📘 আল হাল্লু জীবন সমস্যার সমাধান > 📄 অজ্ঞতা ও মূর্খতা

📄 অজ্ঞতা ও মূর্খতা


অজ্ঞতা ও মূর্খতা, জ্ঞানবিদ্যার পরিপন্থি, বর্তমান বিশ্বে যা মহা সংকট হিসেবে পরিগণিত। মূর্খতা হলো কোনো বিষয় তার আসলরূপে ও বাস্তবিক অর্থে না জানা। মূর্খতার কারণে মানুষ ভুল পথে পরিচালিত হয়। যত অন্যায়-অনাচার, যুলুম-অত্যাচারে লিপ্ত হয়। পর্যায়ক্রমে ধর্মহীনতা ও কুফুরির দিকে ধাবিত হয়। আল্লাহর নবী মূসা (আ.) অজ্ঞতা ও মূর্খতা থেকে আল্লাহর কাছে পানাহ চেয়েছেন। পবিত্র কুরআনের ভাষায়:

﴿قَالَ أَعُوذُ بِاللَّهِ أَنْ أَكُونَ مِنَ الْجَهِلِينَ﴾ [البقرة: ٦٧]

অর্থ: 'সে বলেছিল, আমি আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি, যেন আমি মূর্খদের অন্তর্ভুক্ত না হই।' (বাকারা, ২: ৬৭)

বনী ইসরাইল মূসা (আ.)-কে বলেছিল:

﴿قَالُوا أَتَتَّخِذُنَا هُزُوًا﴾ [البقرة: ٦٧]

অর্থ: 'তুমি কি আমাদের উপহাস করছ?' (বাকারা, ২: ৬৭)

নূহ সম্প্রদায়ের ওপর যখন আল্লাহ তা'আলার আযাব-সর্বগ্রাসী প্লাবন-নেমে এল, নূহ (আ.) তাঁর কাফের পুত্রের মুক্তি কামনা করলেন। আল্লাহ তা'আলা তাঁর উদ্দেশ্যে বললেন:

﴿إِنِّي أَعِظُكَ أَنْ تَكُونَ مِنَ الْجَهِلِينَ﴾ [هود: ٤٦]

অর্থ: 'আমি তোমাকে উপদেশ দিচ্ছি, তুমি অজ্ঞদের লোকদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না।' (সূরা হুদ, ১১: ৪৬)

পবিত্র কুরআনের যে শব্দটি সর্বপ্রথম নাযিল হয়েছে এবং রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর পবিত্র যবানে উচ্চারিত হয়েছে তা হলো, اقْرَأْ অর্থাৎ, পড়। এতে প্রমাণিত হয়, ইসলাম জ্ঞানার্জনে উদ্বুদ্ধ করে, মূর্খতা নিরক্ষরতা দূরীকরণে অনুপ্রাণিত করে।

বর্তমান বিশ্বে যত বিভেদ-সংঘাত, যুদ্ধ-বিগ্রহ, অর্থ-সম্পদ ও প্রাণের বিনাশ ঘটে চলছে তার অন্যতম কারণ হলো সুশিক্ষা ও নৈতিক শিক্ষার অভাব। মূর্খতা যখন কোনো জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে শিকড় গেড়ে বসে সে জাতির অধঃপতন ও ধ্বংস অনিবার্য। মূর্খতার অশুভ পরিণতি থেকে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ-কোনোটাই মুক্ত নয়। মূর্খতা হলো সর্বব্যাপী সংকট। তা থেকে বাঁচার উপায় নিম্নরূপ:

সমাধান:
১. অজ্ঞতা ও মূর্খতা থেকে বাঁচার প্রথম পদক্ষেপ হলো নিজের অজ্ঞতা দিকগুলো শনাক্ত করা। দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়ে জ্ঞানার্জনে নিয়োজিত হওয়া। জ্ঞানার্জনের পথে আল্লাহ তা'আলা রাসূল ﷺ-কে এ দু'আ শিখিয়ে দিয়েছেন (পবিত্র কুরআনের ভাষায়):

وَقُلْ رَّبِّ زِدْنِي عِلْمًا [طه: ١١٤]

অর্থ: 'এবং আপনি বলুন, হে আমার রব! আমার জ্ঞান বৃদ্ধি করে দিন।' (তোয়াহা, ২০: ১১৪)

২. শিক্ষা-দীক্ষামূলক ধারাবাহিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে এসব কার্যক্রমের ব্যাপক প্রচার-প্রসার করতে হবে। যেন সর্বশ্রেণির মানুষের মধ্যে শিক্ষা-দীক্ষাকেন্দ্রিক সচেতনতা গড়ে উঠে। অজ্ঞতা ও মূর্খতার অশুভ পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করতে হবে। জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শিক্ষার আলো ছাড়া পৃথিবীর বুকে কোনো জাতি সভ্যতা, সংস্কৃতি ও উন্নতির পথে এককদম অগ্রসর হতে পারেনি। আর যে জাতিই চূড়ান্ত অধঃপতন ও ধ্বংসের শিকার হয়েছে তার অন্যতম কারণ হলো মূর্খতা ও শিক্ষাবিমুখতা।

৩. শিক্ষার যাবতীয় উপায়-উপকরণ প্রস্তুত করে দেশের উন্নত শহর থেকে শুরু করে অনুন্নত প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রতিটি শিক্ষার্থীর হাতে পৌঁছে দিতে হবে। শিক্ষার মাধ্যম ও উপায়-উপকরণ যতো সহজলভ্য হবে, এর অবকাঠামো যতো মজবুত ও টেকশই হবে, দেশ ও জাতির শিক্ষার মান ততোই উন্নত হবে। "কবিগুরু” আহমদ শাওকী (১৮৬৮-১৯৩২) বলেন:

بِالْعِلْمِ وَالْمَالِ يَبْنِي النَّاسُ مُلْكَهُمُ لَمْ يُبنَ مُلْكَ عَلَى جَهْلٍ وَإِقْلَالِ

অর্থ: 'জ্ঞান-বিজ্ঞান ও অর্থ-সম্পদের ভিত্তিতে একটি জাতি তার রাজ্য গড়ে তুলতে পারে। কিন্তু অশিক্ষা ও মূর্খতার ওপর কোনো সমাজ ও রাজ্যের প্রতিষ্ঠা হয়নি, হতে পারে না।'

৪. মনে রাখতে হবে, মূর্খতা সমাজের সবচেয়ে জটিল সংকট। এর অশুভ পরিণতি সর্বব্যাপী, সর্বগ্রাসী। মূর্খ জাতি কখনো মর্যাদা ও গৌরব অর্জন করতে পারে না। বিশ্বজাতির কল্যাণে কোনো সুস্থ সভ্যতার বার্তা বহন করতে পারে না। এমনকি চলমান কোনো সভ্যতা-সংস্কৃতির সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারে না।

৫. সন্তানদের সুশিক্ষায় অনুপ্রাণিত করতে হবে। শিক্ষার গুরুত্ব ও তাৎপর্য বোঝাতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষাবিমুখতা এবং বর্তমানে ও অদূর ভবিষ্যতে এর অশুভ পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করতে হবে।

৬. পারিবারিক আয় উপার্জনের একটি উপযুক্ত অংশ শিক্ষাখাতে ব্যয় করা কর্তব্য। অন্ন-বস্ত্রের মতো শিক্ষা হতে হবে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। আন্দালুসী কবি আবূ ইসহাক আলবেরি (রহ.) (৪৫৯ হি.) বলেন:

وَما يُغْنيك تشييد المباني إذا بِالجَهْلِ نَفْسَكَ قَد هَدَمتا جعلت المال فَوقَ العِلم جهلاً لعمرُكَ في القضية ما عدلتا

অর্থ: 'এসব দুর্ভেদ্য প্রাচীর নির্মাণ তোমার কী কাজে আসবে, যদি মূর্খতার বশে নিজ হাতেই তা ধ্বংস করে দাও। অজ্ঞতাবশ বিদ্যা-বুদ্ধির ওপর অর্থ-সম্পদকে প্রাধান্য দিয়েছ, কসম করে বলছি, তোমার এ সিদ্ধান্ত ন্যায়ানুগতা বঞ্চিত।'

৭. সাধারণ মানুষকে শিক্ষার গুরুত্ব ও তাৎপর্য বোঝাতে হবে। এ সম্পর্কে কুরআন-সুন্নাহর আলোচনা ও মুসলিম মনিষীগণের বাণী তুলে ধরতে হবে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা হুদহুদ পাখি ও পিপীলিকার ঘটনা বলেছেন। কেননা তারা নিজ নিজ অবস্থানে থেকে বিদ্যা-বুদ্ধি ও বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছিল।

৮. ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজে-সর্বক্ষেত্রে শিক্ষার মান সমুন্নত করতে হবে। শিক্ষাগত যোগ্যতাকে মর্যাদা ও সম্মানের দৃষ্টিতে বিবেচনা করা আবশ্যক। শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রতিযোগিতামূলক মানসিকতা গড়ে তোলার পাশাপাশি সফল কৃতকার্য শিক্ষার্থীদের পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত করতে হবে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন:

يَرْفَعِ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا مِنْكُمْ وَالَّذِينَ أُوتُوا الْعِلْمَ دَرَجَتِ [المجادلة: ١١]

অর্থ: 'তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে ও যাদেরকে জ্ঞান দান করা হয়েছে, আল্লাহ তাদেরকে মর্যাদায় সমুন্নত করবেন।' (মুজাদালা, ৫৮: ১১)

৯. প্রতিভাবান শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার বিশেষ সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা আবশ্যক। শিক্ষাঙ্গনে দেশের সফল কৃতকার্য শিক্ষার্থীদের উপযুক্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিতে হবে। যেন তারা দেশ ও জাতির উন্নতি-অগ্রগতিতে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে। আগামীর তরুণ প্রজন্মকে শিক্ষিত আলোকিতরূপে গড়ে তোলার লক্ষ্যে যথার্থ অবদান রাখতে পারে।

১০. “শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড”-শিক্ষার ক্ষেত্রে এ মূলনীতিই চূড়ান্ত। শিক্ষার আলো ও অশিক্ষার অন্ধকার কখনো এক হতে পারে না। শিক্ষিত ও অশিক্ষিত কখনো সমান হতে পারে না। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেন:

قُلْ هَلْ يَسْتَوِي الَّذِينَ يَعْلَمُونَ وَالَّذِينَ لَا يَعْلَمُونَ﴾ [الزمر: 9]

