📄 অন্ধ অনুকরণ
তাকলীদ হলো অন্যের কথা মান্য করা, তার মতো করে কাজ করা। তাকলীদ দুই প্রকার:
এক. যে তাকলীদ ওয়াজিব ও মুস্তাহাব, তার উদ্দেশ্য হলো, কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য-উদ্দেশ্য অর্জন করা এবং ইহকালে ও পরকালে সফলতা লাভ করা। যেমন: রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সুন্নাহ ও আদর্শের অনুসরণ করা। তাঁর আনীত আসমানি কিতাব কুরআনের বিধি-বিধান মেনে চলা। এর বাইরে বিজ্ঞ পণ্ডিত, মহামনীষী বা অন্যদের ভালো কথা ও হিতাকাঙ্ক্ষামূলক উপদেশ মেনে চলাও কর্তব্য। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা এমন ন্যায়-নীতি ও সত্যানুসারী লোকদের হেদায়েতপ্রাপ্ত ও জ্ঞানী বলে আখ্যায়িত করেছেন:
الَّذِينَ يَسْتَمِعُونَ الْقَوْلَ فَيَتَّبِعُونَ أَحْسَنَهُ أُولَئِكَ الَّذِينَ هَدُهُمُ اللَّهُ وَأُولَئِكَ هُمْ أُولُو الْأَلْبَابِ﴾ [الزمر: ١٨]
অর্থ: 'যারা কথা শোনে মনোযোগ দিয়ে, অতঃপর তার মধ্যে যা-কিছু উত্তম তার অনুসরণ করে, তারাই এমন লোক, যাদেরকে আল্লাহ হেদায়াত দান করেছেন এবং তারাই বোধশক্তিসম্পন্ন।' (যুমার, ৩৯: ১৮)
দুই. যে তাকলীদ হারাম ও নিন্দনীয়। এটাকে বলে 'আত্তাক্লীদুল আ'মা' (অন্ধ অনুকরণ)। অর্থাৎ, কোনো দলিল-প্রমাণ ছাড়া অন্যের কথা ও মতাদর্শ গ্রহণ করা। কুরআন-সুন্নাহর মানদণ্ডে বিচার না করে, সুস্থ বিবেক-বুদ্ধির আলোকে যাচাই না করে একরোখাভাবে কারো অনুসরণে লেগে যাওয়া।
এমন অন্ধ-অনুকরণের কবলে ব্যক্তি তার ভালো-মন্দ যাচাই করার শক্তি হারিয়ে ফেলে। বোধ-উপলব্ধি ও বিবেক-বুদ্ধিতে সে নিস্তেজ অকার্যকর হয়ে পড়ে। তার দু' চোখ খোলা; কিন্তু আলোহীন। সে দেখে; কিন্তু অন্যের চোখে। গ্রহণ করে অন্যের দৃষ্টিভঙ্গি। তার কান সজাগ উৎকর্ণ; কিন্তু শোনে অন্যের মতো করে। তার নিজস্ব কোনো বক্তব্য নেই। সর্বদা অন্যের বুলি মুখস্থ আওড়িয়ে বেড়ায়। স্বতন্ত্র চিন্তা-চেতনার ঘর শূন্য। অন্যের ভাবধারায় আকণ্ঠ নিমজ্জিত।
এভাবে নিজের অজান্তে কখন-যে কুরআন-সুন্নাহর আদর্শচ্যুত হয়ে পড়ে, ঠাওর করতে পারে না। যখন বুঝতে পারে ফিরে আসার পথ থাকে না। কুরআন-সুন্নাহর আলোকে আদর্শ ও মতাদর্শ অনুসরণের জন্য অবশ্যই মানবরচিত আদর্শের অন্ধ অনুকরণের গণ্ডি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। কিন্তু তার উপায় কী? অন্ধ অনুকরণ সমস্যার যথার্থ সমাধানই বা কী?
সমাধান:
১. মনে রাখতে হবে, নিঃশর্ত আনুগত্য ও প্রশ্নাতীত অনুসরণ একমাত্র আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের জন্য। এ ব্যাপারে ইসলাম কোনো ধরনের শিথিলতা ও আপসরফার মনোভাব সমর্থন করে না। কেননা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ﷺ-এর আনুগত্য এমন কোনো বিষয় নয়, যাতে যৌক্তিক মতভেদ হতে পারে। অতএব মতামতের স্বাধীনতার মূলনীতি এখানে অচল।
২. এ কথা স্বীকার করতে হবে ও বিশ্বাস করতে হবে যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ মাসুম ও গুনাহমুক্ত। কথাবার্তা ও কর্মপদ্ধতিতে, আদর্শে ও মতাদর্শে তিনি যাবতীয় ভুল-বিচ্যুতির ঊর্ধ্বে। কেননা নিজের পক্ষ থেকে তিনি কিছুই বলতেন না। যা বলতেন, মহান আল্লাহ রাব্বুল 'আলামীনের পক্ষ থেকে ওহীর আলোকে বলতেন। যা কিছু করতেন, আল্লাহ তা'আলার নির্দেশ মোতাবেক করতেন। তিনি ব্যতীত যে কেউ ভুলের শিকার হতে পারে। ভুল করে বসতে পারে নিজের অজান্তেই। তাই অন্যদের মতামত ও আদর্শ যদি কুরআন-সুন্নাহর মানদণ্ডে হয় তাহলে গ্রহণযোগ্য, অন্যথায় তা বিবর্জিত।
৩. শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা ইনস্টিটিউটগুলোতে নিত্য-নতুন আবিষ্কার ও উদ্ভাবনের কর্মপ্রচেষ্টা সচল রাখতে হবে। প্রতিটি আবিষ্কার ও উদ্ভাবন হতে হবে মানব-কল্যাণমুখী, জীবন-জগতের প্রয়োজন ও বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্যশীল, যা ইহজাগতিক জীবনের গতিময়তা বৃদ্ধি করবে এবং পরকালের কাঙ্ক্ষিত সফলতা অর্জনের পথ সুগম করবে।
৪. অন্যান্য জাতিবর্গের সভ্যতা-সংস্কৃতি ও সফলতার ইতিবাচক দিকগুলো গ্রহণ করে তাদের উদ্ভট চিন্তাপ্রসূত মতাদর্শ, অন্যায়-অন্যায্য কৃষ্টিকালচার ও ভ্রষ্টাচার পরিহার করা কর্তব্য। এক্ষেত্রে মূলনীতি হলো: الْكَلِمَةُ الْحِكْمَةُ ضَالَّةُ الْمُؤْمِنِ فَحَيْثُ وَجَدَهَا فَهُوَ أَحَقُّ بِهَا অর্থ: প্রজ্ঞার বাণী হলো মু'মিনের হারানো ধন। যেখানেই তা পাওয়া যাবে, মুমিনই হলো এর অগ্রগণ্য হকদার।
৫. দেশের সর্বত্র গবেষণা ইনস্টিটিউট ও শিল্পকারখানা গড়ে তুলতে হবে। যেন মেধাবী ও যোগ্য ব্যক্তি তার মেধা ও যোগ্যতা কাজে লাগানোর উপযুক্ত সুযোগ পায়। বিজ্ঞান ও গবেষণার প্রতিটি শাখা-প্রশাখায় উন্নতি-অগ্রগতির লক্ষ্যে কাজ করতে হবে। এক্ষেত্রে কুরআন-সুন্নাহর বিচারে বিশুদ্ধতা ও যুগের চাহিদার মাঝে সমন্বয় করে কাজ করা আবশ্যক। এ দুয়ের মধ্যে যদি কখনো সংঘাত দেখা দেয়, তবে কুরআন-সুন্নাহর আদর্শই হতে হবে অগ্রগণ্য।
৬. গবেষণা, আবিষ্কার ও উদ্ভাবনের সমস্ত শাখা-প্রশাখায় তরুণ প্রজন্মের জন্য উন্নত শিক্ষা-দীক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। তাদের ব্যক্তিত্ব গঠন ও আত্মোন্নয়নের লক্ষ্যে কাজ করতে হবে, যেন তারা বিশ্বসমাজে নিজেদের ব্যক্তিত্ব, স্বাতন্ত্র্য ও স্বকীয়তা বজায় রেখে সসম্মানে টিকে থাকতে সক্ষম হয়।
৭. যুগে যুগে ধর্মীয় সংস্কারক, বুদ্ধি ও চিন্তার জগতে নতুন দিগন্ত উন্মোচনকারী মহীয়সী ব্যক্তিদের জীবনী অধ্যয়ন করতে হবে। তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন ইমাম শাফেয়ী, ইবনে তাইমিয়াহ, ইবনে খালদুন ও ইবনুন নাফীস (রহ.) প্রমুখ।
৮. মনে রাখতে হবে, পবিত্র কুরআনে বহুবার অন্ধ অনুকরণের সমালোচনা করা হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা বলেছেন:
وَإِذَا قِيلَ لَهُمُ اتَّبِعُوا مَا أَنْزَلَ اللَّهُ قَالُوا بَلْ نَتَّبِعُ مَا أَلْفَيْنَا عَلَيْهِ آبَاءَنَا أَوَلَوْ كَانَ آبَاؤُهُمْ لَا يَعْقِلُونَ شَيْئًا وَلَا يَهْتَدُونَ)
অর্থ: 'যখন তাদেরকে (কাফিরদেরকে) বলা হয়, আল্লাহ যে বাণী নাযিল করেছেন তার অনুসরণ কর, তখন তারা বলে, না, আমরা তো কেবল সে সকল বিষয়েরই অনুসরণ করব, যার ওপর আমরা আমাদের বাপ-দাদাকে পেয়েছি। আচ্ছা! সেই অবস্থায়ও কি (তাদের এটাই করা উচিত) যখন তাদের বাপ-দাদা (দ্বীনের) কিছুমাত্র বুঝ-সমঝ রাখত না? আর তারা কোন (ঐশী) হিদায়াতও লাভ করেনি?' (বাকারা, ২: ১৭০)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
