📘 আল কুরআনে নারী 📄 হায়েজ অবস্থায় স্ত্রীর সাথে স্বামীর আচরণ

📄 হায়েজ অবস্থায় স্ত্রীর সাথে স্বামীর আচরণ


وَيَسْأَلُونَكَ عَنِ الْمَحِيضِ قُلْ هُوَ أَذًى فَاعْتَزِلُوا النِّسَاءَ فِي الْمَحِيضِ لَا وَلَا تَقْرَبُوهُنَّ حَتَّى يَطْهُرْنَ ، فَإِذَا تَطَهَّرْنَ فَأْتُوهُنَّ مِنْ حَيْثُ أَمَرَكُمُ اللَّهُ . إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ التَّوَّابِينَ وَيُحِبُّ الْمُتَطَهِّرِينَ (البقرة : ২২২)

"লোকেরা তোমাকে হায়েজ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। বল, তা অপবিত্র ময়লা। সুতরাং তোমরা হায়েজ অবস্থায় স্ত্রীদের সহবাস থেকে দূরে থাক। তারা পবিত্র হওয়ার পূর্বে তাদের (সাথে সহবাস কর না) নিকটে যেও না। যখন তারা পবিত্র হবে তখন আল্লাহর নির্দেশিত স্থানে তাদের কাছে যাও। আল্লাহ তওবাকারী ও পবিত্রতা অবলম্বনকারীদের ভালবাসেন।" -(সূরা আল বাকারা : ২২২)

হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত আছে, ইয়াহুদীরা ঋতুবর্তী স্ত্রীদের তাদের সাথে খেতে দিতো না। এমনকি তাদের সাথে এক ঘরে ঘুমাতোও না। সাহাবায়ে কিরাম এ সম্বন্ধে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করলে উপরোক্ত আয়াত নাযিল হয়। অতপর রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, "তাদের সাথে সঙ্গম ছাড়া সবকিছুই জায়েয।"

সহীহ বুখারী ও মুসলিম শরীফে হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, হায়েজ অবস্থায় আমি হাড় চুষে দিলে তিনিও একই স্থানে মুখ দিয়ে চুষতেন। আমি পানি পান করে রেখে দিলে তিনি পাত্রের একই স্থানে মুখ দিয়ে ঐ পানি পান করতেন।

তিনি আরও বলেন, আমার হায়েজ অবস্থায় হুজুর (স) গোসলের সময় আমাকে তাঁর মাথা ধুয়ে দিতে বলতেন। আমার ঐ অবস্থায় তিনি আমার কোলে হেলান দিয়ে কুরআন শরীফ তিলাওয়াত করতেন।

হাদীস শরীফে এও রয়েছে যে, একদা হুজুর (স) তাঁর কোনো ঋতুবতী স্ত্রীকে মসজিদ থেকে (জানালা দিয়ে) বিছানা এনে দিতে বললেন। তখন তিনি (স) বলেছেন রাসুলুল্লাহ (স) করলে ওজর পেশ বলে ঋতুবতী إِنَّ حَيْضَكَ لَيْسَ بيدك তোমার হায়েজ তো তোমার হাতে নয়।

উপরোক্ত আয়াত ও হাদীসসমূহের বর্ণনায় স্ত্রীদের হায়েজ অবস্থায় স্বামীর ব্যবহার সম্পর্কে বর্ণনা দেয়া হয়েছে। যার মূলকথা অন্যান্য জাতির ন্যায় মুসলিম জাতির স্ত্রীগণ হায়েজ অবস্থায় অস্পৃশ্য হয়ে যায় না। ঐ অবস্থায়ও স্ত্রীরা স্বামীদের সাথে একই বিছানায় শয়ন করতে ও একই পাত্রে খেতে পারে। ইসলাম নারীদের এ প্রাকৃতিক অবস্থায়ও তাদের সাথে স্বাভাবিক ব্যবহার করার রীতি বহাল রেখেছে। অপবিত্রতার কারণে স্ত্রীসংগম করা জায়েয না হলেও তাদের ঐ অবস্থায় অন্যান্য স্বাভাবিক আচার-ব্যবহার বৈধ। এভাবে ইসলাম নারীদের যথার্থ মূল্য ও মর্যাদা দিয়েছে। এখানে উল্লেখ করা যায় পাশ্চাত্যের গবেষকদের নারী সম্পর্কিত মন্তব্যের কথা। তারা ভাবতেন নারীদের আত্মা আছে কিনা? থাকলে তা কি ধরনের? কোন্ জাতীয়? তা কি মানুষের আত্মা?

