📘 আল হাল্লু জীবন সমস্যার সমাধান > 📄 হিংসা

📄 হিংসা


জ্ঞান-গরিমা, অর্থ-সম্পদ, সুনাম-সুখ্যাতি, বংশ-মর্যাদা, পদমর্যাদা ইত্যাদি যাবতীয় ক্ষেত্রে কারো উৎকর্ষতা ও শ্রেষ্ঠত্ব দেখে গা জ্বালা করা, তার সবটুকু ছিনিয়ে নিয়ে এককভাবে নিজেই ভোগ-দখল করার উদগ্র বাসনার নামই হিংসা। হিংসা হলো ‘দোধারি’ তলোয়ার, যেভাবেই চালানো হোক, ক্ষতি অনিবার্য।

হিংসুক নিজেই হিংসার আগুনে জ্বলে, অন্যের ক্ষতি সাধন করে একক দখলদারিত্ব কায়েম করার উদগ্র বাসনায় অস্থির হয়ে উঠে। হিংসার গুনাহ ও পাপের বোঝা বহন করার সঙ্গে সঙ্গে নেক আমলসমূহ বরবাদ করে। অপর দিকে ভুক্তভোগী শ্রেণি হিংসুক-কর্তৃক নানা প্রতিকূলতা ও বিপত্তির শিকার হয়। হিংসার কবলে তাদের স্বাভাবিক শান্তিপূর্ণ জীবনযাত্রা ক্রমশ অসহনীয় ও দুর্বিষহ হয়ে উঠে।

হিংসা মানুষের স্বভাবজাত ব্যাধি। এর কারণে সমাজে বাদবিবাদ, বিদ্বেষ, শত্রুতা, অন্যায়-অনাচার, যুলুম-অত্যাচারের মতো জঘন্য অপকর্মের সূত্রপাত হয়। তাই হিংসা বর্জনের অপরিহার্যতা অনস্বীকার্য। কিন্তু তার উপায় কী? এ জটিল সমস্যার সমাধান কী?

সমাধান:
১. মানুষমাত্রই তার মনে হিংসার উদ্রেগ হবে এবং এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আক্রোশ ভরে মনের মধ্যে হিংসা পুষে রাখা দূষণীয়। যে কোনোভাবে তা দমন করাই বাঞ্ছনীয়। তাই অন্যের যোগ্যতা, দক্ষতা, সুযোগ-সুবিধা ও অর্থপ্রাচুর্যের দিকে না তাকিয়ে, আল্লাহ তা'আলা আপনাকে যে অগণিত নিয়ামত দান করেছেন, তার কথা স্মরণ করুন। তাহলে দেখবেন, এমন বহু নিয়ামত আপনার ভাগ্যে জুটেছে, যা পাওয়ার জন্য অন্যরা উদগ্রীব হয়ে আছে।

২. একবার ভেবে দেখুন, হিংসার কারণে আপনার নেক আমল বরবাদ হবে। মানসিক প্রশান্তি ব্যাহত হবে। নিত্যদিনের স্বাভাবিক শান্তিপূর্ণ জীবনযাত্রা বিঘ্নিত হবে। কেননা হিংসা হলো এমন আগুন যা সর্বপ্রথম হিংসুককেই জ্বালিয়ে মারে।

৩. মনে রাখুন, ইবলিসই হলো হিংসা-বিদ্বেষের মূল হোতা। তার দুষ্ট মনেই হিংসার প্রথম উৎপত্তি। জান্নাতে সে আদম (আ.)-কে হিংসা করেছিল। সুতরাং, কেউ যদি হিংসার বশবর্তী হয় সে হবে ইবলিসের অনুসারী। তার পরিণতি ভয়াবহ।

৪. ভুলে যাবেন না, সময় আবর্তনশীল। নিয়তি পরিবর্তনশীল। কালের দুর্যোগ-দুর্বিপাকে আপনি নিজেও আক্রান্ত হতে পারেন। তাই সর্বদা অন্যের মঙ্গল কামনা করা কর্তব্য। পরার্থপরতা ও পরোপকারে সচেষ্ট থাকা বাঞ্ছনীয়।

৫. ইবাদত ও সদাচারে সদা যত্নবান হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গুনাহ ও নাফরমানি পরিহারে সচেষ্ট হোন। তাকওয়া ও আল্লাহভীতি অবলম্বন করুন, তাহলে যাবতীয় অকল্যাণ অনিষ্ট থেকে সুরক্ষা পাবেন। পবিত্র কুরআনের আশ্বাসবাণী শুনুন:
وَإِنْ تَصْبِرُوا وَتَتَّقُوا لَا يَضُرُّكُمْ كَيْدُهُمْ شَيْئًا إِنَّ اللَّهَ بِمَا يَعْمَلُونَ مُحِيطٌ ﴿آل عمران: ۱۲۰﴾
অর্থ: 'আর যদি তোমরা ধৈর্য ধারণ কর ও তাকওয়া অবলম্বন কর, তাহলে তাদের চক্রান্ত তোমাদের কোনই ক্ষতি করতে পারবে না। তারা যা করে নিশ্চয়ই আল্লাহ তা'আলা তার পরিবেষ্টনকারী।' (আলে-ইমরান, ৩:১২০)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«احْفَظِ اللَّهَ يَحْفَظْكَ». (سنن الترمذي) ٤ /٦٦٧
অর্থ: 'আল্লাহ তা'আলার আদেশ-নিষেধ মেনে চল। তিনিই তোমাকে রক্ষা করবেন।' (তিরমিজী, ৪/৬৬৭)

৬. হিংসুকের সংস্পর্শ থেকে দূরে থাকুন। তার কাছেও যাবেন না। বন্ধু হিসেবে তো কখনই না। কেননা আপনার মঙ্গল ও ইতিবাচক ক্ষেত্রে সে কখনো স্বস্তিবোধ করবে না। তার একমাত্র অপচেষ্টা হলো আপনার শ্রেষ্ঠত্বের দিকটি ছিনিয়ে নিয়ে আপনাকে কল্যাণ-বঞ্চিত করা।

৭. দু'আ ও ইস্তেগফারের মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলার আশ্রয় গ্রহণ করুন। সকাল-সন্ধ্যায় সুন্নত অযীফাগুলো নিয়মিত আদায় করুন। শরীয়তে এমন অনেক আমলের দিকনির্দেশনা রয়েছে, যাবতীয় বিপদ-আপদ, সংকট ও প্রতিকূলতার মুখে যা আপনার রক্ষাকবচ-সে সমস্ত আমলে যত্নবান হোন। বিশেষভাবে 'মুআওয়াযাতাইন' দু'টি রক্ষাকবচ: সূরা ফালাক ও সূরা নাস নিয়মিত পাঠ করুন।

৮. হিংসুকের হিংসা মোকাবেলা করার জন্য, কিংবা তা থেকে বাঁচার জন্য সবচেয়ে কার্যকর পন্থা হলো-যদিও এর বাস্তবায়ন কষ্টসাধ্য; কেননা তা মানুষের স্বভাবজাত ও প্রচলিত মানসিকতা বিরোধী- হিংসুকের হিংসা-বিদ্বেষের মাত্রা যত তীব্র হোক, আপনি আন্তরিকতা, সদাচার ও ভালোবাসার পরিচয় দিন। সৌহার্দ্য ও প্রীতির নিদর্শনস্বরূপ তাকে হাদিয়া ও উপঢৌকন দিন। প্রফুল্লচিত্তে সহাস্য বদনে তার সাথে সাক্ষাৎ করুন। এটাই পবিত্র কুরআনের নির্দেশ ও দিকনির্দেশনা:
﴿وَلَا تَسْتَوِي الْحَسَنَةُ وَالسَّيِّئَةُ ۚ ادْفَعْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ فَإِذَا الَّذِي بَيْنَكَ وَبَيْنَهُ عَدَاوَةٌ كَأَنَّهُ وَلِيٌّ حَمِيمٌ﴾ [حم السجدة : ৩৪]
অর্থ: 'ভাল ও মন্দ সমান হতে পারে না। মন্দ প্রতিহিত কর উৎকৃষ্ট দ্বারা; ফলে তোমার সাথে যার শত্রুতা আছে সে হয়ে যাবে অন্তরঙ্গ বন্ধুর মত।' (হা-মীম সাজদা, ৪১: ৩৪)

৯. আপনার যোগ্যতা-দক্ষতা ও সুযোগ-সুবিধার কথা দশজনের কাছে প্রচার করবেন না। বিশেষভাবে হিংসুকের কাছে এসব বিষয় জাহির করা থেকে বিরত থাকুন। হিংসুকের হিংসা থেকে বাঁচার জন্য এটি একটি কার্যকর পন্থা। ইয়াকুব (আ.) তাঁর সন্তানদের এ পদ্ধতি বাতলে দিয়েছিলেন। সন্তানদের জনশক্তি ও একতাবদ্ধতার বিষয়টির ওপর যেন দুষ্ট লোকের নজর না লাগে। পবিত্র কুরআনের ভাষায়:
يُبَنِيَّ لَا تَدْخُلُوا مِنْ بَابٍ وَاحِدٍ وَادْخُلُوا مِنْ أَبْوَابٍ مُتَفَرِّقَةٍ
অর্থ: 'হে আমার পুত্রগণ! তোমরা এক দরযা দিয়ে প্রবেশ কর না, ভিন্ন ভিন্ন দরযা দিয়ে প্রবেশ করবে।' (ইউসুফ, ১২: ৬৭)
তাফসির বিশারদগণের অভিমত, রাজার দরবারে প্রবেশের সময় এ বিশেষ পন্থা অবলম্বনের উদ্দেশ্য ছিল, হিংসুক ও দুষ্ট লোকের 'বদনজর' থেকে বেঁচে থাকা।

১০. একমাত্র আল্লাহ তা'আলাকে ভয় করুন। কখনো যেন মনের মধ্যে 'গায়রুল্লাহর ভয়' স্থান না পায়। সুনিশ্চিত থাকুন, আপনি যদি আল্লাহ তা'আলার আশ্রয়ে থাকেন, কুরআন-সুন্নাহর নির্দেশিত যিকিরের রক্ষাকবচ ধারণ করেন তাহলে হিংসুকের হিংসা আপনার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। যালিমের যুলুম প্রতিফলিত হবে না। পবিত্র কুরআনের ভাষায়:
قُلْ لَنْ يُصِيبَنَا إِلَّا مَا كَتَبَ اللهُ لَنَا ﴾ [التوبة: ٥١]
অর্থ: 'বলুন, আল্লাহ আমাদের জন্য যা নির্ধারণ করে দিয়েছেন, তা ছাড়া অন্য কোন বিপদ-আপদ আমাদের ওপর আপতিত হবে না।' (তাওবা, ৯: ৫১)
সুন্নাহর ভাষায়: عَنْ ابْنِ عَبَّاسٍ قَال: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: وَاعْلَمْ أَنَّ الأُمَّةَ لَوِ اجْتَمَعَتْ عَلَى أَنْ يَنْفَعُوكَ بِشَيْءٍ لَمْ يَنْفَعُوكَ إِلَّا بِشَيْءٍ قَدْ كَتَبَهُ اللَّهُ لَكَ، وَلَوْ اجْتَمَعُوا عَلَى أَنْ يَضُرُّوكَ بِشَيْءٍ لَمْ يَضُرُّوكَ إِلَّا بِشَيْءٍ قَدْ كَتَبَهُ اللهُ عَلَيْكَ». (سنن الترمذي ٦٦٧/٤)
অর্থ: আবূ হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'জেনে রাখুন, গোটা জাতি যদি আপনার কল্যাণে একতাবদ্ধ হয় তবুও আল্লাহ তা'আলা আপনার ভাগ্যে যতটুকু কল্যাণের ফায়সালা করেছেন, এর অতিরিক্ত তারা একবিন্দু কল্যাণ সাধন করতে পারবে না। আর গোটা জাতি যদি আপনার ক্ষতি সাধনে সংবদ্ধ হয় তবুও আল্লাহর ফায়সালার বাইরে তারা আপনার একচুল পরিমাণও ক্ষতি করতে পারবে না।' (সুনানে তিরমিজী, ৪/৬৬৭)

১১. হিংসুকের হিংসার উচিত জবাব হলো কোনো প্রত্যুত্তর না করে নীরব নিশ্চুপ থাকা। সুতরাং মানুষের হিংসাত্মক ও ব্যাঙ্গাত্মক কটুক্তির প্রতি ভ্রূক্ষেপ না করে আপন মনে কাজ করে যান। কাজের উদ্যোগ-উদ্দীপনা বাড়িয়ে দিন। কথিত আছে, প্রকৃত জবাব হলো বাস্তবে পরিণত করে দেখানো, মুখের ওপর দু'টা কথা শুনিয়ে দেওয়া তাতো নিতান্ত সামান্য।

১২. সুনিশ্চিত থাকুন, রিযিকদাতা একমাত্র আল্লাহ তা'আলা। তিনি যার জন্য যতটুকু রিযিকের ফায়সালা করেছেন, তা সম্পূর্ণ ভোগ করার আগে কেউ মৃত্যুবরণ করবে না। আপনার জীবিকা কেউ ছিনিয়ে নিতে পারবে না, ভোগদখল করতে পারবে না।

১৩. অন্যের আয়ত্তে আপনার পছন্দের ভালো লাগার কিছু দেখলে তার বরকতের দু'আ করুন। তার উত্তরোত্তর সফলতা কামনা করুন। রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাদের এমনই আদেশ করেছেন: إِذَا رَأَى أَحَدُكُمْ مِنْ أَخِيهِ مَا يُعْجِبُهُ، فَلْيَدْعُ لَهُ بِالْبَرَكَةِ». (سنن ابن ماجه ٢ / ١١٦٠)
অর্থ: 'তোমাদের কেউ যখন তার ভাইয়ের কাছে নিজের পছন্দের ও ভালো লাগার কিছু দেখবে, তখন সে যেন তার বরকতের দু'আ করে।' (সুনানে ইবনে মাযাহ, ২/১১৬০)

১৪. মনটাকে নিষ্কলুষ ও হিংসা-বিদ্বেষমুক্ত রাখুন। ইহকালে জান্নাতের পরম সুখানুভূতি লাভ করবেন। আত্মার শুদ্ধতা ও মনের নিষ্কলুষতা আপনার জন্য জান্নাতের ফায়সালা ত্বরান্বিত করবে।

