📄 নিদ্রাহীনতা
নিদ্রাহীনতা বর্তমান বিশ্বে নিদ্রাহীনতা একটি স্বাভাবিক ব্যাধি। এর প্রধান কারণ, আগের তুলনায় মানুষের জীবনব্যবস্থার শাখা-প্রশাখা, জীবনের চাহিদা ও দায়দায়িত্ব যেমন বেড়েছে, তেমন জটিল আকার ধারণ করেছে। কালের দুর্যোগ-দুর্বিপাক ও বিপদ-সংকটগুলো সূক্ষ্ম প্রকট হয়ে দেখা দিচ্ছে। জীবনের মৌলিক চাহিদাগুলো নিয়ে বেঁচে থাকার চেয়ে বণিক চিন্তাপ্রসূত সামাজিকতা ও লৌকিকতা রক্ষা করতে গলদঘর্ম অবস্থা। ক্ষুদ্র মানবদেহের বুকপিঠ জীবনযাপনের এতসব দায়-দায়িত্বের বোঝা বহন করে চলে। নিশ্চিন্ত হয়ে একদণ্ড ঘুমানোর সুযোগ কোথায়?
নিদ্রাহীনতা ও ইনসোমনিয়া এমন জটিল ব্যাধি যা প্রথম পর্যায়ে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায়। সাথে সাথে যদি এ রোগ নিয়ন্ত্রণ করা না হয় তাহলে পর্যায়ক্রমে তা জটিল থেকে জটিল আকার ধারণ করে। এক পর্যায়ে ভুক্তভোগীর সুস্বাস্থ্য ও মন-মানসিকতায় বিরূপ প্রভাব ফেলতে শুরু করে। তার সহজাত স্বাভাবিক জীবনযাত্রা অস্থির দুর্বিষহ করে তোলে।
ব্যক্তি যখন ভীষণ নিদ্রাহীনতার শিকার হয়, গভীর রাতে ঘুমের জন্য ছটফট করে, মাথায় নানা উদ্ভট জল্পনা-কল্পনা বাসা বাঁধতে শুরু করে। নেতিবাচক চিন্তা-ভাবনা এসে ভিড় করে। নিদ্রাহীনতার কারণে জীবনের সহজাত গতিময়তা ব্যাহত হয়। কর্মজীবনের গতিময়তা বিঘ্নিত হয়। উচ্চ রক্তচাপ, স্থূলতা, টাইপ-২, ডায়াবেটিস, হৃদযন্ত্রের মতো বিভিন্ন রোগ ও অকাল বার্ধক্যের মতো জটিল রোগ দেখা দেয়। সুস্থ-সবল প্রাণবন্ত জীবনের জন্য নিয়মিত সুখনিদ্রার বিকল্প নেই। কিন্তু তার উপায় কী? নিদ্রাহীনতার সঠিক সমাধানই বা কী?
সমাধান:
১. আল্লাহর যিকিরে যবান তরতাজা রাখুন। নিদ্রাপূর্ব দু'আগুলো নিয়মিত পাঠ করুন। ভালো-ঘুম হওয়ার জন্য এটি একটি পরীক্ষিত আমল। ঘুমানোর আগে অবশ্যই বেতের নামায আদায় করতে ভুলবেন না। আবূ হুরায়রা (রা.) বলেছেন: 'রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাকে তিনটি উপদেশ দিয়েছেন। তার মধ্যে একটি হলো, ঘুমানোর আগে বেতের নামায আদায় করা।'
২. একটি দৈনন্দিন রুটিন করে নিন। সে মোতাবেক জীবনযাপন করুন। প্রতিটি কাজ সুনির্দিষ্ট সময়ে শেষ করে সময়মতো ঘুমিয়ে পড়ুন। অন্যান্য কাজে যত অনিয়মই হোক ঘুমে যেন এতটুকু বিলম্ব না হয়। নিজের মধ্যে এভাবে সময়মতো ঘুমানোর অভ্যাস গড়ে তুলুন।
৩. ঘুম নষ্ট করে দেয়-এমন খাদ্যদ্রব্য যেমন: চা, কফি ইত্যাদি থেকে বিরত থাকতে হবে। অতিঅবশ্যই ধূমপান, মাদক ও নেশাজাতীয় দ্রব্য বর্জন করতে হবে।
৪. খালি পেটে ঘুমাতে যাবেন না। প্রয়োজনে ফলমূল ও সালাদজাতীয় খাবার খেয়ে নিন। ভালো ঘুমের জন্য কায়িক পরিশ্রম ও ব্যায়াম করে দেহটাকে যতো শ্রান্ত-পরিশ্রান্ত করবেন, ঘুমটাও তত গভীর ও আরামদায়ক হবে।
৫. যদি ঘুম না আসে তাহলে অযথা শুয়ে না থেকে বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ুন। নামায, যিকির, তিলাওয়াত কিংবা বই পড়ায় মনোযোগী হোন। অলস মস্তিষ্ক শয়তানের বাসা। এমন অলস মুহূর্তে নানা উদ্ভট জল্পনা-কল্পনা এসে ভিড় করে। মনটাকে অস্থির অশান্ত করে তোলে।
৬. ঘুমানোর জন্য একটি কোলাহলমুক্ত নীরব নিভৃত স্থান বাছাই করুন। অবশ্যই দুর্ঘটনার শঙ্কাবহুল ইলেক্ট্রনিক যন্ত্রগুলো অফ করুন। তাতে ঘুমন্ত অবস্থায় আকস্মিক দুর্ঘটনার কবল থেকে মুক্ত থাকা যাবে।
৭. বিছানা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও আরামদায়ক হতে হবে। যারা ব্যাক পেইন কিংবা পিঠ ও কোমর ব্যথায় আক্রান্ত, তাদের অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী উপযুক্ত বালিশ ও বিছানার বন্দোবস্ত করতে হবে।
৮. ঘুমানোর আগে বেডরুমটাকে হালকা সুবাসিত করুন। কিংবা বালিশের নিচে সুগন্ধযুক্ত রুমাল রেখে দিন। তাতে আপনার দেহমন প্রশান্ত সুবাসিত হয়ে উঠবে। চোখ দু'টো ঘুমের আবেশে জড়িয়ে যাবে।
৯. দ্রুত ঘুমানোর জন্য অত্যন্ত কার্যকর পন্থা হলো, উত্তমরূপে ওযু করা। ওযু ব্যক্তির হৃদয়-মনকে দুশ্চিন্তা ও টেনশনমুক্ত করে। সুস্থির প্রশান্ত করে তোলে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বারা ইবনে আযেব (রা.)-কে এ পরামর্শ দিয়েছেন:
"إِذَا أَتَيْتَ مَضْجَعَكَ، فَتَوَضَّأُ وُضُوءَكَ لِلصَّلاةِ "
অর্থ: 'তুমি যখন ঘুমাতে যাবে, নামাযের জন্য যেভাবে ওযু করো, সেভাবে ওযু করে ঘুমাবে।' (বুখারী: ১/৫৮)
১০. দৈনন্দিন জীবনের ঝায়-ঝামেলা-ঘুমানোর আগ মুহূর্তে এসব নিয়ে কোনো চিন্তা-ফিকির করবেন না। কেননা তা মন-মস্তিষ্ককে অস্থির বিচলিত করে তোলে। তার চেয়ে বরং জীবনের যত সুখ-সৌভাগ্য, সফলতা-উৎকর্ষতার কথা মনে করে আনন্দে উদ্বেল হোন। ভবিষ্যতের সুন্দর স্বপ্ন রচনা করে ঘুমের রাজ্যে হারিয়ে যাবেন।
পরিশিষ্ট:
বিশিষ্ট সাহাবী বারা' ইবনে আযেব (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
" إِذَا أَتَيْتَ مَضْجَعَكَ، فَتَوَضَّأْ وُضُوءَكَ لِلصَّلَاةِ، ثُمَّ اضْطَجِعْ عَلَى شِقَّكَ الْأَيْمَنِ، ثُمَّ قُلْ اللَّهُمَّ أَسْلَمْتُ وَجْهِي إِلَيْكَ، وَفَوَّضْتُ أَمْرِي إِلَيْكَ، وَأَلْجَأْتُ ظَهْرِي إِلَيْكَ، رَغْبَةً وَرَهْبَةً إِلَيْكَ، لَا مَلْجَأَ وَلَا مَنْجَا مِنْكَ إِلَّا إِلَيْكَ، اللَّهُمَّ آمَنْتُ بِكِتَابِكَ الَّذِي أَنْزَلْتَ، وَبِنَبِيِّكَ الَّذِي أَرْسَلْتَ. فَإِنْ مُتَّ مِنْ لَيْلَتِكَ، فَأَنْتَ عَلَى الفِطْرَةِ، وَاجْعَلْهُنَّ آخِرَ مَا تَتَكَلَّمُ بِهِ ".
