📘 আল হাল্লু জীবন সমস্যার সমাধান 📄 গুজব

📄 গুজব


গুজব হলো ভিত্তিহীন বানোয়াট খবর, যা জনসাধারণের মধ্যে এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে যে, এটাকে সত্য বলে বিশ্বাস করতে তাদের মনে আর কোনো দ্বিধা-সংশয় থাকে না।

গুজব রটার কারণ:
যদি ভয়, শঙ্কা কিংবা অনিশ্চয়তার পরিবেশ বিরাজ করে, তবে অতি সহজেই সেখানে গুজব ছড়ায়। যদি যথাসময়ে দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে নির্ভরযোগ্য তথ্য না আসে, তবে সে সুযোগেও গুজবের বিস্তার হতে পারে। এছাড়া গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে দোনামনা ও সিদ্ধান্তহীনতায় দীর্ঘ কাল ক্ষেপণ হলেও গুজব রটতে পারে।

গণমানস বা জনতার মনস্তত্ত্বের একটা চরিত্র হলো, সংকট আসছে জেনে তা ঘনীভূত হওয়ার আগেই প্রতিটি মানুষ নিজের ও তার প্রিয়জনদের জন্য নিরাপত্তা ও স্বস্তি নিশ্চিত করতে চায়। মানুষের এই প্রবণতা যৌক্তিক। তাতে বাধা দেওয়ার উপায় নেই। এই যৌক্তিক প্রবণতার সাহায্যেও অনেক সময় গুজবের ডালপালা ছড়ায়।

গুজব সাধারণত চটকদার ও কৌতূহলোদ্দীপক কিংবা অত্যন্ত ভীতিকর ও আশঙ্কাজনক হয়ে থাকে। গুজব হলো দাবানলের মতো, কোত্থেকে উৎপত্তি, কোথায় এর শেষ পরিণতি-এর কোনো নিশ্চয়তা নেই। গুজবও কার থেকে রটেছে, কীভাবে রটেছে, কেন রটেছে, সাধারণ মানুষের অত ভাবার ফুরসত নেই।

গুজব রটানো হয় বিভ্রান্তি সৃষ্টি করার লক্ষ্যে এবং জনসাধারণের নিরাপত্তা ও শান্তি বিঘ্নিত করে বিশৃঙ্খলা ও অস্থিরতা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক অপপ্রচার অথবা পরস্পর বৈরিতা ও শত্রুতা, গুজবের নেপথ্য কারণ হয়ে থাকে।

গুজব মানুষের মধ্যে সংশয় ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে। তাদের সঠিক পথ ও মত থেকে বিচ্যুত করে ছাড়ে। গুজবের হাত ধরে যে সামাজিক অস্থিরতা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়, পর্যায়ক্রমে তা ধ্বংস ও হত্যাযজ্ঞের রূপ ধারণ করে। একটি সমাজে যদি শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখতে হয়, তাহলে জনসাধারণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আবশ্যক। এ লক্ষ্যে মিথ্যা রটনা ও গুজবের ছিদ্রপথগুলো বন্ধ করা কর্তব্য। এ কর্তব্য পালনের যথাযথ উপায় কী? গুজব প্রতিরোধে আমাদের করণীয় কী?

সমাধান:
১. দেশের শিক্ষা-দীক্ষার সার্বিক মানোন্নয়ন করতে হবে। জনসাধারণ সদা চোখে যা দেখে, সরল মনে যা শুনে, তার সবই যেন বিশ্বাস না করে বসে-এ ব্যাপারে সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষা-দীক্ষা ও সচেতনতাই মানুষকে যাবতীয় সন্দেহ-সংশয় ও মিথ্যা গুজব থেকে বিরত রেখে প্রকৃত সত্য উদ্‌ঘাটনের পথে পরিচালিত করে।
২. গুজবের উৎস-অনুসন্ধান ও গুজব-বন্ধে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা-ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সমস্ত সন্দেহ-সংশয় দূর করে জনগণকে প্রকৃত সত্য ও বাস্তবতা সম্পর্কে অবহিত করতে হবে।
৩. গুজব ও বানোয়াট খবর ছড়িয়ে পড়লে সাধারণ মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি সঠিক পথে পরিচালিত করার জন্য গণমাধ্যমকে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে ভিত্তিহীন খবরের প্রতিবাদ করে প্রকৃত সত্য প্রচারে প্রতিশ্রুতিশীল হতে হবে। গুজব ও সন্দেহ-সংশয় ছড়ানোর মতো অনর্থক কাজে সময় নষ্ট না করে জনসাধারণকে ভালো ও কল্যাণকর কাজে সময় ব্যয় করায় অনুপ্রাণিত করতে হবে।
৪. প্রত্যেকেই নিজের যাবতীয় কাজ-কর্মে দায়বদ্ধ হতে হবে। কারোর এই অধিকার নেই যে, নিজের ব্যর্থতা ও বিফলতার দায় অন্যের উপর চাপিয়ে গুজব ছড়ানো।
৫. শোনামাত্রই যেকোনো সংবাদ বিশ্বাস করা ঠিক নয়। কেননা কোনো কোনো সংবাদ বানোয়াট ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যমূলক হয়ে থাকে। তাই মিথ্যা বানোয়াট খবরের ধোঁকায় না পড়ে নির্ভরযোগ্য সূত্রে প্রকৃত সত্য জানার চেষ্টা করুন। এক্ষেত্রে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলার নির্দেশ হলো:

يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنْ جَاءَكُمْ فَاسِقٌ بِنَبَا فَتَبَيَّنُوا أَنْ تُصِيبُوا قَوْمًا بِجَهَالَةٍ فَتُصْبِحُوا عَلَى مَا فَعَلْتُمْ نَدِمِينَ﴾ [الحجرات: ٦]

অর্থ: 'হে মুমিনগণ! কোন ফাসেক যদি তোমাদের কাছে কোন সংবাদ নিয়ে আসে, তবে ভালোভাবে যাচাই করে দেখাবে, যাতে তোমরা অজ্ঞতাবশত কোন সম্প্রদায়ের ক্ষতি করে না বস। ফলে নিজেদের কৃতকর্মের কারণে তোমাদেরকে অনুতপ্ত হতে হয়।' (হুজুরাত, ৪৯: ৬)
৬. অনেক সময় সঠিক আদর্শ ও মতাদর্শের বিরুদ্ধবাদী ও শত্রুভাবাপন্ন লোকদের পক্ষ থেকেও মিথ্যা রটানো হয়ে থাকে। সতর্ক থাকুন, না জেনে, সুনিশ্চিত না হয়ে মিথ্যা বানোয়াট খবরে প্রতারিত হবেন না। গুজবের প্রেক্ষাপটে পবিত্র কুরআনের আদর্শ অনুসরণ করুন। সঠিক তথ্য-প্রমাণ ছাড়া কথা বিশ্বাস না করা এবং নিঃসন্দেহ ও সুনিশ্চিত না হয়ে কোনো কথা না বলাই হলো পবিত্র কুরআনের নির্দেশ। আল্লাহ তা'আলা বলেছেন:

﴿قُلْ هَلْ عِنْدَكُمْ مِّنْ عِلْمٍ فَتُخْرِجُوهُ لَنَا﴾ [الأنعام: ١٤٨]