১৫. আল্লাহ তা'আলার প্রতি গভীর আস্থা ও বিশ্বাস, দুঃস্থ ও প্রয়োজনগ্রস্তদের সাহায্য-সহযোগিতা ও দান-সদকা হলো আপনার অন্যতম পুঁজি। যাবতীয় বিপদ-আপদ, হিংসা ও কুদৃষ্টি থেকে বাঁচার জন্য এটি অত্যন্ত কার্যকর ও কুরআন-সুন্নাহর স্বীকৃত পন্থা। আল্লামা ইবনুল কাইয়্যিম জাওযী (রহ.) (৬৯১-৭৫১ হি.) বলেছেন: 'বিপদ-আপদ থেকে মুক্ত থাকার জন্য দান-সদকার বিরাট ভূমিকা রয়েছে। মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে সবার জন্য তা সমান প্রযোজ্য।'

১৬. আল্লাহ তা'আলার কাছে তওবা করুন। একনিষ্ঠ মনে তাওবা করে গুনাহমুক্ত হোন এবং সামনের দিনগুলোতে গুনাহমুক্ত জীবন-যাপনে সচেষ্ট হোন। কেননা গুনাহ ও পাপাচারই হলো বিপদগ্রস্ত হওয়ার মূল কারণ। পবিত্র কুরআনের ভাষায়:
وَمَا أَصَابَكُمْ مِّنْ مُّصِيبَةٍ فَبِمَا كَسَبَتْ أَيْدِيكُمْ وَيَعْفُوا عَنْ كَثِير [سورة الشورى: ٣٠]
অর্থ: 'তোমাদের যে বিপদ-আপদ ঘটে তাতো তোমাদেরই কৃতকর্মের ফল।' (আশ-শূরা, ৪২: ৩০)

১৭. অর্থবিত্ত, সুনাম-সুখ্যাতি, সন্তান-সন্ততি ও ঘর-বাড়ি মোটকথা, আপনার পছন্দের ও ভালো লাগার যা-কিছুই লাভ করবেন, বলুন, مَا شَاءَ اللَّهُ لَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ (মাশাআল্লাহ, লা-কুওয়াতা ইল্লাবিল্লাহ)। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা গোটা মানবজাতিকে এমনই দিকনির্দেশনা প্রদান করে বলেছেন:
وَلَوْلَا إِذْ دَخَلْتَ جَنَّتَكَ قُلْتَ مَا شَاءَ اللَّهُ لَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ [الكهف: ٣٩]
অর্থ: 'তোমার উদ্যানে প্রবেশ করে তুমি কেন বললে না, আল্লাহ যা চেয়েছেন তাই হয়েছে, আল্লাহর সাহায্য ব্যতীত কোন শক্তি নেই।' (কাহফ, ১৮: ৩৯)

পরিশিষ্ট:
হিংসা-বিদ্বেষের সূত্র ধরে পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে ঘৃণ্য ও জঘন্য ঘটনাটা ঘটেছে। তার মূল হোতা ইবলিস শয়তান। মাটির তৈরি আদমকে হিংসা করে আল্লাহ তা'আলার অবাধ্য হয়েছে। তার মন-মানসিকতা হিংসা-বিদ্বেষে এতটাই কলুষিত হলো যে, স্রষ্টার আদেশ লঙ্ঘন করে হলেও আদমকে সিজদা করা থেকে বিরত থাকল। স্রষ্টার আনুগত্য ছেড়ে অবাধ্যতার পথ বেছে নিল। রহমতের শীতল ছায়া ছেড়ে অভিশাপের আগুনে দগ্ধ হলো। জান্নাতের বাগান ছেড়ে জাহান্নামের গর্ভে নিমজ্জিত হলো। সুতরাং যে ব্যক্তি নিজেকে হিংসা-বিদ্বেষে কলুষিত করবে ইবলিস হলো তার সর্বস্বীকৃত প্রধান 'গুরু'। তাই সতর্ক হোন। ইবলিসের শিষ্য হয়ে নিজেকে কলুষিত করবেন না। রহমতের শীতল ছায়া ছেড়ে অভিশাপের আগুনে ঝাঁপ দিবেন না।

আইরিশ লেখক জর্জ বার্নাড শো (১৮৫৬-১৯৫০ খ্রিষ্টাব্দ) বলেছেন: 'যে দাঁতব্যথায় ভুগছে, তার মনে হয়, দাঁত-ব্যথামুক্ত বাকি সবাই খুব সুখী।'

লোকমান হাকিম (রহ.) বলেছেন: 'হিংসুকের তিনটি আলামত: ব্যক্তির অনুপস্থিতিতে নিন্দা করে, উপস্থিতিতে তোষামোদ করে, তার বিপদে উল্লসিত হয়।'

📘 আল হাল্লু জীবন সমস্যার সমাধান > 📄 ভয়

📄 ভয়


ভয় হলো একটি মানসিক অবস্থা। মৃত্যু, রোগ, শোক, হিংসা-বিদ্বেষ, ভয়ংকর শত্রু, প্রাণীর আক্রমণ, ঘুটঘুটে অন্ধকার ও নির্জন নিস্তব্ধ পরিবেশে আবদ্ধ হওয়া ইত্যাদির মতো অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু ঘটে যাওয়ার আশঙ্কাই হলো ভয়-ভীতির প্রধান অনুঘটক। এ প্রসঙ্গে ইবনুল কাইয়্যিম জাওযী (রহ.) (৬৯১-৭৫১ হি.) বলেন:
'কোনো অকল্যাণ-অনিষ্টের অজানা আশঙ্কা থেকে সৃষ্ট মানসিক অস্থিরতার নামই হলো ভয়।'

দার্শনিক অ্যারিস্টটল-এর বক্তব্য হলো, 'ভয় হলো অনাকাঙ্ক্ষিত ও ভীতিকর কিছু ঘটার আশঙ্কার কারণে মানসিক অস্থিরতা ও চাঞ্চল্য।'

ভয় পাওয়া এবং শংকিত হওয়া দূষণীয় কিছু নয়, দূষণীয় হলো ব্যক্তির এ ধরনের দাবি করা যে, সে কখনো কোনো কিছুর ভয় করে না। এ ধরনের দাবির কোনো ভিত্তি নেই। কেননা মানুষের স্বভাব-প্রকৃতিতে ভয়-ভীতি সঞ্চারিত করা হয়েছে, যা সহজাত ও স্বভাবজাত। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন:
﴿إِنَّ الْإِنْسَانَ خُلِقَ هَلُومًا﴾ [المعارج: ١٩]
অর্থ: 'মানুষতো সৃষ্টি হয়েছে অতিশয় অস্থিরচিত্তরূপে।'

তবে সবকিছুরই একটি মাত্রা ও পরিমিতি রয়েছে। যা বজায় রাখা কাম্য, লঙ্ঘন করা অবাঞ্ছনীয়। সুতরাং ভয়-ভীতি যদি মাত্রাতিক্রম করে তবে তার বিরূপ প্রতিক্রিয়া অনিবার্য। তা ব্যক্তিকে ভীরুতা, মানসিক দুর্বলতা ও ভীতিপ্রবণ মানসিকতার পথে ঠেলে দেয়। পর্যায়ক্রমে তা মারাত্মক ব্যাধিতে পরিণত হয়। এ রোগ মানুষকে দুর্বলপ্রাণ করে ফেলে। ফলে ভুক্তভোগী নিজের প্রতি চরম অনাস্থা ও সংশয়ের শিকার হয়। আত্মবিশ্বাস খুইয়ে বসে। বাস্তব জীবনের কঠিন চ্যালেঞ্জের মোকাবেলা করার ক্ষেত্রে সে পশ্চাৎপদ ও পলায়নপর ভূমিকায় স্বস্তি বোধ করে। চরম নিরাশা ও নেতিবাচক মানসিকতায় ভুগতে থাকে।

ভয়-ভীতি তার মন-মস্তিষ্ক ও চিন্তা-চেতনায় এমন প্রবলভাবে ভর করে যে, তার মানসিক প্রশান্তি মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়। মন-মানসিকতা অস্থির বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে। পর্যায়ক্রমে স্বাভাবিক জীবনযাপন চরম অসহনীয় হয়ে উঠে। জীবনের পরম কাঙ্ক্ষিত সুখ-শান্তির মৃত্যু ঘটে।

সুস্থ-স্বাভাবিক ও সুন্দর জীবনযাপনের জন্য অনর্থক ভয়-ভীতিমুক্ত হয়ে থাকতে হবে। অযথা আশঙ্কা ও উৎকণ্ঠা থেকে বেঁচে থাকতে হবে। কিন্তু উপায় কী? এক্ষেত্রে আমাদের করণীয় কী?

সমাধান:
১. তাকদির ও নিয়তির ফায়সালায় পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস রাখুন। আপনার দৃঢ় বিশ্বাস থাকতে হবে, সবকিছু মহান আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছা ও আদেশে বাস্তবায়িত হয় এবং নিয়ন্ত্রিত হয়। সুতরাং আল্লাহ তা'আলা যা ফায়সালা করেছেন আপনার ভাগ্যে তা-ই ঘটবে। পবিত্র কুরআনের ভাষায়:
قُلْ لَنْ يُصِيبَنَا إِلَّا مَا كَتَبَ اللهُ لَنَا [التوبة: ٥١]
অর্থ: 'আপনি বলুন, আল্লাহ আমাদের জন্য যা নির্ধারণ করে দিয়েছেন তা ছাড়া অন্য কোন বিপদ-আপদ আমাদের ওপর আপতিত হবে না।' রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
وَتَعْلَمَ أَنَّ مَا أَصَابَكَ لَمْ يَكُنْ لِيُخْطِئَكَ، وَأَنَّ مَا أَخْطَأَكَ لَمْ يَكُنْ لِيُصِيبَكَ». (سنن أبي داود) ٤ / ٢٢٥
অর্থ: 'জেনে রাখ, তোমার ভাগ্যে যা ঘটবে তা কোনোভাবেই খণ্ডাবে না। আর যা তোমার ভাগ্যে নেই তা কিছুতেই তোমাকে আক্রান্ত করতে পারবে না।' (আবু দাউদ, ৪/২২৫) তাহলে আর ভয় কীসের? দুশ্চিন্তা কীসের?

২. ভয় ও আশঙ্কার জায়গাগুলোতে আপনার বিশ্লেষণ ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগান। দলিল-প্রমাণের ভিত্তিতে বিষয়গুলোর যৌক্তিক বিশ্লেষণ করুন। তাহলে নিশ্চিত হতে পারবেন, আপনার অজানা আশঙ্কা ও সংশয়প্রবণতা ভিত্তিহীন। যার অধিকাংশি বাস্তবে পরিণত হয় না। যেমন: বিমানে চড়তে আপনার ভয় হয়। বিমানে করে শূন্যের পথে ভ্রমণ করার সাহস পান না। তাহলে বিমান সম্পর্কে আপনার জানা-শোনার পরিধি বাড়ান। এর বৈশিষ্ট্য ও সুযোগ-সুবিধা সম্পর্কে অবগত হোন। এভাবে আপনার ভয়-ডর কেটে যাবে। এটা পরীক্ষিত ও অভিজ্ঞতালব্ধ পন্থা।

৩. বিশ্বাস করুন, মানুষ যা কিছুর আশঙ্কা করে তার অধিকাংশি বাস্তবে ঘটে না। এটা একটা বাস্তব মূলনীতি। ভয়-ডর দূর করার জন্য এটি একটি কার্যকর পন্থা।

৪. কোনো ক্ষেত্রে যদি শঙ্কিত হন এবং সময়ের সাথে সাথে শঙ্কার মাত্রা বাড়তে থাকে তাহলে বারবার পাঠ করুন: حَسْبُنَا اللهُ وَنِعْمَ الوَكِيل.
অর্থ: 'আমাদের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট। তিনি কতোই না শ্রেষ্ঠ অভিভাবক।'
বিপদে-আপদে, বাধা ও প্রতিকূলতায় এ দু'আটি মু'মিনের পরম আশ্রয়। পবিত্র কুরআনের ভাষায়:
الَّذِينَ قَالَ لَهُمُ النَّاسُ إِنَّ النَّاسَ قَدْ جَمَعُوا لَكُمْ فَاخْشَوْهُمْ فَزَادَهُمْ إِيْمَانًا وَقَالُوا حَسْبُنَا اللَّهُ وَنِعْمَ الْوَكِيلُ * فَانْقَلَبُوا بِنِعْمَةٍ مِّنَ اللهِ وَفَضْلٍ لَّمْ يَمْسَسْهُمْ سُوءٌ وَاتَّبَعُوا رِضْوَانَ اللَّهِ وَاللَّهُ ذُو فَضْلٍ عَظِيمٍ﴾ [آل عمران: ١٧٣، ١٧٤]
অর্থ: 'যাদেরকে লোকেরা বলেছিল, নিশ্চয়ই তোমাদের বিরুদ্ধে সেইসব লোক সমবেত হয়েছে; অতএব তোমরা তাদেরকে ভয় কর; কিন্তু এতে তাদের বিশ্বাস পরিবর্ধিত হয়েছিল এবং তারা বলেছিল; আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট এবং তিনি মঙ্গলময়, কর্মবিধায়ক। অনন্তর তারা আল্লাহর অনুগ্রহ সম্পদসহ প্রত্যাবর্তীত হয়েছিল, তাদেরকে অমঙ্গল স্পর্শ করেনি এবং তারা আল্লাহর সন্তুষ্টির অনুসরণ করেছিল; আর আল্লাহর অনুগ্রহ অতি ব্যাপক।' (আলে-ইমরান, ৩: ১৭৩-১৭৪)

৫. অতীত অনুসন্ধান করে দেখুন। পেছনে ফেলে-আসা দিনগুলোর কথা স্মরণ করুন। দেখবেন, আপনার অধিকাংশ শঙ্কা ও আশঙ্কার বিষয়গুলো আর বাস্তবে ঘটেনি। নিশ্চিত হতে পারবেন, বাস্তবতার চেয়ে মানুষের মনের অযাচিত জল্পনা-কল্পনা ও শঙ্কা-আশঙ্কার পরিমাণই বেশি।