অর্থ: 'বল; যারা জানে এবং যারা জানে না, তারা কি সমান হতে পারে?' (সূরা যুমার, ৩৯: ৯)

১১. মাদরাসা, বিশ্ববিদ্যালয় ও বিষয়ভিত্তিক ইনস্টিটিউট গড়ে তোলার জন্য দেশের ব্যবসায়ী ও বিত্তবান শ্রেণিকে অনুপ্রাণিত করতে হবে। এটা তাদের জাতীয় ও মানবিক দায়িত্বও বটে। কোনো অবস্থাতেই তা এড়ানোর সুযোগ নেই।

১২. জ্ঞানার্জনের পথে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর চিরন্তন বাণীই হলো মূল আদর্শ:
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: وَمَنْ سَلَكَ طَرِيقًا يَلْتَمِسُ فِيهِ عِلْمًا، سَهَّلَ اللَّهُ لَهُ بِهِ طَرِيقًا إِلَى الْجَنَّةِ». (صحيح مسلم) ٤ / ٢٠٧٤
অর্থ: আবূ হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল ﷺ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'জ্ঞানার্জনের উদ্দেশ্যে যে ব্যক্তি কোনো পথ অবলম্বন করবে আল্লাহ তা'আলা তার জান্নাতের পথ সহজ করে দিবেন।' (মুসলিম, ৪/২০৭৪)

১৩. জ্ঞানী-গুণী ও বিদ্বান ব্যক্তিদের সাহচর্য গ্রহণ করতে হবে। তাঁরা হলেন নবীগণের প্রকৃত ওয়ারিশ। আবু দারদা (রা.) থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
إِنَّ العُلَمَاءَ وَرَثَةُ الأَنْبِيَاءِ، إِنَّ الأَنْبِيَاءَ لَمْ يُوَرِّثُوا دِينَارًا وَلَا دِرْهَمًا إِنَّمَا وَرَّثُوا العِلْمَ، فَمَنْ أَخَذَ بِهِ أَخَذَ بِحَقٍّ وَافِرٍ». (سنن الترمذي) ٥ / ٤٩
অর্থ: 'আলেমগণই হলেন নবীগণের উত্তরাধিকারী। কেননা নবীগণ ত্যাজ্য সম্পত্তি হিসেবে 'দিনার-দিরহাম' রেখে যাননি। রেখে গিয়েছেন শুধু ইলম ও জ্ঞান। যে ব্যক্তি তা গ্রহণ করতে পারবে, সে বিরাট কিছু লাভ করবে।' (ইবনে মাযাহ্, ৫/৪৯)

পরিশিষ্ট:
* আমিরুল মু'মিনীন আলী ইবনে আবু তালেব (রা.) (৪০ হি.) বলেছেন: 'ইলম ও জ্ঞানের মর্যাদা এমনই যে, যার জ্ঞান নেই সে-ও নিজেকে জ্ঞানী বলে পরিচয় দিয়ে গর্ববোধ করে। আর অজ্ঞতা-মূর্খতা এতটাই ঘৃণ্য যে, মূর্খ লোকও নিজেকে মূর্খতার দায়মুক্ত করতে পেরে স্বস্তি বোধ করে।'
* আন্দালুসী কবি আবু ইসহাক আলবেরি (৯৮৫-১০৬৭ খৃষ্টাব্দ) বলেছেন:
وَكِنْزاً لا تَخافُ عَلَيْهِ لِيّاً خفيفَ الحَمْلِ يوجَدُ حَيْثُ كُنتا
يَزيدُ بِكَثْرَةِ الإنفاقِ مِنْهُ وَيَنْقُصُ أنْ بِهِ كَفّا شَدَدْنا
অর্থ: 'জ্ঞান-বিজ্ঞান হলো এমন ভাণ্ডার, যা চুরি হওয়ার ভয় নেই। নিতান্তই হালকা। সর্বত্র বহনযোগ্য। জ্ঞানের আলো যত ছড়াবে ততই বৃদ্ধি পাবে। কিন্তু যখনই জ্ঞানের প্রচার-প্রসার বন্ধ হবে ধীরে-ধীরে তা সংকুচিত হতে থাকবে।'
* বিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন (১৮৭৯-১৯৫৫ খ্রিষ্টাব্দ) বলেছেন: 'ধর্মীয় শিক্ষা ছাড়া জ্ঞান-বিজ্ঞান খোঁড়া অচল। আর জ্ঞানের আলো ছাড়া ধর্মকর্ম অন্ধ-আলোহীন।'
* মিশরীয় সাহিত্যিক ও চিন্তাবিদ আব্বাস মাহমুদ আক্কাদ (১৮৮৯-১৯৬৪ খ্রিষ্টাব্দ) বলেছেন: 'যখন কোনো বই পড়ি বইয়ের কালো হরফগুলোই শুধু পড়ি না, বইয়ের হৃদয়াত্মার সাথে মিশে যাই।'
* ফরাসি দার্শনিক র‍্যনে দেকার্ত (১৫৯৬-১৬৫০ খ্রিষ্টাব্দ) বলেছেন: 'জ্ঞান-বিজ্ঞানই হলো বিশ্বে সর্ববৃহৎ শক্তি।'

📘 আল হাল্লু জীবন সমস্যার সমাধান > 📄 হিংসা

📄 হিংসা


জ্ঞান-গরিমা, অর্থ-সম্পদ, সুনাম-সুখ্যাতি, বংশ-মর্যাদা, পদমর্যাদা ইত্যাদি যাবতীয় ক্ষেত্রে কারো উৎকর্ষতা ও শ্রেষ্ঠত্ব দেখে গা জ্বালা করা, তার সবটুকু ছিনিয়ে নিয়ে এককভাবে নিজেই ভোগ-দখল করার উদগ্র বাসনার নামই হিংসা। হিংসা হলো ‘দোধারি’ তলোয়ার, যেভাবেই চালানো হোক, ক্ষতি অনিবার্য।

হিংসুক নিজেই হিংসার আগুনে জ্বলে, অন্যের ক্ষতি সাধন করে একক দখলদারিত্ব কায়েম করার উদগ্র বাসনায় অস্থির হয়ে উঠে। হিংসার গুনাহ ও পাপের বোঝা বহন করার সঙ্গে সঙ্গে নেক আমলসমূহ বরবাদ করে। অপর দিকে ভুক্তভোগী শ্রেণি হিংসুক-কর্তৃক নানা প্রতিকূলতা ও বিপত্তির শিকার হয়। হিংসার কবলে তাদের স্বাভাবিক শান্তিপূর্ণ জীবনযাত্রা ক্রমশ অসহনীয় ও দুর্বিষহ হয়ে উঠে।

হিংসা মানুষের স্বভাবজাত ব্যাধি। এর কারণে সমাজে বাদবিবাদ, বিদ্বেষ, শত্রুতা, অন্যায়-অনাচার, যুলুম-অত্যাচারের মতো জঘন্য অপকর্মের সূত্রপাত হয়। তাই হিংসা বর্জনের অপরিহার্যতা অনস্বীকার্য। কিন্তু তার উপায় কী? এ জটিল সমস্যার সমাধান কী?

সমাধান:
১. মানুষমাত্রই তার মনে হিংসার উদ্রেগ হবে এবং এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আক্রোশ ভরে মনের মধ্যে হিংসা পুষে রাখা দূষণীয়। যে কোনোভাবে তা দমন করাই বাঞ্ছনীয়। তাই অন্যের যোগ্যতা, দক্ষতা, সুযোগ-সুবিধা ও অর্থপ্রাচুর্যের দিকে না তাকিয়ে, আল্লাহ তা'আলা আপনাকে যে অগণিত নিয়ামত দান করেছেন, তার কথা স্মরণ করুন। তাহলে দেখবেন, এমন বহু নিয়ামত আপনার ভাগ্যে জুটেছে, যা পাওয়ার জন্য অন্যরা উদগ্রীব হয়ে আছে।

২. একবার ভেবে দেখুন, হিংসার কারণে আপনার নেক আমল বরবাদ হবে। মানসিক প্রশান্তি ব্যাহত হবে। নিত্যদিনের স্বাভাবিক শান্তিপূর্ণ জীবনযাত্রা বিঘ্নিত হবে। কেননা হিংসা হলো এমন আগুন যা সর্বপ্রথম হিংসুককেই জ্বালিয়ে মারে।

৩. মনে রাখুন, ইবলিসই হলো হিংসা-বিদ্বেষের মূল হোতা। তার দুষ্ট মনেই হিংসার প্রথম উৎপত্তি। জান্নাতে সে আদম (আ.)-কে হিংসা করেছিল। সুতরাং, কেউ যদি হিংসার বশবর্তী হয় সে হবে ইবলিসের অনুসারী। তার পরিণতি ভয়াবহ।

৪. ভুলে যাবেন না, সময় আবর্তনশীল। নিয়তি পরিবর্তনশীল। কালের দুর্যোগ-দুর্বিপাকে আপনি নিজেও আক্রান্ত হতে পারেন। তাই সর্বদা অন্যের মঙ্গল কামনা করা কর্তব্য। পরার্থপরতা ও পরোপকারে সচেষ্ট থাকা বাঞ্ছনীয়।

৫. ইবাদত ও সদাচারে সদা যত্নবান হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গুনাহ ও নাফরমানি পরিহারে সচেষ্ট হোন। তাকওয়া ও আল্লাহভীতি অবলম্বন করুন, তাহলে যাবতীয় অকল্যাণ অনিষ্ট থেকে সুরক্ষা পাবেন। পবিত্র কুরআনের আশ্বাসবাণী শুনুন:
وَإِنْ تَصْبِرُوا وَتَتَّقُوا لَا يَضُرُّكُمْ كَيْدُهُمْ شَيْئًا إِنَّ اللَّهَ بِمَا يَعْمَلُونَ مُحِيطٌ ﴿آل عمران: ۱۲۰﴾
অর্থ: 'আর যদি তোমরা ধৈর্য ধারণ কর ও তাকওয়া অবলম্বন কর, তাহলে তাদের চক্রান্ত তোমাদের কোনই ক্ষতি করতে পারবে না। তারা যা করে নিশ্চয়ই আল্লাহ তা'আলা তার পরিবেষ্টনকারী।' (আলে-ইমরান, ৩:১২০)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«احْفَظِ اللَّهَ يَحْفَظْكَ». (سنن الترمذي) ٤ /٦٦٧
অর্থ: 'আল্লাহ তা'আলার আদেশ-নিষেধ মেনে চল। তিনিই তোমাকে রক্ষা করবেন।' (তিরমিজী, ৪/৬৬৭)

