📘 আল হাল্লু জীবন সমস্যার সমাধান 📄 দারিদ্র্য

📄 দারিদ্র্য


দারিদ্র্য হলো মানবিক মৌলিক চাহিদাগুলো-অন্ন, বস্ত্র, বিদ্যা, বাসস্থান ও চিকিৎসা-ন্যূনতম মানে পূরণ করার অক্ষমতা। কিংবা আরও সংক্ষেপে বলতে গেলে, বেঁচে থাকার স্বার্থে ন্যূনতম প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চনা। দরিদ্রতার কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় শিশু-কিশোররা। তারা হলো দরিদ্রতার ভয়াল থাবার নিরীহ শিকার। মাতৃগর্ভ থেকেই তারা অযত্ন, অবহেলা ও পুষ্টিহীনতার শিকার। ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর থেকে অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা-দীক্ষা ও সভ্যতা-সংস্কৃতি-সর্বক্ষেত্রেই তাদের ওপর চরম বঞ্চনা চেপে বসে।

নীতি-নৈতিকতা ও মানবিকতার ক্ষেত্রেও দারিদ্র্যের থাবা অত্যন্ত ভয়ানক। অভাব-অনাটন মানুষের মনে হিংসা-বিদ্বেষ ও শত্রুতার মানসিকতা উস্কে দেয়। সমাজে যত অন্যায়, অনিয়ম, অনাচার, পাপাচার-এসবের অন্যতম নেপথ্য কারণ হলো দরিদ্রতা। হতদরিদ্র, অভাব-অনাটনগ্রস্ত মানুষ তার অস্তিত্বের লড়াইয়ে কি না করতে পারে-মিথ্যা, কপটতা, ধোঁকা থেকে শুরু করে, পর্যায়ক্রমে চুরি, রাহাজানি, নির্যাতন এমনকি হত্যা, আত্মহত্যা করতেও সে পরোয়া করে না।

তাই রাসূলুল্লাহ ﷺ প্রত্যেক নামাযের পড়ে কুফুরি ও দারিদ্র্য থেকে আল্লাহর তা'আলার কাছে পানাহ চাইতেন। হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, রাসূল ﷺ প্রত্যেক নামাযের পর এ দু'আটি পাঠ করতেন:
«اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْكُفْرِ وَالْفَقْرِ، اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ عَذَابِ الْقَبْرِ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ» (مسند أبي داود الطيالسي)
অর্থ: 'হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে কুফুরি ও দরিদ্রতা থেকে পানাহ চাই। পানাহ চাই কবরের আযাব থেকে।' (মুসনাদে আবূ দাউদ, ২/১৯৯)
আমরা যদি দুর্নীতিমুক্ত, শান্তিপূর্ণ সভ্য সমাজ গড়তে চাই তাহলে দারিদ্র্য বিমোচনের বিকল্প নেই। কিন্তু উপায় কী? এ লক্ষ্যে আমাদের করণীয় কী?

