📘 আল হাল্লু জীবন সমস্যার সমাধান > 📄 রাগ-ক্রোধ

📄 রাগ-ক্রোধ


রাগ-ক্রোধ হলো দৈনন্দিন জীবনের এক জটিল সমস্যা ও মারাত্মক ব্যাধি। এ স্বভাবজাত রিপু মানুষের মাঝে আজ ব্যাপক ও প্রকট আকার ধারণ করেছে।

ব্যক্তি যখন কোনো কিছুতে অসন্তুষ্ট ও বিরক্ত হয় তার মধ্যে রাগের উদ্রেগ ঘটে, ক্রোধ সঞ্চারিত হয়। রাগের বশবর্তী হয়ে মানুষ গালমন্দ, অভিশাপ, ঘাত-প্রতিঘাত, যুদ্ধ-বিগ্রহ, ডিভোর্স ও সম্পর্কচ্ছেদের মতো জঘন্য কাজ করতেও কুণ্ঠাবোধ করে না।

পৃথিবীতে বহু অন্যায়-অনাচার, যুলুম-নির্যাতন, ধ্বংস ও হত্যাযজ্ঞের নেপথ্য কারণ ছিল ভীষণ রাগ ও প্রচণ্ড ক্ষোভ। ক্রোধের মতো সুদূর অকল্যাণপ্রসারী ও দ্রুত ক্রিয়াশীল মানবপ্রবৃত্তি দ্বিতীয়টি নেই। কেননা তা ব্যক্তির কাজকর্ম, দায়-দায়িত্ব পালন হতে শুরু করে আচার-ব্যবহার সর্বত্র ক্রীয়াশীল হয়ে থাকে। এ যেন এক সর্বনাশা ক্যান্সার ব্যাধি। যার ধ্বংসাত্মক জীবাণুগুলো দেহের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে।

অতিরিক্ত ক্রোধের কারণে হৃদস্পন্দন ও রক্তচাপ বাড়তে থাকে। হার্টঅ্যাটাক ও মস্তিষ্কের রক্তক্ষরণের মতো প্রাণঘাতী রোগের ঝুঁকি বাড়ে। মাত্রাতিরিক্ত ক্রোধের কারণে পাকস্থলীর কোষগুলো উজ্জীবিত হয়ে ওঠে। সঙ্গে সঙ্গে এসিড নির্গমনের পরিমাণও বেড়ে যায়।

রাগ ও ক্ষোভের কারণে মানুষ শুভবুদ্ধি চর্চার প্রাণশক্তি হারিয়ে ফেলে। পরিবার-পরিজন, সমাজ ও বন্ধুজনের কাছে অসহ্য হয়ে ওঠে। কেউ তাকে সহ্য করতে পারে না। তার রগচটা স্বভাবের কারণে সবাই তটস্থ থাকে। সমাজের সঙ্গে সে যতই মিলেমিশে চলার চেষ্টা করুক, প্রত্যেকেই তার সাথে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে চলে। একপর্যায়ে ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবন ভীষণ অস্বস্তিকর লাগে।

সুস্থ স্বাভাবিক জীবনযাপন করার জন্য রাগ ও ক্ষোভের মানসিকতা পরিহারের বিকল্প নেই। কিন্তু এর উপায় কী? এ সঠিক পথ ও পন্থা কী?

সমাধান:
১. রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর আদেশ মান্য করুন। যেমনটি হাদীসে বর্ণিত হয়েছে: عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ، أَنَّ رَجُلًا قَالَ لِلنَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: أَوْصِنِي، قَالَ: «لَا تَغْضَبْ فَرَدَّدَ مِرَارًا، قَالَ: «لَا تَغْضَبْ» (صحيح البخاري) ٢٨/٨
অর্থ: আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, এক ব্যক্তি নবী ﷺ-এর নিকট বলল, 'আপনি আমাকে অসিয়ত করুন।' তিনি বললেন, 'তুমি রাগ করো না।' লোকটি কয়েকবার তা বললেন। নবী ﷺ প্রত্যেকবারই বললেন, 'রাগ করো না।' (বুখারী, ৮/২৮)

২. জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে, প্রতিটি অঙ্গনে এ দিকনির্দেশনা অনুযায়ী চলুন-আপনার সহপাঠী বা সহকর্মীদের বলে দিন, রাগের মুহূর্তে তারা যেন আপনাকে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর হাদীসের নিষেধাজ্ঞার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। এর মাধ্যমে তারাও প্রতিদানপ্রাপ্ত হবে।

৩. রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাদের ক্রোধ দমন করার পদ্ধতি বাতলে দিয়েছেন। তা হলো, ভীষণ রাগের মুহূর্তে ওযু করুন। পানি যেমন আগুন নিভিয়ে দেয়, তেমনই মনের চাপা ক্ষোভ ও উত্তেজনা প্রশমিত করে। নিজের অবস্থান পরিবর্তন করুন। যদি দাঁড়িয়ে থাকেন বসে পড়ুন। যদি বসে থাকেন শুয়ে পড়ুন। অথবা স্থান ত্যাগ করুন এবং أَعُوْذُ بِاللَّهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّحِيمِ পাঠ করুন।

৪. রাগের সময় চুপ থাকুন। কোনো কথা বলা থেকে বিরত থাকুন। রাগের মাথায় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা, কোনো প্রকার আর্থিক লেনদেন ও চুক্তি করা সমীচীন নয়। কেননা রাগের মাথায় সিদ্ধান্ত ও মতামত-কোনোটাই ন্যায়ানুগ ও যথার্থ হতে পারে না। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: وَإِذَا غَضِبَ أَحَدُكُمْ فَلْيَسْكُتْ».
অর্থ: 'তোমাদের কেউ যখন রাগ করে সে যেন চুপ থাকে।' (মুসনাদে আহমাদ, ৪/৩৯)

৫. রাগ করার আগে একবার ভাবুন, রাগ মানুষকে গুনাহে লিপ্ত করে। তার নেক আমল বরবাদ করে। ব্যক্তির সুনাম-সুখ্যাতি ও মান-মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করে। পরিচিতজন ও বন্ধুদের সাথে সম্পর্কের অবনতি ঘটায়। সর্বোপরি রাগান্বিত ব্যক্তিকে আল্লাহর ক্রোধের পাত্রে পরিণত করে।

৬. ক্রোধ দমন করা এবং ক্ষমা ও সহনশীলতার আচরণের বিরাট ফযিলত ও প্রতিদানের কথা চিন্তা করুন। মহান রাব্বুল আলামীনের তরফ থেকে প্রতিদান লাভের প্রত্যাশাই আপনাকে রাগ ও ক্ষোভের মানসিকতা বর্জনে উদ্বুদ্ধ করবে।

৭. অধস্তন ও নিম্নবর্গের ওপর আপনার যে কর্তৃত্ব ও ক্ষমতা, আল্লাহ তা'আলা আপনার ওপর তার চেয়ে নিরঙ্কুশ ও একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী। তাই শান্তি ও প্রতিশোধের ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও ক্ষমাসুন্দর আচরণ করুন। আল্লাহ তা'আলা আপনার ওপর রহম করবেন। হাদীসে বর্ণিত হয়েছে: «الرَّاحِمُونَ يَرْحَمُهُمُ الرَّحْمَنُ، ارْحَمُوا مَنْ فِي الْأَرْضِ يَرْحَمْكُمْ مَنْ فِي السَّمَاءِ». (سنن الترمذي) ٣/٣٨٨ অর্থ: 'দয়ার্দ্র ব্যক্তিদের ওপর পরম দয়ালু সত্তা (আল্লাহ তা'আলা) রহম করেন। তোমরা যমীনবাসীর ওপর রহম কর। আসমানে বিরাজমান সত্তা তোমাদের ওপর রহম করবেন।' (তিরমিজী, ৩/৩৮৮)

৮. যদি রাগের উদ্রেগ হয় তাহলে তাসবীহ পাঠ করুন। রাগ প্রশমিত হতে থাকবে। মন-মানসিকতা প্রশান্তি ও প্রফুল্লতায় ভরে উঠবে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা তাসবীহের আমলের সঙ্গে মানসিক প্রশান্তি জুড়ে দিয়েছেন। পবিত্র কুরআনের ভাষায়: ﴿وَمِنْ أَنَاءِ اللَّيْلِ فَسَبِّحُ وَأَطْرَافَ النَّهَارِ لَعَلَّكَ تَرْضَى﴾ [طه: ١٣٠] অর্থ: 'সূর্যোদয়ের পূর্বে, সূর্যাস্তের পূর্বে এবং তাসবীহ পাঠ কর রাতের কিছু অংশে ও দিনের প্রান্তসমূহে, যাতে তুমি সন্তুষ্ট হতে পার।' (ত্বহা, ২০: ১৩০)

৯. রাগ ও ক্ষোভের কারণে যে মানসিক ও শারীরিক ক্ষতির শিকার হবেন, তা কি কখনো ভেবে দেখেছেন? দুশ্চিন্তা-বিষণ্ণতা, মানসিক সংকীর্ণতা, আক্ষেপ-অনুতাপ-এসবই রাগ করার অশুভ পরিণতি। এ ছাড়াও ব্লাডপ্রেসার, হার্টঅ্যাটাক, ব্রেইন স্ট্রোক ও মস্তিষ্কের রক্তক্ষরণের মতো প্রাণঘাতী রোগের ঝুঁকি বাড়তে থাকে।