لَتَتَّبِعُنَّ سَنَنَ مَنْ قَبْلَكُمْ شِبْرًا بِشِبْرٍ، وَذِرَاعًا بِذِرَاعٍ، حَتَّى لَوْ سَلَكُوا جُحْرَ ضَبٌ لَسَلَكْتُمُوهُ، قُلْنَا يَا رَسُولَ اللهِ: اليَهُودَ، وَالنَّصَارَى قَالَ: «فَمَنْ ) صحيح البخاري (١٦٩/٤
অর্থ: (আমি আশঙ্কা করছি,) তোমরা অবশ্যই তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের রীতি-নীতি অক্ষরে অক্ষরে অনুসরণ করবে (যা আদৌ করা উচিত নয়)। এমনকি তারা যদি গুঁইসাপের গর্তেও ঢুকে যায়, তোমরাও তাতে ঢুকবে।' সাহাবায়ে কিরাম জিজ্ঞেস করলেন, 'ইয়া রাসূলুল্লাহ, তারা কি ইহুদী ও খ্রিষ্টান?' জবাবে তিনি বললেন, 'তারা ছাড়া আর কে?' (বুখারী, ৪/১৬৯)
৯. যারা অন্ধ অনুকরণের পথে হাঁটে তারা শয়তানের খেলার পুতুলে পরিণত হয়। পাপাচার, অনাচার, শিরক, ধর্মচ্যুতি ও নাস্তিকতার ময়দানে শয়তান তাদের নিয়ে খেলে বেড়ায়। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন:
وَجُوَزْنَا بِبَنِي إِسْرَاعِيلَ الْبَحْرَ فَأَتَوْا عَلَى قَوْمٍ يَعْكُفُونَ عَلَى أَصْنَامٍ لَّهُمْ قَالُوا يُمُوسَى اجْعَلُ لَّنَا إِلَهَا كَمَا لَهُمْ آلِهَةٌ قَالَ إِنَّكُمْ قَوْمٌ تَجْهَلُونَ * إِنَّ هَؤُلَاءِ مُتَبَّرٌ مَّا هُمْ فِيْهِ وَبُطِلٌ مَّا كَانُوا يَعْمَلُونَ﴾ [الأعراف : ۱۳৮، ۱۳۹]
অর্থ: 'আমি বনী ইসরাঈলকে সাগর পার করিয়ে দিলাম। অতঃপর এমন কিছু লোকের নিকট দিয়ে অতিক্রম করল যারা তাদের মূর্তিপূজায় রত ছিল। বনী ইসরাঈল বলল, হে মূসা! এদের যেমন দেবতা আছে, তেমনি আমাদের জন্যও কোন দেবতা বানিয়ে দাও। মূসা বলল, তোমরা এমন (আজব) লোক যে, মূর্খতাসূলভ কথা বলছ। নিশ্চয়ই এসব লোক যে ধান্ধায় লেগে আছে, সব ধ্বংস হয়ে যাবে এবং তারা যা-কিছু করছে সব ভ্রান্ত।' (সূরা আ'রাফ: ১৩৮-১৩৯)
১০. বর্তমান তরুণ প্রজন্ম ও যুব সমাজের মধ্যে কুরআন-সুন্নাহর আদর্শ ও ধর্মীয় শিক্ষা-দীক্ষার প্রচার-প্রসার ঘটাতে হবে। সজাগ করে তুলতে হবে ধর্মীয় মূল্যবোধ ও ঈমানী চেতনা। শিষ্টাচার, শালীনতা ও নীতি-নৈতিকতাবোধের ভিত্তি সুদৃঢ় করতে হবে। বয়ঃসন্ধিকাল ও যৌবনের দূরন্ত আবেগ-উদ্দীপনার মুহূর্তে নানা পথ ও মতাদর্শের পিচ্ছিল অঙ্গনে ধর্মীয় শিক্ষা-দীক্ষাহীন অবাধ বিচরণ কখনই আশঙ্কামুক্ত নয়।
১১. পারিবারিক সম্পর্ক ও সম্প্রীতির বন্ধন অটুট রেখে সন্তানদের ওপর আদর-স্নেহ ও প্রজ্ঞাপূর্ণ তত্ত্বাবধান বজায় রাখতে হবে। এক্ষেত্রে অসৎসঙ্গ ও ভ্রষ্ট মতাদর্শ থেকে সতর্ক করে সৎসঙ্গ ও প্রকৃত আদর্শে অনুপ্রাণিত করা অত্যধিক গুরুত্বপূর্ণ। অন্ধভক্তির কবল থেকে বাঁচিয়ে কুরআন-সুন্নাহর আদর্শে পরিচালিত করা সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
১২. হিংসা-বিদ্বেষ, অন্যের কর্মধারা ও ভাবাদর্শের অন্ধ অনুকরণের মানসিকতা পরিহার করা বাঞ্ছনীয়। তার পরিবর্তে নিজ যোগ্যতা ও দক্ষতাবলে এগিয়ে যাওয়ার মানসিকতা লালন করা কর্তব্য। এটাই সফলতার মূল চাবিকাঠি।
১৩. অবসর ও ছুটিতে ছেলে-মেয়েদের সাথে সময় কাটাতে হবে। তাদের সাথে মহতি উদ্যোগ-আয়োজনে শামিল হতে হবে। দীর্ঘ ছুটিতে ছেলে-মেয়েদের বন্ধু-বান্ধবের সাথে লাগামহীন মেলামেশা এবং যত্রতত্র অবাধ বিচরণ, নানা পথ ও মতাদর্শের অন্ধ অনুকরণের ঘেরাটোপে আবদ্ধ হওয়ার আশঙ্কা বৃদ্ধি করে।
১৪. পশ্চিমা সভ্যতা-সংস্কৃতি ও কৃষ্টি-কালচারের চাকচিক্যপূর্ণ ও জমকালো আয়োজন দেখে প্রতারিত না হবেন না। কুরআন-সুন্নাহর আদর্শ, এর স্বকীয়তা ও স্বাতন্ত্র্যের গৌরব ধারণ করুন। ইসলাম মানবতার কল্যাণে আকিদা-বিশ্বাস, সাম্য, ভ্রাতৃত্ব, ন্যায়ানুগতা ও শুদ্ধাচারের যে মহান বার্তা নিয়ে আগমন করেছে, মানবসমাজ ও সভ্যতাকে যে অন্যায়-অনাচার, পাপাচার-নষ্টাচার এবং কুফর-শিরকের অন্ধকার থেকে উদ্ধার করেছে, তা ভুলে গেলে চলবে না। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা উম্মতে মুহাম্মদীর উদ্দেশ্যে বলেছেন:
كُنْتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَتَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَتُؤْمِنُونَ بِاللهِ وَلَوْ آمَنَ أَهْلُ الْكِتٰبِ لَكَانَ خَيْرًا لَّهُمْ * مِنْهُمُ الْمُؤْمِنُونَ وَأَكْثَرُهُمُ الْفَسِقُونَ﴾ [آল عمران: ১১০]
অর্থ: '(হে মুমিনগণ!) তোমরা সেই শ্রেষ্ঠতম দল, যাদেরকে মানুষের কল্যাণের জন্য যাদের অস্তিত্ব দান করা হয়েছে। তোমরা পুণ্যের আদেশ করে থাক ও অন্যায় কাজে বাধা দিয়ে থাক এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান রাখ। কিতাবীগণ যদি ঈমান গ্রহণ করত, তাহলে তাদের জন্য তা কতই না উত্তম হত। তাদের মধ্যে কতক তো ঈমানদার, কিন্তু তাদের অধিকাংশই নাফরমান।' (সূরা আলে-ইমরান : ১১০)
পরিশিষ্ট:
মালেকী মাযহাবের বিশিষ্ট ইমাম আল্লামা ইবনে আব্দুল বার (রহ.) (৩৬৮-৪৬৩ হি.) অন্ধ অনুকরণের নিন্দা করে বলেছেন:
'ওলামায়ে কিরামের নিকট অনুসরণ আর অন্ধ অনুকরণ এক নয়। অনুসরণ হলো, বক্তার বক্তব্যের তত্ত্ব, মর্ম ও যথার্থতা অনুধাবন করে তা গ্রহণ করা এবং মেনে চলা। আর অন্ধ অনুকরণ হলো, না বুঝে, না জেনে প্রকৃত মর্ম ও তত্ত্ব অনুধাবন না করে কারো কথা গ্রহণ করা, কোনো মতাদর্শ আঁকড়ে থাকা।'
আল্লামা ইবনে আব্দুল বার (রহ.) অন্ধ অনুকরণের নিন্দা করেছেন শিক্ষণীয় শৈলীতে ও চমকপ্রদ ও কবিতার ভাষায়:
يَا سَائِلِي عَنْ مَوْضِعِ التَّقْلِيدِ خُذْ عَنِّي الْجَوَابَ بِفَهْمِ لُبِّ حَاضِرِ
وَاصْغِ إِلَى قَوْلِي وَدِنْ بِنَصِيحَتِي وَاحْفَظْ عَلَيَّ بَوَادِرِي وَنَوَادِرِي
لَا فَرْقَ بَيْنَ مُقَلَّدٍ وَبَهِيمَة تَنْقَادُ بَيْنَ جَنَادِلَ وَدَعَائِرِ
تَبًّا لِقَاضٍ أَوْ لِمُفْتٍ لَا يَرَى عِلَلًا وَمَعْنَى لِلْمَقَالِ السَّائِرِ
فَإِذَا اقْتَدَيْتَ فَبِالْكِتَابِ وَسُنَّةِ الْمَبْعُوثِ بِالدِّينِ الْحَنِيفِ الطَّاهِرِ
ثُمَّ الصَّحَابَةِ عِنْدَ عُدْمِكَ سُنَّةً فَأُولَاكَ أَهْلُ نَهَى وَأَهْلُ بَصَائِرِ
وَكَذَاكَ إِجْمَاعُ الَّذِينَ يَلُونَهُمْ مِنْ تَابِعِيهِمْ كَابِرًا عَنْ كَابِرِ
إِجْمَاعُ أُمَّتِنَا وَقَوْلُ نَبِيِّنَا مِثْلُ النُّصُوصِ لِذِي الْكِتَابِ الزَّاهِرِ
অর্থ: তাকলীদ সম্পর্কে প্রশ্নকারী, দিল-মন লাগিয়ে গভীর মনোযোগে উত্তর শুনে নাও! আমার হিতোপদেশ গ্রহণ কর!