সমাধান:
১. আপন রবের প্রতি সুধারণা পোষণ করুন। আল্লাহ তা'আলা বান্দার সাথে তার ধারণা মোতাবেক আচরণ করেন। তাঁর কাছেই প্রার্থনা করুন। সময়মতো জামাতের সাথে পাঁচওয়াক্ত নামাযে যত্নবান হোন। নামায হলো রিযিকের প্রশস্ত পথ। রাসূলুল্লাহ ﷺ ও তাঁর উম্মতের প্রতি আল্লাহ তা'আলার নির্দেশ হলো: وَأَمُرُ أَهْلَكَ بِالصَّلُوةِ وَاصْطَبِرْ عَلَيْهَا طَ لَا نَسْئَلُكَ رِزْقًا طَ نَحْنُ نَرْزُقُكَ طَ وَالْعَاقِبَةُ لِلتَّقْوَى [طه: ١٣٢] অর্থ: 'এবং নিজ পরিবারবর্গকে নামাযের আদেশ কর এবং নিজেও তাতে অবিচলিত থাক। আমি তোমার কাছে রিযিক চাই না। রিযিক তো আমিই দেব। আর শুভ পরিণাম তো তাকওয়ারই।' (ত্বহা, ২০: ১৩২)
২. আখেরাতের সৌভাগ্য ও সফলতা অর্জনকে ইহকালীন জীবনের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য উদ্দেশ্য হিসেবে নির্ধারণ করুন। সবর ও ধৈর্যের মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলার নিকট সাহায্য প্রার্থনা করুন। নিজের যাবতীয় প্রয়োজনে মানুষের দ্বারস্থ না হয়ে আল্লাহ তা'আলার কাছে প্রার্থনা করুন। সুখ-সচ্ছলতা দানকারী একমাত্র আল্লাহ তা'আলা। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "وَمَنْ يَسْتَعْفِفْ يُعْفِهِ اللهُ وَمَنْ يَتَصَبَّرْ يُصَبِّرْهُ اللهُ، وَمَا أُعْطِيَ أَحَدٌ عَطَاءً خَيْرًا وَأَوْسَعَ مِنَ الصَّبْرِ". (صحيح البخاري) অর্থ: 'যে ব্যক্তি সচ্ছলতা চায়, আল্লাহ তাকে সচ্ছলতা দান করেন। যে ধৈর্যধারণ করতে চায়, আল্লাহ তাকে ধৈর্যক্ষমতা দান করেন। আর সহনশীলতা ও ধৈর্যের চেয়ে কল্যাণকর ও বিরাট নিয়ামত কেউ প্রাপ্ত হতে পারে না।' (বুখারী, ২/১২২)
৩. দরিদ্র ও প্রয়োজনগ্রস্ত লোকদের সাহায্য-সহযোগিতায় যে সমাজসেবী ও দাতা সংস্থাগুলো সচেষ্ট, তাদের আর্থিক ফান্ড সচল রাখার জন্য সমাজের ধনী ও বিত্তশীলদের এগিয়ে আসতে হবে। এর পাশাপাশি ধনী লোকদের যাকাত আদায়ে যত্নবান হতে হবে। যাকাত আদায়কারীর আত্মশুদ্ধির ও সমাজের দারিদ্র্য বিমোচনের ক্ষেত্রে যাকাতের গুরুত্ব অপরিসীম।
৪. দেশ ও সমাজকে সর্বপ্রকার নৈরাজ্য ও বিশৃঙ্খলামুক্ত রাখতে হবে। কেননা বিদ্রোহ ও নৈরাজ্যের কবলে দেশের সরকার ও জনগণ সবচেয়ে বেশি আর্থিক ক্ষয়-ক্ষতির শিকার হয়। ক্যান্সার যেমন মানবদেহকে ক্ষয়ে-ক্ষয়ে নিঃশেষ করে ফেলে, তেমনি বিশৃঙ্খলা, বিদ্রোহের কবলে দেশের অর্থনৈতিক অবকাঠামো সমূলে ধসে পড়ে।
৫. দেশে লাভজনক বিনিয়োগের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিনিয়োগ-বান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। গবেষক ও চিন্তাশীলদের উৎপাদনমুখী পরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সরকার ও বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে।
৬. শ্রমিক ও কর্মচারীদের সাথে মালিক ও কর্তাশ্রেণি ব্যক্তিদের অবশ্যই সম্মানজনক বিনম্র ব্যবহার করা কর্তব্য। তাকওয়া ও ধার্মিকতার বিবেচনায় অনেক কর্মচারী তার মালিক পক্ষের তুলনায় আল্লাহ তা'আলার নিকট অধিক মর্যাদাবান ও শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী। কুরআন-সুন্নাহর দৃষ্টিতে মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বের একমাত্র মানদণ্ড হলো তাকওয়া ও আল্লাহভীতি। এক্ষেত্রে অর্থবিত্ত ও জাগতিক চাকচিক্যের কোনো মূল্য নেই। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِنْدَ اللَّهِ أَتْقَكُمْ إِنَّ اللَّهَ عَلِيمٌ خَبِيرٌ﴾ [الحجرات: ١٣] অর্থ: 'তোমাদের মধ্যে আল্লাহর কাছে সেই অধিক মর্যাদাসম্পন্ন যে তোমাদের মধ্যে অধিক তাকওয়া সম্পন্ন। নিশ্চয় আল্লাহ তো সর্বজ্ঞ, সম্যক অবহিত।' (হুজুরাত, ৫৯: ১৩)
৭. শ্রমিক হলো সৃষ্টি ও উৎপাদনের মূল চালিকাশক্তি। তাদের কর্মস্পৃহা সচল ও বেগবান করার জন্য তাদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করার সঙ্গে সঙ্গে নির্দিষ্ট সময়ে বেতন-ভাতা পরিশোধ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে কোনো প্রকার অবহেলা ও গড়িমিসি গ্রহণযোগ্য নয়। আবূ হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, 'হাদীসে কুদসীতে' আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: ثَلَاثَةٌ أَنَا خَصْمُهُمْ يَوْمَ القِيَامَةِ: رَجُلٌ أَعْطَى بِي ثُمَّ غَدَرَ، وَرَجُلٌ بَاعَ حُرًّا فَأَكَلَ ثَمَنَهُ، وَرَجُلٌ اسْتَأْجَرَ أَجِيرًا فَاسْتَوْفَى مِنْهُ وَلَمْ يُعْطِ أَجْرَهُ. (صحيح البخاري) অর্থ: 'কেয়ামতের দিন আমি তিন ব্যক্তির বিরুদ্ধে বিবাদি হব। (এক.) যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে; এরপর (প্রয়োজনের মুহূর্তে) প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে। (দুই.) যে স্বাধীন ব্যক্তিকে দাস বলে বিক্রি করে মূল্য আত্মসাৎ করেছে। (তিন.) যে শ্রমিক নিয়োগ দিয়ে তার কাজ (ষোলো আনা) বুঝে নিয়েছে; কিন্তু তার শ্রমের মূল্য পরিশোধ করেনি।' (বুখারী, ৩/৮৩)
৮. আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রে যেসব বিষয় আল্লাহ তা'আলা হারাম করেছেন-যেমন: জুয়া, সুদ ও ব্যবসা-বাণিজ্যে ধোঁকা-প্রতারণা-ইত্যাদি থেকে বিরত থাকতে হবে। শরীয়তের এ নিষিদ্ধ আর্থিক লেনদেনগুলো বাহ্যিক দৃষ্টিতে সাময়িক লাভজনক মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে ও দূরদর্শী দৃষ্টিকোণ থেকে তা অভাব-অনাটন ও দরিদ্রতার অন্যতম কারণ।
৯. গুনাহগার ও নাফরমান ব্যক্তির ধনাঢ্যতা ও অর্থবিত্তের বাড়ন্ত অবস্থা দেখে প্রতারিত হবেন না। এটা রিযিকের প্রশস্ততা নয়, আল্লাহ তা'আলার তরফ থেকে নাফরমান বান্দাকে ধীরে ধীরে পাকড়াও করার কৌশল। তার অবস্থা হলো সুদি কারবারিদের মতো-বাহ্যিকভাবে তা অত্যধিক বেশি মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে তা নিতান্ত কম। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: إِنَّ الرِّبَا وَإِنْ كَثُرَ فَإِنَّ عَاقِبَتَهُ إِلَى قُلّ» (مسند ابن أبي شيبة) অর্থ: 'সূদের দ্বারা সম্পদ যতই বৃদ্ধি পাক-না-কেন, তার শেষ পরিণতি হল নিঃস্বতা।' (মুসনাদে ইবনে আবি শায়বা, ১/২০৭)
১০. হালাল আয়-উপার্জনের পেশায় নিয়োজিত থাকার সঙ্গে সঙ্গে এমন কিছু নেক আমল করুন, যার ওসিলায় আপনার রিযিক বরকতপূর্ণ হবে। এমন কয়েকটি আমল হলো, বেশি বেশি ইস্তিগফার করা, মাতা-পিতার প্রতি সদাচার করা, আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা, অভাবী-দরিদ্রদের সাহায্য করা ও বেশি বেশি দরূদ শরীফ পাঠ করা। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: مَنْ سَرَّهُ أَنْ يُبْسَطَ لَهُ فِي رِزْقِهِ، أَوْ يُنْسَأَ لَهُ فِي أَثَرِهِ، فَلْيَصِلْ رحمه» (صحيح البخاري) অর্থ: 'যে ব্যক্তি তার রিযিক বৃদ্ধি ও তার পশ্চাতে সুনাম কামনা করে, সে যেন আত্মীয়-স্বজনের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখে।' (বুখারী, ৩/৫৬) পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন : مَنْ عَمِلَ صَالِحًا مِنْ ذَكَرٍ أَوْ أُنْثَى وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَلَنُحْيِيَنَّهُ حَيُوةً طَيِّبَةً ، وَلَنَجْزِيَنَّهُمْ أَجْرَهُمْ بِأَحْسَنِ مَا কَانُوا يَعْمَلُونَ﴾ [النحل: ٩٧] অর্থ: 'পুরুষ আর নারীদের মধ্যে যে কেউ সৎকাজ করবে আর সে মু'মিনও, তাকে আমি অবশ্য অবশ্যই উত্তম জীবন দান করব। আর তাদেরকে অবশ্য অবশ্যই তারা যা করে, তার চেয়ে উত্তম প্রতিফল দান করব।' (নাহল, ১৬: ৯৭)
১১. নিজের আয়-উপার্জন অনুযায়ী এখনই একটি পদক্ষেপ গ্রহণ করুন-মাসিক আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের সামঞ্জস্য রেখে নিজের ও পরিবারের আর্থিক চাহিদা ও ব্যয়ের খাতগুলো তালিকাবদ্ধ করুন। তালিকায় নিতান্ত প্রয়োজন ও চাহিদাগুলো সর্বাধিক প্রাধান্য পাবে। গ্যাস, পানি ও বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয়ী হোন। এসব নিত্য প্রয়োজনীয় সেবা-পরিসেবার বিল যথাসম্ভব কমিয়ে আনার পাশাপাশি শখ-সৌখিনতা ও প্রয়োজনের অতিরিক্ত চাহিদা পূরণের মানসিকতা পরিহার করুন। প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে, সময়ে-অসময়ে ঋণ গ্রহণের স্বভাব ত্যাগ করুন। একান্ত প্রয়োজন ছাড়া কখনো ঋণ গ্রহণ করা সমীচীন নয়।
১২. সকাল-সন্ধ্যায় নিয়মিতভাবে এ দু'আটি পাঠ করুন: اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْكُفرِ وَالْفَقْرِ اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ عَذَابِ الْقَبْرِ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ» (مسند أبي داود الطيالسي) অর্থ: 'হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে কুফুরি ও দরিদ্রতা থেকে পানাহ চাই। পানাহ চাই কবরের আযাব থেকে।' (মুসনাদে আবূ দাউদ, ২/১৯৯)
১৩. আপনি যদি ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন, কাঁধের ওপর একাধিক ঋণের বোঝা চেপে থাকে, তাহলে পাওনাদারদের নামের পাশে টাকার অংক বসিয়ে একটা তালিকা করে নিন। পর্যায়ক্রমে কোন ঋণ কোন তারিখে শোধ করবেন, তা-ও চূড়ান্ত করুন। এক্ষেত্রে যেন কোনো কালবিলম্ব না হয়, সে বিষয়ে দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হোন। আপনার সদিচ্ছা ও একান্ত প্রচেষ্টাই পারে আপনাকে ঋণমুক্ত করতে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: مَنْ أَخَذَ أَمْوَالَ النَّاسِ يُرِيدُ أَدَاءَهَا أَدَّى اللَّهُ عَنْهُ، وَمَنْ أَخَذَ يُرِيدُ إِخْلَافَهَا أَتْلَفَهُ اللهُ» (صحيح البخاري) অর্থ 'যে ব্যক্তি ঋণ গ্রহণ করে (যত দ্রুত সম্ভব) আদায় করার ইচ্ছায়, আল্লাহ তা'আলা তার ঋণ আদায়ের ব্যবস্থা করে দিবেন। আর যে ব্যক্তি ঋণ নিবে আত্মসাৎ করার উদ্দেশ্যে, আল্লাহ তা'আলাও তাকে (এ ধরনের অর্থ যথার্থ কাজে ব্যয় করার সুযোগ থেকে) বঞ্চিত করবেন।' (বুখারী, ৩/১১৬)
১৪. ঋণ পরিশোধের জন্য, অর্থনৈতিক অবস্থা সচল রাখার জন্য কিংবা কোনো লাভজনক প্রকল্প শুরু করার জন্য পুঁজি সংগ্রহের উদ্দেশ্যে ঘরের অপ্রয়োজনীয় আসবাবপত্র বিক্রি করে দিতে পারেন। অথবা বর্তমান বিলাসবহুল ফ্ল্যাট ছেড়ে এমন ফ্ল্যাটে স্থানান্তর হতে পারেন, যার মূল্য কিংবা মাসিক ভাড়া তুলনামূলক কম। এসব ক্ষেত্রে আপনার হিতাকাঙ্ক্ষী কোনো বিজ্ঞ-অভিজ্ঞ ব্যক্তির সাথে পরামর্শ করুন; তাহলে ঋণ পরিশোধ ও জমানো পুঁজি লাভজনক খাতে বিনিয়োগ করার ক্ষেত্রে সহজেই সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারবেন।
১৫. আপনার ঋণগুলোকে এককেন্দ্রিক করে ফেলার চেষ্টা করুন। তা এভাবে হতে পারে, একজনের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের ঋণ নিয়ে সকলের পাওনা পরিশোধ করে দিন। এবার ঋণের অঙ্কটা আপনার সাধ্যানুযায়ী কয়েক মাসের কিস্তিতে ভাগ করুন। প্রতিমাসের ব্যয় কিংবা বেতনের খাত থেকে সে পরিমাণ অর্থ সঞ্চয় করে ঋণ পরিশোধ করতে থাকুন। এ পন্থায় অতি সহজেই মোটা অঙ্কের ঋণ পরিশোধ সম্ভব। ঋণ পরিশোধের অর্থ-জমানো দীর্ঘ সময়সাপেক্ষ হলে একসাথে জমিয়ে ঋণ পরিশোধ করতে যাওয়া বোকামি। এ ধরনের ক্ষেত্রে মোটা অঙ্কের টাকা একসাথে জমা হয়ে ওঠে না।
১৬. আয়-উপার্জন বৃদ্ধির জন্য চাকরি ও ব্যবসা-বাণিজ্যে আরও বেশি সময় দিন, পরিশ্রমের মাত্রা বাড়িয়ে দিন, কিংবা আরও লাভজনক বৈধ কোনো পেশা অবলম্বন করুন। এমন একটা পেশা বেছে নিন, যা আপনার চাহিদা ও প্রয়োজনের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। এক্ষেত্রে হালাল উপার্জনের সমস্ত পেশা ও শ্রমকে সম্মানের দৃষ্টিতে দেখতে হবে। পেশা ও শ্রেণিভেদে মানুষের মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বের তারতম্য অবশ্যই আছে। তাই বলে একটি পেশার মূল্যায়নে বাড়াবাড়ি করা, আরেকটা পেশায় নাক ছিটকানো ও অবজ্ঞা করা কোনো ক্রমেই সমীচীন নয়।
১৭. আর উপার্জন ও জীবনধারণের ক্ষেত্রে কখনো অন্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বেন না। এতে মানুষ আপনাকে বোঝা মনে করবে। তার চেয়ে বরং মহান আল্লাহ তা'আলার ওপর ভরসা করে নিজ যোগ্যতা ও কর্মদক্ষতায় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার চেষ্টা করাই শ্রেয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: لَوْ أَنَّكُمْ كُنْتُمْ تَوَكَّلُونَ عَلَى اللَّهِ حَقَّ تَوَكَّلِهِ لَرُزِقْتُمْ كَمَا يُرْزَقُ الطَّيْرُ تَغْدُو خِمَاصًا وَتَرُوحُ بِطَانًا» (سنن الترمذي) অর্থ: 'যদি তোমরা আল্লাহ তা'আলার ওপর পূর্ণ ভরসা করতে পার, তাহলে তোমরা সেভাবেই রিযিকপ্রাপ্ত হবে, যেভাবে বিহঙ্গকুল রিযিকপ্রাপ্ত হয়-সকালে খালি পেটে বের হয়; সন্ধ্যায় ভরপেট হয়ে ফিরে আসে।' (তিরমিজী, ৪/৫৭৩)
১৮. আত্মবিশ্বাস রাখুন। সর্বোচ্চ চেষ্টা ও পরিশ্রম দিয়ে নিজের যোগ্যতা ও দক্ষতা কাজে লাগানোর চেষ্টা করুন। বিশ্বাস করুন, আপনার শ্রম কখনো বৃথা যাবে না। আপনার সাথে আছে আল্লাহর তা'আলার প্রতিশ্রুতি। যিনি মহান রিযিকদাতা। তাঁর প্রতিশ্রুতির ব্যতিক্রম হতে পারে না। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: هُوَ الَّذِي جَعَلَ لَكُمُ الْأَرْضَ ذَلُولًا فَامْشُوا فِي مَنَاكِبِهَا وَكُلُوا مِنْ رِزْقِهِ وَإِلَيْهِ النُّشُورُ﴾ [الملك: ١٥] অর্থ: 'তিনিই তোমাদের জন্য ভূমিকে বশ্য করে দিয়েছেন। সুতরাং তোমরা তার কাঁধে চলাফেরা কর ও তাঁর রিযিক খাও। তাঁরই কাছে তোমাদেরকে পুনর্জীবিত হয়ে যেতে হবে।' (মুলক, ৬৭: ১৫)
১৯. আয়-উপার্জনের সমৃদ্ধি ও রিযিকে বরকত লাভের জন্য আল্লাহ তা'আলার নিয়ামতের শোকর আদায় করুন। শোকরগুযার বান্দাকে আল্লাহ তা'আলা বহুগুণ বেশি দান করেন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা ওয়াদা করেছেন: لَئِن شَكَرْتُمْ لَأَزِيدَنَّكُمْ ﴾ [إبراهيم: ٧] অর্থ: 'তোমরা সত্যিকারের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলে, আমি তোমাদের আরও বেশি দেব।' (ইবরাহীম, ১৪: ৭)
২০. আল্লাহ তা'আলা আপনার কল্যাণে যে রিযিকের ফায়সালা করেছেন, তাতেই তুষ্ট থাকুন। তাঁর ফায়সালার বাইরে মানুষের পক্ষে কোনো জীবিকা উপার্জন করা সম্ভব না। তিনিই সৃষ্টিজগতের রিযিকদাতা ও জীবিকার ব্যবস্থাপক। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: مَنْ كَانَتِ الدُّنْيَا هَمَّهُ، فَرَّقَ اللهُ عَلَيْهِ أَمْرَهُ، وَجَعَلَ فَقْرَهُ بَيْنَ عَيْنَيْهِ، وَلَمْ يَأْتِهِ مِنَ الدُّنْيَا إِلَّا مَا كُتِبَ لَهُ، وَمَنْ كَانَتِ الْآخِرَةُ نِيَّتَهُ، جَمَعَ اللَّهُ لَهُ أَمْرَهُ، وَجَعَلَ غِنَاهُ فِي قَلْبِهِ، وَأَتَتْهُ الدُّنْيَا وَهِيَ رَاغِمَةً» (سنن ابن ماجه) অর্থ: 'যে ব্যক্তির সমস্ত চিন্তা-ভাবনা শুধু জাগতিক জীবনকে কেন্দ্র করে, আল্লাহ তা'আলা তার জীবনকে বিক্ষিপ্ত করে দেন। তার দৃষ্টিতে অভাব-অনটনের বিষয়টি বড় করে দেখান। দুনিয়ার ততটুকু (সুযোগ-সুবিধা) সে লাভ করতে পারে, যা আল্লাহ তার জন্যে ফায়সালা করেন। আর যার ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষা শুধু আখিরাতের সফলতা কেন্দ্র করে, আল্লাহ তা'আলা তার জীবন সুসংগঠিত করে দেন। তাকে আত্মিক সচ্ছলতা দান করেন। দুনিয়া মাথানত করে তার কাছে ধরা দেয়।' (ইবনে মাযাহ, ২/১৩৭৫)
২১. চেষ্টা পরিশ্রমের সুফল পেতে কিংবা বিনিয়োগকৃত পুঁজির লভ্যাংশ পেতে কালবিলম্ব হলে কখনো উদ্বিগ্ন, উৎকণ্ঠিত হবেন না। কেননা প্রত্যেকের জীবিকা নির্দিষ্ট সময়াবদ্ধ। সুনির্দিষ্ট সময়ের আগে সে তা কিছুতেই লাভ করতে পারবে না। রিযিকপ্রাপ্ত হওয়ার ক্ষেত্রে যে অত্যন্ত ত্বরাপ্রবণ, চেষ্টা পরিশ্রমের লাভালাভ নগদ নগদ বুঝে পেতে যে অতি ব্যগ্র, তার অবস্থা হলো ঐ মুসল্লির মতো, যে দ্রুত নামায শেষ করার ইচ্ছায় ইমাম সাহেবের আগেই রুকু সিজদায় চলে যায়; কিন্তু শেষে তাকে ইমাম সাহেবের সাথেই সালাম ফেরাতে হয়। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: ﴿وَإِنْ يُرِدُكَ بِخَيْرٍ فَلَا رَادَّ لِفَضْلِهِ ﴾ [يونس: ١০৭] অর্থ: 'তিনি যদি তোমার কোনও মঙ্গল করার ইচ্ছা করেন, তবে এমন কেউ নেই, যে তার অনুগ্রহ রদ করবে।' (ইউনুস, ১০: ১০৭)
২২. জাগতিক সুযোগ-সুবিধা ও সুখ-সাচ্ছন্দ্যের ক্ষেত্রে যারা আপনার চেয়ে উচ্চস্তরের, তাদের দিকে না তাকিয়ে, যারা আপনার চেয়ে নিম্নস্তরের, তাদের অবস্থা লক্ষ করুন। মনের সচ্ছলতা ও অল্পে তুষ্টির অনন্য গুণের কারণে আল্লাহ তা'আলার নিকট আপনিই অধিক মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: ارْضَ بِمَا قَسَمَ اللَّهُ لَكَ تَكُنْ أَغْنَى النَّاسِ. অর্থ: 'আল্লাহ তা'আলা আপনার ভাগে যা রেখেছেন, তাতেই তুষ্ট থাকুন। মনের সচ্ছলতায় আপনি হবেন জগতের শ্রেষ্ঠ ধনী।' (আয যুহ্‌দ লি আবি দাউদ, ১৩৯)
২৩. মনে রাখবেন, নিজের জন্য আপনি যা কল্যাণকর ভাবছেন, তার চেয়ে আল্লাহ তা'আলার ফায়সালাই অধিক মঙ্গলজনক। সামান্য অভাব-অনাটন সত্ত্বেও ব্যক্তির গুনাহমুক্ত জীবনযাপন, পূত-পবিত্রতা ও চারিত্রিক নিষ্কলুষতা আল্লাহ তা'আলার নিকট অধিক পছন্দনীয় ও বিরাট প্রতিদান লাভের ওসিলা। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: يَدْخُلُ الْفُقَرَاءُ الْجَنَّةَ قَبْلَ الْأَغْنِيَاءِ بِخَمْسِمِائَةِ عَامٍ نِصْفِ يَوْمٍ অর্থ: 'আমার উম্মতের গরিব-দরিদ্র শ্রেণি ধনী সম্পদশালীদের চেয়ে পাঁচশ বছর আগে জান্নাতের প্রবেশ করবে।'

