📄 বৈবাহিক সম্পর্ক কি কেবল যৌন সম্পর্ক?
وَلَا تَنكِحُوا المُشْرِكَتِ حَتَّى يُؤْمِنَّ ، وَلَامَةٌ مُؤْمِنَةٌ خَيْرٌ মּِن مُّشْرِكَة ولو اعجبتكُم وَلَا تَنكِحُوا الْمُشْرِكِينَ حَتَّى يُؤْمِنُوا ، وَلَعَبْدُ مُؤْمِنَ خير من مُشرِك وَلَو أَعْجَبَكُم ، أُولئِكَ يَدْعُونَ إِلَى النَّارِ وَاللَّهُ يَدْعُوا إلى الجنة والمغফারة باذنه ، ويُبَيِّنُ ايتهِ لِلنَّاسِ لَعَلَّهُمْ يَتَذَكَّرُونَ
"তোমরা কোনো মুশরিক নারীকে ঈমান না আনা পর্যন্ত বিবাহ করো না। মুশরিক নারী তোমাদের মুগ্ধ করলেও তার চেয়ে ঈমানদার দাসী অনেক উত্তম। তেমনি কোনো মুশরিক পুরুষ ঈমান না আনা পর্যন্ত তোমাদের কন্যাদের তার বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করো না। মুশরিক পুরুষ তোমাদের মুগ্ধ করলেও তার চেয়ে বরং একজন ঈমানদার দাস অনেক ভাল। কারণ তারা (মুশরিকরা) আহ্বান করে জাহান্নামের দিকে আর আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে জান্নাত ও ক্ষমার দিকে আহ্বান করেন। তিনি তাঁর বিধানসমূহ মানুষের জন্যে সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করেন যেন তারা শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে।"-(সূরা আল বাকারা: ২২১)
বৈবাহিক সম্পর্ক কেবল যৌন সম্পর্কই নয় বরং তা এক গভীর সামাজিক, নৈতিক, আধ্যাত্মিক ও তামাদ্দুনিক সম্পর্কও বটে।
আলোচ্য আয়াতে মু'মিন পুরুষ ও স্ত্রীদের জন্যে মুশরিকদের বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করা বা হওয়া হারাম ঘোষণা করা হয়েছে। আহলে কিতাবদের মুশরিকগণ সহ সর্ব প্রকার মুশরিকের সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়েছে। ঈমানদার ও মুশরিক স্বামী-স্ত্রীর প্রভাব পরস্পরের উপর পড়ে থাকে। সেই পরিবারে ঈমান ও কুফরীর একটা জগাখিচুড়ী জীবনধারা দাঁনা বেঁধে উঠতে পারে। এ জাতীয় জীবনধারা মুশরেকী বা কুফরী জীবন বিধানের দৃষ্টিতে আপত্তিজনক নাও হতে পারে; কিন্তু ইসলামী জীবন বিধানের চোখে তা কিছুতেই বরদাশত করার বিষয় নয়। দু'জনের মধ্যে যেই অধিকতর প্রভাবশালী হবে পরিবারের সদস্যগণের উপর তার প্রভাব পড়বে সর্বাধিক। এতে পরবর্তী বংশধরদের জগাখিচুড়ী চরিত্রই প্রকাশ পেয়ে থাকবে। তাছাড়া দু'জন যদি চরমপন্থী হয় তাহলে দাম্পত্য জীবন কলহপূর্ণ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। কোনো প্রকৃত ঈমানদার ব্যক্তি কেবলমাত্র যৌন ভোগ-লালসা চরিতার্থ করার এমন একটি অবাঞ্ছিত পরিস্থিতির উদ্ভব হতে দিতে পারে না। কোনো ঈমানদার ব্যক্তি যদি কখনো কোনো মুশরিকের প্রেমে পড়ে তখন তার ঈমান, তার বংশ-পরিবার এবং নিজের দ্বীন ও চরিত্র রক্ষার জন্যে ব্যক্তিগত হৃদয়াবেগ কুরবানী করাই তার কর্তব্য। কারণ তাদের সাথে এরূপ সম্পর্কের ফলে কুফর ও শিরকের মধ্যে নিমগ্ন হওয়ার সম্ভাবনা থাকে তীব্রভাবে।
