামীনের পক্ষ থেকে এজন্যেই বরাদ্ধ করা হয়েছে যাতে পৃথিবীর 'জীব পরিবেশ' তথা মানব পরিবেশের সামগ্রিক ভারসাম্য সংরক্ষিত হয়।

প্রসংগত উল্লেখ্য যে, একমাত্র ইসলামই নারীদের যথার্থ মর্যাদা ও অধিকার দিয়েছে। কথাটা এজন্যে প্রশ্নাতীত সত্য যে ইসলাম তথা কুরআন-সুন্নাহ সেই আল্লাহরই দেয়া বিধান, যে আল্লাহ মানুষ সৃষ্টি করেছেন- তাদের নর-নারীতে শ্রেণী বিন্যাস করেছেন। আর আল্লাহর চেয়ে তার সৃষ্টির কল্যাণ করার যোগ্যতা কার আছে?

নারীর সামাজিক মর্যাদা সম্পর্কে কুরআন ও হাদীসে অসংখ্য প্রমাণ রয়েছে। উদাহরণ স্বরূপ আল কুরআনে বলা হয়েছে وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوف তাদের (স্ত্রীদের) সাথে সদাচরণ করে জীবন-যাপন কর। হাদীসে এসেছে خیارکم خياركم لنسائكم “তোমাদের মধ্যে উত্তম সে ব্যক্তি যে তার স্ত্রীর কাছে উত্তম।" اَلْجَنَّةُ تَحْتَ أَقْدَامَ الْأُمَّهَاتِ “বেহেশত মায়েদের পদতলে” ইত্যাদি।

নারীগণের অর্থনৈতিক অধিকার ইসলাম ছাড়া আর কোথাও নেই বলা চলে। ইসলাম নারীকে তারই হাতে সমস্ত মোহরানার টাকা দেয়ার নির্দেশ দিয়েছে। স্ত্রীর চাহিদা মোতাবেক মোহরের অর্থ তাকে দিতে হয়। আর মোহরের পরিমাণ হতে হবে মর্যাদার ভিত্তিতে। টাকা স্ত্রীকেই দিতে হয় আর তাতে স্বামীর কোনো অধিকারই থাকে না। আর তখন থেকে স্ত্রীর ভরণ-পোষণের যাবতীয় দায়-দায়িত্ব স্বামীর উপরই ন্যস্ত। কসমেটিক্স থেকে শুরু করে সমস্ত ব্যয়ভার স্বামীকে বহন করতে হয়। এমনকি স্ত্রীর আয়ের উৎস থাকলেও তার ব্যয়ভার স্বামীর উপরই বর্তায়। তার আয়ের মালিক সেই হবে অথচ তার ব্যয়ভার সম্পূর্ণরূপে বহন করবে স্বামী। পিতা-মাতার সম্পত্তিতে ও স্বামীর সম্পত্তিতেও তার হিস্যা সংরক্ষিত আছে। নারীর এতবড় অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বিশ্বের অন্য কোনো জাতির মধ্যে নেই। মুসলিম মহিলারা ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণেই মতলববাজদের ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে এত সুন্দর খোদায়ী ব্যবস্থা তথা ইসলামী জীবন পদ্ধতির বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করতে দেখা যায়। কতই না ভাল হতো, যদি শিক্ষিতা মহিলারা দ্বীন ইসলাম সম্পর্কে পড়াশুনা করতো।