৬. মহান বীরপুরুষদের জীবনচরিত অধ্যয়ন করুন। কীভাবে তাঁরা জীবনের চরম বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছেন! কী সফলভাবে শত বাধা-বিপত্তি মোকাবেলা করেছেন। ভয় ও আশঙ্কা জয় করে দুর্বার গতিতে আগামীর পথে অগ্রসর হয়েছেন। বিষয়গুলো গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করুন। তাঁদের জীবনদর্শন অবলম্বন করে জীবনাদর্শের অনুসরণ করুন। এ ক্ষেত্রে আপনার জন্য শ্রেষ্ঠ আদর্শ হলেন মুহাম্মদ বিন আব্দুল্লাহ, রাসূলুল্লাহ ﷺ।

৭. ভয় ও শঙ্কার মুহূর্তে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে একাকিত্ব বরণ করে নিবেন না। দীর্ঘ অবসর যাপনে প্রবৃত্ত হবেন না, তাহলে নানা শঙ্কা ও আশঙ্কা আপনার ওপর প্রবলভাবে জেঁকে বসবে। তার চেয়ে আপনি বরং অন্যদের সাথে সাক্ষাৎ ও আলাপ-আলোচনায় ব্যস্ত থাকুন। শিশু-বাচ্চাদের সাথে হাস্য-রসিকতায় মেতে উঠুন। একাকিত্বের ঘেরাটোপ থেকে বেরিয়ে জনহিতকর ও কল্যাণমূলক উদ্যোগ-আয়োজনে অংশগ্রহণ করুন। জীবনের চরম বাস্তবতা ও বাধাবিপত্তির মোকাবিলা করতে শিখুন।

৮. লোকদের সাথে সামাজিক সম্পর্কগুলোকে পরিমার্জিত করুন। নিরাশাবাদী ও নেতিবাচক মানসিকতার লোকদের সঙ্গ ত্যাগ করুন। তাদের সঙ্গ আপনাকে সংশয়প্রবণতার দিকে ঠেলে দিবে। সাহসী, আশাবাদী, ইতিবাচক ও নীতিবান লোকদের সাথে ওঠাবসা করুন। তাদের সৎসঙ্গ আপনাকে সাহস যোগাবে এবং আশাবাদী করে তুলবে।

৯. নিজের জন্য উপযুক্ত কোনো ক্রীড়াদলে যোগদান করুন। খেলাধুলা ও আনন্দ-বিনোদনে নিজেকে উচ্ছল-প্রাণবন্ত রাখুন। এমন একটি খেলা ও প্রশিক্ষণ বেছে নিন যা আপনার মনে সাহস সঞ্চার করবে। আপনার মানসিকতাকে বলিষ্ঠ করে তুলবে। যেমন: বক্সিং, পর্বতারোহণ, ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতা, সাঁতার ইত্যাদি।

১০. শয়তানের প্ররোচনা ওয়াসওয়াসা থেকে আল্লাহর আশ্রয় গ্রহণ করুন। মনের যাবতীয় ভয়-শঙ্কা ও জল্পনা-কল্পনা দূর হয়ে যাবে। মনে রাখুন, মানসিক ভয়-ভীতির পেছনে শয়তানের কুমন্ত্রণা মূল ক্রীড়নক। আপনি যদি সফলভাবে এর মোকাবেলা করতে পারেন, তা থেকে নিজেকে মুক্ত রাখতে পারেন তাহলে আর কোনো ভয় নেই। ভয় করবেন একমাত্র আল্লাহকে। পবিত্র কুরআনের দিকনির্দেশনা মেনে চলুন:
إِنَّمَا ذَلِكُمُ الشَّيْطَنُ يُخَوِّفُ أَوْلِيَاءَهُ ۖ فَلَا تَخَافُوهُمْ وَخَافُونِ إِنْ كُنتُمْ مُؤْمِنِينَ﴾ [آل عمران: ١٧٥]
অর্থ: 'প্রকৃতপক্ষে সে তো শয়তান, যে তার বন্ধুদের ভয় দেখায়। সুতরাং তোমরা যদি মুমিন হয়ে থাক, তবে তাদেরকে ভয় করো না। বরং কেবল আমাকেই ভয় করো।' (আলে-ইমরান, ৩: ১৭৫)

১১. ভয়মুক্ত থাকার জন্য আপনাকে দু'টি পন্থা বাতলে দিচ্ছি। প্রথমত, নিজের চেষ্টা ও সাধ্যানুযায়ী যাবতীয় বৈধ উপায় অবলম্বন করুন। সামর্থ্যের সবটুকু বিলিয়ে দিয়ে কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে এগিয়ে যান। দ্বিতীয়ত, আল্লাহ তা'আলার ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস রেখে আপনার যাবতীয় বিষয় তাঁর যিম্মায় ন্যস্ত করুন। আপন রবের প্রতি সুধারণা পোষণ করুন। মনে রাখবেন, গোটা জগতের যাবতীয় বিষয় তাঁর একক ইচ্ছা ও নির্দেশে পরিচালিত হয়। তাঁর হাতেই সবকিছুর চাবিকাঠি।

১২. বাল্যকাল থেকেই সন্তানদের সুস্থ মানবীয় মূল্যবোধের ওপর গড়ে তুলতে হবে। কঠোর ও রূঢ় শাস্তি প্রয়োগ করা, ভয় দেখানো, ভীতিকর ভিডিও বা চিত্র উপস্থাপন করা ইত্যাদির কোনোটিই শিশুদের ক্ষেত্রে বাঞ্ছনীয় নয়। ভীরুতা-কাপুরুষতা ও ভয়-সংশয় থেকে দূরে রেখে সন্তানদের উদ্দাম সাহসিকতা ও গভীর আত্মবিশ্বাসের ছাঁচে গড়ে তুলতে হবে।

১৩. যতক্ষণ না মনের ভয়-সংশয় দূর হয়ে প্রশান্তি ও প্রফুল্লতা ফিরে আসে, আল্লাহ তা'আলার যিকির ও তাসবীহ-তাহলীল পাঠে মগ্ন থাকুন। প্রতিদিন কুরআন তিলাওয়াতে যত্নবান হোন। মানসিক অস্থিরতা ও ভয় কাটিয়ে ওঠার জন্য এবং আত্মিক স্বস্তি ও প্রশান্তি লাভ করার জন্য আল্লাহর যিকির ও কুরআন তিলাওয়াত হলো শ্রেষ্ঠ উপায়। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন:
﴿الَّا بِذِكْرِ اللَّهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوبُ ﴾ [الرعد: ٢٨]
অর্থ: 'মনে রেখ, কেবল আল্লাহর যিকিরই সেই জিনিস, যা দ্বারা অন্তরে প্রশান্তি লাভ হয়।' (রা'দ, ১৩: ২৮)

১৪. নিয়মিতভাবে সকাল-সন্ধ্যায় মাসনূন দু'আ পাঠ করুন। এ ক্ষেত্রে কোনো প্রকার অবহেলা ও গাফলতি ঠিক নয়। কেননা এ দু'আগুলো আপনার অকল্যাণ প্রতিরোধে মজবুত রক্ষাকবচ। তাতে এমন প্রতিরক্ষাব্যবস্থা নিহিত আছে যা আপনার মন-মানসিকতায় ভয়ের ছাপ পর্যন্ত ফেলতে দিবে না। সকাল-সন্ধ্যায় ফজর ও মাগরিব নামাযের পর বিশেষভাবে এ দু'আটি পাঠ করুন:
«اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْهَمَّ وَالْحَزَنِ، وَالْعَجْزِ وَالْكَسَلِ، وَالْبُخْلِ وَالْجُبْنِ، وَضَلَعِ الدَّيْنِ، وَغَلَبَةِ الرِّجَالِ». (مسند أحمد) ٢١ / ٧٣
অর্থ: 'হে আল্লাহ, দুশ্চিন্তা-অস্থিরতা, দুঃখ-বেদনা, অক্ষমতা ও অলসতা থেকে আমি আপনার কাছে পানাহ চাচ্ছি। পানাহ চাচ্ছি ভীরুতা, কাপুরুষতা ও কৃপণতা থেকে। আরও পানাহ চাচ্ছি ঋণের বোঝা ও নির্যাতন-নিপীড়ন থেকে।'

১৫. মনের যাবতীয় ভয়-সংশয় ছাপিয়ে অপরের কল্যাণে দান-সদকা, সেবা-শুশ্রূষা ও সাহায্য-সহযোগিতায় নিয়োজিত হোন। তাতে যে আত্মিক তৃপ্তি ও মানসিক প্রশান্তি পাবেন তা অনন্য অসামান্য। গুনাহ নাফরমানি ও পাপাচার থেকে বিরত থাকুন। কেননা তা অনেক মানসিক দুশ্চিন্তা ও দুর্ভাবনার কারণ, মানসিক সংকীর্ণতা ও আত্মিক ব্যাধির উপকরণ।

১৬. সৃষ্টির প্রতি কোনো আশা-ভরসা না রেখে স্রষ্টার দান ও প্রতিদানের সুসংবাদ ও প্রতিশ্রুতিতে আশাবাদী হোন। সমস্ত ক্ষতি ও অকল্যাণ প্রতিরোধে এবং সমূহ উপকার ও কল্যাণ লাভে আল্লাহ তা'আলার ওপর ভরসা করুন। তিনিই তো তাকদির ও নিয়তির ফায়সালাকারী। তিনি যা দান করেন তা রদ করার সাধ্য কারো নেই। তিনি যা রদ করেন তা দান করার সাধ্য কারো নেই।

১৭. মনের যাতো জল্পনা-কল্পনা ও ভীতি-সংশয়ের কাছে নিজেকে সঁপে দিবেন না। তাহলে তা আপনার মন-মস্তিষ্কের ওপর প্রবলভাবে জেঁকে বসবে। মানসিক স্বস্তি ও প্রশান্তি নষ্ট করে আপনার জীবনকে অসহনীয় করে তুলবে।

১৮. মনে রাখুন, যে ভয় নৈতিক ও যৌক্তিক, তা আপনার জন্য আসন্ন বিপদের সতর্কবার্তা। ধৈর্য ও স্থৈর্যের সাথে তা মোকাবেলা করার চেষ্টা করুন। ধৈর্যশীলদের জন্য রয়েছে আল-কুরআনের সুসংবাদ:
وَلَنَبْلُوَنَّكُمْ بِشَيْءٍ مِّنَ الْخَوْفِ وَالْجُوعِ وَنَقْصٍ مِّنَ الْأَمْوَالِ وَالْأَنفُسِ وَالثَّمَرَاتِ وَبَشِّরِ الصَّبِرِينَ﴾ [البقرة: ١٥٥]
অর্থ: 'আর দেখ, আমি অতিঅবশ্যই তোমাদের পরীক্ষা করব (কখনো) ভয়-ভীতি দ্বারা, (কখনো) ক্ষুধা দ্বারা এবং (কখনো) জান-মাল ও ফসলহানির মাধ্যমে। যেসব লোক (এরূপ অবস্থায়) সবর ও ধৈর্যের পরিচয় দেয়, তাদেরকে সুসংবাদ প্রদান করুন।' (বাকারা, ২: ১৫৫)

১৯. রাসূল ﷺ যখন কোনো ভয় ও শঙ্কা আঁচ করতেন বেলাল (রা.)-কে বলতেন, 'হে বেলাল, নামায কায়েম করে আমাদের প্রশান্তি দাও।' সুতরাং আপনিও ভয়-ভীতির মোকাবেলায় নামাযের আশ্রয় গ্রহণ করুন। কেননা নামায হলো আপনার চক্ষুশীতলতা, নিরাপত্তা ও শান্তির ঝর্ণাধারা।

২০. শুধু আজকের দিনটির জন্য পরিকল্পনা করুন। বর্তমান অবস্থা ও পরিস্থিতির জন্য নিজেকে প্রস্তুত করুন। অনাকাঙ্ক্ষিত ও অনাগত ভবিষ্যতের কথা ভেবে অজানা আশঙ্কা ও দুশ্চিন্তায় ভুগবেন না। মনে রাখুন, ভয়-ভীতি আপনার কোনো কাজে আসবে না। তা আপনার মৃত্যুকে একটুও বিলম্বিত করতে পারবে না। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন:
﴿وَلِكُلِّ أُمَّةٍ أَجَلٌ فَإِذَا جَاءَ أَجَلُهُمْ لَا يَسْتَأْخِرُونَ سَاعَةً وَلَا يَسْتَقْدِمُونَ﴾ [الأعراف: ٣٤]
অর্থ: 'প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্য এক নির্দিষ্ট সময় আছে। যখন সেই নির্দিষ্ট সময় এসে পড়ে, তখন তারা এক মুহূর্ত তার সামনে বা পেছনে যেতে পারে না।' (আ'রাফ, ৭: ৩৪)

২১. মানসিক ভয়-ভীতির পরিস্থিতিতে আপনার বন্ধুজন ও আত্মীয়-স্বজনের সাহায্য নিন। বিষয়টি নিয়ে তাদের সাথে আলোচনা করুন, যেন তারা আপনার সাহায্যে যথাযথ ভূমিকা পালন করতে পারে। পরিস্থিতি যতই জটিল হোক তাদের সাহায্য গ্রহণে কুণ্ঠিত হবেন না। অন্যথায় অবস্থা আরও জটিল আকার ধারণ করবে। প্রয়োজনে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হোন। তাঁর পরামর্শ মোতাবেক নিজেকে পরিচালিত করুন।

২২. যা করতে ভয় হয়, বারবার তা-ই করার চেষ্টা করুন। বিখ্যাত আমেরিকান সাহিত্যিক রাল্ফ ওয়াল্ডো এমারসন বলেছেন: 'যা করতে ভয় হয়, সর্বদা তা-ই করুন।' আপনার যদি গাড়ি চালাতে ভয় হয় তাহলে গাড়ি চালানোর প্রাক্টিস করুন। অনবরত চেষ্টা-প্রচেষ্টার মাধ্যমে অনেক দুঃসাধ্য সাধন হয়, অনেক ভয় ও শঙ্কার বিষয় অনায়াস হয়ে যায়। ভালোভাবে আয়ত্ত করার পর বারবার গাড়ি চালান। ধীরে ধীরে আপনার ভয় কেটে যাবে।