অর্থ: বল, 'তোমাদের কাছে কি কোন জ্ঞান আছে, যা তোমরা আমাদের জন্য প্রকাশ করবে?' (আনআম, ৬: ১৪৮)
৭. যাচাই করে সুনিশ্চিত না হয়ে কোনো সংবাদ প্রচার করতে যাবেন না। অনেক সাদাসিধে সরল মনের মানুষ তা বিশ্বাস করে যত্রতত্র ছড়াতে থাকে।
৮. গুজব ও বিশৃঙ্খলার মুহূর্তে ঘরে অবস্থান করুন এবং নীরব ভূমিকা পালন করুন। কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সাথে জড়ানো এবং এ সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করা সমীচীন নয়। তবে যদি এমন কোনো কথা বলতে হয়, যাতে দেশ ও দশের কল্যাণ হবে তাহলে বলুন। এটাই শান্তি ও নিরাপত্তার উপায়। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: أَمْلِকُ عَلَيْكَ لِسَانَكَ، وَلْيَسَعْكَ بَيْتُكَ، وَابْكِ عَلَى خَطِيئَتِكَ। অর্থ: 'তোমার যবান সংযত রাখ। (ফেতনার যামানায়) নিজ ঘরে আবদ্ধ থাক। নিজের ভুল-ত্রুটির জন্য অনুতপ্ত হও।' (তিরমিজী, ৪/১৮৩)
৯. আপনার নামে যদি কোনো মিথ্যা প্রপাগাণ্ডা রটানো হয়, তাহলে স্বভাবতই আপনি ক্রুদ্ধ, ভীষণ ক্রুদ্ধ হবেন। কিন্তু নিজের এ অস্বস্তি ও অসন্তোষ প্রকাশ করতে গিয়ে যদি অতিরিক্ত ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন, তাহলে অন্যরা ভাববে, আপনার নামে যে মিথ্যাচার করা হয়েছে, তা পুরোপুরি না হলেও আংশিক সত্য। তারা নিজেরাই প্রশ্ন ছুড়ে দিবে, আপনার নামে যা বলা হয়েছে, তা যদি নির্জলা মিথ্যাই হয়ে থাকে, তাহলে আপনি এত ক্ষুব্ধ হচ্ছেন কেন? তাই অসন্তোষ ও ক্ষোভ প্রকাশের ক্ষেত্রেও উগ্রতা পরিহার করে ভদ্রতা ও শালীনতা বজায় রাখা কর্তব্য।
১০. দ্বিতীয় কর্তব্য হলো, ধীরস্থিরতা ও প্রজ্ঞার সাথে পরিস্থিতি মোকাবিলা করা। অর্থাৎ, আপনি এমন মানসিকতা প্রকাশ করুন, যেন বিষয়টা গুরুত্বহীন ও নিতান্ত সাধারণ। দেখবেন, বিষয়টা নিয়ে অন্যরাও আর মাথা ঘামাবে না। বিশ্বাস করুন, আপনার নামে অপপ্রচার অচিরেই পর্দার আড়াল হবে। অন্য একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য তার স্থান দখল করে নিবে।
১১. নিতান্ত সাধারণ শ্রেণির লোকেরা খবরের সত্যাসত্য যাচাই না করেই বিশ্বাস করে বসে। খবরটা যদি কিঞ্চিৎ চটকদার ও কৌতূহলোদ্দীপক কিংবা ভীতিকর হয়, মুহূর্তের মধ্যে সর্বত্র ছড়িয়ে দিতে তারা কোনো কসুর করে না। তাই নিজে সুনিশ্চিত না হয়ে সাধারণ লোকের কথায় কখনো কান দিতে যাবেন না।
১২. প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য সব ধরনের গুজব ও ফেতনা থেকে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করুন। এ ধরনের সঙ্গিন পরিস্থিতিতে বেশি বেশি ইস্তিগফার করুন এবং ইবাদতে মশগুল থাকুন। এ দু'আটি বারবার পাঠ করুন: اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوْذُبِكَ مِنَ الْفِتَنِ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَمَا بَطَنَ। অর্থ: 'হে আল্লাহ! প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য সকল ধরনের ফেতনা-ফাসাদ থেকে আমি আপনার আশ্রয় প্রার্থনা করি।'
১৩. সংবাদের উৎস সম্পর্কে জানার চেষ্টা করুন। কোনো কথা বলার ক্ষেত্রে দলিল প্রমাণের ভিত্তিতে বলুন। কোনো কথার সত্যাসত্য যাচাই না করে শোনামাত্র তা প্রচার করতে থাকা সমীচীন নয়। রাসূল ﷺ বলেছেন: 'মানুষের পাপ করার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে যা শুনে তা-ই বলে বেড়ায়।' (মুসলিম, ১/১০)
১৪. তারা বলেছে কিংবা আমি শুনেছি-এ জাতীয় সূত্রে কথা বলার প্রবণতা পরিহার করা বাঞ্ছনীয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: بِئْسَ مَطِيَّةُ الرَّجُلِ زَعَمُوا» অর্থ: 'তারা ধারণা করছে-কথা বলার ক্ষেত্রে এ ধরনের সূত্র ব্যবহার করা অত্যন্ত নিন্দনীয়।' (আবূ দাউদ, ৪/২৯৪)
১৫. আপনার গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয়ে যদি দ্বিধা-সংশয় দেখা দেয় এবং আপনার মনে হয়, মানুষ তাতে ভুল বুঝতে পারে, তাহলে বিষয়টি স্পষ্ট করে দেওয়া আবশ্যক। মানুষ তাতে আস্বস্ত ও সুনিশ্চিত হতে পারবে। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, একবার সাফিয়্যাহ (রা.) রাসূল ﷺ-এর সাথে মসজিদে দেখা করতে এলেন। ফেরার পথে অন্ধকারে রাসূল ﷺ তাঁর পেছনে হাঁটছিলেন। ইতোমধ্যে দু'জন সাহাবি রাসূল ﷺ-কে অতিক্রম করে গেল। তিনি আশঙ্কা করলেন, সাফিয়্যাহ (রা.)-কে কেন্দ্র করে শয়তান তাদের মনে কুমন্ত্রণা সৃষ্টি করতে পারে। তাই সাহাবি দু'জনের উদ্দেশ্যে তিনি বললেন, 'এ হলো সাফিয়‍্যাহে বিনতে হুয়াই।' এতেই সাহাবা দু'জন বুঝে গেলেন, তিনি রাসূল ﷺ-এর স্ত্রী। সামান্য ক্ষুদ্র বিষয়ও সুস্পষ্ট করে দেওয়া হলো রাসূল ﷺ-এর আদর্শ।

পরিশিষ্ট:
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর জীবদ্দশায় মদিনা মুনাওয়ারায় একটা উদ্দেশ্যমূলক প্রপাগাণ্ডা ছড়ানো হলো। যা ছিল রাসূল ﷺ-এর সহধর্মিনী, উম্মুল মুমিনীন আয়েশা বিনতে সিদ্দীক (রা.) সম্পর্কে। যার চারিত্রিক পবিত্রতা ও নিষ্কলুষতার প্রমাণ পবিত্র কুরআনে বিদ্যমান। একটা সাধারণ বিষয়কে কেন্দ্র করে মদিনার মুনাফিকরা আয়েশা (রা.)-এর চরিত্র সম্পর্কে প্রপাগাণ্ডা ছড়াতে প্রবৃত্ত হলো। মুনাফিক ও তাদের সহযোগীদের তৎপরতায় তা গোটা মদিনায় মানুষের মুখে মুখে রটতে থাকল।

