📄 দুঃখ-বেদনা
অতীতের কষ্টদায়ক স্মৃতি মনে পড়, লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থতা কিংবা প্রিয়জনের অকাল বিচ্ছেদ ইত্যাদি কারণে যে বেদনাদায়ক মানসিক অবস্থার সৃষ্টি হয় তা-ই দুঃখ-বেদনা, যা মানসিক অস্থিরতা ও দুর্দশার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। পর্যায়ক্রমে তা ব্যক্তির জীবনকে অসহনীয় দুর্বিষহ করে তোলে।
দুঃখ-কষ্ট হলো একখণ্ড কালো মেঘ, ঘুটঘুটে অন্ধকার রাত। তা এমন কষ্টদায়ক পরিস্থিতি, যা জীবনের গতিময়তা স্থবির করে দেয়। দুঃখ-কষ্টের কবলে মানুষ নেগেটিভ চিন্তা-ভাবনার শিকার হয়। তার মনে নেতিবাচক মানসিকতা বাসা বাঁধতে শুরু করে। আশা-আকাঙ্ক্ষা ও সফলতার কথা সে কল্পনাও করতে পারে না। জীবনের যত সৌন্দর্য, স্বাদ-আহ্লাদ ও হাসি-আনন্দ সবই বিস্বাদ লাগে। উচ্ছল প্রাণবন্ত জীবনের স্বপ্নিল পথ হারিয়ে ফেলে। এভাবে এক পর্যায়ে সে ডিপ্রেশন ও হতাশার মতো জটিল মানসিক ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে পড়ে। এমন জটিল ব্যাধি থেকে বাঁচার উপায় কী? দুঃখ-বেদনা কাটিয়ে ওঠার পথ কী?
সমাধান:
১. নিজেকে একবার জিজ্ঞেস করে দেখুন, দুঃখ-কষ্ট কি আপনার হারানো বস্তু পুনরুদ্ধার করতে পেরেছে? আপনার আর্থিক ক্ষতি পুষিয়ে দিতে পেরেছে? পেরেছে কি সুস্বাস্থ্য ফিরিয়ে দিতে? অকাল মৃত্যুর হাত থেকে আপনজনকে রক্ষা করতে? সুতরাং দুঃখ-কষ্টে জড়িয়ে থেকে কোনো লাভ নেই। অযথা মনের মধ্যে পুষে রাখার কোনো অর্থ নেই।
২. অতীতের যত দুঃখ-বেদনা ও কষ্ট-জ্বালা-সব কিছু ভুলে যান, বিস্মৃতির গহ্বরে ছুড়ে ফেলুন এবং জ্বলজ্বলে বর্তমানের কর্তব্যকে কাজে পরিণত করুন। তাতেই আপনার সুখ ও সফলতা নিহিত।
৩. ইবাদত ও যিকির-আযকার মানুষের জীবনে অসামান্য প্রশান্তি এনে দেয়। গভীর ধ্যানমগ্ন হয়ে আল্লাহর যিকির করা, নামায কায়েম করা, তাঁর প্রশংসা করা ও তাঁরই কাছে সাহায্য প্রার্থনা করা মানুষকে সব দুঃখ ভুলিয়ে দিতে পারে। তাই নিয়মিত সালাত কায়েম করুন। আল্লাহ তা'আলার কাছে প্রার্থনা করুন। ধৈর্যের সাথে তাঁর প্রতিদানের অপেক্ষা করুন। দেখবেন, একটু একটু করে মনের দুঃখ বেদনাগুলো মুছে যাচ্ছে।
৪. নামায হলো যাবতীয় বিপদ-আপদ ও দুঃখ-কষ্টের নিরাময়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখনই কোনো বিষয়ে শঙ্কিত হতেন, নামাযে মশগুল হতেন। বলতেন:
«يَا بِلَالُ، أَرِحْنَا بِالصَّلَاةِ»
অর্থ: 'হে বেলাল! নামায কায়েম করে আমাদের প্রশান্তি দাও।' (মুসনাদে আহমাদ, ৩৮/১৭৮)
তাই দুঃখ-কষ্টের মুহূর্তে নামাযই হোক আপনার প্রথম আশ্রয়। সিজদারত হয়ে এ দু'আটি পাঠ করুন:
«اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْهَمِّ وَالْحَزَنِ».
অর্থ: 'হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে বিষণ্ণতা ও দুঃখ-কষ্ট থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি।'
৫. পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন:
﴿أَلَا بِذِكْرِ اللَّهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوبُ﴾ [الرعد: ٢٨]
অর্থ: 'স্মরণ রেখ, কেবল আল্লাহর যিকিরই সেই জিনিস, যা দ্বারা অন্তরে প্রশান্তি লাভ হয়।' (সূরা রা'দ, ১৩: ২৮)
তাই বেশি বেশি আল্লাহর যিকির করুন। আত্মিক প্রশান্তি অর্জিত হবে। জীবন উচ্ছলতা ও প্রাণ ফিরে পাবে। পবিত্র কুরআনে বর্ণিত হযরত ইউনুস (আ.)-এর বিপদমুক্তির দু'আটি পাঠ করুন। পবিত্র কুরআনের ভাষায়:
لا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ سُبْحَنَكَ إِنِّي كُنْتُ مِنَ الظَّلِمِينَ
অর্থ: '(হে আল্লাহ!) তুমি ছাড়া কোন মাবুদ নেই। তুমি সকল ত্রুটি থেকে পবিত্র। নিশ্চয়ই আমি অপরাধী।' (আম্বিয়া, ২১:৮৭) দুঃখ-দুর্দশা ও বিপদ-আপদ থেকে মুক্তি লাভের জন্য এ দু'আটি হলো ঐশী দিকনির্দেশনা।
৬. আল্লাহ তা'আলা আপনাকে যে নিয়ামত দান করেছেন, তাতেই তুষ্ট থাকুন। মানুষের দুঃখী হওয়ার প্রধান একটি কারণ হলো, সে যা পেয়েছে তাতে তৃপ্ত ও কৃতজ্ঞ না হওয়া। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: لَيْسَ الغِنَى عَنْ كَثْرَةِ العَرَضِ، وَلَكِنَّ الغِنَى غِنَى النَّفْسِ (صحيح البخاري ٩٥/٨)
অর্থ: 'অঢেল ধন-দৌলত ও সহায়-সম্পত্তিই প্রকৃত সচ্ছলতা নয়। মনের সচ্ছলতাই প্রকৃত সচ্ছলতা।' (বুখারী, ৮/৯৫) এ জীবনে যা পেয়েছেন, তাতেই তুষ্ট ও কৃতজ্ঞ হোন। এর মধ্যেই আপনার প্রকৃত সচ্ছলতা নিহিত আছে।
৭. যে নায-নিয়ামতপ্রাপ্ত হয়েছেন, যে সৌভাগ্য ও সফলতা অর্জন করতে পেরেছেন তার একটা তালিকা করুন। আর জীবনে কদাচিত কিঞ্চিৎ যে ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন তারও একটা তালিকা করুন। দেখবেন, দুঃখ-কষ্টের তুলনায় সুখানন্দের পরিমাণ বহুগুণ বেশি। চিন্তা করলে এমন অনেক বিষয় খুঁজে পাবেন যা আপনার আছে, অন্যদের নেই। এর জন্য সৃষ্টিকর্তার কাছে কৃতজ্ঞ হোন। কৃতজ্ঞতা স্বীকার করার কারণে অনেক মানুষ বলার মতো কিছু না থাকার পরও পরম সুখী। আবার অকৃতজ্ঞ হওয়ার কারণে একটা শ্রেণি সব রকম পার্থিব আরাম-আয়েশ ভোগ করেও অতৃপ্ত অসুখী।
৮. হতাশা ও নিরাশাবাদী লোকদের সঙ্গ ত্যাগ করুন। তারা শুধু আপনাকে দুঃখ-দুর্দশার কথাই শোনাবে। ব্যর্থতা ও হতাশার কথা বলে আপনার কান ভারি করে তুলবে। তাদের সঙ্গদোষে আপনি নিজের অজান্তেই নেতিবাচক মন-মানসিকতায় আক্রান্ত হয়ে পড়বেন। আশাবাদী ও স্বপ্নবান ব্যক্তিদের সান্নিধ্যে থাকুন। তাদের সংস্পর্শ আপনার সফলতা ও সৌভাগ্যের পথ সুগম করবে।
জীবনের সমস্ত হতাশা ও ব্যর্থতার কথা ভুলে যান। এমন সমস্ত কাজে নিয়োজিত থাকুন, যা বর্তমানে ও অদূর ভবিষ্যতে আপনার ও সমাজের সমষ্টির জন্য সুফল বয়ে আনবে। প্রকৃত বিচক্ষণ বুদ্ধিমান তার ক্ষতিকে লাভে এবং নিরাশাকে আশায় রূপান্তরিত করে।
৯. ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনের প্রতিটি অঙ্গনে বিজ্ঞ ও বিদগ্ধজনদের এড়িয়ে একক সিদ্ধান্তে পরিচালিত হবেন না। আপনার ব্যক্তিগত জানা-শোনা যত বেশিই হোক-না-কেন, অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার যত সমৃদ্ধই হোক-না-কেন, একক সিন্ধান্ত কখনো কখনো আপনাকে ভুল পথেও ধাবিত করতে পারে। তাই জীবনের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়গুলোতে পরিবার-পরিজন ও বিজ্ঞ-অভিজ্ঞজনদের সাথে আলোচনাসাপেক্ষে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করুন। তাদের পক্ষ থেকে কখনো কখনো এমন সমাধান ও দিকনির্দেশনা পাবেন যা আপনাকে ব্যর্থতার কবল থেকে উদ্ধার করে সফলতার পথে পরিচালিত করবে।
