📘 আল হাল্লু জীবন সমস্যার সমাধান > 📄 বার্ধক্য

📄 বার্ধক্য


বার্ধক্য একটি স্বাভাবিক জৈবিক ঘটনা। মন্থর ও আনুক্রমিক হারে এগিয়ে আসা দৈহিক অবক্ষয়। একটা অবধারিত জৈবিক বাস্তবতা। যা প্রতিরোধ করার কিংবা নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা কারো নেই।

শৈশব, কৈশোর, যৌবন ও পৌঢ়ত্বের পর বার্ধক্যও জীবনের একটি পটভূমি। সর্বশেষ চূড়ান্ত পটভূমি। জীবনের এই স্বতঃসিদ্ধ চিত্রটি পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা এভাবে ব্যক্ত করেছেন:
ٱللَّهُ ٱلَّذِى خَلَقَكُم مِّن ضَعْفٍ ثُمَّ جَعَلَ مِنۢ بَعْدِ ضَعْفٍ قُوَّةً ثُمَّ جَعَلَ مِنۢ بَعْدِ قُوَّةٍ ضَعْفًا وَشَيْبَةً ۚ يَخْلُقُ مَا يَشَآءُ ۖ وَهُوَ ٱلْعَلِيمُ ٱلْقَدِيرُ﴾ [الروم: ٥٤]
অর্থ: 'আল্লাহ সেই সত্তা, যিনি তোমাদের সৃষ্টি শুরু করেছেন দুর্বল অবস্থা থেকে, দুর্বলতার পর তিনি দান করেন শক্তি, আবার শক্তির পর দেন দুর্বলতা ও বার্ধক্য। তিনি যা চান সৃষ্টি করেন এবং তিনিই সর্বজ্ঞ, সর্বশক্তিমান।' (রূম, ৩০: ৫৪)

বার্ধক্যের পরিণতিতে ব্যক্তি স্মৃতিশক্তি হারাতে থাকে। তার দৈহিক শক্তি ক্ষয়িত হতে থাকে। উচ্ছল প্রাণবন্ত জীবন হারাতে থাকে তার গতিময়তা। একপর্যায়ে এসে ব্যক্তি মানসিক বিকারগ্রস্ততা ও অপ্রকৃতিস্থতার শিকার হয়। পরিবার-পরিজন ও বন্ধু-স্বজন তার সংস্পর্শে বিরক্তি বোধ করে। তার থেকে দূরত্ব বজায় রেখে চলে। সে দূরত্ব ঈষৎ উপেক্ষামূলক ও অনাকাঙ্ক্ষিত।

দীর্ঘ জীবনের শক্তি ও সঞ্চয় ব্যয় করে ব্যক্তি যে সাজানো সংসার গড়ে তুলেছে, জীবনের চরম সংকটকালে এসে যখন সে সংসারের লোকদের একে একে অনেককে দূরে সরে যেতে দেখে তখন তাকে চরম মানসিক দুশ্চিন্তা ও বিষণ্ণতা, সর্বাঙ্গীণ একাকিত্ব ও নিঃসঙ্গতা ঘিরে ধরে। বৃদ্ধ লোকটি সুন্দর সাবলীল, শ্রদ্ধা ও সহায়তাপূর্ণ জীবনের অস্তিত্ব সংকটের তিক্ত অভিজ্ঞতার শিকার হয়। এ তিক্ততার দায় আমাদের; চারপাশের সমাজের।

জীবনের পটভূমিতে একজন বৃদ্ধের প্রতি আমাদের করণীয় কী? বার্ধক্যকালীন সমস্যাগুলোর প্রকৃত সমাধান কী?

সমাধান:
১. বৃদ্ধ ব্যক্তির প্রতি পরিবার-পরিজনের পক্ষ থেকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। তার সাথে সযত্ন ও শ্রদ্ধাপূর্ণ আচরণ করতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে তার বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা ও আরাম-বিশ্রামের দিকে বিশেষ নজর রাখতে হবে। শরীয়তের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতের মতো এটিও একটি মহৎ ইবাদত।

২. বৃদ্ধ ব্যক্তির মন-মানসিকতা ও সুযোগ-সুবিধানুযায়ী উপযুক্ত পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। কেননা বার্ধক্য একটি জৈবিক অবক্ষয়কাল। যখন ব্যক্তির বিশেষ সেবাযত্ন ও পরিচর্যা আবশ্যক।

৩. সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়, দাতব্য সংস্থা কর্তৃক কিংবা সামাজিক উদ্যোগে বৃদ্ধদের জন্য স্বাস্থ্যালয় ও পরিচর্যা কেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে।

৪. বৃদ্ধ লোকদের স্বাস্থ্য-সক্ষমতা ও মন-মানসিকতার উপযোগী একটি দৈনন্দিন রুটিন প্রস্তুত করতে হবে। সে মোতাবেক তারা হাঁটাচলা করবেন। সাধ্য ও সক্ষমতা অনুযায়ী যিকির, তাসবীহ-তাহলীল ও কুরআন তিলাওয়াতে মশগুল হবেন।

৫. বৃদ্ধ ব্যক্তিকে সবসময় ডাক্তারের পরামর্শ মোতাবেক চলতে হবে। যেকোনো ধরনের সমস্যা অনুভব করামাত্র ডাক্তারের শরণাপন্ন হয়ে স্বাস্থ্য-পরীক্ষা করা কর্তব্য। রোগ শনাক্ত হওয়ার পর যথোপযুক্ত চিকিৎসা গ্রহণ করা আবশ্যক।

৬. বয়োবৃদ্ধ ব্যক্তিদের সাথে কখনো বাকবিতণ্ডা রেষারেষি করা যাবে না। কোনো অবস্থাতেই তাদের ত্যক্ত-বিরক্ত করা বাঞ্ছনীয় নয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
لَيْسَ مِنَّا مَنْ لَّمْ يَرْحَمْ صَغِيرَنَا وَيُوَقِّرْ كَبِيرَنَا
অর্থ: 'যে ব্যক্তি ছোটদের স্নেহ করে না, বড়দের শ্রদ্ধা করে না সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়। (তিরমিজী, ৪/৩২১)

৭. বৃদ্ধদের প্রতি সদয় সহানুভূতিশীল হতে হবে। যদ্দূর সম্ভব, সহমত পোষণ করে তাদের ইচ্ছা ও অভিমতের মূল্যায়ন করতে হবে। তাদের মন জয় করার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে।

৮. স্বাস্থ্যসুরক্ষা ও দেহের পরিচর্যার মাধ্যমে বার্ধক্য নিয়ন্ত্রণ করা ও বৃদ্ধ বয়সে সুস্থ থাকা সম্ভব। এর জন্য আবশ্যক হলো স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা এবং রুটিন মাফিক জীবনযাপন করা।

৯. দেহমনে সুস্থ-সবল থাকার জন্য নিয়মিত শরীরচর্চা ও ব্যায়াম করতে হবে। বার্ধক্য ত্বরান্বিত করে-এমন সমস্ত কাজ যেমন: ধূমপান, তৈলাক্ত খাবার খাওয়া ও দুশ্চিন্তা করা ইত্যাদি থেকে বিরত থাকা কর্তব্য। সর্বোপরি সুস্থ মন-মানসিকতা ও সুস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর সবকিছু পরিহার করা আবশ্যক।

১০. জ্ঞাতব্য যে, দীর্ঘ জীবন আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে এক বিরাট নিয়ামত। তাই রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর একনিষ্ঠ খাদেম আনাস (রা.)-এর জন্য দীর্ঘ জীবন কামনা করে দু'আ করেছেন। অন্যত্র রাসূল ﷺ বলেছেন:
وَإِنَّ مِنَ السَّعَادَةِ أَنْ يَطُولَ عُمْرُ الْعَبْدِ، وَيَرْزُقَهُ اللَّهُ الْإِنَابَةَ»
অর্থ: 'মানুষ দীর্ঘজীবী হওয়া এবং আল্লাহ তা'আলা তাকে তাওবা করার তাওফিক দান করা অন্যতম সৌভাগ্য।' (মুসনাদে আহমাদ, ২২/৪২৬)