অন্ধ-অনুকরণকারী ও ঐ গবাদিপশুর মাঝে কোনো তফাৎ নেই, যা পালের পশুগুলোর দেখাদেখি চরছে। কোথায় যাচ্ছে, কেন যাচ্ছে-এ সবই তার অজানা।
হতভাগা ঐ কাযী ও মুফতী, যে কথার তত্ত্ব ও মর্ম অনুধাবন করতে পারে না, প্রবাদ বাক্যের অর্থ জানে না।
তুমি যদি অনুসরণ করতেই চাও, তাহলে আসমানি কিতাব 'আল-কুরআন' ও সঠিক ধর্ম ইসলাম নিয়ে আগত রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সুন্নাহর নিঃশর্ত অনুসরণ অত্যাবশ্যক।
সুন্নাহর অবর্তমানে সাহাবায়ে কিরামের আদর্শ অগ্রগণ্য। কেননা তাঁরা হলেন কুরআন-সুন্নাহর গভীর জ্ঞান ও অগাধ পাণ্ডিত্যের অধিকারী।
এরপরই পর্যায়ক্রমে তাবেয়ীন, তাবে-তাবেয়ীন ও আইম্মায়ে মুজতাহিদীন-এর সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত অনুসরণীয়। আইম্মায়ে কিরামের ইজমা ও রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সুন্নাহ পবিত্র কুরআনের মতোই অবশ্য পালনীয়।
টিকাঃ
৪১. তাকলীদ: অনুসরণ-অনুকরণ.
৪২. ওয়াজিব: অত্যাবশ্যক.
৪৩. মুস্তাহাব: পছন্দনীয়.
৪৪. হারাম: নিষিদ্ধ.
৪৬. ইজমা: সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত.
📄 যাদু
যাদু হলো একটা বস্তুকে তার আসল রূপ থেকে বের করে বিভ্রম ঘটানো কিংবা বস্তুকে অতি প্রকৃতরূপে দেখানো। যাদুকররা বিভিন্ন উপায় অবলম্বন করে দর্শকদের দৃষ্টি-বিভ্রম ঘটায়, তাদের কল্পনা শক্তিকে নিয়ন্ত্রিত করে ফেলে। এমনকি যাদুর সাহায্যে তারা মানুষের নানাবিধ ক্ষতিসাধন করতেও সক্ষম।
শরীয়তের দৃষ্টিতে যাদু সম্পূর্ণরূপে হারাম এবং জঘন্যতম কবীরা গুনাহ। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«اجْتَنِبُوا السَّبْعَ المُوبِقَاتِ»، قَالُوا: يَا رَسُولَ اللَّهِ وَمَا هُنَّ؟ قَالَ: «الشَّرْكُ بِاللهِ، وَالسِّحْرُ، وَقَتْلُ النَّفْسِ الَّتِي حَرَّمَ اللَّهُ إِلَّا بِالحَقِّ، وَأَكْلُ الرِّبَا، وَأَكْلُ مَالِ اليَتِيمِ، وَالتَّوَلِّي يَوْمَ الرَّحْفِ، وَقَذْفُ المُحْصَنَاتِ المُؤْمِنَاتِ الغَافِلاتِ» صحيح البخاري (١٠/٤)
অর্থ: ধ্বংসাত্মক সাতটি বিষয় পরিহার কর। সাহাবায়ে কিরাম জিজ্ঞেস করলেন: 'ইয়া রাসূলুল্লাহ, সাতটি ধ্বংসাত্মক বিষয় কী?' রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন: ১. আল্লাহর সাথে শিরক করা। ২. যাদু করা। ৩. অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করা, যা আল্লাহ তা'আলা হারাম করে দিয়েছেন। ৪. সুদ খাওয়া। ৫. এতিমের সম্পদ আত্মসাৎ করা। ৬. জিহাদের ময়দান থেকে পলায়ন করা। ৭. সতী-সাধ্বী মু'মিন নারীকে অপবাদ দেওয়া। (বুখারী, ৪/১০)
যাদু প্রকারান্তরে একপ্রকার কুফুরি ও চরম ভ্রষ্টতা। কেননা যাদু-টোনা করতে গিয়ে মানুষ আল্লাহ ব্যতীত শয়তানের অনুসরণ উপাসনায় লিপ্ত হয়ে পড়ে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন:
وَاتَّبَعُوا مَا تَتْلُو الشَّيَاطِينُ عَلَى مُلْكِ سُلَيْمَانَ وَمَا كَفَرَ سُلَيْمَانُ وَلَكِنَّ الشَّي္طِينَ كَفَرُوا يُعَلِّمُونَ النَّاسَ السِّحْرَ [البقرة: ١٠٢]
অর্থ: 'আর তারা (বনী ইসরাঈল) সুলায়মান (আ.)-এর শাসনামলে শয়তানগণ যা-কিছু (মন্ত্র) পড়ত, তার পেছনে পড়ে গেল। সুলায়মান (আ.) কোন কুফর করেনি। অবশ্য শয়তানগণ মানুষকে যাদু শিক্ষা দিয়ে কুফরীতে লিপ্ত হয়েছিল।' (বাকারা, ২: ১০২)
যাদুগ্রস্ত ব্যক্তিদের মধ্যে যাদুর ক্ষতিকর প্রভাব বিভিন্নভাবে প্রতিফলিত হয়। যাদুতে আক্রান্ত হয়ে কেউ নামায, রোযা, যিকির ও কুরআন তিলাওয়াত, মোটকথা নেক আমল ও যাবতীয় ভালো কাজ থেকে বিমুখ হয়ে পড়ে। কেউ কেউ আবার নানান উদ্ভট জল্পনা-কল্পনা ও দুঃস্বপ্নের জটিল ঘোরে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। যাদুর শিকার হয়ে কত পরিবার ভেঙে গেছে, কত আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন হয়েছে, কত লোক নানা দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়েছে, তার কোনো ইয়ত্তা নেই।
বর্তমান সমাজে যাদু একটি মহাসংকট ও নীরব ঘাতক। সময়ের সাথে এ সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। এ সংকট থেকে উত্তরণের পথ কী? এ সমস্যা কাটিয়ে উঠার উপায় কী?
সমাধান:
১. প্রথমেই বুঝতে হবে, যাদু নিয়তির অবধারিত ফায়সালা ও ইহজাগতিক অনুমোদনের ভিত্তিতে হয়ে থাকে। তবে তা শরীয়ত-অনুমোদিত নয়। ইহজাগতিক অনুমোদনের অর্থ হলো, যে বিষয়ের বাস্তবায়ন আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে পূর্বনির্ধারিত ও অবধারিত, কিন্তু অনুমোদিত নয়। আল্লাহ তা'আলা তা করার আদেশ করেননি এবং তিনি তা পছন্দও করেন না। আর শরীয়তের অনুমোদিত হওয়ার অর্থ হলো, কোনো বিষয় আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে হালাল হিসেবে সাব্যস্ত হওয়া, তাঁর পক্ষ থেকে আদেশপ্রাপ্ত এবং তা বাস্তবায়নের বিনিময়ে প্রতিদানপ্রাপ্ত হওয়া।
২. আনুগত্য ও ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলার নৈকট্য অর্জনের পাশাপাশি যাবতীয় শিরকী-বেদাতী কার্যকলাপ থেকে বিরত থাকতে হবে। কেননা যাদুকররা ভ্রান্ত আকিদাবাদী ও শিরকী ধ্যান-ধারণায় বিশ্বাসীদের অতি সহজেই কাজে কাবু করতে সক্ষম। তাদের ভুলভাল বুঝিয়ে মতলব হাসিল করে নিতে তৎপর।
৩. অত্যন্ত খুশু-খুযূর সঙ্গে সময়মতো জামাতের সাথে পাঁচ ওয়াক্ত নামায আদায় করতে হবে। বান্দার সুরক্ষায় নামায হলো মজবুত বর্ম ও দুর্ভেদ্য প্রাচীর স্বরূপ।
৪. অবসরে ও কাজেকর্মে সর্বাবস্থায় আল্লাহর যিকিরে মশগুল থাকা কর্তব্য। যাবতীয় বিপদ-আপদ থেকে সুরক্ষার জন্য হাদীসে বর্ণিত সকাল-সন্ধ্যার দু'আসমূহ পাঠ করতে হবে। পরিভাষায় এ দু'আসমূহকে الْأَدْعِيَةُ الْمَأْتُوْরَةُ (আল-আদয়িয়াতুল মা'সূরা) বলা হয়।
৫. নিরক্ষতা, অশিক্ষা ও কুসংস্কারের প্রতিরোধে ধর্মীয় শিক্ষা-দীক্ষার প্রচার-প্রসার ঘটাতে হবে। এ লক্ষ্যে সমাজের জ্ঞানী-গুণী, বিশেষভাবে আলেম সমাজের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করা কর্তব্য।
৬. প্রচলিত উদ্ভট প্রথা, বেদআত ও কুসংস্কারের পথ ছেড়ে কুরআন-সুন্নাহর বিধান মজবুতভাবে আঁকড়ে ধরতে হবে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলার নির্দেশ: وَأَنَّ هَذَا صِرَاطِي مُسْتَقِيمًا فَاتَّبِعُوهُ وَلَا تَتَّبِعُوا السُّبُلَ فَتَفَرَّقَ بِكُمْ عَنْ سَبِيلِهِ ذَلِكُمْ وَصَكُمْ بِهِ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ﴾ [الأنعام : ١٥৩] অর্থ: (হে নবী! তাদেরকে) আরও বল, এটা আমার সরল-সঠিক পথ। সুতরাং এর অনুসরণ কর, অন্য কোনও পথের অনুসরণ করো না, অন্যথায় তা তোমাদেরকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেবে। হে মানুষ! এসব বিষয়ে আল্লাহ তোমাদেরকে গুরুত্বের সাথে আদেশ করেছেন, যাতে তোমরা মুত্তাকী হতে পার।' (আনআম, ৬: ১৫৩)
৭. কুরআন তিলাওয়াত করতে হবে নিয়মিতভাবে এবং অর্থ ও মর্ম অনুধাবন করে গভীর চিন্তা-ফিকিরের সাথে। বিশেষভাবে সূরা বাকারার তিলাওয়াত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যে ঘরে এ সূরা পাঠ করা হয়, শয়তান তার কাছেও ঘেঁষতে পারে না। যতসব বাতিলপন্থি, ভ্রষ্টাচারী যাদুকর তার ওপর প্রভাববিস্তার করতে পারে না।
