📄 বন্ধ্যত্ব
বন্ধ্যত্ব হলো সন্তান প্রজননে অক্ষমতা। এ সমস্যা যেমন নারীর ক্ষেত্রে হতে পারে, পুরুষের ক্ষেত্রেও হতে পারে। একটা পরিবারে বন্ধ্যত্ব-সমস্যা দেখা দিলে প্রথমেই নারীর দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করা হয়। এটা অন্যায়। বন্ধ্যত্বের কারণে একটা পরিবার নানাবিধ সমস্যার সম্মুখীন হয়। প্রশান্ত প্রাণবন্ত মন হয়ে উঠে বিষণ্ণ অস্থির। শান্তি-সুখের সংসারে নেমে আসে দুশ্চিন্তা-বিষাদের অন্ধকার। নারী তার সংসার জীবনের অর্থময়তা হারাতে থাকে। পুরুষ তার ভবিষ্যৎ উত্তরাধিকারের অনিশ্চয়তায় ভুগে কর্মস্পৃহা হারাতে থাকে। পারিবারিক জীবনের এ সমস্যা থেকে বাঁচার উপায় কী? এ সংকট মোকাবিলায় আমাদের করণীয় কী?
সমাধান:
১. বিয়ের আগে অবশ্যই ডাক্তারি চেকআপ-এর বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে। পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হতে হবে-ছেলে-মেয়ের কোনো একজন গুরুতর কোনো শারীরিক কিংবা মানসিক রোগে আক্রান্ত কি না?
২. জেনে রাখুন, বন্ধ্যত্ব সমস্যার সম্মুখীন আপনি একাই নন। আপনার পূর্বেও কোনো কোনো নবী-রাসূল ও মহা মনীষী এ সমস্যার শিকার হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে এমনও আছেন, যাঁরা বিয়ে পর্যন্ত করেননি। কিন্তু এ কারণে তো তাঁদের মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব একটুও কমেনি। তাঁদের জীবনের মহৎ লক্ষ্য-উদ্দেশ্য বাধাগ্রস্ত হয়নি। তাহলে আপনি কেন নিজের সাধারণ জীবনযাপনের পথে এ সমস্যাটাকে এত গুরুতর মনে করছেন!
৩. বন্ধ্যত্বের বিষয়টাকে আপনার মন-মানসিকতা থেকে ঝেড়ে ফেলুন। ব্যস্ততা ছাড়া বেশিক্ষণ একাকী থাকা ঠিক নয়। তাহলে যত দুশ্চিন্তা-দুর্ভাবনা আপনার মনে বাসা বাঁধবে। সবসময় কর্মমুখর জীবনযাপন করুন। স্বপ্নবান আশাবাদী ও পরিশ্রমী ব্যক্তিদের সাথে চলুন। জনকল্যাণমূলক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করুন। তা আপনাকে জীবনের সমস্যা-সংকটের কথা ভুলিয়ে সাবলীল প্রাণবন্ত জীবনযাপনে সাহায্য করবে।
৪. কয়েকজন এতিম ও দরিদ্র সন্তানকে নিজ সন্তানের মতো আপন করে নিন। তাদের আদর-যত্ন ও দেখাশোনা করুন। প্রয়োজনের মুহূর্তে তারাই সন্তানের চেয়েও বেশি আপন হয়ে আপনার পাশে দাঁড়াবে।
৫. একটা এতিম সন্তানকে পালক নিন, কিংবা তার ভরণ-পোষণের দায়িত্ব গ্রহণ করুন। এ মহৎ কর্মে যুগপদ দু'টি কল্যাণ নিহিত। প্রথমত, আপনার জীবন সুখ-শান্তিতে ভরে উঠবে। দ্বিতীয়ত, জান্নাতুল ফিরদাউসে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সঙ্গী হওয়ার পরম সৌভাগ্য লাভ করবেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "আমি ও এতিমের দায়িত্ব গ্রহণকারী জান্নাতে এই দু'আঙুলের ন্যায় পাশাপাশি অবস্থান করব। এ কথা বলার পর রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর মধ্যমা ও তর্জনী আঙুল কাছাকাছি করে দেখালেন। দু'টি আঙুলের মধ্যে তিনি সামান্য ফাঁকা রাখলেন।" (বুখারী, ৭/৫৩)
৬. এতিম-অনাথ শিশুদের জন্য অর্থ ব্যয় করাও অনেক ফযিলতপূর্ণ কাজ। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেন: يَسْأَلُونَكَ مَاذَا يُنْفِقُونَ ۖ قُلْ مَا أَنْفَقْتُمْ مِّنْ خَيْرٍ فَلِلْوَالِدَيْنِ وَالْأَقْرَبِينَ وَالْيَتَامَىٰ وَالْمَسَاكِينِ وَابْنِ السَّبِيلِ ۗ وَمَا تَفْعَلُوا مِنْ خَيْرٍ فَإِنَّ اللَّهَ بِهِ عَلِيمٌ ﴿٢١٥﴾ [البقرة : ٢١٥] অর্থ: লোকে আপনাকে জিজ্ঞেস করে (আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য) তারা কী ব্যয় করবে? আপনি বলে দিন, তোমরা যে সম্পদই ব্যয় কর তা পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন, ইয়াতীম, মিসকীন ও মুসাফিরদের জন্য হওয়া চাই। আর তোমরা কল্যাণকর যে কাজই কর আল্লাহ সে সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবগত। (বাকারা, ২: ২১৫)
৭. সন্তান না হওয়ার ইতিবাচক দিকগুলোর কথা চিন্তা করুন। যেমন : সন্তানের ভরণ-পোষণ ও লালন-পালনের ঝক্কি-ঝামেলা থেকে মুক্ত থাকা সম্ভব। সন্তানের নানা রোগ-শোক ও বিপদ-আপদ থেকে আশঙ্কামুক্ত হয়ে নির্ঝঞ্ঝাট জীবনযাপন করার সুযোগ হয়। কারো জীবদ্দশায় যদি নিজ সন্তানের মৃত্যু দেখতে হয়, এর দুর্বিষহ কষ্ট-যন্ত্রণা তাকে আজীবন বয়ে বেড়াতে হয়। কিন্তু যদি সন্তান না থাকে, তাহলে নিজ চোখে সন্তানের অকাল মৃত্যু দেখার জ্বালা সহ্য করতে হয় না। সন্তান যদি কোনো অপরাধ জগতের সাথে জড়িয়ে পড়ে কিংবা কোনো নৈতিক ও চারিত্রিক ভ্রষ্টাচারে লিপ্ত হয়, তাকে সুপথে ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টায় ভুক্তভোগী মা-বাবার জীবন নিঃশেষ হয়ে যায়। নিঃসন্তান হওয়ার ফলে আপনার জীবনে এ ধরনের কোনো আশঙ্কা নেই।
৮. নিজেকে একবার জিজ্ঞেস করুন, কিংবা আপনার চারপাশের সমাজের খোঁজ নিয়ে দেখুন, এমন অনেক লোকের সন্ধান পাবেন, যারা দশটি কিংবা তার কম-বেশি সন্তানের বিরাট পরিবারের কর্তা। সারা জীবন সংসারের ঘানি টেনে, পরিবারের নানান ঝক্কিঝামেলা সামাল দিতে গিয়ে এখন তারা এমন পরিস্থিতির শিকার যে, সর্বান্তকরণে তাদের একটাই কামনা, তারা যদি নিঃসন্তান হতে পারত! এ অবস্থা বিবেচনায় আপনি রবের শোকর আদায় করুন। যে তিনি আপনাকে জীবনের এমন কঠিন পরিস্থিতি থেকে রক্ষা করেছেন।
৯. মনে-প্রাণে সর্বদা এ চিন্তা লালন করুন, আল্লাহ তা'আলার ফায়সালায় প্রকৃত কল্যাণ নিহিত। সন্তান লালন-পালনে, না কি নিঃসন্তান জীবনযাপনে, অসুস্থতায় না কি সুস্থতায়, সচ্ছলতায় না কি দরিদ্রতায়-কীসে আপনার কল্যাণ নিহিত, এ বিষয়ে মহান আল্লাহ তা'আলাই সর্বজ্ঞাত। তাঁর ফায়সালাই সন্তুষ্টচিত্তে গ্রহণ করুন। তিনিই সর্বশ্রেষ্ঠ ফায়সালাকারী।
