📘 আল হাল্লু জীবন সমস্যার সমাধান 📄 অবসর

📄 অবসর


লেখাপড়া ও কাজকর্মের মধ্যে যে ছুটি ও কর্মবিরতি থাকে, তাই অবসর। পেশা ও দায়িত্বের তারতম্যভেদে আমাদের অবসরও কম-বেশি হয়ে থাকে। অবসর নিয়ে মানুষের বিচিত্র অনুভূতি। কেউ কাজ ছাড়া, ব্যস্ততা ছাড়া একদণ্ড বসে থাকতে পারে না। কেউ বা আবার অধীর আগ্রহে ছুটি ও অবসরের প্রতীক্ষায় দিন গুনতে থাকে।

ছুটি, কর্মবিরতি ও অবসর-যাই বলেন না কেন-এর মূল উদ্দেশ্য হলো, শিক্ষাজীবন ও কর্মজীবনের দায়দায়িত্বের একঘেয়েমি দূর করে, বিশ্রাম ও আনন্দ-বিনোদনের সুযোগ দিয়ে নব উদ্যম-উদ্দীপনা সৃষ্টি করা। অবসর হলো বৈধ আনন্দ-বিনোদন উপভোগের এবং নিজের কল্যাণে, দশের কল্যাণে কাজ করার এক সুবর্ণ সুযোগ। তা না করে ব্যক্তি যদি ঘরকুনো হয়ে একাকীত্ব ও নিঃসঙ্গতায় ডুবে থাকে, কিংবা অসৎ সঙ্গদোষে নানা অন্যায়-অপকর্মে, পাপাচারে-অনাচারে লিপ্ত হয়ে পড়ে, তাহলে অবসর তার অকল্যাণ ও ক্ষতির কারণ।

এমন কত ব্যক্তি আছে, যারা অবসরের সুযোগে বিপথে পা বাড়িয়েছে। এরপর কর্মজীবনের মতো ব্যস্ততা তাদের সুপথে ফিরিয়ে আনতে পারেনি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শত বিচ্যুতি ও পদস্খলন তার ভ্রষ্টতার চূড়ান্ত করে ছেড়েছে। কত লোক অবসরে নিঃসঙ্গতা ও একাকিত্বে নানা জল্পনা-কল্পনার শিকার হয়েছে। উদ্ভট চিন্তা-চেতনায় বিপথগামী হয়েছে। আমরা যদি অবসরের সুফল ভোগ করতে চাই, এর ক্ষতি ও অকল্যাণ থেকে বাঁচতে চাই, তাহলে অবশ্যই তা যথাযথভাবে কাজে লাগানোর উপায় খুঁজে বের করতে হবে।

সমাধান:
১. অবসর পেলে দু'রাকাত নামায আদায় করুন। কিছুক্ষণ যিকির করুন। ভালো বই পড়ুন। পরিবারের সঙ্গে সময় কাটান। আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবের বাড়ীতে বেড়াতে যান। কিংবা পবিত্র কুরআনের কয়েকটি আয়াত মুখস্থ করে ফেলুন। অবসরের মুহূর্তে এ আমলগুলো আপনার জীবনের শ্রেষ্ঠ পুঁজি এবং আল্লাহ তা'আলার নৈকট্য ও সন্তুষ্টি অর্জনের অন্যতম উপায়।
২. সময়মতো জামাতের সাথে পাঁচওয়াক্ত নামাযে যত্নবান হোন। বেশি বেশি আল্লাহর যিকির করুন। শিক্ষা ও জ্ঞান চর্চায় নিমগ্ন থাকুন। ওলামায়ে কিরাম, জ্ঞানী-গুণী ও সফল আশাবাদী ব্যক্তিদের সংস্পর্শে থাকুন। অবসরে নিঃসঙ্গতা ও একাকিত্বের কাছে আত্মসমর্পণ করে নিজেকে জল্পনা-কল্পনা ও উদ্ভট ধ্যান-ধারণার কাছে সঁপে দিবেন না। কবি আবুল আতাহিয়া বলেছেন: 'কল্যাণ অর্জনের জন্য কর্মব্যস্ততাই শ্রেয়। আর অবসর তো যত অনর্থক কথাবার্তা ও গুজব-রটা গালগল্পের আখড়া।'
৩. একটি দৈনন্দিন রুটিন তৈরি করুন। প্রতিটি কাজ রুটিনমাফিক সময়মতো সম্পন্ন করুন। কোনো কাজে অবহেলা করা, এক মুহূর্ত বিলম্ব করা সমীচীন নয়। কাজে বিলম্ব করার প্রবণতা সময়ের সুফল লাভের সুযোগ নষ্ট করে ফেলে।
৪. অবসরে স্বপ্নবান, প্রজ্ঞাবান ও জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তিদের সংস্পর্শে থাকুন। তাঁদের সংস্পর্শ আপনাকে সময়ের সদ্ব্যবহারে অনুপ্রাণিত করবে। অলস, হিংসুক, পশ্চাদপদ ও নিরাশাবাদী লোকের সঙ্গ ত্যাগ করুন। বিভিন্ন সামাজিক ও জনকল্যাণমূলক কাজে অংশগ্রহণ করুন। মহৎ হিতবাদী উদ্যোগ বাস্তবায়ন করুন।
৫. কর্মজীবনের গতানুগতিক কর্মধারার বাইরে, শিক্ষাজীবনের একঘেয়েমি সিলেবাসের চাপমুক্ত অবসরের সময়টা আপনার জীবনের সুবর্ণ সুযোগ। এ সুযোগ আপনি ব্যক্তিগত পঠন-পাঠন, জ্ঞান চর্চা, ব্যক্তিত্ব গঠন ও মানবিক মূল্যবোধের পরিচর্যায় কাজে লাগান। এ লক্ষ্যে কোনো বিজ্ঞ আলেমে দ্বীনের তত্ত্বাবধানে শিক্ষা-দীক্ষামূলক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করুন। এ জাতীয় কার্যক্রম আপনার জ্ঞান-বিদ্যা, বোধ-উপলব্ধি ও চিন্তা-চেতনার জগৎকে আরও ঋদ্ধ-সমৃদ্ধ করবে। মহান আল্লাহ তা'আলার সৃষ্টি-রহস্য সম্পর্কে চিন্তা-ফিকির করুন। আপনার ঈমান বৃদ্ধি পাবে। অথবা নিজের জীবন ও ব্যক্তিত্বকে আরও সুন্দর সাফল্যমণ্ডিত করার ব্যাপারে চিন্তা-ফিকির করুন।
৬. একটি দ্বীনি আমল শেষ করার পর কোনো জাগতিক প্রয়োজনীয় কাজ করুন। একটা ব্যক্তিগত কাজ করার পর পারিবারিক কাজে সাহায্য করুন। অবসরে ঘর-দোর ও বাসাবাড়ির খোঁজ-খবর নিন। যা মেরামত করা প্রয়োজন, তা মেরামত করুন। যা গোছানো দরকার, গুছিয়ে রাখুন। এক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ ﷺ হলেন আপনার শ্রেষ্ঠ আদর্শ। তিনি নিজ হাতে জুতা সেলাই করতেন। কাপড়ে তালি লাগাতেন, বকরির দুধ দোহন করতেন। জীবনের একটি মুহূর্তও তাঁর কর্মহীন অবসর ছিল না। (পবিত্র কুরআনের ভাষায়): ﴿فَإِذَا فَرَغْتَ فَانْصَبْ * وَإِلَى رَبِّكَ فَأَرْغَبُ ﴾ [الشرح: ٧، ٨] অর্থ: 'সুতরাং তুমি যখন অবসর পাও, তখন (ইবাদতে) নিজেকে পরিশ্রান্ত কর। এবং নিজ প্রতিপালকের প্রতি মনোযোগী হও।' (শাহর, ৯৪: ৭, ৮)
৭. ঘরে বসে দীর্ঘ অবসর না কাটিয়ে কোনো ক্রীড়াসংঘে যুক্ত হোন। তাদের বিভিন্ন ধরনের শরীরচর্চা ও খেলাধুলায় অংশগ্রহণ করুন। এতে আপনার দৈহিক ও মানসিক উদ্দীপনা অটুট থাকবে।
৮. অবসরে সময়-সুযোগ পেয়ে, বাড়িতে মুখরোচক খাবারের সমাহার দেখে অতি ভোজনে অভ্যস্ত হয়ে পড়বেন না। কায়িক পরিশ্রমহীন অবসর ও অতি ভোজন আপনার ওজন বাড়িয়ে দিবে। সঙ্গে সঙ্গে অলসতা দুর্বলতা দানা বাঁধতে শুরু করবে। রাতে সকাল সকাল ঘুমিয়ে পড়ুন। দীর্ঘ রাতজাগা থেকে বিরত থাকুন। নিয়মিত পর্যাপ্ত ঘুমের জন্য একটা রুটিন করে নিন। প্রতিদিন রুটিনমাফিক ঘুমান; কম না, বেশিও না।
৯. জীবনে যদি সুস্থতার নিয়ামত ও অবসরের সুযোগ লাভ করেন, তাহলে এটা আপনার জন্য সুবর্ণ সুযোগ ও বিরাট নিয়ামত। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে আখিরাতের পুঁজি সঞ্চয় করুন। জাগতিক কাজকর্ম সম্পন্ন করুন। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "نِعْمَتَانِ مَغْبُونٌ فِيهِمَا كَثِيرٌ مِنَ النَّاسِ: الصَّحَةُ وَالفَرَاغُ " (صحيح البخاري) অর্থ: 'দুটি নিয়ামত, অনেক মানুষ তা যথাযথভাবে কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়েছে। সুস্থতা ও অবসর।' (বুখারী, ৮/৮৮) সুতরাং সময়ের গুরুত্ব অনুধাবন করে এর সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার করুন। সময়ের প্রতি অবহেলা ও গুরুত্বহীনতা আপনাকে ব্যর্থতার পথে ঠেলে দিবে। মনে হবে, আগামীকাল তো আজকের মতোই, গতকালকের মতোই গতানুগতিক। তাতে নতুনত্ব ও বৈচিত্র্যের কী আছে? কিন্তু যে সময়ের গুরুত্ব বোঝে, অবসর কাজে লাগায়, তার কাছে প্রতিটা ভোরের সূর্যই অপার সম্ভাবনাময়। প্রতিটা দিনের আলো সফলতা অর্জনের প্রেরণা।
১০. প্রাতিষ্ঠানিক কর্মমুখর দিন আর অবসর দিনের কার্যধারার মধ্যে বিস্তর ফারাক। তাই ছুটির দিনগুলোর জন্য ভিন্ন রুটিন করুন। প্রতিদিন সকালে উঠে নিজ দায়িত্ব ও কর্তব্য ঠিক করে নিন। এ রুটিন আপনাকে কর্তব্য পালনে সজাগ সচেতন করবে। মনে রাখবেন, আপনি কর্মবিমুখ হয়ে থেমে থাকুন, কিংবা দায়িত্বে অবহেলা করে মন্থর গতিতে চলুন, সময় কিন্তু থেমে নেই; আপন গতিতে ছুটে চলছে। তাই প্রতিটি মুহূর্তের সদ্ব্যবহার করার চেষ্টা করুন। অন্যথায় সময়-সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যাবে। আপনার কপালে জুটবে শুধু আফসোস অনুতাপ।
১১. গতানুগতিক জীবনধারা পরিবর্তন করুন। লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ঠিক রেখে চিন্তাধারায় নতুনত্ব ও বৈচিত্র্য আনুন। যেমন: স্থান পরিবর্তন করুন। নতুন কোনো জায়গায় বেড়াতে যান। পাঠ্যপুস্তকের বাইরে ভিন্ন ধারার বইপত্র পাঠ করুন। একই ধারার চিন্তা-ভাবনার বাইরে নতুন সৃষ্টিশীল বিদ্যা-বুদ্ধির চর্চা করুন। এতে গদবাঁধা জীবনের বিরক্তিকর গুমোট ভাব দূর হয়ে জীবন নতুনত্ব ও বৈচিত্র্যের রঙে রঞ্জিত হবে। নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত পাওলো কোয়েলহো বলেন: 'মানুষের প্রতিটা দিন যদি একইভাবে, একই ধারায় অতিবাহিত হতে থাকে, তাহলে এর অর্থ হলো, তারা নতুন কিছু ভাবতে ভুলে গেছে; নতুন কিছু করতে ভুলে গেছে।'
১২. অবসর ও ছুটির সময়টা যদি সুপরিকল্পনা মাফিক না কাটান, তাহলে এর পরিণতির কথা একবার ভাবুন-বিরক্তি, অস্বস্তি, অলসতা, কর্মবিমুখতা, বিষণ্ণতা ও দুশ্চিন্তা আপনাকে ঘিরে ধরবে। পরবর্তী জীবনে অবসরের সুযোগ হাতছাড়া করার কারণে সম্ভাবনাময় কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হওয়ার আফসোস-অনুতাপ করতে হবে। হাফেজ ইবনুল কাইয়্যিম জাওযী (রহ.) (৬৯১-৭৫১ হি.) বলেছেন: 'নিজেকে যদি সত্য ও ন্যায়ের পথে অবিচল রাখতে না পার, অসত্য ও অন্যায় তোমার ওপর জেঁকে বসবে।'
১৩. নিজের মধ্যে প্রতিযোগিতামূলক মানসিকতা লালন করুন। জীবনের প্রতিটি মুহূর্তের সদ্‌ব্যবহার করে উন্নতি-অগ্রগতি সাধনে সচেষ্ট থাকুন। হিজরতের প্রেক্ষাপটে আল্লাহ তা'আলা অগ্রগামী মুহাজিরদের প্রশংসা করে বলেছেন: وَالسَّبِقُونَ الْأَوَّلُونَ مِنَ الْمُهَاجِرِينَ وَالْأَنْصَارِ وَالَّذِينَ اتَّبَعُوهُمْ بِإِحْسَانٍ * رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ وَأَعَدَّ لَهُمْ جَنَّتٍ تَجْرِي تَحْتَهَا الْأَنْهُرُ خُلِدِينَ فِيهَا أَبَدًا ذَلِكَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ﴾ [التوبة: ١٠٠] অর্থ: 'মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে যারা প্রথমে ঈমান এনেছে এবং যারা নিষ্ঠার সাথে তাদের অনুসরণ করেছে, আল্লাহ তাদের সকলের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছে। আল্লাহ তাদের জন্য এমন উদ্যানরাজি তৈরি করে রেখেছেন, যার তলদেশে নহর বহমান। তাতে তারা সর্বদা থাকবে। এটাই মহা সাফল্য।' (তাওবা, ৯: ১০০) কল্যাণ অর্জনে সচেষ্ট হওয়ার ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: احْرِصْ عَلَى مَا يَنْفَعُكَ، (مسند الحميدي) অর্থ: 'যা তোমার জন্য মঙ্গলজনক তা অর্জনে সচেষ্ট হও, এবং আল্লাহ তা'আলার নিকট সাহায্য প্রার্থনা করো।' (মুসনাদুল হুমায়দী, ২/২৬৭)
১৪. 'আল-হামদুলিল্লাহ' এক সেকেন্ডেই বলা যায়। এক সেকেন্ডের এ আমলটিই মিযানের পাল্লা ভারি করে দেয়। 'মুসলিম' শরীফের হাদীসে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: 'আল-হামদুলিল্লাহ মিযানের পাল্লা পূর্ণ করে দেয়।' খুব স্বল্প সময়ে একশতবার সুবহানাল্লাহ পাঠ করা যায়। যে ব্যক্তি তা পাঠ করবে সে একশত সওয়াব হাসিল করতে পারবে। এবার একটু চিন্তা করে দেখুন, অবসরের কত সময় আমাদের অযথা কথাবার্তা ও অনর্থক কাজেকর্মে ব্যয় হয়েছে।

