📘 আল হাল্লু জীবন সমস্যার সমাধান 📄 প্রবাস-পরবাস

📄 প্রবাস-পরবাস


'প্রবাস-পরবাস' শব্দ দু'টা বলা যত সহজ, শুনতে তত কঠিন কষ্টদায়ক। প্রবাস হলো, প্রয়োজনের তাড়নায় কিংবা দায়িত্বের তাগাদায় মাতৃভূমি ছেড়ে ভিন দেশে পাড়ি জমানো। প্রবাস-জীবনে ব্যক্তিকে পরিবার-পরিজন, বন্ধু-বান্ধব ও পাড়াপ্রতিবেশী-সবার থেকে দূরে থাকতে হয়। শৈশব-কৈশোরের স্মৃতি, পরিবারের আনন্দ-বেদনার স্মৃতি, পরিচিত ভাষা ও সমাজ ছেড়ে নতুন পরিবেশ ও অপরিচিত লোক-সমাজের মধ্যে একাকী জীবনযাপন করতে হয়।

দেশে যেখানে প্রতিদিন তিন বেলা মার হাতের সুস্বাদু খাবার খেয়ে পরিতৃপ্ত হতো, এখন দূর পরবাসে খাবারের বাছ-বিচার না করে কোনো রকম ক্ষুধার জ্বালা মিটিয়েই তৃপ্ত হতে হয়। রোগ-শোকে, বিপদ-আপদে আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুবান্ধব পাশে এসে দাঁড়াত। প্রবাসে এখন জীবনের যত ঝড়-ঝাপটা, সব একাই শামাল দিতে হয়। এতসব দুঃখ-কষ্ট সে সহ্য করে যায় পরিবার-পরিজনের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য। পরিবার যেন সুখে থাকে, ছেলে-মেয়েরা যেন উন্নত শিক্ষা-দীক্ষার সুযোগ পায়, মা-বাবার চিকিৎসাটা যেন ভালোমতো হয়, এ-ই তার একমাত্র চাওয়া। প্রবাস জীবনের দুঃখ-কষ্ট, এ জীবনের দায়-দায়িত্বের চাপ শুধু একজন প্রবাসীই বুঝতে পারে। তাসত্ত্বেও নিয়তির অবধারিত নীতি মেনে তাকে জীবন সংগ্রামে টিকে থাকতে হয়। হাসিমুখে কষ্ট-যাতনা আড়াল করে প্রবাস জীবন উপভোগ করার জন্য আমাদের করণীয় কী? এত দুঃখ-কষ্টের মাঝেও একটু হাসি-আনন্দে জীবনযাপন করার উপায় কী?

সমাধান:
১. মনে রাখতে হবে, প্রবাসজীবনের উদ্দেশ্য হলো এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজন পূরণ করা ও কল্যাণচিন্তা বাস্তবায়ন করা, স্বদেশে থেকে ব্যক্তির জন্য যা অত্যন্ত দুরূহ ও কষ্টসাধ্য। অনেক সময় শিক্ষা-দীক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও সুচিকিৎসার উদ্দেশ্যে বিদেশযাত্রা আপনার জন্য অধিক কল্যাণকর ও ফলপ্রসূ হতে পারে।
২. বিদেশ যাত্রা ও প্রবাস-জীবনে অনেক কল্যাণ নিহিত। এর মাধ্যমে নতুন সভ্যতা-সংস্কৃতি, জীবনধারা ও সামাজিকতা পরখ করার সুযোগ হয়। তার মধ্যে যা কিছু কল্যাণ, যা কিছু মঙ্গল, তা হয়ে থাকে ভবিষ্যৎ জীবন পথের পাথেয়। এভাবে ব্যক্তির বিদ্যা-বুদ্ধি ও অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার ঋদ্ধ হয়। জীবনধারা উন্নত ও সমৃদ্ধ হয়।
৩. আপনি নিশ্চিত থাকুন। দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হবেন না। প্রযুক্তি ও আবিষ্কারের যুগে এখন যোগাযোগব্যবস্থা অনেক উন্নত। মোবাইল ও ইন্টারনেটের কল্যাণে গোটা পৃথিবী আপনার হাতের মুঠোয়। যখন ইচ্ছা, যার সাথে ইচ্ছা, যোগাযোগ করতে পারেন। তাদের খোঁজ-খবর নিতে পারেন।
৪. বিদেশে এমন ব্যক্তিবর্গ ও প্রতিষ্ঠানের সাথে যোগাযোগ ও আন্তরিক সম্পর্ক বজায় রাখুন-যেমন: স্বদেশের দূতাবাস, মসজিদ, ইসলামি প্রতিষ্ঠান এবং স্বদেশী ব্যক্তিবর্গ-যাদের আন্তরিক ব্যবহার ও কথাবার্তায় আপনার প্রবাস জীবনের কষ্ট লাঘব হবে। আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধব থেকে দূরে থাকার কষ্ট কিছুটা হলেও ভুলে থাকতে পারবেন।
৫. স্মরণ করুন, নবী-রাসূলগণ, ইতিহাসের মহা মনীষী ও বিপ্লবী ব্যক্তিগণ জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চার উদ্দেশ্যে, দেশ ও জাতির কল্যাণে স্বদেশ ত্যাগ করে ভিনদেশে পাড়ি জমিয়েছেন। দূর দেশের অজানা পথের দুর্যোগ-দুর্বিপাক হাসিমুখে সহ্য করেছেন।
৬. স্বদেশ ছেড়ে যে দেশে অবস্থান করছেন, অবসরের সময়টাতে সেখানে শিক্ষা-দীক্ষামূলক চর্চা অথবা অর্থোন্নয়নমুখী কোনো কার্যক্রমে যুক্ত হোন। যা আপনাকে প্রবাস জীবনের দুশ্চিন্তা-দুর্ভাবনা ও দুঃখ-কষ্টের কথা ভুলিয়ে দেয়।
৭. মনে রাখুন, আপনি নিজের ও পরিবারের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ বিনির্মাণের গুরুদায়িত্ব পালন করছেন। এজন্য অবশ্যই আপনাকে হালাল উপার্জনের কোনো একটা উপায় অবলম্বন করতে হবে। জাগতিক জীবনে এটাই চিরাচরিত রীতি। তাই বিষয়টিকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখুন এবং জীবনের এ মহান দায়িত্ব সফলভাবে পালন করতে পেরে সম্মান ও গৌরব বোধ করুন।
৮. চিন্তা করে দেখুন, পরকালীন জীবনের বিবেচনায় আমাদের এ জাগতিক জীবনও একপ্রকার প্রবাস জীবন। যে দিন আদম (আ.) ও হাওয়া (আ.) আমাদের আসল ভূমি জান্নাত থেকে পৃথিবীর মাটিতে পদার্পণ করেছেন, সে দিন থেকেই আমরা প্রবাসী। এভাবেই চিন্তা করে নিজের মনকে সান্ত্বনা দিন।
৯. সময়মতো জামাতের সাথে পাঁচওয়াক্ত নামায ও অন্যান্য ইবাদতে যত্নবান হোন। বেশি বেশি যিকির আযকারের মাধ্যমে আপন রবের সাথে মহাব্বত ও ভালোবাসার সম্পর্ক স্থাপন করুন। এর মধ্যে যুগপদ দু'টি কল্যাণ নিহিত:
প্রথমত, বিরাট প্রতিদান হাসিল হবে। দ্বিতীয়ত, নেক আমলের মধ্যে সময় কাটানোর মাধ্যমে দুশ্চিন্তা-দুর্ভাবনামুক্ত থাকা সহজ হবে।
১০. নিজের মধ্যে একটা আলাদা জগৎ গড়ে তুলুন, যা হবে কল্যাণকর চিন্তাভাবনা, আল্লাহর যিকির ও দু'আ পাঠের মতো মহৎ আমলের জগৎ। মনে করুন, এ জগৎটাই আপনার স্বদেশ মাতৃভূমি।
১১. আপনি কেন কাঁটা তারের সীমারেখা ভুলে গোটা বিশ্বটাকে আপনার স্বদেশ ভাবছেন না? এ জগৎটাকে নিজের আবাসভূমি মনে করছেন না? আপনি এভাবে চিন্তা করুন-বিশ্বজগৎটা তো একই স্রষ্টার সৃষ্টি। সমগ্র পৃথিবী তো মহান আল্লাহর কর্তৃত্বাধীন। যেখানে আপনার অবস্থান, সেটাই হবে আপনার আবাসভূমি। কবির ভাষায়: 'পৃথিবীর যেখানেই মহান আল্লাহ তা'আলার নাম উচ্চারিত হয়, আমি মনে করি, সেটাই আমার মাতৃভূমি।'
১২. বিদেশে অবস্থানকালে সেখানের নিয়ম-নীতি মেনে চলুন। আপনার স্বকীয়তা ও ধার্মিকতা অটুট রেখে তাদের সভ্যতা-সংস্কৃতির প্রতি সম্মান বজায় রাখুন। নিজেকে ইসলাম ও মুসলমানের আদর্শ নমুনারূপে উপস্থাপন করুন। আপনার স্বকীয়তা ও স্বাতন্ত্র্য, আপনার জন্য সামাজিক মূল্যায়ন ও সম্মান বয়ে আনবে।