১১. নামাযের জামাতে যদি বয়স্ক ও বৃদ্ধ লোক উপস্থিত থাকে তবে ইমাম সাহেবের কর্তব্য হলো, অতি দীর্ঘায়িত না করে সংক্ষিপ্তভাবে নামায শেষ করা। হাদীসে রাসূলুল্লাহ ﷺ এমনটিই আদেশ করেছেন।

১২. বার্ধক্য প্রলম্বিত করার জন্য এবং বার্ধক্যের ক্ষতিকর প্রভাবমুক্ত থাকার লক্ষ্যে প্রতিদিন মসজিদে গিয়ে জামাতের সাথে পাঁচ ওয়াক্ত নামায আদায় করতে হবে। অবশ্যই মসজিদে পায়ে হেঁটে যাতায়াত করতে হবে। এ আমলটিতে একই সাথে দু'টি কল্যাণ নিহিত। প্রথমত, জামাতের উদ্দেশ্যে মসজিদে যাওয়ার সওয়াব হাসিল হবে। দ্বিতীয়ত, ডাক্তার যে প্রতিদিন ৩০ মিনিট হাঁটা-চলার পরামর্শ দিয়ে থাকেন তা সহজেই কার্যকর হবে।

১৩. পরিবার-পরিজন ও বন্ধুবান্ধবের সংস্পর্শে থাকতে হবে। আত্মীয়-স্বজনের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে হবে। অকাল বার্ধক্য প্রতিরোধের জন্য এটি একটি বাস্তবানুগ ও কার্যকর পন্থা। যা চিকিৎসা-বিজ্ঞানে সুপ্রমাণিত।

১৪. যেকোনো ধরনের মানসিক চাপমুক্ত থাকতে হবে। মানসিক চাপে ভোগার অন্যতম কারণ হলো আসন্ন ভবিষ্যৎ নিয়ে অজানা আশঙ্কায় ভোগা। হাতছাড়া হওয়া বিষয়ে আক্ষেপ-অনুতাপ করা এবং কোনো ক্ষেত্রে বিফল হয়ে দুঃখ-কষ্টে ভেঙে পড়া।

১৫. স্বাস্থ্য-সবলতা অনুযায়ী নিয়মমাফিক রোযা রাখতে হবে। সাম্প্রতিক একটি গবেষণা ও জরিপে প্রতীয়মান হয়েছে, দৈনিক উদ্দীপনা ও চাঞ্চল্য বৃদ্ধির জন্য রোযা অন্যতম কার্যকর উপায়। এর মাধ্যমে বার্ধক্য প্রলম্বিত ও নিয়ন্ত্রিত হয়।

পরিশিষ্ট:
হাদীসে বর্ণিত হয়েছে:
أَنَّ رَجُلًا قَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ أَيُّ النَّاسِ خَيْرٌ، قَالَ: «مَنْ طَالَ عُمُرُهُ، وَحَسُنَ عَمَلُهُ»، قَالَ: فَأَيُّ النَّاسِ شَرٌّ؟ قَالَ: «مَنْ طَالَ عُمُرُهُ وَسَاءَ عَمَلُهُ» (سنن الترمذي) ٤ / ٥٦٦
অর্থ: জনৈক সাহাবি আরজ করলেন: 'ইয়া রাসূলুল্লাহ! সর্বোত্তম ব্যক্তি কে?' রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন: 'যে ব্যক্তি (যুগপদ) দীর্ঘজীবী ও নেক আমলকারী।' সাহাবি জিজ্ঞাসা করলেন: 'সবচেয়ে খারাপ লোক কে?' রাসূল ﷺ বললেন: 'যে লোক (যুগপদ) দীর্ঘজীবী ও বদ আমলকারী।' (তিরমিজী, ৪/৫৬৬)

* বিখ্যাত ইংরেজ দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিক বিপ্লবের প্রবক্তা ফ্রান্সিস বেকন (১৫৬১-১৬২৬ খ্রিষ্টাব্দ) বলেছেন: 'দৈহিক বার্ধক্যের চেয়ে মানসিক বার্ধক্যই বেশি প্রকট।'

* বিশিষ্ট মিশরীয় চিন্তাবিদ ও লেখক মোস্তফা মাহমুদ (১৯২১-২০০৯ খ্রিষ্টাব্দ) বলেন: 'মনে রাখুন, যৌবনই হলো জীবনের সর্বাধিক মূল্যবান পুঁজি। তাই যৌবনে এমন পাথেয় সঞ্চয় করুন, বার্ধক্যে যা আপনার জন্য সহায়ক হবে।'

📘 আল হাল্লু জীবন সমস্যার সমাধান > 📄 রিবা

📄 রিবা


‘রিবা’ অর্থাৎ, সুদ অন্যতম কবীরা গুনাহ। জঘন্যতম অর্থনৈতিক অনাচার ও সর্বব্যাপী ধ্বংসাত্মক। ‘রিবার’ পরিচয় ও সংজ্ঞা দিতে গিয়ে আল্লামা ইবনে হাজার আসকালানী (রহ.) বলেন: ‘পণ্য বা অর্থের বিনিময়ে প্রদেয় অতিরিক্ত পণ্য বা অর্থই হলো ‘রিবা’।’

রিবা দু’ প্রকার:
এক. ‘রিবার’ প্রথম প্রকারকে মেয়াদি সুদ বা জাহেলি যুগের সুদ বলা হয়। হাদীসের পরিভাষায় বলা হয় ‘রিবান নাসিআ।’ ‘রিবা’র এ প্রথম প্রকারটা সর্বপ্রথম পবিত্র কুরআনের ভাষ্য দ্বারা প্রমাণিত। তাই এটাকে ‘রিবাল কুরআন’ও বলা হয়।

দুই. ‘রিবা’র দ্বিতীয় প্রকারকে বর্ধিত সুদ বলা হয়। আরবিতে এই প্রকারটাকে একাধিক নামে নামকরণ করা হয়। যথা: রিবাল ফজল, রিবান নাক্ক্ ও রিবাল বাই ইত্যাদি। সুদের এ প্রকারটি কুরআনের ভাষ্য দ্বারা সাব্যস্ত নয়; রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। তাই এটাকে রিবাল হাদিসও বলা হয়।

‘রিবান নাসিআ’ বা মেয়াদি সুদ: সর্বপ্রথম ও সর্বাধিক আলোচিত রিবা হলো মেয়াদি সুদ। পবিত্র কুরআনে এ প্রকার সুদকে সরাসরি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তাই একে রিবাল কুরআন বলা হয়। জাহেলি যুগের লোকেরাও এটাকে সুদ বলেই বিশ্বাস করত। সে-বিবেচনায় এটাকে রিবাল জাহেলিয়্যাও বলা হয়। আবূ বকর জাসসাস (রহ.)-এর যথার্থ সংজ্ঞা প্রদান করেছেন: 'মেয়াদের ভিত্তিতে অতিরিক্ত অর্থ প্রদানের শর্তে যে ঋণ দেওয়া হয় তাকে রিবা নাসিআ বা মেয়াদি সুদ বলা হয়।'

'রিবাল ফজল' বা বর্ধিত সুদ: কিছু পণ্যদ্রব্য তার সমজাত দ্রব্যের বিনিময়ে লেনদেন করার সময় অতিরিক্ত হিসেবে যা গ্রহণ করা হয় তাকে 'রিবাল ফজল' বলে।

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা 'রিবা' বা সুদকে হারাম করেছেন এবং সুদিকারবারিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ সুদখোর, সুদী লেনদেনের লেখক ও সাক্ষীদের ওপর অভিসম্পাত করেছেন। কেননা সুদ অর্থ-সম্পদের বরকত নষ্ট করে দেয়। বান্দার নেক আমল বরবাদ করে ছাড়ে। দেশের আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থার সুষ্ঠুতা ও সমবণ্টনের ভিত্তি ধসিয়ে দেয়। এছাড়াও ব্যক্তিগত, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে অর্থনৈতিক অন্যায়-অনাচারের রাস্তা খুলে দেয়।

বর্তমান বিশ্বে পুঁজিবাদী অর্থনীতি ব্যবস্থার জঘন্য ও নিকৃষ্ট দিক হলো 'রিবা' বা সুদ। যা বিত্তবানদের বিত্তবৈভব আরও বহুস্তরে বৃদ্ধি করে। আর দরিদ্রকে দারিদ্র্যের চরমে ঠেলে দেয়।

তাই সুদ বর্জন করা ও সুদমুক্ত অর্থব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার বিকল্প নেই। কিন্তু তার উপায় কী? এ সংকট নিরসনের প্রকৃত পথ কী?

