📘 আল হাল্লু জীবন সমস্যার সমাধান > 📄 মতভেদ

📄 মতভেদ


মতভেদ হলো একটি বিষয়ে দু'জন কিংবা ততধিক ব্যক্তি সহমত হতে না পারা, মতবিরোধে লিপ্ত হওয়া। মতভেদের অন্যতম কারণগুলো হলো ব্যক্তিগত বিরোধ, লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের ভিন্নতা, চিন্তা-চেতনা আকিদা ও বিশ্বাসের পার্থক্য ইত্যাদি।

মতবিরোধ ও মতভিন্নতার মাঝে একটা পার্থক্য বর্তমান। মতবিরোধ হলো, কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনের পথ-পন্থা ও মূল লক্ষ্য-উদ্দেশ্য উভয় ক্ষেত্রে মতভেদ দেখা দেওয়া। আর মতভিন্নতা হলো, লক্ষ্য-উদ্দেশ্য এক হওয়া সত্ত্বেও পথ ও পন্থা ভিন্ন হওয়া।

আরেকটি দৃষ্টিকোণ থেকে মতভেদ দু'ধরনের: একটির উৎস হলো চিন্তানৈতিক বৈচিত্র্য ও বোধ-উপলব্ধির ভিন্নতা। এটি প্রশংসনীয় ও ফলপ্রসূ। অপরটির নেপথ্য কারণ হলো ব্যক্তিস্বার্থ, দলীয় স্বার্থ, নিজস্ব মতামত বাস্তবায়নের মানসিকতা, জাতীয়বাদ ও সাম্প্রদায়িকতা ইত্যাদি। এটা নিন্দনীয় ও ক্ষতিকর।

এ ধরনের মতবিরোধ ও মনোমালিন্য হতে শুরু করে পরস্পর হিংসা-বিদ্বেষ ও গালমন্দ পর্যায়ক্রমে ব্যক্তিগত সম্পর্কচ্ছেদ, পারিবারিক বিচ্ছেদ, সামাজিক বিশৃঙ্খলা শেষ অবধি যুলুম-নির্যাতন ও যুদ্ধবিগ্রহ পর্যন্ত গড়ায়। সবচেয়ে ভয়াবহ হলো দলীয় ও সাম্প্রদায়িক বিরোধ। ধর্মীয় বিরোধ তো আরও ভয়াবহ ও ধ্বংসাত্মক। এর জের ধরেই পৃথিবীতে ভয়াবহ দাঙ্গা ও যুদ্ধ-বিগ্রহ ঘটেছে। শত বছরের সাজানো জনপদ ও হাজার বছরের সভ্যতা-সংস্কৃতির অপমৃত্যু ঘটেছে।

ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে শান্তি ও সুশৃঙ্খলা অটুট রাখার জন্য বিরোধ নিষ্পত্তির বিকল্প নেই। কিন্তু উপায় কী? মতভেদ ও বিরোধ নিরসনের সহজ সমাধান কী?

সমাধান:
১. মতবিরোধের বিষয়টিকে সার্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার-বিশ্লেষণ করুন। যে সমস্ত সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ত্রুটিগুলো সাদা চোখে ধরা পড়ে না, বিস্তর অনুসন্ধান ও জানা-শোনার ভিত্তিতে তা শনাক্ত করুন।

২. মতবিরোধের ক্ষেত্রে গালমন্দ করা, অপবাদ আরোপ করা, অপর পক্ষের নামে কুৎসা রটনার মতো অন্যায় পথ পরিহার করে আসল সত্য ও সঠিক সমাধান বের করার চেষ্টা করুন।

৩. কারো সঙ্গে মতবিরোধ হলে দলিল-প্রমাণের ভিত্তিতে কথা বলুন। অন্যের কথা বাস্তবতার আলোকে বিচার করুন। প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটিত হওয়ার পর স্বতঃস্ফূর্ত চিত্তে তা গ্রহণ করুন।

৪. প্রতিপক্ষ যত কঠোর হোক, যত মূর্খতার পরিচয়ই দিক আপনি প্রশান্ত চিত্তে ভদ্রতা ও শালীনতা বজায় রেখে তার মোকাবেলা করুন। প্রজ্ঞা ও বুদ্ধিমত্তার সাথে তার প্রতিটি কথার উত্তর প্রদান করুন।

৫. একতরফা কথা না বলে, গলাবাজি প্রদর্শন না করে অপরপক্ষকে কথা বলার সুযোগ দিন। গুরুত্ব দিয়ে তার প্রতিটি কথা শুনুন এবং যথাযথভাবে যাচাই করুন।

৬. মতভেদসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কর্তব্য হলো পরস্পর আলোচনা করা, মতবিনিময় করা এবং প্রত্যেকের কথা ও মতামত গুরুত্ব দিয়ে শোনা। সর্বোপরি সকলের ঐকমত্যের জায়গাটি শনাক্ত করা এবং সে ভিত্তিতে এমন একটি সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া, যাতে সবার নৈতিক ও যৌক্তিক স্বার্থ রক্ষা হয়।

৭. পরস্পর বিরোধ নিরসন সম্ভব না হলে কোনো জ্ঞানী-গুণী, বিজ্ঞ-প্রাজ্ঞ ও আমানতদার ব্যক্তির শরণাপন্ন হয়ে তাঁর সিদ্ধান্ত সন্তুষ্টচিত্তে মেনে নেওয়া কর্তব্য।

৮. অপরপক্ষের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন। তার যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার মূল্যায়ন করুন। বিরোধ মীমাংসার উদ্দেশ্যে তার পক্ষ থেকে যদি কোনো ইতিবাচক ও ন্যায়ানুগ মতামত আসে তাহলে তা সাদরে গ্রহণ করুন।

৯. মতভেদ ও মতবিরোধের ক্ষেত্রে মীমাংসাকারীর ভূমিকা পালন করুন। সদয় ও বিনম্র কথায় বিরোধ নিষ্পত্তির চেষ্টা করুন।

১০. যেকোনো বিজ্ঞজনের চেয়ে মহাবিজ্ঞ, পণ্ডিতজনের ওপর মহাপণ্ডিত বর্তমান। বহুমাত্রিক অগাধ জ্ঞানার্জনের পরও এমন অনেক বহু বিষয় আছে যা আপনার জ্ঞানের পরিধির বাইরে। তাই কখনো নিজেকে সর্বেসর্বা ভাবা ঠিক নয়। যে অজ্ঞ, মূর্খ সে-ই নিজেকে মহাজ্ঞানী, মহাপণ্ডিত ভেবে বসে থাকে।

১১. পক্ষপাতিত্ব ও ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির মানসিকতা পরিহার করে বিবদমান ব্যক্তিদের পরস্পর সহানুভূতিশীল ও শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির চেতনা ধারণ করে গঠনমূলক আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খুঁজে বের করতে হবে।

১২. অন্যকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে নিজেকে সর্বেসর্বা ভাবার মানসিকতা পরিহার করুন। মীমাংসামূলক আলোচনার টেবিলে একে অন্যকে বোঝার চেষ্টা করুন।

১৩. ভুল স্বীকার করার মানসিকতা লালন করা কর্তব্য। অপর পক্ষের দাবি যৌক্তিক ও নৈতিক প্রমাণিত হলে তা সাগ্রহে হাসিমুখে মেনে নেওয়া আবশ্যক। তখন মতভিন্নতা, বাদবিসংবাদের কারণ হবে না; বরং প্রকৃত সত্য ও যৌক্তিক বিষয় উদ্‌ঘাটনের উপায় বলে সাব্যস্ত হবে।

পরিশিষ্ট:
* হাফেজ ইবনুল কাইয়্যিম জাওযী (রহ.) (৬৯১-৭৫১ হি.) বলেছেন: ‘যে ব্যক্তি অন্যদের কাজকর্ম ও পদক্ষেপগুলোকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে বিবেচনা করবে তার হৃদয় নিষ্কলুষ ও পরিশুদ্ধ থাকবে। আল্লাহ তা'আলা তাকে যাবতীয় অকল্যাণ ও অনিষ্ট থেকে রক্ষা করবেন।’

* সিরিয়ান ও লেবানিজ কবি অ্যাডোনিস বলেছেন: 'তুমি আমাকে ঘৃণা করছ না। তুমি ঘৃণা করছ আমার সম্পর্কে তোমার মনে কল্পিত রূপটাকে। সে কল্পিত রূপটি আমি নই, স্বয়ং তুমিই।'

* নিউজিল্যান্ডের বিখ্যাত লেখক পিটার টি ম্যাকিন্টায়ার বলেছেন: 'সর্বদা নিছক সত্য ও ন্যায়ের ওপর অবিচল থাকার মাধ্যমেই আত্মবিশ্বাস অর্জিত হয় না; বরং অকপটে ও নিঃসংকোচে নিজের ভুল স্বীকার করতে পারাই প্রকৃত আত্মবিশ্বাস ও সাহসিকতার পরিচয়।'

