📘 আল হাল্লু জীবন সমস্যার সমাধান 📄 সমালোচনা

📄 সমালোচনা


সমালোচনা দু'ধরনের: গঠনমূলক ইতিবাচক সমালোচনা, আর আক্রমণাত্মক নেতিবাচক সমালোচনা।

গঠনমূলক ইতিবাচক সমালোচনার উদ্দেশ্য হলো, ভুল শুধরে দিয়ে মতামত ব্যক্ত করা; ভুলগুলো চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে ব্যক্তিকে ছোট করা উদ্দেশ্য নয়। আর নেতিবাচক সমালোচনার নেপথ্য কারণ হলো হিংসা, বিদ্বেষ ও অন্যকে হেয় প্রতিপন্ন করার প্রবণতা। এর উদ্দেশ্য, সমাজের চোখে ব্যক্তিকে খাটো করা, হেয় প্রতিপন্ন করা। এছাড়াও ব্যক্তির যোগ্যতা, দক্ষতা ও কর্মোদ্দীপনা দমিয়ে রাখাও নেতিবাচক সমালোচনার অন্যতম টার্গেট।

যখনই আপনি সমাজে নিজের মেধা, যোগ্যতা, প্রতিভা ও সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটাতে পারবেন, কর্মদক্ষতা ও অনন্য কৃতিত্বের পরিচয় দিয়ে সুনাম অর্জন করতে শুরু করবেন, আপনাকে সমালোচনার সম্মুখীন হতে হবে। এক্ষেত্রে গঠনমূলক ইতিবাচক সমালোচনা অবশ্যই আপনার জন্য এক বড় পাওনা। তবে পাশাপাশি আক্রমাণত্মক নেতিবাচক সমালোচনার জ্বালাও সইতে হবে। হিংসুক, নিন্দুক ও শত্রুভাবাপন্ন লোকদের গালমন্দ, অন্যায় অপপ্রচার ও মিথ্যা অপবাদ-এর কোনোটির হাত থেকেই আপনার রেহাই নেই। সমাজের চোখে আপনাকে খাটো ও হেয় প্রতিপন্ন করার উদগ্র মানসিকতা নিয়ে তারা গণমাধ্যম ও সোস্যাল মিডিয়ায় সর্বত্র আপনার সমালোচনায় সোচ্চার ভূমিকা পালন করবে। চারপাশের অনুকূল পরিবেশ ও সুবিস্তৃত কর্মপরিসর মুহূর্তেই আপনার জন্য বদ্ধ গুহার মতো সংকুচিত হয়ে পড়বে।

জীবনের এমন রুক্ষ কঠিন মুহূর্তে আপনার করণীয় কী? সমালোচনার সংকট কাটিয়ে উঠার যথার্থ উপায় কী?

সমাধান:
১. সমালোচনার আক্রমণে দোদুল্যমান হবেন না। প্রকম্পিত হবেন না। মনে রাখবেন, সমালোচনা আপনার যোগ্যতা ও মর্যাদার পরিচায়ক।

২. সমালোচনা যদি গঠনমূলক ও ইতিবাচক হয় তাহলে তার মূল্যায়ন করে নিজের ভুলগুলো শুধরে নিন। কর্মক্ষেত্রে নিজেকে আরও দক্ষ ও অভিজ্ঞরূপে গড়ে তুলুন।

৩. আক্রমণাত্মক নেতিবাচক সমালোচনার মুখে ধৈর্যধারণ করুন। নিজ অবস্থানে অটল-অবিচল থাকুন। কাফের মুশরিকদের ভিত্তিহীন সমালোচনার মুখে আল্লাহ তা'আলা রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে ধৈর্য ও অবিচলতার আদেশ করেছেন। পবিত্র কুরআনের ভাষায়: وَاصْبِرْ عَلَى مَا يَقُولُونَ وَاهْجُرُهُمْ هَجْرًا جَمِيلًا﴾ [المزمل: ١٠] অর্থ: 'আর তারা (অর্থাৎ কাফেরগণ) যেসব কথা বলে, তাতে ধৈর্যধারণ কর এবং তাদেরকে পাশ কাটিয়ে চল উত্তমরূপে।' (মুয্যাম্মিল, ৭৩: ১০)

৪. বেশি বেশি তাসবীহ পাঠ করুন ও নামায আদায়ে যত্নবান হোন। সমালোচনার মুখে আল্লাহ তা'আলা রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে বিশেষভাবে এ দু'টি আমলের আদেশ করেছেন: وَلَقَدْ نَعْلَمُ أَنَّكَ يَضِيقُ صَدْرُكَ بِمَا يَقُولُونَ * فَسَبِّحْ بِحَمْدِ رَبِّكَ وَكُنْ مِّنَ السُّجِدِينَ﴾ [الحجر: ৯৭, ৯৮] অর্থ: 'নিশ্চয়ই আমি জানি, তারা যে সব কথা বলে তাতে তোমার অন্তর সঙ্কুচিত হয়। (তার প্রতিকার এই যে,) তুমি তোমার প্রতিপালকের প্রশংসার সাথে তাঁর তাসবীহ পাঠ করতে থাক এবং সিজদাকারীদের অন্তর্ভুক্ত থাক।' (হিজর, ১৫: ৯৭-৯৮)

৫. আপন রবের নৈকট্য অর্জনে সচেষ্ট হোন। খুশু-খুযূর সাথে (বিনম্র ও একাগ্রচিত্তে) নামাযে মশগুল হোন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলার নির্দেশ: ﴿وَاسْجُدْ وَاقْتَرِبْ﴾ [ العلق: ১৯] অর্থ: সিজদা কর ও নিকটবর্তী হও। (সূরা আলাক : ১৯) রাসূলুল্লাহ ﷺ যখন কোনো বিষয়ে বিচলিত হতেন, তখন বেলাল (রা.)-এর উদ্দেশ্যে বলতেন: يَا بِلَالُ، أَرِحْنَا بِالصَّلَاةِ. مسند أحمد (۱৭৮/৩৮) অর্থ: হে বেলাল, নামাযের মাধ্যমে আমার মনে প্রশান্তি দাও। (মুসনাদে আহমদ, ৩৮/১৭৮)

৬. আপনি যদি সর্বজনমান্য ও সর্বমহলে নন্দিত হতে চান, যদি চান যাবতীয় দোষ-ত্রুটিমুক্ত থাকতে, তাহলে আপনি অসম্ভবকে সম্ভব করার পেছনে ছুটছেন, দুঃসাধ্য সাধনের চেষ্টায় লেগে আছেন, যা কখনো সম্ভব নয়। মানুষ হিসেবে আপনার ভুল হতেই পারে। সে ভুলের সুযোগে কেউ আপনার সমালোচনায় মুখর হতে পারে। কিন্তু আপনি কখনো তাদের নিন্দা-সমালোচনা কানে তুলবেন না। এক্ষেত্রে আপনার করণীয় হবে হিংসুক, নিন্দুক ও মূর্খ লোকদের ভিত্তিহীন সমালোচনা এড়িয়ে চলা। আপনি যদি তাদের সমালোচনার মোকাবিলা করতে যান, তাহলে আপনার প্রত্যুত্তর প্রমাণ করবে, আপনি নিন্দুকের নিন্দা ও অজ্ঞ-মূর্খের অযাচিত সমালোচনার মূল্যায়ন করছেন। পবিত্র কুরআনে বর্ণিত ‘ইবাদুর রাহমান”-এর পথ অনুসরণ করুন। কুরআনের ভাষায়: ﴿وَإِذَا خَاطَبَهُمُ الْجَهِلُونَ قَالُوا سَلَمَا﴾ [الفرقان: ٦٣] অর্থ: ‘এবং অজ্ঞলোক যখন তাদেরকে লক্ষ করে (অজ্ঞতাসূলভ) কথা বলে, তখন তারা শান্তিপূর্ণ কথা বলে।' (ফুরকান, ২৫: ৬৩)

৭. নিন্দুকের নিন্দা ও অজ্ঞ-মূর্খের গালাগালের জবাব দিতে যাবেন না। এভাবে আপনি তাদের সমালোচনা বন্ধ করতে পারবেন না; বরং দ্বিগুণ উৎসাহে তারা নিত্য-নতুন সমালোচনায় মুখর হবে। তার চেয়ে বরং প্রজ্ঞা ও ধৈর্যের সাথে তাদের সমালোচনা এড়িয়ে চলুন। আপনার নিরুদ্বেগ নিরাবেগ ভূমিকাতেই তাদের আগ্রহে ভাটা পড়বে। নিজেদের ক্ষোভ ও আক্রোশের জ্বালায় নিজেরাই জ্বলে মরবে। পবিত্র কুরআনের ভাষায়: ﴿قُلْ مُوتُوا بِغَيْظِكُمْ ﴾ [آل عمران : ۱۱۹] অর্থ: '(তাদেরকে) বলে দাও, তোমরা নিজেদের আক্রোশে নিজেরা মর।' (আলে-ইমরান, ৩: ১১৯)