পরিশিষ্ট:
ইমাম শাফেয়ী (রহ.) বলেছেন: أَمْطِرِي لُؤْلُوا جِبَالَ سَرَنديبَ وفيضي آبار تكرور تــبـــــرا / أَنَا إِن عِشتُ لَستُ أَعْدَمُ قوتاً وَإِذا مُتُّ لَستُ أَعدَمُ قبـــــরা / هِمَّتِي هِمَّةُ المُلوكِ وَنَفْسِي نَفْسُ حُرِّ تَرَى المَذَلَّةَ كُفরা
অর্থ: 'হে আকাশ, তুমি সারান্দিবের পর্বতমালায় মণিমুক্তা বর্ষণ কর! তাকরুরের কূপগুলোকে স্বর্ণখণ্ডে ভরে দাও, (তাতে আমার কী আসে-যায়)। আমি যদি বেঁচে থাকি তাহলে তো আমি রিযিক-বঞ্চিত হব না, আর যদি মৃত্যুবরণ করি তাহলে কবরই হবে আমার শেষ ঠিকানা। তবে রাজা-বাদশাহের মতোই আমার মনোবল উচ্চাকাঙ্ক্ষী। আমার মানসিকতাও নির্ভীক স্বাধীনচেতা; নচেৎ নিজের প্রতি সামান্য অপমানও যে কুফুরির মতো ঘৃণা করে।'

তাবেয়ী ইমাম হাসান বসরী (রহ.) (৬৪২-৭২৮ খ্রিষ্টাব্দ) বলেছেন: 'পবিত্র কুরআনের নিরানব্বই জায়গায় পড়েছি। “আল্লাহ তা'আলা রিযিকের ফায়সালাকারী ও সমস্ত সৃষ্টিজীবের রিযিক দানকারী।” আর পবিত্র কুরআনের মাত্র একটা জায়গায় পড়েছি, "শয়তান তোমাদের দারিদ্র্যের ভয় দেখায়।” (কিন্তু এরপরও আমাদের অবস্থা হলো) নিরানব্বইবার আল্লাহ তা'আলার প্রতিশ্রুতিতে আশ্বস্ত না হয়ে এক জায়গার শয়তানের অপচেষ্টায় ভড়কে যাই।'

জনৈক পশ্চিমা দার্শনিক বলেছেন: 'সেবক হিসেবে সম্পদ যত একনিষ্ঠ, মনিব হিসেবে সে ততটাই নিকৃষ্ট।'

স্পাইক মিলিগান বলেছেন: 'অর্থবিত্ত তোমার জন্য নিঃস্বার্থ বন্ধু জোগাতে পারবে না; উল্টো তোমার পেছনে ঘোর শত্রু লেলিয়ে দিবে।'

টিকাঃ
৫৫. সুনানে নাসায়ীর রিওয়ায়েতে বর্ণিত হয়েছে: «إِنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ يَقُولُهُنَّ فِي دُبُرِ الصَّلَاةِ» (سنن النسائي) অর্থ: রাসূলুল্লাহ ﷺ নামাযের পর এ দু'আটি পাঠ করতেন। (নাসায়ী, ৩/৭৩) এতে বোঝা যায়, সকাল-সন্ধ্যায় ও প্রত্যেক নামাযের পর-দুটি সময়েই আমল করার সুযোগ রয়েছে। (অনুবাদক)
৫৬. সুনানে নাসায়ীর রিওয়ায়েতে বর্ণিত হয়েছে... আল্লাহ্ তা'আলার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে, সওয়াবের প্রত্যাশায়, কোনো প্রকার শর্তরোপ না করে যে ঋণ প্রদান করা হয়, তাকে 'করজে হাসানা' বা উত্তম ঋণ বলা হয়।
৫৭. একজন যুগশ্রেষ্ঠ ইসলামি ফকীহ। যে সকল মহা মনীষী ইসলামের বিধিবিধান সম্পর্কে ব্যাপক গবেষণা করে, ইসলামকে অনুসরণের জন্য সাধারণের জন্য সহজসাধ্য করে তুলেছেন, তাঁদের মধ্যে তিনি অন্যতম। ১৫০ হিজরিতে মিশরের আসকালান শহরে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। দু' বছর বয়সে তাঁর মা তাঁকে নিয়ে মক্কায় পাড়ি জমান। সাত বছর বয়সে পবিত্র কুরআনের হিফয সম্পন্ন করেন। জ্ঞানার্জনের লক্ষ্যে তিনি মদীনা, ইয়েমেন, ইরাক ও মিসর সহ বহুদেশ সফর করেন। তাঁর রচিত গ্রন্থসমূহের মধ্যে 'আল-উম্ম' ও 'আররিসালাহ' অন্যতম। ২০৪ হিজরিতে তিনি মিশরে ইন্তেকাল করেন। (অনুবাদক)
৫৮. তিনি ভারতের আহমেদ নগরে জন্মগ্রহণ করেন। পরবর্তীতে তিনি স্থায়িভাবে আয়ারল্যান্ডে পাড়ি জমান। তিনি ছিলেন আয়ারল্যান্ডের বিশিষ্ট কবি ও রম্যলেখক। ২০০২ সালের ২৭ই ফেব্রুয়ারি তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