২৩. ভয় করবেন না। আপন রবের প্রতি সুধারণা পোষণ করুন। সুন্দর আগামীর সুসংবাদ গ্রহণ করুন। আল্লাহ তা'আলা আপনার পরম সহায়। আশা-ভরসা আপনার পাথেয়। সফলতা ও সৌভাগ্য আপনার নিত্যসঙ্গী।

২৪. অযাচিত ভয়-ভীতির পরিণামের কথা চিন্তা করুন। এর কারণে পরিবার ও সমাজে অনেক নেতিবাচক পরিস্থিতির শিকার হতে হবে। অনর্থক শঙ্কা-আশঙ্কা দেখে মানুষ ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে উঠবে। সুতরাং ভীতিপ্রবণ মানসিকতা পরিহার করাই বাঞ্ছনীয়।

২৫. নিজেকে বিশ্বাস করান যে, আপনি সাহসী। বাস্তবে সাহসী ভূমিকা পালন করুন। দ্বিধা-সংশয় ও হীনম্মন্যতা থেকে দূরে থাকুন। কেননা এ স্বভাব দু'টি আপনাকে ভীরু ও আত্মসমাহিত করে ছাড়বে। সাহসিকতার সাথে নিজের এক একটি অধিকার বুঝে নিন। যত বাধা-প্রতিবন্ধকতার শিকার হন-না-কেন, দুঃসাহসিকতার সঙ্গে এগিয়ে যান। নিজের যোগ্যতা ও প্রতিভা বিকাশ করুন।

২৬. আল্লাহ তা'আলা ছাড়া কাউকে ভয় করবেন না। কেননা আল্লাহর ভয় ও তাঁর একত্ববাদের বিশ্বাস আপনার মনে সুদৃঢ় আত্মবিশ্বাস জাগিয়ে তুলবে। আপনার জীবনকে অনাবিল প্রশান্তিতে ভরে দিবে। পক্ষান্তরে গায়রুল্লাহর ভয় সম্মান মর্যাদার স্থানে অসম্মান, সফলতা সৌভাগ্যের স্থলে দুঃখ-দুর্দশা এবং সুখ-সমৃদ্ধির পরিবর্তে দরিদ্রতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সুতরাং এক আল্লাহর ওপর ভরসা করুন। তাঁর ফায়সালার বাইরে কেউ আপনাকে একচুল ক্ষতি করতে পারবে না। পবিত্র কুরআনের বাণী:
﴿إِنَّمَا النَّجْوَى مِنَ الشَّيْطَنِ لِيَحْزُنَ الَّذِينَ آمَنُوا وَلَيْسَ بِضَارِهِمْ شَيْئًا إِلَّا بِإِذْنِ اللَّهِ وَعَلَى اللَّهِ فَلْيَتَوَكَّلِ الْمُؤْمِنُونَ ﴾ [المجادلة: ١٠]
অর্থ: 'এরূপ কানাকাকি হয় শয়তানের প্ররোচনায়, যাতে সে মুমিনদেরকে দুঃখ দিতে পারে। কিন্তু সে আল্লাহর ইচ্ছা ব্যতীত বিন্দুমাত্র ক্ষতি করতে পারে না। মুমিনদের উচিত কেবল আল্লাহরই ওপর ভরসা করা।' (মুজাদালা, ৫৮: ১০)

পরিশিষ্ট:
* যদি মর্যাদা ও গৌরব হৃত হয়, রুখে দাঁড়াও। সর্বজন শ্রদ্ধেয়, সকলের আস্থা ও ভরসার প্রতীকরূপে নিজেকে গড়ে তোল। বকরির নম্রতা ও নমনীয়তা ইহকালে তার কোনো কাজে আসেনি। সিংহের সাহসিকতা সর্বজন ঘৃণিত; কিন্তু তাতেই বা তার কী ক্ষতি? -আয়েয আল কারনী
* বিখ্যাত ইংরেজ কবি উইলিয়াম শেকসপিয়র (১৫৬৪-১৬১৬ খৃষ্টাব্দ) বলেছেন: 'ভীরু-কাপুরুষ ভয় কবলে এক জীবনেই হাজার বার মরে। আর সাহসী বীর মৃত্যুর স্বাদ একবারই গ্রহণ করে।'
* জনৈক দার্শনিক বলেছেন: 'বুলেটের বিকট আওয়াজে ভয় পাওয়ার কারণ নেই। কেননা যে বুলেটের আঘাতে তোমার মৃত্যু হবে তার শব্দ তুমি শুনতেও পাবে না।
* জনৈক দার্শনিক বলেছেন: 'পৃথিবীর সব ভয়েই ভীতির সঞ্চার হয়। একমাত্র আল্লাহর ভয়ে প্রশান্তি লাভ হয়।'
* বিখ্যাত মিশরীয় লেখক নাগীব মাহফুজ (১৯১১-২০০৬ খ্রিষ্টাব্দ) বলেছেন: 'ভয়-ভীতি আপনার মৃত্যুর পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারবে না। কিন্তু জীবন চলার পথে শক্ত প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াবে।'
* 'আমাদের মাঝে কেউ কেউ অন্ধ মাছের মতো। বিশাল সমুদ্রে থেকেও মনে করে, ছোট্ট পাত্রে আটকে আছে। আর আমরা মানবজাতি, ঈমান ও বিশ্বাসের সুবিশাল জগতে আমাদের সৃষ্টি; কিন্তু আমরা নিজেদের ভয়-ভীতি, দুঃখ-বেদনা ও বিরোধিতা বৈরিতার ঘেরাটোপে আটকে রেখেছি।' -আয়েয আল কারনী

টিকাঃ
৩১. মা'আরিজ, ৭০: ১৯
৩২. তাওবাহ, ৯: ৫১

📘 আল হাল্লু জীবন সমস্যার সমাধান > 📄 কৃপণতা

📄 কৃপণতা


আল্লামা আবুল ফারায ইস্পাহানী (রহ.) বলেন: 'কৃপণতা হলো দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে অর্থ ব্যয়ে কুণ্ঠিত হওয়া।'

বিশিষ্ট ভাষাবিদ আবুল আব্বাস ফুযূমী (রহ.) বলেন: 'কৃপণতা হলো আর্থিক দায়-দায়িত্ব পালন থেকে বিরত থাকা।'

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা মানবজাতিকে এবং হাদীস শরীফে রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর উম্মতকে কৃপণতা থেকে সতর্ক করেছেন। কৃপণতা হলো একটি জঘন্য স্বভাবদোষ ও চারিত্রিক ভ্রষ্টতা। শরীয়তের দৃষ্টিতে তা ঘৃণিত স্বভাব। কেননা তা ব্যক্তিকে পরোপকার ও পরার্থপরতা ছেড়ে আত্মপরায়ণতা ও স্বার্থপরতায় প্রলুব্ধ করে। অন্যদের যাবতীয় অধিকার থেকে বঞ্চিত করে অর্থ-বিত্ত কুক্ষিগত করতে এবং সুযোগ-সুবিধা বাগিয়ে নিতে প্ররোচিত করে।

কৃপণতার কারণে ব্যক্তির কপালে শুধু দুর্নাম ও নিন্দাই জোটে। এমনকি মৃত্যুর পরও এ দুর্নাম বয়ে বেড়াতে হয়। কৃপণতার মূল কারণ হলো সম্পদলিপ্সা ও জাগতিক সুযোগ-সুবিধা ভোগের উদগ্র বাসনা। ফলে কৃপণ মনে করে, সে যদি অন্যের কল্যাণে যতসামান্যও ব্যয় করতে থাকে তাহলে এতে সে একদিন নিঃস্ব হতদরিদ্রে পরিণত হবে।

সে মনে করে, টাকা ছাড়া কিছুই হয় না অর্থবিত্তই হলো যাবতীয় বিষয়ের একমাত্র উৎস ও নিয়ন্ত্রক। ফলে সে অর্থোপার্জনে যতটা তৎপর, অর্থসঞ্চয়ে তারচেয়ে দ্বিগুণ তৎপর। পর্যায়ক্রমে সে হয়ে উঠে অর্থ-সম্পদের অনুগত দাসানুদাস। অর্থবিত্ত তার একমাত্র কর্তৃত্ববান মনিব।

সুধি সমাজে এটা সর্বজনস্বীকৃত যে, অনুগত সেবক হিসেবে সম্পদ যতোটা উৎকৃষ্ট কর্তৃত্ববান মনিব হিসেবে ততটা নিষ্ঠুর নিকৃষ্ট। সুতরাং স্বয়ং ব্যক্তি যদি তার অর্থবিত্তের নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, যথাযথ খাতে ব্যয় করতে পারে তাহলে সে মহান মনিব। কিন্তু যদি সে সম্পদের অনুগত দাসে পরিণত হয় তাহলে তার মতো হতভাগা আর কে আছে!

ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ জীবনে কৃপণতা ও ব্যয়কুণ্ঠতা একটি মারাত্মক ব্যাধি। বিশেষভাবে সামাজিক জীবনে তা এক জটিল সমস্যা। এর জের ধরে বহু অনাকাঙ্ক্ষিত পরিবেশ-পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। এর থেকে বাঁচার উপায় কী? এর সঠিক সমাধান কী?

সমাধান:
১. কৃপণতা সম্পর্কে কুরআন-সুন্নাহয় যে সতর্কবাণী ও নিষেধাজ্ঞা এসেছে, সে সম্পর্কে জানুন। আপনার মধ্যে যে কৃপণতা দেখা দিবে, তার ক্ষতিকর দিকগুলোর কথা চিন্তা করুন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলার বাণী স্মরণ রাখুন:

وَمَنْ يَبْخَلُ فَإِنَّمَا يَبْخَلُ عَنْ نَّفْسِهِ وَاللَّهُ الْغَنِيُّ وَا نُتُمُ الْفُقَرَاء [محمد: ۳৮]

অর্থ: 'আর যে-কেউ কার্পণ্য করে, সে তো কার্পণ্য করে নিজে নিজেরই প্রতি। আল্লাহ অভাবমুক্ত এবং তোমরা অভাবগ্রস্ত।' (মুহাম্মাদ, ৪৭: ৩৮)

২. কখনো কি ভেবেছেন, যে সম্পদ আঁকড়ে ধরে রাখতে চাইছেন তার শেষ পরিণতি কী? এখন যে দান-সদকা করছেন না, যাকাত আদায় করছেন না, কাল কিয়ামতের দিন যখন আপন রবের সামনে দাঁড়াবেন, কী জবাব দিবেন? যারা সম্পদলিপ্সা ও অর্থবিত্ত সঞ্চয়ে আকণ্ঠ ডুবে আছে, কিয়ামতের দিন তাদের আক্ষেপ-অনুতাপের কথা স্মরণ করুন। সীমাহীন অনুতাপের জ্বালায় তারা বলবে (পবিত্র কুরআনের ভাষায়):

مَا اغْنَى عَنِّي مَالِيَهُ * هَلَكَ عَنِّي سُلْطَنِيَهُ﴾ [الحاقة: ২৯, ২৮]

অর্থ: 'আমার অর্থ-সম্পদ আমার কোনো কাজে আসল না। আমার থেকে আমার সব ক্ষমতা লুপ্ত হয়ে গেল।' (আল-হাক্কা, ৬৯: ২৮-২৯)

৩. বাস্তব সত্য উপলব্ধি করার চেষ্টা করুন। যে অর্থ-সম্পদ পুঞ্জীভূত করে রাখতে চাইছেন মৃত্যুর পর তার কানাকড়িও কবরে নিয়ে যেতে পারবেন না। এগুলো সবই আপনাকে ত্যাগ করে অন্যের মালিকানাধীন হয়ে যাবে। তাদের ভোগ্যপণ্যে পরিণত হবে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: يَتْبَعُ المَيِّتَ ثَلَاثُ، فَيَرْجِعُ اثْنَانِ وَيَبْقَى وَاحِدٌ، يَتْبَعُهُ أَهْلُهُ وَمَالُهُ وَعَمَلُهُ، فَيَرْجِعُ أَهْلُهُ وَمَالُهُ وَيَبْقَى عَمَلُهُ» (سنن الترمذي (٥٩٠/٤)

অর্থ: 'তিনটি বিষয় মৃতের ব্যক্তির সাথে চলবে। এরপর দু'টি ফিরে আসবে আর একটি থেকে যাবে (চিরকালের জন্য)। পরিবার-পরিজন, অর্থ-সম্পদ ও আমল তার সাথে চলবে। পরিবার-পরিজন ও অর্থ-সম্পদ ফিরে আসবে। থেকে যাবে শুধু তার আমল।' (তিরমিজী, ৪/৫৯০)

৪. মনে রাখুন, আপনার বর্তমান মালিকানাধীন সম্পদ কাল ত্যাজ্য সম্পত্তিতে পরিণত হবে। যথারীতি কোনো উত্তরাধিকারী তার বৈধ মালিক বনে যাবে। সে যদি আপনার সুযোগ্য নেক সন্তান হয় তাহলে আপনার কথা স্মরণ করবে। আপনার কল্যাণের দু'আ করবে। কিন্তু সে যদি হয় অবাধ্য অকৃতজ্ঞ তাহলে আপনার কষ্টার্জিত সম্পদ পাপাচার-অনাচারে অপচয় করে বেড়াবে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: يَقُولُ الْعَبْدُ : مَالِي، مَالِي، إِنَّمَا لَهُ مِنْ مَالِهِ ثَلَاثُ: مَا أَكَلَ فَأَفْنَى، أَوْ لَبِسَ فَأَبْلَى، أَوْ أَعْطَى فَاقْتَنَى، وَمَا سِوَى ذَلِكَ فَهُوَ ذَاهِبٌ، وَتَارِكُهُ لِلنَّاسِ» (صحيح مسلم) ٢٢٧٣/٤

অর্থ: 'বান্দা বলবে, 'হায় আমার সম্পদ! হায় আমার সম্পদ!' সম্পদের তিনটা অংশই শুধু তার কাজে আসবে। যা খেয়েছে, তা শেষ হয়ে গেছে। যা পরিধান করেছে, তা জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। আর যা দান করেছে, তা সঞ্চিত হয়ে আছে। এছাড়া বাকি সবই তার হাতছাড়া। এগুলো মানুষের জন্য রেখে যেতে হবে।' (মুসলিম, ৪/২২৭৩)