অর্থ: ঘুমানোর জন্য যখন বিছানায় যাবে তখন নামাযের ওযুর মতো করে ওযু করবে। এরপর ডান কাঁধে ভর করে শুয়ে পড়বে। ঘুমানোর আগে এই দু'আটি পাঠ করবে: اَللّٰهُمَّ أَسْلَمْتُ وَجْهِيْ إِلَيْكَ، وَفَوَّضْتُ أَمْرِيْ إِلَيْكَ، وَأَلْجَأْتُ ظَهْرِيْ إِلَيْكَ، رَغْبَةً وَّرَهْبَةً إِلَيْكَ، لَا مَلْجَأَ وَلَا مَنْجَا مِنْكَ إِلَّا إِلَيْكَ، اَللّٰهُمَّ آمَنْتُ بِكِتَابِكَ الَّذِيْ أَنْزَلْتَ، وَبِنَبِيِّكَ الَّذِيْ أَرْسَلْتَ. (صحيح البخاري) ١ /٥٨
অর্থ: 'হে আল্লাহ! আমি নিজেকে আপনার কাছে অর্পণ করলাম। আমার যাবতীয় বিষয় আপনার যিম্মায় সমর্পণ করলাম। নিজেকে আপনার আশ্রয়ে সঁপে দিলাম, দয়া ও করুনা লাভের আশায়, জাহান্নামের আযাব থেকে নাযাত লাভের প্রত্যাশায়। হে আল্লাহ! আমি বিশ্বাস স্থাপন করলাম আপনার অবতীর্ণ কিতাবের প্রতি। আপনার প্রেরিত রাসূলের প্রতি।'
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন :
'এভাবে ঘুমানোর পর তুমি যদি সে রাতে মৃত্যুবরণ করে তাহলে ইসলামের ওপর মৃত্যুবরণ করবে। উল্লিখিত দু'আগুলোই হবে (ঘুমানোর পূর্বে) তোমার সর্বশেষ কথা। (এরপর অন্য কোনো কথা বলবে না)।'
বারা ইবনে আযেব (রা.) বলেন: দু'আটি আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে পাঠ করে শোনালাম। যখন আমি اَللّٰهُمَّ آمَنْتُ بِكِতَابِكَ الَّذِيْ أَنْزَلْتَ পর্যন্ত পৌঁছালাম, বললাম, وَرَسُوْلِكَ রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, না, (وَرَسُوْلِكَ নয় বরং) وَبِنَبِيَّكَ الَّذِيْ أَرْسَلْتَ
'যাদের দ্বারা আপনি কষ্ট পেয়েছেন, যুলুম নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, ঘুমানোর আগে তাদের প্রত্যেককে মন থেকে মাফ করে দিন। অন্যদের প্রতি যত অভিযোগ-অনুযোগ, মন থেকে সব মুছে ফেলুন। নিশ্চিন্ত ও প্রশান্ত মনে চোখ বন্ধ করুন।' -আয়েয আল-কারনী
রোমান দার্শনিক ও লেখক এমিল সিওরান (১৯১১-১৯৯৫ খ্রিষ্টাব্দ) বলেছেন: 'অনিদ্রা এমন জটিল সমস্যা, যা মানুষের সুখের স্বর্গকে কষ্টের নরকে পরিণত করতে পারে।'
ইবনুন নাহবী (৪৩৩-৫১৩ হি.) বলেছেন: 'বিপদ-আপদ যত কঠিনই হোক এক সময় তা কেটে যাবে। রাতের অন্ধকার যত গভীরই হোক এক সময় ভোরের আলো ফুটবেই। রাতের আকাশেও তো ঝলমলে তারকা বর্তমান। ভোরের আলোয় সমস্ত আঁধার মৃয়মাণ।'
📄 হতাশা
হতাশা ও নিরাশা হলো একটি নেতিবাচক মানসিক অনুভূতি। মানুষ যখন তার ইচ্ছা পূরণ ও লক্ষ্য-উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের পথে বাধা ও প্রতিবন্ধকতার শিকার হয়, সামাজিক বৈরিতা ও প্রতিকূলতার সম্মুখীন হয়, তার মনে হতে থাকে, এ থেকে রক্ষা নেই। এ পরিস্থিতি কাটিয়ে ওঠার পথ নেই। তখনই তার মনে নিরাশা দানা বাঁধতে শুরু করে। তাকে হতাশা ঘিরে ধরে। মানুষ যখন ভীষণ রকম হতাশ হয়ে পড়ে তার ইচ্ছা ও মনোবল নিস্তেজ হয়ে পড়ে। কর্মক্ষমতা ও কর্মদক্ষতা দুর্বল হতে থাকে। নিজস্ব সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবনী শক্তি ক্ষয়িত হতে থাকে।
হতাশার কবলে ব্যক্তির মনে নেতিবাচক জল্পনা-কল্পনা বাসা বাঁধে। পর্যায়ক্রমে মনের অবাস্তব উদ্ভট জল্পনা-কল্পনাগুলো তার বোধ-বিশ্বাসে পরিণত হয়। চেষ্টা-শ্রমের মানসিকতা ও অন্যকে ছাড়িয়ে যাওয়ার স্পৃহা হারিয়ে ফেলে। এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তার কাছে অনর্থক মনে হতে থাকে, যেন শুরু করার আগেই নিঃশেষ হওয়ার দশা। জীবন-সংগ্রামে ঝাঁপ দেওয়ার আগেই পরাজয়-প্রবণতা।
নিরাশাবাদী উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্ন বুনতে জানে না। আসন্ন সফলতার পথ সুগম করার কথা ভাবে না। প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে নেতিবাচক কিছু ঘটনা ঘটার অজানা আশঙ্কায় ভুগতে থাকে। জীবনের সফলতা ও কৃতকার্যতা তার কাছে সুদূরপরাহত।
হতাশাগ্রস্ত লোক আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলে। সর্বদা নানা অভিযোগ-অনুযোগে মত্ত থাকে। দ্বিধা-সংশয়, অস্থিরতা-অনিশ্চয়তা, ভয়-শঙ্কা-এগুলো তার নিত্যসঙ্গী, যা কখনো কখনো দুর্বলপ্রাণ ব্যক্তিকে ধর্মহীনতা ও নাস্তিকতার পথে ধাবিত করে। আবার কখনো আত্মহত্যায় প্ররোচিত করে।
ব্যক্তিগত পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে হতাশা ও নিরাশা একটি মারাত্মক ব্যাধি। এ ব্যাধি থেকে মুক্ত থাকার লক্ষ্যে আমাদের করণীয় কী? তা কাটিয়ে ওঠার উপায় কী?