৮. হিংসুক, নিন্দুক ও অজ্ঞ-মূর্খ লোকদের থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখুন। সাক্ষাতে, মজলিসে কিংবা উপলক্ষ্যে তারা যেন আপনার কাছেও ঘেঁষতে না পারে। সুযোগ পেলেই তারা আপনার একান্ত ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে মেতে উঠবে।

৯. প্রজ্ঞা, বিনয় ও মহৎ চরিত্রগুণে সর্বোত্তম পন্থায় সমালোচনার জবাব দেওয়ার চেষ্টা করুন। এগুলো এমন শক্তিশালী মানবিক গুণ, যা চরম শত্রুকেও পরম বন্ধুতে রূপান্তরিত করে।

১০. মানুষের ভিত্তিহীন সমালোচনা ও নিন্দা যদি মাত্রাতিরিক্ত হয়ে পড়ে, শালীনতার সীমা ছাড়িয়ে যায়, তাহলে আদালত ও বিচারের দ্বারস্থ হোন। আদালত ও সুবিচার আপনার সমস্যার সুষ্ঠু সমাধান করতে পারে।

১১. নিশ্চিত থাকুন, প্রশান্ত হোন, উদ্দেশ্যমূলক সমালোচনাও আপনার জন্য কল্যাণ বয়ে আনতে পারে। হতে পারে আপনার গুনাহ মাফ হওয়ার কারণ। কাল কিয়ামতের দিন যখন নিন্দুকের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠবে, আপনি হবেন নিন্দুক সমালোচকদের নেকির অংশীদার, কিংবা তারা হবে আপনার গুনাহর ভাগিদার।

১২. অজ্ঞ, মূর্খ ও নির্বোধ লোকেরা তো মহান স্রষ্টা ও রিযিকদাতা আল্লাহ তা'আলাকেও গালমন্দ করে। সে তুলনায় আমার আপনার মতো নগণ্য মানুষ-যাদের ভুল-বিচ্যুতি হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে-তাদের ক্ষেত্রে নিন্দুকের পক্ষ থেকে আর কী-ই বা আশা করতে পারে!

১৩. উদ্দেশ্যমূলক নেতিবাচক নিন্দা-সমালোচনায় ব্যথিত মনঃক্ষুণ্ণ হবেন না। কেননা এটা প্রমাণ করে, সমাজে আপনার গুরুত্বপূর্ণ ও মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান বর্তমান; তা না হলে নিন্দুকেরা আপনাকে নিয়ে উঠে পড়ে লাগত না।

১৪. সমালোচনা ও গালমন্দ মোকাবিলা করার ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর জীবনীতে রয়েছে আপনার জন্য শ্রেষ্ঠ আদর্শ। মক্কার কাফের মুশরিকদের দ্বারা তিনি কত কটুক্তি ও বিরূপ মন্তব্যের সম্মুখীন হয়েছেন, কত গাল-মন্দ ও অশালীন আচরণের শিকার হয়েছেন; কিন্তু তিনি ধৈর্যধারণ করেছেন। মহান আল্লাহর দরবারে এর প্রতিদান আশা করেছেন। পবিত্র কুরআনে মক্কার কাফের-মুশরিকদের কটুক্তি ও এর প্রেক্ষাপট তুলে ধরা হয়েছে। যেন আগত উম্মতে মুহাম্মদীর জন্য তা এক অনুপম আদর্শ ও শিক্ষণীয় হয়ে থাকে।

১৫. আপনি যদি নিন্দুকের কথার গুরুত্ব দিয়ে তাদের সমালোচনার জবাবে প্রবৃত্ত হন, তাহলে তো তাদের আশাই পূরণ হলো, উদ্দেশ্য সফল হলো। তখন তারা দ্বিগুণ উদ্যমে নিত্য-নতুন সমালোচনায় মুখর হবে। সঙ্গে সঙ্গে আপনার জীবন অস্থির দুর্বিষহ হয়ে উঠবে। এটাই নিন্দুকের পরম উদ্দেশ্য। তাই নেতিবাচক যতো নিন্দা-সমালোচনা, তাতে মানসিক অস্থিরতা ও অস্বস্তি বোধ করবেন না, যথাসম্ভব তা এড়িয়ে যান। মক্কার কাফেররা যখন রাসূল ﷺ-এর নামে কুৎসা রটনা করছিল, তাঁর বিরুদ্ধে নানা ষড়যন্ত্র ও চক্রান্ত লিপ্ত ছিল, তখন তাঁর প্রতি আল্লাহ তা'আলার নির্দেশ ছিল (পবিত্র কুরআনের ভাষায়): وَلَا تَكُ فِي ضَيْقٍ مِمَّا يَمْكُرُونَ﴾ [النحل: ١٢٧] অর্থ: 'তারা যে ষড়যন্ত্র করে তার কারণে কুণ্ঠিত হয়ো না।' (নাহল, ১৬: ১২৭)

১৬. মহৎ ব্যক্তিত্ব ও চারিত্রিক উদারতার গুণে নিন্দা সমালোচনা মুছে ফেলুন। নিন্দার মুখে নীরব-নিরুদ্বেগ ভূমিকা পালন করে নিন্দুক সমালোচককে নিস্পৃহ করে ফেলুন।

পরিশিষ্ট:
* আরবিতে একটি কথা প্রচলিত আছে: طَنَّشْ تَعِشُ تَنْتَعِشُ. অর্থ: 'যত বাধা-বিপত্তি, সংকীর্ণতা-প্রতিকূলতা-কোনো কিছুর প্রতি ভ্রুক্ষেপ না করে নিজের মতো করে বাঁচুন। তাতেই জীবনের পরম সুখ-শান্তি নিহিত।'
* আমার সহপাঠী ডক্টর আবূ তাইয়্যেব মুতানাব্বি বলেন, 'জীবনে আমি কোনো বাধা-বিপত্তি, সংকট-সংকীর্ণতার পরোয়া করিনি। তাতে আমি জীবনের কোনো কল্যাণ খুঁজে পাইনি।
* আপনি যদি নিজের বিরুদ্ধে প্রতিটি কথার জবাব দিতে যান, এক-একটি সমালোচনা মোকাবিলায় প্রবৃত্ত হন, বিরুদ্ধবাদীদের ব্যাপারে প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে উঠেন, তাহলে-আপনার ওপর আল্লাহ রহম করুন-আপনার জীবন ত্যক্ত-বিরক্ত ও চরম দুর্বিষহ হয়ে উঠবে। তাই জীবনের এসব অনাকাঙ্ক্ষিত ক্ষেত্রে ক্ষমা, উদারতা ও ভ্রুক্ষেপহীনতাই শ্রেয়। পবিত্র কুরআনের নির্দেশ: ﴿خُذِ الْعَفْوَ وَأُمُرْ بِالْعُرْفِ وَأَعْرِضْ عَنِ الْجُهِلِينَ﴾ [الأعراف: ١٩٩] অর্থ: '(হে নবী!) তুমি ক্ষমাপরায়ণতা অবলম্বন কর এবং (মানুষকে) সৎকাজের আদেশ দাও আর অজ্ঞদের দিকে ভ্রুক্ষেপ করো না।' (আ'রাফ, ৭: ১৯৯)
* এক লোক আবু বকর (রা.)-কে গালমন্দ করল। জবাবে তিনি লোকটাকে বললেন, 'এসব কটু কথা ও গালমন্দ তোমার সাথে তোমার কবরেই যাবে। আমার কবরে যাবে না।' মনে রাখবেন উদ্দেশ্যমূলক নেতিবাচক সমালোচনা, নিন্দা, কটুকথা ও গালমন্দ-এসবই নিন্দুক সমালোচকের কাফনের সাথে তার কবরে যাবে। কাল কিয়ামতের দিন বিচারের সম্মুখীন হওয়ার আগ পর্যন্ত সে এগুলো বহন করে চলবে। তাই অন্যায় সমালোচনা এড়িয়ে চলা ও ভ্রুক্ষেপহীনতার পথ অবলম্বন করুন। এটাই জ্ঞানী ও মহৎ ব্যক্তিগণের আদর্শ। পবিত্র কুরআনের ভাষায়: وَإِذَا سَمِعُوا اللَّغْوَ أَعْرَضُوا عَنْهُ وَقَالُوا لَنَا أَعْمَالُنَا وَلَكُمْ أَعْمَالُكُمْ : سَلْمٌ عَلَيْكُمْ لَا نَبْتَغِي الْجَهلِينَ﴾ [القصص: ٥٥] অর্থ: 'তারা যখন কোন বেহুদা কথা শোনে, তা এড়িয়ে যায় এবং বলে, আমাদের জন্য আমাদের কর্ম এবং তোমাদের জন্য তোমাদের কর্ম। তোমাদেরকে সালাম। আমরা অজ্ঞদের সাথে জড়িত হতে চাই না।' (কাসাস, ২৮: ৫৫)

টিকাঃ
৪৯. আল্লাহ তা'আলার প্রকৃত বান্দাগণ।

📘 আল হাল্লু জীবন সমস্যার সমাধান 📄 কুরআন-বিমুখতা

📄 কুরআন-বিমুখতা


পবিত্র কুরআন মানব জাতির শেফা, হৃদয়ের প্রশান্তি ও আত্মার পরিতৃপ্তি। কুরআন আমাদের জীবন-সমস্যার সমাধান, শ্রেষ্ঠ জীবন বিধান। যে ব্যক্তি দিনের কর্মব্যস্ততায় ও রাতের নীরবতায় কুরআন তিলাওয়াতের নিয়ামত লাভ করেছে, কুরআনের আয়াত সম্পর্কে চিন্তা-ফিকির করার সুযোগ পেয়েছে, ব্যক্তিগত জীবনে, পারিবারিক অনুশাসন ও সমাজ বিনির্মাণে কুরআনের বিধি-বিধান প্রয়োগ ও বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হয়েছে, সে কতই না সৌভাগ্যবান!

