📘 আল হাল্লু জীবন সমস্যার সমাধান > 📄 চিন্তানৈতিক প্রান্তিকতা

📄 চিন্তানৈতিক প্রান্তিকতা


চিন্তানৈতিক ভ্রষ্টতা হলো, কথাবার্তায়, কাজকর্মে, আচার-আচরণে, মন-মানসিকতা ও চিন্তা-চেতনায় মধ্যপন্থা থেকে বিচ্যুত হয়ে প্রান্তিকতার শিকার হওয়া। প্রাচীনকাল থেকেই চিন্তা-চেতনাগত প্রান্তিকতা ও ভ্রষ্টতা মানবজাতির মধ্যে সক্রিয় হয়ে আছে। বর্তমান বিশ্বে তা আরও জঘন্য ও প্রকট আকার ধারণ করেছে।

এ বুদ্ধিবৃত্তিক প্রান্তিকতা ও চিন্তানৈতিক ভ্রষ্টতা নির্দিষ্ট কোনো ধর্মের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়। মধ্যযুগে ইউরোপের বৃহৎ জনগোষ্ঠী ও খ্রিষ্ট-ধর্মীয়-সমাজ চিন্তা-চেতনাগত চরম বাড়াবাড়ি ও ছাড়াছাড়িতে মেতে উঠেছিল। গির্জা ও পাদরিদের অনুশাসন ও সুনীতি এবং সাধারণ জনগোষ্ঠীর বৈষয়িক ও অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির মাঝে যে সংঘাত মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল, তার কবলে ইউরোপের জনগণ গির্জার অনুশাসন ছুড়ে ফেলে সর্বান্তঃকরণে পুঁজিবাদী অর্থনীতি আঁকড়ে ধরেছিল।

মুসলিম সমাজও প্রান্তিক চিন্তা-চেতনার আক্রমণ থেকে নিস্তার পায়নি। আজও মুসলিম বিশ্বের বহু জনপদ ও জনগোষ্ঠীর মধ্যে মানসিক ভ্রষ্টতা ও চিন্তার প্রান্তিকতা ভীষণ আকার ধারণ করেছে। একদল মুসলিম যুবক ও বুদ্ধিজীবীর দিল-দেমাগ ও বিবেক-মস্তিষ্ক প্রান্তিকতা ও মধ্যপন্থা থেকে বিচ্যুতির কালো থাবায় বিষাক্ত হয়েছে উঠেছে। এরই জের ধরে যতো হানাহানি, রক্তপাত ও যুদ্ধবিগ্রহ ঘটে চলেছে।

চিন্তা-চেতনার প্রান্তিকতা এমন মারাত্মক বিষয়, যা দেশ-জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে যে কাউকেই বিষিয়ে তুলতে পারে। এর নিরন্তর ক্ষয় ও ক্ষতির শিকার যে কেউ হতে পারে। চিন্তার ভ্রষ্টতা ও মানসিক প্রান্তিকতার অনেক নেতিবাচক প্রভাব বর্তমান। তা সরল স্বাভাবিক ও মানবিক ব্যক্তিত্বকে সমাজের চোখে ঘৃণিত পরিত্যাজ্য করে ছাড়ে। ফলে পরিবার-পরিজন থেকে শুরু করে সমাজের লোকেরা তার সাথে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে চলে। মানসিক দুর্দশা-হতাশা-নিরাশা তাকে প্রবলভাবে ঘিরে ধরে।

এত শুধু ব্যক্তি পর্যায়ে প্রান্তিকতার নেতিবাচক প্রতিফল। সামাজিক অঙ্গনে এর ক্ষয়ক্ষতি আরও বহুগুণ বিস্তৃত ও সুদূরপ্রসারী। সমাজের মন-মানসিকতা ও চিন্তা-চেতনা সত্যচ্যুত ও ভ্রষ্ট করা থেকে শুরু করে, সভ্যতা-সংস্কৃতির বিনাশ, পর্যায়ক্রমে দেশ, জনপদ ও জনগোষ্ঠীর ধ্বংস ও বরবাদির চূড়ান্ত করে ছাড়ে।

এই সর্বব্যাপী ধ্বংস ও বরবাদি থেকে বাঁচার জন্য চিন্তানৈতিক ভ্রষ্টতা ও প্রান্তিকতা দূর করে সুস্থ বিচারবোধ ও পরিমিতিসম্পন্ন মানসিকতা অবলম্বন করতে হবে। কিন্তু এর সঠিক উপায় কী? এ জটিল সমস্যার সরল সমাধান কী?

সমাধান:
১. ধর্মীয় শিক্ষা-দীক্ষার প্রচার-প্রসারের মাধ্যমে সমাজের অজ্ঞতা ও নিরক্ষরতা দূর করতে হবে। কুরআন-সুন্নাহর বিজ্ঞ আলেমগণের মাধ্যমে সমাজের প্রতিটি শ্রেণির মানুষকে ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে হবে, নৈতিক দীক্ষায় দীক্ষিতরূপে গড়ে তুলতে হবে। ইসলামের মধ্যপন্থা ও পরিমিতিবোধ সম্পর্কে তাদের সঠিক ধারণা দিতে হবে। এর বাইরে নিজ উদ্যোগে ইসলাম সম্পর্কে পড়াশোনা ও সঠিক জ্ঞানার্জনের পথে তাদের অনুপ্রাণিত করতে হবে। সুবোধ শিক্ষিত ও পরিশীলিত মন-মস্তিষ্কই পারে ভালো-মন্দ ও সত্য-মিথ্যার মাঝে পার্থক্য নিরূপণ করতে।

২. কুরআন সুন্নাহর আলোকে ইসলামের ন্যায়ানুগতা ও মধ্যপন্থা প্রচার করা আবশ্যক। এ ক্ষেত্রে প্রিন্ট মিডিয়া, ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া ও সোস্যাল মিডিয়া হলো কার্যকর উপায়। বর্তমান প্রজন্মকে চিন্তা-চেতনার প্রান্তিকতা থেকে রক্ষার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন শিক্ষা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম প্রবর্তন করা কর্তব্য। সর্বোপরি দলিল-প্রমাণ ও যুক্তি-দর্শনের আলোকে ভ্রষ্ট বিচ্যুত মানসিকতার অপনোদন করা আবশ্যক।

৩. শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানগুলোতে সুস্থ মন-মানসিকতা ও বিশুদ্ধ চিন্তা-চেতনার চর্চা ও পরিচর্যা করতে হবে। প্রান্তিক বুদ্ধি-বিদ্যার নেতিবাচক প্রভাব ও ক্ষতিকর দিকগুলো সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের সচেতন করে, কুরআন-সুন্নাহর আলোকে ইসলামের উদারতা ও মধ্যপন্থার দীক্ষায় অনুপ্রাণিত করতে হবে। তবে উদারতার নামে যেন শিথিলতার চর্চা না হয়-সে দিকটিও গুরুত্বের সঙ্গে তত্ত্বাবধান করতে হবে। ইসলাম উদারতাকে যতটা সমর্থন করে, শিথিলতাকে ঠিক ততটা ঘৃণা করে।

৪. যেকোনো পর্যায়ে প্রান্তিকতা থেকে বাঁচার লক্ষ্যে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর অনুপম আদর্শ গ্রহণই হলো শ্রেষ্ঠ উপায়। জীবনের প্রতি অধ্যায়েই তাঁর কর্মধারা ছিল শিথিলতা-অবহেলা, বাড়াবাড়ি ও অতিরঞ্জনের দোষমুক্ত; মধ্যপন্থা ও ন্যায়ানুগতার গুণে অনন্য। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা তাঁর উম্মতকে একই গুণের স্বীকৃতি প্রদান করে বলেছেন:

وَكَذَلِكَ جَعَلْنَكُمْ أُمَّةً وَسَطًا﴾ [البقرة: ١٤٣]

অর্থ: '(হে মুসলিমগণ!) এভাবেই আমি তোমাদেরকে এক মধ্যপন্থী উম্মত বানিয়েছি।' (বাকারা, ২: ১৪৩) রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِيَّاكُمْ وَالْغُلُو فِي الدِّينِ، فَإِنَّهُ أَهْلَكَ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمُ الْغُلُوُّ فِي الدين» (سنن ابن ماجه ٢/ ١٠٠٨)

অর্থ: 'হে লোকসকল! দ্বীনের বিষয়ে তোমরা অতিরঞ্জন ও বাড়াবাড়ি করো না। কেননা তোমাদের পূর্বপুরুষরা দ্বীনের ব্যাপারে অতিরঞ্জন ও বাড়াবাড়ি করার কারণে ধ্বংস হয়েছে।' (ইবনে মাযাহ, ২/১০০৮)

৫. কুরআন-সুন্নাহ সম্পর্কে বিজ্ঞ এবং শরীয়তের দলিল-প্রমাণ সম্পর্কে অভিজ্ঞ আলেম-সমাজের বাইরে অন্যদের ফতোয়া প্রদানের ব্যাপারে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে হবে। শরীয়তের দলিল-প্রমাণ ব্যতীত হালাল-হারামের বিধান বলে দেওয়া এবং যত্রতত্র ফতোয়া প্রদান করার রীতি বন্ধ করতে হবে। যথার্থরূপে না জেনে-বুঝে যারা অনুমাননির্ভর ফতোয়া প্রদান করবে, তাদের জবাবদিহির সম্মুখীন হতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে সাধারণ লোকদের অনুপ্রাণিত করতে হবে, ধর্মীয় বিষয়ে তারা যেন বিজ্ঞ আলেমে দ্বীনের দ্বারস্থ হয়।