৮. যে ব্যক্তি যাদুটোনায় আক্রান্ত হয়েছে সে যেন কোনো ভণ্ড কবিরাজ, গণক ও যাদুকরের দ্বারস্থ না হয়ে প্রকৃত আলেমে দ্বীনের শরণাপন্ন হয়। কেননা এসব মিথ্যাবাদী ভণ্ড কবিরাজ, গণক ও যাদুকররা ভীতু ও দুর্বলপ্রাণ লোকদের অজানা আশঙ্কায় শঙ্কিত করে তাদের অর্থ-সম্পদ হাতিয়ে নেয়। এরা হলো অন্যায়ভাবে মানুষের সম্পদ আত্মসাৎকারী। এদের কবলে পড়ে ভুক্তভোগীরা দ্বিগুণ ক্ষতির শিকার হয়।
৯. যাদু-টোনার সবচেয়ে বড় প্রতিষেধক হলো 'শরয়ী রুকইয়া'। যদি সম্ভব হয় তাহলে যাদুগ্রস্ত ব্যক্তি নিজেই নিজের ওপর 'শরয়ী রুকইয়া' প্রয়োগ করবে। সে যদি না পারে তাহলে এ বিষয়ে বিজ্ঞ-অভিজ্ঞ কারো মাধ্যমে প্রয়োগ করাবে। 'শরয়ী রুকইয়া'র একটি পদ্ধতি হলো:
* সূরা 'সাফফাত'-এর প্রথম দশ আয়াত একবার।
* সূরা 'ফাতেহা' তিনবার।
* সূরা 'কাফিরুন' তিনবার।
* সূরা 'ফালাক', তিনবার।
* সূরা 'নাস' তিনবার।
* সূরা 'এখলাস' তিনবার।
* 'আয়াতুল কুরসী' তিনবার।
* নিম্নোক্ত শেফার দু'আগুলো তিনবার করে পাঠ করতে হবে। «اللَّهُمَّ رَبَّ النَّاسِ، مُذْهِبَ البَأْسِ، اشْفِ أَنْتَ الشَّافِي، لَا شَافِيَ إِلَّا أَنْتَ، شِفَاءً لَا يُغَادِرُ سَقَمًا» (صحيح البخاري) ٧/ ١٣٢ «بِسْمِ اللَّهِ أَرْقِيكَ، مِنْ كُلِّ شَيْءٍ يُؤْذِيكَ، مِنْ شَرِّ كُلِّ نَفْسٍ أَوْ عَيْنٍ، أَوْ حَاسِدٍ اللَّهُ يَشْفِيكَ، بِسْمِ اللَّهِ أَرْقِيكَ» أَعُوذُ بِكَلِمَاتِ اللهِ التَّامَّاتِ، مِنْ شَرِّ مَا خَلَقَ (مسند أحمد) ٢٤/ ٤٧٩
তরতাজা বড়ই গাছের সাতটি পাতা চূর্ণ করে এক বালতি পানিতে মেশাতে হবে। উল্লিখিত কুরআনের আয়াত ও শেফার দু'আগুলো পাঠ করে পানিতে দম দিতে হবে। এ পানি দিয়ে গোসল করার মাধ্যমে যাদুর আসর দূর হয়ে যাবে, ইনশাআল্লাহ।
১০. যাদুর প্রভাবে ব্যক্তি যে মানসিক প্রতিকূলতা ও প্রতিবন্ধকতার শিকার হয়, তা কাটিয়ে ওঠার জন্য পরিবার, আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবের সর্বাত্মক সাহায্য-সহযোগিতা একান্ত কাম্য। যাদুগ্রস্ত ব্যক্তিকে নামায, যিকির ও কুরআন তিলাওয়াতে উদ্বুদ্ধ করার পাশাপাশি তার নামে দান-সদকা করাও কর্তব্য।
১১. প্রতিদিন সকালে সাতটি আজওয়া খেজুর খাওয়ার দ্বারা ইনশাআল্লাহ যাদুর প্রভাব থেকে মুক্ত থাকা যাবে। স্বয়ং রাসূলুল্লাহ ﷺ এ দিকনির্দেশনা প্রদান করেছেন:
مَنْ تَصَبَّحَ كُلَّ يَوْمٍ سَبْعَ تَمَرَاتٍ عَجْوَةً، لَمْ يَضُرَّهُ فِي ذَلِكَ اليَوْمِ سُمٌّ وَلَا سِحْرُ» (صحيح البخاري ٨٠/٧)
অর্থ: 'প্রতিদিন সকালে যে ব্যক্তি সাতটি 'আজওয়া খেজুর' খাবে, ঐ দিন তাকে কোনো বিষক্রিয়া ও যাদু আক্রান্ত করতে পারবে না।' (বুখারী, ৭/৮০)
১২. ভূত-প্রেতের ভয়ানক দৃশ্যসংবলিত মুভি দেখা থেকে বিরত থাকতে হবে। এ ছাড়াও যুদ্ধ-বিগ্রহ ও ধ্বংসযজ্ঞের কাহিনি ও দৃশ্যসংবলিত ভিডিও বর্জনীয়। কেননা মানসপটে এসব ভয়ানক দৃশ্যের কল্পনা যাদুগ্রস্ত ব্যক্তির মানসিক অবস্থার অবনতি ঘটায়।
১৩. যাদুর আলামতযুক্ত বস্তু, যেমন: একটা অপরটার সাথে বন্ধনযুক্ত, গিঁটযুক্ত সুতা কিংবা রশি, অপ্রচলিত অদ্ভুত চিহ্নযুক্ত লেখা কিংবা কাপড়ের টুকরা ইত্যাদি পাওয়া গেলে তা নষ্ট করে আগুনে পুড়িয়ে ফেলতে হবে।
১৪. মনে রাখতে হবে, যাদুর মোকাবেলায় যাদু কাজে লাগানো এবং এক যাদুর সাহায্যে আরেক যাদু প্রতিহত করা সুস্পষ্ট হারাম এবং শয়তানের কাজ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন কাজ করতে নিষেধ করেছেন। বলেছেন: إِنَّهُ مِنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ. অর্থ: 'নিশ্চয়ই তা শয়তানের কাজ।' আরেকটি হাদীসে বলেছেন: «إِنَّ اللهَ أَنْزَلَ الدَّاءَ وَالدَّوَاءَ، وَجَعَلَ لِكُلِّ دَاءٍ دَوَاء فَتَدَاوَوْا وَلَا تَدَاوَوْا بِحَرام» (سنن أبي داود (٧/٤) অর্থ: 'তোমরা চিকিৎসা গ্রহণ কর; কিন্তু হারাম পন্থায় চিকিৎসা গ্রহণ কর না।' (আবু দাউদ, ৪/৭)
১৫. আপন রবের প্রতি সুধারণা পোষণ করুন। তাঁর ওপর ভরসা করুন। সর্বদা আল্লাহর যিকিরে মশগুল থাকুন। তাঁর হুকুমের বাইরে মানুষ আপনার ক্ষতি সাধন করার যতো পরিকল্পনা করুক, যতো চেষ্টা-তদবির করুক, আপনার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: وَمَا هُمْ بِضَارِّينَ بِهِ مِنْ أَحَدٍ إِلَّا بِإِذْنِ اللهِ﴾ [البقرة: ١٠٢] অর্থ: 'তারা তার মাধ্যমে আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া কারও কোন ক্ষতি সাধন করতে পারত না।' (বাকারা, ২: ১০২)
১৬. যারা যাদুবিদ্যায় পারদর্শী ও যাদুবিদ্যাজীবী, তাদের উচিত যাদু প্রয়োগের মতো ন্যক্কারজনক কাজ থেকে বিরত থাকা এবং এর ক্ষতিকর দিকগুলো সম্পর্কে মানুষকে সতর্ক করা। কুরআন-সুন্নাহর নির্দেশ মেনে মানবজাতির হিতাকাঙ্ক্ষা ও কল্যাণ সাধনার মধ্যেই তাদের ইহকালীন ও পরকালীন সফলতা নিহিত।
পরিশিষ্ট:
পবিত্র কুরআনের বাণী:
وَاتَّبَعُوا مَا تَتْلُو الشَّيْطِينُ عَلَى مُلْكِ سُلَيْمَنَ ، وَمَا كَفَرَ سُلَيْمَنُ وَلَكِنَّ الشَّيْطِينَ كَفَرُوا يُعَلِّمُونَ النَّاسَ السِّحْرَ وَمَا أُنْزِلَ عَلَى الْمَلَكَيْنِ بِبَابِلَ هَارُوتَ وَمَارُوتَ وَمَا يُعَلِّمُنِ مِنْ أَحَدٍ حَتَّى يَقُولَا إِنَّمَا نَحْنُ فِتْنَةٌ فَلَا تَكْفُرْ فَيَتَعَلَّمُونَ مِنْهُمَا مَا يُفَرِّقُونَ بِهِ بَيْنَ الْمَرْءِ وَزَوْجِهِ وَمَا هُمْ بِضَارِّينَ بِهِ مِنْ أَحَدٍ إِلَّا بِإِذْنِ اللهِ وَيَتَعَلَّمُونَ مَا يَضُرُّهُمْ وَلَا يَنْفَعُهُمْ وَلَقَدْ عَلِمُوا لَمَنِ اشْتَرَاهُ مَا لَهُ فِي الْآخِرَةِ مِنْ خَلَاقٍ مَن وَلَبِئْسَ مَا شَرَوْا بِهِ أَنْفُسَهُمْ لَوْ كَانُوا يَعْلَمُونَ﴾ [البقرة: ١٠٢]
অর্থ: 'আর তারা (বনী ইসরাঈল) সুলায়মান (আ.)-এর শাসনামলে শয়তানগণ যা-কিছু (মন্ত্র) পড়ত তার পেছনে পড়ে গেল। সুলায়মান (আ.) কোন কুফর করেনি। অবশ্য শয়তানগণ মানুষকে যাদু শিক্ষা দিয়ে কুফরীতে লিপ্ত হয়েছিল। তাছাড়া (বনী ইসরাঈল) বাবিল শহরে হারুত ও মারুত নামক ফিরিশতাদ্বয়ের প্রতি যা নাযিল হয়েছিল তার পেছনে পড়ে গেল। এ ফিরিশতাদ্বয় কাউকে ততক্ষণ পর্যন্ত কোন তালীম দিত না, যতক্ষণ না বলে দিত, আমরা কেবলই পরীক্ষাস্বরূপ (প্রেরিত হয়েছি)। সুতরাং তোমরা (যাদুর পেছনে পড়ে) কুফরী অবলম্বন করো না। তথাপি তারা তাদের থেকে এমন জিনিস শিক্ষা করত, যা দ্বারা তারা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটাত, (তবে প্রকাশ থাকে যে,) তারা তার মাধ্যমে আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া কারও কোন ক্ষতি সাধন করতে পারত না। (কিন্তু) তারা এমন জিনিস শিখত, যা তাদের পক্ষে ক্ষতিকর ছিল- এবং উপকারী ছিল না। আর তারা এটাও ভালো করে জানত যে, যে ব্যক্তি তার খরিদ্দার হবে আখিরাতে তার কোন হিস্যা থাকবে না। বস্তুত তারা যার বিনিময় নিজেদেরকে বিক্রি করেছে তা অতি মন্দ। যদি তাদের (এ বিষয়ের প্রকৃত) জ্ঞান থাকত।' (বাকারা, ২: ১০২)
আবু হুরায়রা (রা.) ও হাসান (রা.) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: مَنْ أَتَى كَاهِنًا، أَوْ عَرَّافًا، فَصَدَّقَهُ بِمَا يَقُولُ، فَقَدْ كَفَرَ بِمَا أُنْزِلَ عَلَى مُحَمَّدٍ» (مسند أحمد) ٣٣١/١٥
অর্থ: 'যে ব্যক্তি কোনো গণক, জ্যোতিষীর দ্বারস্থ হবে এবং তার কথা বিশ্বাস করবে, সে যেন মুহাম্মদ ﷺ-এর ওপর অবতীর্ণ (আসমানি কিতাবকে) অস্বীকারকারী হবে।' (মুসনাদে আহমাদ, ১৫/৩৩১)
টিকাঃ
৪৬. খুশু-খুযূর: বিনম্রতা ও একাগ্রতা.