১০. রাগ প্রশমিত করার চর্চা করুন। রাগের উদ্রেগ হওয়া মাত্র নাক দিয়ে টেনে লম্বা শ্বাস গ্রহণ করুন। কয়েক সেকেন্ড শ্বাস ধরে রেখে মুখ দিয়ে ধীরে ধীরে নিশ্বাস ত্যাগ করুন। এভাবে কয়েকবার করুন, দেহ-মন উভয়ই প্রশান্ত হবে।

১১. অন্যদের সম্মান বজায় রাখুন। তাদের প্রতি সুধারণা পোষণ করুন। অধীন ও নিম্নবর্গের লোকদের কথা ধৈর্যের সঙ্গে মনোযোগ দিয়ে শুনুন। তাদের ওজর-আপত্তি কবুল করুন। সময় নিয়ে ধৈর্যের সাথে কথা শোনার কারণে অনেক ভুল ধারণা ও অবিশ্বাসের আশঙ্কা থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। ফলে অন্যায় রাগ ও ক্ষোভের সম্ভাবনা থাকে না।

১২. সন্তানদের ঈমানী শিক্ষা-দীক্ষা ও কুরআন-সুন্নাহর আদর্শে গড়ে তুলতে হবে। ক্রোধ দমন, সহনশীলতা ও ক্ষমার গুণের মতো মহৎ আত্মিক গুণাবলি অর্জনে উদ্বুদ্ধ করতে হবে।

১৩. দু'টি বিষয়ের জন্য সর্বদা আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা করুন: প্রথমটি হলো, বিনয়-নম্রতা ও সহনশীলতা। অপরটি হলো, সন্তুষ্ট ও ক্ষুব্ধ-উভয় অবস্থায় ন্যায়সংগত কথা বলার যোগ্যতা। রাসূলুল্লাহ ﷺ আল্লাহ তা'আলার দরবারে এই প্রার্থনা করতেন:
وَأَسْأَلُكَ كَلِمَةَ الْحَقِّ فِي الرِّضَا وَالْغَضَبِ».
অর্থ: (হে আল্লাহ!) আমি আপনার নিকট প্রশান্ত ও ক্রোধান্বিত-উভয় অবস্থায়ই ন্যায়ানুগ কথা বলার তাওফিক প্রার্থনা করছি।' (নাসায়ী, ৩/৫৪)

১৪. বিশ্বাস করুন, রাগ ও ক্ষোভ প্রকাশের ক্ষেত্রে আত্মনিয়ন্ত্রণ করা ও ক্রোধ দমন করতে পারা দুর্বলতা ও অক্ষমতার আলামত নয়; বরং নৈতিক শক্তি ও সাহসিকতার পরিচয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর পবিত্র যবানেই শুনুন:
لَيْسَ الشَّدِيدُ بِالصُّرْعَةِ، إِنَّمَا الشَّدِيدُ الَّذِي يَمْلِكُ نَفْسَهُ عِنْدَ الغَضَبِ» (صحيح البخاري) ٢٨/٨
অর্থ: 'যে পেশিশক্তি জাহির করে সে আসল শক্তিশালী নয়। প্রকৃত শক্তিশালী ও বলবান হলো, যে রাগের সময় আত্মনিয়ন্ত্রণ করতে পারে।' (বুখারী, ৮/২৮)

১৫. আল্লাহ তা'আলার মহব্বত ও ভালোবাসা কে-ই বা পেতে না চায়? তাহলে রাগ ও ক্ষোভের মানসিকতা পরিহার করে ধৈর্য ও সহনশীলতার চর্চা করুন। রাসূলুল্লাহ ﷺ আব্দুল কায়েস (রা.)-কে সুসংবাদ প্রদান করে বলেছেন:
إِنَّ فِيكَ خَصْلَتَيْنِ يُحِبُّهُمَا اللهُ : الْحِلْمُ، وَالْأَنَاةُ (صحيح مسلم ١/ ٤٨)
অর্থ: 'তোমার মধ্যে দু'টি স্বভাবগুণ বর্তমান, যা আল্লাহ তা'আলা পছন্দ করেন। (স্বভাবগুণ দু'টি হলো,) ধৈর্য ও সহনশীলতা।' (মুসলিম ১/৪৮)

১৬. যদি ক্রোধ দমন করা সম্ভব না হয়, আত্মনিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায় তাহলে রাগ ও ক্ষোভের সম্ভাব্য ক্ষেত্র থেকে দূরে থাকুন। রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর পবিত্র যবানে এমনই নির্দেশবাণী উচ্চারিত হয়েছে:
أَمْلِكُ عَلَيْكَ لِسَانَكَ، وَلْيَسَعْكَ بَيْتُكَ، وَابْكِ عَلَى خَطِيئَتِكَ» (سنن الترمذي) ١٨٣/٤
অর্থ: 'তোমার যবান সংযত রাখ। (ফেতনার যামানায়) নিজ ঘরে আবদ্ধ থাক। নিজের ভুল-ত্রুটির জন্য অনুতপ্ত হও।' (তিরমিযি, ৪/১৮৩)

১৭. যে সমস্ত কারণে রাগের উদ্রেগ হয়, যে ব্যক্তিদের কারণে মনে ক্ষোভের সঞ্চার হয় তাদের থেকে দূরে থাকুন। তাহলে রাগের সম্ভাবনা কমে যাবে। অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণ করে আফসোস-অনুতাপে ভুগতে হবে না।

১৮. বিনম্র ও মার্জিত আওয়াজে কথা বলুন। চিৎকার-চেঁচামেচি আপনার কথার জোর বাড়াবে না, বক্তব্য জোরালোভাবে সাব্যস্ত করবে না। উল্টো আপনার অভদ্রতা ও অসভ্যতা ফাঁস করে দিবে। মানুষের কাছে আপনি সম্মান ও মর্যাদা হারাবেন।

১৯. রাগ ও ক্রোধের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্ক থাকুন। কেননা তা বহু অন্যায়-অনিষ্ট এবং শারীরিক ও মানসিক ব্যাধির মূল কারণ।

পরিশিষ্ট:
একদিন ওমর ইবনে আব্দুল আজীজ (রহ.)-এর পুত্র ছোট বাচ্চাদের সঙ্গে খেলছিল। বাচ্চারা বেশ হাসি-আনন্দের সাথেই খেলাধুলায় মত্ত ছিল। এর মধ্যেই এক দুষ্ট ছেলের আঘাতে ওমর ইবনে আব্দুল আজীজ (রহ.)-এর পুত্রের মাথা ফেটে গেল। সঙ্গে সঙ্গে রক্ত বের হতে লাগল। লোকেরা দুষ্ট ছেলেটিকে ধরে খলিফার দরবারে নিয়ে এল। বাইরে চিৎকার-চেঁচামেচি শুনে ওমর ইবনে আব্দুল আজীজ (রহ.) ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। ইতোমধ্যেই ছেলেটির মা এসে খলিফার দরবারে উপস্থিত। অনুনয়ের সুরে বলল: 'ছেলেটি আমার এতিম। তার বাবা নেই।'
খলিফা বললেন: 'আপনি ধৈর্যধারণ করুন। বিচলিত হবেন না।' এরপর তিনি জানতে চাইলেন: 'এতিমদের তালিকায় এই ছেলেটির নাম আছে কি না?' ছেলেটির মা বলল: 'না, এতিমদের তালিকায় তার নাম নেই। 'বায়তুল মাল' থেকে সে কোনো সুযোগ-সুবিধাও পাচ্ছে না।'
খলিফা বললেন: 'এতিমদের তালিকায় এই ছেলেটির নাম রেজিস্ট্রি করে দাও।'
খলিফা-পত্নী ফাতেমা বললেন: 'এই ছেলেটির প্রতি আপনি এত সদয় হচ্ছেন কেন? আজ আপনার পুত্রকে রক্তাক্ত করেছে। কাল আর একজনকে আহত করবে।'
খলিফা তাঁর পত্নীর উদ্দেশ্যে বললেন: 'যা বলার বলেছ। আর বলো না। ছেলেটি এতিম। লোকেরা তাকে এমনভাবে ধরে এনেছে যে, তাকে অনেক ভয় পাইয়ে দিয়েছে। এখন তাকে একটু শান্ত-নিশ্চিন্ত হওয়ার সুযোগ দাও।'

খলিফা ওমর বিন আব্দুল আজীজ (রহ.)-এর কী অনুপম মহানুভবতা ও সহনশীলতা! সন্তানের মাথা রক্তাক্ত দেখে তিনি একটুও বিচলিত হলেন না, রাগান্বিত হলেন না। ক্ষমা-সুন্দর ব্যবহার করে উদারতা ও মহানুভবতার কী অনুপম দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন! চরিত্র-মাধুর্যে ও ক্ষমার গুণে তাঁরাই হলেন পবিত্র কুরআনের বাস্তব নমুনা। তাঁদের সম্পর্কেই পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে:
وَالْكَاظِمِينَ الْغَيْظَ وَالْعَافِينَ عَنِ النَّاسِ وَاللَّهُ يُحِبُّ الْمُحْسِنِينَ [آل عمران: ١٣٤]
অর্থ: 'যারা নিজের রাগ হজম করতে ও মানুষকে ক্ষমা করতে অভ্যস্ত। আল্লাহ এরূপ পুণ্যবানদেরকে ভালোবাসেন।' (আলে- ইমরান, ৩: ১৩৪)

* বিখ্যাত ফরাসি উদ্ভাবক ও বহুবিদ্যাজ্ঞ পিয়ের বিউমার্কাইজ (১৭৩২- ১৭৯৯ খ্রিষ্টাব্দ) বলেছেন: 'রাগের শুরুটা হলো পাগলামি। তার শেষটা হলো আক্ষেপ অনুতাপ।'

