📘 আল হাল্লু জীবন সমস্যার সমাধান > 📄 নেতিবাচক মানসিকতা

📄 নেতিবাচক মানসিকতা


নেতিবাচক মানসিকতা হলো, জীবনে যা কিছু অনভিপ্রেত অনাকাঙ্ক্ষিত, যত বাধা-বিপত্তি, ফিরে ফিরে সেগুলোকে বড় করে দেখা। আর সমস্ত সফলতা, সুখশান্তির ক্ষেত্রগুলোকে এড়িয়ে যাওয়া, কিংবা খাটো করে দেখা।

নেতিবাচক প্রবণতা মূলত একটা মানসিক ব্যাধি। ব্যক্তির মন-মানসিকতায় যখন তা দানা বাঁধতে শুরু করে সাদা চোখে ধরা পড়ে না। পর্যায়ক্রমে এ ব্যাধি শিকড়-বাকড় ছড়াতে থাকে। ডালপালা গজাতে থাকে। একপর্যায়ে প্রবল হতে প্রবল আকার ধারণ করে। ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে জটিল সংকট সৃষ্টি করে।

ভুক্তভোগী প্রথমে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে নেতিবাচক মানসিকতায় ভাবতে শুরু করে। তারপর কোনো বিষয়ের সুদূরসম্ভাব্য ও কল্পিত অশুভ দিকগুলো খুঁটে খুঁটে দেখে। অশুভ দিকগুলোই তার কাছে মুখ্য হয়ে ওঠে। ইতিবাচক দৃষ্টিতে ও কল্যাণপ্রত্যাশী মানসিকতায় সে কোনো কিছুই ভেবে উঠতে পারে না।

এভাবে নেতিবাচক মানসিকতা যখন তার মজ্জাগত হয়ে প্রকট আকার ধারণ করে, তার কাছে জীবনের কোনো সফলতার মূল্য থাকে না। মনে হতে থাকে, সুখ-শান্তি নিতান্তই সাময়িক, কিছু দিন পর তা হারিয়ে যাবে। দুঃখ-বেদনা ও কষ্ট-যাতনাই হলো জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

সুখময় সফল জীবন-যাপনের জন্য নেতিবাচক মানসিকতা পরিহার করা অপরিহার্য। কিন্তু এর উপায় কী? এর সঠিক সমাধান কী?

সমাধান:
১. যে সত্তা আপনাকে সৃষ্টি করেছেন, রিযিক দান করেছেন তিনি আপনার অমঙ্গলের ফায়সালা করতে পারেন না। সুতরাং মহান আল্লাহর ওপর ভরসা রাখুন। পবিত্র কুরআনের বাণী:

﴿وَعَلَيْهِ فَلْيَتَوَكَّلِ الْمُتَوَكَّلُونَ﴾ [يوسف: ٦٧]

অর্থ: 'আর যারা নির্ভর করতে চায় তাদের উচিত তাঁরই ওপর নির্ভর করা।' (ইউসুফ, ১২: ৬৭)

২. আপন রবের প্রতি সুধারণা পোষণ করুন। আল্লাহ তা'আলা বান্দার ধারণা অনুযায়ী তার ভালো-মন্দের ফায়সালা করেন। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, আল্লাহ তা'আলা বলেন:

أَنَا عِنْدَ ظَنِّ عَبْدِي بِي إِنْ ظَنَّ خَيْرًا فَلَهُ وَإِنْ ظَنَّ شَرًّا فله». (صحیح ابن حبان) ٢ / ٤٠٥

অর্থ: আমার প্রতি বান্দার ধারণা অনুসারে আমি তার ব্যাপারে ফায়সালা করি। সে যদি সুধারণা রাখে এর সুফল লাভ করে। আর যদি অকল্যাণের ধারণা পোষণ করে এর পরিণতি তাকেই ভোগ করতে হয়। (সহীহ ইবনে হিব্বান, ২/৪০৫)

৩. সর্বদা পজেটিভ ও ইতিবাচক মানসিকতায় ভাবতে শিখুন। যত দুঃখ-কষ্ট ও বিপদ-আপদের কবলে ধৈর্যধারণ করুন। নায-নিয়ামত ও সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের কথা স্মরণ করুন। রাসূলুল্লাহ ﷺ মু'মিন বান্দাকে সুসংবাদ প্রদান করে বলেছেন:

عَنْ صُهَيْبٍ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ: «عَجَبًا لِأَمْرِ الْمُؤْمِنِ، إِنَّ أَمْرَهُ كُلَّهُ خَيْرٌ، وَلَيْسَ ذَاكَ لِأَحَدٍ إِلَّا لِلْمُؤْمِنِ، إِنْ أَصَابَتْهُ سَرَّاءُ شَكَرَ، فَكَانَ خَيْرًا لَهُ، وَإِنْ أَصَابَتْهُ ضَرَّاءُ، صَبَرَ فَكَانَ خَيْرًا لَهُ. صحيح مسلم (٤ / ٢٢٩٥)

অর্থ: সুহায়ব (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল ﷺ বলেন, 'মু'মিনের অবস্থা কতোই না বিস্ময়কর, সকল কাজই তার জন্য কল্যাণকর। মু'মিন ছাড়া অন্য কেউ এ সৌভাগ্য অর্জন করতে পারে না। সুখে-স্বাচ্ছন্দ্যে সে আল্লাহর শোকর করে। কৃতজ্ঞতা প্রকাশ তার জন্য কল্যাণ বয়ে আনে। দুঃখ-দুর্দশাগ্রস্ত হলে ধৈর্যধারণ করে। সবর ও ধৈর্যের বিনিময়ে সে কল্যাণ লাভ করে।' (মুসলিম, ৪/২২৯৫)

৪. নিজেকে একবার জিজ্ঞেস করুন, আপনি কি গায়েবের খবরাখবর জানেন? অদূর ভবিষ্যতে কী ঘটতে চলেছে তা বলতে পারেন? তাহলে কেন অনর্থক অজানা আশঙ্কায় সংকুচিত হচ্ছেন? আপনার জীবনে কী এমন কোনো হাসি-আনন্দ ও সৌভাগ্য-সফলতা আসেনি, যা ছিল অভাবিত কল্পনাতীত? তাহলে ভবিষ্যতেও কেন সুন্দরের আশা করছেন না? সফলতার স্বপ্ন বুনছেন না? মনে রাখতে হবে, ইতিবাচক মানসিকতাই সফলতার মূল চাবিকাঠি। তাই গোলাপের কাঁটার ভয় না করে তার সুবাস সৌন্দর্য উপভোগ করুন। রাতের ঘন কালো আঁধার না দেখে আকাশের উজ্জ্বল চাঁদ ও ঝলমলে তারকারাজি লক্ষ করুন। চারপাশের সব আঁধার কেটে যাবে।

৫. পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ মানব মুহাম্মদ বিন আব্দুল্লাহ রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর আদর্শ অনুসরণ করুন। তুমুল ঝড়-ঝাপটার কবলেও তিনি ছিলেন ভীষণ আশাবাদী ও কল্যাণপ্রত্যাশী। মুসলিম উম্মাহর কঠিন সংকটকালেও তিনি রোম ও পারস্য সাম্রাজ্য বিজয়ের সুসংবাদ দান করেছিলেন।

৬. পৃথিবীর ইতিহাসে যত মহা আবিষ্কারক, জ্ঞানী-মহাজ্ঞানী ও রাজা-মহারাজা ছিলেন, তাঁদের জীবনযাপনও ছিল আপনার মতো সুখ-দুঃখ মিশ্রিত। কারো কারো পরিবেশ পরিস্থিতি ছিল আরও অধিক বিপদসংকুল ও সংকটপূর্ণ। কিন্তু তাঁরা কখনও আশা ছাড়েননি, নিরাশ হননি। শত প্রতিকূলতার মাঝেও সৌভাগ্য ও সফলতার স্বপ্ন বুকে ধারণ করে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে সচেষ্ট থেকেছেন। ফলে এক জীবনেই তারা এমন অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছেন, যা আমরা কয়েক জীবনেও সম্ভব বলে বিশ্বাস করতে পারি না।