১০. ঘড়ির কাঁটার দিকে লক্ষ করুন, কীভাবে অনবরত আবর্তিত হচ্ছে; চন্দ্র-সূর্য, গ্রহ-নক্ষত্র কীভাবে বিরামহীন প্রদক্ষিণ করছে। পৃথিবীর কোনো দুর্যোগ-দুর্বিপাক এগুলোর গতিময়তায় ব্যাঘাত ঘটাতে পারেনি। মানুষের জীবনও তাই-কোনো বিপদ-আপদ তার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না। তবে যে সাময়িক বিপত্তি ঘটে তার আড়ালে মূলত আসন্ন সুখ ও সৌভাগ্যের সম্ভাবনার হাতছানি থাকে। তাই মেঘের তর্জন-গর্জনে বিচলিত না হয়ে তার আড়ালের সূর্যের হাসি দেখে আশাবাদী হোন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলার সুসংবাদ: ﴿فَإِنَّ مَعَ الْعُسْرِ يُসْرًا إِنَّ مَعَ الْعُسْرِ يُসْرًا﴾ [الشرح: ٥، ٦]
অর্থ: 'প্রকৃতপক্ষে কষ্টের সাথে স্বস্তি থাকে। নিশ্চয়ই কষ্টের সাথে স্বস্তি থাকে।' (ইনশিরাহ্, ৯৪: ৫, ৬)
আপনার কি মনে হয়, জীবনের একটি বাধা, একটি ব্যর্থতা দু'টি সফলতা ও সৌভাগ্যের সমান হতে পারে? কখনই না। তাহলে দুঃখ যন্ত্রণার ঘেরাটোপে আটকে না থেকে অপার সম্ভাবনা ও উন্মুক্ত সফলতার পানে এগিয়ে চলুন।
১১. বিবেক-বুদ্ধির বিচারে ও ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেও দুঃখক্লিষ্ট হওয়া কাম্য নয়। কেননা তা আপনাকে জীবনের কর্মমুখরতা ও ইবাদত-মগ্নতার ক্ষেত্রে দুর্বল করে ফেলবে। জীবনের ঈপ্সিত সৌন্দর্য নষ্ট করে সহজাত জীবনযাপনের নির্মলতা ও স্বচ্ছতাকে কর্দমাক্ত করে ছাড়বে।
১২. জীবনে যা-কিছু হারিয়ে যাক, যা-কিছু হাত ছাড়া হয়ে যাক, মনে করবেন, এই না পাওয়ার মাঝেই আপনার সুখ-সৌভাগ্য নিহিত। বিশ্বাস রাখবেন, যা কিছু হয়েছে আল্লাহর ফায়সালায় হয়েছে। তাঁর ফায়সালাই আপনার জন্য মঙ্গলজনক।
১৩. প্রশান্ত চিত্ত হোন। একান্ত নিবিষ্টচিত্তে সুমধুর কণ্ঠে কুরআন তিলাওয়াত শ্রবণ করুন। হৃদয়-মন অভাবিত আনন্দ ও অপার্থিব প্রশান্তিতে ভরে উঠবে। পবিত্র কুরআনে মহান রবের বাণী:
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ إِذَا ذُكِرَ اللهُ وَجِلَتْ قُلُوبُهُمْ وَإِذَا تُلِيَتْ عَلَيْهِمْ آيَتُهُ زَادَتْهُمْ إِيمَانًا وَعَلَى رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُونَ﴾ [الأنفال: ٢]
অর্থ: 'মুমিন তো তারাই, যাদের সামনে আল্লাহকে স্মরণ করা হলে তাদের হৃদয় ভীত হয়, যখন তাদের সামনে তাঁর আয়াতসমূহ পড়া হয়, তখন তা তাঁদের ঈমানের উন্নতি সাধন করে এবং তাঁরা তাঁদের প্রতিপালকের উপর ভরসা করে।' (আনফাল, ৮: ২)
১৪. যখন দুঃখ-কষ্টের ঘেরাটোপে আটকে পড়ে সুখ-শান্তি হাতড়ে ফিরবেন, দুশ্চিন্তা ও বিষণ্ণতায় আক্রান্ত হয়ে এক চিলতে হাসি আনন্দের জন্য অধীর পড়বেন, তখন 'ইস্তেগফার' হলো আপনার পরম আশ্রয়। 'ইস্তেগফার' হলো মুক্তির পথ। শান্তি ও নিরাপত্তার সোপান। যে ব্যক্তি এ পথ অবলম্বন করবে, আল্লাহ তা'আলা তার দুঃখ-কষ্ট দূর করে দিবেন। জীবনে পরম সৌভাগ্য ও শান্তি দান করবেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর উম্মতকে এ সুসংবাদই দান করেছেন:
مَنْ أَكْثَرَ مِنَ الاسْتِغْفَارِ، جَعَلَ اللهُ لَهُ مِنْ كُلِّ هَمَّ فَرَجًا، وَمِنْ كُلِّ ضِيقٍ مَخْرَجًا، وَرَزَقَهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ
অর্থ: 'যে ব্যক্তি বেশি বেশি ইস্তেগফার করবে, আল্লাহ তার জন্য সকল দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তির পথ খুলে দিবেন। সমস্ত সংকট কাটিয়ে ওঠার পন্থা বাতলে দিবেন। এমন উপায়ে রিযিক দান করেন, যা সে কল্পনাও করতে পারবে না।' (মুসনাদে আহমাদ: ৪/১০৪)
১৫. পবিত্র কুরআনে সরল পথের দিকনির্দেশনা:
اهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمِ﴾ [الفاتحة: ٥]
অর্থ: 'আমাদের সরল পথে পরিচালিত কর।' (ফাতিহা, ১: ৪) ইহকালীন জীবনে সুখ ও প্রশান্তি লাভের প্রধান উপায় হলো 'তাকওয়া' অবলম্বন করা, সরল পথে চলা। সুতরাং যেখানেই থাকুন, যে অবস্থাতেই থাকুন, গুনাহ ও নাফরমানি বর্জন করে তাকওয়া (আল্লাহভীতি) অর্জন করে সরল পথে অবিচল থাকুন। দুঃখ-বেদনা ও যাবতীয় কষ্ট যাতনা থেকে এটাই পরম মুক্তির পথ। পবিত্র কুরআনের বাণী:
وَمَنْ يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَلْ لَهُ مَخْرَجًا ﴾ [الطلاق : ٢]
অর্থ: 'যে কেউ আল্লাহকে ভয় করবে, আল্লাহ তার জন্য (সমস্যা থেকে উদ্ধার পাওয়ার) কোন না কোন পথ বের করে দিবেন।' (তালাক, ৬৫: ২)
১৬. আপনি শুধু আজকের কথা ভাবুন। আজকের দায়িত্ব-কর্তব্য সম্পর্কে চিন্তা-ফিকির করুন। অনাগত আগামীর কথা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলুন। বর্তমানের দায়-দায়িত্বগুলো নিষ্ঠার সাথে সুষ্ঠুভাবে পালন করুন। ভবিষ্যতে আল্লাহ তা'আলা আপনার সহায় হবেন।
১৭. জীবন নিয়ে আপনার সুন্দর গোছালো পরিকল্পনা। তা সত্ত্বেও সময়ে সময়ে নানা প্রতিবন্ধকতা ও প্রতিকূলতার শিকার হচ্ছেন। তাহলে জেনে রাখুন, বিপদ-আপদ আপনার অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার সমৃদ্ধ করবে, পাপ মোচন করবে এবং আল্লাহ তা'আলার নিকট আপনার মর্যাদা বৃদ্ধির মাধ্যম হবে। বিদগ্ধ পণ্ডিত আবুল আলা আল মাআররির কথা স্মরণ করুন: তিনি ছিলেন অন্ধ। তা সত্ত্বেও তিনি ছিলেন একজন আরব দার্শনিক কবি ও লেখক। জীবনের সমস্ত অর্জিত জ্ঞান ও পাণ্ডিত্য অন্যদের হাতে লিখিয়ে নিয়েছেন। আল্লামা ইবনুল আসীর (রহ.) পঙ্গু হয়েও 'জামেউল উসূল' ও 'আন-নিহায়া'-এর মতো বিশাল গ্রন্থ রচনা করেছেন।
১৮. দুনিয়াতে আল্লাহ তা'আলার যিকিরকারীর মতো অন্যান্য আমলকারী ও ধর্মীয় জ্ঞানের চর্চাকারীগণও প্রধান মুখ্য ও প্রশংসিত। আর সমস্ত কিছুই নগণ্য ও নিন্দিত। সুতরাং নগণ্য বিষয়ে মন খারাপ করা অনুচিত। চিন্তা ও মননশীলতায় মহৎ উদার হোন। নচেৎ অতিসামান্য তুচ্ছ বিষয়ে ভেঙে পড়বেন। সাহসিকতা ও কর্মোদ্দীপনা হারিয়ে ফেলবেন। বিখ্যাত আরব কবি আবূ তায়্যেব মুতানাব্বি (৩০৩-৩৫৪ হি.) বলেছেন: وَتَعْظُمُ فِي عَينِ الصَغيرِ صِغَارُها وَتَصْغُرُ فِي عَينِ العَظيمِ العَظَائِمُ
অর্থ: 'ছোটদের দৃষ্টিতে নিতান্ত ক্ষুদ্র বিষয়গুলোও গুরুতর জটিল আকার ধারণ করে। প্রকৃত অর্থেই যারা মহৎ উদার, অনেক জটিল গুরুতর বিষয়ও তাঁরা সহজেই সমাধান করে ফেলেন।'
১৯. রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর প্রতি বেশি বেশি দুরূদ পাঠ করুন। কেননা তা দুশ্চিন্তা ও বিষণ্ণতা দূর করে স্থিরতা ও প্রশান্তি লাভের কার্যকর উপায়। দুরূদ পাঠের প্রতিদান সম্পর্কে হাদীসে বর্ণিত হয়েছে: عَنْ أَبَى بْنِ كَعْبٍ ... قَالَ أُبَيُّ قُلْتُ يَا رَسُولَ اللهِ، إِنِّي أُكْثِرُ الصَّلاةَ عَلَيْكَ فَكَمْ أَجْعَلُ لَكَ مِنْ صَلَاتِي فَقَالَ مَا شِئْتَ ". قَالَ: قُلْتُ: الرُّبُعَ - قَالَ: مَا شِئْتَ فَإِنْ زِدْتَ فَهُوَ خَيْرٌ لَكَ". قُلْتُ: النَّصْفَ. قَالَ: مَا شِئْتَ فَإِنْ زِدْتَ فَهُوَ خَيْرٌ لَكَ". قَالَ قُلْتُ فَالثُّلُثَيْنِ. قَالَ: مَا شِئْتَ فَإِنْ زِدْتَ فَهُوَ خَيْرٌ لَكَ. قُلْتُ أَجْعَلُ لَكَ صَلَاتِي كُلَّهَا. قَالَ: إِذًا تُكْفَى هَمَّكَ وَيُغْفَرُ لَكَ ذَنْبُكَ.