পরিশিষ্ট:
অবিসংবাদিতভাবেই হাদীসশাস্ত্রে সর্বাধিক প্রসিদ্ধ ব্যক্তিত্ব হলেন ইমাম বুখারী (রহ.)। ষোলো বছর বয়সেই তিনি স্বদেশ ছেড়ে বের হয়ে পড়েন। পবিত্র মক্কায় হজ পালন করেন এবং মদিনায় রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর রওযা মোবারক যিয়ারত করেন। এরপর হেজায, মিশর হয়ে ইরাকের বাগদাদ এসে পৌঁছান। বাগদাদ শহরে যখন প্রবেশ করেন, তিনি পরিবার-পরিজন থেকে বিচ্ছিন্ন রিক্তহস্ত। একমাত্র সম্বল হলো আপন রবের ওপর ভরসা ও গভীর জ্ঞানপিপাসা। আল্লাহ তা'আলাও তাঁর ভরসার যথার্থ প্রতিদান দিয়েছেন। যা ছিল হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ তা'আলার প্রতিশ্রুতির বহিঃপ্রকাশ: أَنَا عِنْدَ ظَنَّ عَبْدِي بِي، فَلْيَظُنَّ بِي مَا شَاءَ অর্থ: 'আমার প্রতি বান্দার বিশ্বাস মোতাবেক আমি তার সাথে আচরণ করি। সুতরাং বান্দা আমার প্রতি বিশ্বাস রাখুক, সে যেমন চায়।' (মুসনাদে আহমাদ, ২৫/৩৯৮) জ্ঞানসাধনায় সুদীর্ঘ সফর, অবিরাম চেষ্টা-সাধনা ও কালের দুর্যোগ-দুর্বিপাক মোকাবিলার পরই তিনি মুসলিম জাতির কল্যাণে বুখারী শরীফ সংকলন করতে সক্ষম হয়েছেন।

ইমাম শাফেয়ী (রহ.) (১৫০-২০৪ হি.) বলেছেন: 'জ্ঞানী ও বিচক্ষণ ব্যক্তির জন্য একই স্থানে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়া সমীচীন নয়। সুতরাং জ্ঞানচর্চার উদ্দেশ্যে স্বদেশ ছেড়ে দূর-দূরান্তে সফর করো। সফর ও হিজরতের বদৌলতে জ্ঞান সাধনার এমন পাথেয় পাবে, যা তোমাকে স্বদেশ ত্যাগের কষ্ট ভুলিয়ে দিবে। অবিরাম চেষ্টা সাধনার মধ্যেই কাঙ্ক্ষিত জীবনের সন্ধান পাবে। আমি দেখেছি, স্থবিরতা ও প্রবাহহীনতা পানিকে নষ্ট করে ফেলে। কিন্তু তা যদি হয় সদা প্রবহমান, তাহলে তার স্বকীয় বৈশিষ্ট্য বজায় থাকে। সিংহ যদি গর্ত ছেড়ে বের না হয়, তার শিকার জুটবে কী করে? তীর যদি তূণীর থেকে নিক্ষিপ্ত না হয়, লক্ষ্যস্থলে আঘাত হানবে কিভাবে? সূর্য যদি আপন কক্ষপথের একই স্থানে থেমে থাকে, মানুষ তাতে যারপরনাই বিরক্ত হবে। স্বর্ণখণ্ড যদি তার খনির মধ্যে পড়ে থাকে, মাটির মতো মূল্যহীন পড়ে থাকবে। সুগন্ধি কাঠ যদি বনের মধ্যে পড়ে থাকে, তবে তা সাধারণ কাঠ মাত্র। স্বর্ণখণ্ড যদি তার খনি ছেড়ে বেরিয়ে আসে, তাহলেই অমূল্য রতন। সুগন্ধিকাঠ যদি বন ছেড়ে বেরিয়ে আসে, স্বর্ণের মতো অমূল্য বস্তু।'

টিকাঃ
৫৬. সুনানে নাসায়ীর রিওয়ায়েতে বর্ণিত হয়েছে: «إِنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ يَقُولُهُنَّ فِي دُبُرِ الصَّلَاةِ» (سنن النسائي) অর্থ: রাসূলুল্লাহ ﷺ নামাযের পর এ দু'আটি পাঠ করতেন। (নাসায়ী, ৩/৭৩) এতে বোঝা যায়, সকাল-সন্ধ্যায় ও প্রত্যেক নামাযের পর-দুটি সময়েই আমল করার সুযোগ রয়েছে।

📘 আল হাল্লু জীবন সমস্যার সমাধান 📄 অনধিকার চর্চা

📄 অনধিকার চর্চা


নাক-গলানো অর্থ অনর্থক বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা, অনধিকার চর্চা করা। প্রত্যেক সমাজে এমন স্বভাবের লোক দেখা যায়, যারা অন্যের বিষয়ে ভীষণ কৌতূহলী। অন্যের জীবনের একান্ত বিষয় জানার জন্য, গোপন কথা উদ্ধার করার জন্য তাদের মধ্যে একধরনের ব্যাগ্রতা কাজ করে; অথচ ব্যক্তিগত দায়-দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে তার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। নিজের কর্তব্য সম্পর্কে যতোটা উদাসীন, অন্যের খুঁটিনাটি সম্পর্কে ততটা তৎপর। কখনো কখনো নাগ গলানো ও অনধিকার চর্চার প্রবণতা এমন প্রকট আকার ধারণ করে এবং ব্যক্তির মনের কৌতূহল এত উদগ্র হয়ে উঠে যে, যত্রতত্র সে প্রশ্ন করে বেড়ায়, জানতে চায়:

'অমুক কী করল? সেখানে কে গেল? অমুকের বাড়িতে কে এল? তমুকের মেয়ের বিয়ে হচ্ছে না কেন? কিংবা, বিয়ে হলো কত বছর গেল, বাচ্চা-কাচ্চা হচ্ছে না কেন? অমুকের সাথে না তার রেষারেষি ছিল, এখন এত ভাব কীসের?'

এমন অনর্থক শত-সহস্র প্রশ্ন তার মনে কিলবিল করতে থাকে আর মুখ পিছলে বেরুতে থাকে। রাসূলুল্লাহ ﷺ এ বিষয়ে সুস্পষ্টভাবে সতর্ক করেছেন। আবূ হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

مِنْ حُسْنِ إِسْلَامِ الْمَرْءِ تَرْكُهُ مَا لَا يَعْنِيهِ

অর্থ: 'মুসলমানের ইসলামের সৌন্দর্য হলো যাবতীয় অনর্থক কাজ থেকে বিরত থাকা।' (ইবনে মাযাহ, ২/১৩১৫)
আরেকটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

مَنْ سَتَرَ عَوْرَةَ أَخِيْهِ الْمُسْلِمِ، سَتَرَ اللَّهُ عَوْرَتَهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ، وَمَنْ كَشَفَ عَوْرَةَ أَخِيْهِ الْمُسْلِمِ، كَشَفَ اللَّهُ عَوْرَتَهُ، حَتَّى يَفْضَحَهُ بِهَا فِيْ بَيْتِهِ» (سنن ابن ماجه ٢/ ٨٥٠)

অর্থ: 'যে ব্যক্তি তার মুসলিম ভাইয়ের দোষ গোপন রাখবে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা তার ভুল-ত্রুটি গোপন রাখবেন। আর যে ব্যক্তি তার মুসলিম ভাইয়ের দোষ ফাঁস করে দিবে আল্লাহ তা'আলাও তার দোষ প্রকাশ করে দিবেন। এমনকি নিজ ঘরে তাকে অপমানিত করে ছাড়বেন।' (ইবনে মাযাহ, ২/৮৫০)

বর্তমান সমাজে নাক গলানোর প্রবণতা ও অনধিকার চর্চার মানসিকতা ব্যাপক আকার ধারণ করেছে, দুরারোগ্য ব্যাধির রূপ পরিগ্রহ করেছে। এ থেকে বাঁচার উপায় কী? এ জটিল সমস্যার সমাধান কী?

সমাধান:
১. মনে রাখতে হবে, আমাদের জীবনকাল খুবই সংক্ষিপ্ত। যা আমাদের দায়-দায়িত্ব, প্রয়োজন ও চাহিদা পূরণের জন্যই পর্যাপ্ত নয়, সেখানে অন্যের বিষয়ে নাক গলানো ও অনধিকার চর্চা করা কোনোভাবেই সমীচীন নয়।
২. পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলার নির্দেশ পালন করুন:

وَلَا تَقْفُ مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ طَ إِنَّ السَّمْعَ وَالْبَصَرَ وَالْفُؤَادَ كُلُّ أُولَئِكَ كَانَ عَنْهُ مَسْئُولًا﴾ [الإسراء: ٣٦]

