📄 কেবল লালসাবৃত্তি চরিতার্থই কি স্ত্রী সহবাসের উদ্দেশ্য?
نِسَاءُ كُمْ حَرْثٌ لَّكُم من فَاتُوا حَرْثَكُم أَنَّى شِئْتُمْ وَ وَقَدِّمُوا لِأَنفُسِكُمْ ، وَاتَّقُوا اللَّهَ وَاعْلَمُوا أَنَّكُمْ مُلْقُوهُ ، وَبَشِّرِ المُؤْمِنِينَ (البقرة : ২২৩)
“তোমাদের স্ত্রীগণ তোমাদের জন্যে কৃষি ক্ষেত্র। তাই তোমরা নিজেদের কৃষি ক্ষেত্রে যেভাবে ইচ্ছা গমন করতে পার। তবে নিজেদের জন্যে কিছু যোগাড় করে রাখ। আর আল্লাহকে ভয় কর। জেনে রেখ, তোমাদের অবশ্যই একদিন তাঁর সাথে সাক্ষাত করতে হবে। আর মুমিনদের সুসংবাদ দাও।"-(সূরা আল বাকারা : ২২৩)
স্ত্রী জাতি সৃষ্টির উদ্দেশ্য এ নয় যে, তারা পুরুষদের "বিহার ক্ষেত্র" হিসেবে ব্যবহৃত হবে। বরং দুনিয়ার জীবন-যাপনে নর-নারী হবে পরস্পরের সহযাত্রী। সহাবস্থানের ব্যাপদেশে বৈধ উপায়ে তাদের সংগমের অনুমতি রয়েছে। প্রকৃতিগতভাবে তাদের মাঝে সেই স্পৃহাও রয়েছে। কিন্তু তাই বলে নারীদেরকে পুরুষের যৌন ক্ষুধা মিটানোর জন্যেই সৃষ্টি করা হয়নি, সৃষ্টি করা হয়েছে আল্লাহর পৃথিবীতে মানব বংশ বিস্তার সহ দুনিয়ার জীবন-যাপনে, পুরুষের সহগামী হিসেবে। বরং নর-নারীর পারস্পরিক আকর্ষণ সৃষ্টির পেছনেও সৃষ্টির ক্রমধারা জারী রাখা তথা মানব বংশের বিস্তার সাধন করার উদ্দেশ্য নিহিত রয়েছে। উদ্দেশ্য এ নয় যে, সহবাস বা সংগমের কারণে সন্তান হবে, বরং সন্তান উৎপাদনের মাধ্যম ও প্রসেস হলো স্ত্রীসংগম। যে কারণে আল্লাহ তা'আলা স্ত্রীদেরকে পুরুষদের কৃষিক্ষেত্র বলে স্ত্রী ও পুরুষের মধ্যে ক্ষেত ও কৃষকের সম্পর্ক নির্ধারণ করেছেন।
সুফিয়ান, আবু নাঈম ও ইমাম বুখারী বর্ণনা করেছেন যে, ইবনে মুনকাদির বলেন, আমি হযরত জাবির (রা)-কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, ইয়াহুদীরা বলতো পেছনের দিক থেকে স্ত্রীসংগম করলে সেই সংগমের সন্তান টেরা হয়। এ প্রেক্ষাপটে উপরোক্ত আয়াত অবতীর্ণ হয়। ইবনে জারিজ একটি হাদীস বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (স) বলেছেন, পেছন দিক সন্মুখ দিক—যেদিক থেকেই ইচ্ছা মিলতে পারবে, তবে স্থান হবে যৌনদ্বার বা স্ত্রীলিংগ।
ইমাম আহমদ ও সুনান সংকলকগণ একটি হাদীস উদ্ধৃত করেছেন যে, বাহায ইবনে হাকীমের দাদা রাসূলুল্লাহ (স)-কে জিজ্ঞেস করেন। হে আল্লাহর রাসূল! আমরা আমাদের স্ত্রীর কাছে কিভাবে আসবো? উত্তরে তিনি বললেন, তারা তোমাদের ক্ষেত্র স্বরূপ, তাদেরকে যেভাবে যে দিক থেকে ইচ্ছা ব্যবহার কর। তবে তাদের মুখের উপর মেরো না, গালমন্দ করো না, ক্রোধবশতঃ তাদের থেকে পৃথক হয়ে অন্য ঘরে থেকো না।