📘 আল হাল্লু জীবন সমস্যার সমাধান 📄 দুর্বল ব্যক্তিত্ব

📄 দুর্বল ব্যক্তিত্ব


পৃথিবীতে কেউ দুর্বল ব্যক্তিত্ব ও হীনম্মন্যতা নিয়ে জন্মায় না। প্রতিটি শিশুই সুস্থ স্বাভাবিক, সুন্দর প্রকৃতি নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। কিন্তু এরপর শৈশবে, বয়ঃসন্ধিকালে পারিপার্শ্বিক সামাজিকতা, পরিবেশ-প্রতিকূলতা, জীবনের ছোটখাটো ভুল ও সঙ্গদোষ ইত্যাদি কারণে সে দুর্বল মানসিকতার শিকার হয়। তার মধ্যে প্রবল হীনম্মন্যতা কাজ করে। ব্যক্তিজীবন থেকে শুরু করে বহিঃজীবনে সমন্বিত কার্যক্রমে ও সামাজিক আচার-অনুষ্ঠানে তার দুর্বল ব্যক্তিত্ব প্রকাশ পেতে থাকে।

দুর্বল ব্যক্তিত্ত্বের আলামত: নিজের বিদ্যাবুদ্ধির আলোকে বিচার না করে, সুফল ও পরিণতির কথা না ভেবে অন্যের পেছনে ছোটা, অন্যের চিন্তা-চেতনা ও মতাদর্শ গ্রহণ করা। জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোতে সিদ্ধান্ত গ্রহণে অক্ষম হয়ে অন্যের দ্বারস্থ হওয়া। অন্যের মুখোমুখি হতে ভয় পাওয়া। অপরিচিতজনদের সাথে সাক্ষাৎ ও ওঠা-বসায় লজ্জাবোধ করা। কোনো চিন্তা-ভাবনা ও বাদ-প্রতিবাদ ছাড়াই অন্যের চাহিদা ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করা। সামাজিক অঙ্গনে নিজেকে দুর্বল ও ছোট মনে করা। নিজস্ব মতামত ও সিদ্ধান্ত প্রকাশে সাহস হারিয়ে ফেলা। বিশেষ করে ব্যক্তিগত মতামত যদি অন্যদের বিপরীত হয়, মুখে কুলুপ এঁটে বসে থাকা, কিংবা অন্যদের মতামতের প্রতি সহাস্য সমর্থন ব্যক্ত করা। কোনো অন্যায়-অবিচারের শিকার হয়েও এর নৈতিক প্রতিবাদের সাহস হারিয়ে ফেলা। কঠিন পরিস্থিতি থেকে গা বাঁচানোর জন্য মিথ্যার আশ্রয় নেওয়া। উন্নতি-অগ্রগতির লক্ষ্যে নতুন কোনো উদ্যোগ-আয়োজনে নিস্পৃহ হয়ে থাকা।

মানসিক দুর্বলতা ও হীনম্মন্যতা ব্যক্তিকে জীবনের সমুন্নত লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ও সর্বোচ্চ সাফল্য অর্জনের পথ থেকে দূরে ঠেলে দেয়। সমাজে স্বাধীনভাবে ও সম্মানের সাথে বেঁচে থাকতে হলে ব্যক্তিত্বের দুর্বলতা কাটিয়ে আত্মসম্মানবোধ-সম্পন্ন ও বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্বের অধিকারী হতে হবে। এ লক্ষ্যে আমাদের করণীয় কী? হীনম্মন্যতা ও দুর্বল ব্যক্তিত্ব কাটিয়ে ওঠার উপায় কী?

সমাধান:
১. মা-বাবাকে সন্তানদের সাথে আলাপ-আলোচনায় বসতে হবে। তাদের প্রতিটি কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতে হবে। তাদের সুন্দর চিন্ত-ভাবনা ও সফলতার কথায় মুগ্ধতা প্রকাশ করতে হবে। যা তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দিবে এবং আত্মসম্মান বোধসম্পন্ন হতে সহায়ক হবে।
২. বাল্যবয়স থেকে সন্তানদের ব্যক্তিত্ব গঠনের লক্ষ্যে কাজ করতে হবে। কয়েকটি গবেষণা এ তথ্য প্রকাশ করেছে যে, জাতির নেতৃত্ব ও পরিচালনার যোগ্য ব্যক্তিত্ব গড়ে তোলার জন্য দু'বছর বয়স থেকেই শিশুদের নিয়মতান্ত্রিক পরিচর্যা করা কর্তব্য।
৩. অন্যদের সাথে সন্তানদের ইতিবাচক অংশগ্রহণ সুনিশ্চিত করতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে মানবিক মূল্যবোধ ও ভদ্রতা-সভ্যতা বজায় রাখার বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা কর্তব্য।
৪. শিশুদের লজ্জা, ভয় ও দুর্বল মানসিকতা থেকে বেঁচে থেকে ব্যক্তিত্বসম্পন্ন হয়ে ওঠার লক্ষ্যে আরও কিছু দায়িত্ব-কর্তব্য রয়েছে। অভিভাবকদের তা অবশ্যই গুরুত্বের সাথে পালন করতে হবে। করণীয় বিষয়গুলো হলো:
* শিশুদের সার্বিক বিষয়ের সযত্ন তত্ত্বাবধান করার পাশাপাশি তাদের সঙ্গে স্নেহ-ভালোবাসাপূর্ণ আচরণ করতে হবে। অনুপ্রেরণাদায়ক কথা বলে তাদের উদ্দীপনা ও চঞ্চলতা সচল রাখতে হবে।
* বিভিন্ন উপলক্ষে-আয়োজনে অন্যদের সাথে শিশুদের অংশগ্রহণ এবং পরিচিত-অপরিচিত ব্যক্তিদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার বিষয়গুলো তাদের সযত্নে শেখাতে হবে।
* পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে বিনোদন-ভ্রমণে অংশগ্রহণ এবং সমবয়সিদের সাথে খেলাধুলা মানসিক বিকাশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
* মা-বাবার কর্তব্য হলো, সন্তানদের সাথে আলাপ-আলোচনা করা। তাদের চিন্তা-ভাবনা ও বোধ-উপলব্ধির কথা শোনা। কোথাও ভুল-ত্রুটি হলে তা শুধরে দেওয়া।
* সন্তানদের কীর্তি ও সফলতা যত ক্ষুদ্র সামান্য হোক-না-কেন, এর যথাযথ মূল্যায়ন করতে হবে, তার যোগ্যতার প্রশংসা করে কিংবা সফলতায় পুরস্কৃত করে।
* প্রত্যেক শিশুকে বিশেষ বিশেষ যোগ্যতার বিষয়ে সজাগ-সচেতন করতে হবে। যেন তারা নিজ যোগ্যতা কাজে লাগিয়ে নিজেদের সফল ও যোগ্য হিসেবে গড়ে তুলতে পারে।
* শিশুদের অপছন্দনীয় ও সাধ্যাতীত বিষয়ে কোনো প্রকার জোর-জবরদস্তি না করে তাদের পছন্দ ও আগ্রহের বিষয়ে অনুপ্রাণিত করা আবশ্যক।
* লোক-সমাজের মাঝে, বিশেষ করে বন্ধু-বান্ধবের পরিবেশে সন্তানদের শাসানো ও খাটো করার মানসিকতা পরিহার করতে হবে।
* শিশুদের যদি জন্মগত কোনো খুঁত থাকে, তাহলে তা মেনে নিয়েই তার সাথে সুন্দর স্বাভাবিক আচরণ করা এবং তাকে লজ্জা, ভয় ও মানসিক সংকীর্ণতাবোধ থেকে মুক্ত রেখে সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথে অনুপ্রাণিত করা কর্তব্য।
* অন্যদের যোগ্যতা ও শ্রেষ্ঠত্বের সাথে তুলনা করে সন্তানদের তিরস্কার ভর্ৎসনা করার মানসিকতা পরিহার করতে হবে। তাদের মনে সাহস ও আত্মবিশ্বাস জাগিয়ে তুলতে হবে।
* সন্তানদের প্রতি প্রশ্রয়মূলক আদর-সোহাগ দেখানো, তাদের যেকোনো শখ-শৌখিনতা পূরণ করা ঠিক নয়। এমন অতিরিক্ত আঙ্কারা ও প্রশ্রয়ে সন্তানদের উচ্ছন্নে যাওয়ার আশঙ্কাই প্রবল। এক্ষেত্রে তাদের আত্মনির্ভরশীলরূপে গড়ে তোলা কর্তব্য। সঙ্গে সঙ্গে দৈনন্দিন কাজকর্ম-ড্রেস পরা, বইপত্র গুছিয়ে রাখা, ব্যক্তিগত আসবাবপত্র সযত্নে গুছিয়ে রাখা ও সংরক্ষণ-নিজেকেই করতে শেখাতে হবে।
* শিশুদের কাছে রাসূলুল্লাহ ﷺ ও সাহাবায়ে কেরামের বীরত্বগাথা ঘটনা বর্ণনা করতে হবে, যা তাদের মনে সাহসিকতা ও উদ্দীপনা যোগাবে।
* মেহমানদের সাদর অভ্যর্থনা জানানো, তাদের সাথে সুন্দর করে কথা বলা এবং ভদ্র-মার্জিত ব্যবহার করার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের চর্চা করাতে হবে।
* সন্তানদের মাঝে পরস্পর বোঝাপড়ার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। তাদের ওপর কঠোর শাসন প্রয়োগ করা এবং তাদের যৌক্তিক-অযৌক্তিক সমস্ত মতামত অগ্রাহ্য করার মানসিকতা পরিহার করা উচিত। এর ফলে সন্তানদের মনে ভীতির সঞ্চার হয় এবং তাদের মনোবল দুর্বল হয়ে পড়ে।
৫. শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম ও সমন্বিত উদ্যোগ-আয়োজনে শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। এতে তারা মানসিক জড়তা কাটিয়ে ওঠার পাশাপাশি নিজেদের নানামুখী যোগ্যতা প্রকাশ করার সুযোগ পাবে।
৬. আপনার মানসিক জড়তা ও ব্যক্তিত্বের দুর্বলতার দিকগুলো শনাক্ত করে একটা কাগজে টুকে রাখুন। কীভাবে তা কাটিয়ে ওঠা যায়, চিন্তা-ফিকির করুন। এমন কোনো বিজ্ঞ-অভিজ্ঞ ব্যক্তির দ্বারস্থ হোন, যিনি আপনার যোগ্যতার মূল্যায়ন করতে পারেন এবং আপনার ভুল-বিচ্যুতির সংশোধন করে সুসম্পন্ন ব্যক্তিরূপে গড়ে তুলতে পারেন।
৭. জীবন-জগৎ সম্পর্কে গভীর অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ হওয়ার জন্য বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়ার পাশাপাশি বই-পুস্তক পাঠ করুন। জীবন ও সমাজ বিষয়ক কুরআন-সুন্নাহর বিধি-বিধান সম্পর্কে জানুন, যেন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে নিজেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারেন।
৮. যৌক্তিক বিচারবুদ্ধি ও দূরদর্শিতার গুণে বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্বের অধিকারী হোন। অন্যের অন্ধ অনুকরণ না করে, অযৌক্তিক সিদ্ধান্তের সামনে নত না হয়ে নিজস্ব মতামত ব্যক্ত করুন। সাহসিকতার সাথে নিজের যৌক্তিকতা তুলে ধরুন।
৯. আগে নিজেকে চেনার চেষ্টা করুন। আমাদের প্রত্যেকের মধ্যেই কিছু বিশেষ যোগ্যতা ও সুপ্ত প্রতিভা বিদ্যমান। আপনি আপনার যোগ্যতার জায়গাগুলো নির্ণয় করুন। সফলতার সম্ভাব্য ক্ষেত্রসমূহ চিহ্নিত করুন। দ্রুত সফল হওয়ার জন্য, সমাজের মধ্যে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য যথার্থ ক্ষেত্রে মেধা-শ্রম ব্যয় করুন।
১০. শুধু একটা পেশার গণ্ডিতে আটকে না থেকে, সম্ভব হলে এর পাশাপাশি আরও বিভিন্ন পেশা ও উদ্যোগ শুরু করুন। এর মাধ্যমে অনেক বিচিত্র চিন্তা-চেতনা ও ব্যক্তিত্বের পরিচয় পাবেন। আপনার দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার ঋদ্ধ-সমৃদ্ধ হবে।
১১. বিভিন্ন সামাজিক কার্যক্রম, শিক্ষা-দীক্ষামূলক কর্মশালা ও সমন্বিত উদ্যোগে অংশগ্রহণ করুন। এর মাধ্যমে অপরিচিত ব্যক্তিদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপনের সুযোগ সৃষ্টি হবে। আপনার মানসিক জড়তা দূর হবে এবং সবকিছুতে অযাচিত সংকোচ ও জড়সড়-ভাব কেটে যাবে। স্বভাব-প্রকৃতি উচ্ছল প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে।
১২. জীবনের লক্ষ উদ্দেশ্য নির্ধারণ করুন। কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে নিজেকেই নিজে চ্যালেঞ্জ করুন। সফলতা লাভের জন্য চ্যালেঞ্জিং মানসিকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইতিহাসের সফল ব্যক্তিদের সম্পর্কে জানুন। নিজ যোগ্যতা ও প্রতিভা কাজে লাগিয়ে যারা সফলতার শীর্ষস্থান অধিকার করেছেন, তাদের জীবনের শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা হবে আপনার চলার পথের পাথেয়।
১৩. আত্মকেন্দ্রিকতার গণ্ডি থেকে বের হয়ে চারপাশের সমাজ ও সামাজিকতার সাথে সম্পৃক্ত হোন। বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়-স্বজনের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ করুন। সর্বোপরি সমাজের মৌলিক ক্ষেত্রগুলোতে নিজের সচেষ্ট তৎপরতা বজায় রাখুন এবং কার্যকর ভূমিকা পালন করুন।
১৪. মহান স্রষ্টা আল্লাহ তা'আলার ওপর ভরসা করুন। আল্লাহর ভয় ও তাঁর একত্ববাদে বিশ্বাস ব্যক্তির মধ্যে মানসিক প্রশান্তি, আত্মবিশ্বাস ও আত্মসম্মানবোধ জাগ্রত করে। আর গায়রুল্লাহর ভয় সম্মান মর্যাদার স্থানে অসম্মান, সফলতা সৌভাগ্যের স্থলে দুঃখ-দুর্দশা এবং সুখ-সমৃদ্ধির পরিবর্তে দরিদ্রতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
১৫. ক্রীড়াসংস্থার সাথে সম্পৃক্ত হয়ে নিয়মিত খেলাধুলায় অংশগ্রহণ করুন। খেলাধুলা ও ক্রীড়াচর্চা আপনার আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি করবে। জড়তা ও সংকোচ দূর করে উচ্ছল প্রাণবন্ত স্বভাব-প্রকৃতিতে অভ্যস্ত করে তুলবে।
১৬. যারা শক্তিহীন দুর্বল মানসিকতার শিকার, তারা যৌক্তিক সত্য কথাটি বলার সাহস করে না। ন্যায়সংগত সাহসী ভূমিকা পালন করতে পারে না। অগোচরে নিন্দা-সমালোচনামুখর হয়ে উঠে। সমাজে এমন লোকের সংখ্যা কম নয়। তাদের থেকে আপনি নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখুন। নচেৎ সময়ের ব্যবধানে আপনার মধ্যে একই পশ্চাদপদ মানসিকতা সক্রিয় হয়ে উঠবে। সাহসী, আত্মবিশ্বাসী ও স্বাধীনচেতা ব্যক্তিদের সাথে চলুন। তাদের সংস্পর্শ আপনার বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্ব গঠনে সহায়ক হবে।
১৭. অন্যের কথা ও কাজের যৌক্তিক প্রতিবাদ করতে ভয় করবেন না। তবে এক্ষেত্রে স্থান-কাল-পাত্র বিবেচনা করা বাঞ্ছনীয়। আপনার কাছে যদি এমন কোনো বিষয় উত্থাপিত হয়, যা নীতি-নৈতিকতাশূন্য ও অযৌক্তিক, তাহলে নিঃসংকোচে আপনি তার প্রতিবাদ করুন। ভয় ও সংকোচের বশবর্তী হয়ে নিজেকে কখনো এমন কাজে বাধ্য করবেন না, যা অগ্রহণযোগ্য।
১৮. যাবতীয় বিষয়ে আল্লাহ তা'আলার সাহায্য প্রার্থনা করুন। তাঁর আশ্রয় গ্রহণ করুন। সময়মতো জামাতের সাথে পাঁচওয়াক্ত নামাযে যত্নবান হোন। পবিত্র কুরআনের এ আয়াতগুলো বারবার পাঠ করুন: রَبِّ اشْرَحْ لِي صَدْرِي - وَيَسِّرْ لِي أَمْرِي - وَاحْلُلْ عُقْدَةً مِنْ لِسَانِي - يَفْقَهُوا قَوْلِي অর্থ: এবং আমার কাজ সহজ করে দিন। আমার জিহ্বার জড়তা দূর করে দিন। যাতে মানুষ আমার কথা বুঝতে পারে। নিরাশা ও ব্যর্থতার মানসিকতা ছেড়ে আশাবাদী মানসিকতা ধারণ করুন। আপন রবের প্রতি সুধারণা পোষণ করুন। এতে আপনার আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি পাবে ব্যক্তিত্ব সুদৃঢ় হবে।
১৯. সামান্য সমস্যাতে, এমনকি কঠিন সংকটেও মানুষের দ্বারে-দ্বারে অভিযোগ-অনুযোগ করে বেড়াবেন না। একমাত্র আল্লাহ তা'আলার কাছে যাবতীয় সমস্যার কথা ব্যক্ত করুন।
২০. মনের ওপর জোর খাটিয়ে অন্যের চাহিদা ও ইচ্ছা পূরণে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়বেন না, তাহলে সবাই আপনাকে দিয়ে নিজ নিজ স্বার্থ উদ্ধার করে নেবে। এক্ষেত্রে ব্যক্তিত্বের স্বকীয়তা বজায় রাখুন। প্রথমে বিবেক-বুদ্ধির বিচারে যাচাই করুন। তারপর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করুন।
২১. আবেগ নিয়ন্ত্রণ করুন। রাগ-বিরাগ, দুঃখ-বেদনা ও হাসি-আনন্দের মুহূর্তে আত্মনিয়ন্ত্রণ করুন। আবেগ-তাড়িত হয়ে কখনও কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে যাবেন না। আপনার সিদ্ধান্ত যখন উৎকণ্ঠা, ব্যাকুলতা, একচেটিয়া সমর্থন ও চরম বিরোধিতা ইত্যাদি মনস্তাত্ত্বিক আবেগমুক্ত হবে, তখনই তা যথার্থ ও ন্যায়ানুগ হতে পারে।