পরিশিষ্ট:
আমিরুল মু'মিনীন ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) বলেছেন: 'আল্লাহ তা'আলা হাত দু'টি সৃষ্টি করেছেন কাজ করার জন্য। তা যদি ভালো কাজে নিয়োজিত না থাকে, তাহলে গুনাহ ও নাফরমানিতে লিপ্ত হবে। সুতরাং হাত দু'টিকে ন্যায় ও কল্যাণের স্বার্থে কাজে লাগান। অন্যায়-অন্যায্য থেকে বিরত থাকুন।'

ফরাসি লেখক ও দার্শনিক ভলতেয়ার (১৬৯৪-১৭৭৮ খ্রিষ্টাব্দ) বলেছেন: 'সময় নষ্ট করার চারটা পথ: অবসর, অবহেলা, খারাপ কাজ ও সময়ের কর্তব্য সময়ে পালন না করা।'

'অবসর সময়ে ঘরকুনো হয়ে গুমরে পড়ে থাকা আত্মহত্যার পথে ধাবিত করে।'-ড. আয়েয করনী

হাফেজ ইবনুল কাইয়্যিম জাওযী (রহ.) (৬৯১-৭৫১ হি.) বলেছেন: 'শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়াহ (রহ.) অন্যদের কাজেকর্মে সাহায্য-সহযোগিতা করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত সচেষ্ট ছিলেন। কেননা তিনি জানতেন, যে অন্যকে সাহায্য করে, আল্লাহ তাকে সাহায্য করেন। তাইতো অলস-অকর্মা লোকদের দেখবে, তারা বিষণ্ণ, চিন্তাক্লিষ্ট, উদ্যমহীন ও কর্মবিমুখ। কিন্তু যারা কর্মব্যস্ত উদ্যমী, তারা গুরুত্বপূর্ণ সব বিষয়েই সমান তৎপর।'

ঈসা বিন যায়েদ মারাকি নিজের ঘটনার বর্ণনা করেন: 'আমার এক গোলাম ছিল। আল্লাহর যমীনে তার মতো অলস-অকর্মা আমি দ্বিতীয়টি দেখিনি। একদিন তাকে বাজারে পাঠালাম আঙুর ও ডুমুর ফল কিনে আনতে। সে যখন বাজার থেকে ফিরে এসেছে, অনেক দেরি হয়ে গেছে। তার ওপর শুধু আঙুর নিয়ে এসেছে; ডুমুর ফল আনেনি। বললাম: 'এমনিতেই তুমি দেরি করে এসেছ। তার ওপর দু'টি কাজের কথা বলেছিলাম, করেছ একটা।' এ অপরাধে তাকে শাস্তি দিলাম-আজ থেকে তোমার দায়িত্ব হলো, তোমাকে একটা কাজের কথা বললে দু'টা কাজ করবে। এর কিছুদিন পরই আমি অসুস্থ হয়ে পড়ি। গোলামকে পাঠাই একজন ডাক্তার ডেকে আনতে। সে যখন ফিরে এসেছে, তার সাথে আরও একজন লোক। গোলামকে জিজ্ঞেস করলাম: 'এ ডাক্তার সাহেবকে তো আমি চিনি। তার সাথে এই লোকটা কে?' গোলাম বলল: 'ডাক্তার আপনার চিকিৎসা করবে। চিকিৎসায় যদি কাজ না হয়, এবং (আল্লাহ না করুন) যদি আপনার মৃত্যু হয়, তাহলে এই লোকটা আপনার কবর খননের কাজ করবে।'

📘 আল হাল্লু জীবন সমস্যার সমাধান 📄 অপচয়

📄 অপচয়


যেকোনো বস্তুর অপব্যবহার, অপাত্রে ব্যবহার ও মাত্রাতিরিক্ত ব্যয়কেই অপচয়-অপব্যয় বলা হয়। এখানে আলোচনার উদ্দেশ্য হলো অর্থের অপচয়। মানুষ যখন কোনো আর্থিক বিচারবুদ্ধি ছাড়া, যাচ্ছেতাইভাবে, সাধ্য ও সামর্থ্যের সীমা ছাড়িয়ে অর্থ ব্যয় করতে থাকে, তখন এটাকে অপচয় বলে। এমতাবস্থায় তার কাছে অর্থ-সম্পদের কোনো মূল্য থাকে না। কারণে-অকারণে, প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে লাগামহীনভাবে অর্থব্যয় করতে থাকে। মানুষ এটা করতে পারে, যখন সে নিজেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ ও স্বাবলম্বীভাবে। সঞ্চিত অর্থ আয়ের উৎসটাকে নিজের রক্ষক ও সহায়ক বলে বিশ্বাস করে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: كَلَّا إِنَّ الْإِنْسَانَ لَيَطْغَى أَنْ رَّاهُ اسْتَغْنَى﴾ [العلق: ٦، ٧] অর্থ: 'বস্তুত মানুষ প্রকাশ্য অবাধ্যতা করছে। কেননা সে নিজেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ মনে করে।' (আলাক, ৯৬: ৬-৭)

একটি জাতির উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত-যেকোনো শ্রেণির মধ্যে অপচয়প্রবণতা দেখা দিতে পারে। তবে সাধারণত উচ্চবিত্ত শ্রেণির মধ্যেই ভোগবিলাস ও অপচয়প্রবণতা প্রকট আকার ধারণ করে। ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজে সর্বক্ষেত্রেই অপচয়ের সূত্র ধরে বিশৃঙ্খলা ও বৈষম্য মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। কারণ, অপচয় হয়ে থাকে মূলত অন্যের হক নষ্ট করে, কারো অধিকার ক্ষুণ্ণ করে। সমাজবিজ্ঞানী ও ইতিহাসবিদদের স্বীকৃত অভিমত হলো, কোনো জাতির অপচয়-অপব্যয় ও ভোগ-বিলাসিতার যখন চূড়ান্ত হয়, তাদের নৈতিক অবক্ষয়, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় বিপর্যয় অনিবার্য। পবিত্র কুরআনে এর সুস্পষ্ট প্রমাণ বিদ্যমান। আল্লাহ তা'আলা বলেন: ﴿وَإِذَا أَرَدْنَا أَنْ تُهْلِكَ قَرْيَةً أَمَرْنَا مُتْرَفِيهَا فَفَسَقُوا فِيهَا فَحَقَّ عَلَيْهَا الْقَوْلُ فَدَمَّرْ نَهَا تَدْمِيرًا﴾ [الإসراء: ١٦] অর্থ: 'আমি যখন কোন জনবসতিকে ধ্বংস করতে চাই তখন তাদের সচ্ছল ব্যক্তিদেরকে আদেশ করি (আমার আদেশ মেনে চলার জন্য)। কিন্তু তারা অবাধ্যতা করতে থাকে। তখন সে জনবসতির প্রতি আমার আযাবের ফায়সালা সাব্যস্ত হয়ে যায়। তখন আমি তা সম্পূর্ণরূপে বিধ্বস্ত করে দেই।' (ইসরাঈল, ১৭: ১৬)

সুতরাং কোনো জাতি যদি অধঃপতন ও ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পেতে চায়, অবশ্যই তাকে অপচয়, অপব্যয়ের পথ থেকে ফিরে আসতে হবে। কিন্তু এর উপায় কী? এক্ষেত্রে যথার্থ করণীয় কী?

