📘 আল হাল্লু জীবন সমস্যার সমাধান 📄 স্থূলতা: ক্ষতিকর প্রভাব ও করণীয়

📄 স্থূলতা: ক্ষতিকর প্রভাব ও করণীয়


দেহে যখন অতিরিক্ত 'স্নেহ' বা চর্বি জমে যায়, তখন দেহের এ বিশেষ অবস্থাকে স্থূলতা বলা হয়। স্থূলতা বিষয়ে চিকিৎসাশাস্ত্রে অনেক গবেষণা হয়েছে। একটি জরিপে দেখা গেছে, বিশ্বে ক্ষুধা ও অনাহারে মৃত্যুর তুলনায় অতিভোজন ও স্থূলতার কারণে মৃত্যুর হার বেশি।

স্থূলতার কারণে দেহে নানা রকম ক্ষতিকর প্রভাব দেখা দেয়। জটিল ও মারাত্মক রোগ-ব্যাধির সৃষ্টি হয়। তন্মধ্যে হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, ব্লাডপ্রেসার, শ্বাসকষ্ট ও অস্টিওআর্থারাইটিস অন্যতম। এর কোনো কোনোটি একপর্যায়ে মারাত্মক ক্যান্সারের রূপ ধারণ করে। স্থূলতার কারণে মানুষের কর্মশক্তি ও প্রজনন-ক্ষমতা হ্রাস পায়। ভুক্তভোগী তার জীবনের আনন্দ-বিনোদনগুলো সুস্থ-স্বাভাবিকভাবে উপভোগ করতে পারে না। ফলে শিকার হয় নানা রকম দুশ্চিন্তা, বিষণ্ণতা ও অস্থিরতার। কর্মস্পৃহা ও কর্মতৎপরতার ক্ষেত্রে স্থূলতা বিরাট প্রতিবন্ধক।

স্থূলতা যখন অতিমাত্রায় বৃদ্ধি পায়, ব্যক্তি একপ্রকার প্রতিবন্ধী হয়ে পড়ে। নিজেই নিজের জন্য কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। পরিবার ও সমাজের ওপর বিরাট বোঝা হয়ে পড়ে। সুস্থ, সবল, কর্মোদ্দীপনাপূর্ণ ও প্রশান্তিময় জীবন যাপন করার জন্য মেদহীন সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হতে হবে। কিন্তু এর উপায় কী? স্থূলতা কাটিয়ে উঠার কার্যকর সমাধান কী?

সমাধান:
১. প্রথমেই মানতে হবে, স্বীকার করতে হবে, স্থূলতা একটা মারাত্মক ব্যাধি। স্থূলকায় ব্যক্তি যখন এটা মেনে নিবে, নিজেকে অসুস্থ ভাবতে শুরু করবে, তখন থেকেই সে দেহের মেদ-চর্বি ঝরিয়ে সুস্থতা লাভের জন্য তৎপর হবে।

২. অনিয়মিত ও অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস পরিহার করা কর্তব্য। স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর-এমন যেকোনো ধরনের খাবার থেকে বেঁচে থাকা আবশ্যক।

৩. ডাক্তারের শরণাপন্ন হয়ে তাঁর পরামর্শ ও দিকনির্দেশনা মেনে চলতে হবে।

৪. স্থূলতার ক্ষতিকর দিকগুলো সম্পর্কে জানতে হবে। ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের ওপর এর মারাত্মক পরিণতির কথা মনে রাখতে হবে।

৫. দৈনিক হাঁটাচলা ও নিয়মিত ব্যায়াম, স্থূলতা কাটিয়ে উঠার জন্য সবচেয়ে কার্যকর প্রাকৃতিক উপায়। তাই হাঁটাচলা ও ব্যায়াম হতে হবে প্রতিদিনের আবশ্যক কর্তব্য। এক্ষেত্রে কোনো এক্সারসাইজ টিমের সাথে যুক্ত হয়ে ব্যায়াম করা যেতে পারে। তাদের ব্যায়ামের দিক-নির্দেশনা সুস্বাস্থ্যের জন্য খুবই কার্যকর।

৬. অবসরে কায়িক পরিশ্রমহীন দীর্ঘ সময় বসে থাকা ও বিশ্রামে পড়ে থাকার মানসিকতা ত্যাগ করতে হবে।

৭. ভালোভাবে না চিবিয়ে দ্রুত খাবার খাওয়ার অভ্যাস বর্জন করা কর্তব্য। মিষ্টান্নজাতীয় খাবার ও কোলড্রিংস যথাসম্ভব পরিহার করতে হবে। এর পরিবর্তে তরতাজা ফলাহার অধিক সাাস্থ্যসম্মত।

৮. স্বল্প দূরত্বের গন্তব্যস্থলে যাতায়াতের ক্ষেত্রে যানবাহনের চেয়ে পায়ে হেঁটে যাতায়াত করতে হবে। মসজিদ, ক্ষেত-খামার কিংবা নিকটবর্তী কর্মস্থলে পায়ে হেঁটে যাতায়াত করাই বাঞ্ছনীয়। বহুতল ভবনে লিফট বাদ দিয়ে সিঁড়ি ব্যবহার করতে হবে।

৯. স্বাস্থ্যকর যতো খাদ্যদ্রব্য পরিবর্তন করতে হবে। এক বসায় উদরপূর্তি করে না খেয়ে অল্প অল্প করে বারবার খাওয়া এবং রাতের খাবার ও ঘুমানোর মধ্যে তিন থেকে চার ঘণ্টার বিরতি রাখা অধিক স্বাস্থ্যসম্মত। প্রতিদিন অন্তত আট গ্লাস পানি পান করতে হবে।

১০. মেদমুক্ত সুস্বাস্থ্য ফিরে পেতে দৃঢ় প্রত্যয়ী ও আত্মবিশ্বাসী হতে হবে। আমাদের চারপাশের অনেকেই নিজস্ব চেষ্টা-পরিশ্রমের বদৌলতে মেদ-চর্বি ঝরিয়ে স্থূলতামুক্ত সুস্বাস্থ্য ফিরে পেয়েছে।

পরিশিষ্ট:
* অনেক খেটে খাওয়া শ্রমজীবী লোকদের দেখেছি, তারা লোহা, কাঠ, পাথর ইত্যাদির কাজ করে। তারা কত সুস্থ, সবল ও মজবুত গড়নের অধিকারী। কাজে-কর্মে কী সীমাহীন উদ্যমী ও প্রাণবন্ত। গলা ছেড়ে গেয়ে চলছে আর বিরামহীন কাজ করছে। চেহারায় দুঃখ বিষাদের কোনো ছাপ নেই। মনে বিষণ্ণতা ও দুশ্চিন্তার স্থান নেই। দেহ-মনে তারা যেন সুস্থ-সবল প্রাণবন্ত। তাদের জীবনযাপনও সুখ-শান্তিপূর্ণ।
বিপরীতে এমন লোকদেরও জানি, যারা মেদবহুলতা ও স্থূলতায় আক্রান্ত। তাদের কেউ কেউ জটিল দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু বরণ করেছে।

জনৈক লেখক নিজের স্থূলতা ও মেদবহুলতার কথা বলেছেন: কায়িক পরিশ্রমহীন জীবন ও অনিয়মিত খাদ্যভ্যাসের কারণে আমাকে চরম বিপাকে পড়তে হয়। অল্পতেই হাঁপিয়ে উঠি। সামান্য পরিশ্রমেই আমার হাঁসফাঁস অবস্থা। শারীরিক অবস্থারও ক্রমাবনতি হতে থাকে। আমি ভীষণ দুশ্চিন্তা ও অস্থিরতায় পড়ে যাই। কী করব, ভেবে উঠতে পারি না। চিকিৎসা করে সম্পূর্ণ সুস্থতা ফিরে পাব কি না, সে ব্যাপারেও অনিশ্চয়তা কাজ করে। এরপর বিশেষ এক উপলক্ষে জনৈক ডাক্তারের সঙ্গে দেখা হলো। আমার শারীরিক অবস্থা দেখে তিনি নিজেই কথা তুললেন। তাঁর সাথে আমার দীর্ঘক্ষণ কথা হয়। গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ ও দিকনির্দেশনার সঙ্গে সঙ্গে খাবারের রুটিন পাল্টে দেন। রুটিনমাফিক কিছু ব্যায়াম ও শরীরচর্চার ব্যাপারেও গুরুত্বারোপ করেন। ডাক্তারের পরামর্শ ও আশ্বাসে আমি সাহস ফিরে পেলাম। সুস্থ হওয়ার প্রবল আকাঙ্ক্ষা নিয়ে রুটিনমাফিক খাবার-দাবারে অভ্যস্ত হলাম। কোনো দিন ব্যায়াম করতে ভুলি না। এভাবে কয়েক মাসের মধ্যেই অতিরিক্ত মেদ ঝরিয়ে সুস্বাস্থ্য ফিরে পেলাম। এখন আলহামদুলিল্লাহ, আমি সম্পূর্ণ সুস্থ-সবল জীবনযাপন করছি।