আজকের সমাজে আল্লাহর দেয়া উপরোক্ত বিশেষ মর্যাদার অপব্যবহার করে পুরুষরা নারীদের উপর যেমন চালাচ্ছে নির্যাতন ও অত্যাচার; তেমনি এ নির্যাতন থেকে নিষ্কৃতির নামে এবং নারী স্বাধীনতার ধুয়া তুলে অবলা নারীদের নামিয়ে আনা হচ্ছে পুরুষদের কর্মস্থলে। নারী মুক্তির আকর্ষণীয় যবনিকার অন্তরালে তাদের গণ্য করা হচ্ছে ভোগ্য পণ্যে বা ভোক্তার দ্রব্যে। মানব ইতিহাসের সামগ্রিক পরিণতির প্রতি লক্ষ্য রেখে এগুতে অক্ষম অসহায় নারী সমাজ অপরিণামদর্শী ও সামগ্রিক কল্যাণ সম্পর্কে অজ্ঞ পণ্ডিতমন্য কতিপয় পুরুষের পাতানো ফাঁদে পা দিয়ে নিজেদের চরম অবমাননা ও লাঞ্ছনা গঞ্জনার হাতে সঁফে দিচ্ছে। আজকের পাশ্চাত্যের নারী সভ্যতার ইতিহাস একথার জ্বলন্ত সাক্ষী। তবুও কি মুক্তিকামী নারী সমাজের বোধোদয় হবে না? অন্যথা অনাগত প্রজন্ম এদের কখনো ক্ষমার চোখে দেখবে না। তাদের আদালতে এদের দেখতে পাওয়া যাবে আসামীর কাঠ গড়ায়।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন, আল্লাহ তা'আলা নারীদের তুলনায় পুরুষদের বিশেষ মর্যাদা ও বৈশিষ্ট্য দিয়েছেন। তাই তাদের (পুরুষদের) অতি ধৈর্য ও সতর্কতা সহকারে চলা উচিত। যদি স্ত্রীর পক্ষ থেকে কতর্ব্য পালনে কোনো প্রকার গাফলতি বা ত্রুটি দেখা যায়, তবে তা সহ্য করে নেবে এবং স্ত্রীদের প্রতি নিজের কর্তব্য পালনে মোটেই অবহেলা করবে না।

পরিশেষে আল্লাহর নিজের বৈশিষ্ট্য প্রসংগে স্বয়ং তাঁরই কথা وَاللَّهُ عَزِيزُ حَكِيمٌ "আল্লাহ মহা পরাক্রমশালী ও মহাজ্ঞানী" বলে ইংগিত করা হয়েছে যে নর-নারীর বৈশিষ্ট্যের তারতম্য ও পুরুষদের কিছুটা অতিরিক্ত মর্যাদাদান কোনো প্রকারের বৈষম্য সৃষ্টি বা পক্ষপাতিত্বজনক নয়; বরং তাঁর অসীম জ্ঞান ও অনুপম ক্ষমতার কারণেই তিনি সৃষ্টিকূলের বৈশিষ্ট্য ও তারতম্য সম্পর্কে সম্যক অবগত আছেন বিধায় যা কল্যাণকর তাই করে থাকেন। সৃষ্টির সার্বিক মঙ্গল কোন্ পথে-তা একমাত্র স্রষ্টাই জানেন। তাই তিনি সেভাবেই সুশৃঙ্খল নীতি নির্ধারণ করে দিয়েছেন।

📘 আল কুরআনে নারী 📄 স্ত্রীকে বর্জন করতে হলে তা করবে সহৃদয়তার সাথে

📄 স্ত্রীকে বর্জন করতে হলে তা করবে সহৃদয়তার সাথে


الطَّلَاقُ مَرْتَنِ من فَإِمْسَاكَ بِمَعْرُوفِ أَوْ تَسْرِيحَ بِإِحْسَان (البقرة : ২২৯)

"তালাক দু'বার। তারপর হয় সোজাসুজি স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেবে, না হয় ন্যায়ভাবে তাকে বিদায় দেবে।"-(সূরা আল বাকারা: ২২৯)

স্ত্রীকে বর্জন করতে হলে তা করবে সহৃদয়তার সাথে

এ সংক্ষিপ্ত আয়াতাংশে আরবের জাহেলী যুগের এক সামাজিক ত্রুটির সংশোধন করা হয়েছে। আরব দেশে এক এক ব্যক্তি নিজ স্ত্রীকে অসংখ্যবার তালাক দিয়ে থাকতো। কোনো স্ত্রীর উপর স্বামী বিরূপ হলে তাকে বার বার তালাক দিয়ে আবার ফেরত নিতো। ফলে এ অসহায় নারীরা না পুরোপুরি স্বামী সংগ পেতো, না তার বন্ধনমুক্ত হয়ে অন্য স্বামী গ্রহণ করতে পারতো। কুরআন মজিদের আলোচ্য আয়াত এ যুলুমের পথই বন্ধ করেছে। এখানে আল-কুরআন স্বামীকে প্রয়োজনে কেবল দু'বার তালাক দেয়ার অধিকার দিয়েছে। তারপর হয় স্ত্রীকে নিয়মানুযায়ী রেখে দেবে, না হয় সহৃদয়তার সাথে তাকে বর্জন করবে।