৬. বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে হবে। বেকারত্বের কবলে ও কর্মহীন জীবনে যুবসমাজ নানা বিচ্যুতি ও প্রান্তিকতার শিকার হওয়ার সমূহ আশঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি জনকল্যাণমূলক উদ্যোগ ও কার্যক্রম সবার জন্য উন্মুক্ত করে দিতে হবে, যেকোনো পেশা ও শ্রেণির মানুষ যেন নিজের অবসরে এখানে শামিল হতে পারে।

৭. মানুষের মাঝে সকল ভেদাভেদ ও শ্রেণিবৈষম্য নির্মূল করে সাম্য সম্প্রীতি ও ন্যায়ানুগতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। জুলুম-অত্যাচার ও বিপর্যয়-বিশৃঙ্খলার পথ বন্ধ করে পরস্পর সাহায্য-সহযোগিতা ও সহমর্মিতার পরিবেশ কায়েম করতে হবে। জাতিগত বিভেদ ও শ্রেণিবৈষম্যের জেরধরেই শত্রুতা, প্রতিহিংসা, প্রতিশোধস্পৃহা ইত্যাদির মতো জঘন্য মানসিক প্রান্তিকতা দানা বাঁধে।

৮. সন্তানদের ইসলামি শিক্ষা-দীক্ষা ও ধর্মীয় ভাবধারায় গড়ে তোলা অভিভাবকগণের মৌলিক কর্তব্য। তাদেরকে প্রচলিত বিভিন্ন বাদ-বিসংবাদ ছেড়ে কুরআন-সুন্নাহর আদর্শে অনুপ্রাণিত করা আবশ্যক।

৯. দীর্ঘ সময়ের জন্য সন্তানদের একাকী ও অভিভাবকহীন না ছেড়ে তাদের জন্য সৎসঙ্গপূর্ণ পরিবেশ সুনিশ্চিত করা আবশ্যক। অভিভাবকহীন লাগাম ছাড়া অসৎ সঙ্গদোষের কবলে তরুণ-যুবকরা ভুল দৃষ্টিভঙ্গি ও চিন্তানৈতিক প্রান্তিকতার শিকার হয়।

১০. পরস্পর ভেদাভেদ, দলাদলি, সাম্প্রদায়িকতা, নিজ আদর্শ ও মতাদর্শের প্রতি গোঁড়ামি ও পক্ষপাতিত্বমূলক মানসিকতা পরিহার করা কর্তব্য। এ সমস্ত প্রবণতা মানুষের মাঝে বিদ্বেষ, বিরোধিতা ও চিন্তানৈতিক প্রান্তিকতার জন্ম দেয়, সদাচার ও মহৎ উদ্যোগ থেকে বিরত রাখে এবং ঐক্যবদ্ধ ও সংঘবদ্ধ হওয়ার পথে কঠিন বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

১১. সম্ভাব্য সকল উপায়ে শুদ্ধ চিন্তা-চেতনা ও বিশুদ্ধ মননশীলতার প্রচার-প্রসার ঘটাতে হবে। মন-মস্তিষ্কের বিশুদ্ধতা ও বিবেক-বুদ্ধির নিষ্কলুষতাই হলো আমাদের আকিদা-বিশ্বাস ও জাতীয় ঐক্যের রক্ষাকবচ, মুসলমানদের ধন-সম্পদ, ইজ্জত-আবরু ও প্রাণ রক্ষার কার্যকর উপায় এবং সমস্ত বিচ্যুতি ও প্রান্তিকতা থেকে বর্তমান প্রজন্মের মন-মস্তিষ্ক রক্ষা করার শ্রেষ্ঠ মাধ্যম।

১২. চিন্তানৈতিক প্রান্তিকতা ও সভ্যতা-সংস্কৃতির ঔপনিবেশিকতার সমস্ত ছিদ্রপথ বন্ধ করতে হবে। এ বিষয়টিকে সতর্ক নজরদারিতে রেখে এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জবাবদিহির সম্মুখীন করতে হবে। যেন চিন্তানৈতিক দুরারোগ্য ক্যান্সার মুসলিম উম্মাহর মন-মস্তিস্ক ও রগরেষায় বাসা বাঁধতে না পারে।

১৩. প্রান্তিক মতাদর্শীদের মোকাবিলা করতে হবে বুদ্ধিবৃত্তিক পদক্ষেপ ও গঠনমূলক আলোচনার মাধ্যমে। ধৈর্য, প্রজ্ঞা ও হিতোপদেশের আলোকে তাদের প্রতিটি মৌলিক প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। ইসলামের উদারতা, ন্যায়ানুগতা ও মধ্যপন্থার বিষয়টি যথাযথভাবে বুঝিয়ে বলতে হবে।

১৪. যারা মানসিক ভ্রষ্টতায় আক্রান্ত, প্রান্তিক চিন্তা-চেতনার শিকার, তাদের জন্য শিক্ষা ও প্রশিক্ষণমূলক পুনর্বাসন কেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে। সেখানে গঠনমূলক আলোচনা, দলিল-প্রমাণ ও যুক্তি দর্শনের আলোকে প্রান্তিক মানসিকতার অসাড়তা স্পষ্ট করা হবে এবং কুরআন সুন্নাহর বিশেষজ্ঞ আলেমে দ্বীন ও মনো-বিজ্ঞদের সমন্বয়ে সুস্থ বোধ-বুদ্ধি ও নিষ্কলুষ মননশীলতার চর্চা হবে।

১৫. আমাদের প্রত্যেকের কর্তব্য, অন্যের প্রতি সুধারণা পোষণ করা, বাঁকাচোখে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতে না দেখা। আপনি যদি একরোখা দৃষ্টিতে লোকদের নেতিবাচক দিকগুলো বড় করে দেখেন, তাহলে তা আপনাকে মানুষের প্রতি প্রান্তিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং তাদের খাটো করে দেখার মতো হীন মানসিক সংকটে ফেলবে।

১৬. মনে রাখতে হবে, কাউকে কাফের বলে দেওয়া, ঈমানের গণ্ডি থেকে খারিজ বলে ঘোষণা করার অধিকার একমাত্র আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের। এ সম্পর্কে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করবেন বিজ্ঞ আলেম সমাজ। এক্ষেত্রে যে কারোর মন্তব্য করার অধিকার নেই, অবকাশ নেই।

১৭. এক শ্রেণির অজ্ঞ মূর্খ, বয়সে ও বিদ্যা-বুদ্ধিতে অপরিপক্ক লোকদের মধ্যে এ প্রবণতা কাজ করে যে, পান থেকে চুন খসতেই তারা যে কাউকে সরাসরি কাফের বলে বসে। কাউকে কাফের আখ্যায়িত করাতেই যেন তাদের পরমানন্দ। કારણે-অকারণে, শাস্ত্রীয় মূলনীতির পরোয়া না করে যে কাউকে কাফের বলে দেওয়ার ভয়াবহ পরিণতির কথা কি তারা চিন্তা করেছে? তারা কি কখনো ভেবেছে, এর জের ধরে মানুষের জান-মাল, ইজ্জত-আবরু চরম হুমকির মুখে পড়ে! কখনো কখনো তা ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ও হত্যাযজ্ঞের মতো ভয়ংকর রূপ পরিগ্রহ করে! দেশ, জাতি ও জনপদের সার্বিক নিরাপত্তার ভিত ধসে পড়ে!

এ ক্ষেত্রে ঈমানের মাসআলা-মাসাইল সম্পর্কে বিশদ আলোচনা পেশ করতে হবে। কী কী কারণে ঈমান নষ্ট হয়ে যাবে এবং ব্যক্তি ঈমানের গণ্ডি থেকে খারিজ হয়ে যাবে-এ সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে সুস্পষ্ট ধারণা দিতে হবে। যেন সাধারণ শ্রেণি ও অজ্ঞ লোকেরা এ বিষয়ে ফেতনা-ফাসাদে জড়িয়ে না পড়ে।

১৮. চিন্তানৈতিক প্রান্তিকতা দূর করার লক্ষ্যে ধর্মীয় সংস্কারক ও বিজ্ঞ আলেম সমাজের পরামর্শ ও দিকনির্দেশনার সমন্বয়ে কাজ করতে হবে। সাধারণ লোকদের নিকট অস্পষ্ট ও সংশয়পূর্ণ বিষয়গুলো সবিস্তারে সুস্পষ্টরূপে প্রচার করতে হবে। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি বিষয় হলো, কাফের হওয়ার উপযুক্ত অপরাধ করার পরও কোন কোন ক্ষেত্রে ব্যক্তির অজ্ঞতা ও না-জানার ওযর কবুল করা হবে? কী কী অপরাধে সহযোগী ব্যক্তিকেও কাফের সাব্যস্ত করা হবে? ইসলামের গণ্ডি থেকে খারিজ হওয়ার কারণগুলো কী কী? জঘন্য পাপাচার ও নষ্টাচার হওয়া সত্ত্বেও তা ব্যক্তিকে ঈমান ও ইসলামের গণ্ডি থেকে বের করে দেয় না-এমন কারণগুলো কী কী? এবং কোন কারণে কোন ব্যক্তিকে কাফের প্রতিপন্ন করা যাবে না ইত্যাদি। এ অধ্যায় সম্পর্কিত শরীয়তের পরিভাষাগুলো সুস্পষ্টরূপে বলে দিতে হবে। যেন বিষয়টি সম্পর্কে সাধারণ মানুষও পড়াশোনা করে সুস্পষ্ট ধারণা পেতে পারে।