অর্থ: 'আর সে বিষয়ের পেছনে ছুটো না, যে বিষয়ে তোমার কোন জ্ঞান নেই। কান, চোখ আর অন্তর-এগুলোর সকল বিষয়ে অবশ্যই জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।' (বানী ইসরাঈল, ১৭:৮৮) সুতরাং অন্যের বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা ও গুপ্তচরবৃত্তি থেকে বিরত থাকতে হবে। যবান, চোখ, কান ইত্যাদির অপব্যবহার থেকে বাঁচতে হবে।
৩. মনে রাখতে হবে, অন্যের পিছু লেগে থাকা এবং তার একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়ে অনধিকার চর্চা করা ইত্যাদি দুষ্টাচারের কারণে অনেক সময় অপ্রীতিকর পরিস্থিতি ও ক্ষতির শিকার হতে হয়। তাই অন্যের বিষয়ে নাক গলানো বাদ দিয়ে নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকাই শ্রেয়। সফল ব্যক্তি কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের পথেই সদা ব্যস্ত। অন্যের বিষয়ে অনর্থক কৌতূহল দেখানোর মতো সময় তার নেই।
৪. অন্যের ব্যাপারে যখন কৌতূহল জাগবে, উদগ্র কৌতূহল কাজ করবে, নিজেকেই নিজে জিজ্ঞেস করতে হবে: নিজের যাবতীয় দায়-দায়িত্ব কি পালন করতে পেরেছি? আমার কাজগুলো কি সুচারুরূপে সম্পন্ন করতে পেরেছি? নিজেই তো কত নানা সমস্যায় জর্জরিত। তার সমাধান না করে অন্যের বিষয়ে নাক গলানো কি আমার জন্য সাজে?
৫. প্রত্যেক ব্যক্তিকেই নিজ নিজ কৃতকর্মের দায়ভার বহন করতে হবে। কেউ কারো কৃতকর্মের বোঝা বহন করবে না এবং সে বাধ্যও নয়। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: ﴿وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَى﴾ [الأنعام: ١٦٤] অর্থ: 'এবং কেউ অন্য কারো [গুনাহের] বোঝা বহন করবে না।' (আনআম, ৬: ১৬৪) তাই অন্যের বিষয় এড়িয়ে নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকাই শ্রেয়। অন্যের ছিদ্রান্বেষণ না করে আত্মসমালোচনা করাই কর্তব্য।
৬. পরিবার-পরিজন, বন্ধুবান্ধব ও পাড়া-প্রতিবেশীদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখার ব্যাপারে যত্নশীল হতে হবে। তাদের বিষয়ে নাক গলিয়ে, একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়ে প্রশ্ন করে বিব্রত করা সমীচীন নয়।
৭. অন্যের যোগ্যতা, দক্ষতা ও সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের দিকে না তাকিয়ে আল্লাহ তা'আলা আপনাকে যে অগণিত নিয়ামত দান করেছেন, তার কথা চিন্তা করুন। কারণ, অন্যের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বড় করে দেখার প্রবণতা আপনার মধ্যে মানসিক অস্থিরতা ও আত্মিক কলুষতার জন্ম দিবে।
৮. বর্তমান প্রজন্মের মধ্যে অনধিকার চর্চা ও নাক গলানোর প্রবণতার ব্যাপারে ঘৃণাবোধ সৃষ্টি করতে হবে। এক্ষেত্রে মাতা-পিতাকেই হতে হবে উত্তম আদর্শ। সবার আগে তাদেরই এই স্বভাবদোষ থেকে বিরত থাকা এবং এ সম্পর্কে ঘৃণা প্রকাশ করা কর্তব্য।
৯. রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর বাণী মনে রাখুন এবং তা থেকে প্রকৃত শিক্ষা অর্জন করুন: আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, 'যে ব্যক্তি তার মুসলিম ভাইয়ের দোষ গোপন রাখবে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা তার ভুল-ত্রুটি গোপন রাখবেন। আর যে ব্যক্তি তার মুসলিম ভাইয়ের দোষ ফাঁস করে দিবে আল্লাহ তা'আলাও তার দোষ প্রকাশ করে দিবেন। এমনকি নিজ ঘরে তাকে অপমানিত করে ছাড়বেন।' (ইবনে মাযাহ, ২/৮৫০)
১০. অন্যের বিষয়ে নাক গলানোর স্বভাবদোষ থেকে বেঁচে থাকুন। কেননা এমন স্বভাবদুষ্ট লোক বন্ধু মহলে ও পরিচিত সমাজে অপ্রিয় অনাকাঙ্ক্ষিত। পরিচিত-অপরিচিত সর্বমহলে বাতাসের মতো প্রাণবন্ত ও ফুলের মতো প্রিয় ব্যক্তিত্ব হয়ে উঠুন। তাহলে মানুষ আপনার সাক্ষাৎপ্রত্যাশী হবে এবং আপনার সাথে কথা বলে স্বস্তি পাবে।
১১. অন্যের ব্যক্তিগত বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা থেকে বিরত থাকুন। তারাও আপনার একান্ত বিষয়ে অনধিকার চর্চা থেকে বিরত থাকবে। মনে রাখবেন, প্রত্যেকের জীবনের কিছু গোপনীয়তা আছে। আপনি কখনো তা উদ্‌ঘাটনে প্রবৃত্ত হবেন না। কেউ যদি আপনার সাহায্য-সহযোগিতার মুখাপেক্ষী হয়, তাহলে আপনাকে আগ বাড়িয়ে কিছু জিজ্ঞেস করতে হবে না, নিজ থেকেই সে আপনার কাছে তার সমস্যার কথা খুলে বলবে এবং তার কর্তব্য সম্পর্কে পরামর্শ গ্রহণ করবে।
১২. অন্যের ব্যক্তিগত বিষয়ে নাকগলানোর আগে নিজেকে একবার জিজ্ঞেস করুন: কেউ যদি আমার একান্ত বিষয় জানার জন্য তৎপর হয়, খুটিয়ে খুটিয়ে সব গোপনীয়তা উদ্ধারের চেষ্টা করে, আমার কী দশা হবে? আমার এমন স্বভাব-দোষের কারণেও তো অন্যরাও ভীষণ বিব্রত বোধ করবে, চরম অস্বস্তিতে পড়বে।
১৩. যারা অন্যের বিষয়ে নাক গলায়, অনধিকার চর্চা করে, তাদের থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখুন। এমন কারোর সাথে যদি সাক্ষাৎ হয়েই যায়, তাহলে অত্যন্ত সাবধানে আগপিছ ভেবে-চিন্তে কথা বলুন। তার নাক গলানোর প্রবণতা থেকে বাঁচার জন্য কুশল বিনিময়স্বরূপ তার উদ্দেশ্যে প্রশ্ন জুড়ে দিন। কিংবা তার উদ্দেশ্যমূলক প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে প্রসঙ্গ পরিবর্তন করুন। আপনার একান্ত বিষয় জানার জন্য সে যদি পীড়াপীড়ি করে, তাহলে ভদ্রভাবে বলে দিন: 'এটা আমার একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়। তা জানা ঠিক হবে না।' এতে কোনো লজ্জাবোধ করবেন না। সে তো লাজ-লজ্জা ছেড়ে আপনাকে অযাচিত প্রশ্ন করতে পেরেছে, আপনি কেন নৈতিক উত্তর প্রদানে লজ্জিত হতে যাবেন? পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: وَإِذَا خَاطَبَهُمُ الْجَهِلُونَ قَالُوا سَلَمَا ﴾ [الفرقان: ٦٣] অর্থ: 'এবং অজ্ঞ লোকেরা যখন তাদেরকে সম্বোধন করে তখন তারা বলে 'সালাম'।' (ফুরকান, ২৫: ৬৩)

পরিশিষ্ট:
হাদীসে বর্ণিত হয়েছে: উকবা বিন আমের (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি জিজ্ঞেস করলাম, 'ইয়া রাসূলুল্লাহ, মুক্তির পথ কী?' তিনি বললেন, 'তোমার যবান সংযত রাখো। (ফেতনার যামানায়) নিজ ঘরে আবদ্ধ থাক। নিজের ভুল-ত্রুটির জন্য অনুতপ্ত হও।' (তিরমিজী, ৪/৬০৫)

ঢাকনা-ঢাকা পাত্রঃ ছোট্ট গল্প। তাতে নাক গলানোর ও অনধিকার চর্চার বিরুদ্ধে সূক্ষ্ম প্রতিবাদ বিদ্যমান। এক মেয়ে ঢাকনা-ঢাকা পাত্র হাতে হেঁটে যাচ্ছিল। পথিমধ্যে এক লোক জিজ্ঞেস করল: 'এই মেয়ে, কী নিয়ে যাচ্ছ? এই পাত্রে কী?' উত্তরে মেয়েটি বলল: 'আমার মা যদি সবাইকে দেখাতে চাইতেন, পাত্রে কী আছে, তাহলে এভাবে ঢেকে দিতেন না।'

আপনি যদি অনর্থক কাজ থেকে বিরত থাকেন, অনধিকার চর্চা পরিহার করেন, তাহলে নিজের প্রয়োজন দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে পর্যাপ্ত সময়-শ্রম ব্যয় করার সুযোগ পাবেন। -আয়েয আল কারনী

📘 আল হাল্লু জীবন সমস্যার সমাধান 📄 বন্ধ্যত্ব

📄 বন্ধ্যত্ব


বন্ধ্যত্ব হলো সন্তান প্রজননে অক্ষমতা। এ সমস্যা যেমন নারীর ক্ষেত্রে হতে পারে, পুরুষের ক্ষেত্রেও হতে পারে। একটা পরিবারে বন্ধ্যত্ব-সমস্যা দেখা দিলে প্রথমেই নারীর দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করা হয়। এটা অন্যায়। বন্ধ্যত্বের কারণে একটা পরিবার নানাবিধ সমস্যার সম্মুখীন হয়। প্রশান্ত প্রাণবন্ত মন হয়ে উঠে বিষণ্ণ অস্থির। শান্তি-সুখের সংসারে নেমে আসে দুশ্চিন্তা-বিষাদের অন্ধকার। নারী তার সংসার জীবনের অর্থময়তা হারাতে থাকে। পুরুষ তার ভবিষ্যৎ উত্তরাধিকারের অনিশ্চয়তায় ভুগে কর্মস্পৃহা হারাতে থাকে। পারিবারিক জীবনের এ সমস্যা থেকে বাঁচার উপায় কী? এ সংকট মোকাবিলায় আমাদের করণীয় কী?