আল্লামা ইবনে কাসীর তাঁর তাফসীর গ্রন্থে ইবনে জারীরের তাফসীর থেকে একটি বর্ণনার উদ্ধৃতি দিয়েছেন। তাহলো জাহেলী যুগে স্বামীরা স্ত্রীদের যতবার ইচ্ছা ততবার তালাক দিতো এবং ইদ্দত চলাকালীন সময়ে তাদের ফিরিয়ে আনতো। এমনিভাবে রাসূল (স)-এর যামানায় একজন আনসার রাগান্বিত হয়ে তার স্ত্রীকে বলেছিল, আমি তোমাকে একেবারে ছেড়েও দেব না, আবার রাখবও না। মহিলা বললেন, তা কিভাবে? আনসার বললেন, তোমাকে তালাক দেব এবং ইদ্দত শেষ হওয়ার পূর্বে ফিরিয়ে আনবো। আবার তালাক দেব এবং ইদ্দত শেষ হওয়ার আগে ফিরিয়ে নেব। এভাবে করতে থাকবো। মহিলাটি একথা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দরবারে গিয়ে আরয করলো। তারপর কুরআনের উপরোক্ত আয়াত নাযিল হয়। হাদীস বর্ণনাকারী আরও বলেন, তারপর থেকে লোকজন তালাকের ব্যাপারে সতর্ক হয়ে যায় এবং অসংযমী ব্যক্তিরাও সংযমী হয়ে উঠে। এতে করে পুরুষদের এতদিনের বাড়তি অধিকার রহিত হয়ে যায়।

আয়াতে দু' তালাক দেয়ার পর হয় নিয়মানুযায়ী স্ত্রীকে রাখার অথবা সহৃদয়তার সাথে পরিত্যাগ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ দু' তালাক প্রদানের পর স্ত্রীর ইদ্দতের মধ্যে তাকে পুনরায় গ্রহণের অধিকার স্বামীর রয়েছে। কিন্তু স্ত্রীকে পুনরায় গ্রহণ করতে হলে অবশ্যই স্ত্রীর সাথে সদ্ব্যবহার করার ও তার প্রতি অনুগ্রহ প্রদর্শন করার মনোভাব থাকতে হবে। তাকে যন্ত্রণা দেয়ার মনোভাব অবশ্যই পরিহার করতে হবে। আর যদি বাইন তালাক দেয়ার ইচ্ছা থাকে তবে ইদ্দত পূর্ণ করতে দিয়ে তাকে সহৃদয়তার সাথে বর্জন করবে। তাকে পুন বিবাহের সুযোগ দিবে, তার অধিকার হরণ অথবা ক্ষতি সাধন করার জন্যে তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা হারাম।

ইসলামে বিয়ের চুক্তি সম্পাদন করা হয় সারা জীবনের জন্যে। এ চুক্তি যাতে অটুট থাকে তৎ প্রতি অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হয়। কারণ এ সম্পর্ক ছিন্ন করার পরিণাম কেবল স্বামী-স্ত্রী পর্যন্তই সীমাবদ্ধ থাকে না বরং তাতে পরবর্তী বংশ ও সন্তানাদির জীবনও বিপন্ন হয়ে পড়ে। এমনকি অনেক সময় উভয়ের মধ্যে সুদূর প্রসারী ঝগড়া-বিবাদ লেগে যায়, আর তাতে সংশ্লিষ্ট সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে। যেসব কারণে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছিন্নতার সৃষ্টি হয় সেগুলো নিরসনের জন্যে কুরআন-হাদীস সুষ্ঠু ও সুন্দর ব্যবস্থা করেছে। প্রথমতঃ স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক দিন দিন যাতে গাঢ় হয় এবং কখনো ছিন্ন না হয় তৎপ্রতি সতর্ক দৃষ্টি রাখার জন্যে কুরআন ও হাদীস উপদেশ দিয়েছে। দ্বিতীয়তঃ কখনো কোনো কারণে অসহযোগিতা দেখা দিলে পরস্পরকে বুঝাবার ব্যবস্থা করার প্রতি ইসলাম লোকদেরকে উদ্বুদ্ধ করে থাকে। তৃতীয়তঃ সৃষ্ট অসহযোগিতার উপর বেশ সতর্কীকরণ ও ভীতি প্রদর্শন করার উপদেশ দেয়া হয়েছে। চতুর্থতঃ উপরোক্ত পদক্ষেপেও যদি কোনো ফল না হয়, তবে উভয় পক্ষের কয়েক ব্যক্তিকে সালিস সাব্যস্ত করে ব্যাপারটির মীমাংসা করতে হবে বলে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আল কুরআনের নির্দেশ : حَكَمًا مِنْ أَهْلِهِ وَحَكَمًا مِنْ أَهْلِهَا অর্থাৎ স্বামীর পরিবারের মধ্য হতে সালিস ও স্ত্রীর পরিবারের মধ্য হতে সালিস স্থির করে সমাধানের চেষ্টা করা। এখানে উভয়ের পরিবার থেকে সালিস স্থির করার নির্দেশটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, বিষয়টিকে যদি পরিবারের বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়, তাহলে তিক্ততা ও মনের দূরত্ব আরও বেশী বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। পঞ্চমতঃ যদি দুর্ভাগ্য বশতঃ অবস্থা এমন চরম পর্যায়ে পৌঁছে যে সংশোধনের কোনো চেষ্টাই কাজে না লাগে এবং বৈবাহিক সম্পর্কের আকাংখিত ফল লাভের পরিবর্তে উভয়ের মিলেমিশে থাকাও মস্তবড় আযাবের কারণ হয়ে পড়ে। এমতাবস্থায় এ সম্পর্ক ছিন্ন করে দেয়াই উভয় পক্ষের জন্যে শান্তি ও নিরাপত্তার ব্যবস্থা হতে পারে। এ অসহনীয় অবস্থা ও শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি থেকে বাঁচার জন্যেই ইসলামে তালাক ও বিবাহ বিচ্ছেদের বিধান রয়েছে। তালাক হচ্ছে আল্লাহর কাছে নিকৃষ্টতম হালাল কাজ। হাদীসের ঘোষণা হলঃ أَبْغَضُ الْحَلالِ إِلَى اللهِ الطَّلَاقُ অর্থাৎ আল্লাহর নিকট নিকৃষ্টতম হালাল বিষয় হচ্ছে ‘তালাক’।

