📄 অহমিকা -আত্মগরিমা
অহমিকা হলো, ব্যক্তি অতিমাত্রায় আত্মতুষ্ট ও আত্মতৃপ্ত হয়ে শিক্ষা-দীক্ষা, অর্থবিত্ত, সুনাম-সুখ্যাতি, বংশ-মর্যাদা, দৈহিক গঠন, রূপ-লাবণ্য ও রুচিপ্রকৃতি ইত্যাদি যাবতীয় ক্ষেত্রে অন্যদের থেকে নিজেকে শ্রেষ্ঠ জ্ঞান করে। কোনো ক্ষেত্রে নিজেকে পিছিয়ে থাকতে দেখে ভীষণ হীনম্মন্যতায় ভোগে এবং অন্যের শ্রেষ্ঠত্ব দেশে হিংসার আগুনে জ্বলে।
এমন লোককে দেখবেন অহংকারী চালে চলাফেরা করে। কোনো সদুপদেশ গ্রহণ করতে চায় না। নিন্দা ও সমালোচনার মুখে ক্ষিপ্ত হয়। প্রশংসা-স্তুতি শুনে তুষ্ট হয়। কথাবার্তা, আচার-আচরণে শুধু অহমিকা ও দাম্ভিকতার উৎকট বহিঃপ্রকাশ। অন্যদের সে থোড়াই কেয়ার করে। নিজেকে নিয়েই সদা ব্যতিব্যস্ত। নিজস্ব যোগ্যতা ও বৈশিষ্ট্যে মহাতুষ্ট। অকপটে স্বীকার করে, দোষ-গুণ-এ দু'য়ে মিলেই মানুষ। কিন্তু কখনো নিজের দোষ-ত্রুটি চোখে পড়ে না।
তার একটাই চাওয়া, সর্ব ক্ষেত্রে তাকে সর্বোচ্চ সম্মান দেওয়া হোক। সর্বক্ষেত্রে তাকে মাননীয়-বরণীয় হিসেবে নির্বাচিত করা হোক।
এমন লোক সমাজে অসহ্য, অসহনীয়। সমাজের কেউ তাকে সাদরে গ্রহণ করে না। সবাই তার থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে চলে।
অহমিকা ও আত্মগরিমা হলো একটি স্বভাবজাত বিচ্যুতির পরিণতি। এ বিচ্যুতি থেকে মুক্ত হওয়ার উপায় কী?
সমাধান:
১. ভুল স্বীকার করার মানসিকতা লালন করুন। নিয়ম করে প্রতিদিন আত্ম-সমালোচনা করুন। নিজের ভুল-ত্রুটিগুলো শনাক্ত করে তা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করুন।
২. একবার ভেবে দেখুন, আমাদের আসল পরিচয় কী? কীসের থেকে আমাদের উৎপত্তি, আর কোথায় গিয়ে আমাদের সমাপ্তি? প্রথমে মাটি থেকে, তারপর শুক্রাণু থেকে মানুষের উৎপত্তি। পর্যায়ক্রমে গর্ভাশয়ের দুর্গন্ধ পানিতে তার বসবাস। এরপর বাহ্যিক পৃথিবীর জীবনে পদার্পণ। মৃত্যুর পর আবার মাটিতে সমর্পণ।
৩. অতীতের পরাক্রমশালী রাজা-বাদশা, প্রতাপশালী ও অর্থ-প্রাচুর্যের অধিকারী, এক সময় যারা ক্ষমতার দোর্দণ্ড প্রতাপ দেখিয়েছে, আজ তাদের কী পরিণতি? আজ তাদের প্রতাপ-প্রতিপত্তি কোথায়? সবাই তো মাটিতে মিশে একাকার।
৪. আল্লাহ তা'আলার দরবারে সবসময় একটি বিষয় প্রার্থনা করুন, তিনি যেন আপনাকে সুস্থ বিচারবুদ্ধি ও সরল পথের দিশা দান করেন। সত্যকে সত্যরূপে দেখার এবং স্বতঃস্ফূর্তভাবে তা গ্রহণ করার তাওফিক দান করেন।
৫. জেনে রাখুন, অহংকারী ও দাম্ভিক লোকের প্রতি মানুষের মনে চাপা ক্ষোভ ও অসন্তোষ কাজ করে। তার নিন্দা, সমালোচনা ও দুর্নাম সবার মুখে-মুখে। এসব অসন্তোষ ও নিন্দা মৃত্যুর পরও তার পিছু ছাড়ে না।
৬. আপনার চেয়েও মহৎ শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিদের সম্পর্কে জানুন। নবী-রাসূল ও মহান পূর্বসূরিদের জীবন চরিত পাঠ করুন। তাহলে আপনার মনে হবে, ব্যক্তি এক জীবনে যতই উন্নতি সাধন করুক, যতই সফলতা অর্জন করুক তার চেয়েও সফল সার্থক ব্যক্তির তুলনায় সে নিতান্ত সাধারণ।
৭. নিজের দোষত্রুটি, ভুল-বিচ্যুতি, দুর্বলতা ও সংকীর্ণতার ক্ষেত্রগুলোর কথা মনে রাখুন। তাহলে নিজেকে তুচ্ছ ও নগণ্য মনে হবে। অন্যকে বড় ভাবার ও সম্মান করার মানসিকতা গড়ে উঠবে।
৮. আল্লাহকে ভয় করুন। মনে রাখুন, মানুষের গুরুতর ও খুঁটিনাটি-যাবতীয় বিষয় তিনি দেখছেন। সে যে অহমিকা-দাম্ভিকতা, অহংকার-আত্মগরিমা প্রদর্শন করে বেড়াচ্ছে, এর জন্য আল্লাহ তা'আলার দরবারে তাকে কঠিন হিসাবের সম্মুখীন হতে হবে। কাল কিয়ামতের দিন বান্দা কখনো হিসাব দিয়ে পার পাবে না।
৯. অন্যের মতামত ও সিদ্ধান্তের যথার্থ মূল্যায়ন করুন। মনে রাখুন, কোনো মানুষ ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। আপনিও নন। সমাজে এমন অনেক মানুষ আছে, যারা বিবেক-বুদ্ধি, চিন্তা-চেতনা, শিষ্টাচার ও আদর্শে আপনার চেয়ে উন্নত, আপনার চেয়ে শ্রেষ্ঠ।
১০. নিজেকে তুলনামূলক দৃষ্টিতে বিচার করুন। শক্তিমত্তার বিচারে নিজেকে তুলনা করেন, তাহলে একটি সাধারণ ষাঁড় আপনার চেয়ে কয়েকগুণ শক্তিশালী। দ্রুততা ও ক্ষিপ্রতায় যদি নিজেকে তুলনা করেন, তাহলে ঘোড়া বহু গুণ এগিয়ে। বাহ্যিক অবয়ব ও দৈহিক বিশালতায় হাতির সামনে আপনি নিতান্ত ক্ষুদ্র মানব।
১১. মনে রাখুন, যোগ্যতা ও প্রতিভা আল্লাহ প্রদত্ত। আল্লাহ তা'আলা যখন ইচ্ছা, যেভাবে ইচ্ছা তা ছিনিয়ে নিতে পারেন। সুতরাং যে জিনিস ধরে রাখার সাধ্য মানুষের নেই, তা নিয়ে সে কীভাবে গর্ব করে, বড়াই করে!