সমাধান:
১. বিয়ের আগে অবশ্যই ডাক্তারি চেকআপ-এর বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে। পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হতে হবে-ছেলে-মেয়ের কোনো একজন গুরুতর কোনো শারীরিক কিংবা মানসিক রোগে আক্রান্ত কি না?
২. জেনে রাখুন, বন্ধ্যত্ব সমস্যার সম্মুখীন আপনি একাই নন। আপনার পূর্বেও কোনো কোনো নবী-রাসূল ও মহা মনীষী এ সমস্যার শিকার হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে এমনও আছেন, যাঁরা বিয়ে পর্যন্ত করেননি। কিন্তু এ কারণে তো তাঁদের মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব একটুও কমেনি। তাঁদের জীবনের মহৎ লক্ষ্য-উদ্দেশ্য বাধাগ্রস্ত হয়নি। তাহলে আপনি কেন নিজের সাধারণ জীবনযাপনের পথে এ সমস্যাটাকে এত গুরুতর মনে করছেন!
৩. বন্ধ্যত্বের বিষয়টাকে আপনার মন-মানসিকতা থেকে ঝেড়ে ফেলুন। ব্যস্ততা ছাড়া বেশিক্ষণ একাকী থাকা ঠিক নয়। তাহলে যত দুশ্চিন্তা-দুর্ভাবনা আপনার মনে বাসা বাঁধবে। সবসময় কর্মমুখর জীবনযাপন করুন। স্বপ্নবান আশাবাদী ও পরিশ্রমী ব্যক্তিদের সাথে চলুন। জনকল্যাণমূলক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করুন। তা আপনাকে জীবনের সমস্যা-সংকটের কথা ভুলিয়ে সাবলীল প্রাণবন্ত জীবনযাপনে সাহায্য করবে।
৪. কয়েকজন এতিম ও দরিদ্র সন্তানকে নিজ সন্তানের মতো আপন করে নিন। তাদের আদর-যত্ন ও দেখাশোনা করুন। প্রয়োজনের মুহূর্তে তারাই সন্তানের চেয়েও বেশি আপন হয়ে আপনার পাশে দাঁড়াবে।
৫. একটা এতিম সন্তানকে পালক নিন, কিংবা তার ভরণ-পোষণের দায়িত্ব গ্রহণ করুন। এ মহৎ কর্মে যুগপদ দু'টি কল্যাণ নিহিত। প্রথমত, আপনার জীবন সুখ-শান্তিতে ভরে উঠবে। দ্বিতীয়ত, জান্নাতুল ফিরদাউসে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সঙ্গী হওয়ার পরম সৌভাগ্য লাভ করবেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "আমি ও এতিমের দায়িত্ব গ্রহণকারী জান্নাতে এই দু'আঙুলের ন্যায় পাশাপাশি অবস্থান করব। এ কথা বলার পর রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর মধ্যমা ও তর্জনী আঙুল কাছাকাছি করে দেখালেন। দু'টি আঙুলের মধ্যে তিনি সামান্য ফাঁকা রাখলেন।" (বুখারী, ৭/৫৩)
৬. এতিম-অনাথ শিশুদের জন্য অর্থ ব্যয় করাও অনেক ফযিলতপূর্ণ কাজ। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেন: يَسْأَلُونَكَ مَاذَا يُنْفِقُونَ ۖ قُلْ مَا أَنْفَقْتُمْ مِّنْ خَيْرٍ فَلِلْوَالِدَيْنِ وَالْأَقْرَبِينَ وَالْيَتَامَىٰ وَالْمَسَاكِينِ وَابْنِ السَّبِيلِ ۗ وَمَا تَفْعَلُوا مِنْ خَيْرٍ فَإِنَّ اللَّهَ بِهِ عَلِيمٌ ﴿٢١٥﴾ [البقرة : ٢١٥] অর্থ: লোকে আপনাকে জিজ্ঞেস করে (আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য) তারা কী ব্যয় করবে? আপনি বলে দিন, তোমরা যে সম্পদই ব্যয় কর তা পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন, ইয়াতীম, মিসকীন ও মুসাফিরদের জন্য হওয়া চাই। আর তোমরা কল্যাণকর যে কাজই কর আল্লাহ সে সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবগত। (বাকারা, ২: ২১৫)
৭. সন্তান না হওয়ার ইতিবাচক দিকগুলোর কথা চিন্তা করুন। যেমন : সন্তানের ভরণ-পোষণ ও লালন-পালনের ঝক্কি-ঝামেলা থেকে মুক্ত থাকা সম্ভব। সন্তানের নানা রোগ-শোক ও বিপদ-আপদ থেকে আশঙ্কামুক্ত হয়ে নির্ঝঞ্ঝাট জীবনযাপন করার সুযোগ হয়। কারো জীবদ্দশায় যদি নিজ সন্তানের মৃত্যু দেখতে হয়, এর দুর্বিষহ কষ্ট-যন্ত্রণা তাকে আজীবন বয়ে বেড়াতে হয়। কিন্তু যদি সন্তান না থাকে, তাহলে নিজ চোখে সন্তানের অকাল মৃত্যু দেখার জ্বালা সহ্য করতে হয় না। সন্তান যদি কোনো অপরাধ জগতের সাথে জড়িয়ে পড়ে কিংবা কোনো নৈতিক ও চারিত্রিক ভ্রষ্টাচারে লিপ্ত হয়, তাকে সুপথে ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টায় ভুক্তভোগী মা-বাবার জীবন নিঃশেষ হয়ে যায়। নিঃসন্তান হওয়ার ফলে আপনার জীবনে এ ধরনের কোনো আশঙ্কা নেই।
৮. নিজেকে একবার জিজ্ঞেস করুন, কিংবা আপনার চারপাশের সমাজের খোঁজ নিয়ে দেখুন, এমন অনেক লোকের সন্ধান পাবেন, যারা দশটি কিংবা তার কম-বেশি সন্তানের বিরাট পরিবারের কর্তা। সারা জীবন সংসারের ঘানি টেনে, পরিবারের নানান ঝক্কিঝামেলা সামাল দিতে গিয়ে এখন তারা এমন পরিস্থিতির শিকার যে, সর্বান্তকরণে তাদের একটাই কামনা, তারা যদি নিঃসন্তান হতে পারত! এ অবস্থা বিবেচনায় আপনি রবের শোকর আদায় করুন। যে তিনি আপনাকে জীবনের এমন কঠিন পরিস্থিতি থেকে রক্ষা করেছেন।
৯. মনে-প্রাণে সর্বদা এ চিন্তা লালন করুন, আল্লাহ তা'আলার ফায়সালায় প্রকৃত কল্যাণ নিহিত। সন্তান লালন-পালনে, না কি নিঃসন্তান জীবনযাপনে, অসুস্থতায় না কি সুস্থতায়, সচ্ছলতায় না কি দরিদ্রতায়-কীসে আপনার কল্যাণ নিহিত, এ বিষয়ে মহান আল্লাহ তা'আলাই সর্বজ্ঞাত। তাঁর ফায়সালাই সন্তুষ্টচিত্তে গ্রহণ করুন। তিনিই সর্বশ্রেষ্ঠ ফায়সালাকারী।
১০. কিতাব সম্পর্কে হাফেজ ইবনুল কাইয়্যিম জাওযী (রহ.) (৬৯১-৭৫১ হি.)-এর অভিমত শুনুন। তিনি বলেছেন: 'আপনার কিতাবগুলো আপনার চিরস্থায়ী সন্তান।' অর্থাৎ, মৃত্যুর পর সমাজের মধ্যে সন্তানই আপনার প্রতিচ্ছবি হয়ে থাকবে। কালের ব্যবধানে একদিন তারও মৃত্যু হবে। আপনার অবদানও নিঃশেষ হয়ে যাবে। কিন্তু আপনার রচিত বইয়ের কোনো মৃত্যু নেই। তা চিরদিন আপনার অবদান ও সুকীর্তির প্রতিচ্ছবি হয়ে থাকবে। আপনি এমন কোনো উদ্যোগ বাস্তবায়নে সচেষ্ট হোন, মানবকল্যাণে যার অবদান স্থায়ী, দীর্ঘস্থায়ী।
১১. মেধাবী যোগ্য ছাত্র-গড়ার মহৎ উদ্যোগে নিয়োজিত হোন। আপন সন্তানের মতো তাদের দেখাশোনা করুন। ইহকাল ও পরকালের কল্যাণে তারাই আপনার আপন সন্তানের চেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।
১২. বিয়ে করেছেন। একএক করে কয়েক বছর পার হয়ে গেল, কিন্তু সন্তানের দেখা নেই। আশাহত হবেন না। আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হবেন না। এমন অনেকের কথা শুনেছি, বিয়ের দীর্ঘ কয়েক বছর পর এক সময় যখন তারা সন্তানের আশা ছেড়ে দিয়েছে, আল্লাহ তা'আলা তাদের কোল জুড়ে ফুটফুটে সন্তান দান করেছেন। অসুস্থতার পর সুস্থতা, অসচ্ছলতার পর সচ্ছলতা ও দুঃখের পর সুখ-পরিবর্তনের এই চলমান ধারাই হলো জীবন। সুতরাং দীর্ঘকাল সন্তানহীনতার কষ্টের পর সন্তান লাভের সুখ সমাগত।
১৩. এই দু'আটি বেশি বেশি পাঠ করুন: رَبِّ لَا تَذَرْنِي فَرْدًا وَأَنتَ خَيْرُ الْوَارִثِينَ﴾ [الأنبياء: ٨٩] অর্থ: 'হে আমার রব্ব! আমাকে একা রেখ না, আর তুমিই শ্রেষ্ঠ উত্তরাধিকারী।' (আম্বিয়া, ২১: ৮৯) যারা সন্তানহীনতার সম্মুখীন হয়েছেন, এই দু'আটি তাদের জন্য ঐশী সমাধান।
১৪. অবসর ও কাজেকর্মে, ঘরে-বাইরে সর্বদা তাওবা-ইস্তিগফারে মশগুল থাকুন। এই আমলের প্রতিদানে আল্লাহ তা'আলা সন্তান-সন্ততি দান করার ওয়াদা করেছেন: فَقُلْتُ اسْتَغْفِرُوا رَبَّكُمْ إِنَّهُ كَانَ غَفَّارًا * يُرْسِلِ السَّمَاءَ عَلَيْكُمْ مِدْرَارًا * وَيُمْدِدْكُمْ بِأَمْوَالٍ وَبَنِينَ وَيَجْعَلْ لَكُمْ جَنَّتٍ وَيَجْعَلْ لَكُمْ اَنْهُرًا﴾ [نوح: ١٠-١٢] অর্থ: 'আমি তাদেরকে বলেছি, নিজ প্রতিপালকের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর। নিশ্চিতভাবে জেন, তিনি অতিশয় ক্ষমাশীল। তিনি আকাশ থেকে তোমাদের ওপর প্রচুর বৃষ্টি বর্ষণ করবেন এবং তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে উন্নতি দান করবেন এবং তোমাদের জন্য সৃষ্টি করবেন উদ্যান আর তোমাদের জন্য নদ-নদীর ব্যবস্থা করে দিবেন।' (নূহ, ৭১: ১০-১২)
১৫. নিরাশ হবেন না। এখন বন্ধ্যত্ব সমস্যার সমাধানে এবং সন্তান প্রজননের জন্য অনেক উন্নত চিকিৎসা রয়েছে। সুতরাং আপনি এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের শরণাপন্ন হোন এবং আল্লাহর তা'আলার কাছে দু'আ করতে থাকুন। তিনিই সর্বশ্রোতা ও দোয়া কবুলকারী।