৭. এমন বন্ধু-বান্ধব নির্বাচন করুন, যারা ভীষণ আশাবাদী ও কর্মোদ্যমী। যারা অলস অকর্মণ্য ও নিরাশাবাদী, তাদের সঙ্গ ত্যাগ করুন। নিকট আত্মীয় ও বন্ধু সমাজের দ্বারা মানসিক শক্তি অর্জন করুন। দৃঢ় মনোবল ও ধারাবাহিক কর্মপ্রচেষ্টায় বাধা-বিপত্তি কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করুন।

৮. নিশ্চিত থাকুন, বিশ্বে যা কিছু ঘটছে, পূর্বনির্ধারিত আসমানি ফায়সালার ভিত্তিতেই ঘটছে। প্রতিটি মানুষের জীবনে তাঁর নিয়তির ফায়সালা প্রতিফলিত হচ্ছে। এ বিষয়টিই রাসূলুল্লাহ ﷺ আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-কে জোর দিয়ে বলেছেন:

﴿وَاعْلَمْ أَنَّ الأُمَّةَ لَوْ اجْتَمَعَتْ عَلَى أَنْ يَنْفَعُوكَ بِشَيْءٍ لَمْ يَنْفَعُوكَ إِلَّا بِشَيْءٍ قَدْ كَتَبَهُ اللهُ لَكَ، وَلَوْ اجْتَمَعُوا عَلَى أَنْ يَضُرُّوكَ بِشَيْءٍ لَمْ يَضُرُّوكَ إِلَّا بِشَيْءٍ قَدْ كَتَبَهُ اللهُ عَلَيْكَ، رُفِعَتِ الأَقْلَامُ وَجَفَّتْ الصُّحُفُ» (سنن الترمذي ٤ / ٦٦٧)

অর্থ: জেনে রেখো, গোটা জাতি যদি তোমার কোনো মঙ্গলের উদ্দেশ্যে ঐক্যবদ্ধ হয়, আল্লাহ তা'আলা তোমার মঙ্গলের যে ফায়সালা করেছেন, তার বাইরে তারা তোমার একবিন্দু উপকারও করতে পারবে না। তারা যদি তোমার ক্ষতিসাধনে সংবদ্ধ হয়, তবুও আল্লাহর ফায়সালার বাইরে তোমার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। মানুষের ভাগ্যলিপি চূড়ান্ত এবং নিয়তির ফায়সালা অবধারিত।' (তিরমিজী, ৪/৬৬৭)

৯. মনের যত জল্পনা-কল্পনা ও দ্বিধা-সংশয় ঝেড়ে ফেলে দৃঢ় সংকল্প ও অবিচল মানসিকতায় কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে প্রয়াসী হোন। অতীতের ব্যর্থতা প্রতিকূলতা মনে করিয়ে দেয়-এমন সমস্ত বিষয় এড়িয়ে চলুন, স্মৃতির পাতা থেকে মুছে ফেলুন। আল্লাহ তা'আলার বরকত ও তাওফিকের প্রত্যাশী হয়ে নতুনভাবে শুরু করুন। নব উদ্যমে সচেষ্ট হোন। ইনশাআল্লাহ, সফলতা অবশ্যম্ভাবী।

১০. দু'আ ও ইস্তিগফারের মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলার সাহায্য প্রার্থনা করুন। সকাল-সন্ধ্যায় নির্ধারিত যিকির-ওযীফা আদায় করার পাশাপাশি অত্যন্ত মনোযোগের সঙ্গে পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত করুন। বেশি বেশি আল্লাহর যিকির করুন। হৃদয় মন প্রশান্ত হবে, অস্থিরতা ও উৎকণ্ঠামুক্ত হবে। পবিত্র কুরআনের বাণী: ﴿الَّذِينَ آمَنُوا وَتَطْمَئِنُّ قُلُوبُهُم بِذِكْرِ اللَّهِ ﴾ [الرعد: ٢٨] অর্থ: 'স্মরণ রেখ, কেবল আল্লাহর যিকিরই সেই জিনিস, যা দ্বারা অন্তরে প্রশান্তি লাভ হয়।' (সূরা রা'দ, ১৩: ২৮)

১১. নতুন কোনো উদ্যোগে ও কর্ম কল্পনা বাস্তবায়নে সচেষ্ট হোন। তাতে নিজের যোগ্যতা ও দক্ষতা যাচাই করার সুযোগ হবে। ভিন্ন প্রেক্ষাপটে নিজেকে নতুনভাবে উপলব্ধি করা যাবে। মনোবল ও আত্মবিশ্বাস আরও সমৃদ্ধ হবে।

১২. সুদূর কল্যাণপ্রসারী উদ্যোগ বাস্তবায়নে সচেষ্ট হোন। উদ্যোগ-আয়োজনের ব্যতি-ব্যস্ততা ও কর্মমুখরতা অতীতের ব্যর্থতা ও হতাশার কথা ভুলিয়ে দিবে। প্রকৃত বুদ্ধিমান ও বিচক্ষণ বিফলতাকে সফলতায় ও হতাশাকে সাহসিকতায় রূপান্তরিত করে, বাধা-প্রতিবন্ধকতার কবলে ভেঙে পড়ে বিপদের ওপর বিপদ ডেকে আনে না।

১৩. যে পরিবেশ পরিস্থিতি, যাদের সংস্পর্শ ও কাজকর্ম আপনার নেতিবাচক মানসিকতার প্রধান কারণ বলে মনে করেন, তাদের থেকে সরে দাঁড়ান। আপনজন কিংবা বন্ধুজনদের সাথে মনোমুগ্ধকর পরিবেশে দর্শনীয় স্থানে ঘুরে আসুন। এতে মন-মানসিকতা প্রফুল্ল প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে। নতুনভাবে আত্মবিশ্বাস ফিরে পাবেন। দায়দায়িত্বে পেশাদারিত্ব ও উদ্দীপনার মানসিকতা সৃষ্টি হবে।

১৪. পত্র-পত্রিকা ও সোস্যাল মিডিয়ার অজস্র নেতিবাচক সংবাদ ও ভীতিপ্রদ খবরাখবরের ছড়াছড়ি-এ সমস্তই এড়িয়ে চলুন। ইতিবাচক সংবাদ, সফল ব্যক্তিদের সফলতার ঘটনা পড়ুন।

১৫. নেতিবাচক মানসিকতার কবলে চারপাশের সমাজ-বিচ্ছিন্ন হয়ে একাকিত্বে পড়ে থাকবেন না। আশাবাদী, কর্মোদ্যমী ও স্বপ্নবান ব্যক্তিবর্গের সংস্পর্শে থাকুন। তাদের সংস্পর্শ আপনার মনে সাহস সঞ্চার করবে। আপনাকে প্রাণবন্ত উজ্জীবিত করে তুলবে।

১৬. সুসংবাদ গ্রহণ করুন, আগামীর দিনগুলো আরও সুন্দর সফল হবে। কেননা আপনি মহান আল্লাহর তত্ত্বাবধানে ও তাঁর রক্ষণাবেক্ষণে আছেন। তিনি কিছুতেই আপনাকে নিরাশ করবেন না। রিযিক থেকে বঞ্চিত করবেন না। সুতরাং সফলতা ও সৌভাগ্যের প্রত্যাশা করুন। আল্লাহ তা'আলা আশাবাদী ও স্বপ্নবান ব্যক্তিদের ভালোবাসেন। তাদেরকে তাদের আশানুরূপ দান করেন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলার প্রতিশ্রুতি:

﴿وَاللَّهُ يَعِدُكُمْ مَّغْفِرَةً مِّنْهُ وَفَضْلًا وَاللَّهُ وَاسِعٌ عَلِيمٌ﴾

অর্থ: 'আল্লাহ তোমাদেরকে স্বীয় মাগফিরাত ও অনুগ্রহের প্রতিশ্রুতি দেন। আল্লাহ অতি প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ।' (বাকারা, ২: ২৬৮)

১৭. আপনার প্রতি আমার সর্বশেষ উপদেশ হলো, 'চোখ থেকে “কালো” চশমাটা খুলে ফেলুন। মন থেকে নেতিবাচক ধ্যান-ধারণা ঝেড়ে ফেলুন। জীবনটাকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখতে শিখুন। পজেটিভ দৃষ্টিভঙ্গিতে আপনার জীবনটাকে রাঙিয়ে তুলুন। জীবনের পটভূমি তো আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিরই বাস্তব প্রতিফলন মাত্র।

পরিশিষ্ট:
* লেবাননের বিখ্যাত আরব কবি ইলিয়া আবূ মাযী (১৮৮৯-১৯৫৭ খ্রিষ্টাব্দ) বলেছেন:
قَالَ: السَّمَاءُ كَثِيْبَةً وَتَجَهما قُلْتُ: ابْتَسِم يَكْفِي التَّجَهُمَ فِي السَّمَا!
قَالَ: الصَّبَا وَلَّى فَقُلْت لَهُ : ابْتَسِمْ! لَنْ يَرْجِعَ الْأَسْفُ الصَّبَا المُتَصَرِّما.
অর্থ: সে বলল, 'আকাশ বিষণ্ণ গোমরা হয়ে আছে।' বললাম, 'তুমি হাস্যবদন থাক। আকাশের বিষণ্ণতা গোমরাভাব মুহূর্তেই কেটে যাবে।' সে বলল, 'শৈশব অতীত হলো! যৌবন ফুরিয়ে গেল!' বললাম, 'হাসিমুখে পৌঢ়ত্বের ভার গ্রহণ কর। তোমার আক্ষেপ অতীত শৈশব ও হারানো যৌবন ফিরিয়ে দিতে পারবে না।'

* আমেরিকান ফোর্ড মটর কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা হেনরি ফোর্ড (১৮৬৩- ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দ) বলেছেন: 'একটি ক্ষেত্রে আপনার বিশ্বাস আপনি পারবেন, আর একটি ক্ষেত্রে আপনার ধারণা, আপনি পারবেন না। দু'টি ক্ষেত্রেই দেখবেন, আপনার বিশ্বাস ও ধারণাটাই সত্যে প্রমাণিত হয়েছে।'

* মাইক্রোসফটের প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক সফটওয়্যার নির্মাতা বিল গেটস বলেছেন: 'ইউনিভার্সিটির কয়েকটি সাবজেক্টে ফেল করেছি; কিন্তু আমার বন্ধুটি বেশ সাফল্যের সাথেই পাশ করেছে। এখন সে মাইক্রোসফট কোম্পানির ইঞ্জিনিয়ার। আর আমি কোম্পানির স্বত্বাধিকারী।'

* প্রখ্যাত আমেরিকান সাহিত্যিক ও চিন্তাবিদ প্রেন্টাইস মুলফোর্ড (১৮৩৪- ১৮৯১ খ্রিষ্টাব্দ) বলেছেন: 'যে ব্যক্তি শুধু জীবনের নেতিবাচক দিকগুলোকেই বড় করে দেখে, অতীতের দুঃখ-দুর্দশার ভাবনায় ডুবে থাকে, ভবিষ্যতেও সে অনুরূপ প্রতিকূল পরিস্থিতির অজানা আশঙ্কায় ভুগতে থাকে। একপর্যায়ে সে অন্ধকার ভবিষ্যৎ ছাড়া আর কিছুই দেখতে পায় না। তখন তার নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিই বাস্তবে প্রতিফলিত হয়। পদে পদে সে নানা প্রতিবন্ধকতা ও প্রতিকূলতার শিকার হয়।'

📘 আল হাল্লু জীবন সমস্যার সমাধান > 📄 রাগ-ক্রোধ

📄 রাগ-ক্রোধ


রাগ-ক্রোধ হলো দৈনন্দিন জীবনের এক জটিল সমস্যা ও মারাত্মক ব্যাধি। এ স্বভাবজাত রিপু মানুষের মাঝে আজ ব্যাপক ও প্রকট আকার ধারণ করেছে।

ব্যক্তি যখন কোনো কিছুতে অসন্তুষ্ট ও বিরক্ত হয় তার মধ্যে রাগের উদ্রেগ ঘটে, ক্রোধ সঞ্চারিত হয়। রাগের বশবর্তী হয়ে মানুষ গালমন্দ, অভিশাপ, ঘাত-প্রতিঘাত, যুদ্ধ-বিগ্রহ, ডিভোর্স ও সম্পর্কচ্ছেদের মতো জঘন্য কাজ করতেও কুণ্ঠাবোধ করে না।

পৃথিবীতে বহু অন্যায়-অনাচার, যুলুম-নির্যাতন, ধ্বংস ও হত্যাযজ্ঞের নেপথ্য কারণ ছিল ভীষণ রাগ ও প্রচণ্ড ক্ষোভ। ক্রোধের মতো সুদূর অকল্যাণপ্রসারী ও দ্রুত ক্রিয়াশীল মানবপ্রবৃত্তি দ্বিতীয়টি নেই। কেননা তা ব্যক্তির কাজকর্ম, দায়-দায়িত্ব পালন হতে শুরু করে আচার-ব্যবহার সর্বত্র ক্রীয়াশীল হয়ে থাকে। এ যেন এক সর্বনাশা ক্যান্সার ব্যাধি। যার ধ্বংসাত্মক জীবাণুগুলো দেহের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে।

অতিরিক্ত ক্রোধের কারণে হৃদস্পন্দন ও রক্তচাপ বাড়তে থাকে। হার্টঅ্যাটাক ও মস্তিষ্কের রক্তক্ষরণের মতো প্রাণঘাতী রোগের ঝুঁকি বাড়ে। মাত্রাতিরিক্ত ক্রোধের কারণে পাকস্থলীর কোষগুলো উজ্জীবিত হয়ে ওঠে। সঙ্গে সঙ্গে এসিড নির্গমনের পরিমাণও বেড়ে যায়।

রাগ ও ক্ষোভের কারণে মানুষ শুভবুদ্ধি চর্চার প্রাণশক্তি হারিয়ে ফেলে। পরিবার-পরিজন, সমাজ ও বন্ধুজনের কাছে অসহ্য হয়ে ওঠে। কেউ তাকে সহ্য করতে পারে না। তার রগচটা স্বভাবের কারণে সবাই তটস্থ থাকে। সমাজের সঙ্গে সে যতই মিলেমিশে চলার চেষ্টা করুক, প্রত্যেকেই তার সাথে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে চলে। একপর্যায়ে ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবন ভীষণ অস্বস্তিকর লাগে।

সুস্থ স্বাভাবিক জীবনযাপন করার জন্য রাগ ও ক্ষোভের মানসিকতা পরিহারের বিকল্প নেই। কিন্তু এর উপায় কী? এ সঠিক পথ ও পন্থা কী?