১০. কিতাব সম্পর্কে হাফেজ ইবনুল কাইয়্যিম জাওযী (রহ.) (৬৯১-৭৫১ হি.)-এর অভিমত শুনুন। তিনি বলেছেন: 'আপনার কিতাবগুলো আপনার চিরস্থায়ী সন্তান।' অর্থাৎ, মৃত্যুর পর সমাজের মধ্যে সন্তানই আপনার প্রতিচ্ছবি হয়ে থাকবে। কালের ব্যবধানে একদিন তারও মৃত্যু হবে। আপনার অবদানও নিঃশেষ হয়ে যাবে। কিন্তু আপনার রচিত বইয়ের কোনো মৃত্যু নেই। তা চিরদিন আপনার অবদান ও সুকীর্তির প্রতিচ্ছবি হয়ে থাকবে। আপনি এমন কোনো উদ্যোগ বাস্তবায়নে সচেষ্ট হোন, মানবকল্যাণে যার অবদান স্থায়ী, দীর্ঘস্থায়ী।
১১. মেধাবী যোগ্য ছাত্র-গড়ার মহৎ উদ্যোগে নিয়োজিত হোন। আপন সন্তানের মতো তাদের দেখাশোনা করুন। ইহকাল ও পরকালের কল্যাণে তারাই আপনার আপন সন্তানের চেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।
১২. বিয়ে করেছেন। একএক করে কয়েক বছর পার হয়ে গেল, কিন্তু সন্তানের দেখা নেই। আশাহত হবেন না। আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হবেন না। এমন অনেকের কথা শুনেছি, বিয়ের দীর্ঘ কয়েক বছর পর এক সময় যখন তারা সন্তানের আশা ছেড়ে দিয়েছে, আল্লাহ তা'আলা তাদের কোল জুড়ে ফুটফুটে সন্তান দান করেছেন। অসুস্থতার পর সুস্থতা, অসচ্ছলতার পর সচ্ছলতা ও দুঃখের পর সুখ-পরিবর্তনের এই চলমান ধারাই হলো জীবন। সুতরাং দীর্ঘকাল সন্তানহীনতার কষ্টের পর সন্তান লাভের সুখ সমাগত।
১৩. এই দু'আটি বেশি বেশি পাঠ করুন: رَبِّ لَا تَذَرْنِي فَرْدًا وَأَنتَ خَيْرُ الْوَارִثِينَ﴾ [الأنبياء: ٨٩] অর্থ: 'হে আমার রব্ব! আমাকে একা রেখ না, আর তুমিই শ্রেষ্ঠ উত্তরাধিকারী।' (আম্বিয়া, ২১: ৮৯) যারা সন্তানহীনতার সম্মুখীন হয়েছেন, এই দু'আটি তাদের জন্য ঐশী সমাধান।
১৪. অবসর ও কাজেকর্মে, ঘরে-বাইরে সর্বদা তাওবা-ইস্তিগফারে মশগুল থাকুন। এই আমলের প্রতিদানে আল্লাহ তা'আলা সন্তান-সন্ততি দান করার ওয়াদা করেছেন: فَقُلْتُ اسْتَغْفِرُوا رَبَّكُمْ إِنَّهُ كَانَ غَفَّارًا * يُرْسِلِ السَّمَاءَ عَلَيْكُمْ مِدْرَارًا * وَيُمْدِدْكُمْ بِأَمْوَالٍ وَبَنِينَ وَيَجْعَلْ لَكُمْ جَنَّتٍ وَيَجْعَلْ لَكُمْ اَنْهُرًا﴾ [نوح: ١٠-١٢] অর্থ: 'আমি তাদেরকে বলেছি, নিজ প্রতিপালকের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর। নিশ্চিতভাবে জেন, তিনি অতিশয় ক্ষমাশীল। তিনি আকাশ থেকে তোমাদের ওপর প্রচুর বৃষ্টি বর্ষণ করবেন এবং তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে উন্নতি দান করবেন এবং তোমাদের জন্য সৃষ্টি করবেন উদ্যান আর তোমাদের জন্য নদ-নদীর ব্যবস্থা করে দিবেন।' (নূহ, ৭১: ১০-১২)
১৫. নিরাশ হবেন না। এখন বন্ধ্যত্ব সমস্যার সমাধানে এবং সন্তান প্রজননের জন্য অনেক উন্নত চিকিৎসা রয়েছে। সুতরাং আপনি এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের শরণাপন্ন হোন এবং আল্লাহর তা'আলার কাছে দু'আ করতে থাকুন। তিনিই সর্বশ্রোতা ও দোয়া কবুলকারী।
পরিশিষ্ট:
নবী যাকারিয়া (আ.) অশীতিপর বৃদ্ধ কিংবা বয়স একশ ছুঁইছুঁই। আপন রবের দরবারে সন্তানহীনতার অনুযোগ করলেন। সিজদায় লুটিয়ে পড়ে কেঁদে যারযার হয়ে দু'আ করলেন: وَرَبِّ لَا تَذَرْنِي فَرْدًا وَانْتَ خَيْرُ الْوَارִثِينَ﴾ [الأنبياء: ٨٩] অর্থ: 'হে আমার রব্ব! আমাকে একা রেখ না, আর তুমিই শ্রেষ্ঠ উত্তরাধিকারী।' (আম্বিয়া, ২১: ৮৯) আল্লাহ তা'আলা তাঁর নবীর দু'আ কবুল করলেন। পড়ন্ত বার্ধক্যে পুত্রসন্তান দান করলেন। তিনি হলেন নবী ইয়াহইয়া (আ.)। পুত্র ইয়াহইয়া (আ.)-কে পেয়ে যাকারিয়া (আ.) আনন্দে আত্মহারা। আপন রবের উদ্দেশ্যে বললেন (পবিত্র কুরআনের ভাষায়): قَالَ رَبِّ إِنِّي وَهَنَ الْعَظْمُ مِنِّي وَاشْتَعَلَ الرَّأْسُ شَيْبًا وَلَمْ أَكُنْ بِدُعَائِكَ رَبِّ شَقِيًّا ) [مريم: ٤] অর্থ: 'সে বলেছিল, হে আমার প্রতিপালক! আমার অস্থিরাজি পর্যন্ত জীর্ণ হয়ে গেছে, মাথা বার্ধক্যজনিত শুভ্রতায় উজ্জ্বলিত হয়ে উঠেছে এবং হে আমার প্রতিপালক! আমি তোমার কাছে প্রার্থনা করে কখনও ব্যর্থকাম হইনি।' (মারইয়াম, ১৯: ৪) আল্লাহ তা'আলার কুদরত এমনই। সবকিছুর ঊর্ধ্বে। সমস্ত বাহ্যিকতার ঊর্ধ্বে। তাই অবস্থা যতই প্রতিকূল হোক, সমস্যা যতই চরম আকার ধারণ করুক, আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হবেন না। আপনার যেকোনো প্রয়োজন, নিবেদন করুন একমাত্র আল্লাহর কাছে। তিনিই দোয়া কবুলকারী।
📄 অসুস্থতা
ভালো-মন্দ, সুখ-দুঃখ, সচ্ছলতা-অসচ্ছলতা ও সুস্থতা-অসুস্থতা-অনুকূল ও প্রতিকূল অবস্থার এই চলমান ধারাই হলো পার্থিব জীবন। সুস্থতার মতো অসুস্থতাও জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ ও অনাকাঙ্ক্ষিত বাস্তবতা। নবী-রাসূলগণের মতো শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি থেকে শুরু করে বর্তমান পৃথিবীর সর্বনিম্নস্তরের লোকটাও এ বাস্তবতার শিকার। সুস্থতার সময় তো মানুষ তার যোগ্যতা-দক্ষতার বড়াই করে। পদমর্যাদা ও প্রভাব-প্রতিপত্তির অহমিকা প্রদর্শন করে। বংশমর্যাদা, অর্থবল, লোকবল তাকে এতটাই মোহিত করে রাখে, চরম অবাধ্যতা ও স্বেচ্ছাচারিতা প্রদর্শনেও সে কোনো কিছুর পরোয়া করে না। কিন্তু যে-ই অসুস্থ হয়, তার আসল দুর্বলতা প্রকাশ পায়। শরীর-স্বাস্থ্য ও মন-মানসিকতায় ভীষণ অসহায়ত্বের ছাপ ফুটে উঠে। অসুস্থতার এ সময়টাতেই মানুষ বুঝতে পারে, সে কত দুর্বল, কত অসহায়!