মুশরিক মহিলা বা পুরুষ কোনো ঈমানদার পুরুষ বা মহিলার জন্যে উপযুক্ত বা বিবাহযোগ্য হতে পারে না—যতক্ষণ না সে ঈমান আনবে বা মুসলমান হবে। অমুসলিম নারী-পুরুষ যতই দৈহিক বা আর্থিক আকর্ষণ সম্পন্ন হোক না কেন, সে কখনো ঈমানদারদের দাম্পত্য সাথী হতে পারে না। কারণ স্বরূপ কুরআন ঘোষণা করেছে যে, তারা তো জাহান্নামের অগ্নির দিকেই আহ্বান করে থাকে। আর আল্লাহ আহ্বান করেন জান্নাতের দিকে। তাই আল্লাহ চান না যে, কোনো বান্দা-বান্দী অমুসলিম জীবনসাথীর সংস্পর্শে গিয়ে তার প্রেমে পড়ে তাকে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করে অথবা তার বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে নিজেকে আল্লাহর ইচ্ছার বিপরীত পথে পরিচালিত করতে থাকে।
যৌন সম্পর্ক অনেকটা পাশবিক আকর্ষণ। মানব জীবনে যৌন আকর্ষণ আল্লাহর সৃষ্টি কৌশলের একটা বিশেষ দিক মাত্র। পারিবারিক জীবনের ভিত্তি ও মানব বংশ রক্ষার জন্যে আল্লাহ তা'আলা নারী-পুরুষ সৃষ্টি করে তাদের বয়সের একটা সীমা পর্যন্ত যৌন আকর্ষণ দিয়েছেন। পরিবারের ভিত্তি স্থাপন করে মানব সমাজের শৃংখলা আনয়ন করে মানব বংশ বৃদ্ধি করে ও আধ্যাত্মিকতার উন্মেষ ঘটিয়ে পূর্ণ মানবতা হাসিলের জন্যে দাম্পত্য জীবনে নর-নারীর এক সুনিবিড় সম্পর্ক স্থাপনের পেছনে এ যৌন আকর্ষণের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। অনেক সময় আধ্যাত্মিক প্রেম সাধনায় পাশবিক প্রেম প্রাথমিক সোপানের ন্যায় গণ্য হয়ে থাকে। 'ইশকে মাজাযী' থেকে মানুষ 'ইশকে হাকীকীর' স্তরে উপনীত হতে পারে।
সুতরাং যৌন ক্ষুধা নিবৃত্তিই বিবাহের উদ্দেশ্য হতে পারে না। এটা তো যুবক-যুবতীর মনের সাময়িক—সম্পূর্ণ অস্থায়ী অবস্থা মাত্র। স্বামী-স্ত্রীর পূর্ণাঙ্গ সম্পর্কের একটা দিক মাত্র। একটা গুরুত্বপূর্ণ দিক হলেও একমাত্র দিক এটা নয়। এক জোড়া দম্পত্তির পুরো জীবনের সফলতার জন্যে তাদের সার্বিক সহযোগিতা একান্তভাবে কাম্য। কাজেই দু'জনের চিন্তাধারা, মন-মানসিকতা ও আকীদা-বিশ্বাসে সামঞ্জস্য একান্ত অপরিহার্য। কোনো অমুসলিম নারী একজন মুসলিম নরের জন্যে উপযুক্ত নয়, যেমন করে একজন অমুসলিম পুরুষ একজন মুসলিম নারীর সাথী হওয়ার যোগ্য নয়। অমুসলিম নর-নারীর দৈহিক সৌন্দর্য ও আর্থিক সচ্ছলতা এ ক্ষেত্রে মোটেই গণ্য হতে পারে না।
আমাদের সমাজে দেখা যায়, সহশিক্ষার কারণে অনেক স্কুল কলেজের ছাত্র-ছাত্রী যৌন আকর্ষণে পরস্পরকে ভালবেসে মাতা-পিতার প্রতি কলংক লেপন করে ও বেরিয়ে চলে যায়। আর তাদের ঐ সম্পর্ক শেষ পর্যন্ত বিচ্ছিন্নতায় রূপায়িত হতেও দেখা যায়। একটি সমীক্ষা অনুযায়ী দেখা যায় লাভ মেরেজের প্রায় ৭০% শেষ পর্যন্ত বিবাহ বিচ্ছেদের সম্মুখীন হয়। কারণসমূহের মধ্যে প্রধানত এর সাময়িক আকর্ষণ, বাহ্যিক ভালবাসা, আবেগ প্রবণতা, অদূরদর্শিতা এবং সর্বোপরি মাতা-পিতার সদিচ্ছার অভাবই এজন্য দায়ি বলে মনে করা হয়।