মুনাফিকরা আয়েশা (রা.)-এর মানহানি করার নিকৃষ্ট তৎপরতায় মেতে উঠেছিল ইসলামের প্রতি ঘৃণা ও ইসলামের রাসূল ﷺ-এর প্রতি বিদ্বেষবশত। কিন্তু সাহাবায়ে কেরাম, তাঁরা ছিলেন ঈমান ও বিশ্বাসের কেন্দ্রবিন্দুতে অবিচল। রাসূলুল্লাহ ﷺ ও তাঁর পরিবারের প্রত্যেকের চারিত্রিক পবিত্রতা ও নিষ্কলুষতায় ছিলেন নিঃসন্দেহ। তাই সর্বান্তঃকরণে তাঁরা বলতে পেরেছিলেন (পবিত্র কুরআনের ভাষায়): ﴿سُبْحَنَكَ هَذَا بُهْتَانٌ عَظِيمٌ﴾ অর্থ: 'আল্লাহ পবিত্র ও মহান, এটা তো এক গুরুতর অপবাদ!' (নূর, ২৪: ১৬) মুনাফিকদের এ মিথ্যাচার ও প্রপাগাণ্ডা কেন্দ্র করে পবিত্র কুরআনের সূরা নূরে আয়াত নাযিল হলো। যেখানে মুনাফিকদের দাবি ও অপপ্রচার মিথ্যা প্রতিপন্ন করে তাদের অভিশপ্ত আখ্যায়িত করা হয়েছে। পাশাপাশি অপপ্রচার ও গুজবের পরিস্থিতে সাহাবায়ে কেরামের ন্যায়ানুগ অবস্থানের প্রশংসা করা হয়েছে। সুতরাং গুজব প্রপাগাণ্ডা ও অপপ্রচারের ক্ষেত্রে বাকসংযম করুন। নিশ্চিত না হয়ে কোনো কথা বলা থেকে বিরত থাকুন। এটাই প্রকৃত মু'মিনের চরিত্র। এ থেকে বিচ্যুত হয়ে মুনাফিকদের কাতারে শামিল হবেন না।

لَوْلَا إِذْ سَمِعْتُمُوهُ ظَنَّ الْمُؤْمِنُونَ وَالْمُؤْمِنْتُ بِأَنْفُسِهِمْ خَيْرًا لَا وَقَالُوا هَذَا إِفْكٌ مُبِينٌ﴾ [النور: ١٢]

অর্থ: 'যখন তোমরা এটা শুনলে, তখন কেন মু'মিন পুরুষ ও মু'মিন নারীরা তাদের নিজদের সম্পর্কে ভাল ধারণা পোষণ করল না এবং বলল না যে, এটা তো সুস্পষ্ট অপবাদ?' (নূর, ২৪: ১২)

কানাব আল গাতফানী বলেছেন: 'আমি কোনো মঙ্গলের কথা বললে তারা বধির হয়ে থাকে। অমঙ্গলের কিছু বললে উৎকর্ণ হয়ে উঠে। সন্দেহ সংশয়ের কিছু শুনলে সর্বত্র রাষ্ট্র করে বেড়ায়, আর ভালো কিছু জানলে জায়গায় দাফন করে ফেলে।'

খুরাসানে যখন দুর্যোগ ও বিশৃঙ্খলার সূত্রপাত হয়, বিশ্ববরেণ্য কবি সাহিত্যিক আলী ইবনে আব্দুল আযীয আল জুরজানী খুরাসানেই ছিলেন। দেশের এমন উত্তাল পরিস্থিতিতে তিনি নিজ ঘরের দরজা বন্ধ করে দিলেন। দরজার ওপর কেবল কবিতার তিনটি পঙক্তি লিখে দিলেন, যা তার অবস্থান স্পষ্ট করে:

অ্যানিস্টু বিওয়াহদাতি ওয়ালাযিমতু বাইতি / ফাতাবাল আনসু লি ওনামাস সুরুুরু / ফা আদদাবানিয যামান ফালা উবালি / হুজিরতু ফালা উযারু ওয়ালা আযুরু / ওয়ালাসতু বিসায়িল মা দুমতু হাইয়্যান / আসারাল জাইশু আম রাকিবাল আমীরু।

অর্থ: 'একাকিত্ব বরণ করে নিজেই নিজেকে গৃহবন্দি করে রেখেছি। এই নিঃসঙ্গতার মধ্যেই আমার আন্তরিকতা ও চিত্তবিনোদন নিহিত। কালের ঘাত-প্রতিঘাত ও দুর্যোগ-দুর্বিপাকের শিক্ষা আমি পেয়েছি। তাই আমি কি জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লাম, কেউ আমাকে দেখতে আসে না, আমিও কারো সাক্ষাতে যাই না-এসব কিছুই আমি পরোয়া করি না। যত দিন বেঁচে আছি, জানতে চাইব না-সেনাবাহিনী কি যুদ্ধাভিমুখী হয়েছে? যুদ্ধের উদ্দেশ্যে শাসক কি ঘোড়া ছুটিয়েছে-এসবের কিছুই।'

বিখ্যাত মার্কিন রম্য লেখক ও সাহিত্যিক মার্ক টোয়েন (১৮৩৫-১৯১০ খ্রিষ্টাব্দ) বলেছেন: 'তুমি কিছু মানুষকে সবসময়ের জন্য বোকা বানিয়ে রাখতে পার কিংবা মানুষকে কিছু কালের জন্য বোকা বানিয়ে রাখতে পার। কিন্তু সব মানুষকে সবসময়ের জন্য বোকা বানিয়ে রাখতে পারবে না।'

📘 আল হাল্লু জীবন সমস্যার সমাধান 📄 প্রবাস-পরবাস

📄 প্রবাস-পরবাস


'প্রবাস-পরবাস' শব্দ দু'টা বলা যত সহজ, শুনতে তত কঠিন কষ্টদায়ক। প্রবাস হলো, প্রয়োজনের তাড়নায় কিংবা দায়িত্বের তাগাদায় মাতৃভূমি ছেড়ে ভিন দেশে পাড়ি জমানো। প্রবাস-জীবনে ব্যক্তিকে পরিবার-পরিজন, বন্ধু-বান্ধব ও পাড়াপ্রতিবেশী-সবার থেকে দূরে থাকতে হয়। শৈশব-কৈশোরের স্মৃতি, পরিবারের আনন্দ-বেদনার স্মৃতি, পরিচিত ভাষা ও সমাজ ছেড়ে নতুন পরিবেশ ও অপরিচিত লোক-সমাজের মধ্যে একাকী জীবনযাপন করতে হয়।

দেশে যেখানে প্রতিদিন তিন বেলা মার হাতের সুস্বাদু খাবার খেয়ে পরিতৃপ্ত হতো, এখন দূর পরবাসে খাবারের বাছ-বিচার না করে কোনো রকম ক্ষুধার জ্বালা মিটিয়েই তৃপ্ত হতে হয়। রোগ-শোকে, বিপদ-আপদে আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুবান্ধব পাশে এসে দাঁড়াত। প্রবাসে এখন জীবনের যত ঝড়-ঝাপটা, সব একাই শামাল দিতে হয়। এতসব দুঃখ-কষ্ট সে সহ্য করে যায় পরিবার-পরিজনের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য। পরিবার যেন সুখে থাকে, ছেলে-মেয়েরা যেন উন্নত শিক্ষা-দীক্ষার সুযোগ পায়, মা-বাবার চিকিৎসাটা যেন ভালোমতো হয়, এ-ই তার একমাত্র চাওয়া। প্রবাস জীবনের দুঃখ-কষ্ট, এ জীবনের দায়-দায়িত্বের চাপ শুধু একজন প্রবাসীই বুঝতে পারে। তাসত্ত্বেও নিয়তির অবধারিত নীতি মেনে তাকে জীবন সংগ্রামে টিকে থাকতে হয়। হাসিমুখে কষ্ট-যাতনা আড়াল করে প্রবাস জীবন উপভোগ করার জন্য আমাদের করণীয় কী? এত দুঃখ-কষ্টের মাঝেও একটু হাসি-আনন্দে জীবনযাপন করার উপায় কী?