* হাফেজ ইবনুল কাইয়্যিম জাওযী (রহ.) (৬৯১-৭৫১ হি.) বলেছেন: 'নিজের রাগটাকে ধৈর্য ও সহনশীলতার রশিতে বেঁধে ফেলুন। কেননা মনের ক্ষোভ ও ক্রোধ হলো পাগলা কুকুর। একবার যদি বাঁধনমুক্ত হয়ে যায় সবকিছু নাশ করে ফেলে।'

* বিখ্যাত আরব কবি ও দুঃসাহসী যোদ্ধা আনতারাহ ইবনে শাদ্দাদ (৫২৫- ৬০৮ খ্রিষ্টাব্দ) বলেছেন:
لا يحمل الحقدَ مَن تَعلو بِهِ الرُتَبُ وَلا يَنالُ العُلا مَن طَبْعُهُ الغَضَبُ
অর্থ: 'অভিজাত সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি হিংসা-বিদ্বেষ পুষে রাখতে পারে না। রাগী ও বদমেজাযি কখনো সফলতার শীর্ষস্থান অধিকার করতে পারে না।'

* ইয়েমেনের প্রেসিডেন্ট-পদ গ্রহণ করার পর ড. মুহাম্মাদ সা'দ আস্সা'দী তাঁর পুত্রকে বলেন: 'কখনো যদি মনে রাগ ও ক্ষোভের উদ্রেগ হয় তাহলে উপরে আসমান ও নিচে যমীনের দিকে তাকাও। আসমান-যমীনের বিশালত্ব এবং তার স্রষ্টার বড়ত্ব ও মহত্ত্ব অনুধাবন করার চেষ্টা করো।'

📘 আল হাল্লু জীবন সমস্যার সমাধান > 📄 তাড়াহুড়া

📄 তাড়াহুড়া


তাড়াহুড়া হলো আগ-পিছ না ভেবে, কোনো চিন্তা-ফিকির না করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও কার্যসম্পাদনে প্রবৃত্ত হওয়া। মানুষ স্বভাবগতভাবে তাড়াহুড়াপ্রবণ। আল্লাহ তা'আলা যদি তাকে বিবেক-বুদ্ধি ও ধৈর্য-সহ্য দান না করতেন, তাহলে পরিপক্ব হওয়ার আগেই সে ফল পেড়ে ফেলত। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা ইবরাহিম (আ.)-এর আদর্শ বর্ণনা করে মানুষকে ধৈর্য ও সহনশীলতায় অনুপ্রাণিত করেছেন:

﴿إِنَّ إِبْرَاهِيمَ لَحَلِيمٌ أَوَّاهُ مُّنِيبٌ﴾ [هود: ٧٥]

অর্থ: 'নিশ্চয় ইবরাহীম অত্যন্ত সহনশীল, অধিক অনুনয় বিনয়কারী, আল্লাহমুখী।' (সূরা হুদ, ১১: ৭৫)

ধৈর্য-স্থৈর্য, সুচিন্তা ও স্থান-কাল-পাত্র বিবেচনা ইত্যাদি স্বভাবগুণ মানুষের সফলতা ও সৌভাগ্যের পথ সুগম করে। তাকে ব্যর্থতা ও ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করে। আর তাড়াহুড়া ও অস্থিরতা হলো এমন স্বভাবদোষ, যা ব্যক্তিকে প্রতিকূলতা ও ব্যর্থতার পথে ধাবিত করে। তার অর্জিত যত সফলতা ও সুকীর্তি, গৌরব ও মর্যাদা, এক এক করে সমস্ত কিছু বরবাদ করে ছাড়ে। এমনটাই ঘটা স্বাভাবিক। কেননা তাড়াহুড়ার মুহূর্তে যা করা হয় তাতে সুস্থ চিন্তা-ভাবনা ও বিবেক-বুদ্ধির কোনো ভূমিকা থাকে না।

কত তাড়াহুড়াপ্রবণ লোক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাড়াহুড়া ও অস্থিরতার বশবর্তী হয়ে স্বাস্থ্য-সুস্থতা, অর্থ-সম্পদ ও সুনাম-সুখ্যাতি-সব খুইয়ে বসেছে। স্বভাবগত ক্ষয় তার জীবনের ক্ষয়-ক্ষতির চূড়ান্ত করে ছেড়েছে। পরিশেষে যখন সে নিজের ভুল বুঝতে পেরেছে, তখন আক্ষেপ-অনুতাপ ছাড়া কিছু করার নেই।

জীবনে সুখ-শান্তি লাভ করার জন্য, সফলতা ও সৌভাগ্য অর্জন করার জন্য তাড়াহুড়াপ্রবণতা ও অস্থির মানসিকতা পরিহারের বিকল্প নেই। কিন্তু এর উপায় কী? এ সমস্যার সঠিক সমাধান কী?

সমাধান:
১. ধৈর্যধারণ করুন। কেননা তা সফলতা ও মুক্তির অন্যতম উপায়। যে ব্যক্তি ধৈর্যধারণ করে, প্রতিদান স্বরূপ আল্লাহ তা'আলা তার কাজটাকে সহজ করে দেন। তার মুক্তি ও সফলতার পথ উন্মুক্ত করে দেন।

২. কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার আগে কোনো উদ্যোগ বাস্তবায়নের পূর্বে গভীরভাবে চিন্তা-ফিকির করুন। পর্যাপ্ত সময় নিয়ে এ সম্পর্কে যাবতীয় তথ্য-উপাত্ত ও সুবিধা-অসুবিধা যাচাই করুন।

৩. পবিত্র কুরআনের এ নির্দেশ হোক আপনার জীবনের নিত্য আদর্শ: ﴿وَشَاوِرْهُمْ فِي الْأَمْرِ﴾ [آل عمران : ١٥٩] অর্থ: 'তাদের জন্য মাগফিরাতের দু'আ কর।' (আলে-ইমরান, ৩: ১৫৯)

৪. পরামর্শ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য এমন ব্যক্তিদের নির্বাচন করুন যারা জ্ঞানী, গুণী, বিচক্ষণ ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন।

৫. কোনো বিষয়ে কল্যাণ-অকল্যাণ সম্পর্কে সুনিশ্চিত না হতে পারলে 'সালাতুল ইস্তিখারা' আদায় করুন। আল্লাহ তা'আলার কাছে সঠিক দিকনির্দেশনা চেয়ে প্রার্থনা করুন। যে ব্যক্তি 'ইস্তিখারা' করে সে ব্যর্থ হয় না। 'ইস্তিখারা'র পরামর্শে তাকে অনুতপ্ত হতে হয় না।

৬. অতীত জীবনের দিকে ফিরে তাকান, গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করুন, তাড়াহুড়ার কারণে যে ক্ষতি ও দুর্গতির শিকার হয়েছেন তা শনাক্ত করুন এবং সামনের দিনগুলোতে ধৈর্য ও সুচিন্তার আলোকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে উদ্যোগ বাস্তবায়ন করুন।

৭. কোনো বিষয়ে ত্বরিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ না করে "একটু ভেবে দেখি, একটু চিন্তা করে দেখি”-এ নীতি অবলম্বন করুন। এভাবে তাড়াহুড়াপ্রবণ মানসিকতা নিয়ন্ত্রিত হবে এবং ধৈর্য ও ধীরস্থিরতার গুণে প্রতিটি বিষয় সুষ্ঠু সফলভাবে সম্পন্ন হবে।

৮. ধীরতা ও স্থিরতার চর্চা করুন। যেকোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানাতে হলে একটু সময় নিন। কোনো দায়িত্ব পালন করতে বলা হলে ভেবে-চিন্তে ধীরস্থিরভাবে পালন করুন। এভাবে অনবরত প্রশান্ত মানসিকতার চর্চা করতে থাকুন। একপর্যায়ে তা আপনার স্বভাবগুণে পরিণত হবে।

৯. আরবি প্রবাদ বাক্যটি মনে রাখুন: فِي الْعُجْلَةِ النَّدَامَةُ، وَفِي التَّأَنِّي السَّلَامَةُ. অর্থ: 'তাড়াহুড়ায় লোকসান, ধীরস্থিরতায় পরিত্রাণ।' অতীতে মানুষ যে ক্ষতি ও দুর্গতির শিকার হয়েছে এবং বর্তমানেও হচ্ছে, তার অধিকাংশেরই নেপথ্য কারণ হলো তাড়াহুড়াপ্রবণতা ও অশান্তচিত্ততা।

১০. ইবাদত হলো বান্দার জীবনের শ্রেষ্ঠ অধ্যায়। অন্যান্য মঙ্গলজনক কাজও তার জীবনের শুভ অধ্যায়। তাই শুভ কাজে দেরি করতে নেই। দ্বিতীয় কোনো চিন্তা-ভাবনার অবকাশ নেই।

১১. ধৈর্য-স্থৈর্য হলো নবী-রাসূলগণের চারিত্রিক গুণ। জ্ঞানী-গুণী ও মহামনীষিগণের স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য। আর তাড়াহুড়া ও অস্থিরপ্রবণতা হলো বোকা, নির্বোধ ও পাগলাটে লোকের স্বভাবদোষ। এবার আপনিই ভাবুন, কোনটি অবলম্বন করবেন।

১২. সন্তান, পরিবার ও অধীনস্তদের, চিন্তা-ভাবনা ও ধীরস্থিরতার দীক্ষায় গড়ে তুলতে হবে। তাড়াহুড়া ও অস্থিরপ্রবণতার ক্ষতিকর দিকগুলোর ব্যাপারে সচেতন ও সতর্ক করতে হবে।