৬. হিংসুকের সংস্পর্শ থেকে দূরে থাকুন। তার কাছেও যাবেন না। বন্ধু হিসেবে তো কখনই না। কেননা আপনার মঙ্গল ও ইতিবাচক ক্ষেত্রে সে কখনো স্বস্তিবোধ করবে না। তার একমাত্র অপচেষ্টা হলো আপনার শ্রেষ্ঠত্বের দিকটি ছিনিয়ে নিয়ে আপনাকে কল্যাণ-বঞ্চিত করা।

৭. দু'আ ও ইস্তেগফারের মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলার আশ্রয় গ্রহণ করুন। সকাল-সন্ধ্যায় সুন্নত অযীফাগুলো নিয়মিত আদায় করুন। শরীয়তে এমন অনেক আমলের দিকনির্দেশনা রয়েছে, যাবতীয় বিপদ-আপদ, সংকট ও প্রতিকূলতার মুখে যা আপনার রক্ষাকবচ-সে সমস্ত আমলে যত্নবান হোন। বিশেষভাবে 'মুআওয়াযাতাইন' দু'টি রক্ষাকবচ: সূরা ফালাক ও সূরা নাস নিয়মিত পাঠ করুন।

৮. হিংসুকের হিংসা মোকাবেলা করার জন্য, কিংবা তা থেকে বাঁচার জন্য সবচেয়ে কার্যকর পন্থা হলো-যদিও এর বাস্তবায়ন কষ্টসাধ্য; কেননা তা মানুষের স্বভাবজাত ও প্রচলিত মানসিকতা বিরোধী- হিংসুকের হিংসা-বিদ্বেষের মাত্রা যত তীব্র হোক, আপনি আন্তরিকতা, সদাচার ও ভালোবাসার পরিচয় দিন। সৌহার্দ্য ও প্রীতির নিদর্শনস্বরূপ তাকে হাদিয়া ও উপঢৌকন দিন। প্রফুল্লচিত্তে সহাস্য বদনে তার সাথে সাক্ষাৎ করুন। এটাই পবিত্র কুরআনের নির্দেশ ও দিকনির্দেশনা:
﴿وَلَا تَسْتَوِي الْحَسَنَةُ وَالسَّيِّئَةُ ۚ ادْفَعْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ فَإِذَا الَّذِي بَيْنَكَ وَبَيْنَهُ عَدَاوَةٌ كَأَنَّهُ وَلِيٌّ حَمِيمٌ﴾ [حم السجدة : ৩৪]
অর্থ: 'ভাল ও মন্দ সমান হতে পারে না। মন্দ প্রতিহিত কর উৎকৃষ্ট দ্বারা; ফলে তোমার সাথে যার শত্রুতা আছে সে হয়ে যাবে অন্তরঙ্গ বন্ধুর মত।' (হা-মীম সাজদা, ৪১: ৩৪)

৯. আপনার যোগ্যতা-দক্ষতা ও সুযোগ-সুবিধার কথা দশজনের কাছে প্রচার করবেন না। বিশেষভাবে হিংসুকের কাছে এসব বিষয় জাহির করা থেকে বিরত থাকুন। হিংসুকের হিংসা থেকে বাঁচার জন্য এটি একটি কার্যকর পন্থা। ইয়াকুব (আ.) তাঁর সন্তানদের এ পদ্ধতি বাতলে দিয়েছিলেন। সন্তানদের জনশক্তি ও একতাবদ্ধতার বিষয়টির ওপর যেন দুষ্ট লোকের নজর না লাগে। পবিত্র কুরআনের ভাষায়:
يُبَنِيَّ لَا تَدْخُلُوا مِنْ بَابٍ وَاحِدٍ وَادْخُلُوا مِنْ أَبْوَابٍ مُتَفَرِّقَةٍ
অর্থ: 'হে আমার পুত্রগণ! তোমরা এক দরযা দিয়ে প্রবেশ কর না, ভিন্ন ভিন্ন দরযা দিয়ে প্রবেশ করবে।' (ইউসুফ, ১২: ৬৭)
তাফসির বিশারদগণের অভিমত, রাজার দরবারে প্রবেশের সময় এ বিশেষ পন্থা অবলম্বনের উদ্দেশ্য ছিল, হিংসুক ও দুষ্ট লোকের 'বদনজর' থেকে বেঁচে থাকা।

১০. একমাত্র আল্লাহ তা'আলাকে ভয় করুন। কখনো যেন মনের মধ্যে 'গায়রুল্লাহর ভয়' স্থান না পায়। সুনিশ্চিত থাকুন, আপনি যদি আল্লাহ তা'আলার আশ্রয়ে থাকেন, কুরআন-সুন্নাহর নির্দেশিত যিকিরের রক্ষাকবচ ধারণ করেন তাহলে হিংসুকের হিংসা আপনার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। যালিমের যুলুম প্রতিফলিত হবে না। পবিত্র কুরআনের ভাষায়:
قُلْ لَنْ يُصِيبَنَا إِلَّا مَا كَتَبَ اللهُ لَنَا ﴾ [التوبة: ٥١]
অর্থ: 'বলুন, আল্লাহ আমাদের জন্য যা নির্ধারণ করে দিয়েছেন, তা ছাড়া অন্য কোন বিপদ-আপদ আমাদের ওপর আপতিত হবে না।' (তাওবা, ৯: ৫১)
সুন্নাহর ভাষায়: عَنْ ابْنِ عَبَّاسٍ قَال: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: وَاعْلَمْ أَنَّ الأُمَّةَ لَوِ اجْتَمَعَتْ عَلَى أَنْ يَنْفَعُوكَ بِشَيْءٍ لَمْ يَنْفَعُوكَ إِلَّا بِشَيْءٍ قَدْ كَتَبَهُ اللَّهُ لَكَ، وَلَوْ اجْتَمَعُوا عَلَى أَنْ يَضُرُّوكَ بِشَيْءٍ لَمْ يَضُرُّوكَ إِلَّا بِشَيْءٍ قَدْ كَتَبَهُ اللهُ عَلَيْكَ». (سنن الترمذي ٦٦٧/٤)
অর্থ: আবূ হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'জেনে রাখুন, গোটা জাতি যদি আপনার কল্যাণে একতাবদ্ধ হয় তবুও আল্লাহ তা'আলা আপনার ভাগ্যে যতটুকু কল্যাণের ফায়সালা করেছেন, এর অতিরিক্ত তারা একবিন্দু কল্যাণ সাধন করতে পারবে না। আর গোটা জাতি যদি আপনার ক্ষতি সাধনে সংবদ্ধ হয় তবুও আল্লাহর ফায়সালার বাইরে তারা আপনার একচুল পরিমাণও ক্ষতি করতে পারবে না।' (সুনানে তিরমিজী, ৪/৬৬৭)

১১. হিংসুকের হিংসার উচিত জবাব হলো কোনো প্রত্যুত্তর না করে নীরব নিশ্চুপ থাকা। সুতরাং মানুষের হিংসাত্মক ও ব্যাঙ্গাত্মক কটুক্তির প্রতি ভ্রূক্ষেপ না করে আপন মনে কাজ করে যান। কাজের উদ্যোগ-উদ্দীপনা বাড়িয়ে দিন। কথিত আছে, প্রকৃত জবাব হলো বাস্তবে পরিণত করে দেখানো, মুখের ওপর দু'টা কথা শুনিয়ে দেওয়া তাতো নিতান্ত সামান্য।

১২. সুনিশ্চিত থাকুন, রিযিকদাতা একমাত্র আল্লাহ তা'আলা। তিনি যার জন্য যতটুকু রিযিকের ফায়সালা করেছেন, তা সম্পূর্ণ ভোগ করার আগে কেউ মৃত্যুবরণ করবে না। আপনার জীবিকা কেউ ছিনিয়ে নিতে পারবে না, ভোগদখল করতে পারবে না।

১৩. অন্যের আয়ত্তে আপনার পছন্দের ভালো লাগার কিছু দেখলে তার বরকতের দু'আ করুন। তার উত্তরোত্তর সফলতা কামনা করুন। রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাদের এমনই আদেশ করেছেন: إِذَا رَأَى أَحَدُكُمْ مِنْ أَخِيهِ مَا يُعْجِبُهُ، فَلْيَدْعُ لَهُ بِالْبَرَكَةِ». (سنن ابن ماجه ٢ / ١١٦٠)
অর্থ: 'তোমাদের কেউ যখন তার ভাইয়ের কাছে নিজের পছন্দের ও ভালো লাগার কিছু দেখবে, তখন সে যেন তার বরকতের দু'আ করে।' (সুনানে ইবনে মাযাহ, ২/১১৬০)

১৪. মনটাকে নিষ্কলুষ ও হিংসা-বিদ্বেষমুক্ত রাখুন। ইহকালে জান্নাতের পরম সুখানুভূতি লাভ করবেন। আত্মার শুদ্ধতা ও মনের নিষ্কলুষতা আপনার জন্য জান্নাতের ফায়সালা ত্বরান্বিত করবে।

১৫. আল্লাহ তা'আলার প্রতি গভীর আস্থা ও বিশ্বাস, দুঃস্থ ও প্রয়োজনগ্রস্তদের সাহায্য-সহযোগিতা ও দান-সদকা হলো আপনার অন্যতম পুঁজি। যাবতীয় বিপদ-আপদ, হিংসা ও কুদৃষ্টি থেকে বাঁচার জন্য এটি অত্যন্ত কার্যকর ও কুরআন-সুন্নাহর স্বীকৃত পন্থা। আল্লামা ইবনুল কাইয়্যিম জাওযী (রহ.) (৬৯১-৭৫১ হি.) বলেছেন: 'বিপদ-আপদ থেকে মুক্ত থাকার জন্য দান-সদকার বিরাট ভূমিকা রয়েছে। মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে সবার জন্য তা সমান প্রযোজ্য।'