অসুস্থতার ধরন ভিন্নতায় ব্যক্তি নানা ধরনের প্রতিকূলতার শিকার হয়। সুস্বাদু খাবার-দাবার বিস্বাদ লাগে। আরামের বিশ্রাম হারাম হয়ে যায়। গোটা দেহ নিস্তেজ শক্তিহীন হয়ে পড়ে। মন মানসিকতা তার স্বাভাবিক চঞ্চলতা ও উদ্যমতা হারায়। জীবনের এই প্রতিকূলতাকে আমরা কোন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখব? অসুস্থ অবস্থায় আমাদের করণীয় কী হবে?
সমাধান:
১. আমি আপনাকে সে কথাই বলবো, যা রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: «لا بَأْسَ طَهُورُ إِنْ شَاءَ اللهُ» (صحيح البخاري) অর্থ: 'ভয়ের কিছু নেই। ইনশাআল্লাহ ভালো হয়ে যাবে।' (বুখারী, ৪/২০২) অসুস্থতার কবলে ভেঙ্গে পড়বেন না। জেনে রাখুন, অসুস্থতা অবশ্যই আপনাকে সুস্থতার নিয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দিবে। মন থেকে অহংকার ও দাম্ভিকতার শিকড় উপড়ে ফেলবে। উদাসীনতা দূর করে সচেতনতা বৃদ্ধি করবে।
২. অসুস্থ হলে নিকটজনদের সাথে পরামর্শ করুন এবং আপনার অসুস্থতার বিষয়ে অভিজ্ঞ ডাক্তারের শরণাপন্ন হোন। ডাক্তারের পরামর্শ মোতাবেক উন্নত চিকিৎসা গ্রহণ করুন।
৩. চিকিৎসকের কর্তব্য হলো, রোগীর সাথে সহাস্য বদনে কুশল বিনিময় করা। অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে রোগীর অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা। রোগ যতই গুরুতর হোক, কোনো ধরনের ভয় ও আশঙ্কার প্রকাশ না করে রোগীর কাছে সহজ-স্বাভাবিকভাবে তার রোগের কথা বলা। সঙ্গে সঙ্গে তাকে এ-বলে আশ্বস্ত করা, দুশ্চিন্তার কিছু নেই, ইনশাআল্লাহ, অচিরেই সুস্থ হয়ে যাবেন।
৪. আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান এটা প্রমাণ করেছে যে, রোগীর উঁচু মনোবল ও আরোগ্য লাভের দৃঢ় প্রত্যাশা তার দেহে রোগ-প্রতিরোধ-ক্ষমতা বৃদ্ধি করে এবং দ্রুত আরোগ্য লাভে সহায়তা করে। পক্ষান্তরে, হতাশা ও নিরাশা রোগীর দেহে রোগ-প্রতিরোধ-ক্ষমতাকে দুর্বল করে ফেলে। ফলে তার আরোগ্য লাভও বিলম্বিত হতে থাকে।
৫. মনে রাখবেন, আপনার রোগ যত গুরুতরই হোক-না-কেন, পৃথিবীতে এর চেয়েও জটিল ও ভয়ানক রোগ বিদ্যমান। তাই আপন রবের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করুন এজন্য যে, তিনি আপনাকে তুলনামূলক বড় রোগ থেকে মুক্ত রেখেছেন।
৬. আরেকটি বিষয় মনে রাখবেন, আল্লাহ তা'আলার ফায়সালায় প্রকৃত কল্যাণ নিহিত। বিজ্ঞজনের বাণী: 'অসুস্থতা তোমাকে কত গুনাহ, নাফরমানি ও ভুল-বিচ্যুতি থেকে বিরত রেখেছে।'
৭. আপনি অসুস্থ? তাহলে সুসংবাদ গ্রহণ করুন। অসুস্থতা হলো আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টি লাভের অন্যতম মাধ্যম। কেননা এর মাধ্যমে বান্দার গুনাহ মাফ হয়। আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রতিদান নিশ্চিত হয় এবং আল্লাহ তা'আলার নিকট তার মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। ফযল ইবনে সাহল (রহ.) বলেছেন: রোগ-শোক ও অসুস্থতায় বান্দার জন্য কিছু নিয়ামত রয়েছে। জ্ঞানী ব্যক্তির তা জেনে রাখা উচিত। নিয়ামতগুলো হলো: অসুস্থতার মাধ্যমে বান্দার গুনাহ মাফ হয়। ধৈর্যধারণের প্রতিদান লাভ হয়। অবহেলা উদাসীনতা দূর হয়ে অসুস্থ ব্যক্তির মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি পায়। সুস্থতার নিয়ামতের গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পারে। গুনাহ ও নাফরমানি পরিহার করে তাওবা করার মানসিকতা তৈরি হয়। আল্লাহর রাস্তায় দান-সদকা করার অনুপ্রেরণা জাগে।
৮. দু'টি কল্যাণ লাভের প্রত্যাশায় অসুস্থ অবস্থায় পাঠ্য দু'আগুলো পাঠ করুন। প্রথমটি সুস্থতা লাভ, দ্বিতীয়টি গুনাহমুক্ত হওয়া।
৯. অসুস্থ হলে প্রতিদান লাভের প্রত্যাশায় ধৈর্যধারণ করুন। এর বদৌলতে আল্লাহ তা'আলার দরবারে যে উঁচু মর্তবা লাভ হবে, অনেক নেক আমলের মাধ্যমেও তা অর্জন করা কঠিন। অসুস্থতার মাধ্যমে মূলত আল্লাহ তা'আলা আপনাকে পরীক্ষা করছেন, উঁচু মরতবা লাভ করার এ সুযোগ আপনি কাজে লাগাতে পারেন কি না?