সমাধান:
১. আপন রবের সাথে নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তুলুন। আল্লাহ তা'আলার ওপর গভীর আস্থা অটুট রাখুন। দৃঢ় বিশ্বাস রাখুন, যত দুর্যোগ ও প্রতিকূলতা, একমাত্র আল্লাহ তা'আলাই তা থেকে উদ্ধার করতে পারেন।
২. সবক্ষেত্রেই ভালো কিছুর আশা করুন। ইচ্ছা পূরণে ও লক্ষ্য-উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের লক্ষ্যে চেষ্টা-প্রচেষ্টার সঙ্গে সঙ্গে নামায, যিকির, তাসবীহ, তিলাওয়াত, দান-সদকা ও প্রার্থনায় যত্নবান হোন। আল্লাহ তা'আলা কিছুতেই আপনাকে আশাহত করবেন না। আপনার চেষ্টা-প্রচেষ্টা নিষ্ফল করবেন না।
৩. হতাশা ও নিরাশার দু'টি পরিণতি: হয়ত হতাশা আপনাকে গ্রাস করবে; কিংবা স্বয়ং আপনি নিরাশাকে হজম করে ফেলবেন। হতাশা হয়ত আপনাকে পশ্চাৎপদ মানসিকতার দিকে ঠেলে দিবে। কিংবা স্বয়ং আপনি নিরাশাটাকে ভেঙে চুরমার করে সামনের পথে অগ্রসর হবেন। সুতরাং যত পশ্চাদপদ নেতিবাচক চিন্তা-ভাবনা ঝেড়ে ফেলুন। ইতিবাচক ও সমুন্নত মানসিকতা ধারণ করুন। আপনার জীবন আপনারই মানসিকতা ও চেতনার আলোকে গড়ে উঠবে।
৪. সুন্দর মনোরম উদ্যানে বেরিয়ে পড়ুন। মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক পরিবেশে ঘুরে আসুন। যেখানে প্রকৃতি তার স্বর্গীয় সৌন্দর্য উন্মুক্ত করে দিয়েছে। শরীয়তের বিধিনিষেধ মেনে বৈধ আনন্দ-বিনোদন উপভোগ করুন। হতাশামুক্ত হওয়ার জন্য গতানুগতিক জীবনধারার বাইরে বিচিত্র মুহূর্ত ও ভিন্ন পরিবেশ আপনার দেহ-মনকে প্রফুল্ল প্রাণবন্ত করে তুলবে।
৫. নিশ্চিত থাকুন, আপনার সমস্যার সমাধান অবশ্যই আছে। আপনাকে শুধু আশা-ভরসা নিয়ে ধৈর্যধারণ করতে হবে। মহান আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করতে হবে। তিনিই একমাত্র রক্ষাকারী, পরম মুক্তিদাতা।
৬. যেকোনো বাধা-প্রতিবন্ধকতার কবলে এতটা হতাশ হবেন না যে, তা আপনাকে ব্যর্থতার পথে ধাবিত করে। রাতের আঁধারের পর ভোরের আলো যেমন অপেক্ষমাণ তেমনই নিরাশার অন্তরালে আশা ও প্রত্যাশার হাতছানি বর্তমান।
৭. আশাবাদী হোন। স্বপ্নবান হোন। সফল মহা পুরুষদের জীবনী পাঠ করুন। জীবনের কঠিন প্রতিকূলতাগুলো তাঁরা কীভাবে মোকাবেলা করেছেন, দুর্লঙ্ঘ বাধা-প্রতিবন্ধকতা কীভাবে উতরে গেছেন, তা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করুন। অতীতের বাধা-বিপত্তির কবলে বিচিত্র অভিজ্ঞতাগুলো বিশ্লেষণ করুন। উভয় ক্ষেত্রেই একটি বিষয়ের আশ্চর্যরকম মিল পাওয়া যাবে। তা হলো আশা ও প্রত্যাশা। যুগে যুগে মহামনীষিগণ প্রত্যেকেই ছিলেন এক-একজন আশাবাদী স্বপ্নবান পুরুষ। নিরাশা হতাশা তাদের স্পর্শ করতে পারেনি।
৮. মনের মধ্যে যে দ্বিধা-সংশয় ও আশঙ্কা কাজ করছে প্রথমে তা শনাক্ত করুন। প্রয়োজনে লিখে ফেলুন। এরপর তার বাস্তবানুগ সমাধান উদ্ঘাটনে প্রয়াসী হোন। কিংবা আপনার কষ্ট ও প্রতিকূলতার বিষয়টি কোনো প্রবীণ বিদগ্ধ ব্যক্তির কাছে তুলে ধরুন। অথবা কোনো মনোবিজ্ঞানী চিকিৎসকের শরণাপন্ন হোন। তাঁরা আপনার সমস্যা সমাধানে যথার্থ সহযোগিতা করবেন। আপনাকে মানসিক সংকীর্ণতা ও সংকট থেকে উদ্ধারে কার্যকর পরামর্শ দিয়ে সাহায্য করবেন।
৯. সফল ও স্বপ্নবান ব্যক্তিদের সংস্পর্শে থাকুন। ব্যর্থ নিরাশাবাদী লোকদের সঙ্গ ত্যাগ করুন। কেননা নিরাশাবাদ হলো একটা সংক্রামক ব্যাধি। জটিল ব্যাকটেরিয়ার মতো তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
১০. শিক্ষাক্ষেত্র কিংবা কর্মজীবনের কোনো একটি শাখায় বিফল হলে ভিন্ন খাতে মেধা-শ্রম যাচাই করুন। একটা বিষয়ে বিফলতার অর্থ এই নয় যে, সর্বক্ষেত্রেই ব্যর্থতা অবশ্যম্ভাবী। ইতিহাসের অনেক সফল ব্যক্তিকেই নিজের সফলতার জায়গাটি নির্ণয় করতে গিয়ে কোনো না কোনো ব্যর্থতার সম্মুখীন হতে হয়েছে।
১১. নিজেকে নিরুৎসাহিত করার অজুহাত না খুঁজে স্বীয় যোগ্যতা ও সাহসিকতার বলে বলীয়ান হয়ে উঠুন। শতো বাধার প্রাচীর ডিঙিয়ে সম্মুখে এগিয়ে চলুন। একই জায়গায় স্থবির হয়ে, শুধু চিন্তা-ভাবনায় ডুবে থেকে সফলতার সর্বোচ্চ চূড়া দূরের কথা, সফলতার হাতছানি লাভ করাও সম্ভব নয়।
১২. হতাশা ও নিরাশা ব্যক্তিকে কর্মবিমুখ করার জন্য তার সামনে একের পর এক বাধা-প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। দাঁড় করিয়ে দেয় যতসব কাল্পনিক অবাস্তব কারণ-উপকরণ। তাই নিরাশাকে এতটুকু অবকাশ দেওয়া যাবে না যে, আপনার যোগ্যতা ও সম্ভাবনা অকার্যকর করে দেয়, সমস্যা সমাধানের পথে আরও জটিলতা সৃষ্টি করে।
১৩. অতীত জীবনের যে সমস্ত কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছেন, কীভাবে তা মোকাবেলা করেছেন-তা স্মরণ করে দেখুন। অতীতের সুপরিকল্পিত পদক্ষেপ ও সাহসী ভূমিকাগুলো আপনাকে অনুপ্রাণিত করবে, আসন্ন ভবিষ্যতের বাধা-বিপত্তি মোকাবিলা করার।
১৪. নিজের জন্য এমন লক্ষ্য-উদ্দেশ্য নির্ধারণ করবেন না, যা আপনার সাধ্য ও সামর্থ্যের বাইরে। সামর্থ্য ও যোগ্যতা অনুযায়ী ছোট ছোট পদক্ষেপ গ্রহণ করুন। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র একাধিক পদক্ষেপের মাধ্যমে একটি মহৎ উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন সম্ভব। মনে রাখবেন, এক হাজার মিটারের দৌড় প্রতিযোগিতা প্রথমে একটি পদক্ষেপের মাধ্যমেই সূচিত হয়। তারপর একের পর এক বহু পদক্ষেপের সাহায্যে এক হাজার মিটারের দৌড় সম্পন্ন হয়।
১৫. ভুল যতই হোক-না-কেন, চেষ্টা অব্যাহত রাখুন। এক্ষেত্রে পিপীলিকার আদর্শ গ্রহণ করুন-সফলতা লাভের জন্য সে হাজারবারও চেষ্টা করতে প্রস্তুত। মনে রাখুন, বিদ্যুৎ আবিষ্কারক এডিসন সাতশতোবার ব্যর্থ চেষ্টার পরই সফলভাবে বিদ্যুৎ আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়েছেন। কাজেকর্মে ও দায়দায়িত্বে যত অলসতা-অবহেলা ঝেড়ে ফেলুন। প্রতিটি কাজ সময়মতো সম্পন্ন করুন। দৈনিকের কাজ দৈনিক সেরে ফেলুন। কখনো আজকের কাজ আগামী দিনের জন্য বিলম্ব করবেন না।