আল্লামা ইবনে কাসীর তাঁর বিখ্যাত তাফসীর তাফসীরে ইবনে কাসীরে বহু হাদীস এ প্রসংগে উল্লেখ করেছেন। সবক'টি হাদীসই উপরোক্ত আয়াতের সমর্থক ও ব্যাখ্যা স্বরূপ। অর্থাৎ স্ত্রী সংগম সামনের দিক থেকে ও পেছন দিক থেকে উভয় দিক থেকেই জায়েয; তবে অবশ্যই যৌনদ্বার হতে হবে। তাউস (র) বলেন, জনৈক ব্যক্তি হযরত ইবনে আব্বাস (রা)-কে স্ত্রীদের গুহ্যদ্বার দিয়ে সহবাস করা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, "তুমি কি আমাকে কুফরী সম্পর্কে জিজ্ঞেস করছো?" আল্লামা ইবনে কাসীর এটিকে সহীহ বর্ণনা রূপে লিপিবদ্ধ করেছেন।
হযরত আবু হুরাইরা (রা) বলেন, "রাসূলুল্লাহ (স) বলেছেন, সে ব্যক্তি অভিশপ্ত যে তার স্ত্রীর গুহ্যদ্বার দিয়ে সহবাস করে।"
হযরত আবু হুরাইরা (রা) থেকে আরেকটি হাদীস আল্লামা ইবনে কাসীর (র) তাঁর তাফসীরে উদ্ধৃত করেছেন যে, নবী (স) বলেছেন, "যে ব্যক্তি স্ত্রীদের বা পুরুষদের গুহ্যদ্বার দিয়ে সঙ্গম করে সে কুফরী করে।"
আয়াতের শেষাংশে আছে : وَقَدِّمُوا لَأَنْفُসِكُمْ বিভিন্ন তাফসীরে এর তরজমা হলো: -তোমরা তোমাদের জন্যে কিছু করিও। -(আল কুরআনুল করীম (ইসলামিক ফাউণ্ডেশন) -নিজেদের পরিত্রাণের জন্যে নেক আমল পেশ করতে থাক। -(ইবনে কাসীর) -তোমাদের ভবিষ্যত সম্পর্কে চিন্তা করিও। (তাফহীমুল কুরআন) -নিজেদের জন্যে আগামী দিনের ব্যবস্থা কর। (মাআরেফুল কুরআন)
এ আয়াতাংশের দু'টো অর্থ হতে পারে। এক. নিজের বংশ রক্ষার জন্যে চেষ্টা কর। যেন তোমার মৃত্যুর পর তোমার স্থলাভিষিক্ত বর্তমান থাকে। দুই. নবাগত বংশধরকে তোমার স্থলাভিষিক্ত করতে হলে দ্বীন ইসলাম, নৈতিক চরিত্র তথা মনুষ্যত্বের ভূষণে ভূষিত করার চেষ্টা কর। পরবর্তী আয়াতাংশে সতর্ক করে বলা হয়েছে এ ব্যাপারে যদি ইচ্ছাকৃত অবহেলা ও ত্রুটি দেখাও তবে সে জন্যে অবশ্যই আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে।
টিকাঃ
-(তাফহীমুল কুরআন)
📄 স্ত্রীর সাথে সহবাস না করার কসম করলে
لِلَّذِينَ يُؤْلُونَ مِنْ نِسَائِهِمْ تَرَبُّصُ أَرْبَعَةِ أَشْهُرٍ فَإِنْ فَاؤُ فَإِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رحِيمٌ ، وَإِنْ غَزَمُوا الطَّلَاقَ فَإِنَّ اللهَ سَمِيعٌ عَلِيمٌ ( البقرة : ২২৬-২২৭)
"যারা নিজেদের স্ত্রীর সাথে সম্পর্ক না রাখার প্রতিজ্ঞা (ঈলা) করে বসে, তাদের জন্যে চার মাসের অবকাশ রয়েছে। তারপর তারা যদি মিলমিশ করে নেয় তবে আল্লাহ ক্ষমাশীল ও দয়ালু। আর যদি বর্জন করার সংকল্প করে নেয়, তবে নিশ্চয়ই আল্লাহ শ্রবণকারী ও জ্ঞানী।"
যদি কোনো ব্যক্তি কিছুদিন তার স্ত্রীর সাথে সহবাস না করার কসম করে বসে, তবে সেই কসমকে শরীয়তের পরিভাষায় 'ঈলা' বলা হয়। এ বিচ্ছিন্নতার সময় চার মাসের কম হলে সময় গত হওয়ার অপেক্ষা করবে, স্ত্রীও ধৈর্যধারণ করবে। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার এরূপ সম্পর্ক সুষ্ঠু ও স্বাভাবিক হতে পারে না। তবুও মাঝে মধ্যে এরূপ বিপর্যয় সৃষ্টি হতে পারে। আল্লাহর শরীয়তে এমন বিপর্যয় অপছন্দনীয়। এ ধরনের বিপর্যয়ের জন্যে আল্লাহ তা'আলা চার মাস সময় নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। এ চার মাসের মধ্যে হয় পুনরায় স্বাভাবিক সম্পর্ক পুনস্থাপন করবে। অন্যথা স্বামী-স্ত্রী সম্পর্ক একেবারেই ছিন্ন করবে, যেন বসবাসযোগ্য অন্য কারো সাথে সম্পর্ক স্থাপনের জন্যে অন্যত্র বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারে।