সমাধান:
১. রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর আদেশ মান্য করুন। যেমনটি হাদীসে বর্ণিত হয়েছে: عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ، أَنَّ رَجُلًا قَالَ لِلنَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: أَوْصِنِي، قَالَ: «لَا تَغْضَبْ فَرَدَّدَ مِرَارًا، قَالَ: «لَا تَغْضَبْ» (صحيح البخاري) ٢٨/٨
অর্থ: আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, এক ব্যক্তি নবী ﷺ-এর নিকট বলল, 'আপনি আমাকে অসিয়ত করুন।' তিনি বললেন, 'তুমি রাগ করো না।' লোকটি কয়েকবার তা বললেন। নবী ﷺ প্রত্যেকবারই বললেন, 'রাগ করো না।' (বুখারী, ৮/২৮)

২. জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে, প্রতিটি অঙ্গনে এ দিকনির্দেশনা অনুযায়ী চলুন-আপনার সহপাঠী বা সহকর্মীদের বলে দিন, রাগের মুহূর্তে তারা যেন আপনাকে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর হাদীসের নিষেধাজ্ঞার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। এর মাধ্যমে তারাও প্রতিদানপ্রাপ্ত হবে।

৩. রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাদের ক্রোধ দমন করার পদ্ধতি বাতলে দিয়েছেন। তা হলো, ভীষণ রাগের মুহূর্তে ওযু করুন। পানি যেমন আগুন নিভিয়ে দেয়, তেমনই মনের চাপা ক্ষোভ ও উত্তেজনা প্রশমিত করে। নিজের অবস্থান পরিবর্তন করুন। যদি দাঁড়িয়ে থাকেন বসে পড়ুন। যদি বসে থাকেন শুয়ে পড়ুন। অথবা স্থান ত্যাগ করুন এবং أَعُوْذُ بِاللَّهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّحِيمِ পাঠ করুন।

৪. রাগের সময় চুপ থাকুন। কোনো কথা বলা থেকে বিরত থাকুন। রাগের মাথায় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা, কোনো প্রকার আর্থিক লেনদেন ও চুক্তি করা সমীচীন নয়। কেননা রাগের মাথায় সিদ্ধান্ত ও মতামত-কোনোটাই ন্যায়ানুগ ও যথার্থ হতে পারে না। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: وَإِذَا غَضِبَ أَحَدُكُمْ فَلْيَسْكُتْ».
অর্থ: 'তোমাদের কেউ যখন রাগ করে সে যেন চুপ থাকে।' (মুসনাদে আহমাদ, ৪/৩৯)

৫. রাগ করার আগে একবার ভাবুন, রাগ মানুষকে গুনাহে লিপ্ত করে। তার নেক আমল বরবাদ করে। ব্যক্তির সুনাম-সুখ্যাতি ও মান-মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করে। পরিচিতজন ও বন্ধুদের সাথে সম্পর্কের অবনতি ঘটায়। সর্বোপরি রাগান্বিত ব্যক্তিকে আল্লাহর ক্রোধের পাত্রে পরিণত করে।

৬. ক্রোধ দমন করা এবং ক্ষমা ও সহনশীলতার আচরণের বিরাট ফযিলত ও প্রতিদানের কথা চিন্তা করুন। মহান রাব্বুল আলামীনের তরফ থেকে প্রতিদান লাভের প্রত্যাশাই আপনাকে রাগ ও ক্ষোভের মানসিকতা বর্জনে উদ্বুদ্ধ করবে।

৭. অধস্তন ও নিম্নবর্গের ওপর আপনার যে কর্তৃত্ব ও ক্ষমতা, আল্লাহ তা'আলা আপনার ওপর তার চেয়ে নিরঙ্কুশ ও একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী। তাই শান্তি ও প্রতিশোধের ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও ক্ষমাসুন্দর আচরণ করুন। আল্লাহ তা'আলা আপনার ওপর রহম করবেন। হাদীসে বর্ণিত হয়েছে: «الرَّاحِمُونَ يَرْحَمُهُمُ الرَّحْمَنُ، ارْحَمُوا مَنْ فِي الْأَرْضِ يَرْحَمْكُمْ مَنْ فِي السَّمَاءِ». (سنن الترمذي) ٣/٣٨٨ অর্থ: 'দয়ার্দ্র ব্যক্তিদের ওপর পরম দয়ালু সত্তা (আল্লাহ তা'আলা) রহম করেন। তোমরা যমীনবাসীর ওপর রহম কর। আসমানে বিরাজমান সত্তা তোমাদের ওপর রহম করবেন।' (তিরমিজী, ৩/৩৮৮)

৮. যদি রাগের উদ্রেগ হয় তাহলে তাসবীহ পাঠ করুন। রাগ প্রশমিত হতে থাকবে। মন-মানসিকতা প্রশান্তি ও প্রফুল্লতায় ভরে উঠবে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা তাসবীহের আমলের সঙ্গে মানসিক প্রশান্তি জুড়ে দিয়েছেন। পবিত্র কুরআনের ভাষায়: ﴿وَمِنْ أَنَاءِ اللَّيْلِ فَسَبِّحُ وَأَطْرَافَ النَّهَارِ لَعَلَّكَ تَرْضَى﴾ [طه: ١٣٠] অর্থ: 'সূর্যোদয়ের পূর্বে, সূর্যাস্তের পূর্বে এবং তাসবীহ পাঠ কর রাতের কিছু অংশে ও দিনের প্রান্তসমূহে, যাতে তুমি সন্তুষ্ট হতে পার।' (ত্বহা, ২০: ১৩০)

৯. রাগ ও ক্ষোভের কারণে যে মানসিক ও শারীরিক ক্ষতির শিকার হবেন, তা কি কখনো ভেবে দেখেছেন? দুশ্চিন্তা-বিষণ্ণতা, মানসিক সংকীর্ণতা, আক্ষেপ-অনুতাপ-এসবই রাগ করার অশুভ পরিণতি। এ ছাড়াও ব্লাডপ্রেসার, হার্টঅ্যাটাক, ব্রেইন স্ট্রোক ও মস্তিষ্কের রক্তক্ষরণের মতো প্রাণঘাতী রোগের ঝুঁকি বাড়তে থাকে।

১০. রাগ প্রশমিত করার চর্চা করুন। রাগের উদ্রেগ হওয়া মাত্র নাক দিয়ে টেনে লম্বা শ্বাস গ্রহণ করুন। কয়েক সেকেন্ড শ্বাস ধরে রেখে মুখ দিয়ে ধীরে ধীরে নিশ্বাস ত্যাগ করুন। এভাবে কয়েকবার করুন, দেহ-মন উভয়ই প্রশান্ত হবে।

১১. অন্যদের সম্মান বজায় রাখুন। তাদের প্রতি সুধারণা পোষণ করুন। অধীন ও নিম্নবর্গের লোকদের কথা ধৈর্যের সঙ্গে মনোযোগ দিয়ে শুনুন। তাদের ওজর-আপত্তি কবুল করুন। সময় নিয়ে ধৈর্যের সাথে কথা শোনার কারণে অনেক ভুল ধারণা ও অবিশ্বাসের আশঙ্কা থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। ফলে অন্যায় রাগ ও ক্ষোভের সম্ভাবনা থাকে না।

১২. সন্তানদের ঈমানী শিক্ষা-দীক্ষা ও কুরআন-সুন্নাহর আদর্শে গড়ে তুলতে হবে। ক্রোধ দমন, সহনশীলতা ও ক্ষমার গুণের মতো মহৎ আত্মিক গুণাবলি অর্জনে উদ্বুদ্ধ করতে হবে।

১৩. দু'টি বিষয়ের জন্য সর্বদা আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা করুন: প্রথমটি হলো, বিনয়-নম্রতা ও সহনশীলতা। অপরটি হলো, সন্তুষ্ট ও ক্ষুব্ধ-উভয় অবস্থায় ন্যায়সংগত কথা বলার যোগ্যতা। রাসূলুল্লাহ ﷺ আল্লাহ তা'আলার দরবারে এই প্রার্থনা করতেন:
وَأَسْأَلُكَ كَلِمَةَ الْحَقِّ فِي الرِّضَا وَالْغَضَبِ».
অর্থ: (হে আল্লাহ!) আমি আপনার নিকট প্রশান্ত ও ক্রোধান্বিত-উভয় অবস্থায়ই ন্যায়ানুগ কথা বলার তাওফিক প্রার্থনা করছি।' (নাসায়ী, ৩/৫৪)