১২. জেনে রাখুন, বহু নৈতিক ও চারিত্রিক বিচ্যুতির প্রধান কারণ হলো অহমিকা ও দাম্ভিকতা। ন্যায় ও সত্যবিমুখতা, অন্যদের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা, নিজের ইতিবাচক দিকগুলো রং চড়িয়ে প্রচার করা, ক্ষমতা ও প্রভাব-প্রতিপত্তির মোহ, অন্যের ঘাড়ে দোষ চাপানোর মতো বহু জঘন্য স্বভাবের নেপথ্য কারণ হলো অহংকার ও আত্মগরিমা।
১৩. মানুষ কীভাবে ভুলে যায় যে, সে অতি সামান্য দুর্বল প্রাণী! যেকোনো মুহূর্তেই সে অসুস্থ হতে পারে। মুহূর্তের ব্যবধানে তার মৃত্যু হতে পারে।
১৪. রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
وَإِنَّ اللَّهَ أَوْحَى إِلَيَّ أَنْ تَوَاضَعُوا حَتَّى لَا يَفْخَرَ أَحَدٌ عَلَى أَحَدٍ، وَلَا يَبْغِي أَحَدٌ عَلَى أَحَدٍ» (صحيح مسلم ٤ / ٢١٩٨)
অর্থ: 'আল্লাহ তা'আলা আমার কাছে এ প্রত্যাদেশ পাঠিয়েছেন যে, তোমরা পরস্পর বিনয় নম্রতা বজায় রাখ। কেউ যেন কারো ওপর বড়াই না করে। কেউ যেন কারো ওপর অবিচার না করে।' (মুসলিম, ৪/২১৯৮)
১৫. আপনার উন্নতি অগ্রগতির পথে অন্যদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান ভুলে যাবেন না। নিজেই নিজেকে সর্বেসর্বা ভেবে বসবেন না। জীবনের এ পর্যায়ে এসে আপনি যে উন্নতি ও সফলতা অর্জন করেছেন, তার পেছনে আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুজনদের আন্তরিক অবদান ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা অনস্বীকার্য। তা ছাড়া আপনার একার পক্ষে কখনো এ পর্যায়ে পৌঁছনো সম্ভব ছিল না।
১৬. কোনো মানুষ ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। সুতরাং নিজের ভুল স্বীকারে কুণ্ঠাবোধ করবেন না। যা সঠিক ও যথার্থ, আপনার বিপক্ষে হলেও আন্তরিকভাবে তা মেনে নিন। মনে রাখুন, ভুল স্বীকার করা নিজের দুর্বলতা ও অপমানের কারণ নয়। তা তো আপনার সদিচ্ছা ও নৈতিক সাহসিকতার পরিচায়ক।
১৭. সবার সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখুন। মানুষের আন্তরিকতা ও ভালোবাসার কদর করুন। অহংকার ও নিজের বড়ত্ব জাহির করে সম্পর্কের অবমূল্যায়ন করা সমীচীন নয়।
১৮. মানুষের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি বদলে ফেলুন। চারপাশের মানুষজন ও সমাজ-তাদেরও রয়েছে এমন কল্যাণ ও শ্রেষ্ঠত্বের অবদান, যা হয়তো আপনার অজানা। কিন্তু তার বদৌলতেই তারা আল্লাহ তা'আলার দরবারে শ্রেষ্ঠ মহান।
১৯. নিত্যদিনের সাংসারিক কাজকর্মগুলো নিজেই করার চেষ্টা করুন। এটাই ছিল রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর অনুপম আদর্শ। নিজ হাতে বকরির দুধ দোহন করতেন। কাপড়ে তালি যুক্ত করতেন। জুতা সেলাই করতেন। হাট-বাজার থেকে সদাই কিনে আনতেন। গরিব মিসকিনদের সাথে চলাফেরা করতেন। স্বভাবতই এসব কাজের দ্বারা মনের অহংবোধ ও আত্মগরিমা দূর হয়।
পরিশিষ্ট:
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: «لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ مَنْ كَانَ فِي قَلْبِهِ مِثْقَالُ ذَرَّةٍ مِنْ كِبْرٍ» অর্থ: 'যার মনে বিন্দু পরিমাণ অহংকার থাকবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না।' (মুসলিম, ১/৯৩)
আব্বাসীয় খেলাফতকালের বিখ্যাত আরব কবি আবু নাওয়াস (৭৬২-৮১৩ খ্রিষ্টাব্দ) বলেন: فَقُل لِمَن يَدَّعِي فِي العِلْمِ فَلْسَفَةً حفظت شَيئاً وَغَابَت عَنكَ أَشياءُ অর্থ: 'নিজেকে যে জ্ঞানী বলে জাহির করে তাকে বলে দাও, "তুমি যা অর্জন করেছ তা এক বিন্দুসম। এখনও যা বাকি আছে তা তো সমুদ্রসম।”
প্রখ্যাত লেবানিজ কবি ও লেখক জিবরান খলীল জিবরান (১৮৮৩-১৯৩১) বলেন: 'আপাদ-মস্তকে বহিরাঙ্গের চাকচিক্যটাকে সর্বোচ্চ মূল্য দিয়ো না। তাহলে একটি পর্যায়ে দেখবে, শুধু বহিরাঙ্গটাই চকমক করছে। আর যোগ্যতা ও শ্রেষ্ঠত্বের জায়গাটুকু শূন্য পড়ে আছে।'
মিশরীয় লেখক ও সাহিত্যিক তাওফীক হাকীম (১৮৯৮-১৯৮৭ খ্রিষ্টাব্দ) বলেছেন: 'অহমিকা, আত্মগরিমা হলো অজ্ঞতা ও মূর্খতার উৎকট রূপ।'
বিখ্যাত তাবেয়ী ইমাম হাসান বসরী (রহ.) (৬৪২-৭২৮ খ্রিষ্টাব্দ) বলেছেন: 'অহংকারীর অবস্থা হলো পাহাড়ের শীর্ষ চূড়ায় অবস্থানকারীর মতো। সে অন্যদের ছোট আকারে দেখে। অন্যরাও তাকে ছোটরূপে দেখে।'
📄 স্বার্থপরতা
স্বার্থপরতা হলো অন্যের ভালোমন্দ-বিবেচনা না করে কিংবা জলাঞ্জলি দিয়ে নিজের প্রয়োজনটাকে মুখ্য করে দেখা, মতলবটা হাসিল করে নেওয়া।
স্বার্থপরতা হলো নিজেকে সমস্ত সুযোগ-সুবিধা ও কল্যাণের একমাত্র হকদার মনে করা। স্বার্থপর লোক সীমাহীন আত্মতৃপ্তিতে ভোগে। নিজের প্রতি তার মুগ্ধতা চূড়ান্ত পর্যায়ের। সর্বদা নিজেকে নিয়েই মেতে থাকে। নিজের প্রশংসা-স্তুতির গালগল্প মুখে লেগে থাকে। অন্যদের ব্যাপারে তার কোনো উদ্যোগ-উদ্দীপনা যে নেই, তা নয়; কিন্তু তা শুধু অন্যদের দমিয়ে রেখে নিজের স্বার্থ সাধনের উদ্দেশ্যে। অন্যদের ভাগ্যে ভালোমন্দ কী জুটল, কি গোটা দুনিয়া ভেসে গেল, তাতে তার কিছুই যায় আসে না। নিজের ঝুলিতে কতটুকুন পুড়লো-তার কাছে এটাই মুখ্য। দিন শেষে তার ঝুলি কতোটুকু ভরেছে, এটাই তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
স্বার্থপর লোকের অভিধানে শব্দ মাত্র তিনটি: আমি, আমি এবং আমি। এর বাইরে সে একটা অক্ষরও বোঝে না, বোঝার চেষ্টাও করে না। এ কারণেই মানুষ তার সঙ্গে মিশতে চায় না, তার সংস্পর্শে স্বস্তি পায় না।
ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে স্বার্থপরতা এক জটিল সমস্যা। কেননা মানুষ হলো সমাজবদ্ধ প্রাণী, সমাজ ছাড়া সে একাকী বাঁচতে পারে না। আর স্বার্থপরতা হলো সমাজবিরুদ্ধ স্বভাব। তাছাড়া বিষয়টা শারীরিক নয়, মানসিক। এতে কোনো সন্দেহ নেই, শারীরিক সমস্যার চেয়ে মানসিক সমস্যাই বেশি গুরুতর।
সুখময় সুন্দর জীবনযাপনের জন্য এমন গুরুতর মানসিক সমস্যা থেকে মুক্তির বিকল্প নেই। কিন্তু উপায় কী? এ সমস্যার সমাধান কী?