১৯. বিচার-বিভাগ ও এর সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিদের দক্ষতা বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে তাদের পূর্ণ ক্ষমতা ও স্বাধীনতা দিতে হবে; যেন তারা ন্যায়ানুগতা প্রতিষ্ঠা করতে পারে এবং কোনো প্রকার কালবিলম্ব ও শিথিলতা করা ব্যতীত দ্রুত হুকুম বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হয়। ভ্রষ্ট ও প্রান্তিক চিন্তাচেতনার বিরুদ্ধে কঠিন শাস্তির বিধান করতে হবে। এ ধরনের অপরাধে যারা জড়িত থাকবে, তারা সাধারণ হোক কিংবা তথাকথিত বুদ্ধিজীবী শ্রেণি-অবশ্যই তাদের আইনানুগ বিচারের আওতায় আনতে হবে।

২০. চিন্তা-ভাবনায় প্রান্তিক ও অতিরঞ্জনকারীদের পথ ও পন্থা সম্পর্কে জানতে হবে। তাদের চিন্তাপ্রসূত সন্দেহ-সংশয় ও দাবি দাওয়ার বিষয়গুলো সম্পর্কে অবহিত হতে হবে। অনিষ্টকে অনিষ্ট বলে চেনার যোগ্যতা, ভালোমন্দের মাঝে পার্থক্য নিরূপণের অভিজ্ঞতা ব্যক্তিকে যত অকল্যাণ-অনিষ্ট থেকে রক্ষা করতে পারে। যে ব্যক্তি ভুল চিনতে পারে না, সে-ই সাধারণত ভুলের শিকার হয়।

২১. প্রান্তিক চিন্তা-ভাবনার উৎসসমূহ শনাক্ত করতে হবে। কুরআন-সুন্নাহর দলিল-প্রমাণ ও যুক্তি-দর্শনের আলোকে তাদের উত্থাপিত আপত্তির সদুত্তর দিতে হবে।

২২. অতীতের যে সমস্ত জাতিবর্গ ধর্মবিশ্বাসের ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি ও অতিরঞ্জনের আস্ফালন দেখিয়েছে, আসমানি গ্রন্থের বিধি-বিধান বাস্তবায়নে ছাড়াছাড়ি ও শিথিলতার স্পর্ধা দেখিয়েছে, তাদের ইতিহাস পড়ে দেখুন, পরিণতিতে তারা কী ভয়ানক মানবিক অবক্ষয় ও জাগতিক অধঃপতনের শিকার হয়েছে! ইহুদিরা তো ধর্মীয় অবমাননার চূড়ান্ত করে তাদের নবীদের হত্যাযজ্ঞে মেতে ছিল। আর খ্রিষ্টসমাজ, তারা ভক্তি-শ্রদ্ধার চরমে পৌঁছে স্রষ্টার ইবাদত ছেড়ে সৃষ্ট নবীদের উপাসনায় আকণ্ঠ নিমজ্জিত হয়ে ছিল। কালের আবর্তে একসময় তারাই আবার ধর্ম ও গির্জার অনুশাসন ছুড়ে ফেলে সর্বান্তঃকরণে লুফে নিল পুঁজিবাদী দর্শন। পুঁজিবাদের থালার শেষ ঝোলটুকু চেটে খাবার প্রতিযোগিতায় ছুটতে লাগল।

আমাদের প্রত্যেকের প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব হলো, সার্বিক নিরাপত্তার শতভাগ অটুট ও নিষ্কণ্টক রাখা। কেননা একটি দেশ ও জনপদে যখন শান্তি ও নিরাপত্তার ভিত নড়ে ওঠে, ঠিক তখন থেকেই সমাজে অশান্তি ও বিশৃঙ্খলা ছড়াতে থাকে। দ্বীন ও শরীয়ত পাঁচটি মৌলিক বিষয়কে নিরাপদ ও সুরক্ষিত রাখার আদেশ করেছে। তা হলো, জান, মাল, মান-মর্যাদা, দ্বীন-ধর্ম ও বিবেক-বুদ্ধি। জাতীয় শান্তি ও নিরাপত্তা সুনিশ্চিত না হলে এর রক্ষণাবেক্ষণ সম্ভব নয়।

২৩. সাক্ষাতের শুরুতেই সালাম প্রদান করা কর্তব্য। পরস্পর সাক্ষাতের মুহূর্তে সালামই হলো ইসলামি আদর্শ, যা শান্তি, নিরাপত্তা ও সম্প্রীতির বার্তা বহন করে। পৃথিবীতে ইসলাম ও ইসলামের সর্বশেষ নবী আগমন করেছেন শান্তি ও নিরাপত্তার সুসংবাদ নিয়ে। মানুষের জান-মাল ও ইজ্জত আবরুর রক্ষণাবেক্ষণের বার্তা নিয়ে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে উদ্দেশ্য করে বলেছেন:

﴿وَمَا أَرْسَلْتُكَ إِلَّا رَحْمَةً لِلْعَلَمِينَ﴾ [الأنبياء: ١٠٧]

অর্থ: '(হে নবী!) আমি তোমাকে বিশ্বজগতের জন্য কেবল রহমত করেই পাঠিয়েছি।' (আম্বিয়া, ২১: ১০৭)

মানুষের প্রতি রাসূলুল্লাহ্ ﷺ-এর মমত্ববোধ ও দয়ার্দ্রতা ছিল আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে বিশেষ দান। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেছেন:

﴿فَبِمَا رَحْمَةٍ مِّنَ اللَّهِ لِنْتَ لَهُمْ ﴾ [آل عمران: ١٥٩]

অর্থ: 'আল্লাহর রহমতেই আপনি তাদের জন্য কোমল হৃদয় হয়েছেন।' (সূরা আলে ইমরান, ৩: ১৫৯)

পরিশিষ্ট:
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর যুগে তিনটি যুবক ইবাদত ও ধর্মকর্ম পালনে দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলো। তাদের লক্ষ্য হলো, একটা মুহূর্তও যেন আল্লাহর ইবাদত ও আনুগত্যের বাইরে না কাটে। এ লক্ষ্যে প্রথম জন শপথ করল: 'রাতে ঘুমাবে না। সারা রাত নফল নামাযে মশগুল থাকবে।' দ্বিতীয়জন কসম করে বলল: 'আমৃত্যু রোযা রেখে যাব।' তৃতীয়জন শপথ করল: 'বিবাহ না করে আজীবন আল্লাহর ইবাদতগুজারে নিয়োজিত থাকবো।'
এ ঘটনা শুনে রাসূলুল্লাহ ﷺ যুবকদের ডেকে পাঠালেন। তাদের উদ্দেশ্যে বললেন :
أَمَا وَاللَّهِ إِنِّي لَأَخْشَاكُمْ اللَّهِ وَأَتْقَاكُمْ لَهُ، لَكِنِّي أَصُومُ وَأُفْطِرُ، وَأُصَلِّي وَأَرْقُدُ، وَأَتَزَوَّجُ النِّسَاءَ، فَمَنْ رَغِبَ عَنْ سُنَّتِي فَلَيْسَ مِنّي صحيح البخاري (٢/٧)
অর্থ: 'শুনে রাখ, আল্লাহর শপথ করে বলছি, তোমাদের মধ্যে আমিই সর্বাধিক আল্লাহভীরু পরহেযগার। কিন্তু আমিও তো রোযা রাখি ও পানাহার করি। নামায আদায় করি, বিশ্রাম গ্রহণ করি এবং নারীদের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হই। (এটাই আমার আদর্শ) যে ব্যক্তি আমার আদর্শ-বিমুখ হবে সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।' (বুখারী, ৭/২) সুতরাং ধর্মেকর্মে শরীয়তের নামে অতিরঞ্জন ও বাড়াবাড়ি সমীচীন নয়। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলার বাণী:
وَنُيَسِّرُكَ لِلْيُسْرَى﴾ [الأعلى: ٨]
অর্থ: 'আমি তোমার জন্য সহজ শরীয়ত (এর অনুসরণ) সহজ করে দেব।' (সূরা আ'লা, ৮৭: ৮)