চরম হতভাগা ঐ ব্যক্তি, যে দিনের কর্মব্যস্ততায় ও রাতের অঘোর নিদ্রায় আল-কুরআনকে ভুলে বসেছে। যার ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে নেই আল-কুরআনের প্রভাব। নেই কোনো কার্যকারিতা। কুরআন বিমুখতার অনেক ধরন রয়েছে। পবিত্র কুরআনকে মুহাম্মদ ﷺ-এর ওপর অবতীর্ণ আসমানি গ্রন্থ বলে বিশ্বাস না করা থেকে শুরু করে, তাঁর ফায়সালা না মানা, তাঁর হালালকে হালাল বলে এবং হারামকে হারাম বলে বিশ্বাস না করা, উদ্দেশ্য-প্রণোদিত হয়ে কুরআনের ভুলভাল ব্যাখ্যা করা, পর্যায়ক্রমে কুরআন তিলাওয়াত না করা, কুরআন নিয়ে চিন্তা-ফিকির না করা, এমনকি কুরআন-শিক্ষায় অনাগ্রহ, অবহেলা-এসবই কুরআন-বিমুখতার অন্তর্ভুক্ত।

কুরআন-বিমুখতার কিছু কারণ রয়েছে। কুরআন-সুন্নাহর শিক্ষা-দীক্ষার অভাব, ধর্মীয় মূল্যবোধের শূন্যতা, জীবন-জগতের মোহাবিষ্টতা, পরকাল-বিমুখতা এবং পশ্চিমা সভ্যতা-সংস্কৃতির আগ্রাসন-মোটাদাগে এগুলো হলো কুরআন বিমুখতার অন্যতম কারণ। এসব কারণে মানুষের হৃদয় আজ রুক্ষ-কঠোর হয়ে গেছে। সে কুরআন তিলাওয়াতে আগ্রহ বোধ করে না। কালে-ভদ্রে তিলাওয়াত করলেও কুরআনের স্বাদ অনুভব করতে পারে না এবং কুরআনের মর্ম-বাণী তার মনে দাগ কাটে না। সে অভাব-অনটনে ভোগে, দুঃখ-দুর্দশার শিকার হয়, নানা প্রতিকূলতার সম্মুখীন হয়; কিন্তু আল-কুরআনের সমাধান কাজে লাগাতে পারে না। আমরা যদি জীবন সমস্যার সুষ্ঠু সমাধান চাই, ব্যক্তিগত জীবন, পরিবার ও সমাজের সুষ্ঠু বিনির্মাণ চাই, তাহলে অতি অবশ্যই আমাদের সর্বস্তরের কুরআন-বিমুখতা দূর করার বিকল্প নেই। কিন্তু তার উপায় কী? কুরআনমুখী হওয়ার পথ কী?

সমাধান:
১. প্রথমেই আমাদের উদাসীনতার বিষয়ে চিন্তা-ফিকির করতে হবে। কীভাবে আমরা আল্লাহর কালাম ছেড়ে, জ্ঞান-বিজ্ঞানের শ্রেষ্ঠ অধ্যায় থেকে দূরে সরে জাগতিক ব্যতিব্যস্ততায় আকণ্ঠ নিমজ্জিত হয়ে আছি?! পার্থিব জ্ঞান-বিজ্ঞানের সাধনায় ডুবে আছি?!
২. মুভি, নাটক, সিরিয়াল, গেমস, চিত্তাকর্ষক ওয়েবসাইট ও সোস্যাল মিডিয়া ব্যক্তিকে অনর্থক কাজে প্রবৃত্ত করে। তার মধ্যে কুরআন-বিমুখতা সৃষ্টি করে। এসব অনর্থক ও গুনাহের কাজ থেকে বিরত থাকতে হবে এবং বেশি বেশি তাসবীহ-তাহলীল ও তাওবা-ইস্তিগফারে মশগুল থাকতে হবে।
৩. শিক্ষা সিলেবাসে কুরআন শিক্ষা বাধ্যতামূলক করতে হবে। কুরআন শিক্ষার মানোন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন শাখাভিত্তিক কুরআন তিলাওয়াত প্রতিযোগিতার আয়োজন করতে হবে। যা শিক্ষার্থীদের মধ্যে আগ্রহ-উদ্দীপনা সৃষ্টি করবে।
৪. জীবনের ক্ষুদ্র হতে ক্ষুদ্র পরিসর থেকে শুরু করে সমস্ত অঙ্গনে কুরআনী শিক্ষা-দীক্ষার যথাযথ বাস্তবায়ন ঘটাতে হবে।
৫. চারটি মৌলিক উদ্যোগ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কাজ করতে হবে: এক. কুরআন হিফজ করা। দুই. কুরআনের অর্থ ও মর্ম সম্পর্কে চিন্তা-ফিকির করা। তিন. বাস্তব জীবনে কুরআনী বিধি-বিধানের সঠিক প্রয়োগ ও বাস্তবায়ন করা। চার. কুরআনী শিক্ষার প্রচার-প্রসার। কুরআনের ধারক-বাহকগণকেই এই চারটি মহৎ উদ্যোগ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা পালন করতে হবে।
৬. পরিবারের প্রতিটি সদস্যকে কুরআনমুখী করার জন্য তাদের সাথে শিক্ষা-দীক্ষামূলক বাস্তবিক ও প্রায়োগিক নীতি অবলম্বন করতে হবে। তাদের কাছে কুরআন শিক্ষার গুরুত্ব ও তাৎপর্য তুলে ধরার সঙ্গে সঙ্গে কুরআন-বিমুখতার ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে সজাগ-সচেতন করতে হবে।
৭. জান্নাতে উঁচু মর্যাদা ও সুউচ্চ মাকাম হাসিল করার জন্য কুরআন তিলাওয়াত একটি শ্রেষ্ঠ উসিলা। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, 'কুরআনের হাফেজকে বলা হবে, 'তিলাওয়াত করতে থাক এবং উপরে উঠতে থাক। দুনিয়াতে যেভাবে সুললিত কণ্ঠে তিলাওয়াত করতে, ঠিক সেভাবে সুললিত কণ্ঠে তিলাওয়াত কর। সর্বশেষ আয়াতটি পাঠ করার সময় যে স্তরে থাকবে, সেটাই হবে তোমার আবাসস্থল।' (আবূ দাউদ, ২/৭৩)
৮. ভুলে গেলে চলবে না, আল্লাহ তা'আলা তাঁর রাসূল ﷺ-কে যে নূর (কুরআন) দান করেছেন, সে নূরের আলোয় উদ্ভাসিত পথেই আপনার সৌভাগ্য ও সফলতা নিহিত। তাতেই রয়েছে আপনার তাওফিক ও হিদায়াতের পাথেয়।
৯. দোকান, অফিস-আদালত কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, যেখানেই থাকুন না কেন, কুরআন তিলাওয়াতের ফযিলত থেকে বঞ্চিত হবেন না। মনে রাখবেন, পবিত্র কুরআনের এক একটি হরফে দশ নেকি। আর আল্লাহ তা'আলা যাকে চান কয়েক গুণ বৃদ্ধি করে দেন।
১০. বিশ্বাস করুন, কুরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে আপনি আপন রবের সাথে একান্তে কথা বলার মহা সৌভাগ্য লাভ করতে পারেন। হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ তা'আলা বলেন: "أَنَا جَلِيسُ مَنْ ذَكَرَنِي" অর্থ: 'যে আমার যিকির করে, আমি তার সাথেই থাকি।' এটা তো সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত যে, সর্বোত্তম যিকির হলো কুরআন তিলাওয়াত।
১১. নির্দিষ্ট কিছু যিকির ও নির্দিষ্ট পরিমাণ কুরআন তিলাওয়াত প্রতিদিনের অত্যাবশ্যকীয় আমল বানিয়ে নিন। অভ্যস্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত ফরয নামাযের মতো গুরুত্ব দিয়ে আমল দু'টি করতে থাকুন। কোনো দিন যদি ছুটে যায় তাহলে পরদিন দু'দিনের সমপরিমাণ পাঠ করুন।
১২. অভিজ্ঞ কোনো কারী সাহেবের তত্ত্বাবধানে কুরআন শিখুন। তাহলে বিশুদ্ধভাবে ও সুললিত কণ্ঠে কুরআন তিলাওয়াতের যোগ্যতা অর্জন করতে পারবেন।
১৩. নিজেকে একবার জিজ্ঞেস করুন, বর্তমান বিশ্বের কোনো ক্ষমতাধর প্রেসিডেন্ট যদি আপনার জন্য কোনো মেসেজ পাঠান, আপনি কি তা না পড়ে বেমালুম ভুলে থাকতে পারবেন? তাহলে আকাশমণ্ডলী ও যমীনের স্রষ্টা, সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী, মহান আল্লাহ তা'আলার বাণী আল কুরআন কতটা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে!
১৪. রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর যুগে মুনাফিকদের একটি চরিত্র ছিল, তারা কুরআনবিমুখ হয়ে থাকত। রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর ওপর যে আয়াতই নাযিল হতো, তারা তা ঘৃণা ভরে প্রত্যাখ্যান করত। স্পষ্টতই কুরআন-বিমুখতা একটা মুনাফেকি চরিত্র। সুতরাং অত্যন্ত সতর্ক থাকুন। কোনো মুনাফেকি চরিত্র যেন আপনার দ্বারা প্রকাশ না পায়।
১৫. বুখারী শরীফে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর হাদীসটি মনে রাখুন: "لَا حَسَدَ إِلَّا عَلَى اثْنَتَيْنِ: رَجُلٌ آتَاهُ اللهُ الكِتَابَ، وَقَامَ بِهِ آنَاءَ اللَّيْلِ، وَرَجُلٌ أَعْطَاهُ اللهُ مَالًا، فَهُوَ يَتَصَدَّقُ بِهِ آنَاءَ اللَّيْلِ وَالنَّهَارِ". (صحيح البخاري) অর্থ: 'দু' ব্যক্তির ব্যাপারে কোনো প্রকার ঈর্ষা করা যাবে না: (এক.) যে ব্যক্তিকে আল্লাহ তা'আলা কুরআনের নিয়ামত দান করেছেন এবং দিনে-রাতে সে কুরআন তিলাওয়াতে মশগুল থাকে। (দুই.) যাকে আল্লাহ তা'আলা সম্পদ দান করেছেন এবং দিন-রাত সে তা আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করে।' (বুখারী, ৬/১৯১)
১৬. কুরআন শেখা ও শেখানোর মাধ্যমে নিজেকে সর্বোত্তম ব্যক্তিরূপে প্রতিষ্ঠিত করুন। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: «خَيْرُكُمْ مَنْ تَعَلَّمَ القُرْآنَ وَعَلَّمَهُ» অর্থ: 'তোমাদের মধ্যে সে-ই উত্তম, যে কুরআন শিখে ও অপরকে শিক্ষা দেয়।' (বুখারী, ৬/১৯২)
১৭. রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর আরেকটি বাণী বিশেষভাবে স্মরণ রাখুন: «اقْرَءُوا الْقُرْآنَ فَإِنَّهُ يَأْتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ شَفِيعًا لِأَصْحَابِهِ». অর্থ: 'তোমরা কুরআন পাঠ করো। কেননা কিয়ামত দিবসে কুরআন তার পাঠকারীদের জন্য সুপারিশকারী হবে।' (মুসলিম, ১/৫৫৩)
১৮. অসৎ গুনাহগার লোকদের সঙ্গ ত্যাগ করুন। পবিত্র কুরআনের হাফেয ও মুত্তাকী ব্যক্তিদের সংস্পর্শে থাকুন। তাদের সৎসঙ্গ আপনাকে কুরআন তিলাওয়াতে অনুপ্রাণিত করবে।
১৯. তিলাওয়াতের পাশাপাশি একটি সহজ-সাবলীল তাফসির গ্রন্থ সাথে রাখুন। অর্থ-না-জানা শব্দের বিশ্লেষণ ও আয়াতের সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা তা থেকে সহজেই জেনে নিন। সহজ-সাবলীল তাফসির-গ্রন্থগুলোর মধ্যে অন্যতম কয়েকটি হলো: তাফসিরুল জালালাইন, তাফসিরুস্ সা'দী, আত্তাফসিরুল মুয়াস্সার, সাফওয়াতুত্ তাফাসির।
২০. নিজের সঙ্গে ক্ষুদ্র কলেবরের একটি কুরআনের কপি রাখুন, কিংবা মোবাইলে কুরআনের একটি সফ্টওয়্যার ডাউনলোড করে রাখুন। ঘরে-বাইরে যেকোনো স্থানে কুরআন তিলাওয়াত করার সুযোগ পাবেন এবং কোনো আয়াত নিয়ে চিন্তা-ফিকির করতে পারবেন।