১৪. বিশ্বাস করুন, রাগ ও ক্ষোভ প্রকাশের ক্ষেত্রে আত্মনিয়ন্ত্রণ করা ও ক্রোধ দমন করতে পারা দুর্বলতা ও অক্ষমতার আলামত নয়; বরং নৈতিক শক্তি ও সাহসিকতার পরিচয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর পবিত্র যবানেই শুনুন:
لَيْسَ الشَّدِيدُ بِالصُّرْعَةِ، إِنَّمَا الشَّدِيدُ الَّذِي يَمْلِكُ نَفْسَهُ عِنْدَ الغَضَبِ» (صحيح البخاري) ٢٨/٨
অর্থ: 'যে পেশিশক্তি জাহির করে সে আসল শক্তিশালী নয়। প্রকৃত শক্তিশালী ও বলবান হলো, যে রাগের সময় আত্মনিয়ন্ত্রণ করতে পারে।' (বুখারী, ৮/২৮)

১৫. আল্লাহ তা'আলার মহব্বত ও ভালোবাসা কে-ই বা পেতে না চায়? তাহলে রাগ ও ক্ষোভের মানসিকতা পরিহার করে ধৈর্য ও সহনশীলতার চর্চা করুন। রাসূলুল্লাহ ﷺ আব্দুল কায়েস (রা.)-কে সুসংবাদ প্রদান করে বলেছেন:
إِنَّ فِيكَ خَصْلَتَيْنِ يُحِبُّهُمَا اللهُ : الْحِلْمُ، وَالْأَنَاةُ (صحيح مسلم ١/ ٤٨)
অর্থ: 'তোমার মধ্যে দু'টি স্বভাবগুণ বর্তমান, যা আল্লাহ তা'আলা পছন্দ করেন। (স্বভাবগুণ দু'টি হলো,) ধৈর্য ও সহনশীলতা।' (মুসলিম ১/৪৮)

১৬. যদি ক্রোধ দমন করা সম্ভব না হয়, আত্মনিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায় তাহলে রাগ ও ক্ষোভের সম্ভাব্য ক্ষেত্র থেকে দূরে থাকুন। রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর পবিত্র যবানে এমনই নির্দেশবাণী উচ্চারিত হয়েছে:
أَمْلِكُ عَلَيْكَ لِسَانَكَ، وَلْيَسَعْكَ بَيْتُكَ، وَابْكِ عَلَى خَطِيئَتِكَ» (سنن الترمذي) ١٨٣/٤
অর্থ: 'তোমার যবান সংযত রাখ। (ফেতনার যামানায়) নিজ ঘরে আবদ্ধ থাক। নিজের ভুল-ত্রুটির জন্য অনুতপ্ত হও।' (তিরমিযি, ৪/১৮৩)

১৭. যে সমস্ত কারণে রাগের উদ্রেগ হয়, যে ব্যক্তিদের কারণে মনে ক্ষোভের সঞ্চার হয় তাদের থেকে দূরে থাকুন। তাহলে রাগের সম্ভাবনা কমে যাবে। অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণ করে আফসোস-অনুতাপে ভুগতে হবে না।

১৮. বিনম্র ও মার্জিত আওয়াজে কথা বলুন। চিৎকার-চেঁচামেচি আপনার কথার জোর বাড়াবে না, বক্তব্য জোরালোভাবে সাব্যস্ত করবে না। উল্টো আপনার অভদ্রতা ও অসভ্যতা ফাঁস করে দিবে। মানুষের কাছে আপনি সম্মান ও মর্যাদা হারাবেন।

১৯. রাগ ও ক্রোধের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্ক থাকুন। কেননা তা বহু অন্যায়-অনিষ্ট এবং শারীরিক ও মানসিক ব্যাধির মূল কারণ।

পরিশিষ্ট:
একদিন ওমর ইবনে আব্দুল আজীজ (রহ.)-এর পুত্র ছোট বাচ্চাদের সঙ্গে খেলছিল। বাচ্চারা বেশ হাসি-আনন্দের সাথেই খেলাধুলায় মত্ত ছিল। এর মধ্যেই এক দুষ্ট ছেলের আঘাতে ওমর ইবনে আব্দুল আজীজ (রহ.)-এর পুত্রের মাথা ফেটে গেল। সঙ্গে সঙ্গে রক্ত বের হতে লাগল। লোকেরা দুষ্ট ছেলেটিকে ধরে খলিফার দরবারে নিয়ে এল। বাইরে চিৎকার-চেঁচামেচি শুনে ওমর ইবনে আব্দুল আজীজ (রহ.) ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। ইতোমধ্যেই ছেলেটির মা এসে খলিফার দরবারে উপস্থিত। অনুনয়ের সুরে বলল: 'ছেলেটি আমার এতিম। তার বাবা নেই।'
খলিফা বললেন: 'আপনি ধৈর্যধারণ করুন। বিচলিত হবেন না।' এরপর তিনি জানতে চাইলেন: 'এতিমদের তালিকায় এই ছেলেটির নাম আছে কি না?' ছেলেটির মা বলল: 'না, এতিমদের তালিকায় তার নাম নেই। 'বায়তুল মাল' থেকে সে কোনো সুযোগ-সুবিধাও পাচ্ছে না।'
খলিফা বললেন: 'এতিমদের তালিকায় এই ছেলেটির নাম রেজিস্ট্রি করে দাও।'
খলিফা-পত্নী ফাতেমা বললেন: 'এই ছেলেটির প্রতি আপনি এত সদয় হচ্ছেন কেন? আজ আপনার পুত্রকে রক্তাক্ত করেছে। কাল আর একজনকে আহত করবে।'
খলিফা তাঁর পত্নীর উদ্দেশ্যে বললেন: 'যা বলার বলেছ। আর বলো না। ছেলেটি এতিম। লোকেরা তাকে এমনভাবে ধরে এনেছে যে, তাকে অনেক ভয় পাইয়ে দিয়েছে। এখন তাকে একটু শান্ত-নিশ্চিন্ত হওয়ার সুযোগ দাও।'

খলিফা ওমর বিন আব্দুল আজীজ (রহ.)-এর কী অনুপম মহানুভবতা ও সহনশীলতা! সন্তানের মাথা রক্তাক্ত দেখে তিনি একটুও বিচলিত হলেন না, রাগান্বিত হলেন না। ক্ষমা-সুন্দর ব্যবহার করে উদারতা ও মহানুভবতার কী অনুপম দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন! চরিত্র-মাধুর্যে ও ক্ষমার গুণে তাঁরাই হলেন পবিত্র কুরআনের বাস্তব নমুনা। তাঁদের সম্পর্কেই পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে:
وَالْكَاظِمِينَ الْغَيْظَ وَالْعَافِينَ عَنِ النَّاسِ وَاللَّهُ يُحِبُّ الْمُحْسِنِينَ [آل عمران: ١٣٤]
অর্থ: 'যারা নিজের রাগ হজম করতে ও মানুষকে ক্ষমা করতে অভ্যস্ত। আল্লাহ এরূপ পুণ্যবানদেরকে ভালোবাসেন।' (আলে- ইমরান, ৩: ১৩৪)

* বিখ্যাত ফরাসি উদ্ভাবক ও বহুবিদ্যাজ্ঞ পিয়ের বিউমার্কাইজ (১৭৩২- ১৭৯৯ খ্রিষ্টাব্দ) বলেছেন: 'রাগের শুরুটা হলো পাগলামি। তার শেষটা হলো আক্ষেপ অনুতাপ।'

* হাফেজ ইবনুল কাইয়্যিম জাওযী (রহ.) (৬৯১-৭৫১ হি.) বলেছেন: 'নিজের রাগটাকে ধৈর্য ও সহনশীলতার রশিতে বেঁধে ফেলুন। কেননা মনের ক্ষোভ ও ক্রোধ হলো পাগলা কুকুর। একবার যদি বাঁধনমুক্ত হয়ে যায় সবকিছু নাশ করে ফেলে।'