১০. লক্ষ করে দেখুন, আপনি একাই অসুস্থ নন, গোটা বিশ্বে আরও লক্ষ কোটি মানুষ নানা রকম অসুস্থতায় জর্জরিত। তাদের অনেকের আরোগ্য লাভ দীর্ঘ সময়সাপেক্ষ। আর কারো কারো মৃত্যু অনিবার্য। সে তুলনায় আপনার অসুস্থতা নিতান্ত সাধারণ মনে হবে। সুতরাং তাদের কথা চিন্তা করে সান্ত্বনা গ্রহণ করুন।
১১ অসুস্থতার অন্যতম ইতিবাচক দিক হলো, ব্যক্তিকে তা অন্যান্য রোগীদের কথা স্মরণ করিয়ে দেয় এবং তাদের সেবা-শুশ্রূষা করার মানসিকতা তৈরি করে। হাদীসে কুদসীতে বর্ণিত হয়েছে: আবূ হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, কেয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা বলবেন, 'হে আদম সন্তান! আমি অসুস্থ হয়েছিলাম; কিন্তু তুমি আমার সেবা করোনি।' বান্দা বলবে: 'আপনি তো বিশ্বজগতের প্রতিপালক। আর আমি আপনার নগণ্য বান্দা। আমার পক্ষে কীভাবে আপনার সেবা-শুশ্রূষা করা সম্ভব?' আল্লহ তা'আলা বলবেন: 'তোমার কি জানা ছিল না, আমার বান্দা অমুকের ছেলে অমুক অসুস্থ? কিন্তু তুমি তার সেবাযত্ন করনি। তুমি যদি তার সেবাযত্ন করতে, তাহলে তার কাছে আমাকে পেতে।' (মুসলিম, ৪/১৯৯)
১২. দান-সদকা হলো যাবতীয় রোগের প্রতিষেধক এবং জাহান্নামের অগ্নিনির্বাপক। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "دَاوُوا مَرْضَاكُمْ بِالصَّدَقَةِ" অর্থ: দান-সদকার মাধ্যমে তোমরা রোগীদের চিকিৎসা কর।
১৩. আরোগ্য লাভের জন্য অস্থির ত্বরাপ্রবণ হওয়া সমীচীন নয়। এতে হিতে বিপরীত হতে পারে। রোগের মাত্রা আরও বেড়ে যেতে পারে। প্রতিটা রোগই নির্দিষ্ট কিছু কাল স্থায়ী হয়। তাই ধৈর্যধারণ করুন এবং আরোগ্য লাভের প্রত্যাশায় নিয়মিত দু'আ করতে থাকুন। মনে রাখবেন, আরোগ্য দানকারী একমাত্র আল্লাহ তা'আলা। হাসপাতাল, চিকিৎসক ও চিকিৎসা-এগুলো বাহ্যিক উপায় মাত্র। মূর্তিপূজারিদের সামনে ইবরাহিম (আ.) আপন রবের ক্ষমতা ও শক্তিমত্তার কথা বর্ণনা প্রসঙ্গে বলেছেন (পবিত্র কুরআনের ভাষায়): ﴿وَإِذَا مَرِضْتُ فَهُوَ يَشْفِينِ﴾ [الشراء: ٨٠] অর্থ: 'এবং আমি যখন পীড়িত হই, তিনিই আমাকে শেফা দান করেন।' (শুআরা, ২৬: ৮০)
১৪. মনে রাখতে হবে, মানবজাতির আসল ব্যাধি হলো ঈমান ও বিশ্বাসের ব্যাধি। তাই পবিত্র কুরআনে দৈহিক রোগ-ব্যাধির তুলনায় হৃদয় ও আত্মা এবং ঈমান ও বিশ্বাসের ব্যাধির ব্যাপারে অধিক সতর্ক করা হয়েছে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: ﴿فِي قُلُوبِهِمْ مَرَضٌ فَزَادَهُمُ اللَّهُ مَرَضًا وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ هُ بِمَا كَانُوا يَكْذِبُونَ﴾ [البقرة: ١٠] অর্থ: 'তাদের অন্তরে আছে রোগ। আল্লাহ তাদের রোগ আরও বৃদ্ধি করে দিয়েছেন। আর তাদের জন্য যন্ত্রণাময় শাস্তি প্রস্তুত রয়েছে, যেহেতু তারা মিথ্যা বলত।' (বাকারা, ২: ১০)
১৫. জাগতিক জীবন তো দুঃখ-কষ্ট, বিপদ-আপদ, রোগ-ব্যাধি ও দুর্যোগ-দুর্বিপাকে আকীর্ণ। প্রকৃত সুখ-শান্তি ও সমৃদ্ধির জায়গা হলো চিরস্থায়ী জান্নাত। তাই ইহজীবনের বাস্তবতা মেনে ধৈর্যধারণ করা এবং আল্লাহ তা'আলার আনুগত্যে মশগুল থাকাই শ্রেয়। এর মাধ্যমেই পরকালের সফলতা ও জান্নাতের পথ সুগম হবে।
১৬. আমি এক ব্যক্তিকে চিনি। তরুণ বয়সে জটিল এক রোগে আক্রান্ত হয়ে কাঁধ থেকে তার বাঁ হাত কেটে ফেলতে হয়েছিল। এখন সে পরিবার, সন্তান নিয়ে বেশ সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যে বেঁচে আছে। পেশায় গাড়ি চালক। এক হাতেই সে এমন স্বচ্ছন্দে গাড়ি চালায় ও অন্যান্য কাজকর্ম করে, যেন সৃষ্টিগতভাবেই সে এক হাত নিয়ে জন্মেছে। সুতরাং আপনিও আল্লাহ তা'আলার ফায়সালায় সন্তুষ্ট থাকুন। এতেই আপনার মানসিক প্রশান্তি নিহিত।
১৭. অসুস্থ ব্যক্তির শারীরিক ও মানসিক অবস্থার প্রতি লক্ষ রাখা, তার সাথে আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব ও পরিচিতজনদের সাক্ষাৎ করা কর্তব্য। পাশাপাশি তাকে সাহায্য-সহযোগিতা করা, দ্রুত আরোগ্য লাভের আশ্বাস দেওয়াও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর ফলে রোগী শারীরিকভাবে দুর্বল হলেও তার মানসিক শক্তি অটুট থাকে। দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠার জন্য যা অত্যন্ত কার্যকর।
১৮. অসুস্থতা থেকে মুক্ত থাকার উদ্দেশ্যে সকাল-সন্ধ্যায় 'আদইয়ায়ে মাসূরা' নিয়মিতভাবে পাঠ করুন। শরীয়ত সমর্থিত পন্থায় 'রুকইয়া' এর পন্থা অবলম্বন করুন। এ দু'টি পন্থা হলো বান্দার ঐশী সুরক্ষা। যা রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর উম্মতকে শিখিয়ে দিয়ে গেছেন।
১৯. মনে রাখবেন, অসুস্থ হয়ে চিকিৎসা করানোর চেয়ে রোগ প্রতিরোধ করা ও রোগের কারণ-উপকরণ থেকে সুরক্ষিত থাকাই শ্রেয়। এ লক্ষ্যে শুয়ে-বসে অলস অবসর জীবনযাপন, অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত ও তৈলাক্ত খাবার এবং ধূমপান ইত্যাদির মতো স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর কারণগুলো থেকে বেঁচে থাকতে হবে। পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর খাবার-দাবার, নিয়মিত হাঁটাচলা ও শরীরচর্চায় যত্নবান হওয়া আবশ্যক।
২০. অসুস্থ হলে আল্লার দয়া ও অনুগ্রহ থেকে নিরাশ হওয়া কিংবা সুস্থ হওয়ার পর তাঁর নিয়ামতের প্রতি অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা-কোনোটাই বাঞ্ছনীয় নয়। তাই অসুস্থ অবস্থায় হতাশায় ভেঙে না পড়ে আল্লাহর ওপর ভরসা করুন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: ﴿وَلَلئِنْ أَذَقْنَا الْإِنْسَانَ مِنَّا رَحْمَةً ثُمَّ نَزَعْنُهَا مِنْهُ إِنَّهُ لَيَتُوسٌ كَفُورٌ ﴾ [هود: ৯] অর্থ: 'যখন আমি মানুষকে আমার নিকট হতে অনুগ্রহ আস্বাদন করাই ও পরে তার থেকে তা প্রত্যাহার করে নেই, তখন সে হতাশ (ও) অকৃতজ্ঞ হয়ে যায়।' (হুদ, ১১:৯)
