📘 আল হাল্লু জীবন সমস্যার সমাধান 📄 বিস্মৃতি

📄 বিস্মৃতি


বিস্মৃতি হলো প্রয়োজনের মুহূর্তে অতীতের জানা-বিষয় স্মরণ করতে না পারা। বিস্মৃতি আমাদের জন্য সুখকর, যখন আমরা নিজেদের কষ্ট-যাতনা, বিপদ-আপদ ও দুঃখের স্মৃতিগুলো ভুলে থাকতে পারি। ভুলে যেতে পারি ঝগড়া-বিবাদ, হিংসা-বিদ্বেষ, অন্যায় বিরোধিতা ও শত্রুতা। বিস্মৃতিই আবার আমাদের জন্য কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায়, যখন আমরা ভুলে যাই নির্দিষ্ট সময় ও উপলক্ষে নিজেদের দায়িত্ব ও কর্তব্যের কথা, জীবনের প্রয়োজন ও আয়োজনের কথা।

উল্লেখযোগ্য কিছু কারণে মানুষ বিস্মৃতির শিকার হয়। তার মধ্যে একটি হলো পুষ্টিহীনতা। মানুষের মস্তিষ্ক ও ব্রেইন যখন পর্যাপ্ত পুষ্টি না পায়, তার কার্যক্ষমতা হ্রাস পেতে থাকে। স্মরণশক্তি ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ে। এছাড়াও অতি ভোজন, ধূমপান, কোমল পানীয়, ড্রাগস ইত্যাদিতে মানুষের মেধা ও স্মরণশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যে কারণেই হোক, আপনি কি স্মৃতিশক্তির দুর্বলতায় ভুগছেন? আপনি কি এমন অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির শিকার হচ্ছেন, যা করবেন বলে ভেবেছিলেন, এখন কিছুতেই তা মনে করতে পারছেন না? যা কিছু মুখস্থ করতে চান, কিছুতেই পেরে ওঠেন না? তাহলে আমার সাথে চলুন। বিস্মৃতির কবল থেকে মুক্তির পথ বাতলে দিচ্ছি। এ জটিল সমস্যার সমাধান বলে দিচ্ছি।