* বিখ্যাত আরব কবি ও দুঃসাহসী যোদ্ধা আনতারাহ ইবনে শাদ্দাদ (৫২৫- ৬০৮ খ্রিষ্টাব্দ) বলেছেন:
لا يحمل الحقدَ مَن تَعلو بِهِ الرُتَبُ وَلا يَنالُ العُلا مَن طَبْعُهُ الغَضَبُ
অর্থ: 'অভিজাত সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি হিংসা-বিদ্বেষ পুষে রাখতে পারে না। রাগী ও বদমেজাযি কখনো সফলতার শীর্ষস্থান অধিকার করতে পারে না।'

* ইয়েমেনের প্রেসিডেন্ট-পদ গ্রহণ করার পর ড. মুহাম্মাদ সা'দ আস্সা'দী তাঁর পুত্রকে বলেন: 'কখনো যদি মনে রাগ ও ক্ষোভের উদ্রেগ হয় তাহলে উপরে আসমান ও নিচে যমীনের দিকে তাকাও। আসমান-যমীনের বিশালত্ব এবং তার স্রষ্টার বড়ত্ব ও মহত্ত্ব অনুধাবন করার চেষ্টা করো।'

📘 আল হাল্লু জীবন সমস্যার সমাধান > 📄 তাড়াহুড়া

📄 তাড়াহুড়া


তাড়াহুড়া হলো আগ-পিছ না ভেবে, কোনো চিন্তা-ফিকির না করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও কার্যসম্পাদনে প্রবৃত্ত হওয়া। মানুষ স্বভাবগতভাবে তাড়াহুড়াপ্রবণ। আল্লাহ তা'আলা যদি তাকে বিবেক-বুদ্ধি ও ধৈর্য-সহ্য দান না করতেন, তাহলে পরিপক্ব হওয়ার আগেই সে ফল পেড়ে ফেলত। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা ইবরাহিম (আ.)-এর আদর্শ বর্ণনা করে মানুষকে ধৈর্য ও সহনশীলতায় অনুপ্রাণিত করেছেন:

﴿إِنَّ إِبْرَاهِيمَ لَحَلِيمٌ أَوَّاهُ مُّنِيبٌ﴾ [هود: ٧٥]

অর্থ: 'নিশ্চয় ইবরাহীম অত্যন্ত সহনশীল, অধিক অনুনয় বিনয়কারী, আল্লাহমুখী।' (সূরা হুদ, ১১: ৭৫)

ধৈর্য-স্থৈর্য, সুচিন্তা ও স্থান-কাল-পাত্র বিবেচনা ইত্যাদি স্বভাবগুণ মানুষের সফলতা ও সৌভাগ্যের পথ সুগম করে। তাকে ব্যর্থতা ও ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করে। আর তাড়াহুড়া ও অস্থিরতা হলো এমন স্বভাবদোষ, যা ব্যক্তিকে প্রতিকূলতা ও ব্যর্থতার পথে ধাবিত করে। তার অর্জিত যত সফলতা ও সুকীর্তি, গৌরব ও মর্যাদা, এক এক করে সমস্ত কিছু বরবাদ করে ছাড়ে। এমনটাই ঘটা স্বাভাবিক। কেননা তাড়াহুড়ার মুহূর্তে যা করা হয় তাতে সুস্থ চিন্তা-ভাবনা ও বিবেক-বুদ্ধির কোনো ভূমিকা থাকে না।

কত তাড়াহুড়াপ্রবণ লোক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাড়াহুড়া ও অস্থিরতার বশবর্তী হয়ে স্বাস্থ্য-সুস্থতা, অর্থ-সম্পদ ও সুনাম-সুখ্যাতি-সব খুইয়ে বসেছে। স্বভাবগত ক্ষয় তার জীবনের ক্ষয়-ক্ষতির চূড়ান্ত করে ছেড়েছে। পরিশেষে যখন সে নিজের ভুল বুঝতে পেরেছে, তখন আক্ষেপ-অনুতাপ ছাড়া কিছু করার নেই।

জীবনে সুখ-শান্তি লাভ করার জন্য, সফলতা ও সৌভাগ্য অর্জন করার জন্য তাড়াহুড়াপ্রবণতা ও অস্থির মানসিকতা পরিহারের বিকল্প নেই। কিন্তু এর উপায় কী? এ সমস্যার সঠিক সমাধান কী?

সমাধান:
১. ধৈর্যধারণ করুন। কেননা তা সফলতা ও মুক্তির অন্যতম উপায়। যে ব্যক্তি ধৈর্যধারণ করে, প্রতিদান স্বরূপ আল্লাহ তা'আলা তার কাজটাকে সহজ করে দেন। তার মুক্তি ও সফলতার পথ উন্মুক্ত করে দেন।

২. কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার আগে কোনো উদ্যোগ বাস্তবায়নের পূর্বে গভীরভাবে চিন্তা-ফিকির করুন। পর্যাপ্ত সময় নিয়ে এ সম্পর্কে যাবতীয় তথ্য-উপাত্ত ও সুবিধা-অসুবিধা যাচাই করুন।

৩. পবিত্র কুরআনের এ নির্দেশ হোক আপনার জীবনের নিত্য আদর্শ: ﴿وَشَاوِرْهُمْ فِي الْأَمْرِ﴾ [آل عمران : ١٥٩] অর্থ: 'তাদের জন্য মাগফিরাতের দু'আ কর।' (আলে-ইমরান, ৩: ১৫৯)

৪. পরামর্শ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য এমন ব্যক্তিদের নির্বাচন করুন যারা জ্ঞানী, গুণী, বিচক্ষণ ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন।

৫. কোনো বিষয়ে কল্যাণ-অকল্যাণ সম্পর্কে সুনিশ্চিত না হতে পারলে 'সালাতুল ইস্তিখারা' আদায় করুন। আল্লাহ তা'আলার কাছে সঠিক দিকনির্দেশনা চেয়ে প্রার্থনা করুন। যে ব্যক্তি 'ইস্তিখারা' করে সে ব্যর্থ হয় না। 'ইস্তিখারা'র পরামর্শে তাকে অনুতপ্ত হতে হয় না।

৬. অতীত জীবনের দিকে ফিরে তাকান, গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করুন, তাড়াহুড়ার কারণে যে ক্ষতি ও দুর্গতির শিকার হয়েছেন তা শনাক্ত করুন এবং সামনের দিনগুলোতে ধৈর্য ও সুচিন্তার আলোকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে উদ্যোগ বাস্তবায়ন করুন।

৭. কোনো বিষয়ে ত্বরিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ না করে "একটু ভেবে দেখি, একটু চিন্তা করে দেখি”-এ নীতি অবলম্বন করুন। এভাবে তাড়াহুড়াপ্রবণ মানসিকতা নিয়ন্ত্রিত হবে এবং ধৈর্য ও ধীরস্থিরতার গুণে প্রতিটি বিষয় সুষ্ঠু সফলভাবে সম্পন্ন হবে।

৮. ধীরতা ও স্থিরতার চর্চা করুন। যেকোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানাতে হলে একটু সময় নিন। কোনো দায়িত্ব পালন করতে বলা হলে ভেবে-চিন্তে ধীরস্থিরভাবে পালন করুন। এভাবে অনবরত প্রশান্ত মানসিকতার চর্চা করতে থাকুন। একপর্যায়ে তা আপনার স্বভাবগুণে পরিণত হবে।

৯. আরবি প্রবাদ বাক্যটি মনে রাখুন: فِي الْعُجْلَةِ النَّدَامَةُ، وَفِي التَّأَنِّي السَّلَامَةُ. অর্থ: 'তাড়াহুড়ায় লোকসান, ধীরস্থিরতায় পরিত্রাণ।' অতীতে মানুষ যে ক্ষতি ও দুর্গতির শিকার হয়েছে এবং বর্তমানেও হচ্ছে, তার অধিকাংশেরই নেপথ্য কারণ হলো তাড়াহুড়াপ্রবণতা ও অশান্তচিত্ততা।