টিকাঃ
৪০. আর্থ্রাইটিস বলতে সাধারণত অস্থিসন্ধি বা জয়েন্টের প্রদাহকেই বোঝানো হয়। এটি নির্দিষ্ট একটি রোগ নয়। অস্থিসন্ধি, অস্থিসন্ধির আশপাশের মাংসপেশি, টেনডন ইত্যাদির অনেকগুলো অসুখ একসঙ্গে আর্থ্রাইটিস নামে পরিচিত। তবে সবচেয়ে বেশি হয় অস্টিওআর্থারাইটিস। (অনুবাদক)

📘 আল হাল্লু জীবন সমস্যার সমাধান 📄 ধূমপান

📄 ধূমপান


ধূমপান হলো তামাকজাতীয় দ্রব্যাদি বিভিন্ন পদ্ধতিতে প্রক্রিয়াজাত করে, আগুন দিয়ে পুড়িয়ে তার ধোঁয়া শ্বাসের সাথে শরীরে গ্রহণ-প্রক্রিয়া। যেকোনো পোড়ানো বস্তুর ধোঁয়া শ্বাসের সাথে গ্রহণ করাকে ধূমপান বলা হয়। তবে মূলত তামাকজাতীয় দ্রব্যাদির পোড়ানো ধোঁয়া শ্বাসের সাথে গ্রহণ করাই ধূমপান হিসেবে বিশেষভাবে পরিচিত।

বর্তমান বিশ্বে ধূমপান প্রকট আকার ধারণ করেছে এবং মানুষের নিত্যনৈমিত্তিক বদভ্যাসে পরিণত হয়েছে। ধূমপায়ী ও তার চারপাশের সমাজ এর চরম ভুক্তভোগী। কয়েকটি কারণে মানুষ ধূমপান করে থাকে। কিছু মানুষ ধূমপান করে শয়তানের প্ররোচনায় প্ররোচিত হয়ে। কিছু লোক ধূমপান করে চরম মানসিক কষ্ট-যাতনার শিকার হয়ে। তাদের ধারণা, ধূমপান মনের দুঃখ-কষ্ট লাঘব করে। আর একটা শ্রেণি সিগারেট ফুঁকে-তাদের বিশ্বাস, সিগারেট আভিজাত্য ও ফ্যাশনের গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ।

ওলামায়ে কেরামের অনেকেই ধূমপানকে সুস্পষ্ট হারাম বলেছেন। কারণ, ধূমপান ধূমপায়ী ও তার চারপাশের সকলের ক্ষতি করে। তা পরিবেশ ও বায়ুদূষণের অন্যতম কারণ। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলার নির্দেশ: وَلَا تُلْقُوْا بِأَيْدِيكُمْ إِلَى التَّهْلُكَةِ﴾ [البقرة: ١٩٥] অর্থ: 'নিজ হাতে নিজেদের ধ্বংসে নিক্ষেপ করো না।' (বাকারা, ২: ১৯৫)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: إِنَّ الْمَلَائِكَةَ تَتَأَنَّى مِمَّا يَتَأَنَّى مِنْهُ الْإِنْسَانُ. অর্থ: 'মানুষ যাতে কষ্ট পায়, ফেরেশতারাও তাতে কষ্ট পান।' (ইবনে মাযাহ, ২/১১১৬)

ধূমপান একই সাথে পরিবেশ ও সমাজের জন্য ভীষণ ক্ষতিকর। তাতে অর্থের অপচয়ের সঙ্গে সঙ্গে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির আশঙ্কা রয়েছে। ধূমপানের কারণে ব্যক্তি যক্ষ্মা ও ফুসফুসের ক্যান্সারের মতো মারাত্মক দুরারোগ্য ব্যাধির শিকার হয়। এছাড়াও তাতে নিউমোনিয়া ও এজমার ঝুঁকি রয়েছে। 'ওয়ার্ল্ড হেলথ অরগানাইজেশন' (বিশ্ব-স্বাস্থ্য-সংস্থা)-এর একটি জরিপে দেখা যায়, বিশ্বে প্রতি বছর ছয় মিলিয়ন মানুষের মৃত্যুর কারণ হলো ধূমপান। তাদের মধ্যে ৮৩ ভাগ মানুষের মৃত্যু হয় সরাসরি ধূমপানের কারণে। বাকিদের পরোক্ষ ধূমপানের কারণে।

এখনই যদি আমরা ধূমপানের বিষয়ে সচেতন না হই, তাহলে পরিবেশ-দূষণ ও স্বাস্থ্য-ঝুঁকি আরও প্রকট আকার ধারণ করবে। পর্যায়ক্রমে তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। দূষণমুক্ত পরিবেশ গড়ে তোলার জন্য এবং বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাস্থ্য রক্ষার লক্ষ্যে আমাদের অবশ্যই ধূমপানের বদভ্যাস ছাড়তে হবে। এর জন্য আমাদের করণীয় কী? এ চলমান সংকট থেকে নিষ্কৃতির উপায় কী?

সমাধান:
১. প্রথমেই বুঝতে হবে এবং স্বীকার করতে হবে, ধূমপান স্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। তাই ধূমপান থেকে বিরত থাকার জন্য দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হতে হবে।

২. ধূমপানে অভ্যস্ত ও নেশাগ্রস্ত হওয়ার পূর্বেই সিগারেট ছাড়তে হবে। পরিবেশ-পরিস্থিতি যতই প্রতিকূল হোক, কাল বিলম্ব না করে একটি সময়সীমা নির্ধারণ করে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হতে হবে-এ সময়ের মধ্যে অতি অবশ্যই ধূমপান ছেড়ে দিব।

৩. বন্ধু-বান্ধব ও চারপাশের পরিচিতদের জানিয়ে দিন, আপনি পাকাপাকিভাবে ধূমপান ছেড়ে দিচ্ছেন। এ লক্ষ্যে তাদের সমর্থন ও সহযোগিতা কামনা করুন।

৪. বাড়িতে, গাড়িতে কিংবা কর্মক্ষেত্রে ধূমপানের কথা মনে করিয়ে দেয়-এমন সমস্ত কিছু সরিয়ে ফেলুন। যেমন: সিগারেটের প্যাকেট, লাইটার, সিগারেট রাখার পাত্র ইত্যাদি।

৫. কী কী কারণে আপনি ধূমপান ছেড়ে দিতে আগ্রহী-তার একটা তালিকা করে ফেলুন। তালিকাটি নিজের সাথেই রাখুন। তা আপনাকে ধূমপান ছাড়তে প্রস্তুত করবে এবং সাহস জোগাবে।

৬. ধূমপানের যাবতীয় ক্ষতি সম্পর্কে জানুন। মনে রাখবেন, ধূমপানের মধ্যে নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্ট, হৃদরোগ হতে শুরু করে যক্ষ্মা ও ফুসফুসের ক্যান্সারের মতো মরণব্যাধির আশঙ্কা রয়েছে। ধূমপানের ক্ষতি সম্পর্কে ইন্টারনেটে ভিডিও ক্লিপগুলো দেখতে পারেন। তাতে বিষয়টি আপনার কাছে আরও পরিষ্কার ও সুস্পষ্ট হবে।

৭. ধূমপান না করার উপকারিতা সম্পর্কে জানুন। যেমন: বায়ুদূষণ, পরিবেশ-দূষণ, অর্থের অপচয়, শরীর-স্বাস্থ্যের ক্ষতি-এসবই ধূমপানের ক্ষতিকর প্রভাব। আপনি যদি ধূমপানমুক্ত জীবনযাপন করতে পারেন, তাহলেই এর উপকারগুলো লাভ করতে সক্ষম হবেন। ধূমপানমুক্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে পরিবার, বন্ধু-বান্ধব-সবাই প্রশান্তি বোধ করে।

৮. ধূমপান ছাড়ার জন্য দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হতে হবে। আত্মনিয়ন্ত্রণ করতে হবে। নিজের মনটাকে কাবু করতে হবে। কঠিন মুহূর্তে মনের চাহিদা হবে-একবার ধূমপান করলে এমন কী-ই বা ক্ষতি হবে; কিন্তু এমন প্ররোচনা থেকে বেঁচে থাকতে হবে।

৯. আপন রবের নৈকট্য অর্জনে সচেষ্ট হোন। আল্লাহ তা'আলার যিকির দ্বারা আপনার যবান তরতাজা রাখুন। সময়মতো সালাত কায়েম ও নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াতে যত্নবান হোন।