* ভারতীয় অন্যতম রাজনীতিবিদ ও হিন্দু ধর্মালম্বীদের আধ্যাত্মিক গুরু, মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী (১৮৬৯-১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দ) বলেছেন: 'মতভিন্নতা হলেই যে তা চরম বিরোধিতা ও শত্রুতায় পর্যবসিত হতে হবে এমনটা সমীচীন নয়। নচেৎ আমি ও আমার স্ত্রীই হতাম একে অপরের চরম বিরোধী, ঘোরতর শত্রু।'

টিকাঃ
৩৭. এটি তার ছদ্মনাম। তার আসল নাম হলো আলী আহমাদ সাঈদ।

📘 আল হাল্লু জীবন সমস্যার সমাধান > 📄 জুলুম-নির্যাতন

📄 জুলুম-নির্যাতন


জুলুম হলো, কারোর মান-সম্মান ক্ষুণ্ণ করা, অর্থ-সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি করা কিংবা শারীরিক নির্যাতন করা। আরেকটু বিস্তারিত বলতে গেলে কারো হক নষ্ট করা, সম্পদ আত্মসাৎ, অন্যায়-অবিচার, মিথ্যার আড়ালে প্রকৃত সত্যটাকে গোপন করা, জনসম্মুখে কাউকে অপমানিত ও হেয় প্রতিপন্ন করা, গাল-মন্দ করা এবং মিথ্যারোপ করা ইত্যাদি হলো গুরুতর ও জঘন্যতম যুলুম-অন্যায়।

যুলুমের অধিকাংশ ক্ষেত্রেই যালিম তার পদবলে ও পেশিশক্তিতে এতটাই দুর্বিনীত থাকে যে, তাকে প্রতিরোধ করার জন্য পীড়িত ও ভুক্তভোগীর কিছুই করার থাকে না। সমস্ত অন্যায়-অবিচার চুপচাপ মুখ বুজে সহ্য করতে হয়। অত্যাচারিত ব্যক্তি যখন দেখে, তার মতোই রক্ত-মাংসে গড়া এক আদম সন্তান তার ওপর অনবরত অন্যায়-অবিচার করে যাচ্ছে, অথচ তার আত্মরক্ষা করার সাধ্যটুকু নেই, প্রতিবাদের ভাষায় টু শব্দটি পর্যন্ত উচ্চারণ করার সুযোগ নেই তখন কিছু না করতে পারার অক্ষমতা ও আত্মগ্লানি তার জন্য আরও দুর্বিষহ ও অসহনীয় হয়ে ওঠে।

আল্লাহ তা'আলা যে কোনো যুলুম-নির্যাতনকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন। স্বয়ং তাঁর পবিত্র সত্তার ওপরও যুলুমের নিষিদ্ধতা অবধারিত করে নিয়েছেন। শরীয়তের দৃষ্টিতে যুলুম-নির্যাতন জঘন্যতম কবীরা গুনাহ। কেননা তা যাবতীয় অনিষ্টের মূল। পারিবারিক ও সামাজিক যত অস্থিরতা ও বিশৃঙ্খলা, যত ফেতনা-ফাসাদ-এসবের নেপথ্যে মূল কারণ হলো অন্যায়-অনাচার ও যুলুম-অত্যাচার।

সুস্থ, স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে হলে সুষ্ঠু সমাজ গড়ে তুলতে হবে। যুলুম-নির্যাতনের পথ বন্ধ করতে হবে। অন্যায়-অনাচারের মূলোৎপাটন করতে হবে। কিন্তু উপায় কী? এ জটিল সমস্যার সমাধান কী?

সমাধান:
১. বিচারবিভাগকে দুর্নীতিমুক্ত ও শক্তিশালী করার পাশাপাশি প্রত্যেক নাগরিকের ন্যায্য অধিকার সুনিশ্চিত করতে হবে। নাগরিক অধিকার সংক্রান্ত মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করতে হবে।

২. ব্যক্তি-জীবন থেকে শুরু করে পরিবার, শিক্ষালয় ও কর্মস্থল, মোটকথা সমাজের প্রতিটি অঙ্গনে সাম্য ও ন্যায়ানুগতা বজায় রাখতে হবে। যেন দেশ ও জাতি ন্যায়-ন্যায্যতার শীতল ছায়ায় বেঁচে থাকতে পারে এবং তার সুফল ভোগ করতে পারে।

৩. পবিত্র কুরআনের আয়াত ও রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর হাদীসের কথা মনে রাখতে হবে। তাতে যুলুম নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং যালিমের ওপর কঠোর শাস্তির ঘোষণা করা হয়েছে। যেমন: পবিত্র কুরআনের সতর্কবাণী:
﴿اَلَا إِنَّ الظَّلِمِينَ فِي عَذَابٍ مُّقِيمٍ﴾ [الشورى: ٤٥]
অর্থ: 'মনে রেখ, জালেমগণ স্থায়ী আযাবের ভেতর থাকবে।' (সূরা শুরা, ৪২: ৪৫)

হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ তা'আলার বাণী:
يَا عِبَادِي إِنِّي حَرَّمْتُ الظُّلْمَ عَلَى نَفْسِي، وَجَعَلْتُهُ بَيْنَكُمْ مُحَرَّمًا، فَلَا تَظَالَمُوا» (صحيح مسلم) ٤ / ١٩٩٤
অর্থ: 'হে আমার বান্দারা! আমি নিজেই নিজের ওপর যুলুম নিষিদ্ধ হিসেবে অবধারিত করেছি। তোমাদের জন্যও তা নিষিদ্ধ করেছি। সুতরাং তোমরা একে অন্যের ওপর যুলুম করো না।' (মুসলিম, ৪/১৯৯৪)

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
الظُّلْمُ ظُلُمَاتُ يَوْمَ القِيَامَةِ» (صحيح البخاري) ١٢٩/٣

অর্থ: 'যুলুম-নির্যাতন কিয়ামতের দিন বহু আযাব ও শাস্তি হয়ে দেখা দিবে।' (বুখারী, ৩/১২৯)

৪. এ বিষয়ে সুনিশ্চিত থাকুন, কিয়ামত দিবসে আল্লাহ তা'আলা মাযলুমের পক্ষে জালিমের কাছ থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করবেন। যালিমের নেক আমলসমূহ মাযলুমের আমলনামার অন্তর্ভুক্ত করে দিবেন। আর মাযলুমের গুনাহ ও নাফরমানি যালিমের আমলনামাভুক্ত করে দিবেন। এভাবে মাযলুমের পাল্লা অধিক আমলের ওজনে ভারি হবে, আর যালিমের গুনাহর পাল্লা যুলুম-অত্যাচারের বোঝায় ঝুঁকে পড়বে। হাদীসে বর্ণিত হয়েছে:
«لَتُؤَدُّنَّ الْحُقُوقَ إِلَى أَهْلِهَا يَوْمَ الْقِيَامَةِ، حَتَّى يُقَادَ لِلشَّاةِ الْجَلْحَاءِ، مِنَ الشَّاةِ الْقَرْنَاءِ» (صحيح مسلم) ٤ / ١٩٩٧
অর্থ: 'কিয়ামতের দিন প্রত্যেকের হক ও ন্যায্য অধিকার বুঝিয়ে দেওয়া হবে। এমনকি শিংবিহীন বকরির ওপর শিংওয়ালা বকরির যুলুমের প্রতিশোধ গ্রহণ করা হবে।' (মুসলিম, ৪/১৯৯৭)

৫. ইতিহাসের পাতা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করুন। যুগে যুগে যালিম অত্যাচারী ও স্বেচ্ছাচারীদের কী করুণ পরিণতি ঘটেছে! একসময়ের দোর্দণ্ড প্রতাপ-প্রতিপত্তির অধিকারী, নিঃশেষে তারা কী ভয়াবহ ধ্বংস ও বরবাদির শিকার হয়েছে। মৃত্যুর পরও তাদের নিস্তার নেই। ইতিহাস আজও তাদের নিন্দা ও ঘৃণা ভরে স্মরণ করে।