আব্দুর রহমান বিন মুলজিম খারেজী, সাহাবায়ে কেরামের যামানায় বিশৃঙ্খলা ও উগ্রবাদের অন্যতম হোতা। সে-ই আমিরুল মু'মিনীন আলী (রা.)-কে হত্যা করে। সে ছিল অত্যধিক নামাযী ও কুরআন তিলাওয়াতকারী, আবার রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর একটি ভবিষ্যদ্বাণীর বীভৎস প্রতিমূর্তি। রাসূল ﷺ বলেছেন:
يَخْرُجُ فِيكُمْ قَوْمٌ تَحْقِرُونَ صَلَاتَكُمْ مَعَ صَلَاتِهِمْ، وَصِيَامَكُمْ مَعَ صِيَامِهِمْ، وَعَمَلَكُمْ مَعَ عَمَلِهِمْ، وَيَقْرَءُونَ القُرْآنَ لَا يُجَاوِزُ حَنَاجِرَهُمْ، يَمْرُقُونَ مِنَ الدِّينِ كَمَا يَمْرُقُ السَّهْمُ مِنَ الرَّمِيَّة، (صحيح البخاري) ٦ / ١٩٧
অর্থ: 'তোমাদের মধ্যে এমন একদল লোকের আবির্ভাব হবে, যাদের নামায, রোযা ও নেক আমলের তুলনায় তোমাদের নামায, রোযা ও নেক আমলসমূহকে নিতান্ত তুচ্ছ নগণ্য মনে হবে। তারা কুরআন পাঠ করবে; কিন্তু কুরআনের মর্ম তাদের কণ্ঠনালিও অতিক্রম করবে না। তারা ইসলামের গণ্ডি থেকে এমনভাবে ছিটকে পড়বে, যেমন তিরন্দাজের হাত থেকে তীর ছুটে বেরিয়ে যায়।' (বুখারী, 6/১৯৭)
লক্ষ করে দেখুন, আব্দুর রহমান বিন মুলজিমের অবস্থা। কত বড় ইবাদতগুজার ও মুত্তাকী-পরহেযগার হওয়া সত্ত্বেও শুধু চিন্তানৈতিক ভ্রষ্টতা ও প্রান্তিকতার বশবর্তী হয়ে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর জামাতা, আমিরুল মু'মিনীন আলী (রা.)-কে হত্যার মতো জঘন্য হীন অকর্ম করতে একটুও কুণ্ঠিত হয়নি। এমন লোকদের ব্যাপারেই পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন:
أَفَمَنْ زُيِّنَ لَهُ سُوءُ عَمَلِهِ فَرَاهُ حَسَنًا فَإِنَّ اللَّهَ يُضِلُّ مَنْ يَشَاءُ وَيَهْدِي مَنْ يَشَاءُ فَلَا تَذْهَبْ نَفْسُكَ عَلَيْهِمْ حَسَرَاتٍ إِنَّ اللَّهَ عَلِيمٌ بِمَا يَصْنَعُونَ﴾ [فاطر: ৮]
অর্থ: 'তবে কি যার দৃষ্টিতে তার মন্দ কাজগুলো সুদৃশ্য করে দেখানো হয়েছে, ফলে সে তার মন্দ কাজকে ভালো মনে করে, (সে কি সৎকর্মশীল ব্যক্তির সমান হতে পারে?)। বস্তুত আল্লাহ যাকে চান বিপথগামী করেন আর যাকে চান সঠিক পথে পরিচালিত করে। সুতরাং (হে নবী!) এমন যেন না হয় যে, তাদের (অর্থাৎ কাফেরদের) জন্য আপসোস করতে করতে তোমার প্রাণটাই চলে যায়। নিশ্চয়ই তারা যা-কিছু করছে, সে সম্পর্কে আল্লাহ ভালোভাবেই জ্ঞাত।' (ফাতির, ৩৫: ৮)

📘 আল হাল্লু জীবন সমস্যার সমাধান > 📄 কারাগার ও কারাবাস

📄 কারাগার ও কারাবাস


কারাগার, যেখানে ব্যক্তিকে আটক রেখে পূর্ণ নজরদারিতে রাখা হয় এবং নির্দিষ্ট সীমা-পরিসীমার বাইরে যাবতীয় কাজ-কর্ম থেকে বিরত রাখা হয়। কারাবদ্ধ ব্যক্তি আপন পরিবার-পরিজন, বন্ধু-বান্ধব ও সমাজ-বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। একাকীত্ব ও নিঃসঙ্গতার ঘেরাটোপে আটকে পড়ে। চারপাশের চলমান বিশ্বের ক্রমবর্ধমান উন্নতি ও অগ্রযাত্রা থেকে বঞ্চিত হতে থাকে। এভাবে একপর্যায়ে তার কর্মক্ষমতা, সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবনী শক্তি ক্রমশ ক্ষয়েক্ষয়ে নিঃশেষের চূড়ান্তে পৌঁছে।

কারাগারে কোনো কোনো বন্দি চরম দুশ্চিন্তা, দুর্ভাবনা ও মানসিক অস্থিরতার শিকার হয়। কখনো কখনো তো কারাবন্দিদের অবস্থা এতটাই সঙ্গিন হয়ে পড়ে যে, না জীবিত আখ্যায়িত করে তার কাছ থেকে কোনো কাজের আশা করা যায়; না মৃত সাব্যস্ত করে তাকে সমাধিস্থ করা যায়। কপালে বন্দিদশা জোটে নির্দিষ্ট মতাদর্শের কারণে, অপরাধের শাস্তিতে কিংবা অন্যের ওপর যুলুম-নির্যাতনের কারণে। কারাবদ্ধ ব্যক্তি হয়ত যালিম কিংবা মাজলুম; নিপীড়ক কিংবা নিপীড়িত। যাই হোক-না-কেনো, বন্দিদশায় ব্যক্তির জীবন সার্বিকভাবে সংকীর্ণ হয়ে পড়ে। হতাশা, বঞ্চনা ও আসন্ন ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা তার মন-মানসিকতায় জেঁকে বসে।

সামাজিকভাবেও বন্দিজীবন ফিরে-আসা লোকটাকে নেতিবাচক ও তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে দেখা হয়; যদি সে প্রকৃত অপরাধী হয়ে থাকে। কোনো কোনো বন্দি তো এমন ভীষণ দুর্ভোগ-দুর্দশার শিকার হয়, বাঁচার জন্য সবশেষে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। বন্দিজীবনের দুর্ভোগ-দুর্দশা থেকে বাঁচার জন্য এবং জীবনের উন্নতি-অগ্রগতির চাকা সচল রাখার জন্য আমাদের এর প্রকৃত সমাধান খুঁজে বের করতে হবে। এ সংকট থেকে উত্তরণের পথ-পন্থা অবলম্বন করতে হবে।

সমাধান:
১. কারাবন্দি ব্যক্তির কর্তব্য হলো আপন রবের আশ্রয় গ্রহণ করা। নিজের যত অভিযোগ-অনুযোগ ও মুক্তিকামনা, আল্লাহর দরবারে ব্যক্ত করা। বন্দিজীবনে এমনই ছিলেন নবী ইউসুফ (আ.)-এর আদর্শ। পাপাচার-অনাচারের বিপরীতে তিনি বন্দিজীবনকে প্রাধান্য দিয়েছেন। (পবিত্র কুরআনের ভাষায়):

﴿قَالَ رَبِّ السِّجْنُ أَحَبُّ إِلَى مِمَّا يَدْعُونَنِي إِلَيْهِ﴾ [يوسف: ٣٣]

অর্থ: 'ইউসুফ দু'আ করল, হে আমার প্রতিপালক! এই নারীগণ আমাকে যে কাজের দিকে ডাকছে, তা অপেক্ষা কারাগারই আমার বেশি পছন্দ।' (ইউসুফ, ১২: ৩৩)
নবী ইউসুফ (আ.) কারাগারে তাঁর সঙ্গীদ্বয়কে তাওহিদ ও একত্ববাদের দাওয়াত দিয়েছেন। পবিত্র কুরআনের ভাষায়:

﴿يُصَاحِبَي السِّجْنِ أَرْبَابٌ مُّتَفَرِّقُونَ خَيْرٌ أَمِ اللَّهُ الْوَاحِدُ الْقَهَّارُ﴾

অর্থ: 'হে আমার কারা সঙ্গীদ্বয়, বহু সংখ্যক ভিন্ন ভিন্ন রব ভাল নাকি মহাপরাক্রমশালী এক আল্লাহ?' (ইউসুফ, ১২: ৩৯)

২. কারাবন্দির জন্য সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় হলো পাঁচ ওয়াক্ত নামায ও অন্যান্য ইবাদত-বন্দেগি। সুতরাং অবশ্যই তাকে খুশু-খুযূর সাথে, একাগ্র ও বিনম্র চিত্তে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত কায়েম করতে হবে। বেশি বেশি কুরআন তিলাওয়াতের পাশাপাশি যিকির ও ওযীফা আদায়ে যত্নবান হতে হবে।

৩. বন্দিজীবনে নিজেকে সর্বদা ভালো ও কল্যাণকর কাজে নিয়োজিত রাখতে হবে। যেন একটি মুহূর্তও অনর্থক অবসরে না কাটে। এ উদ্দেশ্যে লেখাপড়া থেকে শুরু করে খেলাধুলা ও শরীর চর্চা ইত্যাদি, সম্ভব যেকোনো ভালো কাজ করা যেতে পারে।

৪. কারাগারে যদি কোনো জ্ঞানী, গুণী ও সৎজনের সন্ধান মিলে তার সাহচর্য গ্রহণ করতে হবে। এমন কত লোক আছে, যারা অপরাধী হয়ে, অন্ধকার জীবন নিয়ে কারাবন্দি হয়েছে। সেখানে কোনো জ্ঞানী-গুণীজনের সংস্পর্শে থেকে আলোকিত জীবন নিয়ে ফিরে এসেছে।

৫. সাথী-সঙ্গীদের সাথে উত্তম ব্যবহার করা, আচরণে-বিচরণে তাদের প্রিয়পাত্র হয়ে উঠা কারাবন্দির প্রধান কর্তব্য। এর ফলে সাথি-সঙ্গীরাও তার প্রতি সদাচারী, সদয় ও সহানুভূতিশীল হবে। তার বন্দিজীবন যথাসম্ভব হাসি-আনন্দে কাটবে। কষ্ট ও দুর্ভোগের ভার কিছুটা হলেও লাঘব হবে।

৬. জীবনের প্রেক্ষাপটে বন্দিদশা হলো এক তিক্ত ও বিচিত্র অভিজ্ঞতা। ধৈর্য, অবিচলতা ও আত্মিক শক্তিবলে যদি এ পরিস্থিতির মোকাবিলা করা যায়, তাহলে ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য তা মূল্যবান পুঁজি হয়ে থাকবে। ইতিহাসের কত জ্ঞানী-গুণী ও মহামনীষী কারাবন্দিত্বের শিকার হয়েছেন। কিন্তু এ প্রতিকূলতার কবলে তাঁরা নতিস্বীকার করেননি, অবদমিত হননি। বন্দিজীবনের বাস্তবতা মেনে নিয়েই তারা নিজের কল্যাণে, তার চেয়ে বেশি জাতির কল্যাণে গৌরবময় কাজ করেছেন। অনেক মহামনীষী বন্দিশালার অবরুদ্ধ পরিবেশে থেকে জীবনের অমর কীর্তি গড়েছেন।