১০. সবসময় নিজের কল্যাণে, দশের কল্যাণে নিয়োজিত থাকুন। উদ্দেশ্যহীন অবসর-যাপন নিরাপদ নয়। কারণ, অবসর হলো নফস ও শয়তানের সুবর্ণ সুযোগ। অবসরেই শয়তান মানুষকে নানা বদভ্যাস ও কুকাজে প্ররোচিত করে। ছুটি ও অবসরের সময়টাতে কোনো ক্রীড়াদল কিংবা এক্সারসাইজ টিমের সঙ্গে যোগ দিন। আপনার জীবন আরও প্রফুল্ল ও প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে। সার্বক্ষণিক ব্যস্ততা ও কর্মমুখরতায় আপনাকে ধূমপানের কথা ভুলিয়ে দিবে।

১১. ধূমপান থেকে বাঁচার লক্ষ্যে একটি টিম গড়ে তুলুন। যাদের প্রত্যেকেই ধূমপান ছাড়ার জন্য প্রতিশ্রুতিশীল ও দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। নিজেকে ধূমপানমুক্ত করার জন্য এবং পরিবেশ দূষণমুক্ত করার জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ ও কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করুন। লক্ষ্য-উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য সংঘবদ্ধ হয়ে কাজ করুন। এটা তো সর্বজনস্বীকৃত যে, একক প্রচেষ্টার চেয়ে সম্মিলিত প্রচেষ্টা অধিক কার্যকর ও ফলপ্রসূ।

১২. যে সময় ও উপলক্ষগুলোতে ধূমপানে অভ্যস্ত, তা চিহ্নিত করুন। যেমন: তিনবেলা খাবার পর, ঘুমাতে যাওয়ার আগে এবং ঘুম থেকে উঠার পর-এ সময়গুলোতে ধূমপানের পরিবর্তে কোনো ভালো খাবার খান। যেমন: তাজা ফলমূল, সালাত, হালকা নাশতাজাতীয় খাবার ইত্যাদি।

১৩. ধূমপানের পেছনে আপনার আর্থিক ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি একবার চিন্তা করুন। প্রতি সপ্তাহে, প্রতি মাসে, প্রত্যেক বছরে কী বিপুল পরিমাণ অর্থ ধূমপানের পেছনে অপচয় হচ্ছে। অথচ এ অপচায়িত অর্থের যথার্থ ব্যয়ের প্রকৃত হকদার হলেন স্বয়ং আপনি, আপনার পরিবার, আত্মীয়-স্বজন, দুস্থ ও প্রয়োজনগ্রস্ত মানবসমাজ। নিজেকে একবার জিজ্ঞেস করুন, কাল কিয়ামতের দিন যখন অর্থ-সম্পদ সম্পর্কে আপনাকে জিজ্ঞেস করা হবে, তখন এর সদুত্তর কী হবে? কিয়ামতের দিন পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর দেওয়া ব্যতীত বান্দা একচুল নড়তে পারবে না। তার মধ্যে অর্থ-সম্পদের আয়-ব্যয় সম্পর্কে জিজ্ঞেস অন্যতম। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

لَا تَزُولُ قَدَمَا ابْنِ آدَمَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ حَتَّى يُسْأَلَ عَنْ خَمْسٍ: عَنْ عُمْرِكَ فِيمَا أَفْنَيْتَ، وَعَنْ شَبَابِكَ فِيمَا أَبْلَيْتَ، وَعَنْ مَالِكَ مِنْ أَيْنَ كَسَبْتَهُ وَفِيمَا أَنْفَقْتَهُ، وَمَا عَمِلْتَ فِيمَا عَلِمْتَ "

অর্থ: 'কিয়ামত দিবসে আদম সন্তানের পা নড়তে পারবে না, যতক্ষণ না তাকে পাঁচটি বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়: তার জীবন সম্পর্কে, কী কাজে তুমি তোমার জীবন নিঃশেষ করেছ? তার যৌবন সম্পর্কে, কীসে তোমার যৌবন ক্ষয় করেছ? তার অর্থ-সম্পদ সম্পর্কে, কোন পথে উপার্জন করেছ, আর কোন পথে ব্যয় করেছ? যে জ্ঞানার্জন করেছ তার ওপর কতটুকু আমল করেছ?' (মুসনাদে আবূ ইয়ালা, ৯/১৭৮)

১৪. ধূমপানে অভ্যস্ত বন্ধু-বান্ধব ও সহকর্মীদের থেকে দূরত্ব বজায় রেখে চলুন। কেননা তাদের উৎসাহে ধূমপান আপনাকেও প্ররোচিত করবে। মুত্তাকী ও ধার্মিক ব্যক্তিদের সাথে চলুন। তাদের সংস্পর্শ আপনাকে বদভ্যাস ছাড়ার লক্ষ্যে উৎসাহিত করবে।

১৫. লক্ষ করুন, ধূমপানের কারণে শুধু আপনার একার ক্ষতি হচ্ছে না, আপনার চারপাশের ধুমায়িত পরিবেশে পরিবার, বন্ধু-বান্ধব ও সহকর্মীরা পরোক্ষ ধূমপানে বাধ্য হচ্ছে। তাদের শরীর-স্বাস্থ্য ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে। সুতরাং আল্লাহকে ভয় করুন। অন্যকে কষ্ট দেওয়া থেকে বিরত থাকুন। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
الْمُسْلِمُ مَنْ سَلِمَ الْمُسْلِمُونَ مِنْ لِسَانِهِ وَيَدِهِ.
অর্থ: 'সে-ই প্রকৃত মুসলমান, অন্য সকল মুসলমান যার যবান ও হাত থেকে নিরাপদ থাকে।' (বুখারী, ১/১১)

১৬. দেহ-মন সতেজ-সবল রাখার জন্য ধূমপান ছেড়ে বেশি বেশি পানি পান করুন। এক্ষেত্রে দুধ, ফলের জুসও বেশ কার্যকর।

১৭. যদি ধূমপানের ইচ্ছা জাগে, তাহলে ধূমপানের কারণে যক্ষ্মা ও ফুসফুসের ক্যান্সারের মতো দুরারোগ্য ব্যাধিগ্রস্ত লোকদের কথা চিন্তা করুন। তাদের রোগাক্রান্ত করুণ অবস্থা আপনাকেও সতর্ক সচেতন করবে।

১৮. সদিচ্ছা ও নিজ উদ্যোগেও যদি ধূমপান থেকে বিরত থাকা সম্ভব না হয় তাহলে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হোন। তাঁর সুপরামর্শ ও দিকনির্দেশনা অনুযায়ী চলার চেষ্টা করুন।

১৯. ধূমপান থেকে প্রত্যেকের বিরত থাকা উচিত। তবে বিশেষভাবে পিতা, শিক্ষক ও সমাজের অভিভাবক ও অনুসরণীয় ব্যক্তিদের বিরত থাকা বাঞ্ছনীয়। কেননা তাদের দেখাদেখি তরুণ সমাজও এই ভ্রষ্টাচারে প্ররোচিত হয়, ধূমপানের পথে পা বাড়ায়।

২০. দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়ে যারা ধূমপানের পথ থেকে সরে এসেছে, এখন ধূমপানমুক্ত সুস্থ-সুন্দর জীবনযাপন করছে, জনসম্মুখে তাদের সফলতার বিষয়টি প্রচার করে পুরস্কৃত করতে হবে; যেন তাদের দেখে অন্যরাও উদ্বুদ্ধ ও অনুপ্রাণিত হয়।

২১. যেকোনো পারিবারিক সমস্যা দ্রুততার সময়ে সমাধান করতে হবে। পারিবারিক বন্ধন মজবুত ও অটুট রাখার ব্যাপারে সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করা কর্তব্য। কেননা পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা ও অশান্তির কবলে অনেকেই ধূমপানের পথে পা বাড়ায়।

২২. সন্তানদের ইসলামি শিক্ষা-দীক্ষা ও ধর্মীয় অনুশাসনে গড়ে তুলতে হবে। ধূমপান ও এর ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে তাদের সচেতন করতে হবে। ধূমপানটাকে আভিজাত্য ও আধুনিকতার অনুষঙ্গ না বানিয়ে এটাকে ক্ষতিকর ও ঘৃণ্যরূপে তুলে ধরতে হবে।

২৩. রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে ধূমপানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে হবে। সিগারেট ও তামাকজাতীয় দ্রব্য ক্রয়-বিক্রয়ের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ করতে হবে। সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ইউনিভার্সিটি, অফিস-আদালত, মার্কেট, শপিং মল-মোটকথা, সর্বত্র ধূমপানের জন্য মোটা অঙ্কের আর্থিক জরিমানা আরোপ করতে হবে।

২৪. দেশের প্রতিটি অঞ্চলে ধূমপানের বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রচারাভিযান চালাতে হবে। তাতে তিনটি বিষয়ে সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করা হবে: এক. ধূমপানের ওপর শরীয়তের নিষেধাজ্ঞা। দুই. ধূমপানের ক্ষতিকর দিকগুলো সম্পর্কে দেশের বিজ্ঞ চিকিৎসকদের অভিমত। তিন. ধূমপানের বিরুদ্ধে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি।