সমাধান:
১. তাকওয়া ও আল্লাহভীতি অবলম্বন করতে হবে। সুদের নিষিদ্ধতা সংবলিত কুরআন-সুন্নাহর বিধান চর্চা করতে হবে। বিশেষভাবে পবিত্র কুরআনের এ আয়াতটি মনে রাখতে হবে:
﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ لَا تَأْكُلُواْ ٱلرِّبَوٰٓاْ أَضْعَٰفًا مُّضَٰعَفَةً ۖ وَٱتَّقُواْ ٱللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ﴾ [آل عمران: ۱۳০]
অর্থ: 'হে মুমিনগণ! তোমরা কয়েক গুণ বৃদ্ধি করে সুদ খেও না এবং আল্লাহকে ভয় করো, যাতে তোমরা সফলতা লাভ করতে পার।' (আলে-ইমরান, ৩: ১৩০)

২. সতর্ক ও সচেতন হোন, রাসূল ﷺ যাদের ওপর লা'নত করেছেন তাদের দলে না শামিল হয়ে যান। জাবের বিন আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত: «لَعَنَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ آكِلَ الرِّبَا، وَمُؤْكِلَهُ، وَكَاتِبَهُ، وَشَاهِدَيْهِ»، وَقَالَ: «هُمْ سَوَاءٌ» (صحيح مسلم) ١٢١٩/٣
অর্থ: রাসূলুল্লাহ ﷺ সুদখোর, সুদি লেনদেন লিপিবদ্ধকারী ও এর সাক্ষরদের অভিসম্পাত করেছেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, 'তারা সবাই সমান (অপরাধী)।' (মুসলিম, ৩/১২১৯)

৩. সুদমুক্ত হালাল লেনদেন করতে হবে। তাতেই প্রকৃত কল্যাণ ও বরকত নিহিত। সুদি ও হারাম লেনদেন পরিহার করুন। তাতে যত অকল্যাণ ও অনিষ্টের ছড়াছড়ি।

৪. বিশ্বাস করুন, আপনি আপনার সম্পদের স্থায়ী মালিক নন। এ অর্থবিত্ত চিরকাল আপনার কাছে সঞ্চিত থাকবে না। অন্যের হাত ঘুরে তা যেমন আপনার মালিকানাধীন হয়েছে, আপনার হাত ঘুরেও অন্যের মালিকানায় চলে যাবে। এটাই অর্থ-সম্পদের অবধারিত নীতি। সুতরাং আপনি শুধু শুধু অর্থসম্পদকে সুদের দোষে দূষিত করতে যাবেন কেন?

৫. অতীতে যে সমস্ত জাতিবর্গের মধ্যে সুদভিত্তিক অর্থব্যবস্থা প্রচলিত ছিল, যে সমাজে এখনও সুদি কারবার বর্তমান তাদের অবস্থা যাচাই করে দেখুন-রিবা ও সুদের কারণে তারা কী সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবক্ষয় ও অধঃগতির শিকার হয়েছে! কী ভয়াবহ আর্থিক অবিচার-অনাচারে জর্জরিত হয়েছে!

৬. সমাজের জ্ঞানীজন ও সুধীমহলের পক্ষ থেকে মানুষকে সতর্ক করতে হবে। সুদের জঘন্যতা ও নিষিদ্ধতা সংবলিত কুরআন-সুন্নাহর সুস্পষ্ট বিধান সম্পর্কে লোকদের অবহিত করতে হবে।

৭. মনে রাখতে হবে, আল্লাহ তা'আলা কোনো সুদখোরের দু'আ কবুল করেন না। কেননা তার খাদ্য হারাম পথে উপার্জিত। তার পোশাক-পরিচ্ছদ অবৈধ টাকায় ক্রয়কৃত। তার দেহের রক্তের সাথে হারাম সম্পদ মিশ্রিত। এমন ব্যক্তির দু'আ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
يَا رَبِّ، يَا رَبِّ، وَمَطْعَمُهُ حَرَامٌ، وَمَشْرَبُهُ حَرَامٌ، وَمَلْبَسُهُ حَرَامٌ، وَغُذِيَ بِالْحَرَامِ، فَأَنَّى يُسْتَجَابُ لِذَلِكَ؟ " (صحيح مسلم) ٢ /٧٠٣
অর্থ: (হারাম ভক্ষণকারী আল্লাহর দরবারে দু'আ করে বলে,) ইয়া রাব্বি! ইয়া রাব্বি! (হে আমার রব! হে আমার রব!) অথচ তার খাবার হারাম, পানীয় হারাম, তার পোশাক-পরিচ্ছেদ হারাম, এমনকি তাকে হারাম খাওয়ানো হয়েছে। এমতাবস্থায় তার দু'আ কীভাবে কবুল হতে পারে? (মুসলিম, ২/৭০৩)

৮. মুক্তবাজার-নীতি চালু করে একপেশে ও স্বার্থকেন্দ্রিক অর্থনীতি বন্ধ করতে হবে।

৯. 'রিবা' ও সুদভিত্তিক ঋণব্যবস্থাকে মুনাফাভিত্তিক ব্যবস্থায় প্রবর্তন করতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে স্বর্ণ ও রুপার মূল্যহারে টাকার নোটের মান নির্ধারণ করতে হবে।

১০. লোকদের ব্যবসা-বাণিজ্য ও হালাল উপার্জনে অনুপ্রাণিত করতে হবে। কেননা ব্যবসা-বাণিজ্যের মাধ্যমেই বাজার চাঙা হয়ে উঠবে এবং সুদের ভিত্তি ছেড়ে লাভ-লোকসানের ভিত্তিতে বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসায়ীর মাঝে আর্থিক লেনদেন করা সহজতর হবে।

১১. শরীয়তে অনুমোদিত 'করজে হাসানা'র গুরুত্ব ও মাহাত্ম্য অনুধাবন করে সে নিয়মে ঋণ প্রদান করতে হবে। 'করজে হাসানা'র নীতি হলো, যে পরিমাণ অর্থ ঋণ প্রদান করা হয়েছে, ঋণগ্রহিতাকে তার সমপরিমাণ অর্থ পরিশোধ করলেই ঋণ শোধ হয়ে যাবে। এর সাথে একআনা মুনাফাও অতিরিক্ত যোগ করতে হবে না।

১২ ঋণগ্রহীতাকে নির্দিষ্ট সময়ে ঋণ পরিশোধের ব্যাপারে প্রতিশ্রুতিশীল হতে হবে। এক্ষেত্রে বিশ্বাস রক্ষা করাই হলো তার প্রধান কর্তব্য। পাশাপাশি ঋণদাতাকে সহনশীলতার পরিচয় দিতে হবে এবং অভাব-অনাটনের ক্ষেত্রে ঋণগ্রস্তকে ঋণ পরিশোধের সুযোগ দেওয়ার মানসিকতা ধারণ করতে হবে। পবিত্র কুরআনের দিকনির্দেশনা:
﴿وَإِنْ كَانَ ذُو عُسْرَةٍ فَنَظِرَةٌ إِلَى مَيْسَرَةٍ وَأَنْ تَصَدَّقُوا خَيْرٌ لَكُمْ إِنْ كُنْتُمْ تَعْلَمُونَ﴾ [البقرة: ٢٨٠]
অর্থ: 'কোন (দেনাদার) ব্যক্তি যদি অসচ্ছল হয়, তবে সচ্ছলতা লাভ পর্যন্ত তাকে অবকাশ দিতে হবে। আর যদি সদাকাই করে দাও, তবে তোমাদের পক্ষে সেটা অধিকতর শ্রেয়- যদি তোমরা উপলব্ধি কর।' (বাকারা, ২: ২৮০)