পরিশিষ্ট:
নবী যাকারিয়া (আ.) অশীতিপর বৃদ্ধ কিংবা বয়স একশ ছুঁইছুঁই। আপন রবের দরবারে সন্তানহীনতার অনুযোগ করলেন। সিজদায় লুটিয়ে পড়ে কেঁদে যারযার হয়ে দু'আ করলেন: وَرَبِّ لَا تَذَرْنِي فَرْدًا وَانْتَ خَيْرُ الْوَارִثِينَ﴾ [الأنبياء: ٨٩] অর্থ: 'হে আমার রব্ব! আমাকে একা রেখ না, আর তুমিই শ্রেষ্ঠ উত্তরাধিকারী।' (আম্বিয়া, ২১: ৮৯) আল্লাহ তা'আলা তাঁর নবীর দু'আ কবুল করলেন। পড়ন্ত বার্ধক্যে পুত্রসন্তান দান করলেন। তিনি হলেন নবী ইয়াহইয়া (আ.)। পুত্র ইয়াহইয়া (আ.)-কে পেয়ে যাকারিয়া (আ.) আনন্দে আত্মহারা। আপন রবের উদ্দেশ্যে বললেন (পবিত্র কুরআনের ভাষায়): قَالَ رَبِّ إِنِّي وَهَنَ الْعَظْمُ مِنِّي وَاشْتَعَلَ الرَّأْسُ شَيْبًا وَلَمْ أَكُنْ بِدُعَائِكَ رَبِّ شَقِيًّا ) [مريم: ٤] অর্থ: 'সে বলেছিল, হে আমার প্রতিপালক! আমার অস্থিরাজি পর্যন্ত জীর্ণ হয়ে গেছে, মাথা বার্ধক্যজনিত শুভ্রতায় উজ্জ্বলিত হয়ে উঠেছে এবং হে আমার প্রতিপালক! আমি তোমার কাছে প্রার্থনা করে কখনও ব্যর্থকাম হইনি।' (মারইয়াম, ১৯: ৪) আল্লাহ তা'আলার কুদরত এমনই। সবকিছুর ঊর্ধ্বে। সমস্ত বাহ্যিকতার ঊর্ধ্বে। তাই অবস্থা যতই প্রতিকূল হোক, সমস্যা যতই চরম আকার ধারণ করুক, আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হবেন না। আপনার যেকোনো প্রয়োজন, নিবেদন করুন একমাত্র আল্লাহর কাছে। তিনিই দোয়া কবুলকারী।

📘 আল হাল্লু জীবন সমস্যার সমাধান 📄 অসুস্থতা

📄 অসুস্থতা


ভালো-মন্দ, সুখ-দুঃখ, সচ্ছলতা-অসচ্ছলতা ও সুস্থতা-অসুস্থতা-অনুকূল ও প্রতিকূল অবস্থার এই চলমান ধারাই হলো পার্থিব জীবন। সুস্থতার মতো অসুস্থতাও জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ ও অনাকাঙ্ক্ষিত বাস্তবতা। নবী-রাসূলগণের মতো শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি থেকে শুরু করে বর্তমান পৃথিবীর সর্বনিম্নস্তরের লোকটাও এ বাস্তবতার শিকার। সুস্থতার সময় তো মানুষ তার যোগ্যতা-দক্ষতার বড়াই করে। পদমর্যাদা ও প্রভাব-প্রতিপত্তির অহমিকা প্রদর্শন করে। বংশমর্যাদা, অর্থবল, লোকবল তাকে এতটাই মোহিত করে রাখে, চরম অবাধ্যতা ও স্বেচ্ছাচারিতা প্রদর্শনেও সে কোনো কিছুর পরোয়া করে না। কিন্তু যে-ই অসুস্থ হয়, তার আসল দুর্বলতা প্রকাশ পায়। শরীর-স্বাস্থ্য ও মন-মানসিকতায় ভীষণ অসহায়ত্বের ছাপ ফুটে উঠে। অসুস্থতার এ সময়টাতেই মানুষ বুঝতে পারে, সে কত দুর্বল, কত অসহায়!

অসুস্থতার ধরন ভিন্নতায় ব্যক্তি নানা ধরনের প্রতিকূলতার শিকার হয়। সুস্বাদু খাবার-দাবার বিস্বাদ লাগে। আরামের বিশ্রাম হারাম হয়ে যায়। গোটা দেহ নিস্তেজ শক্তিহীন হয়ে পড়ে। মন মানসিকতা তার স্বাভাবিক চঞ্চলতা ও উদ্যমতা হারায়। জীবনের এই প্রতিকূলতাকে আমরা কোন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখব? অসুস্থ অবস্থায় আমাদের করণীয় কী হবে?