১৬. আল্লাহ তা'আলার কাছে তওবা করুন। একনিষ্ঠ মনে তাওবা করে গুনাহমুক্ত হোন এবং সামনের দিনগুলোতে গুনাহমুক্ত জীবন-যাপনে সচেষ্ট হোন। কেননা গুনাহ ও পাপাচারই হলো বিপদগ্রস্ত হওয়ার মূল কারণ। পবিত্র কুরআনের ভাষায়:
وَمَا أَصَابَكُمْ مِّنْ مُّصِيبَةٍ فَبِمَا كَسَبَتْ أَيْدِيكُمْ وَيَعْفُوا عَنْ كَثِير [سورة الشورى: ٣٠]
অর্থ: 'তোমাদের যে বিপদ-আপদ ঘটে তাতো তোমাদেরই কৃতকর্মের ফল।' (আশ-শূরা, ৪২: ৩০)

১৭. অর্থবিত্ত, সুনাম-সুখ্যাতি, সন্তান-সন্ততি ও ঘর-বাড়ি মোটকথা, আপনার পছন্দের ও ভালো লাগার যা-কিছুই লাভ করবেন, বলুন, مَا شَاءَ اللَّهُ لَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ (মাশাআল্লাহ, লা-কুওয়াতা ইল্লাবিল্লাহ)। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা গোটা মানবজাতিকে এমনই দিকনির্দেশনা প্রদান করে বলেছেন:
وَلَوْلَا إِذْ دَخَلْتَ جَنَّتَكَ قُلْتَ مَا شَاءَ اللَّهُ لَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ [الكهف: ٣٩]
অর্থ: 'তোমার উদ্যানে প্রবেশ করে তুমি কেন বললে না, আল্লাহ যা চেয়েছেন তাই হয়েছে, আল্লাহর সাহায্য ব্যতীত কোন শক্তি নেই।' (কাহফ, ১৮: ৩৯)

পরিশিষ্ট:
হিংসা-বিদ্বেষের সূত্র ধরে পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে ঘৃণ্য ও জঘন্য ঘটনাটা ঘটেছে। তার মূল হোতা ইবলিস শয়তান। মাটির তৈরি আদমকে হিংসা করে আল্লাহ তা'আলার অবাধ্য হয়েছে। তার মন-মানসিকতা হিংসা-বিদ্বেষে এতটাই কলুষিত হলো যে, স্রষ্টার আদেশ লঙ্ঘন করে হলেও আদমকে সিজদা করা থেকে বিরত থাকল। স্রষ্টার আনুগত্য ছেড়ে অবাধ্যতার পথ বেছে নিল। রহমতের শীতল ছায়া ছেড়ে অভিশাপের আগুনে দগ্ধ হলো। জান্নাতের বাগান ছেড়ে জাহান্নামের গর্ভে নিমজ্জিত হলো। সুতরাং যে ব্যক্তি নিজেকে হিংসা-বিদ্বেষে কলুষিত করবে ইবলিস হলো তার সর্বস্বীকৃত প্রধান 'গুরু'। তাই সতর্ক হোন। ইবলিসের শিষ্য হয়ে নিজেকে কলুষিত করবেন না। রহমতের শীতল ছায়া ছেড়ে অভিশাপের আগুনে ঝাঁপ দিবেন না।

আইরিশ লেখক জর্জ বার্নাড শো (১৮৫৬-১৯৫০ খ্রিষ্টাব্দ) বলেছেন: 'যে দাঁতব্যথায় ভুগছে, তার মনে হয়, দাঁত-ব্যথামুক্ত বাকি সবাই খুব সুখী।'

লোকমান হাকিম (রহ.) বলেছেন: 'হিংসুকের তিনটি আলামত: ব্যক্তির অনুপস্থিতিতে নিন্দা করে, উপস্থিতিতে তোষামোদ করে, তার বিপদে উল্লসিত হয়।'

📘 আল হাল্লু জীবন সমস্যার সমাধান > 📄 ভয়

📄 ভয়


ভয় হলো একটি মানসিক অবস্থা। মৃত্যু, রোগ, শোক, হিংসা-বিদ্বেষ, ভয়ংকর শত্রু, প্রাণীর আক্রমণ, ঘুটঘুটে অন্ধকার ও নির্জন নিস্তব্ধ পরিবেশে আবদ্ধ হওয়া ইত্যাদির মতো অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু ঘটে যাওয়ার আশঙ্কাই হলো ভয়-ভীতির প্রধান অনুঘটক। এ প্রসঙ্গে ইবনুল কাইয়্যিম জাওযী (রহ.) (৬৯১-৭৫১ হি.) বলেন:
'কোনো অকল্যাণ-অনিষ্টের অজানা আশঙ্কা থেকে সৃষ্ট মানসিক অস্থিরতার নামই হলো ভয়।'

দার্শনিক অ্যারিস্টটল-এর বক্তব্য হলো, 'ভয় হলো অনাকাঙ্ক্ষিত ও ভীতিকর কিছু ঘটার আশঙ্কার কারণে মানসিক অস্থিরতা ও চাঞ্চল্য।'

ভয় পাওয়া এবং শংকিত হওয়া দূষণীয় কিছু নয়, দূষণীয় হলো ব্যক্তির এ ধরনের দাবি করা যে, সে কখনো কোনো কিছুর ভয় করে না। এ ধরনের দাবির কোনো ভিত্তি নেই। কেননা মানুষের স্বভাব-প্রকৃতিতে ভয়-ভীতি সঞ্চারিত করা হয়েছে, যা সহজাত ও স্বভাবজাত। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন:
﴿إِنَّ الْإِنْسَانَ خُلِقَ هَلُومًا﴾ [المعارج: ١٩]
অর্থ: 'মানুষতো সৃষ্টি হয়েছে অতিশয় অস্থিরচিত্তরূপে।'

তবে সবকিছুরই একটি মাত্রা ও পরিমিতি রয়েছে। যা বজায় রাখা কাম্য, লঙ্ঘন করা অবাঞ্ছনীয়। সুতরাং ভয়-ভীতি যদি মাত্রাতিক্রম করে তবে তার বিরূপ প্রতিক্রিয়া অনিবার্য। তা ব্যক্তিকে ভীরুতা, মানসিক দুর্বলতা ও ভীতিপ্রবণ মানসিকতার পথে ঠেলে দেয়। পর্যায়ক্রমে তা মারাত্মক ব্যাধিতে পরিণত হয়। এ রোগ মানুষকে দুর্বলপ্রাণ করে ফেলে। ফলে ভুক্তভোগী নিজের প্রতি চরম অনাস্থা ও সংশয়ের শিকার হয়। আত্মবিশ্বাস খুইয়ে বসে। বাস্তব জীবনের কঠিন চ্যালেঞ্জের মোকাবেলা করার ক্ষেত্রে সে পশ্চাৎপদ ও পলায়নপর ভূমিকায় স্বস্তি বোধ করে। চরম নিরাশা ও নেতিবাচক মানসিকতায় ভুগতে থাকে।

ভয়-ভীতি তার মন-মস্তিষ্ক ও চিন্তা-চেতনায় এমন প্রবলভাবে ভর করে যে, তার মানসিক প্রশান্তি মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়। মন-মানসিকতা অস্থির বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে। পর্যায়ক্রমে স্বাভাবিক জীবনযাপন চরম অসহনীয় হয়ে উঠে। জীবনের পরম কাঙ্ক্ষিত সুখ-শান্তির মৃত্যু ঘটে।

সুস্থ-স্বাভাবিক ও সুন্দর জীবনযাপনের জন্য অনর্থক ভয়-ভীতিমুক্ত হয়ে থাকতে হবে। অযথা আশঙ্কা ও উৎকণ্ঠা থেকে বেঁচে থাকতে হবে। কিন্তু উপায় কী? এক্ষেত্রে আমাদের করণীয় কী?

সমাধান:
১. তাকদির ও নিয়তির ফায়সালায় পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস রাখুন। আপনার দৃঢ় বিশ্বাস থাকতে হবে, সবকিছু মহান আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছা ও আদেশে বাস্তবায়িত হয় এবং নিয়ন্ত্রিত হয়। সুতরাং আল্লাহ তা'আলা যা ফায়সালা করেছেন আপনার ভাগ্যে তা-ই ঘটবে। পবিত্র কুরআনের ভাষায়:
قُلْ لَنْ يُصِيبَنَا إِلَّا مَا كَتَبَ اللهُ لَنَا [التوبة: ٥١]
অর্থ: 'আপনি বলুন, আল্লাহ আমাদের জন্য যা নির্ধারণ করে দিয়েছেন তা ছাড়া অন্য কোন বিপদ-আপদ আমাদের ওপর আপতিত হবে না।' রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
وَتَعْلَمَ أَنَّ مَا أَصَابَكَ لَمْ يَكُنْ لِيُخْطِئَكَ، وَأَنَّ مَا أَخْطَأَكَ لَمْ يَكُنْ لِيُصِيبَكَ». (سنن أبي داود) ٤ / ٢٢٥
অর্থ: 'জেনে রাখ, তোমার ভাগ্যে যা ঘটবে তা কোনোভাবেই খণ্ডাবে না। আর যা তোমার ভাগ্যে নেই তা কিছুতেই তোমাকে আক্রান্ত করতে পারবে না।' (আবু দাউদ, ৪/২২৫) তাহলে আর ভয় কীসের? দুশ্চিন্তা কীসের?