সমাধান:
১. অন্যকে অগ্রাধিকার দেওয়ার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। স্বার্থপরতা নয়, পরার্থপরতাই ঈমানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: لَا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى يُحِبَّ لِأَخِيهِ مَا يُحِبُّ لِنَفْسِهِ অর্থ: 'তোমাদের কেউ সাচ্চা মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে নিজের জন্য যা পছন্দ করে, তার ভাইয়ের জন্য তা পছন্দ না করতে পারবে।' (বুখারী, ১/১২)
২. অন্যদের স্বার্থ মূল্যায়ন করতে হবে। আলোচনা-পর্যালোচনায় সুস্থিরতাই বাঞ্ছনীয়। প্রত্যেকের মতামত যথাযোগ্য বিবেচনা করতে হবে। অন্যদের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে নিজের স্বার্থ সিদ্ধির মানসিকতা ত্যাগ করতে হবে। কেননা তা অন্যের জন্য যতটুকু ক্ষতিকর, ব্যক্তি নিজের জন্য তার চেয়ে বেশি ক্ষতিকর।
৩. সমস্ত বিষয়ে অন্যদের দৃষ্টিতে চিন্তা করুন। নিজেকে অন্যের স্থানে দাঁড় করান। অন্যরা কী ভাবছে-তা বোঝার চেষ্টা করুন। কোনো ক্ষেত্রে প্রয়োজনটা কার বেশি, আপনার না কি অন্যদের-বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করুন। একরোখা হয়ে নিজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা সমীচীন নয়। কাজেকর্মে অন্যদের সাথে শামিল হোন। তাদের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়ান।
৪. যে বস্তুটার প্রয়োজন নেই, তা পাওয়ার জন্য মাত্রাতিরিক্ত আগ্রহ মানুষের মধ্যে স্বার্থপরতার জন্ম দেয়। তাই যে কোনো বিষয় মৌলিক প্রয়োজনের দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করুন। মনের চাহিদা ও চোখের ক্ষুধা মেটাতে উদগ্রীব হবেন না।
৫. বোঝার চেষ্টা করুন, সর্বক্ষেত্রে আবশ্যক নয় যে, আপনাকেই সবার আগে থাকতে হবে। এর প্রয়োজনও নেই। যেমন: সড়কের পাশে অপেক্ষমাণ যাত্রীরা সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মসজিদে মুসল্লিগণ কাতারবদ্ধ হয়ে বসে আছে। কোনো প্রয়োজন নেই সবাইকে ডিঙিয়ে সামনে যাওয়ার।
৬. পবিত্র কুরআনের এ আয়াতটি মনে রাখুন। তাতে সাহাবায়ে কেরাম (রা.)-এর নিজেদের স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে অন্যদের স্বার্থ রক্ষার আদর্শ তুলে ধরা হয়েছে:
﴿وَيُؤْثِرُونَ عَلَى أَنْفُسِهِمْ وَلَوْ كَانَ بِهِمْ خَصَاصَةٌ﴾ [الحشر: ٩]
অর্থ: 'এবং নিজেরা অভাবগ্রস্ত হওয়া সত্ত্বেও তাদেরকে নিজেদের ওপর অগ্রাধিকার দেয়।' (হাশর, ৫৯: ৯)
৭. আল্লাহ তা'আলা আপনাকে যে নিয়ামত দান করেছেন, যে অর্থবিত্তের মালিক বানিয়েছেন তা থেকে অভাবী ও অভাবগ্রস্তকে দান করুন। এতে দু'টি কল্যাণ নিহিত: এক. আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে বিরাট প্রতিদান লাভ। দুই. স্বার্থপরতার মতো ঘৃণ্য স্বভাব থেকে নিস্তার।
৮. সমাজ-সেবামূলক কাজে উদ্যোগী হোন। সেবামূলক উদ্যোগ হলো আতরের মতো-আতরের সুবাসে ক্রেতা-বিক্রেতা ও বহনকারী প্রত্যেকেই সুবাসিত হয়। অনুরূপ সেবামূলক উদ্যোগে ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ সর্বশ্রেণি উপকৃত হয়।
যদি মানসিক অস্থিরতার শিকার হন তাহলে পরোপকারে সচেষ্ট হোন। স্বেচ্ছাসেবী দাতব্য সংস্থার কাজে অংশগ্রহণ করুন। দরিদ্রকে দান করুন। দুর্বলকে সাহায্য করুন। এসব কাজের মাধ্যমে আপনি অপার্থিব আনন্দ লাভ করতে পারবেন। মানুষের মুখে প্রশংসা, দু'আ ও কল্যাণ কামনা হবে আপনার বাড়তি পাওনা।
একটি বিষয় সুনিশ্চিত, আপনি যা ভোগ করছেন তা নিঃশেষ হয়ে যাবে। আর যা দান করছেন তা-ই শুধু অবশিষ্ট থাকবে। তাহলে কেন ক্ষণস্থায়ী বিষয় রেখে চিরস্থায়ী বিষয়ের পেছনে ছুটছেন?