পরিশিষ্ট:
পবিত্র কুরআন সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলার একটি ঘোষণার মহত্ত্ব ও তাৎপর্যের সামনে যে কাউকে নীরব, নিশ্চুপ ও বিনম্রচিত্ত হতে হবে: ﴿قُلْ لَئِنِ اجْتَمَعَتِ الْإِنسُ وَالْجِنُّ عَلَى أَنْ يَأْتُوا بِمِثْلِ هَذَا الْقُرْآنِ لَا يَأْتُونَ بِمِثْلِهِ وَلَوْ كَانَ بَعْضُهُمْ لِبَعْضٍ ظَهِيرًا﴾ [الإسراء: ৮৮] অর্থ: 'বলে দাও, এই কুরআনের মত বাণী তৈরি করে আনার জন্য যদি সমস্ত মানুষ ও জিন একত্র হয়ে যায়, তবুও তারা এ রকম কিছু আনতে পারবে না, তাতে তারা একে অন্যের যতই সাহায্য করুক।' (বনী ইসরাঈল, ১৭: ৮৮)

বিখ্যাত মিশরীয় কবি মুহাম্মদ বিন সাঈদ বুসীরী বলেছেন: 'আমাকে তার অলৌকিকত্বের নিদর্শন বর্ণনা করতে দাও। তার অলৌকিকত্বের নিদর্শন যখন প্রকাশিত হয়, পাহাড়ের চূড়ায় অতিথির জন্য রান্নার আগুনের মতো সুস্পষ্ট হয়ে উঠে।'

হে আল্লাহ, মহাগ্রন্থ আল কুরআনকে আমাদের হৃদয়ের সবুজ-শ্যামল বসন্ত বানিয়ে দিন। কুরআনের উসিলায় মনের সমস্ত দুঃখ-কষ্ট, দুশ্চিন্তা ও অস্থিরতা দূর করে দিন। পবিত্র কুরআনকে আমাদের একাকীত্বের বন্ধু ও চলার পথের সাথি বানিয়ে দিন। কিয়ামত-দিবসে আমাদের পক্ষে সাক্ষ্যদানকারী ও সুপারিশকারী বানিয়ে দিন।

টিকাঃ
৫০. মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা, ১/১০৮
৫১. রাসূলুল্লাহ-এর প্রশংসাসম্বলিত কাব্যরচনার জন্য তিনি বিশেষভাবে বিখ্যাত। রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর স্তুতিসম্বলিত তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থটির নাম 'আল-কাওকিবুদ দুররিয়্যাহ্ ফি মাদহি খইরিল বারিয়্যাহ্'।

📘 আল হাল্লু জীবন সমস্যার সমাধান 📄 বিস্মৃতি

📄 বিস্মৃতি


বিস্মৃতি হলো প্রয়োজনের মুহূর্তে অতীতের জানা-বিষয় স্মরণ করতে না পারা। বিস্মৃতি আমাদের জন্য সুখকর, যখন আমরা নিজেদের কষ্ট-যাতনা, বিপদ-আপদ ও দুঃখের স্মৃতিগুলো ভুলে থাকতে পারি। ভুলে যেতে পারি ঝগড়া-বিবাদ, হিংসা-বিদ্বেষ, অন্যায় বিরোধিতা ও শত্রুতা। বিস্মৃতিই আবার আমাদের জন্য কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায়, যখন আমরা ভুলে যাই নির্দিষ্ট সময় ও উপলক্ষে নিজেদের দায়িত্ব ও কর্তব্যের কথা, জীবনের প্রয়োজন ও আয়োজনের কথা।

উল্লেখযোগ্য কিছু কারণে মানুষ বিস্মৃতির শিকার হয়। তার মধ্যে একটি হলো পুষ্টিহীনতা। মানুষের মস্তিষ্ক ও ব্রেইন যখন পর্যাপ্ত পুষ্টি না পায়, তার কার্যক্ষমতা হ্রাস পেতে থাকে। স্মরণশক্তি ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ে। এছাড়াও অতি ভোজন, ধূমপান, কোমল পানীয়, ড্রাগস ইত্যাদিতে মানুষের মেধা ও স্মরণশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যে কারণেই হোক, আপনি কি স্মৃতিশক্তির দুর্বলতায় ভুগছেন? আপনি কি এমন অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির শিকার হচ্ছেন, যা করবেন বলে ভেবেছিলেন, এখন কিছুতেই তা মনে করতে পারছেন না? যা কিছু মুখস্থ করতে চান, কিছুতেই পেরে ওঠেন না? তাহলে আমার সাথে চলুন। বিস্মৃতির কবল থেকে মুক্তির পথ বাতলে দিচ্ছি। এ জটিল সমস্যার সমাধান বলে দিচ্ছি।