সমাধান:
১. মনে রাখতে হবে, বিস্মৃতি ও ভুলে যাওয়ার স্বভাব ব্যক্তিকে অযত্ন-অবহেলার পথে ধাবিত করে। ফলে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে তার সামান্য ভুলের কারণে বড় ধরনের অঘটন ঘটে যেতে পারে। যেমন: সিগন্যাল-ম্যানের সামান্য ভুলের কারণে বড় ধরনের ট্রেন দুর্ঘটনা ঘটা। অনুরূপভাবে জীবনের এমন অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট রয়েছে, যেখানে সামান্য ভুলের কারণে ভয়ানক আর্থিক ও মানবিক বিপর্যয় নেমে আসার সমূহ আশঙ্কা রয়েছে।
২. বিতারিত শয়তান থেকে সর্বদা মহান আল্লাহ তা'আলার আশ্রয় গ্রহণ করুন। কেননা যেকোনো ভালো কাজ ও কল্যাণকর উদ্যোগ ভুলিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে শয়তানই মূল হোতা। খিযির (আ.)-এর সন্ধানের পথে মূসা (আ.)-এর সফরসঙ্গী যুবক তার দায়িত্বের কথা ভুলে গিয়েছিল। বলেছিল (পবিত্র কুরআনের ভাষায়): ﴿وَمَا أَنْسَنِيهُ إِلَّا الشَّيْطَنُ أَنْ أَذْكُرَهُ﴾ [الكهف: ٦٣] অর্থ: 'সেটির কথা বলতে আমাকে আর কেউ নয়, শয়তানই আমাকে ভুলিয়ে দিয়েছিল।' (কাহফ, ১৮: ৬৩)
৩. কোনো কিছু যদি ভুলে যান, কিছুতেই মনে করে উঠতে পারছেন না, তাহলে বেশি বেশি দরুদ শরীফ পাঠ করুন। সঙ্গে সঙ্গে এই দু'আটিও বার বার পাঠ করুন: اللَّهُمَّ رَبَّ الضَّالَّةِ، هَادِيَ الضَّالَّةِ، تَهْدِي مِنَ الضَّلَالَةِ، رُدَّ عَلَيَّ ضَالَّتِي بِقُدْرَتِكَ وَسُلْطَانِكَ مِنْ عَطَائِكَ وَفَضْلِكَ।
অর্থ: 'হে হারানো বিস্মৃত বস্তুর প্রভু, হারানো বস্তুর সন্ধান দানকারী, ভুলে যাওয়া বস্তুর সন্ধান আপনিই দিতে পারেন। নিজ শক্তিমত্তা, ক্ষমতা দান ও অনুগ্রহের গুণে আমার হারানো বস্তু ফিরিয়ে দিন।'
৪. বেশি বেশি তাওবা-ইস্তিগফার করুন। কেননা গুনাহ ও পাপাচার মানুষের মনের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে। আর তাওবা-ইস্তিগফার সে প্রভাব দূর করে মনটাকে বিশুদ্ধ পরিশুদ্ধ করে।
৫. মেধা-মস্তিস্ক দেহের অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মতোই একটি অঙ্গ। সযত্ন পরিচর্যার মাধ্যমে তা সবল শক্তিশালী হয়ে উঠে। তাই অধিক পাঠ ও অধ্যয়নের মাধ্যমে মেধার পরিচর্যা করুন। ক্যালকুলেটর, কম্পিউটার ও গুগল ইত্যাদি সাহায্য-সহযোগিতা ছাড়াই মেধা খাটিয়ে কঠিন ও জটিল বিষয়ের সমাধান বের করার চেষ্টা করুন।
৬. নিয়মিত খেলাধুলা ও শরীরচর্চা করুন। কেননা তা শরীর-স্বাস্থ্যের সুস্থতা ও মন-মস্তিস্কের প্রফুল্লতা ধরে রাখতে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করে।
৭. ভেজালমুক্ত নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্যরুটিন মেনে চলুন। মেদ, ভুঁড়ি ও স্থূলতা থেকে বেঁচে থাকুন। কেননা তা মেধা ও স্মরণশক্তির জন্য ক্ষতিকর। দেহের প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও পুষ্টিযুক্ত খাবার খান। বিজ্ঞজনদের উক্তি ‘সুস্থ দেহ, সুস্থ মন।’
৮. আমাদের শরীর-স্বাস্থ্য ও স্মরণশক্তির সুরক্ষায় শাকসবজি ও ফলমূলের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। তাই প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় অধিক শাক-সবজি ও ফলমূল থাকতে হবে। তাতে প্রচুর পরিমাণ ফ্লেভোনয়েড ও অ্যান্টি অক্সিডেন্ট বিদ্যমান। স্মৃতিশক্তি বজায় রাখা এবং স্মৃতিশক্তিজনিত যেকোনো সমস্যা প্রতিরোধে অ্যান্টি অক্সিডেন্টের জাদুকরি কার্যক্ষমতা রয়েছে।
৯. ডাক্তারি পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে আপনার দেহে ক্যালসিয়ামের শূন্যতা ও ভিটামিন-ঘাটতির বিষয়ে নিশ্চিত হোন। বিশেষ করে ভিটামিন বি১২ ও ভিটামিন ডি-সুস্বাস্থ্য ও স্মৃতিশক্তি রক্ষায় এ দু'টি ভিটামিন অত্যন্ত কার্যকর।
১০. থাইরয়েড গ্রন্থির দুর্বলতা ও রক্তস্বল্পতা-ডাক্তারি পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে এ দুটি বিষয়ের নিশ্চিত হবে। কোনো সমস্যা ধরা পড়লে উন্নত চিকিৎসা গ্রহণ করা কর্তব্য। কেননা স্মৃতিশক্তি দুর্বল ও ক্ষয় করার ক্ষেত্রে এ দুটি রোগ ভীষণ সক্রিয়।
১১. ক্রোধ, বিষণ্ণতা, দুশ্চিন্তা, ত্বরা-প্রবণতা ইত্যাদি মানসিক সমস্যা থেকে বেঁচে থাকুন। কেননা এসব কারণে অনেক সময় ভুলো মানসিকতা সৃষ্টি হয়, স্মৃতিবিভ্রম ঘটে।
১২. প্রতিদিনের গতানুগতিক জীবনের একঘেয়েমি ভাব দূর করার চেষ্টা করুন। এ লক্ষ্যে প্রাকৃতিক মনোরম পরিবেশে ঘুরে আসুন। কিংবা ঐতিহাসিক দর্শনীয় স্পট পরিদর্শনে বেরিয়ে পড়ুন। এতে মন-মানসিকতা প্রশান্ত ও প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে। স্মৃতিশক্তি সতেজতা ও গতিময়তা ফিরে পাবে।
১৩. পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও নিয়মিত ঘুম সুস্থ মস্তিষ্কের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষভাবে রাতের ঘুম মানসিক সুস্থতার জন্য এক শক্তিশালী নিয়ামক। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: وَجَعَلْنَا نَوْمَكُمْ سُبَاتًا * وَجَعَلْنَا الَّيْلَ لিবাসা * وَجَعَلْنَا النَّهَارَ مَعَاشَا﴾ [النبأ: ٩ - ١١] অর্থ: 'আর তোমাদের ঘুমকে ক্লান্তি ঘুচানোর উপায় বানিয়েছি। এবং রাতকে বানিয়েছি আবরণ স্বরূপ। এবং দিনকে জীবিকা আহরণের সময় নির্ধারণ করেছি।' (নাবা, ৭৮: ৯-১১) তাই রাতে সকাল সকাল ঘুমিয়ে পড়ুন এবং সতেজ ও প্রাণবন্ত মনে কর্মমুখর জীবন-যাপন করুন।
১৪. নিয়মিত জামাতের সাথে ফজর নামায আদায়ে যত্নবান হোন। এতে একই সঙ্গে আপনি দু'টি কল্যাণ লাভ করতে পারবেন। প্রথমত: ফজর নামাযের বিরাট ফযিলত হাসিল হবে। দ্বিতীয়ত: ভোরের স্বচ্ছ-সতেজ আবহাওয়া আপনার মেধা ও স্মরণশক্তিকে পুষ্টি জোগাবে।
১৫. যেকোনো বিষয় মুখস্থ ও আত্মস্থ করার জন্য উপযুক্ত স্থান বাছাই করুন। এর জন্য শোরগোল ও কোলাহলমুক্ত পরিবেশ অধিক উপযুক্ত।
১৬. রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর নির্দেশনা মোতাবেক পাকস্থলীকে তিনভাগে ভাগ করুন। এক ভাগ খাবারের জন্য আরেক ভাগ পানীয়র জন্য তৃতীয় ভাগ নিজের জন্য খালি রাখুন। বিজ্ঞ ডাক্তারদের অভিমত হলো, পাকস্থলী যত বেশি খাবার-দাবারে পূর্ণ হয়, খাদ্য হজমের জন্য পাকস্থলীর দিকে রক্ত চলাচল বেড়ে যায়। ফলে মস্তিষ্কের স্বাভাবিক রক্তচলাচল ব্যাহত হয়, যা মস্তিষ্ক ও স্মরণশক্তির জন্য ক্ষতিকর।
১৭. আপনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বারবার ফোকাস করুন। মনে রাখার জন্য এটা অত্যন্ত কার্যকর কৌশল। রবার্ট গ্রিন তাঁর كَيْفَ تُمْسِكُ بِزِمَامِ القُوَّةِ গ্রন্থে বলেছেন: 'গুরুত্বপূর্ণ প্রতিটি বিষয়ে বারবার ফোকাস করুন। কয়েক ধাপে একাধিকবার প্রাক্টিস করুন। বিষয়টি আপনার ভালোভাবে আত্মস্থ হয়ে যাবে।'
১৮. জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে খুঁটিনাটি বিষয় ভুলে যাওয়ার হাত থেকে যদি বাঁচতে চান, তাহলে কাজ শুরু করার আগে যাবতীয় প্রয়োজনীয় বস্তুর খোঁজ নেওয়ার কৌশল অবলম্বন করুন। যেমন: প্রতিদিন কাজে বের হওয়ার আগে আপনার যাবতীয় গুরুত্বপূর্ণ বস্তু সাথে নিয়েছেন কি না, খোঁজ করে দেখুন। আমি লক্ষ করেছি, বিমান-যাত্রায় নেভিগেটররা এ দায়িত্ব বেশ গুরুত্বের সাথে পালন করে। যাত্রা শেষে তারা যাত্রীদের সতর্ক করে দেয়, প্রত্যেকেই যেন নিজ দায়িত্বে যার যার সামানপত্র নিয়ে অবতরণ করে। ব্যক্তিজীবনে এ দায়িত্ব নিজেদেরই পালন করতে হবে।
১৯. যেকোনো ক্ষেত্রে চুক্তি, প্রতিশ্রুতি ও সম্মিলিত সিদ্ধান্ত ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো মৌখিকভাবে চূড়ান্ত না করে লিখিতরূপে সংরক্ষণ করুন। প্রয়োজনের মুহূর্তে অবিকল মনে করার জন্য এটি অত্যন্ত কার্যকর কৌশল। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা মেয়াদি ঋণ প্রদান করার ক্ষেত্রে ভুল থেকে বাঁচার দিকনির্দেশনা প্রদান করেছেন এবং ঋণের বিষয়টি লিখে রাখার আদেশ করেছেন: يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓا۟ إِذَا تَدَايَنتُم بِدَيْنٍ إِلَىٰٓ أَجَلٍ مُّسَمًّى فَٱكْتُبُوهُ [البقرة: ٢٨٢] অর্থ: 'হে মুমিনগণ! তোমরা যখন নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য কোন ঋণের কারবার কর, তখন তা লিখে নাও।' (বাকারা, ২: ২৮২)
২০. প্রতিদিনের গুরুত্বপূর্ণ কাজ ও দায়-দায়িত্বের একটি তালিকা তৈরি করুন। তালিকা তৈরির কাজটি চাইলে আপনি ক্যালেন্ডারে, নোটবুকে কিংবা মোবাইলের ক্যালেন্ডারের এড ইভেন্ট অপশনেও তৈরি করতে পারেন। তালিকা দেখে নির্দিষ্ট সময়ের কাজটি সহজেই মনে করতে পারবেন। মোবাইলে সেভ করে রাখলে মোবাইল স্বয়ংক্রিয়ভাবে নির্দিষ্ট সময়ে আপনার কাজের কথা মনে করিয়ে দিবে।
২১. আপনার ভুলো মানসিকতা ও স্মৃতিবিভ্রম যদি অতিমাত্রায় ও অস্বাভাবিক পর্যায়ের হয়ে থাকে, তাহলে আপনার মানসিক অবস্থার উন্নতির লক্ষ্যে ডাক্তারের শরণাপন্ন হতে কুণ্ঠিত হবেন না।
২২. মেধা ও স্মরণশক্তিকে দুর্বল করে দেয়, ভুলো মানসিকতা ও স্মৃতিবিভ্রম ঘটায়, এমন সমস্ত বস্তু পরিহার করুন। যেমন: অ্যালকোহল জাতীয় পানীয়, ধূমপান, মাদক, ড্রাগস ও অনবরত রাত্রিজাগরণ ইত্যাদি।
২৩. ভুলে যাওয়ার সমস্যা থেকে বাঁচার জন্য একটি কার্যকর পন্থা হলো, সদ্য-জানা বিষয়গুলোকে প্রসিদ্ধ কোনো স্থান কিংবা বিষয়ের সাথে জুড়ে দেওয়া। যেমন: অপরিচিত কারোর সাথে সাক্ষাৎ হলো। জিজ্ঞেস করে জানতে পারলেন, তার নাম মুহাম্মদ বিন আব্দুল্লাহ। আপনি ঠিক করে নিন, তার নাম তো অবিকল রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর নামের সাথে মিলে যায়। পরে কখনো তার সাথে দেখা হলে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর নামের বদৌলতে তার নামটি সহজেই মনে পড়ে যাবে।
২৪. যে বিষয়টি আপনি পড়েছেন ও মুখস্থ করেছেন, তা যদি ভুলে যান তাহলে দ্বিতীয়বার সরাসরি মুখস্থ করতে যাবেন না। এ পর্যায়ে আপনি বিষয়টির অর্থ, মর্ম ও ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণসহ বোঝার চেষ্টা করুন। এরপর বিষয়টির সারসংক্ষেপ লিখে আপনার টেবিলের ওপর সুন্দরভাবে সাজিয়ে রাখুন। কাজের ফাঁকে ফাঁকে বারবার দেখতে দেখতে বিষয়টি অনায়াসেই আত্মস্থ হয়ে যাবে।
২৫. পবিত্র কুরআনের এ দু'আটি বারবার পাঠ করুন: ﴿رَبَّنَا لَا تُؤَاخِذْنَا إِنْ نَّسِينَا أَوْ أَخْطَأْنَا﴾ [البقرة: ٢٨٦] অর্থ: '(হে মুসলিমগণ! তোমরা আল্লাহর কাছে এই দু'আ কর যে,) হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের দ্বারা যদি কোন ভুল-ত্রুটি হয়ে যায় তবে সে জন্য তুমি আমাদের পাকড়াও করো না।' (সূরা বাকারা, ২: ২৮৬)
২৬. বারবার ভুলে যাওয়ার কারণে শঙ্কিত হবেন না। আশাহত হয়ে পড়বেন না। মনে রাখবেন, বিস্মৃতি আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে এক বিরাট নিয়ামত। এক জীবনের সমস্ত দুঃখ-কষ্ট, বিপদ-আপদ ও জ্বালা-যন্ত্রণার কথা যদি মানুষ মনে করতে পারত, তাহলে এই মনঃকষ্টেই সে মৃত্যুবরণ করত।

পরিশিষ্ট:
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: إِنَّ اللهَ قَدْ تَجَاوَزَ عَنْ أُمَّتِي الْخَطَأَ وَالنَّسْيَانَ وَمَا اسْتُكْرِهُوا عَلَيْهِ» (سنن ابن ماجه) অর্থ: 'আল্লাহ তা'আলা আমার উম্মতের অনিচ্ছাকৃত ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করে দিয়েছেন এবং এমন অপরাধও ক্ষমা করে দিয়েছেন, যা করার জন্য তাদের বাধ্য করা হয়েছে।' (ইবনে মাযাহ, ১/৬৫৯)

ইমাম যাহাবী (রহ.) তাঁর 'সিয়ারু আলামিন নুবালা' গ্রন্থে এ ঘটনা উল্লেখ করেছেন: জনৈক মুহাদ্দিস তার ভুলো মনের কারণে প্রসিদ্ধ ছিলেন। এক রাতে তিনি সুস্বাদু মাছ নিয়ে বাড়িতে এলেন। মাছটি ভালোভাবে রান্না করতে বলে সামান্য বিশ্রামের জন্য বিছানায় পিঠ লাগালেন। এরপর কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছেন, নিজেও টের পাননি। ইতোমধ্যে মাছ রান্না হয়ে গেছে। একজন ডাকতে এসে দেখল, তিনি ঘুমিয়ে পড়েছেন। দিনভর ক্লান্তির পর ঘুম, জাগানো উচিত হবে না-এই ভেবে সে চলে গেল। পরিবারের সবাই রাতের খাবার শেষে শায়েখের হাতে আলগোছে মাছের তেল মাখিয়ে দিল। ফজরের আজানে শায়েখের ঘুম ভাঙল। উঠেই তিনি মাছ খেতে চাইলেন। বললেন: 'মাছ কোথায়? মাছ নিয়ে এস। আমি তো মাছ খাইনি।' পরিবারের সদস্যরা বলল: 'রাতে আমাদের সাথেই তো আপনি মাছ খেয়েছেন।' শায়েখ বললেন: 'কিছুতেই না, আমি মাছ খাইনি।' পরিবারের সদস্যরা বলল: 'তাহলে আপনার হাত শুঁকে দেখুন।' শায়েখ হাত শুঁকে মাছের ঘ্রাণ পেলেন। বললেন: 'তোমাদের কথাই ঠিক। বোধ হয় আমিই ভুলে গেছি।'