৬. যদি ক্ষমতা বলে ও পেশিশক্তির জোরে দুষ্ট মন আপনাকে কারো ওপর যুলুম করতে প্ররোচিত করে তাহলে স্মরণ করুন, আপনার ওপরও বিরাজমান অসীম ক্ষমতা ও শক্তিমত্তার অধিকারী মহান আল্লাহ তা'আলা। সুতরাং যমীনবাসীর প্রতি রহম করুন। আসমানের মহান সত্তা আপনার প্রতি রহম করবেন। জ্ঞানীগণ যথার্থ বলেছেন: 'কারো ওপর যুলুম করার সময় তোমার ক্ষেত্রে আল্লাহ তা'আলার ন্যায়ানুগতার কথা স্মরণ করো। কারো ওপর ক্ষমতা ও শক্তি যাহির করতে গিয়ে তোমার ওপর আল্লাহ তা'আলার ক্ষমতা ও শক্তিমত্তার কথা মনে রেখো।'

৭. কখনো যুলুম-অবিচারের শিকার হলে এই দু'আটি পাঠ করতে থাকুন :
حَسْبُنَا اللهُ وَنِعْمَ الْوَكِيْلُ
উচ্চারণ : হাসবুনাল্লাহু ওয়া নিমাল ওয়াকীল। অর্থ : আমার পক্ষে আল্লাহই যথেষ্ট। তিনি কতই না শ্রেষ্ঠ অভিভাবক। এ দু'আটি হলো নিরুপায় মজলুমের সর্বোত্তম পাথেয় ও বিরাট অস্ত্র।

৮. ধৈর্যধারণ করুন। আল্লাহর নিকট সাহায্য প্রার্থনা করুন। যে ব্যক্তি ধৈর্যধারণ করে আল্লাহ তা'আলা তার ধৈর্যের প্রতিদান প্রদান করেন। তাকে সাহায্য করেন। মনে রাখতে হবে, যুগে যুগে নবী-রাসূলগণ কাফের-মুশরিক কর্তৃক বহু যুলুম-নির্যাতন ও নিপীড়ন-নিগ্রহের শিকার হয়েছেন। দ্বিতীয়ত, এ পৃথিবী হলো তিক্ত অভিজ্ঞতা ও পরীক্ষাস্থল। ভোগ-বিলাস ও আরাম-আয়েশের জায়গা নয়। কিয়ামত দিবসেই প্রকৃত ইনসাফ ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে।

৯. যুলুম-অত্যাচার বাহ্যিকভাবে ক্ষতিকর মনে হলেও কখনো কখনো তা আপনার জন্য কল্যাণকর হতে পারে। তা আপনারই কৃত অন্যায় ও পাপাচারের প্রায়শ্চিত্তস্বরূপ। পাপমোচনের উদ্দেশ্যে আল্লাহ তা'আলার নিকট বেশি বেশি তাওবা-ইস্তিগফার করুন। সকাল-সন্ধ্যা নিয়মিত এ দু'আটি পাঠ করুন :

عَنْ أَبِيْ سَعِيْدِ الْخُدْرِيِّ، قَالَ: دَخَلَ رَسُوْلُ اللهِ ﷺ ذَاتَ يَوْمٍ الْمَسْجِدَ، فَإِذَا هُوَ بِرَجُلٍ مِّنَ الْأَنْصَارِ، يُقَالُ لَهُ: أَبُوْ أُمَامَةَ، فَقَالَ: «يَا أَبَا أُمَامَةَ، مَا لِيْ أَرَاكَ جَالِسًا فِي الْمَسْجِدِ فِيْ غَيْرِ وَقْتِ الصَّلَاةِ؟» قَالَ: هُمُوْمٌ لَزِمَتْنِيْ، وَدُيُوْنٌ يَا رَسُوْلَ اللهِ، قَالَ: «أَفَلَا أُعَلِّمُكَ كَلَامًا إِذَا أَنْتَ قُلْتَهُ أَذْهَبَ عَنِ اللهُ عَزَّ وَجَلَّ هَمَّكَ، وَقَضَى عَنْكَ دَيْنَكَ؟» قَالَ: قُلْتُ: بَلَى، يَا رَسُوْلَ اللهِ، قَالَ: قُلْ إِذَا أَصْبَحْتَ، وَإِذَا أَمْسَيْتَ:

অর্থ: আবু সাঈদ খুদরী (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ একদিন মসজিদে প্রবেশ করে জনৈক আনসারী সাহাবিকে দেখতে পেলেন। তিনি হলেন আবু উমামা (রা.)। রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন: 'হে উমামা! কী ব্যাপার? নামাযের সময়ের বাইরেও যে তুমি মসজিদে আছ?'

আবূ উমামা (রা.) বললেন: 'ইয়া রাসূলুল্লাহ, আমি দুশ্চিন্তা ও বিষণ্ণতায় ভুগছি। ঋণের দায়ে দায়গ্রস্ত হয়ে পড়েছি।'

রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, 'আমি কি তোমাকে এমন দু'আ শিখিয়ে দিব না, তুমি যদি তা পাঠ করো আল্লাহ তা'আলা তোমার দুশ্চিন্তা দূর করবেন এবং তোমার ঋণ পরিশোধের ব্যবস্থা করে দিবেন?'

আবূ উমামা (রা.) বলেন, আমি বললাম: 'ইয়া রাসূলুল্লাহ! অবশ্যই (শিখিয়ে দিন)।'

রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন: 'সকাল-সন্ধ্যায় তুমি এ দু'আটি পাঠ করবে:
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْهَمِّ وَالْحَزَنِ، وَأَعُوذُ بِكَ مِنَ الْعَجْزِ وَالْكَسَلِ، وَأَعُوذُ بِكَ مِنَ الْجُبْنِ وَالْبُخْلِ، وَأَعُوذُ بِكَ مِنْ غَلَبَةِ الدَّيْنِ، وَقَهْرِ الرِّجَالِ " (سنن أبي داود) ٢ / ٩٣

অর্থ: 'হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে দুশ্চিন্তা ও দুর্দশা থেকে পানাহ চাই। পানাহ চাই অক্ষমতা ও অলসতা থেকে। ভীরুতা ও কৃপণতা থেকে আপনার আশ্রয় প্রার্থনা করি। আশ্রয় প্রার্থনা করি ঋণের বোঝা ও লোকদের ক্ষমতা ও পেশিশক্তির কবল থেকে।' (আবূ দাউদ, ২/৯৩)

১০. যালিমের ক্ষমতা ও প্রতাপ-প্রতিপত্তি দেখে শঙ্কিত হবেন না। সাময়িকভাবে সে অপ্রতিরোধ্য। আল্লাহ তা'আলা তার যুলুম ও স্বেচ্ছাচার সম্পর্কে বেখবর নন। নির্দিষ্ট সময়ে অবশ্যই তাকে জবাবদিহির কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হবে এবং যুলুমের শাস্তির সম্মুখীন করা হবে। সুতরাং ধৈর্যধারণ করুন এবং আল্লাহ তা'আলার সাহায্য কামনা করুন। যালিমের যুলুম নিতান্ত সাময়িক। আল্লাহ তা'আলা তাকে অবকাশ দিয়ে রাখেন। নির্দিষ্ট সময়ে তাকে কঠোরভাবে পাকড়াও করা হবে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলার ঘোষণা:

وَلَا تَحْسَبَنَّ اللَّهَ غَافِلًا عَمَّا يَعْمَلُ الظَّلِمُونَ * إِنَّمَا يُؤَخِّرُهُمْ لِيَوْمٍ تَشْخَصُ فِيهِ الْأَبْصَارُ [إبراهيم: ٤٢]

অর্থ: 'তুমি কিছুতেই মনে করো না, জালিমদের কৃতকর্ম সম্পর্কে আল্লাহ বেখবর। তিনি তো তাদের সে দিন পর্যন্ত অবকাশ দিচ্ছেন, যে দিন চক্ষুসমূহ থাকবে বিস্ফারিত।' (ইবরাহীম, ১৪: ৪২)

১১. চারপাশে যদি যালিম ও যুলুমের অবাধ ছড়াছড়ি ও উদ্দাম প্রদর্শনী চলতে থাকে তাহলে শান্তি ও নিরাপত্তার শহরে হিজরত করুন। অনেক মহামনীষীই নিপীড়ন-নিগ্রহের শিকার হয়ে, যালিমের জনপদ ছেড়ে নিরাপদ শহরে সফর করেছেন।

১২. বুখারী ও মুসলিম শরীফের এ হাদীসটি মনে রাখুন:
دَخَلَتِ امْرَأَةُ النَّارَ فِي هِرَّةِ رَبَطَتْهَا، فَلَمْ تُطْعِمْهَا، وَلَمْ تَدَعْهَا تَأْكُلُ مِنْ خَشَاشِ الْأَرْضِ» (صحيح البخاري) ٤ /١٣٠
অর্থ: 'এক মহিলা শুধু এ কারণে জাহান্নামী হয়েছে যে, সে একটা বিড়ালকে আটকে রেখেছিল। নিজে বিড়ালটাকে খেতে দেয়নি। তাকে জমিনে চড়ে খাবার সংগ্রহ করে খাওয়ার সুযোগও দেয়নি।' (বুখারী, ৪/১৩০) একটু চিন্তা করে দেখুন, অতি নগণ্য প্রাণী বিড়াল আটকে রাখার অপরাধে আল্লাহ তা'আলা মহিলাটিকে জাহান্নামের আযাব দিয়েছেন। আর যে সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি মানুষের ওপর যুলুম করবে তার পরিণতি কত ভয়াবহ হতে পারে!