সমাধান:
১. মনে রাখতে হবে, বিস্মৃতি ও ভুলে যাওয়ার স্বভাব ব্যক্তিকে অযত্ন-অবহেলার পথে ধাবিত করে। ফলে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে তার সামান্য ভুলের কারণে বড় ধরনের অঘটন ঘটে যেতে পারে। যেমন: সিগন্যাল-ম্যানের সামান্য ভুলের কারণে বড় ধরনের ট্রেন দুর্ঘটনা ঘটা। অনুরূপভাবে জীবনের এমন অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট রয়েছে, যেখানে সামান্য ভুলের কারণে ভয়ানক আর্থিক ও মানবিক বিপর্যয় নেমে আসার সমূহ আশঙ্কা রয়েছে।
২. বিতারিত শয়তান থেকে সর্বদা মহান আল্লাহ তা'আলার আশ্রয় গ্রহণ করুন। কেননা যেকোনো ভালো কাজ ও কল্যাণকর উদ্যোগ ভুলিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে শয়তানই মূল হোতা। খিযির (আ.)-এর সন্ধানের পথে মূসা (আ.)-এর সফরসঙ্গী যুবক তার দায়িত্বের কথা ভুলে গিয়েছিল। বলেছিল (পবিত্র কুরআনের ভাষায়): ﴿وَمَا أَنْسَنِيهُ إِلَّا الشَّيْطَنُ أَنْ أَذْكُرَهُ﴾ [الكهف: ٦٣] অর্থ: 'সেটির কথা বলতে আমাকে আর কেউ নয়, শয়তানই আমাকে ভুলিয়ে দিয়েছিল।' (কাহফ, ১৮: ৬৩)
৩. কোনো কিছু যদি ভুলে যান, কিছুতেই মনে করে উঠতে পারছেন না, তাহলে বেশি বেশি দরুদ শরীফ পাঠ করুন। সঙ্গে সঙ্গে এই দু'আটিও বার বার পাঠ করুন: اللَّهُمَّ رَبَّ الضَّالَّةِ، هَادِيَ الضَّالَّةِ، تَهْدِي مِنَ الضَّلَالَةِ، رُدَّ عَلَيَّ ضَالَّتِي بِقُدْرَتِكَ وَسُلْطَانِكَ مِنْ عَطَائِكَ وَفَضْلِكَ।
অর্থ: 'হে হারানো বিস্মৃত বস্তুর প্রভু, হারানো বস্তুর সন্ধান দানকারী, ভুলে যাওয়া বস্তুর সন্ধান আপনিই দিতে পারেন। নিজ শক্তিমত্তা, ক্ষমতা দান ও অনুগ্রহের গুণে আমার হারানো বস্তু ফিরিয়ে দিন।'
৪. বেশি বেশি তাওবা-ইস্তিগফার করুন। কেননা গুনাহ ও পাপাচার মানুষের মনের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে। আর তাওবা-ইস্তিগফার সে প্রভাব দূর করে মনটাকে বিশুদ্ধ পরিশুদ্ধ করে।
৫. মেধা-মস্তিস্ক দেহের অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মতোই একটি অঙ্গ। সযত্ন পরিচর্যার মাধ্যমে তা সবল শক্তিশালী হয়ে উঠে। তাই অধিক পাঠ ও অধ্যয়নের মাধ্যমে মেধার পরিচর্যা করুন। ক্যালকুলেটর, কম্পিউটার ও গুগল ইত্যাদি সাহায্য-সহযোগিতা ছাড়াই মেধা খাটিয়ে কঠিন ও জটিল বিষয়ের সমাধান বের করার চেষ্টা করুন।
৬. নিয়মিত খেলাধুলা ও শরীরচর্চা করুন। কেননা তা শরীর-স্বাস্থ্যের সুস্থতা ও মন-মস্তিস্কের প্রফুল্লতা ধরে রাখতে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করে।
৭. ভেজালমুক্ত নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্যরুটিন মেনে চলুন। মেদ, ভুঁড়ি ও স্থূলতা থেকে বেঁচে থাকুন। কেননা তা মেধা ও স্মরণশক্তির জন্য ক্ষতিকর। দেহের প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও পুষ্টিযুক্ত খাবার খান। বিজ্ঞজনদের উক্তি ‘সুস্থ দেহ, সুস্থ মন।’
৮. আমাদের শরীর-স্বাস্থ্য ও স্মরণশক্তির সুরক্ষায় শাকসবজি ও ফলমূলের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। তাই প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় অধিক শাক-সবজি ও ফলমূল থাকতে হবে। তাতে প্রচুর পরিমাণ ফ্লেভোনয়েড ও অ্যান্টি অক্সিডেন্ট বিদ্যমান। স্মৃতিশক্তি বজায় রাখা এবং স্মৃতিশক্তিজনিত যেকোনো সমস্যা প্রতিরোধে অ্যান্টি অক্সিডেন্টের জাদুকরি কার্যক্ষমতা রয়েছে।
৯. ডাক্তারি পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে আপনার দেহে ক্যালসিয়ামের শূন্যতা ও ভিটামিন-ঘাটতির বিষয়ে নিশ্চিত হোন। বিশেষ করে ভিটামিন বি১২ ও ভিটামিন ডি-সুস্বাস্থ্য ও স্মৃতিশক্তি রক্ষায় এ দু'টি ভিটামিন অত্যন্ত কার্যকর।
১০. থাইরয়েড গ্রন্থির দুর্বলতা ও রক্তস্বল্পতা-ডাক্তারি পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে এ দুটি বিষয়ের নিশ্চিত হবে। কোনো সমস্যা ধরা পড়লে উন্নত চিকিৎসা গ্রহণ করা কর্তব্য। কেননা স্মৃতিশক্তি দুর্বল ও ক্ষয় করার ক্ষেত্রে এ দুটি রোগ ভীষণ সক্রিয়।
১১. ক্রোধ, বিষণ্ণতা, দুশ্চিন্তা, ত্বরা-প্রবণতা ইত্যাদি মানসিক সমস্যা থেকে বেঁচে থাকুন। কেননা এসব কারণে অনেক সময় ভুলো মানসিকতা সৃষ্টি হয়, স্মৃতিবিভ্রম ঘটে।
১২. প্রতিদিনের গতানুগতিক জীবনের একঘেয়েমি ভাব দূর করার চেষ্টা করুন। এ লক্ষ্যে প্রাকৃতিক মনোরম পরিবেশে ঘুরে আসুন। কিংবা ঐতিহাসিক দর্শনীয় স্পট পরিদর্শনে বেরিয়ে পড়ুন। এতে মন-মানসিকতা প্রশান্ত ও প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে। স্মৃতিশক্তি সতেজতা ও গতিময়তা ফিরে পাবে।
১৩. পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও নিয়মিত ঘুম সুস্থ মস্তিষ্কের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষভাবে রাতের ঘুম মানসিক সুস্থতার জন্য এক শক্তিশালী নিয়ামক। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: وَجَعَلْنَا نَوْمَكُمْ سُبَاتًا * وَجَعَلْنَا الَّيْلَ لিবাসা * وَجَعَلْنَا النَّهَارَ مَعَاشَا﴾ [النبأ: ٩ - ١١] অর্থ: 'আর তোমাদের ঘুমকে ক্লান্তি ঘুচানোর উপায় বানিয়েছি। এবং রাতকে বানিয়েছি আবরণ স্বরূপ। এবং দিনকে জীবিকা আহরণের সময় নির্ধারণ করেছি।' (নাবা, ৭৮: ৯-১১) তাই রাতে সকাল সকাল ঘুমিয়ে পড়ুন এবং সতেজ ও প্রাণবন্ত মনে কর্মমুখর জীবন-যাপন করুন।
১৪. নিয়মিত জামাতের সাথে ফজর নামায আদায়ে যত্নবান হোন। এতে একই সঙ্গে আপনি দু'টি কল্যাণ লাভ করতে পারবেন। প্রথমত: ফজর নামাযের বিরাট ফযিলত হাসিল হবে। দ্বিতীয়ত: ভোরের স্বচ্ছ-সতেজ আবহাওয়া আপনার মেধা ও স্মরণশক্তিকে পুষ্টি জোগাবে।
১৫. যেকোনো বিষয় মুখস্থ ও আত্মস্থ করার জন্য উপযুক্ত স্থান বাছাই করুন। এর জন্য শোরগোল ও কোলাহলমুক্ত পরিবেশ অধিক উপযুক্ত।
১৬. রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর নির্দেশনা মোতাবেক পাকস্থলীকে তিনভাগে ভাগ করুন। এক ভাগ খাবারের জন্য আরেক ভাগ পানীয়র জন্য তৃতীয় ভাগ নিজের জন্য খালি রাখুন। বিজ্ঞ ডাক্তারদের অভিমত হলো, পাকস্থলী যত বেশি খাবার-দাবারে পূর্ণ হয়, খাদ্য হজমের জন্য পাকস্থলীর দিকে রক্ত চলাচল বেড়ে যায়। ফলে মস্তিষ্কের স্বাভাবিক রক্তচলাচল ব্যাহত হয়, যা মস্তিষ্ক ও স্মরণশক্তির জন্য ক্ষতিকর।
১৭. আপনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বারবার ফোকাস করুন। মনে রাখার জন্য এটা অত্যন্ত কার্যকর কৌশল। রবার্ট গ্রিন তাঁর كَيْفَ تُمْسِكُ بِزِمَامِ القُوَّةِ গ্রন্থে বলেছেন: 'গুরুত্বপূর্ণ প্রতিটি বিষয়ে বারবার ফোকাস করুন। কয়েক ধাপে একাধিকবার প্রাক্টিস করুন। বিষয়টি আপনার ভালোভাবে আত্মস্থ হয়ে যাবে।'
১৮. জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে খুঁটিনাটি বিষয় ভুলে যাওয়ার হাত থেকে যদি বাঁচতে চান, তাহলে কাজ শুরু করার আগে যাবতীয় প্রয়োজনীয় বস্তুর খোঁজ নেওয়ার কৌশল অবলম্বন করুন। যেমন: প্রতিদিন কাজে বের হওয়ার আগে আপনার যাবতীয় গুরুত্বপূর্ণ বস্তু সাথে নিয়েছেন কি না, খোঁজ করে দেখুন। আমি লক্ষ করেছি, বিমান-যাত্রায় নেভিগেটররা এ দায়িত্ব বেশ গুরুত্বের সাথে পালন করে। যাত্রা শেষে তারা যাত্রীদের সতর্ক করে দেয়, প্রত্যেকেই যেন নিজ দায়িত্বে যার যার সামানপত্র নিয়ে অবতরণ করে। ব্যক্তিজীবনে এ দায়িত্ব নিজেদেরই পালন করতে হবে।
১৯. যেকোনো ক্ষেত্রে চুক্তি, প্রতিশ্রুতি ও সম্মিলিত সিদ্ধান্ত ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো মৌখিকভাবে চূড়ান্ত না করে লিখিতরূপে সংরক্ষণ করুন। প্রয়োজনের মুহূর্তে অবিকল মনে করার জন্য এটি অত্যন্ত কার্যকর কৌশল। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা মেয়াদি ঋণ প্রদান করার ক্ষেত্রে ভুল থেকে বাঁচার দিকনির্দেশনা প্রদান করেছেন এবং ঋণের বিষয়টি লিখে রাখার আদেশ করেছেন: يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓا۟ إِذَا تَدَايَنتُم بِدَيْنٍ إِلَىٰٓ أَجَلٍ مُّسَمًّى فَٱكْتُبُوهُ [البقرة: ٢٨٢] অর্থ: 'হে মুমিনগণ! তোমরা যখন নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য কোন ঋণের কারবার কর, তখন তা লিখে নাও।' (বাকারা, ২: ২৮২)
২০. প্রতিদিনের গুরুত্বপূর্ণ কাজ ও দায়-দায়িত্বের একটি তালিকা তৈরি করুন। তালিকা তৈরির কাজটি চাইলে আপনি ক্যালেন্ডারে, নোটবুকে কিংবা মোবাইলের ক্যালেন্ডারের এড ইভেন্ট অপশনেও তৈরি করতে পারেন। তালিকা দেখে নির্দিষ্ট সময়ের কাজটি সহজেই মনে করতে পারবেন। মোবাইলে সেভ করে রাখলে মোবাইল স্বয়ংক্রিয়ভাবে নির্দিষ্ট সময়ে আপনার কাজের কথা মনে করিয়ে দিবে।
২১. আপনার ভুলো মানসিকতা ও স্মৃতিবিভ্রম যদি অতিমাত্রায় ও অস্বাভাবিক পর্যায়ের হয়ে থাকে, তাহলে আপনার মানসিক অবস্থার উন্নতির লক্ষ্যে ডাক্তারের শরণাপন্ন হতে কুণ্ঠিত হবেন না।
২২. মেধা ও স্মরণশক্তিকে দুর্বল করে দেয়, ভুলো মানসিকতা ও স্মৃতিবিভ্রম ঘটায়, এমন সমস্ত বস্তু পরিহার করুন। যেমন: অ্যালকোহল জাতীয় পানীয়, ধূমপান, মাদক, ড্রাগস ও অনবরত রাত্রিজাগরণ ইত্যাদি।
২৩. ভুলে যাওয়ার সমস্যা থেকে বাঁচার জন্য একটি কার্যকর পন্থা হলো, সদ্য-জানা বিষয়গুলোকে প্রসিদ্ধ কোনো স্থান কিংবা বিষয়ের সাথে জুড়ে দেওয়া। যেমন: অপরিচিত কারোর সাথে সাক্ষাৎ হলো। জিজ্ঞেস করে জানতে পারলেন, তার নাম মুহাম্মদ বিন আব্দুল্লাহ। আপনি ঠিক করে নিন, তার নাম তো অবিকল রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর নামের সাথে মিলে যায়। পরে কখনো তার সাথে দেখা হলে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর নামের বদৌলতে তার নামটি সহজেই মনে পড়ে যাবে।
২৪. যে বিষয়টি আপনি পড়েছেন ও মুখস্থ করেছেন, তা যদি ভুলে যান তাহলে দ্বিতীয়বার সরাসরি মুখস্থ করতে যাবেন না। এ পর্যায়ে আপনি বিষয়টির অর্থ, মর্ম ও ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণসহ বোঝার চেষ্টা করুন। এরপর বিষয়টির সারসংক্ষেপ লিখে আপনার টেবিলের ওপর সুন্দরভাবে সাজিয়ে রাখুন। কাজের ফাঁকে ফাঁকে বারবার দেখতে দেখতে বিষয়টি অনায়াসেই আত্মস্থ হয়ে যাবে।
২৫. পবিত্র কুরআনের এ দু'আটি বারবার পাঠ করুন: ﴿رَبَّنَا لَا تُؤَاخِذْنَا إِنْ نَّسِينَا أَوْ أَخْطَأْنَا﴾ [البقرة: ٢٨٦] অর্থ: '(হে মুসলিমগণ! তোমরা আল্লাহর কাছে এই দু'আ কর যে,) হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের দ্বারা যদি কোন ভুল-ত্রুটি হয়ে যায় তবে সে জন্য তুমি আমাদের পাকড়াও করো না।' (সূরা বাকারা, ২: ২৮৬)
২৬. বারবার ভুলে যাওয়ার কারণে শঙ্কিত হবেন না। আশাহত হয়ে পড়বেন না। মনে রাখবেন, বিস্মৃতি আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে এক বিরাট নিয়ামত। এক জীবনের সমস্ত দুঃখ-কষ্ট, বিপদ-আপদ ও জ্বালা-যন্ত্রণার কথা যদি মানুষ মনে করতে পারত, তাহলে এই মনঃকষ্টেই সে মৃত্যুবরণ করত।