পরিশিষ্ট:
মদিনার পথে শিশু বাচ্চারা খেলা করছিল। একই পথে আমিরুল মু'মিনীন ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) হেঁটে যাচ্ছিলেন। তাঁকে দেখে বাচ্চারা সবাই দৌড়ে পালাল। শুধু একটা ছেলে দাঁড়িয়ে রইল। খলিফার আগমনে তার চেহারায় কোনো ভাবান্তর নেই। ডর-ভয়ের কোনো ছাপ নেই। ছেলেটি হলো আব্দুল্লাহ ইবনে যুবাইর (রা.)। আমিরুল মু'মিনীন ওমর (রা.) তার কাছে এসে জিজ্ঞেস করলেন: 'অন্য ছেলেদের সাথে তুমি কেন দৌড়ে পালালে না?' ছোট্ট বালক আব্দুল্লাহ ইবনে যুবাইর বলল: 'আমি তো কোনো অপরাধী নই যে, আপনাকে দেখে পালিয়ে যাব। এ রাস্তাও তো এতটা সংকীর্ণ নয় যে, কারো চলার জন্য একপাশে সরে দাঁড়াতে হবে।' ছোট্ট বালক আব্দুল্লাহ ইবনে যুবাইর (রা.)-এর এমন উত্তর তাঁর ভয়-ডরহীন সাহসিকতার বহিঃপ্রকাশ।

লিবিয়ার স্বাধীনতা সংগ্রাম ও ইতালিয়ান উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে 'সানূসী' আন্দোলনের প্রাণপুরুষ উমর আল মুখতার (১৮৫৮-১৯৩১ খ্রিষ্টাব্দ) বলেছেন: 'আত্মসম্মান-বোধসম্পন্ন হোন। উপস্থিত বিষয়ে সহমত পোষণ করা যতই গুরুত্বপূর্ণ হোক-না-কেন, অযৌক্তিক মনে হলে কিছুতেই তা মেনে নিবেন না। কেননা এমনও হতে পারে, অন্যায়-অন্যায্যের সামনে একবার মাথা নোয়ানোর পর আর কখনও মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর সাহস হবে না।'

আইরিশ লেখক জর্জ বার্নাড শ' (১৮৫৬-১৯৫০ খ্রিষ্টাব্দ) বলেছেন: 'অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায়, যা বলা উচিত, তা-ই বলতে ভয় হয়।'

যুক্তরাষ্ট্রের বিশিষ্ট প্রযুক্তি উদ্ভাবক ও কম্পিউটার বিপ্লবের পথিকৃৎ স্টিভ জবস (১৯৫৫-২০১১ খ্রিষ্টাব্দ) বলেছেন: 'পৃথিবীতে আপনার জীবনকাল খুবই সংক্ষিপ্ত। এ ক্ষণকাল অন্যের ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষা পূরণে নষ্ট করবেন না।'

জার্মান লেখক ও কবি ইয়োহান ভোল্‌ফগাং ফন গ্যেটে (১৭৪৯-১৮৩২ খ্রিষ্টাব্দ) বলেছেন: 'ধৈর্য ও স্থৈর্যের মাধ্যমে প্রতিভার বিকাশ ঘটে। জীবনের বাস্তবতা মোকাবেলা করার মাধ্যমে বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্ব গড়ে উঠে।'

টিকাঃ
৫৯. আল্লাহ ছাড়া অন্যান্য জাগতিক বস্তু ও প্রভাব-প্রতিপত্তির ভয়।

📘 আল হাল্লু জীবন সমস্যার সমাধান 📄 গুজব

📄 গুজব


গুজব হলো ভিত্তিহীন বানোয়াট খবর, যা জনসাধারণের মধ্যে এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে যে, এটাকে সত্য বলে বিশ্বাস করতে তাদের মনে আর কোনো দ্বিধা-সংশয় থাকে না।