৯. যারা আপনার উপকার করে, হোক না তাদের উপকার ক্ষুদ্র সামান্য, তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ হোন। আপনার প্রতি অন্যদের ভালোবাসার কদর করুন। এর ফলে আপনার প্রতি তাদের ভালোবাসা ও আন্তরিকতা অটুট থাকবে এবং স্বভাব-চরিত্র স্বার্থপরতার দোষমুক্ত হবে।
১০. আত্মীয়-স্বজন, বন্ধুমহল ও পাড়াপ্রতিবেশীর সাথে নানা উদ্যোগ-আয়োজনে অংশগ্রহণ করুন। সমাজের দশজনের সাথে এক হয়ে চলুন। সার্বিক ও সামাজিক উদ্যোগে পরস্পর বহু জিনিস আদান-প্রদান হয়। অন্যের স্বার্থে কাজ করার সুযোগ হয়। এর মাধ্যমে আত্মকেন্দ্রিকতা ও স্বার্থপরতা দূর হতে থাকে।
১১. সন্তানদের কুরআন-সুন্নাহর আদর্শে গড়ে তুলতে হবে। হিংসা-বিদ্বেষ ছেড়ে পরস্পর সহযোগিতা ও পরার্থপরতায় অনুপ্রাণিত করতে হবে।
১২. অন্যদের সামনে সন্তানের অপমান করা, তাদের ব্যক্তিত্ব খাটো করা ঠিক নয়। কেননা কখনো-কখনো এমন আচরণের কারণে সন্তানদের মনে স্বার্থপরতা দানা বাঁধতে শুরু করে। সমবয়সিদের প্রতি ঘৃণা জন্মাতে থাকে।
১৩. মনে রাখুন, স্বার্থপরতা নিছক স্বার্থপরতা-ই নয়; পর্যায়ক্রমে তা আপনার মনে অহংকার, হিংসা ও ঘৃণা-বিদ্বেষ সৃষ্টি করবে। সুতরাং নিজেকে এসব স্বভাবদোষে কলুষিত করা থেকে বিরত থাকুন।
১৪. স্বার্থপর লোক সবার কাছেই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘৃণিত। কেউ তাকে পছন্দ করে না। তার সংস্পর্শে স্বস্তিবোধ করে না। কেননা সর্বক্ষেত্রেই সে নিজেকে প্রাধান্য দিতে সচেষ্ট। নিজেরটা বাগিয়ে নিতে সিদ্ধহস্ত।
১৫. মা-বাবাকে সন্তানদের মধ্যে সমতা বজায় রাখতে হবে। আচার-আচরণে ও আদর-স্নেহে যেন পক্ষপাতিত্ব ও প্রান্তিকতার ছাপ না থাকে। কেননা তা সন্তানদের মাঝে বিভাজন সৃষ্টি করে। পারস্পরিক সম্প্রীতি ও ভালোবাসার সম্পর্কের অবনতি ঘটায়। তারা শুধু নিজেকে নিয়ে ভাবতে শুরু করে।
১৬. সামান্য বিষয়ে বাচ্চাদেরকে শাস্তি দেওয়ার মানসিকতা পরিহার করতে হবে। কখনো কখনো এ কারণে বড় হওয়ার পর তাদের মনে স্বার্থপরতা কাজ করে। নিজের মতো অন্যদেরকে শাস্তি পেতে দেখে তৃপ্তি বোধ করে।
১৮. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনচরিত ও শ্রেষ্ঠ কল্যাণ যুগের মহান পূর্বসূরি-সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়ীন ও তাবে তাবেয়ীন ও পরবর্তী যুগের মহামনীষীগণের জীবনচরিত পাঠ করুন। তাঁদের মহান আদর্শ ও মতাদর্শ থেকে পাঠ গ্রহণ করুন। নিজের স্বার্থকে প্রাধান্য না দিয়ে অন্যের স্বার্থে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁরাই হলেন আমাদের অনুপম আদর্শ।
পরিশিষ্ট:
বিশিষ্ট স্কটিশ দার্শনিক ও ঐতিহাসিক টমাস কার্লাইল (১৭৯৫-১৮৮১) বলেছেন: 'স্বার্থপরতা ও আত্মকেন্দ্রিকতা হলো যাবতীয় স্বভাব-বিচ্যুতির মূল কারণ।'
বিশ্ববিখ্যাত গ্রিক বিজ্ঞানী ও দার্শনিক অ্যারিস্টটল বলেছেন: 'মহান আদর্শবান ব্যক্তি অন্যের প্রয়োজন অনুভব করে এবং পরোপকারে সচেষ্ট থাকে।'
প্রখ্যাত লেবানিজ কবি ও লেখক জিবরান খলীল জিবরান (১৮৮৩-১৯৩১) বলেন: 'যে তোমার চেয়ে অধিক প্রয়োজনগ্রস্ত, তাকে দান করাই উদারতা নয়, নিজের প্রয়োজনটাকে উপেক্ষা করে প্রয়োজনীয় বস্তু দান করাই হলো প্রকৃত উদারতা।'
বিখ্যাত আরব দানবীর হাতেম তাঈ কবিতার ভাষায় বলেছেন:
أما وَالَّذِي لَا يَعْلَمُ الغَيبَ غَيرُهُ وَيُحْيِي العِظامَ البيضَ وَهِيَ رَمِيمُ
لَقَد كُنتُ أَطوي البطن والزاد يُسْتَهى مخَافَةَ يَوماً أَن يُقَالَ لَئِيمُ
অর্থ: 'অদৃশ্যের দ্রষ্টা ও পুনরুত্থানের স্রষ্টার শপথ করে বলছি, উপাদেয় খাবার খাওয়ার সাধ্য থাকার পরও সবার সাথে অভুক্ত থেকেছি; পাছে লোকে না আবার আমাকে নীচ-ইতর বলে।'
📄 অজ্ঞতা ও মূর্খতা
অজ্ঞতা ও মূর্খতা, জ্ঞানবিদ্যার পরিপন্থি, বর্তমান বিশ্বে যা মহা সংকট হিসেবে পরিগণিত। মূর্খতা হলো কোনো বিষয় তার আসলরূপে ও বাস্তবিক অর্থে না জানা। মূর্খতার কারণে মানুষ ভুল পথে পরিচালিত হয়। যত অন্যায়-অনাচার, যুলুম-অত্যাচারে লিপ্ত হয়। পর্যায়ক্রমে ধর্মহীনতা ও কুফুরির দিকে ধাবিত হয়। আল্লাহর নবী মূসা (আ.) অজ্ঞতা ও মূর্খতা থেকে আল্লাহর কাছে পানাহ চেয়েছেন। পবিত্র কুরআনের ভাষায়:
﴿قَالَ أَعُوذُ بِاللَّهِ أَنْ أَكُونَ مِنَ الْجَهِلِينَ﴾ [البقرة: ٦٧]
অর্থ: 'সে বলেছিল, আমি আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি, যেন আমি মূর্খদের অন্তর্ভুক্ত না হই।' (বাকারা, ২: ৬৭)
বনী ইসরাইল মূসা (আ.)-কে বলেছিল:
﴿قَالُوا أَتَتَّخِذُنَا هُزُوًا﴾ [البقرة: ٦٧]
অর্থ: 'তুমি কি আমাদের উপহাস করছ?' (বাকারা, ২: ৬৭)
নূহ সম্প্রদায়ের ওপর যখন আল্লাহ তা'আলার আযাব-সর্বগ্রাসী প্লাবন-নেমে এল, নূহ (আ.) তাঁর কাফের পুত্রের মুক্তি কামনা করলেন। আল্লাহ তা'আলা তাঁর উদ্দেশ্যে বললেন:
﴿إِنِّي أَعِظُكَ أَنْ تَكُونَ مِنَ الْجَهِلِينَ﴾ [هود: ٤٦]
অর্থ: 'আমি তোমাকে উপদেশ দিচ্ছি, তুমি অজ্ঞদের লোকদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না।' (সূরা হুদ, ১১: ৪৬)