*. “রুকইয়া'র আভিধানিক অর্থ হলো, ঝাড়ফুঁক করা, তাবিজ করা। অর্থাৎ, কোনো প্রকার ক্ষতি ও কষ্টদায়ক বিষয় থেকে বাঁচার জন্য তাবিজ কিংবা ঝাড়ফুঁকের মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলার আশ্রয় গ্রহণ করা। (আল-মাওসূআতুল ফিকহিয়্যাহ্ (দ্বিতীয় সংস্করণ), খণ্ড: ২৩, পৃষ্ঠা: ৯৬) শরীয়তের পরিভাষায়: আরোগ্য লাভের জন্য কিংবা বিপদমুক্তির উদ্দেশ্যে পবিত্র কুরআনের আয়াত ও সহীহ হাদীসে বর্ণিত দু'আ ও যিকিরের মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলার আশ্রয় গ্রহণ করা। (আল-কওলুল মুয়ীন ফি মুরতাকাযাতি মুআলিজীস সারয়ি ওয়াস সিহরি ওয়াল আইন (প্রথম সংস্করণ), পৃষ্ঠা: ৩৬৫) ঝাড়ফুঁক কিংবা তাবিজ করার ক্ষেত্রে প্রধানতম শর্তটি হলো, আল্লাহ তা'আলার উপর ভরসা করা এবং এ বিশ্বাস ধারণ করা যে, ভালো-মন্দ সবকিছু আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকেই হয়। তাঁর ইচ্ছার বাইরে কারো পক্ষে কোনো উপকার করা ও ক্ষতি সাধন করার সাধ্য নেই। (আল-কওলুল মুয়ীন ফি মুরতাকাযাতি মুআলিজীস সারয়ি ওয়াস সিহরি ওয়াল আইন (প্রথম সংস্করণ), পৃষ্ঠা: ৩৬৫) (অনুবাদক)
*. হরর ফিল্ম।
📄 জাতীয়তাবাদ
জাতীয়তাবাদ হলো, মানুষ তার দেশ, ধর্ম, বর্ণ, জাতি ও বংশপরিচয় প্রভৃতি বিষয়কে কেন্দ্র করে অন্যদের ওপর শ্রেষ্ঠত্ববাদী ধ্যান-ধারণা পোষণ করা। যেমন: আমি ব্রিটিশ; ইন্ডিয়ান নই। আমি আমেরিকান; মেক্সিকান নই। আমি জার্মানি খ্রিষ্টান; ইহুদি নই। আমি শ্বেতাঙ্গ; কৃষ্ণাঙ্গ নই।
জাতীয়তাবাদ আমাদের সামনে একেক সময় একেক রূপ পরিগ্রহ করে, একেক রং ধারণ করে। কখনো জাতিসত্তা, কখনো নাগরিক সত্তা, কখনো ধর্মীয়, কখনো পার্থিব, কখনো ডান, কখনো বাম-এই রকম বহু চেহারা নিয়ে সে হাজির হয়।
জাতীয়তাবাদের মতো ভ্রষ্ট মানসিকতার শিকার হয়ে মানুষ অন্যদের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য ও হেয় প্রতিপন্ন করা থেকে শুরু করে গালমন্দ ও ক্ষতিসাধন করতেও পরোয়া করে না। আর উগ্র জাতীয়তাবাদের বশবর্তী হয়ে মানুষ অন্যের ওপর যুলুম-অত্যাচার, নির্যাতন-নিগ্রহ, এমনকি হত্যা-গণহত্যায় উন্মত্ত হয়ে উঠে।
ইতিহাস দেখেছে, অতীতে জাতীয়তাবাদী আগ্রাসনে মানবতার করুণ পরিণতি। দেখেছে মিলেসিভিচের নেতৃত্বে স্নেব্রিনিকাতেই সার্বিয়ান যোদ্ধাদের কর্তৃক বসনিয়ান মুসলমানদের ওপর পাশবিক নির্যাতন ও গণহত্যা। এক গণহত্যায় তারা আটহাজার মুসলমানকে সমূলে ধ্বংস করেছিল। ইতিহাস দেখেছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানরা ইহুদিদের ওপর কী নির্মম হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে! ২০০২ সালে ভারতের গুজরাটে সংখ্যালঘু মুসলমানরা জাতীয়তাবাদী আগ্রাসনের কবলে কী নির্মম হত্যাযজ্ঞের শিকার হয়েছে! বর্তমানে জাতীয়তাবাদী আগ্রাসনের প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলো, ফিলিস্তিনের মুসলিম ভূখণ্ডে ইসরাঈলি ইহুদিদের জাতীয়তাবাদী দখলদারি আগ্রাসন।
বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা এবং ভেদাভেদহীন সাম্য ও ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সমাজ বিনির্মাণের লক্ষ্যে বর্তমান কলুষিত জাতীয়তাবাদের অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। কিন্তু উপায় কী? এ সংকট নিরসনের সরল পথ কী?