অর্থ: উবাই ইবনে কা'ব (রা.) থেকে বর্ণিত,... তিনি বলেন, আমি বললাম: 'হে আল্লাহর রাসূল! আমি তো খুব অধিক হারে আপনার প্রতি দরুদ পাঠ করি। আপনার প্রতি দরুদ পাঠের জন্য আমি আমার সময়ের কতটুকু খরচ করবো?' তিনি বললেন: 'তুমি যতক্ষণ ইচ্ছা কর।' আমি বললাম: 'এক-চতুর্থাংশ সময়?' তিনি বললেন: 'তুমি যতটুকু ইচ্ছা কর, তবে এর চেয়ে অধিক পরিমাণে পাঠ করতে পারলে এতে তোমারই মঙ্গল হবে।' আমি বললাম: 'তাহলে আমি কি অর্ধেক সময় দরুদ পাঠ করবো?' তিনি বললেন: 'তুমি যতক্ষণ চাও, যদি এর চেয়েও বাড়াতে পারো সেটা তোমার জন্যই কল্যাণকর।' আমি বললাম: 'তাহলে দুই-তৃতীয়াংশ সময় দরুদ পাঠ করবো?' তিনি বললেন: 'তুমি যতক্ষণ ইচ্ছা কর, তবে এর চেয়েও বাড়াতে পারলে তোমারই ভাল।' 'আমি বললাম: 'তাহলে আমার পুরো সময়টাই আপনার দরুদ পাঠে কাটিয়ে দিব?' তিনি বললেন: 'তোমার চিন্তা ও কষ্টের জন্য তা যথেষ্ট হবে এবং তোমার পাপসমূহ ক্ষমা করা হবে।' (তিরমিজী, ৪/৬৩৭)
২০. বিপদে ধৈর্য ধারণ করুন। উত্তম প্রতিদানের প্রত্যাশা করুন। আল্লাহ তা'আলা কিছুতেই আপনার ধৈর্য ও প্রতিদান নষ্ট করবেন না। তিনি নিজ উদারতা ও মহানুভবতার শান অনুযায়ী দান করবেন। হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন:
مَا لِعَبْدِي الْمُؤْمِنِ عِنْدِي جَزَاءُ، إِذَا قَبَضْتُ صَفِيَّهُ مِنْ أَهْلِ الدُّنْيَا ثُمَّ احْتَسَبَهُ، إِلَّا الجَنَّةُ» (صحيح البخاري) ٩٠/٨
অর্থ: 'আমি যখন কোনো মুমিন বান্দার প্রাণপ্রিয়জনকে দুনিয়ার কোল থেকে উঠিয়ে নেই, আর সে উত্তম বিনিময়ের আশায় ধৈর্যধারণ করে, আমার নিকট তার জন্য একটি বিরাট প্রতিদান সুনির্দিষ্ট থাকে। তা হলো জান্নাত।' (বুখারী: ৮/৯০)
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: ﴿سَلَمٌ عَلَيْكُمْ بِمَا صَبَرْتُمْ فَنِعْمَ عُقْبَى الدَّارِ﴾ [الرعد: ٢٤]
অর্থ: 'তোমরা (দুনিয়ায়) যে সবর অবলম্বন করেছিলে, তার প্রতিদানে এখন তোমাদের প্রতি কেবল শান্তিই বর্ষিত হবে এবং (তোমাদের) প্রকৃত নিবাসে এটা তোমাদের উৎকৃষ্ট পরিণাম!' (সূরা রা'দ, ১৩: ২৪)
২১. আপনাকে জীবনের বাস্তবতা মেনে নিয়েই বেঁচে থাকতে হবে। ইহকালীন জীবন অত্যন্ত বিপদসংকুল ও সংকটপূর্ণ। কিন্তু তা সাময়িক, একদিন তা নিঃশেষ হয়ে যাবে। সাময়িক দুঃখ-কষ্ট সহ্য করে আপনাকে পরকালের সীমাহীন শান্তিময় জীবনের জন্য প্রস্তুত হতে হবে। জান্নাত লাভের উপযুক্ত পাথেয় সংগ্রহ করতে হবে।
২২. অন্যায়-অত্যাচারের শিকার হয়ে যদি ন্যায়বিচার না পান তাহলে ব্যথিত হবেন না। মনের মধ্যে দুঃখ-কষ্ট পুষে রাখবেন না। বিচারের পালা এখানেই শেষ নয়। ন্যায়বিচারের পথ চূড়ান্ত রুদ্ধ নয়। রোজ হাশরে আরেকটি মহকুমা কায়েম হবে। বিচার করবেন 'আহকামুল হাকেমীন' মহান আল্লাহ তা'আলা। কারো ওপর একবিন্দু যুলুম করবেন না। তা হবে ঐশী ন্যায়পরায়ণতা ও ন্যায়ানুগতার বিচার। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন:
﴿وَنَضَعُ الْمَوَازِينَ الْقِسْطَ لِيَوْمِ الْقِيمَةِ فَلَا تُظْلَمُ نَفْسٌ شَيْئًا وَإِنْ كَانَ مِثْقَالَ حَبَّةٍ مِّنْ خَرْدَلٍ أَتَيْنَا بِهَا وَكَفَى بِنَا حَسِبِينَ﴾ [الأنبياء: ٤٧]
অর্থ: 'কেয়ামতের দিন আমি এমন তুলাদণ্ড স্থাপন করব, যা পুরোপুরি ন্যায়ানুগ হবে। ফলে কারও প্রতি কোন জুলুম করা হবে না। যদি কোন কর্ম তিল পরিমাণও হয়, তবে তাও আমি উপস্থিত করব। হিসাব গ্রহণের জন্য আমিই যথেষ্ট।' (আম্বিয়া, ২১:৪৭)
২৩. একবার ভেবে দেখুন, জান্নাতে আল্লাহ তা'আলা কত বিপুল সুখ-শান্তির উপকরণ প্রস্তুত করে রেখেছেন। দুঃখ-বেদনা, দুশ্চিন্তা ও বিষণ্ণতা কাটিয়ে ওঠার জন্য এটি একটি সফল পদ্ধতি। যদি রোগ-বিরোগে আক্রান্ত হন, বিপদ-আপদের সম্মুখীন হন, ভয়-বিহ্বলতা, অভাব ও দারিদ্র্যের শিকার হন তাহলে জান্নাতের বিপুল সুখ-সমৃদ্ধির কথা চিন্তা করুন। জান্নাতের ব্যাপ্তি-পরিব্যপ্তি হবে আকাশমণ্ডলী ও যমীন বরাবর। এর পাশেই নির্মল ঝর্ণাধারা বয়ে যাবে। আপন রবের দরবারে সে জান্নাতের প্রার্থনা করুন। তা অর্জনের লক্ষ্যে এগিয়ে যান।
২৪. চারপাশে একটু লক্ষ করুন, বিপদগ্রস্ত লোকদের খোঁজ-খবর নিন, দেখবেন, শুধু আপনি একাই নন, কত মানুষ শত জ্বালা-যন্ত্রণায় ভুগছে। কত রকম দুর্যোগ ও সংকটে জর্জরিত হয়ে আছে। মনে হবে তাদের তুলনায় আপনি দিব্যি সুখী জীবনযাপন করছেন। আল্লাহ তা'আলা আপনাকে পরিবার-পরিজন ও জীবিকা উপার্জন দিয়ে যেভাবে রেখেছেন তাতেই তুষ্ট থাকুন। হাদীসে বর্ণিত হয়েছে:
«وَلَكِنَّ الْغِنَى غِنَى النَّفْسِ» (صحيح البخاري ٩٥/٨)
অর্থ: 'মনের সচ্ছলতাই প্রকৃত সচ্ছলতা।' (বুখারী, ৮/৯৫)
২৫. দুঃখ-দুশ্চিন্তামুক্ত হয়ে সুখ-শান্তি লাভ করার জন্য সবচেয়ে মহৎ আমল হলো ফজরের নামায আদায় করা। সুতরাং জামাতের সাথে ফজর নামায আদায়ে যত্নবান হোন। অন্তত দু'রাকাত করে হলেও তাহাজ্জুদ নামায নিয়মিত আদায় করুন। হাদীসে বর্ণিত হয়েছে:
مَا مِنْ مُسْلِمٍ، ذَكَرٍ وَلَا أُنْثَى يَنَامُ إِلَّا وَعَلَيْهِ جَرِيرٌ مَعْقُودُ، فَإِنِ اسْتَيْقَظَ فَذَكَرَ اللهَ انْحَلَّتْ عُقْدَةٌ، وَإِنْ هُوَ تَوَضَّأَ ثُمَّ قَامَ إِلَى الصَّلَاةِ أَصْبَحَ نَشِيطًا قَدْ أَصَابَ خَيْرًا، وَقَدِ انْحَلَّتْ عُقْدَةُهُ كُلُّهَا، وَإِنْ أَصْبَحَ وَلَمْ يَذْكُرِ اللَّهَ أَصْبَحَ وَعُقْدَةُهُ عَلَيْهِ، وَأَصْبَحَ ثَقِيلًا كَسْلَانَا لَمْ يُصِبْ خَيْرًا (صحيح ابن حبان) ٦ / ٢٩٧
অর্থ: 'যে কোনো মুসলিম নর-নারী ঘুমায়, তার ওপর (শয়তান কর্তৃক) একটি গিঁট লেগে যায়। সে যখন ঘুম থেকে উঠে, আল্লাহকে স্মরণ করে একটা গিঁট খুলে যায়। এরপর সে যদি ওযু করে নামাযে মশগুল হয় তাহলে উদ্যম প্রাণবন্ত হয়ে সকাল যাপন করে এবং কল্যাণের অধিকারী হয়। ইতোমধ্যে (তার ওপর শয়তানের) সমস্ত গিঁট খুলে যায়। আর যদি ঘুম থেকে উঠে আল্লাহর যিকির না করে, (শয়তানের) গিঁটগুলো নিয়েই সে সকাল যাপন করে। এমতাবস্থায় তার সকাল নিরুদ্যম অলসভাবে কাটে। সে কোনো কল্যাণ লাভ করতে পারে না।' (সহীহ্ ইবনে হিব্বান, ৬/২৯৭)
২৬. পরিবার-পরিজনদের নিকট দুঃখ-কষ্টের অভিযোগ-অনুযোগ করে বেড়াবেন না। নিজের দূরাবস্থার কথা জাহির করে শত্রুর মুখে তৃপ্তির হাসি ফুটাবেন না। সমস্ত দুঃখ-কষ্ট ও জ্বালা-যন্ত্রণার ভার আল্লাহ তা'আলার যিম্মায় সপে দিয়ে উচ্ছল প্রাণবন্ত জীবন-যাপন করুন। ফলে নিকটজনেরা প্রশান্ত-নিশ্চিন্ত থাকবে, আর শত্রুরা আপনার সুখানন্দ দেখে ক্রোধ ও হিংসার আগুনে জ্বলে মরবে।
২৭. কল্যাণ ও সেবামূলক কাজে উদ্যোগী হোন। সেবামূলক উদ্যোগ হলো আতরের মতো-আতরের সুবাসে ক্রেতা-বিক্রেতা ও বহনকারী প্রত্যেকেই সুবাসিত হয়। অনুরূপ সেবামূলক উদ্যোগে ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ সর্বশ্রেণি উপকৃত হয়। যদি মানসিক অস্থিরতার শিকার হন তাহলে পরোপকারে সচেষ্ট হোন। স্বেচ্ছাসেবী দাতব্য সংস্থার কাজে অংশগ্রহণ করুন। দরিদ্রকে দান করুন। দুর্বলকে সাহায্য করুন। এসব কাজের মাধ্যমে আপনি অপার্থিব আনন্দ লাভ করতে পারবেন। মানুষের মুখে প্রশংসা, দু'আ ও কল্যাণ কামনা হবে আপনার বাড়তি পাওনা।
২৮. অসন্তোষ ও বিরক্তি পরিহার করুন। কেননা এক পর্যায়ে তা দুঃখ-বেদনা ও মনঃকষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। প্রতিটা দিন নতুনভাবে শুরু করুন, নতুনভাবে উপভোগ করুন। দর্শনীয় স্থান পরিদর্শনে বেরিয়ে পড়ুন। মহাবিশ্বের তথ্যসমৃদ্ধ বই (ওপেন ইউনিভার্সবুক) ঘেঁটে দেখুন, মহাবিশ্বের বিপুল অনিন্দ সৌন্দর্য সম্পর্কে জানতে পারবেন। আল্লাহ তা'আলার সৃষ্টির মহিমা উপলব্ধি করতে পারবেন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেন: فَأَنبَتْنَا بِهِ حَدَائِقَ ذَاتَ بَهْجَة [النمل: ٦٠]
অর্থ: 'অনন্তর আমি তা দ্বারা মনোরম উদ্যানসমূহ উৎপন্ন করেছি।' (নামল, ২৭: ৬০)
২৯. দুঃখ-বেদনার মুহূর্তে ভেঙে পড়বেন না। শত জ্বালা-যন্ত্রণার কবলে নিজেকে সঁপে দিবেন না। মানসিক দৃঢ়তা ও সংকল্পের অবিচলতা দিয়ে তা মোকাবেলা করুন। সুস্থির বুদ্ধিমত্তা কাজে লাগিয়ে সংকট কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করুন। অন্যথায় সামান্য অসঙ্গতি চরম দুর্গতি ডেকে আনবে।
৩০. যেকোনো দুঃখ-বেদনার কথা দশ জনের কাছে না বলে নীরবে হজম করার চর্চা করুন। এভাবে ভীষণ মনঃকষ্ট এক সময় লাঘব হয়ে যাবে। বলছি না যে, দুঃখ-কষ্ট দূর হয়ে যাবে। সুখের পরশ ও দুঃখের ছায়া-এ দু'য়ের সম্মেলনেই ইহকালীন জীবন। কষ্ট-যাতনাহীন অনাবিল সুখ-শান্তিপূর্ণ জীবন হলো স্বর্গীয় জীবন। যা শুধু পরকালেই সম্ভব। তখন জান্নাতবাসীর সরল সদুক্তি হবে (পবিত্র কুরআনের ভাষায়):