১৩. সদাচার ও ন্যায়পরায়ণতা প্রতিষ্ঠা করা হলো মহান আল্লাহ তা'আলার নির্দেশ। এর সুফল সুদূরপ্রসারী। পবিত্র কুরআনের বাণী:
﴿إِنَّ اللهَ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ وَالْإِحْسَانِ﴾ [النحل: ৯০]
অর্থ: 'নিশ্চয়ই আল্লাহ তা'আলা ইনসাফ ও দয়ার আদেশ করেন।' (সূরা নাহল, ১৬: ৯০)

১৪. আচার-উচ্চারণে, আচরণ-বিচরণে নীতিবান ও ন্যায়ানুগ হোন। তাতে আল্লাহ তা'আলার রহমত ও সন্তুষ্টি অর্জিত হবে। আল্লাহর লানতের ব্যাপারে সতর্ক থাকুন। কেননা যালিমদের ওপর তাঁর লানত অবধারিত। পবিত্র কুরআনের সতর্কবাণী:
﴿أَلا لَعْنَةُ اللهِ عَلَى الظَّلِمِينَ ﴾ [هود: ١٨]
অর্থ: 'সকলে শুনে নিক, ওই জালেমদের ওপর আল্লাহর লানত।' (সূরা হুদ, ১১: ১৮)

১৫. আপন সন্তান ও পরিবারের কল্যাণ বিবেচনা করে হলেও যুলুম থেকে বিরত থাকুন। মানুষের ওপর আপনি অন্যায়-অবিচারে প্রবৃত্ত হবেন; তার পরিণতিতে আপনার পরিবারের সদস্যগণ তাদের খারাপ নিশানায় পরিণত হবে, লোকদের দ্বারা যুলুম-নির্যাতনের শিকার হবে। এটাই প্রকৃতির অবধারিত নীতি-যেমন কর্ম তেমন ফল। তাছাড়া মানুষের স্বভাবজাত প্রবণতা হলো, সে যখন কারো সাথে পেরে না ওঠে তখন প্রতিপক্ষের আবেগ-অনুভূতি ও দুর্বলতার জায়গায় আঘাত করে তাকে ঘায়েল করার চেষ্টা করে।

১৬. সন্তানদের কুরআন-সুন্নাহর আদর্শ ও ঈমানী দীক্ষায় গড়ে তুলুন। তাদের সদাচার ও ন্যায়পরায়ণতায় অনুপ্রাণিত করুন। অন্যায় যুলুমের ব্যাপারে তাদের মনে ঘৃণাবোধ সৃষ্টি করুন।

১৭. যদি যুলুম প্রতিরোধের শক্তি না থাকে তাহলে অন্তরে তা ঘৃণা করুন। যালিমের সঙ্গ বেঁচে থাকুন। কখনো তার প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করবেন না, তার পক্ষে একবিন্দুও ঝুঁকবেন না, নচেৎ জাহান্নামের কঠিন আযাবের আশঙ্কা রয়েছে। পবিত্র কুরআনের নির্দেশ:

وَلا تَرْكَنُوا إِلَى الَّذِينَ ظَلَمُوا فَتَمَسَّكُمُ النَّارُ وَمَا لَكُمْ مِنْ دُونِ اللَّهِ مِنْ أَوْلِيَاءَ ثُمَّ لَا تُنْصَرُونَ﴾ [هود: ۱۱۳]

অর্থ: ‘(হে মুসলিমগণ!) তোমরা ওই জালেমদের দিকে একটুও ঝুঁকবে না, অন্যথায় কখনও জাহান্নামের আগুন তোমাদেরকেও স্পর্শ করবে এবং আল্লাহ ছাড়া তোমাদের কোনও বন্ধু থাকবে না। আর তখন কেউ তোমাদের সাহায্যও করবে না।’ (সূরা হুদ, ১১: ১১৩)

১৮. প্রকৃত হকদারকে তার পাওনা বুঝিয়ে দিতে হবে এবং সব ধরনের যুলুম অবিচার থেকে বিরত থাকতে হবে। সৃষ্টির শুরু থেকেই আল্লাহ তা'আলার নিকট ক্ষুদ্র থেকে বৃহৎ-প্রতিটি প্রাণীর মর্যাদা হক্ব ও মর্যাদা রয়েছে। মানুষের হক্ব ও মর্যাদা আরও বেশি। তার দেহ-শরীর, অর্থ-সম্পদ ও ইজ্জত আবরু তার মতোই সমান মর্যাদাপূর্ণ। রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর পবিত্র যবানে সুস্পষ্ট ঘোষণা শুনুন:

أَلَا إِنَّ اللَّهَ حَرَّمَ عَلَيْكُمْ دِمَاءَكُمْ وَأَمْوَالَكُمْ، كَحُرْمَةِ يَوْمِكُمْ هَذَا، فِي بَلَدِكُمْ هَذَا، فِي شَهْرِكُمْ هَذَا، أَلَا هَلْ بَلَّغْتُ؟ قَالُوا: نَعَمْ، قَالَ: "اللَّهُمَّ اشْهَدْ". (صحيح البخاري) ٥ / ١٧٧

অর্থ: '(হে উপস্থিত জনমণ্ডলী, আজকের এই দিন (জুমার দিন), এ মাস (জিলহজ মাস) ও এ শহর (মক্কা) যেমন পবিত্র; তোমাদের জানমাল, ইজ্জত-আবরু, মান-সম্মান (কিয়ামত পর্যন্ত) এমনই পবিত্র। আমি কি তোমাদের নিকট আল্লাহর দ্বীন পৌঁছে দিয়েছি?' সাহাবাগণ বললেন, 'হ্যাঁ (ইয়া রাসূলুল্লাহ)।' রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, 'হে আল্লাহ! আপনি সাক্ষী থাকুন।' (বুখারী, ৫/১৭৭)

১৯. অত্যন্ত সতর্ক থাকুন, কিয়ামতের দিন হাশরের ময়দানে যখন আপন রবের সামনে দাঁড়াবেন তখন যেন আল্লাহর কোনো বান্দা, এমনকি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কোনো নগণ্য প্রাণীর ওপর যুলুমের বোঝা বহন করতে না হয়, নচেৎ আক্ষেপ-অনুতাপ ও বরবাদি ছাড়া কোনো উপায় থাকবে না। পবিত্র কুরআনের বাণী:
وَ عَنَتِ الْوُجُوْهُ لِلْحَيِّ الْقَيُّوْمِ وَقَدْ خَابَ مَنْ حَمَلَ ظُلْمًا
অর্থ: 'আল-হায়্যুল কায়্যুমের সামনে সকল চেহারা নত হয়ে থাকবে। আর যে-কেউ যুলুমের ভার বহন করবে, সে-ই ব্যর্থকাম হবে।' (ত্বহা, ২০: ১১১)

২০. যুলুম-নির্যাতন এমন জঘন্য অপরাধ, ইহকালেই এর করুণ পরিণতি ভোগ করতে হয়। কেননা যালিম আল্লাহ তা'আলার ক্রোধের পাত্রে পরিণত হয়। তাছাড়া মাযলুমের বদ দু'আ ও আল্লাহ তা'আলার আরশের মধ্যে কোনো আবরণ থাকে না। তার জন্য আসমানের সমস্ত দরজা খুলে দেওয়া হয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ মাযলুমের দু'আর ব্যাপারে সতর্ক করে বলেছেন:

ثَلَاثُ لَا تُرَدُّ دَعْوَتُهُمْ، الإِمَامُ العَادِلُ، وَالصَّائِمُ حِيْنَ يُفْطِرُ، وَدَعْوَةُ المَظْلُومِ يَرْفَعُهَا فَوْقَ الغَمَامِ، وَتُفَتَّحُ لَهَا أَبْوَابُ السَّمَاءِ، وَيَقُولُ الرَّبُّ عَزَّ وَجَلَّ: وَعِزَّتِي لَأَنْصُرَنَّكِ وَلَوْ بَعْدَ حِيْنٍ. (سنن الترمذي) ٦٧٣/٤

অর্থ: 'তিন ব্যক্তির দু'আ বৃথা যায় না: (এক.) ন্যায়পরায়ণ বাদশাহ। (দুই.) ইফতারের সময় রোযাদারের দু'আ। (তিন.) পীড়িত ও মাযলুমের দু'আ। আল্লাহ তা'আলা তা মেঘের ওপর উঠিয়ে নেন। তার জন্য আসমানের দরজাসমূহ খুলে দেওয়া হয়। আল্লাহ তা'আলা (মাযলুমের দু'আয়) সাড়া দিয়ে বলেন: 'হে আমার বান্দা, কিছুটা বিলম্বে হলেও অতি অবশ্যই তোমাকে সাহায্য করব!'