১০. ইবাদত হলো বান্দার জীবনের শ্রেষ্ঠ অধ্যায়। অন্যান্য মঙ্গলজনক কাজও তার জীবনের শুভ অধ্যায়। তাই শুভ কাজে দেরি করতে নেই। দ্বিতীয় কোনো চিন্তা-ভাবনার অবকাশ নেই।

১১. ধৈর্য-স্থৈর্য হলো নবী-রাসূলগণের চারিত্রিক গুণ। জ্ঞানী-গুণী ও মহামনীষিগণের স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য। আর তাড়াহুড়া ও অস্থিরপ্রবণতা হলো বোকা, নির্বোধ ও পাগলাটে লোকের স্বভাবদোষ। এবার আপনিই ভাবুন, কোনটি অবলম্বন করবেন।

১২. সন্তান, পরিবার ও অধীনস্তদের, চিন্তা-ভাবনা ও ধীরস্থিরতার দীক্ষায় গড়ে তুলতে হবে। তাড়াহুড়া ও অস্থিরপ্রবণতার ক্ষতিকর দিকগুলোর ব্যাপারে সচেতন ও সতর্ক করতে হবে।

১৩. ধীরস্থিরতা ও প্রশান্তি লাভের অন্যতম উপায় অবলম্বন করুন। তা হলো আল্লাহর যিকির। পবিত্র কুরআনের ঘোষণা: ﴿الَّذِينَ آمَنُوا وَتَطْمَئِنُّ قُلُوبُهُمْ بِذِكْرِ اللَّهِ ﴾ [الرعد: ٢٨] অর্থ: 'স্মরণ রেখ, কেবল আল্লাহর যিকিরই সেই জিনিস, যা দ্বারা অন্তরে প্রশান্তি লাভ হয়।' (সূরা রা'দ, ১৩: ২৮)

১৪. সর্বশ্রেষ্ঠ মানব রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর আদর্শ গ্রহণ করুন। ধৈর্যে-স্থৈর্যে তিনি হলেন অতীত ও ভবিষ্যতের অনুপম শ্রেষ্ঠ আদর্শ।

১৫. হযরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: «الأَنَاةُ مِنَ اللَّهِ وَالعَجَلَةُ مِنَ الشَّيْطَانِ» অর্থ: 'ধীরস্থিরতা হলো আল্লাহর তরফ থেকে। আর তাড়াহুড়া হলো শয়তানের পক্ষ থেকে।' (তিরমিজী, ৪/৩৬৭) একবার ভেবে দেখুন-শয়তানের প্ররোচনায় প্ররোচিত হবেন, না কি মহান রবের তরফ থেকে নিয়ামতপ্রাপ্ত হবেন?

পরিশিষ্ট:
* ইরাক ও ইরানের অন্যতম বিখ্যাত শিয়া ধর্মীয় রেফারেন্স মুহাম্মদ আল-হুসাইনী আশ্ শীরাজী (১৯২৮-২০০১ খ্রিষ্টাব্দ) বলেছেন: 'বুদ্ধিমান বিচক্ষণ ব্যক্তি সর্বদা প্রশান্তচিত্ততা ও সুস্থির চিন্তা-ভাবনার আলোকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। কেননা তৃণীরের তীর একবার ছুটে গেলে আর ফেরানো যায় না।'

* চৈনিক কনফুসীয় দার্শনিক মেনসিয়াস (২৮৯-৩৭২ খ্রিষ্টপূর্ব) বলেছেন: 'যারা সহসা অতি দ্রুত শিখরে পৌঁছায় তারা অপেক্ষাকৃত দ্রুত নিচে পতিত হয়।'

* বিশিষ্ট জার্মানি লেখক ও সাহিত্যিক জোহান গ্যাটে (১৭৪৯-১৮৩২ খ্রিষ্টাব্দ) বলেছেন: 'অস্থিরপ্রবণ লোক বের হওয়ার দরজার খোঁজে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ে। অথচ সে দরজার সামনেই আনাগোনা করছে।'

টিকাঃ
৩৬. কোনো কাজ করার ইচ্ছা করলে কিংবা অত্যাসন্ন কোনো বিষয়ে আল্লাহর সাহায্য কামনা করতে তাঁরই দরবারে কায়মনোবাক্যে বিশেষ পদ্ধতিতে প্রার্থনা করার নামই ইস্তিখারা। অর্থাৎ, ইস্তিখারার মাধ্যমে বান্দা আল্লাহ তা'আলার কাছে এই প্রার্থনা করে যে, আমি যা করতে চাই তাতে যদি আমার কল্যাণ থাকে তাহলে তা আমার জন্য সহজ করে দিন এবং বরকত দান করুন। এটিই হলো ইস্তিখারার হাকীকত। ইস্তিখারার জন্য দুটি কাজ করণীয় বলে সহীহ হাদীসে বলা হয়েছে। দু' রাকাত নামায আদায় করা এবং ইস্তিখারা প্রসিদ্ধ মাসনূন দু'আটি মনোযোগের সাথে পড়া। সময়ের স্বল্পতা বা অন্য কোনো কারণে এই দু'টি কাজ সম্ভব না হলে তিনবার বা সাতবার এই দু'আটি পড়েও ইস্তেখারা করা যায়, اللَّهُمَّ خَرِّ لِي وَاخْتَر ْلِي (ইবনুস সুন্নী, হাদীস: ৫৭, ৫৮) এরপর যে বিষয়ে হৃদয়াত্মা আশ্বাস পাবে আল্লাহ তা'আলার ওপর ভরসা করে সেই কাজ আরম্ভ করা কর্তব্য। এভাবে আমল করলে ইস্তিখারা হয়ে যাবে। উল্লেখ্য যে, এই আমল করার জন্য শরীয়তে নির্দিষ্ট কোনো সময় নেই। রাত বা দিনের যেকোনো সময় তা করা যায়। (অনুবাদক)

📘 আল হাল্লু জীবন সমস্যার সমাধান > 📄 মতভেদ

📄 মতভেদ


মতভেদ হলো একটি বিষয়ে দু'জন কিংবা ততধিক ব্যক্তি সহমত হতে না পারা, মতবিরোধে লিপ্ত হওয়া। মতভেদের অন্যতম কারণগুলো হলো ব্যক্তিগত বিরোধ, লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের ভিন্নতা, চিন্তা-চেতনা আকিদা ও বিশ্বাসের পার্থক্য ইত্যাদি।

মতবিরোধ ও মতভিন্নতার মাঝে একটা পার্থক্য বর্তমান। মতবিরোধ হলো, কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনের পথ-পন্থা ও মূল লক্ষ্য-উদ্দেশ্য উভয় ক্ষেত্রে মতভেদ দেখা দেওয়া। আর মতভিন্নতা হলো, লক্ষ্য-উদ্দেশ্য এক হওয়া সত্ত্বেও পথ ও পন্থা ভিন্ন হওয়া।

আরেকটি দৃষ্টিকোণ থেকে মতভেদ দু'ধরনের: একটির উৎস হলো চিন্তানৈতিক বৈচিত্র্য ও বোধ-উপলব্ধির ভিন্নতা। এটি প্রশংসনীয় ও ফলপ্রসূ। অপরটির নেপথ্য কারণ হলো ব্যক্তিস্বার্থ, দলীয় স্বার্থ, নিজস্ব মতামত বাস্তবায়নের মানসিকতা, জাতীয়বাদ ও সাম্প্রদায়িকতা ইত্যাদি। এটা নিন্দনীয় ও ক্ষতিকর।

এ ধরনের মতবিরোধ ও মনোমালিন্য হতে শুরু করে পরস্পর হিংসা-বিদ্বেষ ও গালমন্দ পর্যায়ক্রমে ব্যক্তিগত সম্পর্কচ্ছেদ, পারিবারিক বিচ্ছেদ, সামাজিক বিশৃঙ্খলা শেষ অবধি যুলুম-নির্যাতন ও যুদ্ধবিগ্রহ পর্যন্ত গড়ায়। সবচেয়ে ভয়াবহ হলো দলীয় ও সাম্প্রদায়িক বিরোধ। ধর্মীয় বিরোধ তো আরও ভয়াবহ ও ধ্বংসাত্মক। এর জের ধরেই পৃথিবীতে ভয়াবহ দাঙ্গা ও যুদ্ধ-বিগ্রহ ঘটেছে। শত বছরের সাজানো জনপদ ও হাজার বছরের সভ্যতা-সংস্কৃতির অপমৃত্যু ঘটেছে।

ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে শান্তি ও সুশৃঙ্খলা অটুট রাখার জন্য বিরোধ নিষ্পত্তির বিকল্প নেই। কিন্তু উপায় কী? মতভেদ ও বিরোধ নিরসনের সহজ সমাধান কী?