৭. কারাবন্দির কর্তব্য হলো নেগেটিভ ধ্যান-ধারণা ঝেড়ে ফেলে পজেটিভ চিন্তা করা। বন্দিদশায় মুষড়ে না পড়ে মুক্তির আশায় বুক বাঁধা। দুঃখ-দুর্দশার পরই সুখ-শান্তির উদয় হয়। এটাই তো জীবনাবর্তনের চিরন্তন ধারা। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন:

﴿فَإِنَّ مَعَ الْعُسْرِ يُسْرًا * إِنَّ مَعَ الْعُسْرِ يُسْرًا﴾ [الشرح: ٥، ٦]

অর্থ: 'প্রকৃতপক্ষে কষ্টের সাথে স্বস্তি থাকে। নিশ্চয়ই কষ্টের সাথে স্বস্তি থাকে।' (ইনশিরাহ্, ৯৪: ৫, ৬)

৮. কারাগারের নির্জীব নিরানন্দ পরিবেশ কাটিয়ে উঠার জন্য সাথিসঙ্গীদের সাথে কবিতার আসর কিংবা গল্প-গুজবের আড্ডা দেওয়া যেতে পারে। গুমোটবদ্ধ পরিবেশে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে পাওয়ার জন্য এবং প্রফুল্লতা লাভের জন্য এটা অত্যন্ত কার্যকর পন্থা।

৯. কারা কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব হলো, কারাগারটাকে বিচার ও শাস্তির কেন্দ্রের চেয়ে অধিক, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্ররূপে গড়ে তোলা। বন্দিদের অলসতা কর্মহীনতার সুযোগ না দিয়ে বিভিন্ন পেশা ও প্রশিক্ষণে নিয়োজিত করা।

১০. আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুজন-যারা কারাবন্দির সাথে দেখা করতে যাবে-তাদের কর্তব্য হলো, কোনো নেগেটিভ খবর না বলে বন্দিকে আনন্দদায়ক ও আশাব্যঞ্জক কথা বলা। তার মামলা-মোকদ্দমার অগ্রগতি ও অনতিবিলম্বে কারামুক্তির সুসংবাদ শোনানো।

১১. স্মরণ করুন নবী ইউসুফ (আ.)-এর ঘটনা, বন্দিজীবনে তিনি আল্লাহ তা'আলার একত্ববাদের মহান দায়ীর ভূমিকা পালন করেছেন। ইমাম সারাখসী (রহ.) বন্দি অবস্থাতেই তাঁর ৩০ খণ্ডের সুবিশাল 'মাবসূত' গ্রন্থ-রচনা করেছেন। আল্লামা ইবনে তাইমিয়াহ (রহ.) তাঁর ৪০ খণ্ডের সুবিশাল 'ফাতাওয়া ইবনে তাইমিয়া' গ্রন্থটি কারাগারে থাকাবস্থায় রচনা করেছেন।

পরিশিষ্ট:
* ইতিহাসের পাতায় কারাজীবনের সবচেয়ে মহৎ চাঞ্চল্যকর ও চমকপ্রদ ঘটনাটি হলো নবী ইউসুফ (আ.)-এর। নবুওয়াত লাভ করার পূর্বেই তিনি ছিলেন মহৎ, সম্ভ্রান্ত ও চারিত্রিক কলুষতামুক্ত নিষ্পাপ ব্যক্তিত্বের অধিকারী। তাঁকে পাপাচার ও অনাচারে প্রলুব্ধ করা হলো; কিন্তু তিনি বললেন (পবিত্র কুরআনের ভাষায়): ﴿قَالَ رَبِّ السِّجْنُ أَحَبُّ إِلَيَّ مِمَّا يَدْعُونَنِي إِلَيْهِ﴾ [يوسف: ٣٣] অর্থ: 'সে (ইউসুফ) বলল, 'হে আমার রব, তারা আমাকে যে কাজের প্রতি আহ্বান করছে তা থেকে কারাগারই আমার নিকট অধিক প্রিয়।' (সূরা ইউসুফ, ১২: ৩৩) তাঁকে তিন মিথ্যা অপবাদ দিয়ে কারাবন্দি করা হলো তিনি আপন রবের আশ্রয় প্রার্থনা করলেন। আল্লাহ তা'আলাও তাঁর পরম সহায় হলেন। কারাগারে তিনি তাঁর সঙ্গীদ্বয়কে তাওহিদ ও একত্ববাদের দাওয়াত প্রদান করলেন। একত্ববাদ ও বহুঈশ্বরবাদের মধ্যে তিনি সুস্পষ্ট পার্থক্য রেখা টেনে দিলেন। (পবিত্র কুরআনের ভাষায়): ﴿يُصَاحِبَي السِّجْنِ وَأَرْبَابٌ مُّتَفَرِّقُونَ خَيْرٌ أَمِ اللَّهُ الْوَاحِدُ الْقَهَّارُ﴾ অর্থ: 'হে আমার কারা সঙ্গীদ্বয়! বহু সংখ্যক ভিন্ন ভিন্ন রব ভাল নাকি মহাপরাক্রমশালী এক আল্লাহ?' (ইউসুফ, ১২:৩৯)
এভাবেই হিতোপদেশ প্রদান, তাওহিদ ও একত্ববাদের শিক্ষার প্রচারে তাঁর কারাজীবন কাটতে লাগল।
এদিকে মিশরের নীল নদের তীরে কত ঢেউ আছড়ে পড়ে, রাজদরবারে কত বিষয়ে শলাপরামর্শ হয়, কত মামলা-মোকদ্দমার সুষ্ঠু সুরাহা হয়; কিন্তু নবী ইউসুফ (আ.)-এর মুক্তির পরোয়ানা আসে না। তিনিও আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হন না। আল্লাহর রহমতই যে তাঁর পরম আশ্রয়। অবশেষে একদিন বিশেষ প্রয়োজনে বাদশাহ, ইউসুফ (আ.)-কে কারামুক্ত করে দরবারে হাযির করার নির্দেশ করলেন। কিন্তু ইউসুফ (আ.) সুস্পষ্ট অপবাদমুক্ত না হয়ে কারাগার থেকে বের হতে সম্মত হলেন না। তিনি জানতে চাইলেন (পবিত্র কুরআনের ভাষায়): ﴿مَا بَالُ النِّسْوَةِ الَّتِي قَطَّعْنَ أَيْدِيَهُنَّ إِنَّ رَبِّي بِكَيْدِهِنَّ عَلِيمٌ﴾ অর্থ: 'যে নারীগণ নিজেদের হাত কেটে ফেলেছিল তাদের অবস্থা কী? আমার প্রতিপালক তাদের ছলনা সম্পর্কে বেশ অবগত।' (ইউসুফ, ১২:৫০)
আল্লাহ তা'আলা ইউসুফ (আ.)-এর দোষমুক্তি প্রকাশ করলেন। স্বয়ং অপবাদ আরোপকারী নারী নিজের দোষ স্বীকার করে নিল এবং নবী ইউসুফ (আ.)-কে নির্দোষ ঘোষণা করল। আল্লাহ তাঁকে জেলখানা থেকে সরাসরি রাজ-প্রাসাদের মর্যাদা দান করলেন। একই সঙ্গে নবুওয়াত ও মিশরের রাজত্বের সম্মানে ভূষিত করলেন। জেলখানার বন্দিজীবনে নবী ইউসুফ (আ.) যে শিক্ষা-দীক্ষার প্রচার করেছেন, যে মহৎ আদর্শের পথ দেখিয়েছেন, কারাবাসীদের জন্য তা অনুপম শিক্ষা হয়ে আছে।

📘 আল হাল্লু জীবন সমস্যার সমাধান > 📄 স্থূলতা: ক্ষতিকর প্রভাব ও করণীয়

📄 স্থূলতা: ক্ষতিকর প্রভাব ও করণীয়


দেহে যখন অতিরিক্ত 'স্নেহ' বা চর্বি জমে যায়, তখন দেহের এ বিশেষ অবস্থাকে স্থূলতা বলা হয়। স্থূলতা বিষয়ে চিকিৎসাশাস্ত্রে অনেক গবেষণা হয়েছে। একটি জরিপে দেখা গেছে, বিশ্বে ক্ষুধা ও অনাহারে মৃত্যুর তুলনায় অতিভোজন ও স্থূলতার কারণে মৃত্যুর হার বেশি।

স্থূলতার কারণে দেহে নানা রকম ক্ষতিকর প্রভাব দেখা দেয়। জটিল ও মারাত্মক রোগ-ব্যাধির সৃষ্টি হয়। তন্মধ্যে হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, ব্লাডপ্রেসার, শ্বাসকষ্ট ও অস্টিওআর্থারাইটিস অন্যতম। এর কোনো কোনোটি একপর্যায়ে মারাত্মক ক্যান্সারের রূপ ধারণ করে। স্থূলতার কারণে মানুষের কর্মশক্তি ও প্রজনন-ক্ষমতা হ্রাস পায়। ভুক্তভোগী তার জীবনের আনন্দ-বিনোদনগুলো সুস্থ-স্বাভাবিকভাবে উপভোগ করতে পারে না। ফলে শিকার হয় নানা রকম দুশ্চিন্তা, বিষণ্ণতা ও অস্থিরতার। কর্মস্পৃহা ও কর্মতৎপরতার ক্ষেত্রে স্থূলতা বিরাট প্রতিবন্ধক।

স্থূলতা যখন অতিমাত্রায় বৃদ্ধি পায়, ব্যক্তি একপ্রকার প্রতিবন্ধী হয়ে পড়ে। নিজেই নিজের জন্য কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। পরিবার ও সমাজের ওপর বিরাট বোঝা হয়ে পড়ে। সুস্থ, সবল, কর্মোদ্দীপনাপূর্ণ ও প্রশান্তিময় জীবন যাপন করার জন্য মেদহীন সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হতে হবে। কিন্তু এর উপায় কী? স্থূলতা কাটিয়ে উঠার কার্যকর সমাধান কী?