পরিশিষ্ট:
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: إِنَّ اللهَ قَدْ تَجَاوَزَ عَنْ أُمَّتِي الْخَطَأَ وَالنَّسْيَانَ وَمَا اسْتُكْرِهُوا عَلَيْهِ» (سنن ابن ماجه) অর্থ: 'আল্লাহ তা'আলা আমার উম্মতের অনিচ্ছাকৃত ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করে দিয়েছেন এবং এমন অপরাধও ক্ষমা করে দিয়েছেন, যা করার জন্য তাদের বাধ্য করা হয়েছে।' (ইবনে মাযাহ, ১/৬৫৯)

ইমাম যাহাবী (রহ.) তাঁর 'সিয়ারু আলামিন নুবালা' গ্রন্থে এ ঘটনা উল্লেখ করেছেন: জনৈক মুহাদ্দিস তার ভুলো মনের কারণে প্রসিদ্ধ ছিলেন। এক রাতে তিনি সুস্বাদু মাছ নিয়ে বাড়িতে এলেন। মাছটি ভালোভাবে রান্না করতে বলে সামান্য বিশ্রামের জন্য বিছানায় পিঠ লাগালেন। এরপর কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছেন, নিজেও টের পাননি। ইতোমধ্যে মাছ রান্না হয়ে গেছে। একজন ডাকতে এসে দেখল, তিনি ঘুমিয়ে পড়েছেন। দিনভর ক্লান্তির পর ঘুম, জাগানো উচিত হবে না-এই ভেবে সে চলে গেল। পরিবারের সবাই রাতের খাবার শেষে শায়েখের হাতে আলগোছে মাছের তেল মাখিয়ে দিল। ফজরের আজানে শায়েখের ঘুম ভাঙল। উঠেই তিনি মাছ খেতে চাইলেন। বললেন: 'মাছ কোথায়? মাছ নিয়ে এস। আমি তো মাছ খাইনি।' পরিবারের সদস্যরা বলল: 'রাতে আমাদের সাথেই তো আপনি মাছ খেয়েছেন।' শায়েখ বললেন: 'কিছুতেই না, আমি মাছ খাইনি।' পরিবারের সদস্যরা বলল: 'তাহলে আপনার হাত শুঁকে দেখুন।' শায়েখ হাত শুঁকে মাছের ঘ্রাণ পেলেন। বললেন: 'তোমাদের কথাই ঠিক। বোধ হয় আমিই ভুলে গেছি।'