সমাধান:
১. মতবিরোধের বিষয়টিকে সার্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার-বিশ্লেষণ করুন। যে সমস্ত সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ত্রুটিগুলো সাদা চোখে ধরা পড়ে না, বিস্তর অনুসন্ধান ও জানা-শোনার ভিত্তিতে তা শনাক্ত করুন।

২. মতবিরোধের ক্ষেত্রে গালমন্দ করা, অপবাদ আরোপ করা, অপর পক্ষের নামে কুৎসা রটনার মতো অন্যায় পথ পরিহার করে আসল সত্য ও সঠিক সমাধান বের করার চেষ্টা করুন।

৩. কারো সঙ্গে মতবিরোধ হলে দলিল-প্রমাণের ভিত্তিতে কথা বলুন। অন্যের কথা বাস্তবতার আলোকে বিচার করুন। প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটিত হওয়ার পর স্বতঃস্ফূর্ত চিত্তে তা গ্রহণ করুন।

৪. প্রতিপক্ষ যত কঠোর হোক, যত মূর্খতার পরিচয়ই দিক আপনি প্রশান্ত চিত্তে ভদ্রতা ও শালীনতা বজায় রেখে তার মোকাবেলা করুন। প্রজ্ঞা ও বুদ্ধিমত্তার সাথে তার প্রতিটি কথার উত্তর প্রদান করুন।

৫. একতরফা কথা না বলে, গলাবাজি প্রদর্শন না করে অপরপক্ষকে কথা বলার সুযোগ দিন। গুরুত্ব দিয়ে তার প্রতিটি কথা শুনুন এবং যথাযথভাবে যাচাই করুন।

৬. মতভেদসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কর্তব্য হলো পরস্পর আলোচনা করা, মতবিনিময় করা এবং প্রত্যেকের কথা ও মতামত গুরুত্ব দিয়ে শোনা। সর্বোপরি সকলের ঐকমত্যের জায়গাটি শনাক্ত করা এবং সে ভিত্তিতে এমন একটি সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া, যাতে সবার নৈতিক ও যৌক্তিক স্বার্থ রক্ষা হয়।

৭. পরস্পর বিরোধ নিরসন সম্ভব না হলে কোনো জ্ঞানী-গুণী, বিজ্ঞ-প্রাজ্ঞ ও আমানতদার ব্যক্তির শরণাপন্ন হয়ে তাঁর সিদ্ধান্ত সন্তুষ্টচিত্তে মেনে নেওয়া কর্তব্য।

৮. অপরপক্ষের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন। তার যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার মূল্যায়ন করুন। বিরোধ মীমাংসার উদ্দেশ্যে তার পক্ষ থেকে যদি কোনো ইতিবাচক ও ন্যায়ানুগ মতামত আসে তাহলে তা সাদরে গ্রহণ করুন।

৯. মতভেদ ও মতবিরোধের ক্ষেত্রে মীমাংসাকারীর ভূমিকা পালন করুন। সদয় ও বিনম্র কথায় বিরোধ নিষ্পত্তির চেষ্টা করুন।

১০. যেকোনো বিজ্ঞজনের চেয়ে মহাবিজ্ঞ, পণ্ডিতজনের ওপর মহাপণ্ডিত বর্তমান। বহুমাত্রিক অগাধ জ্ঞানার্জনের পরও এমন অনেক বহু বিষয় আছে যা আপনার জ্ঞানের পরিধির বাইরে। তাই কখনো নিজেকে সর্বেসর্বা ভাবা ঠিক নয়। যে অজ্ঞ, মূর্খ সে-ই নিজেকে মহাজ্ঞানী, মহাপণ্ডিত ভেবে বসে থাকে।

১১. পক্ষপাতিত্ব ও ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির মানসিকতা পরিহার করে বিবদমান ব্যক্তিদের পরস্পর সহানুভূতিশীল ও শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির চেতনা ধারণ করে গঠনমূলক আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খুঁজে বের করতে হবে।

১২. অন্যকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে নিজেকে সর্বেসর্বা ভাবার মানসিকতা পরিহার করুন। মীমাংসামূলক আলোচনার টেবিলে একে অন্যকে বোঝার চেষ্টা করুন।

১৩. ভুল স্বীকার করার মানসিকতা লালন করা কর্তব্য। অপর পক্ষের দাবি যৌক্তিক ও নৈতিক প্রমাণিত হলে তা সাগ্রহে হাসিমুখে মেনে নেওয়া আবশ্যক। তখন মতভিন্নতা, বাদবিসংবাদের কারণ হবে না; বরং প্রকৃত সত্য ও যৌক্তিক বিষয় উদ্‌ঘাটনের উপায় বলে সাব্যস্ত হবে।

পরিশিষ্ট:
* হাফেজ ইবনুল কাইয়্যিম জাওযী (রহ.) (৬৯১-৭৫১ হি.) বলেছেন: ‘যে ব্যক্তি অন্যদের কাজকর্ম ও পদক্ষেপগুলোকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে বিবেচনা করবে তার হৃদয় নিষ্কলুষ ও পরিশুদ্ধ থাকবে। আল্লাহ তা'আলা তাকে যাবতীয় অকল্যাণ ও অনিষ্ট থেকে রক্ষা করবেন।’

* সিরিয়ান ও লেবানিজ কবি অ্যাডোনিস বলেছেন: 'তুমি আমাকে ঘৃণা করছ না। তুমি ঘৃণা করছ আমার সম্পর্কে তোমার মনে কল্পিত রূপটাকে। সে কল্পিত রূপটি আমি নই, স্বয়ং তুমিই।'

* নিউজিল্যান্ডের বিখ্যাত লেখক পিটার টি ম্যাকিন্টায়ার বলেছেন: 'সর্বদা নিছক সত্য ও ন্যায়ের ওপর অবিচল থাকার মাধ্যমেই আত্মবিশ্বাস অর্জিত হয় না; বরং অকপটে ও নিঃসংকোচে নিজের ভুল স্বীকার করতে পারাই প্রকৃত আত্মবিশ্বাস ও সাহসিকতার পরিচয়।'

* ভারতীয় অন্যতম রাজনীতিবিদ ও হিন্দু ধর্মালম্বীদের আধ্যাত্মিক গুরু, মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী (১৮৬৯-১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দ) বলেছেন: 'মতভিন্নতা হলেই যে তা চরম বিরোধিতা ও শত্রুতায় পর্যবসিত হতে হবে এমনটা সমীচীন নয়। নচেৎ আমি ও আমার স্ত্রীই হতাম একে অপরের চরম বিরোধী, ঘোরতর শত্রু।'

টিকাঃ
৩৭. এটি তার ছদ্মনাম। তার আসল নাম হলো আলী আহমাদ সাঈদ।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00