وَقَالُوا الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي أَذْهَبَ عَنَّا الْحَزَنَ إِنَّ رَبَّنَا لَغَفُورٌ شكور :كم
অর্থ: 'তারা বলবে, সমস্ত প্রসংশা আল্লাহর, যিনি আমাদের থেকে সমস্ত দুঃখ দূর করেছেন। নিশ্চয়ই আমাদের প্রতিপালক অতি ক্ষমাশীল, অত্যন্ত গুণগ্রাহী।' (ফাতির, ৩৫: ৩৪)
৩১. অসৎ ও ভ্রান্ত মতাদর্শীদের অমূলক নিন্দা-সমালোচনা ক্ষমা-সুন্দর দৃষ্টিতে এড়িয়ে যান। মনটাকে হিংসা-বিদ্বেষের কলুষতামুক্ত রেখে কাঙ্ক্ষিত সফলতা ও সৌভাগ্যের পথে এগিয়ে যান। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন:
﴿فَمَنْ عَفَا وَأَصْلَحَ فَأَجْرُهُ عَلَى اللَّهِ﴾ [الشورى: ٤٠]
অর্থ: 'তবে যে ক্ষমা করে দেয় ও সংশোধনের চেষ্টা করে, তার সাওয়াব আল্লাহর জিম্মায় রয়েছে।' (সূরা শুরা, ৪২: ৪০)
৩২. সর্বদা হাস্যোজ্জ্বল থাকুন। কেননা তা আপনার কষ্ট-যন্ত্রণার মলম, দুঃখ-বেদনার 'মরহম'। অস্থিরতা ও বিষণ্ণতা কাটিয়ে মানসিক সুখ-শান্তি অর্জনের লক্ষ্যে এটি একটি কার্যকর প্রক্রিয়া।
৩৩. শুচিবায়ু, বিষণ্ণতা-দুশ্চিন্তা ও সাম্প্রদায়িকতার মতো যে সমস্ত মানসিক ব্যাধির কারণে প্রতিনিয়ত দুঃখ-কষ্টের উদ্রেগ হয়, তা থেকে বেঁচে থাকার চেষ্টা করুন। বিখ্যাত আরব কবি আবূ তায়্যেব মুতানাব্বি (৩০৩-৩৫৪ হি.) বলেছেন:
وَالْهَمُّ يَخْتَرِمُ الْجَسِيمَ نَحَافَةً وَيُشِيبُ نَاصِيَةَ الصَّبِيِّ وَيُهْرِمُ
অর্থ: 'দুশ্চিন্তা ও বিষণ্ণতা কত সুঠামদেহীকে শীর্ণকায় করে ফেলে। কত যুবকের যৌবনকে বার্ধক্যে পরিণত করে।'
৩৪. একবার ভেবে দেখুন, যে কারণে কষ্ট পেয়েছেন, তা কি চিরকাল স্থায়ী হবে? এ ক্ষণস্থায়ী পৃথিবীতে কোনো কিছুই কি চিরস্থায়ী, শুধু মহান আল্লাহর সত্তা ব্যতীত? প্রতিটি বস্তুর ধ্বংস ও মৃত্যু অনিবার্য, বর্তমানে কিংবা অদূর ভবিষ্যতে। পবিত্র কুরআনের ঘোষণা:
كُلٌّ مَنْ عَلَيْهَا فَانٍ * وَيَبْقَى وَجْهُ رَبِّكَ ذُو الْجَالِ وَالْإِكْرَامِ
অর্থ: ভূপৃষ্ঠে যা কিছু আছে, সবই ধ্বংস হবে। বাকি থাকবে কেবল আপনার প্রতিপালকের গৌরবময়, মহানুভব সত্তা। (সূরা আর-রাহমান, ৫৫: ২৬, ২৭)
৩৫. মানসিক দুঃখ-কষ্টের বিষয়টি যেমন গুরুতর, তেমনি ব্যাপক-বিস্তৃত। মহান আল্লাহর দরবারে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি এ বিষয়ে তিনি আমাকে (লা-তাহযান) নামক একটি পুস্তক রচনার তাওফিক দান করেছেন। তা থেকেই কয়েকটি পরামর্শ উদ্ধৃত করছি: * প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে না পারার অপবাদ দিয়ে কেউ আপনাকে অপমানিত করেছে, তাতে দুঃখিত হবেন না। * অনেকে বলবে, 'এসব অভদ্রতা অশালীনতার সামনে আপনার ভদ্রতা নম্রতার কী-ই বা মূল্য আছে?!' লোকদের এমন কথায় আপনি হতাশ হবেন না। * কেউ আপনার সামনে অন্যদের প্রশংসা এমন ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে উপস্থাপন করবে যেন আপনি কিছুই না। তাতেও দুঃখিত হবেন না। * যাকে সর্বক্ষেত্রে বিশ্বাস করছিলেন, যার ওপর আস্থা রেখে নিরাপদে পথ চলছিলেন, সে-ই সবার আগে আপনার সঙ্গে ধোঁকাবাজি করেছে, তাতে বিষণ্ণ-চিন্তিত হওয়ার কিছু নেই। * যে আপনার দুর্বলতাগুলো খুটিয়ে বের করে, আপনাকে নানাভাবে ঠকাচ্ছে তার কারণে দুঃখ করবেন না। * দুঃখিত ও ব্যথিত হবেন না। কেননা এসমস্ত ক্ষেত্রে আপনার এক বিন্দু ক্ষতি হয়নি। বরং লাভই হয়েছে; মানুষ আপনার উদারতা ও মহত্ত্বের পরিচয় পেয়ে গেছে। -আয়েয আল কারনী
পরিশিষ্ট:
ভেবে দেখুন, কী কঠিন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল যখন রাসূলুল্লাহ ﷺ ও আবূ বকর (রা.) হেরা গুহায় আবদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন। বিষমাখা তরবারি হাতে পঞ্চাশজন কাফের তাঁদের ঘিরে রেখেছিল। তাদের চোখ-মুখ থেকে রাসূল ﷺ-এর প্রতি শত্রুতা ও প্রতিহিংসার আগুন ঠিকরে বেরুচ্ছিল। রাসূল ﷺ-এর খোঁজে তারা যেখানে এসে দাঁড়িয়েছিল, বাকি ছিল শুধু হেরা গুহায় প্রবেশ করা।
গুহার ভেতরে নিরস্ত্র দু'টি প্রাণ-রাসূলুল্লাহ ﷺ ও আবূ বকর (রা.)। তাঁরা গুহার মুখে কাফেরদের উপস্থিতি টের পেয়েছেন। এ-ও বুঝতে পেরেছেন, কাফেররা গুহার মুখে প্রবেশ করলেই তাদের দেখে ফেলবে। এখান থেকে বের হওয়ার কিংবা আত্মগোপন করার দ্বিতীয় কোনো পথ নেই। কাফেরদের হাত থেকে বাঁচার কোনো আশ্রয় নেই। স্বভাবতই আবূ বকর (রা.) বিচলিত হয়ে পড়লেন। উৎকণ্ঠার স্বরে বললেন: 'ইয়া রাসূলুল্লাহ! তাদের একজনও যদি নিচের দিকে গুহার মুখের দিকে তাকায় আমাদের দেখে ফেলবে।'
রাসূল ﷺ একটুও বিচলিত হলেন না। প্রশান্তচিত্তে স্মিত হেসে যে কয়েকটি শব্দ উচ্চারণ করেছিলেন, যুগযুগ ধরে বিপদগ্রস্ত ও সংকটাপন্ন মানুষের পরম আশ্রয় হয়ে থাকবে। কিয়ামত পর্যন্ত তা আস্থা ও বিশ্বাস, দৃঢ়তা ও অবিচলতার বিমূর্ত প্রতীক হয়ে থাকবে। পবিত্র কুরআনের ভাষায়:
﴿لَا تَحْزَنْ إِنَّ اللَّهَ مَعَنَا﴾ [التوبة: ٤٠]
অর্থ: 'বিচলিত হয়ো না। আল্লাহ তো আমাদের সাথে আছেন।' (সূরা তাওবা, ৯: ৪০)
পরক্ষণেই বিপদ কেটে গেল। মুক্তির পথ উন্মুক্ত হলো। ব্যর্থ-বিফল মনোরথে কাফেররা মক্কায় ফিরে গেল। আল্লাহ তা'আলার ওয়াদা ও প্রতিশ্রুতির চাক্ষুষ বাস্তবায়ন দেখে, তাঁর সাহায্য লাভের আনন্দে উদ্দেল হয়ে রাসূলুল্লাহ ﷺ ও আবু বকর (রা.) হেরা গুহা থেকে বেরিয়ে এলেন। ইসলাম ও মুসলমানদের নতুন গন্তব্য মদিনার পথে অগ্রসর হলেন। জীবনের কোনো প্রতিকূলতায় বিচলিত হবেন না। কোনো বাধা-প্রতিবন্ধকতায় উৎকণ্ঠিত হবেন না। আল্লাহ তা'আলার ওপর অগাধ বিশ্বাসী ও আস্থাশীল হোন। আপনার দুর্দিন কেটে যাবে। জীবনযাপন সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ হয়ে উঠবে।
দুঃখ জীবনেরই একটা অংশ। বিশ্ববিখ্যাত মনোবিজ্ঞানী কার্ল গুস্তাভ য়ুং বলেছেন: 'পৃথিবীতে সবচেয়ে সুখী মানুষের জীবনেও দুঃখ আছে। মানুষের জীবনে তা ভারসাম্য রক্ষা করে। সবচেয়ে ভালো উপায় হলো তাকে আসতে দাও এবং মেধা ও ধৈর্যবলে তাকে সামলাও।'
বিখ্যাত চীনা দার্শনিক লাও ঝু-এর উক্তি: 'যদি পূর্ণতা লাভের জন্য অন্যের দিকে তাকাও, তাহলে কখনই পূর্ণ হতে পারবে না। তোমার সুখ-শান্তি যদি অর্থবিত্ত-নির্ভরশীল হয় তবে কখনো সুখী হতে পারবে না। তোমার অর্জনে যতটুকু আছে, তাতেই তুষ্ট থাক। সর্বোপরি যদি মনের সচ্ছলতা লাভ করতে পার, গোটা পৃথিবীটাই তোমার হয়ে যাবে।'
কবি সালেহ আল-আমরী বলেন:
لَا تَفْقِدِ الْأَمَلَ الْجَمِيلَ وَإِنْ عَفا صَدَأُ الْحَديدِ ، وشَاخَتِ الأَقْفَالُ
البحر يُفلق، والحجارة تَنْبَرِي نَبْعًا، وَيُشْرِقُ فِي القُلُوبِ الفَالُ
ومن السحاب الجهم إزهار، وفي عُقد المصيبة تنبت الآمال.
কাব্যানুবাদ: মেঘ দেখে তুই করিসনে ভয়, আড়ালে তার সূর্য হাসে। হারা শশীর হারা হাসি, অন্ধকারেই ফিরে আসে। দখিন হাওয়ায় অমোঘ বরে রিক্ত শাখাই পুষ্পে বরে। সিক্ত যে প্রাণ অশ্রুধারায় প্রাণের প্রিয় তারি পাশে।
টিকাঃ
৩৫. কবিতাটি কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত রচিত। আরবি কবিতার শাব্দিক অর্থের সঙ্গে এর খুব একটা মিল নেই। তবে ভাবার্থ অবিকল সামঞ্জস্যপূর্ণ। বরং আরবী কবিতার মর্মার্থ বাংলা কবিতাতেই পরিপূর্ণভাবে ফুটে উঠেছে। তাই শাব্দিক অনুবাদের পরিবর্তে বাংলা কবিতার মাধ্যমেই অনুবাদ করা হলো। তবে এমনটি ভাবার উপায় নেই, কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত আরবী কবিতার ভাব ও মর্ম গ্রহণ করেছেন। কারণ, তিনি ১৯২২ খৃষ্টাব্দে মৃত্যু বরণ করেন। আর আরবী কবিতার রচয়িতা সালেহ আল-আমরী ১৯৯৩ খৃষ্টাব্দে জন্ম গ্রহণ করেছেন। (অনুবাদক)
📄 নিদ্রাহীনতা
নিদ্রাহীনতা বর্তমান বিশ্বে নিদ্রাহীনতা একটি স্বাভাবিক ব্যাধি। এর প্রধান কারণ, আগের তুলনায় মানুষের জীবনব্যবস্থার শাখা-প্রশাখা, জীবনের চাহিদা ও দায়দায়িত্ব যেমন বেড়েছে, তেমন জটিল আকার ধারণ করেছে। কালের দুর্যোগ-দুর্বিপাক ও বিপদ-সংকটগুলো সূক্ষ্ম প্রকট হয়ে দেখা দিচ্ছে। জীবনের মৌলিক চাহিদাগুলো নিয়ে বেঁচে থাকার চেয়ে বণিক চিন্তাপ্রসূত সামাজিকতা ও লৌকিকতা রক্ষা করতে গলদঘর্ম অবস্থা। ক্ষুদ্র মানবদেহের বুকপিঠ জীবনযাপনের এতসব দায়-দায়িত্বের বোঝা বহন করে চলে। নিশ্চিন্ত হয়ে একদণ্ড ঘুমানোর সুযোগ কোথায়?