পবিত্র কুরআনের যে শব্দটি সর্বপ্রথম নাযিল হয়েছে এবং রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর পবিত্র যবানে উচ্চারিত হয়েছে তা হলো, اقْرَأْ অর্থাৎ, পড়। এতে প্রমাণিত হয়, ইসলাম জ্ঞানার্জনে উদ্বুদ্ধ করে, মূর্খতা নিরক্ষরতা দূরীকরণে অনুপ্রাণিত করে।
বর্তমান বিশ্বে যত বিভেদ-সংঘাত, যুদ্ধ-বিগ্রহ, অর্থ-সম্পদ ও প্রাণের বিনাশ ঘটে চলছে তার অন্যতম কারণ হলো সুশিক্ষা ও নৈতিক শিক্ষার অভাব। মূর্খতা যখন কোনো জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে শিকড় গেড়ে বসে সে জাতির অধঃপতন ও ধ্বংস অনিবার্য। মূর্খতার অশুভ পরিণতি থেকে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ-কোনোটাই মুক্ত নয়। মূর্খতা হলো সর্বব্যাপী সংকট। তা থেকে বাঁচার উপায় নিম্নরূপ:
সমাধান:
১. অজ্ঞতা ও মূর্খতা থেকে বাঁচার প্রথম পদক্ষেপ হলো নিজের অজ্ঞতা দিকগুলো শনাক্ত করা। দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়ে জ্ঞানার্জনে নিয়োজিত হওয়া। জ্ঞানার্জনের পথে আল্লাহ তা'আলা রাসূল ﷺ-কে এ দু'আ শিখিয়ে দিয়েছেন (পবিত্র কুরআনের ভাষায়):
وَقُلْ رَّبِّ زِدْنِي عِلْمًا [طه: ١١٤]
অর্থ: 'এবং আপনি বলুন, হে আমার রব! আমার জ্ঞান বৃদ্ধি করে দিন।' (তোয়াহা, ২০: ১১৪)
২. শিক্ষা-দীক্ষামূলক ধারাবাহিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে এসব কার্যক্রমের ব্যাপক প্রচার-প্রসার করতে হবে। যেন সর্বশ্রেণির মানুষের মধ্যে শিক্ষা-দীক্ষাকেন্দ্রিক সচেতনতা গড়ে উঠে। অজ্ঞতা ও মূর্খতার অশুভ পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করতে হবে। জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শিক্ষার আলো ছাড়া পৃথিবীর বুকে কোনো জাতি সভ্যতা, সংস্কৃতি ও উন্নতির পথে এককদম অগ্রসর হতে পারেনি। আর যে জাতিই চূড়ান্ত অধঃপতন ও ধ্বংসের শিকার হয়েছে তার অন্যতম কারণ হলো মূর্খতা ও শিক্ষাবিমুখতা।
৩. শিক্ষার যাবতীয় উপায়-উপকরণ প্রস্তুত করে দেশের উন্নত শহর থেকে শুরু করে অনুন্নত প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রতিটি শিক্ষার্থীর হাতে পৌঁছে দিতে হবে। শিক্ষার মাধ্যম ও উপায়-উপকরণ যতো সহজলভ্য হবে, এর অবকাঠামো যতো মজবুত ও টেকশই হবে, দেশ ও জাতির শিক্ষার মান ততোই উন্নত হবে। "কবিগুরু” আহমদ শাওকী (১৮৬৮-১৯৩২) বলেন:
بِالْعِلْمِ وَالْمَالِ يَبْنِي النَّاسُ مُلْكَهُمُ لَمْ يُبنَ مُلْكَ عَلَى جَهْلٍ وَإِقْلَالِ
অর্থ: 'জ্ঞান-বিজ্ঞান ও অর্থ-সম্পদের ভিত্তিতে একটি জাতি তার রাজ্য গড়ে তুলতে পারে। কিন্তু অশিক্ষা ও মূর্খতার ওপর কোনো সমাজ ও রাজ্যের প্রতিষ্ঠা হয়নি, হতে পারে না।'
৪. মনে রাখতে হবে, মূর্খতা সমাজের সবচেয়ে জটিল সংকট। এর অশুভ পরিণতি সর্বব্যাপী, সর্বগ্রাসী। মূর্খ জাতি কখনো মর্যাদা ও গৌরব অর্জন করতে পারে না। বিশ্বজাতির কল্যাণে কোনো সুস্থ সভ্যতার বার্তা বহন করতে পারে না। এমনকি চলমান কোনো সভ্যতা-সংস্কৃতির সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারে না।
৫. সন্তানদের সুশিক্ষায় অনুপ্রাণিত করতে হবে। শিক্ষার গুরুত্ব ও তাৎপর্য বোঝাতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষাবিমুখতা এবং বর্তমানে ও অদূর ভবিষ্যতে এর অশুভ পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করতে হবে।
৬. পারিবারিক আয় উপার্জনের একটি উপযুক্ত অংশ শিক্ষাখাতে ব্যয় করা কর্তব্য। অন্ন-বস্ত্রের মতো শিক্ষা হতে হবে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। আন্দালুসী কবি আবূ ইসহাক আলবেরি (রহ.) (৪৫৯ হি.) বলেন:
وَما يُغْنيك تشييد المباني إذا بِالجَهْلِ نَفْسَكَ قَد هَدَمتا جعلت المال فَوقَ العِلم جهلاً لعمرُكَ في القضية ما عدلتا
অর্থ: 'এসব দুর্ভেদ্য প্রাচীর নির্মাণ তোমার কী কাজে আসবে, যদি মূর্খতার বশে নিজ হাতেই তা ধ্বংস করে দাও। অজ্ঞতাবশ বিদ্যা-বুদ্ধির ওপর অর্থ-সম্পদকে প্রাধান্য দিয়েছ, কসম করে বলছি, তোমার এ সিদ্ধান্ত ন্যায়ানুগতা বঞ্চিত।'
৭. সাধারণ মানুষকে শিক্ষার গুরুত্ব ও তাৎপর্য বোঝাতে হবে। এ সম্পর্কে কুরআন-সুন্নাহর আলোচনা ও মুসলিম মনিষীগণের বাণী তুলে ধরতে হবে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা হুদহুদ পাখি ও পিপীলিকার ঘটনা বলেছেন। কেননা তারা নিজ নিজ অবস্থানে থেকে বিদ্যা-বুদ্ধি ও বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছিল।
৮. ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজে-সর্বক্ষেত্রে শিক্ষার মান সমুন্নত করতে হবে। শিক্ষাগত যোগ্যতাকে মর্যাদা ও সম্মানের দৃষ্টিতে বিবেচনা করা আবশ্যক। শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রতিযোগিতামূলক মানসিকতা গড়ে তোলার পাশাপাশি সফল কৃতকার্য শিক্ষার্থীদের পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত করতে হবে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন:
يَرْفَعِ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا مِنْكُمْ وَالَّذِينَ أُوتُوا الْعِلْمَ دَرَجَتِ [المجادلة: ١١]
অর্থ: 'তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে ও যাদেরকে জ্ঞান দান করা হয়েছে, আল্লাহ তাদেরকে মর্যাদায় সমুন্নত করবেন।' (মুজাদালা, ৫৮: ১১)