বিবাহে মানুষের পুরো দুনিয়ার জীবনের জন্য সাথী নির্বাচন করা হয়ে থাকে। তাই ইসলাম উভয়কে এখতিয়ার দিয়েছে পরস্পরকে দেখে শুনে নেয়ার জন্য। তা ছাড়া বর ও কনের সার্বিক সমতা (কুফু) হওয়ার প্রতি গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে ইসলামে। বিশেষতঃ দীনের ব্যাপারে সতর্কতা অত্যাবশ্যক। আদর্শিক মানসিকতা ও আমলী জিন্দেগীতে বর-কনে যেন অভিন্ন হয়, তৎপ্রতি লক্ষ্য রাখা কর্তব্য।
📄 হায়েজ অবস্থায় স্ত্রীর সাথে স্বামীর আচরণ
وَيَسْأَلُونَكَ عَنِ الْمَحِيضِ قُلْ هُوَ أَذًى فَاعْتَزِلُوا النِّسَاءَ فِي الْمَحِيضِ لَا وَلَا تَقْرَبُوهُنَّ حَتَّى يَطْهُرْنَ ، فَإِذَا تَطَهَّرْنَ فَأْتُوهُنَّ مِنْ حَيْثُ أَمَرَكُمُ اللَّهُ . إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ التَّوَّابِينَ وَيُحِبُّ الْمُتَطَهِّرِينَ (البقرة : ২২২)
"লোকেরা তোমাকে হায়েজ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। বল, তা অপবিত্র ময়লা। সুতরাং তোমরা হায়েজ অবস্থায় স্ত্রীদের সহবাস থেকে দূরে থাক। তারা পবিত্র হওয়ার পূর্বে তাদের (সাথে সহবাস কর না) নিকটে যেও না। যখন তারা পবিত্র হবে তখন আল্লাহর নির্দেশিত স্থানে তাদের কাছে যাও। আল্লাহ তওবাকারী ও পবিত্রতা অবলম্বনকারীদের ভালবাসেন।" -(সূরা আল বাকারা : ২২২)
হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত আছে, ইয়াহুদীরা ঋতুবর্তী স্ত্রীদের তাদের সাথে খেতে দিতো না। এমনকি তাদের সাথে এক ঘরে ঘুমাতোও না। সাহাবায়ে কিরাম এ সম্বন্ধে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করলে উপরোক্ত আয়াত নাযিল হয়। অতপর রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, "তাদের সাথে সঙ্গম ছাড়া সবকিছুই জায়েয।"
সহীহ বুখারী ও মুসলিম শরীফে হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, হায়েজ অবস্থায় আমি হাড় চুষে দিলে তিনিও একই স্থানে মুখ দিয়ে চুষতেন। আমি পানি পান করে রেখে দিলে তিনি পাত্রের একই স্থানে মুখ দিয়ে ঐ পানি পান করতেন।
তিনি আরও বলেন, আমার হায়েজ অবস্থায় হুজুর (স) গোসলের সময় আমাকে তাঁর মাথা ধুয়ে দিতে বলতেন। আমার ঐ অবস্থায় তিনি আমার কোলে হেলান দিয়ে কুরআন শরীফ তিলাওয়াত করতেন।
হাদীস শরীফে এও রয়েছে যে, একদা হুজুর (স) তাঁর কোনো ঋতুবতী স্ত্রীকে মসজিদ থেকে (জানালা দিয়ে) বিছানা এনে দিতে বললেন। তখন তিনি (স) বলেছেন রাসুলুল্লাহ (স) করলে ওজর পেশ বলে ঋতুবতী إِنَّ حَيْضَكَ لَيْسَ بيدك তোমার হায়েজ তো তোমার হাতে নয়।