নিদ্রাহীনতা ও ইনসোমনিয়া এমন জটিল ব্যাধি যা প্রথম পর্যায়ে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায়। সাথে সাথে যদি এ রোগ নিয়ন্ত্রণ করা না হয় তাহলে পর্যায়ক্রমে তা জটিল থেকে জটিল আকার ধারণ করে। এক পর্যায়ে ভুক্তভোগীর সুস্বাস্থ্য ও মন-মানসিকতায় বিরূপ প্রভাব ফেলতে শুরু করে। তার সহজাত স্বাভাবিক জীবনযাত্রা অস্থির দুর্বিষহ করে তোলে।
ব্যক্তি যখন ভীষণ নিদ্রাহীনতার শিকার হয়, গভীর রাতে ঘুমের জন্য ছটফট করে, মাথায় নানা উদ্ভট জল্পনা-কল্পনা বাসা বাঁধতে শুরু করে। নেতিবাচক চিন্তা-ভাবনা এসে ভিড় করে। নিদ্রাহীনতার কারণে জীবনের সহজাত গতিময়তা ব্যাহত হয়। কর্মজীবনের গতিময়তা বিঘ্নিত হয়। উচ্চ রক্তচাপ, স্থূলতা, টাইপ-২, ডায়াবেটিস, হৃদযন্ত্রের মতো বিভিন্ন রোগ ও অকাল বার্ধক্যের মতো জটিল রোগ দেখা দেয়। সুস্থ-সবল প্রাণবন্ত জীবনের জন্য নিয়মিত সুখনিদ্রার বিকল্প নেই। কিন্তু তার উপায় কী? নিদ্রাহীনতার সঠিক সমাধানই বা কী?
সমাধান:
১. আল্লাহর যিকিরে যবান তরতাজা রাখুন। নিদ্রাপূর্ব দু'আগুলো নিয়মিত পাঠ করুন। ভালো-ঘুম হওয়ার জন্য এটি একটি পরীক্ষিত আমল। ঘুমানোর আগে অবশ্যই বেতের নামায আদায় করতে ভুলবেন না। আবূ হুরায়রা (রা.) বলেছেন: 'রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাকে তিনটি উপদেশ দিয়েছেন। তার মধ্যে একটি হলো, ঘুমানোর আগে বেতের নামায আদায় করা।'
২. একটি দৈনন্দিন রুটিন করে নিন। সে মোতাবেক জীবনযাপন করুন। প্রতিটি কাজ সুনির্দিষ্ট সময়ে শেষ করে সময়মতো ঘুমিয়ে পড়ুন। অন্যান্য কাজে যত অনিয়মই হোক ঘুমে যেন এতটুকু বিলম্ব না হয়। নিজের মধ্যে এভাবে সময়মতো ঘুমানোর অভ্যাস গড়ে তুলুন।
৩. ঘুম নষ্ট করে দেয়-এমন খাদ্যদ্রব্য যেমন: চা, কফি ইত্যাদি থেকে বিরত থাকতে হবে। অতিঅবশ্যই ধূমপান, মাদক ও নেশাজাতীয় দ্রব্য বর্জন করতে হবে।
৪. খালি পেটে ঘুমাতে যাবেন না। প্রয়োজনে ফলমূল ও সালাদজাতীয় খাবার খেয়ে নিন। ভালো ঘুমের জন্য কায়িক পরিশ্রম ও ব্যায়াম করে দেহটাকে যতো শ্রান্ত-পরিশ্রান্ত করবেন, ঘুমটাও তত গভীর ও আরামদায়ক হবে।
৫. যদি ঘুম না আসে তাহলে অযথা শুয়ে না থেকে বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ুন। নামায, যিকির, তিলাওয়াত কিংবা বই পড়ায় মনোযোগী হোন। অলস মস্তিষ্ক শয়তানের বাসা। এমন অলস মুহূর্তে নানা উদ্ভট জল্পনা-কল্পনা এসে ভিড় করে। মনটাকে অস্থির অশান্ত করে তোলে।
৬. ঘুমানোর জন্য একটি কোলাহলমুক্ত নীরব নিভৃত স্থান বাছাই করুন। অবশ্যই দুর্ঘটনার শঙ্কাবহুল ইলেক্ট্রনিক যন্ত্রগুলো অফ করুন। তাতে ঘুমন্ত অবস্থায় আকস্মিক দুর্ঘটনার কবল থেকে মুক্ত থাকা যাবে।
৭. বিছানা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও আরামদায়ক হতে হবে। যারা ব্যাক পেইন কিংবা পিঠ ও কোমর ব্যথায় আক্রান্ত, তাদের অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী উপযুক্ত বালিশ ও বিছানার বন্দোবস্ত করতে হবে।
৮. ঘুমানোর আগে বেডরুমটাকে হালকা সুবাসিত করুন। কিংবা বালিশের নিচে সুগন্ধযুক্ত রুমাল রেখে দিন। তাতে আপনার দেহমন প্রশান্ত সুবাসিত হয়ে উঠবে। চোখ দু'টো ঘুমের আবেশে জড়িয়ে যাবে।
৯. দ্রুত ঘুমানোর জন্য অত্যন্ত কার্যকর পন্থা হলো, উত্তমরূপে ওযু করা। ওযু ব্যক্তির হৃদয়-মনকে দুশ্চিন্তা ও টেনশনমুক্ত করে। সুস্থির প্রশান্ত করে তোলে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বারা ইবনে আযেব (রা.)-কে এ পরামর্শ দিয়েছেন:
"إِذَا أَتَيْتَ مَضْجَعَكَ، فَتَوَضَّأُ وُضُوءَكَ لِلصَّلاةِ "
অর্থ: 'তুমি যখন ঘুমাতে যাবে, নামাযের জন্য যেভাবে ওযু করো, সেভাবে ওযু করে ঘুমাবে।' (বুখারী: ১/৫৮)
১০. দৈনন্দিন জীবনের ঝায়-ঝামেলা-ঘুমানোর আগ মুহূর্তে এসব নিয়ে কোনো চিন্তা-ফিকির করবেন না। কেননা তা মন-মস্তিষ্ককে অস্থির বিচলিত করে তোলে। তার চেয়ে বরং জীবনের যত সুখ-সৌভাগ্য, সফলতা-উৎকর্ষতার কথা মনে করে আনন্দে উদ্বেল হোন। ভবিষ্যতের সুন্দর স্বপ্ন রচনা করে ঘুমের রাজ্যে হারিয়ে যাবেন।
পরিশিষ্ট:
বিশিষ্ট সাহাবী বারা' ইবনে আযেব (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
" إِذَا أَتَيْتَ مَضْجَعَكَ، فَتَوَضَّأْ وُضُوءَكَ لِلصَّلَاةِ، ثُمَّ اضْطَجِعْ عَلَى شِقَّكَ الْأَيْمَنِ، ثُمَّ قُلْ اللَّهُمَّ أَسْلَمْتُ وَجْهِي إِلَيْكَ، وَفَوَّضْتُ أَمْرِي إِلَيْكَ، وَأَلْجَأْتُ ظَهْرِي إِلَيْكَ، رَغْبَةً وَرَهْبَةً إِلَيْكَ، لَا مَلْجَأَ وَلَا مَنْجَا مِنْكَ إِلَّا إِلَيْكَ، اللَّهُمَّ آمَنْتُ بِكِتَابِكَ الَّذِي أَنْزَلْتَ، وَبِنَبِيِّكَ الَّذِي أَرْسَلْتَ. فَإِنْ مُتَّ مِنْ لَيْلَتِكَ، فَأَنْتَ عَلَى الفِطْرَةِ، وَاجْعَلْهُنَّ آخِرَ مَا تَتَكَلَّمُ بِهِ ".
অর্থ: ঘুমানোর জন্য যখন বিছানায় যাবে তখন নামাযের ওযুর মতো করে ওযু করবে। এরপর ডান কাঁধে ভর করে শুয়ে পড়বে। ঘুমানোর আগে এই দু'আটি পাঠ করবে: اَللّٰهُمَّ أَسْلَمْتُ وَجْهِيْ إِلَيْكَ، وَفَوَّضْتُ أَمْرِيْ إِلَيْكَ، وَأَلْجَأْتُ ظَهْرِيْ إِلَيْكَ، رَغْبَةً وَّرَهْبَةً إِلَيْكَ، لَا مَلْجَأَ وَلَا مَنْجَا مِنْكَ إِلَّا إِلَيْكَ، اَللّٰهُمَّ آمَنْتُ بِكِتَابِكَ الَّذِيْ أَنْزَلْتَ، وَبِنَبِيِّكَ الَّذِيْ أَرْسَلْتَ. (صحيح البخاري) ١ /٥٨
অর্থ: 'হে আল্লাহ! আমি নিজেকে আপনার কাছে অর্পণ করলাম। আমার যাবতীয় বিষয় আপনার যিম্মায় সমর্পণ করলাম। নিজেকে আপনার আশ্রয়ে সঁপে দিলাম, দয়া ও করুনা লাভের আশায়, জাহান্নামের আযাব থেকে নাযাত লাভের প্রত্যাশায়। হে আল্লাহ! আমি বিশ্বাস স্থাপন করলাম আপনার অবতীর্ণ কিতাবের প্রতি। আপনার প্রেরিত রাসূলের প্রতি।'
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন :
'এভাবে ঘুমানোর পর তুমি যদি সে রাতে মৃত্যুবরণ করে তাহলে ইসলামের ওপর মৃত্যুবরণ করবে। উল্লিখিত দু'আগুলোই হবে (ঘুমানোর পূর্বে) তোমার সর্বশেষ কথা। (এরপর অন্য কোনো কথা বলবে না)।'
বারা ইবনে আযেব (রা.) বলেন: দু'আটি আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে পাঠ করে শোনালাম। যখন আমি اَللّٰهُمَّ آمَنْتُ بِكِতَابِكَ الَّذِيْ أَنْزَلْتَ পর্যন্ত পৌঁছালাম, বললাম, وَرَسُوْلِكَ রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, না, (وَرَسُوْلِكَ নয় বরং) وَبِنَبِيَّكَ الَّذِيْ أَرْسَلْتَ
'যাদের দ্বারা আপনি কষ্ট পেয়েছেন, যুলুম নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, ঘুমানোর আগে তাদের প্রত্যেককে মন থেকে মাফ করে দিন। অন্যদের প্রতি যত অভিযোগ-অনুযোগ, মন থেকে সব মুছে ফেলুন। নিশ্চিন্ত ও প্রশান্ত মনে চোখ বন্ধ করুন।' -আয়েয আল-কারনী
রোমান দার্শনিক ও লেখক এমিল সিওরান (১৯১১-১৯৯৫ খ্রিষ্টাব্দ) বলেছেন: 'অনিদ্রা এমন জটিল সমস্যা, যা মানুষের সুখের স্বর্গকে কষ্টের নরকে পরিণত করতে পারে।'
ইবনুন নাহবী (৪৩৩-৫১৩ হি.) বলেছেন: 'বিপদ-আপদ যত কঠিনই হোক এক সময় তা কেটে যাবে। রাতের অন্ধকার যত গভীরই হোক এক সময় ভোরের আলো ফুটবেই। রাতের আকাশেও তো ঝলমলে তারকা বর্তমান। ভোরের আলোয় সমস্ত আঁধার মৃয়মাণ।'
📄 হতাশা
হতাশা ও নিরাশা হলো একটি নেতিবাচক মানসিক অনুভূতি। মানুষ যখন তার ইচ্ছা পূরণ ও লক্ষ্য-উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের পথে বাধা ও প্রতিবন্ধকতার শিকার হয়, সামাজিক বৈরিতা ও প্রতিকূলতার সম্মুখীন হয়, তার মনে হতে থাকে, এ থেকে রক্ষা নেই। এ পরিস্থিতি কাটিয়ে ওঠার পথ নেই। তখনই তার মনে নিরাশা দানা বাঁধতে শুরু করে। তাকে হতাশা ঘিরে ধরে। মানুষ যখন ভীষণ রকম হতাশ হয়ে পড়ে তার ইচ্ছা ও মনোবল নিস্তেজ হয়ে পড়ে। কর্মক্ষমতা ও কর্মদক্ষতা দুর্বল হতে থাকে। নিজস্ব সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবনী শক্তি ক্ষয়িত হতে থাকে।
হতাশার কবলে ব্যক্তির মনে নেতিবাচক জল্পনা-কল্পনা বাসা বাঁধে। পর্যায়ক্রমে মনের অবাস্তব উদ্ভট জল্পনা-কল্পনাগুলো তার বোধ-বিশ্বাসে পরিণত হয়। চেষ্টা-শ্রমের মানসিকতা ও অন্যকে ছাড়িয়ে যাওয়ার স্পৃহা হারিয়ে ফেলে। এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তার কাছে অনর্থক মনে হতে থাকে, যেন শুরু করার আগেই নিঃশেষ হওয়ার দশা। জীবন-সংগ্রামে ঝাঁপ দেওয়ার আগেই পরাজয়-প্রবণতা।
নিরাশাবাদী উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্ন বুনতে জানে না। আসন্ন সফলতার পথ সুগম করার কথা ভাবে না। প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে নেতিবাচক কিছু ঘটনা ঘটার অজানা আশঙ্কায় ভুগতে থাকে। জীবনের সফলতা ও কৃতকার্যতা তার কাছে সুদূরপরাহত।
হতাশাগ্রস্ত লোক আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলে। সর্বদা নানা অভিযোগ-অনুযোগে মত্ত থাকে। দ্বিধা-সংশয়, অস্থিরতা-অনিশ্চয়তা, ভয়-শঙ্কা-এগুলো তার নিত্যসঙ্গী, যা কখনো কখনো দুর্বলপ্রাণ ব্যক্তিকে ধর্মহীনতা ও নাস্তিকতার পথে ধাবিত করে। আবার কখনো আত্মহত্যায় প্ররোচিত করে।
ব্যক্তিগত পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে হতাশা ও নিরাশা একটি মারাত্মক ব্যাধি। এ ব্যাধি থেকে মুক্ত থাকার লক্ষ্যে আমাদের করণীয় কী? তা কাটিয়ে ওঠার উপায় কী?