এ আয়াতে প্রতিজ্ঞা বা কসম করার হুকুমের ব্যাপারে ইমামদের মাঝে মতপার্থক্য রয়েছে। হানাফী ও শাফেয়ী মাযহাবের ফকীহদের মতে স্বামী যদি স্ত্রীর সাথে স্বামী-স্ত্রী সম্পর্ক না রাখার প্রতিজ্ঞা করে, কেবল তখনই আলোচ্য আয়াতের প্রয়োগ হবে। আর প্রতিজ্ঞা না করেই যদি স্বামী-স্ত্রী সম্পর্ক ত্যাগ করা হয় তবে এমতাবস্থায় যত কালই অতিবাহিত হোক না কেন, এ আয়াত সেখানে প্রযোজ্য হবে না। কিন্তু মালেকী মাযহাবের শাস্ত্রবিদদের মতে প্রতিজ্ঞা করা হোক আর না-ই হোক, উভয় অবস্থায়ই স্বামী-স্ত্রী সম্পর্ক না রাখার ব্যাপারে এ চার মাস কাল সময়ই চূড়ান্ত ফায়সালার জন্যে নির্দিষ্ট রয়েছে। ইমাম আহমদের একটি মতও এরই সমর্থনে রয়েছে।
হযরত আলী (রা), হযরত আব্বাস (রা) এবং হাসান বসরী (র)-এর মতে এ নির্দেশ কেবল তখনই প্রযোজ্য হবে যদি স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিপর্যয় দেখা দেয়ার কারণে সম্পর্ক ত্যাগ করা হয়ে থাকে। কিন্তু বিশেষ কোনো সদুদ্দেশ্য প্রণোদিত হয়ে যদি স্ত্রীর সাথে দৈহিক সম্পর্ক ছিন্ন করা হয়, অথচ মনের দিক থেকে পরস্পরের মধ্যে হৃদ্যতা, পূর্ণ সম্পর্ক বজায় থাকে; তবে তার জন্যে এ আয়াত প্রযোজ্য হবে না। কিন্তু অন্যান্য ফিক্হ শাস্ত্রবিদদের মতে যে কোনো ধরনের প্রতিজ্ঞা স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক দৈহিক সম্পর্ক ছিন্ন করলে তাকে 'ঈলা' বলা হবে। আর সন্তুষ্টি বা অসন্তুষ্টি যে কোনোভাবেই হোক না কেন, চার মাসের অধিক এরূপ অবস্থা বর্তমান থাকা উচিত হবে না।
ইমাম বুখারী ও মুসলিমের সহীহ হাদীস গ্রন্থদ্বয়ে হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (স) একবার এক মাসের জন্যে 'ঈলা' করেছিলেন এবং উনত্রিশ দিন পরে বলেন, উনত্রিশ দিনেও মাস হয়ে থাকে।
চার মাস সময়ের অধিক সময় ঈলা করলে স্ত্রীর স্বামীর কাছে এ আবেদন করার অধিকার থাকবে যে, হয়ত সে মিলিত হবে, না হয় তালাক দেবে। অতপর বিচারক স্বামীকে দু'টোর মধ্যে একটি পথ গ্রহণ করতে বাধ্য করবে যেন মহিলাকে দুর্ভোগ পোহাতে না হয়।