সমাধান:
১. জ্ঞানী-গুণী, চিন্তাবিদ ও আলেম সমাজের পক্ষ থেকে জাতীয়তাবাদের ক্ষতি ও নেগেটিভ দিকগুলো সম্পর্কে মানবজাতিকে সতর্ক ও সচেতন করতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে মানুষকে সাম্য, সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্ববোধে অনুপ্রাণিত করতে হবে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলার নির্দেশ: ﴿وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِيعًا وَلَا تَفَرَّقُوا﴾ [آل عمران: ١٠٣] অর্থ: আল্লাহর রশিকে দৃঢ়ভাবে ধরে রাখ এবং পরস্পরে বিভেদ করো না। (আলে-ইমরান, ৩: ১০৩)
২. অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বোঝাতে হবে, আসমানি কিতাব ও ঐশী ধর্ম ইসলামের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো, মানবজাতির মাঝে সাম্য, সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্ব অটুট রেখে ধর্মপরায়ণতায় অনুপ্রাণিত করা। আল্লাহ তা'আলার নিকট বান্দার শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদার একমাত্র মানদণ্ড হলো তাকওয়া, আনুগত্য ও উত্তম আমল। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: ﴿إِنَّ هَذِهِ أُمَّتُكُمْ أُمَّةً وَاحِدَةً وَأَنَا رَبُّكُمْ فَاعْبُدُونِ﴾ অর্থ: '(হে মানুষ!) নিশ্চিত জেন, এটাই তোমাদের দ্বীন, যা একই দ্বীন এবং আমি তোমাদের প্রতিপালক। সুতরাং তোমরা আমার ইবাদত কর।' (আম্বিয়া, ২১: ৯২)
৩. মনে রাখতে হবে, মানবজাতির মূলে আছেন আদম (আ.) ও হাওয়া (আ.)। তাদের সৃষ্টির উপাদান হলো মাটি। সুতরাং পরস্পর গর্ব-গৌরব ও শ্রেষ্ঠত্ব প্রদর্শনের কোনো যৌক্তিকতা নেই। শ্রেষ্ঠত্বের মানদণ্ড হলো তাকওয়া। যার মাধ্যমে ব্যক্তি আপন রবের নৈকট্য অর্জন করতে পারে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: ﴿يَأَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُمْ مِّنْ نَفْسٍ وَاحِدَةٍ وَخَلَقَ مِنْهَا زَوْجَهَا وَبَثَّ مِنْهُمَا رِجَالًا كَثِيرًا وَنِسَاءً وَاتَّقُوا اللَّهَ الَّذِي تَسَاءَلُونَ بِهِ وَالْأَرْحَامَ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلَيْكُمْ رَقِيبًا [النساء: ١] অর্থ: 'হে মানুষ! তোমরা তোমাদের রবকে ভয় কর, যিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন এক নফস থেকে। আর তা থেকে সৃষ্টি করেছেন তার স্ত্রীকে এবং তাদের থেকে ছড়িয়ে দিয়েছেন বহু পুরুষ ও নারী। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যার মাধ্যমে তোমরা একে অপরের কাছে চেয়ে থাক। আর ভয় কর রক্ত-সম্পর্কিত আত্মীয়ের ব্যাপারে। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের উপর পর্যবেক্ষক।' (নিসা, ৪: ১)
৪. মনে রাখতে হবে, জাতীয়তাবাদের পরিণতি হলো মানুষে মানুষে হিংসা, বিদ্বেষ, বিভেদ ও শত্রুতা। উগ্র জাতীয়তাবাদের চূড়ান্ত হলো নির্যাতন-নিপীড়ন, হত্যা-গণহত্যা ও ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা জাহেলি যুগের জাতীয়তাবাদের পরিণতি ও ইসলামি ভ্রাতৃত্ববোধের সুফল স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেছেন : ﴿وَاذْكُرُوا نِعْمَتَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ إِذْ كُنْتُمْ أَعْدَاءً فَأَلَّفَ بَيْنَ قُلُوبِكُمْ فَأَصْبَحْتُمْ بِنِعْمَتِهِ إِخْوَانًا﴾ [آل عمران: ۱۰৩] অর্থ: 'আল্লাহ তা'আলা তোমাদের প্রতি যে অনুগ্রহ করেছেন তা স্মরণ রাখ। একটা সময় ছিল, যখন তোমরা একে অন্যের শত্রু ছিলে। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা তোমাদের অন্তরসমূহকে জুড়ে দিলেন। ফলে তাঁর অনুগ্রহে তোমরা ভাই-ভাই হয়ে গেলে।' (আলে-ইমরান, ৩: ১০৩)
৫. মানবজাতির পরস্পর গৌরব ও শ্রেষ্ঠত্বের সংস্কৃতিতে ইসলামের সারমর্ম হলো:
মহান আল্লাহর তা'আলার দৃষ্টিতে গোটা মানবজাতিই সমান। সেখানে কালো-সাদা, উঁচু-নীচু, ধনী-গরিব, এদেশীয়-ওদেশীয় সকল মানুষ সমান। মানুষে-মানুষে কোনো ভেদাভেদ নেই। মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বের একমাত্র মানদণ্ড হলো তাকওয়া ও ধর্মপরায়ণতা। তবে তাকওয়া ও ধর্মপরায়ণতা জাহির করে আত্মগৌরব প্রকাশ করার বৈধতা নেই। এটাই ইসলামের মূলমন্ত্র। রাসূলুল্লাহ ﷺ এই সাম্যের বাণী প্রচার করেছিলেন বলেই ইসলাম অতি সহজে সর্বত্র বিস্তার লাভ করেছিল। আজ থেকে চোদ্দশো বছর আগে ইসলাম পৃথিবীর নিপীড়িত বঞ্চিত মানুষের সামনে যে আশার আলো জ্বেলেছিল, সে আলোর মশাল যদি তুলে ধরা যায়, ইসলামের নবী করীম ﷺ যে সাম্যের বাণী প্রচার করেছিলেন, তা যদি বাস্তবায়ন করা যায়, তবে তা-ই হবে বর্তমান কলুষিত জাতীয়তাবাদের শ্রেষ্ঠ প্রতিষেধক। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
يَا أَيُّهَا النَّاسُ، أَلَا إِنَّ رَبَّكُمْ وَاحِدٌ، وَإِنَّ أَبَاكُمْ وَاحِدٌ، أَلَا لَا فَضْلَ لِعَرَبِي عَلَى عَجَمِيٌّ، وَلَا لِعَجَمِيٌّ عَلَى عَرَبِيَّ، وَلَا أَحْمَرَ عَلَى أَسْوَدَ، وَلَا أَسْوَدَ عَلَى أَحْمَرَ، إِلَّا بِالتَّقْوَى أَبَلَّغْتُ؟، قَالُوا: بَلَغَ رَسُولُ الله - (مسند أحمد ٣٨/٤٧٤)
অর্থ: 'হে লোকসকল! শুনে রাখ, নিশ্চয়ই তোমাদের রব এক। তোমাদের আদি পিতা এক। মনে রেখ, কোনো অনারবির ওপর আরবির শ্রেষ্ঠত্ব নেই। কোনো কৃষ্ণাঙ্গের ওপর শ্বেতাঙ্গের প্রাধান্য নেই। কোনো শ্বেতাঙ্গের ওপর কৃষ্ণাঙ্গের প্রাধান্য নেই। (শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদার একমাত্র ভিত্তি হলো) তাকওয়া (আল্লাহভীতি) আমি কি (আমার রবের বার্তা) যথার্থভাবে পৌঁছে দিয়েছি?' সাহাবায়ে কিরাম বললেন, 'আল্লাহ রাসূল (তাঁর রবের বার্তা) যথার্থভাবে পৌঁছে দিয়েছেন।' (মুসনাদে আহমাদ, ৩৮/৪৭৪)
৬. পৃথিবীতে আল্লাহ তা'আলা মানবজাতিকে অন্য সমস্ত সৃষ্টি হতে শ্রেষ্ঠ ও মর্যাদাবান করে সৃষ্টি করেছেন। সুতরাং দেশ, জাতি, ধর্ম-বর্ণের ভিন্নতার কারণে কোনো মানুষ হেয় প্রতিপন্ন হতে পারে না। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: ﴿وَلَقَدْ كَرَّمْنَا بَنِي آدَمَ وَحَمَلْتُهُمْ فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ وَرَزَقْتُهُمْ مِّنَ الطَّيِّبَاتِ وَفَضْلْتُهُمْ عَلَى كَثِيرٍ مِّمَّنْ خَلَقْنَا تَفْضِيلًا﴾ [الإسراء: ٧٠] অর্থ: 'বাস্তবিকভাবে আমি আদম সন্তানকে মর্যাদা দান করেছি এবং স্থলে ও জলে তাদের জন্য বাহনের ব্যবস্থা করেছি, তাদেরকে উত্তম রিযিক দান করেছি এবং আমার বহু মাখলুকের ওপর তাদের শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছি।' (বনী ঈসরাইল, ১৭: ৭০)
৭. সমাজে পরিবারই হলো ব্যক্তির শিক্ষা-দীক্ষা ও বোধ-উপলব্ধির প্রথম পরিসর। তাই অভিভাবকদের কর্তব্য হলো, সন্তানদের মানবিক মূল্যবোধ, অন্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ ও পরকল্যাণের দীক্ষায় দীক্ষিত করা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হলো ব্যক্তির শিক্ষা-দীক্ষার দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ পরিসর। তাই শিক্ষকমণ্ডলী হতে শুরু করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সাথে সংশ্লিষ্ট প্রত্যেকের ওপরও একই দায়িত্ব ও কর্তব্য বর্তায়।