সমাধান:
১. আপন রবের সাথে নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তুলুন। আল্লাহ তা'আলার ওপর গভীর আস্থা অটুট রাখুন। দৃঢ় বিশ্বাস রাখুন, যত দুর্যোগ ও প্রতিকূলতা, একমাত্র আল্লাহ তা'আলাই তা থেকে উদ্ধার করতে পারেন।
২. সবক্ষেত্রেই ভালো কিছুর আশা করুন। ইচ্ছা পূরণে ও লক্ষ্য-উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের লক্ষ্যে চেষ্টা-প্রচেষ্টার সঙ্গে সঙ্গে নামায, যিকির, তাসবীহ, তিলাওয়াত, দান-সদকা ও প্রার্থনায় যত্নবান হোন। আল্লাহ তা'আলা কিছুতেই আপনাকে আশাহত করবেন না। আপনার চেষ্টা-প্রচেষ্টা নিষ্ফল করবেন না।
৩. হতাশা ও নিরাশার দু'টি পরিণতি: হয়ত হতাশা আপনাকে গ্রাস করবে; কিংবা স্বয়ং আপনি নিরাশাকে হজম করে ফেলবেন। হতাশা হয়ত আপনাকে পশ্চাৎপদ মানসিকতার দিকে ঠেলে দিবে। কিংবা স্বয়ং আপনি নিরাশাটাকে ভেঙে চুরমার করে সামনের পথে অগ্রসর হবেন। সুতরাং যত পশ্চাদপদ নেতিবাচক চিন্তা-ভাবনা ঝেড়ে ফেলুন। ইতিবাচক ও সমুন্নত মানসিকতা ধারণ করুন। আপনার জীবন আপনারই মানসিকতা ও চেতনার আলোকে গড়ে উঠবে।
৪. সুন্দর মনোরম উদ্যানে বেরিয়ে পড়ুন। মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক পরিবেশে ঘুরে আসুন। যেখানে প্রকৃতি তার স্বর্গীয় সৌন্দর্য উন্মুক্ত করে দিয়েছে। শরীয়তের বিধিনিষেধ মেনে বৈধ আনন্দ-বিনোদন উপভোগ করুন। হতাশামুক্ত হওয়ার জন্য গতানুগতিক জীবনধারার বাইরে বিচিত্র মুহূর্ত ও ভিন্ন পরিবেশ আপনার দেহ-মনকে প্রফুল্ল প্রাণবন্ত করে তুলবে।
৫. নিশ্চিত থাকুন, আপনার সমস্যার সমাধান অবশ্যই আছে। আপনাকে শুধু আশা-ভরসা নিয়ে ধৈর্যধারণ করতে হবে। মহান আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করতে হবে। তিনিই একমাত্র রক্ষাকারী, পরম মুক্তিদাতা।
৬. যেকোনো বাধা-প্রতিবন্ধকতার কবলে এতটা হতাশ হবেন না যে, তা আপনাকে ব্যর্থতার পথে ধাবিত করে। রাতের আঁধারের পর ভোরের আলো যেমন অপেক্ষমাণ তেমনই নিরাশার অন্তরালে আশা ও প্রত্যাশার হাতছানি বর্তমান।
৭. আশাবাদী হোন। স্বপ্নবান হোন। সফল মহা পুরুষদের জীবনী পাঠ করুন। জীবনের কঠিন প্রতিকূলতাগুলো তাঁরা কীভাবে মোকাবেলা করেছেন, দুর্লঙ্ঘ বাধা-প্রতিবন্ধকতা কীভাবে উতরে গেছেন, তা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করুন। অতীতের বাধা-বিপত্তির কবলে বিচিত্র অভিজ্ঞতাগুলো বিশ্লেষণ করুন। উভয় ক্ষেত্রেই একটি বিষয়ের আশ্চর্যরকম মিল পাওয়া যাবে। তা হলো আশা ও প্রত্যাশা। যুগে যুগে মহামনীষিগণ প্রত্যেকেই ছিলেন এক-একজন আশাবাদী স্বপ্নবান পুরুষ। নিরাশা হতাশা তাদের স্পর্শ করতে পারেনি।
৮. মনের মধ্যে যে দ্বিধা-সংশয় ও আশঙ্কা কাজ করছে প্রথমে তা শনাক্ত করুন। প্রয়োজনে লিখে ফেলুন। এরপর তার বাস্তবানুগ সমাধান উদ্ঘাটনে প্রয়াসী হোন। কিংবা আপনার কষ্ট ও প্রতিকূলতার বিষয়টি কোনো প্রবীণ বিদগ্ধ ব্যক্তির কাছে তুলে ধরুন। অথবা কোনো মনোবিজ্ঞানী চিকিৎসকের শরণাপন্ন হোন। তাঁরা আপনার সমস্যা সমাধানে যথার্থ সহযোগিতা করবেন। আপনাকে মানসিক সংকীর্ণতা ও সংকট থেকে উদ্ধারে কার্যকর পরামর্শ দিয়ে সাহায্য করবেন।
৯. সফল ও স্বপ্নবান ব্যক্তিদের সংস্পর্শে থাকুন। ব্যর্থ নিরাশাবাদী লোকদের সঙ্গ ত্যাগ করুন। কেননা নিরাশাবাদ হলো একটা সংক্রামক ব্যাধি। জটিল ব্যাকটেরিয়ার মতো তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
১০. শিক্ষাক্ষেত্র কিংবা কর্মজীবনের কোনো একটি শাখায় বিফল হলে ভিন্ন খাতে মেধা-শ্রম যাচাই করুন। একটা বিষয়ে বিফলতার অর্থ এই নয় যে, সর্বক্ষেত্রেই ব্যর্থতা অবশ্যম্ভাবী। ইতিহাসের অনেক সফল ব্যক্তিকেই নিজের সফলতার জায়গাটি নির্ণয় করতে গিয়ে কোনো না কোনো ব্যর্থতার সম্মুখীন হতে হয়েছে।
১১. নিজেকে নিরুৎসাহিত করার অজুহাত না খুঁজে স্বীয় যোগ্যতা ও সাহসিকতার বলে বলীয়ান হয়ে উঠুন। শতো বাধার প্রাচীর ডিঙিয়ে সম্মুখে এগিয়ে চলুন। একই জায়গায় স্থবির হয়ে, শুধু চিন্তা-ভাবনায় ডুবে থেকে সফলতার সর্বোচ্চ চূড়া দূরের কথা, সফলতার হাতছানি লাভ করাও সম্ভব নয়।
১২. হতাশা ও নিরাশা ব্যক্তিকে কর্মবিমুখ করার জন্য তার সামনে একের পর এক বাধা-প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। দাঁড় করিয়ে দেয় যতসব কাল্পনিক অবাস্তব কারণ-উপকরণ। তাই নিরাশাকে এতটুকু অবকাশ দেওয়া যাবে না যে, আপনার যোগ্যতা ও সম্ভাবনা অকার্যকর করে দেয়, সমস্যা সমাধানের পথে আরও জটিলতা সৃষ্টি করে।
১৩. অতীত জীবনের যে সমস্ত কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছেন, কীভাবে তা মোকাবেলা করেছেন-তা স্মরণ করে দেখুন। অতীতের সুপরিকল্পিত পদক্ষেপ ও সাহসী ভূমিকাগুলো আপনাকে অনুপ্রাণিত করবে, আসন্ন ভবিষ্যতের বাধা-বিপত্তি মোকাবিলা করার।
১৪. নিজের জন্য এমন লক্ষ্য-উদ্দেশ্য নির্ধারণ করবেন না, যা আপনার সাধ্য ও সামর্থ্যের বাইরে। সামর্থ্য ও যোগ্যতা অনুযায়ী ছোট ছোট পদক্ষেপ গ্রহণ করুন। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র একাধিক পদক্ষেপের মাধ্যমে একটি মহৎ উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন সম্ভব। মনে রাখবেন, এক হাজার মিটারের দৌড় প্রতিযোগিতা প্রথমে একটি পদক্ষেপের মাধ্যমেই সূচিত হয়। তারপর একের পর এক বহু পদক্ষেপের সাহায্যে এক হাজার মিটারের দৌড় সম্পন্ন হয়।
১৫. ভুল যতই হোক-না-কেন, চেষ্টা অব্যাহত রাখুন। এক্ষেত্রে পিপীলিকার আদর্শ গ্রহণ করুন-সফলতা লাভের জন্য সে হাজারবারও চেষ্টা করতে প্রস্তুত। মনে রাখুন, বিদ্যুৎ আবিষ্কারক এডিসন সাতশতোবার ব্যর্থ চেষ্টার পরই সফলভাবে বিদ্যুৎ আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়েছেন। কাজেকর্মে ও দায়দায়িত্বে যত অলসতা-অবহেলা ঝেড়ে ফেলুন। প্রতিটি কাজ সময়মতো সম্পন্ন করুন। দৈনিকের কাজ দৈনিক সেরে ফেলুন। কখনো আজকের কাজ আগামী দিনের জন্য বিলম্ব করবেন না।
১৬. আল্লাহ তা'আলার প্রশংসা করুন এজন্য যে, অদ্যাবধি সুস্থ-সবল থেকে সাধ্যমতো কাজেকর্মে নিয়োজিত আছেন। ব্যক্তিগত সফলতার একটি তালিকা সযত্নে সংরক্ষণ করুন। প্রতিদিন অন্তত একবার আপনার সফলতাগুলো স্মরণ করুন। এতে আশা ও প্রত্যাশার সাথে সাথে মনোবল বৃদ্ধি পাবে। কাঙ্ক্ষিত কিছু যদি হাতছাড়া হয়ে যায়, মনে করবেন, এ হারানোর মধ্যেই আপনার কল্যাণ নিহিত।
১৭. নিজেকে অন্যের সাথে তুলনা করতে যাবেন না। প্রত্যেকের জীবনই নানা রকম বৈচিত্র্যময়। আপনার যা কাঙ্ক্ষিত, সংকল্পিত তা অর্জনে নিজের মতো করে এগিয়ে যান। এর জন্য নিজের চেষ্টা ও সামর্থ্যের সর্বোচ্চটুকু বিলিয়ে দিন। একদিন সফলতার এমন শীর্ষস্তরে পৌঁছে যাবেন যা হয়ত আপনার কাছে স্বপ্নের মতো মনে হবে।
১৮. বিফলতা ও নেতিবাচক মানসিকতা পরিহার করে নিজেকে সফলতা ও সহজতার সুসংবাদ দান করুন। প্রত্যেক দিন-শেষে ভাবুন, আগামীর দিনটি আরও সুন্দর ও সাফল্যমণ্ডিত হবে। মনে রাখুন, সফলতা ও সৌভাগ্যের প্রতিক্ষায় ধৈর্যধারণ করাও একটি ইবাদত। সুতরাং অপেক্ষা করুন ধৈর্যের সাথে, সফলতা আসবে দু'হাত ভরে।
১৯. একটি বিষয়ে নিশ্চিত থাকুন, কোনো বাধা-বিপত্তিই স্থায়ী নয়। চরম দুর্যোগ-দুর্ভোগের পরই পরম সুখ ও সৌভাগ্যের উত্থান ঘটে। এটাই জগতের অবধারিত নীতি।
পরিশিষ্ট:
হযরত ইয়াকুব (আ.) প্রাণপ্রিয় পুত্র হারানোর শোকে কেঁদে কেঁদে দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেছিলেন। পৃথিবীর ইতিহাসে এর চেয়ে মর্মান্তিক বেদনাবিধুর ঘটনা কি আর ঘটেছে? "ইউসুফকে নেকড়ে খেয়ে ফেলেছে”-এই কথিত কিচ্ছার অন্তরালে এক মহান পিতা প্রাণপ্রিয় পুত্রকে হারালেন। জগতের সমস্ত দুঃখ-যাতনা তাকে ঘিরে ধরল। তিনি পুত্র হারানোর শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়লেন। অঝোর ধারায় কাঁদতে লাগলেন। নিদ্রাহীন চোখ দু'টি আলো হারাতে লাগল। সুস্বাদু যত খাদ্য বিস্বাদে পরিণত হলো।
পুত্র ইউসুফের শোক না কাটতেই আরেক পুত্র বিনইয়ামিনও হাতছাড়া হওয়ার উপক্রম। দুঃখ-বেদনা ও কষ্ট-যাতনা যেন ইয়াকুব (আ.)-এর চরম ধৈর্যপরীক্ষা নিয়েই তবে ক্ষান্ত হবে। এমন কঠিন দুর্যোগ-মুহূর্তেও তাঁর যবানে বারবার উচ্চারিত হতে লাগল। পবিত্র কুরআনের ভাষায় :
إِنَّهُ لَا يَا يُنَسُ مِنْ رَّوْحِ اللَّهِ إِلَّا الْقَوْمُ الْكُفِرُونَ﴾ [يوسف: ٨٧]
অর্থ: 'নিশ্চিত জেনে রাখ, আল্লাহর রহমত থেকে কেবল তারাই নিরাশ হয়, যারা কাফের।' (সূরা ইউসুফ, ১২: ৮৭)
অবশেষে তাঁর আশাই সত্য প্রমাণিত হলো। চরম দুঃখ-বেদনার পর পরম সুখানন্দের মুহূর্ত ঘনিয়ে এলো। পুত্র ইউসুফের জামার স্পর্শে দৃষ্টিশক্তি ফিরে পেলেন। দু'চোখ ভরে 'শিশুপুত্র' ইউসুফকে দেখতে লাগলেন। পরম স্নেহে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। শিশুপুত্র যে আজ বাদশাহর মর্যাদায় ভূষিত, রাজসিংহাসনে অধিষ্ঠিত। এ ঘটনা যেন পবিত্র কুরআনের এ আয়াতেরই প্রতিধ্বনি:
فَإِنَّ مَعَ الْعُسْرِ يُسْرًا * إِنَّ مَعَ الْعُسْرِ يُسْرًا﴾ [الشرح: ٥، ٦]
অর্থ: 'প্রকৃতপক্ষে কষ্টের সাথে স্বস্তি থাকে। নিশ্চয়ই কষ্টের সাথে স্বস্তি থাকে।' (সূরা ইনশিরাহ্, ৯৪: ৫, ৬)
'নিরাশা ও হতাশার কবলে আত্মসমর্পণ করবেন না। জীবনের বাহ্যিক রূপটা হয় যদি কালো মেঘের মতো তাহলে তার ভেতরটা আশা-ভরসার আলোয় উদ্ভাসিত। শক্ত কঠিন বিরাট পাথরের নিচেও এক চিলতে শীতল ছায়া প্রত্যাশিত। সফলতা ও সৌভাগ্যের পথ হোক না যতই দুস্তর পারাবার, আশা ও ভরসাই হলো তার সফল পারাপার।' -আয়েয আল-কারনী
📄 নেতিবাচক মানসিকতা
নেতিবাচক মানসিকতা হলো, জীবনে যা কিছু অনভিপ্রেত অনাকাঙ্ক্ষিত, যত বাধা-বিপত্তি, ফিরে ফিরে সেগুলোকে বড় করে দেখা। আর সমস্ত সফলতা, সুখশান্তির ক্ষেত্রগুলোকে এড়িয়ে যাওয়া, কিংবা খাটো করে দেখা।
নেতিবাচক প্রবণতা মূলত একটা মানসিক ব্যাধি। ব্যক্তির মন-মানসিকতায় যখন তা দানা বাঁধতে শুরু করে সাদা চোখে ধরা পড়ে না। পর্যায়ক্রমে এ ব্যাধি শিকড়-বাকড় ছড়াতে থাকে। ডালপালা গজাতে থাকে। একপর্যায়ে প্রবল হতে প্রবল আকার ধারণ করে। ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে জটিল সংকট সৃষ্টি করে।
ভুক্তভোগী প্রথমে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে নেতিবাচক মানসিকতায় ভাবতে শুরু করে। তারপর কোনো বিষয়ের সুদূরসম্ভাব্য ও কল্পিত অশুভ দিকগুলো খুঁটে খুঁটে দেখে। অশুভ দিকগুলোই তার কাছে মুখ্য হয়ে ওঠে। ইতিবাচক দৃষ্টিতে ও কল্যাণপ্রত্যাশী মানসিকতায় সে কোনো কিছুই ভেবে উঠতে পারে না।
এভাবে নেতিবাচক মানসিকতা যখন তার মজ্জাগত হয়ে প্রকট আকার ধারণ করে, তার কাছে জীবনের কোনো সফলতার মূল্য থাকে না। মনে হতে থাকে, সুখ-শান্তি নিতান্তই সাময়িক, কিছু দিন পর তা হারিয়ে যাবে। দুঃখ-বেদনা ও কষ্ট-যাতনাই হলো জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
সুখময় সফল জীবন-যাপনের জন্য নেতিবাচক মানসিকতা পরিহার করা অপরিহার্য। কিন্তু এর উপায় কী? এর সঠিক সমাধান কী?
সমাধান:
১. যে সত্তা আপনাকে সৃষ্টি করেছেন, রিযিক দান করেছেন তিনি আপনার অমঙ্গলের ফায়সালা করতে পারেন না। সুতরাং মহান আল্লাহর ওপর ভরসা রাখুন। পবিত্র কুরআনের বাণী:
﴿وَعَلَيْهِ فَلْيَتَوَكَّلِ الْمُتَوَكَّلُونَ﴾ [يوسف: ٦٧]
অর্থ: 'আর যারা নির্ভর করতে চায় তাদের উচিত তাঁরই ওপর নির্ভর করা।' (ইউসুফ, ১২: ৬৭)
২. আপন রবের প্রতি সুধারণা পোষণ করুন। আল্লাহ তা'আলা বান্দার ধারণা অনুযায়ী তার ভালো-মন্দের ফায়সালা করেন। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, আল্লাহ তা'আলা বলেন:
أَنَا عِنْدَ ظَنِّ عَبْدِي بِي إِنْ ظَنَّ خَيْرًا فَلَهُ وَإِنْ ظَنَّ شَرًّا فله». (صحیح ابن حبان) ٢ / ٤٠٥
অর্থ: আমার প্রতি বান্দার ধারণা অনুসারে আমি তার ব্যাপারে ফায়সালা করি। সে যদি সুধারণা রাখে এর সুফল লাভ করে। আর যদি অকল্যাণের ধারণা পোষণ করে এর পরিণতি তাকেই ভোগ করতে হয়। (সহীহ ইবনে হিব্বান, ২/৪০৫)
৩. সর্বদা পজেটিভ ও ইতিবাচক মানসিকতায় ভাবতে শিখুন। যত দুঃখ-কষ্ট ও বিপদ-আপদের কবলে ধৈর্যধারণ করুন। নায-নিয়ামত ও সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের কথা স্মরণ করুন। রাসূলুল্লাহ ﷺ মু'মিন বান্দাকে সুসংবাদ প্রদান করে বলেছেন:
عَنْ صُهَيْبٍ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ: «عَجَبًا لِأَمْرِ الْمُؤْمِنِ، إِنَّ أَمْرَهُ كُلَّهُ خَيْرٌ، وَلَيْسَ ذَاكَ لِأَحَدٍ إِلَّا لِلْمُؤْمِنِ، إِنْ أَصَابَتْهُ سَرَّاءُ شَكَرَ، فَكَانَ خَيْرًا لَهُ، وَإِنْ أَصَابَتْهُ ضَرَّاءُ، صَبَرَ فَكَانَ خَيْرًا لَهُ. صحيح مسلم (٤ / ٢٢٩٥)
অর্থ: সুহায়ব (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল ﷺ বলেন, 'মু'মিনের অবস্থা কতোই না বিস্ময়কর, সকল কাজই তার জন্য কল্যাণকর। মু'মিন ছাড়া অন্য কেউ এ সৌভাগ্য অর্জন করতে পারে না। সুখে-স্বাচ্ছন্দ্যে সে আল্লাহর শোকর করে। কৃতজ্ঞতা প্রকাশ তার জন্য কল্যাণ বয়ে আনে। দুঃখ-দুর্দশাগ্রস্ত হলে ধৈর্যধারণ করে। সবর ও ধৈর্যের বিনিময়ে সে কল্যাণ লাভ করে।' (মুসলিম, ৪/২২৯৫)
৪. নিজেকে একবার জিজ্ঞেস করুন, আপনি কি গায়েবের খবরাখবর জানেন? অদূর ভবিষ্যতে কী ঘটতে চলেছে তা বলতে পারেন? তাহলে কেন অনর্থক অজানা আশঙ্কায় সংকুচিত হচ্ছেন? আপনার জীবনে কী এমন কোনো হাসি-আনন্দ ও সৌভাগ্য-সফলতা আসেনি, যা ছিল অভাবিত কল্পনাতীত? তাহলে ভবিষ্যতেও কেন সুন্দরের আশা করছেন না? সফলতার স্বপ্ন বুনছেন না? মনে রাখতে হবে, ইতিবাচক মানসিকতাই সফলতার মূল চাবিকাঠি। তাই গোলাপের কাঁটার ভয় না করে তার সুবাস সৌন্দর্য উপভোগ করুন। রাতের ঘন কালো আঁধার না দেখে আকাশের উজ্জ্বল চাঁদ ও ঝলমলে তারকারাজি লক্ষ করুন। চারপাশের সব আঁধার কেটে যাবে।
৫. পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ মানব মুহাম্মদ বিন আব্দুল্লাহ রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর আদর্শ অনুসরণ করুন। তুমুল ঝড়-ঝাপটার কবলেও তিনি ছিলেন ভীষণ আশাবাদী ও কল্যাণপ্রত্যাশী। মুসলিম উম্মাহর কঠিন সংকটকালেও তিনি রোম ও পারস্য সাম্রাজ্য বিজয়ের সুসংবাদ দান করেছিলেন।
৬. পৃথিবীর ইতিহাসে যত মহা আবিষ্কারক, জ্ঞানী-মহাজ্ঞানী ও রাজা-মহারাজা ছিলেন, তাঁদের জীবনযাপনও ছিল আপনার মতো সুখ-দুঃখ মিশ্রিত। কারো কারো পরিবেশ পরিস্থিতি ছিল আরও অধিক বিপদসংকুল ও সংকটপূর্ণ। কিন্তু তাঁরা কখনও আশা ছাড়েননি, নিরাশ হননি। শত প্রতিকূলতার মাঝেও সৌভাগ্য ও সফলতার স্বপ্ন বুকে ধারণ করে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে সচেষ্ট থেকেছেন। ফলে এক জীবনেই তারা এমন অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছেন, যা আমরা কয়েক জীবনেও সম্ভব বলে বিশ্বাস করতে পারি না।