১৩. ধীরস্থিরতা ও প্রশান্তি লাভের অন্যতম উপায় অবলম্বন করুন। তা হলো আল্লাহর যিকির। পবিত্র কুরআনের ঘোষণা: ﴿الَّذِينَ آمَنُوا وَتَطْمَئِنُّ قُلُوبُهُمْ بِذِكْرِ اللَّهِ ﴾ [الرعد: ٢٨] অর্থ: 'স্মরণ রেখ, কেবল আল্লাহর যিকিরই সেই জিনিস, যা দ্বারা অন্তরে প্রশান্তি লাভ হয়।' (সূরা রা'দ, ১৩: ২৮)

১৪. সর্বশ্রেষ্ঠ মানব রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর আদর্শ গ্রহণ করুন। ধৈর্যে-স্থৈর্যে তিনি হলেন অতীত ও ভবিষ্যতের অনুপম শ্রেষ্ঠ আদর্শ।

১৫. হযরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: «الأَنَاةُ مِنَ اللَّهِ وَالعَجَلَةُ مِنَ الشَّيْطَانِ» অর্থ: 'ধীরস্থিরতা হলো আল্লাহর তরফ থেকে। আর তাড়াহুড়া হলো শয়তানের পক্ষ থেকে।' (তিরমিজী, ৪/৩৬৭) একবার ভেবে দেখুন-শয়তানের প্ররোচনায় প্ররোচিত হবেন, না কি মহান রবের তরফ থেকে নিয়ামতপ্রাপ্ত হবেন?

পরিশিষ্ট:
* ইরাক ও ইরানের অন্যতম বিখ্যাত শিয়া ধর্মীয় রেফারেন্স মুহাম্মদ আল-হুসাইনী আশ্ শীরাজী (১৯২৮-২০০১ খ্রিষ্টাব্দ) বলেছেন: 'বুদ্ধিমান বিচক্ষণ ব্যক্তি সর্বদা প্রশান্তচিত্ততা ও সুস্থির চিন্তা-ভাবনার আলোকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। কেননা তৃণীরের তীর একবার ছুটে গেলে আর ফেরানো যায় না।'

* চৈনিক কনফুসীয় দার্শনিক মেনসিয়াস (২৮৯-৩৭২ খ্রিষ্টপূর্ব) বলেছেন: 'যারা সহসা অতি দ্রুত শিখরে পৌঁছায় তারা অপেক্ষাকৃত দ্রুত নিচে পতিত হয়।'

* বিশিষ্ট জার্মানি লেখক ও সাহিত্যিক জোহান গ্যাটে (১৭৪৯-১৮৩২ খ্রিষ্টাব্দ) বলেছেন: 'অস্থিরপ্রবণ লোক বের হওয়ার দরজার খোঁজে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ে। অথচ সে দরজার সামনেই আনাগোনা করছে।'

টিকাঃ
৩৬. কোনো কাজ করার ইচ্ছা করলে কিংবা অত্যাসন্ন কোনো বিষয়ে আল্লাহর সাহায্য কামনা করতে তাঁরই দরবারে কায়মনোবাক্যে বিশেষ পদ্ধতিতে প্রার্থনা করার নামই ইস্তিখারা। অর্থাৎ, ইস্তিখারার মাধ্যমে বান্দা আল্লাহ তা'আলার কাছে এই প্রার্থনা করে যে, আমি যা করতে চাই তাতে যদি আমার কল্যাণ থাকে তাহলে তা আমার জন্য সহজ করে দিন এবং বরকত দান করুন। এটিই হলো ইস্তিখারার হাকীকত। ইস্তিখারার জন্য দুটি কাজ করণীয় বলে সহীহ হাদীসে বলা হয়েছে। দু' রাকাত নামায আদায় করা এবং ইস্তিখারা প্রসিদ্ধ মাসনূন দু'আটি মনোযোগের সাথে পড়া। সময়ের স্বল্পতা বা অন্য কোনো কারণে এই দু'টি কাজ সম্ভব না হলে তিনবার বা সাতবার এই দু'আটি পড়েও ইস্তেখারা করা যায়, اللَّهُمَّ خَرِّ لِي وَاخْتَر ْلِي (ইবনুস সুন্নী, হাদীস: ৫৭, ৫৮) এরপর যে বিষয়ে হৃদয়াত্মা আশ্বাস পাবে আল্লাহ তা'আলার ওপর ভরসা করে সেই কাজ আরম্ভ করা কর্তব্য। এভাবে আমল করলে ইস্তিখারা হয়ে যাবে। উল্লেখ্য যে, এই আমল করার জন্য শরীয়তে নির্দিষ্ট কোনো সময় নেই। রাত বা দিনের যেকোনো সময় তা করা যায়। (অনুবাদক)

📘 আল হাল্লু জীবন সমস্যার সমাধান > 📄 মতভেদ

📄 মতভেদ


মতভেদ হলো একটি বিষয়ে দু'জন কিংবা ততধিক ব্যক্তি সহমত হতে না পারা, মতবিরোধে লিপ্ত হওয়া। মতভেদের অন্যতম কারণগুলো হলো ব্যক্তিগত বিরোধ, লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের ভিন্নতা, চিন্তা-চেতনা আকিদা ও বিশ্বাসের পার্থক্য ইত্যাদি।

মতবিরোধ ও মতভিন্নতার মাঝে একটা পার্থক্য বর্তমান। মতবিরোধ হলো, কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনের পথ-পন্থা ও মূল লক্ষ্য-উদ্দেশ্য উভয় ক্ষেত্রে মতভেদ দেখা দেওয়া। আর মতভিন্নতা হলো, লক্ষ্য-উদ্দেশ্য এক হওয়া সত্ত্বেও পথ ও পন্থা ভিন্ন হওয়া।

আরেকটি দৃষ্টিকোণ থেকে মতভেদ দু'ধরনের: একটির উৎস হলো চিন্তানৈতিক বৈচিত্র্য ও বোধ-উপলব্ধির ভিন্নতা। এটি প্রশংসনীয় ও ফলপ্রসূ। অপরটির নেপথ্য কারণ হলো ব্যক্তিস্বার্থ, দলীয় স্বার্থ, নিজস্ব মতামত বাস্তবায়নের মানসিকতা, জাতীয়বাদ ও সাম্প্রদায়িকতা ইত্যাদি। এটা নিন্দনীয় ও ক্ষতিকর।

এ ধরনের মতবিরোধ ও মনোমালিন্য হতে শুরু করে পরস্পর হিংসা-বিদ্বেষ ও গালমন্দ পর্যায়ক্রমে ব্যক্তিগত সম্পর্কচ্ছেদ, পারিবারিক বিচ্ছেদ, সামাজিক বিশৃঙ্খলা শেষ অবধি যুলুম-নির্যাতন ও যুদ্ধবিগ্রহ পর্যন্ত গড়ায়। সবচেয়ে ভয়াবহ হলো দলীয় ও সাম্প্রদায়িক বিরোধ। ধর্মীয় বিরোধ তো আরও ভয়াবহ ও ধ্বংসাত্মক। এর জের ধরেই পৃথিবীতে ভয়াবহ দাঙ্গা ও যুদ্ধ-বিগ্রহ ঘটেছে। শত বছরের সাজানো জনপদ ও হাজার বছরের সভ্যতা-সংস্কৃতির অপমৃত্যু ঘটেছে।

ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে শান্তি ও সুশৃঙ্খলা অটুট রাখার জন্য বিরোধ নিষ্পত্তির বিকল্প নেই। কিন্তু উপায় কী? মতভেদ ও বিরোধ নিরসনের সহজ সমাধান কী?

সমাধান:
১. মতবিরোধের বিষয়টিকে সার্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার-বিশ্লেষণ করুন। যে সমস্ত সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ত্রুটিগুলো সাদা চোখে ধরা পড়ে না, বিস্তর অনুসন্ধান ও জানা-শোনার ভিত্তিতে তা শনাক্ত করুন।

২. মতবিরোধের ক্ষেত্রে গালমন্দ করা, অপবাদ আরোপ করা, অপর পক্ষের নামে কুৎসা রটনার মতো অন্যায় পথ পরিহার করে আসল সত্য ও সঠিক সমাধান বের করার চেষ্টা করুন।

৩. কারো সঙ্গে মতবিরোধ হলে দলিল-প্রমাণের ভিত্তিতে কথা বলুন। অন্যের কথা বাস্তবতার আলোকে বিচার করুন। প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটিত হওয়ার পর স্বতঃস্ফূর্ত চিত্তে তা গ্রহণ করুন।

৪. প্রতিপক্ষ যত কঠোর হোক, যত মূর্খতার পরিচয়ই দিক আপনি প্রশান্ত চিত্তে ভদ্রতা ও শালীনতা বজায় রেখে তার মোকাবেলা করুন। প্রজ্ঞা ও বুদ্ধিমত্তার সাথে তার প্রতিটি কথার উত্তর প্রদান করুন।

৫. একতরফা কথা না বলে, গলাবাজি প্রদর্শন না করে অপরপক্ষকে কথা বলার সুযোগ দিন। গুরুত্ব দিয়ে তার প্রতিটি কথা শুনুন এবং যথাযথভাবে যাচাই করুন।

৬. মতভেদসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কর্তব্য হলো পরস্পর আলোচনা করা, মতবিনিময় করা এবং প্রত্যেকের কথা ও মতামত গুরুত্ব দিয়ে শোনা। সর্বোপরি সকলের ঐকমত্যের জায়গাটি শনাক্ত করা এবং সে ভিত্তিতে এমন একটি সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া, যাতে সবার নৈতিক ও যৌক্তিক স্বার্থ রক্ষা হয়।