৮. সাম্য-সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্ববোধের গুরুত্ব তুলে ধরে শিক্ষামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে এবং সচেতনতামূলক লেখা প্রচার করতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে মানুষে-মানুষে ভেদাভেদ ও জাতীয়তাবাদের ক্ষতির বিষয়ে সতর্ক করতে হবে।
৯. একটি জাতিকে সুষ্ঠু ও ভারসাম্যপূর্ণ জাতি হয়ে উঠতে হলে অবশ্যই তাকে ধর্মীয় বিশ্বাস, ভাষা, বর্ণ, রাজনীতি, অর্থনীতি, এমনকি ভৌগোলিক সীমানার ভিত্তিতে গোষ্ঠীবদ্ধতার বিশ্বাস পরিহার করতে হবে। অতীতে ইসলামই সর্বপ্রথম এ মহৎ কাজটি করে দেখিয়েছে। জাহেলি যুগের সমস্ত ভেদাভেদ ও পার্থক্য রেখা নির্মূল করে উচ্চ শ্রেণি, পতিত শ্রেণি, সংখ্যাগুরু-সংখ্যালঘু সবাইকে এক কাতারে এনে দাঁড় করিয়েছে। ফলে বেলাল (রা.), সুহাইব রুমী (রা.) ও সালমান ফারসী (রা.) প্রমুখ সংখ্যালঘু ও পতিত শ্রেণির ব্যক্তিগণ স্বসম্মানে ইসলাম গ্রহণ করেছেন এবং নিজ যোগ্যতা ও কর্মগুণে মর্যাদা ও নেতৃত্বের আসনে সমাসীন হতে পেরেছেন। পরবর্তীযুগেও ইসলামের সাম্য রক্ষার ধারা অব্যাহত ছিল এবং বর্তমানেও ইসলাম মানবজাতির জন্য সে মহৎ উদারতার বার্তা বহন করছে।
পরিশিষ্ট:
একটি বিষয়ে একবার আবু যর (রা.) ও বেলাল (রা.)-এর মতভেদ হলো। বাদবিসংবাদের একপর্যায় আবু যর (রা.) বেলাল (রা.)-কে 'কৃষ্ণাঙ্গের বাচ্চা' বলে গাল দিলেন। বেলাল (রা.) কোনো প্রত্যুত্তর না করে রাসূল ﷺ-এর দরবারে অভিযোগ করলেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ ভীষণ ক্ষুব্ধ হলেন। আবু যর (রা.)-কে ডেকে বললেন: يَا أَبَا ذَرٍّ أَعَيَّرْتَهُ بِأُمِّهِ؟ إِنَّكَ امْرُؤٌ فِيكَ جَاهِلِيَّةً. অর্থ: 'হে আবু যর! তুমি তাঁকে (বেলালকে) তাঁর মার নামে গালাগাল করতে পারলে? তোমার মধ্যে তো জাহেলি যুগের কুসংস্কার রয়ে গেছে।' (বুখারী, ১/১৫)
এরপর আবু যর (রা.) বেরিয়ে গেলেন। পথিমধ্যে বেলাল (রা.)-এর সাথে দেখা। সঙ্গে সঙ্গে তিনি মাটির সাথে গাল লাগিয়ে শুয়ে পড়লেন। বেলাল (রা.)-এর উদ্দেশ্যে বললেন: 'তুমি যদি আমার গাল পদদলিত না কর, তাহলে আমি এভাবেই পড়ে থাকবো।' বেলাল (রা.) বললেন : 'কিছুতেই আমি তা করতে পারি না।' তখন সাহাবয়ে কিরাম তাদের মিলিয়ে দিলেন। ভালোবাসা ও সম্প্রীতির আবেগে অশ্রুসিক্ত হয়ে তারা একে অপরকে জড়িয়ে ধরলেন। এটাই হলো ইসলামি সাম্য ও ভ্রাতৃত্ববোধের দৃষ্টান্ত।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: يَأَيُّهَا النَّاسُ إِنَّا خَلَقْتُكُمْ مِّنْ ذَكَرٍ وَأُنثَى وَجَعَلْتُكُمْ شُعُوبًا وَقَبَائِلَ لِتَعَارَفُوا إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِنْدَ اللَّهِ أَتَقُكُمْ إِنَّ اللَّهَ عَلِيمٌ خَبِيرٌ﴾ [الحجرات: ١٣] অর্থ: 'হে মানুষ! আমি তোমাদের সকলকে এক পুরুষ ও এক নারী হতে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা একে অন্যকে চিনতে পার। প্রকৃতপক্ষে তোমাদের মধ্যে আল্লাহর কাছে সর্বাপেক্ষা বেশি মর্যাদাবান সেই, যে তোমাদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা বেশি মুত্তাকী। নিশ্চয়ই আল্লাহ সবকিছু জানেন, সবকিছু সম্পর্কে অবহিত।' (হুজুরাত, ৪৯: ১৩)
📄 সমালোচনা
সমালোচনা দু'ধরনের: গঠনমূলক ইতিবাচক সমালোচনা, আর আক্রমণাত্মক নেতিবাচক সমালোচনা।
গঠনমূলক ইতিবাচক সমালোচনার উদ্দেশ্য হলো, ভুল শুধরে দিয়ে মতামত ব্যক্ত করা; ভুলগুলো চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে ব্যক্তিকে ছোট করা উদ্দেশ্য নয়। আর নেতিবাচক সমালোচনার নেপথ্য কারণ হলো হিংসা, বিদ্বেষ ও অন্যকে হেয় প্রতিপন্ন করার প্রবণতা। এর উদ্দেশ্য, সমাজের চোখে ব্যক্তিকে খাটো করা, হেয় প্রতিপন্ন করা। এছাড়াও ব্যক্তির যোগ্যতা, দক্ষতা ও কর্মোদ্দীপনা দমিয়ে রাখাও নেতিবাচক সমালোচনার অন্যতম টার্গেট।
যখনই আপনি সমাজে নিজের মেধা, যোগ্যতা, প্রতিভা ও সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটাতে পারবেন, কর্মদক্ষতা ও অনন্য কৃতিত্বের পরিচয় দিয়ে সুনাম অর্জন করতে শুরু করবেন, আপনাকে সমালোচনার সম্মুখীন হতে হবে। এক্ষেত্রে গঠনমূলক ইতিবাচক সমালোচনা অবশ্যই আপনার জন্য এক বড় পাওনা। তবে পাশাপাশি আক্রমাণত্মক নেতিবাচক সমালোচনার জ্বালাও সইতে হবে। হিংসুক, নিন্দুক ও শত্রুভাবাপন্ন লোকদের গালমন্দ, অন্যায় অপপ্রচার ও মিথ্যা অপবাদ-এর কোনোটির হাত থেকেই আপনার রেহাই নেই। সমাজের চোখে আপনাকে খাটো ও হেয় প্রতিপন্ন করার উদগ্র মানসিকতা নিয়ে তারা গণমাধ্যম ও সোস্যাল মিডিয়ায় সর্বত্র আপনার সমালোচনায় সোচ্চার ভূমিকা পালন করবে। চারপাশের অনুকূল পরিবেশ ও সুবিস্তৃত কর্মপরিসর মুহূর্তেই আপনার জন্য বদ্ধ গুহার মতো সংকুচিত হয়ে পড়বে।
জীবনের এমন রুক্ষ কঠিন মুহূর্তে আপনার করণীয় কী? সমালোচনার সংকট কাটিয়ে উঠার যথার্থ উপায় কী?
সমাধান:
১. সমালোচনার আক্রমণে দোদুল্যমান হবেন না। প্রকম্পিত হবেন না। মনে রাখবেন, সমালোচনা আপনার যোগ্যতা ও মর্যাদার পরিচায়ক।
২. সমালোচনা যদি গঠনমূলক ও ইতিবাচক হয় তাহলে তার মূল্যায়ন করে নিজের ভুলগুলো শুধরে নিন। কর্মক্ষেত্রে নিজেকে আরও দক্ষ ও অভিজ্ঞরূপে গড়ে তুলুন।
৩. আক্রমণাত্মক নেতিবাচক সমালোচনার মুখে ধৈর্যধারণ করুন। নিজ অবস্থানে অটল-অবিচল থাকুন। কাফের মুশরিকদের ভিত্তিহীন সমালোচনার মুখে আল্লাহ তা'আলা রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে ধৈর্য ও অবিচলতার আদেশ করেছেন। পবিত্র কুরআনের ভাষায়: وَاصْبِرْ عَلَى مَا يَقُولُونَ وَاهْجُرُهُمْ هَجْرًا جَمِيلًا﴾ [المزمل: ١٠] অর্থ: 'আর তারা (অর্থাৎ কাফেরগণ) যেসব কথা বলে, তাতে ধৈর্যধারণ কর এবং তাদেরকে পাশ কাটিয়ে চল উত্তমরূপে।' (মুয্যাম্মিল, ৭৩: ১০)
৪. বেশি বেশি তাসবীহ পাঠ করুন ও নামায আদায়ে যত্নবান হোন। সমালোচনার মুখে আল্লাহ তা'আলা রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে বিশেষভাবে এ দু'টি আমলের আদেশ করেছেন: وَلَقَدْ نَعْلَمُ أَنَّكَ يَضِيقُ صَدْرُكَ بِمَا يَقُولُونَ * فَسَبِّحْ بِحَمْدِ رَبِّكَ وَكُنْ مِّنَ السُّجِدِينَ﴾ [الحجر: ৯৭, ৯৮] অর্থ: 'নিশ্চয়ই আমি জানি, তারা যে সব কথা বলে তাতে তোমার অন্তর সঙ্কুচিত হয়। (তার প্রতিকার এই যে,) তুমি তোমার প্রতিপালকের প্রশংসার সাথে তাঁর তাসবীহ পাঠ করতে থাক এবং সিজদাকারীদের অন্তর্ভুক্ত থাক।' (হিজর, ১৫: ৯৭-৯৮)
৫. আপন রবের নৈকট্য অর্জনে সচেষ্ট হোন। খুশু-খুযূর সাথে (বিনম্র ও একাগ্রচিত্তে) নামাযে মশগুল হোন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলার নির্দেশ: ﴿وَاسْجُدْ وَاقْتَرِبْ﴾ [ العلق: ১৯] অর্থ: সিজদা কর ও নিকটবর্তী হও। (সূরা আলাক : ১৯) রাসূলুল্লাহ ﷺ যখন কোনো বিষয়ে বিচলিত হতেন, তখন বেলাল (রা.)-এর উদ্দেশ্যে বলতেন: يَا بِلَالُ، أَرِحْنَا بِالصَّلَاةِ. مسند أحمد (۱৭৮/৩৮) অর্থ: হে বেলাল, নামাযের মাধ্যমে আমার মনে প্রশান্তি দাও। (মুসনাদে আহমদ, ৩৮/১৭৮)