২. ভয় ও আশঙ্কার জায়গাগুলোতে আপনার বিশ্লেষণ ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগান। দলিল-প্রমাণের ভিত্তিতে বিষয়গুলোর যৌক্তিক বিশ্লেষণ করুন। তাহলে নিশ্চিত হতে পারবেন, আপনার অজানা আশঙ্কা ও সংশয়প্রবণতা ভিত্তিহীন। যার অধিকাংশি বাস্তবে পরিণত হয় না। যেমন: বিমানে চড়তে আপনার ভয় হয়। বিমানে করে শূন্যের পথে ভ্রমণ করার সাহস পান না। তাহলে বিমান সম্পর্কে আপনার জানা-শোনার পরিধি বাড়ান। এর বৈশিষ্ট্য ও সুযোগ-সুবিধা সম্পর্কে অবগত হোন। এভাবে আপনার ভয়-ডর কেটে যাবে। এটা পরীক্ষিত ও অভিজ্ঞতালব্ধ পন্থা।

৩. বিশ্বাস করুন, মানুষ যা কিছুর আশঙ্কা করে তার অধিকাংশি বাস্তবে ঘটে না। এটা একটা বাস্তব মূলনীতি। ভয়-ডর দূর করার জন্য এটি একটি কার্যকর পন্থা।

৪. কোনো ক্ষেত্রে যদি শঙ্কিত হন এবং সময়ের সাথে সাথে শঙ্কার মাত্রা বাড়তে থাকে তাহলে বারবার পাঠ করুন: حَسْبُنَا اللهُ وَنِعْمَ الوَكِيل.
অর্থ: 'আমাদের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট। তিনি কতোই না শ্রেষ্ঠ অভিভাবক।'
বিপদে-আপদে, বাধা ও প্রতিকূলতায় এ দু'আটি মু'মিনের পরম আশ্রয়। পবিত্র কুরআনের ভাষায়:
الَّذِينَ قَالَ لَهُمُ النَّاسُ إِنَّ النَّاسَ قَدْ جَمَعُوا لَكُمْ فَاخْشَوْهُمْ فَزَادَهُمْ إِيْمَانًا وَقَالُوا حَسْبُنَا اللَّهُ وَنِعْمَ الْوَكِيلُ * فَانْقَلَبُوا بِنِعْمَةٍ مِّنَ اللهِ وَفَضْلٍ لَّمْ يَمْسَسْهُمْ سُوءٌ وَاتَّبَعُوا رِضْوَانَ اللَّهِ وَاللَّهُ ذُو فَضْلٍ عَظِيمٍ﴾ [آل عمران: ١٧٣، ١٧٤]
অর্থ: 'যাদেরকে লোকেরা বলেছিল, নিশ্চয়ই তোমাদের বিরুদ্ধে সেইসব লোক সমবেত হয়েছে; অতএব তোমরা তাদেরকে ভয় কর; কিন্তু এতে তাদের বিশ্বাস পরিবর্ধিত হয়েছিল এবং তারা বলেছিল; আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট এবং তিনি মঙ্গলময়, কর্মবিধায়ক। অনন্তর তারা আল্লাহর অনুগ্রহ সম্পদসহ প্রত্যাবর্তীত হয়েছিল, তাদেরকে অমঙ্গল স্পর্শ করেনি এবং তারা আল্লাহর সন্তুষ্টির অনুসরণ করেছিল; আর আল্লাহর অনুগ্রহ অতি ব্যাপক।' (আলে-ইমরান, ৩: ১৭৩-১৭৪)

৫. অতীত অনুসন্ধান করে দেখুন। পেছনে ফেলে-আসা দিনগুলোর কথা স্মরণ করুন। দেখবেন, আপনার অধিকাংশ শঙ্কা ও আশঙ্কার বিষয়গুলো আর বাস্তবে ঘটেনি। নিশ্চিত হতে পারবেন, বাস্তবতার চেয়ে মানুষের মনের অযাচিত জল্পনা-কল্পনা ও শঙ্কা-আশঙ্কার পরিমাণই বেশি।

৬. মহান বীরপুরুষদের জীবনচরিত অধ্যয়ন করুন। কীভাবে তাঁরা জীবনের চরম বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছেন! কী সফলভাবে শত বাধা-বিপত্তি মোকাবেলা করেছেন। ভয় ও আশঙ্কা জয় করে দুর্বার গতিতে আগামীর পথে অগ্রসর হয়েছেন। বিষয়গুলো গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করুন। তাঁদের জীবনদর্শন অবলম্বন করে জীবনাদর্শের অনুসরণ করুন। এ ক্ষেত্রে আপনার জন্য শ্রেষ্ঠ আদর্শ হলেন মুহাম্মদ বিন আব্দুল্লাহ, রাসূলুল্লাহ ﷺ।

৭. ভয় ও শঙ্কার মুহূর্তে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে একাকিত্ব বরণ করে নিবেন না। দীর্ঘ অবসর যাপনে প্রবৃত্ত হবেন না, তাহলে নানা শঙ্কা ও আশঙ্কা আপনার ওপর প্রবলভাবে জেঁকে বসবে। তার চেয়ে আপনি বরং অন্যদের সাথে সাক্ষাৎ ও আলাপ-আলোচনায় ব্যস্ত থাকুন। শিশু-বাচ্চাদের সাথে হাস্য-রসিকতায় মেতে উঠুন। একাকিত্বের ঘেরাটোপ থেকে বেরিয়ে জনহিতকর ও কল্যাণমূলক উদ্যোগ-আয়োজনে অংশগ্রহণ করুন। জীবনের চরম বাস্তবতা ও বাধাবিপত্তির মোকাবিলা করতে শিখুন।

৮. লোকদের সাথে সামাজিক সম্পর্কগুলোকে পরিমার্জিত করুন। নিরাশাবাদী ও নেতিবাচক মানসিকতার লোকদের সঙ্গ ত্যাগ করুন। তাদের সঙ্গ আপনাকে সংশয়প্রবণতার দিকে ঠেলে দিবে। সাহসী, আশাবাদী, ইতিবাচক ও নীতিবান লোকদের সাথে ওঠাবসা করুন। তাদের সৎসঙ্গ আপনাকে সাহস যোগাবে এবং আশাবাদী করে তুলবে।

৯. নিজের জন্য উপযুক্ত কোনো ক্রীড়াদলে যোগদান করুন। খেলাধুলা ও আনন্দ-বিনোদনে নিজেকে উচ্ছল-প্রাণবন্ত রাখুন। এমন একটি খেলা ও প্রশিক্ষণ বেছে নিন যা আপনার মনে সাহস সঞ্চার করবে। আপনার মানসিকতাকে বলিষ্ঠ করে তুলবে। যেমন: বক্সিং, পর্বতারোহণ, ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতা, সাঁতার ইত্যাদি।

১০. শয়তানের প্ররোচনা ওয়াসওয়াসা থেকে আল্লাহর আশ্রয় গ্রহণ করুন। মনের যাবতীয় ভয়-শঙ্কা ও জল্পনা-কল্পনা দূর হয়ে যাবে। মনে রাখুন, মানসিক ভয়-ভীতির পেছনে শয়তানের কুমন্ত্রণা মূল ক্রীড়নক। আপনি যদি সফলভাবে এর মোকাবেলা করতে পারেন, তা থেকে নিজেকে মুক্ত রাখতে পারেন তাহলে আর কোনো ভয় নেই। ভয় করবেন একমাত্র আল্লাহকে। পবিত্র কুরআনের দিকনির্দেশনা মেনে চলুন:
إِنَّمَا ذَلِكُمُ الشَّيْطَنُ يُخَوِّفُ أَوْلِيَاءَهُ ۖ فَلَا تَخَافُوهُمْ وَخَافُونِ إِنْ كُنتُمْ مُؤْمِنِينَ﴾ [آل عمران: ١٧٥]
অর্থ: 'প্রকৃতপক্ষে সে তো শয়তান, যে তার বন্ধুদের ভয় দেখায়। সুতরাং তোমরা যদি মুমিন হয়ে থাক, তবে তাদেরকে ভয় করো না। বরং কেবল আমাকেই ভয় করো।' (আলে-ইমরান, ৩: ১৭৫)

১১. ভয়মুক্ত থাকার জন্য আপনাকে দু'টি পন্থা বাতলে দিচ্ছি। প্রথমত, নিজের চেষ্টা ও সাধ্যানুযায়ী যাবতীয় বৈধ উপায় অবলম্বন করুন। সামর্থ্যের সবটুকু বিলিয়ে দিয়ে কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে এগিয়ে যান। দ্বিতীয়ত, আল্লাহ তা'আলার ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস রেখে আপনার যাবতীয় বিষয় তাঁর যিম্মায় ন্যস্ত করুন। আপন রবের প্রতি সুধারণা পোষণ করুন। মনে রাখবেন, গোটা জগতের যাবতীয় বিষয় তাঁর একক ইচ্ছা ও নির্দেশে পরিচালিত হয়। তাঁর হাতেই সবকিছুর চাবিকাঠি।

১২. বাল্যকাল থেকেই সন্তানদের সুস্থ মানবীয় মূল্যবোধের ওপর গড়ে তুলতে হবে। কঠোর ও রূঢ় শাস্তি প্রয়োগ করা, ভয় দেখানো, ভীতিকর ভিডিও বা চিত্র উপস্থাপন করা ইত্যাদির কোনোটিই শিশুদের ক্ষেত্রে বাঞ্ছনীয় নয়। ভীরুতা-কাপুরুষতা ও ভয়-সংশয় থেকে দূরে রেখে সন্তানদের উদ্দাম সাহসিকতা ও গভীর আত্মবিশ্বাসের ছাঁচে গড়ে তুলতে হবে।

১৩. যতক্ষণ না মনের ভয়-সংশয় দূর হয়ে প্রশান্তি ও প্রফুল্লতা ফিরে আসে, আল্লাহ তা'আলার যিকির ও তাসবীহ-তাহলীল পাঠে মগ্ন থাকুন। প্রতিদিন কুরআন তিলাওয়াতে যত্নবান হোন। মানসিক অস্থিরতা ও ভয় কাটিয়ে ওঠার জন্য এবং আত্মিক স্বস্তি ও প্রশান্তি লাভ করার জন্য আল্লাহর যিকির ও কুরআন তিলাওয়াত হলো শ্রেষ্ঠ উপায়। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন:
﴿الَّا بِذِكْرِ اللَّهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوبُ ﴾ [الرعد: ٢٨]
অর্থ: 'মনে রেখ, কেবল আল্লাহর যিকিরই সেই জিনিস, যা দ্বারা অন্তরে প্রশান্তি লাভ হয়।' (রা'দ, ১৩: ২৮)

১৪. নিয়মিতভাবে সকাল-সন্ধ্যায় মাসনূন দু'আ পাঠ করুন। এ ক্ষেত্রে কোনো প্রকার অবহেলা ও গাফলতি ঠিক নয়। কেননা এ দু'আগুলো আপনার অকল্যাণ প্রতিরোধে মজবুত রক্ষাকবচ। তাতে এমন প্রতিরক্ষাব্যবস্থা নিহিত আছে যা আপনার মন-মানসিকতায় ভয়ের ছাপ পর্যন্ত ফেলতে দিবে না। সকাল-সন্ধ্যায় ফজর ও মাগরিব নামাযের পর বিশেষভাবে এ দু'আটি পাঠ করুন:
«اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْهَمَّ وَالْحَزَنِ، وَالْعَجْزِ وَالْكَسَلِ، وَالْبُخْلِ وَالْجُبْنِ، وَضَلَعِ الدَّيْنِ، وَغَلَبَةِ الرِّجَالِ». (مسند أحمد) ٢١ / ٧٣
অর্থ: 'হে আল্লাহ, দুশ্চিন্তা-অস্থিরতা, দুঃখ-বেদনা, অক্ষমতা ও অলসতা থেকে আমি আপনার কাছে পানাহ চাচ্ছি। পানাহ চাচ্ছি ভীরুতা, কাপুরুষতা ও কৃপণতা থেকে। আরও পানাহ চাচ্ছি ঋণের বোঝা ও নির্যাতন-নিপীড়ন থেকে।'