সমাধান:
১. মনে রাখতে হবে, প্রবাসজীবনের উদ্দেশ্য হলো এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজন পূরণ করা ও কল্যাণচিন্তা বাস্তবায়ন করা, স্বদেশে থেকে ব্যক্তির জন্য যা অত্যন্ত দুরূহ ও কষ্টসাধ্য। অনেক সময় শিক্ষা-দীক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও সুচিকিৎসার উদ্দেশ্যে বিদেশযাত্রা আপনার জন্য অধিক কল্যাণকর ও ফলপ্রসূ হতে পারে।
২. বিদেশ যাত্রা ও প্রবাস-জীবনে অনেক কল্যাণ নিহিত। এর মাধ্যমে নতুন সভ্যতা-সংস্কৃতি, জীবনধারা ও সামাজিকতা পরখ করার সুযোগ হয়। তার মধ্যে যা কিছু কল্যাণ, যা কিছু মঙ্গল, তা হয়ে থাকে ভবিষ্যৎ জীবন পথের পাথেয়। এভাবে ব্যক্তির বিদ্যা-বুদ্ধি ও অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার ঋদ্ধ হয়। জীবনধারা উন্নত ও সমৃদ্ধ হয়।
৩. আপনি নিশ্চিত থাকুন। দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হবেন না। প্রযুক্তি ও আবিষ্কারের যুগে এখন যোগাযোগব্যবস্থা অনেক উন্নত। মোবাইল ও ইন্টারনেটের কল্যাণে গোটা পৃথিবী আপনার হাতের মুঠোয়। যখন ইচ্ছা, যার সাথে ইচ্ছা, যোগাযোগ করতে পারেন। তাদের খোঁজ-খবর নিতে পারেন।
৪. বিদেশে এমন ব্যক্তিবর্গ ও প্রতিষ্ঠানের সাথে যোগাযোগ ও আন্তরিক সম্পর্ক বজায় রাখুন-যেমন: স্বদেশের দূতাবাস, মসজিদ, ইসলামি প্রতিষ্ঠান এবং স্বদেশী ব্যক্তিবর্গ-যাদের আন্তরিক ব্যবহার ও কথাবার্তায় আপনার প্রবাস জীবনের কষ্ট লাঘব হবে। আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধব থেকে দূরে থাকার কষ্ট কিছুটা হলেও ভুলে থাকতে পারবেন।
৫. স্মরণ করুন, নবী-রাসূলগণ, ইতিহাসের মহা মনীষী ও বিপ্লবী ব্যক্তিগণ জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চার উদ্দেশ্যে, দেশ ও জাতির কল্যাণে স্বদেশ ত্যাগ করে ভিনদেশে পাড়ি জমিয়েছেন। দূর দেশের অজানা পথের দুর্যোগ-দুর্বিপাক হাসিমুখে সহ্য করেছেন।
৬. স্বদেশ ছেড়ে যে দেশে অবস্থান করছেন, অবসরের সময়টাতে সেখানে শিক্ষা-দীক্ষামূলক চর্চা অথবা অর্থোন্নয়নমুখী কোনো কার্যক্রমে যুক্ত হোন। যা আপনাকে প্রবাস জীবনের দুশ্চিন্তা-দুর্ভাবনা ও দুঃখ-কষ্টের কথা ভুলিয়ে দেয়।
৭. মনে রাখুন, আপনি নিজের ও পরিবারের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ বিনির্মাণের গুরুদায়িত্ব পালন করছেন। এজন্য অবশ্যই আপনাকে হালাল উপার্জনের কোনো একটা উপায় অবলম্বন করতে হবে। জাগতিক জীবনে এটাই চিরাচরিত রীতি। তাই বিষয়টিকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখুন এবং জীবনের এ মহান দায়িত্ব সফলভাবে পালন করতে পেরে সম্মান ও গৌরব বোধ করুন।
৮. চিন্তা করে দেখুন, পরকালীন জীবনের বিবেচনায় আমাদের এ জাগতিক জীবনও একপ্রকার প্রবাস জীবন। যে দিন আদম (আ.) ও হাওয়া (আ.) আমাদের আসল ভূমি জান্নাত থেকে পৃথিবীর মাটিতে পদার্পণ করেছেন, সে দিন থেকেই আমরা প্রবাসী। এভাবেই চিন্তা করে নিজের মনকে সান্ত্বনা দিন।
৯. সময়মতো জামাতের সাথে পাঁচওয়াক্ত নামায ও অন্যান্য ইবাদতে যত্নবান হোন। বেশি বেশি যিকির আযকারের মাধ্যমে আপন রবের সাথে মহাব্বত ও ভালোবাসার সম্পর্ক স্থাপন করুন। এর মধ্যে যুগপদ দু'টি কল্যাণ নিহিত:
প্রথমত, বিরাট প্রতিদান হাসিল হবে। দ্বিতীয়ত, নেক আমলের মধ্যে সময় কাটানোর মাধ্যমে দুশ্চিন্তা-দুর্ভাবনামুক্ত থাকা সহজ হবে।
১০. নিজের মধ্যে একটা আলাদা জগৎ গড়ে তুলুন, যা হবে কল্যাণকর চিন্তাভাবনা, আল্লাহর যিকির ও দু'আ পাঠের মতো মহৎ আমলের জগৎ। মনে করুন, এ জগৎটাই আপনার স্বদেশ মাতৃভূমি।
১১. আপনি কেন কাঁটা তারের সীমারেখা ভুলে গোটা বিশ্বটাকে আপনার স্বদেশ ভাবছেন না? এ জগৎটাকে নিজের আবাসভূমি মনে করছেন না? আপনি এভাবে চিন্তা করুন-বিশ্বজগৎটা তো একই স্রষ্টার সৃষ্টি। সমগ্র পৃথিবী তো মহান আল্লাহর কর্তৃত্বাধীন। যেখানে আপনার অবস্থান, সেটাই হবে আপনার আবাসভূমি। কবির ভাষায়: 'পৃথিবীর যেখানেই মহান আল্লাহ তা'আলার নাম উচ্চারিত হয়, আমি মনে করি, সেটাই আমার মাতৃভূমি।'
১২. বিদেশে অবস্থানকালে সেখানের নিয়ম-নীতি মেনে চলুন। আপনার স্বকীয়তা ও ধার্মিকতা অটুট রেখে তাদের সভ্যতা-সংস্কৃতির প্রতি সম্মান বজায় রাখুন। নিজেকে ইসলাম ও মুসলমানের আদর্শ নমুনারূপে উপস্থাপন করুন। আপনার স্বকীয়তা ও স্বাতন্ত্র্য, আপনার জন্য সামাজিক মূল্যায়ন ও সম্মান বয়ে আনবে।

পরিশিষ্ট:
অবিসংবাদিতভাবেই হাদীসশাস্ত্রে সর্বাধিক প্রসিদ্ধ ব্যক্তিত্ব হলেন ইমাম বুখারী (রহ.)। ষোলো বছর বয়সেই তিনি স্বদেশ ছেড়ে বের হয়ে পড়েন। পবিত্র মক্কায় হজ পালন করেন এবং মদিনায় রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর রওযা মোবারক যিয়ারত করেন। এরপর হেজায, মিশর হয়ে ইরাকের বাগদাদ এসে পৌঁছান। বাগদাদ শহরে যখন প্রবেশ করেন, তিনি পরিবার-পরিজন থেকে বিচ্ছিন্ন রিক্তহস্ত। একমাত্র সম্বল হলো আপন রবের ওপর ভরসা ও গভীর জ্ঞানপিপাসা। আল্লাহ তা'আলাও তাঁর ভরসার যথার্থ প্রতিদান দিয়েছেন। যা ছিল হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ তা'আলার প্রতিশ্রুতির বহিঃপ্রকাশ: أَنَا عِنْدَ ظَنَّ عَبْدِي بِي، فَلْيَظُنَّ بِي مَا شَاءَ অর্থ: 'আমার প্রতি বান্দার বিশ্বাস মোতাবেক আমি তার সাথে আচরণ করি। সুতরাং বান্দা আমার প্রতি বিশ্বাস রাখুক, সে যেমন চায়।' (মুসনাদে আহমাদ, ২৫/৩৯৮) জ্ঞানসাধনায় সুদীর্ঘ সফর, অবিরাম চেষ্টা-সাধনা ও কালের দুর্যোগ-দুর্বিপাক মোকাবিলার পরই তিনি মুসলিম জাতির কল্যাণে বুখারী শরীফ সংকলন করতে সক্ষম হয়েছেন।