তালাক দেয়ার শরীয়তসম্মত বিধান হলো বড়জোর দুই তালাক পর্যন্ত দেয়া যাবে। তৃতীয় তালাক দেয়া উচিত হবে না বলে কতিপয় বিশিষ্ট ফকীহ মতামত ব্যক্ত করেছেন। এজন্যেই ইমাম মালেক ও অন্যান্য অনেক ফকীহ তৃতীয় তালাক দেয়ার অনুমতি দেননি। তাঁরা একে তালাকে বেদআত বলেছেন। অবশ্য অন্যান্য ফকীহগণ তিন তহুরে তিন তালাক পৃথক পৃথকভাবে দেয়া জায়েয বলেন। এসব ফকীহ একেই সুন্নাত তালাক বলেছেন।

আল কুরআনে الطَّلَاقُ مَرَّتَانِ তালাক দু’বার বলে পরবর্তী পর্যায়ে বলেছে فَإِمْسَاكُ بِمَعْرُوفٍ أَوْ تَسْرِيحُ بِإِحْسَانٍ অর্থাৎ তৃতীয়বার যদি তালাক দিয়ে দেয় তখন বৈবাহিক সম্পর্ক সম্পূর্ণরূপে ছিন্ন হয়ে যাবে। এবং তা প্রত্যাহার করার কোনো অধিকার থাকবে না। তবে দ্বিতীয় বিবাহ করার পর সেই স্বামী কোনো কারণে তালাক দিয়ে দিলে তখন প্রথম স্বামী তাকে পুনরায় গ্রহণ করতে পারবে। অবশ্য দ্বিতীয় স্বামীর সাথে তার সহবাস হওয়া শর্ত। এটি হচ্ছে তাদের শাস্তি স্বরূপ। আর এ জায়েয কাজটি মূলত হারামের একান্ত নিকটবর্তী।

📘 আল কুরআনে নারী 📄 সম্পর্ক ছিন্ন করার নিয়তে নিজেদের দেয়া কোনো কিছু স্ত্রীদের থেকে ফেরত নেয়া হারাম

📄 সম্পর্ক ছিন্ন করার নিয়তে নিজেদের দেয়া কোনো কিছু স্ত্রীদের থেকে ফেরত নেয়া হারাম


وَلَا يَحِلُّ لكُمْ أَنْ تَأْخُذُوا مِمَّا أَتَيْتُمُوهُنَّ شَيْئًا إِلَّا أَنْ يُخَافَا أَلَّا يُقِيمَا حُدُودَ اللهِ ، فَإِنْ خِفْتُمْ أَلا يُقِيمَا حُدُودَ اللهِ ، فَلَا جُنَاحَ عَلَيْهِمَا فِيْمَا افْتَدَتْ به تِلْكَ حُدُورُ اللَّهِ فَلَا تَعْتَدُوهَا ، وَمَنْ يُتَعَدَّ حُدُودَ اللَّهِ فَأُولَئِكَ هُمُ الظَّلِمُونَ (البقرة : ২২৯)