১৫. মনের যাবতীয় ভয়-সংশয় ছাপিয়ে অপরের কল্যাণে দান-সদকা, সেবা-শুশ্রূষা ও সাহায্য-সহযোগিতায় নিয়োজিত হোন। তাতে যে আত্মিক তৃপ্তি ও মানসিক প্রশান্তি পাবেন তা অনন্য অসামান্য। গুনাহ নাফরমানি ও পাপাচার থেকে বিরত থাকুন। কেননা তা অনেক মানসিক দুশ্চিন্তা ও দুর্ভাবনার কারণ, মানসিক সংকীর্ণতা ও আত্মিক ব্যাধির উপকরণ।

১৬. সৃষ্টির প্রতি কোনো আশা-ভরসা না রেখে স্রষ্টার দান ও প্রতিদানের সুসংবাদ ও প্রতিশ্রুতিতে আশাবাদী হোন। সমস্ত ক্ষতি ও অকল্যাণ প্রতিরোধে এবং সমূহ উপকার ও কল্যাণ লাভে আল্লাহ তা'আলার ওপর ভরসা করুন। তিনিই তো তাকদির ও নিয়তির ফায়সালাকারী। তিনি যা দান করেন তা রদ করার সাধ্য কারো নেই। তিনি যা রদ করেন তা দান করার সাধ্য কারো নেই।

১৭. মনের যাতো জল্পনা-কল্পনা ও ভীতি-সংশয়ের কাছে নিজেকে সঁপে দিবেন না। তাহলে তা আপনার মন-মস্তিষ্কের ওপর প্রবলভাবে জেঁকে বসবে। মানসিক স্বস্তি ও প্রশান্তি নষ্ট করে আপনার জীবনকে অসহনীয় করে তুলবে।

১৮. মনে রাখুন, যে ভয় নৈতিক ও যৌক্তিক, তা আপনার জন্য আসন্ন বিপদের সতর্কবার্তা। ধৈর্য ও স্থৈর্যের সাথে তা মোকাবেলা করার চেষ্টা করুন। ধৈর্যশীলদের জন্য রয়েছে আল-কুরআনের সুসংবাদ:
وَلَنَبْلُوَنَّكُمْ بِشَيْءٍ مِّنَ الْخَوْفِ وَالْجُوعِ وَنَقْصٍ مِّنَ الْأَمْوَالِ وَالْأَنفُسِ وَالثَّمَرَاتِ وَبَشِّরِ الصَّبِرِينَ﴾ [البقرة: ١٥٥]
অর্থ: 'আর দেখ, আমি অতিঅবশ্যই তোমাদের পরীক্ষা করব (কখনো) ভয়-ভীতি দ্বারা, (কখনো) ক্ষুধা দ্বারা এবং (কখনো) জান-মাল ও ফসলহানির মাধ্যমে। যেসব লোক (এরূপ অবস্থায়) সবর ও ধৈর্যের পরিচয় দেয়, তাদেরকে সুসংবাদ প্রদান করুন।' (বাকারা, ২: ১৫৫)

১৯. রাসূল ﷺ যখন কোনো ভয় ও শঙ্কা আঁচ করতেন বেলাল (রা.)-কে বলতেন, 'হে বেলাল, নামায কায়েম করে আমাদের প্রশান্তি দাও।' সুতরাং আপনিও ভয়-ভীতির মোকাবেলায় নামাযের আশ্রয় গ্রহণ করুন। কেননা নামায হলো আপনার চক্ষুশীতলতা, নিরাপত্তা ও শান্তির ঝর্ণাধারা।

২০. শুধু আজকের দিনটির জন্য পরিকল্পনা করুন। বর্তমান অবস্থা ও পরিস্থিতির জন্য নিজেকে প্রস্তুত করুন। অনাকাঙ্ক্ষিত ও অনাগত ভবিষ্যতের কথা ভেবে অজানা আশঙ্কা ও দুশ্চিন্তায় ভুগবেন না। মনে রাখুন, ভয়-ভীতি আপনার কোনো কাজে আসবে না। তা আপনার মৃত্যুকে একটুও বিলম্বিত করতে পারবে না। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন:
﴿وَلِكُلِّ أُمَّةٍ أَجَلٌ فَإِذَا جَاءَ أَجَلُهُمْ لَا يَسْتَأْخِرُونَ سَاعَةً وَلَا يَسْتَقْدِمُونَ﴾ [الأعراف: ٣٤]
অর্থ: 'প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্য এক নির্দিষ্ট সময় আছে। যখন সেই নির্দিষ্ট সময় এসে পড়ে, তখন তারা এক মুহূর্ত তার সামনে বা পেছনে যেতে পারে না।' (আ'রাফ, ৭: ৩৪)

২১. মানসিক ভয়-ভীতির পরিস্থিতিতে আপনার বন্ধুজন ও আত্মীয়-স্বজনের সাহায্য নিন। বিষয়টি নিয়ে তাদের সাথে আলোচনা করুন, যেন তারা আপনার সাহায্যে যথাযথ ভূমিকা পালন করতে পারে। পরিস্থিতি যতই জটিল হোক তাদের সাহায্য গ্রহণে কুণ্ঠিত হবেন না। অন্যথায় অবস্থা আরও জটিল আকার ধারণ করবে। প্রয়োজনে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হোন। তাঁর পরামর্শ মোতাবেক নিজেকে পরিচালিত করুন।

২২. যা করতে ভয় হয়, বারবার তা-ই করার চেষ্টা করুন। বিখ্যাত আমেরিকান সাহিত্যিক রাল্ফ ওয়াল্ডো এমারসন বলেছেন: 'যা করতে ভয় হয়, সর্বদা তা-ই করুন।' আপনার যদি গাড়ি চালাতে ভয় হয় তাহলে গাড়ি চালানোর প্রাক্টিস করুন। অনবরত চেষ্টা-প্রচেষ্টার মাধ্যমে অনেক দুঃসাধ্য সাধন হয়, অনেক ভয় ও শঙ্কার বিষয় অনায়াস হয়ে যায়। ভালোভাবে আয়ত্ত করার পর বারবার গাড়ি চালান। ধীরে ধীরে আপনার ভয় কেটে যাবে।

২৩. ভয় করবেন না। আপন রবের প্রতি সুধারণা পোষণ করুন। সুন্দর আগামীর সুসংবাদ গ্রহণ করুন। আল্লাহ তা'আলা আপনার পরম সহায়। আশা-ভরসা আপনার পাথেয়। সফলতা ও সৌভাগ্য আপনার নিত্যসঙ্গী।

২৪. অযাচিত ভয়-ভীতির পরিণামের কথা চিন্তা করুন। এর কারণে পরিবার ও সমাজে অনেক নেতিবাচক পরিস্থিতির শিকার হতে হবে। অনর্থক শঙ্কা-আশঙ্কা দেখে মানুষ ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে উঠবে। সুতরাং ভীতিপ্রবণ মানসিকতা পরিহার করাই বাঞ্ছনীয়।

২৫. নিজেকে বিশ্বাস করান যে, আপনি সাহসী। বাস্তবে সাহসী ভূমিকা পালন করুন। দ্বিধা-সংশয় ও হীনম্মন্যতা থেকে দূরে থাকুন। কেননা এ স্বভাব দু'টি আপনাকে ভীরু ও আত্মসমাহিত করে ছাড়বে। সাহসিকতার সাথে নিজের এক একটি অধিকার বুঝে নিন। যত বাধা-প্রতিবন্ধকতার শিকার হন-না-কেন, দুঃসাহসিকতার সঙ্গে এগিয়ে যান। নিজের যোগ্যতা ও প্রতিভা বিকাশ করুন।

২৬. আল্লাহ তা'আলা ছাড়া কাউকে ভয় করবেন না। কেননা আল্লাহর ভয় ও তাঁর একত্ববাদের বিশ্বাস আপনার মনে সুদৃঢ় আত্মবিশ্বাস জাগিয়ে তুলবে। আপনার জীবনকে অনাবিল প্রশান্তিতে ভরে দিবে। পক্ষান্তরে গায়রুল্লাহর ভয় সম্মান মর্যাদার স্থানে অসম্মান, সফলতা সৌভাগ্যের স্থলে দুঃখ-দুর্দশা এবং সুখ-সমৃদ্ধির পরিবর্তে দরিদ্রতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সুতরাং এক আল্লাহর ওপর ভরসা করুন। তাঁর ফায়সালার বাইরে কেউ আপনাকে একচুল ক্ষতি করতে পারবে না। পবিত্র কুরআনের বাণী:
﴿إِنَّمَا النَّجْوَى مِنَ الشَّيْطَنِ لِيَحْزُنَ الَّذِينَ آمَنُوا وَلَيْسَ بِضَارِهِمْ شَيْئًا إِلَّا بِإِذْنِ اللَّهِ وَعَلَى اللَّهِ فَلْيَتَوَكَّلِ الْمُؤْمِنُونَ ﴾ [المجادلة: ١٠]
অর্থ: 'এরূপ কানাকাকি হয় শয়তানের প্ররোচনায়, যাতে সে মুমিনদেরকে দুঃখ দিতে পারে। কিন্তু সে আল্লাহর ইচ্ছা ব্যতীত বিন্দুমাত্র ক্ষতি করতে পারে না। মুমিনদের উচিত কেবল আল্লাহরই ওপর ভরসা করা।' (মুজাদালা, ৫৮: ১০)