৫. অতীতের কৃপণ লোকদের অবস্থা লক্ষ করুন, ইতিহাসের পাতায় তারা শুধু নিন্দা-সমালোচনা ও হাস্য-পরিহাসের পাত্র হয়ে আছে। কৃপণতার কারণে তাদের ভাগ্যে জুটেছে শুধু সমালোচনা ও নিন্দা। উদারতার প্রশান্তি ও প্রতিদান তারা কখনো অর্জন করতে পারেনি। বিখ্যাত আরব কবি যুহাইর ইবনে আবূ সালমা (৫২০-৬০৯ খৃষ্টাব্দ) বলেছেন, 'কে আছে, যে সম্পদশালী হয়েও স্বগোত্রের সঙ্গে কৃপণতা করে বেড়াবে, আর সমাজের লোকেরা তার থেকে নির্মুখাপেক্ষী হয়ে ঘৃণাভরে স্মরণ করবে।'

৬. উদার, মহৎপ্রাণ ব্যক্তিদের সংস্পর্শে থাকুন। তাঁদের সান্নিধ্যে মহত্ত্ব ও উদারতার পাঠ গ্রহণ করুন। বদান্যতা ও দানশীলতার চর্চা করুন, যেন তা অভ্যাসে, পর্যায়ক্রমে স্বভাবজাত ও সৃষ্টিগত বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
السَّخِيُّ قَرِيبٌ مِنَ اللهِ قَرِيبٌ مِنَ الْجَنَّةِ قَرِيبٌ مِنَ النَّاسِ بَعِيدُ مِنَ النَّارِ، وَالبَخِيلُ بَعِيدٌ مِنَ اللَّهِ بَعِيدُ مِنَ الْجَنَّةِ بَعِيدٌ مِنَ النَّاسِ قَرِيبٌ مِنَ النَّارِ، وَالْجَاهِلُ السَّخِيُّ أَحَبُّ إِلَى اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ مِنْ عَابِدِ بَخِيل» (سنن الترمذي) ٤ / ٣٤٢

অর্থ: 'উদার-দানশীল আল্লাহ তা'আলার নৈকট্যপ্রাপ্ত। জান্নাতের নিকটবর্তী। লোকসমাজের প্রিয়পাত্র এবং জাহান্নাম থেকে দূরবর্তী। আর কৃপণ, সে তো আল্লাহর রহমত-বঞ্চিত। জান্নাত থেকে দূরে। মানুষের ভালোবাসা বঞ্চিত এবং জাহান্নামের সন্নিকটে। কৃপণ ইবাদতগুযার বান্দার তুলনায় নিরক্ষর দানশীলও আল্লাহ তা'আলার নিকট অধিক প্রিয়।' (তিরমিজী, ৪/৩৪২)

৭. মহান ব্যক্তিত্বের আদর্শ গ্রহণ করুন। উদারতা ও বদান্যতায় যিনি ছিলেন কল্যাণবাহী বায়ুর চেয়েও বেগবান। রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর জীবনে কোনো দিন কাউকে "না" বলে ফিরিয়ে দেননি।
কবি ফারায দাকের ভাষায়: مَا قَالَ لَا قَطُّ إِلَّا فِي تَشَهُدِهِ لَوْلَا التَّشَهُدُ كَانَتْ لَا ؤُهُ نَعَمُ
অর্থ: 'কখনো 'না' শব্দটি মুখে বলেননি। বলেছিলেন শুধু একবার-উম্মতকে একত্ববাদের কালিমা শিক্ষা দিতে গিয়ে। যদি একত্ববাদের এ কালিমা যদি না হতো তাহলে আজীবন তাঁর পবিত্র যবানে 'না' উচ্চারিত হতো না।'

৮. কৃপণতার মতো স্বভাব দোষ থেকে মুক্ত থাকার জন্য হাদীসে বর্ণিত দু'আটি সকাল-সন্ধ্যা পাঠ করুন: «اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ البُخْلِ، وَأَعُوذُ بِكَ مِنَ الْجُبْنِ».
অর্থ: 'হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে কৃপণতা থেকে পানাহ চাই। পানাহ চাই ভীরুতা ও কাপুরুষতা থেকে।' (বুখারী, ৮/৭৯)

৯. মনে রাখুন, কৃপণ ও অপচয়কারী কুরআন-সুন্নাহর দৃষ্টিতে নিন্দিত। আর উদার-দানশীল সম্মানের পাত্র। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: وَالَّذِينَ إِذَا أَنْفَقُوا لَمْ يُسْرِفُوا وَلَمْ يَقْتُرُوا وَكَانَ بَيْنَ ذَلِكَ قَوَامًا [الفرقان: ٦٧]
অর্থ: যারা ব্যয় করার সময়, না করে অপব্যয় এবং না করে কার্পণ্য, বরং তাদের পন্থা হল (বাড়াবাড়ি ও সংকীর্ণতার) মধ্যবর্তী ভারসাম্যমান পন্থা।' (ফুরকান, ২৫: ৬৭) সুতরাং কৃপণতা ও অপচয়-প্রবণতা বর্জন করে অর্থব্যয়ে মধ্যপন্থা অবলম্বন করুন। অর্থব্যয়ে এটাই পবিত্র কুরআনের নির্দেশিত পথ।

১০. কৃপণতা বহু ধরনের, বহু কিসিমের। কেউ তার জ্ঞান-বিদ্যার কার্পণ্য করে। কেউ তার অর্থবিত্তে ও স্বভাব-চরিত্রে কার্পণ্য করে। এ সমস্ত ক্ষেত্রে উদারতা ও মহানুভবতা বাঞ্ছনীয়। চেষ্টা করুন স্বভাব-চরিত্র থেকে কৃপণতা ঝেড়ে ফেলার। তাহলে মহান সত্তার প্রতিবেশিত্ব লাভ করতে পারবেন। হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, আল্লাহ তা'আলা জান্নাত সৃষ্টির পর তাকে কিছু বলার আদেশ করলেন। জান্নাত বলল: 'মুমিন বান্দাগণ সুনিশ্চিত সফল হবে।' আল্লাহ তা'আলা বললেন: 'আমার সম্মান ও মর্যাদার কসম! জান্নাতে কৃপণ আমার কাছেও আসতে পারবে না।'

১১. মনে রাখুন, উদারতা ও বদান্যতা হলো জাহান্নাম থেকে মুক্তির উপায়। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: قَالَ عَدِيٌّ: سَمِعْتُ النَّبِيَّ ﷺ يَقُولُ: «اتَّقُوا النَّارَ وَلَوْ بِشِقِّ تَمْرَةٍ». (صحيح البخاري) ٢ /١١٠
অর্থ: আদী ইবনে হাতেম (রা.) বলেন, আমি রাসূল ﷺ কে বলতে শুনেছি, 'এক টুকরা খেজুর সদকা করে হলেও জাহান্নাম থেকে বাঁচার চেষ্টা করো।' (বুখারী, ২/১১০)

১২. অল্প অল্প করে হলেও দানশীলতার চর্চা করুন। প্রতিদিন দরিদ্র-দুঃস্থদের দান করার জন্য মানিব্যাগে কিছু টাকা আলাদা করে রাখুন। এভাবে দান-সদকা আপনার অভ্যাসে পরিণত হবে। দানশীলতা আপনার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য হয়ে উঠবে।

পরিশিষ্ট:
* হাসতে মানা: কৃপণ লোকটি সবেমাত্র দুপুরের খাবার খাওয়ার জন্য খুব যত্ন করে ভুনা করা আস্ত ছাগলছানাটি খাবার টেবিলে পরিবেশন করছে। ঠিক তখনই তুফাইলি এসে হাজির। এমন উপাদেয় খাবারের বন্দোবস্ত দেখে তার তর সইল না। এমন গোগ্রাসে খেতে লাগল যে, কৃপণ লোকটি বলেই ফেলল: 'এমন খাবলে-ছোবলে খাচ্ছ, মনে হচ্ছে ছাগলছানা থেকে প্রতিশোধ নিচ্ছ। এর মা বুঝি তোমাকে শিংয়ের গুঁতায় আহত করেছে?' তুফাইলি বলল: 'জবাইকৃত ভুনা করা ছাগলছানার জন্য তোমারই বা এত দরদ উথলে উঠছে কেন, এর মা বুঝি তোমার ধাত্রীত্ব পালন করেছে?'

* আব্বাসী খেলাফতকালের বিখ্যাত কবি দি'বাল খুযায়ী (৭৬৫-৭৩৫ খৃষ্টাব্দ) এক কৃপণ যুবক সম্পর্কে বলেছেন:
إِنَّ هذا الفَتَى يَصُونُ رغيفاً ما إليه لناظر مِن سَبِيل
هُوَ فِي سُفْرَتَينِ مِنْ أَدَمِ الطائف في سلتين في منديل
خُتِمَتْ كُلُّ سَلَّةٍ بِحَدِيدٍ وسيور قددن من جلد فيل
في جراب، في جوف تابوت موسى والمفاتيح عند ميكائيل

অর্থ: 'এ যুবক একটা রুটি সংরক্ষণ করেছে এমনভাবে যে, কেউ সেটার দিকে নজর দেওয়ার কিংবা দেখে ফেলার উপায় নেই। রুটিটাকে তায়েফের শক্ত চামড়ার তৈরি দু'টি দস্তরে পেঁচিয়ে দু'টি ছোট ঝুড়িতে রেখেছে। ঝুড়ি দু'টি হাতির চামড়ার ফিতা দিয়ে বেঁধে লোহা দিয়ে সিলগালা করে দেওয়া হয়েছে। এরপর তা আরেকটি থলিতে পুরে মূসার সিন্দুকে সংরক্ষণ করা হয়েছে। যে সিন্দুকের চাবি মিকাঈলের কাছে।'

টিকাঃ
৩৩. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো কাউকে "না" বলে ফিরিয়ে দেননি। “না”-এর আরবী হলো لَا। ইসলামের কালিমার শুরুতেই এ لَا শব্দটিই বিদ্যমান। যেমন: لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ مُحَمَّدٌ رَسُولُ اللَّهِ। কবি ফারাযদাক তার কবিতায় রাসূলুল্লাহ -এর উদারতা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন, ইসলামের কালিমার এ لَا যদি না হতো, তাহলে জীবদ্দশায় তিনি কখনো না বলতেন না। (অনুবাদক)
৩৪. এক ব্যক্তির নাম।

📘 আল হাল্লু জীবন সমস্যার সমাধান > 📄 দুঃখ-বেদনা

📄 দুঃখ-বেদনা


অতীতের কষ্টদায়ক স্মৃতি মনে পড়, লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থতা কিংবা প্রিয়জনের অকাল বিচ্ছেদ ইত্যাদি কারণে যে বেদনাদায়ক মানসিক অবস্থার সৃষ্টি হয় তা-ই দুঃখ-বেদনা, যা মানসিক অস্থিরতা ও দুর্দশার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। পর্যায়ক্রমে তা ব্যক্তির জীবনকে অসহনীয় দুর্বিষহ করে তোলে।

দুঃখ-কষ্ট হলো একখণ্ড কালো মেঘ, ঘুটঘুটে অন্ধকার রাত। তা এমন কষ্টদায়ক পরিস্থিতি, যা জীবনের গতিময়তা স্থবির করে দেয়। দুঃখ-কষ্টের কবলে মানুষ নেগেটিভ চিন্তা-ভাবনার শিকার হয়। তার মনে নেতিবাচক মানসিকতা বাসা বাঁধতে শুরু করে। আশা-আকাঙ্ক্ষা ও সফলতার কথা সে কল্পনাও করতে পারে না। জীবনের যত সৌন্দর্য, স্বাদ-আহ্লাদ ও হাসি-আনন্দ সবই বিস্বাদ লাগে। উচ্ছল প্রাণবন্ত জীবনের স্বপ্নিল পথ হারিয়ে ফেলে। এভাবে এক পর্যায়ে সে ডিপ্রেশন ও হতাশার মতো জটিল মানসিক ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে পড়ে। এমন জটিল ব্যাধি থেকে বাঁচার উপায় কী? দুঃখ-বেদনা কাটিয়ে ওঠার পথ কী?

সমাধান:
১. নিজেকে একবার জিজ্ঞেস করে দেখুন, দুঃখ-কষ্ট কি আপনার হারানো বস্তু পুনরুদ্ধার করতে পেরেছে? আপনার আর্থিক ক্ষতি পুষিয়ে দিতে পেরেছে? পেরেছে কি সুস্বাস্থ্য ফিরিয়ে দিতে? অকাল মৃত্যুর হাত থেকে আপনজনকে রক্ষা করতে? সুতরাং দুঃখ-কষ্টে জড়িয়ে থেকে কোনো লাভ নেই। অযথা মনের মধ্যে পুষে রাখার কোনো অর্থ নেই।

২. অতীতের যত দুঃখ-বেদনা ও কষ্ট-জ্বালা-সব কিছু ভুলে যান, বিস্মৃতির গহ্বরে ছুড়ে ফেলুন এবং জ্বলজ্বলে বর্তমানের কর্তব্যকে কাজে পরিণত করুন। তাতেই আপনার সুখ ও সফলতা নিহিত।

৩. ইবাদত ও যিকির-আযকার মানুষের জীবনে অসামান্য প্রশান্তি এনে দেয়। গভীর ধ্যানমগ্ন হয়ে আল্লাহর যিকির করা, নামায কায়েম করা, তাঁর প্রশংসা করা ও তাঁরই কাছে সাহায্য প্রার্থনা করা মানুষকে সব দুঃখ ভুলিয়ে দিতে পারে। তাই নিয়মিত সালাত কায়েম করুন। আল্লাহ তা'আলার কাছে প্রার্থনা করুন। ধৈর্যের সাথে তাঁর প্রতিদানের অপেক্ষা করুন। দেখবেন, একটু একটু করে মনের দুঃখ বেদনাগুলো মুছে যাচ্ছে।

৪. নামায হলো যাবতীয় বিপদ-আপদ ও দুঃখ-কষ্টের নিরাময়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখনই কোনো বিষয়ে শঙ্কিত হতেন, নামাযে মশগুল হতেন। বলতেন:
«يَا بِلَالُ، أَرِحْنَا بِالصَّلَاةِ»
অর্থ: 'হে বেলাল! নামায কায়েম করে আমাদের প্রশান্তি দাও।' (মুসনাদে আহমাদ, ৩৮/১৭৮)
তাই দুঃখ-কষ্টের মুহূর্তে নামাযই হোক আপনার প্রথম আশ্রয়। সিজদারত হয়ে এ দু'আটি পাঠ করুন:
«اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْهَمِّ وَالْحَزَنِ».
অর্থ: 'হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে বিষণ্ণতা ও দুঃখ-কষ্ট থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি।'