উপরোক্ত আয়াত ও হাদীসসমূহের বর্ণনায় স্ত্রীদের হায়েজ অবস্থায় স্বামীর ব্যবহার সম্পর্কে বর্ণনা দেয়া হয়েছে। যার মূলকথা অন্যান্য জাতির ন্যায় মুসলিম জাতির স্ত্রীগণ হায়েজ অবস্থায় অস্পৃশ্য হয়ে যায় না। ঐ অবস্থায়ও স্ত্রীরা স্বামীদের সাথে একই বিছানায় শয়ন করতে ও একই পাত্রে খেতে পারে। ইসলাম নারীদের এ প্রাকৃতিক অবস্থায়ও তাদের সাথে স্বাভাবিক ব্যবহার করার রীতি বহাল রেখেছে। অপবিত্রতার কারণে স্ত্রীসংগম করা জায়েয না হলেও তাদের ঐ অবস্থায় অন্যান্য স্বাভাবিক আচার-ব্যবহার বৈধ। এভাবে ইসলাম নারীদের যথার্থ মূল্য ও মর্যাদা দিয়েছে। এখানে উল্লেখ করা যায় পাশ্চাত্যের গবেষকদের নারী সম্পর্কিত মন্তব্যের কথা। তারা ভাবতেন নারীদের আত্মা আছে কিনা? থাকলে তা কি ধরনের? কোন্ জাতীয়? তা কি মানুষের আত্মা?
উক্ত আয়াতের মাঝের অংশে বলা হয়েছে, "যখন তারা পবিত্র হবে তখন আল্লাহর নির্দেশিত স্থানে তাদের কাছে যাও।" অর্থাৎ সহবাস কর। এখানে স্থান বলতে সঙ্গমস্থল অর্থাৎ স্ত্রীলিংগ বুঝানো হয়েছে। স্ত্রীলিংগ ছাড়া অন্য পথে সংগম করলে তা হবে সীমালংঘন জনিত অপরাধ।
হযরত ইবনে আব্বাস (রা) ও অন্যান্যের মতে পায়খানার রাস্তায় রতিক্রিয়া হারাম বলে প্রমাণিত হয়েছে। আজকের পাশ্চাত্যের প্রগতিশীলদের দেশে আইন করে সমকামিতা বৈধ করা হয়েছে। এভাবে তারা রুচী বর্জিত হয়ে পশুত্বের পর্যায়ে অবনত হয়েছে। আর অভূতপূর্ব রোগ বিস্তার লাভের পথ সুগম করছে। তথাকথিত সভ্য জাতির মাঝে এমনি ধরনের অসভ্য আচরণ চলছে।
আয়াতের শেষাংশে বলা হয়েছে: "আল্লাহ তওবাকারী ও পবিত্রতা অবলম্বনকারীদের ভালবাসেন।" এখানে আল্লামা ইবনে কাসীরের মতে তাওবাকারী বলতে গুনাহ বর্জনকারী ও হায়েজ অবস্থায় স্ত্রী সহবাস থেকে বিরত ব্যক্তিকে বুঝানো হয়েছে; আর পবিত্রতা অবলম্বনকারী বলতে আল্লাহর নিষিদ্ধ যাবতীয় নোংরামী ও হায়েজ অবস্থায় স্ত্রীসংগম থেকে বিরত ব্যক্তিকে বুঝানো হয়েছে।
'آذی' -এর দু'টো অর্থ হতে পারে। এক. কষ্ট ও ক্ষতি; দুই. এমন অপবিত্রতা যা মানুষ অপছন্দ করে। হায়েজ অবস্থায় স্ত্রীসহবাস করলে স্বামী-স্ত্রী উভয়ের জন্যেই কষ্টকর, ক্ষতি ও অপবিত্রতা। স্ত্রীর ক্ষতি হলো, হায়েজ জনিত ব্যাথার আঘাত লাগা, ব্যথিত শিরায় আঘাত লাগার কষ্ট, জরায়ুর সংকোচন-সম্প্রসারণ, হায়েজে অনিয়মিতা আর স্বামীর ক্ষতি জরায়ু হতে রক্ত মিশ্রিত জীবানু পুরুষাংগের মধ্যে ঢুকে পড়ে নানা রোগের সৃষ্টি করে থাকে। এসব কারণে হায়েজ অবস্থায় স্ত্রীসংগম নিষেধ করা হয়েছে। উত্তম রূপে পবিত্র হওয়ার পূর্বে স্ত্রীসংগম হারাম করে দিয়ে আল্লাহ তা'আলা নর-নারীকে উপরোক্ত ক্ষতির হাত থেকে রক্ষার ব্যবস্থা করেছেন।
📄 কেবল লালসাবৃত্তি চরিতার্থই কি স্ত্রী সহবাসের উদ্দেশ্য?