২১. পবিত্র কুরআন হলো যাবতীয় শারীরিক ও মানসিক রোগের প্রতিষেধক। তাই বেশি বেশি কুরআন তিলাওয়াতের সঙ্গে সঙ্গে নিয়মিত সূরা ফাতেহা, ইখলাস, সূরা ফালাক, সূরা নাস পাঠ করুন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: ﴿وَنُنَزِّلُ مِنَ الْقُرْآنِ مَا هُوَ شِفَاءٌ وَرَحْمَةً لِلْمُؤْمِنِينَ﴾ অর্থ: 'আমি নাযিল করেছি এমন কুরআন, যা মু'মিনদের পক্ষে শেফা ও রহমতের ব্যবস্থা। তবে জালেমদের ক্ষেত্রে এর দ্বারা ক্ষতি ছাড়া অন্য কিছু বৃদ্ধি হয় না।' (বনী ইসরাঈল ১৭:৮২)
২২. আপনার মন-মানসিকতা ও চিন্তা-চেতনা জুড়ে যেন অসুস্থতার প্রভাব বিরাজ করতে না পারে-এ বিষয়ে সচেতন হোন। নিজের ভালো লাগার কোনো কাজে ব্যস্ত থাকা কিংবা বই পড়া, বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা এবং দর্শনীয় স্থানে ঘুরে বেড়ানোর মাধ্যমে অসুস্থতার কথা ভুলে থাকার চেষ্টা করুন।
২৩. দেশের অভিজ্ঞ ডাক্তার ও চিকিৎসকের মাধ্যমে স্বাস্থ্য-সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। যার প্রধান লক্ষ্য-উদ্দেশ্য হবে, সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বাস্থ্যসুরক্ষা ও বিভিন্ন রোগ-বিরোগে তাদের করণীয় কর্তব্য সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা।
২৪. ওষুধ কোম্পানীগুলোকে ওষুধ উৎপাদনের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ গুণগত মান নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি চিকিৎসা বিজ্ঞানের সর্বক্ষেত্রে উন্নতি-অগ্রগতির লক্ষ্যে কাজ করতে হবে। দেশের প্রতিটি শহর, শহরতলি, পল্লি-গ্রাম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা প্রদান করা অত্যাবশ্যক। এটা একই সঙ্গে মানবিকতা ও ইসলামি শরীয়তের দাবি।
২৫. দেশের জ্ঞানী-গুণী, দায়ী ও শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের কর্তব্য হলো, হাসপাতাল ও বিভিন্ন মানবসেবা কেন্দ্রে রোগীদের সাক্ষাতে যাওয়া। তাদের খোঁজ-খবর নেওয়া। তাদের এ কার্যক্রম হতে হবে নিয়ম মাফিক ও ধারাবাহিক। এ সময় তারা নিজেদের সাধ্যানুযায়ী অসুস্থদের সাহায্য-সহযোগিতা করার পাশাপাশি দ্রুত আরোগ্য লাভের আশাবাদ ব্যক্ত করবে এবং সওয়াব ও প্রতিদান লাভের প্রত্যাশায় তাদের সবর ও ধৈর্যধারণে অনুপ্রাণিত করবে।
২৬. সমাজের ধনী ও বিত্তশালী ব্যক্তিবর্গের কর্তব্য হলো, গরিব-মিসকিন ও অসুস্থ লোকদের চিকিৎসা সেবায় আর্থিক অনুদান দেওয়া। কুরআন-সুন্নাহর দৃষ্টিতে এটা বিরাট প্রতিদান ও ফযিলতপূর্ণ আমল।
২৭. রোগী দেখতে যাওয়ার ক্ষেত্রে নিম্নোক্ত আদব রক্ষা করা কর্তব্য: ব্যক্তিগত সুযোগ-সুবিধাকে প্রাধান্য না দিয়ে অসুস্থ ব্যক্তির কাছে উপযুক্ত সময়ে যাওয়া, রোগীর কাছে বেশিক্ষণ অবস্থান না করা, নেতিবাচক কথা ও দুঃসংবাদ এড়িয়ে ইতিবাচক কথা বলা এবং দ্রুত আরোগ্য লাভের আশাবাদ ব্যক্ত করা। অসুস্থতা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে হলে রোগীকে একের পর এক প্রশ্ন না করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছ থেকে জেনে নেওয়া। হাদীসে বর্ণিত রোগী দেখার দু'আ পাঠ করা। আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: مَا مِنْ عَبْدٍ مُسْلِمٍ يَعُودُ مَرِيضًا لَمْ يَحْضُرْ أَجَلُهُ فَيَقُولُ سَبْعَ مَرَّاتٍ ... إِلَّا عُونِي। অর্থ: 'যেকোনো মুসলমান অসুস্থ-যার মৃত্যু এখনও ঘনিয়ে আসেনি-ব্যক্তিকে দেখতে এসে সাতবার এ দু'আ পাঠ করবে, রোগী সুস্থতা লাভ করবে: أَسْأَلُ اللهَ العَظِيمَ رَبَّ العَرْشِ العَظِيمِ أَنْ يَشْفِيَكَ। অর্থ: 'মহা আরশের অধিপতি মহান আল্লাহ তা'আলার কাছে প্রার্থনা করছি, তিনি আপনাকে আরোগ্য দান করুন।' (তিরমিজী, ৪/৪১০) আনাস বিন মালেক (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ যখন কোনো অসুস্থ ব্যক্তিকে দেখতে যেতেন (এই দু'আ) পাঠ করতেন: أَذْهِبِ البَأْسَ رَبَّ النَّاسِ، اشْفِ وَأَنْتَ الشَّافِي، لَا شِفَاءَ إِلَّا شِفَاؤُكَ، شِفَاءً لَا يُغَادِرُ سَقَمًا» (صحيح البخاري) অর্থ: 'হে মানবজাতির প্রতিপালক! (তার) অসুস্থতা দূর করে দিন! (তাকে) আরোগ্য দান করুন। আপনিই তো আরোগ্য দানকারী। আপনি ছাড়া কোনো আরোগ্য দানকারী নেই। (তাকে এমন) সুস্থতা দান করুন, যারপর আর কোনো রোগ থাকবে না।' (বুখারী, ৭/১২১)
২৮. বিজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ মতে প্রতি ছয় মাস অন্তর অন্তর স্বাস্থ্য পরীক্ষার মাধ্যমে সুস্থতা-অসুস্থা যাচাই করা কর্তব্য। সচেতনতামূলক উপায় অবলম্বন করা আবশ্যক। বাহ্যিক উপায় অবলম্বন করা ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা শরীয়তের নির্দেশ।
২৯. সচরাচর সাধারণ রোগগুলোর প্রাথমিক চিকিৎসা সম্পর্কে জেনে রাখুন এবং তা যথাযথ প্রয়োগ করতে শিখুন। সময়ে অসময়ে এ সাধারণ চিকিৎসাই অতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে। যেমন: হাত কেটে যাওয়া, পায়ে সামান্য আঘাত পাওয়া, মাথাব্যথা, ছোট বাচ্চাদের আঘাত পাওয়া ইত্যাদি।
৩০. আপনার ওপর আল্লাহ তা'আলার নায-নিয়ামতের কথা স্মরণ করুন, দেখবেন তা অগণিত। সুস্থতার দিনগুলোর কথা ভাবুন, দেখবেন তা কত দীর্ঘ। এবার অসুস্থতার কয়েকটা দিন গুণে দেখুন, তা হবে নিতান্ত সামান্য। তাই অসুস্থতার গুটি কয়েক দিনের কথা ভুলে সুদীর্ঘ সময়ের সুস্থতা ও সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের কথা মনে রাখুন এবং আল্লাহ তা'আলার নিয়ামতের কৃতজ্ঞতা আদায় করুন।
৩১. আল্লাহ তা'আলা যখন আপনাকে রোগমুক্ত করে সুস্থতা দান করলেন, দৈহিক শক্তি-সামর্থ্য ফিরিয়ে দিলেন, তখন সর্বান্তঃকরণে আল্লাহ তা'আলার প্রশংসা করুন। তাঁর নিয়ামতের কৃতজ্ঞতা স্বীকার করুন। সদ্য অসুস্থতার কথা ভুলে গিয়ে, শক্তি-সামর্থ্য ফিরে পেয়ে যাচ্ছে-তাই জীবনযাপন করা সমীচীন নয়। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: ﴿وَلَلئِنْ أَذَقْنَهُ نَعْمَاءَ بَعْدَ ضَرَّاءَ مَسَّتْهُ لَيَقُولَنَّ ذَهَبَ السَّيِّاتُ عَنِّي ۖ إِنَّهُ لَفَرِحٌ فَخُورٌ﴾ [هود: ১০] অর্থ: 'আবার যখন কোনো দুঃখ-কষ্ট তাকে স্পর্শ করার পর তাকে নিয়ামতরাজি আস্বাদন করাই, তখন সে বলে, আমার সব অমঙ্গল কেটে গেছে। (আর তখন) সে উৎফুল্ল হয়ে অহমিকা প্রদর্শন করতে থাকে।' (হুদ, ১১: ১০)
পরিশিষ্ট:
অসুস্থ অবস্থায় ধৈর্য ও সহনশীলতার সবচেয়ে বিস্ময়কর ঘটনা হলো আল্লাহর নবী আইয়ূব (আ.)-এর ঘটনা। অর্থ-কড়ি, সহায়-সম্পত্তি, সন্তান-সন্ততি, আত্মীয়-স্বজন ও বংশমর্যাদা-কোনো কিছুতেই তার কোনো কমতি ছিল না। জীবনের সর্বক্ষেত্রেই তিনি ছিলেন সুসম্পন্ন। এত বিপুল নায-নিয়ামত ও সীমাহীন সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের মাঝেই আল্লাহ তা'আলা তাঁর নবী আইয়ূব (আ.)-এর ধৈর্যের পরীক্ষা নিতে চাইলেন। তিনি এমন দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হলেন, যা তার গোটা দেহে ছড়িয়ে পড়ল। দেহের ভেতর-বাহির সর্বত্রই রোগের প্রকোপ ছড়িয়ে পড়ল। বাকি রইল শুধু হৃদয় ও জিহ্বা। রোগাক্রান্ত নবী আইয়ূব (আ.) বিপুল অর্থ-কড়ি, সহায়-সম্পত্তি সবই হারালেন। সন্তান-সন্ততি, আত্মীয়-স্বজন সবাই তার সঙ্গ ত্যাগ করল। কিছু দিনের ব্যবধানে তিনি হয়ে পড়লেন সহায়-সম্বলহীন নিঃসঙ্গপ্রায়। তবে সবাই সঙ্গ ত্যাগ করলেও পুণ্যবতী স্ত্রী তাঁর সেবা-শুশ্রূষায় নিয়োজিত থাকলেন। এমন সর্বাঙ্গ রোগীর সেবাযত্নে তিনি একটুও ত্যক্ত-বিরক্ত হলেন না। এমন রোগাক্রান্ত দশায় নবী আইয়ূব (আ.)-এর জীবনের ১৮টা বছর কেটে গেল। কালের নির্মম ঘাত-প্রতিঘাত ও জীবনের চরম দুর্যোগ-দুর্দশার মধ্যেও তিনি আল্লাহর যিকিরে মশগুল থাকতেন। তাঁর প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশে রত থাকতেন। প্রতিদানের প্রত্যাশা এবং ধৈর্য ও সহনশীলতার পথ থেকে একচুল বিচ্যুত হননি। বিরক্তি ও অস্বস্তি তাঁর মনে ছাপ ফেলতে পারেনি। দুরারোগ্য ব্যাধি যখন চরম পর্যায়ে পৌঁছিল, তিনি আপন রবের কাছে দু'আ করলেন এবং পানাহ চাইলেন। পবিত্র কুরআনের ভাষায়: "আর স্মরণ কর আইউবের কথা, যখন সে তার রবকে আহ্বান করে বলেছিল, 'আমি দুঃখ-কষ্টে পতিত হয়েছি। আর আপনি তো সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু।' তখন আমি তাঁর ডাকে সাড়া দিলাম। আর তাঁর যত দুঃখ-কষ্ট ছিল তা দূর করে দিলাম এবং তার পরিবার-পরিজন তাকে দিয়ে দিলাম। আর তাদের সাথে তাদের মত আরো দিলাম আমার পক্ষ থেকে রহমত এবং ইবাদাতকারীদের জন্য উপদেশস্বরূপ।" (আম্বিয়া, ২১: ৮৩, ৮৪) আল্লাহ তা'আলা তাঁর নবীর দু'আ কবুল করলেন এবং আরোগ্য লাভের পন্থা বাতলে দিলেন। আইয়ূব (আ.) আপন রবের নির্দেশ মোতাবেক মাটিতে পদাঘাত করলেন। সঙ্গে সঙ্গে পানির ফোয়ারা উৎসারিত হলো। তাতে গোসল করে তিনি দেহের বাহ্যিক রোগমুক্ত হলেন। এরপর ফোয়ারার পানি পান করে তিনি অভ্যন্তরীণ রোগমুক্ত হলেন। এভাবে তিনি সর্বান্তঃকরণে রোগমুক্ত হয়ে উঠলেন। পবিত্র কুরআনের ভাষায়: (আমি বললাম,) 'তুমি তোমার পা দিয়ে (ভূমিতে) আঘাত কর, এ হচ্ছে গোসলের সুশীতল পানি আর পানীয়'। আর আমার পক্ষ থেকে রহমতস্বরূপ ও বুদ্ধিমানদের জন্য উপদেশস্বরূপ আমি তাকে দান করলাম তার পরিবার-পরিজন ও তাদের সাথে তাদের অনুরূপ অনেককে।' (সোয়াদ, ৩৮: ৪২, ৪৩)
সুস্থতা-অসুস্থতায়, সচ্ছলতা-অসচ্ছলতায়, বিপদ-আপদে ও সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যে সর্বদা আল্লাহ তা'আলার খাঁটি বান্দা হয়ে থাকুন। প্রশংসা ও কৃতজ্ঞচিত্ত বান্দা হয়ে জীবন যাপন করুন। বিশ্বাস করুন, বিপদ থেকে উদ্ধারকারী একমাত্র আল্লাহ তা'আলা। তিনিই পারেন বান্দাকে রোগমুক্ত করে সুস্থতা দান করতে। সুতরাং বিপদ-আপদে ধৈর্যধারণ করুন। আপনার যাবতীয় বিষয় আপন রবের জিম্মায় সমর্পণ করুন এবং তাঁরই ফায়সালায় সন্তুষ্ট থাকুন।
বিখ্যাত আরব কবি আবুল আতাহিয়া (১৩০-২১৩ হি.) বলেছেন: 'ডাক্তারের সাধ্য নেই শুধু চিকিৎসা ও ওষুধের সাহায্যে রোগমুক্ত করার। এত দিন যে ডাক্তার, চিকিৎসা করে কত রোগীকে সুস্থ করে তুলেছেন, আজ যখন রোগাক্রান্ত হয়ে স্বয়ং তিনিই মৃত্যুপথযাত্রী, তখন তার কি-ই বা করার আছে। হাসপাতাল, ডাক্তার, ওষুধ-সবই ব্যর্থ।' রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: «مَا أَنْزَلَ اللهُ دَاءً إِلَّا أَنْزَلَ لَهُ شِفَاءً» (صحيح البخاري) অর্থ: 'আল্লাহ তা'আলা যে রোগই দিয়েছেন তা থেকে আরোগ্য লাভের উপায় বাতলে দিয়েছেন।' (বুখারী, ৭/১২২) কানাডিয়ান লেখক বব প্রক্টর বলেছেন: 'আপনার অসুস্থতার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে যদি লোকদের কাছে ঘটা করে বলতে থাকেন, তাহলে আপনার রোগের মাত্রা আরও বৃদ্ধি পাবে। চারপাশের লোকদের চাহনিতে করুণার ছাপ ফুটে উঠবে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে তারা আপনার অসুস্থতা ও দুর্বলতার কথা স্মরণ করিয়ে পিছিয়ে রাখতে চেষ্টা করবে। তাই অসুস্থতার কথা প্রচার না করে, নিজেকে দুর্বলরূপে উপস্থাপন না করে আত্মবিশ্বাসী হোন। দ্রুত আরোগ্য লাভে আশাবাদী হয়ে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হোন।'
টিকাঃ
৬০. আল-জামেউস্ সাহীহ লিসুনানি ওয়াল মাসানীদ, ৮/৪০২
📄 মৃত্যু
মৃত্যু হলো অমোঘ অজেয় অনিবার্য, সৃষ্টি জগতের প্রতিটা প্রাণীর জন্য। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: ﴿كُلُّ نَفْسٍ ذَائِقَةُ الْمَوْتِ﴾ [آل عمران: ١٨٥] অর্থ: 'সমস্ত প্রাণীই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে।' (আলে ইমরান, ১৮৫) বিজ্ঞজনদের অভিমত: জন্মাও মৃত্যুর জন্য, আর নির্মাণ করো বিলুপ্তির জন্য। জনৈক আরব কবি বলেছেন: অর্থ: শুনে রাখ, আল্লাহ ছাড়া সমস্তই মরণশীল। আর আনন্দের সবকিছু নিঃসন্দেহে ধ্বংসশীল। পবিত্র কুরআনের ভাষ্যমতে মৃত্যুই হলো সবচেয়ে কষ্ট ও বেদনাদায়ক বিচ্ছেদ, যার পর ইহকালে আর কোনো দেখা-সাক্ষাতের সুযোগ থাকে না। যার সাথে আপনার রক্তের সম্পর্ক, মনেপ্রাণে যাকে ভালোবেসে এসেছেন, আজ যদি তার মৃত্যু হয়, নিজ হাতে তাকে কবরের মাটিতে দাফন করতে হবে। পৃথিবীতে এক মুহূর্তের জন্য যাকে চোখের আড়াল করতে পারতেন না, আজ চিরকালের জন্য তাকে ছেড়ে আসতে হবে, অন্ধকার কবরে, একাকী নিঃসঙ্গ। হৃদয়-মন জুড়ে দুঃখ-বেদনা উথলে উঠবে। জীবনের যত আনন্দের উপলক্ষ, মুহূর্তেই তা করুণ বেদনায় পরিণত হবে। জীবনের এ কঠিন বাস্তবতার মুহূর্তে আপনার করণীয় কী? এমন বেদনাদায়ক পরিস্থিতি কাটিয়ে ওঠার উপায় কী?