৯. প্রতিভাবান শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার বিশেষ সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা আবশ্যক। শিক্ষাঙ্গনে দেশের সফল কৃতকার্য শিক্ষার্থীদের উপযুক্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিতে হবে। যেন তারা দেশ ও জাতির উন্নতি-অগ্রগতিতে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে। আগামীর তরুণ প্রজন্মকে শিক্ষিত আলোকিতরূপে গড়ে তোলার লক্ষ্যে যথার্থ অবদান রাখতে পারে।
১০. “শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড”-শিক্ষার ক্ষেত্রে এ মূলনীতিই চূড়ান্ত। শিক্ষার আলো ও অশিক্ষার অন্ধকার কখনো এক হতে পারে না। শিক্ষিত ও অশিক্ষিত কখনো সমান হতে পারে না। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেন:
قُلْ هَلْ يَسْتَوِي الَّذِينَ يَعْلَمُونَ وَالَّذِينَ لَا يَعْلَمُونَ﴾ [الزمر: 9]
অর্থ: 'বল; যারা জানে এবং যারা জানে না, তারা কি সমান হতে পারে?' (সূরা যুমার, ৩৯: ৯)
১১. মাদরাসা, বিশ্ববিদ্যালয় ও বিষয়ভিত্তিক ইনস্টিটিউট গড়ে তোলার জন্য দেশের ব্যবসায়ী ও বিত্তবান শ্রেণিকে অনুপ্রাণিত করতে হবে। এটা তাদের জাতীয় ও মানবিক দায়িত্বও বটে। কোনো অবস্থাতেই তা এড়ানোর সুযোগ নেই।
১২. জ্ঞানার্জনের পথে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর চিরন্তন বাণীই হলো মূল আদর্শ:
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: وَمَنْ سَلَكَ طَرِيقًا يَلْتَمِسُ فِيهِ عِلْمًا، سَهَّلَ اللَّهُ لَهُ بِهِ طَرِيقًا إِلَى الْجَنَّةِ». (صحيح مسلم) ٤ / ٢٠٧٤
অর্থ: আবূ হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল ﷺ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'জ্ঞানার্জনের উদ্দেশ্যে যে ব্যক্তি কোনো পথ অবলম্বন করবে আল্লাহ তা'আলা তার জান্নাতের পথ সহজ করে দিবেন।' (মুসলিম, ৪/২০৭৪)
১৩. জ্ঞানী-গুণী ও বিদ্বান ব্যক্তিদের সাহচর্য গ্রহণ করতে হবে। তাঁরা হলেন নবীগণের প্রকৃত ওয়ারিশ। আবু দারদা (রা.) থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
إِنَّ العُلَمَاءَ وَرَثَةُ الأَنْبِيَاءِ، إِنَّ الأَنْبِيَاءَ لَمْ يُوَرِّثُوا دِينَارًا وَلَا دِرْهَمًا إِنَّمَا وَرَّثُوا العِلْمَ، فَمَنْ أَخَذَ بِهِ أَخَذَ بِحَقٍّ وَافِرٍ». (سنن الترمذي) ٥ / ٤٩
অর্থ: 'আলেমগণই হলেন নবীগণের উত্তরাধিকারী। কেননা নবীগণ ত্যাজ্য সম্পত্তি হিসেবে 'দিনার-দিরহাম' রেখে যাননি। রেখে গিয়েছেন শুধু ইলম ও জ্ঞান। যে ব্যক্তি তা গ্রহণ করতে পারবে, সে বিরাট কিছু লাভ করবে।' (ইবনে মাযাহ্, ৫/৪৯)
পরিশিষ্ট:
* আমিরুল মু'মিনীন আলী ইবনে আবু তালেব (রা.) (৪০ হি.) বলেছেন: 'ইলম ও জ্ঞানের মর্যাদা এমনই যে, যার জ্ঞান নেই সে-ও নিজেকে জ্ঞানী বলে পরিচয় দিয়ে গর্ববোধ করে। আর অজ্ঞতা-মূর্খতা এতটাই ঘৃণ্য যে, মূর্খ লোকও নিজেকে মূর্খতার দায়মুক্ত করতে পেরে স্বস্তি বোধ করে।'
* আন্দালুসী কবি আবু ইসহাক আলবেরি (৯৮৫-১০৬৭ খৃষ্টাব্দ) বলেছেন:
وَكِنْزاً لا تَخافُ عَلَيْهِ لِيّاً خفيفَ الحَمْلِ يوجَدُ حَيْثُ كُنتا
يَزيدُ بِكَثْرَةِ الإنفاقِ مِنْهُ وَيَنْقُصُ أنْ بِهِ كَفّا شَدَدْنا
অর্থ: 'জ্ঞান-বিজ্ঞান হলো এমন ভাণ্ডার, যা চুরি হওয়ার ভয় নেই। নিতান্তই হালকা। সর্বত্র বহনযোগ্য। জ্ঞানের আলো যত ছড়াবে ততই বৃদ্ধি পাবে। কিন্তু যখনই জ্ঞানের প্রচার-প্রসার বন্ধ হবে ধীরে-ধীরে তা সংকুচিত হতে থাকবে।'
* বিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন (১৮৭৯-১৯৫৫ খ্রিষ্টাব্দ) বলেছেন: 'ধর্মীয় শিক্ষা ছাড়া জ্ঞান-বিজ্ঞান খোঁড়া অচল। আর জ্ঞানের আলো ছাড়া ধর্মকর্ম অন্ধ-আলোহীন।'
* মিশরীয় সাহিত্যিক ও চিন্তাবিদ আব্বাস মাহমুদ আক্কাদ (১৮৮৯-১৯৬৪ খ্রিষ্টাব্দ) বলেছেন: 'যখন কোনো বই পড়ি বইয়ের কালো হরফগুলোই শুধু পড়ি না, বইয়ের হৃদয়াত্মার সাথে মিশে যাই।'
* ফরাসি দার্শনিক র্যনে দেকার্ত (১৫৯৬-১৬৫০ খ্রিষ্টাব্দ) বলেছেন: 'জ্ঞান-বিজ্ঞানই হলো বিশ্বে সর্ববৃহৎ শক্তি।'
📄 হিংসা
জ্ঞান-গরিমা, অর্থ-সম্পদ, সুনাম-সুখ্যাতি, বংশ-মর্যাদা, পদমর্যাদা ইত্যাদি যাবতীয় ক্ষেত্রে কারো উৎকর্ষতা ও শ্রেষ্ঠত্ব দেখে গা জ্বালা করা, তার সবটুকু ছিনিয়ে নিয়ে এককভাবে নিজেই ভোগ-দখল করার উদগ্র বাসনার নামই হিংসা। হিংসা হলো ‘দোধারি’ তলোয়ার, যেভাবেই চালানো হোক, ক্ষতি অনিবার্য।
হিংসুক নিজেই হিংসার আগুনে জ্বলে, অন্যের ক্ষতি সাধন করে একক দখলদারিত্ব কায়েম করার উদগ্র বাসনায় অস্থির হয়ে উঠে। হিংসার গুনাহ ও পাপের বোঝা বহন করার সঙ্গে সঙ্গে নেক আমলসমূহ বরবাদ করে। অপর দিকে ভুক্তভোগী শ্রেণি হিংসুক-কর্তৃক নানা প্রতিকূলতা ও বিপত্তির শিকার হয়। হিংসার কবলে তাদের স্বাভাবিক শান্তিপূর্ণ জীবনযাত্রা ক্রমশ অসহনীয় ও দুর্বিষহ হয়ে উঠে।
হিংসা মানুষের স্বভাবজাত ব্যাধি। এর কারণে সমাজে বাদবিবাদ, বিদ্বেষ, শত্রুতা, অন্যায়-অনাচার, যুলুম-অত্যাচারের মতো জঘন্য অপকর্মের সূত্রপাত হয়। তাই হিংসা বর্জনের অপরিহার্যতা অনস্বীকার্য। কিন্তু তার উপায় কী? এ জটিল সমস্যার সমাধান কী?