সমাধান:
১. প্রথমেই মানতে হবে, স্বীকার করতে হবে, স্থূলতা একটা মারাত্মক ব্যাধি। স্থূলকায় ব্যক্তি যখন এটা মেনে নিবে, নিজেকে অসুস্থ ভাবতে শুরু করবে, তখন থেকেই সে দেহের মেদ-চর্বি ঝরিয়ে সুস্থতা লাভের জন্য তৎপর হবে।

২. অনিয়মিত ও অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস পরিহার করা কর্তব্য। স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর-এমন যেকোনো ধরনের খাবার থেকে বেঁচে থাকা আবশ্যক।

৩. ডাক্তারের শরণাপন্ন হয়ে তাঁর পরামর্শ ও দিকনির্দেশনা মেনে চলতে হবে।

৪. স্থূলতার ক্ষতিকর দিকগুলো সম্পর্কে জানতে হবে। ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের ওপর এর মারাত্মক পরিণতির কথা মনে রাখতে হবে।

৫. দৈনিক হাঁটাচলা ও নিয়মিত ব্যায়াম, স্থূলতা কাটিয়ে উঠার জন্য সবচেয়ে কার্যকর প্রাকৃতিক উপায়। তাই হাঁটাচলা ও ব্যায়াম হতে হবে প্রতিদিনের আবশ্যক কর্তব্য। এক্ষেত্রে কোনো এক্সারসাইজ টিমের সাথে যুক্ত হয়ে ব্যায়াম করা যেতে পারে। তাদের ব্যায়ামের দিক-নির্দেশনা সুস্বাস্থ্যের জন্য খুবই কার্যকর।

৬. অবসরে কায়িক পরিশ্রমহীন দীর্ঘ সময় বসে থাকা ও বিশ্রামে পড়ে থাকার মানসিকতা ত্যাগ করতে হবে।

৭. ভালোভাবে না চিবিয়ে দ্রুত খাবার খাওয়ার অভ্যাস বর্জন করা কর্তব্য। মিষ্টান্নজাতীয় খাবার ও কোলড্রিংস যথাসম্ভব পরিহার করতে হবে। এর পরিবর্তে তরতাজা ফলাহার অধিক সাাস্থ্যসম্মত।

৮. স্বল্প দূরত্বের গন্তব্যস্থলে যাতায়াতের ক্ষেত্রে যানবাহনের চেয়ে পায়ে হেঁটে যাতায়াত করতে হবে। মসজিদ, ক্ষেত-খামার কিংবা নিকটবর্তী কর্মস্থলে পায়ে হেঁটে যাতায়াত করাই বাঞ্ছনীয়। বহুতল ভবনে লিফট বাদ দিয়ে সিঁড়ি ব্যবহার করতে হবে।

৯. স্বাস্থ্যকর যতো খাদ্যদ্রব্য পরিবর্তন করতে হবে। এক বসায় উদরপূর্তি করে না খেয়ে অল্প অল্প করে বারবার খাওয়া এবং রাতের খাবার ও ঘুমানোর মধ্যে তিন থেকে চার ঘণ্টার বিরতি রাখা অধিক স্বাস্থ্যসম্মত। প্রতিদিন অন্তত আট গ্লাস পানি পান করতে হবে।

১০. মেদমুক্ত সুস্বাস্থ্য ফিরে পেতে দৃঢ় প্রত্যয়ী ও আত্মবিশ্বাসী হতে হবে। আমাদের চারপাশের অনেকেই নিজস্ব চেষ্টা-পরিশ্রমের বদৌলতে মেদ-চর্বি ঝরিয়ে স্থূলতামুক্ত সুস্বাস্থ্য ফিরে পেয়েছে।

পরিশিষ্ট:
* অনেক খেটে খাওয়া শ্রমজীবী লোকদের দেখেছি, তারা লোহা, কাঠ, পাথর ইত্যাদির কাজ করে। তারা কত সুস্থ, সবল ও মজবুত গড়নের অধিকারী। কাজে-কর্মে কী সীমাহীন উদ্যমী ও প্রাণবন্ত। গলা ছেড়ে গেয়ে চলছে আর বিরামহীন কাজ করছে। চেহারায় দুঃখ বিষাদের কোনো ছাপ নেই। মনে বিষণ্ণতা ও দুশ্চিন্তার স্থান নেই। দেহ-মনে তারা যেন সুস্থ-সবল প্রাণবন্ত। তাদের জীবনযাপনও সুখ-শান্তিপূর্ণ।
বিপরীতে এমন লোকদেরও জানি, যারা মেদবহুলতা ও স্থূলতায় আক্রান্ত। তাদের কেউ কেউ জটিল দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু বরণ করেছে।

জনৈক লেখক নিজের স্থূলতা ও মেদবহুলতার কথা বলেছেন: কায়িক পরিশ্রমহীন জীবন ও অনিয়মিত খাদ্যভ্যাসের কারণে আমাকে চরম বিপাকে পড়তে হয়। অল্পতেই হাঁপিয়ে উঠি। সামান্য পরিশ্রমেই আমার হাঁসফাঁস অবস্থা। শারীরিক অবস্থারও ক্রমাবনতি হতে থাকে। আমি ভীষণ দুশ্চিন্তা ও অস্থিরতায় পড়ে যাই। কী করব, ভেবে উঠতে পারি না। চিকিৎসা করে সম্পূর্ণ সুস্থতা ফিরে পাব কি না, সে ব্যাপারেও অনিশ্চয়তা কাজ করে। এরপর বিশেষ এক উপলক্ষে জনৈক ডাক্তারের সঙ্গে দেখা হলো। আমার শারীরিক অবস্থা দেখে তিনি নিজেই কথা তুললেন। তাঁর সাথে আমার দীর্ঘক্ষণ কথা হয়। গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ ও দিকনির্দেশনার সঙ্গে সঙ্গে খাবারের রুটিন পাল্টে দেন। রুটিনমাফিক কিছু ব্যায়াম ও শরীরচর্চার ব্যাপারেও গুরুত্বারোপ করেন। ডাক্তারের পরামর্শ ও আশ্বাসে আমি সাহস ফিরে পেলাম। সুস্থ হওয়ার প্রবল আকাঙ্ক্ষা নিয়ে রুটিনমাফিক খাবার-দাবারে অভ্যস্ত হলাম। কোনো দিন ব্যায়াম করতে ভুলি না। এভাবে কয়েক মাসের মধ্যেই অতিরিক্ত মেদ ঝরিয়ে সুস্বাস্থ্য ফিরে পেলাম। এখন আলহামদুলিল্লাহ, আমি সম্পূর্ণ সুস্থ-সবল জীবনযাপন করছি।

টিকাঃ
৪০. আর্থ্রাইটিস বলতে সাধারণত অস্থিসন্ধি বা জয়েন্টের প্রদাহকেই বোঝানো হয়। এটি নির্দিষ্ট একটি রোগ নয়। অস্থিসন্ধি, অস্থিসন্ধির আশপাশের মাংসপেশি, টেনডন ইত্যাদির অনেকগুলো অসুখ একসঙ্গে আর্থ্রাইটিস নামে পরিচিত। তবে সবচেয়ে বেশি হয় অস্টিওআর্থারাইটিস। (অনুবাদক)

📘 আল হাল্লু জীবন সমস্যার সমাধান > 📄 ধূমপান

📄 ধূমপান


ধূমপান হলো তামাকজাতীয় দ্রব্যাদি বিভিন্ন পদ্ধতিতে প্রক্রিয়াজাত করে, আগুন দিয়ে পুড়িয়ে তার ধোঁয়া শ্বাসের সাথে শরীরে গ্রহণ-প্রক্রিয়া। যেকোনো পোড়ানো বস্তুর ধোঁয়া শ্বাসের সাথে গ্রহণ করাকে ধূমপান বলা হয়। তবে মূলত তামাকজাতীয় দ্রব্যাদির পোড়ানো ধোঁয়া শ্বাসের সাথে গ্রহণ করাই ধূমপান হিসেবে বিশেষভাবে পরিচিত।

বর্তমান বিশ্বে ধূমপান প্রকট আকার ধারণ করেছে এবং মানুষের নিত্যনৈমিত্তিক বদভ্যাসে পরিণত হয়েছে। ধূমপায়ী ও তার চারপাশের সমাজ এর চরম ভুক্তভোগী। কয়েকটি কারণে মানুষ ধূমপান করে থাকে। কিছু মানুষ ধূমপান করে শয়তানের প্ররোচনায় প্ররোচিত হয়ে। কিছু লোক ধূমপান করে চরম মানসিক কষ্ট-যাতনার শিকার হয়ে। তাদের ধারণা, ধূমপান মনের দুঃখ-কষ্ট লাঘব করে। আর একটা শ্রেণি সিগারেট ফুঁকে-তাদের বিশ্বাস, সিগারেট আভিজাত্য ও ফ্যাশনের গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ।