২৫. ধূমপানের ক্ষতিকর দিকগুলো তুলে ধরে কিছু অনলাইন প্রোগ্রাম ও ভিডিও ক্লিপ প্রচার করতে হবে, যেখানে ধূমপানের কারণে সৃষ্ট দুরারোগ্য ব্যাধিগুলো, বিশেষভাবে যক্ষ্মা ও ফুসফুসের ক্যান্সারের বিষয়টি আরও সুস্পষ্ট ও স্বচিত্ররূপে প্রচার করা হবে।

২৬. আপনি যদি সরাসরি ধূমপান না করে থাকেন, তাহলে পরোক্ষ ধূমপান থেকে বেঁচে থাকুন। অর্থাৎ, যে সমস্ত স্থান সিগারেটের ধুয়ায় ধুমায়িত হয়ে আছে সেখান থেকে দূরে থাকুন। চলার পথে আশপাশ থেকে সিগারেটের ধুয়া নাকে এলে সাময়িক দম বন্ধ রাখুন। সবচেয়ে নিরাপদ হলো ভালো মাস্ক ব্যবহার করা।

২৭. অনেক বন্ধু-বান্ধব বলবে: 'লাইফে কোনো কিছু থেকে বঞ্চিত হতে নেই। সবকিছুরই অভিজ্ঞতা থাকা দরকার। সিগারেটে একটু-আধটু টান দিয়েই দেখ না।' এমন বন্ধুদের থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখুন। মনে রাখবেন, ক্ষতিকর ও অন্যায় কাজের প্রথম অভিজ্ঞতাই পরবর্তী জীবনে বিরাট আক্ষেপ-অনুতাপের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

২৮. বিশ্বাস করুন, সুস্থ-সবল ও সুন্দর জীবনযাপনের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ও শ্রেষ্ঠ পদক্ষেপ হলো ধূমপান থেকে বিরত থাকা। এ আপদ থেকে বাঁচার জন্য আল্লাহর ওপর ভরসা করুন। তাঁর সাহায্য ও তাওফিক কামনা করুন।

পরিশিষ্ট:
আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: لَا تَزُولُ قَدَمَا ابْنِ آدَمَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ حَتَّى يُسْأَلَ عَنْ خَمْسٍ: عَنْ عُمْরِكَ فِيمَا أَفْنَيْتَ، وَعَنْ شَبَابِكَ فِيمَا أَبْلَيْتَ، وَعَنْ مَالِكَ مِنْ أَيْنَ كَسَبْتَهُ وَفِيمَا أَنْفَقْتَهُ، وَمَا عَمِلْتَ فِيمَا عَلِمْتَ
অর্থ: 'কিয়ামত দিবসে আদম সন্তানের পা নড়তে পারবে না, যতক্ষণ না তাকে পাঁচটি বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়; তার জীবন সম্পর্কে, কী কাজে তুমি তোমার জীবন নিঃশেষ করেছ? তার যৌবন সম্পর্কে, কীসে তোমার যৌবন ক্ষয় করেছ? তার অর্থ-সম্পদ সম্পর্কে, কোন পথে উপার্জন করেছ, আর কোন পথে ব্যয় করেছো? যে জ্ঞানার্জন করেছ তার ওপর কতটুকু আমল করেছ?' (মুসনাদে আবু ইয়ালা, ৯/১৭৮)

ধূমপানে আসক্ত হয়ে পড়বেন না। মনে রাখবেন, আপনি যদি ধূমপানকে নিঃশেষ না করতে পারেন, ধূমপান আপনাকে নিঃশেষ করে ফেলবে। সুতরাং দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হোন এবং সিগারেট ছুড়ে ফেলুন। -আয়েয আল কারনী

এক ধূমপানকারীকে জিজ্ঞেস করা হলো: 'ধূমপানে কী লাভ?'
বললো: 'কুকুর তাড়াই।' উদ্দেশ্য, যখন সে সজোরে কাশাকাশি করে, আশেপাশের কুকুরগুলো পালিয়ে যায়।
এমন কথা শুনে তার এক বন্ধু বললো: 'কুকুর তাড়াতে গিয়ে তুমি তো নিজেকেই পুড়িয়ে ফেলছ। বন্ধু-বান্ধব ও নিকটজনদের পরোক্ষ ক্ষতি করছ।'

📘 আল হাল্লু জীবন সমস্যার সমাধান 📄 আসক্তি ও নেশা

📄 আসক্তি ও নেশা


নেশা হলো নির্দিষ্ট কোনো বিষয়-বস্তুতে মানুষের অস্বাভাবিক আসক্তি। নেশা বিভিন্নমুখী হতে পারে-সুনির্দিষ্ট বিষয়ে, ড্রাগে কিংবা নেশাজাতীয় দ্রব্যে।

ব্যক্তি যখন কোনো কিছুতে এডিক্টেড হয়, এর নেতিবাচক প্রভাব তার জীবনের প্রতিটি অঙ্গনে প্রতিফলিত হয়। তার মনে হতে থাকে, আসক্তির বিষয় ও নেশার দ্রব্য ছাড়া তার পক্ষে বেঁচে থাকা অসম্ভব। এগুলো না পাওয়াতে তার মানসিকতায় বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটে। মন-মেজাজ ভীষণ রকম বিগড়ে যায়। আসক্তির বিষয় ও নেশার দ্রব্য পাওয়ার জন্য সে বেপরোয়া হয়ে উঠে। পরিবার-পরিজন, বন্ধু-বান্ধব কারোর ক্ষতির প্রতিই সে বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ করে না। যেকোনো মূল্যে তার আসক্তির বিষয় ও নেশার দ্রব্যটি চাই-ই চাই।

নেশা দু ধরনের: এক. দ্রব্যজাতীয় শারীরিক নেশা, দুই, আর স্বভাব ও আচরণগত নেশা।
দ্রব্যজাতীয় শারীরিক নেশা হলো, ড্রাগ গ্রহণ কিংবা মাদক-সেবনে এডিক্টেড হয়ে পড়া, যা ছাড়া সে বেশিক্ষণ থাকতে পারে না।
স্বভাব ও আচরণগত নেশা হলো, নির্দিষ্ট কোনো ক্ষেত্রে ব্যক্তি অস্বাভাবিক অভ্যস্ত হয়ে পড়া। যেমন: ইন্টারনেট ও সোস্যাল মিডিয়া এডিক্টেড, গেমস এডিক্টেড ও মুভি-সিরিজ এডিক্টেড।

ব্যক্তি যখন কোনো নেশা ও এডিকশনের শিকারে পরিণত হয়, তার জীবন হয়ে পড়ে কল্যাণশূণ্য। নিজের ও দশের কল্যাণে তার কোনো কার্যকারিতা থাকে না। পরিবার, সমাজ ও দেশের জন্য সে এক অসহনীয় বোঝা।

সুস্থ সুন্দর জীবনযাপনের জন্য মাদকমুক্ত ও এডিকশনমুক্ত সমাজ গড়ে তোলার বিকল্প নেই। কিন্তু উপায় কী? নেশা ও মাদক সমস্যার সমাধান কী?

সমাধান:
১. ব্যক্তিকে প্রথমেই নেশাগ্রস্ততার বিষয়টিকে অপরাধ বলে স্বীকার করতে হবে। নেশার কারণে নিজের মনে গভীর অপরাধবোধ থাকতে হবে। এডিকশনমুক্ত হওয়ার জন্য সুদৃঢ় মানসিকতা ও সর্বাত্মক চেষ্টা অত্যাবশ্যক। এক্ষেত্রে পরিবার-পরিজন ও নিকটজনদের সাহায্য-সহযোগিতা করা একান্ত কর্তব্য।

২. অভিজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। চিকিৎসকের প্রতিটি পরামর্শ ও দিকনির্দেশনা মোতাবেক চলতে হবে।

৩. যেকোনো পারিবারিক সমস্যা দ্রুততর সমাধান করা বাঞ্ছনীয়। পারিবারিক বন্ধন মজবুত ও অটুট রাখার জন্য সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করা কর্তব্য। কারণ, পারিবারিক সম্পর্কের তিক্ততা ও অশান্তির কবলে অনেকেই মাদক ও নেশার পথে পা বাড়ায়।

৪. সন্তানদের কুরআন-সুন্নাহর আদর্শ ও ধর্মীয় অনুশাসনে গড়ে তুলতে হবে। আল্লাহভীতি ও ধর্মীয় মূল্যবোধে অনুপ্রাণিত করতে হবে।