ইমাম শাফেয়ী (রহ.) (১৫০-২০৪ হি.) বলেছেন: 'জ্ঞানী ও বিচক্ষণ ব্যক্তির জন্য একই স্থানে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়া সমীচীন নয়। সুতরাং জ্ঞানচর্চার উদ্দেশ্যে স্বদেশ ছেড়ে দূর-দূরান্তে সফর করো। সফর ও হিজরতের বদৌলতে জ্ঞান সাধনার এমন পাথেয় পাবে, যা তোমাকে স্বদেশ ত্যাগের কষ্ট ভুলিয়ে দিবে। অবিরাম চেষ্টা সাধনার মধ্যেই কাঙ্ক্ষিত জীবনের সন্ধান পাবে। আমি দেখেছি, স্থবিরতা ও প্রবাহহীনতা পানিকে নষ্ট করে ফেলে। কিন্তু তা যদি হয় সদা প্রবহমান, তাহলে তার স্বকীয় বৈশিষ্ট্য বজায় থাকে। সিংহ যদি গর্ত ছেড়ে বের না হয়, তার শিকার জুটবে কী করে? তীর যদি তূণীর থেকে নিক্ষিপ্ত না হয়, লক্ষ্যস্থলে আঘাত হানবে কিভাবে? সূর্য যদি আপন কক্ষপথের একই স্থানে থেমে থাকে, মানুষ তাতে যারপরনাই বিরক্ত হবে। স্বর্ণখণ্ড যদি তার খনির মধ্যে পড়ে থাকে, মাটির মতো মূল্যহীন পড়ে থাকবে। সুগন্ধি কাঠ যদি বনের মধ্যে পড়ে থাকে, তবে তা সাধারণ কাঠ মাত্র। স্বর্ণখণ্ড যদি তার খনি ছেড়ে বেরিয়ে আসে, তাহলেই অমূল্য রতন। সুগন্ধিকাঠ যদি বন ছেড়ে বেরিয়ে আসে, স্বর্ণের মতো অমূল্য বস্তু।'

টিকাঃ
৫৬. সুনানে নাসায়ীর রিওয়ায়েতে বর্ণিত হয়েছে: «إِنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ يَقُولُهُنَّ فِي دُبُرِ الصَّلَاةِ» (سنن النسائي) অর্থ: রাসূলুল্লাহ ﷺ নামাযের পর এ দু'আটি পাঠ করতেন। (নাসায়ী, ৩/৭৩) এতে বোঝা যায়, সকাল-সন্ধ্যায় ও প্রত্যেক নামাযের পর-দুটি সময়েই আমল করার সুযোগ রয়েছে।

📘 আল হাল্লু জীবন সমস্যার সমাধান 📄 অনধিকার চর্চা

📄 অনধিকার চর্চা


নাক-গলানো অর্থ অনর্থক বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা, অনধিকার চর্চা করা। প্রত্যেক সমাজে এমন স্বভাবের লোক দেখা যায়, যারা অন্যের বিষয়ে ভীষণ কৌতূহলী। অন্যের জীবনের একান্ত বিষয় জানার জন্য, গোপন কথা উদ্ধার করার জন্য তাদের মধ্যে একধরনের ব্যাগ্রতা কাজ করে; অথচ ব্যক্তিগত দায়-দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে তার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। নিজের কর্তব্য সম্পর্কে যতোটা উদাসীন, অন্যের খুঁটিনাটি সম্পর্কে ততটা তৎপর। কখনো কখনো নাগ গলানো ও অনধিকার চর্চার প্রবণতা এমন প্রকট আকার ধারণ করে এবং ব্যক্তির মনের কৌতূহল এত উদগ্র হয়ে উঠে যে, যত্রতত্র সে প্রশ্ন করে বেড়ায়, জানতে চায়:

'অমুক কী করল? সেখানে কে গেল? অমুকের বাড়িতে কে এল? তমুকের মেয়ের বিয়ে হচ্ছে না কেন? কিংবা, বিয়ে হলো কত বছর গেল, বাচ্চা-কাচ্চা হচ্ছে না কেন? অমুকের সাথে না তার রেষারেষি ছিল, এখন এত ভাব কীসের?'

এমন অনর্থক শত-সহস্র প্রশ্ন তার মনে কিলবিল করতে থাকে আর মুখ পিছলে বেরুতে থাকে। রাসূলুল্লাহ ﷺ এ বিষয়ে সুস্পষ্টভাবে সতর্ক করেছেন। আবূ হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

مِنْ حُسْنِ إِسْلَامِ الْمَرْءِ تَرْكُهُ مَا لَا يَعْنِيهِ

অর্থ: 'মুসলমানের ইসলামের সৌন্দর্য হলো যাবতীয় অনর্থক কাজ থেকে বিরত থাকা।' (ইবনে মাযাহ, ২/১৩১৫)
আরেকটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

مَنْ سَتَرَ عَوْرَةَ أَخِيْهِ الْمُسْلِمِ، سَتَرَ اللَّهُ عَوْرَتَهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ، وَمَنْ كَشَفَ عَوْرَةَ أَخِيْهِ الْمُسْلِمِ، كَشَفَ اللَّهُ عَوْرَتَهُ، حَتَّى يَفْضَحَهُ بِهَا فِيْ بَيْتِهِ» (سنن ابن ماجه ٢/ ٨٥٠)

অর্থ: 'যে ব্যক্তি তার মুসলিম ভাইয়ের দোষ গোপন রাখবে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা তার ভুল-ত্রুটি গোপন রাখবেন। আর যে ব্যক্তি তার মুসলিম ভাইয়ের দোষ ফাঁস করে দিবে আল্লাহ তা'আলাও তার দোষ প্রকাশ করে দিবেন। এমনকি নিজ ঘরে তাকে অপমানিত করে ছাড়বেন।' (ইবনে মাযাহ, ২/৮৫০)

বর্তমান সমাজে নাক গলানোর প্রবণতা ও অনধিকার চর্চার মানসিকতা ব্যাপক আকার ধারণ করেছে, দুরারোগ্য ব্যাধির রূপ পরিগ্রহ করেছে। এ থেকে বাঁচার উপায় কী? এ জটিল সমস্যার সমাধান কী?

সমাধান:
১. মনে রাখতে হবে, আমাদের জীবনকাল খুবই সংক্ষিপ্ত। যা আমাদের দায়-দায়িত্ব, প্রয়োজন ও চাহিদা পূরণের জন্যই পর্যাপ্ত নয়, সেখানে অন্যের বিষয়ে নাক গলানো ও অনধিকার চর্চা করা কোনোভাবেই সমীচীন নয়।
২. পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলার নির্দেশ পালন করুন:

وَلَا تَقْفُ مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ طَ إِنَّ السَّمْعَ وَالْبَصَرَ وَالْفُؤَادَ كُلُّ أُولَئِكَ كَانَ عَنْهُ مَسْئُولًا﴾ [الإسراء: ٣٦]