৫. পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন:
﴿أَلَا بِذِكْرِ اللَّهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوبُ﴾ [الرعد: ٢٨]
অর্থ: 'স্মরণ রেখ, কেবল আল্লাহর যিকিরই সেই জিনিস, যা দ্বারা অন্তরে প্রশান্তি লাভ হয়।' (সূরা রা'দ, ১৩: ২৮)

তাই বেশি বেশি আল্লাহর যিকির করুন। আত্মিক প্রশান্তি অর্জিত হবে। জীবন উচ্ছলতা ও প্রাণ ফিরে পাবে। পবিত্র কুরআনে বর্ণিত হযরত ইউনুস (আ.)-এর বিপদমুক্তির দু'আটি পাঠ করুন। পবিত্র কুরআনের ভাষায়:
لا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ سُبْحَنَكَ إِنِّي كُنْتُ مِنَ الظَّلِمِينَ
অর্থ: '(হে আল্লাহ!) তুমি ছাড়া কোন মাবুদ নেই। তুমি সকল ত্রুটি থেকে পবিত্র। নিশ্চয়ই আমি অপরাধী।' (আম্বিয়া, ২১:৮৭) দুঃখ-দুর্দশা ও বিপদ-আপদ থেকে মুক্তি লাভের জন্য এ দু'আটি হলো ঐশী দিকনির্দেশনা।

৬. আল্লাহ তা'আলা আপনাকে যে নিয়ামত দান করেছেন, তাতেই তুষ্ট থাকুন। মানুষের দুঃখী হওয়ার প্রধান একটি কারণ হলো, সে যা পেয়েছে তাতে তৃপ্ত ও কৃতজ্ঞ না হওয়া। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: لَيْسَ الغِنَى عَنْ كَثْرَةِ العَرَضِ، وَلَكِنَّ الغِنَى غِنَى النَّفْسِ (صحيح البخاري ٩٥/٨)
অর্থ: 'অঢেল ধন-দৌলত ও সহায়-সম্পত্তিই প্রকৃত সচ্ছলতা নয়। মনের সচ্ছলতাই প্রকৃত সচ্ছলতা।' (বুখারী, ৮/৯৫) এ জীবনে যা পেয়েছেন, তাতেই তুষ্ট ও কৃতজ্ঞ হোন। এর মধ্যেই আপনার প্রকৃত সচ্ছলতা নিহিত আছে।

৭. যে নায-নিয়ামতপ্রাপ্ত হয়েছেন, যে সৌভাগ্য ও সফলতা অর্জন করতে পেরেছেন তার একটা তালিকা করুন। আর জীবনে কদাচিত কিঞ্চিৎ যে ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন তারও একটা তালিকা করুন। দেখবেন, দুঃখ-কষ্টের তুলনায় সুখানন্দের পরিমাণ বহুগুণ বেশি। চিন্তা করলে এমন অনেক বিষয় খুঁজে পাবেন যা আপনার আছে, অন্যদের নেই। এর জন্য সৃষ্টিকর্তার কাছে কৃতজ্ঞ হোন। কৃতজ্ঞতা স্বীকার করার কারণে অনেক মানুষ বলার মতো কিছু না থাকার পরও পরম সুখী। আবার অকৃতজ্ঞ হওয়ার কারণে একটা শ্রেণি সব রকম পার্থিব আরাম-আয়েশ ভোগ করেও অতৃপ্ত অসুখী।

৮. হতাশা ও নিরাশাবাদী লোকদের সঙ্গ ত্যাগ করুন। তারা শুধু আপনাকে দুঃখ-দুর্দশার কথাই শোনাবে। ব্যর্থতা ও হতাশার কথা বলে আপনার কান ভারি করে তুলবে। তাদের সঙ্গদোষে আপনি নিজের অজান্তেই নেতিবাচক মন-মানসিকতায় আক্রান্ত হয়ে পড়বেন। আশাবাদী ও স্বপ্নবান ব্যক্তিদের সান্নিধ্যে থাকুন। তাদের সংস্পর্শ আপনার সফলতা ও সৌভাগ্যের পথ সুগম করবে।
জীবনের সমস্ত হতাশা ও ব্যর্থতার কথা ভুলে যান। এমন সমস্ত কাজে নিয়োজিত থাকুন, যা বর্তমানে ও অদূর ভবিষ্যতে আপনার ও সমাজের সমষ্টির জন্য সুফল বয়ে আনবে। প্রকৃত বিচক্ষণ বুদ্ধিমান তার ক্ষতিকে লাভে এবং নিরাশাকে আশায় রূপান্তরিত করে।

৯. ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনের প্রতিটি অঙ্গনে বিজ্ঞ ও বিদগ্ধজনদের এড়িয়ে একক সিদ্ধান্তে পরিচালিত হবেন না। আপনার ব্যক্তিগত জানা-শোনা যত বেশিই হোক-না-কেন, অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার যত সমৃদ্ধই হোক-না-কেন, একক সিন্ধান্ত কখনো কখনো আপনাকে ভুল পথেও ধাবিত করতে পারে। তাই জীবনের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়গুলোতে পরিবার-পরিজন ও বিজ্ঞ-অভিজ্ঞজনদের সাথে আলোচনাসাপেক্ষে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করুন। তাদের পক্ষ থেকে কখনো কখনো এমন সমাধান ও দিকনির্দেশনা পাবেন যা আপনাকে ব্যর্থতার কবল থেকে উদ্ধার করে সফলতার পথে পরিচালিত করবে।

১০. ঘড়ির কাঁটার দিকে লক্ষ করুন, কীভাবে অনবরত আবর্তিত হচ্ছে; চন্দ্র-সূর্য, গ্রহ-নক্ষত্র কীভাবে বিরামহীন প্রদক্ষিণ করছে। পৃথিবীর কোনো দুর্যোগ-দুর্বিপাক এগুলোর গতিময়তায় ব্যাঘাত ঘটাতে পারেনি। মানুষের জীবনও তাই-কোনো বিপদ-আপদ তার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না। তবে যে সাময়িক বিপত্তি ঘটে তার আড়ালে মূলত আসন্ন সুখ ও সৌভাগ্যের সম্ভাবনার হাতছানি থাকে। তাই মেঘের তর্জন-গর্জনে বিচলিত না হয়ে তার আড়ালের সূর্যের হাসি দেখে আশাবাদী হোন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলার সুসংবাদ: ﴿فَإِنَّ مَعَ الْعُسْرِ يُসْرًا إِنَّ مَعَ الْعُسْرِ يُসْرًا﴾ [الشرح: ٥، ٦]
অর্থ: 'প্রকৃতপক্ষে কষ্টের সাথে স্বস্তি থাকে। নিশ্চয়ই কষ্টের সাথে স্বস্তি থাকে।' (ইনশিরাহ্, ৯৪: ৫, ৬)
আপনার কি মনে হয়, জীবনের একটি বাধা, একটি ব্যর্থতা দু'টি সফলতা ও সৌভাগ্যের সমান হতে পারে? কখনই না। তাহলে দুঃখ যন্ত্রণার ঘেরাটোপে আটকে না থেকে অপার সম্ভাবনা ও উন্মুক্ত সফলতার পানে এগিয়ে চলুন।

১১. বিবেক-বুদ্ধির বিচারে ও ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেও দুঃখক্লিষ্ট হওয়া কাম্য নয়। কেননা তা আপনাকে জীবনের কর্মমুখরতা ও ইবাদত-মগ্নতার ক্ষেত্রে দুর্বল করে ফেলবে। জীবনের ঈপ্সিত সৌন্দর্য নষ্ট করে সহজাত জীবনযাপনের নির্মলতা ও স্বচ্ছতাকে কর্দমাক্ত করে ছাড়বে।

১২. জীবনে যা-কিছু হারিয়ে যাক, যা-কিছু হাত ছাড়া হয়ে যাক, মনে করবেন, এই না পাওয়ার মাঝেই আপনার সুখ-সৌভাগ্য নিহিত। বিশ্বাস রাখবেন, যা কিছু হয়েছে আল্লাহর ফায়সালায় হয়েছে। তাঁর ফায়সালাই আপনার জন্য মঙ্গলজনক।

১৩. প্রশান্ত চিত্ত হোন। একান্ত নিবিষ্টচিত্তে সুমধুর কণ্ঠে কুরআন তিলাওয়াত শ্রবণ করুন। হৃদয়-মন অভাবিত আনন্দ ও অপার্থিব প্রশান্তিতে ভরে উঠবে। পবিত্র কুরআনে মহান রবের বাণী:
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ إِذَا ذُكِرَ اللهُ وَجِلَتْ قُلُوبُهُمْ وَإِذَا تُلِيَتْ عَلَيْهِمْ آيَتُهُ زَادَتْهُمْ إِيمَانًا وَعَلَى رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُونَ﴾ [الأنفال: ٢]
অর্থ: 'মুমিন তো তারাই, যাদের সামনে আল্লাহকে স্মরণ করা হলে তাদের হৃদয় ভীত হয়, যখন তাদের সামনে তাঁর আয়াতসমূহ পড়া হয়, তখন তা তাঁদের ঈমানের উন্নতি সাধন করে এবং তাঁরা তাঁদের প্রতিপালকের উপর ভরসা করে।' (আনফাল, ৮: ২)

১৪. যখন দুঃখ-কষ্টের ঘেরাটোপে আটকে পড়ে সুখ-শান্তি হাতড়ে ফিরবেন, দুশ্চিন্তা ও বিষণ্ণতায় আক্রান্ত হয়ে এক চিলতে হাসি আনন্দের জন্য অধীর পড়বেন, তখন 'ইস্তেগফার' হলো আপনার পরম আশ্রয়। 'ইস্তেগফার' হলো মুক্তির পথ। শান্তি ও নিরাপত্তার সোপান। যে ব্যক্তি এ পথ অবলম্বন করবে, আল্লাহ তা'আলা তার দুঃখ-কষ্ট দূর করে দিবেন। জীবনে পরম সৌভাগ্য ও শান্তি দান করবেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর উম্মতকে এ সুসংবাদই দান করেছেন:
مَنْ أَكْثَرَ مِنَ الاسْتِغْفَارِ، جَعَلَ اللهُ لَهُ مِنْ كُلِّ هَمَّ فَرَجًا، وَمِنْ كُلِّ ضِيقٍ مَخْرَجًا، وَرَزَقَهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ
অর্থ: 'যে ব্যক্তি বেশি বেশি ইস্তেগফার করবে, আল্লাহ তার জন্য সকল দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তির পথ খুলে দিবেন। সমস্ত সংকট কাটিয়ে ওঠার পন্থা বাতলে দিবেন। এমন উপায়ে রিযিক দান করেন, যা সে কল্পনাও করতে পারবে না।' (মুসনাদে আহমাদ: ৪/১০৪)

১৫. পবিত্র কুরআনে সরল পথের দিকনির্দেশনা:
اهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمِ﴾ [الفاتحة: ٥]
অর্থ: 'আমাদের সরল পথে পরিচালিত কর।' (ফাতিহা, ১: ৪) ইহকালীন জীবনে সুখ ও প্রশান্তি লাভের প্রধান উপায় হলো 'তাকওয়া' অবলম্বন করা, সরল পথে চলা। সুতরাং যেখানেই থাকুন, যে অবস্থাতেই থাকুন, গুনাহ ও নাফরমানি বর্জন করে তাকওয়া (আল্লাহভীতি) অর্জন করে সরল পথে অবিচল থাকুন। দুঃখ-বেদনা ও যাবতীয় কষ্ট যাতনা থেকে এটাই পরম মুক্তির পথ। পবিত্র কুরআনের বাণী:
وَمَنْ يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَلْ لَهُ مَخْرَجًا ﴾ [الطلاق : ٢]
অর্থ: 'যে কেউ আল্লাহকে ভয় করবে, আল্লাহ তার জন্য (সমস্যা থেকে উদ্ধার পাওয়ার) কোন না কোন পথ বের করে দিবেন।' (তালাক, ৬৫: ২)

১৬. আপনি শুধু আজকের কথা ভাবুন। আজকের দায়িত্ব-কর্তব্য সম্পর্কে চিন্তা-ফিকির করুন। অনাগত আগামীর কথা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলুন। বর্তমানের দায়-দায়িত্বগুলো নিষ্ঠার সাথে সুষ্ঠুভাবে পালন করুন। ভবিষ্যতে আল্লাহ তা'আলা আপনার সহায় হবেন।

১৭. জীবন নিয়ে আপনার সুন্দর গোছালো পরিকল্পনা। তা সত্ত্বেও সময়ে সময়ে নানা প্রতিবন্ধকতা ও প্রতিকূলতার শিকার হচ্ছেন। তাহলে জেনে রাখুন, বিপদ-আপদ আপনার অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার সমৃদ্ধ করবে, পাপ মোচন করবে এবং আল্লাহ তা'আলার নিকট আপনার মর্যাদা বৃদ্ধির মাধ্যম হবে। বিদগ্ধ পণ্ডিত আবুল আলা আল মাআররির কথা স্মরণ করুন: তিনি ছিলেন অন্ধ। তা সত্ত্বেও তিনি ছিলেন একজন আরব দার্শনিক কবি ও লেখক। জীবনের সমস্ত অর্জিত জ্ঞান ও পাণ্ডিত্য অন্যদের হাতে লিখিয়ে নিয়েছেন। আল্লামা ইবনুল আসীর (রহ.) পঙ্গু হয়েও 'জামেউল উসূল' ও 'আন-নিহায়া'-এর মতো বিশাল গ্রন্থ রচনা করেছেন।