আয়াতে فَانْ فَاؤُ (তারা যদি মিলে যায়) বলে বুঝানো হয়েছে যে, তারা যদি পূর্বের অবস্থায় ফিরে যায় অর্থাৎ সহবাস করে। ইবনে আব্বাস (রা) মাসরূক (র) সাঈদ ইবনে যোবায়ের প্রমুখ মনীষীগণ এ অর্থই গ্রহণ করেছেন। কোনো কোনো ফিক্হ শাস্ত্রবিদ এর এ অর্থ নিয়েছেন যে, ঐ সময়ের মধ্যে ঐ স্বামী যদি নিজের প্রতিজ্ঞা ভংগ করে এবং পুনরায় স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক স্থাপন করে নেয়; তবে তাকে প্রতিজ্ঞা ভংগের জন্য কাফ্ফারা দিতে হবে না। আল্লাহ এমনিই মাফ করে দেবেন। কিন্তু অধিকাংশ ফিক্হ শাস্ত্রবিদের মতে প্রতিজ্ঞা ভংগের কাফ্ফারা অবশ্যই দিতে হবে। ক্ষমাশীল ও দয়াবান হওয়ার অর্থ এ নয় যে, কাফ্ফারাও মাফ করে দেবেন বরং এর অর্থ আল্লাহ এ কাফ্ফারা কবুল করে নেবেন; আর সম্পর্ক ত্যাগ করার সময় পরস্পরের প্রতি যে বাড়াবাড়ী হয়েছে তা ক্ষমা করে দেবেন।
হযরত উসমান (রা), ইবনে মাসউদ (রা), যায়েদ ইবনে সাবেত (রা) প্রমুখের মতে প্রতিজ্ঞা ভংগের ও পুন সম্পর্ক স্থাপনের সময় চার মাসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এ সময় অতিবাহিত হওয়ার সাথে সাথে তালাক পড়ে যাবে। অর্থাৎ এক তালাক বায়েন হবে, মানে ইদ্দত পালনের সময় স্বামী তাকে পুনরায় গ্রহণ করতে পারবে না। অবশ্য উভয়ের ইচ্ছা থাকলে পুনরায় বিবাহ করতে পারবে। হানাফী মাযহাবের ফকীহগণও এমতই গ্রহণ করেছেন।
📄 স্ত্রীকে তালাক দেয়া : ইদ্দত ও প্রত্যাহারের সময়সীমা
وَالْمُطَلَّقَتُ يَتَرَبَّصْنَ بِأَنْفُسِهِنَّ ثَلَثَةَ قُرُوءٍ، وَلَا يَحِلُّ لَهُنَّ أَنْ يَكْتُمْنَ مَا خَلَقَ اللَّهُ فِي أَرْحَامِهِنَّ إِنْ كُنْ يُؤْمِنَّ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ ، وَبُعُولَتُهُنَّ أَحَقُّ بِرَدِّهِنَّ فِي ذَلِكَ إِنْ أَرَادُوا إِصْلَاحًا - - ( البقرة : ২২৮)
“যেসব নারীকে তালাক দেয়া হয়েছে, তারা তিন হায়েজ পর্যন্ত নিজেদেরকে অপেক্ষায় রাখবে। আর আল্লাহ তাদের গর্ভে যা সৃষ্টি করেছেন, তা যেন তারা গোপন না রাখে- এটা তাদের জন্যে জায়েয নয়, যদি তারা আল্লাহ ও পরকালকে বিশ্বাস করে- তাওহীদ ও আখেরাতে যদি ঈমান থাকে। আর তাঁদের স্বামীদের এ অধিকার আছে যে তারা ইচ্ছা করলে এ অবকাশের মধ্যে সদ্ভাব রাখতে চাইলে নিজ স্ত্রীদের ফিরিয়ে নিতে পারে।" (সূরা আল বাকারা : ২২৮)
স্ত্রীকে তালাক দেয়া: ইদ্দত ও প্রত্যাহারের সময়সীমা
এ আয়াতের নির্দেশের উপর আমল করার ব্যাপারে ফিকহবিদদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। একদল ফকীহর মতে তৃতীয় তালাক থেকে পাক হয়ে গোসল না করা পর্যন্ত বাইন তালাক সংঘটিত হবে না; এবং স্বামী তাকে ফিরিয়ে নিতে পারবে। হযরত আবু বকর (রা), ওমর (রা), আলী (রা), ইবনে আব্বাস (রা) ও ইবনে মাসউদ (রা) হযরত আবু মূসা আশআরী (রা) প্রমুখ বড় বড় সাহাবীদের এটাই মত। হানাফী মাযহাবের ফকীহগণও এ মতই নিয়েছেন। আরেক দলের মতে তৃতীয় হায়েজ আসার সাথে সাথেই তাকে ফিরিয়ে নেয়ার স্বামীর অধিকার বাতিল হয়ে যাবে। হযরত আয়েশা (রা), ইবনে উমর (রা), যায়েদ ইবনে সাবেত (রা) এ মত প্রকাশ করেছেন। শাফেয়ী ও মালেকী মাযহাবের ফকীহগণও এ মতই গ্রহণ করেছেন। এখানে স্মরণ রাখতে হবে এ হুকুম কেবল তখনি প্রযোজ্য হবে যখন স্বামী স্ত্রীকে এক কিংবা দুই তালাক দেয়। কারণ, তিন তালাক দেয়ার পর ফিরিয়ে আনার আর কোনো অধিকার থাকে না।