অর্থ: 'আর সে বিষয়ের পেছনে ছুটো না, যে বিষয়ে তোমার কোন জ্ঞান নেই। কান, চোখ আর অন্তর-এগুলোর সকল বিষয়ে অবশ্যই জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।' (বানী ইসরাঈল, ১৭:৮৮) সুতরাং অন্যের বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা ও গুপ্তচরবৃত্তি থেকে বিরত থাকতে হবে। যবান, চোখ, কান ইত্যাদির অপব্যবহার থেকে বাঁচতে হবে।
৩. মনে রাখতে হবে, অন্যের পিছু লেগে থাকা এবং তার একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়ে অনধিকার চর্চা করা ইত্যাদি দুষ্টাচারের কারণে অনেক সময় অপ্রীতিকর পরিস্থিতি ও ক্ষতির শিকার হতে হয়। তাই অন্যের বিষয়ে নাক গলানো বাদ দিয়ে নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকাই শ্রেয়। সফল ব্যক্তি কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের পথেই সদা ব্যস্ত। অন্যের বিষয়ে অনর্থক কৌতূহল দেখানোর মতো সময় তার নেই।
৪. অন্যের ব্যাপারে যখন কৌতূহল জাগবে, উদগ্র কৌতূহল কাজ করবে, নিজেকেই নিজে জিজ্ঞেস করতে হবে: নিজের যাবতীয় দায়-দায়িত্ব কি পালন করতে পেরেছি? আমার কাজগুলো কি সুচারুরূপে সম্পন্ন করতে পেরেছি? নিজেই তো কত নানা সমস্যায় জর্জরিত। তার সমাধান না করে অন্যের বিষয়ে নাক গলানো কি আমার জন্য সাজে?
৫. প্রত্যেক ব্যক্তিকেই নিজ নিজ কৃতকর্মের দায়ভার বহন করতে হবে। কেউ কারো কৃতকর্মের বোঝা বহন করবে না এবং সে বাধ্যও নয়। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: ﴿وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَى﴾ [الأنعام: ١٦٤] অর্থ: 'এবং কেউ অন্য কারো [গুনাহের] বোঝা বহন করবে না।' (আনআম, ৬: ১৬৪) তাই অন্যের বিষয় এড়িয়ে নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকাই শ্রেয়। অন্যের ছিদ্রান্বেষণ না করে আত্মসমালোচনা করাই কর্তব্য।
৬. পরিবার-পরিজন, বন্ধুবান্ধব ও পাড়া-প্রতিবেশীদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখার ব্যাপারে যত্নশীল হতে হবে। তাদের বিষয়ে নাক গলিয়ে, একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়ে প্রশ্ন করে বিব্রত করা সমীচীন নয়।
৭. অন্যের যোগ্যতা, দক্ষতা ও সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের দিকে না তাকিয়ে আল্লাহ তা'আলা আপনাকে যে অগণিত নিয়ামত দান করেছেন, তার কথা চিন্তা করুন। কারণ, অন্যের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বড় করে দেখার প্রবণতা আপনার মধ্যে মানসিক অস্থিরতা ও আত্মিক কলুষতার জন্ম দিবে।
৮. বর্তমান প্রজন্মের মধ্যে অনধিকার চর্চা ও নাক গলানোর প্রবণতার ব্যাপারে ঘৃণাবোধ সৃষ্টি করতে হবে। এক্ষেত্রে মাতা-পিতাকেই হতে হবে উত্তম আদর্শ। সবার আগে তাদেরই এই স্বভাবদোষ থেকে বিরত থাকা এবং এ সম্পর্কে ঘৃণা প্রকাশ করা কর্তব্য।
৯. রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর বাণী মনে রাখুন এবং তা থেকে প্রকৃত শিক্ষা অর্জন করুন: আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, 'যে ব্যক্তি তার মুসলিম ভাইয়ের দোষ গোপন রাখবে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা তার ভুল-ত্রুটি গোপন রাখবেন। আর যে ব্যক্তি তার মুসলিম ভাইয়ের দোষ ফাঁস করে দিবে আল্লাহ তা'আলাও তার দোষ প্রকাশ করে দিবেন। এমনকি নিজ ঘরে তাকে অপমানিত করে ছাড়বেন।' (ইবনে মাযাহ, ২/৮৫০)
১০. অন্যের বিষয়ে নাক গলানোর স্বভাবদোষ থেকে বেঁচে থাকুন। কেননা এমন স্বভাবদুষ্ট লোক বন্ধু মহলে ও পরিচিত সমাজে অপ্রিয় অনাকাঙ্ক্ষিত। পরিচিত-অপরিচিত সর্বমহলে বাতাসের মতো প্রাণবন্ত ও ফুলের মতো প্রিয় ব্যক্তিত্ব হয়ে উঠুন। তাহলে মানুষ আপনার সাক্ষাৎপ্রত্যাশী হবে এবং আপনার সাথে কথা বলে স্বস্তি পাবে।
১১. অন্যের ব্যক্তিগত বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা থেকে বিরত থাকুন। তারাও আপনার একান্ত বিষয়ে অনধিকার চর্চা থেকে বিরত থাকবে। মনে রাখবেন, প্রত্যেকের জীবনের কিছু গোপনীয়তা আছে। আপনি কখনো তা উদ্‌ঘাটনে প্রবৃত্ত হবেন না। কেউ যদি আপনার সাহায্য-সহযোগিতার মুখাপেক্ষী হয়, তাহলে আপনাকে আগ বাড়িয়ে কিছু জিজ্ঞেস করতে হবে না, নিজ থেকেই সে আপনার কাছে তার সমস্যার কথা খুলে বলবে এবং তার কর্তব্য সম্পর্কে পরামর্শ গ্রহণ করবে।
১২. অন্যের ব্যক্তিগত বিষয়ে নাকগলানোর আগে নিজেকে একবার জিজ্ঞেস করুন: কেউ যদি আমার একান্ত বিষয় জানার জন্য তৎপর হয়, খুটিয়ে খুটিয়ে সব গোপনীয়তা উদ্ধারের চেষ্টা করে, আমার কী দশা হবে? আমার এমন স্বভাব-দোষের কারণেও তো অন্যরাও ভীষণ বিব্রত বোধ করবে, চরম অস্বস্তিতে পড়বে।
১৩. যারা অন্যের বিষয়ে নাক গলায়, অনধিকার চর্চা করে, তাদের থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখুন। এমন কারোর সাথে যদি সাক্ষাৎ হয়েই যায়, তাহলে অত্যন্ত সাবধানে আগপিছ ভেবে-চিন্তে কথা বলুন। তার নাক গলানোর প্রবণতা থেকে বাঁচার জন্য কুশল বিনিময়স্বরূপ তার উদ্দেশ্যে প্রশ্ন জুড়ে দিন। কিংবা তার উদ্দেশ্যমূলক প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে প্রসঙ্গ পরিবর্তন করুন। আপনার একান্ত বিষয় জানার জন্য সে যদি পীড়াপীড়ি করে, তাহলে ভদ্রভাবে বলে দিন: 'এটা আমার একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়। তা জানা ঠিক হবে না।' এতে কোনো লজ্জাবোধ করবেন না। সে তো লাজ-লজ্জা ছেড়ে আপনাকে অযাচিত প্রশ্ন করতে পেরেছে, আপনি কেন নৈতিক উত্তর প্রদানে লজ্জিত হতে যাবেন? পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: وَإِذَا خَاطَبَهُمُ الْجَهِلُونَ قَالُوا سَلَمَا ﴾ [الفرقان: ٦٣] অর্থ: 'এবং অজ্ঞ লোকেরা যখন তাদেরকে সম্বোধন করে তখন তারা বলে 'সালাম'।' (ফুরকান, ২৫: ৬৩)

পরিশিষ্ট:
হাদীসে বর্ণিত হয়েছে: উকবা বিন আমের (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি জিজ্ঞেস করলাম, 'ইয়া রাসূলুল্লাহ, মুক্তির পথ কী?' তিনি বললেন, 'তোমার যবান সংযত রাখো। (ফেতনার যামানায়) নিজ ঘরে আবদ্ধ থাক। নিজের ভুল-ত্রুটির জন্য অনুতপ্ত হও।' (তিরমিজী, ৪/৬০৫)

ঢাকনা-ঢাকা পাত্রঃ ছোট্ট গল্প। তাতে নাক গলানোর ও অনধিকার চর্চার বিরুদ্ধে সূক্ষ্ম প্রতিবাদ বিদ্যমান। এক মেয়ে ঢাকনা-ঢাকা পাত্র হাতে হেঁটে যাচ্ছিল। পথিমধ্যে এক লোক জিজ্ঞেস করল: 'এই মেয়ে, কী নিয়ে যাচ্ছ? এই পাত্রে কী?' উত্তরে মেয়েটি বলল: 'আমার মা যদি সবাইকে দেখাতে চাইতেন, পাত্রে কী আছে, তাহলে এভাবে ঢেকে দিতেন না।'