উক্ত আয়াতের মাঝের অংশে বলা হয়েছে, "যখন তারা পবিত্র হবে তখন আল্লাহর নির্দেশিত স্থানে তাদের কাছে যাও।" অর্থাৎ সহবাস কর। এখানে স্থান বলতে সঙ্গমস্থল অর্থাৎ স্ত্রীলিংগ বুঝানো হয়েছে। স্ত্রীলিংগ ছাড়া অন্য পথে সংগম করলে তা হবে সীমালংঘন জনিত অপরাধ।

হযরত ইবনে আব্বাস (রা) ও অন্যান্যের মতে পায়খানার রাস্তায় রতিক্রিয়া হারাম বলে প্রমাণিত হয়েছে। আজকের পাশ্চাত্যের প্রগতিশীলদের দেশে আইন করে সমকামিতা বৈধ করা হয়েছে। এভাবে তারা রুচী বর্জিত হয়ে পশুত্বের পর্যায়ে অবনত হয়েছে। আর অভূতপূর্ব রোগ বিস্তার লাভের পথ সুগম করছে। তথাকথিত সভ্য জাতির মাঝে এমনি ধরনের অসভ্য আচরণ চলছে।

আয়াতের শেষাংশে বলা হয়েছে: "আল্লাহ তওবাকারী ও পবিত্রতা অবলম্বনকারীদের ভালবাসেন।" এখানে আল্লামা ইবনে কাসীরের মতে তাওবাকারী বলতে গুনাহ বর্জনকারী ও হায়েজ অবস্থায় স্ত্রী সহবাস থেকে বিরত ব্যক্তিকে বুঝানো হয়েছে; আর পবিত্রতা অবলম্বনকারী বলতে আল্লাহর নিষিদ্ধ যাবতীয় নোংরামী ও হায়েজ অবস্থায় স্ত্রীসংগম থেকে বিরত ব্যক্তিকে বুঝানো হয়েছে।

'آذی' -এর দু'টো অর্থ হতে পারে। এক. কষ্ট ও ক্ষতি; দুই. এমন অপবিত্রতা যা মানুষ অপছন্দ করে। হায়েজ অবস্থায় স্ত্রীসহবাস করলে স্বামী-স্ত্রী উভয়ের জন্যেই কষ্টকর, ক্ষতি ও অপবিত্রতা। স্ত্রীর ক্ষতি হলো, হায়েজ জনিত ব্যাথার আঘাত লাগা, ব্যথিত শিরায় আঘাত লাগার কষ্ট, জরায়ুর সংকোচন-সম্প্রসারণ, হায়েজে অনিয়মিতা আর স্বামীর ক্ষতি জরায়ু হতে রক্ত মিশ্রিত জীবানু পুরুষাংগের মধ্যে ঢুকে পড়ে নানা রোগের সৃষ্টি করে থাকে। এসব কারণে হায়েজ অবস্থায় স্ত্রীসংগম নিষেধ করা হয়েছে। উত্তম রূপে পবিত্র হওয়ার পূর্বে স্ত্রীসংগম হারাম করে দিয়ে আল্লাহ তা'আলা নর-নারীকে উপরোক্ত ক্ষতির হাত থেকে রক্ষার ব্যবস্থা করেছেন।

📘 আল কুরআনে নারী 📄 কেবল লালসাবৃত্তি চরিতার্থই কি স্ত্রী সহবাসের উদ্দেশ্য?

📄 কেবল লালসাবৃত্তি চরিতার্থই কি স্ত্রী সহবাসের উদ্দেশ্য?