সমাধান:
১. আমি আপনাকে সে কথাই বলবো, যা রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: «لا بَأْسَ طَهُورُ إِنْ شَاءَ اللهُ» (صحيح البخاري) অর্থ: 'ভয়ের কিছু নেই। ইনশাআল্লাহ ভালো হয়ে যাবে।' (বুখারী, ৪/২০২) অসুস্থতার কবলে ভেঙ্গে পড়বেন না। জেনে রাখুন, অসুস্থতা অবশ্যই আপনাকে সুস্থতার নিয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দিবে। মন থেকে অহংকার ও দাম্ভিকতার শিকড় উপড়ে ফেলবে। উদাসীনতা দূর করে সচেতনতা বৃদ্ধি করবে।
২. অসুস্থ হলে নিকটজনদের সাথে পরামর্শ করুন এবং আপনার অসুস্থতার বিষয়ে অভিজ্ঞ ডাক্তারের শরণাপন্ন হোন। ডাক্তারের পরামর্শ মোতাবেক উন্নত চিকিৎসা গ্রহণ করুন।
৩. চিকিৎসকের কর্তব্য হলো, রোগীর সাথে সহাস্য বদনে কুশল বিনিময় করা। অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে রোগীর অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা। রোগ যতই গুরুতর হোক, কোনো ধরনের ভয় ও আশঙ্কার প্রকাশ না করে রোগীর কাছে সহজ-স্বাভাবিকভাবে তার রোগের কথা বলা। সঙ্গে সঙ্গে তাকে এ-বলে আশ্বস্ত করা, দুশ্চিন্তার কিছু নেই, ইনশাআল্লাহ, অচিরেই সুস্থ হয়ে যাবেন।
৪. আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান এটা প্রমাণ করেছে যে, রোগীর উঁচু মনোবল ও আরোগ্য লাভের দৃঢ় প্রত্যাশা তার দেহে রোগ-প্রতিরোধ-ক্ষমতা বৃদ্ধি করে এবং দ্রুত আরোগ্য লাভে সহায়তা করে। পক্ষান্তরে, হতাশা ও নিরাশা রোগীর দেহে রোগ-প্রতিরোধ-ক্ষমতাকে দুর্বল করে ফেলে। ফলে তার আরোগ্য লাভও বিলম্বিত হতে থাকে।
৫. মনে রাখবেন, আপনার রোগ যত গুরুতরই হোক-না-কেন, পৃথিবীতে এর চেয়েও জটিল ও ভয়ানক রোগ বিদ্যমান। তাই আপন রবের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করুন এজন্য যে, তিনি আপনাকে তুলনামূলক বড় রোগ থেকে মুক্ত রেখেছেন।
৬. আরেকটি বিষয় মনে রাখবেন, আল্লাহ তা'আলার ফায়সালায় প্রকৃত কল্যাণ নিহিত। বিজ্ঞজনের বাণী: 'অসুস্থতা তোমাকে কত গুনাহ, নাফরমানি ও ভুল-বিচ্যুতি থেকে বিরত রেখেছে।'
৭. আপনি অসুস্থ? তাহলে সুসংবাদ গ্রহণ করুন। অসুস্থতা হলো আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টি লাভের অন্যতম মাধ্যম। কেননা এর মাধ্যমে বান্দার গুনাহ মাফ হয়। আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রতিদান নিশ্চিত হয় এবং আল্লাহ তা'আলার নিকট তার মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। ফযল ইবনে সাহল (রহ.) বলেছেন: রোগ-শোক ও অসুস্থতায় বান্দার জন্য কিছু নিয়ামত রয়েছে। জ্ঞানী ব্যক্তির তা জেনে রাখা উচিত। নিয়ামতগুলো হলো: অসুস্থতার মাধ্যমে বান্দার গুনাহ মাফ হয়। ধৈর্যধারণের প্রতিদান লাভ হয়। অবহেলা উদাসীনতা দূর হয়ে অসুস্থ ব্যক্তির মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি পায়। সুস্থতার নিয়ামতের গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পারে। গুনাহ ও নাফরমানি পরিহার করে তাওবা করার মানসিকতা তৈরি হয়। আল্লাহর রাস্তায় দান-সদকা করার অনুপ্রেরণা জাগে।
৮. দু'টি কল্যাণ লাভের প্রত্যাশায় অসুস্থ অবস্থায় পাঠ্য দু'আগুলো পাঠ করুন। প্রথমটি সুস্থতা লাভ, দ্বিতীয়টি গুনাহমুক্ত হওয়া।
৯. অসুস্থ হলে প্রতিদান লাভের প্রত্যাশায় ধৈর্যধারণ করুন। এর বদৌলতে আল্লাহ তা'আলার দরবারে যে উঁচু মর্তবা লাভ হবে, অনেক নেক আমলের মাধ্যমেও তা অর্জন করা কঠিন। অসুস্থতার মাধ্যমে মূলত আল্লাহ তা'আলা আপনাকে পরীক্ষা করছেন, উঁচু মরতবা লাভ করার এ সুযোগ আপনি কাজে লাগাতে পারেন কি না?
১০. লক্ষ করে দেখুন, আপনি একাই অসুস্থ নন, গোটা বিশ্বে আরও লক্ষ কোটি মানুষ নানা রকম অসুস্থতায় জর্জরিত। তাদের অনেকের আরোগ্য লাভ দীর্ঘ সময়সাপেক্ষ। আর কারো কারো মৃত্যু অনিবার্য। সে তুলনায় আপনার অসুস্থতা নিতান্ত সাধারণ মনে হবে। সুতরাং তাদের কথা চিন্তা করে সান্ত্বনা গ্রহণ করুন।
১১ অসুস্থতার অন্যতম ইতিবাচক দিক হলো, ব্যক্তিকে তা অন্যান্য রোগীদের কথা স্মরণ করিয়ে দেয় এবং তাদের সেবা-শুশ্রূষা করার মানসিকতা তৈরি করে। হাদীসে কুদসীতে বর্ণিত হয়েছে: আবূ হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, কেয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা বলবেন, 'হে আদম সন্তান! আমি অসুস্থ হয়েছিলাম; কিন্তু তুমি আমার সেবা করোনি।' বান্দা বলবে: 'আপনি তো বিশ্বজগতের প্রতিপালক। আর আমি আপনার নগণ্য বান্দা। আমার পক্ষে কীভাবে আপনার সেবা-শুশ্রূষা করা সম্ভব?' আল্লহ তা'আলা বলবেন: 'তোমার কি জানা ছিল না, আমার বান্দা অমুকের ছেলে অমুক অসুস্থ? কিন্তু তুমি তার সেবাযত্ন করনি। তুমি যদি তার সেবাযত্ন করতে, তাহলে তার কাছে আমাকে পেতে।' (মুসলিম, ৪/১৯৯)
১২. দান-সদকা হলো যাবতীয় রোগের প্রতিষেধক এবং জাহান্নামের অগ্নিনির্বাপক। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "دَاوُوا مَرْضَاكُمْ بِالصَّدَقَةِ" অর্থ: দান-সদকার মাধ্যমে তোমরা রোগীদের চিকিৎসা কর।
১৩. আরোগ্য লাভের জন্য অস্থির ত্বরাপ্রবণ হওয়া সমীচীন নয়। এতে হিতে বিপরীত হতে পারে। রোগের মাত্রা আরও বেড়ে যেতে পারে। প্রতিটা রোগই নির্দিষ্ট কিছু কাল স্থায়ী হয়। তাই ধৈর্যধারণ করুন এবং আরোগ্য লাভের প্রত্যাশায় নিয়মিত দু'আ করতে থাকুন। মনে রাখবেন, আরোগ্য দানকারী একমাত্র আল্লাহ তা'আলা। হাসপাতাল, চিকিৎসক ও চিকিৎসা-এগুলো বাহ্যিক উপায় মাত্র। মূর্তিপূজারিদের সামনে ইবরাহিম (আ.) আপন রবের ক্ষমতা ও শক্তিমত্তার কথা বর্ণনা প্রসঙ্গে বলেছেন (পবিত্র কুরআনের ভাষায়): ﴿وَإِذَا مَرِضْتُ فَهُوَ يَشْفِينِ﴾ [الشراء: ٨٠] অর্থ: 'এবং আমি যখন পীড়িত হই, তিনিই আমাকে শেফা দান করেন।' (শুআরা, ২৬: ৮০)
১৪. মনে রাখতে হবে, মানবজাতির আসল ব্যাধি হলো ঈমান ও বিশ্বাসের ব্যাধি। তাই পবিত্র কুরআনে দৈহিক রোগ-ব্যাধির তুলনায় হৃদয় ও আত্মা এবং ঈমান ও বিশ্বাসের ব্যাধির ব্যাপারে অধিক সতর্ক করা হয়েছে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: ﴿فِي قُلُوبِهِمْ مَرَضٌ فَزَادَهُمُ اللَّهُ مَرَضًا وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ هُ بِمَا كَانُوا يَكْذِبُونَ﴾ [البقرة: ١٠] অর্থ: 'তাদের অন্তরে আছে রোগ। আল্লাহ তাদের রোগ আরও বৃদ্ধি করে দিয়েছেন। আর তাদের জন্য যন্ত্রণাময় শাস্তি প্রস্তুত রয়েছে, যেহেতু তারা মিথ্যা বলত।' (বাকারা, ২: ১০)
১৫. জাগতিক জীবন তো দুঃখ-কষ্ট, বিপদ-আপদ, রোগ-ব্যাধি ও দুর্যোগ-দুর্বিপাকে আকীর্ণ। প্রকৃত সুখ-শান্তি ও সমৃদ্ধির জায়গা হলো চিরস্থায়ী জান্নাত। তাই ইহজীবনের বাস্তবতা মেনে ধৈর্যধারণ করা এবং আল্লাহ তা'আলার আনুগত্যে মশগুল থাকাই শ্রেয়। এর মাধ্যমেই পরকালের সফলতা ও জান্নাতের পথ সুগম হবে।
১৬. আমি এক ব্যক্তিকে চিনি। তরুণ বয়সে জটিল এক রোগে আক্রান্ত হয়ে কাঁধ থেকে তার বাঁ হাত কেটে ফেলতে হয়েছিল। এখন সে পরিবার, সন্তান নিয়ে বেশ সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যে বেঁচে আছে। পেশায় গাড়ি চালক। এক হাতেই সে এমন স্বচ্ছন্দে গাড়ি চালায় ও অন্যান্য কাজকর্ম করে, যেন সৃষ্টিগতভাবেই সে এক হাত নিয়ে জন্মেছে। সুতরাং আপনিও আল্লাহ তা'আলার ফায়সালায় সন্তুষ্ট থাকুন। এতেই আপনার মানসিক প্রশান্তি নিহিত।
১৭. অসুস্থ ব্যক্তির শারীরিক ও মানসিক অবস্থার প্রতি লক্ষ রাখা, তার সাথে আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব ও পরিচিতজনদের সাক্ষাৎ করা কর্তব্য। পাশাপাশি তাকে সাহায্য-সহযোগিতা করা, দ্রুত আরোগ্য লাভের আশ্বাস দেওয়াও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর ফলে রোগী শারীরিকভাবে দুর্বল হলেও তার মানসিক শক্তি অটুট থাকে। দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠার জন্য যা অত্যন্ত কার্যকর।
১৮. অসুস্থতা থেকে মুক্ত থাকার উদ্দেশ্যে সকাল-সন্ধ্যায় 'আদইয়ায়ে মাসূরা' নিয়মিতভাবে পাঠ করুন। শরীয়ত সমর্থিত পন্থায় 'রুকইয়া' এর পন্থা অবলম্বন করুন। এ দু'টি পন্থা হলো বান্দার ঐশী সুরক্ষা। যা রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর উম্মতকে শিখিয়ে দিয়ে গেছেন।
১৯. মনে রাখবেন, অসুস্থ হয়ে চিকিৎসা করানোর চেয়ে রোগ প্রতিরোধ করা ও রোগের কারণ-উপকরণ থেকে সুরক্ষিত থাকাই শ্রেয়। এ লক্ষ্যে শুয়ে-বসে অলস অবসর জীবনযাপন, অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত ও তৈলাক্ত খাবার এবং ধূমপান ইত্যাদির মতো স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর কারণগুলো থেকে বেঁচে থাকতে হবে। পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর খাবার-দাবার, নিয়মিত হাঁটাচলা ও শরীরচর্চায় যত্নবান হওয়া আবশ্যক।
২০. অসুস্থ হলে আল্লার দয়া ও অনুগ্রহ থেকে নিরাশ হওয়া কিংবা সুস্থ হওয়ার পর তাঁর নিয়ামতের প্রতি অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা-কোনোটাই বাঞ্ছনীয় নয়। তাই অসুস্থ অবস্থায় হতাশায় ভেঙে না পড়ে আল্লাহর ওপর ভরসা করুন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: ﴿وَلَلئِنْ أَذَقْنَا الْإِنْسَانَ مِنَّا رَحْمَةً ثُمَّ نَزَعْنُهَا مِنْهُ إِنَّهُ لَيَتُوسٌ كَفُورٌ ﴾ [هود: ৯] অর্থ: 'যখন আমি মানুষকে আমার নিকট হতে অনুগ্রহ আস্বাদন করাই ও পরে তার থেকে তা প্রত্যাহার করে নেই, তখন সে হতাশ (ও) অকৃতজ্ঞ হয়ে যায়।' (হুদ, ১১:৯)
২১. পবিত্র কুরআন হলো যাবতীয় শারীরিক ও মানসিক রোগের প্রতিষেধক। তাই বেশি বেশি কুরআন তিলাওয়াতের সঙ্গে সঙ্গে নিয়মিত সূরা ফাতেহা, ইখলাস, সূরা ফালাক, সূরা নাস পাঠ করুন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: ﴿وَنُنَزِّلُ مِنَ الْقُرْآنِ مَا هُوَ شِفَاءٌ وَرَحْمَةً لِلْمُؤْمِنِينَ﴾ অর্থ: 'আমি নাযিল করেছি এমন কুরআন, যা মু'মিনদের পক্ষে শেফা ও রহমতের ব্যবস্থা। তবে জালেমদের ক্ষেত্রে এর দ্বারা ক্ষতি ছাড়া অন্য কিছু বৃদ্ধি হয় না।' (বনী ইসরাঈল ১৭:৮২)
২২. আপনার মন-মানসিকতা ও চিন্তা-চেতনা জুড়ে যেন অসুস্থতার প্রভাব বিরাজ করতে না পারে-এ বিষয়ে সচেতন হোন। নিজের ভালো লাগার কোনো কাজে ব্যস্ত থাকা কিংবা বই পড়া, বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা এবং দর্শনীয় স্থানে ঘুরে বেড়ানোর মাধ্যমে অসুস্থতার কথা ভুলে থাকার চেষ্টা করুন।
২৩. দেশের অভিজ্ঞ ডাক্তার ও চিকিৎসকের মাধ্যমে স্বাস্থ্য-সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। যার প্রধান লক্ষ্য-উদ্দেশ্য হবে, সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বাস্থ্যসুরক্ষা ও বিভিন্ন রোগ-বিরোগে তাদের করণীয় কর্তব্য সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা।
২৪. ওষুধ কোম্পানীগুলোকে ওষুধ উৎপাদনের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ গুণগত মান নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি চিকিৎসা বিজ্ঞানের সর্বক্ষেত্রে উন্নতি-অগ্রগতির লক্ষ্যে কাজ করতে হবে। দেশের প্রতিটি শহর, শহরতলি, পল্লি-গ্রাম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা প্রদান করা অত্যাবশ্যক। এটা একই সঙ্গে মানবিকতা ও ইসলামি শরীয়তের দাবি।
২৫. দেশের জ্ঞানী-গুণী, দায়ী ও শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের কর্তব্য হলো, হাসপাতাল ও বিভিন্ন মানবসেবা কেন্দ্রে রোগীদের সাক্ষাতে যাওয়া। তাদের খোঁজ-খবর নেওয়া। তাদের এ কার্যক্রম হতে হবে নিয়ম মাফিক ও ধারাবাহিক। এ সময় তারা নিজেদের সাধ্যানুযায়ী অসুস্থদের সাহায্য-সহযোগিতা করার পাশাপাশি দ্রুত আরোগ্য লাভের আশাবাদ ব্যক্ত করবে এবং সওয়াব ও প্রতিদান লাভের প্রত্যাশায় তাদের সবর ও ধৈর্যধারণে অনুপ্রাণিত করবে।
২৬. সমাজের ধনী ও বিত্তশালী ব্যক্তিবর্গের কর্তব্য হলো, গরিব-মিসকিন ও অসুস্থ লোকদের চিকিৎসা সেবায় আর্থিক অনুদান দেওয়া। কুরআন-সুন্নাহর দৃষ্টিতে এটা বিরাট প্রতিদান ও ফযিলতপূর্ণ আমল।
২৭. রোগী দেখতে যাওয়ার ক্ষেত্রে নিম্নোক্ত আদব রক্ষা করা কর্তব্য: ব্যক্তিগত সুযোগ-সুবিধাকে প্রাধান্য না দিয়ে অসুস্থ ব্যক্তির কাছে উপযুক্ত সময়ে যাওয়া, রোগীর কাছে বেশিক্ষণ অবস্থান না করা, নেতিবাচক কথা ও দুঃসংবাদ এড়িয়ে ইতিবাচক কথা বলা এবং দ্রুত আরোগ্য লাভের আশাবাদ ব্যক্ত করা। অসুস্থতা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে হলে রোগীকে একের পর এক প্রশ্ন না করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছ থেকে জেনে নেওয়া। হাদীসে বর্ণিত রোগী দেখার দু'আ পাঠ করা। আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: مَا مِنْ عَبْدٍ مُسْلِمٍ يَعُودُ مَرِيضًا لَمْ يَحْضُرْ أَجَلُهُ فَيَقُولُ سَبْعَ مَرَّاتٍ ... إِلَّا عُونِي। অর্থ: 'যেকোনো মুসলমান অসুস্থ-যার মৃত্যু এখনও ঘনিয়ে আসেনি-ব্যক্তিকে দেখতে এসে সাতবার এ দু'আ পাঠ করবে, রোগী সুস্থতা লাভ করবে: أَسْأَلُ اللهَ العَظِيمَ رَبَّ العَرْشِ العَظِيمِ أَنْ يَشْفِيَكَ। অর্থ: 'মহা আরশের অধিপতি মহান আল্লাহ তা'আলার কাছে প্রার্থনা করছি, তিনি আপনাকে আরোগ্য দান করুন।' (তিরমিজী, ৪/৪১০) আনাস বিন মালেক (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ যখন কোনো অসুস্থ ব্যক্তিকে দেখতে যেতেন (এই দু'আ) পাঠ করতেন: أَذْهِبِ البَأْسَ رَبَّ النَّاسِ، اشْفِ وَأَنْتَ الشَّافِي، لَا شِفَاءَ إِلَّا شِفَاؤُكَ، شِفَاءً لَا يُغَادِرُ سَقَمًا» (صحيح البخاري) অর্থ: 'হে মানবজাতির প্রতিপালক! (তার) অসুস্থতা দূর করে দিন! (তাকে) আরোগ্য দান করুন। আপনিই তো আরোগ্য দানকারী। আপনি ছাড়া কোনো আরোগ্য দানকারী নেই। (তাকে এমন) সুস্থতা দান করুন, যারপর আর কোনো রোগ থাকবে না।' (বুখারী, ৭/১২১)
২৮. বিজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ মতে প্রতি ছয় মাস অন্তর অন্তর স্বাস্থ্য পরীক্ষার মাধ্যমে সুস্থতা-অসুস্থা যাচাই করা কর্তব্য। সচেতনতামূলক উপায় অবলম্বন করা আবশ্যক। বাহ্যিক উপায় অবলম্বন করা ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা শরীয়তের নির্দেশ।
২৯. সচরাচর সাধারণ রোগগুলোর প্রাথমিক চিকিৎসা সম্পর্কে জেনে রাখুন এবং তা যথাযথ প্রয়োগ করতে শিখুন। সময়ে অসময়ে এ সাধারণ চিকিৎসাই অতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে। যেমন: হাত কেটে যাওয়া, পায়ে সামান্য আঘাত পাওয়া, মাথাব্যথা, ছোট বাচ্চাদের আঘাত পাওয়া ইত্যাদি।
৩০. আপনার ওপর আল্লাহ তা'আলার নায-নিয়ামতের কথা স্মরণ করুন, দেখবেন তা অগণিত। সুস্থতার দিনগুলোর কথা ভাবুন, দেখবেন তা কত দীর্ঘ। এবার অসুস্থতার কয়েকটা দিন গুণে দেখুন, তা হবে নিতান্ত সামান্য। তাই অসুস্থতার গুটি কয়েক দিনের কথা ভুলে সুদীর্ঘ সময়ের সুস্থতা ও সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের কথা মনে রাখুন এবং আল্লাহ তা'আলার নিয়ামতের কৃতজ্ঞতা আদায় করুন।
৩১. আল্লাহ তা'আলা যখন আপনাকে রোগমুক্ত করে সুস্থতা দান করলেন, দৈহিক শক্তি-সামর্থ্য ফিরিয়ে দিলেন, তখন সর্বান্তঃকরণে আল্লাহ তা'আলার প্রশংসা করুন। তাঁর নিয়ামতের কৃতজ্ঞতা স্বীকার করুন। সদ্য অসুস্থতার কথা ভুলে গিয়ে, শক্তি-সামর্থ্য ফিরে পেয়ে যাচ্ছে-তাই জীবনযাপন করা সমীচীন নয়। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: ﴿وَلَلئِنْ أَذَقْنَهُ نَعْمَاءَ بَعْدَ ضَرَّاءَ مَسَّتْهُ لَيَقُولَنَّ ذَهَبَ السَّيِّاتُ عَنِّي ۖ إِنَّهُ لَفَرِحٌ فَخُورٌ﴾ [هود: ১০] অর্থ: 'আবার যখন কোনো দুঃখ-কষ্ট তাকে স্পর্শ করার পর তাকে নিয়ামতরাজি আস্বাদন করাই, তখন সে বলে, আমার সব অমঙ্গল কেটে গেছে। (আর তখন) সে উৎফুল্ল হয়ে অহমিকা প্রদর্শন করতে থাকে।' (হুদ, ১১: ১০)