স্ত্রীর জুরায়ুতে যা কিছু থাকবে তা তাকে অবশ্যই প্রকাশ করতে হবে। এটা তার ঈমানের দাবী। আল্লাহ ও আখিরাতের বিশ্বাসী কেউ আল্লাহর নির্দেশের বিপরীত করতে পারে না। তাই জরায়ুতে গর্ভধারণ অথবা ঋতুস্রাব যাই হোক এসব বিষয়ে গোপন করবে না। কারণ এসব বিষয় গোপন করতে গেলে ইদ্দতের হিসাব ভুল হয়ে যাবে।
আয়াতে إِنَّ أَرَادُوا أَصْلَاحًا (তারা যদি সদ্ভাব রাখার ইচ্ছা করে) বলে একথা বুঝানো হয়েছে যে, তালাকে রাজয়ী হয়ে থাকলে স্বামী স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিতে চাইলে তা হতে হবে সংশোধনের উদ্দেশ্যে। শাস্তি দেয়া, প্রতিশোধ নেয়া, বা জ্বালাতন ও নির্যাতনের উদ্দেশ্যে ফিরিয়ে নেয়া একান্ত গর্হিত কাজ সম্পূর্ণ না-জায়েয। অবশ্য শরীয়ত মতে রাজয়াত (পুনঃ গ্রহণ) হয়ে যাবে কিন্তু নির্যাতনের নিয়তের কারণে অবশ্যই আল্লাহর কাছে গুনাহগার হতে হবে।
মুমিনগণ সর্বদা শরীয়তের সীমারেখার মধ্যে থেকে দুনিয়ার জীবন অতিবাহিত করে থাকে। 'তালাক' দাম্পত্য জীবনের জন্য মারাত্মক শব্দ ও ঘৃণ্য কাজ। সুতরাং এ শব্দ উচ্চারণ ও এ কাজ করার প্রতি অত্যধিক সচেতনতা ঈমানের দাবী। ইসলামী শরীয়তে সবচেয়ে ঘৃণিত কাজ থেকে বিরত থাকা উত্তম।
টিকাঃ
(তাফহীমুল কুরআন)
📄 স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক মর্যাদার মূলনীতি
وَلَهُنَّ مِثْلُ الَّذِي عَلَيْهِنَّ بِالْمَعْرُوفِ ۚ وَلِلرِّجَالِ عَلَيْهِنَّ دَرَজَةٌ ۗ وَاللَّهُ عَزِيزٌ حَكِيمٌ (البقرة : ২২৮)
"আর নারীদের জন্যেও ন্যায়সংগতভাবেই ঠিক সেসব অধিকার রয়েছে যেমন তাদের উপর রয়েছে পুরুষদের অধিকার। অবশ্য তাদের উপর পুরুষদের বিশেষ মর্যাদা রয়েছে। আর আল্লাহ তা'আলা মহাপরাক্রমশালী ও মহাজ্ঞানী।"-(সূরা আল বাকরা : ২২৮)
নারীদের উপর যেমন পুরুষদের অধিকার রয়েছে। তেমনি পুরুষদের উপরও রয়েছে নারীদের অধিকার। আর উভয়কেই উভয়ের অধিকার প্রদান করা একান্ত কর্তব্য। তবে এতটুকু পার্থক্য আছে যে, পুরুষদের মর্যাদা নারীদের তুলনায় কিছুটা অধিক। এ আয়াতে সেই দিকেই ইংগিত করে বলা হয়েছে : وَلِلرِّجَالِ عَلَيْهِنَّ دَرَজَةٌ অর্থাৎ নারীদের তুলনায় পুরুষদের রয়েছে বিশেষ মর্যাদা।
সূরা নিসায় বিষয়টি আরও স্পষ্ট করে বলা হয়েছে। ইরশাদ হচ্ছে : الرِّجَالُ قَوَّامُونَ عَلَى النِّسَاءِ بِمَا فَضَّلَ اللَّهُ بَعْضَهُمْ عَلَىٰ بَعْضٍ وَبِمَا أَنْفَقُوا مِنْ أَمْوَالِهِمْ ۚ -(النساء : ৩৪)
"পুরুষরা নারীদের উপর কর্তৃত্বশীল। কারণ, আল্লাহ তাদের একের উপর অপরকে বিশেষ মর্যাদায় ভূষিত করেছেন এবং এ জন্যে যে পুরুষরা নারীদের পেছনে তাদের সম্পদ ব্যয় করেছে।"