“আর নিজেদের দেয়া কোনো কিছু স্ত্রীদের থেকে ফিরিয়ে নেয়া তোমাদের জন্যে জায়েয নেই। কিন্তু যে ক্ষেত্রে স্বামী-স্ত্রী উভয়েই এ ব্যাপারে ভয় করে যে, তারা আল্লাহর নির্দেশ বজায় রাখতে পারবে না, তাহলে সে ক্ষেত্রে স্ত্রী যদি বিনিময় স্বরূপ কিছু দিয়ে অব্যাহতি পেতে চায়, তবে উভয়ের কারোই কোনো গুনাহ নেই। এই হলো আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত সীমা। কাজেই একে 'অতিক্রম করো না। যারা আল্লাহর সীমালংঘন করবে তারাই যালিম।” - (সূরা আল বাকারা : ২২৯)

কোনো কোনো অত্যাচারী স্বামী তার স্ত্রীকে রাখার নিয়ত রাখে না। এমতাবস্থায় তাকে তালাকও দেয় না আবার তার অধিকার আদায় করারও চিন্তা করে না। এতে স্ত্রী যখন অতীষ্ঠ হয়ে পড়ে, সেই সুযোগ নিয়ে স্ত্রীর নিকট থেকে কিছু অর্থকড়ি আদায় করার বা মোহর মাফ করিয়ে নেয়ার বা ফেরত নেয়ার দাবী করে বসে। অনেক সময় কলে-কৌশলে স্ত্রীকে দেয়া গহনা বা কাপড়-চোপড় কেড়ে নিয়ে তাকে খালি হাতে বিদায় দেয়। আল কুরআন এ ধরনের কাজকে হারাম ঘোষণা করেছে। ইরশাদ হচ্ছে:

وَلَا يَحِلُّ لكُمْ أَنْ تَأْخُذُوا مِمَّا أَتَيْتُمُوهُنَّ شَيْئًا . “আর তোমাদের স্ত্রীদের দেয়া কোনো কিছু তাদের থেকে ফেরত নেয়া তোমাদের জন্যে হালাল নয়।”

অর্থাৎ তালাকের পরিবর্তে তোমাদের দেয়া অর্থ-সম্পদ বা মোহর ফেরত নেয়া হারাম। অবশ্য একটি ব্যাপারে তা থেকে স্বতন্ত্র ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, যাতে মোহর ফেরত নেয়া বা ক্ষমা করিয়ে নেয়া যেতে পারে। তা হচ্ছে এই যে, যদি স্ত্রী এমন অনুভব করে "মনের গরমিলের কারণে আমি স্বামীর হক আদায় করতে পারিনি" এবং স্বামীও যদি তাই বোঝে, তবে এমতাবস্থায় মোহর ফেরত নেয়া বা তা ক্ষমা করিয়ে নেয়া এবং এর পরিবর্তে তালাক নেয়া জায়েয হবে। -(মাআরেফুল কুরআন)

স্ত্রীদের নিকট থেকে নিজের দেয়া সম্পদের কিছু ফেরত নেয়া জায়েয নেই। কিন্তু যে ক্ষেত্রে স্বামী ও স্ত্রী উভয়ই এ ব্যাপারে ভয় করে যে, তারা আল্লাহর নির্দেশ বজায় রাখতে পারবে না, আর সে ক্ষেত্রে স্ত্রী যদি বিনিময় দিয়ে অব্যাহতি নিয়ে নেয়, তবে এতে কারো পাপ নেই।

অবশ্য স্ত্রী যদি স্বামীর কোনো অপরাধ ছাড়া তার থেকে অব্যাহতি চায়, তবে তাতে গুনাহ রয়েছে। হযরত ইবনে জারীর থেকে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, "স্বামীর বিনা অপরাধে স্ত্রী যদি তার কাছে তালাক প্রার্থনা করে তাহলে জান্নাতের ঘ্রাণও তার নসীব হবে না।" -(ইবনে কাসীর)