نِسَاءُ كُمْ حَرْثٌ لَّكُم من فَاتُوا حَرْثَكُم أَنَّى شِئْتُمْ وَ وَقَدِّمُوا لِأَنفُسِكُمْ ، وَاتَّقُوا اللَّهَ وَاعْلَمُوا أَنَّكُمْ مُلْقُوهُ ، وَبَشِّرِ المُؤْمِنِينَ (البقرة : ২২৩)

“তোমাদের স্ত্রীগণ তোমাদের জন্যে কৃষি ক্ষেত্র। তাই তোমরা নিজেদের কৃষি ক্ষেত্রে যেভাবে ইচ্ছা গমন করতে পার। তবে নিজেদের জন্যে কিছু যোগাড় করে রাখ। আর আল্লাহকে ভয় কর। জেনে রেখ, তোমাদের অবশ্যই একদিন তাঁর সাথে সাক্ষাত করতে হবে। আর মুমিনদের সুসংবাদ দাও।"-(সূরা আল বাকারা : ২২৩)

স্ত্রী জাতি সৃষ্টির উদ্দেশ্য এ নয় যে, তারা পুরুষদের "বিহার ক্ষেত্র" হিসেবে ব্যবহৃত হবে। বরং দুনিয়ার জীবন-যাপনে নর-নারী হবে পরস্পরের সহযাত্রী। সহাবস্থানের ব্যাপদেশে বৈধ উপায়ে তাদের সংগমের অনুমতি রয়েছে। প্রকৃতিগতভাবে তাদের মাঝে সেই স্পৃহাও রয়েছে। কিন্তু তাই বলে নারীদেরকে পুরুষের যৌন ক্ষুধা মিটানোর জন্যেই সৃষ্টি করা হয়নি, সৃষ্টি করা হয়েছে আল্লাহর পৃথিবীতে মানব বংশ বিস্তার সহ দুনিয়ার জীবন-যাপনে, পুরুষের সহগামী হিসেবে। বরং নর-নারীর পারস্পরিক আকর্ষণ সৃষ্টির পেছনেও সৃষ্টির ক্রমধারা জারী রাখা তথা মানব বংশের বিস্তার সাধন করার উদ্দেশ্য নিহিত রয়েছে। উদ্দেশ্য এ নয় যে, সহবাস বা সংগমের কারণে সন্তান হবে, বরং সন্তান উৎপাদনের মাধ্যম ও প্রসেস হলো স্ত্রীসংগম। যে কারণে আল্লাহ তা'আলা স্ত্রীদেরকে পুরুষদের কৃষিক্ষেত্র বলে স্ত্রী ও পুরুষের মধ্যে ক্ষেত ও কৃষকের সম্পর্ক নির্ধারণ করেছেন।

সুফিয়ান, আবু নাঈম ও ইমাম বুখারী বর্ণনা করেছেন যে, ইবনে মুনকাদির বলেন, আমি হযরত জাবির (রা)-কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, ইয়াহুদীরা বলতো পেছনের দিক থেকে স্ত্রীসংগম করলে সেই সংগমের সন্তান টেরা হয়। এ প্রেক্ষাপটে উপরোক্ত আয়াত অবতীর্ণ হয়। ইবনে জারিজ একটি হাদীস বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (স) বলেছেন, পেছন দিক সন্মুখ দিক—যেদিক থেকেই ইচ্ছা মিলতে পারবে, তবে স্থান হবে যৌনদ্বার বা স্ত্রীলিংগ।

ইমাম আহমদ ও সুনান সংকলকগণ একটি হাদীস উদ্ধৃত করেছেন যে, বাহায ইবনে হাকীমের দাদা রাসূলুল্লাহ (স)-কে জিজ্ঞেস করেন। হে আল্লাহর রাসূল! আমরা আমাদের স্ত্রীর কাছে কিভাবে আসবো? উত্তরে তিনি বললেন, তারা তোমাদের ক্ষেত্র স্বরূপ, তাদেরকে যেভাবে যে দিক থেকে ইচ্ছা ব্যবহার কর। তবে তাদের মুখের উপর মেরো না, গালমন্দ করো না, ক্রোধবশতঃ তাদের থেকে পৃথক হয়ে অন্য ঘরে থেকো না।