পরিশিষ্ট:
* যদি মর্যাদা ও গৌরব হৃত হয়, রুখে দাঁড়াও। সর্বজন শ্রদ্ধেয়, সকলের আস্থা ও ভরসার প্রতীকরূপে নিজেকে গড়ে তোল। বকরির নম্রতা ও নমনীয়তা ইহকালে তার কোনো কাজে আসেনি। সিংহের সাহসিকতা সর্বজন ঘৃণিত; কিন্তু তাতেই বা তার কী ক্ষতি? -আয়েয আল কারনী
* বিখ্যাত ইংরেজ কবি উইলিয়াম শেকসপিয়র (১৫৬৪-১৬১৬ খৃষ্টাব্দ) বলেছেন: 'ভীরু-কাপুরুষ ভয় কবলে এক জীবনেই হাজার বার মরে। আর সাহসী বীর মৃত্যুর স্বাদ একবারই গ্রহণ করে।'
* জনৈক দার্শনিক বলেছেন: 'বুলেটের বিকট আওয়াজে ভয় পাওয়ার কারণ নেই। কেননা যে বুলেটের আঘাতে তোমার মৃত্যু হবে তার শব্দ তুমি শুনতেও পাবে না।
* জনৈক দার্শনিক বলেছেন: 'পৃথিবীর সব ভয়েই ভীতির সঞ্চার হয়। একমাত্র আল্লাহর ভয়ে প্রশান্তি লাভ হয়।'
* বিখ্যাত মিশরীয় লেখক নাগীব মাহফুজ (১৯১১-২০০৬ খ্রিষ্টাব্দ) বলেছেন: 'ভয়-ভীতি আপনার মৃত্যুর পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারবে না। কিন্তু জীবন চলার পথে শক্ত প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াবে।'
* 'আমাদের মাঝে কেউ কেউ অন্ধ মাছের মতো। বিশাল সমুদ্রে থেকেও মনে করে, ছোট্ট পাত্রে আটকে আছে। আর আমরা মানবজাতি, ঈমান ও বিশ্বাসের সুবিশাল জগতে আমাদের সৃষ্টি; কিন্তু আমরা নিজেদের ভয়-ভীতি, দুঃখ-বেদনা ও বিরোধিতা বৈরিতার ঘেরাটোপে আটকে রেখেছি।' -আয়েয আল কারনী

টিকাঃ
৩১. মা'আরিজ, ৭০: ১৯
৩২. তাওবাহ, ৯: ৫১

📘 আল হাল্লু জীবন সমস্যার সমাধান > 📄 কৃপণতা

📄 কৃপণতা


আল্লামা আবুল ফারায ইস্পাহানী (রহ.) বলেন: 'কৃপণতা হলো দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে অর্থ ব্যয়ে কুণ্ঠিত হওয়া।'

বিশিষ্ট ভাষাবিদ আবুল আব্বাস ফুযূমী (রহ.) বলেন: 'কৃপণতা হলো আর্থিক দায়-দায়িত্ব পালন থেকে বিরত থাকা।'

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা মানবজাতিকে এবং হাদীস শরীফে রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর উম্মতকে কৃপণতা থেকে সতর্ক করেছেন। কৃপণতা হলো একটি জঘন্য স্বভাবদোষ ও চারিত্রিক ভ্রষ্টতা। শরীয়তের দৃষ্টিতে তা ঘৃণিত স্বভাব। কেননা তা ব্যক্তিকে পরোপকার ও পরার্থপরতা ছেড়ে আত্মপরায়ণতা ও স্বার্থপরতায় প্রলুব্ধ করে। অন্যদের যাবতীয় অধিকার থেকে বঞ্চিত করে অর্থ-বিত্ত কুক্ষিগত করতে এবং সুযোগ-সুবিধা বাগিয়ে নিতে প্ররোচিত করে।

কৃপণতার কারণে ব্যক্তির কপালে শুধু দুর্নাম ও নিন্দাই জোটে। এমনকি মৃত্যুর পরও এ দুর্নাম বয়ে বেড়াতে হয়। কৃপণতার মূল কারণ হলো সম্পদলিপ্সা ও জাগতিক সুযোগ-সুবিধা ভোগের উদগ্র বাসনা। ফলে কৃপণ মনে করে, সে যদি অন্যের কল্যাণে যতসামান্যও ব্যয় করতে থাকে তাহলে এতে সে একদিন নিঃস্ব হতদরিদ্রে পরিণত হবে।

সে মনে করে, টাকা ছাড়া কিছুই হয় না অর্থবিত্তই হলো যাবতীয় বিষয়ের একমাত্র উৎস ও নিয়ন্ত্রক। ফলে সে অর্থোপার্জনে যতটা তৎপর, অর্থসঞ্চয়ে তারচেয়ে দ্বিগুণ তৎপর। পর্যায়ক্রমে সে হয়ে উঠে অর্থ-সম্পদের অনুগত দাসানুদাস। অর্থবিত্ত তার একমাত্র কর্তৃত্ববান মনিব।

সুধি সমাজে এটা সর্বজনস্বীকৃত যে, অনুগত সেবক হিসেবে সম্পদ যতোটা উৎকৃষ্ট কর্তৃত্ববান মনিব হিসেবে ততটা নিষ্ঠুর নিকৃষ্ট। সুতরাং স্বয়ং ব্যক্তি যদি তার অর্থবিত্তের নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, যথাযথ খাতে ব্যয় করতে পারে তাহলে সে মহান মনিব। কিন্তু যদি সে সম্পদের অনুগত দাসে পরিণত হয় তাহলে তার মতো হতভাগা আর কে আছে!

ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ জীবনে কৃপণতা ও ব্যয়কুণ্ঠতা একটি মারাত্মক ব্যাধি। বিশেষভাবে সামাজিক জীবনে তা এক জটিল সমস্যা। এর জের ধরে বহু অনাকাঙ্ক্ষিত পরিবেশ-পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। এর থেকে বাঁচার উপায় কী? এর সঠিক সমাধান কী?

সমাধান:
১. কৃপণতা সম্পর্কে কুরআন-সুন্নাহয় যে সতর্কবাণী ও নিষেধাজ্ঞা এসেছে, সে সম্পর্কে জানুন। আপনার মধ্যে যে কৃপণতা দেখা দিবে, তার ক্ষতিকর দিকগুলোর কথা চিন্তা করুন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলার বাণী স্মরণ রাখুন:

وَمَنْ يَبْخَلُ فَإِنَّمَا يَبْخَلُ عَنْ نَّفْسِهِ وَاللَّهُ الْغَنِيُّ وَا نُتُمُ الْفُقَرَاء [محمد: ۳৮]

অর্থ: 'আর যে-কেউ কার্পণ্য করে, সে তো কার্পণ্য করে নিজে নিজেরই প্রতি। আল্লাহ অভাবমুক্ত এবং তোমরা অভাবগ্রস্ত।' (মুহাম্মাদ, ৪৭: ৩৮)

২. কখনো কি ভেবেছেন, যে সম্পদ আঁকড়ে ধরে রাখতে চাইছেন তার শেষ পরিণতি কী? এখন যে দান-সদকা করছেন না, যাকাত আদায় করছেন না, কাল কিয়ামতের দিন যখন আপন রবের সামনে দাঁড়াবেন, কী জবাব দিবেন? যারা সম্পদলিপ্সা ও অর্থবিত্ত সঞ্চয়ে আকণ্ঠ ডুবে আছে, কিয়ামতের দিন তাদের আক্ষেপ-অনুতাপের কথা স্মরণ করুন। সীমাহীন অনুতাপের জ্বালায় তারা বলবে (পবিত্র কুরআনের ভাষায়):

مَا اغْنَى عَنِّي مَالِيَهُ * هَلَكَ عَنِّي سُلْطَنِيَهُ﴾ [الحاقة: ২৯, ২৮]

অর্থ: 'আমার অর্থ-সম্পদ আমার কোনো কাজে আসল না। আমার থেকে আমার সব ক্ষমতা লুপ্ত হয়ে গেল।' (আল-হাক্কা, ৬৯: ২৮-২৯)

৩. বাস্তব সত্য উপলব্ধি করার চেষ্টা করুন। যে অর্থ-সম্পদ পুঞ্জীভূত করে রাখতে চাইছেন মৃত্যুর পর তার কানাকড়িও কবরে নিয়ে যেতে পারবেন না। এগুলো সবই আপনাকে ত্যাগ করে অন্যের মালিকানাধীন হয়ে যাবে। তাদের ভোগ্যপণ্যে পরিণত হবে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: يَتْبَعُ المَيِّتَ ثَلَاثُ، فَيَرْجِعُ اثْنَانِ وَيَبْقَى وَاحِدٌ، يَتْبَعُهُ أَهْلُهُ وَمَالُهُ وَعَمَلُهُ، فَيَرْجِعُ أَهْلُهُ وَمَالُهُ وَيَبْقَى عَمَلُهُ» (سنن الترمذي (٥٩٠/٤)

অর্থ: 'তিনটি বিষয় মৃতের ব্যক্তির সাথে চলবে। এরপর দু'টি ফিরে আসবে আর একটি থেকে যাবে (চিরকালের জন্য)। পরিবার-পরিজন, অর্থ-সম্পদ ও আমল তার সাথে চলবে। পরিবার-পরিজন ও অর্থ-সম্পদ ফিরে আসবে। থেকে যাবে শুধু তার আমল।' (তিরমিজী, ৪/৫৯০)

৪. মনে রাখুন, আপনার বর্তমান মালিকানাধীন সম্পদ কাল ত্যাজ্য সম্পত্তিতে পরিণত হবে। যথারীতি কোনো উত্তরাধিকারী তার বৈধ মালিক বনে যাবে। সে যদি আপনার সুযোগ্য নেক সন্তান হয় তাহলে আপনার কথা স্মরণ করবে। আপনার কল্যাণের দু'আ করবে। কিন্তু সে যদি হয় অবাধ্য অকৃতজ্ঞ তাহলে আপনার কষ্টার্জিত সম্পদ পাপাচার-অনাচারে অপচয় করে বেড়াবে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: يَقُولُ الْعَبْدُ : مَالِي، مَالِي، إِنَّمَا لَهُ مِنْ مَالِهِ ثَلَاثُ: مَا أَكَلَ فَأَفْنَى، أَوْ لَبِسَ فَأَبْلَى، أَوْ أَعْطَى فَاقْتَنَى، وَمَا سِوَى ذَلِكَ فَهُوَ ذَاهِبٌ، وَتَارِكُهُ لِلنَّاسِ» (صحيح مسلم) ٢٢٧٣/٤

অর্থ: 'বান্দা বলবে, 'হায় আমার সম্পদ! হায় আমার সম্পদ!' সম্পদের তিনটা অংশই শুধু তার কাজে আসবে। যা খেয়েছে, তা শেষ হয়ে গেছে। যা পরিধান করেছে, তা জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। আর যা দান করেছে, তা সঞ্চিত হয়ে আছে। এছাড়া বাকি সবই তার হাতছাড়া। এগুলো মানুষের জন্য রেখে যেতে হবে।' (মুসলিম, ৪/২২৭৩)