৫. বয়ঃসন্ধিকালে সন্তানদের মধ্যে মাদক সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা কর্তব্য। নেশা ও মাদকের ক্ষতিকর দিকগুলো সম্পর্কে অবহিত করা বাঞ্ছনীয়। বয়সের এ নাজুক সময়টাতে দীর্ঘ সময়ের জন্য সন্তানদের অভিভাবকহীন ছাড়া উচিত নয়। কেননা যেকোনো অসৎসঙ্গের কবলে পড়ে সে নৈতিক ও চারিত্রিক ভ্রষ্টাচারের শিকার হতে পারে।

৬. দু'আ ও নামাযের মাধ্যমে আল্লাহমুখী হতে হবে। সূরা ফাতিহা ও সূরা ইখলাস বারবার পাঠ করার সঙ্গে সঙ্গে বেশি বেশি ইস্তিগফার করতে হবে। অসৎ সঙ্গ পরিহার করে সৎসঙ্গ গ্রহণ করতে হবে। কেননা অসৎসঙ্গ ব্যক্তিকে অন্যায় ও পাপাচারের পথে ধাবিত করে। আর সৎসঙ্গ ন্যায় ও সদাচারের পথ সুগম করে।

৭. খারাপ নেশা ও নেগেটিভ এডিকশনের পরিবর্তে ভালো কাজে অভ্যস্ত হতে হবে। যেমন: ইন্টারনেট, সোস্যাল মিডিয়া ও গেমস এডিকশনের পরিবর্তে সময়মতো পাঁচওয়াক্ত নামায, কুরআন তিলাওয়াত, তাসবীহ ও ইস্তিগফারে সদামশগুল থাকাই কর্তব্য।

৮. যে পরিবেশ-পরিস্থিতি ব্যক্তিকে মাদক-নেশার দিকে ঠেলে দেয়, অস্বাভাবিক আসক্তি ও এডিকশনের পথে ধাবিত করে, তা থেকে বেঁচে থাকতে সুস্থ, শালীন ও সুন্দর পরিবেশে স্থানান্তরিত হওয়া আবশ্যক। কেননা ব্যক্তি যতই সভ্য-ভদ্র ও শালীন-কুলীন হোক-না-কেন, অন্ধকার কলুষিত সমাজের উদ্যাম স্রোতে তার পদস্খলন হবে না-এর নিশ্চয়তা কোথায়?

৯. নেতিবাচক ধ্যান-ধারণা, চিন্তা-চেতনা ও হতাশার কবল থেকে বেঁচে থাকুন। কখনো কখনো তা ব্যক্তিকে নেশা ও মাদকতার পথে ধাবিত করে। অবসরের গণ্ডি থেকে বেরিয়ে এসে কর্মমুখর জীবনযাপন করুন। সর্বদা জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা, নিজের কল্যাণে ও দশের কল্যাণে নিয়োজিত থাকুন।

১০. অভিজ্ঞতা লাভের জন্য কিংবা একবার উপভোগ করার উদ্দেশ্যে-যেকোনোভাবেই হোক না কেন-ড্রাগস ও মাদক সেবনের ব্যাপারে সতর্ক থাকুন। কেননা ক্ষতিকর ও ধ্বংসাত্মক বিষয়ে প্রাথমিক অভিজ্ঞতা লাভের উদগ্র বাসনা এক পর্যায়ে তাকে মারাত্মক নেশার পথে ধাবিত করে এবং পরবর্তী জীবনে গভীর আক্ষেপ-অনুতাপের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

১১. এ কথা কস্মিনকালেও বিশ্বাসযোগ্য নয়, এডিকশন ও নেশাগ্রস্ততা মনের কষ্ট-যাতনা দূর করে অনাবিল সুখ ও প্রশান্তি দান করে। এটা নির্জলা মিথ্যা ধারণা। ড্রাগস ও মাদক হলো গণবিধ্বংসী বিষ। এর ধ্বংসাত্মক পরিণতি সর্বব্যাপী।

১২. মনে রাখতে হবে, ড্রাগস ও মাদক সেবনে ব্যক্তি অনেক দুরারোগ্য প্রাণঘাতী ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়। তার মধ্যে অন্যতম হলো লিভার ডিজিস, হৃদরোগ, মানসিক রোগ ও ক্যান্সার ইত্যাদি।

১৩. নেশাগ্রস্ত লোকেরা নেশার তাড়নায় নানা অন্যায় অপকর্মে জড়িয়ে পড়ে। কখনো বা আইনের হাতে পড়ে দীর্ঘদিনের স্বশ্রম কারাণ্ড ভোগ করতে হয়। একপর্যায়ে সামাজিক মান-মর্যাদা হারিয়ে পরিবার, সমাজ ও দেশের জন্য দুর্বিষহ বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।

১৪. ড্রাগস ও মাদক-নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে কঠোর আইন প্রণয়ন করে এর যথাযথ প্রয়োগ করতে হবে। এক্ষেত্রে কোনোরূপ অবহেলা ও শিথিলতা মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়।

১৫. এডিক্টেড ও মাদকাসক্ত লোকদের শাস্তির সম্মুখীন করার সঙ্গে সঙ্গে তাদের জন্য পুনর্বাসন কেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে। সেখানে বিজ্ঞ চিকিৎসক ও মনোবিজ্ঞ ডাক্তারদের নিবিড় পরিচর্যার মাধ্যমে তাদের সুস্থ স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে কাজ করতে হবে।

১৬. পরিবার-পরিজন ও বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে যখন আলাপ-আলোচনার বৈঠক হবে, তখন সমস্ত অমনোযোগিতা ছেড়ে মনোযোগে তাদের কথা শুনুন। এ সময় মোবাইলে ব্যস্ত হয়ে পড়া, ইন্টারনেটে বিভিন্ন ওয়েবসাইট ঘাঁটাঘাঁটি করাও একপ্রকার আসক্তি, যা পরিহার করা বাঞ্ছনীয়।

১৭. দেশের প্রতিটি অঞ্চলে মাদকতার বিরুদ্ধে সচেতনতামূলক প্রচারাভিযান চালাতে হবে এবং তা ধারাবাহিকভাবে পরিচালনা করতে হবে। তাতে তিনটি বিষয়ে সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করা হবে: এক. নেশা ও মাদকদ্রব্যের ওপর শরীয়তের নিষেধাজ্ঞা। দুই. মাদকের ক্ষতিকর দিকগুলো সম্পর্কে দেশের বিজ্ঞ চিকিৎসকদের অভিমত। তিন. মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি। মাদকের ক্ষতিকর দিকগুলো তুলে ধরে কিছু অনলাইন প্রোগ্রাম ও ভিডিও ক্লিপ প্রচার করতে হবে। যেখানে মাদকের কারণে সৃষ্ট দুরারোগ্য ব্যাধিগুলো, বিশেষভাবে যক্ষ্মা ও ফুসফুসের ক্যান্সারের বিষয়টি আরও সুস্পষ্ট ও স্বচিত্ররূপে প্রচার করা হবে।

১৮. নিজেকে নেশা ও মাদকতার অসহায় শিকারে পরিণত করবেন না। আল্লাহ তা'আলার ওপর ভরসা করুন। যেকোনো ধরনের আসক্তি ও নেশা থেকে বিরত থাকার লক্ষ্যে দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হোন। সর্বোপরি আল্লাহ তা'আলার সাহায্য ও তাওফিক কামনা করুন। তিনিই পরম সাহায্যকারী।

পরিশিষ্ট:
আমাদের দেশে এক যুবককে চিনি। সাঈদ হাম্মাদ। তার মতো মেধাবী, উচ্চাকাঙ্ক্ষী, উদ্যমী ও প্রতিশ্রুতিশীল যুবক সচরাচর দেখা যায় না। লেখাপড়ার প্রতিটি স্তরেই সে সফলতার সাথে উত্তীর্ণ হয়েছে। চাকরির জন্য তাকে দশ জায়গায় ধন্না দিতে হয়নি। নিজ যোগ্যতাবলেই ভালো চাকরি পেয়েছে। দুটি শিশু সন্তানসহ সুন্দর সাজানো সংসার তার। বেশ উচ্ছল প্রাণবন্ত ও হাসি-আনন্দেই কাটছিল তার দিনগুলো।

প্রতিদিন চলার পথে, কর্মসূত্রে কতজনের সাথেই তো দেখা হয়। কারো সাথে নতুন পরিচয় ঘটে। এমনই একদিন অফিস শেষে ফেরার পথে পরিচয় হলো এক যুবকের সাথে। নাম তার যাঈফ সাদেক। পোশাক-আশাকে পুরোদস্তুর ভদ্র সম্ভ্রান্ত। কথাবার্তায় ঈষৎ চটপটে।

তারপর আরেক দিন যাঈফের সাথে দেখা। কোথাও যাচ্ছে সে। ছুটির দিন। কথা বলতে বলতে হাম্মাদও তার সাথে চলতে লাগল। যাঈফের সূত্রে দেখা হলো, পরিচয় হলো আরও একদল যুবকের সাথে। এরা সবাই যাঈফের বন্ধু। তাদের সাথে চুটিয়ে আড্ডা হলো। একজন অপরজনের কথায় কথায় জীবনের কত অনুষঙ্গই উঠে এল। আলাপ-আলোচনায় তার মনে হলো, যাঈফ ও তার বন্ধু-বান্ধব-সবাই ড্রাগস এডিক্টেড।