আল্লামা ইবনে কাসীর তাঁর বিখ্যাত তাফসীর তাফসীরে ইবনে কাসীরে বহু হাদীস এ প্রসংগে উল্লেখ করেছেন। সবক'টি হাদীসই উপরোক্ত আয়াতের সমর্থক ও ব্যাখ্যা স্বরূপ। অর্থাৎ স্ত্রী সংগম সামনের দিক থেকে ও পেছন দিক থেকে উভয় দিক থেকেই জায়েয; তবে অবশ্যই যৌনদ্বার হতে হবে। তাউস (র) বলেন, জনৈক ব্যক্তি হযরত ইবনে আব্বাস (রা)-কে স্ত্রীদের গুহ্যদ্বার দিয়ে সহবাস করা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, "তুমি কি আমাকে কুফরী সম্পর্কে জিজ্ঞেস করছো?" আল্লামা ইবনে কাসীর এটিকে সহীহ বর্ণনা রূপে লিপিবদ্ধ করেছেন।

হযরত আবু হুরাইরা (রা) বলেন, "রাসূলুল্লাহ (স) বলেছেন, সে ব্যক্তি অভিশপ্ত যে তার স্ত্রীর গুহ্যদ্বার দিয়ে সহবাস করে।"

হযরত আবু হুরাইরা (রা) থেকে আরেকটি হাদীস আল্লামা ইবনে কাসীর (র) তাঁর তাফসীরে উদ্ধৃত করেছেন যে, নবী (স) বলেছেন, "যে ব্যক্তি স্ত্রীদের বা পুরুষদের গুহ্যদ্বার দিয়ে সঙ্গম করে সে কুফরী করে।"

আয়াতের শেষাংশে আছে : وَقَدِّمُوا لَأَنْفُসِكُمْ বিভিন্ন তাফসীরে এর তরজমা হলো: -তোমরা তোমাদের জন্যে কিছু করিও। -(আল কুরআনুল করীম (ইসলামিক ফাউণ্ডেশন) -নিজেদের পরিত্রাণের জন্যে নেক আমল পেশ করতে থাক। -(ইবনে কাসীর) -তোমাদের ভবিষ্যত সম্পর্কে চিন্তা করিও। (তাফহীমুল কুরআন) -নিজেদের জন্যে আগামী দিনের ব্যবস্থা কর। (মাআরেফুল কুরআন)

এ আয়াতাংশের দু'টো অর্থ হতে পারে। এক. নিজের বংশ রক্ষার জন্যে চেষ্টা কর। যেন তোমার মৃত্যুর পর তোমার স্থলাভিষিক্ত বর্তমান থাকে। দুই. নবাগত বংশধরকে তোমার স্থলাভিষিক্ত করতে হলে দ্বীন ইসলাম, নৈতিক চরিত্র তথা মনুষ্যত্বের ভূষণে ভূষিত করার চেষ্টা কর। পরবর্তী আয়াতাংশে সতর্ক করে বলা হয়েছে এ ব্যাপারে যদি ইচ্ছাকৃত অবহেলা ও ত্রুটি দেখাও তবে সে জন্যে অবশ্যই আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে।

টিকাঃ
-(তাফহীমুল কুরআন)

📘 আল কুরআনে নারী 📄 স্ত্রীর সাথে সহবাস না করার কসম করলে

📄 স্ত্রীর সাথে সহবাস না করার কসম করলে


لِلَّذِينَ يُؤْلُونَ مِنْ نِسَائِهِمْ تَرَبُّصُ أَرْبَعَةِ أَشْهُرٍ فَإِنْ فَاؤُ فَإِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رحِيمٌ ، وَإِنْ غَزَمُوا الطَّلَاقَ فَإِنَّ اللهَ سَمِيعٌ عَلِيمٌ ( البقرة : ২২৬-২২৭)

"যারা নিজেদের স্ত্রীর সাথে সম্পর্ক না রাখার প্রতিজ্ঞা (ঈলা) করে বসে, তাদের জন্যে চার মাসের অবকাশ রয়েছে। তারপর তারা যদি মিলমিশ করে নেয় তবে আল্লাহ ক্ষমাশীল ও দয়ালু। আর যদি বর্জন করার সংকল্প করে নেয়, তবে নিশ্চয়ই আল্লাহ শ্রবণকারী ও জ্ঞানী।"