আল কুরআনে সূরা আল বাকারার এ ছোট আয়াতাংশে নর-নারীর দায়িত্ব ও কর্তব্যের বিরাট বিষয়কে তুলে ধরা হয়েছে। এতে নারী-পুরুষের অধিকার সম্পর্কিত মূলনীতি বর্ণনা করা হয়েছে। এখানে উভয়ের অধিকার ও কর্তব্য পালন সমভাবে ওয়াজিব করে দেয়া হয়েছে। অধিকন্তু আয়াতাংশে স্ত্রীলোকদের অধিকারের কথা পুরুষদের অধিকারের পূর্বে বর্ণনা করা হয়েছে। অর্থাৎ পুরুষদের উচিত তারা যেন অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে নারীদের অধিকার প্রদান করে। কারণ, পুরুষ তো নিজের বাহুবলে ও আল্লাহ প্রদত্ত মর্যাদা বলে নারীর কাছ থেকে নিজের অধিকার আদায় করে নেয়। কিন্তু পুরুষদের উচিত নারীদের অধিকারের কথা চিন্তা করা। কেননা সাধারণত নারীরা শক্তি দিয়ে নিজ অধিকার আদায় করতে পারে না।
আল্লাহর বাণীর শব্দাবলী খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। এখানে مُثْل শব্দ দিয়ে স্বামী ও স্ত্রীর কর্তব্য ও অধিকারের সমতার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ উভয়ের প্রতি উভয়ের অধিকার সমান। তাই বলে এর মানে এ নয় যে, উভয়কেই একই ধরনের কাজ করতে হবে এবং তাদের কর্মস্থল অভিন্ন হবে। কারণ প্রকৃতিগতভাবেই তাদেরকে দৈহিক আকৃতি, গঠন, শক্তি ও সামর্থের পার্থক্য করা হয়েছে। যে কারণে তারা সামাজিক ও পারিবারিক কাজে পরস্পরের বিকল্প নয় বরং পরিপূরক বা সম্পূরক।
আল কুরআনে পুরুষদের বিশেষ মর্যাদা দানের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়েছে وَلِلرِّجَالِ عَلَيْهِنَّ دَرَজَةٌ পুরুষদের জন্যে নারীদের তুলনায় বিশেষ মর্যাদা রয়েছে। এখানে পুরুষদেরকে স্ত্রীদের তত্ত্বাবধায়ক ও জিম্মদার ঘোষণা করা হয়েছে। যেমন সূরা আন নিসায় قَوَّামُونَ বলে পুরুষদেরকে কর্তৃত্বশীল বানিয়ে দেয়া হয়েছে। এ তত্ত্বাবধান ও কর্তৃত্ব দান এজন্যে যে, পুরুষদের দৈহিক গঠন ও মানসিকতার সৃষ্টিগত পার্থক্যের দরুন তারা কর্তৃত্ব করারই উপযোগী। তাছাড়া স্ত্রীদের যাবতীয় ভরণ পোষণের দায়িত্ব স্বামীরই উপর বর্তায়। আর স্ত্রীগণ হচ্ছে তাদের সহযোগী মাত্র। আল-কুরআনের ভাষায় স্ত্রীদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যেমন জঘন্য অন্যায় তেমনি তাদের বল্লাহীনভাবে পুরুষদের আওতা মুক্ত করে দেয়াও নিরাপদ নয়। বৈষয়িক জীবনে স্ত্রীদের পুরুষদের সম্পূর্ণ আওতামুক্ত করা নিতান্ত ভয়ের কারণ। এতে করে পৃথিবীতে রক্তপাত, ফিতনা-ফাসাদ ও বিবাদ-বিষম্বাদের সৃষ্টি হয়ে থাকে। আর সমাজে বিস্তার লাভ করে লজ্জাহীনতা, অশ্লীলতা ও বেহায়াপনা। হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন সমাজকে করে কলুষিত।