পরিশিষ্ট:
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন:
﴿الَّذِينَ يَأْكُلُونَ الرِّبُوا لَا يَقُومُونَ إِلَّا كَمَا يَقُوْمُ الَّذِي يَتَخَبَّطُهُ الشَّيْطَنُ مِنَ الْمَسِ ذَلِكَ بِأَنَّهُمْ قَالُوا إِنَّمَا الْبَيْعُ مِثْلُ الرِّبُوا * وَأَحَلَّ اللهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبوا﴾ [البقرة: ٢٧٥]
অর্থ: 'যারা সুদ খায় (কিয়ামতের দিন) তারা সেই ব্যক্তির মত উঠবে, শয়তান যাকে স্পর্শ দ্বারা পাগল বানিয়ে দিয়েছে। এটা এজন্য হবে যে, তারা বলেছিল, 'বিক্রিও তো সুদেরই মত হয়ে থাকে।' (বাকারা, ২: ২৭৫)

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
رَأَيْتُ لَيْلَةَ أُسْرِيَ بِي رَجُلًا يَسْبَحُ فِي نَهَرٍ وَيُلْقَمُ الْحِجَارَةَ، فَسَأَلْتُ مَا هَذَا؟ فَقِيلَ لِي: آكِلُ الربا " (مسند أحمد) ٢٩٣/٣٣
অর্থ: 'মেরাজের রাতে এক লোককে দেখি রক্তের নদীতে হাবু-ডুবু খাচ্ছে। তাকে পাথর গলাধঃকরণ করানো হচ্ছে। জিজ্ঞেস করলাম: 'কে এই লোক?' বলা হলো: 'সুদখোর।' (মুসনাদে আহমাদ, ৩৩/২৯৩)

টিকাঃ
**. আল্লাহ্ তা'আলার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে, সওয়াবের প্রত্যাশায়, কোনো প্রকার শর্তরোপ না করে যে ঋণ প্রদান করা হয়, তাকে 'করজে হাসানা' বা উত্তম ঋণ বলা হয়।

📘 আল হাল্লু জীবন সমস্যার সমাধান > 📄 গুনাহ

📄 গুনাহ


গুনাহ হলো, শরীয়তের দৃষ্টিতে নিষিদ্ধ এবং আল্লাহ তা'আলা ও রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর আদেশ-নিষেধবহির্ভূত কোনো কাজ করা। গুনাহর দু'টি স্তর : সগীরা ও কবীরা।

কবীরা গুনাহ: যে সমস্ত পাপাচারের কারণে ইহকালেই শরীয়ত-নির্ধারিত শাস্তি 'হদ্দ' ওয়াজিব হয়। যেমন: চুরি, ডাকাতি, হত্যা, যিনা-ব্যভিচার। এছাড়াও যে সমস্ত অন্যায়-অনাচারের ব্যাপারে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ﷺ-এর পক্ষ থেকে কঠোর সতর্কবার্তা উচ্চারিত হয়েছে এবং কুরআন-সুন্নাহয় আল্লাহ তা'আলার ক্রোধ, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ﷺ-এর অভিশাপ এবং জাহান্নামের কঠিন আযাবের ভীতি প্রদর্শন করা হয়েছে।

সগীরা গুনাহ: কবীরা গুনাহ ছাড়া বাকি সমস্তই সগীরা গুনাহ। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন:
الَّذِينَ يَجْتَنِبُونَ كَبَائِرَ الْإِثْمِ وَالْفَوَاحِشَ إِلَّا اللَّمَمَ إِنَّ رَبَّكَ وَاسِعُ الْمَغْفِرَةِ [النجم: ٣٢]
অর্থ: 'যারা ছোট খাট দোষ-ত্রুটি ছাড়া বড় বড় পাপ ও অশ্লীল কার্যকলাপ থেকে বিরত থাকে, নিশ্চয় তোমার রব ক্ষমার ব্যাপারে উদার।' (সূরা নাজম, ৫৩: ৩২)

গুনাহ ও নাফরমানির কারণে পরকালীন শাস্তি অবশ্যম্ভাবী। তাতে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই। তবে আল্লাহ তা'আলা নিজ দয়াগুণে যাকে ক্ষমা করেন, তার বিষয় ভিন্ন। এছাড়াও দৈহিক, মানসিক ও ইহজাগতিক প্রেক্ষাপটে গুনাহ ও পাপাচারের নেতিবাচক ও ক্ষতিকর প্রভাব বর্তমান। বিষণ্ণতা, অস্থিরতা, দুঃখ-দুর্দশা, রিযিকের সংকীর্ণতা, আর্থিক অভাব-অনাটন থেকে শুরু করে দুর্ভিক্ষ, খরা, অনাবৃষ্টি যাবতীয় সংকট ও দুর্যোগ-দুর্বিপাকের নেপথ্যে মানুষের গুনাহ-নাফরমানি, পাপাচার-অনাচারই হলো অন্যতম কারণ। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেন:

ظَهَرَ الْفَسَادُ فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ بِمَا كَسَبَتْ أَيْدِي النَّاسِ لِيُذِيقَهُمْ بَعْضَ الَّذِي عَمِلُوا لَعَلَّهُمْ يَرْجِعُونَ﴾ [الروم: ٤١]

অর্থ: 'মানুষের কৃতকর্মের দরুন স্থলে ও সমুদ্রে ফাসাদ প্রকাশ পায়। যার ফলে আল্লাহ তাদের কতিপয় কৃতকর্মের স্বাদ তাদেরকে আস্বাদন করান, যাতে তারা ফিরে আসে।' (রূম, ৩০: ৪১)

ইহকালে ও পরকালে শান্তি ও সৌভাগ্য অর্জনের জন্য গুনাহ ও নাফরমানিমুক্ত জীবনযাপনের বিকল্প নেই। কিন্তু উপায় কী? পাপাচারমুক্ত জীবনযাপনের সরল পথ কী?

সমাধান:
১. প্রথমেই আসল সমস্যা ও মূল ব্যাধিটা শনাক্ত করতে হবে। আর তা হলো, অন্যায় স্বীকার করা। কৃত পাপকর্মকে পাপাচার বলে মেনে নেওয়া। এক্ষেত্রে অহমিকা ও দাম্ভিকতা প্রদর্শন করা, কৃত অন্যায়ের প্রতি ভ্রূক্ষেপ না করা কিংবা অন্যায়কে ন্যায় বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা সমীচীন নয়।

২. গুনাহ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কোনো নেক আমল করে খালেস দিলে আল্লাহ তা'আলার নিকট তাওবা করতে হবে। এটাই পবিত্র কুরআনের দিকনির্দেশনা:
وَالَّذِينَ إِذَا فَعَلُوا فَاحِشَةً أَوْ ظَلَمُوا أَنْفُسَهُمْ ذَكَرُوا اللَّهَ فَاسْتَغْفَرُوا لِذُنُوبِهِمْ وَمَنْ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلَّا اللَّهُ وَلَمْ يُصِرُّوا عَلَى مَا فَعَلُوا وَهُمْ يَعْلَمُونَ * أُولَئِكَ جَزَاؤُهُمْ مَّغْفِرَةٌ مِّنْ رَبِّهِمْ وَجَنَّاتٌ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهُرُ خُلِدِينَ فِيهَا وَنِعْمَ أَجْرُ الْعَمِلِينَ﴾ [آل عمران : ١٣٥، ١٣٦]
অর্থ: 'আর যারা কোন অশ্লীল কাজ করলে অথবা নিজদের প্রতি যুলম করলে আল্লাহকে স্মরণ করে, অতঃপর তাদের গুনাহের জন্য ক্ষমা চায়। আর আল্লাহ ছাড়া কে গুনাহ ক্ষমা করবে? আর তারা যা করেছে, জেনে শুনে তা তারা বার বার করে না। এরাই তারা, যাদের প্রতিদান তাদের রবের পক্ষ থেকে মাগফিরাত ও জান্নাতসমূহ, যার তলদেশে প্রবাহিত রয়েছে নহরসমূহ। সেখানে তারা স্থায়ী হবে। আর আমলকারীদের প্রতিদান কতই না উত্তম!' (আলে-ইমরান, ৩: ১৩৫-১৩৬)