২১. সর্বদা মনে রাখুন, কিয়ামতের দিন বিচার দিবসে আল্লাহ তা'আলার সামনে দাঁড়াতে হবে। অন্যায়-অবিচার করে ইহকালে কোনোভাবে পার পেয়ে গেলেও পরকালে আল্লাহ তা'আলার ন্যায়বিচার থেকে কোনো নিস্তার নেই। পবিত্র কুরআনের ঘোষণা:

﴿وَقُضِيَ بَيْنَهُمْ بِالْحَقِّ وَهُمْ لَا يُظْلَمُوْনَ * وَوُفِّيَتْ كُلُّ نَفْسٍ مَّا عَمِلَتْ وَهُوَ أَعْلَمُ بِمَا يَفْعَلُوْনَ﴾ [الزمر: 69، 70]

অর্থ: 'মানুষের মধ্যে ন্যায়বিচার করা হবে। তাদের ওপর কোন যুলুম করা হবে না। প্রত্যেককে তার কৃতকর্মের পূর্ণ প্রতিফল দেওয়া হবে। আর তারা যা করে সে সম্পর্কে আল্লাহ পরিপূর্ণ জ্ঞাত।' (সূরা যুমার, ৩৯: ৬৯-৭০)

২২. দেহের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, বিশেষভাবে যবান ও হাত দু'টিকে সবধরনের যুলুম-অত্যাচার থেকে বিরত থাকুন। এটিই প্রকৃত মুসলমানের আদর্শ। হাদীসে বর্ণিত হয়েছে: «الْمُسْلِمُ مَنْ سَلِمَ الْمُسْلِمُوْনَ مِنْ لِسَانِهِ وَيَدِهِ». অর্থ: 'প্রকৃত মুসলমান সেই, যার যবান ও হাত থেকে অন্যান্য মুসলমান নিরাপদ থাকে।' (বুখারী, ৮/১০২)

২৩. কারো ন্যায্য অধিকার ক্ষুণ্ণ করা থেকে বিরত থাকুন। সময় মতো প্রত্যেককে তার পাওনা বুঝিয়ে দিন। এ ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর উম্মতকে সতর্ক করে বলেছেন:

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم: "مَنْ كَانَتْ لَهُ مَظْلَمَةٌ لِأَحَدٍ مِنْ عِرْضِهِ أَوْ شَيْءٍ فَلْيَتَحَلَّلْهُ مِنْهُ الْيَوْمَ، قَبْلَ أَنْ لَا يَكُونَ دِينَارُ وَلَا درهم". (صحيح البخاري، ٢٤٤٩)

অর্থ: আবূ হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের সম্ভ্রমহানি বা অন্য কোন বিষয়ে যুলুমের জন্য দায়ী থাকে, সে যেন আজই তার কাছ হতে মাফ করিয়ে নেয়, সে দিন আসার পূর্বে যে দিন তার কোন দীনার বা দিরহাম থাকবে না।' (সহীহ বুখারী, হাদীস নং: ২৪৪৯)

পরিশিষ্ট:
হিজরি চতুর্থ শতাব্দী। বাগদাদের শাসক ছিল ভীষণ অহংকারী, যালিম স্বেচ্ছাচারী। জনগণকে লাঞ্ছিত অপদস্ত করা ছিল তার স্বভাবজাত। প্রজাসাধারণের ওপর যুলুম-নির্যাতন ছিল নিত্য-নৈমিত্তিক ব্যাপার।

তারই শহরে বাস করত দরিদ্র নিঃস্ব ভগ্ন দেহের এক বৃদ্ধা। সহায়-সম্বল বলতে তার একখণ্ড কৃষি জমি। যালিম শাসকের সাঙ্গ-পাঙ্গরা একদিন রীতিমতো বৃদ্ধার শেষ সম্বল কৃষি জমিটাই জবরদখল করে নিল। নিরুপায় বৃদ্ধা শাসকের নিকট অনুযোগ করল। তার ওপর হওয়া অন্যায়-অবিচারের সুবিচার চেয়ে আরজি জানাল। শাসক তার স্বভাবজাত অহংপুষ্ট ভঙ্গিমায় ও তাচ্ছিল্যের সুরে বলল:
'যাও, রাতের শেষ ভাগে দু'আ করে দেখ, দেখি কী করতে পারো?'

বৃদ্ধার আর বোঝার বাকি রইল না। বিচার না পাওয়ার হতাশা ও চাপা ক্ষোভ নিয়েই তাকে ফিরে আসতে হলো। শুধু বলে এল: 'সুপরামর্শ দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।'

সে রাতের শেষ প্রহরে বৃদ্ধা আল্লাহ তা'আলার দরবারে যুলুমের বিচার চেয়ে শাসকের নামে বদ দু'আ করল। কিছু কালের মধ্যেই আব্বাসী খলিফা কর্তৃক বাগদাদের শাসক পরাজিত হলো। পালাবারও সুযোগ পেল না। কারাবন্দি হলো।

প্রথম জুমার দিন আব্বাসী খলিফা জনসম্মুখে পরাজিত শাসকের হাত কেটে ফেলার হুকুম করলেন। তৎক্ষণাৎ পূর্ববর্তী যালিম শাসকের হাত কেটে ফেলা হলো। দ্বিতীয় জুমায় আব্বাসী খলিফা তার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডাদেশ জারি করলেন। খবর পেয়ে বৃদ্ধা বেরিয়ে এল। যালিম শাসককে মৃত্যুমঞ্চে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বলল: 'আপনাকে আবারও ধন্যবাদ জানাচ্ছি, রাতের শেষ প্রহরে দু'আ করার সুপারিশ দেওয়ার জন্য।'

এরপর বৃদ্ধা এ কবিতা আওড়ালো :
إِذَا جَارَ الوَزِيرُ وَكَاتِبَاهُ وَقَاضِي الأَرْضِ أَجْحَفَ فِي الْقَضَاءِ
فَوَيْلٌ ثُمَّ وَيْلٌ ثُمَّ وَيْلٌ لقَاضِي الْأَرْضِ مِنْ قَاضِي السَّمَاءِ
অর্থ: 'শাসক ও উযির-নাযির যদি যালেম হয়, যমীনের বিচারক যদি অবিচারী হয়, তাহলে আসমানের ফায়সালাকারীর পক্ষ থেকে তার ধ্বংস ও বরবাদি অনিবার্য।'

ফ্রান্সের দার্শনিক ও বহুবিদ্যাবিশারদ গুস্তাভে লে বোন (১৮৪১-১৯৩০ খ্রি.) তাঁর রচিত 'আরব-সভ্যতা' নামক বইয়ে লিখেছেন:
'আরবদের চেয়ে ন্যায়পরায়ণ ও দয়ালু বিজেতা ইতিহাস আর দেখেনি।'

যুলুম-অত্যাচার, বিদ্বেষ-শত্রুতা ও বিপদের মুহূর্তে বন্ধুকে একা ফেলে যাওয়া ইত্যাদি প্রসঙ্গে কবি ইবনে রুমি (২২১-২৮৩ হি.) বলেন:
وزَهَدَنِي فِي النَّاسِ مَعْرِفَتِي بِهِم وطول اختباري صاحباً بعد صاحب
فلم تُرني الأيام خلا يسرني بواديه إلا ساءني في العواقب
ولا صرت أدعوه لدفع ملمة من الدهر إلا كان إحدى النوائب
অর্থ: 'সুদীর্ঘ জীবনের অভিজ্ঞতা ও মানুষের আসল পরিচয় আমাকে তাদের থেকে বিমুখ করেছে। জীবনে এ যাবৎ কাল এমন কোনো বন্ধুর দেখা পেলাম না, যার ওপর ভরসা করতে পারি, যাকে দেখে আশ্বস্ত হতে পারি। যাকেই অন্তরঙ্গ ও পরম হিতাকাঙ্ক্ষী মনে হয়েছে তার সাথে পরিণতি খুব একটা সুখকর হয়নি। চরম বিপদের মুহূর্তে আমি তার সাহায্য প্রত্যাশা করেছি। কিন্তু তার স্বার্থপরতা আমার সামনে নতুন বিপদ দাঁড় করিয়েছে।'