সমাধান:
১. অপচয় সম্পর্কে, অপব্যয়ের ক্ষতি ও পরিণতি সম্পর্কে কুরআন-সুন্নাহ কী বলেছে, এ সংকট নিরসনে কুরআন-সুন্নাহর দিকনির্দেশনা কী-এ সম্পর্কে জানুন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা অপচয়কারীদের সম্পর্কে বলেছেন: ﴿إِنَّ الْمُبَذِّرِينَ كَانُوا إِخْوَانَ الشَّيْطِينِ وَكَانَ الشَّيْطَنُ لِرَبِّهِ كَفُورًا﴾ [الإسراء: ٢٧] অর্থ: 'নিশ্চয় অপব্যয়কারীরা শয়তানের ভাই। আর শয়তান তার রবের প্রতি খুবই অকৃতজ্ঞ।' (বনী ইসরাঈল, ১৭: ২৭)
২. মনে রাখুন, অর্থ-সম্পদ ও সহায়-সম্পত্তির কোনোটাই আপনার চিরস্থায়ী মালিকানাধীন নয়। অন্যের হাত ঘুরে তা যেমন আপনার মালিকানাধীন হয়েছে, আপনার হাত ঘুরেও অন্যের মালিকানায় চলে যাবে। প্রখ্যাত মুসলিম সমাজবিজ্ঞানী ইবনে খালদুন (১৩৩২-১৪০৬ খৃষ্টাব্দ) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ 'মুকাদ্দিমা ইবনে খালদুন'-এ লিখেছেন: 'অপচয়-অপব্যয় ও ভোগবিলাস যেকোনো জাতি ও রাজ্যকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়।' পবিত্র কুরআনের আয়াত এর প্রকৃষ্ট প্রমাণ। আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: ﴿وَإِذَا أَرَدْنَا أَنْ تُهْلِكَ قَرْيَةً أَمَرْنَا مُتْرَفِيهَا فَفَسَقُوا فِيهَا فَحَقَّ عَلَيْهَا الْقَوْلُ فَدَمَّرْنَاهَا تَدْمِيرًا﴾ [الإسراء: ١٦] অর্থ: 'আমি যখন কোন জনবসতিকে ধ্বংস করতে চাই তখন তাদের সচ্ছল ব্যক্তিদেরকে আদেশ করি (আমার আদেশ মেনে চলার জন্য)। কিন্তু তারা অবাধ্যতা করতে থাকে। তখন সে জনবসতির প্রতি আমার আযাবের ফায়সালা সাব্যস্ত হয়ে যায়। তখন আমি তা সম্পূর্ণরূপে বিধ্বস্ত করে দেই।' (ইসরাঈল, ১৭: ১৬)
৩. আর্থিক সচ্ছলতা ও প্রাচুর্যের বলে আপনি যেভাবে ইচ্ছা ব্যয় করছেন, শখ-শৌখিনতা ও ভোগ-বিলাসের ষোলোআনা পূর্ণ করছেন; কিন্তু একটিবারও কি ভেবেছেন, সমাজের কত লোক এখনও দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে? কত পরিবার দু'বেলা খেতে পায় না? কত নিঃস্ব, হতদরিদ্র আপনার সাহায্যের মুখাপেক্ষী? মুস্তফা মানফালুতী যথার্থ বলেছেন: مَا رَأَيْتُ مُسْرِفًا مُتْرَفًا إِلَّا وَجَدْتُ بِجَانِبِهِ بَائِسًا جَائِعًا. অর্থ: 'প্রত্যেক অপব্যয়ী, বিলাসী ব্যক্তির পাশে একজন ক্ষুধার্ত হতদরিদ্রকে দেখতে পাই।'
৪. অপচয়-অপব্যয়ের পরিণতি সম্পর্কে চিন্তা করুন। শরীর-স্বাস্থ্য, মন-মানসিকতার ওপর এর ক্ষতিকর প্রভাব এবং আর্থসামাজিক বৈষম্য ও বিশৃঙ্খলার বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করুন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলার নির্দেশ: ﴿وَكُلُوا وَاشْرَبُوا وَلَا تُسْرِفُوا إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الْمُسْرِفِينَ﴾ অর্থ: 'আর খাও, পান কর কিন্তু অপচয় করো না, অবশ্যই তিনি অপচয়কারীদেরকে পছন্দ করেন না।' (আ'রাফ, ৭: ৩১)
৫. ব্যক্তিগতভাবে ও পারিবারিকভাবে একটি সুষ্ঠু, ভারসাম্যপূর্ণ ও মধ্যপন্থার অর্থনীতি মেনে চলুন। সুখী ও নিরাপদ জীবনযাপন করতে পারবেন। এ দিকনির্দেশনা পবিত্র কুরআনের: وَلَا تَجْعَلْ يَدَكَ مَغْلُولَةً إِلَى عُنُقِكَ وَلَا تَبْسُطُهَا كُلَّ الْبَسْطِ فَتَقْعُدَ مَلُومًا مَّحْسُورًا﴾ [الإسراء: ٢٩] অর্থ: '(কৃপণতাবশে) তোমার হাতকে তোমার গলার সাথে বেঁধে দিও না, আর (অপব্যয়ী হয়ে) তা একেবারে প্রসারিত করেও দিওনা, তা করলে তুমি তিরস্কৃত ও নিঃস্ব হয়ে বসে পড়বে।' (বনী ইসরাঈল, ১৭: ২৯)
৬. স্ত্রী, ছেলে-মেয়ে-তারা যদি বিচক্ষণ বুদ্ধিমান না হয়, সাংসারিক বোধ-বুদ্ধিতে পাকাপোক্ত না হয়, তাহলে তাদের হাতে প্রয়োজনের অতিরিক্ত অর্থ দেওয়া সমীচীন নয়। কেননা সম্পদ হলো আপনার হাতে আমানত। এ সম্পর্কে পবিত্র কুরআনের দিকনির্দেশনা শুনুন: وَلَا تُؤْتُوا السُّفَهَاءَ أَمْوَالَكُمُ الَّتِي جَعَلَ اللَّهُ لَكُمْ قِيمًا وَارْزُقُوهُمْ فِيهَا وَاكْسُوهُمْ وَقُولُوا لَهُمْ قَوْلًا مَّعْرُوفًا﴾ [النساء : ٥] অর্থ: 'তোমরা অবুঝ (ইয়াতীম)দের কাছে নিজেদের সেই সম্পদ অর্পণ করো না, যাকে আল্লাহ তোমাদের জন্য জীবনের অবলম্বন বানিয়েছেন। তবে তাদেরকে তা থেকে খাওয়াও পরাও আর তাদের সাথে ন্যায়সঙ্গতভাবে কথা বল।' (নিসা, ৪: ৫)
৭. খরচ করার আগে অপব্যয় হবে কি না এবং খরচ করার পর অপচয় হলো কি না-বিষয়টি যাচাই করে দেখুন। অবহেলা, অযত্নে সম্পদ নষ্ট করা বাঞ্ছনীয় নয়। কেননা অর্থ-সম্পদ সংরক্ষণে অবহেলা সমাজে ধোঁকা প্রতারণা চৌর্যবৃত্তির পথ খুলে দেয়।
৮. মনে রাখবেন, আপনার অর্থ-সম্পদ ও আয়-ব্যয় সম্পর্কে কিয়ামতের দিন জিজ্ঞেস করা হবে। তাই আপন রবের নিকট হিসাব দেওয়ার পূর্বে নিজেই নিজেকে জবাবদিহিতার কাঠগড়ায় দাঁড় করান। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: لَا تَزُولُ قَدَمَا ابْنِ آدَمَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ حَتَّى يُسْأَلَ عَنْ خَمْسٍ: عَنْ عُمْرِكَ فِيمَا أَفْنَيْتَ، وَعَنْ شَبَابِكَ فِيمَا أَبْلَيْتَ، وَعَنْ مَالِكَ مِنْ أَيْنَ كَسَبْتَهُ وَفِيمَا أَنْفَقْتَهُ، وَمَا عَمِلْتَ فِيمَا عَلِمْتَ" (مسند أبي يعلى) অর্থ: 'কিয়ামত দিবসে আদম সন্তানের পা নড়তে পারবে না, যতক্ষণ না তাকে পাঁচটি বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়: তার জীবন সম্পর্কে, কী কাজে তুমি তোমার জীবন নিঃশেষ করেছ? তার যৌবন সম্পর্কে, কীসে তোমার যৌবন ক্ষয় করেছ? তার অর্থ-সম্পদ সম্পর্কে, কোন পথে উপার্জন করেছ, আর কোন পথে ব্যয় করেছ? যে জ্ঞানার্জন করেছ, তার ওপর কতটুকু আমল করেছ?' (মুসনাদে আবূ ইয়ালা মুসিলী, ৯/১৭৮)
৯. মনে রাখতে হবে, মহান দাতা আপনাকে যে সচ্ছলতা দান করেছেন, মুহূর্তের মধ্যে তিনি তা ছিনিয়েও নিতে পারেন। পূর্বের বহু জাতিবর্গ, যারা অপচয়-অপব্যয়, ভোগবিলাস ও সীমালঙ্ঘনে মত্ত ছিল, আল্লাহ তা'আলা তাদের ধ্বংস করে দিয়েছেন। পবিত্র কুরআনে তাদের অবস্থা এভাবে তুলে ধরা হয়েছে: فَتِلْكَ بُيُوتُهُمْ خَاوِيَةً بِمَا ظَلَمُوا إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَةً لِقَوْمٍ يَعْلَمُونَ * وَانْجَيْنَا الَّذِينَ آمَنُوا وَكَانُوا يَتَّقُونَ﴾ [النمل : ٥٢، ٥٣] অর্থ: 'ওই তো তাদের ঘর-বাড়ি, যা তাদের যুলুমের কারণে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। নিশ্চয়ই যারা তাদের জ্ঞান-বুদ্ধিকে কাজে লাগায়, তাদের জন্য এতে আছে শিক্ষা গ্রহণের উপকরণ। আরা যারা ঈমান এনেছিল ও তাকওয়া অবলম্বন করেছিল, তাদেরকে আমি রক্ষা করি।' (নামল, ২৭: ৫২-৫৩)
১০. অপচয়কারী ও অপব্যয়ীদের থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখুন। প্রয়োজন ছাড়া খুব একটা কাছে ঘেঁষবেন না। সঙ্গ-দোষে আপনিও অপব্যয়ের দোষে দুষ্ট হতে পারেন। জীবন-যাপনে মধ্যপন্থি ও পরিমিতিবোধ-সম্পন্ন ব্যক্তিদের সংস্পর্শে থাকুন। ভারসাম্যপূর্ণ অর্থব্যয়ের ক্ষেত্রে তাদের সংস্পর্শ আপনার জন্য সহায়ক হবে।
১১. আর্থিকভাবে আপনি যতই সচ্ছল ও অবস্থা-সম্পন্ন হোন-না-কেন, নিজের প্রয়োজনীয় যাবতীয় কেনাকাটা নিজেই করার চেষ্টা করুন। পরিবারের আর্থিক বিষয়গুলো নিজেই দেখাশোনা করুন।
১২. আপনার কর্তব্য হলো, মধ্যপন্থায় ব্যয় করা এবং অতিরিক্ত সম্পদ সঞ্চয় করা। এখন হয়ত আপনি সুস্থ, সচ্ছল ও নিরাপদ জীবনযাপন করছেন; কিন্তু অসুস্থতা, অসচ্ছলতা ও বিপদ-আপদ-এগুলোও জীবনের অংশ। জীবনের এসব প্রতিকূলতার মুহূর্তে সঞ্চিত সম্পদ আপনার একনিষ্ঠ সহযোগী। বিজ্ঞজন যথার্থ বলেছেন: ‘সুখের দিনগুলোতে সম্ভাব্য বিপদ-মোকাবেলার প্রস্তুতি গ্রহণ কর।’
১৩. অপচয় থেকে বাঁচতে গিয়ে কৃপণতার মতো নিকৃষ্ট স্বভাবদোষে দুষ্ট হওয়াও ঠিক নয়। স্বভাবধর্ম ইসলাম অপব্যয় ও কৃপণতা-এর কোনোটাকেই সমর্থন করে না; বরং এ দুটিকে পাশে রেখে মধ্যপন্থা অবলম্বনের দিকনির্দেশনা প্রদান করে। পবিত্র কুরআনের সূরা ফুরকানে আল্লাহ তা’আলার প্রকৃত বান্দাদের কিছু বৈশিষ্ট্য তুলে ধরা হয়েছে। একটি বৈশিষ্ট্য হলো (পবিত্র কুরআনের ভাষায়): وَالَّذِينَ إِذَا أَنْفَقُوا لَمْ يُসْرِفُوا وَلَمْ يَقْتُرُوا وَكَانَ بَيْنَ ذَلِكَ قَوَامًا﴾ [الفرقان : ٦٧] অর্থ: ‘এবং যারা ব্যয় করার সময় না করে অপব্যয় এবং না করে কার্পণ্য; বরং তাদের পন্থা হল (বাড়াবাড়ি ও সংকীর্ণতার) মধ্যবর্তী ভারসাম্যপূর্ণ পন্থা।’ (ফুরকান, ২৫: ৬৭)