গুজব রটার কারণ:
যদি ভয়, শঙ্কা কিংবা অনিশ্চয়তার পরিবেশ বিরাজ করে, তবে অতি সহজেই সেখানে গুজব ছড়ায়। যদি যথাসময়ে দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে নির্ভরযোগ্য তথ্য না আসে, তবে সে সুযোগেও গুজবের বিস্তার হতে পারে। এছাড়া গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে দোনামনা ও সিদ্ধান্তহীনতায় দীর্ঘ কাল ক্ষেপণ হলেও গুজব রটতে পারে।

গণমানস বা জনতার মনস্তত্ত্বের একটা চরিত্র হলো, সংকট আসছে জেনে তা ঘনীভূত হওয়ার আগেই প্রতিটি মানুষ নিজের ও তার প্রিয়জনদের জন্য নিরাপত্তা ও স্বস্তি নিশ্চিত করতে চায়। মানুষের এই প্রবণতা যৌক্তিক। তাতে বাধা দেওয়ার উপায় নেই। এই যৌক্তিক প্রবণতার সাহায্যেও অনেক সময় গুজবের ডালপালা ছড়ায়।

গুজব সাধারণত চটকদার ও কৌতূহলোদ্দীপক কিংবা অত্যন্ত ভীতিকর ও আশঙ্কাজনক হয়ে থাকে। গুজব হলো দাবানলের মতো, কোত্থেকে উৎপত্তি, কোথায় এর শেষ পরিণতি-এর কোনো নিশ্চয়তা নেই। গুজবও কার থেকে রটেছে, কীভাবে রটেছে, কেন রটেছে, সাধারণ মানুষের অত ভাবার ফুরসত নেই।

গুজব রটানো হয় বিভ্রান্তি সৃষ্টি করার লক্ষ্যে এবং জনসাধারণের নিরাপত্তা ও শান্তি বিঘ্নিত করে বিশৃঙ্খলা ও অস্থিরতা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক অপপ্রচার অথবা পরস্পর বৈরিতা ও শত্রুতা, গুজবের নেপথ্য কারণ হয়ে থাকে।

গুজব মানুষের মধ্যে সংশয় ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে। তাদের সঠিক পথ ও মত থেকে বিচ্যুত করে ছাড়ে। গুজবের হাত ধরে যে সামাজিক অস্থিরতা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়, পর্যায়ক্রমে তা ধ্বংস ও হত্যাযজ্ঞের রূপ ধারণ করে। একটি সমাজে যদি শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখতে হয়, তাহলে জনসাধারণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আবশ্যক। এ লক্ষ্যে মিথ্যা রটনা ও গুজবের ছিদ্রপথগুলো বন্ধ করা কর্তব্য। এ কর্তব্য পালনের যথাযথ উপায় কী? গুজব প্রতিরোধে আমাদের করণীয় কী?

সমাধান:
১. দেশের শিক্ষা-দীক্ষার সার্বিক মানোন্নয়ন করতে হবে। জনসাধারণ সদা চোখে যা দেখে, সরল মনে যা শুনে, তার সবই যেন বিশ্বাস না করে বসে-এ ব্যাপারে সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষা-দীক্ষা ও সচেতনতাই মানুষকে যাবতীয় সন্দেহ-সংশয় ও মিথ্যা গুজব থেকে বিরত রেখে প্রকৃত সত্য উদ্‌ঘাটনের পথে পরিচালিত করে।
২. গুজবের উৎস-অনুসন্ধান ও গুজব-বন্ধে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা-ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সমস্ত সন্দেহ-সংশয় দূর করে জনগণকে প্রকৃত সত্য ও বাস্তবতা সম্পর্কে অবহিত করতে হবে।
৩. গুজব ও বানোয়াট খবর ছড়িয়ে পড়লে সাধারণ মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি সঠিক পথে পরিচালিত করার জন্য গণমাধ্যমকে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে ভিত্তিহীন খবরের প্রতিবাদ করে প্রকৃত সত্য প্রচারে প্রতিশ্রুতিশীল হতে হবে। গুজব ও সন্দেহ-সংশয় ছড়ানোর মতো অনর্থক কাজে সময় নষ্ট না করে জনসাধারণকে ভালো ও কল্যাণকর কাজে সময় ব্যয় করায় অনুপ্রাণিত করতে হবে।
৪. প্রত্যেকেই নিজের যাবতীয় কাজ-কর্মে দায়বদ্ধ হতে হবে। কারোর এই অধিকার নেই যে, নিজের ব্যর্থতা ও বিফলতার দায় অন্যের উপর চাপিয়ে গুজব ছড়ানো।
৫. শোনামাত্রই যেকোনো সংবাদ বিশ্বাস করা ঠিক নয়। কেননা কোনো কোনো সংবাদ বানোয়াট ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যমূলক হয়ে থাকে। তাই মিথ্যা বানোয়াট খবরের ধোঁকায় না পড়ে নির্ভরযোগ্য সূত্রে প্রকৃত সত্য জানার চেষ্টা করুন। এক্ষেত্রে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলার নির্দেশ হলো:

يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنْ جَاءَكُمْ فَاسِقٌ بِنَبَا فَتَبَيَّنُوا أَنْ تُصِيبُوا قَوْمًا بِجَهَالَةٍ فَتُصْبِحُوا عَلَى مَا فَعَلْتُمْ نَدِمِينَ﴾ [الحجرات: ٦]

অর্থ: 'হে মুমিনগণ! কোন ফাসেক যদি তোমাদের কাছে কোন সংবাদ নিয়ে আসে, তবে ভালোভাবে যাচাই করে দেখাবে, যাতে তোমরা অজ্ঞতাবশত কোন সম্প্রদায়ের ক্ষতি করে না বস। ফলে নিজেদের কৃতকর্মের কারণে তোমাদেরকে অনুতপ্ত হতে হয়।' (হুজুরাত, ৪৯: ৬)
৬. অনেক সময় সঠিক আদর্শ ও মতাদর্শের বিরুদ্ধবাদী ও শত্রুভাবাপন্ন লোকদের পক্ষ থেকেও মিথ্যা রটানো হয়ে থাকে। সতর্ক থাকুন, না জেনে, সুনিশ্চিত না হয়ে মিথ্যা বানোয়াট খবরে প্রতারিত হবেন না। গুজবের প্রেক্ষাপটে পবিত্র কুরআনের আদর্শ অনুসরণ করুন। সঠিক তথ্য-প্রমাণ ছাড়া কথা বিশ্বাস না করা এবং নিঃসন্দেহ ও সুনিশ্চিত না হয়ে কোনো কথা না বলাই হলো পবিত্র কুরআনের নির্দেশ। আল্লাহ তা'আলা বলেছেন:

﴿قُلْ هَلْ عِنْدَكُمْ مِّنْ عِلْمٍ فَتُخْرِجُوهُ لَنَا﴾ [الأنعام: ١٤٨]

অর্থ: বল, 'তোমাদের কাছে কি কোন জ্ঞান আছে, যা তোমরা আমাদের জন্য প্রকাশ করবে?' (আনআম, ৬: ১৪৮)
৭. যাচাই করে সুনিশ্চিত না হয়ে কোনো সংবাদ প্রচার করতে যাবেন না। অনেক সাদাসিধে সরল মনের মানুষ তা বিশ্বাস করে যত্রতত্র ছড়াতে থাকে।
৮. গুজব ও বিশৃঙ্খলার মুহূর্তে ঘরে অবস্থান করুন এবং নীরব ভূমিকা পালন করুন। কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সাথে জড়ানো এবং এ সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করা সমীচীন নয়। তবে যদি এমন কোনো কথা বলতে হয়, যাতে দেশ ও দশের কল্যাণ হবে তাহলে বলুন। এটাই শান্তি ও নিরাপত্তার উপায়। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: أَمْلِকُ عَلَيْكَ لِسَانَكَ، وَلْيَسَعْكَ بَيْتُكَ، وَابْكِ عَلَى خَطِيئَتِكَ। অর্থ: 'তোমার যবান সংযত রাখ। (ফেতনার যামানায়) নিজ ঘরে আবদ্ধ থাক। নিজের ভুল-ত্রুটির জন্য অনুতপ্ত হও।' (তিরমিজী, ৪/১৮৩)
৯. আপনার নামে যদি কোনো মিথ্যা প্রপাগাণ্ডা রটানো হয়, তাহলে স্বভাবতই আপনি ক্রুদ্ধ, ভীষণ ক্রুদ্ধ হবেন। কিন্তু নিজের এ অস্বস্তি ও অসন্তোষ প্রকাশ করতে গিয়ে যদি অতিরিক্ত ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন, তাহলে অন্যরা ভাববে, আপনার নামে যে মিথ্যাচার করা হয়েছে, তা পুরোপুরি না হলেও আংশিক সত্য। তারা নিজেরাই প্রশ্ন ছুড়ে দিবে, আপনার নামে যা বলা হয়েছে, তা যদি নির্জলা মিথ্যাই হয়ে থাকে, তাহলে আপনি এত ক্ষুব্ধ হচ্ছেন কেন? তাই অসন্তোষ ও ক্ষোভ প্রকাশের ক্ষেত্রেও উগ্রতা পরিহার করে ভদ্রতা ও শালীনতা বজায় রাখা কর্তব্য।
১০. দ্বিতীয় কর্তব্য হলো, ধীরস্থিরতা ও প্রজ্ঞার সাথে পরিস্থিতি মোকাবিলা করা। অর্থাৎ, আপনি এমন মানসিকতা প্রকাশ করুন, যেন বিষয়টা গুরুত্বহীন ও নিতান্ত সাধারণ। দেখবেন, বিষয়টা নিয়ে অন্যরাও আর মাথা ঘামাবে না। বিশ্বাস করুন, আপনার নামে অপপ্রচার অচিরেই পর্দার আড়াল হবে। অন্য একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য তার স্থান দখল করে নিবে।
১১. নিতান্ত সাধারণ শ্রেণির লোকেরা খবরের সত্যাসত্য যাচাই না করেই বিশ্বাস করে বসে। খবরটা যদি কিঞ্চিৎ চটকদার ও কৌতূহলোদ্দীপক কিংবা ভীতিকর হয়, মুহূর্তের মধ্যে সর্বত্র ছড়িয়ে দিতে তারা কোনো কসুর করে না। তাই নিজে সুনিশ্চিত না হয়ে সাধারণ লোকের কথায় কখনো কান দিতে যাবেন না।
১২. প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য সব ধরনের গুজব ও ফেতনা থেকে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করুন। এ ধরনের সঙ্গিন পরিস্থিতিতে বেশি বেশি ইস্তিগফার করুন এবং ইবাদতে মশগুল থাকুন। এ দু'আটি বারবার পাঠ করুন: اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوْذُبِكَ مِنَ الْفِتَنِ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَمَا بَطَنَ। অর্থ: 'হে আল্লাহ! প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য সকল ধরনের ফেতনা-ফাসাদ থেকে আমি আপনার আশ্রয় প্রার্থনা করি।'
১৩. সংবাদের উৎস সম্পর্কে জানার চেষ্টা করুন। কোনো কথা বলার ক্ষেত্রে দলিল প্রমাণের ভিত্তিতে বলুন। কোনো কথার সত্যাসত্য যাচাই না করে শোনামাত্র তা প্রচার করতে থাকা সমীচীন নয়। রাসূল ﷺ বলেছেন: 'মানুষের পাপ করার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে যা শুনে তা-ই বলে বেড়ায়।' (মুসলিম, ১/১০)
১৪. তারা বলেছে কিংবা আমি শুনেছি-এ জাতীয় সূত্রে কথা বলার প্রবণতা পরিহার করা বাঞ্ছনীয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: بِئْسَ مَطِيَّةُ الرَّجُلِ زَعَمُوا» অর্থ: 'তারা ধারণা করছে-কথা বলার ক্ষেত্রে এ ধরনের সূত্র ব্যবহার করা অত্যন্ত নিন্দনীয়।' (আবূ দাউদ, ৪/২৯৪)
১৫. আপনার গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয়ে যদি দ্বিধা-সংশয় দেখা দেয় এবং আপনার মনে হয়, মানুষ তাতে ভুল বুঝতে পারে, তাহলে বিষয়টি স্পষ্ট করে দেওয়া আবশ্যক। মানুষ তাতে আস্বস্ত ও সুনিশ্চিত হতে পারবে। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, একবার সাফিয়্যাহ (রা.) রাসূল ﷺ-এর সাথে মসজিদে দেখা করতে এলেন। ফেরার পথে অন্ধকারে রাসূল ﷺ তাঁর পেছনে হাঁটছিলেন। ইতোমধ্যে দু'জন সাহাবি রাসূল ﷺ-কে অতিক্রম করে গেল। তিনি আশঙ্কা করলেন, সাফিয়্যাহ (রা.)-কে কেন্দ্র করে শয়তান তাদের মনে কুমন্ত্রণা সৃষ্টি করতে পারে। তাই সাহাবি দু'জনের উদ্দেশ্যে তিনি বললেন, 'এ হলো সাফিয়‍্যাহে বিনতে হুয়াই।' এতেই সাহাবা দু'জন বুঝে গেলেন, তিনি রাসূল ﷺ-এর স্ত্রী। সামান্য ক্ষুদ্র বিষয়ও সুস্পষ্ট করে দেওয়া হলো রাসূল ﷺ-এর আদর্শ।