৩. তাওবা কবুল হওয়ার জন্য কিছু শর্ত রয়েছে। এ শর্তগুলো হলো, কৃত নাফরমানির কারণে অনুতপ্ত হওয়া, ভবিষ্যতে এমন অন্যায় করব না বলে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হওয়া এবং যাবতীয় গুনাহ ও নাফরমানি থেকে বেঁচে থেকে আল্লাহর আনুগত্য ও ইবাদতে মশগুল থাকা।

৪. সবসময় কোনো নেক আমল ও উপকারী কাজে ব্যস্ত থাকুন। কর্মমুখর জীবনযাপন করুন। কেননা অবসর হলো শয়তানের সুবর্ণ-সুযোগ। অবসরের সময়গুলোতে শয়তান মানুষের মনে নানা ওয়াসওয়াসা ও কুমন্ত্রণা ঢুকিয়ে দেয়। তাকে নানা অন্যায়-অনাচারে প্ররোচিত করে।

৫. দৈহিক পবিত্রতা ও আত্মিক পরিশুদ্ধির জন্য বেশি বেশি দু'আ করুন। কেননা দু'আ হলো মুমিনের ঢাল ও অস্ত্র। আল্লাহ তা'আলা পবিত্র কুরআনে দু'আর ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করেছেন। বলেছেন: وَإِذَا سَأَلَكَ عِبَادِي عَنِّي فَإِنِّي قَرِيبٌ أُجِيبُ دَعْوَةَ الدَّاعِ إِذَا دَعَانِ﴾ [البقرة : ١٨٦] অর্থ: 'আর যখন আমার বান্দাগণ তোমাকে আমার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবে, আমি তো নিশ্চয় নিকটবর্তী। আমি আহবানকারীর ডাকে সাড়া দেই, যখন সে আমাকে ডাকে।' (বাকারা, ২: ১৮৬)

৬. বেশি বেশি তাওবা করুন। সর্বদা দু'আ ও ইস্তিগফারে মশগুল থাকুন। রাসূলুল্লাহ ﷺ ছিলেন গুনাহমুক্ত মাসুম। জীবদ্দশায়ই তাঁর আগে-পরের সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছে। তারপরও প্রতিদিন তিনি সত্তরবার ইস্তিগফার করতেন। অন্য একটি হাদীসের ভাষ্যমতে একশতোবার ইস্তিগফার করতেন।

৭. পরম দয়ালু, চিরদয়াময় আল্লাহ তা'আলার দয়া ও রহমতের কথা স্মরণ করুন। তিনি সর্বদা সদাচারীদের পাশেই রয়েছেন। তাঁর অপার রহমতই বান্দার শেষ ভরসা। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেছেন:
قُلْ يُعِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَىٰ أَنْفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِنْ رَّوحِ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ)
অর্থ: 'বলে দাও, হে আমার বান্দাগণ! যারা নিজ সত্তার ওপর সীমালঙ্ঘন করেছে, আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সমস্ত পাপ ক্ষমা করেন। নিশ্চয়ই তিনি অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।' (যুমার, ৩৯: ৫৩)

৮. শয়তানের ওয়াসাওয়াসা ও প্ররোচনা থেকে মুক্ত থাকার লক্ষ্যে এবং গুনাহ ও নাফরমানি ছেড়ে আল্লাহর আনুগত্যে থাকার জন্য দান-সদকা করুন। কত নাফরমান অবাধ্য বান্দাকে আল্লাহ তা'আলা হেদায়াত দান করেছেন শুধু এ কারণে যে, সে গরিব-মিসকিনদের দান করেছে, ক্ষুধার্ত-নিরন্নকে আহার দান করেছে। বিপদগ্রস্তকে সাহায্য করেছে।

৯. অন্যায় ও নাফরমানির মন্দ পরিণতি সম্পর্কে একবার ভাবুন। এর কারণে কী কঠিন বিষণ্ণতা ও মানসিক অস্থিরতার শিকার হতে হয়! এছাড়াও কবর ও পরকালের ভয়ংকর শাস্তি অবশ্যম্ভাবী। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলার সতর্কবাণী স্মরণ করুন:
وَمَنْ جَاءَ بِالسَّيِّئَةِ فَكُبَّتْ وُجُوهُهُمْ فِي النَّارِ هَلْ تُجْزَوْنَ إِلَّا مَا كُنْتُمْ تَعْمَلُونَ﴾ [النمل: ٩٠]
অর্থ: 'আর যে-কেউ মন্দকর্ম নিয়ে আসবে, তাদেরকে উল্টো-মুখো করে আগুনে নিক্ষেপ করা হবে। তোমাদেরকে তো কেবল তোমাদের কৃতকর্মের শাস্তি দেওয়া হবে।' (নামল, ২৭: ৯০)

১০. কুরআন-সুন্নাহয় বর্ণিত সকাল-সন্ধ্যার দু'আগুলো নিয়মিত পাঠ করুন। শরীয়তের পরিভাষায় এ দু'আগুলোকে أَدْعِيَةٌ مَأْتُوْرَةٌ (আদইয়ায়ে মা'সূরা) বলা হয়। শয়তানের ওয়াসওয়াসা ও নফসের কুমন্ত্রণার বিরুদ্ধে এ দু'আগুলো হলো আপনার রক্ষাকবচ।

১১. 'আদইয়ায়ে মা'সূরা'র মধ্যে হতে এ দু'আটি বারবার পাঠ করুন: ﴿لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ سُبْحَنَكَ إِنِّي كُنْتُ مِنَ الظَّلِمِينَ ﴾ [الأنبياء: ৮৭] অর্থ: '(হে আল্লাহ) আপনি ছাড়া নেই কোনো ইলাহ। আপনি চিরমহান। আমি তো ভুল করে ফেলেছি।' (আম্বিয়া, ২১: ৮৭) যুগে যুগে নবী-রাসূলগণ এ দু'আটি পাঠ করতেন খালেস দিলে।

১২. তাওবা করার উসিলায় আল্লাহ তা'আলা আপনার গুনাহগুলোকে সাওয়াবে রূপান্তরিত করে দিবেন। আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে বান্দার জন্য এ প্রতিদানের প্রতিশ্রুতির ব্যাপারে দৃঢ় বিশ্বাসী হোন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন : ﴿إِلَّا مَنْ تَابَ وَآمَنَ وَعَمِلَ عَمَلًا صَالِحًا فَأُولَئِك يُبَدِّلُ اللَّهُ سَيِّاتِهِمْ حَسَنَاتٍ وَكَانَ اللهُ غَفُورًا رَّحِيمًا﴾ [الفرقان: ৭০] অর্থ: 'তবে যে তাওবা করে, ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে, পরিণামে আল্লাহ তাদের পাপগুলোকে পূণ্য দ্বারা পরিবর্তন করে দিবেন। আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।' (ফুরকান, ২৫: ৭০)

১৩. একটিবার ভেবে দেখুন তো, গুনাহ-নাফরমানি ও অন্যায়-অনাচারে লিপ্ত অবস্থায় যদি আপনার মৃত্যু হয়, তাহলে কোন মুখে আপন রবের সামনে দাঁড়াবেন?