৬. আপনি যদি সর্বজনমান্য ও সর্বমহলে নন্দিত হতে চান, যদি চান যাবতীয় দোষ-ত্রুটিমুক্ত থাকতে, তাহলে আপনি অসম্ভবকে সম্ভব করার পেছনে ছুটছেন, দুঃসাধ্য সাধনের চেষ্টায় লেগে আছেন, যা কখনো সম্ভব নয়। মানুষ হিসেবে আপনার ভুল হতেই পারে। সে ভুলের সুযোগে কেউ আপনার সমালোচনায় মুখর হতে পারে। কিন্তু আপনি কখনো তাদের নিন্দা-সমালোচনা কানে তুলবেন না। এক্ষেত্রে আপনার করণীয় হবে হিংসুক, নিন্দুক ও মূর্খ লোকদের ভিত্তিহীন সমালোচনা এড়িয়ে চলা। আপনি যদি তাদের সমালোচনার মোকাবিলা করতে যান, তাহলে আপনার প্রত্যুত্তর প্রমাণ করবে, আপনি নিন্দুকের নিন্দা ও অজ্ঞ-মূর্খের অযাচিত সমালোচনার মূল্যায়ন করছেন। পবিত্র কুরআনে বর্ণিত ‘ইবাদুর রাহমান”-এর পথ অনুসরণ করুন। কুরআনের ভাষায়: ﴿وَإِذَا خَاطَبَهُمُ الْجَهِلُونَ قَالُوا سَلَمَا﴾ [الفرقان: ٦٣] অর্থ: ‘এবং অজ্ঞলোক যখন তাদেরকে লক্ষ করে (অজ্ঞতাসূলভ) কথা বলে, তখন তারা শান্তিপূর্ণ কথা বলে।' (ফুরকান, ২৫: ৬৩)
৭. নিন্দুকের নিন্দা ও অজ্ঞ-মূর্খের গালাগালের জবাব দিতে যাবেন না। এভাবে আপনি তাদের সমালোচনা বন্ধ করতে পারবেন না; বরং দ্বিগুণ উৎসাহে তারা নিত্য-নতুন সমালোচনায় মুখর হবে। তার চেয়ে বরং প্রজ্ঞা ও ধৈর্যের সাথে তাদের সমালোচনা এড়িয়ে চলুন। আপনার নিরুদ্বেগ নিরাবেগ ভূমিকাতেই তাদের আগ্রহে ভাটা পড়বে। নিজেদের ক্ষোভ ও আক্রোশের জ্বালায় নিজেরাই জ্বলে মরবে। পবিত্র কুরআনের ভাষায়: ﴿قُلْ مُوتُوا بِغَيْظِكُمْ ﴾ [آل عمران : ۱۱۹] অর্থ: '(তাদেরকে) বলে দাও, তোমরা নিজেদের আক্রোশে নিজেরা মর।' (আলে-ইমরান, ৩: ১১৯)
৮. হিংসুক, নিন্দুক ও অজ্ঞ-মূর্খ লোকদের থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখুন। সাক্ষাতে, মজলিসে কিংবা উপলক্ষ্যে তারা যেন আপনার কাছেও ঘেঁষতে না পারে। সুযোগ পেলেই তারা আপনার একান্ত ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে মেতে উঠবে।
৯. প্রজ্ঞা, বিনয় ও মহৎ চরিত্রগুণে সর্বোত্তম পন্থায় সমালোচনার জবাব দেওয়ার চেষ্টা করুন। এগুলো এমন শক্তিশালী মানবিক গুণ, যা চরম শত্রুকেও পরম বন্ধুতে রূপান্তরিত করে।
১০. মানুষের ভিত্তিহীন সমালোচনা ও নিন্দা যদি মাত্রাতিরিক্ত হয়ে পড়ে, শালীনতার সীমা ছাড়িয়ে যায়, তাহলে আদালত ও বিচারের দ্বারস্থ হোন। আদালত ও সুবিচার আপনার সমস্যার সুষ্ঠু সমাধান করতে পারে।
১১. নিশ্চিত থাকুন, প্রশান্ত হোন, উদ্দেশ্যমূলক সমালোচনাও আপনার জন্য কল্যাণ বয়ে আনতে পারে। হতে পারে আপনার গুনাহ মাফ হওয়ার কারণ। কাল কিয়ামতের দিন যখন নিন্দুকের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠবে, আপনি হবেন নিন্দুক সমালোচকদের নেকির অংশীদার, কিংবা তারা হবে আপনার গুনাহর ভাগিদার।
১২. অজ্ঞ, মূর্খ ও নির্বোধ লোকেরা তো মহান স্রষ্টা ও রিযিকদাতা আল্লাহ তা'আলাকেও গালমন্দ করে। সে তুলনায় আমার আপনার মতো নগণ্য মানুষ-যাদের ভুল-বিচ্যুতি হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে-তাদের ক্ষেত্রে নিন্দুকের পক্ষ থেকে আর কী-ই বা আশা করতে পারে!
১৩. উদ্দেশ্যমূলক নেতিবাচক নিন্দা-সমালোচনায় ব্যথিত মনঃক্ষুণ্ণ হবেন না। কেননা এটা প্রমাণ করে, সমাজে আপনার গুরুত্বপূর্ণ ও মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান বর্তমান; তা না হলে নিন্দুকেরা আপনাকে নিয়ে উঠে পড়ে লাগত না।
১৪. সমালোচনা ও গালমন্দ মোকাবিলা করার ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর জীবনীতে রয়েছে আপনার জন্য শ্রেষ্ঠ আদর্শ। মক্কার কাফের মুশরিকদের দ্বারা তিনি কত কটুক্তি ও বিরূপ মন্তব্যের সম্মুখীন হয়েছেন, কত গাল-মন্দ ও অশালীন আচরণের শিকার হয়েছেন; কিন্তু তিনি ধৈর্যধারণ করেছেন। মহান আল্লাহর দরবারে এর প্রতিদান আশা করেছেন। পবিত্র কুরআনে মক্কার কাফের-মুশরিকদের কটুক্তি ও এর প্রেক্ষাপট তুলে ধরা হয়েছে। যেন আগত উম্মতে মুহাম্মদীর জন্য তা এক অনুপম আদর্শ ও শিক্ষণীয় হয়ে থাকে।
১৫. আপনি যদি নিন্দুকের কথার গুরুত্ব দিয়ে তাদের সমালোচনার জবাবে প্রবৃত্ত হন, তাহলে তো তাদের আশাই পূরণ হলো, উদ্দেশ্য সফল হলো। তখন তারা দ্বিগুণ উদ্যমে নিত্য-নতুন সমালোচনায় মুখর হবে। সঙ্গে সঙ্গে আপনার জীবন অস্থির দুর্বিষহ হয়ে উঠবে। এটাই নিন্দুকের পরম উদ্দেশ্য। তাই নেতিবাচক যতো নিন্দা-সমালোচনা, তাতে মানসিক অস্থিরতা ও অস্বস্তি বোধ করবেন না, যথাসম্ভব তা এড়িয়ে যান। মক্কার কাফেররা যখন রাসূল ﷺ-এর নামে কুৎসা রটনা করছিল, তাঁর বিরুদ্ধে নানা ষড়যন্ত্র ও চক্রান্ত লিপ্ত ছিল, তখন তাঁর প্রতি আল্লাহ তা'আলার নির্দেশ ছিল (পবিত্র কুরআনের ভাষায়): وَلَا تَكُ فِي ضَيْقٍ مِمَّا يَمْكُرُونَ﴾ [النحل: ١٢٧] অর্থ: 'তারা যে ষড়যন্ত্র করে তার কারণে কুণ্ঠিত হয়ো না।' (নাহল, ১৬: ১২৭)
১৬. মহৎ ব্যক্তিত্ব ও চারিত্রিক উদারতার গুণে নিন্দা সমালোচনা মুছে ফেলুন। নিন্দার মুখে নীরব-নিরুদ্বেগ ভূমিকা পালন করে নিন্দুক সমালোচককে নিস্পৃহ করে ফেলুন।
পরিশিষ্ট:
* আরবিতে একটি কথা প্রচলিত আছে: طَنَّشْ تَعِشُ تَنْتَعِشُ. অর্থ: 'যত বাধা-বিপত্তি, সংকীর্ণতা-প্রতিকূলতা-কোনো কিছুর প্রতি ভ্রুক্ষেপ না করে নিজের মতো করে বাঁচুন। তাতেই জীবনের পরম সুখ-শান্তি নিহিত।'
* আমার সহপাঠী ডক্টর আবূ তাইয়্যেব মুতানাব্বি বলেন, 'জীবনে আমি কোনো বাধা-বিপত্তি, সংকট-সংকীর্ণতার পরোয়া করিনি। তাতে আমি জীবনের কোনো কল্যাণ খুঁজে পাইনি।
* আপনি যদি নিজের বিরুদ্ধে প্রতিটি কথার জবাব দিতে যান, এক-একটি সমালোচনা মোকাবিলায় প্রবৃত্ত হন, বিরুদ্ধবাদীদের ব্যাপারে প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে উঠেন, তাহলে-আপনার ওপর আল্লাহ রহম করুন-আপনার জীবন ত্যক্ত-বিরক্ত ও চরম দুর্বিষহ হয়ে উঠবে। তাই জীবনের এসব অনাকাঙ্ক্ষিত ক্ষেত্রে ক্ষমা, উদারতা ও ভ্রুক্ষেপহীনতাই শ্রেয়। পবিত্র কুরআনের নির্দেশ: ﴿خُذِ الْعَفْوَ وَأُمُرْ بِالْعُرْفِ وَأَعْرِضْ عَنِ الْجُهِلِينَ﴾ [الأعراف: ١٩٩] অর্থ: '(হে নবী!) তুমি ক্ষমাপরায়ণতা অবলম্বন কর এবং (মানুষকে) সৎকাজের আদেশ দাও আর অজ্ঞদের দিকে ভ্রুক্ষেপ করো না।' (আ'রাফ, ৭: ১৯৯)
* এক লোক আবু বকর (রা.)-কে গালমন্দ করল। জবাবে তিনি লোকটাকে বললেন, 'এসব কটু কথা ও গালমন্দ তোমার সাথে তোমার কবরেই যাবে। আমার কবরে যাবে না।' মনে রাখবেন উদ্দেশ্যমূলক নেতিবাচক সমালোচনা, নিন্দা, কটুকথা ও গালমন্দ-এসবই নিন্দুক সমালোচকের কাফনের সাথে তার কবরে যাবে। কাল কিয়ামতের দিন বিচারের সম্মুখীন হওয়ার আগ পর্যন্ত সে এগুলো বহন করে চলবে। তাই অন্যায় সমালোচনা এড়িয়ে চলা ও ভ্রুক্ষেপহীনতার পথ অবলম্বন করুন। এটাই জ্ঞানী ও মহৎ ব্যক্তিগণের আদর্শ। পবিত্র কুরআনের ভাষায়: وَإِذَا سَمِعُوا اللَّغْوَ أَعْرَضُوا عَنْهُ وَقَالُوا لَنَا أَعْمَالُنَا وَلَكُمْ أَعْمَالُكُمْ : سَلْمٌ عَلَيْكُمْ لَا نَبْتَغِي الْجَهلِينَ﴾ [القصص: ٥٥] অর্থ: 'তারা যখন কোন বেহুদা কথা শোনে, তা এড়িয়ে যায় এবং বলে, আমাদের জন্য আমাদের কর্ম এবং তোমাদের জন্য তোমাদের কর্ম। তোমাদেরকে সালাম। আমরা অজ্ঞদের সাথে জড়িত হতে চাই না।' (কাসাস, ২৮: ৫৫)
টিকাঃ
৪৯. আল্লাহ তা'আলার প্রকৃত বান্দাগণ।