পরিশিষ্ট:
অসুস্থ অবস্থায় ধৈর্য ও সহনশীলতার সবচেয়ে বিস্ময়কর ঘটনা হলো আল্লাহর নবী আইয়ূব (আ.)-এর ঘটনা। অর্থ-কড়ি, সহায়-সম্পত্তি, সন্তান-সন্ততি, আত্মীয়-স্বজন ও বংশমর্যাদা-কোনো কিছুতেই তার কোনো কমতি ছিল না। জীবনের সর্বক্ষেত্রেই তিনি ছিলেন সুসম্পন্ন। এত বিপুল নায-নিয়ামত ও সীমাহীন সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের মাঝেই আল্লাহ তা'আলা তাঁর নবী আইয়ূব (আ.)-এর ধৈর্যের পরীক্ষা নিতে চাইলেন। তিনি এমন দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হলেন, যা তার গোটা দেহে ছড়িয়ে পড়ল। দেহের ভেতর-বাহির সর্বত্রই রোগের প্রকোপ ছড়িয়ে পড়ল। বাকি রইল শুধু হৃদয় ও জিহ্বা। রোগাক্রান্ত নবী আইয়ূব (আ.) বিপুল অর্থ-কড়ি, সহায়-সম্পত্তি সবই হারালেন। সন্তান-সন্ততি, আত্মীয়-স্বজন সবাই তার সঙ্গ ত্যাগ করল। কিছু দিনের ব্যবধানে তিনি হয়ে পড়লেন সহায়-সম্বলহীন নিঃসঙ্গপ্রায়। তবে সবাই সঙ্গ ত্যাগ করলেও পুণ্যবতী স্ত্রী তাঁর সেবা-শুশ্রূষায় নিয়োজিত থাকলেন। এমন সর্বাঙ্গ রোগীর সেবাযত্নে তিনি একটুও ত্যক্ত-বিরক্ত হলেন না। এমন রোগাক্রান্ত দশায় নবী আইয়ূব (আ.)-এর জীবনের ১৮টা বছর কেটে গেল। কালের নির্মম ঘাত-প্রতিঘাত ও জীবনের চরম দুর্যোগ-দুর্দশার মধ্যেও তিনি আল্লাহর যিকিরে মশগুল থাকতেন। তাঁর প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশে রত থাকতেন। প্রতিদানের প্রত্যাশা এবং ধৈর্য ও সহনশীলতার পথ থেকে একচুল বিচ্যুত হননি। বিরক্তি ও অস্বস্তি তাঁর মনে ছাপ ফেলতে পারেনি। দুরারোগ্য ব্যাধি যখন চরম পর্যায়ে পৌঁছিল, তিনি আপন রবের কাছে দু'আ করলেন এবং পানাহ চাইলেন। পবিত্র কুরআনের ভাষায়: "আর স্মরণ কর আইউবের কথা, যখন সে তার রবকে আহ্বান করে বলেছিল, 'আমি দুঃখ-কষ্টে পতিত হয়েছি। আর আপনি তো সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু।' তখন আমি তাঁর ডাকে সাড়া দিলাম। আর তাঁর যত দুঃখ-কষ্ট ছিল তা দূর করে দিলাম এবং তার পরিবার-পরিজন তাকে দিয়ে দিলাম। আর তাদের সাথে তাদের মত আরো দিলাম আমার পক্ষ থেকে রহমত এবং ইবাদাতকারীদের জন্য উপদেশস্বরূপ।" (আম্বিয়া, ২১: ৮৩, ৮৪) আল্লাহ তা'আলা তাঁর নবীর দু'আ কবুল করলেন এবং আরোগ্য লাভের পন্থা বাতলে দিলেন। আইয়ূব (আ.) আপন রবের নির্দেশ মোতাবেক মাটিতে পদাঘাত করলেন। সঙ্গে সঙ্গে পানির ফোয়ারা উৎসারিত হলো। তাতে গোসল করে তিনি দেহের বাহ্যিক রোগমুক্ত হলেন। এরপর ফোয়ারার পানি পান করে তিনি অভ্যন্তরীণ রোগমুক্ত হলেন। এভাবে তিনি সর্বান্তঃকরণে রোগমুক্ত হয়ে উঠলেন। পবিত্র কুরআনের ভাষায়: (আমি বললাম,) 'তুমি তোমার পা দিয়ে (ভূমিতে) আঘাত কর, এ হচ্ছে গোসলের সুশীতল পানি আর পানীয়'। আর আমার পক্ষ থেকে রহমতস্বরূপ ও বুদ্ধিমানদের জন্য উপদেশস্বরূপ আমি তাকে দান করলাম তার পরিবার-পরিজন ও তাদের সাথে তাদের অনুরূপ অনেককে।' (সোয়াদ, ৩৮: ৪২, ৪৩)