জনৈক দার্শনিক বলেছেন, 'মানুষের ওপর আল্লাহ তা'আলার দুটি বিশেষ অনুগ্রহ রয়েছে। এ দু'টি অনুগ্রহ ছাড়া সুখে শান্তিতে বাঁচতে পারতো না। দু'টি অনুগ্রহের একটি ভুলে যাওয়া, অপরটি আশা-ভরসা। দুঃখ বেদনার বিস্মৃতি ছাড়া অশ্রুসিক্ত চোখ নিদ্রাবিভোর হতে পারে না। আশা-ভরসার হাতছানি ব্যতীত বেদনাবিধূর হৃদয়ে আশার আলো জ্বলতে পারে না।

টিকাঃ
৫২. আদ্‌দাওয়াতুল কাবীর, ২/১৮৭
৫৩. দেহের গুরুত্বপূর্ণ একটি গ্রন্থি থাইরয়েড। থাইরয়েড গ্রন্থি একটি এনড্রোক্রাইন গ্ল্যান্ড। এটা মানুষের গলার সামনে অবস্থিত। এখান থেকে থাইরয়েড হরমোন তৈরি হয়। এই হরমোন শরীরের সব রেচন প্রক্রিয়ায় সাহায্য করে। বাচ্চাদের ক্ষেত্রে শারীরিক ও মানসিক বিকাশে বিশেষ ভূমিকা রাখে। থাইরয়েড গ্রন্থি ঠিকমতো কাজ না করলে শারীরিক এবং মানসিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। একটি শিশু যদি ছোটবেলা থেকে এর অভাবে ভোগে, তাহলে সে প্রতিবন্ধী হয়ে বড় হবে। যদি তাকে চিকিৎসা দেওয়া না হয়, সে বুদ্ধি ও শারীরিক প্রতিবন্ধী হয়ে যাবে। আর বড়দের ক্ষেত্রে থাইরয়েড গ্রন্থির বিভিন্ন রকম রোগ হতে পারে। থাইরয়েড যে হরমোন তৈরি করছে, এটি একটি স্বাভাবিক মাত্রার মধ্যে থাকবে। তবে যদি স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে কম তৈরি হয়, একে বলা হয় হাইপোথাইরয়েডিজম।

📘 আল হাল্লু জীবন সমস্যার সমাধান 📄 সড়ক দুর্ঘটনা

📄 সড়ক দুর্ঘটনা


যখন আমরা গাড়ি ড্রাইভ করি, আমাদের সামান্য অসতর্কতার কারণে মুহূর্তেই তা এক যন্ত্রদানব ও মরণাস্ত্রে পরিণত হতে পারে। গাড়িযোগে যে বিনোদন কেন্দ্র কিংবা কর্মস্থলে যাওয়ার কথা ছিল, তার পরিবর্তে আমাদের ঠিকানা হতে পারে (আল্লাহ না করুন) হাসপাতাল কিংবা কবরস্থান। বিশ্বে প্রতিনিয়ত ঘটে চলছে সড়ক দুর্ঘটনা। যন্ত্রদানবের তাণ্ডব প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে শিশু-কিশোর, যুবক-বৃদ্ধ, ছাত্র-ছাত্রী, ব্যবসায়ী ও পেশাজীবী নানা শ্রেণির মানুষের। সড়ক দুর্ঘটনা যেন মানবতার বিরুদ্ধে নীরব যুদ্ধ ও গুপ্তঘাতক। অতি সঙ্গোপনে কী নির্মমভাবে কতশতো মানুষের প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে!

সড়ক দুর্ঘটনার কারণে কত প্রাণ ঝরেছে, তার কোনো ইয়ত্তা নেই। কত রক্ত ঝরেছে, এর কোনো হিসাব নেই। কত পরিবার সমূলে ধ্বংস হয়েছে, কত অর্থ-সম্পদের ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে, এর কোনো হিসাব নেই। এমন বেদনাদায়ক দৃশ্য আমাদের প্রতিনিয়ত দেখতে হয় পত্র-পত্রিকায়, টিভির পর্দায়। হৃদয় কেঁপে উঠে যখন দেখি, একই পরিবারের পাঁচ-ছয়জন একসাথে নিহত হতে। বর্তমান বিশ্বে সড়ক দুর্ঘটনা নিত্যনৈমিত্তিক সংকটের রূপ পরিগ্রহ করেছে। এ সংকটের কবলে মায়েরা সন্তানহারা হচ্ছে। নারীরা বিধবা হচ্ছে। এতিম হচ্ছে সন্তান-সন্ততি। কত লোক অচল হয়ে বিছানায় পড়ে আছে। বিশ্বমানবতার কল্যাণে অবশ্যই আমাদের এ সমস্যা সমাধানের পথ খুঁজে বের করতে হবে। এ সংকট উত্তরণের পথ অবলম্বন করতে হবে।