হাবীবা বিনতে সহল (রা) সাবিত ইবনে কায়েস (রা)-এর স্ত্রী ছিলেন। কিন্তু সাবিত (রা) ছিলেন অত্যন্ত কুৎসিত ব্যক্তি। তাই হাবীবা (রা) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে স্বামীর ব্যাপারে অভিযোগ করে বললেন, আল্লাহর কসম, আমার যদি আল্লাহর ভয় না থাকতো তাহলে তিনি আমার কাছে আসলেই আমি তার মুখে থু থু মেরে দিতাম। তখন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তোমাকে দেয়া তার বাগানটি কি তাকে ফিরিয়ে দিতে রাজি আছ? তিনি উত্তরে বললেন, হ্যাঁ, রাজি আছি। তিনি বাগানটি তাকে ফিরিয়ে দেন। অতপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের উভয়কে বিচ্ছিন্ন করে দেন। ইসলামের পরিভাষায় এ বিচ্ছিন্নতাকে 'খোলা' বলে। অবশ্য খোলার ব্যাপারে স্বামীর স্ত্রীকে দেয়া বস্তুর চেয়ে বেশী নেয়া জায়েয কিনা সে বিষয়ে ইমামগণের মধ্যে মতপার্থক্য আছে।

অল্প-বেশী, তুচ্ছ-মূল্যবান যাকিছু স্ত্রীর আছে তা সবই গ্রহণ করা যাবে একমাত্র চুলের বেণী ছাড়া। ইমাম আবু হানিফা (র)-এর সহচরবৃন্দের অভিমত হলো, স্ত্রীর দোষে খোলা হয়ে থাকলে স্বামী তার প্রদত্ত সব সম্পদই গ্রহণ করতে পারবে। তার অতিরিক্ত গ্রহণ বৈধ নয়। হ্যাঁ, স্ত্রী স্বেচ্ছায় অতিরিক্ত দান করলে তা জায়েয হবে। পক্ষান্তরে স্বামীর দোষে খোলা হয়ে থাকলে স্বামী কিছুই ফেরত পাবে না। তবে স্ত্রী স্বেচ্ছায় দান করলে তা স্বামীর জন্যে বৈধ। ইমাম আহমদ (র), আতা, সাঈদ ইবনে মুসাইয়্যেব প্রমুখের মতে যে কোনো অবস্থায় স্বামী নিজের দেয়া বস্তুর অতিরিক্ত গ্রহণ করা জায়েয নেই। হযরত আলী (রা) বলেন, খোলা গ্রহণকারী মহিলা থেকে তাকে প্রদত্ত বস্তুর চেয়ে অধিক কিছু গ্রহণ করো না। ইমাম আওযাঈ বলেন, বিচারকগণ স্ত্রীর নিকট থেকে স্বামীর প্রদত্ত বস্তুর অধিক কিছু গ্রহণ করা স্বামীর জন্যে বৈধ মনে করেন না।-(তাফসীরে ইবনে কাসীর)

মোটকথা, মোহরানা, অলংকার ও কাপড় ইত্যাদি যাকিছু স্বামী স্ত্রীকে দিয়েছে, তার কোনো একটি জিনিসও সে ফিরে পেতে পারে না-সে অধিকার তার নেই। কেউ কোনো ব্যক্তিকে উপহার, হেবা ইত্যাদি বাবদ কিছু দিয়ে থাকলে তা পুনরায় ফেরত নেয়া ইসলামের সাধারণ নৈতিক নিয়মের বিপরীত। এরূপ হীন ও নিকৃষ্ট কাজকে হাদীস শরীফে এমন কুকুরের সাথে তুলনা করা হয়েছে, যে নিজের বমি নিজে ভক্ষণ করে। বিশেষত নিজ স্ত্রীকে তালাক দিয়ে বিদায় করার সময় তাকে প্রদত্ত সবকিছু কেড়ে নেয়া স্বামীর পক্ষে বাস্তবিকই অত্যন্ত লজ্জাস্কর কাজ। বরং ইসলাম তো এ চরিত্র শিক্ষা দিয়েছে যে, তালাক দিয়ে বিদায় করার সময় স্ত্রীকে কিছু না কিছু দিয়েই বিদায় করা উচিত।

টিকাঃ
-(তাফহীমুল কুরআন), (মাআরেফুল কুরআন), (ইবনে কাসীর)

📘 আল কুরআনে নারী 📄 যখন তালাক প্রত্যাহারের সুযোগ থাকে না

📄 যখন তালাক প্রত্যাহারের সুযোগ থাকে না


فَإِنْ طَلَّقَهَا فَلَا تَحِلُّ لَهُ مِنْ بَعْدُ حَتَّى تَنْكِحَ زَوْجًا غَيْرَهُ ۖ وَإِنْ طَلَّقَهَا فَلَا جُنَاحَ عَلَيْهِمَا أَنْ يَتَرَاجَعَا إِنْ ظَنَّا أَنْ يُقِيمَا حُدُودَ اللَّهِ ۚ وَتِلْكَ حُدُودُ اللَّهِ يُبَيِّنُهَا لِقَوْمٍ يَعْلَمُونَ ﴿البقرة : ২৩০﴾