نِسَاءُ كُمْ حَرْثٌ لَّكُم من فَاتُوا حَرْثَكُم أَنَّى شِئْتُمْ وَ وَقَدِّمُوا لِأَنفُسِكُمْ ، وَاتَّقُوا اللَّهَ وَاعْلَمُوا أَنَّكُمْ مُلْقُوهُ ، وَبَشِّرِ المُؤْمِنِينَ (البقرة : ২২৩)
“তোমাদের স্ত্রীগণ তোমাদের জন্যে কৃষি ক্ষেত্র। তাই তোমরা নিজেদের কৃষি ক্ষেত্রে যেভাবে ইচ্ছা গমন করতে পার। তবে নিজেদের জন্যে কিছু যোগাড় করে রাখ। আর আল্লাহকে ভয় কর। জেনে রেখ, তোমাদের অবশ্যই একদিন তাঁর সাথে সাক্ষাত করতে হবে। আর মুমিনদের সুসংবাদ দাও।"-(সূরা আল বাকারা : ২২৩)
স্ত্রী জাতি সৃষ্টির উদ্দেশ্য এ নয় যে, তারা পুরুষদের "বিহার ক্ষেত্র" হিসেবে ব্যবহৃত হবে। বরং দুনিয়ার জীবন-যাপনে নর-নারী হবে পরস্পরের সহযাত্রী। সহাবস্থানের ব্যাপদেশে বৈধ উপায়ে তাদের সংগমের অনুমতি রয়েছে। প্রকৃতিগতভাবে তাদের মাঝে সেই স্পৃহাও রয়েছে। কিন্তু তাই বলে নারীদেরকে পুরুষের যৌন ক্ষুধা মিটানোর জন্যেই সৃষ্টি করা হয়নি, সৃষ্টি করা হয়েছে আল্লাহর পৃথিবীতে মানব বংশ বিস্তার সহ দুনিয়ার জীবন-যাপনে, পুরুষের সহগামী হিসেবে। বরং নর-নারীর পারস্পরিক আকর্ষণ সৃষ্টির পেছনেও সৃষ্টির ক্রমধারা জারী রাখা তথা মানব বংশের বিস্তার সাধন করার উদ্দেশ্য নিহিত রয়েছে। উদ্দেশ্য এ নয় যে, সহবাস বা সংগমের কারণে সন্তান হবে, বরং সন্তান উৎপাদনের মাধ্যম ও প্রসেস হলো স্ত্রীসংগম। যে কারণে আল্লাহ তা'আলা স্ত্রীদেরকে পুরুষদের কৃষিক্ষেত্র বলে স্ত্রী ও পুরুষের মধ্যে ক্ষেত ও কৃষকের সম্পর্ক নির্ধারণ করেছেন।
সুফিয়ান, আবু নাঈম ও ইমাম বুখারী বর্ণনা করেছেন যে, ইবনে মুনকাদির বলেন, আমি হযরত জাবির (রা)-কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, ইয়াহুদীরা বলতো পেছনের দিক থেকে স্ত্রীসংগম করলে সেই সংগমের সন্তান টেরা হয়। এ প্রেক্ষাপটে উপরোক্ত আয়াত অবতীর্ণ হয়। ইবনে জারিজ একটি হাদীস বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (স) বলেছেন, পেছন দিক সন্মুখ দিক—যেদিক থেকেই ইচ্ছা মিলতে পারবে, তবে স্থান হবে যৌনদ্বার বা স্ত্রীলিংগ।
ইমাম আহমদ ও সুনান সংকলকগণ একটি হাদীস উদ্ধৃত করেছেন যে, বাহায ইবনে হাকীমের দাদা রাসূলুল্লাহ (স)-কে জিজ্ঞেস করেন। হে আল্লাহর রাসূল! আমরা আমাদের স্ত্রীর কাছে কিভাবে আসবো? উত্তরে তিনি বললেন, তারা তোমাদের ক্ষেত্র স্বরূপ, তাদেরকে যেভাবে যে দিক থেকে ইচ্ছা ব্যবহার কর। তবে তাদের মুখের উপর মেরো না, গালমন্দ করো না, ক্রোধবশতঃ তাদের থেকে পৃথক হয়ে অন্য ঘরে থেকো না।