সমাধান:
১. একটু ভাবুন, নিজেকে একবার জিজ্ঞেস করুন, আপনার প্রিয়জনের প্রকৃত সুখ ও শান্তি কোথায়? ক্ষণস্থায়ী ইহকালে সহাবস্থানে, না কি চিরস্থায়ী পরকালে আপন রবের সান্নিধ্য? বিবেকের কাছেই আপনি এর সদুত্তর পেয়ে যাবেন। কবি আবুল হাসান আলী আততিহামী পুত্রের মৃত্যুতে বলেছিলেন: 'দুনিয়ার শত্রু-মিত্রের মাঝে আমার বর্তমান অবস্থান। আর আপন রবের পরম সান্নিধ্য তাঁর অবস্থান। আমাদের দুজনের অবস্থানে কত বিস্তর ব্যবধান।'
২. কারো মৃত্যুতে যারা আপন রবের প্রতি বিশ্বাস, আত্মসমর্পণ ও সন্তুষ্টির বাণী উচ্চারণ করে, পবিত্র কুরআন তাদের আদর্শরূপে তুলে ধরা হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: ﴿الَّذِينَ إِذَا أَصَابَتْهُمْ مُّصِيبَةٌ قَالُوا إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ﴾ [البقرة: ١٥৬] অর্থ: 'এরা হল সেই সব লোক, যারা তাদের কোন মুসিবত দেখা দিলে বলে ওঠে, 'আমরা সকলে আল্লাহরই এবং আমাদেরকে তাঁর কাছেই ফিরে যেতে হবে।' (বাকারা, ২: ১৫৬)
৩. প্রতিদান লাভের আশায় ধৈর্যধারণ করুন। প্রতিদানে আপন রবের পক্ষ থেকে তিনটি সুসংবাদ গ্রহণ করুন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলার ঘোষণা: ﴿أُولَئِكَ عَلَيْهِمْ صَلَوَاتٌ مِنْ رَّبِّهِمْ وَرَحْمَةٌ تَن وَأُولَئِكَ هُمُ الْمُهْتَدُونَ﴾ [البقرة: ١৫৭] অর্থ: 'এরা সেই সব লোক, যাদের প্রতি তাদের প্রতিপালকের পক্ষ হতে বিশেষ করুণা ও দয়া রয়েছে এবং এরাই আছে হিদায়াতের ওপর।' (বাকারা, ২: ১৫৭)
৪. আপন রবের ফায়সালা সন্তুষ্টচিত্তে গ্রহণ করুন এবং তাঁর প্রতি সপ্রশংস হোন। বিপদ-আপদে ধৈর্যশীল ও প্রশংসচিত্ত বান্দার জন্য আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে জান্নাতে বালাখানার সুসংবাদ রয়েছে। আল্লাহ তা'আলা ফেরেশতাদের বলবেন: "আমার বান্দার জন্য জান্নাতে একটি আবাসস্থল তৈরি করো এবং এর নাম রাখো 'বাইতুল হামদ'।”
৫. মনে রাখবেন, আল্লাহ তা'আলার প্রতিটি ফায়সালাই বান্দার জন্য মঙ্গলজনক। বান্দাকে তিনি পরীক্ষা করেন বিভিন্ন অবস্থা ও পরিস্থিতির মাধ্যমে। বাহ্যিক দৃষ্টিতে দেখে অনেকে ভাবে, এটা তার জন্য অমঙ্গলজনক; অথচ তাতে নিহিত আছে বহুবিধ কল্যাণ। আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: وَعَسَى أَنْ تَكْرَهُوا شَيْئًا وَهُوَ خَيْرٌ لَكُمْ﴾ [البقرة: ٢١٦] অর্থ: 'এটা তো খুবই সম্ভব যে, তোমরা একটা জিনিসকে মন্দ মনে কর, অথচ তোমাদের পক্ষে তা মঙ্গলজনক।' (বাকারা, ২: ২১৬)
৬. মনে রাখতে হবে, জগৎ ও জাগতিক জীবন হলো বান্দার পরীক্ষা-ক্ষেত্র, যা দুঃখ-কষ্ট, বিপদ-আপদ, সংকট ও প্রতিকূলতায় কণ্টকাকীর্ণ। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: وَلَنَبْلُوَنَّكُمْ بِشَيْءٍ মِّنَ الْخَوْفِ وَالْجُوعِ وَنَقْصٍ মِّنَ الْأَمْوَالِ وَالْأَنْفُسِ وَالثَّمَرَاتِ وَبَشِّرِ الصَّبِرِينَ﴾ [البقرة: ١٥٥] অর্থ: 'আর দেখ আমি অবশ্যই তোমাদেরকে পরীক্ষা করব (কখনও) ভয়-ভীতি দ্বারা, (কখনও) ক্ষুধা দ্বারা এবং (কখনও) জান-মাল ও ফসলহানী দ্বারা। যেসব লোক (এরূপ অবস্থায়) সবরের পরিচয় দেয়, তাদেরকে সুসংবাদ শোনাও।' (বাকারা, ২: ১৫৫)
৭. আল্লাহ তা'আলার আশ্রয় গ্রহণ করুন। সবর ও সালাতের মাধ্যমে তাঁর সাহায্য প্রার্থনা করুন। পবিত্র কুরআনে উম্মতে মুহাম্মদীর প্রতি আল্লাহ তা'আলার নির্দেশ: وَاسْتَعِينُوا بِالصَّبْرِ وَالصَّلوةِ وَإِنَّهَا لَكَبِيرَةٌ إِلَّا عَلَى الْخَشِعِينَ) [البقرة: ٤٥] অর্থ: 'এবং সবর ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা কর। সালাতকে অবশ্যই কঠিন মনে হয়, কিন্তু তাদের পক্ষে নয়, যারা খুশৃ' (অর্থাৎ, ধ্যান ও বিনয়)-এর সাথে পড়ে।' (বাকারা, ২: ৪৫)
৮. নিয়তির ফায়সালায় অসন্তোষ প্রকাশ করা এবং আল্লাহ তা'আলার হুকুমে আপত্তি উত্থাপন করা সমীচীন নয়। কেননা বান্দার অভিযোগ অসন্তোষ তার হারানো বস্তু ফিরিয়ে দিতে পারে না, মৃতকে জীবিত করে তুলতে পারে না। সুতরাং সন্তুষ্টচিত্তে আপন রবের ফায়সালা মেনে নিয়ে শান্তিপূর্ণ জীবন যাপন করাই শ্রেয়।
৯. পরকালের প্রতি বিশ্বাস ঈমানের অন্যতম ভিত্তি। পরকালে আল্লাহ তা'আলা তাঁর ধৈর্যশীল বান্দাদের উত্তম বিনিময় দান করবেন এবং জান্নাতে প্রিয়জনদের সাথে অবস্থান করার সুযোগ দান করবেন। তাই প্রিয়জনদের মৃত্যুতে ধৈর্যধারণ করুন এবং সান্ত্বনা লাভ করুন যে জান্নাতে তাদের সাথেই হবে আপনার অবস্থান।
১০. প্রিয়জনের মৃত্যুতে দুঃখ প্রকাশ করা, কান্না করা মানুষের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য। তাই ইসলামেও শোকের মুহূর্তে শোক প্রকাশে নিষেধ নেই। তবে হাইমাউ করে কান্না করা, বিলাপ করা, মাতম করা, মাথা চাপড়ানো ও জামা কাপড় ছিঁড়ে ফেলা জাহেলি যুগের কুসংস্কার; শরীয়তের দৃষ্টিতে তা সম্পূর্ণরূপে নিষেধ। মৃত্যুশয্যায় পুত্র ইবরাহীমকে যখন রাসূলুল্লাহ ﷺ দেখতে এলেন, তাঁর দু' চোখ থেকে অশ্রু ঝরতে লাগলো। তা দেখে আব্দুর রহমান বিন আউফ (রা.) (বিস্মিত হয়ে) বললেন: 'ইয়া রাসূলুল্লাহ! আপনিও কান্না করছেন?' রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন: إِنَّ العَيْنَ تَدْمَعُ، وَالقَلْبَ يَحْزَنُ، وَلَا نَقُولُ إِلَّا مَا يَرْضَى رَبُّنَا، وَإِنَّا بِفِرَاقِكَ يَا إِبْرَاهِيمُ لَمَحْزُونُونَ» (صحيح البخاري) অর্থ: 'চোখ দু'টো অশ্রুবিগলিত, হৃদয় দুঃখভারাক্রান্ত। কিন্তু যবানে তাই উচ্চারিত হবে, যাতে আমার রব সন্তুষ্ট। হে ইবরাহীম! আমরা যে তোমার মৃত্যুতে অত্যন্ত শোকাহত।' (বুখারী, ২/৮৩)