১৮. দুনিয়াতে আল্লাহ তা'আলার যিকিরকারীর মতো অন্যান্য আমলকারী ও ধর্মীয় জ্ঞানের চর্চাকারীগণও প্রধান মুখ্য ও প্রশংসিত। আর সমস্ত কিছুই নগণ্য ও নিন্দিত। সুতরাং নগণ্য বিষয়ে মন খারাপ করা অনুচিত। চিন্তা ও মননশীলতায় মহৎ উদার হোন। নচেৎ অতিসামান্য তুচ্ছ বিষয়ে ভেঙে পড়বেন। সাহসিকতা ও কর্মোদ্দীপনা হারিয়ে ফেলবেন। বিখ্যাত আরব কবি আবূ তায়্যেব মুতানাব্বি (৩০৩-৩৫৪ হি.) বলেছেন: وَتَعْظُمُ فِي عَينِ الصَغيرِ صِغَارُها وَتَصْغُرُ فِي عَينِ العَظيمِ العَظَائِمُ
অর্থ: 'ছোটদের দৃষ্টিতে নিতান্ত ক্ষুদ্র বিষয়গুলোও গুরুতর জটিল আকার ধারণ করে। প্রকৃত অর্থেই যারা মহৎ উদার, অনেক জটিল গুরুতর বিষয়ও তাঁরা সহজেই সমাধান করে ফেলেন।'

১৯. রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর প্রতি বেশি বেশি দুরূদ পাঠ করুন। কেননা তা দুশ্চিন্তা ও বিষণ্ণতা দূর করে স্থিরতা ও প্রশান্তি লাভের কার্যকর উপায়। দুরূদ পাঠের প্রতিদান সম্পর্কে হাদীসে বর্ণিত হয়েছে: عَنْ أَبَى بْنِ كَعْبٍ ... قَالَ أُبَيُّ قُلْتُ يَا رَسُولَ اللهِ، إِنِّي أُكْثِرُ الصَّلاةَ عَلَيْكَ فَكَمْ أَجْعَلُ لَكَ مِنْ صَلَاتِي فَقَالَ مَا شِئْتَ ". قَالَ: قُلْتُ: الرُّبُعَ - قَالَ: مَا شِئْتَ فَإِنْ زِدْتَ فَهُوَ خَيْرٌ لَكَ". قُلْتُ: النَّصْفَ. قَالَ: مَا شِئْتَ فَإِنْ زِدْتَ فَهُوَ خَيْرٌ لَكَ". قَالَ قُلْتُ فَالثُّلُثَيْنِ. قَالَ: مَا شِئْتَ فَإِنْ زِدْتَ فَهُوَ خَيْرٌ لَكَ. قُلْتُ أَجْعَلُ لَكَ صَلَاتِي كُلَّهَا. قَالَ: إِذًا تُكْفَى هَمَّكَ وَيُغْفَرُ لَكَ ذَنْبُكَ.
অর্থ: উবাই ইবনে কা'ব (রা.) থেকে বর্ণিত,... তিনি বলেন, আমি বললাম: 'হে আল্লাহর রাসূল! আমি তো খুব অধিক হারে আপনার প্রতি দরুদ পাঠ করি। আপনার প্রতি দরুদ পাঠের জন্য আমি আমার সময়ের কতটুকু খরচ করবো?' তিনি বললেন: 'তুমি যতক্ষণ ইচ্ছা কর।' আমি বললাম: 'এক-চতুর্থাংশ সময়?' তিনি বললেন: 'তুমি যতটুকু ইচ্ছা কর, তবে এর চেয়ে অধিক পরিমাণে পাঠ করতে পারলে এতে তোমারই মঙ্গল হবে।' আমি বললাম: 'তাহলে আমি কি অর্ধেক সময় দরুদ পাঠ করবো?' তিনি বললেন: 'তুমি যতক্ষণ চাও, যদি এর চেয়েও বাড়াতে পারো সেটা তোমার জন্যই কল্যাণকর।' আমি বললাম: 'তাহলে দুই-তৃতীয়াংশ সময় দরুদ পাঠ করবো?' তিনি বললেন: 'তুমি যতক্ষণ ইচ্ছা কর, তবে এর চেয়েও বাড়াতে পারলে তোমারই ভাল।' 'আমি বললাম: 'তাহলে আমার পুরো সময়টাই আপনার দরুদ পাঠে কাটিয়ে দিব?' তিনি বললেন: 'তোমার চিন্তা ও কষ্টের জন্য তা যথেষ্ট হবে এবং তোমার পাপসমূহ ক্ষমা করা হবে।' (তিরমিজী, ৪/৬৩৭)

২০. বিপদে ধৈর্য ধারণ করুন। উত্তম প্রতিদানের প্রত্যাশা করুন। আল্লাহ তা'আলা কিছুতেই আপনার ধৈর্য ও প্রতিদান নষ্ট করবেন না। তিনি নিজ উদারতা ও মহানুভবতার শান অনুযায়ী দান করবেন। হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন:
مَا لِعَبْدِي الْمُؤْمِنِ عِنْدِي جَزَاءُ، إِذَا قَبَضْتُ صَفِيَّهُ مِنْ أَهْلِ الدُّنْيَا ثُمَّ احْتَسَبَهُ، إِلَّا الجَنَّةُ» (صحيح البخاري) ٩٠/٨
অর্থ: 'আমি যখন কোনো মুমিন বান্দার প্রাণপ্রিয়জনকে দুনিয়ার কোল থেকে উঠিয়ে নেই, আর সে উত্তম বিনিময়ের আশায় ধৈর্যধারণ করে, আমার নিকট তার জন্য একটি বিরাট প্রতিদান সুনির্দিষ্ট থাকে। তা হলো জান্নাত।' (বুখারী: ৮/৯০)
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: ﴿سَلَمٌ عَلَيْكُمْ بِمَا صَبَرْتُمْ فَنِعْمَ عُقْبَى الدَّارِ﴾ [الرعد: ٢٤]
অর্থ: 'তোমরা (দুনিয়ায়) যে সবর অবলম্বন করেছিলে, তার প্রতিদানে এখন তোমাদের প্রতি কেবল শান্তিই বর্ষিত হবে এবং (তোমাদের) প্রকৃত নিবাসে এটা তোমাদের উৎকৃষ্ট পরিণাম!' (সূরা রা'দ, ১৩: ২৪)

২১. আপনাকে জীবনের বাস্তবতা মেনে নিয়েই বেঁচে থাকতে হবে। ইহকালীন জীবন অত্যন্ত বিপদসংকুল ও সংকটপূর্ণ। কিন্তু তা সাময়িক, একদিন তা নিঃশেষ হয়ে যাবে। সাময়িক দুঃখ-কষ্ট সহ্য করে আপনাকে পরকালের সীমাহীন শান্তিময় জীবনের জন্য প্রস্তুত হতে হবে। জান্নাত লাভের উপযুক্ত পাথেয় সংগ্রহ করতে হবে।

২২. অন্যায়-অত্যাচারের শিকার হয়ে যদি ন্যায়বিচার না পান তাহলে ব্যথিত হবেন না। মনের মধ্যে দুঃখ-কষ্ট পুষে রাখবেন না। বিচারের পালা এখানেই শেষ নয়। ন্যায়বিচারের পথ চূড়ান্ত রুদ্ধ নয়। রোজ হাশরে আরেকটি মহকুমা কায়েম হবে। বিচার করবেন 'আহকামুল হাকেমীন' মহান আল্লাহ তা'আলা। কারো ওপর একবিন্দু যুলুম করবেন না। তা হবে ঐশী ন্যায়পরায়ণতা ও ন্যায়ানুগতার বিচার। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন:
﴿وَنَضَعُ الْمَوَازِينَ الْقِسْطَ لِيَوْمِ الْقِيمَةِ فَلَا تُظْلَمُ نَفْسٌ شَيْئًا وَإِنْ كَانَ مِثْقَالَ حَبَّةٍ مِّنْ خَرْدَلٍ أَتَيْنَا بِهَا وَكَفَى بِنَا حَسِبِينَ﴾ [الأنبياء: ٤٧]
অর্থ: 'কেয়ামতের দিন আমি এমন তুলাদণ্ড স্থাপন করব, যা পুরোপুরি ন্যায়ানুগ হবে। ফলে কারও প্রতি কোন জুলুম করা হবে না। যদি কোন কর্ম তিল পরিমাণও হয়, তবে তাও আমি উপস্থিত করব। হিসাব গ্রহণের জন্য আমিই যথেষ্ট।' (আম্বিয়া, ২১:৪৭)

২৩. একবার ভেবে দেখুন, জান্নাতে আল্লাহ তা'আলা কত বিপুল সুখ-শান্তির উপকরণ প্রস্তুত করে রেখেছেন। দুঃখ-বেদনা, দুশ্চিন্তা ও বিষণ্ণতা কাটিয়ে ওঠার জন্য এটি একটি সফল পদ্ধতি। যদি রোগ-বিরোগে আক্রান্ত হন, বিপদ-আপদের সম্মুখীন হন, ভয়-বিহ্বলতা, অভাব ও দারিদ্র্যের শিকার হন তাহলে জান্নাতের বিপুল সুখ-সমৃদ্ধির কথা চিন্তা করুন। জান্নাতের ব্যাপ্তি-পরিব্যপ্তি হবে আকাশমণ্ডলী ও যমীন বরাবর। এর পাশেই নির্মল ঝর্ণাধারা বয়ে যাবে। আপন রবের দরবারে সে জান্নাতের প্রার্থনা করুন। তা অর্জনের লক্ষ্যে এগিয়ে যান।

২৪. চারপাশে একটু লক্ষ করুন, বিপদগ্রস্ত লোকদের খোঁজ-খবর নিন, দেখবেন, শুধু আপনি একাই নন, কত মানুষ শত জ্বালা-যন্ত্রণায় ভুগছে। কত রকম দুর্যোগ ও সংকটে জর্জরিত হয়ে আছে। মনে হবে তাদের তুলনায় আপনি দিব্যি সুখী জীবনযাপন করছেন। আল্লাহ তা'আলা আপনাকে পরিবার-পরিজন ও জীবিকা উপার্জন দিয়ে যেভাবে রেখেছেন তাতেই তুষ্ট থাকুন। হাদীসে বর্ণিত হয়েছে:
«وَلَكِنَّ الْغِنَى غِنَى النَّفْسِ» (صحيح البخاري ٩٥/٨)
অর্থ: 'মনের সচ্ছলতাই প্রকৃত সচ্ছলতা।' (বুখারী, ৮/৯৫)

২৫. দুঃখ-দুশ্চিন্তামুক্ত হয়ে সুখ-শান্তি লাভ করার জন্য সবচেয়ে মহৎ আমল হলো ফজরের নামায আদায় করা। সুতরাং জামাতের সাথে ফজর নামায আদায়ে যত্নবান হোন। অন্তত দু'রাকাত করে হলেও তাহাজ্জুদ নামায নিয়মিত আদায় করুন। হাদীসে বর্ণিত হয়েছে:
مَا مِنْ مُسْلِمٍ، ذَكَرٍ وَلَا أُنْثَى يَنَامُ إِلَّا وَعَلَيْهِ جَرِيرٌ مَعْقُودُ، فَإِنِ اسْتَيْقَظَ فَذَكَرَ اللهَ انْحَلَّتْ عُقْدَةٌ، وَإِنْ هُوَ تَوَضَّأَ ثُمَّ قَامَ إِلَى الصَّلَاةِ أَصْبَحَ نَشِيطًا قَدْ أَصَابَ خَيْرًا، وَقَدِ انْحَلَّتْ عُقْدَةُهُ كُلُّهَا، وَإِنْ أَصْبَحَ وَلَمْ يَذْكُرِ اللَّهَ أَصْبَحَ وَعُقْدَةُهُ عَلَيْهِ، وَأَصْبَحَ ثَقِيلًا كَسْلَانَا لَمْ يُصِبْ خَيْرًا (صحيح ابن حبان) ٦ / ٢٩٧
অর্থ: 'যে কোনো মুসলিম নর-নারী ঘুমায়, তার ওপর (শয়তান কর্তৃক) একটি গিঁট লেগে যায়। সে যখন ঘুম থেকে উঠে, আল্লাহকে স্মরণ করে একটা গিঁট খুলে যায়। এরপর সে যদি ওযু করে নামাযে মশগুল হয় তাহলে উদ্যম প্রাণবন্ত হয়ে সকাল যাপন করে এবং কল্যাণের অধিকারী হয়। ইতোমধ্যে (তার ওপর শয়তানের) সমস্ত গিঁট খুলে যায়। আর যদি ঘুম থেকে উঠে আল্লাহর যিকির না করে, (শয়তানের) গিঁটগুলো নিয়েই সে সকাল যাপন করে। এমতাবস্থায় তার সকাল নিরুদ্যম অলসভাবে কাটে। সে কোনো কল্যাণ লাভ করতে পারে না।' (সহীহ্ ইবনে হিব্বান, ৬/২৯৭)

২৬. পরিবার-পরিজনদের নিকট দুঃখ-কষ্টের অভিযোগ-অনুযোগ করে বেড়াবেন না। নিজের দূরাবস্থার কথা জাহির করে শত্রুর মুখে তৃপ্তির হাসি ফুটাবেন না। সমস্ত দুঃখ-কষ্ট ও জ্বালা-যন্ত্রণার ভার আল্লাহ তা'আলার যিম্মায় সপে দিয়ে উচ্ছল প্রাণবন্ত জীবন-যাপন করুন। ফলে নিকটজনেরা প্রশান্ত-নিশ্চিন্ত থাকবে, আর শত্রুরা আপনার সুখানন্দ দেখে ক্রোধ ও হিংসার আগুনে জ্বলে মরবে।

২৭. কল্যাণ ও সেবামূলক কাজে উদ্যোগী হোন। সেবামূলক উদ্যোগ হলো আতরের মতো-আতরের সুবাসে ক্রেতা-বিক্রেতা ও বহনকারী প্রত্যেকেই সুবাসিত হয়। অনুরূপ সেবামূলক উদ্যোগে ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ সর্বশ্রেণি উপকৃত হয়। যদি মানসিক অস্থিরতার শিকার হন তাহলে পরোপকারে সচেষ্ট হোন। স্বেচ্ছাসেবী দাতব্য সংস্থার কাজে অংশগ্রহণ করুন। দরিদ্রকে দান করুন। দুর্বলকে সাহায্য করুন। এসব কাজের মাধ্যমে আপনি অপার্থিব আনন্দ লাভ করতে পারবেন। মানুষের মুখে প্রশংসা, দু'আ ও কল্যাণ কামনা হবে আপনার বাড়তি পাওনা।