"অতপর যদি স্বামী (তৃতীয়) তালাক দিয়ে বসে, তাহলে অন্য স্বামীর ঘর করার পূর্বে সে এই ব্যক্তির জন্যে হালাল হবে না। দ্বিতীয় স্বামী যদি তাকে তালাক দিয়ে দেয় (অথবা মৃত্যুবরণ করে) তাহলে প্রথম স্বামীর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারে। এতে তাদের কোনো গুনাহ হবে না, যদি তাদের আত্মবিশ্বাস থাকে যে, তারা আল্লাহর নির্ধারিত সীমারেখায় থাকতে পারবে। এ হচ্ছে আল্লাহর নির্ধারিত সীমা, যা আল্লাহ বুঝের লোকের জন্যে বর্ণনা করেন।" -(সূরা আল বাকারা : ২৩০)

এ আয়াতটি পূর্ববর্তী আয়াতসমূহেরই শেষাংশ বা ধারাবাহিকতার শেষ সীমা। কেউ তার স্ত্রীকে দুই তালাক দেয়ার পর যদি পুনরায় তৃতীয় তালাক দিয়ে বসে তবে বৈবাহিক বন্ধন সম্পূর্ণরূপে ছিন্ন হয়ে যায়। দ্বিতীয় তালাকের পরে ইদ্দতের মধ্যে প্রত্যাহার করার অথবা ইদ্দত শেষ হওয়ার পর বিবাহ নবায়ন করার যে সুযোগ ছিল, এখন (তৃতীয় তালাকের পর) আর ঐ সুযোগ থাকলো না। কেননা এমতাবস্থায় ধরা যায় যে, স্বামী সবকিছু বুঝে শুনেই স্ত্রীকে তৃতীয় তালাক দিয়েছে। তাই এখন তার শাস্তি হলো তারা উভয়ে একমত হলেও বিবাহের নবায়নও করতে পারবে না। তাদের পুনর্বিবাহের শর্ত হলো স্ত্রী ইদ্দত শেষে অন্য স্বামী গ্রহণ করবে। দ্বিতীয় স্বামীর সাথে সহবাসের পর যদি সেও তাকে তালাক দিয়ে দেয় অথবা সে মারা যায়, তাহলে ইদ্দত শেষ হওয়ার পর প্রথম স্বামীর সাথে পুনরায় বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারবে।

কুরআন ও হাদীসের বাণী এবং সাহাবায়ে কিরাম ও তাবেয়ীগণের কার্যপদ্ধতিতে দেখা যায়, যখন কোনো দম্পতির তালাক ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প থাকে না, তখনই কেবল তালাক দেয়ার পথে এগুবে। আর তখন উত্তম পন্থাই অবলম্বন করবে। তা হচ্ছে এমন তহুরে তালাক দিবে যাতে সহবাস করা হয়নি। এক তালাক দিয়েই ছেড়ে দেবে। ইদ্দত শেষ হলে বিবাহ সম্পর্ক এমনিতেই ছিন্ন হয়ে যাবে। এটাই তালাকের উত্তম পন্থা। আর তারা ভাল মনে করলে ইদ্দতের মধ্যে তালাক প্রত্যাহার করলেই চলবে। ইদ্দত শেষে বিবাহ ভঙ্গ হয়ে থাকলেও তারা ইচ্ছা করলে তা নবায়ন করতে পারে।

কেউ যদি উত্তম পন্থার ভ্রূক্ষেপ না করে ইদ্দতের মধ্যে আরো এক তালাক দিয়ে বসে, তবে সে বিবাহ ছিন্ন করার দ্বিতীয় পর্যায়ে এগিয়ে গেল। এবারও সে পূর্বের মত ইদ্দতের মধ্যে তালাক প্রত্যাহার অথবা ইদ্দত শেষে বিবাহ নবায়ন করতে পারে। অবশ্য দ্বিতীয় পর্যায়ে সম্পর্ক রক্ষার সর্বশেষ স্তরে উপনীত হয়ে গেলো। এখন সে এমন এক সীমারেখায় পদার্পণ করলো যে, আর এক তালাক দিলে তাদের সম্পর্ক চিরতরে ছিন্ন হয়ে যায় এবং স্বামী তার অধিকারের পথ চিরতরে রুদ্ধ করে দিলো।