আপনি যদি অনর্থক কাজ থেকে বিরত থাকেন, অনধিকার চর্চা পরিহার করেন, তাহলে নিজের প্রয়োজন দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে পর্যাপ্ত সময়-শ্রম ব্যয় করার সুযোগ পাবেন। -আয়েয আল কারনী

📘 আল হাল্লু জীবন সমস্যার সমাধান 📄 বন্ধ্যত্ব

📄 বন্ধ্যত্ব


বন্ধ্যত্ব হলো সন্তান প্রজননে অক্ষমতা। এ সমস্যা যেমন নারীর ক্ষেত্রে হতে পারে, পুরুষের ক্ষেত্রেও হতে পারে। একটা পরিবারে বন্ধ্যত্ব-সমস্যা দেখা দিলে প্রথমেই নারীর দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করা হয়। এটা অন্যায়। বন্ধ্যত্বের কারণে একটা পরিবার নানাবিধ সমস্যার সম্মুখীন হয়। প্রশান্ত প্রাণবন্ত মন হয়ে উঠে বিষণ্ণ অস্থির। শান্তি-সুখের সংসারে নেমে আসে দুশ্চিন্তা-বিষাদের অন্ধকার। নারী তার সংসার জীবনের অর্থময়তা হারাতে থাকে। পুরুষ তার ভবিষ্যৎ উত্তরাধিকারের অনিশ্চয়তায় ভুগে কর্মস্পৃহা হারাতে থাকে। পারিবারিক জীবনের এ সমস্যা থেকে বাঁচার উপায় কী? এ সংকট মোকাবিলায় আমাদের করণীয় কী?

সমাধান:
১. বিয়ের আগে অবশ্যই ডাক্তারি চেকআপ-এর বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে। পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হতে হবে-ছেলে-মেয়ের কোনো একজন গুরুতর কোনো শারীরিক কিংবা মানসিক রোগে আক্রান্ত কি না?
২. জেনে রাখুন, বন্ধ্যত্ব সমস্যার সম্মুখীন আপনি একাই নন। আপনার পূর্বেও কোনো কোনো নবী-রাসূল ও মহা মনীষী এ সমস্যার শিকার হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে এমনও আছেন, যাঁরা বিয়ে পর্যন্ত করেননি। কিন্তু এ কারণে তো তাঁদের মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব একটুও কমেনি। তাঁদের জীবনের মহৎ লক্ষ্য-উদ্দেশ্য বাধাগ্রস্ত হয়নি। তাহলে আপনি কেন নিজের সাধারণ জীবনযাপনের পথে এ সমস্যাটাকে এত গুরুতর মনে করছেন!
৩. বন্ধ্যত্বের বিষয়টাকে আপনার মন-মানসিকতা থেকে ঝেড়ে ফেলুন। ব্যস্ততা ছাড়া বেশিক্ষণ একাকী থাকা ঠিক নয়। তাহলে যত দুশ্চিন্তা-দুর্ভাবনা আপনার মনে বাসা বাঁধবে। সবসময় কর্মমুখর জীবনযাপন করুন। স্বপ্নবান আশাবাদী ও পরিশ্রমী ব্যক্তিদের সাথে চলুন। জনকল্যাণমূলক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করুন। তা আপনাকে জীবনের সমস্যা-সংকটের কথা ভুলিয়ে সাবলীল প্রাণবন্ত জীবনযাপনে সাহায্য করবে।
৪. কয়েকজন এতিম ও দরিদ্র সন্তানকে নিজ সন্তানের মতো আপন করে নিন। তাদের আদর-যত্ন ও দেখাশোনা করুন। প্রয়োজনের মুহূর্তে তারাই সন্তানের চেয়েও বেশি আপন হয়ে আপনার পাশে দাঁড়াবে।
৫. একটা এতিম সন্তানকে পালক নিন, কিংবা তার ভরণ-পোষণের দায়িত্ব গ্রহণ করুন। এ মহৎ কর্মে যুগপদ দু'টি কল্যাণ নিহিত। প্রথমত, আপনার জীবন সুখ-শান্তিতে ভরে উঠবে। দ্বিতীয়ত, জান্নাতুল ফিরদাউসে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সঙ্গী হওয়ার পরম সৌভাগ্য লাভ করবেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "আমি ও এতিমের দায়িত্ব গ্রহণকারী জান্নাতে এই দু'আঙুলের ন্যায় পাশাপাশি অবস্থান করব। এ কথা বলার পর রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর মধ্যমা ও তর্জনী আঙুল কাছাকাছি করে দেখালেন। দু'টি আঙুলের মধ্যে তিনি সামান্য ফাঁকা রাখলেন।" (বুখারী, ৭/৫৩)
৬. এতিম-অনাথ শিশুদের জন্য অর্থ ব্যয় করাও অনেক ফযিলতপূর্ণ কাজ। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেন: يَسْأَلُونَكَ مَاذَا يُنْفِقُونَ ۖ قُلْ مَا أَنْفَقْتُمْ مِّنْ خَيْرٍ فَلِلْوَالِدَيْنِ وَالْأَقْرَبِينَ وَالْيَتَامَىٰ وَالْمَسَاكِينِ وَابْنِ السَّبِيلِ ۗ وَمَا تَفْعَلُوا مِنْ خَيْرٍ فَإِنَّ اللَّهَ بِهِ عَلِيمٌ ﴿٢١٥﴾ [البقرة : ٢١٥] অর্থ: লোকে আপনাকে জিজ্ঞেস করে (আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য) তারা কী ব্যয় করবে? আপনি বলে দিন, তোমরা যে সম্পদই ব্যয় কর তা পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন, ইয়াতীম, মিসকীন ও মুসাফিরদের জন্য হওয়া চাই। আর তোমরা কল্যাণকর যে কাজই কর আল্লাহ সে সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবগত। (বাকারা, ২: ২১৫)
৭. সন্তান না হওয়ার ইতিবাচক দিকগুলোর কথা চিন্তা করুন। যেমন : সন্তানের ভরণ-পোষণ ও লালন-পালনের ঝক্কি-ঝামেলা থেকে মুক্ত থাকা সম্ভব। সন্তানের নানা রোগ-শোক ও বিপদ-আপদ থেকে আশঙ্কামুক্ত হয়ে নির্ঝঞ্ঝাট জীবনযাপন করার সুযোগ হয়। কারো জীবদ্দশায় যদি নিজ সন্তানের মৃত্যু দেখতে হয়, এর দুর্বিষহ কষ্ট-যন্ত্রণা তাকে আজীবন বয়ে বেড়াতে হয়। কিন্তু যদি সন্তান না থাকে, তাহলে নিজ চোখে সন্তানের অকাল মৃত্যু দেখার জ্বালা সহ্য করতে হয় না। সন্তান যদি কোনো অপরাধ জগতের সাথে জড়িয়ে পড়ে কিংবা কোনো নৈতিক ও চারিত্রিক ভ্রষ্টাচারে লিপ্ত হয়, তাকে সুপথে ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টায় ভুক্তভোগী মা-বাবার জীবন নিঃশেষ হয়ে যায়। নিঃসন্তান হওয়ার ফলে আপনার জীবনে এ ধরনের কোনো আশঙ্কা নেই।
৮. নিজেকে একবার জিজ্ঞেস করুন, কিংবা আপনার চারপাশের সমাজের খোঁজ নিয়ে দেখুন, এমন অনেক লোকের সন্ধান পাবেন, যারা দশটি কিংবা তার কম-বেশি সন্তানের বিরাট পরিবারের কর্তা। সারা জীবন সংসারের ঘানি টেনে, পরিবারের নানান ঝক্কিঝামেলা সামাল দিতে গিয়ে এখন তারা এমন পরিস্থিতির শিকার যে, সর্বান্তকরণে তাদের একটাই কামনা, তারা যদি নিঃসন্তান হতে পারত! এ অবস্থা বিবেচনায় আপনি রবের শোকর আদায় করুন। যে তিনি আপনাকে জীবনের এমন কঠিন পরিস্থিতি থেকে রক্ষা করেছেন।
৯. মনে-প্রাণে সর্বদা এ চিন্তা লালন করুন, আল্লাহ তা'আলার ফায়সালায় প্রকৃত কল্যাণ নিহিত। সন্তান লালন-পালনে, না কি নিঃসন্তান জীবনযাপনে, অসুস্থতায় না কি সুস্থতায়, সচ্ছলতায় না কি দরিদ্রতায়-কীসে আপনার কল্যাণ নিহিত, এ বিষয়ে মহান আল্লাহ তা'আলাই সর্বজ্ঞাত। তাঁর ফায়সালাই সন্তুষ্টচিত্তে গ্রহণ করুন। তিনিই সর্বশ্রেষ্ঠ ফায়সালাকারী।
১০. কিতাব সম্পর্কে হাফেজ ইবনুল কাইয়্যিম জাওযী (রহ.) (৬৯১-৭৫১ হি.)-এর অভিমত শুনুন। তিনি বলেছেন: 'আপনার কিতাবগুলো আপনার চিরস্থায়ী সন্তান।' অর্থাৎ, মৃত্যুর পর সমাজের মধ্যে সন্তানই আপনার প্রতিচ্ছবি হয়ে থাকবে। কালের ব্যবধানে একদিন তারও মৃত্যু হবে। আপনার অবদানও নিঃশেষ হয়ে যাবে। কিন্তু আপনার রচিত বইয়ের কোনো মৃত্যু নেই। তা চিরদিন আপনার অবদান ও সুকীর্তির প্রতিচ্ছবি হয়ে থাকবে। আপনি এমন কোনো উদ্যোগ বাস্তবায়নে সচেষ্ট হোন, মানবকল্যাণে যার অবদান স্থায়ী, দীর্ঘস্থায়ী।
১১. মেধাবী যোগ্য ছাত্র-গড়ার মহৎ উদ্যোগে নিয়োজিত হোন। আপন সন্তানের মতো তাদের দেখাশোনা করুন। ইহকাল ও পরকালের কল্যাণে তারাই আপনার আপন সন্তানের চেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।
১২. বিয়ে করেছেন। একএক করে কয়েক বছর পার হয়ে গেল, কিন্তু সন্তানের দেখা নেই। আশাহত হবেন না। আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হবেন না। এমন অনেকের কথা শুনেছি, বিয়ের দীর্ঘ কয়েক বছর পর এক সময় যখন তারা সন্তানের আশা ছেড়ে দিয়েছে, আল্লাহ তা'আলা তাদের কোল জুড়ে ফুটফুটে সন্তান দান করেছেন। অসুস্থতার পর সুস্থতা, অসচ্ছলতার পর সচ্ছলতা ও দুঃখের পর সুখ-পরিবর্তনের এই চলমান ধারাই হলো জীবন। সুতরাং দীর্ঘকাল সন্তানহীনতার কষ্টের পর সন্তান লাভের সুখ সমাগত।
১৩. এই দু'আটি বেশি বেশি পাঠ করুন: رَبِّ لَا تَذَرْنِي فَرْدًا وَأَنتَ خَيْرُ الْوَارִثِينَ﴾ [الأنبياء: ٨٩] অর্থ: 'হে আমার রব্ব! আমাকে একা রেখ না, আর তুমিই শ্রেষ্ঠ উত্তরাধিকারী।' (আম্বিয়া, ২১: ৮৯) যারা সন্তানহীনতার সম্মুখীন হয়েছেন, এই দু'আটি তাদের জন্য ঐশী সমাধান।
১৪. অবসর ও কাজেকর্মে, ঘরে-বাইরে সর্বদা তাওবা-ইস্তিগফারে মশগুল থাকুন। এই আমলের প্রতিদানে আল্লাহ তা'আলা সন্তান-সন্ততি দান করার ওয়াদা করেছেন: فَقُلْتُ اسْتَغْفِرُوا رَبَّكُمْ إِنَّهُ كَانَ غَفَّارًا * يُرْسِلِ السَّمَاءَ عَلَيْكُمْ مِدْرَارًا * وَيُمْدِدْكُمْ بِأَمْوَالٍ وَبَنِينَ وَيَجْعَلْ لَكُمْ جَنَّتٍ وَيَجْعَلْ لَكُمْ اَنْهُرًا﴾ [نوح: ١٠-١٢] অর্থ: 'আমি তাদেরকে বলেছি, নিজ প্রতিপালকের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর। নিশ্চিতভাবে জেন, তিনি অতিশয় ক্ষমাশীল। তিনি আকাশ থেকে তোমাদের ওপর প্রচুর বৃষ্টি বর্ষণ করবেন এবং তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে উন্নতি দান করবেন এবং তোমাদের জন্য সৃষ্টি করবেন উদ্যান আর তোমাদের জন্য নদ-নদীর ব্যবস্থা করে দিবেন।' (নূহ, ৭১: ১০-১২)
১৫. নিরাশ হবেন না। এখন বন্ধ্যত্ব সমস্যার সমাধানে এবং সন্তান প্রজননের জন্য অনেক উন্নত চিকিৎসা রয়েছে। সুতরাং আপনি এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের শরণাপন্ন হোন এবং আল্লাহর তা'আলার কাছে দু'আ করতে থাকুন। তিনিই সর্বশ্রোতা ও দোয়া কবুলকারী।