যদি কোনো ব্যক্তি কিছুদিন তার স্ত্রীর সাথে সহবাস না করার কসম করে বসে, তবে সেই কসমকে শরীয়তের পরিভাষায় 'ঈলা' বলা হয়। এ বিচ্ছিন্নতার সময় চার মাসের কম হলে সময় গত হওয়ার অপেক্ষা করবে, স্ত্রীও ধৈর্যধারণ করবে। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার এরূপ সম্পর্ক সুষ্ঠু ও স্বাভাবিক হতে পারে না। তবুও মাঝে মধ্যে এরূপ বিপর্যয় সৃষ্টি হতে পারে। আল্লাহর শরীয়তে এমন বিপর্যয় অপছন্দনীয়। এ ধরনের বিপর্যয়ের জন্যে আল্লাহ তা'আলা চার মাস সময় নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। এ চার মাসের মধ্যে হয় পুনরায় স্বাভাবিক সম্পর্ক পুনস্থাপন করবে। অন্যথা স্বামী-স্ত্রী সম্পর্ক একেবারেই ছিন্ন করবে, যেন বসবাসযোগ্য অন্য কারো সাথে সম্পর্ক স্থাপনের জন্যে অন্যত্র বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারে।

এ আয়াতে প্রতিজ্ঞা বা কসম করার হুকুমের ব্যাপারে ইমামদের মাঝে মতপার্থক্য রয়েছে। হানাফী ও শাফেয়ী মাযহাবের ফকীহদের মতে স্বামী যদি স্ত্রীর সাথে স্বামী-স্ত্রী সম্পর্ক না রাখার প্রতিজ্ঞা করে, কেবল তখনই আলোচ্য আয়াতের প্রয়োগ হবে। আর প্রতিজ্ঞা না করেই যদি স্বামী-স্ত্রী সম্পর্ক ত্যাগ করা হয় তবে এমতাবস্থায় যত কালই অতিবাহিত হোক না কেন, এ আয়াত সেখানে প্রযোজ্য হবে না। কিন্তু মালেকী মাযহাবের শাস্ত্রবিদদের মতে প্রতিজ্ঞা করা হোক আর না-ই হোক, উভয় অবস্থায়ই স্বামী-স্ত্রী সম্পর্ক না রাখার ব্যাপারে এ চার মাস কাল সময়ই চূড়ান্ত ফায়সালার জন্যে নির্দিষ্ট রয়েছে। ইমাম আহমদের একটি মতও এরই সমর্থনে রয়েছে।

হযরত আলী (রা), হযরত আব্বাস (রা) এবং হাসান বসরী (র)-এর মতে এ নির্দেশ কেবল তখনই প্রযোজ্য হবে যদি স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিপর্যয় দেখা দেয়ার কারণে সম্পর্ক ত্যাগ করা হয়ে থাকে। কিন্তু বিশেষ কোনো সদুদ্দেশ্য প্রণোদিত হয়ে যদি স্ত্রীর সাথে দৈহিক সম্পর্ক ছিন্ন করা হয়, অথচ মনের দিক থেকে পরস্পরের মধ্যে হৃদ্যতা, পূর্ণ সম্পর্ক বজায় থাকে; তবে তার জন্যে এ আয়াত প্রযোজ্য হবে না। কিন্তু অন্যান্য ফিক্হ শাস্ত্রবিদদের মতে যে কোনো ধরনের প্রতিজ্ঞা স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক দৈহিক সম্পর্ক ছিন্ন করলে তাকে 'ঈলা' বলা হবে। আর সন্তুষ্টি বা অসন্তুষ্টি যে কোনোভাবেই হোক না কেন, চার মাসের অধিক এরূপ অবস্থা বর্তমান থাকা উচিত হবে না।

ইমাম বুখারী ও মুসলিমের সহীহ হাদীস গ্রন্থদ্বয়ে হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (স) একবার এক মাসের জন্যে 'ঈলা' করেছিলেন এবং উনত্রিশ দিন পরে বলেন, উনত্রিশ দিনেও মাস হয়ে থাকে।