জনৈক দার্শনিক বলেছেন, 'মানুষের ওপর আল্লাহ তা'আলার দুটি বিশেষ অনুগ্রহ রয়েছে। এ দু'টি অনুগ্রহ ছাড়া সুখে শান্তিতে বাঁচতে পারতো না। দু'টি অনুগ্রহের একটি ভুলে যাওয়া, অপরটি আশা-ভরসা। দুঃখ বেদনার বিস্মৃতি ছাড়া অশ্রুসিক্ত চোখ নিদ্রাবিভোর হতে পারে না। আশা-ভরসার হাতছানি ব্যতীত বেদনাবিধূর হৃদয়ে আশার আলো জ্বলতে পারে না।

টিকাঃ
৫২. আদ্‌দাওয়াতুল কাবীর, ২/১৮৭
৫৩. দেহের গুরুত্বপূর্ণ একটি গ্রন্থি থাইরয়েড। থাইরয়েড গ্রন্থি একটি এনড্রোক্রাইন গ্ল্যান্ড। এটা মানুষের গলার সামনে অবস্থিত। এখান থেকে থাইরয়েড হরমোন তৈরি হয়। এই হরমোন শরীরের সব রেচন প্রক্রিয়ায় সাহায্য করে। বাচ্চাদের ক্ষেত্রে শারীরিক ও মানসিক বিকাশে বিশেষ ভূমিকা রাখে। থাইরয়েড গ্রন্থি ঠিকমতো কাজ না করলে শারীরিক এবং মানসিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। একটি শিশু যদি ছোটবেলা থেকে এর অভাবে ভোগে, তাহলে সে প্রতিবন্ধী হয়ে বড় হবে। যদি তাকে চিকিৎসা দেওয়া না হয়, সে বুদ্ধি ও শারীরিক প্রতিবন্ধী হয়ে যাবে। আর বড়দের ক্ষেত্রে থাইরয়েড গ্রন্থির বিভিন্ন রকম রোগ হতে পারে। থাইরয়েড যে হরমোন তৈরি করছে, এটি একটি স্বাভাবিক মাত্রার মধ্যে থাকবে। তবে যদি স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে কম তৈরি হয়, একে বলা হয় হাইপোথাইরয়েডিজম।

📘 আল হাল্লু জীবন সমস্যার সমাধান 📄 সড়ক দুর্ঘটনা

📄 সড়ক দুর্ঘটনা


যখন আমরা গাড়ি ড্রাইভ করি, আমাদের সামান্য অসতর্কতার কারণে মুহূর্তেই তা এক যন্ত্রদানব ও মরণাস্ত্রে পরিণত হতে পারে। গাড়িযোগে যে বিনোদন কেন্দ্র কিংবা কর্মস্থলে যাওয়ার কথা ছিল, তার পরিবর্তে আমাদের ঠিকানা হতে পারে (আল্লাহ না করুন) হাসপাতাল কিংবা কবরস্থান। বিশ্বে প্রতিনিয়ত ঘটে চলছে সড়ক দুর্ঘটনা। যন্ত্রদানবের তাণ্ডব প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে শিশু-কিশোর, যুবক-বৃদ্ধ, ছাত্র-ছাত্রী, ব্যবসায়ী ও পেশাজীবী নানা শ্রেণির মানুষের। সড়ক দুর্ঘটনা যেন মানবতার বিরুদ্ধে নীরব যুদ্ধ ও গুপ্তঘাতক। অতি সঙ্গোপনে কী নির্মমভাবে কতশতো মানুষের প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে!

সড়ক দুর্ঘটনার কারণে কত প্রাণ ঝরেছে, তার কোনো ইয়ত্তা নেই। কত রক্ত ঝরেছে, এর কোনো হিসাব নেই। কত পরিবার সমূলে ধ্বংস হয়েছে, কত অর্থ-সম্পদের ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে, এর কোনো হিসাব নেই। এমন বেদনাদায়ক দৃশ্য আমাদের প্রতিনিয়ত দেখতে হয় পত্র-পত্রিকায়, টিভির পর্দায়। হৃদয় কেঁপে উঠে যখন দেখি, একই পরিবারের পাঁচ-ছয়জন একসাথে নিহত হতে। বর্তমান বিশ্বে সড়ক দুর্ঘটনা নিত্যনৈমিত্তিক সংকটের রূপ পরিগ্রহ করেছে। এ সংকটের কবলে মায়েরা সন্তানহারা হচ্ছে। নারীরা বিধবা হচ্ছে। এতিম হচ্ছে সন্তান-সন্ততি। কত লোক অচল হয়ে বিছানায় পড়ে আছে। বিশ্বমানবতার কল্যাণে অবশ্যই আমাদের এ সমস্যা সমাধানের পথ খুঁজে বের করতে হবে। এ সংকট উত্তরণের পথ অবলম্বন করতে হবে।