📘 আল হাল্লু জীবন সমস্যার সমাধান > 📄 বার্ধক্য

📄 বার্ধক্য


বার্ধক্য একটি স্বাভাবিক জৈবিক ঘটনা। মন্থর ও আনুক্রমিক হারে এগিয়ে আসা দৈহিক অবক্ষয়। একটা অবধারিত জৈবিক বাস্তবতা। যা প্রতিরোধ করার কিংবা নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা কারো নেই।

শৈশব, কৈশোর, যৌবন ও পৌঢ়ত্বের পর বার্ধক্যও জীবনের একটি পটভূমি। সর্বশেষ চূড়ান্ত পটভূমি। জীবনের এই স্বতঃসিদ্ধ চিত্রটি পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা এভাবে ব্যক্ত করেছেন:
ٱللَّهُ ٱلَّذِى خَلَقَكُم مِّن ضَعْفٍ ثُمَّ جَعَلَ مِنۢ بَعْدِ ضَعْفٍ قُوَّةً ثُمَّ جَعَلَ مِنۢ بَعْدِ قُوَّةٍ ضَعْفًا وَشَيْبَةً ۚ يَخْلُقُ مَا يَشَآءُ ۖ وَهُوَ ٱلْعَلِيمُ ٱلْقَدِيرُ﴾ [الروم: ٥٤]
অর্থ: 'আল্লাহ সেই সত্তা, যিনি তোমাদের সৃষ্টি শুরু করেছেন দুর্বল অবস্থা থেকে, দুর্বলতার পর তিনি দান করেন শক্তি, আবার শক্তির পর দেন দুর্বলতা ও বার্ধক্য। তিনি যা চান সৃষ্টি করেন এবং তিনিই সর্বজ্ঞ, সর্বশক্তিমান।' (রূম, ৩০: ৫৪)

বার্ধক্যের পরিণতিতে ব্যক্তি স্মৃতিশক্তি হারাতে থাকে। তার দৈহিক শক্তি ক্ষয়িত হতে থাকে। উচ্ছল প্রাণবন্ত জীবন হারাতে থাকে তার গতিময়তা। একপর্যায়ে এসে ব্যক্তি মানসিক বিকারগ্রস্ততা ও অপ্রকৃতিস্থতার শিকার হয়। পরিবার-পরিজন ও বন্ধু-স্বজন তার সংস্পর্শে বিরক্তি বোধ করে। তার থেকে দূরত্ব বজায় রেখে চলে। সে দূরত্ব ঈষৎ উপেক্ষামূলক ও অনাকাঙ্ক্ষিত।

দীর্ঘ জীবনের শক্তি ও সঞ্চয় ব্যয় করে ব্যক্তি যে সাজানো সংসার গড়ে তুলেছে, জীবনের চরম সংকটকালে এসে যখন সে সংসারের লোকদের একে একে অনেককে দূরে সরে যেতে দেখে তখন তাকে চরম মানসিক দুশ্চিন্তা ও বিষণ্ণতা, সর্বাঙ্গীণ একাকিত্ব ও নিঃসঙ্গতা ঘিরে ধরে। বৃদ্ধ লোকটি সুন্দর সাবলীল, শ্রদ্ধা ও সহায়তাপূর্ণ জীবনের অস্তিত্ব সংকটের তিক্ত অভিজ্ঞতার শিকার হয়। এ তিক্ততার দায় আমাদের; চারপাশের সমাজের।

জীবনের পটভূমিতে একজন বৃদ্ধের প্রতি আমাদের করণীয় কী? বার্ধক্যকালীন সমস্যাগুলোর প্রকৃত সমাধান কী?

সমাধান:
১. বৃদ্ধ ব্যক্তির প্রতি পরিবার-পরিজনের পক্ষ থেকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। তার সাথে সযত্ন ও শ্রদ্ধাপূর্ণ আচরণ করতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে তার বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা ও আরাম-বিশ্রামের দিকে বিশেষ নজর রাখতে হবে। শরীয়তের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতের মতো এটিও একটি মহৎ ইবাদত।

২. বৃদ্ধ ব্যক্তির মন-মানসিকতা ও সুযোগ-সুবিধানুযায়ী উপযুক্ত পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। কেননা বার্ধক্য একটি জৈবিক অবক্ষয়কাল। যখন ব্যক্তির বিশেষ সেবাযত্ন ও পরিচর্যা আবশ্যক।

৩. সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়, দাতব্য সংস্থা কর্তৃক কিংবা সামাজিক উদ্যোগে বৃদ্ধদের জন্য স্বাস্থ্যালয় ও পরিচর্যা কেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে।

৪. বৃদ্ধ লোকদের স্বাস্থ্য-সক্ষমতা ও মন-মানসিকতার উপযোগী একটি দৈনন্দিন রুটিন প্রস্তুত করতে হবে। সে মোতাবেক তারা হাঁটাচলা করবেন। সাধ্য ও সক্ষমতা অনুযায়ী যিকির, তাসবীহ-তাহলীল ও কুরআন তিলাওয়াতে মশগুল হবেন।

৫. বৃদ্ধ ব্যক্তিকে সবসময় ডাক্তারের পরামর্শ মোতাবেক চলতে হবে। যেকোনো ধরনের সমস্যা অনুভব করামাত্র ডাক্তারের শরণাপন্ন হয়ে স্বাস্থ্য-পরীক্ষা করা কর্তব্য। রোগ শনাক্ত হওয়ার পর যথোপযুক্ত চিকিৎসা গ্রহণ করা আবশ্যক।

৬. বয়োবৃদ্ধ ব্যক্তিদের সাথে কখনো বাকবিতণ্ডা রেষারেষি করা যাবে না। কোনো অবস্থাতেই তাদের ত্যক্ত-বিরক্ত করা বাঞ্ছনীয় নয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
لَيْسَ مِنَّا مَنْ لَّمْ يَرْحَمْ صَغِيرَنَا وَيُوَقِّرْ كَبِيرَنَا
অর্থ: 'যে ব্যক্তি ছোটদের স্নেহ করে না, বড়দের শ্রদ্ধা করে না সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়। (তিরমিজী, ৪/৩২১)

৭. বৃদ্ধদের প্রতি সদয় সহানুভূতিশীল হতে হবে। যদ্দূর সম্ভব, সহমত পোষণ করে তাদের ইচ্ছা ও অভিমতের মূল্যায়ন করতে হবে। তাদের মন জয় করার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে।

৮. স্বাস্থ্যসুরক্ষা ও দেহের পরিচর্যার মাধ্যমে বার্ধক্য নিয়ন্ত্রণ করা ও বৃদ্ধ বয়সে সুস্থ থাকা সম্ভব। এর জন্য আবশ্যক হলো স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা এবং রুটিন মাফিক জীবনযাপন করা।

৯. দেহমনে সুস্থ-সবল থাকার জন্য নিয়মিত শরীরচর্চা ও ব্যায়াম করতে হবে। বার্ধক্য ত্বরান্বিত করে-এমন সমস্ত কাজ যেমন: ধূমপান, তৈলাক্ত খাবার খাওয়া ও দুশ্চিন্তা করা ইত্যাদি থেকে বিরত থাকা কর্তব্য। সর্বোপরি সুস্থ মন-মানসিকতা ও সুস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর সবকিছু পরিহার করা আবশ্যক।

১০. জ্ঞাতব্য যে, দীর্ঘ জীবন আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে এক বিরাট নিয়ামত। তাই রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর একনিষ্ঠ খাদেম আনাস (রা.)-এর জন্য দীর্ঘ জীবন কামনা করে দু'আ করেছেন। অন্যত্র রাসূল ﷺ বলেছেন:
وَإِنَّ مِنَ السَّعَادَةِ أَنْ يَطُولَ عُمْرُ الْعَبْدِ، وَيَرْزُقَهُ اللَّهُ الْإِنَابَةَ»
অর্থ: 'মানুষ দীর্ঘজীবী হওয়া এবং আল্লাহ তা'আলা তাকে তাওবা করার তাওফিক দান করা অন্যতম সৌভাগ্য।' (মুসনাদে আহমাদ, ২২/৪২৬)

১১. নামাযের জামাতে যদি বয়স্ক ও বৃদ্ধ লোক উপস্থিত থাকে তবে ইমাম সাহেবের কর্তব্য হলো, অতি দীর্ঘায়িত না করে সংক্ষিপ্তভাবে নামায শেষ করা। হাদীসে রাসূলুল্লাহ ﷺ এমনটিই আদেশ করেছেন।