পরিশিষ্ট:
আব্বাসীয় খেলাফতকালে বারামিকা জাতি ছিল রাজ্য জয়, শাসন ও নেতৃত্বগুণে অনন্য। অর্থনীতি ও রাজনীতিতে স্বয়ংসম্পূর্ণ। আব্বাসী খলিফাদের ওপরও ছিল তাদের বিস্তর প্রভাব-ক্ষমতা। বাদশা হারুনুর রশীদের যুগেও তারা ছিল রাজকীয় আদর-সমাদরের পাত্র। রাজকীয় সুযোগ-সুবিধা পেয়ে তারা অপচয়-অপব্যয় ও ভোগবিলাসে মেতে উঠল। শখ-শৌখিনতার পেছনে কাড়িকাড়ি অর্থ ঢালতে লাগল। অবশেষে বাদশাহ হারুনুর রশীদের শাসনামলেই বারমিকা জাতির ক্ষমতা, শক্তি ও প্রভাব-প্রতিপত্তি বিলুপ্ত হলো। এরপর তারা আর মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারেনি।

এক যুবক শহরের পথ ধরে হেঁটে যাচ্ছে। এক বৃদ্ধাকে দেখল, রাস্তার পাশে বসে কেঁদে-কেঁদে ভিক্ষা করছে। যুবক জিজ্ঞেস করল: 'তোমার পরিচয় কী? তোমার এ অবস্থা হলোই বা কীভাবে?' বৃদ্ধা অনুতাপের সুরে শুধু এতটুকুই বলল: 'আমি বারামিকা গোষ্ঠীর লোক।' যুবক বিস্ময়ে 'থ' হবার দশা। বলল: 'হায় আল্লাহ! এ কী বলছ! তোমরা তো ছিলে শাসন-ক্ষমতার অধিকারী। অর্থপ্রাচুর্যে সমৃদ্ধ জাতি।' এবার বৃদ্ধা তার অতীতের কথা খুলে বলল: 'বললে হয়ত বিশ্বাস করবে না, যৌবনে আমি এমন আরাম-আয়েশ ও ভোগবিলাসে ছিলাম, যা তুমি কল্পনাও করতে পারবে না। স্বর্ণের পানি দিয়ে আমাদের ঘরদোর লেপা হতো। আমার সেবায় ছিল একশ দাস-দাসী। কিন্তু এমন সুখ বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। আমরা ভাগ্য-বিড়ম্বনার শিকার হলাম। এখন তো কোনো কোনো দিন এক বেলা খাবারও খেতে পাই না।'

বারামিকা জাতির ভাগ্যবিপর্যয় মানবজাতির জন্য এক বিরাট শিক্ষা। তাই সম্পদের অপচয় নয়; এর সঠিক মূল্যায়ন করুন। মহানদাতা আল্লাহ তা’আলার শোকর আদায় করুন। পবিত্র কুরআনে তাঁর নির্দেশ মেনে চলুন: وَكُلُوا وَاشْرَبُوا وَلَا تُসْرِفُوا إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الْمُسْرِفِينَ অর্থ: ‘আহার ও পান করবে, কিন্তু অপব্যয় করবে না। আল্লাহ অপব্যয়কারীদেরকে পছন্দ করেন না।’ (আ’রাফ, ৭: ৩১)

টিকাঃ
৫৪. মুস্তফা লুতফী মানফাল্‌তী। প্রখ্যাত মিসরীয় কবি সাহিত্যিক। সাহিত্যকর্মে তিনি একটি স্বকীয় ধারা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিলেন। অনুবাদকর্মেও তাঁর অনন্য অবদান সর্বজনে স্বীকৃত। ১৮৭৬ খ্রিষ্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯২৪ খ্রিষ্টাব্দের মৃত্যু বরণ করেন। তাঁর সাহিত্যকর্মের অন্যতম কীর্তি হলো "আন্নাজারাত" ও "আল-আবারাত" গ্রন্থ।

📘 আল হাল্লু জীবন সমস্যার সমাধান 📄 দারিদ্র্য

📄 দারিদ্র্য


দারিদ্র্য হলো মানবিক মৌলিক চাহিদাগুলো-অন্ন, বস্ত্র, বিদ্যা, বাসস্থান ও চিকিৎসা-ন্যূনতম মানে পূরণ করার অক্ষমতা। কিংবা আরও সংক্ষেপে বলতে গেলে, বেঁচে থাকার স্বার্থে ন্যূনতম প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চনা। দরিদ্রতার কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় শিশু-কিশোররা। তারা হলো দরিদ্রতার ভয়াল থাবার নিরীহ শিকার। মাতৃগর্ভ থেকেই তারা অযত্ন, অবহেলা ও পুষ্টিহীনতার শিকার। ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর থেকে অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা-দীক্ষা ও সভ্যতা-সংস্কৃতি-সর্বক্ষেত্রেই তাদের ওপর চরম বঞ্চনা চেপে বসে।

নীতি-নৈতিকতা ও মানবিকতার ক্ষেত্রেও দারিদ্র্যের থাবা অত্যন্ত ভয়ানক। অভাব-অনাটন মানুষের মনে হিংসা-বিদ্বেষ ও শত্রুতার মানসিকতা উস্কে দেয়। সমাজে যত অন্যায়, অনিয়ম, অনাচার, পাপাচার-এসবের অন্যতম নেপথ্য কারণ হলো দরিদ্রতা। হতদরিদ্র, অভাব-অনাটনগ্রস্ত মানুষ তার অস্তিত্বের লড়াইয়ে কি না করতে পারে-মিথ্যা, কপটতা, ধোঁকা থেকে শুরু করে, পর্যায়ক্রমে চুরি, রাহাজানি, নির্যাতন এমনকি হত্যা, আত্মহত্যা করতেও সে পরোয়া করে না।

তাই রাসূলুল্লাহ ﷺ প্রত্যেক নামাযের পড়ে কুফুরি ও দারিদ্র্য থেকে আল্লাহর তা'আলার কাছে পানাহ চাইতেন। হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, রাসূল ﷺ প্রত্যেক নামাযের পর এ দু'আটি পাঠ করতেন:
«اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْكُفْرِ وَالْفَقْرِ، اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ عَذَابِ الْقَبْرِ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ» (مسند أبي داود الطيالسي)
অর্থ: 'হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে কুফুরি ও দরিদ্রতা থেকে পানাহ চাই। পানাহ চাই কবরের আযাব থেকে।' (মুসনাদে আবূ দাউদ, ২/১৯৯)
আমরা যদি দুর্নীতিমুক্ত, শান্তিপূর্ণ সভ্য সমাজ গড়তে চাই তাহলে দারিদ্র্য বিমোচনের বিকল্প নেই। কিন্তু উপায় কী? এ লক্ষ্যে আমাদের করণীয় কী?