সমাধান:
১. মা-বাবার পক্ষ থেকে সন্তানদের সতর্ক করতে হবে সড়ক দুর্ঘটনার ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে। তাদের মধ্যে সড়ক-চলাচল ও ট্রাফিক আইন সম্পর্কে সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে।
২. দেশের জনপ্রিয় প্রচার-মাধ্যমগুলোর সাহায্যে রাস্তা পারাপার, সড়ক ও ট্রাফিক আইন-শিক্ষামূলক কার্যক্রম সম্প্রচার করে জনসাধারণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। প্রাথমিক শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার্থীদের রাস্তা পারাপার ও সড়ক আইন সম্পর্কে অবহিত করা কর্তব্য।
৩. ড্রাইভিং লাইসেন্স অনুমোদনের সময় বয়সের বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে। বয়ঃসন্ধিকালের সদ্য তরুণদের ও উঠতি বয়সের ছেলে-মেয়েদের মধ্যে এক ধরনের হেঁয়ালিপনা ও খেয়ালি মানসিকতা প্রবল থাকে। এ বয়সের ছেলে-মেয়েদের হাতে গাড়ির চাবি ও ড্রাইভিং লাইসেন্স তুলে দিলে সড়ক নিরাপত্তা চরম হুমকির মুখে পড়বে।
৪. গাড়িচালকদের জন্য প্রশিক্ষণমূলক কার্যক্রম চালু করতে হবে। যেখানে ভিডিও চিত্র ও বাস্তবে প্রায়োগিক পদ্ধতিতে গাড়ি চালানোর কলাকৌশল এবং সড়ক ও ট্রাফিক আইন-কানুন সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। সঙ্গে সঙ্গে ড্রাইভারদের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার বিষয়ে সুনিশ্চিত হওয়ার জন্য তাদের মেডিকেল সার্টিফিকেট যাচাই করা কর্তব্য।
৫. নিরাপদ ও উন্নত সড়ক-ব্যবস্থা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কয়েকটি মৌলিক পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করতে হবে। * সড়ক নির্মাণ ও এর সুরক্ষার জন্য সর্বাধুনিক উন্নত ইঞ্জিনিয়ারিং প্ল্যান মোতাবেক কাজ করা এবং সময় ও প্রয়োজনানুযায়ী এর সংস্কার ও আধুনিকায়ন করা। * সড়কের দুপাশে পানি নিষ্কাশনের সুব্যবস্থা করা। * সড়কের পাশে গাড়ির সর্বোচ্চ গতি, প্রয়োজনীয় সতর্কতা ও সড়কের পাশে অবস্থিত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান ইত্যাদির দিকনির্দেশনা-সংবলিত ফলক স্থাপন করা। * পথচারীদের পারাপার ও গাড়ি পার্কিংয়ের সুব্যবস্থা করা। * যেকোনো সড়ক দুর্ঘটনায় দ্রুত অ্যাম্বুলেন্স ও চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা। * রাস্তার সংস্কার ও খননকাজ করার সময় ভারি যন্ত্রপাতি ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদি সাবধানে ব্যবহার করা।
৬. যারা সড়ক ও ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন করবে, তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইন প্রণয়ন করতে হবে। অপরাধের গুরুত্ব অনুযায়ী আর্থিক জরিমানা থেকে শুরু করে উপযুক্ত দণ্ডবিধি কার্যকর করতে হবে। যারা সুনির্দিষ্ট মেয়াদ পর্যন্ত ট্রাফিক আইন মেনে চলবে, জনসম্মুখে তাদের পুরস্কৃত করতে হবে। যেমন: কোনো গাড়িচালক সুদীর্ঘ পাঁচ বছর অবধি কোনো সড়ক ও ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন করেনি, রাস্তাঘাটে কোনো অ্যাক্সিডেন্ট করেনি এবং দুর্ঘটনার শিকার হয়নি। এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেননা ব্যক্তি খারাপ কাজ করল, সমাজের কেউ তাকে তিরস্কার করল না; আরেক ব্যক্তি ভালো কাজ করল, কারো পক্ষ থেকে সে পুরস্কৃত হলো না, বুঝতে হবে সমাজে অবক্ষয় চলছে।
৭. যখন যানবাহনে আরোহণ করবেন, দু'আ পড়তে ভুলবেন না। যানবাহনে আরোহণের দু'আ হলো: بِسْمِ اللهِ الْحَمْدُ للهِ، سُبْحَانَ الَّذِي سَخَّرَ لَنَا هَذَا وَمَا كُنَّا لَهُ مُقْرِنِينَ وَإِنَّا إِلَى رَبَّنَا لَمُنْقَلِبُونَ الْحَمْدُ لِلَّهِ الْحَمْدُ لِلَّهِ الْحَمْدُ للهِ اللهُ أَكْبَرُ، اللهُ أَكْبَرُ، اللهُ أَكْبَرُ، اللَّهُ أَكْبَرُ، سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ إِنِّي ظَلَمْتُ نَفْسِي فَاغْفِرْ لِي، فَإِنَّهُ لَا يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلَّا أَنْتَ
৮. প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বন করুন এবং আল্লাহ তা'আলার ওপর ভরসা করুন। এ বিষয়ে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর দিকনির্দেশনা শুনুন: قَالَ رَجُلٌ: يَا رَسُولَ اللَّهِ أَعْقِلُهَا وَأَتَوَكَّلُ، أَوْ أُطْلِقُهَا وَأَتَوَكَّلُ؟ قَالَ: «اعْقِلْهَا وَتَوَكَّلْ» (سنন الترمذي) অর্থ: জনৈক সাহাবি এসে জিজ্ঞেস করলেন: 'ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমি কি উট বেঁধে তার নিরাপত্তার ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলার ওপর ভরসা করব? না কি লাগামহীন ছেড়ে দিয়ে আল্লাহর ওপর ভরসা করব?' রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন: 'প্রথমে তুমি উট বাঁধ, তারপর আল্লাহর ওপর ভরসা কর।' (তিরমিযী, ৪/৬৬৮) সুতরাং আপনি নিজের সাধ্যমতো সতর্কতা অবলম্বন করুন। পথনির্দেশ ও ট্রাফিক সিগন্যাল মেনে চলুন। সড়ক ও ট্রাফিক আইন রক্ষায় প্রতিশ্রুতিশীল হোন।
৯. গাড়ি চালানো ও হেঁটে চলাচল করার ক্ষেত্রে কয়েকটি আইন মেনে চলুন: ট্রাফিক পুলিশের সম্মান বজায় রাখুন। দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে তাকে সহযোগিতা করুন। অনর্থক হর্ন বাজিয়ে শব্দ দূষণ সৃষ্টি করা থেকে বিরত থাকুন। সড়ক অনুযায়ী গাড়ির নির্দিষ্ট গতিসীমা বজায় রাখুন। রাস্তায় ময়লা-আবর্জনা ফেলা থেকে বিরত থাকুন। কষ্টদায়ক বস্তু দেখলে সরিয়ে ফেলুন।
১০. অহংকার ও দাম্ভিকতাপূর্ণ চাল ছেড়ে বিনম্রভাবে চলাচল করুন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলার নির্দেশ: ﴿وَلَا تَمْشِ فِي الْأَرْضِ مَرَحًا إِنَّكَ لَنْ تَخْرِقَ الْأَرْضَ وَلَنْ تَبْلُغَ الْجِبَالَ طُولًا﴾ [الإسراء: ٣٧] অর্থ: 'ভূপৃষ্ঠে দম্ভভরে চলো না। তুমি তো ভূমিকে ফাটিয়ে ফেলতে পারবে না এবং উচ্চতায় পাহাড় পর্যন্ত পৌঁছতে পারবে না। (বনী ইসরাঈল, ১৭: ৩৭)
১১. আপনি যদি পায়ে হেঁটে যাত্রা করেন, তাহলে দুর্ঘটনা এড়ানোর জন্যে রাস্তার পাশে কিংবা পথচারীদের জন্য নির্ধারিত পথে যাতায়াত করুন। রাস্তা পার হওয়ার সময় সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করুন। তড়িঘড়ি করে রাস্তা পার হওয়ার প্রবণতা ছেড়ে ট্রাফিক সিগন্যালের অপেক্ষা করুন।
১২. গাড়ি চালানোর সময় অবশ্যই মনে রাখতে হবে, যাত্রীদের সুরক্ষা ও নিরাপত্তা আপনার প্রধান কর্তব্য, মহাগুরুত্বপূর্ণ আমানত। আপনার সামান্য অবহেলায় অসতর্কতায় যাত্রীদের জান-মাল বিরাট ঝুঁকির কবলে পড়তে পারে। মারাত্মক দুর্ঘটনার শিকার হতে পারে।
১৩. নেশাগ্রস্ত, মানসিক ভারসাম্যহীন, নিদ্রাকাতর, ক্লান্তশ্রান্ত, ভীষণ মানসিক যন্ত্রণায় পীড়িত, দৃষ্টি ও শ্রবণশক্তি দুর্বল ইত্যাদি প্রতিকূল অবস্থায়-যা আপনার ও যাত্রীদের জীবন ঝুঁকিতে ফেলতে পারে-গাড়ি চালানো থেকে বিরত থাকতে হবে।
১৪. রাতে গাড়ি চালাতে হলে ফ্লাগলাইট, পেছনের লাল-বাতি, হলুদ বাতি ঠিক আছে কি না, নিশ্চিত হোন। এ বাতিগুলোর সাহায্যেই অন্যান্য গাড়ির চালকগণ আপনার গতিবিধি বুঝতে পারবে। রাতে রাস্তায় চলাচল করতে হলে উজ্জ্বল রঙের জামা পরিধান করুন। যেন গাড়ির চালকরা সহজেই আপনার উপস্থিতি লক্ষ করতে পারে।
১৫. নিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে গাড়ির ফিটনেস যাচাই করুন। এ বিষয়ে আপনার সামান্য অবহেলা ও গাড়ির ফিটনেসের ঘাটতি বড় ধরনের বিপদ ডেকে আনতে পারে। গাড়ি মেরামতের প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদি সাথেই রাখুন। যেন পথিমধ্যে আকস্মিক সমস্যাগুলোতে গাড়ির প্রাথমিক মেরামত নিজেই সেরে ফেলতে পারেন।
১৬. গাড়ি চালানোর সময় অন্য সমস্ত চিন্তা-ভাবনা বাদ দিয়ে সামনের রাস্তায় মনোযোগ ও দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখুন। আপনার সামনে চলন্ত গাড়ির সাথে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখুন।
১৭. গাড়ি চালানোর সময় বিশেষভাবে মোবাইলে কথাবার্তা কিংবা কোনো যাত্রীর সাথে আলাপ-আলোচনা থেকে বিরত থাকুন।
১৮. সুনির্দিষ্ট সিগন্যালের সাহায্যে অন্য চালকদের আপনার গতিবিধির জানান দিন। যেমন: ডানে-বায়ে মোড় নেওয়ার সময় কিংবা গাড়ি থামানোর সময় সিগন্যাল দিয়ে পেছনের চালকদের সতর্ক করুন। অতিরিক্ত গতি বাড়িয়ে সামনের গাড়িগুলোকে ওভারটেক করার চেষ্টা করবেন না। পেছনের গাড়ি আপনার আগে চলে যাওয়ার কারণে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হবেন না।
১৯. সড়ক দুর্ঘটনার সময় কৌতূহলজনিত ভিড় না করে নিরাপত্তা ও মেডিকেলকর্মীদের উদ্ধারকাজে সহযোগিতা করুন। আহত-নিহতে সাহায্যে এগিয়ে আসুন। এ সময় কৌতূহলী জনতার অযাচিত ভিড় উদ্ধারকর্মীদের কাজে ব্যাঘাত সৃষ্টি করে। এমন গুরুতর মানবিক বিপর্যয়ের মুহূর্তে বিপদগ্রস্ত লোকদের সাহায্য-সহযোগিতায় এগিয়ে না এসে তাদের ছবি ও ভিডিও চিত্র ধারণ করে প্রচার করা কোনোভাবেই সমীচীন নয়।

পরিশিষ্ট:
* ব্রিজেট ড্রস্কল বিশ্বে প্রথম ব্যক্তি, যিনি সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান। দুর্ঘটনাটা ঘটেছিল ১৮৯৬ সালের ১৭ আগস্ট লন্ডন শহরে। তিনি ছিলেন দু' সন্তানের জননী। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স ছিল ৪৪ বছর। সড়ক দুর্ঘটনাটি ঘটার সময় তিনি ঘণ্টায় ১২ কিলোমিটার বেগে গাড়ি চালাচ্ছিলেন। জানা যায়, তখনকার যুগে কেউ সাধারণত ছয় কিলোমিটারের চেয়ে বেশি গতিতে গাড়ি চালাত না। সড়ক দুর্ঘটনায় ব্রিজট ড্রস্কনের মৃত্যুর পর জনৈক গবেষক লোকদের সতর্ক করে বলেছিলেন, 'ভবিষ্যতে যেন এমন দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি না হয়।' তাঁর এমন কঠোর সতর্কবাণীর পরও সড়ক দুর্ঘটনায় কত লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে, আজও ঘটছে, তার কোনো হিসাব নেই।
* আমেরিকান প্রবাদ: 'কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে চিরদিনের জন্য না পৌঁছানোর চেয়ে সাময়িক গন্তব্যে একটু বিলম্বে পৌঁছাই শ্রেয়।'

📘 আল হাল্লু জীবন সমস্যার সমাধান 📄 অবসর

📄 অবসর


লেখাপড়া ও কাজকর্মের মধ্যে যে ছুটি ও কর্মবিরতি থাকে, তাই অবসর। পেশা ও দায়িত্বের তারতম্যভেদে আমাদের অবসরও কম-বেশি হয়ে থাকে। অবসর নিয়ে মানুষের বিচিত্র অনুভূতি। কেউ কাজ ছাড়া, ব্যস্ততা ছাড়া একদণ্ড বসে থাকতে পারে না। কেউ বা আবার অধীর আগ্রহে ছুটি ও অবসরের প্রতীক্ষায় দিন গুনতে থাকে।