আল্লামা ইবনে কাসীর তাঁর বিখ্যাত তাফসীর তাফসীরে ইবনে কাসীরে বহু হাদীস এ প্রসংগে উল্লেখ করেছেন। সবক'টি হাদীসই উপরোক্ত আয়াতের সমর্থক ও ব্যাখ্যা স্বরূপ। অর্থাৎ স্ত্রী সংগম সামনের দিক থেকে ও পেছন দিক থেকে উভয় দিক থেকেই জায়েয; তবে অবশ্যই যৌনদ্বার হতে হবে। তাউস (র) বলেন, জনৈক ব্যক্তি হযরত ইবনে আব্বাস (রা)-কে স্ত্রীদের গুহ্যদ্বার দিয়ে সহবাস করা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, "তুমি কি আমাকে কুফরী সম্পর্কে জিজ্ঞেস করছো?" আল্লামা ইবনে কাসীর এটিকে সহীহ বর্ণনা রূপে লিপিবদ্ধ করেছেন।
হযরত আবু হুরাইরা (রা) বলেন, "রাসূলুল্লাহ (স) বলেছেন, সে ব্যক্তি অভিশপ্ত যে তার স্ত্রীর গুহ্যদ্বার দিয়ে সহবাস করে।"
হযরত আবু হুরাইরা (রা) থেকে আরেকটি হাদীস আল্লামা ইবনে কাসীর (র) তাঁর তাফসীরে উদ্ধৃত করেছেন যে, নবী (স) বলেছেন, "যে ব্যক্তি স্ত্রীদের বা পুরুষদের গুহ্যদ্বার দিয়ে সঙ্গম করে সে কুফরী করে।"
আয়াতের শেষাংশে আছে : وَقَدِّمُوا لَأَنْفُসِكُمْ বিভিন্ন তাফসীরে এর তরজমা হলো: -তোমরা তোমাদের জন্যে কিছু করিও। -(আল কুরআনুল করীম (ইসলামিক ফাউণ্ডেশন) -নিজেদের পরিত্রাণের জন্যে নেক আমল পেশ করতে থাক। -(ইবনে কাসীর) -তোমাদের ভবিষ্যত সম্পর্কে চিন্তা করিও। (তাফহীমুল কুরআন) -নিজেদের জন্যে আগামী দিনের ব্যবস্থা কর। (মাআরেফুল কুরআন)
এ আয়াতাংশের দু'টো অর্থ হতে পারে। এক. নিজের বংশ রক্ষার জন্যে চেষ্টা কর। যেন তোমার মৃত্যুর পর তোমার স্থলাভিষিক্ত বর্তমান থাকে। দুই. নবাগত বংশধরকে তোমার স্থলাভিষিক্ত করতে হলে দ্বীন ইসলাম, নৈতিক চরিত্র তথা মনুষ্যত্বের ভূষণে ভূষিত করার চেষ্টা কর। পরবর্তী আয়াতাংশে সতর্ক করে বলা হয়েছে এ ব্যাপারে যদি ইচ্ছাকৃত অবহেলা ও ত্রুটি দেখাও তবে সে জন্যে অবশ্যই আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে।
টিকাঃ
-(তাফহীমুল কুরআন)
📄 স্ত্রীর সাথে সহবাস না করার কসম করলে
لِلَّذِينَ يُؤْلُونَ مِنْ نِسَائِهِمْ تَرَبُّصُ أَرْبَعَةِ أَشْهُرٍ فَإِنْ فَاؤُ فَإِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رحِيمٌ ، وَإِنْ غَزَمُوا الطَّلَاقَ فَإِنَّ اللهَ سَمِيعٌ عَلِيمٌ ( البقرة : ২২৬-২২৭)