১২. বার্ধক্য প্রলম্বিত করার জন্য এবং বার্ধক্যের ক্ষতিকর প্রভাবমুক্ত থাকার লক্ষ্যে প্রতিদিন মসজিদে গিয়ে জামাতের সাথে পাঁচ ওয়াক্ত নামায আদায় করতে হবে। অবশ্যই মসজিদে পায়ে হেঁটে যাতায়াত করতে হবে। এ আমলটিতে একই সাথে দু'টি কল্যাণ নিহিত। প্রথমত, জামাতের উদ্দেশ্যে মসজিদে যাওয়ার সওয়াব হাসিল হবে। দ্বিতীয়ত, ডাক্তার যে প্রতিদিন ৩০ মিনিট হাঁটা-চলার পরামর্শ দিয়ে থাকেন তা সহজেই কার্যকর হবে।

১৩. পরিবার-পরিজন ও বন্ধুবান্ধবের সংস্পর্শে থাকতে হবে। আত্মীয়-স্বজনের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে হবে। অকাল বার্ধক্য প্রতিরোধের জন্য এটি একটি বাস্তবানুগ ও কার্যকর পন্থা। যা চিকিৎসা-বিজ্ঞানে সুপ্রমাণিত।

১৪. যেকোনো ধরনের মানসিক চাপমুক্ত থাকতে হবে। মানসিক চাপে ভোগার অন্যতম কারণ হলো আসন্ন ভবিষ্যৎ নিয়ে অজানা আশঙ্কায় ভোগা। হাতছাড়া হওয়া বিষয়ে আক্ষেপ-অনুতাপ করা এবং কোনো ক্ষেত্রে বিফল হয়ে দুঃখ-কষ্টে ভেঙে পড়া।

১৫. স্বাস্থ্য-সবলতা অনুযায়ী নিয়মমাফিক রোযা রাখতে হবে। সাম্প্রতিক একটি গবেষণা ও জরিপে প্রতীয়মান হয়েছে, দৈনিক উদ্দীপনা ও চাঞ্চল্য বৃদ্ধির জন্য রোযা অন্যতম কার্যকর উপায়। এর মাধ্যমে বার্ধক্য প্রলম্বিত ও নিয়ন্ত্রিত হয়।

পরিশিষ্ট:
হাদীসে বর্ণিত হয়েছে:
أَنَّ رَجُلًا قَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ أَيُّ النَّاسِ خَيْرٌ، قَالَ: «مَنْ طَالَ عُمُرُهُ، وَحَسُنَ عَمَلُهُ»، قَالَ: فَأَيُّ النَّاسِ شَرٌّ؟ قَالَ: «مَنْ طَالَ عُمُرُهُ وَسَاءَ عَمَلُهُ» (سنن الترمذي) ٤ / ٥٦٦
অর্থ: জনৈক সাহাবি আরজ করলেন: 'ইয়া রাসূলুল্লাহ! সর্বোত্তম ব্যক্তি কে?' রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন: 'যে ব্যক্তি (যুগপদ) দীর্ঘজীবী ও নেক আমলকারী।' সাহাবি জিজ্ঞাসা করলেন: 'সবচেয়ে খারাপ লোক কে?' রাসূল ﷺ বললেন: 'যে লোক (যুগপদ) দীর্ঘজীবী ও বদ আমলকারী।' (তিরমিজী, ৪/৫৬৬)

* বিখ্যাত ইংরেজ দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিক বিপ্লবের প্রবক্তা ফ্রান্সিস বেকন (১৫৬১-১৬২৬ খ্রিষ্টাব্দ) বলেছেন: 'দৈহিক বার্ধক্যের চেয়ে মানসিক বার্ধক্যই বেশি প্রকট।'

* বিশিষ্ট মিশরীয় চিন্তাবিদ ও লেখক মোস্তফা মাহমুদ (১৯২১-২০০৯ খ্রিষ্টাব্দ) বলেন: 'মনে রাখুন, যৌবনই হলো জীবনের সর্বাধিক মূল্যবান পুঁজি। তাই যৌবনে এমন পাথেয় সঞ্চয় করুন, বার্ধক্যে যা আপনার জন্য সহায়ক হবে।'

📘 আল হাল্লু জীবন সমস্যার সমাধান > 📄 রিবা

📄 রিবা


‘রিবা’ অর্থাৎ, সুদ অন্যতম কবীরা গুনাহ। জঘন্যতম অর্থনৈতিক অনাচার ও সর্বব্যাপী ধ্বংসাত্মক। ‘রিবার’ পরিচয় ও সংজ্ঞা দিতে গিয়ে আল্লামা ইবনে হাজার আসকালানী (রহ.) বলেন: ‘পণ্য বা অর্থের বিনিময়ে প্রদেয় অতিরিক্ত পণ্য বা অর্থই হলো ‘রিবা’।’

রিবা দু’ প্রকার:
এক. ‘রিবার’ প্রথম প্রকারকে মেয়াদি সুদ বা জাহেলি যুগের সুদ বলা হয়। হাদীসের পরিভাষায় বলা হয় ‘রিবান নাসিআ।’ ‘রিবা’র এ প্রথম প্রকারটা সর্বপ্রথম পবিত্র কুরআনের ভাষ্য দ্বারা প্রমাণিত। তাই এটাকে ‘রিবাল কুরআন’ও বলা হয়।

দুই. ‘রিবা’র দ্বিতীয় প্রকারকে বর্ধিত সুদ বলা হয়। আরবিতে এই প্রকারটাকে একাধিক নামে নামকরণ করা হয়। যথা: রিবাল ফজল, রিবান নাক্ক্ ও রিবাল বাই ইত্যাদি। সুদের এ প্রকারটি কুরআনের ভাষ্য দ্বারা সাব্যস্ত নয়; রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। তাই এটাকে রিবাল হাদিসও বলা হয়।

‘রিবান নাসিআ’ বা মেয়াদি সুদ: সর্বপ্রথম ও সর্বাধিক আলোচিত রিবা হলো মেয়াদি সুদ। পবিত্র কুরআনে এ প্রকার সুদকে সরাসরি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তাই একে রিবাল কুরআন বলা হয়। জাহেলি যুগের লোকেরাও এটাকে সুদ বলেই বিশ্বাস করত। সে-বিবেচনায় এটাকে রিবাল জাহেলিয়্যাও বলা হয়। আবূ বকর জাসসাস (রহ.)-এর যথার্থ সংজ্ঞা প্রদান করেছেন: 'মেয়াদের ভিত্তিতে অতিরিক্ত অর্থ প্রদানের শর্তে যে ঋণ দেওয়া হয় তাকে রিবা নাসিআ বা মেয়াদি সুদ বলা হয়।'

'রিবাল ফজল' বা বর্ধিত সুদ: কিছু পণ্যদ্রব্য তার সমজাত দ্রব্যের বিনিময়ে লেনদেন করার সময় অতিরিক্ত হিসেবে যা গ্রহণ করা হয় তাকে 'রিবাল ফজল' বলে।

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা 'রিবা' বা সুদকে হারাম করেছেন এবং সুদিকারবারিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ সুদখোর, সুদী লেনদেনের লেখক ও সাক্ষীদের ওপর অভিসম্পাত করেছেন। কেননা সুদ অর্থ-সম্পদের বরকত নষ্ট করে দেয়। বান্দার নেক আমল বরবাদ করে ছাড়ে। দেশের আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থার সুষ্ঠুতা ও সমবণ্টনের ভিত্তি ধসিয়ে দেয়। এছাড়াও ব্যক্তিগত, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে অর্থনৈতিক অন্যায়-অনাচারের রাস্তা খুলে দেয়।

বর্তমান বিশ্বে পুঁজিবাদী অর্থনীতি ব্যবস্থার জঘন্য ও নিকৃষ্ট দিক হলো 'রিবা' বা সুদ। যা বিত্তবানদের বিত্তবৈভব আরও বহুস্তরে বৃদ্ধি করে। আর দরিদ্রকে দারিদ্র্যের চরমে ঠেলে দেয়।

তাই সুদ বর্জন করা ও সুদমুক্ত অর্থব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার বিকল্প নেই। কিন্তু তার উপায় কী? এ সংকট নিরসনের প্রকৃত পথ কী?