ছুটি, কর্মবিরতি ও অবসর-যাই বলেন না কেন-এর মূল উদ্দেশ্য হলো, শিক্ষাজীবন ও কর্মজীবনের দায়দায়িত্বের একঘেয়েমি দূর করে, বিশ্রাম ও আনন্দ-বিনোদনের সুযোগ দিয়ে নব উদ্যম-উদ্দীপনা সৃষ্টি করা। অবসর হলো বৈধ আনন্দ-বিনোদন উপভোগের এবং নিজের কল্যাণে, দশের কল্যাণে কাজ করার এক সুবর্ণ সুযোগ। তা না করে ব্যক্তি যদি ঘরকুনো হয়ে একাকীত্ব ও নিঃসঙ্গতায় ডুবে থাকে, কিংবা অসৎ সঙ্গদোষে নানা অন্যায়-অপকর্মে, পাপাচারে-অনাচারে লিপ্ত হয়ে পড়ে, তাহলে অবসর তার অকল্যাণ ও ক্ষতির কারণ।

এমন কত ব্যক্তি আছে, যারা অবসরের সুযোগে বিপথে পা বাড়িয়েছে। এরপর কর্মজীবনের মতো ব্যস্ততা তাদের সুপথে ফিরিয়ে আনতে পারেনি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শত বিচ্যুতি ও পদস্খলন তার ভ্রষ্টতার চূড়ান্ত করে ছেড়েছে। কত লোক অবসরে নিঃসঙ্গতা ও একাকিত্বে নানা জল্পনা-কল্পনার শিকার হয়েছে। উদ্ভট চিন্তা-চেতনায় বিপথগামী হয়েছে। আমরা যদি অবসরের সুফল ভোগ করতে চাই, এর ক্ষতি ও অকল্যাণ থেকে বাঁচতে চাই, তাহলে অবশ্যই তা যথাযথভাবে কাজে লাগানোর উপায় খুঁজে বের করতে হবে।

সমাধান:
১. অবসর পেলে দু'রাকাত নামায আদায় করুন। কিছুক্ষণ যিকির করুন। ভালো বই পড়ুন। পরিবারের সঙ্গে সময় কাটান। আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবের বাড়ীতে বেড়াতে যান। কিংবা পবিত্র কুরআনের কয়েকটি আয়াত মুখস্থ করে ফেলুন। অবসরের মুহূর্তে এ আমলগুলো আপনার জীবনের শ্রেষ্ঠ পুঁজি এবং আল্লাহ তা'আলার নৈকট্য ও সন্তুষ্টি অর্জনের অন্যতম উপায়।
২. সময়মতো জামাতের সাথে পাঁচওয়াক্ত নামাযে যত্নবান হোন। বেশি বেশি আল্লাহর যিকির করুন। শিক্ষা ও জ্ঞান চর্চায় নিমগ্ন থাকুন। ওলামায়ে কিরাম, জ্ঞানী-গুণী ও সফল আশাবাদী ব্যক্তিদের সংস্পর্শে থাকুন। অবসরে নিঃসঙ্গতা ও একাকিত্বের কাছে আত্মসমর্পণ করে নিজেকে জল্পনা-কল্পনা ও উদ্ভট ধ্যান-ধারণার কাছে সঁপে দিবেন না। কবি আবুল আতাহিয়া বলেছেন: 'কল্যাণ অর্জনের জন্য কর্মব্যস্ততাই শ্রেয়। আর অবসর তো যত অনর্থক কথাবার্তা ও গুজব-রটা গালগল্পের আখড়া।'
৩. একটি দৈনন্দিন রুটিন তৈরি করুন। প্রতিটি কাজ রুটিনমাফিক সময়মতো সম্পন্ন করুন। কোনো কাজে অবহেলা করা, এক মুহূর্ত বিলম্ব করা সমীচীন নয়। কাজে বিলম্ব করার প্রবণতা সময়ের সুফল লাভের সুযোগ নষ্ট করে ফেলে।
৪. অবসরে স্বপ্নবান, প্রজ্ঞাবান ও জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তিদের সংস্পর্শে থাকুন। তাঁদের সংস্পর্শ আপনাকে সময়ের সদ্ব্যবহারে অনুপ্রাণিত করবে। অলস, হিংসুক, পশ্চাদপদ ও নিরাশাবাদী লোকের সঙ্গ ত্যাগ করুন। বিভিন্ন সামাজিক ও জনকল্যাণমূলক কাজে অংশগ্রহণ করুন। মহৎ হিতবাদী উদ্যোগ বাস্তবায়ন করুন।
৫. কর্মজীবনের গতানুগতিক কর্মধারার বাইরে, শিক্ষাজীবনের একঘেয়েমি সিলেবাসের চাপমুক্ত অবসরের সময়টা আপনার জীবনের সুবর্ণ সুযোগ। এ সুযোগ আপনি ব্যক্তিগত পঠন-পাঠন, জ্ঞান চর্চা, ব্যক্তিত্ব গঠন ও মানবিক মূল্যবোধের পরিচর্যায় কাজে লাগান। এ লক্ষ্যে কোনো বিজ্ঞ আলেমে দ্বীনের তত্ত্বাবধানে শিক্ষা-দীক্ষামূলক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করুন। এ জাতীয় কার্যক্রম আপনার জ্ঞান-বিদ্যা, বোধ-উপলব্ধি ও চিন্তা-চেতনার জগৎকে আরও ঋদ্ধ-সমৃদ্ধ করবে। মহান আল্লাহ তা'আলার সৃষ্টি-রহস্য সম্পর্কে চিন্তা-ফিকির করুন। আপনার ঈমান বৃদ্ধি পাবে। অথবা নিজের জীবন ও ব্যক্তিত্বকে আরও সুন্দর সাফল্যমণ্ডিত করার ব্যাপারে চিন্তা-ফিকির করুন।
৬. একটি দ্বীনি আমল শেষ করার পর কোনো জাগতিক প্রয়োজনীয় কাজ করুন। একটা ব্যক্তিগত কাজ করার পর পারিবারিক কাজে সাহায্য করুন। অবসরে ঘর-দোর ও বাসাবাড়ির খোঁজ-খবর নিন। যা মেরামত করা প্রয়োজন, তা মেরামত করুন। যা গোছানো দরকার, গুছিয়ে রাখুন। এক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ ﷺ হলেন আপনার শ্রেষ্ঠ আদর্শ। তিনি নিজ হাতে জুতা সেলাই করতেন। কাপড়ে তালি লাগাতেন, বকরির দুধ দোহন করতেন। জীবনের একটি মুহূর্তও তাঁর কর্মহীন অবসর ছিল না। (পবিত্র কুরআনের ভাষায়): ﴿فَإِذَا فَرَغْتَ فَانْصَبْ * وَإِلَى رَبِّكَ فَأَرْغَبُ ﴾ [الشرح: ٧، ٨] অর্থ: 'সুতরাং তুমি যখন অবসর পাও, তখন (ইবাদতে) নিজেকে পরিশ্রান্ত কর। এবং নিজ প্রতিপালকের প্রতি মনোযোগী হও।' (শাহর, ৯৪: ৭, ৮)
৭. ঘরে বসে দীর্ঘ অবসর না কাটিয়ে কোনো ক্রীড়াসংঘে যুক্ত হোন। তাদের বিভিন্ন ধরনের শরীরচর্চা ও খেলাধুলায় অংশগ্রহণ করুন। এতে আপনার দৈহিক ও মানসিক উদ্দীপনা অটুট থাকবে।
৮. অবসরে সময়-সুযোগ পেয়ে, বাড়িতে মুখরোচক খাবারের সমাহার দেখে অতি ভোজনে অভ্যস্ত হয়ে পড়বেন না। কায়িক পরিশ্রমহীন অবসর ও অতি ভোজন আপনার ওজন বাড়িয়ে দিবে। সঙ্গে সঙ্গে অলসতা দুর্বলতা দানা বাঁধতে শুরু করবে। রাতে সকাল সকাল ঘুমিয়ে পড়ুন। দীর্ঘ রাতজাগা থেকে বিরত থাকুন। নিয়মিত পর্যাপ্ত ঘুমের জন্য একটা রুটিন করে নিন। প্রতিদিন রুটিনমাফিক ঘুমান; কম না, বেশিও না।
৯. জীবনে যদি সুস্থতার নিয়ামত ও অবসরের সুযোগ লাভ করেন, তাহলে এটা আপনার জন্য সুবর্ণ সুযোগ ও বিরাট নিয়ামত। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে আখিরাতের পুঁজি সঞ্চয় করুন। জাগতিক কাজকর্ম সম্পন্ন করুন। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "نِعْمَتَانِ مَغْبُونٌ فِيهِمَا كَثِيرٌ مِنَ النَّاسِ: الصَّحَةُ وَالفَرَاغُ " (صحيح البخاري) অর্থ: 'দুটি নিয়ামত, অনেক মানুষ তা যথাযথভাবে কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়েছে। সুস্থতা ও অবসর।' (বুখারী, ৮/৮৮) সুতরাং সময়ের গুরুত্ব অনুধাবন করে এর সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার করুন। সময়ের প্রতি অবহেলা ও গুরুত্বহীনতা আপনাকে ব্যর্থতার পথে ঠেলে দিবে। মনে হবে, আগামীকাল তো আজকের মতোই, গতকালকের মতোই গতানুগতিক। তাতে নতুনত্ব ও বৈচিত্র্যের কী আছে? কিন্তু যে সময়ের গুরুত্ব বোঝে, অবসর কাজে লাগায়, তার কাছে প্রতিটা ভোরের সূর্যই অপার সম্ভাবনাময়। প্রতিটা দিনের আলো সফলতা অর্জনের প্রেরণা।
১০. প্রাতিষ্ঠানিক কর্মমুখর দিন আর অবসর দিনের কার্যধারার মধ্যে বিস্তর ফারাক। তাই ছুটির দিনগুলোর জন্য ভিন্ন রুটিন করুন। প্রতিদিন সকালে উঠে নিজ দায়িত্ব ও কর্তব্য ঠিক করে নিন। এ রুটিন আপনাকে কর্তব্য পালনে সজাগ সচেতন করবে। মনে রাখবেন, আপনি কর্মবিমুখ হয়ে থেমে থাকুন, কিংবা দায়িত্বে অবহেলা করে মন্থর গতিতে চলুন, সময় কিন্তু থেমে নেই; আপন গতিতে ছুটে চলছে। তাই প্রতিটি মুহূর্তের সদ্ব্যবহার করার চেষ্টা করুন। অন্যথায় সময়-সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যাবে। আপনার কপালে জুটবে শুধু আফসোস অনুতাপ।
১১. গতানুগতিক জীবনধারা পরিবর্তন করুন। লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ঠিক রেখে চিন্তাধারায় নতুনত্ব ও বৈচিত্র্য আনুন। যেমন: স্থান পরিবর্তন করুন। নতুন কোনো জায়গায় বেড়াতে যান। পাঠ্যপুস্তকের বাইরে ভিন্ন ধারার বইপত্র পাঠ করুন। একই ধারার চিন্তা-ভাবনার বাইরে নতুন সৃষ্টিশীল বিদ্যা-বুদ্ধির চর্চা করুন। এতে গদবাঁধা জীবনের বিরক্তিকর গুমোট ভাব দূর হয়ে জীবন নতুনত্ব ও বৈচিত্র্যের রঙে রঞ্জিত হবে। নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত পাওলো কোয়েলহো বলেন: 'মানুষের প্রতিটা দিন যদি একইভাবে, একই ধারায় অতিবাহিত হতে থাকে, তাহলে এর অর্থ হলো, তারা নতুন কিছু ভাবতে ভুলে গেছে; নতুন কিছু করতে ভুলে গেছে।'
১২. অবসর ও ছুটির সময়টা যদি সুপরিকল্পনা মাফিক না কাটান, তাহলে এর পরিণতির কথা একবার ভাবুন-বিরক্তি, অস্বস্তি, অলসতা, কর্মবিমুখতা, বিষণ্ণতা ও দুশ্চিন্তা আপনাকে ঘিরে ধরবে। পরবর্তী জীবনে অবসরের সুযোগ হাতছাড়া করার কারণে সম্ভাবনাময় কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হওয়ার আফসোস-অনুতাপ করতে হবে। হাফেজ ইবনুল কাইয়্যিম জাওযী (রহ.) (৬৯১-৭৫১ হি.) বলেছেন: 'নিজেকে যদি সত্য ও ন্যায়ের পথে অবিচল রাখতে না পার, অসত্য ও অন্যায় তোমার ওপর জেঁকে বসবে।'
১৩. নিজের মধ্যে প্রতিযোগিতামূলক মানসিকতা লালন করুন। জীবনের প্রতিটি মুহূর্তের সদ্‌ব্যবহার করে উন্নতি-অগ্রগতি সাধনে সচেষ্ট থাকুন। হিজরতের প্রেক্ষাপটে আল্লাহ তা'আলা অগ্রগামী মুহাজিরদের প্রশংসা করে বলেছেন: وَالسَّبِقُونَ الْأَوَّلُونَ مِنَ الْمُهَاجِرِينَ وَالْأَنْصَارِ وَالَّذِينَ اتَّبَعُوهُمْ بِإِحْسَانٍ * رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ وَأَعَدَّ لَهُمْ جَنَّتٍ تَجْرِي تَحْتَهَا الْأَنْهُرُ خُلِدِينَ فِيهَا أَبَدًا ذَلِكَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ﴾ [التوبة: ١٠٠] অর্থ: 'মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে যারা প্রথমে ঈমান এনেছে এবং যারা নিষ্ঠার সাথে তাদের অনুসরণ করেছে, আল্লাহ তাদের সকলের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছে। আল্লাহ তাদের জন্য এমন উদ্যানরাজি তৈরি করে রেখেছেন, যার তলদেশে নহর বহমান। তাতে তারা সর্বদা থাকবে। এটাই মহা সাফল্য।' (তাওবা, ৯: ১০০) কল্যাণ অর্জনে সচেষ্ট হওয়ার ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: احْرِصْ عَلَى مَا يَنْفَعُكَ، (مسند الحميدي) অর্থ: 'যা তোমার জন্য মঙ্গলজনক তা অর্জনে সচেষ্ট হও, এবং আল্লাহ তা'আলার নিকট সাহায্য প্রার্থনা করো।' (মুসনাদুল হুমায়দী, ২/২৬৭)
১৪. 'আল-হামদুলিল্লাহ' এক সেকেন্ডেই বলা যায়। এক সেকেন্ডের এ আমলটিই মিযানের পাল্লা ভারি করে দেয়। 'মুসলিম' শরীফের হাদীসে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: 'আল-হামদুলিল্লাহ মিযানের পাল্লা পূর্ণ করে দেয়।' খুব স্বল্প সময়ে একশতবার সুবহানাল্লাহ পাঠ করা যায়। যে ব্যক্তি তা পাঠ করবে সে একশত সওয়াব হাসিল করতে পারবে। এবার একটু চিন্তা করে দেখুন, অবসরের কত সময় আমাদের অযথা কথাবার্তা ও অনর্থক কাজেকর্মে ব্যয় হয়েছে।