১৬. আল্লাহ তা'আলার প্রশংসা করুন এজন্য যে, অদ্যাবধি সুস্থ-সবল থেকে সাধ্যমতো কাজেকর্মে নিয়োজিত আছেন। ব্যক্তিগত সফলতার একটি তালিকা সযত্নে সংরক্ষণ করুন। প্রতিদিন অন্তত একবার আপনার সফলতাগুলো স্মরণ করুন। এতে আশা ও প্রত্যাশার সাথে সাথে মনোবল বৃদ্ধি পাবে। কাঙ্ক্ষিত কিছু যদি হাতছাড়া হয়ে যায়, মনে করবেন, এ হারানোর মধ্যেই আপনার কল্যাণ নিহিত।
১৭. নিজেকে অন্যের সাথে তুলনা করতে যাবেন না। প্রত্যেকের জীবনই নানা রকম বৈচিত্র্যময়। আপনার যা কাঙ্ক্ষিত, সংকল্পিত তা অর্জনে নিজের মতো করে এগিয়ে যান। এর জন্য নিজের চেষ্টা ও সামর্থ্যের সর্বোচ্চটুকু বিলিয়ে দিন। একদিন সফলতার এমন শীর্ষস্তরে পৌঁছে যাবেন যা হয়ত আপনার কাছে স্বপ্নের মতো মনে হবে।
১৮. বিফলতা ও নেতিবাচক মানসিকতা পরিহার করে নিজেকে সফলতা ও সহজতার সুসংবাদ দান করুন। প্রত্যেক দিন-শেষে ভাবুন, আগামীর দিনটি আরও সুন্দর ও সাফল্যমণ্ডিত হবে। মনে রাখুন, সফলতা ও সৌভাগ্যের প্রতিক্ষায় ধৈর্যধারণ করাও একটি ইবাদত। সুতরাং অপেক্ষা করুন ধৈর্যের সাথে, সফলতা আসবে দু'হাত ভরে।
১৯. একটি বিষয়ে নিশ্চিত থাকুন, কোনো বাধা-বিপত্তিই স্থায়ী নয়। চরম দুর্যোগ-দুর্ভোগের পরই পরম সুখ ও সৌভাগ্যের উত্থান ঘটে। এটাই জগতের অবধারিত নীতি।
পরিশিষ্ট:
হযরত ইয়াকুব (আ.) প্রাণপ্রিয় পুত্র হারানোর শোকে কেঁদে কেঁদে দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেছিলেন। পৃথিবীর ইতিহাসে এর চেয়ে মর্মান্তিক বেদনাবিধুর ঘটনা কি আর ঘটেছে? "ইউসুফকে নেকড়ে খেয়ে ফেলেছে”-এই কথিত কিচ্ছার অন্তরালে এক মহান পিতা প্রাণপ্রিয় পুত্রকে হারালেন। জগতের সমস্ত দুঃখ-যাতনা তাকে ঘিরে ধরল। তিনি পুত্র হারানোর শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়লেন। অঝোর ধারায় কাঁদতে লাগলেন। নিদ্রাহীন চোখ দু'টি আলো হারাতে লাগল। সুস্বাদু যত খাদ্য বিস্বাদে পরিণত হলো।
পুত্র ইউসুফের শোক না কাটতেই আরেক পুত্র বিনইয়ামিনও হাতছাড়া হওয়ার উপক্রম। দুঃখ-বেদনা ও কষ্ট-যাতনা যেন ইয়াকুব (আ.)-এর চরম ধৈর্যপরীক্ষা নিয়েই তবে ক্ষান্ত হবে। এমন কঠিন দুর্যোগ-মুহূর্তেও তাঁর যবানে বারবার উচ্চারিত হতে লাগল। পবিত্র কুরআনের ভাষায় :
إِنَّهُ لَا يَا يُنَسُ مِنْ رَّوْحِ اللَّهِ إِلَّا الْقَوْمُ الْكُفِرُونَ﴾ [يوسف: ٨٧]
অর্থ: 'নিশ্চিত জেনে রাখ, আল্লাহর রহমত থেকে কেবল তারাই নিরাশ হয়, যারা কাফের।' (সূরা ইউসুফ, ১২: ৮৭)
অবশেষে তাঁর আশাই সত্য প্রমাণিত হলো। চরম দুঃখ-বেদনার পর পরম সুখানন্দের মুহূর্ত ঘনিয়ে এলো। পুত্র ইউসুফের জামার স্পর্শে দৃষ্টিশক্তি ফিরে পেলেন। দু'চোখ ভরে 'শিশুপুত্র' ইউসুফকে দেখতে লাগলেন। পরম স্নেহে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। শিশুপুত্র যে আজ বাদশাহর মর্যাদায় ভূষিত, রাজসিংহাসনে অধিষ্ঠিত। এ ঘটনা যেন পবিত্র কুরআনের এ আয়াতেরই প্রতিধ্বনি:
فَإِنَّ مَعَ الْعُسْرِ يُسْرًا * إِنَّ مَعَ الْعُسْرِ يُسْرًا﴾ [الشرح: ٥، ٦]
অর্থ: 'প্রকৃতপক্ষে কষ্টের সাথে স্বস্তি থাকে। নিশ্চয়ই কষ্টের সাথে স্বস্তি থাকে।' (সূরা ইনশিরাহ্, ৯৪: ৫, ৬)
'নিরাশা ও হতাশার কবলে আত্মসমর্পণ করবেন না। জীবনের বাহ্যিক রূপটা হয় যদি কালো মেঘের মতো তাহলে তার ভেতরটা আশা-ভরসার আলোয় উদ্ভাসিত। শক্ত কঠিন বিরাট পাথরের নিচেও এক চিলতে শীতল ছায়া প্রত্যাশিত। সফলতা ও সৌভাগ্যের পথ হোক না যতই দুস্তর পারাবার, আশা ও ভরসাই হলো তার সফল পারাপার।' -আয়েয আল-কারনী
📄 নেতিবাচক মানসিকতা
নেতিবাচক মানসিকতা হলো, জীবনে যা কিছু অনভিপ্রেত অনাকাঙ্ক্ষিত, যত বাধা-বিপত্তি, ফিরে ফিরে সেগুলোকে বড় করে দেখা। আর সমস্ত সফলতা, সুখশান্তির ক্ষেত্রগুলোকে এড়িয়ে যাওয়া, কিংবা খাটো করে দেখা।
নেতিবাচক প্রবণতা মূলত একটা মানসিক ব্যাধি। ব্যক্তির মন-মানসিকতায় যখন তা দানা বাঁধতে শুরু করে সাদা চোখে ধরা পড়ে না। পর্যায়ক্রমে এ ব্যাধি শিকড়-বাকড় ছড়াতে থাকে। ডালপালা গজাতে থাকে। একপর্যায়ে প্রবল হতে প্রবল আকার ধারণ করে। ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে জটিল সংকট সৃষ্টি করে।
ভুক্তভোগী প্রথমে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে নেতিবাচক মানসিকতায় ভাবতে শুরু করে। তারপর কোনো বিষয়ের সুদূরসম্ভাব্য ও কল্পিত অশুভ দিকগুলো খুঁটে খুঁটে দেখে। অশুভ দিকগুলোই তার কাছে মুখ্য হয়ে ওঠে। ইতিবাচক দৃষ্টিতে ও কল্যাণপ্রত্যাশী মানসিকতায় সে কোনো কিছুই ভেবে উঠতে পারে না।
এভাবে নেতিবাচক মানসিকতা যখন তার মজ্জাগত হয়ে প্রকট আকার ধারণ করে, তার কাছে জীবনের কোনো সফলতার মূল্য থাকে না। মনে হতে থাকে, সুখ-শান্তি নিতান্তই সাময়িক, কিছু দিন পর তা হারিয়ে যাবে। দুঃখ-বেদনা ও কষ্ট-যাতনাই হলো জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
সুখময় সফল জীবন-যাপনের জন্য নেতিবাচক মানসিকতা পরিহার করা অপরিহার্য। কিন্তু এর উপায় কী? এর সঠিক সমাধান কী?
সমাধান:
১. যে সত্তা আপনাকে সৃষ্টি করেছেন, রিযিক দান করেছেন তিনি আপনার অমঙ্গলের ফায়সালা করতে পারেন না। সুতরাং মহান আল্লাহর ওপর ভরসা রাখুন। পবিত্র কুরআনের বাণী:
﴿وَعَلَيْهِ فَلْيَتَوَكَّلِ الْمُتَوَكَّلُونَ﴾ [يوسف: ٦٧]
অর্থ: 'আর যারা নির্ভর করতে চায় তাদের উচিত তাঁরই ওপর নির্ভর করা।' (ইউসুফ, ১২: ৬৭)
২. আপন রবের প্রতি সুধারণা পোষণ করুন। আল্লাহ তা'আলা বান্দার ধারণা অনুযায়ী তার ভালো-মন্দের ফায়সালা করেন। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, আল্লাহ তা'আলা বলেন:
أَنَا عِنْدَ ظَنِّ عَبْدِي بِي إِنْ ظَنَّ خَيْرًا فَلَهُ وَإِنْ ظَنَّ شَرًّا فله». (صحیح ابن حبان) ٢ / ٤٠٥
অর্থ: আমার প্রতি বান্দার ধারণা অনুসারে আমি তার ব্যাপারে ফায়সালা করি। সে যদি সুধারণা রাখে এর সুফল লাভ করে। আর যদি অকল্যাণের ধারণা পোষণ করে এর পরিণতি তাকেই ভোগ করতে হয়। (সহীহ ইবনে হিব্বান, ২/৪০৫)