পরিশিষ্ট:
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর জীবদ্দশায় মদিনা মুনাওয়ারায় একটা উদ্দেশ্যমূলক প্রপাগাণ্ডা ছড়ানো হলো। যা ছিল রাসূল ﷺ-এর সহধর্মিনী, উম্মুল মুমিনীন আয়েশা বিনতে সিদ্দীক (রা.) সম্পর্কে। যার চারিত্রিক পবিত্রতা ও নিষ্কলুষতার প্রমাণ পবিত্র কুরআনে বিদ্যমান। একটা সাধারণ বিষয়কে কেন্দ্র করে মদিনার মুনাফিকরা আয়েশা (রা.)-এর চরিত্র সম্পর্কে প্রপাগাণ্ডা ছড়াতে প্রবৃত্ত হলো। মুনাফিক ও তাদের সহযোগীদের তৎপরতায় তা গোটা মদিনায় মানুষের মুখে মুখে রটতে থাকল।

মুনাফিকরা আয়েশা (রা.)-এর মানহানি করার নিকৃষ্ট তৎপরতায় মেতে উঠেছিল ইসলামের প্রতি ঘৃণা ও ইসলামের রাসূল ﷺ-এর প্রতি বিদ্বেষবশত। কিন্তু সাহাবায়ে কেরাম, তাঁরা ছিলেন ঈমান ও বিশ্বাসের কেন্দ্রবিন্দুতে অবিচল। রাসূলুল্লাহ ﷺ ও তাঁর পরিবারের প্রত্যেকের চারিত্রিক পবিত্রতা ও নিষ্কলুষতায় ছিলেন নিঃসন্দেহ। তাই সর্বান্তঃকরণে তাঁরা বলতে পেরেছিলেন (পবিত্র কুরআনের ভাষায়): ﴿سُبْحَنَكَ هَذَا بُهْتَانٌ عَظِيمٌ﴾ অর্থ: 'আল্লাহ পবিত্র ও মহান, এটা তো এক গুরুতর অপবাদ!' (নূর, ২৪: ১৬) মুনাফিকদের এ মিথ্যাচার ও প্রপাগাণ্ডা কেন্দ্র করে পবিত্র কুরআনের সূরা নূরে আয়াত নাযিল হলো। যেখানে মুনাফিকদের দাবি ও অপপ্রচার মিথ্যা প্রতিপন্ন করে তাদের অভিশপ্ত আখ্যায়িত করা হয়েছে। পাশাপাশি অপপ্রচার ও গুজবের পরিস্থিতে সাহাবায়ে কেরামের ন্যায়ানুগ অবস্থানের প্রশংসা করা হয়েছে। সুতরাং গুজব প্রপাগাণ্ডা ও অপপ্রচারের ক্ষেত্রে বাকসংযম করুন। নিশ্চিত না হয়ে কোনো কথা বলা থেকে বিরত থাকুন। এটাই প্রকৃত মু'মিনের চরিত্র। এ থেকে বিচ্যুত হয়ে মুনাফিকদের কাতারে শামিল হবেন না।

لَوْلَا إِذْ سَمِعْتُمُوهُ ظَنَّ الْمُؤْمِنُونَ وَالْمُؤْمِنْتُ بِأَنْفُسِهِمْ خَيْرًا لَا وَقَالُوا هَذَا إِفْكٌ مُبِينٌ﴾ [النور: ١٢]

অর্থ: 'যখন তোমরা এটা শুনলে, তখন কেন মু'মিন পুরুষ ও মু'মিন নারীরা তাদের নিজদের সম্পর্কে ভাল ধারণা পোষণ করল না এবং বলল না যে, এটা তো সুস্পষ্ট অপবাদ?' (নূর, ২৪: ১২)

কানাব আল গাতফানী বলেছেন: 'আমি কোনো মঙ্গলের কথা বললে তারা বধির হয়ে থাকে। অমঙ্গলের কিছু বললে উৎকর্ণ হয়ে উঠে। সন্দেহ সংশয়ের কিছু শুনলে সর্বত্র রাষ্ট্র করে বেড়ায়, আর ভালো কিছু জানলে জায়গায় দাফন করে ফেলে।'

খুরাসানে যখন দুর্যোগ ও বিশৃঙ্খলার সূত্রপাত হয়, বিশ্ববরেণ্য কবি সাহিত্যিক আলী ইবনে আব্দুল আযীয আল জুরজানী খুরাসানেই ছিলেন। দেশের এমন উত্তাল পরিস্থিতিতে তিনি নিজ ঘরের দরজা বন্ধ করে দিলেন। দরজার ওপর কেবল কবিতার তিনটি পঙক্তি লিখে দিলেন, যা তার অবস্থান স্পষ্ট করে:

অ্যানিস্টু বিওয়াহদাতি ওয়ালাযিমতু বাইতি / ফাতাবাল আনসু লি ওনামাস সুরুুরু / ফা আদদাবানিয যামান ফালা উবালি / হুজিরতু ফালা উযারু ওয়ালা আযুরু / ওয়ালাসতু বিসায়িল মা দুমতু হাইয়্যান / আসারাল জাইশু আম রাকিবাল আমীরু।

অর্থ: 'একাকিত্ব বরণ করে নিজেই নিজেকে গৃহবন্দি করে রেখেছি। এই নিঃসঙ্গতার মধ্যেই আমার আন্তরিকতা ও চিত্তবিনোদন নিহিত। কালের ঘাত-প্রতিঘাত ও দুর্যোগ-দুর্বিপাকের শিক্ষা আমি পেয়েছি। তাই আমি কি জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লাম, কেউ আমাকে দেখতে আসে না, আমিও কারো সাক্ষাতে যাই না-এসব কিছুই আমি পরোয়া করি না। যত দিন বেঁচে আছি, জানতে চাইব না-সেনাবাহিনী কি যুদ্ধাভিমুখী হয়েছে? যুদ্ধের উদ্দেশ্যে শাসক কি ঘোড়া ছুটিয়েছে-এসবের কিছুই।'

বিখ্যাত মার্কিন রম্য লেখক ও সাহিত্যিক মার্ক টোয়েন (১৮৩৫-১৯১০ খ্রিষ্টাব্দ) বলেছেন: 'তুমি কিছু মানুষকে সবসময়ের জন্য বোকা বানিয়ে রাখতে পার কিংবা মানুষকে কিছু কালের জন্য বোকা বানিয়ে রাখতে পার। কিন্তু সব মানুষকে সবসময়ের জন্য বোকা বানিয়ে রাখতে পারবে না।'

📘 আল হাল্লু জীবন সমস্যার সমাধান 📄 প্রবাস-পরবাস

📄 প্রবাস-পরবাস


'প্রবাস-পরবাস' শব্দ দু'টা বলা যত সহজ, শুনতে তত কঠিন কষ্টদায়ক। প্রবাস হলো, প্রয়োজনের তাড়নায় কিংবা দায়িত্বের তাগাদায় মাতৃভূমি ছেড়ে ভিন দেশে পাড়ি জমানো। প্রবাস-জীবনে ব্যক্তিকে পরিবার-পরিজন, বন্ধু-বান্ধব ও পাড়াপ্রতিবেশী-সবার থেকে দূরে থাকতে হয়। শৈশব-কৈশোরের স্মৃতি, পরিবারের আনন্দ-বেদনার স্মৃতি, পরিচিত ভাষা ও সমাজ ছেড়ে নতুন পরিবেশ ও অপরিচিত লোক-সমাজের মধ্যে একাকী জীবনযাপন করতে হয়।

দেশে যেখানে প্রতিদিন তিন বেলা মার হাতের সুস্বাদু খাবার খেয়ে পরিতৃপ্ত হতো, এখন দূর পরবাসে খাবারের বাছ-বিচার না করে কোনো রকম ক্ষুধার জ্বালা মিটিয়েই তৃপ্ত হতে হয়। রোগ-শোকে, বিপদ-আপদে আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুবান্ধব পাশে এসে দাঁড়াত। প্রবাসে এখন জীবনের যত ঝড়-ঝাপটা, সব একাই শামাল দিতে হয়। এতসব দুঃখ-কষ্ট সে সহ্য করে যায় পরিবার-পরিজনের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য। পরিবার যেন সুখে থাকে, ছেলে-মেয়েরা যেন উন্নত শিক্ষা-দীক্ষার সুযোগ পায়, মা-বাবার চিকিৎসাটা যেন ভালোমতো হয়, এ-ই তার একমাত্র চাওয়া। প্রবাস জীবনের দুঃখ-কষ্ট, এ জীবনের দায়-দায়িত্বের চাপ শুধু একজন প্রবাসীই বুঝতে পারে। তাসত্ত্বেও নিয়তির অবধারিত নীতি মেনে তাকে জীবন সংগ্রামে টিকে থাকতে হয়। হাসিমুখে কষ্ট-যাতনা আড়াল করে প্রবাস জীবন উপভোগ করার জন্য আমাদের করণীয় কী? এত দুঃখ-কষ্টের মাঝেও একটু হাসি-আনন্দে জীবনযাপন করার উপায় কী?