পরিশিষ্ট:
আমিরুল মু'মিনীন ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) বলেছেন: 'আল্লাহ তা'আলা হাত দু'টি সৃষ্টি করেছেন কাজ করার জন্য। তা যদি ভালো কাজে নিয়োজিত না থাকে, তাহলে গুনাহ ও নাফরমানিতে লিপ্ত হবে। সুতরাং হাত দু'টিকে ন্যায় ও কল্যাণের স্বার্থে কাজে লাগান। অন্যায়-অন্যায্য থেকে বিরত থাকুন।'

ফরাসি লেখক ও দার্শনিক ভলতেয়ার (১৬৯৪-১৭৭৮ খ্রিষ্টাব্দ) বলেছেন: 'সময় নষ্ট করার চারটা পথ: অবসর, অবহেলা, খারাপ কাজ ও সময়ের কর্তব্য সময়ে পালন না করা।'

'অবসর সময়ে ঘরকুনো হয়ে গুমরে পড়ে থাকা আত্মহত্যার পথে ধাবিত করে।'-ড. আয়েয করনী

হাফেজ ইবনুল কাইয়্যিম জাওযী (রহ.) (৬৯১-৭৫১ হি.) বলেছেন: 'শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়াহ (রহ.) অন্যদের কাজেকর্মে সাহায্য-সহযোগিতা করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত সচেষ্ট ছিলেন। কেননা তিনি জানতেন, যে অন্যকে সাহায্য করে, আল্লাহ তাকে সাহায্য করেন। তাইতো অলস-অকর্মা লোকদের দেখবে, তারা বিষণ্ণ, চিন্তাক্লিষ্ট, উদ্যমহীন ও কর্মবিমুখ। কিন্তু যারা কর্মব্যস্ত উদ্যমী, তারা গুরুত্বপূর্ণ সব বিষয়েই সমান তৎপর।'

ঈসা বিন যায়েদ মারাকি নিজের ঘটনার বর্ণনা করেন: 'আমার এক গোলাম ছিল। আল্লাহর যমীনে তার মতো অলস-অকর্মা আমি দ্বিতীয়টি দেখিনি। একদিন তাকে বাজারে পাঠালাম আঙুর ও ডুমুর ফল কিনে আনতে। সে যখন বাজার থেকে ফিরে এসেছে, অনেক দেরি হয়ে গেছে। তার ওপর শুধু আঙুর নিয়ে এসেছে; ডুমুর ফল আনেনি। বললাম: 'এমনিতেই তুমি দেরি করে এসেছ। তার ওপর দু'টি কাজের কথা বলেছিলাম, করেছ একটা।' এ অপরাধে তাকে শাস্তি দিলাম-আজ থেকে তোমার দায়িত্ব হলো, তোমাকে একটা কাজের কথা বললে দু'টা কাজ করবে। এর কিছুদিন পরই আমি অসুস্থ হয়ে পড়ি। গোলামকে পাঠাই একজন ডাক্তার ডেকে আনতে। সে যখন ফিরে এসেছে, তার সাথে আরও একজন লোক। গোলামকে জিজ্ঞেস করলাম: 'এ ডাক্তার সাহেবকে তো আমি চিনি। তার সাথে এই লোকটা কে?' গোলাম বলল: 'ডাক্তার আপনার চিকিৎসা করবে। চিকিৎসায় যদি কাজ না হয়, এবং (আল্লাহ না করুন) যদি আপনার মৃত্যু হয়, তাহলে এই লোকটা আপনার কবর খননের কাজ করবে।'

📘 আল হাল্লু জীবন সমস্যার সমাধান 📄 অপচয়

📄 অপচয়


যেকোনো বস্তুর অপব্যবহার, অপাত্রে ব্যবহার ও মাত্রাতিরিক্ত ব্যয়কেই অপচয়-অপব্যয় বলা হয়। এখানে আলোচনার উদ্দেশ্য হলো অর্থের অপচয়। মানুষ যখন কোনো আর্থিক বিচারবুদ্ধি ছাড়া, যাচ্ছেতাইভাবে, সাধ্য ও সামর্থ্যের সীমা ছাড়িয়ে অর্থ ব্যয় করতে থাকে, তখন এটাকে অপচয় বলে। এমতাবস্থায় তার কাছে অর্থ-সম্পদের কোনো মূল্য থাকে না। কারণে-অকারণে, প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে লাগামহীনভাবে অর্থব্যয় করতে থাকে। মানুষ এটা করতে পারে, যখন সে নিজেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ ও স্বাবলম্বীভাবে। সঞ্চিত অর্থ আয়ের উৎসটাকে নিজের রক্ষক ও সহায়ক বলে বিশ্বাস করে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: كَلَّا إِنَّ الْإِنْسَانَ لَيَطْغَى أَنْ رَّاهُ اسْتَغْنَى﴾ [العلق: ٦، ٧] অর্থ: 'বস্তুত মানুষ প্রকাশ্য অবাধ্যতা করছে। কেননা সে নিজেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ মনে করে।' (আলাক, ৯৬: ৬-৭)