সুস্থতা-অসুস্থতায়, সচ্ছলতা-অসচ্ছলতায়, বিপদ-আপদে ও সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যে সর্বদা আল্লাহ তা'আলার খাঁটি বান্দা হয়ে থাকুন। প্রশংসা ও কৃতজ্ঞচিত্ত বান্দা হয়ে জীবন যাপন করুন। বিশ্বাস করুন, বিপদ থেকে উদ্ধারকারী একমাত্র আল্লাহ তা'আলা। তিনিই পারেন বান্দাকে রোগমুক্ত করে সুস্থতা দান করতে। সুতরাং বিপদ-আপদে ধৈর্যধারণ করুন। আপনার যাবতীয় বিষয় আপন রবের জিম্মায় সমর্পণ করুন এবং তাঁরই ফায়সালায় সন্তুষ্ট থাকুন।

বিখ্যাত আরব কবি আবুল আতাহিয়া (১৩০-২১৩ হি.) বলেছেন: 'ডাক্তারের সাধ্য নেই শুধু চিকিৎসা ও ওষুধের সাহায্যে রোগমুক্ত করার। এত দিন যে ডাক্তার, চিকিৎসা করে কত রোগীকে সুস্থ করে তুলেছেন, আজ যখন রোগাক্রান্ত হয়ে স্বয়ং তিনিই মৃত্যুপথযাত্রী, তখন তার কি-ই বা করার আছে। হাসপাতাল, ডাক্তার, ওষুধ-সবই ব্যর্থ।' রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: «مَا أَنْزَلَ اللهُ دَاءً إِلَّا أَنْزَلَ لَهُ شِفَاءً» (صحيح البخاري) অর্থ: 'আল্লাহ তা'আলা যে রোগই দিয়েছেন তা থেকে আরোগ্য লাভের উপায় বাতলে দিয়েছেন।' (বুখারী, ৭/১২২) কানাডিয়ান লেখক বব প্রক্টর বলেছেন: 'আপনার অসুস্থতার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে যদি লোকদের কাছে ঘটা করে বলতে থাকেন, তাহলে আপনার রোগের মাত্রা আরও বৃদ্ধি পাবে। চারপাশের লোকদের চাহনিতে করুণার ছাপ ফুটে উঠবে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে তারা আপনার অসুস্থতা ও দুর্বলতার কথা স্মরণ করিয়ে পিছিয়ে রাখতে চেষ্টা করবে। তাই অসুস্থতার কথা প্রচার না করে, নিজেকে দুর্বলরূপে উপস্থাপন না করে আত্মবিশ্বাসী হোন। দ্রুত আরোগ্য লাভে আশাবাদী হয়ে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হোন।'

টিকাঃ
৬০. আল-জামেউস্ সাহীহ লিসুনানি ওয়াল মাসানীদ, ৮/৪০২

ফন্ট সাইজ
15px
17px