৩. সর্বদা পজেটিভ ও ইতিবাচক মানসিকতায় ভাবতে শিখুন। যত দুঃখ-কষ্ট ও বিপদ-আপদের কবলে ধৈর্যধারণ করুন। নায-নিয়ামত ও সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের কথা স্মরণ করুন। রাসূলুল্লাহ ﷺ মু'মিন বান্দাকে সুসংবাদ প্রদান করে বলেছেন:
عَنْ صُهَيْبٍ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ: «عَجَبًا لِأَمْرِ الْمُؤْمِنِ، إِنَّ أَمْرَهُ كُلَّهُ خَيْرٌ، وَلَيْسَ ذَاكَ لِأَحَدٍ إِلَّا لِلْمُؤْمِنِ، إِنْ أَصَابَتْهُ سَرَّاءُ شَكَرَ، فَكَانَ خَيْرًا لَهُ، وَإِنْ أَصَابَتْهُ ضَرَّاءُ، صَبَرَ فَكَانَ خَيْرًا لَهُ. صحيح مسلم (٤ / ٢٢٩٥)
অর্থ: সুহায়ব (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল ﷺ বলেন, 'মু'মিনের অবস্থা কতোই না বিস্ময়কর, সকল কাজই তার জন্য কল্যাণকর। মু'মিন ছাড়া অন্য কেউ এ সৌভাগ্য অর্জন করতে পারে না। সুখে-স্বাচ্ছন্দ্যে সে আল্লাহর শোকর করে। কৃতজ্ঞতা প্রকাশ তার জন্য কল্যাণ বয়ে আনে। দুঃখ-দুর্দশাগ্রস্ত হলে ধৈর্যধারণ করে। সবর ও ধৈর্যের বিনিময়ে সে কল্যাণ লাভ করে।' (মুসলিম, ৪/২২৯৫)
৪. নিজেকে একবার জিজ্ঞেস করুন, আপনি কি গায়েবের খবরাখবর জানেন? অদূর ভবিষ্যতে কী ঘটতে চলেছে তা বলতে পারেন? তাহলে কেন অনর্থক অজানা আশঙ্কায় সংকুচিত হচ্ছেন? আপনার জীবনে কী এমন কোনো হাসি-আনন্দ ও সৌভাগ্য-সফলতা আসেনি, যা ছিল অভাবিত কল্পনাতীত? তাহলে ভবিষ্যতেও কেন সুন্দরের আশা করছেন না? সফলতার স্বপ্ন বুনছেন না? মনে রাখতে হবে, ইতিবাচক মানসিকতাই সফলতার মূল চাবিকাঠি। তাই গোলাপের কাঁটার ভয় না করে তার সুবাস সৌন্দর্য উপভোগ করুন। রাতের ঘন কালো আঁধার না দেখে আকাশের উজ্জ্বল চাঁদ ও ঝলমলে তারকারাজি লক্ষ করুন। চারপাশের সব আঁধার কেটে যাবে।
৫. পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ মানব মুহাম্মদ বিন আব্দুল্লাহ রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর আদর্শ অনুসরণ করুন। তুমুল ঝড়-ঝাপটার কবলেও তিনি ছিলেন ভীষণ আশাবাদী ও কল্যাণপ্রত্যাশী। মুসলিম উম্মাহর কঠিন সংকটকালেও তিনি রোম ও পারস্য সাম্রাজ্য বিজয়ের সুসংবাদ দান করেছিলেন।
৬. পৃথিবীর ইতিহাসে যত মহা আবিষ্কারক, জ্ঞানী-মহাজ্ঞানী ও রাজা-মহারাজা ছিলেন, তাঁদের জীবনযাপনও ছিল আপনার মতো সুখ-দুঃখ মিশ্রিত। কারো কারো পরিবেশ পরিস্থিতি ছিল আরও অধিক বিপদসংকুল ও সংকটপূর্ণ। কিন্তু তাঁরা কখনও আশা ছাড়েননি, নিরাশ হননি। শত প্রতিকূলতার মাঝেও সৌভাগ্য ও সফলতার স্বপ্ন বুকে ধারণ করে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে সচেষ্ট থেকেছেন। ফলে এক জীবনেই তারা এমন অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছেন, যা আমরা কয়েক জীবনেও সম্ভব বলে বিশ্বাস করতে পারি না।
৭. এমন বন্ধু-বান্ধব নির্বাচন করুন, যারা ভীষণ আশাবাদী ও কর্মোদ্যমী। যারা অলস অকর্মণ্য ও নিরাশাবাদী, তাদের সঙ্গ ত্যাগ করুন। নিকট আত্মীয় ও বন্ধু সমাজের দ্বারা মানসিক শক্তি অর্জন করুন। দৃঢ় মনোবল ও ধারাবাহিক কর্মপ্রচেষ্টায় বাধা-বিপত্তি কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করুন।
৮. নিশ্চিত থাকুন, বিশ্বে যা কিছু ঘটছে, পূর্বনির্ধারিত আসমানি ফায়সালার ভিত্তিতেই ঘটছে। প্রতিটি মানুষের জীবনে তাঁর নিয়তির ফায়সালা প্রতিফলিত হচ্ছে। এ বিষয়টিই রাসূলুল্লাহ ﷺ আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-কে জোর দিয়ে বলেছেন:
﴿وَاعْلَمْ أَنَّ الأُمَّةَ لَوْ اجْتَمَعَتْ عَلَى أَنْ يَنْفَعُوكَ بِشَيْءٍ لَمْ يَنْفَعُوكَ إِلَّا بِشَيْءٍ قَدْ كَتَبَهُ اللهُ لَكَ، وَلَوْ اجْتَمَعُوا عَلَى أَنْ يَضُرُّوكَ بِشَيْءٍ لَمْ يَضُرُّوكَ إِلَّا بِشَيْءٍ قَدْ كَتَبَهُ اللهُ عَلَيْكَ، رُفِعَتِ الأَقْلَامُ وَجَفَّتْ الصُّحُفُ» (سنن الترمذي ٤ / ٦٦٧)
অর্থ: জেনে রেখো, গোটা জাতি যদি তোমার কোনো মঙ্গলের উদ্দেশ্যে ঐক্যবদ্ধ হয়, আল্লাহ তা'আলা তোমার মঙ্গলের যে ফায়সালা করেছেন, তার বাইরে তারা তোমার একবিন্দু উপকারও করতে পারবে না। তারা যদি তোমার ক্ষতিসাধনে সংবদ্ধ হয়, তবুও আল্লাহর ফায়সালার বাইরে তোমার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। মানুষের ভাগ্যলিপি চূড়ান্ত এবং নিয়তির ফায়সালা অবধারিত।' (তিরমিজী, ৪/৬৬৭)
৯. মনের যত জল্পনা-কল্পনা ও দ্বিধা-সংশয় ঝেড়ে ফেলে দৃঢ় সংকল্প ও অবিচল মানসিকতায় কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে প্রয়াসী হোন। অতীতের ব্যর্থতা প্রতিকূলতা মনে করিয়ে দেয়-এমন সমস্ত বিষয় এড়িয়ে চলুন, স্মৃতির পাতা থেকে মুছে ফেলুন। আল্লাহ তা'আলার বরকত ও তাওফিকের প্রত্যাশী হয়ে নতুনভাবে শুরু করুন। নব উদ্যমে সচেষ্ট হোন। ইনশাআল্লাহ, সফলতা অবশ্যম্ভাবী।
১০. দু'আ ও ইস্তিগফারের মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলার সাহায্য প্রার্থনা করুন। সকাল-সন্ধ্যায় নির্ধারিত যিকির-ওযীফা আদায় করার পাশাপাশি অত্যন্ত মনোযোগের সঙ্গে পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত করুন। বেশি বেশি আল্লাহর যিকির করুন। হৃদয় মন প্রশান্ত হবে, অস্থিরতা ও উৎকণ্ঠামুক্ত হবে। পবিত্র কুরআনের বাণী: ﴿الَّذِينَ آمَنُوا وَتَطْمَئِنُّ قُلُوبُهُم بِذِكْرِ اللَّهِ ﴾ [الرعد: ٢٨] অর্থ: 'স্মরণ রেখ, কেবল আল্লাহর যিকিরই সেই জিনিস, যা দ্বারা অন্তরে প্রশান্তি লাভ হয়।' (সূরা রা'দ, ১৩: ২৮)
১১. নতুন কোনো উদ্যোগে ও কর্ম কল্পনা বাস্তবায়নে সচেষ্ট হোন। তাতে নিজের যোগ্যতা ও দক্ষতা যাচাই করার সুযোগ হবে। ভিন্ন প্রেক্ষাপটে নিজেকে নতুনভাবে উপলব্ধি করা যাবে। মনোবল ও আত্মবিশ্বাস আরও সমৃদ্ধ হবে।
১২. সুদূর কল্যাণপ্রসারী উদ্যোগ বাস্তবায়নে সচেষ্ট হোন। উদ্যোগ-আয়োজনের ব্যতি-ব্যস্ততা ও কর্মমুখরতা অতীতের ব্যর্থতা ও হতাশার কথা ভুলিয়ে দিবে। প্রকৃত বুদ্ধিমান ও বিচক্ষণ বিফলতাকে সফলতায় ও হতাশাকে সাহসিকতায় রূপান্তরিত করে, বাধা-প্রতিবন্ধকতার কবলে ভেঙে পড়ে বিপদের ওপর বিপদ ডেকে আনে না।