সমাধান:
১. মানুষমাত্রই তার মনে হিংসার উদ্রেগ হবে এবং এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আক্রোশ ভরে মনের মধ্যে হিংসা পুষে রাখা দূষণীয়। যে কোনোভাবে তা দমন করাই বাঞ্ছনীয়। তাই অন্যের যোগ্যতা, দক্ষতা, সুযোগ-সুবিধা ও অর্থপ্রাচুর্যের দিকে না তাকিয়ে, আল্লাহ তা'আলা আপনাকে যে অগণিত নিয়ামত দান করেছেন, তার কথা স্মরণ করুন। তাহলে দেখবেন, এমন বহু নিয়ামত আপনার ভাগ্যে জুটেছে, যা পাওয়ার জন্য অন্যরা উদগ্রীব হয়ে আছে।
২. একবার ভেবে দেখুন, হিংসার কারণে আপনার নেক আমল বরবাদ হবে। মানসিক প্রশান্তি ব্যাহত হবে। নিত্যদিনের স্বাভাবিক শান্তিপূর্ণ জীবনযাত্রা বিঘ্নিত হবে। কেননা হিংসা হলো এমন আগুন যা সর্বপ্রথম হিংসুককেই জ্বালিয়ে মারে।
৩. মনে রাখুন, ইবলিসই হলো হিংসা-বিদ্বেষের মূল হোতা। তার দুষ্ট মনেই হিংসার প্রথম উৎপত্তি। জান্নাতে সে আদম (আ.)-কে হিংসা করেছিল। সুতরাং, কেউ যদি হিংসার বশবর্তী হয় সে হবে ইবলিসের অনুসারী। তার পরিণতি ভয়াবহ।
৪. ভুলে যাবেন না, সময় আবর্তনশীল। নিয়তি পরিবর্তনশীল। কালের দুর্যোগ-দুর্বিপাকে আপনি নিজেও আক্রান্ত হতে পারেন। তাই সর্বদা অন্যের মঙ্গল কামনা করা কর্তব্য। পরার্থপরতা ও পরোপকারে সচেষ্ট থাকা বাঞ্ছনীয়।
৫. ইবাদত ও সদাচারে সদা যত্নবান হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গুনাহ ও নাফরমানি পরিহারে সচেষ্ট হোন। তাকওয়া ও আল্লাহভীতি অবলম্বন করুন, তাহলে যাবতীয় অকল্যাণ অনিষ্ট থেকে সুরক্ষা পাবেন। পবিত্র কুরআনের আশ্বাসবাণী শুনুন:
وَإِنْ تَصْبِرُوا وَتَتَّقُوا لَا يَضُرُّكُمْ كَيْدُهُمْ شَيْئًا إِنَّ اللَّهَ بِمَا يَعْمَلُونَ مُحِيطٌ ﴿آل عمران: ۱۲۰﴾
অর্থ: 'আর যদি তোমরা ধৈর্য ধারণ কর ও তাকওয়া অবলম্বন কর, তাহলে তাদের চক্রান্ত তোমাদের কোনই ক্ষতি করতে পারবে না। তারা যা করে নিশ্চয়ই আল্লাহ তা'আলা তার পরিবেষ্টনকারী।' (আলে-ইমরান, ৩:১২০)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«احْفَظِ اللَّهَ يَحْفَظْكَ». (سنن الترمذي) ٤ /٦٦٧
অর্থ: 'আল্লাহ তা'আলার আদেশ-নিষেধ মেনে চল। তিনিই তোমাকে রক্ষা করবেন।' (তিরমিজী, ৪/৬৬৭)
৬. হিংসুকের সংস্পর্শ থেকে দূরে থাকুন। তার কাছেও যাবেন না। বন্ধু হিসেবে তো কখনই না। কেননা আপনার মঙ্গল ও ইতিবাচক ক্ষেত্রে সে কখনো স্বস্তিবোধ করবে না। তার একমাত্র অপচেষ্টা হলো আপনার শ্রেষ্ঠত্বের দিকটি ছিনিয়ে নিয়ে আপনাকে কল্যাণ-বঞ্চিত করা।
৭. দু'আ ও ইস্তেগফারের মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলার আশ্রয় গ্রহণ করুন। সকাল-সন্ধ্যায় সুন্নত অযীফাগুলো নিয়মিত আদায় করুন। শরীয়তে এমন অনেক আমলের দিকনির্দেশনা রয়েছে, যাবতীয় বিপদ-আপদ, সংকট ও প্রতিকূলতার মুখে যা আপনার রক্ষাকবচ-সে সমস্ত আমলে যত্নবান হোন। বিশেষভাবে 'মুআওয়াযাতাইন' দু'টি রক্ষাকবচ: সূরা ফালাক ও সূরা নাস নিয়মিত পাঠ করুন।
৮. হিংসুকের হিংসা মোকাবেলা করার জন্য, কিংবা তা থেকে বাঁচার জন্য সবচেয়ে কার্যকর পন্থা হলো-যদিও এর বাস্তবায়ন কষ্টসাধ্য; কেননা তা মানুষের স্বভাবজাত ও প্রচলিত মানসিকতা বিরোধী- হিংসুকের হিংসা-বিদ্বেষের মাত্রা যত তীব্র হোক, আপনি আন্তরিকতা, সদাচার ও ভালোবাসার পরিচয় দিন। সৌহার্দ্য ও প্রীতির নিদর্শনস্বরূপ তাকে হাদিয়া ও উপঢৌকন দিন। প্রফুল্লচিত্তে সহাস্য বদনে তার সাথে সাক্ষাৎ করুন। এটাই পবিত্র কুরআনের নির্দেশ ও দিকনির্দেশনা:
﴿وَلَا تَسْتَوِي الْحَسَنَةُ وَالسَّيِّئَةُ ۚ ادْفَعْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ فَإِذَا الَّذِي بَيْنَكَ وَبَيْنَهُ عَدَاوَةٌ كَأَنَّهُ وَلِيٌّ حَمِيمٌ﴾ [حم السجدة : ৩৪]
অর্থ: 'ভাল ও মন্দ সমান হতে পারে না। মন্দ প্রতিহিত কর উৎকৃষ্ট দ্বারা; ফলে তোমার সাথে যার শত্রুতা আছে সে হয়ে যাবে অন্তরঙ্গ বন্ধুর মত।' (হা-মীম সাজদা, ৪১: ৩৪)
৯. আপনার যোগ্যতা-দক্ষতা ও সুযোগ-সুবিধার কথা দশজনের কাছে প্রচার করবেন না। বিশেষভাবে হিংসুকের কাছে এসব বিষয় জাহির করা থেকে বিরত থাকুন। হিংসুকের হিংসা থেকে বাঁচার জন্য এটি একটি কার্যকর পন্থা। ইয়াকুব (আ.) তাঁর সন্তানদের এ পদ্ধতি বাতলে দিয়েছিলেন। সন্তানদের জনশক্তি ও একতাবদ্ধতার বিষয়টির ওপর যেন দুষ্ট লোকের নজর না লাগে। পবিত্র কুরআনের ভাষায়:
يُبَنِيَّ لَا تَدْخُلُوا مِنْ بَابٍ وَاحِدٍ وَادْخُلُوا مِنْ أَبْوَابٍ مُتَفَرِّقَةٍ
অর্থ: 'হে আমার পুত্রগণ! তোমরা এক দরযা দিয়ে প্রবেশ কর না, ভিন্ন ভিন্ন দরযা দিয়ে প্রবেশ করবে।' (ইউসুফ, ১২: ৬৭)
তাফসির বিশারদগণের অভিমত, রাজার দরবারে প্রবেশের সময় এ বিশেষ পন্থা অবলম্বনের উদ্দেশ্য ছিল, হিংসুক ও দুষ্ট লোকের 'বদনজর' থেকে বেঁচে থাকা।
১০. একমাত্র আল্লাহ তা'আলাকে ভয় করুন। কখনো যেন মনের মধ্যে 'গায়রুল্লাহর ভয়' স্থান না পায়। সুনিশ্চিত থাকুন, আপনি যদি আল্লাহ তা'আলার আশ্রয়ে থাকেন, কুরআন-সুন্নাহর নির্দেশিত যিকিরের রক্ষাকবচ ধারণ করেন তাহলে হিংসুকের হিংসা আপনার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। যালিমের যুলুম প্রতিফলিত হবে না। পবিত্র কুরআনের ভাষায়:
قُلْ لَنْ يُصِيبَنَا إِلَّا مَا كَتَبَ اللهُ لَنَا ﴾ [التوبة: ٥١]
অর্থ: 'বলুন, আল্লাহ আমাদের জন্য যা নির্ধারণ করে দিয়েছেন, তা ছাড়া অন্য কোন বিপদ-আপদ আমাদের ওপর আপতিত হবে না।' (তাওবা, ৯: ৫১)