৭. এমন বন্ধু-বান্ধব নির্বাচন করুন, যারা ভীষণ আশাবাদী ও কর্মোদ্যমী। যারা অলস অকর্মণ্য ও নিরাশাবাদী, তাদের সঙ্গ ত্যাগ করুন। নিকট আত্মীয় ও বন্ধু সমাজের দ্বারা মানসিক শক্তি অর্জন করুন। দৃঢ় মনোবল ও ধারাবাহিক কর্মপ্রচেষ্টায় বাধা-বিপত্তি কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করুন।
৮. নিশ্চিত থাকুন, বিশ্বে যা কিছু ঘটছে, পূর্বনির্ধারিত আসমানি ফায়সালার ভিত্তিতেই ঘটছে। প্রতিটি মানুষের জীবনে তাঁর নিয়তির ফায়সালা প্রতিফলিত হচ্ছে। এ বিষয়টিই রাসূলুল্লাহ ﷺ আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-কে জোর দিয়ে বলেছেন:
﴿وَاعْلَمْ أَنَّ الأُمَّةَ لَوْ اجْتَمَعَتْ عَلَى أَنْ يَنْفَعُوكَ بِشَيْءٍ لَمْ يَنْفَعُوكَ إِلَّا بِشَيْءٍ قَدْ كَتَبَهُ اللهُ لَكَ، وَلَوْ اجْتَمَعُوا عَلَى أَنْ يَضُرُّوكَ بِشَيْءٍ لَمْ يَضُرُّوكَ إِلَّا بِشَيْءٍ قَدْ كَتَبَهُ اللهُ عَلَيْكَ، رُفِعَتِ الأَقْلَامُ وَجَفَّتْ الصُّحُفُ» (سنن الترمذي ٤ / ٦٦٧)
অর্থ: জেনে রেখো, গোটা জাতি যদি তোমার কোনো মঙ্গলের উদ্দেশ্যে ঐক্যবদ্ধ হয়, আল্লাহ তা'আলা তোমার মঙ্গলের যে ফায়সালা করেছেন, তার বাইরে তারা তোমার একবিন্দু উপকারও করতে পারবে না। তারা যদি তোমার ক্ষতিসাধনে সংবদ্ধ হয়, তবুও আল্লাহর ফায়সালার বাইরে তোমার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। মানুষের ভাগ্যলিপি চূড়ান্ত এবং নিয়তির ফায়সালা অবধারিত।' (তিরমিজী, ৪/৬৬৭)
৯. মনের যত জল্পনা-কল্পনা ও দ্বিধা-সংশয় ঝেড়ে ফেলে দৃঢ় সংকল্প ও অবিচল মানসিকতায় কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে প্রয়াসী হোন। অতীতের ব্যর্থতা প্রতিকূলতা মনে করিয়ে দেয়-এমন সমস্ত বিষয় এড়িয়ে চলুন, স্মৃতির পাতা থেকে মুছে ফেলুন। আল্লাহ তা'আলার বরকত ও তাওফিকের প্রত্যাশী হয়ে নতুনভাবে শুরু করুন। নব উদ্যমে সচেষ্ট হোন। ইনশাআল্লাহ, সফলতা অবশ্যম্ভাবী।
১০. দু'আ ও ইস্তিগফারের মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলার সাহায্য প্রার্থনা করুন। সকাল-সন্ধ্যায় নির্ধারিত যিকির-ওযীফা আদায় করার পাশাপাশি অত্যন্ত মনোযোগের সঙ্গে পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত করুন। বেশি বেশি আল্লাহর যিকির করুন। হৃদয় মন প্রশান্ত হবে, অস্থিরতা ও উৎকণ্ঠামুক্ত হবে। পবিত্র কুরআনের বাণী: ﴿الَّذِينَ آمَنُوا وَتَطْمَئِنُّ قُلُوبُهُم بِذِكْرِ اللَّهِ ﴾ [الرعد: ٢٨] অর্থ: 'স্মরণ রেখ, কেবল আল্লাহর যিকিরই সেই জিনিস, যা দ্বারা অন্তরে প্রশান্তি লাভ হয়।' (সূরা রা'দ, ১৩: ২৮)
১১. নতুন কোনো উদ্যোগে ও কর্ম কল্পনা বাস্তবায়নে সচেষ্ট হোন। তাতে নিজের যোগ্যতা ও দক্ষতা যাচাই করার সুযোগ হবে। ভিন্ন প্রেক্ষাপটে নিজেকে নতুনভাবে উপলব্ধি করা যাবে। মনোবল ও আত্মবিশ্বাস আরও সমৃদ্ধ হবে।
১২. সুদূর কল্যাণপ্রসারী উদ্যোগ বাস্তবায়নে সচেষ্ট হোন। উদ্যোগ-আয়োজনের ব্যতি-ব্যস্ততা ও কর্মমুখরতা অতীতের ব্যর্থতা ও হতাশার কথা ভুলিয়ে দিবে। প্রকৃত বুদ্ধিমান ও বিচক্ষণ বিফলতাকে সফলতায় ও হতাশাকে সাহসিকতায় রূপান্তরিত করে, বাধা-প্রতিবন্ধকতার কবলে ভেঙে পড়ে বিপদের ওপর বিপদ ডেকে আনে না।
১৩. যে পরিবেশ পরিস্থিতি, যাদের সংস্পর্শ ও কাজকর্ম আপনার নেতিবাচক মানসিকতার প্রধান কারণ বলে মনে করেন, তাদের থেকে সরে দাঁড়ান। আপনজন কিংবা বন্ধুজনদের সাথে মনোমুগ্ধকর পরিবেশে দর্শনীয় স্থানে ঘুরে আসুন। এতে মন-মানসিকতা প্রফুল্ল প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে। নতুনভাবে আত্মবিশ্বাস ফিরে পাবেন। দায়দায়িত্বে পেশাদারিত্ব ও উদ্দীপনার মানসিকতা সৃষ্টি হবে।
১৪. পত্র-পত্রিকা ও সোস্যাল মিডিয়ার অজস্র নেতিবাচক সংবাদ ও ভীতিপ্রদ খবরাখবরের ছড়াছড়ি-এ সমস্তই এড়িয়ে চলুন। ইতিবাচক সংবাদ, সফল ব্যক্তিদের সফলতার ঘটনা পড়ুন।
১৫. নেতিবাচক মানসিকতার কবলে চারপাশের সমাজ-বিচ্ছিন্ন হয়ে একাকিত্বে পড়ে থাকবেন না। আশাবাদী, কর্মোদ্যমী ও স্বপ্নবান ব্যক্তিবর্গের সংস্পর্শে থাকুন। তাদের সংস্পর্শ আপনার মনে সাহস সঞ্চার করবে। আপনাকে প্রাণবন্ত উজ্জীবিত করে তুলবে।
১৬. সুসংবাদ গ্রহণ করুন, আগামীর দিনগুলো আরও সুন্দর সফল হবে। কেননা আপনি মহান আল্লাহর তত্ত্বাবধানে ও তাঁর রক্ষণাবেক্ষণে আছেন। তিনি কিছুতেই আপনাকে নিরাশ করবেন না। রিযিক থেকে বঞ্চিত করবেন না। সুতরাং সফলতা ও সৌভাগ্যের প্রত্যাশা করুন। আল্লাহ তা'আলা আশাবাদী ও স্বপ্নবান ব্যক্তিদের ভালোবাসেন। তাদেরকে তাদের আশানুরূপ দান করেন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলার প্রতিশ্রুতি:
﴿وَاللَّهُ يَعِدُكُمْ مَّغْفِرَةً مِّنْهُ وَفَضْلًا وَاللَّهُ وَاسِعٌ عَلِيمٌ﴾
অর্থ: 'আল্লাহ তোমাদেরকে স্বীয় মাগফিরাত ও অনুগ্রহের প্রতিশ্রুতি দেন। আল্লাহ অতি প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ।' (বাকারা, ২: ২৬৮)
১৭. আপনার প্রতি আমার সর্বশেষ উপদেশ হলো, 'চোখ থেকে “কালো” চশমাটা খুলে ফেলুন। মন থেকে নেতিবাচক ধ্যান-ধারণা ঝেড়ে ফেলুন। জীবনটাকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখতে শিখুন। পজেটিভ দৃষ্টিভঙ্গিতে আপনার জীবনটাকে রাঙিয়ে তুলুন। জীবনের পটভূমি তো আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিরই বাস্তব প্রতিফলন মাত্র।
পরিশিষ্ট:
* লেবাননের বিখ্যাত আরব কবি ইলিয়া আবূ মাযী (১৮৮৯-১৯৫৭ খ্রিষ্টাব্দ) বলেছেন:
قَالَ: السَّمَاءُ كَثِيْبَةً وَتَجَهما قُلْتُ: ابْتَسِم يَكْفِي التَّجَهُمَ فِي السَّمَا!
قَالَ: الصَّبَا وَلَّى فَقُلْت لَهُ : ابْتَسِمْ! لَنْ يَرْجِعَ الْأَسْفُ الصَّبَا المُتَصَرِّما.
অর্থ: সে বলল, 'আকাশ বিষণ্ণ গোমরা হয়ে আছে।' বললাম, 'তুমি হাস্যবদন থাক। আকাশের বিষণ্ণতা গোমরাভাব মুহূর্তেই কেটে যাবে।' সে বলল, 'শৈশব অতীত হলো! যৌবন ফুরিয়ে গেল!' বললাম, 'হাসিমুখে পৌঢ়ত্বের ভার গ্রহণ কর। তোমার আক্ষেপ অতীত শৈশব ও হারানো যৌবন ফিরিয়ে দিতে পারবে না।'
* আমেরিকান ফোর্ড মটর কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা হেনরি ফোর্ড (১৮৬৩- ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দ) বলেছেন: 'একটি ক্ষেত্রে আপনার বিশ্বাস আপনি পারবেন, আর একটি ক্ষেত্রে আপনার ধারণা, আপনি পারবেন না। দু'টি ক্ষেত্রেই দেখবেন, আপনার বিশ্বাস ও ধারণাটাই সত্যে প্রমাণিত হয়েছে।'
* মাইক্রোসফটের প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক সফটওয়্যার নির্মাতা বিল গেটস বলেছেন: 'ইউনিভার্সিটির কয়েকটি সাবজেক্টে ফেল করেছি; কিন্তু আমার বন্ধুটি বেশ সাফল্যের সাথেই পাশ করেছে। এখন সে মাইক্রোসফট কোম্পানির ইঞ্জিনিয়ার। আর আমি কোম্পানির স্বত্বাধিকারী।'
* প্রখ্যাত আমেরিকান সাহিত্যিক ও চিন্তাবিদ প্রেন্টাইস মুলফোর্ড (১৮৩৪- ১৮৯১ খ্রিষ্টাব্দ) বলেছেন: 'যে ব্যক্তি শুধু জীবনের নেতিবাচক দিকগুলোকেই বড় করে দেখে, অতীতের দুঃখ-দুর্দশার ভাবনায় ডুবে থাকে, ভবিষ্যতেও সে অনুরূপ প্রতিকূল পরিস্থিতির অজানা আশঙ্কায় ভুগতে থাকে। একপর্যায়ে সে অন্ধকার ভবিষ্যৎ ছাড়া আর কিছুই দেখতে পায় না। তখন তার নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিই বাস্তবে প্রতিফলিত হয়। পদে পদে সে নানা প্রতিবন্ধকতা ও প্রতিকূলতার শিকার হয়।'