এরপর দিন দিন বিভিন্ন উপলক্ষে, অবসরের সুযোগে যাঈফ ও তার বন্ধুদের সাথে হাম্মাদের নিয়মিত উঠাবসা। এখন সে তাদের সাথে নিজেকে বেশ মানিয়ে নিয়েছে। একপর্যায়ে তারও কৌতূহল জাগল, এডিকশন ও নেশার অনুভূতিটা কী ধরনের? এদের কথাবার্তা শুনে তো মনে হচ্ছে বেশ ইন্টারেস্টিং।

এখান থেকেই হাম্মাদের ভেতর সঙ্গদোষের ক্ষতিকর প্রভাববিস্তারের শুরু। নেশার ঘোরে মাদকতার উন্মত্ততায় দিন দিন তার অবস্থার চরম অবনতি হতে লাগল। হাম্মাদ ছিল পরিবার-পরিজনমুখী প্রাণবন্ত। এখন তার পরিবার-বিমুখতা ও নিশ্চলতা দেখে সবাই যারপনাই বিস্মিত। এরপর কিছু দিন তাকে আর কোথাও দেখা যায় না। খোঁজ নিয়ে জানা গেল, মাদক অপরাধে গ্রেফতার হয়ে জেল হাজতে বন্দি। শরীর স্বাস্থ্য একেবারেই ভেঙে পড়েছে। মাদকতার তাড়নায় উপার্জিত সমস্ত অর্থ-সম্পদ খুইয়ে বসেছে। অভিভাবকহীন সন্তান দু'টাও এখন ছন্নছাড়া।

জীবদ্দশাতেই নিজ হাতে সে তার উজ্জ্বল বর্তমান ও ভবিষ্যৎ ঘোর অন্ধকারে ঠেলে দিল। ইহকাল-পরকাল বরবাদ করে ছাড়ল। তার কাছে আমার জিজ্ঞেস, মানুষ হিসেবে সৃষ্টি করার পর আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে সবচেয়ে বড় নিয়ামত হলো বিবেক-বুদ্ধি। এই অমূল্য নিয়ামত কি নেশা ও মাদকতায় নিঃশেষ করার জন্য?
হে আল্লাহ, আপনি আমাদের ঈমানের ওপর অবিচল রাখুন। আমাদের-বিবেক-বুদ্ধি সঠিক পথে পরিচালিত করুন। আমাদের সরল পথ প্রদর্শন করুন। (আমিন)

আট বছর বয়সের ছোট্ট বালকটির কথা আমি ভুলতে পারব না। কী নিষ্পাপ মাসুম চেহারা। কিন্তু অভিভাবকের আদর-আহ্লাদ কিংবা উদাসীনতায় এখন সে-ই মোবাইল-এডিক্টেড হয়ে পড়েছে। সারা দিন মোবাইল হাতে একের পর এক গেমস খেলছে, ভিডিও দেখছে। মোবাইল ছাড়া একমুহূর্তও সে থাকতে পারে না। লেখাপড়া, খেলাধুলা, আনন্দ-বিনোদনপূর্ণ উচ্ছল প্রাণবন্ত জীবন তার মোবাইল, গেমস ও ইন্টারনেটে সংকুচিত হয়ে পড়েছে। ডাক্তার তার সার্বিক অবস্থা যাচাই করার পর বলল, 'তার অবস্থা উদ্বেগজনক। ছেলেটির থ্রম্বসিস অর্থাৎ, গভীর শিরায় রক্ত জমাট হওয়ার ব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়ার সমূহ আশঙ্কা রয়েছে। মোবাইল, গেমস, সোস্যাল মিডিয়া ও মুভিসিরিজ ইত্যাদিতে আমরা এতটাই আকণ্ঠ মজে যাই, নিজেদের অজান্তেই এডিক্টেড হয়ে পড়ি। তাই এ জাতীয় বিষয়গুলোর পরিমিত ব্যবহার বাঞ্ছনীয়।

📘 আল হাল্লু জীবন সমস্যার সমাধান 📄 অন্ধ অনুকরণ

📄 অন্ধ অনুকরণ


তাকলীদ হলো অন্যের কথা মান্য করা, তার মতো করে কাজ করা। তাকলীদ দুই প্রকার:

এক. যে তাকলীদ ওয়াজিব ও মুস্তাহাব, তার উদ্দেশ্য হলো, কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য-উদ্দেশ্য অর্জন করা এবং ইহকালে ও পরকালে সফলতা লাভ করা। যেমন: রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সুন্নাহ ও আদর্শের অনুসরণ করা। তাঁর আনীত আসমানি কিতাব কুরআনের বিধি-বিধান মেনে চলা। এর বাইরে বিজ্ঞ পণ্ডিত, মহামনীষী বা অন্যদের ভালো কথা ও হিতাকাঙ্ক্ষামূলক উপদেশ মেনে চলাও কর্তব্য। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা এমন ন্যায়-নীতি ও সত্যানুসারী লোকদের হেদায়েতপ্রাপ্ত ও জ্ঞানী বলে আখ্যায়িত করেছেন:

الَّذِينَ يَسْتَمِعُونَ الْقَوْلَ فَيَتَّبِعُونَ أَحْسَنَهُ أُولَئِكَ الَّذِينَ هَدُهُمُ اللَّهُ وَأُولَئِكَ هُمْ أُولُو الْأَلْبَابِ﴾ [الزمر: ١٨]

অর্থ: 'যারা কথা শোনে মনোযোগ দিয়ে, অতঃপর তার মধ্যে যা-কিছু উত্তম তার অনুসরণ করে, তারাই এমন লোক, যাদেরকে আল্লাহ হেদায়াত দান করেছেন এবং তারাই বোধশক্তিসম্পন্ন।' (যুমার, ৩৯: ১৮)

দুই. যে তাকলীদ হারাম ও নিন্দনীয়। এটাকে বলে 'আত্তাক্লীদুল আ'মা' (অন্ধ অনুকরণ)। অর্থাৎ, কোনো দলিল-প্রমাণ ছাড়া অন্যের কথা ও মতাদর্শ গ্রহণ করা। কুরআন-সুন্নাহর মানদণ্ডে বিচার না করে, সুস্থ বিবেক-বুদ্ধির আলোকে যাচাই না করে একরোখাভাবে কারো অনুসরণে লেগে যাওয়া।

এমন অন্ধ-অনুকরণের কবলে ব্যক্তি তার ভালো-মন্দ যাচাই করার শক্তি হারিয়ে ফেলে। বোধ-উপলব্ধি ও বিবেক-বুদ্ধিতে সে নিস্তেজ অকার্যকর হয়ে পড়ে। তার দু' চোখ খোলা; কিন্তু আলোহীন। সে দেখে; কিন্তু অন্যের চোখে। গ্রহণ করে অন্যের দৃষ্টিভঙ্গি। তার কান সজাগ উৎকর্ণ; কিন্তু শোনে অন্যের মতো করে। তার নিজস্ব কোনো বক্তব্য নেই। সর্বদা অন্যের বুলি মুখস্থ আওড়িয়ে বেড়ায়। স্বতন্ত্র চিন্তা-চেতনার ঘর শূন্য। অন্যের ভাবধারায় আকণ্ঠ নিমজ্জিত।

এভাবে নিজের অজান্তে কখন-যে কুরআন-সুন্নাহর আদর্শচ্যুত হয়ে পড়ে, ঠাওর করতে পারে না। যখন বুঝতে পারে ফিরে আসার পথ থাকে না। কুরআন-সুন্নাহর আলোকে আদর্শ ও মতাদর্শ অনুসরণের জন্য অবশ্যই মানবরচিত আদর্শের অন্ধ অনুকরণের গণ্ডি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। কিন্তু তার উপায় কী? অন্ধ অনুকরণ সমস্যার যথার্থ সমাধানই বা কী?