চার মাস সময়ের অধিক সময় ঈলা করলে স্ত্রীর স্বামীর কাছে এ আবেদন করার অধিকার থাকবে যে, হয়ত সে মিলিত হবে, না হয় তালাক দেবে। অতপর বিচারক স্বামীকে দু'টোর মধ্যে একটি পথ গ্রহণ করতে বাধ্য করবে যেন মহিলাকে দুর্ভোগ পোহাতে না হয়।

আয়াতে فَانْ فَاؤُ (তারা যদি মিলে যায়) বলে বুঝানো হয়েছে যে, তারা যদি পূর্বের অবস্থায় ফিরে যায় অর্থাৎ সহবাস করে। ইবনে আব্বাস (রা) মাসরূক (র) সাঈদ ইবনে যোবায়ের প্রমুখ মনীষীগণ এ অর্থই গ্রহণ করেছেন। কোনো কোনো ফিক্হ শাস্ত্রবিদ এর এ অর্থ নিয়েছেন যে, ঐ সময়ের মধ্যে ঐ স্বামী যদি নিজের প্রতিজ্ঞা ভংগ করে এবং পুনরায় স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক স্থাপন করে নেয়; তবে তাকে প্রতিজ্ঞা ভংগের জন্য কাফ্ফারা দিতে হবে না। আল্লাহ এমনিই মাফ করে দেবেন। কিন্তু অধিকাংশ ফিক্হ শাস্ত্রবিদের মতে প্রতিজ্ঞা ভংগের কাফ্ফারা অবশ্যই দিতে হবে। ক্ষমাশীল ও দয়াবান হওয়ার অর্থ এ নয় যে, কাফ্ফারাও মাফ করে দেবেন বরং এর অর্থ আল্লাহ এ কাফ্ফারা কবুল করে নেবেন; আর সম্পর্ক ত্যাগ করার সময় পরস্পরের প্রতি যে বাড়াবাড়ী হয়েছে তা ক্ষমা করে দেবেন।

হযরত উসমান (রা), ইবনে মাসউদ (রা), যায়েদ ইবনে সাবেত (রা) প্রমুখের মতে প্রতিজ্ঞা ভংগের ও পুন সম্পর্ক স্থাপনের সময় চার মাসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এ সময় অতিবাহিত হওয়ার সাথে সাথে তালাক পড়ে যাবে। অর্থাৎ এক তালাক বায়েন হবে, মানে ইদ্দত পালনের সময় স্বামী তাকে পুনরায় গ্রহণ করতে পারবে না। অবশ্য উভয়ের ইচ্ছা থাকলে পুনরায় বিবাহ করতে পারবে। হানাফী মাযহাবের ফকীহগণও এমতই গ্রহণ করেছেন।

📘 আল কুরআনে নারী 📄 স্ত্রীকে তালাক দেয়া : ইদ্দত ও প্রত্যাহারের সময়সীমা

📄 স্ত্রীকে তালাক দেয়া : ইদ্দত ও প্রত্যাহারের সময়সীমা


وَالْمُطَلَّقَتُ يَتَرَبَّصْنَ بِأَنْفُسِهِنَّ ثَلَثَةَ قُرُوءٍ، وَلَا يَحِلُّ لَهُنَّ أَنْ يَكْتُمْنَ مَا خَلَقَ اللَّهُ فِي أَرْحَامِهِنَّ إِنْ كُنْ يُؤْمِنَّ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ ، وَبُعُولَتُهُنَّ أَحَقُّ بِرَدِّهِنَّ فِي ذَلِكَ إِنْ أَرَادُوا إِصْلَاحًا - - ( البقرة : ২২৮)

“যেসব নারীকে তালাক দেয়া হয়েছে, তারা তিন হায়েজ পর্যন্ত নিজেদেরকে অপেক্ষায় রাখবে। আর আল্লাহ তাদের গর্ভে যা সৃষ্টি করেছেন, তা যেন তারা গোপন না রাখে- এটা তাদের জন্যে জায়েয নয়, যদি তারা আল্লাহ ও পরকালকে বিশ্বাস করে- তাওহীদ ও আখেরাতে যদি ঈমান থাকে। আর তাঁদের স্বামীদের এ অধিকার আছে যে তারা ইচ্ছা করলে এ অবকাশের মধ্যে সদ্ভাব রাখতে চাইলে নিজ স্ত্রীদের ফিরিয়ে নিতে পারে।" (সূরা আল বাকারা : ২২৮)