সমাধান:
১. মা-বাবার পক্ষ থেকে সন্তানদের সতর্ক করতে হবে সড়ক দুর্ঘটনার ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে। তাদের মধ্যে সড়ক-চলাচল ও ট্রাফিক আইন সম্পর্কে সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে।
২. দেশের জনপ্রিয় প্রচার-মাধ্যমগুলোর সাহায্যে রাস্তা পারাপার, সড়ক ও ট্রাফিক আইন-শিক্ষামূলক কার্যক্রম সম্প্রচার করে জনসাধারণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। প্রাথমিক শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার্থীদের রাস্তা পারাপার ও সড়ক আইন সম্পর্কে অবহিত করা কর্তব্য।
৩. ড্রাইভিং লাইসেন্স অনুমোদনের সময় বয়সের বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে। বয়ঃসন্ধিকালের সদ্য তরুণদের ও উঠতি বয়সের ছেলে-মেয়েদের মধ্যে এক ধরনের হেঁয়ালিপনা ও খেয়ালি মানসিকতা প্রবল থাকে। এ বয়সের ছেলে-মেয়েদের হাতে গাড়ির চাবি ও ড্রাইভিং লাইসেন্স তুলে দিলে সড়ক নিরাপত্তা চরম হুমকির মুখে পড়বে।
৪. গাড়িচালকদের জন্য প্রশিক্ষণমূলক কার্যক্রম চালু করতে হবে। যেখানে ভিডিও চিত্র ও বাস্তবে প্রায়োগিক পদ্ধতিতে গাড়ি চালানোর কলাকৌশল এবং সড়ক ও ট্রাফিক আইন-কানুন সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। সঙ্গে সঙ্গে ড্রাইভারদের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার বিষয়ে সুনিশ্চিত হওয়ার জন্য তাদের মেডিকেল সার্টিফিকেট যাচাই করা কর্তব্য।
৫. নিরাপদ ও উন্নত সড়ক-ব্যবস্থা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কয়েকটি মৌলিক পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করতে হবে। * সড়ক নির্মাণ ও এর সুরক্ষার জন্য সর্বাধুনিক উন্নত ইঞ্জিনিয়ারিং প্ল্যান মোতাবেক কাজ করা এবং সময় ও প্রয়োজনানুযায়ী এর সংস্কার ও আধুনিকায়ন করা। * সড়কের দুপাশে পানি নিষ্কাশনের সুব্যবস্থা করা। * সড়কের পাশে গাড়ির সর্বোচ্চ গতি, প্রয়োজনীয় সতর্কতা ও সড়কের পাশে অবস্থিত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান ইত্যাদির দিকনির্দেশনা-সংবলিত ফলক স্থাপন করা। * পথচারীদের পারাপার ও গাড়ি পার্কিংয়ের সুব্যবস্থা করা। * যেকোনো সড়ক দুর্ঘটনায় দ্রুত অ্যাম্বুলেন্স ও চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা। * রাস্তার সংস্কার ও খননকাজ করার সময় ভারি যন্ত্রপাতি ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদি সাবধানে ব্যবহার করা।
৬. যারা সড়ক ও ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন করবে, তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইন প্রণয়ন করতে হবে। অপরাধের গুরুত্ব অনুযায়ী আর্থিক জরিমানা থেকে শুরু করে উপযুক্ত দণ্ডবিধি কার্যকর করতে হবে। যারা সুনির্দিষ্ট মেয়াদ পর্যন্ত ট্রাফিক আইন মেনে চলবে, জনসম্মুখে তাদের পুরস্কৃত করতে হবে। যেমন: কোনো গাড়িচালক সুদীর্ঘ পাঁচ বছর অবধি কোনো সড়ক ও ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন করেনি, রাস্তাঘাটে কোনো অ্যাক্সিডেন্ট করেনি এবং দুর্ঘটনার শিকার হয়নি। এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেননা ব্যক্তি খারাপ কাজ করল, সমাজের কেউ তাকে তিরস্কার করল না; আরেক ব্যক্তি ভালো কাজ করল, কারো পক্ষ থেকে সে পুরস্কৃত হলো না, বুঝতে হবে সমাজে অবক্ষয় চলছে।
৭. যখন যানবাহনে আরোহণ করবেন, দু'আ পড়তে ভুলবেন না। যানবাহনে আরোহণের দু'আ হলো: بِسْمِ اللهِ الْحَمْدُ للهِ، سُبْحَانَ الَّذِي سَخَّرَ لَنَا هَذَا وَمَا كُنَّا لَهُ مُقْرِنِينَ وَإِنَّا إِلَى رَبَّنَا لَمُنْقَلِبُونَ الْحَمْدُ لِلَّهِ الْحَمْدُ لِلَّهِ الْحَمْدُ للهِ اللهُ أَكْبَرُ، اللهُ أَكْبَرُ، اللهُ أَكْبَرُ، اللَّهُ أَكْبَرُ، سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ إِنِّي ظَلَمْتُ نَفْسِي فَاغْفِرْ لِي، فَإِنَّهُ لَا يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلَّا أَنْتَ
৮. প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বন করুন এবং আল্লাহ তা'আলার ওপর ভরসা করুন। এ বিষয়ে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর দিকনির্দেশনা শুনুন: قَالَ رَجُلٌ: يَا رَسُولَ اللَّهِ أَعْقِلُهَا وَأَتَوَكَّلُ، أَوْ أُطْلِقُهَا وَأَتَوَكَّلُ؟ قَالَ: «اعْقِلْهَا وَتَوَكَّلْ» (سنন الترمذي) অর্থ: জনৈক সাহাবি এসে জিজ্ঞেস করলেন: 'ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমি কি উট বেঁধে তার নিরাপত্তার ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলার ওপর ভরসা করব? না কি লাগামহীন ছেড়ে দিয়ে আল্লাহর ওপর ভরসা করব?' রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন: 'প্রথমে তুমি উট বাঁধ, তারপর আল্লাহর ওপর ভরসা কর।' (তিরমিযী, ৪/৬৬৮) সুতরাং আপনি নিজের সাধ্যমতো সতর্কতা অবলম্বন করুন। পথনির্দেশ ও ট্রাফিক সিগন্যাল মেনে চলুন। সড়ক ও ট্রাফিক আইন রক্ষায় প্রতিশ্রুতিশীল হোন।
৯. গাড়ি চালানো ও হেঁটে চলাচল করার ক্ষেত্রে কয়েকটি আইন মেনে চলুন: ট্রাফিক পুলিশের সম্মান বজায় রাখুন। দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে তাকে সহযোগিতা করুন। অনর্থক হর্ন বাজিয়ে শব্দ দূষণ সৃষ্টি করা থেকে বিরত থাকুন। সড়ক অনুযায়ী গাড়ির নির্দিষ্ট গতিসীমা বজায় রাখুন। রাস্তায় ময়লা-আবর্জনা ফেলা থেকে বিরত থাকুন। কষ্টদায়ক বস্তু দেখলে সরিয়ে ফেলুন।
১০. অহংকার ও দাম্ভিকতাপূর্ণ চাল ছেড়ে বিনম্রভাবে চলাচল করুন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলার নির্দেশ: ﴿وَلَا تَمْشِ فِي الْأَرْضِ مَرَحًا إِنَّكَ لَنْ تَخْرِقَ الْأَرْضَ وَلَنْ تَبْلُغَ الْجِبَالَ طُولًا﴾ [الإسراء: ٣٧] অর্থ: 'ভূপৃষ্ঠে দম্ভভরে চলো না। তুমি তো ভূমিকে ফাটিয়ে ফেলতে পারবে না এবং উচ্চতায় পাহাড় পর্যন্ত পৌঁছতে পারবে না। (বনী ইসরাঈল, ১৭: ৩৭)
১১. আপনি যদি পায়ে হেঁটে যাত্রা করেন, তাহলে দুর্ঘটনা এড়ানোর জন্যে রাস্তার পাশে কিংবা পথচারীদের জন্য নির্ধারিত পথে যাতায়াত করুন। রাস্তা পার হওয়ার সময় সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করুন। তড়িঘড়ি করে রাস্তা পার হওয়ার প্রবণতা ছেড়ে ট্রাফিক সিগন্যালের অপেক্ষা করুন।
১২. গাড়ি চালানোর সময় অবশ্যই মনে রাখতে হবে, যাত্রীদের সুরক্ষা ও নিরাপত্তা আপনার প্রধান কর্তব্য, মহাগুরুত্বপূর্ণ আমানত। আপনার সামান্য অবহেলায় অসতর্কতায় যাত্রীদের জান-মাল বিরাট ঝুঁকির কবলে পড়তে পারে। মারাত্মক দুর্ঘটনার শিকার হতে পারে।
১৩. নেশাগ্রস্ত, মানসিক ভারসাম্যহীন, নিদ্রাকাতর, ক্লান্তশ্রান্ত, ভীষণ মানসিক যন্ত্রণায় পীড়িত, দৃষ্টি ও শ্রবণশক্তি দুর্বল ইত্যাদি প্রতিকূল অবস্থায়-যা আপনার ও যাত্রীদের জীবন ঝুঁকিতে ফেলতে পারে-গাড়ি চালানো থেকে বিরত থাকতে হবে।
১৪. রাতে গাড়ি চালাতে হলে ফ্লাগলাইট, পেছনের লাল-বাতি, হলুদ বাতি ঠিক আছে কি না, নিশ্চিত হোন। এ বাতিগুলোর সাহায্যেই অন্যান্য গাড়ির চালকগণ আপনার গতিবিধি বুঝতে পারবে। রাতে রাস্তায় চলাচল করতে হলে উজ্জ্বল রঙের জামা পরিধান করুন। যেন গাড়ির চালকরা সহজেই আপনার উপস্থিতি লক্ষ করতে পারে।
১৫. নিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে গাড়ির ফিটনেস যাচাই করুন। এ বিষয়ে আপনার সামান্য অবহেলা ও গাড়ির ফিটনেসের ঘাটতি বড় ধরনের বিপদ ডেকে আনতে পারে। গাড়ি মেরামতের প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদি সাথেই রাখুন। যেন পথিমধ্যে আকস্মিক সমস্যাগুলোতে গাড়ির প্রাথমিক মেরামত নিজেই সেরে ফেলতে পারেন।
১৬. গাড়ি চালানোর সময় অন্য সমস্ত চিন্তা-ভাবনা বাদ দিয়ে সামনের রাস্তায় মনোযোগ ও দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখুন। আপনার সামনে চলন্ত গাড়ির সাথে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখুন।
১৭. গাড়ি চালানোর সময় বিশেষভাবে মোবাইলে কথাবার্তা কিংবা কোনো যাত্রীর সাথে আলাপ-আলোচনা থেকে বিরত থাকুন।
১৮. সুনির্দিষ্ট সিগন্যালের সাহায্যে অন্য চালকদের আপনার গতিবিধির জানান দিন। যেমন: ডানে-বায়ে মোড় নেওয়ার সময় কিংবা গাড়ি থামানোর সময় সিগন্যাল দিয়ে পেছনের চালকদের সতর্ক করুন। অতিরিক্ত গতি বাড়িয়ে সামনের গাড়িগুলোকে ওভারটেক করার চেষ্টা করবেন না। পেছনের গাড়ি আপনার আগে চলে যাওয়ার কারণে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হবেন না।
১৯. সড়ক দুর্ঘটনার সময় কৌতূহলজনিত ভিড় না করে নিরাপত্তা ও মেডিকেলকর্মীদের উদ্ধারকাজে সহযোগিতা করুন। আহত-নিহতে সাহায্যে এগিয়ে আসুন। এ সময় কৌতূহলী জনতার অযাচিত ভিড় উদ্ধারকর্মীদের কাজে ব্যাঘাত সৃষ্টি করে। এমন গুরুতর মানবিক বিপর্যয়ের মুহূর্তে বিপদগ্রস্ত লোকদের সাহায্য-সহযোগিতায় এগিয়ে না এসে তাদের ছবি ও ভিডিও চিত্র ধারণ করে প্রচার করা কোনোভাবেই সমীচীন নয়।

পরিশিষ্ট:
* ব্রিজেট ড্রস্কল বিশ্বে প্রথম ব্যক্তি, যিনি সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান। দুর্ঘটনাটা ঘটেছিল ১৮৯৬ সালের ১৭ আগস্ট লন্ডন শহরে। তিনি ছিলেন দু' সন্তানের জননী। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স ছিল ৪৪ বছর। সড়ক দুর্ঘটনাটি ঘটার সময় তিনি ঘণ্টায় ১২ কিলোমিটার বেগে গাড়ি চালাচ্ছিলেন। জানা যায়, তখনকার যুগে কেউ সাধারণত ছয় কিলোমিটারের চেয়ে বেশি গতিতে গাড়ি চালাত না। সড়ক দুর্ঘটনায় ব্রিজট ড্রস্কনের মৃত্যুর পর জনৈক গবেষক লোকদের সতর্ক করে বলেছিলেন, 'ভবিষ্যতে যেন এমন দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি না হয়।' তাঁর এমন কঠোর সতর্কবাণীর পরও সড়ক দুর্ঘটনায় কত লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে, আজও ঘটছে, তার কোনো হিসাব নেই।
* আমেরিকান প্রবাদ: 'কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে চিরদিনের জন্য না পৌঁছানোর চেয়ে সাময়িক গন্তব্যে একটু বিলম্বে পৌঁছাই শ্রেয়।'

ফন্ট সাইজ
15px
17px