সমাধান:
১. আপন রবের প্রতি সুধারণা পোষণ করুন। আল্লাহ তা'আলা বান্দার সাথে তার ধারণা মোতাবেক আচরণ করেন। তাঁর কাছেই প্রার্থনা করুন। সময়মতো জামাতের সাথে পাঁচওয়াক্ত নামাযে যত্নবান হোন। নামায হলো রিযিকের প্রশস্ত পথ। রাসূলুল্লাহ ﷺ ও তাঁর উম্মতের প্রতি আল্লাহ তা'আলার নির্দেশ হলো: وَأَمُرُ أَهْلَكَ بِالصَّلُوةِ وَاصْطَبِرْ عَلَيْهَا طَ لَا نَسْئَلُكَ رِزْقًا طَ نَحْنُ نَرْزُقُكَ طَ وَالْعَاقِبَةُ لِلتَّقْوَى [طه: ١٣٢] অর্থ: 'এবং নিজ পরিবারবর্গকে নামাযের আদেশ কর এবং নিজেও তাতে অবিচলিত থাক। আমি তোমার কাছে রিযিক চাই না। রিযিক তো আমিই দেব। আর শুভ পরিণাম তো তাকওয়ারই।' (ত্বহা, ২০: ১৩২)
২. আখেরাতের সৌভাগ্য ও সফলতা অর্জনকে ইহকালীন জীবনের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য উদ্দেশ্য হিসেবে নির্ধারণ করুন। সবর ও ধৈর্যের মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলার নিকট সাহায্য প্রার্থনা করুন। নিজের যাবতীয় প্রয়োজনে মানুষের দ্বারস্থ না হয়ে আল্লাহ তা'আলার কাছে প্রার্থনা করুন। সুখ-সচ্ছলতা দানকারী একমাত্র আল্লাহ তা'আলা। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "وَمَنْ يَسْتَعْفِفْ يُعْفِهِ اللهُ وَمَنْ يَتَصَبَّرْ يُصَبِّرْهُ اللهُ، وَمَا أُعْطِيَ أَحَدٌ عَطَاءً خَيْرًا وَأَوْسَعَ مِنَ الصَّبْرِ". (صحيح البخاري) অর্থ: 'যে ব্যক্তি সচ্ছলতা চায়, আল্লাহ তাকে সচ্ছলতা দান করেন। যে ধৈর্যধারণ করতে চায়, আল্লাহ তাকে ধৈর্যক্ষমতা দান করেন। আর সহনশীলতা ও ধৈর্যের চেয়ে কল্যাণকর ও বিরাট নিয়ামত কেউ প্রাপ্ত হতে পারে না।' (বুখারী, ২/১২২)
৩. দরিদ্র ও প্রয়োজনগ্রস্ত লোকদের সাহায্য-সহযোগিতায় যে সমাজসেবী ও দাতা সংস্থাগুলো সচেষ্ট, তাদের আর্থিক ফান্ড সচল রাখার জন্য সমাজের ধনী ও বিত্তশীলদের এগিয়ে আসতে হবে। এর পাশাপাশি ধনী লোকদের যাকাত আদায়ে যত্নবান হতে হবে। যাকাত আদায়কারীর আত্মশুদ্ধির ও সমাজের দারিদ্র্য বিমোচনের ক্ষেত্রে যাকাতের গুরুত্ব অপরিসীম।
৪. দেশ ও সমাজকে সর্বপ্রকার নৈরাজ্য ও বিশৃঙ্খলামুক্ত রাখতে হবে। কেননা বিদ্রোহ ও নৈরাজ্যের কবলে দেশের সরকার ও জনগণ সবচেয়ে বেশি আর্থিক ক্ষয়-ক্ষতির শিকার হয়। ক্যান্সার যেমন মানবদেহকে ক্ষয়ে-ক্ষয়ে নিঃশেষ করে ফেলে, তেমনি বিশৃঙ্খলা, বিদ্রোহের কবলে দেশের অর্থনৈতিক অবকাঠামো সমূলে ধসে পড়ে।
৫. দেশে লাভজনক বিনিয়োগের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিনিয়োগ-বান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। গবেষক ও চিন্তাশীলদের উৎপাদনমুখী পরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সরকার ও বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে।
৬. শ্রমিক ও কর্মচারীদের সাথে মালিক ও কর্তাশ্রেণি ব্যক্তিদের অবশ্যই সম্মানজনক বিনম্র ব্যবহার করা কর্তব্য। তাকওয়া ও ধার্মিকতার বিবেচনায় অনেক কর্মচারী তার মালিক পক্ষের তুলনায় আল্লাহ তা'আলার নিকট অধিক মর্যাদাবান ও শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী। কুরআন-সুন্নাহর দৃষ্টিতে মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বের একমাত্র মানদণ্ড হলো তাকওয়া ও আল্লাহভীতি। এক্ষেত্রে অর্থবিত্ত ও জাগতিক চাকচিক্যের কোনো মূল্য নেই। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِنْدَ اللَّهِ أَتْقَكُمْ إِنَّ اللَّهَ عَلِيمٌ خَبِيرٌ﴾ [الحجرات: ١٣] অর্থ: 'তোমাদের মধ্যে আল্লাহর কাছে সেই অধিক মর্যাদাসম্পন্ন যে তোমাদের মধ্যে অধিক তাকওয়া সম্পন্ন। নিশ্চয় আল্লাহ তো সর্বজ্ঞ, সম্যক অবহিত।' (হুজুরাত, ৫৯: ১৩)
৭. শ্রমিক হলো সৃষ্টি ও উৎপাদনের মূল চালিকাশক্তি। তাদের কর্মস্পৃহা সচল ও বেগবান করার জন্য তাদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করার সঙ্গে সঙ্গে নির্দিষ্ট সময়ে বেতন-ভাতা পরিশোধ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে কোনো প্রকার অবহেলা ও গড়িমিসি গ্রহণযোগ্য নয়। আবূ হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, 'হাদীসে কুদসীতে' আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: ثَلَاثَةٌ أَنَا خَصْمُهُمْ يَوْمَ القِيَامَةِ: رَجُلٌ أَعْطَى بِي ثُمَّ غَدَرَ، وَرَجُلٌ بَاعَ حُرًّا فَأَكَلَ ثَمَنَهُ، وَرَجُلٌ اسْتَأْجَرَ أَجِيرًا فَاسْتَوْفَى مِنْهُ وَلَمْ يُعْطِ أَجْرَهُ. (صحيح البخاري) অর্থ: 'কেয়ামতের দিন আমি তিন ব্যক্তির বিরুদ্ধে বিবাদি হব। (এক.) যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে; এরপর (প্রয়োজনের মুহূর্তে) প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে। (দুই.) যে স্বাধীন ব্যক্তিকে দাস বলে বিক্রি করে মূল্য আত্মসাৎ করেছে। (তিন.) যে শ্রমিক নিয়োগ দিয়ে তার কাজ (ষোলো আনা) বুঝে নিয়েছে; কিন্তু তার শ্রমের মূল্য পরিশোধ করেনি।' (বুখারী, ৩/৮৩)
৮. আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রে যেসব বিষয় আল্লাহ তা'আলা হারাম করেছেন-যেমন: জুয়া, সুদ ও ব্যবসা-বাণিজ্যে ধোঁকা-প্রতারণা-ইত্যাদি থেকে বিরত থাকতে হবে। শরীয়তের এ নিষিদ্ধ আর্থিক লেনদেনগুলো বাহ্যিক দৃষ্টিতে সাময়িক লাভজনক মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে ও দূরদর্শী দৃষ্টিকোণ থেকে তা অভাব-অনাটন ও দরিদ্রতার অন্যতম কারণ।
৯. গুনাহগার ও নাফরমান ব্যক্তির ধনাঢ্যতা ও অর্থবিত্তের বাড়ন্ত অবস্থা দেখে প্রতারিত হবেন না। এটা রিযিকের প্রশস্ততা নয়, আল্লাহ তা'আলার তরফ থেকে নাফরমান বান্দাকে ধীরে ধীরে পাকড়াও করার কৌশল। তার অবস্থা হলো সুদি কারবারিদের মতো-বাহ্যিকভাবে তা অত্যধিক বেশি মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে তা নিতান্ত কম। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: إِنَّ الرِّبَا وَإِنْ كَثُرَ فَإِنَّ عَاقِبَتَهُ إِلَى قُلّ» (مسند ابن أبي شيبة) অর্থ: 'সূদের দ্বারা সম্পদ যতই বৃদ্ধি পাক-না-কেন, তার শেষ পরিণতি হল নিঃস্বতা।' (মুসনাদে ইবনে আবি শায়বা, ১/২০৭)
১০. হালাল আয়-উপার্জনের পেশায় নিয়োজিত থাকার সঙ্গে সঙ্গে এমন কিছু নেক আমল করুন, যার ওসিলায় আপনার রিযিক বরকতপূর্ণ হবে। এমন কয়েকটি আমল হলো, বেশি বেশি ইস্তিগফার করা, মাতা-পিতার প্রতি সদাচার করা, আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা, অভাবী-দরিদ্রদের সাহায্য করা ও বেশি বেশি দরূদ শরীফ পাঠ করা। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: مَنْ سَرَّهُ أَنْ يُبْسَطَ لَهُ فِي رِزْقِهِ، أَوْ يُنْسَأَ لَهُ فِي أَثَرِهِ، فَلْيَصِلْ رحمه» (صحيح البخاري) অর্থ: 'যে ব্যক্তি তার রিযিক বৃদ্ধি ও তার পশ্চাতে সুনাম কামনা করে, সে যেন আত্মীয়-স্বজনের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখে।' (বুখারী, ৩/৫৬) পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন : مَنْ عَمِلَ صَالِحًا مِنْ ذَكَرٍ أَوْ أُنْثَى وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَلَنُحْيِيَنَّهُ حَيُوةً طَيِّبَةً ، وَلَنَجْزِيَنَّهُمْ أَجْرَهُمْ بِأَحْسَنِ مَا কَانُوا يَعْمَلُونَ﴾ [النحل: ٩٧] অর্থ: 'পুরুষ আর নারীদের মধ্যে যে কেউ সৎকাজ করবে আর সে মু'মিনও, তাকে আমি অবশ্য অবশ্যই উত্তম জীবন দান করব। আর তাদেরকে অবশ্য অবশ্যই তারা যা করে, তার চেয়ে উত্তম প্রতিফল দান করব।' (নাহল, ১৬: ৯৭)
১১. নিজের আয়-উপার্জন অনুযায়ী এখনই একটি পদক্ষেপ গ্রহণ করুন-মাসিক আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের সামঞ্জস্য রেখে নিজের ও পরিবারের আর্থিক চাহিদা ও ব্যয়ের খাতগুলো তালিকাবদ্ধ করুন। তালিকায় নিতান্ত প্রয়োজন ও চাহিদাগুলো সর্বাধিক প্রাধান্য পাবে। গ্যাস, পানি ও বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয়ী হোন। এসব নিত্য প্রয়োজনীয় সেবা-পরিসেবার বিল যথাসম্ভব কমিয়ে আনার পাশাপাশি শখ-সৌখিনতা ও প্রয়োজনের অতিরিক্ত চাহিদা পূরণের মানসিকতা পরিহার করুন। প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে, সময়ে-অসময়ে ঋণ গ্রহণের স্বভাব ত্যাগ করুন। একান্ত প্রয়োজন ছাড়া কখনো ঋণ গ্রহণ করা সমীচীন নয়।
১২. সকাল-সন্ধ্যায় নিয়মিতভাবে এ দু'আটি পাঠ করুন: اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْكُفرِ وَالْفَقْرِ اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ عَذَابِ الْقَبْرِ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ» (مسند أبي داود الطيالسي) অর্থ: 'হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে কুফুরি ও দরিদ্রতা থেকে পানাহ চাই। পানাহ চাই কবরের আযাব থেকে।' (মুসনাদে আবূ দাউদ, ২/১৯৯)
১৩. আপনি যদি ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন, কাঁধের ওপর একাধিক ঋণের বোঝা চেপে থাকে, তাহলে পাওনাদারদের নামের পাশে টাকার অংক বসিয়ে একটা তালিকা করে নিন। পর্যায়ক্রমে কোন ঋণ কোন তারিখে শোধ করবেন, তা-ও চূড়ান্ত করুন। এক্ষেত্রে যেন কোনো কালবিলম্ব না হয়, সে বিষয়ে দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হোন। আপনার সদিচ্ছা ও একান্ত প্রচেষ্টাই পারে আপনাকে ঋণমুক্ত করতে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: مَنْ أَخَذَ أَمْوَالَ النَّاسِ يُرِيدُ أَدَاءَهَا أَدَّى اللَّهُ عَنْهُ، وَمَنْ أَخَذَ يُرِيدُ إِخْلَافَهَا أَتْلَفَهُ اللهُ» (صحيح البخاري) অর্থ 'যে ব্যক্তি ঋণ গ্রহণ করে (যত দ্রুত সম্ভব) আদায় করার ইচ্ছায়, আল্লাহ তা'আলা তার ঋণ আদায়ের ব্যবস্থা করে দিবেন। আর যে ব্যক্তি ঋণ নিবে আত্মসাৎ করার উদ্দেশ্যে, আল্লাহ তা'আলাও তাকে (এ ধরনের অর্থ যথার্থ কাজে ব্যয় করার সুযোগ থেকে) বঞ্চিত করবেন।' (বুখারী, ৩/১১৬)
১৪. ঋণ পরিশোধের জন্য, অর্থনৈতিক অবস্থা সচল রাখার জন্য কিংবা কোনো লাভজনক প্রকল্প শুরু করার জন্য পুঁজি সংগ্রহের উদ্দেশ্যে ঘরের অপ্রয়োজনীয় আসবাবপত্র বিক্রি করে দিতে পারেন। অথবা বর্তমান বিলাসবহুল ফ্ল্যাট ছেড়ে এমন ফ্ল্যাটে স্থানান্তর হতে পারেন, যার মূল্য কিংবা মাসিক ভাড়া তুলনামূলক কম। এসব ক্ষেত্রে আপনার হিতাকাঙ্ক্ষী কোনো বিজ্ঞ-অভিজ্ঞ ব্যক্তির সাথে পরামর্শ করুন; তাহলে ঋণ পরিশোধ ও জমানো পুঁজি লাভজনক খাতে বিনিয়োগ করার ক্ষেত্রে সহজেই সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারবেন।
১৫. আপনার ঋণগুলোকে এককেন্দ্রিক করে ফেলার চেষ্টা করুন। তা এভাবে হতে পারে, একজনের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের ঋণ নিয়ে সকলের পাওনা পরিশোধ করে দিন। এবার ঋণের অঙ্কটা আপনার সাধ্যানুযায়ী কয়েক মাসের কিস্তিতে ভাগ করুন। প্রতিমাসের ব্যয় কিংবা বেতনের খাত থেকে সে পরিমাণ অর্থ সঞ্চয় করে ঋণ পরিশোধ করতে থাকুন। এ পন্থায় অতি সহজেই মোটা অঙ্কের ঋণ পরিশোধ সম্ভব। ঋণ পরিশোধের অর্থ-জমানো দীর্ঘ সময়সাপেক্ষ হলে একসাথে জমিয়ে ঋণ পরিশোধ করতে যাওয়া বোকামি। এ ধরনের ক্ষেত্রে মোটা অঙ্কের টাকা একসাথে জমা হয়ে ওঠে না।
১৬. আয়-উপার্জন বৃদ্ধির জন্য চাকরি ও ব্যবসা-বাণিজ্যে আরও বেশি সময় দিন, পরিশ্রমের মাত্রা বাড়িয়ে দিন, কিংবা আরও লাভজনক বৈধ কোনো পেশা অবলম্বন করুন। এমন একটা পেশা বেছে নিন, যা আপনার চাহিদা ও প্রয়োজনের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। এক্ষেত্রে হালাল উপার্জনের সমস্ত পেশা ও শ্রমকে সম্মানের দৃষ্টিতে দেখতে হবে। পেশা ও শ্রেণিভেদে মানুষের মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বের তারতম্য অবশ্যই আছে। তাই বলে একটি পেশার মূল্যায়নে বাড়াবাড়ি করা, আরেকটা পেশায় নাক ছিটকানো ও অবজ্ঞা করা কোনো ক্রমেই সমীচীন নয়।
১৭. আর উপার্জন ও জীবনধারণের ক্ষেত্রে কখনো অন্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বেন না। এতে মানুষ আপনাকে বোঝা মনে করবে। তার চেয়ে বরং মহান আল্লাহ তা'আলার ওপর ভরসা করে নিজ যোগ্যতা ও কর্মদক্ষতায় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার চেষ্টা করাই শ্রেয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: لَوْ أَنَّكُمْ كُنْتُمْ تَوَكَّلُونَ عَلَى اللَّهِ حَقَّ تَوَكَّلِهِ لَرُزِقْتُمْ كَمَا يُرْزَقُ الطَّيْرُ تَغْدُو خِمَاصًا وَتَرُوحُ بِطَانًا» (سنن الترمذي) অর্থ: 'যদি তোমরা আল্লাহ তা'আলার ওপর পূর্ণ ভরসা করতে পার, তাহলে তোমরা সেভাবেই রিযিকপ্রাপ্ত হবে, যেভাবে বিহঙ্গকুল রিযিকপ্রাপ্ত হয়-সকালে খালি পেটে বের হয়; সন্ধ্যায় ভরপেট হয়ে ফিরে আসে।' (তিরমিজী, ৪/৫৭৩)
১৮. আত্মবিশ্বাস রাখুন। সর্বোচ্চ চেষ্টা ও পরিশ্রম দিয়ে নিজের যোগ্যতা ও দক্ষতা কাজে লাগানোর চেষ্টা করুন। বিশ্বাস করুন, আপনার শ্রম কখনো বৃথা যাবে না। আপনার সাথে আছে আল্লাহর তা'আলার প্রতিশ্রুতি। যিনি মহান রিযিকদাতা। তাঁর প্রতিশ্রুতির ব্যতিক্রম হতে পারে না। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: هُوَ الَّذِي جَعَلَ لَكُمُ الْأَرْضَ ذَلُولًا فَامْشُوا فِي مَنَاكِبِهَا وَكُلُوا مِنْ رِزْقِهِ وَإِلَيْهِ النُّشُورُ﴾ [الملك: ١٥] অর্থ: 'তিনিই তোমাদের জন্য ভূমিকে বশ্য করে দিয়েছেন। সুতরাং তোমরা তার কাঁধে চলাফেরা কর ও তাঁর রিযিক খাও। তাঁরই কাছে তোমাদেরকে পুনর্জীবিত হয়ে যেতে হবে।' (মুলক, ৬৭: ১৫)
১৯. আয়-উপার্জনের সমৃদ্ধি ও রিযিকে বরকত লাভের জন্য আল্লাহ তা'আলার নিয়ামতের শোকর আদায় করুন। শোকরগুযার বান্দাকে আল্লাহ তা'আলা বহুগুণ বেশি দান করেন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা ওয়াদা করেছেন: لَئِن شَكَرْتُمْ لَأَزِيدَنَّكُمْ ﴾ [إبراهيم: ٧] অর্থ: 'তোমরা সত্যিকারের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলে, আমি তোমাদের আরও বেশি দেব।' (ইবরাহীম, ১৪: ৭)
২০. আল্লাহ তা'আলা আপনার কল্যাণে যে রিযিকের ফায়সালা করেছেন, তাতেই তুষ্ট থাকুন। তাঁর ফায়সালার বাইরে মানুষের পক্ষে কোনো জীবিকা উপার্জন করা সম্ভব না। তিনিই সৃষ্টিজগতের রিযিকদাতা ও জীবিকার ব্যবস্থাপক। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: مَنْ كَانَتِ الدُّنْيَا هَمَّهُ، فَرَّقَ اللهُ عَلَيْهِ أَمْرَهُ، وَجَعَلَ فَقْرَهُ بَيْنَ عَيْنَيْهِ، وَلَمْ يَأْتِهِ مِنَ الدُّنْيَا إِلَّا مَا كُتِبَ لَهُ، وَمَنْ كَانَتِ الْآخِرَةُ نِيَّتَهُ، جَمَعَ اللَّهُ لَهُ أَمْرَهُ، وَجَعَلَ غِنَاهُ فِي قَلْبِهِ، وَأَتَتْهُ الدُّنْيَا وَهِيَ رَاغِمَةً» (سنن ابن ماجه) অর্থ: 'যে ব্যক্তির সমস্ত চিন্তা-ভাবনা শুধু জাগতিক জীবনকে কেন্দ্র করে, আল্লাহ তা'আলা তার জীবনকে বিক্ষিপ্ত করে দেন। তার দৃষ্টিতে অভাব-অনটনের বিষয়টি বড় করে দেখান। দুনিয়ার ততটুকু (সুযোগ-সুবিধা) সে লাভ করতে পারে, যা আল্লাহ তার জন্যে ফায়সালা করেন। আর যার ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষা শুধু আখিরাতের সফলতা কেন্দ্র করে, আল্লাহ তা'আলা তার জীবন সুসংগঠিত করে দেন। তাকে আত্মিক সচ্ছলতা দান করেন। দুনিয়া মাথানত করে তার কাছে ধরা দেয়।' (ইবনে মাযাহ, ২/১৩৭৫)
২১. চেষ্টা পরিশ্রমের সুফল পেতে কিংবা বিনিয়োগকৃত পুঁজির লভ্যাংশ পেতে কালবিলম্ব হলে কখনো উদ্বিগ্ন, উৎকণ্ঠিত হবেন না। কেননা প্রত্যেকের জীবিকা নির্দিষ্ট সময়াবদ্ধ। সুনির্দিষ্ট সময়ের আগে সে তা কিছুতেই লাভ করতে পারবে না। রিযিকপ্রাপ্ত হওয়ার ক্ষেত্রে যে অত্যন্ত ত্বরাপ্রবণ, চেষ্টা পরিশ্রমের লাভালাভ নগদ নগদ বুঝে পেতে যে অতি ব্যগ্র, তার অবস্থা হলো ঐ মুসল্লির মতো, যে দ্রুত নামায শেষ করার ইচ্ছায় ইমাম সাহেবের আগেই রুকু সিজদায় চলে যায়; কিন্তু শেষে তাকে ইমাম সাহেবের সাথেই সালাম ফেরাতে হয়। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: ﴿وَإِنْ يُرِدُكَ بِخَيْرٍ فَلَا رَادَّ لِفَضْلِهِ ﴾ [يونس: ١০৭] অর্থ: 'তিনি যদি তোমার কোনও মঙ্গল করার ইচ্ছা করেন, তবে এমন কেউ নেই, যে তার অনুগ্রহ রদ করবে।' (ইউনুস, ১০: ১০৭)
২২. জাগতিক সুযোগ-সুবিধা ও সুখ-সাচ্ছন্দ্যের ক্ষেত্রে যারা আপনার চেয়ে উচ্চস্তরের, তাদের দিকে না তাকিয়ে, যারা আপনার চেয়ে নিম্নস্তরের, তাদের অবস্থা লক্ষ করুন। মনের সচ্ছলতা ও অল্পে তুষ্টির অনন্য গুণের কারণে আল্লাহ তা'আলার নিকট আপনিই অধিক মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: ارْضَ بِمَا قَسَمَ اللَّهُ لَكَ تَكُنْ أَغْنَى النَّاسِ. অর্থ: 'আল্লাহ তা'আলা আপনার ভাগে যা রেখেছেন, তাতেই তুষ্ট থাকুন। মনের সচ্ছলতায় আপনি হবেন জগতের শ্রেষ্ঠ ধনী।' (আয যুহ্‌দ লি আবি দাউদ, ১৩৯)
২৩. মনে রাখবেন, নিজের জন্য আপনি যা কল্যাণকর ভাবছেন, তার চেয়ে আল্লাহ তা'আলার ফায়সালাই অধিক মঙ্গলজনক। সামান্য অভাব-অনাটন সত্ত্বেও ব্যক্তির গুনাহমুক্ত জীবনযাপন, পূত-পবিত্রতা ও চারিত্রিক নিষ্কলুষতা আল্লাহ তা'আলার নিকট অধিক পছন্দনীয় ও বিরাট প্রতিদান লাভের ওসিলা। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: يَدْخُلُ الْفُقَرَاءُ الْجَنَّةَ قَبْلَ الْأَغْنِيَاءِ بِخَمْسِمِائَةِ عَامٍ نِصْفِ يَوْمٍ অর্থ: 'আমার উম্মতের গরিব-দরিদ্র শ্রেণি ধনী সম্পদশালীদের চেয়ে পাঁচশ বছর আগে জান্নাতের প্রবেশ করবে।'