আজকের বিশ্বে নারী প্রগতি ও নারীর অধিকারের নামে নারীকে পুরুষদের বিকল্প হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। অথচ সৃষ্টি রহস্যে নর-নারী হলো পরস্পরের পরিপূরক বা সম্পূরক। আল-কুরআন নারীকে তার স্বাভাবিক মর্যাদা দিয়েছে। কিন্তু তথাকথিত প্রগতিবাদীরা নারীকে স্বভাব-প্রকৃতির বিরুদ্ধে পুরুষদের কর্মস্থলে টেনে এনে সমান অধিকারের কথা বলে তাদের কাঁধে দিয়ে বসেছে দ্বিগুণ বোঝা। স্বভাব-প্রকৃতির দেয়া নারীত্বের দায়িত্ব আর তারই সাথে কথিত প্রগতিবাদীদের আরোপিত পুরুষের সমান পুরুষোচিত দায়িত্ব। এতে করে নারীদের প্রতি বাড়তি যুলুমই চাপিয়ে দেয়া হয়েছে মাত্র। প্রকৃতিগতভাবে নারীত্ব ও মাতৃত্বের দায়িত্ব তাদের পালন করতেই হচ্ছে। আবার পুরুষদের কর্মক্ষেত্রে তাদের প্রতিযোগী হয়ে উপার্জনের দায়িত্বও তাদের উপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
সামাজিক শান্তি শৃংখলা মানব চরিত্রের স্বাভাবিক প্রবণতা, সর্বোপরি স্ত্রীলোকদের সুবিধার্থেই পুরুষকে স্ত্রীদের উপর কিছুটা প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। অধিকন্তু তা পালন করা ফরয করেও দেয়া হয়েছে। এর অর্থ অবশ্যই এ নয় যে, পুরুষরা স্ত্রীদের সাথে যথেচ্ছ আচরণ করবে অথবা স্বামীরা স্ত্রীদের ঘরের আসবাবপত্র বা গৃহপালিত জন্তু-জানোয়ারের মত ব্যবহার করবে। বরং পুরুষদের এ বিশেষ মর্যাদাটুকু রাব্বুল আলামীনের পক্ষ থেকে এজন্যেই বরাদ্ধ করা হয়েছে যাতে পৃথিবীর 'জীব পরিবেশ' তথা মানব পরিবেশের সামগ্রিক ভারসাম্য সংরক্ষিত হয়।
প্রসংগত উল্লেখ্য যে, একমাত্র ইসলামই নারীদের যথার্থ মর্যাদা ও অধিকার দিয়েছে। কথাটা এজন্যে প্রশ্নাতীত সত্য যে ইসলাম তথা কুরআন-সুন্নাহ সেই আল্লাহরই দেয়া বিধান, যে আল্লাহ মানুষ সৃষ্টি করেছেন- তাদের নর-নারীতে শ্রেণী বিন্যাস করেছেন। আর আল্লাহর চেয়ে তার সৃষ্টির কল্যাণ করার যোগ্যতা কার আছে?
নারীর সামাজিক মর্যাদা সম্পর্কে কুরআন ও হাদীসে অসংখ্য প্রমাণ রয়েছে। উদাহরণ স্বরূপ আল কুরআনে বলা হয়েছে وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوف তাদের (স্ত্রীদের) সাথে সদাচরণ করে জীবন-যাপন কর। হাদীসে এসেছে خیارکم خياركم لنسائكم “তোমাদের মধ্যে উত্তম সে ব্যক্তি যে তার স্ত্রীর কাছে উত্তম।" اَلْجَنَّةُ تَحْتَ أَقْدَامَ الْأُمَّهَاتِ “বেহেশত মায়েদের পদতলে” ইত্যাদি।
নারীগণের অর্থনৈতিক অধিকার ইসলাম ছাড়া আর কোথাও নেই বলা চলে। ইসলাম নারীকে তারই হাতে সমস্ত মোহরানার টাকা দেয়ার নির্দেশ দিয়েছে। স্ত্রীর চাহিদা মোতাবেক মোহরের অর্থ তাকে দিতে হয়। আর মোহরের পরিমাণ হতে হবে মর্যাদার ভিত্তিতে। টাকা স্ত্রীকেই দিতে হয় আর তাতে স্বামীর কোনো অধিকারই থাকে না। আর তখন থেকে স্ত্রীর ভরণ-পোষণের যাবতীয় দায়-দায়িত্ব স্বামীর উপরই ন্যস্ত। কসমেটিক্স থেকে শুরু করে সমস্ত ব্যয়ভার স্বামীকে