একটি জাতির উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত-যেকোনো শ্রেণির মধ্যে অপচয়প্রবণতা দেখা দিতে পারে। তবে সাধারণত উচ্চবিত্ত শ্রেণির মধ্যেই ভোগবিলাস ও অপচয়প্রবণতা প্রকট আকার ধারণ করে। ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজে সর্বক্ষেত্রেই অপচয়ের সূত্র ধরে বিশৃঙ্খলা ও বৈষম্য মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। কারণ, অপচয় হয়ে থাকে মূলত অন্যের হক নষ্ট করে, কারো অধিকার ক্ষুণ্ণ করে। সমাজবিজ্ঞানী ও ইতিহাসবিদদের স্বীকৃত অভিমত হলো, কোনো জাতির অপচয়-অপব্যয় ও ভোগ-বিলাসিতার যখন চূড়ান্ত হয়, তাদের নৈতিক অবক্ষয়, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় বিপর্যয় অনিবার্য। পবিত্র কুরআনে এর সুস্পষ্ট প্রমাণ বিদ্যমান। আল্লাহ তা'আলা বলেন: ﴿وَإِذَا أَرَدْنَا أَنْ تُهْلِكَ قَرْيَةً أَمَرْنَا مُتْرَفِيهَا فَفَسَقُوا فِيهَا فَحَقَّ عَلَيْهَا الْقَوْلُ فَدَمَّرْ نَهَا تَدْمِيرًا﴾ [الإসراء: ١٦] অর্থ: 'আমি যখন কোন জনবসতিকে ধ্বংস করতে চাই তখন তাদের সচ্ছল ব্যক্তিদেরকে আদেশ করি (আমার আদেশ মেনে চলার জন্য)। কিন্তু তারা অবাধ্যতা করতে থাকে। তখন সে জনবসতির প্রতি আমার আযাবের ফায়সালা সাব্যস্ত হয়ে যায়। তখন আমি তা সম্পূর্ণরূপে বিধ্বস্ত করে দেই।' (ইসরাঈল, ১৭: ১৬)

সুতরাং কোনো জাতি যদি অধঃপতন ও ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পেতে চায়, অবশ্যই তাকে অপচয়, অপব্যয়ের পথ থেকে ফিরে আসতে হবে। কিন্তু এর উপায় কী? এক্ষেত্রে যথার্থ করণীয় কী?

সমাধান:
১. অপচয় সম্পর্কে, অপব্যয়ের ক্ষতি ও পরিণতি সম্পর্কে কুরআন-সুন্নাহ কী বলেছে, এ সংকট নিরসনে কুরআন-সুন্নাহর দিকনির্দেশনা কী-এ সম্পর্কে জানুন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা অপচয়কারীদের সম্পর্কে বলেছেন: ﴿إِنَّ الْمُبَذِّرِينَ كَانُوا إِخْوَانَ الشَّيْطِينِ وَكَانَ الشَّيْطَنُ لِرَبِّهِ كَفُورًا﴾ [الإسراء: ٢٧] অর্থ: 'নিশ্চয় অপব্যয়কারীরা শয়তানের ভাই। আর শয়তান তার রবের প্রতি খুবই অকৃতজ্ঞ।' (বনী ইসরাঈল, ১৭: ২৭)
২. মনে রাখুন, অর্থ-সম্পদ ও সহায়-সম্পত্তির কোনোটাই আপনার চিরস্থায়ী মালিকানাধীন নয়। অন্যের হাত ঘুরে তা যেমন আপনার মালিকানাধীন হয়েছে, আপনার হাত ঘুরেও অন্যের মালিকানায় চলে যাবে। প্রখ্যাত মুসলিম সমাজবিজ্ঞানী ইবনে খালদুন (১৩৩২-১৪০৬ খৃষ্টাব্দ) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ 'মুকাদ্দিমা ইবনে খালদুন'-এ লিখেছেন: 'অপচয়-অপব্যয় ও ভোগবিলাস যেকোনো জাতি ও রাজ্যকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়।' পবিত্র কুরআনের আয়াত এর প্রকৃষ্ট প্রমাণ। আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: ﴿وَإِذَا أَرَدْنَا أَنْ تُهْلِكَ قَرْيَةً أَمَرْنَا مُتْرَفِيهَا فَفَسَقُوا فِيهَا فَحَقَّ عَلَيْهَا الْقَوْلُ فَدَمَّرْنَاهَا تَدْمِيرًا﴾ [الإسراء: ١٦] অর্থ: 'আমি যখন কোন জনবসতিকে ধ্বংস করতে চাই তখন তাদের সচ্ছল ব্যক্তিদেরকে আদেশ করি (আমার আদেশ মেনে চলার জন্য)। কিন্তু তারা অবাধ্যতা করতে থাকে। তখন সে জনবসতির প্রতি আমার আযাবের ফায়সালা সাব্যস্ত হয়ে যায়। তখন আমি তা সম্পূর্ণরূপে বিধ্বস্ত করে দেই।' (ইসরাঈল, ১৭: ১৬)
৩. আর্থিক সচ্ছলতা ও প্রাচুর্যের বলে আপনি যেভাবে ইচ্ছা ব্যয় করছেন, শখ-শৌখিনতা ও ভোগ-বিলাসের ষোলোআনা পূর্ণ করছেন; কিন্তু একটিবারও কি ভেবেছেন, সমাজের কত লোক এখনও দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে? কত পরিবার দু'বেলা খেতে পায় না? কত নিঃস্ব, হতদরিদ্র আপনার সাহায্যের মুখাপেক্ষী? মুস্তফা মানফালুতী যথার্থ বলেছেন: مَا رَأَيْتُ مُسْرِفًا مُتْرَفًا إِلَّا وَجَدْتُ بِجَانِبِهِ بَائِسًا جَائِعًا. অর্থ: 'প্রত্যেক অপব্যয়ী, বিলাসী ব্যক্তির পাশে একজন ক্ষুধার্ত হতদরিদ্রকে দেখতে পাই।'
৪. অপচয়-অপব্যয়ের পরিণতি সম্পর্কে চিন্তা করুন। শরীর-স্বাস্থ্য, মন-মানসিকতার ওপর এর ক্ষতিকর প্রভাব এবং আর্থসামাজিক বৈষম্য ও বিশৃঙ্খলার বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করুন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলার নির্দেশ: ﴿وَكُلُوا وَاشْرَبُوا وَلَا تُسْرِفُوا إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الْمُسْرِفِينَ﴾ অর্থ: 'আর খাও, পান কর কিন্তু অপচয় করো না, অবশ্যই তিনি অপচয়কারীদেরকে পছন্দ করেন না।' (আ'রাফ, ৭: ৩১)
৫. ব্যক্তিগতভাবে ও পারিবারিকভাবে একটি সুষ্ঠু, ভারসাম্যপূর্ণ ও মধ্যপন্থার অর্থনীতি মেনে চলুন। সুখী ও নিরাপদ জীবনযাপন করতে পারবেন। এ দিকনির্দেশনা পবিত্র কুরআনের: وَلَا تَجْعَلْ يَدَكَ مَغْلُولَةً إِلَى عُنُقِكَ وَلَا تَبْسُطُهَا كُلَّ الْبَسْطِ فَتَقْعُدَ مَلُومًا مَّحْسُورًا﴾ [الإسراء: ٢٩] অর্থ: '(কৃপণতাবশে) তোমার হাতকে তোমার গলার সাথে বেঁধে দিও না, আর (অপব্যয়ী হয়ে) তা একেবারে প্রসারিত করেও দিওনা, তা করলে তুমি তিরস্কৃত ও নিঃস্ব হয়ে বসে পড়বে।' (বনী ইসরাঈল, ১৭: ২৯)
৬. স্ত্রী, ছেলে-মেয়ে-তারা যদি বিচক্ষণ বুদ্ধিমান না হয়, সাংসারিক বোধ-বুদ্ধিতে পাকাপোক্ত না হয়, তাহলে তাদের হাতে প্রয়োজনের অতিরিক্ত অর্থ দেওয়া সমীচীন নয়। কেননা সম্পদ হলো আপনার হাতে আমানত। এ সম্পর্কে পবিত্র কুরআনের দিকনির্দেশনা শুনুন: وَلَا تُؤْتُوا السُّفَهَاءَ أَمْوَالَكُمُ الَّتِي جَعَلَ اللَّهُ لَكُمْ قِيمًا وَارْزُقُوهُمْ فِيهَا وَاكْسُوهُمْ وَقُولُوا لَهُمْ قَوْلًا مَّعْرُوفًا﴾ [النساء : ٥] অর্থ: 'তোমরা অবুঝ (ইয়াতীম)দের কাছে নিজেদের সেই সম্পদ অর্পণ করো না, যাকে আল্লাহ তোমাদের জন্য জীবনের অবলম্বন বানিয়েছেন। তবে তাদেরকে তা থেকে খাওয়াও পরাও আর তাদের সাথে ন্যায়সঙ্গতভাবে কথা বল।' (নিসা, ৪: ৫)
৭. খরচ করার আগে অপব্যয় হবে কি না এবং খরচ করার পর অপচয় হলো কি না-বিষয়টি যাচাই করে দেখুন। অবহেলা, অযত্নে সম্পদ নষ্ট করা বাঞ্ছনীয় নয়। কেননা অর্থ-সম্পদ সংরক্ষণে অবহেলা সমাজে ধোঁকা প্রতারণা চৌর্যবৃত্তির পথ খুলে দেয়।
৮. মনে রাখবেন, আপনার অর্থ-সম্পদ ও আয়-ব্যয় সম্পর্কে কিয়ামতের দিন জিজ্ঞেস করা হবে। তাই আপন রবের নিকট হিসাব দেওয়ার পূর্বে নিজেই নিজেকে জবাবদিহিতার কাঠগড়ায় দাঁড় করান। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: لَا تَزُولُ قَدَمَا ابْنِ آدَمَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ حَتَّى يُسْأَلَ عَنْ خَمْسٍ: عَنْ عُمْرِكَ فِيمَا أَفْنَيْتَ، وَعَنْ شَبَابِكَ فِيمَا أَبْلَيْتَ، وَعَنْ مَالِكَ مِنْ أَيْنَ كَسَبْتَهُ وَفِيمَا أَنْفَقْتَهُ، وَمَا عَمِلْتَ فِيمَا عَلِمْتَ" (مسند أبي يعلى) অর্থ: 'কিয়ামত দিবসে আদম সন্তানের পা নড়তে পারবে না, যতক্ষণ না তাকে পাঁচটি বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়: তার জীবন সম্পর্কে, কী কাজে তুমি তোমার জীবন নিঃশেষ করেছ? তার যৌবন সম্পর্কে, কীসে তোমার যৌবন ক্ষয় করেছ? তার অর্থ-সম্পদ সম্পর্কে, কোন পথে উপার্জন করেছ, আর কোন পথে ব্যয় করেছ? যে জ্ঞানার্জন করেছ, তার ওপর কতটুকু আমল করেছ?' (মুসনাদে আবূ ইয়ালা মুসিলী, ৯/১৭৮)
৯. মনে রাখতে হবে, মহান দাতা আপনাকে যে সচ্ছলতা দান করেছেন, মুহূর্তের মধ্যে তিনি তা ছিনিয়েও নিতে পারেন। পূর্বের বহু জাতিবর্গ, যারা অপচয়-অপব্যয়, ভোগবিলাস ও সীমালঙ্ঘনে মত্ত ছিল, আল্লাহ তা'আলা তাদের ধ্বংস করে দিয়েছেন। পবিত্র কুরআনে তাদের অবস্থা এভাবে তুলে ধরা হয়েছে: فَتِلْكَ بُيُوتُهُمْ خَاوِيَةً بِمَا ظَلَمُوا إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَةً لِقَوْمٍ يَعْلَمُونَ * وَانْجَيْنَا الَّذِينَ آمَنُوا وَكَانُوا يَتَّقُونَ﴾ [النمل : ٥٢، ٥٣] অর্থ: 'ওই তো তাদের ঘর-বাড়ি, যা তাদের যুলুমের কারণে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। নিশ্চয়ই যারা তাদের জ্ঞান-বুদ্ধিকে কাজে লাগায়, তাদের জন্য এতে আছে শিক্ষা গ্রহণের উপকরণ। আরা যারা ঈমান এনেছিল ও তাকওয়া অবলম্বন করেছিল, তাদেরকে আমি রক্ষা করি।' (নামল, ২৭: ৫২-৫৩)
১০. অপচয়কারী ও অপব্যয়ীদের থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখুন। প্রয়োজন ছাড়া খুব একটা কাছে ঘেঁষবেন না। সঙ্গ-দোষে আপনিও অপব্যয়ের দোষে দুষ্ট হতে পারেন। জীবন-যাপনে মধ্যপন্থি ও পরিমিতিবোধ-সম্পন্ন ব্যক্তিদের সংস্পর্শে থাকুন। ভারসাম্যপূর্ণ অর্থব্যয়ের ক্ষেত্রে তাদের সংস্পর্শ আপনার জন্য সহায়ক হবে।
১১. আর্থিকভাবে আপনি যতই সচ্ছল ও অবস্থা-সম্পন্ন হোন-না-কেন, নিজের প্রয়োজনীয় যাবতীয় কেনাকাটা নিজেই করার চেষ্টা করুন। পরিবারের আর্থিক বিষয়গুলো নিজেই দেখাশোনা করুন।
১২. আপনার কর্তব্য হলো, মধ্যপন্থায় ব্যয় করা এবং অতিরিক্ত সম্পদ সঞ্চয় করা। এখন হয়ত আপনি সুস্থ, সচ্ছল ও নিরাপদ জীবনযাপন করছেন; কিন্তু অসুস্থতা, অসচ্ছলতা ও বিপদ-আপদ-এগুলোও জীবনের অংশ। জীবনের এসব প্রতিকূলতার মুহূর্তে সঞ্চিত সম্পদ আপনার একনিষ্ঠ সহযোগী। বিজ্ঞজন যথার্থ বলেছেন: ‘সুখের দিনগুলোতে সম্ভাব্য বিপদ-মোকাবেলার প্রস্তুতি গ্রহণ কর।’
১৩. অপচয় থেকে বাঁচতে গিয়ে কৃপণতার মতো নিকৃষ্ট স্বভাবদোষে দুষ্ট হওয়াও ঠিক নয়। স্বভাবধর্ম ইসলাম অপব্যয় ও কৃপণতা-এর কোনোটাকেই সমর্থন করে না; বরং এ দুটিকে পাশে রেখে মধ্যপন্থা অবলম্বনের দিকনির্দেশনা প্রদান করে। পবিত্র কুরআনের সূরা ফুরকানে আল্লাহ তা’আলার প্রকৃত বান্দাদের কিছু বৈশিষ্ট্য তুলে ধরা হয়েছে। একটি বৈশিষ্ট্য হলো (পবিত্র কুরআনের ভাষায়): وَالَّذِينَ إِذَا أَنْفَقُوا لَمْ يُসْرِفُوا وَلَمْ يَقْتُرُوا وَكَانَ بَيْنَ ذَلِكَ قَوَامًا﴾ [الفرقان : ٦٧] অর্থ: ‘এবং যারা ব্যয় করার সময় না করে অপব্যয় এবং না করে কার্পণ্য; বরং তাদের পন্থা হল (বাড়াবাড়ি ও সংকীর্ণতার) মধ্যবর্তী ভারসাম্যপূর্ণ পন্থা।’ (ফুরকান, ২৫: ৬৭)