৭. পরস্পর বিরোধ নিরসন সম্ভব না হলে কোনো জ্ঞানী-গুণী, বিজ্ঞ-প্রাজ্ঞ ও আমানতদার ব্যক্তির শরণাপন্ন হয়ে তাঁর সিদ্ধান্ত সন্তুষ্টচিত্তে মেনে নেওয়া কর্তব্য।

৮. অপরপক্ষের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন। তার যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার মূল্যায়ন করুন। বিরোধ মীমাংসার উদ্দেশ্যে তার পক্ষ থেকে যদি কোনো ইতিবাচক ও ন্যায়ানুগ মতামত আসে তাহলে তা সাদরে গ্রহণ করুন।

৯. মতভেদ ও মতবিরোধের ক্ষেত্রে মীমাংসাকারীর ভূমিকা পালন করুন। সদয় ও বিনম্র কথায় বিরোধ নিষ্পত্তির চেষ্টা করুন।

১০. যেকোনো বিজ্ঞজনের চেয়ে মহাবিজ্ঞ, পণ্ডিতজনের ওপর মহাপণ্ডিত বর্তমান। বহুমাত্রিক অগাধ জ্ঞানার্জনের পরও এমন অনেক বহু বিষয় আছে যা আপনার জ্ঞানের পরিধির বাইরে। তাই কখনো নিজেকে সর্বেসর্বা ভাবা ঠিক নয়। যে অজ্ঞ, মূর্খ সে-ই নিজেকে মহাজ্ঞানী, মহাপণ্ডিত ভেবে বসে থাকে।

১১. পক্ষপাতিত্ব ও ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির মানসিকতা পরিহার করে বিবদমান ব্যক্তিদের পরস্পর সহানুভূতিশীল ও শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির চেতনা ধারণ করে গঠনমূলক আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খুঁজে বের করতে হবে।

১২. অন্যকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে নিজেকে সর্বেসর্বা ভাবার মানসিকতা পরিহার করুন। মীমাংসামূলক আলোচনার টেবিলে একে অন্যকে বোঝার চেষ্টা করুন।

১৩. ভুল স্বীকার করার মানসিকতা লালন করা কর্তব্য। অপর পক্ষের দাবি যৌক্তিক ও নৈতিক প্রমাণিত হলে তা সাগ্রহে হাসিমুখে মেনে নেওয়া আবশ্যক। তখন মতভিন্নতা, বাদবিসংবাদের কারণ হবে না; বরং প্রকৃত সত্য ও যৌক্তিক বিষয় উদ্‌ঘাটনের উপায় বলে সাব্যস্ত হবে।

পরিশিষ্ট:
* হাফেজ ইবনুল কাইয়্যিম জাওযী (রহ.) (৬৯১-৭৫১ হি.) বলেছেন: ‘যে ব্যক্তি অন্যদের কাজকর্ম ও পদক্ষেপগুলোকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে বিবেচনা করবে তার হৃদয় নিষ্কলুষ ও পরিশুদ্ধ থাকবে। আল্লাহ তা'আলা তাকে যাবতীয় অকল্যাণ ও অনিষ্ট থেকে রক্ষা করবেন।’

* সিরিয়ান ও লেবানিজ কবি অ্যাডোনিস বলেছেন: 'তুমি আমাকে ঘৃণা করছ না। তুমি ঘৃণা করছ আমার সম্পর্কে তোমার মনে কল্পিত রূপটাকে। সে কল্পিত রূপটি আমি নই, স্বয়ং তুমিই।'

* নিউজিল্যান্ডের বিখ্যাত লেখক পিটার টি ম্যাকিন্টায়ার বলেছেন: 'সর্বদা নিছক সত্য ও ন্যায়ের ওপর অবিচল থাকার মাধ্যমেই আত্মবিশ্বাস অর্জিত হয় না; বরং অকপটে ও নিঃসংকোচে নিজের ভুল স্বীকার করতে পারাই প্রকৃত আত্মবিশ্বাস ও সাহসিকতার পরিচয়।'

* ভারতীয় অন্যতম রাজনীতিবিদ ও হিন্দু ধর্মালম্বীদের আধ্যাত্মিক গুরু, মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী (১৮৬৯-১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দ) বলেছেন: 'মতভিন্নতা হলেই যে তা চরম বিরোধিতা ও শত্রুতায় পর্যবসিত হতে হবে এমনটা সমীচীন নয়। নচেৎ আমি ও আমার স্ত্রীই হতাম একে অপরের চরম বিরোধী, ঘোরতর শত্রু।'

টিকাঃ
৩৭. এটি তার ছদ্মনাম। তার আসল নাম হলো আলী আহমাদ সাঈদ।

📘 আল হাল্লু জীবন সমস্যার সমাধান > 📄 জুলুম-নির্যাতন

📄 জুলুম-নির্যাতন


জুলুম হলো, কারোর মান-সম্মান ক্ষুণ্ণ করা, অর্থ-সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি করা কিংবা শারীরিক নির্যাতন করা। আরেকটু বিস্তারিত বলতে গেলে কারো হক নষ্ট করা, সম্পদ আত্মসাৎ, অন্যায়-অবিচার, মিথ্যার আড়ালে প্রকৃত সত্যটাকে গোপন করা, জনসম্মুখে কাউকে অপমানিত ও হেয় প্রতিপন্ন করা, গাল-মন্দ করা এবং মিথ্যারোপ করা ইত্যাদি হলো গুরুতর ও জঘন্যতম যুলুম-অন্যায়।

যুলুমের অধিকাংশ ক্ষেত্রেই যালিম তার পদবলে ও পেশিশক্তিতে এতটাই দুর্বিনীত থাকে যে, তাকে প্রতিরোধ করার জন্য পীড়িত ও ভুক্তভোগীর কিছুই করার থাকে না। সমস্ত অন্যায়-অবিচার চুপচাপ মুখ বুজে সহ্য করতে হয়। অত্যাচারিত ব্যক্তি যখন দেখে, তার মতোই রক্ত-মাংসে গড়া এক আদম সন্তান তার ওপর অনবরত অন্যায়-অবিচার করে যাচ্ছে, অথচ তার আত্মরক্ষা করার সাধ্যটুকু নেই, প্রতিবাদের ভাষায় টু শব্দটি পর্যন্ত উচ্চারণ করার সুযোগ নেই তখন কিছু না করতে পারার অক্ষমতা ও আত্মগ্লানি তার জন্য আরও দুর্বিষহ ও অসহনীয় হয়ে ওঠে।

আল্লাহ তা'আলা যে কোনো যুলুম-নির্যাতনকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন। স্বয়ং তাঁর পবিত্র সত্তার ওপরও যুলুমের নিষিদ্ধতা অবধারিত করে নিয়েছেন। শরীয়তের দৃষ্টিতে যুলুম-নির্যাতন জঘন্যতম কবীরা গুনাহ। কেননা তা যাবতীয় অনিষ্টের মূল। পারিবারিক ও সামাজিক যত অস্থিরতা ও বিশৃঙ্খলা, যত ফেতনা-ফাসাদ-এসবের নেপথ্যে মূল কারণ হলো অন্যায়-অনাচার ও যুলুম-অত্যাচার।

সুস্থ, স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে হলে সুষ্ঠু সমাজ গড়ে তুলতে হবে। যুলুম-নির্যাতনের পথ বন্ধ করতে হবে। অন্যায়-অনাচারের মূলোৎপাটন করতে হবে। কিন্তু উপায় কী? এ জটিল সমস্যার সমাধান কী?

সমাধান:
১. বিচারবিভাগকে দুর্নীতিমুক্ত ও শক্তিশালী করার পাশাপাশি প্রত্যেক নাগরিকের ন্যায্য অধিকার সুনিশ্চিত করতে হবে। নাগরিক অধিকার সংক্রান্ত মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করতে হবে।

২. ব্যক্তি-জীবন থেকে শুরু করে পরিবার, শিক্ষালয় ও কর্মস্থল, মোটকথা সমাজের প্রতিটি অঙ্গনে সাম্য ও ন্যায়ানুগতা বজায় রাখতে হবে। যেন দেশ ও জাতি ন্যায়-ন্যায্যতার শীতল ছায়ায় বেঁচে থাকতে পারে এবং তার সুফল ভোগ করতে পারে।

৩. পবিত্র কুরআনের আয়াত ও রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর হাদীসের কথা মনে রাখতে হবে। তাতে যুলুম নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং যালিমের ওপর কঠোর শাস্তির ঘোষণা করা হয়েছে। যেমন: পবিত্র কুরআনের সতর্কবাণী:
﴿اَلَا إِنَّ الظَّلِمِينَ فِي عَذَابٍ مُّقِيمٍ﴾ [الشورى: ٤٥]
অর্থ: 'মনে রেখ, জালেমগণ স্থায়ী আযাবের ভেতর থাকবে।' (সূরা শুরা, ৪২: ৪৫)

হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ তা'আলার বাণী:
يَا عِبَادِي إِنِّي حَرَّمْتُ الظُّلْمَ عَلَى نَفْسِي، وَجَعَلْتُهُ بَيْنَكُمْ مُحَرَّمًا، فَلَا تَظَالَمُوا» (صحيح مسلم) ٤ / ١٩٩٤
অর্থ: 'হে আমার বান্দারা! আমি নিজেই নিজের ওপর যুলুম নিষিদ্ধ হিসেবে অবধারিত করেছি। তোমাদের জন্যও তা নিষিদ্ধ করেছি। সুতরাং তোমরা একে অন্যের ওপর যুলুম করো না।' (মুসলিম, ৪/১৯৯৪)