সমাধান:
১. মনে রাখতে হবে, নিঃশর্ত আনুগত্য ও প্রশ্নাতীত অনুসরণ একমাত্র আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের জন্য। এ ব্যাপারে ইসলাম কোনো ধরনের শিথিলতা ও আপসরফার মনোভাব সমর্থন করে না। কেননা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ﷺ-এর আনুগত্য এমন কোনো বিষয় নয়, যাতে যৌক্তিক মতভেদ হতে পারে। অতএব মতামতের স্বাধীনতার মূলনীতি এখানে অচল।

২. এ কথা স্বীকার করতে হবে ও বিশ্বাস করতে হবে যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ মাসুম ও গুনাহমুক্ত। কথাবার্তা ও কর্মপদ্ধতিতে, আদর্শে ও মতাদর্শে তিনি যাবতীয় ভুল-বিচ্যুতির ঊর্ধ্বে। কেননা নিজের পক্ষ থেকে তিনি কিছুই বলতেন না। যা বলতেন, মহান আল্লাহ রাব্বুল 'আলামীনের পক্ষ থেকে ওহীর আলোকে বলতেন। যা কিছু করতেন, আল্লাহ তা'আলার নির্দেশ মোতাবেক করতেন। তিনি ব্যতীত যে কেউ ভুলের শিকার হতে পারে। ভুল করে বসতে পারে নিজের অজান্তেই। তাই অন্যদের মতামত ও আদর্শ যদি কুরআন-সুন্নাহর মানদণ্ডে হয় তাহলে গ্রহণযোগ্য, অন্যথায় তা বিবর্জিত।

৩. শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা ইনস্টিটিউটগুলোতে নিত্য-নতুন আবিষ্কার ও উদ্ভাবনের কর্মপ্রচেষ্টা সচল রাখতে হবে। প্রতিটি আবিষ্কার ও উদ্ভাবন হতে হবে মানব-কল্যাণমুখী, জীবন-জগতের প্রয়োজন ও বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্যশীল, যা ইহজাগতিক জীবনের গতিময়তা বৃদ্ধি করবে এবং পরকালের কাঙ্ক্ষিত সফলতা অর্জনের পথ সুগম করবে।

৪. অন্যান্য জাতিবর্গের সভ্যতা-সংস্কৃতি ও সফলতার ইতিবাচক দিকগুলো গ্রহণ করে তাদের উদ্ভট চিন্তাপ্রসূত মতাদর্শ, অন্যায়-অন্যায্য কৃষ্টিকালচার ও ভ্রষ্টাচার পরিহার করা কর্তব্য। এক্ষেত্রে মূলনীতি হলো: الْكَلِمَةُ الْحِكْمَةُ ضَالَّةُ الْمُؤْمِنِ فَحَيْثُ وَجَدَهَا فَهُوَ أَحَقُّ بِهَا অর্থ: প্রজ্ঞার বাণী হলো মু'মিনের হারানো ধন। যেখানেই তা পাওয়া যাবে, মুমিনই হলো এর অগ্রগণ্য হকদার।

৫. দেশের সর্বত্র গবেষণা ইনস্টিটিউট ও শিল্পকারখানা গড়ে তুলতে হবে। যেন মেধাবী ও যোগ্য ব্যক্তি তার মেধা ও যোগ্যতা কাজে লাগানোর উপযুক্ত সুযোগ পায়। বিজ্ঞান ও গবেষণার প্রতিটি শাখা-প্রশাখায় উন্নতি-অগ্রগতির লক্ষ্যে কাজ করতে হবে। এক্ষেত্রে কুরআন-সুন্নাহর বিচারে বিশুদ্ধতা ও যুগের চাহিদার মাঝে সমন্বয় করে কাজ করা আবশ্যক। এ দুয়ের মধ্যে যদি কখনো সংঘাত দেখা দেয়, তবে কুরআন-সুন্নাহর আদর্শই হতে হবে অগ্রগণ্য।

৬. গবেষণা, আবিষ্কার ও উদ্ভাবনের সমস্ত শাখা-প্রশাখায় তরুণ প্রজন্মের জন্য উন্নত শিক্ষা-দীক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। তাদের ব্যক্তিত্ব গঠন ও আত্মোন্নয়নের লক্ষ্যে কাজ করতে হবে, যেন তারা বিশ্বসমাজে নিজেদের ব্যক্তিত্ব, স্বাতন্ত্র্য ও স্বকীয়তা বজায় রেখে সসম্মানে টিকে থাকতে সক্ষম হয়।

৭. যুগে যুগে ধর্মীয় সংস্কারক, বুদ্ধি ও চিন্তার জগতে নতুন দিগন্ত উন্মোচনকারী মহীয়সী ব্যক্তিদের জীবনী অধ্যয়ন করতে হবে। তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন ইমাম শাফেয়ী, ইবনে তাইমিয়াহ, ইবনে খালদুন ও ইবনুন নাফীস (রহ.) প্রমুখ।

৮. মনে রাখতে হবে, পবিত্র কুরআনে বহুবার অন্ধ অনুকরণের সমালোচনা করা হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা বলেছেন:
وَإِذَا قِيلَ لَهُمُ اتَّبِعُوا مَا أَنْزَلَ اللَّهُ قَالُوا بَلْ نَتَّبِعُ مَا أَلْفَيْنَا عَلَيْهِ آبَاءَنَا أَوَلَوْ كَانَ آبَاؤُهُمْ لَا يَعْقِلُونَ شَيْئًا وَلَا يَهْتَدُونَ)
অর্থ: 'যখন তাদেরকে (কাফিরদেরকে) বলা হয়, আল্লাহ যে বাণী নাযিল করেছেন তার অনুসরণ কর, তখন তারা বলে, না, আমরা তো কেবল সে সকল বিষয়েরই অনুসরণ করব, যার ওপর আমরা আমাদের বাপ-দাদাকে পেয়েছি। আচ্ছা! সেই অবস্থায়ও কি (তাদের এটাই করা উচিত) যখন তাদের বাপ-দাদা (দ্বীনের) কিছুমাত্র বুঝ-সমঝ রাখত না? আর তারা কোন (ঐশী) হিদায়াতও লাভ করেনি?' (বাকারা, ২: ১৭০)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
لَتَتَّبِعُنَّ سَنَنَ مَنْ قَبْلَكُمْ شِبْرًا بِشِبْرٍ، وَذِرَاعًا بِذِرَاعٍ، حَتَّى لَوْ سَلَكُوا جُحْرَ ضَبٌ لَسَلَكْتُمُوهُ، قُلْنَا يَا رَسُولَ اللهِ: اليَهُودَ، وَالنَّصَارَى قَالَ: «فَمَنْ ) صحيح البخاري (١٦٩/٤
অর্থ: (আমি আশঙ্কা করছি,) তোমরা অবশ্যই তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের রীতি-নীতি অক্ষরে অক্ষরে অনুসরণ করবে (যা আদৌ করা উচিত নয়)। এমনকি তারা যদি গুঁইসাপের গর্তেও ঢুকে যায়, তোমরাও তাতে ঢুকবে।' সাহাবায়ে কিরাম জিজ্ঞেস করলেন, 'ইয়া রাসূলুল্লাহ, তারা কি ইহুদী ও খ্রিষ্টান?' জবাবে তিনি বললেন, 'তারা ছাড়া আর কে?' (বুখারী, ৪/১৬৯)

৯. যারা অন্ধ অনুকরণের পথে হাঁটে তারা শয়তানের খেলার পুতুলে পরিণত হয়। পাপাচার, অনাচার, শিরক, ধর্মচ্যুতি ও নাস্তিকতার ময়দানে শয়তান তাদের নিয়ে খেলে বেড়ায়। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন:
وَجُوَزْنَا بِبَنِي إِسْرَاعِيلَ الْبَحْرَ فَأَتَوْا عَلَى قَوْمٍ يَعْكُفُونَ عَلَى أَصْنَامٍ لَّهُمْ قَالُوا يُمُوسَى اجْعَلُ لَّنَا إِلَهَا كَمَا لَهُمْ آلِهَةٌ قَالَ إِنَّكُمْ قَوْمٌ تَجْهَلُونَ * إِنَّ هَؤُلَاءِ مُتَبَّرٌ مَّا هُمْ فِيْهِ وَبُطِلٌ مَّا كَانُوا يَعْمَلُونَ﴾ [الأعراف : ۱۳৮، ۱۳۹]
অর্থ: 'আমি বনী ইসরাঈলকে সাগর পার করিয়ে দিলাম। অতঃপর এমন কিছু লোকের নিকট দিয়ে অতিক্রম করল যারা তাদের মূর্তিপূজায় রত ছিল। বনী ইসরাঈল বলল, হে মূসা! এদের যেমন দেবতা আছে, তেমনি আমাদের জন্যও কোন দেবতা বানিয়ে দাও। মূসা বলল, তোমরা এমন (আজব) লোক যে, মূর্খতাসূলভ কথা বলছ। নিশ্চয়ই এসব লোক যে ধান্ধায় লেগে আছে, সব ধ্বংস হয়ে যাবে এবং তারা যা-কিছু করছে সব ভ্রান্ত।' (সূরা আ'রাফ: ১৩৮-১৩৯)