"যারা নিজেদের স্ত্রীর সাথে সম্পর্ক না রাখার প্রতিজ্ঞা (ঈলা) করে বসে, তাদের জন্যে চার মাসের অবকাশ রয়েছে। তারপর তারা যদি মিলমিশ করে নেয় তবে আল্লাহ ক্ষমাশীল ও দয়ালু। আর যদি বর্জন করার সংকল্প করে নেয়, তবে নিশ্চয়ই আল্লাহ শ্রবণকারী ও জ্ঞানী।"
যদি কোনো ব্যক্তি কিছুদিন তার স্ত্রীর সাথে সহবাস না করার কসম করে বসে, তবে সেই কসমকে শরীয়তের পরিভাষায় 'ঈলা' বলা হয়। এ বিচ্ছিন্নতার সময় চার মাসের কম হলে সময় গত হওয়ার অপেক্ষা করবে, স্ত্রীও ধৈর্যধারণ করবে। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার এরূপ সম্পর্ক সুষ্ঠু ও স্বাভাবিক হতে পারে না। তবুও মাঝে মধ্যে এরূপ বিপর্যয় সৃষ্টি হতে পারে। আল্লাহর শরীয়তে এমন বিপর্যয় অপছন্দনীয়। এ ধরনের বিপর্যয়ের জন্যে আল্লাহ তা'আলা চার মাস সময় নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। এ চার মাসের মধ্যে হয় পুনরায় স্বাভাবিক সম্পর্ক পুনস্থাপন করবে। অন্যথা স্বামী-স্ত্রী সম্পর্ক একেবারেই ছিন্ন করবে, যেন বসবাসযোগ্য অন্য কারো সাথে সম্পর্ক স্থাপনের জন্যে অন্যত্র বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারে।
এ আয়াতে প্রতিজ্ঞা বা কসম করার হুকুমের ব্যাপারে ইমামদের মাঝে মতপার্থক্য রয়েছে। হানাফী ও শাফেয়ী মাযহাবের ফকীহদের মতে স্বামী যদি স্ত্রীর সাথে স্বামী-স্ত্রী সম্পর্ক না রাখার প্রতিজ্ঞা করে, কেবল তখনই আলোচ্য আয়াতের প্রয়োগ হবে। আর প্রতিজ্ঞা না করেই যদি স্বামী-স্ত্রী সম্পর্ক ত্যাগ করা হয় তবে এমতাবস্থায় যত কালই অতিবাহিত হোক না কেন, এ আয়াত সেখানে প্রযোজ্য হবে না। কিন্তু মালেকী মাযহাবের শাস্ত্রবিদদের মতে প্রতিজ্ঞা করা হোক আর না-ই হোক, উভয় অবস্থায়ই স্বামী-স্ত্রী সম্পর্ক না রাখার ব্যাপারে এ চার মাস কাল সময়ই চূড়ান্ত ফায়সালার জন্যে নির্দিষ্ট রয়েছে। ইমাম আহমদের একটি মতও এরই সমর্থনে রয়েছে।
হযরত আলী (রা), হযরত আব্বাস (রা) এবং হাসান বসরী (র)-এর মতে এ নির্দেশ কেবল তখনই প্রযোজ্য হবে যদি স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিপর্যয় দেখা দেয়ার কারণে সম্পর্ক ত্যাগ করা হয়ে থাকে। কিন্তু বিশেষ কোনো সদুদ্দেশ্য প্রণোদিত হয়ে যদি স্ত্রীর সাথে দৈহিক সম্পর্ক ছিন্ন করা হয়, অথচ মনের দিক থেকে পরস্পরের