পরিশিষ্ট:
নবী যাকারিয়া (আ.) অশীতিপর বৃদ্ধ কিংবা বয়স একশ ছুঁইছুঁই। আপন রবের দরবারে সন্তানহীনতার অনুযোগ করলেন। সিজদায় লুটিয়ে পড়ে কেঁদে যারযার হয়ে দু'আ করলেন: وَرَبِّ لَا تَذَرْنِي فَرْدًا وَانْتَ خَيْرُ الْوَارִثِينَ﴾ [الأنبياء: ٨٩] অর্থ: 'হে আমার রব্ব! আমাকে একা রেখ না, আর তুমিই শ্রেষ্ঠ উত্তরাধিকারী।' (আম্বিয়া, ২১: ৮৯) আল্লাহ তা'আলা তাঁর নবীর দু'আ কবুল করলেন। পড়ন্ত বার্ধক্যে পুত্রসন্তান দান করলেন। তিনি হলেন নবী ইয়াহইয়া (আ.)। পুত্র ইয়াহইয়া (আ.)-কে পেয়ে যাকারিয়া (আ.) আনন্দে আত্মহারা। আপন রবের উদ্দেশ্যে বললেন (পবিত্র কুরআনের ভাষায়): قَالَ رَبِّ إِنِّي وَهَنَ الْعَظْمُ مِنِّي وَاشْتَعَلَ الرَّأْسُ شَيْبًا وَلَمْ أَكُنْ بِدُعَائِكَ رَبِّ شَقِيًّا ) [مريم: ٤] অর্থ: 'সে বলেছিল, হে আমার প্রতিপালক! আমার অস্থিরাজি পর্যন্ত জীর্ণ হয়ে গেছে, মাথা বার্ধক্যজনিত শুভ্রতায় উজ্জ্বলিত হয়ে উঠেছে এবং হে আমার প্রতিপালক! আমি তোমার কাছে প্রার্থনা করে কখনও ব্যর্থকাম হইনি।' (মারইয়াম, ১৯: ৪) আল্লাহ তা'আলার কুদরত এমনই। সবকিছুর ঊর্ধ্বে। সমস্ত বাহ্যিকতার ঊর্ধ্বে। তাই অবস্থা যতই প্রতিকূল হোক, সমস্যা যতই চরম আকার ধারণ করুক, আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হবেন না। আপনার যেকোনো প্রয়োজন, নিবেদন করুন একমাত্র আল্লাহর কাছে। তিনিই দোয়া কবুলকারী।

ফন্ট সাইজ
15px
17px