পরিশিষ্ট:
ইমাম শাফেয়ী (রহ.) বলেছেন: أَمْطِرِي لُؤْلُوا جِبَالَ سَرَنديبَ وفيضي آبار تكرور تــبـــــرا / أَنَا إِن عِشتُ لَستُ أَعْدَمُ قوتاً وَإِذا مُتُّ لَستُ أَعدَمُ قبـــــরা / هِمَّتِي هِمَّةُ المُلوكِ وَنَفْسِي نَفْسُ حُرِّ تَرَى المَذَلَّةَ كُفরা
অর্থ: 'হে আকাশ, তুমি সারান্দিবের পর্বতমালায় মণিমুক্তা বর্ষণ কর! তাকরুরের কূপগুলোকে স্বর্ণখণ্ডে ভরে দাও, (তাতে আমার কী আসে-যায়)। আমি যদি বেঁচে থাকি তাহলে তো আমি রিযিক-বঞ্চিত হব না, আর যদি মৃত্যুবরণ করি তাহলে কবরই হবে আমার শেষ ঠিকানা। তবে রাজা-বাদশাহের মতোই আমার মনোবল উচ্চাকাঙ্ক্ষী। আমার মানসিকতাও নির্ভীক স্বাধীনচেতা; নচেৎ নিজের প্রতি সামান্য অপমানও যে কুফুরির মতো ঘৃণা করে।'

তাবেয়ী ইমাম হাসান বসরী (রহ.) (৬৪২-৭২৮ খ্রিষ্টাব্দ) বলেছেন: 'পবিত্র কুরআনের নিরানব্বই জায়গায় পড়েছি। “আল্লাহ তা'আলা রিযিকের ফায়সালাকারী ও সমস্ত সৃষ্টিজীবের রিযিক দানকারী।” আর পবিত্র কুরআনের মাত্র একটা জায়গায় পড়েছি, "শয়তান তোমাদের দারিদ্র্যের ভয় দেখায়।” (কিন্তু এরপরও আমাদের অবস্থা হলো) নিরানব্বইবার আল্লাহ তা'আলার প্রতিশ্রুতিতে আশ্বস্ত না হয়ে এক জায়গার শয়তানের অপচেষ্টায় ভড়কে যাই।'

জনৈক পশ্চিমা দার্শনিক বলেছেন: 'সেবক হিসেবে সম্পদ যত একনিষ্ঠ, মনিব হিসেবে সে ততটাই নিকৃষ্ট।'

স্পাইক মিলিগান বলেছেন: 'অর্থবিত্ত তোমার জন্য নিঃস্বার্থ বন্ধু জোগাতে পারবে না; উল্টো তোমার পেছনে ঘোর শত্রু লেলিয়ে দিবে।'