সমাধান:
১. মনে রাখতে হবে, প্রবাসজীবনের উদ্দেশ্য হলো এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজন পূরণ করা ও কল্যাণচিন্তা বাস্তবায়ন করা, স্বদেশে থেকে ব্যক্তির জন্য যা অত্যন্ত দুরূহ ও কষ্টসাধ্য। অনেক সময় শিক্ষা-দীক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও সুচিকিৎসার উদ্দেশ্যে বিদেশযাত্রা আপনার জন্য অধিক কল্যাণকর ও ফলপ্রসূ হতে পারে।
২. বিদেশ যাত্রা ও প্রবাস-জীবনে অনেক কল্যাণ নিহিত। এর মাধ্যমে নতুন সভ্যতা-সংস্কৃতি, জীবনধারা ও সামাজিকতা পরখ করার সুযোগ হয়। তার মধ্যে যা কিছু কল্যাণ, যা কিছু মঙ্গল, তা হয়ে থাকে ভবিষ্যৎ জীবন পথের পাথেয়। এভাবে ব্যক্তির বিদ্যা-বুদ্ধি ও অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার ঋদ্ধ হয়। জীবনধারা উন্নত ও সমৃদ্ধ হয়।
৩. আপনি নিশ্চিত থাকুন। দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হবেন না। প্রযুক্তি ও আবিষ্কারের যুগে এখন যোগাযোগব্যবস্থা অনেক উন্নত। মোবাইল ও ইন্টারনেটের কল্যাণে গোটা পৃথিবী আপনার হাতের মুঠোয়। যখন ইচ্ছা, যার সাথে ইচ্ছা, যোগাযোগ করতে পারেন। তাদের খোঁজ-খবর নিতে পারেন।
৪. বিদেশে এমন ব্যক্তিবর্গ ও প্রতিষ্ঠানের সাথে যোগাযোগ ও আন্তরিক সম্পর্ক বজায় রাখুন-যেমন: স্বদেশের দূতাবাস, মসজিদ, ইসলামি প্রতিষ্ঠান এবং স্বদেশী ব্যক্তিবর্গ-যাদের আন্তরিক ব্যবহার ও কথাবার্তায় আপনার প্রবাস জীবনের কষ্ট লাঘব হবে। আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধব থেকে দূরে থাকার কষ্ট কিছুটা হলেও ভুলে থাকতে পারবেন।
৫. স্মরণ করুন, নবী-রাসূলগণ, ইতিহাসের মহা মনীষী ও বিপ্লবী ব্যক্তিগণ জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চার উদ্দেশ্যে, দেশ ও জাতির কল্যাণে স্বদেশ ত্যাগ করে ভিনদেশে পাড়ি জমিয়েছেন। দূর দেশের অজানা পথের দুর্যোগ-দুর্বিপাক হাসিমুখে সহ্য করেছেন।
৬. স্বদেশ ছেড়ে যে দেশে অবস্থান করছেন, অবসরের সময়টাতে সেখানে শিক্ষা-দীক্ষামূলক চর্চা অথবা অর্থোন্নয়নমুখী কোনো কার্যক্রমে যুক্ত হোন। যা আপনাকে প্রবাস জীবনের দুশ্চিন্তা-দুর্ভাবনা ও দুঃখ-কষ্টের কথা ভুলিয়ে দেয়।
৭. মনে রাখুন, আপনি নিজের ও পরিবারের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ বিনির্মাণের গুরুদায়িত্ব পালন করছেন। এজন্য অবশ্যই আপনাকে হালাল উপার্জনের কোনো একটা উপায় অবলম্বন করতে হবে। জাগতিক জীবনে এটাই চিরাচরিত রীতি। তাই বিষয়টিকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখুন এবং জীবনের এ মহান দায়িত্ব সফলভাবে পালন করতে পেরে সম্মান ও গৌরব বোধ করুন।
৮. চিন্তা করে দেখুন, পরকালীন জীবনের বিবেচনায় আমাদের এ জাগতিক জীবনও একপ্রকার প্রবাস জীবন। যে দিন আদম (আ.) ও হাওয়া (আ.) আমাদের আসল ভূমি জান্নাত থেকে পৃথিবীর মাটিতে পদার্পণ করেছেন, সে দিন থেকেই আমরা প্রবাসী। এভাবেই চিন্তা করে নিজের মনকে সান্ত্বনা দিন।
৯. সময়মতো জামাতের সাথে পাঁচওয়াক্ত নামায ও অন্যান্য ইবাদতে যত্নবান হোন। বেশি বেশি যিকির আযকারের মাধ্যমে আপন রবের সাথে মহাব্বত ও ভালোবাসার সম্পর্ক স্থাপন করুন। এর মধ্যে যুগপদ দু'টি কল্যাণ নিহিত:
প্রথমত, বিরাট প্রতিদান হাসিল হবে। দ্বিতীয়ত, নেক আমলের মধ্যে সময় কাটানোর মাধ্যমে দুশ্চিন্তা-দুর্ভাবনামুক্ত থাকা সহজ হবে।
১০. নিজের মধ্যে একটা আলাদা জগৎ গড়ে তুলুন, যা হবে কল্যাণকর চিন্তাভাবনা, আল্লাহর যিকির ও দু'আ পাঠের মতো মহৎ আমলের জগৎ। মনে করুন, এ জগৎটাই আপনার স্বদেশ মাতৃভূমি।
১১. আপনি কেন কাঁটা তারের সীমারেখা ভুলে গোটা বিশ্বটাকে আপনার স্বদেশ ভাবছেন না? এ জগৎটাকে নিজের আবাসভূমি মনে করছেন না? আপনি এভাবে চিন্তা করুন-বিশ্বজগৎটা তো একই স্রষ্টার সৃষ্টি। সমগ্র পৃথিবী তো মহান আল্লাহর কর্তৃত্বাধীন। যেখানে আপনার অবস্থান, সেটাই হবে আপনার আবাসভূমি। কবির ভাষায়: 'পৃথিবীর যেখানেই মহান আল্লাহ তা'আলার নাম উচ্চারিত হয়, আমি মনে করি, সেটাই আমার মাতৃভূমি।'
১২. বিদেশে অবস্থানকালে সেখানের নিয়ম-নীতি মেনে চলুন। আপনার স্বকীয়তা ও ধার্মিকতা অটুট রেখে তাদের সভ্যতা-সংস্কৃতির প্রতি সম্মান বজায় রাখুন। নিজেকে ইসলাম ও মুসলমানের আদর্শ নমুনারূপে উপস্থাপন করুন। আপনার স্বকীয়তা ও স্বাতন্ত্র্য, আপনার জন্য সামাজিক মূল্যায়ন ও সম্মান বয়ে আনবে।

পরিশিষ্ট:
অবিসংবাদিতভাবেই হাদীসশাস্ত্রে সর্বাধিক প্রসিদ্ধ ব্যক্তিত্ব হলেন ইমাম বুখারী (রহ.)। ষোলো বছর বয়সেই তিনি স্বদেশ ছেড়ে বের হয়ে পড়েন। পবিত্র মক্কায় হজ পালন করেন এবং মদিনায় রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর রওযা মোবারক যিয়ারত করেন। এরপর হেজায, মিশর হয়ে ইরাকের বাগদাদ এসে পৌঁছান। বাগদাদ শহরে যখন প্রবেশ করেন, তিনি পরিবার-পরিজন থেকে বিচ্ছিন্ন রিক্তহস্ত। একমাত্র সম্বল হলো আপন রবের ওপর ভরসা ও গভীর জ্ঞানপিপাসা। আল্লাহ তা'আলাও তাঁর ভরসার যথার্থ প্রতিদান দিয়েছেন। যা ছিল হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ তা'আলার প্রতিশ্রুতির বহিঃপ্রকাশ: أَنَا عِنْدَ ظَنَّ عَبْدِي بِي، فَلْيَظُنَّ بِي مَا شَاءَ অর্থ: 'আমার প্রতি বান্দার বিশ্বাস মোতাবেক আমি তার সাথে আচরণ করি। সুতরাং বান্দা আমার প্রতি বিশ্বাস রাখুক, সে যেমন চায়।' (মুসনাদে আহমাদ, ২৫/৩৯৮) জ্ঞানসাধনায় সুদীর্ঘ সফর, অবিরাম চেষ্টা-সাধনা ও কালের দুর্যোগ-দুর্বিপাক মোকাবিলার পরই তিনি মুসলিম জাতির কল্যাণে বুখারী শরীফ সংকলন করতে সক্ষম হয়েছেন।

ইমাম শাফেয়ী (রহ.) (১৫০-২০৪ হি.) বলেছেন: 'জ্ঞানী ও বিচক্ষণ ব্যক্তির জন্য একই স্থানে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়া সমীচীন নয়। সুতরাং জ্ঞানচর্চার উদ্দেশ্যে স্বদেশ ছেড়ে দূর-দূরান্তে সফর করো। সফর ও হিজরতের বদৌলতে জ্ঞান সাধনার এমন পাথেয় পাবে, যা তোমাকে স্বদেশ ত্যাগের কষ্ট ভুলিয়ে দিবে। অবিরাম চেষ্টা সাধনার মধ্যেই কাঙ্ক্ষিত জীবনের সন্ধান পাবে। আমি দেখেছি, স্থবিরতা ও প্রবাহহীনতা পানিকে নষ্ট করে ফেলে। কিন্তু তা যদি হয় সদা প্রবহমান, তাহলে তার স্বকীয় বৈশিষ্ট্য বজায় থাকে। সিংহ যদি গর্ত ছেড়ে বের না হয়, তার শিকার জুটবে কী করে? তীর যদি তূণীর থেকে নিক্ষিপ্ত না হয়, লক্ষ্যস্থলে আঘাত হানবে কিভাবে? সূর্য যদি আপন কক্ষপথের একই স্থানে থেমে থাকে, মানুষ তাতে যারপরনাই বিরক্ত হবে। স্বর্ণখণ্ড যদি তার খনির মধ্যে পড়ে থাকে, মাটির মতো মূল্যহীন পড়ে থাকবে। সুগন্ধি কাঠ যদি বনের মধ্যে পড়ে থাকে, তবে তা সাধারণ কাঠ মাত্র। স্বর্ণখণ্ড যদি তার খনি ছেড়ে বেরিয়ে আসে, তাহলেই অমূল্য রতন। সুগন্ধিকাঠ যদি বন ছেড়ে বেরিয়ে আসে, স্বর্ণের মতো অমূল্য বস্তু।'

টিকাঃ
৫৬. সুনানে নাসায়ীর রিওয়ায়েতে বর্ণিত হয়েছে: «إِنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ يَقُولُهُنَّ فِي دُبُرِ الصَّلَاةِ» (سنن النسائي) অর্থ: রাসূলুল্লাহ ﷺ নামাযের পর এ দু'আটি পাঠ করতেন। (নাসায়ী, ৩/৭৩) এতে বোঝা যায়, সকাল-সন্ধ্যায় ও প্রত্যেক নামাযের পর-দুটি সময়েই আমল করার সুযোগ রয়েছে।

ফন্ট সাইজ
15px
17px