১৩. যে পরিবেশ পরিস্থিতি, যাদের সংস্পর্শ ও কাজকর্ম আপনার নেতিবাচক মানসিকতার প্রধান কারণ বলে মনে করেন, তাদের থেকে সরে দাঁড়ান। আপনজন কিংবা বন্ধুজনদের সাথে মনোমুগ্ধকর পরিবেশে দর্শনীয় স্থানে ঘুরে আসুন। এতে মন-মানসিকতা প্রফুল্ল প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে। নতুনভাবে আত্মবিশ্বাস ফিরে পাবেন। দায়দায়িত্বে পেশাদারিত্ব ও উদ্দীপনার মানসিকতা সৃষ্টি হবে।
১৪. পত্র-পত্রিকা ও সোস্যাল মিডিয়ার অজস্র নেতিবাচক সংবাদ ও ভীতিপ্রদ খবরাখবরের ছড়াছড়ি-এ সমস্তই এড়িয়ে চলুন। ইতিবাচক সংবাদ, সফল ব্যক্তিদের সফলতার ঘটনা পড়ুন।
১৫. নেতিবাচক মানসিকতার কবলে চারপাশের সমাজ-বিচ্ছিন্ন হয়ে একাকিত্বে পড়ে থাকবেন না। আশাবাদী, কর্মোদ্যমী ও স্বপ্নবান ব্যক্তিবর্গের সংস্পর্শে থাকুন। তাদের সংস্পর্শ আপনার মনে সাহস সঞ্চার করবে। আপনাকে প্রাণবন্ত উজ্জীবিত করে তুলবে।
১৬. সুসংবাদ গ্রহণ করুন, আগামীর দিনগুলো আরও সুন্দর সফল হবে। কেননা আপনি মহান আল্লাহর তত্ত্বাবধানে ও তাঁর রক্ষণাবেক্ষণে আছেন। তিনি কিছুতেই আপনাকে নিরাশ করবেন না। রিযিক থেকে বঞ্চিত করবেন না। সুতরাং সফলতা ও সৌভাগ্যের প্রত্যাশা করুন। আল্লাহ তা'আলা আশাবাদী ও স্বপ্নবান ব্যক্তিদের ভালোবাসেন। তাদেরকে তাদের আশানুরূপ দান করেন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলার প্রতিশ্রুতি:
﴿وَاللَّهُ يَعِدُكُمْ مَّغْفِرَةً مِّنْهُ وَفَضْلًا وَاللَّهُ وَاسِعٌ عَلِيمٌ﴾
অর্থ: 'আল্লাহ তোমাদেরকে স্বীয় মাগফিরাত ও অনুগ্রহের প্রতিশ্রুতি দেন। আল্লাহ অতি প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ।' (বাকারা, ২: ২৬৮)
১৭. আপনার প্রতি আমার সর্বশেষ উপদেশ হলো, 'চোখ থেকে “কালো” চশমাটা খুলে ফেলুন। মন থেকে নেতিবাচক ধ্যান-ধারণা ঝেড়ে ফেলুন। জীবনটাকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখতে শিখুন। পজেটিভ দৃষ্টিভঙ্গিতে আপনার জীবনটাকে রাঙিয়ে তুলুন। জীবনের পটভূমি তো আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিরই বাস্তব প্রতিফলন মাত্র।
পরিশিষ্ট:
* লেবাননের বিখ্যাত আরব কবি ইলিয়া আবূ মাযী (১৮৮৯-১৯৫৭ খ্রিষ্টাব্দ) বলেছেন:
قَالَ: السَّمَاءُ كَثِيْبَةً وَتَجَهما قُلْتُ: ابْتَسِم يَكْفِي التَّجَهُمَ فِي السَّمَا!
قَالَ: الصَّبَا وَلَّى فَقُلْت لَهُ : ابْتَسِمْ! لَنْ يَرْجِعَ الْأَسْفُ الصَّبَا المُتَصَرِّما.
অর্থ: সে বলল, 'আকাশ বিষণ্ণ গোমরা হয়ে আছে।' বললাম, 'তুমি হাস্যবদন থাক। আকাশের বিষণ্ণতা গোমরাভাব মুহূর্তেই কেটে যাবে।' সে বলল, 'শৈশব অতীত হলো! যৌবন ফুরিয়ে গেল!' বললাম, 'হাসিমুখে পৌঢ়ত্বের ভার গ্রহণ কর। তোমার আক্ষেপ অতীত শৈশব ও হারানো যৌবন ফিরিয়ে দিতে পারবে না।'
* আমেরিকান ফোর্ড মটর কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা হেনরি ফোর্ড (১৮৬৩- ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দ) বলেছেন: 'একটি ক্ষেত্রে আপনার বিশ্বাস আপনি পারবেন, আর একটি ক্ষেত্রে আপনার ধারণা, আপনি পারবেন না। দু'টি ক্ষেত্রেই দেখবেন, আপনার বিশ্বাস ও ধারণাটাই সত্যে প্রমাণিত হয়েছে।'
* মাইক্রোসফটের প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক সফটওয়্যার নির্মাতা বিল গেটস বলেছেন: 'ইউনিভার্সিটির কয়েকটি সাবজেক্টে ফেল করেছি; কিন্তু আমার বন্ধুটি বেশ সাফল্যের সাথেই পাশ করেছে। এখন সে মাইক্রোসফট কোম্পানির ইঞ্জিনিয়ার। আর আমি কোম্পানির স্বত্বাধিকারী।'
* প্রখ্যাত আমেরিকান সাহিত্যিক ও চিন্তাবিদ প্রেন্টাইস মুলফোর্ড (১৮৩৪- ১৮৯১ খ্রিষ্টাব্দ) বলেছেন: 'যে ব্যক্তি শুধু জীবনের নেতিবাচক দিকগুলোকেই বড় করে দেখে, অতীতের দুঃখ-দুর্দশার ভাবনায় ডুবে থাকে, ভবিষ্যতেও সে অনুরূপ প্রতিকূল পরিস্থিতির অজানা আশঙ্কায় ভুগতে থাকে। একপর্যায়ে সে অন্ধকার ভবিষ্যৎ ছাড়া আর কিছুই দেখতে পায় না। তখন তার নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিই বাস্তবে প্রতিফলিত হয়। পদে পদে সে নানা প্রতিবন্ধকতা ও প্রতিকূলতার শিকার হয়।'
📄 রাগ-ক্রোধ
রাগ-ক্রোধ হলো দৈনন্দিন জীবনের এক জটিল সমস্যা ও মারাত্মক ব্যাধি। এ স্বভাবজাত রিপু মানুষের মাঝে আজ ব্যাপক ও প্রকট আকার ধারণ করেছে।
ব্যক্তি যখন কোনো কিছুতে অসন্তুষ্ট ও বিরক্ত হয় তার মধ্যে রাগের উদ্রেগ ঘটে, ক্রোধ সঞ্চারিত হয়। রাগের বশবর্তী হয়ে মানুষ গালমন্দ, অভিশাপ, ঘাত-প্রতিঘাত, যুদ্ধ-বিগ্রহ, ডিভোর্স ও সম্পর্কচ্ছেদের মতো জঘন্য কাজ করতেও কুণ্ঠাবোধ করে না।
পৃথিবীতে বহু অন্যায়-অনাচার, যুলুম-নির্যাতন, ধ্বংস ও হত্যাযজ্ঞের নেপথ্য কারণ ছিল ভীষণ রাগ ও প্রচণ্ড ক্ষোভ। ক্রোধের মতো সুদূর অকল্যাণপ্রসারী ও দ্রুত ক্রিয়াশীল মানবপ্রবৃত্তি দ্বিতীয়টি নেই। কেননা তা ব্যক্তির কাজকর্ম, দায়-দায়িত্ব পালন হতে শুরু করে আচার-ব্যবহার সর্বত্র ক্রীয়াশীল হয়ে থাকে। এ যেন এক সর্বনাশা ক্যান্সার ব্যাধি। যার ধ্বংসাত্মক জীবাণুগুলো দেহের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে।
অতিরিক্ত ক্রোধের কারণে হৃদস্পন্দন ও রক্তচাপ বাড়তে থাকে। হার্টঅ্যাটাক ও মস্তিষ্কের রক্তক্ষরণের মতো প্রাণঘাতী রোগের ঝুঁকি বাড়ে। মাত্রাতিরিক্ত ক্রোধের কারণে পাকস্থলীর কোষগুলো উজ্জীবিত হয়ে ওঠে। সঙ্গে সঙ্গে এসিড নির্গমনের পরিমাণও বেড়ে যায়।
রাগ ও ক্ষোভের কারণে মানুষ শুভবুদ্ধি চর্চার প্রাণশক্তি হারিয়ে ফেলে। পরিবার-পরিজন, সমাজ ও বন্ধুজনের কাছে অসহ্য হয়ে ওঠে। কেউ তাকে সহ্য করতে পারে না। তার রগচটা স্বভাবের কারণে সবাই তটস্থ থাকে। সমাজের সঙ্গে সে যতই মিলেমিশে চলার চেষ্টা করুক, প্রত্যেকেই তার সাথে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে চলে। একপর্যায়ে ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবন ভীষণ অস্বস্তিকর লাগে।
সুস্থ স্বাভাবিক জীবনযাপন করার জন্য রাগ ও ক্ষোভের মানসিকতা পরিহারের বিকল্প নেই। কিন্তু এর উপায় কী? এ সঠিক পথ ও পন্থা কী?