তালাকের নিকৃষ্ট পন্থা ইসলামে তালাক মূলত একটি অপসন্দনীয় কাজ। জায়েয কাজসমূহের মধ্যে এটি হচ্ছে নিকৃষ্টতম। এতদসত্ত্বেও এছাড়া কোনো উপায় না থাকলে তখন উপরোক্ত উত্তম পন্থায়ই এ কাজ করা যেতে পারে। কিন্তু কেউ যদি এক সাথে তিন তালাক দিয়ে বসে তবে তাতেও তালাক কার্যকর হবে সত্য, তবে তা হচ্ছে সমস্ত উম্মতের দৃষ্টিতে নিকৃষ্ট পন্থা। কেউ কেউ একে নাজায়েযও বলেছেন। এতে তিন তালাকই হয়ে যাবে এবং তালাক প্রত্যাহার তো দূরের কথা বিবাহ নবায়ন করার সুযোগটুকুও আর থাকবে না। মাওলানা আবু যাহেদ সরফরাজ তাঁর "উমদাতুল আসার" গ্রন্থে এ'সাসআলা বিষদভাবে উল্লেখ করেছেন। মাহমুদ ইবনে লবীদের ঘটনা নাসাইর উদ্ধৃতি দিয়ে উল্লেখ করা হয়েছে যে, তিন তালাক এক সাথে দেয়াতে হুজুর খুব অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। এমনকি কোনো কোনো সাহাবী তাকে হত্যার যোগ্য বলেও মনে করেছেন। কিন্তু এতদসত্ত্বেও হুজুর একে প্রত্যাহারযোগ্য তালাক ঘোষণা করার কোনো বর্ণনা কোথায়ও পাওয়া যায়নি।

পুনর্বিবাহের একটি ঘৃণ্যতম ও অভিশপ্ত গন্থা স্ত্রীকে তালাক দেয়ার পর তাকে পুন গ্রহণ করার একটি কঠিন পথ হলো দ্বিতীয় স্বামী ঐ মহিলাকে স্বেচ্ছায় তালাক দেয়ার পর ইদ্দত সমাপান্তে প্রথম স্বামী তাকে পুন বিবাহ করা। শরীয়তের পরিভাষায় যা হাল্লালা বা হীলা নামে পরিচিত। এ ক্ষেত্রে দ্বিতীয় বিবাহ সম্পর্কে কোনো ষড়যন্ত্র কিংবা কোনো পূর্বশর্ত আরোপ সম্পূর্ণ হারাম। কেউ যদি তার তালাক দেয়া স্ত্রীকে পুন হালাল করার উদ্দেশ্যে ষড়যন্ত্র কিংবা পূর্ব প্রস্তুতি সহকারে অথবা তালাক দেয়ার শর্ত আরোপ করে অন্য কারো কাছে বিবাহ দেয় তবে তা সম্পূর্ণ না-জায়েয হবে। তাদের বিবাহ ও তালাক দু'টোই হতে হবে স্বাভাবিক নিয়মে। হাল্লালার জন্যে কেউ বিবাহ করলেও তালাক দিলে উভয়ই গুনাহগার ও অভিশপ্ত হবে। হযরত ওমর (রা) বলেন, যে নারী-পুরুষ হাল্লালার শর্তে বিয়ে করবে আমি এরূপ স্বামী-স্ত্রীকে রজম (পাথর নিক্ষেপ) করে ছাড়বো। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরূপ হাল্লালাকারী ও যার জন্যে হাল্লালা করা হয়েছে উভয়কে কঠোর লা'নত করেছেন। মূলতঃ শর্তারোপ, চাপ প্রয়োগ, ষড়যন্ত্র যে কোনোভাবে হাল্লালার জন্যে বিবাহ দিলে তাকে বিবাহই বলা যাবে না। বরং এতে ব্যভিচারই হবে। তাই এরূপ বিবাহ ও তালাক দ্বারা স্ত্রীলোকটি প্রথম স্বামীর জন্যে কিছুতেই হালাল হবে না।

টিকাঃ
-(মুফতী মুহাম্মদ শফী (র)-মাআরেফুল কুরআন), (সাইয়েদ আবুল আ'লা মওদূদী-তাফহীমুল কুরআন ও মুজীবুল্লাহ নদভী-ইসলামী ফিক্হ)

ফন্ট সাইজ
15px
17px