টিকাঃ
৫৫. সুনানে নাসায়ীর রিওয়ায়েতে বর্ণিত হয়েছে: «إِنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ يَقُولُهُنَّ فِي دُبُرِ الصَّلَاةِ» (سنن النسائي) অর্থ: রাসূলুল্লাহ ﷺ নামাযের পর এ দু'আটি পাঠ করতেন। (নাসায়ী, ৩/৭৩) এতে বোঝা যায়, সকাল-সন্ধ্যায় ও প্রত্যেক নামাযের পর-দুটি সময়েই আমল করার সুযোগ রয়েছে। (অনুবাদক)
৫৬. সুনানে নাসায়ীর রিওয়ায়েতে বর্ণিত হয়েছে... আল্লাহ্ তা'আলার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে, সওয়াবের প্রত্যাশায়, কোনো প্রকার শর্তরোপ না করে যে ঋণ প্রদান করা হয়, তাকে 'করজে হাসানা' বা উত্তম ঋণ বলা হয়।
৫৭. একজন যুগশ্রেষ্ঠ ইসলামি ফকীহ। যে সকল মহা মনীষী ইসলামের বিধিবিধান সম্পর্কে ব্যাপক গবেষণা করে, ইসলামকে অনুসরণের জন্য সাধারণের জন্য সহজসাধ্য করে তুলেছেন, তাঁদের মধ্যে তিনি অন্যতম। ১৫০ হিজরিতে মিশরের আসকালান শহরে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। দু' বছর বয়সে তাঁর মা তাঁকে নিয়ে মক্কায় পাড়ি জমান। সাত বছর বয়সে পবিত্র কুরআনের হিফয সম্পন্ন করেন। জ্ঞানার্জনের লক্ষ্যে তিনি মদীনা, ইয়েমেন, ইরাক ও মিসর সহ বহুদেশ সফর করেন। তাঁর রচিত গ্রন্থসমূহের মধ্যে 'আল-উম্ম' ও 'আররিসালাহ' অন্যতম। ২০৪ হিজরিতে তিনি মিশরে ইন্তেকাল করেন। (অনুবাদক)
৫৮. তিনি ভারতের আহমেদ নগরে জন্মগ্রহণ করেন। পরবর্তীতে তিনি স্থায়িভাবে আয়ারল্যান্ডে পাড়ি জমান। তিনি ছিলেন আয়ারল্যান্ডের বিশিষ্ট কবি ও রম্যলেখক। ২০০২ সালের ২৭ই ফেব্রুয়ারি তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

📘 আল হাল্লু জীবন সমস্যার সমাধান 📄 দুর্বল ব্যক্তিত্ব

📄 দুর্বল ব্যক্তিত্ব


পৃথিবীতে কেউ দুর্বল ব্যক্তিত্ব ও হীনম্মন্যতা নিয়ে জন্মায় না। প্রতিটি শিশুই সুস্থ স্বাভাবিক, সুন্দর প্রকৃতি নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। কিন্তু এরপর শৈশবে, বয়ঃসন্ধিকালে পারিপার্শ্বিক সামাজিকতা, পরিবেশ-প্রতিকূলতা, জীবনের ছোটখাটো ভুল ও সঙ্গদোষ ইত্যাদি কারণে সে দুর্বল মানসিকতার শিকার হয়। তার মধ্যে প্রবল হীনম্মন্যতা কাজ করে। ব্যক্তিজীবন থেকে শুরু করে বহিঃজীবনে সমন্বিত কার্যক্রমে ও সামাজিক আচার-অনুষ্ঠানে তার দুর্বল ব্যক্তিত্ব প্রকাশ পেতে থাকে।

দুর্বল ব্যক্তিত্ত্বের আলামত: নিজের বিদ্যাবুদ্ধির আলোকে বিচার না করে, সুফল ও পরিণতির কথা না ভেবে অন্যের পেছনে ছোটা, অন্যের চিন্তা-চেতনা ও মতাদর্শ গ্রহণ করা। জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোতে সিদ্ধান্ত গ্রহণে অক্ষম হয়ে অন্যের দ্বারস্থ হওয়া। অন্যের মুখোমুখি হতে ভয় পাওয়া। অপরিচিতজনদের সাথে সাক্ষাৎ ও ওঠা-বসায় লজ্জাবোধ করা। কোনো চিন্তা-ভাবনা ও বাদ-প্রতিবাদ ছাড়াই অন্যের চাহিদা ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করা। সামাজিক অঙ্গনে নিজেকে দুর্বল ও ছোট মনে করা। নিজস্ব মতামত ও সিদ্ধান্ত প্রকাশে সাহস হারিয়ে ফেলা। বিশেষ করে ব্যক্তিগত মতামত যদি অন্যদের বিপরীত হয়, মুখে কুলুপ এঁটে বসে থাকা, কিংবা অন্যদের মতামতের প্রতি সহাস্য সমর্থন ব্যক্ত করা। কোনো অন্যায়-অবিচারের শিকার হয়েও এর নৈতিক প্রতিবাদের সাহস হারিয়ে ফেলা। কঠিন পরিস্থিতি থেকে গা বাঁচানোর জন্য মিথ্যার আশ্রয় নেওয়া। উন্নতি-অগ্রগতির লক্ষ্যে নতুন কোনো উদ্যোগ-আয়োজনে নিস্পৃহ হয়ে থাকা।

মানসিক দুর্বলতা ও হীনম্মন্যতা ব্যক্তিকে জীবনের সমুন্নত লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ও সর্বোচ্চ সাফল্য অর্জনের পথ থেকে দূরে ঠেলে দেয়। সমাজে স্বাধীনভাবে ও সম্মানের সাথে বেঁচে থাকতে হলে ব্যক্তিত্বের দুর্বলতা কাটিয়ে আত্মসম্মানবোধ-সম্পন্ন ও বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্বের অধিকারী হতে হবে। এ লক্ষ্যে আমাদের করণীয় কী? হীনম্মন্যতা ও দুর্বল ব্যক্তিত্ব কাটিয়ে ওঠার উপায় কী?