সমাধান:
১. রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর আদেশ মান্য করুন। যেমনটি হাদীসে বর্ণিত হয়েছে: عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ، أَنَّ رَجُلًا قَالَ لِلنَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: أَوْصِنِي، قَالَ: «لَا تَغْضَبْ فَرَدَّدَ مِرَارًا، قَالَ: «لَا تَغْضَبْ» (صحيح البخاري) ٢٨/٨
অর্থ: আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, এক ব্যক্তি নবী ﷺ-এর নিকট বলল, 'আপনি আমাকে অসিয়ত করুন।' তিনি বললেন, 'তুমি রাগ করো না।' লোকটি কয়েকবার তা বললেন। নবী ﷺ প্রত্যেকবারই বললেন, 'রাগ করো না।' (বুখারী, ৮/২৮)
২. জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে, প্রতিটি অঙ্গনে এ দিকনির্দেশনা অনুযায়ী চলুন-আপনার সহপাঠী বা সহকর্মীদের বলে দিন, রাগের মুহূর্তে তারা যেন আপনাকে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর হাদীসের নিষেধাজ্ঞার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। এর মাধ্যমে তারাও প্রতিদানপ্রাপ্ত হবে।
৩. রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাদের ক্রোধ দমন করার পদ্ধতি বাতলে দিয়েছেন। তা হলো, ভীষণ রাগের মুহূর্তে ওযু করুন। পানি যেমন আগুন নিভিয়ে দেয়, তেমনই মনের চাপা ক্ষোভ ও উত্তেজনা প্রশমিত করে। নিজের অবস্থান পরিবর্তন করুন। যদি দাঁড়িয়ে থাকেন বসে পড়ুন। যদি বসে থাকেন শুয়ে পড়ুন। অথবা স্থান ত্যাগ করুন এবং أَعُوْذُ بِاللَّهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّحِيمِ পাঠ করুন।
৪. রাগের সময় চুপ থাকুন। কোনো কথা বলা থেকে বিরত থাকুন। রাগের মাথায় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা, কোনো প্রকার আর্থিক লেনদেন ও চুক্তি করা সমীচীন নয়। কেননা রাগের মাথায় সিদ্ধান্ত ও মতামত-কোনোটাই ন্যায়ানুগ ও যথার্থ হতে পারে না। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: وَإِذَا غَضِبَ أَحَدُكُمْ فَلْيَسْكُتْ».
অর্থ: 'তোমাদের কেউ যখন রাগ করে সে যেন চুপ থাকে।' (মুসনাদে আহমাদ, ৪/৩৯)
৫. রাগ করার আগে একবার ভাবুন, রাগ মানুষকে গুনাহে লিপ্ত করে। তার নেক আমল বরবাদ করে। ব্যক্তির সুনাম-সুখ্যাতি ও মান-মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করে। পরিচিতজন ও বন্ধুদের সাথে সম্পর্কের অবনতি ঘটায়। সর্বোপরি রাগান্বিত ব্যক্তিকে আল্লাহর ক্রোধের পাত্রে পরিণত করে।
৬. ক্রোধ দমন করা এবং ক্ষমা ও সহনশীলতার আচরণের বিরাট ফযিলত ও প্রতিদানের কথা চিন্তা করুন। মহান রাব্বুল আলামীনের তরফ থেকে প্রতিদান লাভের প্রত্যাশাই আপনাকে রাগ ও ক্ষোভের মানসিকতা বর্জনে উদ্বুদ্ধ করবে।
৭. অধস্তন ও নিম্নবর্গের ওপর আপনার যে কর্তৃত্ব ও ক্ষমতা, আল্লাহ তা'আলা আপনার ওপর তার চেয়ে নিরঙ্কুশ ও একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী। তাই শান্তি ও প্রতিশোধের ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও ক্ষমাসুন্দর আচরণ করুন। আল্লাহ তা'আলা আপনার ওপর রহম করবেন। হাদীসে বর্ণিত হয়েছে: «الرَّاحِمُونَ يَرْحَمُهُمُ الرَّحْمَنُ، ارْحَمُوا مَنْ فِي الْأَرْضِ يَرْحَمْكُمْ مَنْ فِي السَّمَاءِ». (سنن الترمذي) ٣/٣٨٨ অর্থ: 'দয়ার্দ্র ব্যক্তিদের ওপর পরম দয়ালু সত্তা (আল্লাহ তা'আলা) রহম করেন। তোমরা যমীনবাসীর ওপর রহম কর। আসমানে বিরাজমান সত্তা তোমাদের ওপর রহম করবেন।' (তিরমিজী, ৩/৩৮৮)
৮. যদি রাগের উদ্রেগ হয় তাহলে তাসবীহ পাঠ করুন। রাগ প্রশমিত হতে থাকবে। মন-মানসিকতা প্রশান্তি ও প্রফুল্লতায় ভরে উঠবে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা তাসবীহের আমলের সঙ্গে মানসিক প্রশান্তি জুড়ে দিয়েছেন। পবিত্র কুরআনের ভাষায়: ﴿وَمِنْ أَنَاءِ اللَّيْلِ فَسَبِّحُ وَأَطْرَافَ النَّهَارِ لَعَلَّكَ تَرْضَى﴾ [طه: ١٣٠] অর্থ: 'সূর্যোদয়ের পূর্বে, সূর্যাস্তের পূর্বে এবং তাসবীহ পাঠ কর রাতের কিছু অংশে ও দিনের প্রান্তসমূহে, যাতে তুমি সন্তুষ্ট হতে পার।' (ত্বহা, ২০: ১৩০)
৯. রাগ ও ক্ষোভের কারণে যে মানসিক ও শারীরিক ক্ষতির শিকার হবেন, তা কি কখনো ভেবে দেখেছেন? দুশ্চিন্তা-বিষণ্ণতা, মানসিক সংকীর্ণতা, আক্ষেপ-অনুতাপ-এসবই রাগ করার অশুভ পরিণতি। এ ছাড়াও ব্লাডপ্রেসার, হার্টঅ্যাটাক, ব্রেইন স্ট্রোক ও মস্তিষ্কের রক্তক্ষরণের মতো প্রাণঘাতী রোগের ঝুঁকি বাড়তে থাকে।
১০. রাগ প্রশমিত করার চর্চা করুন। রাগের উদ্রেগ হওয়া মাত্র নাক দিয়ে টেনে লম্বা শ্বাস গ্রহণ করুন। কয়েক সেকেন্ড শ্বাস ধরে রেখে মুখ দিয়ে ধীরে ধীরে নিশ্বাস ত্যাগ করুন। এভাবে কয়েকবার করুন, দেহ-মন উভয়ই প্রশান্ত হবে।
১১. অন্যদের সম্মান বজায় রাখুন। তাদের প্রতি সুধারণা পোষণ করুন। অধীন ও নিম্নবর্গের লোকদের কথা ধৈর্যের সঙ্গে মনোযোগ দিয়ে শুনুন। তাদের ওজর-আপত্তি কবুল করুন। সময় নিয়ে ধৈর্যের সাথে কথা শোনার কারণে অনেক ভুল ধারণা ও অবিশ্বাসের আশঙ্কা থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। ফলে অন্যায় রাগ ও ক্ষোভের সম্ভাবনা থাকে না।
১২. সন্তানদের ঈমানী শিক্ষা-দীক্ষা ও কুরআন-সুন্নাহর আদর্শে গড়ে তুলতে হবে। ক্রোধ দমন, সহনশীলতা ও ক্ষমার গুণের মতো মহৎ আত্মিক গুণাবলি অর্জনে উদ্বুদ্ধ করতে হবে।
১৩. দু'টি বিষয়ের জন্য সর্বদা আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা করুন: প্রথমটি হলো, বিনয়-নম্রতা ও সহনশীলতা। অপরটি হলো, সন্তুষ্ট ও ক্ষুব্ধ-উভয় অবস্থায় ন্যায়সংগত কথা বলার যোগ্যতা। রাসূলুল্লাহ ﷺ আল্লাহ তা'আলার দরবারে এই প্রার্থনা করতেন:
وَأَسْأَلُكَ كَلِمَةَ الْحَقِّ فِي الرِّضَا وَالْغَضَبِ».