স্ত্রীকে তালাক দেয়া: ইদ্দত ও প্রত্যাহারের সময়সীমা

এ আয়াতের নির্দেশের উপর আমল করার ব্যাপারে ফিকহবিদদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। একদল ফকীহর মতে তৃতীয় তালাক থেকে পাক হয়ে গোসল না করা পর্যন্ত বাইন তালাক সংঘটিত হবে না; এবং স্বামী তাকে ফিরিয়ে নিতে পারবে। হযরত আবু বকর (রা), ওমর (রা), আলী (রা), ইবনে আব্বাস (রা) ও ইবনে মাসউদ (রা) হযরত আবু মূসা আশআরী (রা) প্রমুখ বড় বড় সাহাবীদের এটাই মত। হানাফী মাযহাবের ফকীহগণও এ মতই নিয়েছেন। আরেক দলের মতে তৃতীয় হায়েজ আসার সাথে সাথেই তাকে ফিরিয়ে নেয়ার স্বামীর অধিকার বাতিল হয়ে যাবে। হযরত আয়েশা (রা), ইবনে উমর (রা), যায়েদ ইবনে সাবেত (রা) এ মত প্রকাশ করেছেন। শাফেয়ী ও মালেকী মাযহাবের ফকীহগণও এ মতই গ্রহণ করেছেন। এখানে স্মরণ রাখতে হবে এ হুকুম কেবল তখনি প্রযোজ্য হবে যখন স্বামী স্ত্রীকে এক কিংবা দুই তালাক দেয়। কারণ, তিন তালাক দেয়ার পর ফিরিয়ে আনার আর কোনো অধিকার থাকে না।

স্ত্রীর জুরায়ুতে যা কিছু থাকবে তা তাকে অবশ্যই প্রকাশ করতে হবে। এটা তার ঈমানের দাবী। আল্লাহ ও আখিরাতের বিশ্বাসী কেউ আল্লাহর নির্দেশের বিপরীত করতে পারে না। তাই জরায়ুতে গর্ভধারণ অথবা ঋতুস্রাব যাই হোক এসব বিষয়ে গোপন করবে না। কারণ এসব বিষয় গোপন করতে গেলে ইদ্দতের হিসাব ভুল হয়ে যাবে।

আয়াতে إِنَّ أَرَادُوا أَصْلَاحًا (তারা যদি সদ্ভাব রাখার ইচ্ছা করে) বলে একথা বুঝানো হয়েছে যে, তালাকে রাজয়ী হয়ে থাকলে স্বামী স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিতে চাইলে তা হতে হবে সংশোধনের উদ্দেশ্যে। শাস্তি দেয়া, প্রতিশোধ নেয়া, বা জ্বালাতন ও নির্যাতনের উদ্দেশ্যে ফিরিয়ে নেয়া একান্ত গর্হিত কাজ সম্পূর্ণ না-জায়েয। অবশ্য শরীয়ত মতে রাজয়াত (পুনঃ গ্রহণ) হয়ে যাবে কিন্তু নির্যাতনের নিয়তের কারণে অবশ্যই আল্লাহর কাছে গুনাহগার হতে হবে।

মুমিনগণ সর্বদা শরীয়তের সীমারেখার মধ্যে থেকে দুনিয়ার জীবন অতিবাহিত করে থাকে। 'তালাক' দাম্পত্য জীবনের জন্য মারাত্মক শব্দ ও ঘৃণ্য কাজ। সুতরাং এ শব্দ উচ্চারণ ও এ কাজ করার প্রতি অত্যধিক সচেতনতা ঈমানের দাবী। ইসলামী শরীয়তে সবচেয়ে ঘৃণিত কাজ থেকে বিরত থাকা উত্তম।

টিকাঃ
(তাফহীমুল কুরআন)

ফন্ট সাইজ
15px
17px