মধ্যে হৃদ্যতা, পূর্ণ সম্পর্ক বজায় থাকে; তবে তার জন্যে এ আয়াত প্রযোজ্য হবে না। কিন্তু অন্যান্য ফিক্হ শাস্ত্রবিদদের মতে যে কোনো ধরনের প্রতিজ্ঞা স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক দৈহিক সম্পর্ক ছিন্ন করলে তাকে 'ঈলা' বলা হবে। আর সন্তুষ্টি বা অসন্তুষ্টি যে কোনোভাবেই হোক না কেন, চার মাসের অধিক এরূপ অবস্থা বর্তমান থাকা উচিত হবে না।
ইমাম বুখারী ও মুসলিমের সহীহ হাদীস গ্রন্থদ্বয়ে হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (স) একবার এক মাসের জন্যে 'ঈলা' করেছিলেন এবং উনত্রিশ দিন পরে বলেন, উনত্রিশ দিনেও মাস হয়ে থাকে।
চার মাস সময়ের অধিক সময় ঈলা করলে স্ত্রীর স্বামীর কাছে এ আবেদন করার অধিকার থাকবে যে, হয়ত সে মিলিত হবে, না হয় তালাক দেবে। অতপর বিচারক স্বামীকে দু'টোর মধ্যে একটি পথ গ্রহণ করতে বাধ্য করবে যেন মহিলাকে দুর্ভোগ পোহাতে না হয়।
আয়াতে فَانْ فَاؤُ (তারা যদি মিলে যায়) বলে বুঝানো হয়েছে যে, তারা যদি পূর্বের অবস্থায় ফিরে যায় অর্থাৎ সহবাস করে। ইবনে আব্বাস (রা) মাসরূক (র) সাঈদ ইবনে যোবায়ের প্রমুখ মনীষীগণ এ অর্থই গ্রহণ করেছেন। কোনো কোনো ফিক্হ শাস্ত্রবিদ এর এ অর্থ নিয়েছেন যে, ঐ সময়ের মধ্যে ঐ স্বামী যদি নিজের প্রতিজ্ঞা ভংগ করে এবং পুনরায় স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক স্থাপন করে নেয়; তবে তাকে প্রতিজ্ঞা ভংগের জন্য কাফ্ফারা দিতে হবে না। আল্লাহ এমনিই মাফ করে দেবেন। কিন্তু অধিকাংশ ফিক্হ শাস্ত্রবিদের মতে প্রতিজ্ঞা ভংগের কাফ্ফারা অবশ্যই দিতে হবে। ক্ষমাশীল ও দয়াবান হওয়ার অর্থ এ নয় যে, কাফ্ফারাও মাফ করে দেবেন বরং এর অর্থ আল্লাহ এ কাফ্ফারা কবুল করে নেবেন; আর সম্পর্ক ত্যাগ করার সময় পরস্পরের প্রতি যে বাড়াবাড়ী হয়েছে তা ক্ষমা করে দেবেন।
হযরত উসমান (রা), ইবনে মাসউদ (রা), যায়েদ ইবনে সাবেত (রা) প্রমুখের মতে প্রতিজ্ঞা ভংগের ও পুন সম্পর্ক স্থাপনের সময় চার মাসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এ সময় অতিবাহিত হওয়ার সাথে সাথে তালাক পড়ে যাবে। অর্থাৎ এক তালাক বায়েন হবে, মানে ইদ্দত পালনের সময় স্বামী তাকে পুনরায় গ্রহণ করতে পারবে না। অবশ্য উভয়ের ইচ্ছা থাকলে পুনরায় বিবাহ করতে পারবে। হানাফী মাযহাবের ফকীহগণও এমতই গ্রহণ করেছেন।