৫. অতীতের কৃপণ লোকদের অবস্থা লক্ষ করুন, ইতিহাসের পাতায় তারা শুধু নিন্দা-সমালোচনা ও হাস্য-পরিহাসের পাত্র হয়ে আছে। কৃপণতার কারণে তাদের ভাগ্যে জুটেছে শুধু সমালোচনা ও নিন্দা। উদারতার প্রশান্তি ও প্রতিদান তারা কখনো অর্জন করতে পারেনি। বিখ্যাত আরব কবি যুহাইর ইবনে আবূ সালমা (৫২০-৬০৯ খৃষ্টাব্দ) বলেছেন, 'কে আছে, যে সম্পদশালী হয়েও স্বগোত্রের সঙ্গে কৃপণতা করে বেড়াবে, আর সমাজের লোকেরা তার থেকে নির্মুখাপেক্ষী হয়ে ঘৃণাভরে স্মরণ করবে।'

৬. উদার, মহৎপ্রাণ ব্যক্তিদের সংস্পর্শে থাকুন। তাঁদের সান্নিধ্যে মহত্ত্ব ও উদারতার পাঠ গ্রহণ করুন। বদান্যতা ও দানশীলতার চর্চা করুন, যেন তা অভ্যাসে, পর্যায়ক্রমে স্বভাবজাত ও সৃষ্টিগত বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
السَّخِيُّ قَرِيبٌ مِنَ اللهِ قَرِيبٌ مِنَ الْجَنَّةِ قَرِيبٌ مِنَ النَّاسِ بَعِيدُ مِنَ النَّارِ، وَالبَخِيلُ بَعِيدٌ مِنَ اللَّهِ بَعِيدُ مِنَ الْجَنَّةِ بَعِيدٌ مِنَ النَّاسِ قَرِيبٌ مِنَ النَّارِ، وَالْجَاهِلُ السَّخِيُّ أَحَبُّ إِلَى اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ مِنْ عَابِدِ بَخِيل» (سنن الترمذي) ٤ / ٣٤٢

অর্থ: 'উদার-দানশীল আল্লাহ তা'আলার নৈকট্যপ্রাপ্ত। জান্নাতের নিকটবর্তী। লোকসমাজের প্রিয়পাত্র এবং জাহান্নাম থেকে দূরবর্তী। আর কৃপণ, সে তো আল্লাহর রহমত-বঞ্চিত। জান্নাত থেকে দূরে। মানুষের ভালোবাসা বঞ্চিত এবং জাহান্নামের সন্নিকটে। কৃপণ ইবাদতগুযার বান্দার তুলনায় নিরক্ষর দানশীলও আল্লাহ তা'আলার নিকট অধিক প্রিয়।' (তিরমিজী, ৪/৩৪২)

৭. মহান ব্যক্তিত্বের আদর্শ গ্রহণ করুন। উদারতা ও বদান্যতায় যিনি ছিলেন কল্যাণবাহী বায়ুর চেয়েও বেগবান। রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর জীবনে কোনো দিন কাউকে "না" বলে ফিরিয়ে দেননি।
কবি ফারায দাকের ভাষায়: مَا قَالَ لَا قَطُّ إِلَّا فِي تَشَهُدِهِ لَوْلَا التَّشَهُدُ كَانَتْ لَا ؤُهُ نَعَمُ
অর্থ: 'কখনো 'না' শব্দটি মুখে বলেননি। বলেছিলেন শুধু একবার-উম্মতকে একত্ববাদের কালিমা শিক্ষা দিতে গিয়ে। যদি একত্ববাদের এ কালিমা যদি না হতো তাহলে আজীবন তাঁর পবিত্র যবানে 'না' উচ্চারিত হতো না।'

৮. কৃপণতার মতো স্বভাব দোষ থেকে মুক্ত থাকার জন্য হাদীসে বর্ণিত দু'আটি সকাল-সন্ধ্যা পাঠ করুন: «اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ البُخْلِ، وَأَعُوذُ بِكَ مِنَ الْجُبْنِ».
অর্থ: 'হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে কৃপণতা থেকে পানাহ চাই। পানাহ চাই ভীরুতা ও কাপুরুষতা থেকে।' (বুখারী, ৮/৭৯)

৯. মনে রাখুন, কৃপণ ও অপচয়কারী কুরআন-সুন্নাহর দৃষ্টিতে নিন্দিত। আর উদার-দানশীল সম্মানের পাত্র। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: وَالَّذِينَ إِذَا أَنْفَقُوا لَمْ يُسْرِفُوا وَلَمْ يَقْتُرُوا وَكَانَ بَيْنَ ذَلِكَ قَوَامًا [الفرقان: ٦٧]
অর্থ: যারা ব্যয় করার সময়, না করে অপব্যয় এবং না করে কার্পণ্য, বরং তাদের পন্থা হল (বাড়াবাড়ি ও সংকীর্ণতার) মধ্যবর্তী ভারসাম্যমান পন্থা।' (ফুরকান, ২৫: ৬৭) সুতরাং কৃপণতা ও অপচয়-প্রবণতা বর্জন করে অর্থব্যয়ে মধ্যপন্থা অবলম্বন করুন। অর্থব্যয়ে এটাই পবিত্র কুরআনের নির্দেশিত পথ।

১০. কৃপণতা বহু ধরনের, বহু কিসিমের। কেউ তার জ্ঞান-বিদ্যার কার্পণ্য করে। কেউ তার অর্থবিত্তে ও স্বভাব-চরিত্রে কার্পণ্য করে। এ সমস্ত ক্ষেত্রে উদারতা ও মহানুভবতা বাঞ্ছনীয়। চেষ্টা করুন স্বভাব-চরিত্র থেকে কৃপণতা ঝেড়ে ফেলার। তাহলে মহান সত্তার প্রতিবেশিত্ব লাভ করতে পারবেন। হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, আল্লাহ তা'আলা জান্নাত সৃষ্টির পর তাকে কিছু বলার আদেশ করলেন। জান্নাত বলল: 'মুমিন বান্দাগণ সুনিশ্চিত সফল হবে।' আল্লাহ তা'আলা বললেন: 'আমার সম্মান ও মর্যাদার কসম! জান্নাতে কৃপণ আমার কাছেও আসতে পারবে না।'

১১. মনে রাখুন, উদারতা ও বদান্যতা হলো জাহান্নাম থেকে মুক্তির উপায়। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: قَالَ عَدِيٌّ: سَمِعْتُ النَّبِيَّ ﷺ يَقُولُ: «اتَّقُوا النَّارَ وَلَوْ بِشِقِّ تَمْرَةٍ». (صحيح البخاري) ٢ /١١٠
অর্থ: আদী ইবনে হাতেম (রা.) বলেন, আমি রাসূল ﷺ কে বলতে শুনেছি, 'এক টুকরা খেজুর সদকা করে হলেও জাহান্নাম থেকে বাঁচার চেষ্টা করো।' (বুখারী, ২/১১০)

১২. অল্প অল্প করে হলেও দানশীলতার চর্চা করুন। প্রতিদিন দরিদ্র-দুঃস্থদের দান করার জন্য মানিব্যাগে কিছু টাকা আলাদা করে রাখুন। এভাবে দান-সদকা আপনার অভ্যাসে পরিণত হবে। দানশীলতা আপনার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য হয়ে উঠবে।

পরিশিষ্ট:
* হাসতে মানা: কৃপণ লোকটি সবেমাত্র দুপুরের খাবার খাওয়ার জন্য খুব যত্ন করে ভুনা করা আস্ত ছাগলছানাটি খাবার টেবিলে পরিবেশন করছে। ঠিক তখনই তুফাইলি এসে হাজির। এমন উপাদেয় খাবারের বন্দোবস্ত দেখে তার তর সইল না। এমন গোগ্রাসে খেতে লাগল যে, কৃপণ লোকটি বলেই ফেলল: 'এমন খাবলে-ছোবলে খাচ্ছ, মনে হচ্ছে ছাগলছানা থেকে প্রতিশোধ নিচ্ছ। এর মা বুঝি তোমাকে শিংয়ের গুঁতায় আহত করেছে?' তুফাইলি বলল: 'জবাইকৃত ভুনা করা ছাগলছানার জন্য তোমারই বা এত দরদ উথলে উঠছে কেন, এর মা বুঝি তোমার ধাত্রীত্ব পালন করেছে?'

* আব্বাসী খেলাফতকালের বিখ্যাত কবি দি'বাল খুযায়ী (৭৬৫-৭৩৫ খৃষ্টাব্দ) এক কৃপণ যুবক সম্পর্কে বলেছেন:
إِنَّ هذا الفَتَى يَصُونُ رغيفاً ما إليه لناظر مِن سَبِيل
هُوَ فِي سُفْرَتَينِ مِنْ أَدَمِ الطائف في سلتين في منديل
خُتِمَتْ كُلُّ سَلَّةٍ بِحَدِيدٍ وسيور قددن من جلد فيل
في جراب، في جوف تابوت موسى والمفاتيح عند ميكائيل

অর্থ: 'এ যুবক একটা রুটি সংরক্ষণ করেছে এমনভাবে যে, কেউ সেটার দিকে নজর দেওয়ার কিংবা দেখে ফেলার উপায় নেই। রুটিটাকে তায়েফের শক্ত চামড়ার তৈরি দু'টি দস্তরে পেঁচিয়ে দু'টি ছোট ঝুড়িতে রেখেছে। ঝুড়ি দু'টি হাতির চামড়ার ফিতা দিয়ে বেঁধে লোহা দিয়ে সিলগালা করে দেওয়া হয়েছে। এরপর তা আরেকটি থলিতে পুরে মূসার সিন্দুকে সংরক্ষণ করা হয়েছে। যে সিন্দুকের চাবি মিকাঈলের কাছে।'

টিকাঃ
৩৩. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো কাউকে "না" বলে ফিরিয়ে দেননি। “না”-এর আরবী হলো لَا। ইসলামের কালিমার শুরুতেই এ لَا শব্দটিই বিদ্যমান। যেমন: لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ مُحَمَّدٌ رَسُولُ اللَّهِ। কবি ফারাযদাক তার কবিতায় রাসূলুল্লাহ -এর উদারতা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন, ইসলামের কালিমার এ لَا যদি না হতো, তাহলে জীবদ্দশায় তিনি কখনো না বলতেন না। (অনুবাদক)
৩৪. এক ব্যক্তির নাম।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00