সমাধান:
১. তাকওয়া ও আল্লাহভীতি অবলম্বন করতে হবে। সুদের নিষিদ্ধতা সংবলিত কুরআন-সুন্নাহর বিধান চর্চা করতে হবে। বিশেষভাবে পবিত্র কুরআনের এ আয়াতটি মনে রাখতে হবে:
﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ لَا تَأْكُلُواْ ٱلرِّبَوٰٓاْ أَضْعَٰفًا مُّضَٰعَفَةً ۖ وَٱتَّقُواْ ٱللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ﴾ [آل عمران: ۱۳০]
অর্থ: 'হে মুমিনগণ! তোমরা কয়েক গুণ বৃদ্ধি করে সুদ খেও না এবং আল্লাহকে ভয় করো, যাতে তোমরা সফলতা লাভ করতে পার।' (আলে-ইমরান, ৩: ১৩০)

২. সতর্ক ও সচেতন হোন, রাসূল ﷺ যাদের ওপর লা'নত করেছেন তাদের দলে না শামিল হয়ে যান। জাবের বিন আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত: «لَعَنَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ آكِلَ الرِّبَا، وَمُؤْكِلَهُ، وَكَاتِبَهُ، وَشَاهِدَيْهِ»، وَقَالَ: «هُمْ سَوَاءٌ» (صحيح مسلم) ١٢١٩/٣
অর্থ: রাসূলুল্লাহ ﷺ সুদখোর, সুদি লেনদেন লিপিবদ্ধকারী ও এর সাক্ষরদের অভিসম্পাত করেছেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, 'তারা সবাই সমান (অপরাধী)।' (মুসলিম, ৩/১২১৯)

৩. সুদমুক্ত হালাল লেনদেন করতে হবে। তাতেই প্রকৃত কল্যাণ ও বরকত নিহিত। সুদি ও হারাম লেনদেন পরিহার করুন। তাতে যত অকল্যাণ ও অনিষ্টের ছড়াছড়ি।

৪. বিশ্বাস করুন, আপনি আপনার সম্পদের স্থায়ী মালিক নন। এ অর্থবিত্ত চিরকাল আপনার কাছে সঞ্চিত থাকবে না। অন্যের হাত ঘুরে তা যেমন আপনার মালিকানাধীন হয়েছে, আপনার হাত ঘুরেও অন্যের মালিকানায় চলে যাবে। এটাই অর্থ-সম্পদের অবধারিত নীতি। সুতরাং আপনি শুধু শুধু অর্থসম্পদকে সুদের দোষে দূষিত করতে যাবেন কেন?

৫. অতীতে যে সমস্ত জাতিবর্গের মধ্যে সুদভিত্তিক অর্থব্যবস্থা প্রচলিত ছিল, যে সমাজে এখনও সুদি কারবার বর্তমান তাদের অবস্থা যাচাই করে দেখুন-রিবা ও সুদের কারণে তারা কী সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবক্ষয় ও অধঃগতির শিকার হয়েছে! কী ভয়াবহ আর্থিক অবিচার-অনাচারে জর্জরিত হয়েছে!

৬. সমাজের জ্ঞানীজন ও সুধীমহলের পক্ষ থেকে মানুষকে সতর্ক করতে হবে। সুদের জঘন্যতা ও নিষিদ্ধতা সংবলিত কুরআন-সুন্নাহর সুস্পষ্ট বিধান সম্পর্কে লোকদের অবহিত করতে হবে।

৭. মনে রাখতে হবে, আল্লাহ তা'আলা কোনো সুদখোরের দু'আ কবুল করেন না। কেননা তার খাদ্য হারাম পথে উপার্জিত। তার পোশাক-পরিচ্ছদ অবৈধ টাকায় ক্রয়কৃত। তার দেহের রক্তের সাথে হারাম সম্পদ মিশ্রিত। এমন ব্যক্তির দু'আ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
يَا رَبِّ، يَا رَبِّ، وَمَطْعَمُهُ حَرَامٌ، وَمَشْرَبُهُ حَرَامٌ، وَمَلْبَسُهُ حَرَامٌ، وَغُذِيَ بِالْحَرَامِ، فَأَنَّى يُسْتَجَابُ لِذَلِكَ؟ " (صحيح مسلم) ٢ /٧٠٣
অর্থ: (হারাম ভক্ষণকারী আল্লাহর দরবারে দু'আ করে বলে,) ইয়া রাব্বি! ইয়া রাব্বি! (হে আমার রব! হে আমার রব!) অথচ তার খাবার হারাম, পানীয় হারাম, তার পোশাক-পরিচ্ছেদ হারাম, এমনকি তাকে হারাম খাওয়ানো হয়েছে। এমতাবস্থায় তার দু'আ কীভাবে কবুল হতে পারে? (মুসলিম, ২/৭০৩)

৮. মুক্তবাজার-নীতি চালু করে একপেশে ও স্বার্থকেন্দ্রিক অর্থনীতি বন্ধ করতে হবে।

৯. 'রিবা' ও সুদভিত্তিক ঋণব্যবস্থাকে মুনাফাভিত্তিক ব্যবস্থায় প্রবর্তন করতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে স্বর্ণ ও রুপার মূল্যহারে টাকার নোটের মান নির্ধারণ করতে হবে।

১০. লোকদের ব্যবসা-বাণিজ্য ও হালাল উপার্জনে অনুপ্রাণিত করতে হবে। কেননা ব্যবসা-বাণিজ্যের মাধ্যমেই বাজার চাঙা হয়ে উঠবে এবং সুদের ভিত্তি ছেড়ে লাভ-লোকসানের ভিত্তিতে বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসায়ীর মাঝে আর্থিক লেনদেন করা সহজতর হবে।

১১. শরীয়তে অনুমোদিত 'করজে হাসানা'র গুরুত্ব ও মাহাত্ম্য অনুধাবন করে সে নিয়মে ঋণ প্রদান করতে হবে। 'করজে হাসানা'র নীতি হলো, যে পরিমাণ অর্থ ঋণ প্রদান করা হয়েছে, ঋণগ্রহিতাকে তার সমপরিমাণ অর্থ পরিশোধ করলেই ঋণ শোধ হয়ে যাবে। এর সাথে একআনা মুনাফাও অতিরিক্ত যোগ করতে হবে না।

১২ ঋণগ্রহীতাকে নির্দিষ্ট সময়ে ঋণ পরিশোধের ব্যাপারে প্রতিশ্রুতিশীল হতে হবে। এক্ষেত্রে বিশ্বাস রক্ষা করাই হলো তার প্রধান কর্তব্য। পাশাপাশি ঋণদাতাকে সহনশীলতার পরিচয় দিতে হবে এবং অভাব-অনাটনের ক্ষেত্রে ঋণগ্রস্তকে ঋণ পরিশোধের সুযোগ দেওয়ার মানসিকতা ধারণ করতে হবে। পবিত্র কুরআনের দিকনির্দেশনা:
﴿وَإِنْ كَانَ ذُو عُسْرَةٍ فَنَظِرَةٌ إِلَى مَيْسَرَةٍ وَأَنْ تَصَدَّقُوا خَيْرٌ لَكُمْ إِنْ كُنْتُمْ تَعْلَمُونَ﴾ [البقرة: ٢٨٠]
অর্থ: 'কোন (দেনাদার) ব্যক্তি যদি অসচ্ছল হয়, তবে সচ্ছলতা লাভ পর্যন্ত তাকে অবকাশ দিতে হবে। আর যদি সদাকাই করে দাও, তবে তোমাদের পক্ষে সেটা অধিকতর শ্রেয়- যদি তোমরা উপলব্ধি কর।' (বাকারা, ২: ২৮০)

পরিশিষ্ট:
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন:
﴿الَّذِينَ يَأْكُلُونَ الرِّبُوا لَا يَقُومُونَ إِلَّا كَمَا يَقُوْمُ الَّذِي يَتَخَبَّطُهُ الشَّيْطَنُ مِنَ الْمَسِ ذَلِكَ بِأَنَّهُمْ قَالُوا إِنَّمَا الْبَيْعُ مِثْلُ الرِّبُوا * وَأَحَلَّ اللهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبوا﴾ [البقرة: ٢٧٥]
অর্থ: 'যারা সুদ খায় (কিয়ামতের দিন) তারা সেই ব্যক্তির মত উঠবে, শয়তান যাকে স্পর্শ দ্বারা পাগল বানিয়ে দিয়েছে। এটা এজন্য হবে যে, তারা বলেছিল, 'বিক্রিও তো সুদেরই মত হয়ে থাকে।' (বাকারা, ২: ২৭৫)

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
رَأَيْتُ لَيْلَةَ أُسْرِيَ بِي رَجُلًا يَسْبَحُ فِي نَهَرٍ وَيُلْقَمُ الْحِجَارَةَ، فَسَأَلْتُ مَا هَذَا؟ فَقِيلَ لِي: آكِلُ الربا " (مسند أحمد) ٢٩٣/٣٣
অর্থ: 'মেরাজের রাতে এক লোককে দেখি রক্তের নদীতে হাবু-ডুবু খাচ্ছে। তাকে পাথর গলাধঃকরণ করানো হচ্ছে। জিজ্ঞেস করলাম: 'কে এই লোক?' বলা হলো: 'সুদখোর।' (মুসনাদে আহমাদ, ৩৩/২৯৩)

টিকাঃ
**. আল্লাহ্ তা'আলার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে, সওয়াবের প্রত্যাশায়, কোনো প্রকার শর্তরোপ না করে যে ঋণ প্রদান করা হয়, তাকে 'করজে হাসানা' বা উত্তম ঋণ বলা হয়।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00