১০. বর্তমান তরুণ প্রজন্ম ও যুব সমাজের মধ্যে কুরআন-সুন্নাহর আদর্শ ও ধর্মীয় শিক্ষা-দীক্ষার প্রচার-প্রসার ঘটাতে হবে। সজাগ করে তুলতে হবে ধর্মীয় মূল্যবোধ ও ঈমানী চেতনা। শিষ্টাচার, শালীনতা ও নীতি-নৈতিকতাবোধের ভিত্তি সুদৃঢ় করতে হবে। বয়ঃসন্ধিকাল ও যৌবনের দূরন্ত আবেগ-উদ্দীপনার মুহূর্তে নানা পথ ও মতাদর্শের পিচ্ছিল অঙ্গনে ধর্মীয় শিক্ষা-দীক্ষাহীন অবাধ বিচরণ কখনই আশঙ্কামুক্ত নয়।

১১. পারিবারিক সম্পর্ক ও সম্প্রীতির বন্ধন অটুট রেখে সন্তানদের ওপর আদর-স্নেহ ও প্রজ্ঞাপূর্ণ তত্ত্বাবধান বজায় রাখতে হবে। এক্ষেত্রে অসৎসঙ্গ ও ভ্রষ্ট মতাদর্শ থেকে সতর্ক করে সৎসঙ্গ ও প্রকৃত আদর্শে অনুপ্রাণিত করা অত্যধিক গুরুত্বপূর্ণ। অন্ধভক্তির কবল থেকে বাঁচিয়ে কুরআন-সুন্নাহর আদর্শে পরিচালিত করা সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।

১২. হিংসা-বিদ্বেষ, অন্যের কর্মধারা ও ভাবাদর্শের অন্ধ অনুকরণের মানসিকতা পরিহার করা বাঞ্ছনীয়। তার পরিবর্তে নিজ যোগ্যতা ও দক্ষতাবলে এগিয়ে যাওয়ার মানসিকতা লালন করা কর্তব্য। এটাই সফলতার মূল চাবিকাঠি।

১৩. অবসর ও ছুটিতে ছেলে-মেয়েদের সাথে সময় কাটাতে হবে। তাদের সাথে মহতি উদ্যোগ-আয়োজনে শামিল হতে হবে। দীর্ঘ ছুটিতে ছেলে-মেয়েদের বন্ধু-বান্ধবের সাথে লাগামহীন মেলামেশা এবং যত্রতত্র অবাধ বিচরণ, নানা পথ ও মতাদর্শের অন্ধ অনুকরণের ঘেরাটোপে আবদ্ধ হওয়ার আশঙ্কা বৃদ্ধি করে।

১৪. পশ্চিমা সভ্যতা-সংস্কৃতি ও কৃষ্টি-কালচারের চাকচিক্যপূর্ণ ও জমকালো আয়োজন দেখে প্রতারিত না হবেন না। কুরআন-সুন্নাহর আদর্শ, এর স্বকীয়তা ও স্বাতন্ত্র্যের গৌরব ধারণ করুন। ইসলাম মানবতার কল্যাণে আকিদা-বিশ্বাস, সাম্য, ভ্রাতৃত্ব, ন্যায়ানুগতা ও শুদ্ধাচারের যে মহান বার্তা নিয়ে আগমন করেছে, মানবসমাজ ও সভ্যতাকে যে অন্যায়-অনাচার, পাপাচার-নষ্টাচার এবং কুফর-শিরকের অন্ধকার থেকে উদ্ধার করেছে, তা ভুলে গেলে চলবে না। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা উম্মতে মুহাম্মদীর উদ্দেশ্যে বলেছেন:
كُنْتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَتَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَتُؤْمِنُونَ بِاللهِ وَلَوْ آمَنَ أَهْلُ الْكِتٰبِ لَكَانَ خَيْرًا لَّهُمْ * مِنْهُمُ الْمُؤْمِنُونَ وَأَكْثَرُهُمُ الْفَسِقُونَ﴾ [آল عمران: ১১০]
অর্থ: '(হে মুমিনগণ!) তোমরা সেই শ্রেষ্ঠতম দল, যাদেরকে মানুষের কল্যাণের জন্য যাদের অস্তিত্ব দান করা হয়েছে। তোমরা পুণ্যের আদেশ করে থাক ও অন্যায় কাজে বাধা দিয়ে থাক এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান রাখ। কিতাবীগণ যদি ঈমান গ্রহণ করত, তাহলে তাদের জন্য তা কতই না উত্তম হত। তাদের মধ্যে কতক তো ঈমানদার, কিন্তু তাদের অধিকাংশই নাফরমান।' (সূরা আলে-ইমরান : ১১০)

পরিশিষ্ট:
মালেকী মাযহাবের বিশিষ্ট ইমাম আল্লামা ইবনে আব্দুল বার (রহ.) (৩৬৮-৪৬৩ হি.) অন্ধ অনুকরণের নিন্দা করে বলেছেন:
'ওলামায়ে কিরামের নিকট অনুসরণ আর অন্ধ অনুকরণ এক নয়। অনুসরণ হলো, বক্তার বক্তব্যের তত্ত্ব, মর্ম ও যথার্থতা অনুধাবন করে তা গ্রহণ করা এবং মেনে চলা। আর অন্ধ অনুকরণ হলো, না বুঝে, না জেনে প্রকৃত মর্ম ও তত্ত্ব অনুধাবন না করে কারো কথা গ্রহণ করা, কোনো মতাদর্শ আঁকড়ে থাকা।'

আল্লামা ইবনে আব্দুল বার (রহ.) অন্ধ অনুকরণের নিন্দা করেছেন শিক্ষণীয় শৈলীতে ও চমকপ্রদ ও কবিতার ভাষায়:
يَا سَائِلِي عَنْ مَوْضِعِ التَّقْلِيدِ خُذْ عَنِّي الْجَوَابَ بِفَهْمِ لُبِّ حَاضِرِ
وَاصْغِ إِلَى قَوْلِي وَدِنْ بِنَصِيحَتِي وَاحْفَظْ عَلَيَّ بَوَادِرِي وَنَوَادِرِي
لَا فَرْقَ بَيْنَ مُقَلَّدٍ وَبَهِيمَة تَنْقَادُ بَيْنَ جَنَادِلَ وَدَعَائِرِ
تَبًّا لِقَاضٍ أَوْ لِمُفْتٍ لَا يَرَى عِلَلًا وَمَعْنَى لِلْمَقَالِ السَّائِرِ
فَإِذَا اقْتَدَيْتَ فَبِالْكِتَابِ وَسُنَّةِ الْمَبْعُوثِ بِالدِّينِ الْحَنِيفِ الطَّاهِرِ
ثُمَّ الصَّحَابَةِ عِنْدَ عُدْمِكَ سُنَّةً فَأُولَاكَ أَهْلُ نَهَى وَأَهْلُ بَصَائِرِ
وَكَذَاكَ إِجْمَاعُ الَّذِينَ يَلُونَهُمْ مِنْ تَابِعِيهِمْ كَابِرًا عَنْ كَابِرِ
إِجْمَاعُ أُمَّتِنَا وَقَوْلُ نَبِيِّنَا مِثْلُ النُّصُوصِ لِذِي الْكِتَابِ الزَّاهِرِ

অর্থ: তাকলীদ সম্পর্কে প্রশ্নকারী, দিল-মন লাগিয়ে গভীর মনোযোগে উত্তর শুনে নাও! আমার হিতোপদেশ গ্রহণ কর!
অন্ধ-অনুকরণকারী ও ঐ গবাদিপশুর মাঝে কোনো তফাৎ নেই, যা পালের পশুগুলোর দেখাদেখি চরছে। কোথায় যাচ্ছে, কেন যাচ্ছে-এ সবই তার অজানা।
হতভাগা ঐ কাযী ও মুফতী, যে কথার তত্ত্ব ও মর্ম অনুধাবন করতে পারে না, প্রবাদ বাক্যের অর্থ জানে না।
তুমি যদি অনুসরণ করতেই চাও, তাহলে আসমানি কিতাব 'আল-কুরআন' ও সঠিক ধর্ম ইসলাম নিয়ে আগত রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সুন্নাহর নিঃশর্ত অনুসরণ অত্যাবশ্যক।
সুন্নাহর অবর্তমানে সাহাবায়ে কিরামের আদর্শ অগ্রগণ্য। কেননা তাঁরা হলেন কুরআন-সুন্নাহর গভীর জ্ঞান ও অগাধ পাণ্ডিত্যের অধিকারী।
এরপরই পর্যায়ক্রমে তাবেয়ীন, তাবে-তাবেয়ীন ও আইম্মায়ে মুজতাহিদীন-এর সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত অনুসরণীয়। আইম্মায়ে কিরামের ইজমা ও রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সুন্নাহ পবিত্র কুরআনের মতোই অবশ্য পালনীয়।

টিকাঃ
৪১. তাকলীদ: অনুসরণ-অনুকরণ.
৪২. ওয়াজিব: অত্যাবশ্যক.
৪৩. মুস্তাহাব: পছন্দনীয়.
৪৪. হারাম: নিষিদ্ধ.
৪৬. ইজমা: সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত.

ফন্ট সাইজ
15px
17px