১৪. নজর হেফাজত করুন এবং সর্বদা দৃষ্টি অবনত রাখুন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলার নির্দেশ: ﴿قُلْ لِلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوا فُرُوجَهُمْ ذَلِكَ أَزْلَى لَهُمْ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا يَصْنَعُونَ ﴾ [النور: ৩০] অর্থ: 'মুমিন পুরুষদের বল, তারা যেন তাদের দৃষ্টি অবনত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে। এটাই তাদের জন্য উৎকৃষ্ট পন্থা। তারা যা-কিছু করে আল্লাহ সে সম্পর্কে পরিপূর্ণ অবগত।' (নূর, ২৪: ৩০)

১৫. আত্মশুদ্ধিমূলক ওয়াজ-নসিহতসংবলিত বই পুস্তক পাঠ করুন। নেককার ও আল্লাহর নৈকট্যপ্রাপ্ত বান্দাদের ওয়াজ-নসিহত শুনুন। তা আপনাকে গুনাহ থেকে বিরত থাকতে অনুপ্রাণিত করবে এবং আল্লাহ তা'আলার আনুগত্য ও রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর অনুসরণের পথের পাথেয় হবে।

১৬. অসৎ সঙ্গ থেকে বেঁচে থাকুন। যারা আপনাকে গুনাহ ও নাফরমানির দিকে নিয়ে যায়, যাদের সঙ্গদোষ আপনাকে পাপাচারের পথে ধাবিত করে, তাদের এড়িয়ে চলুন। সৎ সঙ্গ গ্রহণ করুন। সদাচারী নেক আমলকারী সাথি-সঙ্গী, আল্লাহভীতি ও তাকওয়া অবলম্বনের ক্ষেত্রে তারা হবে আপনার একান্ত সহযোগী। কুরআন-সুন্নাহর অনুসরণের পথে একনিষ্ঠ সফরসঙ্গী।

১৭. গুনাহ ও নাফরমানির যতো উপলক্ষ আছে, তা থেকে দূরে থাকুন। যে সমস্ত বিষয় ও কার্যকলাপ ব্যক্তিকে অন্যায়ের পথে ঠেলে দেয়, তা পরিহার করুন।

১৮. গুনাহ ও পাপের ক্ষতিপূরণস্বরূপ বেশি বেশি নেক আমল করুন। কেননা ইবাদত ও সদাচার বান্দার পাপরাশি মোচন করে। রাসূল ﷺ বলেছেন: وَأَتْبِعِ السَّيِّئَةَ الحَسَنَةَ تَمْحُهَا. (سنন الترمذي) ٤ / ٣٥٥ অর্থ: 'গুনাহ করার পর একটি নেক আমল করো। নেক আমলটি তোমার পাপমোচন করে দিবে।' (তিরমিজী, ৪/৩৫৫) পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: إِنَّ الْحَسَنَتِ يُذْهِبْنَ السَّيِّاتِ﴾ [هود: ١١٤] অর্থ: 'নিশ্চয়ই পুণ্যরাজি পাপরাশিকে মিটিয়ে দেয়।' (হুদ, ১১: ১১৪)

১৯. সময়মতো জামাতের সাথে নামায আদায়ে যত্নবান হোন। নামাযের ফরয ওয়াজিব হতে শুরু করে প্রতিটি সুন্নাত ও মুস্তাহাব যথাযথভাবে পালন করুন। যাবতীয় অন্যায় ও নাফরমানির বিরুদ্ধে নামাযই হলো শ্রেষ্ঠ প্রতিবন্ধক। আমীরুল মু'মিনীন ওমর (রা.) বলেছেন: ‘যে ব্যক্তি নামাযে অবহেলা করবে, জীবনের অন্য সকল ক্ষেত্রেও সে ভুল-ত্রুটি করবে।’ প্রতিটি কাজে পবিত্র কুরআনে নামাযের প্রভাব ও কার্যকারিতা সম্পর্কে বলা হয়েছে: إِنَّ الصَّلَوةَ تَنْهَى عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنْكَرِ﴾ [العنكبوت: ٤٥] অর্থ: ‘নিশ্চয়ই নামায অশ্লীল ও অন্যায় কাজ থেকে বিরত রাখে।’ (আনকাবুত, ২৯: ৪৫)

২০. মাতা-পিতার সদাচারী হোন। এর বদৌলতে আল্লাহ তা'আলা গুনাহ মাফ করেন, বিপদ-আপদ দূর করেন এবং যাবতীয় অকল্যাণ ও অনিষ্ট থেকে রক্ষা করেন।

২১. সবসময় মনে রাখুন, আল্লাহ তা'আলা আপনাকে দেখছেন। ঘরে-বাইরে, রাতের অন্ধকারে এবং দিনের আলোতে, গোপনে-প্রকাশ্যে সর্বাবস্থায় তিনি আপনাকে দেখছেন। আপনার কথা-কাজ এমনকি মনের গহীনের সুপ্ত ইচ্ছাটিও তাঁর কাছে গোপন নয়, তাঁর ইলমের বাইরে নয়। জীবনের যাবতীয় ক্রিয়া-কলাপ আপনার আমলনামায় লিপিবদ্ধ হচ্ছে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: يَسْتَخْفُونَ مِنَ النَّاسِ وَلَا يَسْتَخْفُونَ مِنَ اللَّهِ وَهُوَ مَعَهُمْ إِذْ يُبَيِّتُونَ مَا لَا يَرْضَى مِنَ الْقَوْلِ وَكَانَ اللَّهُ بِمَا يَعْمَلُونَ مُحِيطَا অর্থ: ‘তারা মানুষের কাছ থেকে লুকাতে চায়, আর আল্লাহ তা'আলার কাছ থেকে লুকাতে চায় না। অথচ তিনি তাদের সাথেই থাকেন যখন তারা রাতে এমন কথার পরিকল্পনা করে যা তিনি পছন্দ করেন না। আর আল্লাহ তারা যা করে তা পরিবেষ্টন করে আছেন।’ (নিসা, ৪: ১০৮)

পরিশিষ্ট:
ইবনুল কাইয়্যিম জাওযী (রহ.) (৬৯১-৭৫১ হি.) বলেছেন: 'নিশ্চয় আপনার এমন কিছু গুনাহ আছে, যা শুধু আপনি জানেন, এবং আপনার রব জানেন। আপনি খুব করে চান, আল্লাহ তা'আলা যদি আপনার সে গুনাহগুলো ক্ষমা করে দিতেন! তাহলে আপনি নিজের সাথে হওয়া অন্যের অপরাধ ক্ষমা করুন। আপনার ক্ষমাগুণের প্রতিদানে আল্লাহ তা'আলাও আপনাকে ক্ষমা করে দিবেন।'

ডেনমার্কের বিখ্যাত দার্শনিক ও ধর্মতত্ত্ববিদ সোরেন কিয়ের্কেগার্ড (১৮১৩-১৮৫৫ খ্রিষ্টাব্দ) বলেছেন: 'ন্যায় ও কল্যাণ-বিচ্যুতিই হলো অন্যায়। হতাশা ও নিরাশা এ ভুলের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দেয়।'

উনিশ শতকের ইংরেজ জীববিজ্ঞানী ও বিবর্তনবাদের জনক চার্লস ডারউইন (১৮০৯-১৮৮২ খ্রিষ্টাব্দ) বলেছেন: 'যে ব্যক্তি নীতি-নৈতিকতা ও চারিত্রিক-শালীনতায় প্রতিশ্রুতিশীল, সে তার অতীতের কার্যকলাপ সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে নিরীক্ষণ করে। গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে। তার মধ্যে যা কিছু সংগত ও যথার্থ, তা অটুট রাখে। আর যা কিছু অসংগত অসমীচীন, তা পরিহার করে।'

📘 আল হাল্লু জীবন সমস্যার সমাধান > 📄 বয়ঃসন্ধিকাল

📄 বয়ঃসন্ধিকাল


বয়ঃসন্ধিকাল মানবজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। জীবনের এ পর্যায়টি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমন সংবেদনশীল। বয়ঃসন্ধিকাল ১৪ কি ১৫ বছর বয়স হতে শুরু হয়ে ২১ থেকে ২২ বছর বয়স পর্যন্ত স্থায়ী হয়ে থাকে। এ সময়ে ছেলে-মেয়েরা দৈহিক, মানসিক ও সামাজিকভাবে একটি নতুন জগতে প্রবেশ করে। মন-মানসিকতা ও চিন্তা-চেতনার জগতে তারা নিত্যনতুন বিচিত্র অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়।