অর্থ: (হে আল্লাহ!) আমি আপনার নিকট প্রশান্ত ও ক্রোধান্বিত-উভয় অবস্থায়ই ন্যায়ানুগ কথা বলার তাওফিক প্রার্থনা করছি।' (নাসায়ী, ৩/৫৪)
১৪. বিশ্বাস করুন, রাগ ও ক্ষোভ প্রকাশের ক্ষেত্রে আত্মনিয়ন্ত্রণ করা ও ক্রোধ দমন করতে পারা দুর্বলতা ও অক্ষমতার আলামত নয়; বরং নৈতিক শক্তি ও সাহসিকতার পরিচয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর পবিত্র যবানেই শুনুন:
لَيْسَ الشَّدِيدُ بِالصُّرْعَةِ، إِنَّمَا الشَّدِيدُ الَّذِي يَمْلِكُ نَفْسَهُ عِنْدَ الغَضَبِ» (صحيح البخاري) ٢٨/٨
অর্থ: 'যে পেশিশক্তি জাহির করে সে আসল শক্তিশালী নয়। প্রকৃত শক্তিশালী ও বলবান হলো, যে রাগের সময় আত্মনিয়ন্ত্রণ করতে পারে।' (বুখারী, ৮/২৮)
১৫. আল্লাহ তা'আলার মহব্বত ও ভালোবাসা কে-ই বা পেতে না চায়? তাহলে রাগ ও ক্ষোভের মানসিকতা পরিহার করে ধৈর্য ও সহনশীলতার চর্চা করুন। রাসূলুল্লাহ ﷺ আব্দুল কায়েস (রা.)-কে সুসংবাদ প্রদান করে বলেছেন:
إِنَّ فِيكَ خَصْلَتَيْنِ يُحِبُّهُمَا اللهُ : الْحِلْمُ، وَالْأَنَاةُ (صحيح مسلم ١/ ٤٨)
অর্থ: 'তোমার মধ্যে দু'টি স্বভাবগুণ বর্তমান, যা আল্লাহ তা'আলা পছন্দ করেন। (স্বভাবগুণ দু'টি হলো,) ধৈর্য ও সহনশীলতা।' (মুসলিম ১/৪৮)
১৬. যদি ক্রোধ দমন করা সম্ভব না হয়, আত্মনিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায় তাহলে রাগ ও ক্ষোভের সম্ভাব্য ক্ষেত্র থেকে দূরে থাকুন। রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর পবিত্র যবানে এমনই নির্দেশবাণী উচ্চারিত হয়েছে:
أَمْلِكُ عَلَيْكَ لِسَانَكَ، وَلْيَسَعْكَ بَيْتُكَ، وَابْكِ عَلَى خَطِيئَتِكَ» (سنن الترمذي) ١٨٣/٤
অর্থ: 'তোমার যবান সংযত রাখ। (ফেতনার যামানায়) নিজ ঘরে আবদ্ধ থাক। নিজের ভুল-ত্রুটির জন্য অনুতপ্ত হও।' (তিরমিযি, ৪/১৮৩)
১৭. যে সমস্ত কারণে রাগের উদ্রেগ হয়, যে ব্যক্তিদের কারণে মনে ক্ষোভের সঞ্চার হয় তাদের থেকে দূরে থাকুন। তাহলে রাগের সম্ভাবনা কমে যাবে। অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণ করে আফসোস-অনুতাপে ভুগতে হবে না।
১৮. বিনম্র ও মার্জিত আওয়াজে কথা বলুন। চিৎকার-চেঁচামেচি আপনার কথার জোর বাড়াবে না, বক্তব্য জোরালোভাবে সাব্যস্ত করবে না। উল্টো আপনার অভদ্রতা ও অসভ্যতা ফাঁস করে দিবে। মানুষের কাছে আপনি সম্মান ও মর্যাদা হারাবেন।
১৯. রাগ ও ক্রোধের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্ক থাকুন। কেননা তা বহু অন্যায়-অনিষ্ট এবং শারীরিক ও মানসিক ব্যাধির মূল কারণ।
পরিশিষ্ট:
একদিন ওমর ইবনে আব্দুল আজীজ (রহ.)-এর পুত্র ছোট বাচ্চাদের সঙ্গে খেলছিল। বাচ্চারা বেশ হাসি-আনন্দের সাথেই খেলাধুলায় মত্ত ছিল। এর মধ্যেই এক দুষ্ট ছেলের আঘাতে ওমর ইবনে আব্দুল আজীজ (রহ.)-এর পুত্রের মাথা ফেটে গেল। সঙ্গে সঙ্গে রক্ত বের হতে লাগল। লোকেরা দুষ্ট ছেলেটিকে ধরে খলিফার দরবারে নিয়ে এল। বাইরে চিৎকার-চেঁচামেচি শুনে ওমর ইবনে আব্দুল আজীজ (রহ.) ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। ইতোমধ্যেই ছেলেটির মা এসে খলিফার দরবারে উপস্থিত। অনুনয়ের সুরে বলল: 'ছেলেটি আমার এতিম। তার বাবা নেই।'
খলিফা বললেন: 'আপনি ধৈর্যধারণ করুন। বিচলিত হবেন না।' এরপর তিনি জানতে চাইলেন: 'এতিমদের তালিকায় এই ছেলেটির নাম আছে কি না?' ছেলেটির মা বলল: 'না, এতিমদের তালিকায় তার নাম নেই। 'বায়তুল মাল' থেকে সে কোনো সুযোগ-সুবিধাও পাচ্ছে না।'
খলিফা বললেন: 'এতিমদের তালিকায় এই ছেলেটির নাম রেজিস্ট্রি করে দাও।'
খলিফা-পত্নী ফাতেমা বললেন: 'এই ছেলেটির প্রতি আপনি এত সদয় হচ্ছেন কেন? আজ আপনার পুত্রকে রক্তাক্ত করেছে। কাল আর একজনকে আহত করবে।'
খলিফা তাঁর পত্নীর উদ্দেশ্যে বললেন: 'যা বলার বলেছ। আর বলো না। ছেলেটি এতিম। লোকেরা তাকে এমনভাবে ধরে এনেছে যে, তাকে অনেক ভয় পাইয়ে দিয়েছে। এখন তাকে একটু শান্ত-নিশ্চিন্ত হওয়ার সুযোগ দাও।'
খলিফা ওমর বিন আব্দুল আজীজ (রহ.)-এর কী অনুপম মহানুভবতা ও সহনশীলতা! সন্তানের মাথা রক্তাক্ত দেখে তিনি একটুও বিচলিত হলেন না, রাগান্বিত হলেন না। ক্ষমা-সুন্দর ব্যবহার করে উদারতা ও মহানুভবতার কী অনুপম দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন! চরিত্র-মাধুর্যে ও ক্ষমার গুণে তাঁরাই হলেন পবিত্র কুরআনের বাস্তব নমুনা। তাঁদের সম্পর্কেই পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে:
وَالْكَاظِمِينَ الْغَيْظَ وَالْعَافِينَ عَنِ النَّاسِ وَاللَّهُ يُحِبُّ الْمُحْسِنِينَ [آل عمران: ١٣٤]
অর্থ: 'যারা নিজের রাগ হজম করতে ও মানুষকে ক্ষমা করতে অভ্যস্ত। আল্লাহ এরূপ পুণ্যবানদেরকে ভালোবাসেন।' (আলে- ইমরান, ৩: ১৩৪)
* বিখ্যাত ফরাসি উদ্ভাবক ও বহুবিদ্যাজ্ঞ পিয়ের বিউমার্কাইজ (১৭৩২- ১৭৯৯ খ্রিষ্টাব্দ) বলেছেন: 'রাগের শুরুটা হলো পাগলামি। তার শেষটা হলো আক্ষেপ অনুতাপ।'
* হাফেজ ইবনুল কাইয়্যিম জাওযী (রহ.) (৬৯১-৭৫১ হি.) বলেছেন: 'নিজের রাগটাকে ধৈর্য ও সহনশীলতার রশিতে বেঁধে ফেলুন। কেননা মনের ক্ষোভ ও ক্রোধ হলো পাগলা কুকুর। একবার যদি বাঁধনমুক্ত হয়ে যায় সবকিছু নাশ করে ফেলে।'
* বিখ্যাত আরব কবি ও দুঃসাহসী যোদ্ধা আনতারাহ ইবনে শাদ্দাদ (৫২৫- ৬০৮ খ্রিষ্টাব্দ) বলেছেন:
لا يحمل الحقدَ مَن تَعلو بِهِ الرُتَبُ وَلا يَنالُ العُلا مَن طَبْعُهُ الغَضَبُ
অর্থ: 'অভিজাত সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি হিংসা-বিদ্বেষ পুষে রাখতে পারে না। রাগী ও বদমেজাযি কখনো সফলতার শীর্ষস্থান অধিকার করতে পারে না।'
* ইয়েমেনের প্রেসিডেন্ট-পদ গ্রহণ করার পর ড. মুহাম্মাদ সা'দ আস্সা'দী তাঁর পুত্রকে বলেন: 'কখনো যদি মনে রাগ ও ক্ষোভের উদ্রেগ হয় তাহলে উপরে আসমান ও নিচে যমীনের দিকে তাকাও। আসমান-যমীনের বিশালত্ব এবং তার স্রষ্টার বড়ত্ব ও মহত্ত্ব অনুধাবন করার চেষ্টা করো।'