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
الظُّلْمُ ظُلُمَاتُ يَوْمَ القِيَامَةِ» (صحيح البخاري) ١٢٩/٣

অর্থ: 'যুলুম-নির্যাতন কিয়ামতের দিন বহু আযাব ও শাস্তি হয়ে দেখা দিবে।' (বুখারী, ৩/১২৯)

৪. এ বিষয়ে সুনিশ্চিত থাকুন, কিয়ামত দিবসে আল্লাহ তা'আলা মাযলুমের পক্ষে জালিমের কাছ থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করবেন। যালিমের নেক আমলসমূহ মাযলুমের আমলনামার অন্তর্ভুক্ত করে দিবেন। আর মাযলুমের গুনাহ ও নাফরমানি যালিমের আমলনামাভুক্ত করে দিবেন। এভাবে মাযলুমের পাল্লা অধিক আমলের ওজনে ভারি হবে, আর যালিমের গুনাহর পাল্লা যুলুম-অত্যাচারের বোঝায় ঝুঁকে পড়বে। হাদীসে বর্ণিত হয়েছে:
«لَتُؤَدُّنَّ الْحُقُوقَ إِلَى أَهْلِهَا يَوْمَ الْقِيَامَةِ، حَتَّى يُقَادَ لِلشَّاةِ الْجَلْحَاءِ، مِنَ الشَّاةِ الْقَرْنَاءِ» (صحيح مسلم) ٤ / ١٩٩٧
অর্থ: 'কিয়ামতের দিন প্রত্যেকের হক ও ন্যায্য অধিকার বুঝিয়ে দেওয়া হবে। এমনকি শিংবিহীন বকরির ওপর শিংওয়ালা বকরির যুলুমের প্রতিশোধ গ্রহণ করা হবে।' (মুসলিম, ৪/১৯৯৭)

৫. ইতিহাসের পাতা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করুন। যুগে যুগে যালিম অত্যাচারী ও স্বেচ্ছাচারীদের কী করুণ পরিণতি ঘটেছে! একসময়ের দোর্দণ্ড প্রতাপ-প্রতিপত্তির অধিকারী, নিঃশেষে তারা কী ভয়াবহ ধ্বংস ও বরবাদির শিকার হয়েছে। মৃত্যুর পরও তাদের নিস্তার নেই। ইতিহাস আজও তাদের নিন্দা ও ঘৃণা ভরে স্মরণ করে।

৬. যদি ক্ষমতা বলে ও পেশিশক্তির জোরে দুষ্ট মন আপনাকে কারো ওপর যুলুম করতে প্ররোচিত করে তাহলে স্মরণ করুন, আপনার ওপরও বিরাজমান অসীম ক্ষমতা ও শক্তিমত্তার অধিকারী মহান আল্লাহ তা'আলা। সুতরাং যমীনবাসীর প্রতি রহম করুন। আসমানের মহান সত্তা আপনার প্রতি রহম করবেন। জ্ঞানীগণ যথার্থ বলেছেন: 'কারো ওপর যুলুম করার সময় তোমার ক্ষেত্রে আল্লাহ তা'আলার ন্যায়ানুগতার কথা স্মরণ করো। কারো ওপর ক্ষমতা ও শক্তি যাহির করতে গিয়ে তোমার ওপর আল্লাহ তা'আলার ক্ষমতা ও শক্তিমত্তার কথা মনে রেখো।'

৭. কখনো যুলুম-অবিচারের শিকার হলে এই দু'আটি পাঠ করতে থাকুন :
حَسْبُنَا اللهُ وَنِعْمَ الْوَكِيْلُ
উচ্চারণ : হাসবুনাল্লাহু ওয়া নিমাল ওয়াকীল। অর্থ : আমার পক্ষে আল্লাহই যথেষ্ট। তিনি কতই না শ্রেষ্ঠ অভিভাবক। এ দু'আটি হলো নিরুপায় মজলুমের সর্বোত্তম পাথেয় ও বিরাট অস্ত্র।

৮. ধৈর্যধারণ করুন। আল্লাহর নিকট সাহায্য প্রার্থনা করুন। যে ব্যক্তি ধৈর্যধারণ করে আল্লাহ তা'আলা তার ধৈর্যের প্রতিদান প্রদান করেন। তাকে সাহায্য করেন। মনে রাখতে হবে, যুগে যুগে নবী-রাসূলগণ কাফের-মুশরিক কর্তৃক বহু যুলুম-নির্যাতন ও নিপীড়ন-নিগ্রহের শিকার হয়েছেন। দ্বিতীয়ত, এ পৃথিবী হলো তিক্ত অভিজ্ঞতা ও পরীক্ষাস্থল। ভোগ-বিলাস ও আরাম-আয়েশের জায়গা নয়। কিয়ামত দিবসেই প্রকৃত ইনসাফ ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে।

৯. যুলুম-অত্যাচার বাহ্যিকভাবে ক্ষতিকর মনে হলেও কখনো কখনো তা আপনার জন্য কল্যাণকর হতে পারে। তা আপনারই কৃত অন্যায় ও পাপাচারের প্রায়শ্চিত্তস্বরূপ। পাপমোচনের উদ্দেশ্যে আল্লাহ তা'আলার নিকট বেশি বেশি তাওবা-ইস্তিগফার করুন। সকাল-সন্ধ্যা নিয়মিত এ দু'আটি পাঠ করুন :

عَنْ أَبِيْ سَعِيْدِ الْخُدْرِيِّ، قَالَ: دَخَلَ رَسُوْلُ اللهِ ﷺ ذَاتَ يَوْمٍ الْمَسْجِدَ، فَإِذَا هُوَ بِرَجُلٍ مِّنَ الْأَنْصَارِ، يُقَالُ لَهُ: أَبُوْ أُمَامَةَ، فَقَالَ: «يَا أَبَا أُمَامَةَ، مَا لِيْ أَرَاكَ جَالِسًا فِي الْمَسْجِدِ فِيْ غَيْرِ وَقْتِ الصَّلَاةِ؟» قَالَ: هُمُوْمٌ لَزِمَتْنِيْ، وَدُيُوْنٌ يَا رَسُوْلَ اللهِ، قَالَ: «أَفَلَا أُعَلِّمُكَ كَلَامًا إِذَا أَنْتَ قُلْتَهُ أَذْهَبَ عَنِ اللهُ عَزَّ وَجَلَّ هَمَّكَ، وَقَضَى عَنْكَ دَيْنَكَ؟» قَالَ: قُلْتُ: بَلَى، يَا رَسُوْلَ اللهِ، قَالَ: قُلْ إِذَا أَصْبَحْتَ، وَإِذَا أَمْسَيْتَ:

অর্থ: আবু সাঈদ খুদরী (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ একদিন মসজিদে প্রবেশ করে জনৈক আনসারী সাহাবিকে দেখতে পেলেন। তিনি হলেন আবু উমামা (রা.)। রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন: 'হে উমামা! কী ব্যাপার? নামাযের সময়ের বাইরেও যে তুমি মসজিদে আছ?'

আবূ উমামা (রা.) বললেন: 'ইয়া রাসূলুল্লাহ, আমি দুশ্চিন্তা ও বিষণ্ণতায় ভুগছি। ঋণের দায়ে দায়গ্রস্ত হয়ে পড়েছি।'

রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, 'আমি কি তোমাকে এমন দু'আ শিখিয়ে দিব না, তুমি যদি তা পাঠ করো আল্লাহ তা'আলা তোমার দুশ্চিন্তা দূর করবেন এবং তোমার ঋণ পরিশোধের ব্যবস্থা করে দিবেন?'

আবূ উমামা (রা.) বলেন, আমি বললাম: 'ইয়া রাসূলুল্লাহ! অবশ্যই (শিখিয়ে দিন)।'

রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন: 'সকাল-সন্ধ্যায় তুমি এ দু'আটি পাঠ করবে:
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْهَمِّ وَالْحَزَنِ، وَأَعُوذُ بِكَ مِنَ الْعَجْزِ وَالْكَسَلِ، وَأَعُوذُ بِكَ مِنَ الْجُبْنِ وَالْبُخْلِ، وَأَعُوذُ بِكَ مِنْ غَلَبَةِ الدَّيْنِ، وَقَهْرِ الرِّجَالِ " (سنن أبي داود) ٢ / ٩٣

অর্থ: 'হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে দুশ্চিন্তা ও দুর্দশা থেকে পানাহ চাই। পানাহ চাই অক্ষমতা ও অলসতা থেকে। ভীরুতা ও কৃপণতা থেকে আপনার আশ্রয় প্রার্থনা করি। আশ্রয় প্রার্থনা করি ঋণের বোঝা ও লোকদের ক্ষমতা ও পেশিশক্তির কবল থেকে।' (আবূ দাউদ, ২/৯৩)

১০. যালিমের ক্ষমতা ও প্রতাপ-প্রতিপত্তি দেখে শঙ্কিত হবেন না। সাময়িকভাবে সে অপ্রতিরোধ্য। আল্লাহ তা'আলা তার যুলুম ও স্বেচ্ছাচার সম্পর্কে বেখবর নন। নির্দিষ্ট সময়ে অবশ্যই তাকে জবাবদিহির কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হবে এবং যুলুমের শাস্তির সম্মুখীন করা হবে। সুতরাং ধৈর্যধারণ করুন এবং আল্লাহ তা'আলার সাহায্য কামনা করুন। যালিমের যুলুম নিতান্ত সাময়িক। আল্লাহ তা'আলা তাকে অবকাশ দিয়ে রাখেন। নির্দিষ্ট সময়ে তাকে কঠোরভাবে পাকড়াও করা হবে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলার ঘোষণা:

وَلَا تَحْسَبَنَّ اللَّهَ غَافِلًا عَمَّا يَعْمَلُ الظَّلِمُونَ * إِنَّمَا يُؤَخِّرُهُمْ لِيَوْمٍ تَشْخَصُ فِيهِ الْأَبْصَارُ [إبراهيم: ٤٢]

অর্থ: 'তুমি কিছুতেই মনে করো না, জালিমদের কৃতকর্ম সম্পর্কে আল্লাহ বেখবর। তিনি তো তাদের সে দিন পর্যন্ত অবকাশ দিচ্ছেন, যে দিন চক্ষুসমূহ থাকবে বিস্ফারিত।' (ইবরাহীম, ১৪: ৪২)

১১. চারপাশে যদি যালিম ও যুলুমের অবাধ ছড়াছড়ি ও উদ্দাম প্রদর্শনী চলতে থাকে তাহলে শান্তি ও নিরাপত্তার শহরে হিজরত করুন। অনেক মহামনীষীই নিপীড়ন-নিগ্রহের শিকার হয়ে, যালিমের জনপদ ছেড়ে নিরাপদ শহরে সফর করেছেন।

১২. বুখারী ও মুসলিম শরীফের এ হাদীসটি মনে রাখুন:
دَخَلَتِ امْرَأَةُ النَّارَ فِي هِرَّةِ رَبَطَتْهَا، فَلَمْ تُطْعِمْهَا، وَلَمْ تَدَعْهَا تَأْكُلُ مِنْ خَشَاشِ الْأَرْضِ» (صحيح البخاري) ٤ /١٣٠
অর্থ: 'এক মহিলা শুধু এ কারণে জাহান্নামী হয়েছে যে, সে একটা বিড়ালকে আটকে রেখেছিল। নিজে বিড়ালটাকে খেতে দেয়নি। তাকে জমিনে চড়ে খাবার সংগ্রহ করে খাওয়ার সুযোগও দেয়নি।' (বুখারী, ৪/১৩০) একটু চিন্তা করে দেখুন, অতি নগণ্য প্রাণী বিড়াল আটকে রাখার অপরাধে আল্লাহ তা'আলা মহিলাটিকে জাহান্নামের আযাব দিয়েছেন। আর যে সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি মানুষের ওপর যুলুম করবে তার পরিণতি কত ভয়াবহ হতে পারে!

১৩. সদাচার ও ন্যায়পরায়ণতা প্রতিষ্ঠা করা হলো মহান আল্লাহ তা'আলার নির্দেশ। এর সুফল সুদূরপ্রসারী। পবিত্র কুরআনের বাণী:
﴿إِنَّ اللهَ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ وَالْإِحْسَانِ﴾ [النحل: ৯০]
অর্থ: 'নিশ্চয়ই আল্লাহ তা'আলা ইনসাফ ও দয়ার আদেশ করেন।' (সূরা নাহল, ১৬: ৯০)

১৪. আচার-উচ্চারণে, আচরণ-বিচরণে নীতিবান ও ন্যায়ানুগ হোন। তাতে আল্লাহ তা'আলার রহমত ও সন্তুষ্টি অর্জিত হবে। আল্লাহর লানতের ব্যাপারে সতর্ক থাকুন। কেননা যালিমদের ওপর তাঁর লানত অবধারিত। পবিত্র কুরআনের সতর্কবাণী:
﴿أَلا لَعْنَةُ اللهِ عَلَى الظَّلِمِينَ ﴾ [هود: ١٨]
অর্থ: 'সকলে শুনে নিক, ওই জালেমদের ওপর আল্লাহর লানত।' (সূরা হুদ, ১১: ১৮)

১৫. আপন সন্তান ও পরিবারের কল্যাণ বিবেচনা করে হলেও যুলুম থেকে বিরত থাকুন। মানুষের ওপর আপনি অন্যায়-অবিচারে প্রবৃত্ত হবেন; তার পরিণতিতে আপনার পরিবারের সদস্যগণ তাদের খারাপ নিশানায় পরিণত হবে, লোকদের দ্বারা যুলুম-নির্যাতনের শিকার হবে। এটাই প্রকৃতির অবধারিত নীতি-যেমন কর্ম তেমন ফল। তাছাড়া মানুষের স্বভাবজাত প্রবণতা হলো, সে যখন কারো সাথে পেরে না ওঠে তখন প্রতিপক্ষের আবেগ-অনুভূতি ও দুর্বলতার জায়গায় আঘাত করে তাকে ঘায়েল করার চেষ্টা করে।

১৬. সন্তানদের কুরআন-সুন্নাহর আদর্শ ও ঈমানী দীক্ষায় গড়ে তুলুন। তাদের সদাচার ও ন্যায়পরায়ণতায় অনুপ্রাণিত করুন। অন্যায় যুলুমের ব্যাপারে তাদের মনে ঘৃণাবোধ সৃষ্টি করুন।

১৭. যদি যুলুম প্রতিরোধের শক্তি না থাকে তাহলে অন্তরে তা ঘৃণা করুন। যালিমের সঙ্গ বেঁচে থাকুন। কখনো তার প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করবেন না, তার পক্ষে একবিন্দুও ঝুঁকবেন না, নচেৎ জাহান্নামের কঠিন আযাবের আশঙ্কা রয়েছে। পবিত্র কুরআনের নির্দেশ:

وَلا تَرْكَنُوا إِلَى الَّذِينَ ظَلَمُوا فَتَمَسَّكُمُ النَّارُ وَمَا لَكُمْ مِنْ دُونِ اللَّهِ مِنْ أَوْلِيَاءَ ثُمَّ لَا تُنْصَرُونَ﴾ [هود: ۱۱۳]

অর্থ: ‘(হে মুসলিমগণ!) তোমরা ওই জালেমদের দিকে একটুও ঝুঁকবে না, অন্যথায় কখনও জাহান্নামের আগুন তোমাদেরকেও স্পর্শ করবে এবং আল্লাহ ছাড়া তোমাদের কোনও বন্ধু থাকবে না। আর তখন কেউ তোমাদের সাহায্যও করবে না।’ (সূরা হুদ, ১১: ১১৩)

১৮. প্রকৃত হকদারকে তার পাওনা বুঝিয়ে দিতে হবে এবং সব ধরনের যুলুম অবিচার থেকে বিরত থাকতে হবে। সৃষ্টির শুরু থেকেই আল্লাহ তা'আলার নিকট ক্ষুদ্র থেকে বৃহৎ-প্রতিটি প্রাণীর মর্যাদা হক্ব ও মর্যাদা রয়েছে। মানুষের হক্ব ও মর্যাদা আরও বেশি। তার দেহ-শরীর, অর্থ-সম্পদ ও ইজ্জত আবরু তার মতোই সমান মর্যাদাপূর্ণ। রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর পবিত্র যবানে সুস্পষ্ট ঘোষণা শুনুন:

أَلَا إِنَّ اللَّهَ حَرَّمَ عَلَيْكُمْ دِمَاءَكُمْ وَأَمْوَالَكُمْ، كَحُرْمَةِ يَوْمِكُمْ هَذَا، فِي بَلَدِكُمْ هَذَا، فِي شَهْرِكُمْ هَذَا، أَلَا هَلْ بَلَّغْتُ؟ قَالُوا: نَعَمْ، قَالَ: "اللَّهُمَّ اشْهَدْ". (صحيح البخاري) ٥ / ١٧٧

অর্থ: '(হে উপস্থিত জনমণ্ডলী, আজকের এই দিন (জুমার দিন), এ মাস (জিলহজ মাস) ও এ শহর (মক্কা) যেমন পবিত্র; তোমাদের জানমাল, ইজ্জত-আবরু, মান-সম্মান (কিয়ামত পর্যন্ত) এমনই পবিত্র। আমি কি তোমাদের নিকট আল্লাহর দ্বীন পৌঁছে দিয়েছি?' সাহাবাগণ বললেন, 'হ্যাঁ (ইয়া রাসূলুল্লাহ)।' রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, 'হে আল্লাহ! আপনি সাক্ষী থাকুন।' (বুখারী, ৫/১৭৭)

১৯. অত্যন্ত সতর্ক থাকুন, কিয়ামতের দিন হাশরের ময়দানে যখন আপন রবের সামনে দাঁড়াবেন তখন যেন আল্লাহর কোনো বান্দা, এমনকি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কোনো নগণ্য প্রাণীর ওপর যুলুমের বোঝা বহন করতে না হয়, নচেৎ আক্ষেপ-অনুতাপ ও বরবাদি ছাড়া কোনো উপায় থাকবে না। পবিত্র কুরআনের বাণী:
وَ عَنَتِ الْوُجُوْهُ لِلْحَيِّ الْقَيُّوْمِ وَقَدْ خَابَ مَنْ حَمَلَ ظُلْمًا
অর্থ: 'আল-হায়্যুল কায়্যুমের সামনে সকল চেহারা নত হয়ে থাকবে। আর যে-কেউ যুলুমের ভার বহন করবে, সে-ই ব্যর্থকাম হবে।' (ত্বহা, ২০: ১১১)

২০. যুলুম-নির্যাতন এমন জঘন্য অপরাধ, ইহকালেই এর করুণ পরিণতি ভোগ করতে হয়। কেননা যালিম আল্লাহ তা'আলার ক্রোধের পাত্রে পরিণত হয়। তাছাড়া মাযলুমের বদ দু'আ ও আল্লাহ তা'আলার আরশের মধ্যে কোনো আবরণ থাকে না। তার জন্য আসমানের সমস্ত দরজা খুলে দেওয়া হয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ মাযলুমের দু'আর ব্যাপারে সতর্ক করে বলেছেন:

ثَلَاثُ لَا تُرَدُّ دَعْوَتُهُمْ، الإِمَامُ العَادِلُ، وَالصَّائِمُ حِيْنَ يُفْطِرُ، وَدَعْوَةُ المَظْلُومِ يَرْفَعُهَا فَوْقَ الغَمَامِ، وَتُفَتَّحُ لَهَا أَبْوَابُ السَّمَاءِ، وَيَقُولُ الرَّبُّ عَزَّ وَجَلَّ: وَعِزَّتِي لَأَنْصُرَنَّكِ وَلَوْ بَعْدَ حِيْنٍ. (سنن الترمذي) ٦٧٣/٤

অর্থ: 'তিন ব্যক্তির দু'আ বৃথা যায় না: (এক.) ন্যায়পরায়ণ বাদশাহ। (দুই.) ইফতারের সময় রোযাদারের দু'আ। (তিন.) পীড়িত ও মাযলুমের দু'আ। আল্লাহ তা'আলা তা মেঘের ওপর উঠিয়ে নেন। তার জন্য আসমানের দরজাসমূহ খুলে দেওয়া হয়। আল্লাহ তা'আলা (মাযলুমের দু'আয়) সাড়া দিয়ে বলেন: 'হে আমার বান্দা, কিছুটা বিলম্বে হলেও অতি অবশ্যই তোমাকে সাহায্য করব!'

২১. সর্বদা মনে রাখুন, কিয়ামতের দিন বিচার দিবসে আল্লাহ তা'আলার সামনে দাঁড়াতে হবে। অন্যায়-অবিচার করে ইহকালে কোনোভাবে পার পেয়ে গেলেও পরকালে আল্লাহ তা'আলার ন্যায়বিচার থেকে কোনো নিস্তার নেই। পবিত্র কুরআনের ঘোষণা:

﴿وَقُضِيَ بَيْنَهُمْ بِالْحَقِّ وَهُمْ لَا يُظْلَمُوْনَ * وَوُفِّيَتْ كُلُّ نَفْسٍ مَّا عَمِلَتْ وَهُوَ أَعْلَمُ بِمَا يَفْعَلُوْনَ﴾ [الزمر: 69، 70]

অর্থ: 'মানুষের মধ্যে ন্যায়বিচার করা হবে। তাদের ওপর কোন যুলুম করা হবে না। প্রত্যেককে তার কৃতকর্মের পূর্ণ প্রতিফল দেওয়া হবে। আর তারা যা করে সে সম্পর্কে আল্লাহ পরিপূর্ণ জ্ঞাত।' (সূরা যুমার, ৩৯: ৬৯-৭০)

২২. দেহের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, বিশেষভাবে যবান ও হাত দু'টিকে সবধরনের যুলুম-অত্যাচার থেকে বিরত থাকুন। এটিই প্রকৃত মুসলমানের আদর্শ। হাদীসে বর্ণিত হয়েছে: «الْمُسْلِمُ مَنْ سَلِمَ الْمُسْلِمُوْনَ مِنْ لِسَانِهِ وَيَدِهِ». অর্থ: 'প্রকৃত মুসলমান সেই, যার যবান ও হাত থেকে অন্যান্য মুসলমান নিরাপদ থাকে।' (বুখারী, ৮/১০২)

২৩. কারো ন্যায্য অধিকার ক্ষুণ্ণ করা থেকে বিরত থাকুন। সময় মতো প্রত্যেককে তার পাওনা বুঝিয়ে দিন। এ ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর উম্মতকে সতর্ক করে বলেছেন:

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم: "مَنْ كَانَتْ لَهُ مَظْلَمَةٌ لِأَحَدٍ مِنْ عِرْضِهِ أَوْ شَيْءٍ فَلْيَتَحَلَّلْهُ مِنْهُ الْيَوْمَ، قَبْلَ أَنْ لَا يَكُونَ دِينَارُ وَلَا درهم". (صحيح البخاري، ٢٤٤٩)

অর্থ: আবূ হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের সম্ভ্রমহানি বা অন্য কোন বিষয়ে যুলুমের জন্য দায়ী থাকে, সে যেন আজই তার কাছ হতে মাফ করিয়ে নেয়, সে দিন আসার পূর্বে যে দিন তার কোন দীনার বা দিরহাম থাকবে না।' (সহীহ বুখারী, হাদীস নং: ২৪৪৯)

পরিশিষ্ট:
হিজরি চতুর্থ শতাব্দী। বাগদাদের শাসক ছিল ভীষণ অহংকারী, যালিম স্বেচ্ছাচারী। জনগণকে লাঞ্ছিত অপদস্ত করা ছিল তার স্বভাবজাত। প্রজাসাধারণের ওপর যুলুম-নির্যাতন ছিল নিত্য-নৈমিত্তিক ব্যাপার।

তারই শহরে বাস করত দরিদ্র নিঃস্ব ভগ্ন দেহের এক বৃদ্ধা। সহায়-সম্বল বলতে তার একখণ্ড কৃষি জমি। যালিম শাসকের সাঙ্গ-পাঙ্গরা একদিন রীতিমতো বৃদ্ধার শেষ সম্বল কৃষি জমিটাই জবরদখল করে নিল। নিরুপায় বৃদ্ধা শাসকের নিকট অনুযোগ করল। তার ওপর হওয়া অন্যায়-অবিচারের সুবিচার চেয়ে আরজি জানাল। শাসক তার স্বভাবজাত অহংপুষ্ট ভঙ্গিমায় ও তাচ্ছিল্যের সুরে বলল:
'যাও, রাতের শেষ ভাগে দু'আ করে দেখ, দেখি কী করতে পারো?'

বৃদ্ধার আর বোঝার বাকি রইল না। বিচার না পাওয়ার হতাশা ও চাপা ক্ষোভ নিয়েই তাকে ফিরে আসতে হলো। শুধু বলে এল: 'সুপরামর্শ দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।'

সে রাতের শেষ প্রহরে বৃদ্ধা আল্লাহ তা'আলার দরবারে যুলুমের বিচার চেয়ে শাসকের নামে বদ দু'আ করল। কিছু কালের মধ্যেই আব্বাসী খলিফা কর্তৃক বাগদাদের শাসক পরাজিত হলো। পালাবারও সুযোগ পেল না। কারাবন্দি হলো।

প্রথম জুমার দিন আব্বাসী খলিফা জনসম্মুখে পরাজিত শাসকের হাত কেটে ফেলার হুকুম করলেন। তৎক্ষণাৎ পূর্ববর্তী যালিম শাসকের হাত কেটে ফেলা হলো। দ্বিতীয় জুমায় আব্বাসী খলিফা তার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডাদেশ জারি করলেন। খবর পেয়ে বৃদ্ধা বেরিয়ে এল। যালিম শাসককে মৃত্যুমঞ্চে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বলল: 'আপনাকে আবারও ধন্যবাদ জানাচ্ছি, রাতের শেষ প্রহরে দু'আ করার সুপারিশ দেওয়ার জন্য।'

এরপর বৃদ্ধা এ কবিতা আওড়ালো :
إِذَا جَارَ الوَزِيرُ وَكَاتِبَاهُ وَقَاضِي الأَرْضِ أَجْحَفَ فِي الْقَضَاءِ
فَوَيْلٌ ثُمَّ وَيْلٌ ثُمَّ وَيْلٌ لقَاضِي الْأَرْضِ مِنْ قَاضِي السَّمَاءِ
অর্থ: 'শাসক ও উযির-নাযির যদি যালেম হয়, যমীনের বিচারক যদি অবিচারী হয়, তাহলে আসমানের ফায়সালাকারীর পক্ষ থেকে তার ধ্বংস ও বরবাদি অনিবার্য।'

ফ্রান্সের দার্শনিক ও বহুবিদ্যাবিশারদ গুস্তাভে লে বোন (১৮৪১-১৯৩০ খ্রি.) তাঁর রচিত 'আরব-সভ্যতা' নামক বইয়ে লিখেছেন:
'আরবদের চেয়ে ন্যায়পরায়ণ ও দয়ালু বিজেতা ইতিহাস আর দেখেনি।'

যুলুম-অত্যাচার, বিদ্বেষ-শত্রুতা ও বিপদের মুহূর্তে বন্ধুকে একা ফেলে যাওয়া ইত্যাদি প্রসঙ্গে কবি ইবনে রুমি (২২১-২৮৩ হি.) বলেন:
وزَهَدَنِي فِي النَّاسِ مَعْرِفَتِي بِهِم وطول اختباري صاحباً بعد صاحب
فلم تُرني الأيام خلا يسرني بواديه إلا ساءني في العواقب
ولا صرت أدعوه لدفع ملمة من الدهر إلا كان إحدى النوائب
অর্থ: 'সুদীর্ঘ জীবনের অভিজ্ঞতা ও মানুষের আসল পরিচয় আমাকে তাদের থেকে বিমুখ করেছে। জীবনে এ যাবৎ কাল এমন কোনো বন্ধুর দেখা পেলাম না, যার ওপর ভরসা করতে পারি, যাকে দেখে আশ্বস্ত হতে পারি। যাকেই অন্তরঙ্গ ও পরম হিতাকাঙ্ক্ষী মনে হয়েছে তার সাথে পরিণতি খুব একটা সুখকর হয়নি। চরম বিপদের মুহূর্তে আমি তার সাহায্য প্রত্যাশা করেছি। কিন্তু তার স্বার্থপরতা আমার সামনে নতুন বিপদ দাঁড় করিয়েছে।'

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00