১১. আপনজনের মৃত্যুতে শোকাহত হয়ে নিঃসঙ্গ পড়ে থাকবেন না। নিঃসঙ্গতা ও একাকিত্ব কোনো সমস্যা সমাধানে কার্যকর উপায় নয়। এমন ব্যক্তিদের সাথে থাকুন, যাদের মাধ্যমে আপনি সান্ত্বনা পাবেন এবং দুঃখ শোক কাটিয়ে স্বাভাবিক হতে পারবেন।
১২. আল্লাহ তা'আলার কাছে পার্থিব জান্নাতের চেয়ে উত্তম বিনিময় আর কী হতে পারে? তাই প্রতিদানের প্রত্যাশা রেখে হাদীসে কুদসিতে আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে সুসংবাদ গ্রহণ করুন। 'বান্দার কোনো আপনজনকে যখন আমি দুনিয়া থেকে উঠিয়ে নেই, আর সে প্রতিদান লাভের আশায় ধৈর্যধারণ করে তখন আমার কাছে তার জন্য একটা প্রতিদানই সুনির্দিষ্ট হয়, তা হলো জান্নাত।'
১৩. অতীতের কথা স্মরণ করে শোকের পাল্লা আরও ভারি করবেন না। তার চেয়ে বরং ক্রীড়াচর্চামূলক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করুন এবং দুঃখস্মৃতি ভুলে থাকার চেষ্টা করুন।
১৪. সন্তানের মৃত্যুতে সাহাবায়ে কেরামকে রাসূলুল্লাহ ﷺ যা বলে সান্ত্বনা দিয়েছেন, তা স্মরণ করে আপনিও সান্ত্বনা গ্রহণ করুন। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: 'হ্যাঁ, তাদের জন্যে তার ছোটশিশুরা জান্নাতের প্রজাপতি তুল্য। তাদের মাঝে কেউ তার পিতার সাথে মিলিত হবে, অথবা তিনি বলেছেন বাবা-মা দুজনের সাথে মিলিত হবে। অতঃপর তিনি তার পরিধানের কাপড় ধরবেন। এরপর আর তারা তাদের ছাড়বে না। কিংবা রাবী বলেছেন, ধরে থাকা শেষ হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত না আলাহ তার বাবা-মাকে জান্নাতে প্রবেশ করান।' (মুসলিম, ৪/২০২৯)
১৫. বিশ্বাস করুন, পৃথিবীর বুকে মানবজাতি, জীবজন্তু ও জড়পদার্থ এসবের কোনোটিই স্থায়ী নয়। কালের ব্যবধানে সবই ধ্বংস হয়ে যাবে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: كُلُّ مَنْ عَلَيْهَا فَانٍ وَيَبْقَى وَجْهُ رَبِّكَ ذُو الْجَالِ وَالْإِكْرَامِ [الرحمن: ٢٦، ٢٧] অর্থ: 'ভূ-পৃষ্ঠে যা-কিছু আছে, সবই ধ্বংস হবে। বাকি থাকবে কেবল তোমার প্রতিপালকের গৌরবময়, মহানুভব সত্তা।' (আর-রহমান, ৫৫: ২৬-২৭) তাই নশ্বর পৃথিবীতে ক্ষণিকের সম্পর্কচ্ছেদের দুঃখ কষ্ট ভুলে, জান্নাতে প্রিয়জনদের সাথে চিরস্থায়ী জীবন কামনা করুন।
১৬. জীবদ্দশায় এমন মহৎ কীর্তি ও উদ্যোগ বাস্তবায়ন করুন, যা আপনার পরকালের কল্যাণ বয়ে আনবে। রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর এ দিকনির্দেশনা ভুলে যাবেন না: إِذَا مَاتَ الإِنْسَانُ انْقَطَعَ عَمَلُهُ إِلَّا مِنْ ثَلَاثٍ: صَدَقَةٌ جَارِيَةً، وَعِلْمٌ يُنْتَفَعُ بِهِ، وَوَلَدٌ صَالِحٌ يَدْعُو لَهُ অর্থ: 'মানুষ যখন মৃত্যুবরণ করে, সঙ্গে সঙ্গে তার আমলের দরজা বন্ধ হয়ে যায়। তবে তিনটি আমল ছাড়া: (১) সাদকায়ে জারিয়া (২) তার শেখানো এমন জ্ঞান-বিজ্ঞান, যা দ্বারা মানুষ উপকৃত হয়। (৩) কিংবা এমন কোনো সন্তান, যে তার কল্যাণের দোয়া করে।' (তিরমিজী, ৩/৬৫২)
১৭. মনে রাখবেন, জাগতিক জীবনের মৃত্যুই চূড়ান্ত বিচ্ছেদ নয়, আখেরাতে অবশ্যই আমরা একত্রিত হবো। প্রকৃত বিচ্ছেদ তো পরকালীন জীবনে পৃথক অবস্থান-একজন জান্নাতে অপরজন জাহান্নামে। তাই আমাদের কর্তব্য হলো জান্নাতে একসাথে থাকার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করা।
পরিশিষ্ট:
বিখ্যাত আরব কবি আবু জুআইব হুযালী ছিলেন হেযাজের বাসিন্দা। স্ত্রী ও পুত্রসন্তানদের নিয়ে তার পরিবারটি ছিল সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ। আল্লাহ তা'আলা তাকে এমন ফুটফুটে সাতটি পুত্রসন্তান দান করেছিলেন, যাদের দেখে চোখ জুড়িয়ে যায়, আদর-স্নেহে কোলে নিয়ে চুমু খেতে ইচ্ছে করে। ছেলেরা যখন তরুণ-যুবক, প্রত্যেকেই জ্ঞানে-গুণে, আচার-আচরণে মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বের পরিচয় দিতে লাগল কিন্তু ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস! উজ্জ্বল ভবিষ্যতের পথে যারা সমুজ্জ্বলরূপে এগিয়ে যাচ্ছিল, নিয়তির ইশারায় তাদেরই যাত্রা থেমে গেল! সন্তানরা এমন এক দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হলো যে, ডাক্তার, ওষুধ ও ঝাড়ফুঁক-কোনো কিছুতেই কাজ হয় না। পিতা আবূ জুআইব হুযালী কত চেষ্টা তদবির করলেন, কত দিকে ছুটলেন, কত জনের দ্বারস্থ হলেন, কিছুতেই কোনো কাজ হয় না। তিনি ছিলেন একজন বিজ্ঞ কবি। জ্ঞান ও প্রজ্ঞায় সুসম্পন্ন। নিয়তের ইশারা আঁচ করতে বিলম্ব হয়নি। আল্লাহ তা'আলার ফায়সালা বুঝতে দেরি করেননি। এক এক করে সাত সন্তানের মৃত্যুতে ধৈর্যই হলো তার পরম আশ্রয়। আপন রবের নিকট প্রতিদান প্রত্যাশাই হলো তার দিলের যখমের মারহাম। সবকিছু তিনি আপন রবের যিম্মায় ন্যস্ত করে সন্তান হারানোর শোক বুকে চেপে রাখলেন। হৃদয়ের যত বেদনা, তুলে ধরলেন কবিতার ভাষায়। ইতিহাসের পাতায় যা চির অমর হয়ে আছে, সে কবিতারই কয়েকটি পঙ্ক্তি প্রকাশ করে স্ত্রীকে তিনি সান্ত্বনা দিয়ে বলেছেন: 'হিংসুকেরা আমার দৃঢ়তা অবিচলতা দেখুক, আমি তাদের দেখিয়ে দিতে চাই কালের ঘাত-প্রতিঘাতে আমি নিঃশেষ হবার নই। মৃত্যু যখন তার নখদন্ত বের করে আগ্রাসী হয়ে উঠে, তখন গলায় যতো তাবিজ-কবজ ঝুলাও না কেন, কোনো লাভ নেই।'
টিকাঃ
৬১. الزهد والرقائق لابن المبارك والزهد لنعيم بن حماد ٢/ ٢٧
৬২. ব্যক্তির মৃত্যুর পরও তার যে আমলের প্রতিদান অব্যাহত থাকে।