বহন করতে হয়। এমনকি স্ত্রীর আয়ের উৎস থাকলেও তার ব্যয়ভার স্বামীর উপরই বর্তায়। তার আয়ের মালিক সেই হবে অথচ তার ব্যয়ভার সম্পূর্ণরূপে বহন করবে স্বামী। পিতা-মাতার সম্পত্তিতে ও স্বামীর সম্পত্তিতেও তার হিস্যা সংরক্ষিত আছে। নারীর এতবড় অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বিশ্বের অন্য কোনো জাতির মধ্যে নেই। মুসলিম মহিলারা ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণেই মতলববাজদের ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে এত সুন্দর খোদায়ী ব্যবস্থা তথা ইসলামী জীবন পদ্ধতির বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করতে দেখা যায়। কতই না ভাল হতো, যদি শিক্ষিতা মহিলারা দ্বীন ইসলাম সম্পর্কে পড়াশুনা করতো।
আজকের সমাজে আল্লাহর দেয়া উপরোক্ত বিশেষ মর্যাদার অপব্যবহার করে পুরুষরা নারীদের উপর যেমন চালাচ্ছে নির্যাতন ও অত্যাচার; তেমনি এ নির্যাতন থেকে নিষ্কৃতির নামে এবং নারী স্বাধীনতার ধুয়া তুলে অবলা নারীদের নামিয়ে আনা হচ্ছে পুরুষদের কর্মস্থলে। নারী মুক্তির আকর্ষণীয় যবনিকার অন্তরালে তাদের গণ্য করা হচ্ছে ভোগ্য পণ্যে বা ভোক্তার দ্রব্যে। মানব ইতিহাসের সামগ্রিক পরিণতির প্রতি লক্ষ্য রেখে এগুতে অক্ষম অসহায় নারী সমাজ অপরিণামদর্শী ও সামগ্রিক কল্যাণ সম্পর্কে অজ্ঞ পণ্ডিতমন্য কতিপয় পুরুষের পাতানো ফাঁদে পা দিয়ে নিজেদের চরম অবমাননা ও লাঞ্ছনা গঞ্জনার হাতে সঁফে দিচ্ছে। আজকের পাশ্চাত্যের নারী সভ্যতার ইতিহাস একথার জ্বলন্ত সাক্ষী। তবুও কি মুক্তিকামী নারী সমাজের বোধোদয় হবে না? অন্যথা অনাগত প্রজন্ম এদের কখনো ক্ষমার চোখে দেখবে না। তাদের আদালতে এদের দেখতে পাওয়া যাবে আসামীর কাঠ গড়ায়।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন, আল্লাহ তা'আলা নারীদের তুলনায় পুরুষদের বিশেষ মর্যাদা ও বৈশিষ্ট্য দিয়েছেন। তাই তাদের (পুরুষদের) অতি ধৈর্য ও সতর্কতা সহকারে চলা উচিত। যদি স্ত্রীর পক্ষ থেকে কতর্ব্য পালনে কোনো প্রকার গাফলতি বা ত্রুটি দেখা যায়, তবে তা সহ্য করে নেবে এবং স্ত্রীদের প্রতি নিজের কর্তব্য পালনে মোটেই অবহেলা করবে না।
পরিশেষে আল্লাহর নিজের বৈশিষ্ট্য প্রসংগে স্বয়ং তাঁরই কথা وَاللَّهُ عَزِيزُ حَكِيمٌ "আল্লাহ মহা পরাক্রমশালী ও মহাজ্ঞানী" বলে ইংগিত করা হয়েছে যে নর-নারীর বৈশিষ্ট্যের তারতম্য ও পুরুষদের কিছুটা অতিরিক্ত মর্যাদাদান কোনো প্রকারের বৈষম্য সৃষ্টি বা পক্ষপাতিত্বজনক নয়; বরং তাঁর অসীম জ্ঞান ও অনুপম ক্ষমতার কারণেই তিনি সৃষ্টিকূলের বৈশিষ্ট্য ও তারতম্য সম্পর্কে সম্যক অবগত আছেন বিধায় যা কল্যাণকর তাই করে থাকেন। সৃষ্টির সার্বিক মঙ্গল কোন্ পথে-তা একমাত্র স্রষ্টাই জানেন। তাই তিনি সেভাবেই সুশৃঙ্খল নীতি নির্ধারণ করে দিয়েছেন।