ওলামায়ে কেরামের অনেকেই ধূমপানকে সুস্পষ্ট হারাম বলেছেন। কারণ, ধূমপান ধূমপায়ী ও তার চারপাশের সকলের ক্ষতি করে। তা পরিবেশ ও বায়ুদূষণের অন্যতম কারণ। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলার নির্দেশ: وَلَا تُلْقُوْا بِأَيْدِيكُمْ إِلَى التَّهْلُكَةِ﴾ [البقرة: ١٩٥] অর্থ: 'নিজ হাতে নিজেদের ধ্বংসে নিক্ষেপ করো না।' (বাকারা, ২: ১৯৫)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: إِنَّ الْمَلَائِكَةَ تَتَأَنَّى مِمَّا يَتَأَنَّى مِنْهُ الْإِنْسَانُ. অর্থ: 'মানুষ যাতে কষ্ট পায়, ফেরেশতারাও তাতে কষ্ট পান।' (ইবনে মাযাহ, ২/১১১৬)

ধূমপান একই সাথে পরিবেশ ও সমাজের জন্য ভীষণ ক্ষতিকর। তাতে অর্থের অপচয়ের সঙ্গে সঙ্গে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির আশঙ্কা রয়েছে। ধূমপানের কারণে ব্যক্তি যক্ষ্মা ও ফুসফুসের ক্যান্সারের মতো মারাত্মক দুরারোগ্য ব্যাধির শিকার হয়। এছাড়াও তাতে নিউমোনিয়া ও এজমার ঝুঁকি রয়েছে। 'ওয়ার্ল্ড হেলথ অরগানাইজেশন' (বিশ্ব-স্বাস্থ্য-সংস্থা)-এর একটি জরিপে দেখা যায়, বিশ্বে প্রতি বছর ছয় মিলিয়ন মানুষের মৃত্যুর কারণ হলো ধূমপান। তাদের মধ্যে ৮৩ ভাগ মানুষের মৃত্যু হয় সরাসরি ধূমপানের কারণে। বাকিদের পরোক্ষ ধূমপানের কারণে।

এখনই যদি আমরা ধূমপানের বিষয়ে সচেতন না হই, তাহলে পরিবেশ-দূষণ ও স্বাস্থ্য-ঝুঁকি আরও প্রকট আকার ধারণ করবে। পর্যায়ক্রমে তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। দূষণমুক্ত পরিবেশ গড়ে তোলার জন্য এবং বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাস্থ্য রক্ষার লক্ষ্যে আমাদের অবশ্যই ধূমপানের বদভ্যাস ছাড়তে হবে। এর জন্য আমাদের করণীয় কী? এ চলমান সংকট থেকে নিষ্কৃতির উপায় কী?

সমাধান:
১. প্রথমেই বুঝতে হবে এবং স্বীকার করতে হবে, ধূমপান স্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। তাই ধূমপান থেকে বিরত থাকার জন্য দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হতে হবে।

২. ধূমপানে অভ্যস্ত ও নেশাগ্রস্ত হওয়ার পূর্বেই সিগারেট ছাড়তে হবে। পরিবেশ-পরিস্থিতি যতই প্রতিকূল হোক, কাল বিলম্ব না করে একটি সময়সীমা নির্ধারণ করে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হতে হবে-এ সময়ের মধ্যে অতি অবশ্যই ধূমপান ছেড়ে দিব।

৩. বন্ধু-বান্ধব ও চারপাশের পরিচিতদের জানিয়ে দিন, আপনি পাকাপাকিভাবে ধূমপান ছেড়ে দিচ্ছেন। এ লক্ষ্যে তাদের সমর্থন ও সহযোগিতা কামনা করুন।

৪. বাড়িতে, গাড়িতে কিংবা কর্মক্ষেত্রে ধূমপানের কথা মনে করিয়ে দেয়-এমন সমস্ত কিছু সরিয়ে ফেলুন। যেমন: সিগারেটের প্যাকেট, লাইটার, সিগারেট রাখার পাত্র ইত্যাদি।

৫. কী কী কারণে আপনি ধূমপান ছেড়ে দিতে আগ্রহী-তার একটা তালিকা করে ফেলুন। তালিকাটি নিজের সাথেই রাখুন। তা আপনাকে ধূমপান ছাড়তে প্রস্তুত করবে এবং সাহস জোগাবে।

৬. ধূমপানের যাবতীয় ক্ষতি সম্পর্কে জানুন। মনে রাখবেন, ধূমপানের মধ্যে নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্ট, হৃদরোগ হতে শুরু করে যক্ষ্মা ও ফুসফুসের ক্যান্সারের মতো মরণব্যাধির আশঙ্কা রয়েছে। ধূমপানের ক্ষতি সম্পর্কে ইন্টারনেটে ভিডিও ক্লিপগুলো দেখতে পারেন। তাতে বিষয়টি আপনার কাছে আরও পরিষ্কার ও সুস্পষ্ট হবে।

৭. ধূমপান না করার উপকারিতা সম্পর্কে জানুন। যেমন: বায়ুদূষণ, পরিবেশ-দূষণ, অর্থের অপচয়, শরীর-স্বাস্থ্যের ক্ষতি-এসবই ধূমপানের ক্ষতিকর প্রভাব। আপনি যদি ধূমপানমুক্ত জীবনযাপন করতে পারেন, তাহলেই এর উপকারগুলো লাভ করতে সক্ষম হবেন। ধূমপানমুক্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে পরিবার, বন্ধু-বান্ধব-সবাই প্রশান্তি বোধ করে।

৮. ধূমপান ছাড়ার জন্য দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হতে হবে। আত্মনিয়ন্ত্রণ করতে হবে। নিজের মনটাকে কাবু করতে হবে। কঠিন মুহূর্তে মনের চাহিদা হবে-একবার ধূমপান করলে এমন কী-ই বা ক্ষতি হবে; কিন্তু এমন প্ররোচনা থেকে বেঁচে থাকতে হবে।

৯. আপন রবের নৈকট্য অর্জনে সচেষ্ট হোন। আল্লাহ তা'আলার যিকির দ্বারা আপনার যবান তরতাজা রাখুন। সময়মতো সালাত কায়েম ও নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াতে যত্নবান হোন।

১০. সবসময় নিজের কল্যাণে, দশের কল্যাণে নিয়োজিত থাকুন। উদ্দেশ্যহীন অবসর-যাপন নিরাপদ নয়। কারণ, অবসর হলো নফস ও শয়তানের সুবর্ণ সুযোগ। অবসরেই শয়তান মানুষকে নানা বদভ্যাস ও কুকাজে প্ররোচিত করে। ছুটি ও অবসরের সময়টাতে কোনো ক্রীড়াদল কিংবা এক্সারসাইজ টিমের সঙ্গে যোগ দিন। আপনার জীবন আরও প্রফুল্ল ও প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে। সার্বক্ষণিক ব্যস্ততা ও কর্মমুখরতায় আপনাকে ধূমপানের কথা ভুলিয়ে দিবে।

১১. ধূমপান থেকে বাঁচার লক্ষ্যে একটি টিম গড়ে তুলুন। যাদের প্রত্যেকেই ধূমপান ছাড়ার জন্য প্রতিশ্রুতিশীল ও দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। নিজেকে ধূমপানমুক্ত করার জন্য এবং পরিবেশ দূষণমুক্ত করার জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ ও কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করুন। লক্ষ্য-উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য সংঘবদ্ধ হয়ে কাজ করুন। এটা তো সর্বজনস্বীকৃত যে, একক প্রচেষ্টার চেয়ে সম্মিলিত প্রচেষ্টা অধিক কার্যকর ও ফলপ্রসূ।

১২. যে সময় ও উপলক্ষগুলোতে ধূমপানে অভ্যস্ত, তা চিহ্নিত করুন। যেমন: তিনবেলা খাবার পর, ঘুমাতে যাওয়ার আগে এবং ঘুম থেকে উঠার পর-এ সময়গুলোতে ধূমপানের পরিবর্তে কোনো ভালো খাবার খান। যেমন: তাজা ফলমূল, সালাত, হালকা নাশতাজাতীয় খাবার ইত্যাদি।

১৩. ধূমপানের পেছনে আপনার আর্থিক ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি একবার চিন্তা করুন। প্রতি সপ্তাহে, প্রতি মাসে, প্রত্যেক বছরে কী বিপুল পরিমাণ অর্থ ধূমপানের পেছনে অপচয় হচ্ছে। অথচ এ অপচায়িত অর্থের যথার্থ ব্যয়ের প্রকৃত হকদার হলেন স্বয়ং আপনি, আপনার পরিবার, আত্মীয়-স্বজন, দুস্থ ও প্রয়োজনগ্রস্ত মানবসমাজ। নিজেকে একবার জিজ্ঞেস করুন, কাল কিয়ামতের দিন যখন অর্থ-সম্পদ সম্পর্কে আপনাকে জিজ্ঞেস করা হবে, তখন এর সদুত্তর কী হবে? কিয়ামতের দিন পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর দেওয়া ব্যতীত বান্দা একচুল নড়তে পারবে না। তার মধ্যে অর্থ-সম্পদের আয়-ব্যয় সম্পর্কে জিজ্ঞেস অন্যতম। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

لَا تَزُولُ قَدَمَا ابْنِ آدَمَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ حَتَّى يُسْأَلَ عَنْ خَمْسٍ: عَنْ عُمْرِكَ فِيمَا أَفْنَيْتَ، وَعَنْ شَبَابِكَ فِيمَا أَبْلَيْتَ، وَعَنْ مَالِكَ مِنْ أَيْنَ كَسَبْتَهُ وَفِيمَا أَنْفَقْتَهُ، وَمَا عَمِلْتَ فِيمَا عَلِمْتَ "