পরিশিষ্ট:
আব্বাসীয় খেলাফতকালে বারামিকা জাতি ছিল রাজ্য জয়, শাসন ও নেতৃত্বগুণে অনন্য। অর্থনীতি ও রাজনীতিতে স্বয়ংসম্পূর্ণ। আব্বাসী খলিফাদের ওপরও ছিল তাদের বিস্তর প্রভাব-ক্ষমতা। বাদশা হারুনুর রশীদের যুগেও তারা ছিল রাজকীয় আদর-সমাদরের পাত্র। রাজকীয় সুযোগ-সুবিধা পেয়ে তারা অপচয়-অপব্যয় ও ভোগবিলাসে মেতে উঠল। শখ-শৌখিনতার পেছনে কাড়িকাড়ি অর্থ ঢালতে লাগল। অবশেষে বাদশাহ হারুনুর রশীদের শাসনামলেই বারমিকা জাতির ক্ষমতা, শক্তি ও প্রভাব-প্রতিপত্তি বিলুপ্ত হলো। এরপর তারা আর মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারেনি।

এক যুবক শহরের পথ ধরে হেঁটে যাচ্ছে। এক বৃদ্ধাকে দেখল, রাস্তার পাশে বসে কেঁদে-কেঁদে ভিক্ষা করছে। যুবক জিজ্ঞেস করল: 'তোমার পরিচয় কী? তোমার এ অবস্থা হলোই বা কীভাবে?' বৃদ্ধা অনুতাপের সুরে শুধু এতটুকুই বলল: 'আমি বারামিকা গোষ্ঠীর লোক।' যুবক বিস্ময়ে 'থ' হবার দশা। বলল: 'হায় আল্লাহ! এ কী বলছ! তোমরা তো ছিলে শাসন-ক্ষমতার অধিকারী। অর্থপ্রাচুর্যে সমৃদ্ধ জাতি।' এবার বৃদ্ধা তার অতীতের কথা খুলে বলল: 'বললে হয়ত বিশ্বাস করবে না, যৌবনে আমি এমন আরাম-আয়েশ ও ভোগবিলাসে ছিলাম, যা তুমি কল্পনাও করতে পারবে না। স্বর্ণের পানি দিয়ে আমাদের ঘরদোর লেপা হতো। আমার সেবায় ছিল একশ দাস-দাসী। কিন্তু এমন সুখ বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। আমরা ভাগ্য-বিড়ম্বনার শিকার হলাম। এখন তো কোনো কোনো দিন এক বেলা খাবারও খেতে পাই না।'

বারামিকা জাতির ভাগ্যবিপর্যয় মানবজাতির জন্য এক বিরাট শিক্ষা। তাই সম্পদের অপচয় নয়; এর সঠিক মূল্যায়ন করুন। মহানদাতা আল্লাহ তা’আলার শোকর আদায় করুন। পবিত্র কুরআনে তাঁর নির্দেশ মেনে চলুন: وَكُلُوا وَاشْرَبُوا وَلَا تُসْرِفُوا إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الْمُسْرِفِينَ অর্থ: ‘আহার ও পান করবে, কিন্তু অপব্যয় করবে না। আল্লাহ অপব্যয়কারীদেরকে পছন্দ করেন না।’ (আ’রাফ, ৭: ৩১)

টিকাঃ
৫৪. মুস্তফা লুতফী মানফাল্‌তী। প্রখ্যাত মিসরীয় কবি সাহিত্যিক। সাহিত্যকর্মে তিনি একটি স্বকীয় ধারা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিলেন। অনুবাদকর্মেও তাঁর অনন্য অবদান সর্বজনে স্বীকৃত। ১৮৭৬ খ্রিষ্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯২৪ খ্রিষ্টাব্দের মৃত্যু বরণ করেন। তাঁর সাহিত্যকর্মের অন্যতম কীর্তি হলো "আন্নাজারাত" ও "আল-আবারাত" গ্রন্থ।

ফন্ট সাইজ
15px
17px