এ সময়টাতে ছেলে-মেয়েদের স্বভাব-চরিত্রে উচ্ছলতা, দুরন্তপনা ও অস্থিরচিত্ততা প্রবল হয়ে ওঠে। হেঁয়ালিপনা, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও বেপরোয়া মনোভাব প্রকট হয়ে দেখা দেয়। কারো অভিভাবকত্ব ও শাসন ভালো লাগে না। সর্বত্র কর্তৃত্ব ফলানোর মানসিকতা এবং যেকোনো ক্ষমতা ও শক্তির বিরুদ্ধে বিদ্রোহপ্রবণতা কাজ করে। মোটকথা, সবসময় একটা দুর্বিনীত মনোভাব তাদের মধ্যে সক্রিয় হয়ে থাকে। ফলে মা-বাবা ও অন্যান্য অভিভাবকদের সাথে বনিবনা হতে চায় না। সময়-অসময়ে খিটমিট লেগে থাকে। অভিভাবকগণ তাদের আচার-আচরণে উৎকণ্ঠা বোধ করেন।

বয়ঃসন্ধি হলো মানুষের দৈহিক, মানসিক ও চিন্তানৈতিক পরিবর্তনের সন্ধিস্থল। এ সময়টাতে ছেলে-মেয়েরা হয়ে ওঠে আবেগপ্রবণ। উদ্দাম চঞ্চল। তাদের আবেগ-উদ্যমতা যদি সঠিক পথে পরিচালিত না হয়, এর যথার্থ পরিচর্যা যদি না হয়, দৈহিক ক্ষয়ক্ষতি হতে শুরু করে মানসিক ও আদর্শিক বিচ্যুতি ও অবক্ষয় সৃষ্টি হওয়ার সমূহ আশঙ্কা রয়েছে।

উন্নত জীবন গড়ার লক্ষ্যে বয়ঃসন্ধিকালের নেতিবাচক প্রভাব ও ক্ষতিকর দিকগুলো থেকে বেঁচে থেকে এর সযত্ন পরিচর্যা অত্যাবশ্যক। এ লক্ষ্যে আমাদের করণীয় কী? বয়ঃসন্ধিকালের ক্ষতি থেকে বাঁচার উপায় কী?

সমাধান:
১. সন্তানদের সাথে অভিভাবকদের বন্ধুসুলভ বোঝাপড়া থাকতে হবে। একজন মহান পিতা হওয়ার পাশাপাশি নিজেকে সন্তানের হিতাকাঙ্ক্ষী বন্ধুর রূপে দাঁড় করাতে হবে। তাদের সাথে একান্ত আলোচনা-পর্যালোচনায় তাদের মানসিক মানচিত্র পাঠ করতে হবে। তাদের চিন্তা-ভাবনা ও ঝোঁক-প্রবণতা অনুধাবন করতে হবে।

২. একজন অভিভাবক তার পরিবারের শুধু অর্থের জোগানদাতাই নন; সন্তানের আদর্শিক শিক্ষা ও নৈতিক দীক্ষার ব্যাপারেও তাকে সজাগ-সচেতন হতে হবে। সে লক্ষ্যে সন্তানের ওপর প্রজ্ঞাপূর্ণ তত্ত্বাবধান বজায় রাখা কর্তব্য। বয়ঃসন্ধির আবেগ-উদ্দীপনায় সন্তান যেন কোনো অন্যায়ে জড়িয়ে না পড়ে, কোনো পাপচারে লিপ্ত না হয়ে পড়ে-সে দিকে বিশেষ নজর রাখতে হবে।

৩. সন্তানদের সাথে অভিভাবকদের পর্যাপ্ত সময় কাটাতে হবে। সন্তানের জন্য মা-বাবার স্নেহ ও হিতাকাঙ্ক্ষাপূর্ণ সংস্পর্শের বিকল্প হতে পারে না। সৎ সঙ্গ ব্যক্তিকে ন্যায়ের পথে পরিচালিত করে। আর অসৎ সঙ্গ তাকে অন্যায়-অনাচারের পথে ধাবিত করে।

৪. সন্তানদের দ্বীনি শিক্ষা-দীক্ষা ও ধর্মীয় আদর্শে গড়ে তুলতে হবে। তাদের মনে আল্লাহ তা'আলা ও রাসূল ﷺ-এর প্রতি ভালোবাসা জাগরূক করতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে নামায, রোযা, যিকির, তিলাওয়াত ও অন্যান্য ইবাদতে অনুপ্রাণিত করা আবশ্যক।

৫. অবসরের সময়গুলোতে সন্তানদের কোনো উপকারী ও কল্যাণকর কাজে ব্যস্ত রাখতে হবে। কেননা অবসর হলো শয়তানের সুবর্ণ-সুযোগ। এ সুযোগে সে তার পাওনা আদায় করে নেয়।

৬. সন্তানদের ক্রীড়াচর্চায় উৎসাহিত করতে হবে। শরীরচর্চা ও ক্রীড়াচর্চামূলক উদ্যোগ-আয়োজনে তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে, যেন ভবিষ্যত বিনির্মাণের জন্য তারা নিজেদের সুস্থ-সবল, দৃঢ় প্রত্যয়ী ও উঁচু মনোবলের অধিকারীরূপে গড়ে তুলতে পারে। আল্লাহ তা'আলার নিকট দুর্বল মু'মিনের চেয়ে শক্তিশালী মু'মিন অধিক প্রিয়।

৭. বয়ঃসন্ধিকালে কোনো অপরাধের জের ধরে সন্তানদের সাথে বাকবিতণ্ডায় জড়ানো, তাকে শারীরিক শাস্তি দেওয়া কিংবা জনসম্মুখে শাসানো-এর কোনোটাই সমীচীন নয়। কারণ, অনেক ক্ষেত্রেই অভিভাবকদের এমন আচরণ সন্তানের জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এ ক্ষেত্রে প্রজ্ঞাপূর্ণ শাসন ও উপদেশমূলক অনুশাসন অধিক বাঞ্ছনীয়। এর প্রভাব ও সুফল সুদূরপ্রসারী।

৮. বয়ঃসন্ধিকালে ছেলে-মেয়েদের বোঝাতে হবে, এখন সে আর আগের মতো ছোট্ট শিশু-বালক নেই। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে তার ওপর ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক দায়-দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে। এ দায়িত্ব-কর্তব্যগুলো নিষ্ঠার সাথে পালন করা কর্তব্য। তাকে দৃঢ় আত্মবিশ্বাস, দায়বদ্ধতা ও প্রতিশ্রুতিশীলতার ছাঁচে গড়ে তুলতে হবে।

৯. প্রচলিত গদবাঁধা প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম-নীতির বাইরেও সন্তানদের কিছু বৈধ শখ, ইচ্ছা ও আবেগ-অনুভূতি থাকতে পারে। সাধ্যমতো তাদের সে আবেগ-অনুভূতির মূল্যায়ন করতে হবে।

১০. প্রাতিষ্ঠানিক গণ্ডির বাইরে অভিভাবকের তত্ত্বাবধানে সন্তানদের সুযোগ করে দিতে হবে-তারা যেন নিজ চেষ্টা-প্রচেষ্টায় আগামীর পথ সুগম করতে পারে। এক্ষেত্রে প্রাথমিক পর্যায়ে কিছু ভুলচুক হলেও পরবর্তী সময়ে সে তা কাটিয়ে ওঠার সুযোগ পাবে। তা ছাড়া ত্রুটি-বিচ্যুতি মানুষের অভিজ্ঞতার ভাণ্ডারকে ঋদ্ধ-সমৃদ্ধ করে তোলে।