অর্থ: 'কিয়ামত দিবসে আদম সন্তানের পা নড়তে পারবে না, যতক্ষণ না তাকে পাঁচটি বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়: তার জীবন সম্পর্কে, কী কাজে তুমি তোমার জীবন নিঃশেষ করেছ? তার যৌবন সম্পর্কে, কীসে তোমার যৌবন ক্ষয় করেছ? তার অর্থ-সম্পদ সম্পর্কে, কোন পথে উপার্জন করেছ, আর কোন পথে ব্যয় করেছ? যে জ্ঞানার্জন করেছ তার ওপর কতটুকু আমল করেছ?' (মুসনাদে আবূ ইয়ালা, ৯/১৭৮)

১৪. ধূমপানে অভ্যস্ত বন্ধু-বান্ধব ও সহকর্মীদের থেকে দূরত্ব বজায় রেখে চলুন। কেননা তাদের উৎসাহে ধূমপান আপনাকেও প্ররোচিত করবে। মুত্তাকী ও ধার্মিক ব্যক্তিদের সাথে চলুন। তাদের সংস্পর্শ আপনাকে বদভ্যাস ছাড়ার লক্ষ্যে উৎসাহিত করবে।

১৫. লক্ষ করুন, ধূমপানের কারণে শুধু আপনার একার ক্ষতি হচ্ছে না, আপনার চারপাশের ধুমায়িত পরিবেশে পরিবার, বন্ধু-বান্ধব ও সহকর্মীরা পরোক্ষ ধূমপানে বাধ্য হচ্ছে। তাদের শরীর-স্বাস্থ্য ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে। সুতরাং আল্লাহকে ভয় করুন। অন্যকে কষ্ট দেওয়া থেকে বিরত থাকুন। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
الْمُسْلِمُ مَنْ سَلِمَ الْمُسْلِمُونَ مِنْ لِسَانِهِ وَيَدِهِ.
অর্থ: 'সে-ই প্রকৃত মুসলমান, অন্য সকল মুসলমান যার যবান ও হাত থেকে নিরাপদ থাকে।' (বুখারী, ১/১১)

১৬. দেহ-মন সতেজ-সবল রাখার জন্য ধূমপান ছেড়ে বেশি বেশি পানি পান করুন। এক্ষেত্রে দুধ, ফলের জুসও বেশ কার্যকর।

১৭. যদি ধূমপানের ইচ্ছা জাগে, তাহলে ধূমপানের কারণে যক্ষ্মা ও ফুসফুসের ক্যান্সারের মতো দুরারোগ্য ব্যাধিগ্রস্ত লোকদের কথা চিন্তা করুন। তাদের রোগাক্রান্ত করুণ অবস্থা আপনাকেও সতর্ক সচেতন করবে।

১৮. সদিচ্ছা ও নিজ উদ্যোগেও যদি ধূমপান থেকে বিরত থাকা সম্ভব না হয় তাহলে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হোন। তাঁর সুপরামর্শ ও দিকনির্দেশনা অনুযায়ী চলার চেষ্টা করুন।

১৯. ধূমপান থেকে প্রত্যেকের বিরত থাকা উচিত। তবে বিশেষভাবে পিতা, শিক্ষক ও সমাজের অভিভাবক ও অনুসরণীয় ব্যক্তিদের বিরত থাকা বাঞ্ছনীয়। কেননা তাদের দেখাদেখি তরুণ সমাজও এই ভ্রষ্টাচারে প্ররোচিত হয়, ধূমপানের পথে পা বাড়ায়।

২০. দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়ে যারা ধূমপানের পথ থেকে সরে এসেছে, এখন ধূমপানমুক্ত সুস্থ-সুন্দর জীবনযাপন করছে, জনসম্মুখে তাদের সফলতার বিষয়টি প্রচার করে পুরস্কৃত করতে হবে; যেন তাদের দেখে অন্যরাও উদ্বুদ্ধ ও অনুপ্রাণিত হয়।

২১. যেকোনো পারিবারিক সমস্যা দ্রুততার সময়ে সমাধান করতে হবে। পারিবারিক বন্ধন মজবুত ও অটুট রাখার ব্যাপারে সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করা কর্তব্য। কেননা পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা ও অশান্তির কবলে অনেকেই ধূমপানের পথে পা বাড়ায়।

২২. সন্তানদের ইসলামি শিক্ষা-দীক্ষা ও ধর্মীয় অনুশাসনে গড়ে তুলতে হবে। ধূমপান ও এর ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে তাদের সচেতন করতে হবে। ধূমপানটাকে আভিজাত্য ও আধুনিকতার অনুষঙ্গ না বানিয়ে এটাকে ক্ষতিকর ও ঘৃণ্যরূপে তুলে ধরতে হবে।

২৩. রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে ধূমপানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে হবে। সিগারেট ও তামাকজাতীয় দ্রব্য ক্রয়-বিক্রয়ের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ করতে হবে। সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ইউনিভার্সিটি, অফিস-আদালত, মার্কেট, শপিং মল-মোটকথা, সর্বত্র ধূমপানের জন্য মোটা অঙ্কের আর্থিক জরিমানা আরোপ করতে হবে।

২৪. দেশের প্রতিটি অঞ্চলে ধূমপানের বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রচারাভিযান চালাতে হবে। তাতে তিনটি বিষয়ে সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করা হবে: এক. ধূমপানের ওপর শরীয়তের নিষেধাজ্ঞা। দুই. ধূমপানের ক্ষতিকর দিকগুলো সম্পর্কে দেশের বিজ্ঞ চিকিৎসকদের অভিমত। তিন. ধূমপানের বিরুদ্ধে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি।

২৫. ধূমপানের ক্ষতিকর দিকগুলো তুলে ধরে কিছু অনলাইন প্রোগ্রাম ও ভিডিও ক্লিপ প্রচার করতে হবে, যেখানে ধূমপানের কারণে সৃষ্ট দুরারোগ্য ব্যাধিগুলো, বিশেষভাবে যক্ষ্মা ও ফুসফুসের ক্যান্সারের বিষয়টি আরও সুস্পষ্ট ও স্বচিত্ররূপে প্রচার করা হবে।

২৬. আপনি যদি সরাসরি ধূমপান না করে থাকেন, তাহলে পরোক্ষ ধূমপান থেকে বেঁচে থাকুন। অর্থাৎ, যে সমস্ত স্থান সিগারেটের ধুয়ায় ধুমায়িত হয়ে আছে সেখান থেকে দূরে থাকুন। চলার পথে আশপাশ থেকে সিগারেটের ধুয়া নাকে এলে সাময়িক দম বন্ধ রাখুন। সবচেয়ে নিরাপদ হলো ভালো মাস্ক ব্যবহার করা।

২৭. অনেক বন্ধু-বান্ধব বলবে: 'লাইফে কোনো কিছু থেকে বঞ্চিত হতে নেই। সবকিছুরই অভিজ্ঞতা থাকা দরকার। সিগারেটে একটু-আধটু টান দিয়েই দেখ না।' এমন বন্ধুদের থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখুন। মনে রাখবেন, ক্ষতিকর ও অন্যায় কাজের প্রথম অভিজ্ঞতাই পরবর্তী জীবনে বিরাট আক্ষেপ-অনুতাপের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

২৮. বিশ্বাস করুন, সুস্থ-সবল ও সুন্দর জীবনযাপনের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ও শ্রেষ্ঠ পদক্ষেপ হলো ধূমপান থেকে বিরত থাকা। এ আপদ থেকে বাঁচার জন্য আল্লাহর ওপর ভরসা করুন। তাঁর সাহায্য ও তাওফিক কামনা করুন।

পরিশিষ্ট:
আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: لَا تَزُولُ قَدَمَا ابْنِ آدَمَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ حَتَّى يُسْأَلَ عَنْ خَمْسٍ: عَنْ عُمْরِكَ فِيمَا أَفْنَيْتَ، وَعَنْ شَبَابِكَ فِيمَا أَبْلَيْتَ، وَعَنْ مَالِكَ مِنْ أَيْنَ كَسَبْتَهُ وَفِيمَا أَنْفَقْتَهُ، وَمَا عَمِلْتَ فِيمَا عَلِمْتَ
অর্থ: 'কিয়ামত দিবসে আদম সন্তানের পা নড়তে পারবে না, যতক্ষণ না তাকে পাঁচটি বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়; তার জীবন সম্পর্কে, কী কাজে তুমি তোমার জীবন নিঃশেষ করেছ? তার যৌবন সম্পর্কে, কীসে তোমার যৌবন ক্ষয় করেছ? তার অর্থ-সম্পদ সম্পর্কে, কোন পথে উপার্জন করেছ, আর কোন পথে ব্যয় করেছো? যে জ্ঞানার্জন করেছ তার ওপর কতটুকু আমল করেছ?' (মুসনাদে আবু ইয়ালা, ৯/১৭৮)

ধূমপানে আসক্ত হয়ে পড়বেন না। মনে রাখবেন, আপনি যদি ধূমপানকে নিঃশেষ না করতে পারেন, ধূমপান আপনাকে নিঃশেষ করে ফেলবে। সুতরাং দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হোন এবং সিগারেট ছুড়ে ফেলুন। -আয়েয আল কারনী

এক ধূমপানকারীকে জিজ্ঞেস করা হলো: 'ধূমপানে কী লাভ?'
বললো: 'কুকুর তাড়াই।' উদ্দেশ্য, যখন সে সজোরে কাশাকাশি করে, আশেপাশের কুকুরগুলো পালিয়ে যায়।
এমন কথা শুনে তার এক বন্ধু বললো: 'কুকুর তাড়াতে গিয়ে তুমি তো নিজেকেই পুড়িয়ে ফেলছ। বন্ধু-বান্ধব ও নিকটজনদের পরোক্ষ ক্ষতি করছ।'

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00