সমাধান:
১. মা-বাবাকে সন্তানদের সাথে আলাপ-আলোচনায় বসতে হবে। তাদের প্রতিটি কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতে হবে। তাদের সুন্দর চিন্ত-ভাবনা ও সফলতার কথায় মুগ্ধতা প্রকাশ করতে হবে। যা তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দিবে এবং আত্মসম্মান বোধসম্পন্ন হতে সহায়ক হবে।
২. বাল্যবয়স থেকে সন্তানদের ব্যক্তিত্ব গঠনের লক্ষ্যে কাজ করতে হবে। কয়েকটি গবেষণা এ তথ্য প্রকাশ করেছে যে, জাতির নেতৃত্ব ও পরিচালনার যোগ্য ব্যক্তিত্ব গড়ে তোলার জন্য দু'বছর বয়স থেকেই শিশুদের নিয়মতান্ত্রিক পরিচর্যা করা কর্তব্য।
৩. অন্যদের সাথে সন্তানদের ইতিবাচক অংশগ্রহণ সুনিশ্চিত করতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে মানবিক মূল্যবোধ ও ভদ্রতা-সভ্যতা বজায় রাখার বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা কর্তব্য।
৪. শিশুদের লজ্জা, ভয় ও দুর্বল মানসিকতা থেকে বেঁচে থেকে ব্যক্তিত্বসম্পন্ন হয়ে ওঠার লক্ষ্যে আরও কিছু দায়িত্ব-কর্তব্য রয়েছে। অভিভাবকদের তা অবশ্যই গুরুত্বের সাথে পালন করতে হবে। করণীয় বিষয়গুলো হলো:
* শিশুদের সার্বিক বিষয়ের সযত্ন তত্ত্বাবধান করার পাশাপাশি তাদের সঙ্গে স্নেহ-ভালোবাসাপূর্ণ আচরণ করতে হবে। অনুপ্রেরণাদায়ক কথা বলে তাদের উদ্দীপনা ও চঞ্চলতা সচল রাখতে হবে।
* বিভিন্ন উপলক্ষে-আয়োজনে অন্যদের সাথে শিশুদের অংশগ্রহণ এবং পরিচিত-অপরিচিত ব্যক্তিদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার বিষয়গুলো তাদের সযত্নে শেখাতে হবে।
* পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে বিনোদন-ভ্রমণে অংশগ্রহণ এবং সমবয়সিদের সাথে খেলাধুলা মানসিক বিকাশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
* মা-বাবার কর্তব্য হলো, সন্তানদের সাথে আলাপ-আলোচনা করা। তাদের চিন্তা-ভাবনা ও বোধ-উপলব্ধির কথা শোনা। কোথাও ভুল-ত্রুটি হলে তা শুধরে দেওয়া।
* সন্তানদের কীর্তি ও সফলতা যত ক্ষুদ্র সামান্য হোক-না-কেন, এর যথাযথ মূল্যায়ন করতে হবে, তার যোগ্যতার প্রশংসা করে কিংবা সফলতায় পুরস্কৃত করে।
* প্রত্যেক শিশুকে বিশেষ বিশেষ যোগ্যতার বিষয়ে সজাগ-সচেতন করতে হবে। যেন তারা নিজ যোগ্যতা কাজে লাগিয়ে নিজেদের সফল ও যোগ্য হিসেবে গড়ে তুলতে পারে।
* শিশুদের অপছন্দনীয় ও সাধ্যাতীত বিষয়ে কোনো প্রকার জোর-জবরদস্তি না করে তাদের পছন্দ ও আগ্রহের বিষয়ে অনুপ্রাণিত করা আবশ্যক।
* লোক-সমাজের মাঝে, বিশেষ করে বন্ধু-বান্ধবের পরিবেশে সন্তানদের শাসানো ও খাটো করার মানসিকতা পরিহার করতে হবে।
* শিশুদের যদি জন্মগত কোনো খুঁত থাকে, তাহলে তা মেনে নিয়েই তার সাথে সুন্দর স্বাভাবিক আচরণ করা এবং তাকে লজ্জা, ভয় ও মানসিক সংকীর্ণতাবোধ থেকে মুক্ত রেখে সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথে অনুপ্রাণিত করা কর্তব্য।
* অন্যদের যোগ্যতা ও শ্রেষ্ঠত্বের সাথে তুলনা করে সন্তানদের তিরস্কার ভর্ৎসনা করার মানসিকতা পরিহার করতে হবে। তাদের মনে সাহস ও আত্মবিশ্বাস জাগিয়ে তুলতে হবে।
* সন্তানদের প্রতি প্রশ্রয়মূলক আদর-সোহাগ দেখানো, তাদের যেকোনো শখ-শৌখিনতা পূরণ করা ঠিক নয়। এমন অতিরিক্ত আঙ্কারা ও প্রশ্রয়ে সন্তানদের উচ্ছন্নে যাওয়ার আশঙ্কাই প্রবল। এক্ষেত্রে তাদের আত্মনির্ভরশীলরূপে গড়ে তোলা কর্তব্য। সঙ্গে সঙ্গে দৈনন্দিন কাজকর্ম-ড্রেস পরা, বইপত্র গুছিয়ে রাখা, ব্যক্তিগত আসবাবপত্র সযত্নে গুছিয়ে রাখা ও সংরক্ষণ-নিজেকেই করতে শেখাতে হবে।
* শিশুদের কাছে রাসূলুল্লাহ ﷺ ও সাহাবায়ে কেরামের বীরত্বগাথা ঘটনা বর্ণনা করতে হবে, যা তাদের মনে সাহসিকতা ও উদ্দীপনা যোগাবে।
* মেহমানদের সাদর অভ্যর্থনা জানানো, তাদের সাথে সুন্দর করে কথা বলা এবং ভদ্র-মার্জিত ব্যবহার করার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের চর্চা করাতে হবে।
* সন্তানদের মাঝে পরস্পর বোঝাপড়ার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। তাদের ওপর কঠোর শাসন প্রয়োগ করা এবং তাদের যৌক্তিক-অযৌক্তিক সমস্ত মতামত অগ্রাহ্য করার মানসিকতা পরিহার করা উচিত। এর ফলে সন্তানদের মনে ভীতির সঞ্চার হয় এবং তাদের মনোবল দুর্বল হয়ে পড়ে।
৫. শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম ও সমন্বিত উদ্যোগ-আয়োজনে শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। এতে তারা মানসিক জড়তা কাটিয়ে ওঠার পাশাপাশি নিজেদের নানামুখী যোগ্যতা প্রকাশ করার সুযোগ পাবে।
৬. আপনার মানসিক জড়তা ও ব্যক্তিত্বের দুর্বলতার দিকগুলো শনাক্ত করে একটা কাগজে টুকে রাখুন। কীভাবে তা কাটিয়ে ওঠা যায়, চিন্তা-ফিকির করুন। এমন কোনো বিজ্ঞ-অভিজ্ঞ ব্যক্তির দ্বারস্থ হোন, যিনি আপনার যোগ্যতার মূল্যায়ন করতে পারেন এবং আপনার ভুল-বিচ্যুতির সংশোধন করে সুসম্পন্ন ব্যক্তিরূপে গড়ে তুলতে পারেন।
৭. জীবন-জগৎ সম্পর্কে গভীর অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ হওয়ার জন্য বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়ার পাশাপাশি বই-পুস্তক পাঠ করুন। জীবন ও সমাজ বিষয়ক কুরআন-সুন্নাহর বিধি-বিধান সম্পর্কে জানুন, যেন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে নিজেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারেন।
৮. যৌক্তিক বিচারবুদ্ধি ও দূরদর্শিতার গুণে বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্বের অধিকারী হোন। অন্যের অন্ধ অনুকরণ না করে, অযৌক্তিক সিদ্ধান্তের সামনে নত না হয়ে নিজস্ব মতামত ব্যক্ত করুন। সাহসিকতার সাথে নিজের যৌক্তিকতা তুলে ধরুন।
৯. আগে নিজেকে চেনার চেষ্টা করুন। আমাদের প্রত্যেকের মধ্যেই কিছু বিশেষ যোগ্যতা ও সুপ্ত প্রতিভা বিদ্যমান। আপনি আপনার যোগ্যতার জায়গাগুলো নির্ণয় করুন। সফলতার সম্ভাব্য ক্ষেত্রসমূহ চিহ্নিত করুন। দ্রুত সফল হওয়ার জন্য, সমাজের মধ্যে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য যথার্থ ক্ষেত্রে মেধা-শ্রম ব্যয় করুন।
১০. শুধু একটা পেশার গণ্ডিতে আটকে না থেকে, সম্ভব হলে এর পাশাপাশি আরও বিভিন্ন পেশা ও উদ্যোগ শুরু করুন। এর মাধ্যমে অনেক বিচিত্র চিন্তা-চেতনা ও ব্যক্তিত্বের পরিচয় পাবেন। আপনার দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার ঋদ্ধ-সমৃদ্ধ হবে।
১১. বিভিন্ন সামাজিক কার্যক্রম, শিক্ষা-দীক্ষামূলক কর্মশালা ও সমন্বিত উদ্যোগে অংশগ্রহণ করুন। এর মাধ্যমে অপরিচিত ব্যক্তিদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপনের সুযোগ সৃষ্টি হবে। আপনার মানসিক জড়তা দূর হবে এবং সবকিছুতে অযাচিত সংকোচ ও জড়সড়-ভাব কেটে যাবে। স্বভাব-প্রকৃতি উচ্ছল প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে।
১২. জীবনের লক্ষ উদ্দেশ্য নির্ধারণ করুন। কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে নিজেকেই নিজে চ্যালেঞ্জ করুন। সফলতা লাভের জন্য চ্যালেঞ্জিং মানসিকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইতিহাসের সফল ব্যক্তিদের সম্পর্কে জানুন। নিজ যোগ্যতা ও প্রতিভা কাজে লাগিয়ে যারা সফলতার শীর্ষস্থান অধিকার করেছেন, তাদের জীবনের শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা হবে আপনার চলার পথের পাথেয়।
১৩. আত্মকেন্দ্রিকতার গণ্ডি থেকে বের হয়ে চারপাশের সমাজ ও সামাজিকতার সাথে সম্পৃক্ত হোন। বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়-স্বজনের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ করুন। সর্বোপরি সমাজের মৌলিক ক্ষেত্রগুলোতে নিজের সচেষ্ট তৎপরতা বজায় রাখুন এবং কার্যকর ভূমিকা পালন করুন।
১৪. মহান স্রষ্টা আল্লাহ তা'আলার ওপর ভরসা করুন। আল্লাহর ভয় ও তাঁর একত্ববাদে বিশ্বাস ব্যক্তির মধ্যে মানসিক প্রশান্তি, আত্মবিশ্বাস ও আত্মসম্মানবোধ জাগ্রত করে। আর গায়রুল্লাহর ভয় সম্মান মর্যাদার স্থানে অসম্মান, সফলতা সৌভাগ্যের স্থলে দুঃখ-দুর্দশা এবং সুখ-সমৃদ্ধির পরিবর্তে দরিদ্রতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
১৫. ক্রীড়াসংস্থার সাথে সম্পৃক্ত হয়ে নিয়মিত খেলাধুলায় অংশগ্রহণ করুন। খেলাধুলা ও ক্রীড়াচর্চা আপনার আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি করবে। জড়তা ও সংকোচ দূর করে উচ্ছল প্রাণবন্ত স্বভাব-প্রকৃতিতে অভ্যস্ত করে তুলবে।
১৬. যারা শক্তিহীন দুর্বল মানসিকতার শিকার, তারা যৌক্তিক সত্য কথাটি বলার সাহস করে না। ন্যায়সংগত সাহসী ভূমিকা পালন করতে পারে না। অগোচরে নিন্দা-সমালোচনামুখর হয়ে উঠে। সমাজে এমন লোকের সংখ্যা কম নয়। তাদের থেকে আপনি নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখুন। নচেৎ সময়ের ব্যবধানে আপনার মধ্যে একই পশ্চাদপদ মানসিকতা সক্রিয় হয়ে উঠবে। সাহসী, আত্মবিশ্বাসী ও স্বাধীনচেতা ব্যক্তিদের সাথে চলুন। তাদের সংস্পর্শ আপনার বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্ব গঠনে সহায়ক হবে।
১৭. অন্যের কথা ও কাজের যৌক্তিক প্রতিবাদ করতে ভয় করবেন না। তবে এক্ষেত্রে স্থান-কাল-পাত্র বিবেচনা করা বাঞ্ছনীয়। আপনার কাছে যদি এমন কোনো বিষয় উত্থাপিত হয়, যা নীতি-নৈতিকতাশূন্য ও অযৌক্তিক, তাহলে নিঃসংকোচে আপনি তার প্রতিবাদ করুন। ভয় ও সংকোচের বশবর্তী হয়ে নিজেকে কখনো এমন কাজে বাধ্য করবেন না, যা অগ্রহণযোগ্য।
১৮. যাবতীয় বিষয়ে আল্লাহ তা'আলার সাহায্য প্রার্থনা করুন। তাঁর আশ্রয় গ্রহণ করুন। সময়মতো জামাতের সাথে পাঁচওয়াক্ত নামাযে যত্নবান হোন। পবিত্র কুরআনের এ আয়াতগুলো বারবার পাঠ করুন: রَبِّ اشْرَحْ لِي صَدْرِي - وَيَسِّرْ لِي أَمْرِي - وَاحْلُلْ عُقْدَةً مِنْ لِسَانِي - يَفْقَهُوا قَوْلِي অর্থ: এবং আমার কাজ সহজ করে দিন। আমার জিহ্বার জড়তা দূর করে দিন। যাতে মানুষ আমার কথা বুঝতে পারে। নিরাশা ও ব্যর্থতার মানসিকতা ছেড়ে আশাবাদী মানসিকতা ধারণ করুন। আপন রবের প্রতি সুধারণা পোষণ করুন। এতে আপনার আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি পাবে ব্যক্তিত্ব সুদৃঢ় হবে।
১৯. সামান্য সমস্যাতে, এমনকি কঠিন সংকটেও মানুষের দ্বারে-দ্বারে অভিযোগ-অনুযোগ করে বেড়াবেন না। একমাত্র আল্লাহ তা'আলার কাছে যাবতীয় সমস্যার কথা ব্যক্ত করুন।
২০. মনের ওপর জোর খাটিয়ে অন্যের চাহিদা ও ইচ্ছা পূরণে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়বেন না, তাহলে সবাই আপনাকে দিয়ে নিজ নিজ স্বার্থ উদ্ধার করে নেবে। এক্ষেত্রে ব্যক্তিত্বের স্বকীয়তা বজায় রাখুন। প্রথমে বিবেক-বুদ্ধির বিচারে যাচাই করুন। তারপর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করুন।
২১. আবেগ নিয়ন্ত্রণ করুন। রাগ-বিরাগ, দুঃখ-বেদনা ও হাসি-আনন্দের মুহূর্তে আত্মনিয়ন্ত্রণ করুন। আবেগ-তাড়িত হয়ে কখনও কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে যাবেন না। আপনার সিদ্ধান্ত যখন উৎকণ্ঠা, ব্যাকুলতা, একচেটিয়া সমর্থন ও চরম বিরোধিতা ইত্যাদি মনস্তাত্ত্বিক আবেগমুক্ত হবে, তখনই তা যথার্থ ও ন্যায়ানুগ হতে পারে।

পরিশিষ্ট:
মদিনার পথে শিশু বাচ্চারা খেলা করছিল। একই পথে আমিরুল মু'মিনীন ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) হেঁটে যাচ্ছিলেন। তাঁকে দেখে বাচ্চারা সবাই দৌড়ে পালাল। শুধু একটা ছেলে দাঁড়িয়ে রইল। খলিফার আগমনে তার চেহারায় কোনো ভাবান্তর নেই। ডর-ভয়ের কোনো ছাপ নেই। ছেলেটি হলো আব্দুল্লাহ ইবনে যুবাইর (রা.)। আমিরুল মু'মিনীন ওমর (রা.) তার কাছে এসে জিজ্ঞেস করলেন: 'অন্য ছেলেদের সাথে তুমি কেন দৌড়ে পালালে না?' ছোট্ট বালক আব্দুল্লাহ ইবনে যুবাইর বলল: 'আমি তো কোনো অপরাধী নই যে, আপনাকে দেখে পালিয়ে যাব। এ রাস্তাও তো এতটা সংকীর্ণ নয় যে, কারো চলার জন্য একপাশে সরে দাঁড়াতে হবে।' ছোট্ট বালক আব্দুল্লাহ ইবনে যুবাইর (রা.)-এর এমন উত্তর তাঁর ভয়-ডরহীন সাহসিকতার বহিঃপ্রকাশ।

লিবিয়ার স্বাধীনতা সংগ্রাম ও ইতালিয়ান উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে 'সানূসী' আন্দোলনের প্রাণপুরুষ উমর আল মুখতার (১৮৫৮-১৯৩১ খ্রিষ্টাব্দ) বলেছেন: 'আত্মসম্মান-বোধসম্পন্ন হোন। উপস্থিত বিষয়ে সহমত পোষণ করা যতই গুরুত্বপূর্ণ হোক-না-কেন, অযৌক্তিক মনে হলে কিছুতেই তা মেনে নিবেন না। কেননা এমনও হতে পারে, অন্যায়-অন্যায্যের সামনে একবার মাথা নোয়ানোর পর আর কখনও মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর সাহস হবে না।'

আইরিশ লেখক জর্জ বার্নাড শ' (১৮৫৬-১৯৫০ খ্রিষ্টাব্দ) বলেছেন: 'অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায়, যা বলা উচিত, তা-ই বলতে ভয় হয়।'

যুক্তরাষ্ট্রের বিশিষ্ট প্রযুক্তি উদ্ভাবক ও কম্পিউটার বিপ্লবের পথিকৃৎ স্টিভ জবস (১৯৫৫-২০১১ খ্রিষ্টাব্দ) বলেছেন: 'পৃথিবীতে আপনার জীবনকাল খুবই সংক্ষিপ্ত। এ ক্ষণকাল অন্যের ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষা পূরণে নষ্ট করবেন না।'

জার্মান লেখক ও কবি ইয়োহান ভোল্‌ফগাং ফন গ্যেটে (১৭৪৯-১৮৩২ খ্রিষ্টাব্দ) বলেছেন: 'ধৈর্য ও স্থৈর্যের মাধ্যমে প্রতিভার বিকাশ ঘটে। জীবনের বাস্তবতা মোকাবেলা করার মাধ্যমে বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্ব গড়ে উঠে।'

টিকাঃ
৫৯. আল্লাহ ছাড়া অন্যান্য জাগতিক বস্তু ও প্রভাব-প্রতিপত্তির ভয়।

ফন্ট সাইজ
15px
17px