২৮. অসন্তোষ ও বিরক্তি পরিহার করুন। কেননা এক পর্যায়ে তা দুঃখ-বেদনা ও মনঃকষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। প্রতিটা দিন নতুনভাবে শুরু করুন, নতুনভাবে উপভোগ করুন। দর্শনীয় স্থান পরিদর্শনে বেরিয়ে পড়ুন। মহাবিশ্বের তথ্যসমৃদ্ধ বই (ওপেন ইউনিভার্সবুক) ঘেঁটে দেখুন, মহাবিশ্বের বিপুল অনিন্দ সৌন্দর্য সম্পর্কে জানতে পারবেন। আল্লাহ তা'আলার সৃষ্টির মহিমা উপলব্ধি করতে পারবেন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেন: فَأَنبَتْنَا بِهِ حَدَائِقَ ذَاتَ بَهْجَة [النمل: ٦٠]
অর্থ: 'অনন্তর আমি তা দ্বারা মনোরম উদ্যানসমূহ উৎপন্ন করেছি।' (নামল, ২৭: ৬০)

২৯. দুঃখ-বেদনার মুহূর্তে ভেঙে পড়বেন না। শত জ্বালা-যন্ত্রণার কবলে নিজেকে সঁপে দিবেন না। মানসিক দৃঢ়তা ও সংকল্পের অবিচলতা দিয়ে তা মোকাবেলা করুন। সুস্থির বুদ্ধিমত্তা কাজে লাগিয়ে সংকট কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করুন। অন্যথায় সামান্য অসঙ্গতি চরম দুর্গতি ডেকে আনবে।

৩০. যেকোনো দুঃখ-বেদনার কথা দশ জনের কাছে না বলে নীরবে হজম করার চর্চা করুন। এভাবে ভীষণ মনঃকষ্ট এক সময় লাঘব হয়ে যাবে। বলছি না যে, দুঃখ-কষ্ট দূর হয়ে যাবে। সুখের পরশ ও দুঃখের ছায়া-এ দু'য়ের সম্মেলনেই ইহকালীন জীবন। কষ্ট-যাতনাহীন অনাবিল সুখ-শান্তিপূর্ণ জীবন হলো স্বর্গীয় জীবন। যা শুধু পরকালেই সম্ভব। তখন জান্নাতবাসীর সরল সদুক্তি হবে (পবিত্র কুরআনের ভাষায়):
وَقَالُوا الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي أَذْهَبَ عَنَّا الْحَزَنَ إِنَّ رَبَّنَا لَغَفُورٌ شكور :كم
অর্থ: 'তারা বলবে, সমস্ত প্রসংশা আল্লাহর, যিনি আমাদের থেকে সমস্ত দুঃখ দূর করেছেন। নিশ্চয়ই আমাদের প্রতিপালক অতি ক্ষমাশীল, অত্যন্ত গুণগ্রাহী।' (ফাতির, ৩৫: ৩৪)

৩১. অসৎ ও ভ্রান্ত মতাদর্শীদের অমূলক নিন্দা-সমালোচনা ক্ষমা-সুন্দর দৃষ্টিতে এড়িয়ে যান। মনটাকে হিংসা-বিদ্বেষের কলুষতামুক্ত রেখে কাঙ্ক্ষিত সফলতা ও সৌভাগ্যের পথে এগিয়ে যান। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন:
﴿فَمَنْ عَفَا وَأَصْلَحَ فَأَجْرُهُ عَلَى اللَّهِ﴾ [الشورى: ٤٠]
অর্থ: 'তবে যে ক্ষমা করে দেয় ও সংশোধনের চেষ্টা করে, তার সাওয়াব আল্লাহর জিম্মায় রয়েছে।' (সূরা শুরা, ৪২: ৪০)

৩২. সর্বদা হাস্যোজ্জ্বল থাকুন। কেননা তা আপনার কষ্ট-যন্ত্রণার মলম, দুঃখ-বেদনার 'মরহম'। অস্থিরতা ও বিষণ্ণতা কাটিয়ে মানসিক সুখ-শান্তি অর্জনের লক্ষ্যে এটি একটি কার্যকর প্রক্রিয়া।

৩৩. শুচিবায়ু, বিষণ্ণতা-দুশ্চিন্তা ও সাম্প্রদায়িকতার মতো যে সমস্ত মানসিক ব্যাধির কারণে প্রতিনিয়ত দুঃখ-কষ্টের উদ্রেগ হয়, তা থেকে বেঁচে থাকার চেষ্টা করুন। বিখ্যাত আরব কবি আবূ তায়্যেব মুতানাব্বি (৩০৩-৩৫৪ হি.) বলেছেন:
وَالْهَمُّ يَخْتَرِمُ الْجَسِيمَ نَحَافَةً وَيُشِيبُ نَاصِيَةَ الصَّبِيِّ وَيُهْرِمُ
অর্থ: 'দুশ্চিন্তা ও বিষণ্ণতা কত সুঠামদেহীকে শীর্ণকায় করে ফেলে। কত যুবকের যৌবনকে বার্ধক্যে পরিণত করে।'

৩৪. একবার ভেবে দেখুন, যে কারণে কষ্ট পেয়েছেন, তা কি চিরকাল স্থায়ী হবে? এ ক্ষণস্থায়ী পৃথিবীতে কোনো কিছুই কি চিরস্থায়ী, শুধু মহান আল্লাহর সত্তা ব্যতীত? প্রতিটি বস্তুর ধ্বংস ও মৃত্যু অনিবার্য, বর্তমানে কিংবা অদূর ভবিষ্যতে। পবিত্র কুরআনের ঘোষণা:
كُلٌّ مَنْ عَلَيْهَا فَانٍ * وَيَبْقَى وَجْهُ رَبِّكَ ذُو الْجَالِ وَالْإِكْرَامِ
অর্থ: ভূপৃষ্ঠে যা কিছু আছে, সবই ধ্বংস হবে। বাকি থাকবে কেবল আপনার প্রতিপালকের গৌরবময়, মহানুভব সত্তা। (সূরা আর-রাহমান, ৫৫: ২৬, ২৭)

৩৫. মানসিক দুঃখ-কষ্টের বিষয়টি যেমন গুরুতর, তেমনি ব্যাপক-বিস্তৃত। মহান আল্লাহর দরবারে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি এ বিষয়ে তিনি আমাকে (লা-তাহযান) নামক একটি পুস্তক রচনার তাওফিক দান করেছেন। তা থেকেই কয়েকটি পরামর্শ উদ্ধৃত করছি: * প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে না পারার অপবাদ দিয়ে কেউ আপনাকে অপমানিত করেছে, তাতে দুঃখিত হবেন না। * অনেকে বলবে, 'এসব অভদ্রতা অশালীনতার সামনে আপনার ভদ্রতা নম্রতার কী-ই বা মূল্য আছে?!' লোকদের এমন কথায় আপনি হতাশ হবেন না। * কেউ আপনার সামনে অন্যদের প্রশংসা এমন ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে উপস্থাপন করবে যেন আপনি কিছুই না। তাতেও দুঃখিত হবেন না। * যাকে সর্বক্ষেত্রে বিশ্বাস করছিলেন, যার ওপর আস্থা রেখে নিরাপদে পথ চলছিলেন, সে-ই সবার আগে আপনার সঙ্গে ধোঁকাবাজি করেছে, তাতে বিষণ্ণ-চিন্তিত হওয়ার কিছু নেই। * যে আপনার দুর্বলতাগুলো খুটিয়ে বের করে, আপনাকে নানাভাবে ঠকাচ্ছে তার কারণে দুঃখ করবেন না। * দুঃখিত ও ব্যথিত হবেন না। কেননা এসমস্ত ক্ষেত্রে আপনার এক বিন্দু ক্ষতি হয়নি। বরং লাভই হয়েছে; মানুষ আপনার উদারতা ও মহত্ত্বের পরিচয় পেয়ে গেছে। -আয়েয আল কারনী

পরিশিষ্ট:
ভেবে দেখুন, কী কঠিন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল যখন রাসূলুল্লাহ ﷺ ও আবূ বকর (রা.) হেরা গুহায় আবদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন। বিষমাখা তরবারি হাতে পঞ্চাশজন কাফের তাঁদের ঘিরে রেখেছিল। তাদের চোখ-মুখ থেকে রাসূল ﷺ-এর প্রতি শত্রুতা ও প্রতিহিংসার আগুন ঠিকরে বেরুচ্ছিল। রাসূল ﷺ-এর খোঁজে তারা যেখানে এসে দাঁড়িয়েছিল, বাকি ছিল শুধু হেরা গুহায় প্রবেশ করা।

গুহার ভেতরে নিরস্ত্র দু'টি প্রাণ-রাসূলুল্লাহ ﷺ ও আবূ বকর (রা.)। তাঁরা গুহার মুখে কাফেরদের উপস্থিতি টের পেয়েছেন। এ-ও বুঝতে পেরেছেন, কাফেররা গুহার মুখে প্রবেশ করলেই তাদের দেখে ফেলবে। এখান থেকে বের হওয়ার কিংবা আত্মগোপন করার দ্বিতীয় কোনো পথ নেই। কাফেরদের হাত থেকে বাঁচার কোনো আশ্রয় নেই। স্বভাবতই আবূ বকর (রা.) বিচলিত হয়ে পড়লেন। উৎকণ্ঠার স্বরে বললেন: 'ইয়া রাসূলুল্লাহ! তাদের একজনও যদি নিচের দিকে গুহার মুখের দিকে তাকায় আমাদের দেখে ফেলবে।'

রাসূল ﷺ একটুও বিচলিত হলেন না। প্রশান্তচিত্তে স্মিত হেসে যে কয়েকটি শব্দ উচ্চারণ করেছিলেন, যুগযুগ ধরে বিপদগ্রস্ত ও সংকটাপন্ন মানুষের পরম আশ্রয় হয়ে থাকবে। কিয়ামত পর্যন্ত তা আস্থা ও বিশ্বাস, দৃঢ়তা ও অবিচলতার বিমূর্ত প্রতীক হয়ে থাকবে। পবিত্র কুরআনের ভাষায়:
﴿لَا تَحْزَنْ إِنَّ اللَّهَ مَعَنَا﴾ [التوبة: ٤٠]
অর্থ: 'বিচলিত হয়ো না। আল্লাহ তো আমাদের সাথে আছেন।' (সূরা তাওবা, ৯: ৪০)

পরক্ষণেই বিপদ কেটে গেল। মুক্তির পথ উন্মুক্ত হলো। ব্যর্থ-বিফল মনোরথে কাফেররা মক্কায় ফিরে গেল। আল্লাহ তা'আলার ওয়াদা ও প্রতিশ্রুতির চাক্ষুষ বাস্তবায়ন দেখে, তাঁর সাহায্য লাভের আনন্দে উদ্দেল হয়ে রাসূলুল্লাহ ﷺ ও আবু বকর (রা.) হেরা গুহা থেকে বেরিয়ে এলেন। ইসলাম ও মুসলমানদের নতুন গন্তব্য মদিনার পথে অগ্রসর হলেন। জীবনের কোনো প্রতিকূলতায় বিচলিত হবেন না। কোনো বাধা-প্রতিবন্ধকতায় উৎকণ্ঠিত হবেন না। আল্লাহ তা'আলার ওপর অগাধ বিশ্বাসী ও আস্থাশীল হোন। আপনার দুর্দিন কেটে যাবে। জীবনযাপন সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ হয়ে উঠবে।

দুঃখ জীবনেরই একটা অংশ। বিশ্ববিখ্যাত মনোবিজ্ঞানী কার্ল গুস্তাভ য়ুং বলেছেন: 'পৃথিবীতে সবচেয়ে সুখী মানুষের জীবনেও দুঃখ আছে। মানুষের জীবনে তা ভারসাম্য রক্ষা করে। সবচেয়ে ভালো উপায় হলো তাকে আসতে দাও এবং মেধা ও ধৈর্যবলে তাকে সামলাও।'

বিখ্যাত চীনা দার্শনিক লাও ঝু-এর উক্তি: 'যদি পূর্ণতা লাভের জন্য অন্যের দিকে তাকাও, তাহলে কখনই পূর্ণ হতে পারবে না। তোমার সুখ-শান্তি যদি অর্থবিত্ত-নির্ভরশীল হয় তবে কখনো সুখী হতে পারবে না। তোমার অর্জনে যতটুকু আছে, তাতেই তুষ্ট থাক। সর্বোপরি যদি মনের সচ্ছলতা লাভ করতে পার, গোটা পৃথিবীটাই তোমার হয়ে যাবে।'

কবি সালেহ আল-আমরী বলেন:
لَا تَفْقِدِ الْأَمَلَ الْجَمِيلَ وَإِنْ عَفا صَدَأُ الْحَديدِ ، وشَاخَتِ الأَقْفَالُ
البحر يُفلق، والحجارة تَنْبَرِي نَبْعًا، وَيُشْرِقُ فِي القُلُوبِ الفَالُ
ومن السحاب الجهم إزهار، وفي عُقد المصيبة تنبت الآمال.

কাব্যানুবাদ: মেঘ দেখে তুই করিসনে ভয়, আড়ালে তার সূর্য হাসে। হারা শশীর হারা হাসি, অন্ধকারেই ফিরে আসে। দখিন হাওয়ায় অমোঘ বরে রিক্ত শাখাই পুষ্পে বরে। সিক্ত যে প্রাণ অশ্রুধারায় প্রাণের প্রিয় তারি পাশে।

টিকাঃ
৩৫. কবিতাটি কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত রচিত। আরবি কবিতার শাব্দিক অর্থের সঙ্গে এর খুব একটা মিল নেই। তবে ভাবার্থ অবিকল সামঞ্জস্যপূর্ণ। বরং আরবী কবিতার মর্মার্থ বাংলা কবিতাতেই পরিপূর্ণভাবে ফুটে উঠেছে। তাই শাব্দিক অনুবাদের পরিবর্তে বাংলা কবিতার মাধ্যমেই অনুবাদ করা হলো। তবে এমনটি ভাবার উপায় নেই, কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত আরবী কবিতার ভাব ও মর্ম গ্রহণ করেছেন। কারণ, তিনি ১৯২২ খৃষ্টাব্দে মৃত্যু বরণ করেন। আর আরবী কবিতার রচয়িতা সালেহ আল-আমরী ১৯৯৩ খৃষ্টাব্দে জন্ম গ্রহণ করেছেন। (অনুবাদক)

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00