১১. বয়ঃসন্ধিকালে ছেলে-মেয়েদের দীর্ঘ সময়ের জন্য একাকী অবস্থান করতে দেওয়া নিরাপদ নয়। অভিভাবকের তত্ত্বাবধানের বাইরে অনেক অসৎ সঙ্গে জড়িয়ে তারা ভ্রষ্ট চিন্তা-চেতনা ও বিকৃত মানসিকতার শিকার হতে পারে। ধাবিত হতে পারে অন্যায় অপকর্ম ও অশালীনতার পথে।

১২. লেখাপড়া ও অন্যান্য ক্ষেত্রে খুঁজে খুঁজে সন্তানদের ভুল ধরার মানসিকতা পরিহার করতে হবে। কেননা অভিভাবকদের এমন আচরণ সন্তানদের মনে নেতিবাচক মানসিকতা জন্ম দেয়। একপর্যায়ে তার মনোবল ও আত্মবিশ্বাসে ফাটল সৃষ্টি করে। তারা ভালো কিছু করে সফল হওয়ার আগ্রহ-উদ্দীপনা হারিয়ে ফেলে।

১৩. লেখাপড়া, খেলাধুলা, সামাজিক কাজকর্ম ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে সন্তানদের অংশগ্রহণ ও ভূমিকার প্রশংসা করতে হবে। এতে তার আগ্রহ-উদ্দীপনা বৃদ্ধি পাবে। মনোবল ও আত্মবিশ্বাস পরিপুষ্ট হবে।

১৪. দশ বছর বয়সের পর সন্তানের বিছানা পৃথক করা কর্তব্য। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
وَفَرَّقُوا بَيْنَهُمْ فِي الْمَضَاجِعِ. (سنن أبي داود) ١٣٣/١
অর্থ: 'তাদের (সন্তানদের) বিছানা পৃথক-পৃথক করে দাও।' (আবূ দাউদ, ১/১৩৩) উত্তম হলো, প্রত্যেক সন্তান নিজ নিজ বিছানায় ঘুমানো।

১৫. একটি সুন্দর উপযুক্ত সময়ে পারিবারিক আলোচনা-পর্যালোচনায় বসতে হবে। সেখানে মা-বাবা, ছেলে-মেয়ে ও পরিবারের সকল সদস্যকে অংশগ্রহণ করবে। প্রত্যেকে নিজের চিন্তা-ভাবনা ও আবেগ-অনুভূতির কথা ব্যক্ত করবে। পারিবারিক সমস্যা ও সংকট সম্পর্কে আলোচনা-পর্যালোচনা করবে। এভাবে পরিবারের মাঝে পরস্পর বোঝাপড়া সৃষ্টি হবে এবং একটি ইউনিট হিসেবে পারস্পরিক দায়িত্ববোধ আরও গভীর ও প্রতিশ্রুতিশীল হবে।

১৬. সময় সময়ে সন্তানদের তিরস্কার ও ভর্ৎসনার মানসিকতা পরিহার করে তাদের কথা বলার সুযোগ দিতে হবে। নির্ভয়ে নিঃসংকোচে নিজস্ব চিন্তা-ভাবনা ও অনুভূতি ব্যক্ত করার সুযোগ দিতে হবে।

১৭. বাবাকে অবশ্যই পুত্রসন্তানদের সাথে ঘনিষ্ঠ হতে হবে। তাদের সঙ্গে পর্যাপ্ত সময় কাটাতে হবে। কথাবার্তা ও আচার-আচরণে সন্তানের সাথে এতটা সহজ-সাবলীল ও আন্তরিক হবেন, যেন তিনি সন্তানের সমবয়সী ঘনিষ্ঠ বন্ধু। সন্তানকে সাথে নিয়ে আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে বেড়াতে যাওয়া, সঙ্গে করে মসজিদে নিয়ে যাওয়া এবং তার মধ্যে ধর্মীয় আবেগ-অনুভূতি ও মানসিক মূল্যবোধ জাগ্রত করা-এ সমস্ত ক্ষেত্রে পিতাকে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করতে হবে।

১৮. প্রত্যেক মা'কে তার মেয়ের সাথে আন্তরিক ও ঘনিষ্ঠ হতে হবে। মেয়ের বয়ঃসন্ধিকালে তাকে বোঝাতে হবে, এখন সে আর আগের মতো ছোট্ট খুকিটি নেই। জীবনের অনিবার্য ধারায় সে এখন নতুন ধাপে পদার্পণ করেছে। বয়সের একটা স্বীকৃত পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে। এ পর্যায়ে তাকে ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক দায়-দায়িত্ব বুঝিয়ে দিতে হবে। জীবনের প্রতিটি অঙ্গনে তাকে সবচেয়ে দায়িত্ববানরূপে গড়ে তুলতে হবে।

১৯. বয়ঃসন্ধিকালে ছেলে-মেয়েদের শরীয়তের বিধিবিধান সম্পর্কে অবহিত করতে হবে। পাক-পবিএতা, নামায, রোযা, সহীহ-আকিদা ও ধর্মবিশ্বাস ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় বিষয় সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। বয়ঃসন্ধিকালের আবেগ-উদ্দীপনার সূচনালগ্নে ছেলে-মেয়েদের যদি ধর্মীয় ভাবধারা ও অনুশাসনের ভিত্তিতে গড়ে তোলা না হয়, তাহলে আজীবন এই ভুলের মাশুল দিতে হবে।

পরিশিষ্ট:
* কিয়ামত দিবস, যে দিন আল্লাহ তা'আলার আরশের ছায়া ব্যতীত আর কোনো ছায়া থাকবে না, সেদিন আল্লাহ তা'আলা সাত ব্যক্তিকে আরশের ছায়া দান করবেন। হাদীসের ভাষ্যমতে তাদের একজন হলো:
وَشَابٌ نَشَأَ فِي عِبَادَةِ الله". (صحيح البخاري ١١١/٢)
অর্থ: 'এমন যুবক, যার জীবন গড়ে উঠেছে আল্লাহর ইবাদতের মধ্যে।' (বুখারী, ২/১১)

* বিখ্যাত আরব কবি আবুল আতাহিয়া (১৩০-২১১ হি.) বলেছেন:
بكيْتُ عَلَى الشَّبَابِ بِدَمع عيني فَلَمْ يُعْنِ البُكَاءُ وَلَا التَحِيبُ
فَيا لَيْتَ الشَّبَابَ يَعُودُ يَوماً فَأُخبِرُهُ بِمَا صَنَعَ المَشِيبُ
অর্থ: 'বিগত যৌবনের কথা স্মরণ করে এখন আমি কেঁদে মরি। অনুতাপ-অনুশোচনার জ্বালায় পুড়ি। কিন্তু এ অনুশোচনা ও ক্রন্দন কি আমার কোনো কাজে এসেছে? হায়! একদিন যদি যৌবন ফিরে পেতাম, তাকে বার্ধক্যের করুণ পরিণতির কথা বলে দুঃখ ঘুচাতাম।'

* তাফসিরশাস্ত্রের ইমাম আবু জাফর তাবারী (রহ.) (২২৪-৩১০ হি.) যখন বয়সে আশির কোটা পেরিয়েছেন, তখন এক সফরে তিনি জাহাজ নোঙর করার পর লাফিয়ে নামলেন। তা দেখে তো তাঁর সফরসঙ্গী ও শাগরেদরা বিস্ময় কৌতূহলে থ হয়ে গেল। কয়েকজন বিস্ময় প্রকাশ করে মুখ ফুটে বলেই ফেলল: 'অশতিপর হয়েও জাহাজের উঁচু পাটাতন থেকে কী করে লাফিয়ে নামা সম্ভব?'
ইমাম তাবারী (রহ.) বললেন: 'যৌবনে দেহের সবল সুস্থ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো আল্লাহর নাফরমানি থেকে মুক্ত রেখেছি। তাই আল্লাহ তা'আলা আমাকে বার্ধক্যের জরাগ্রস্ততা থেকে মুক্ত রেখেছেন।'

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00