সুন্নাহর ভাষায়: عَنْ ابْنِ عَبَّاسٍ قَال: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: وَاعْلَمْ أَنَّ الأُمَّةَ لَوِ اجْتَمَعَتْ عَلَى أَنْ يَنْفَعُوكَ بِشَيْءٍ لَمْ يَنْفَعُوكَ إِلَّا بِشَيْءٍ قَدْ كَتَبَهُ اللَّهُ لَكَ، وَلَوْ اجْتَمَعُوا عَلَى أَنْ يَضُرُّوكَ بِشَيْءٍ لَمْ يَضُرُّوكَ إِلَّا بِشَيْءٍ قَدْ كَتَبَهُ اللهُ عَلَيْكَ». (سنن الترمذي ٦٦٧/٤)
অর্থ: আবূ হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'জেনে রাখুন, গোটা জাতি যদি আপনার কল্যাণে একতাবদ্ধ হয় তবুও আল্লাহ তা'আলা আপনার ভাগ্যে যতটুকু কল্যাণের ফায়সালা করেছেন, এর অতিরিক্ত তারা একবিন্দু কল্যাণ সাধন করতে পারবে না। আর গোটা জাতি যদি আপনার ক্ষতি সাধনে সংবদ্ধ হয় তবুও আল্লাহর ফায়সালার বাইরে তারা আপনার একচুল পরিমাণও ক্ষতি করতে পারবে না।' (সুনানে তিরমিজী, ৪/৬৬৭)
১১. হিংসুকের হিংসার উচিত জবাব হলো কোনো প্রত্যুত্তর না করে নীরব নিশ্চুপ থাকা। সুতরাং মানুষের হিংসাত্মক ও ব্যাঙ্গাত্মক কটুক্তির প্রতি ভ্রূক্ষেপ না করে আপন মনে কাজ করে যান। কাজের উদ্যোগ-উদ্দীপনা বাড়িয়ে দিন। কথিত আছে, প্রকৃত জবাব হলো বাস্তবে পরিণত করে দেখানো, মুখের ওপর দু'টা কথা শুনিয়ে দেওয়া তাতো নিতান্ত সামান্য।
১২. সুনিশ্চিত থাকুন, রিযিকদাতা একমাত্র আল্লাহ তা'আলা। তিনি যার জন্য যতটুকু রিযিকের ফায়সালা করেছেন, তা সম্পূর্ণ ভোগ করার আগে কেউ মৃত্যুবরণ করবে না। আপনার জীবিকা কেউ ছিনিয়ে নিতে পারবে না, ভোগদখল করতে পারবে না।
১৩. অন্যের আয়ত্তে আপনার পছন্দের ভালো লাগার কিছু দেখলে তার বরকতের দু'আ করুন। তার উত্তরোত্তর সফলতা কামনা করুন। রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাদের এমনই আদেশ করেছেন: إِذَا رَأَى أَحَدُكُمْ مِنْ أَخِيهِ مَا يُعْجِبُهُ، فَلْيَدْعُ لَهُ بِالْبَرَكَةِ». (سنن ابن ماجه ٢ / ١١٦٠)
অর্থ: 'তোমাদের কেউ যখন তার ভাইয়ের কাছে নিজের পছন্দের ও ভালো লাগার কিছু দেখবে, তখন সে যেন তার বরকতের দু'আ করে।' (সুনানে ইবনে মাযাহ, ২/১১৬০)
১৪. মনটাকে নিষ্কলুষ ও হিংসা-বিদ্বেষমুক্ত রাখুন। ইহকালে জান্নাতের পরম সুখানুভূতি লাভ করবেন। আত্মার শুদ্ধতা ও মনের নিষ্কলুষতা আপনার জন্য জান্নাতের ফায়সালা ত্বরান্বিত করবে।
১৫. আল্লাহ তা'আলার প্রতি গভীর আস্থা ও বিশ্বাস, দুঃস্থ ও প্রয়োজনগ্রস্তদের সাহায্য-সহযোগিতা ও দান-সদকা হলো আপনার অন্যতম পুঁজি। যাবতীয় বিপদ-আপদ, হিংসা ও কুদৃষ্টি থেকে বাঁচার জন্য এটি অত্যন্ত কার্যকর ও কুরআন-সুন্নাহর স্বীকৃত পন্থা। আল্লামা ইবনুল কাইয়্যিম জাওযী (রহ.) (৬৯১-৭৫১ হি.) বলেছেন: 'বিপদ-আপদ থেকে মুক্ত থাকার জন্য দান-সদকার বিরাট ভূমিকা রয়েছে। মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে সবার জন্য তা সমান প্রযোজ্য।'
১৬. আল্লাহ তা'আলার কাছে তওবা করুন। একনিষ্ঠ মনে তাওবা করে গুনাহমুক্ত হোন এবং সামনের দিনগুলোতে গুনাহমুক্ত জীবন-যাপনে সচেষ্ট হোন। কেননা গুনাহ ও পাপাচারই হলো বিপদগ্রস্ত হওয়ার মূল কারণ। পবিত্র কুরআনের ভাষায়:
وَمَا أَصَابَكُمْ مِّنْ مُّصِيبَةٍ فَبِمَا كَسَبَتْ أَيْدِيكُمْ وَيَعْفُوا عَنْ كَثِير [سورة الشورى: ٣٠]
অর্থ: 'তোমাদের যে বিপদ-আপদ ঘটে তাতো তোমাদেরই কৃতকর্মের ফল।' (আশ-শূরা, ৪২: ৩০)
১৭. অর্থবিত্ত, সুনাম-সুখ্যাতি, সন্তান-সন্ততি ও ঘর-বাড়ি মোটকথা, আপনার পছন্দের ও ভালো লাগার যা-কিছুই লাভ করবেন, বলুন, مَا شَاءَ اللَّهُ لَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ (মাশাআল্লাহ, লা-কুওয়াতা ইল্লাবিল্লাহ)। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা গোটা মানবজাতিকে এমনই দিকনির্দেশনা প্রদান করে বলেছেন:
وَلَوْلَا إِذْ دَخَلْتَ جَنَّتَكَ قُلْتَ مَا شَاءَ اللَّهُ لَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ [الكهف: ٣٩]
অর্থ: 'তোমার উদ্যানে প্রবেশ করে তুমি কেন বললে না, আল্লাহ যা চেয়েছেন তাই হয়েছে, আল্লাহর সাহায্য ব্যতীত কোন শক্তি নেই।' (কাহফ, ১৮: ৩৯)
পরিশিষ্ট:
হিংসা-বিদ্বেষের সূত্র ধরে পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে ঘৃণ্য ও জঘন্য ঘটনাটা ঘটেছে। তার মূল হোতা ইবলিস শয়তান। মাটির তৈরি আদমকে হিংসা করে আল্লাহ তা'আলার অবাধ্য হয়েছে। তার মন-মানসিকতা হিংসা-বিদ্বেষে এতটাই কলুষিত হলো যে, স্রষ্টার আদেশ লঙ্ঘন করে হলেও আদমকে সিজদা করা থেকে বিরত থাকল। স্রষ্টার আনুগত্য ছেড়ে অবাধ্যতার পথ বেছে নিল। রহমতের শীতল ছায়া ছেড়ে অভিশাপের আগুনে দগ্ধ হলো। জান্নাতের বাগান ছেড়ে জাহান্নামের গর্ভে নিমজ্জিত হলো। সুতরাং যে ব্যক্তি নিজেকে হিংসা-বিদ্বেষে কলুষিত করবে ইবলিস হলো তার সর্বস্বীকৃত প্রধান 'গুরু'। তাই সতর্ক হোন। ইবলিসের শিষ্য হয়ে নিজেকে কলুষিত করবেন না। রহমতের শীতল ছায়া ছেড়ে অভিশাপের আগুনে ঝাঁপ দিবেন না।
আইরিশ লেখক জর্জ বার্নাড শো (১৮৫৬-১৯৫০ খ্রিষ্টাব্দ) বলেছেন: 'যে দাঁতব্যথায় ভুগছে, তার মনে হয়, দাঁত-ব্যথামুক্ত বাকি সবাই খুব সুখী।'
লোকমান হাকিম (রহ.) বলেছেন: 'হিংসুকের তিনটি আলামত: ব্যক্তির অনুপস্থিতিতে নিন্দা করে, উপস্থিতিতে তোষামোদ করে, তার বিপদে উল্লসিত হয়।'