📘 আল হাল্লু জীবন সমস্যার সমাধান > 📄 নামাযে অবহেলা

📄 নামাযে অবহেলা


নামায হলো ইসলামের দ্বিতীয় রোকন। কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম বান্দার নামাযের হিসেব গ্রহণ করা হবে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
إِنَّ أَوَّلَ مَا يُحَاسَبُ بِهِ العَبْدُ يَوْمَ القِيَامَةِ مِنْ عَمَلِهِ صَلَاتُهُ، فَإِنْ صَلُحَتْ فَقَدْ أَفْلَحَ وَأَنْجَحَ، وَإِنْ فَسَدَتْ فَقَدْ خَابَ وَخَسِرَ". (سنن الترمذي) ২/২৭০
অর্থ: 'কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম বান্দার নামাযের হিসেব গ্রহণ করা হবে। যদি তা যথাযথ ঠিক হয় তাহলে বান্দা সফল কৃতকার্য। আর যদি নামাযে গরবর হয় তাহলে বান্দার ক্ষতি ও ধ্বংস অনিবার্য।' (তিরমিজী, ২/২৭০)

নামায ত্যাগ করা গুরুতর কবীরা গুনাহ। কোনো কোনো ইমাম ও ফকীহ-এর মতে কুফুরি, যা বান্দাকে ইসলামের গণ্ডি থেকে বের করে দেয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
العَهْدُ الَّذِي بَيْنَنَا وَبَيْنَهُمُ الصَّلَاةُ، فَمَنْ تَرَكَهَا فَقَدْ كَفَرَ. (سنن الترمذي) ৫/১৪

অর্থ: 'আমাদের মাঝে ও তাদের (কাফেরদের) মাঝে পার্থক্য রেখা হলো নামায। সুতরাং যে নামায ছেড়ে দিলো, সে যেন কুফুরি করলো।' (তিরমিজী, ৫/১৪)

কুরআন সুন্নাহর বহু জায়গায় নামাযের গুরুত্ব ও তাৎপর্য সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। কখনো নামায কায়েমের আদেশ এবং নামাযে অবহেলার ব্যাপারে নিষেধ করার মাধ্যমে, আবার কখনো পুরস্কারের সুসংবাদ দিয়ে এবং কঠিন শাস্তির সতর্কবাণী উচ্চারণ করে বহুবার বিভিন্নভাবে নামাযের গুরুত্ব ও মহত্ত্ব বোঝানো হয়েছে।

নামায হলো আল্লাহ তা'আলার সাথে বান্দার সম্পর্কের সেতুবন্ধন। সুতরাং, যে নামায ত্যাগ করলো সে যেন আপন রবের সাথে তার বাঁধন ছিন্ন করলো, রিযিকের পথ সংকুচিত করলো এবং ইহকাল ও পরকালের সৌভাগ্য সফলতার পথ রুদ্ধ করলো।

যুগের আধুনিকায়ন, বাহ্যিক চাকচিক্য, চারপাশের যান্ত্রিক ব্যস্ততার ভিড়ে নামাযের মতো মৌলিক ইবাদত নিতান্ত গৌণ হয়ে পড়ছে। সঙ্গে-সঙ্গে ইসলাম ও মুসলমানের অধঃপতন ত্বরান্বিত হচ্ছে। মুসলিম জাতির চলমান এ সংকট কাটিয়ে উঠার পথ কী? এ ব্যাপক সমস্যার সমাধানই বা কী?

সমাধান:
১. সন্তানদের মধ্যে নামাযের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। নামায কায়েমে পুরস্কার এবং নামাযে অবহেলায় তিরস্কার-উভয়ই সমান গুরুত্বপূর্ণ ও কার্যকর পন্থা। পুরস্কার ও প্রশংসায় ব্যক্তির উৎসাহ উদ্দীপনা বৃদ্ধি পায়। তিরস্কার ও ভর্ৎসনায় সতর্কতা ও সচেতনতা তৈরি হয়।

২. অভিভাবকগণ, সন্তানদের নামায কায়েমের লক্ষ্যে আপনাদের করণীয় কী হবে? জেনে রাখুন রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর হাদীসের ভাষ্য থেকে:
عَلِّمُوا أَوْلَادَكُمُ الصَّلَاةَ إِذَا بَلَغُوا سَبْعًا وَاضْرِبُوهُمْ عَلَيْهَا إِذَا بَلَغُوا عَشْرًا". (مسند البزار - البحر الزخار) ১৭ /১৮৯
অর্থ: 'সাত বছর বয়সে তোমাদের সন্তানদের নামায শিক্ষা দাও। দশ বছর বয়সে নামায ত্যাগ করার কারণে শাসন কর।' (মুসনাদুল বায়্যার, ১৭/১৮৯)

৩. সন্তানদের নামাযের গুরুত্ব ও ফযীলতসংবলিত পবিত্র কুরআনের আয়াত ও হাদীস পাঠ করে শোনাতে হবে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলার নির্দেশ:
وَأْمُرْ أَهْلَكَ بِالصَّلوةِ وَاصْطَبِرْ عَلَيْهَا ﴾ [طه: ١٣٢]
অর্থ: 'এবং নিজ পরিবারবর্গকে নামাযের আদেশ কর এবং নিজেও তাতে অবিচল থাক।' (সূরা তহা, ২০: ১৩২)

৪. ইহকাল ও পরকালে নামাযের সুফল সুনিশ্চিত। পরকালের আগে অন্তত ইহকালের সুফলগুলো মনে রাখুন-হৃদয়ের প্রশস্ততা, মানসিক প্রশান্তি, সফলতা সৌভাগ্য ও নেক আমলের তাওফীক-এর চেয়ে বড় সুফলতা ও প্রাপ্তি আর কী হতে পারে?!

৫. দু'আ হিসেবে পবিত্র কুরআনের এ আয়াতটি বারবার পাঠ করুন:
رَبِّ اجْعَلْنِي مُقِيمَ الصَّلُوةِ وَمِنْ ذُرِّيَّتِي عَن رَبَّنَا وَتَقَبَّلْ دُعَاءِ
অর্থ: 'হে আমার প্রতিপালক! আমাকেও নামায কায়েমকারী বানিয়ে দিন এবং আমার আওলাদের মধ্যে হতেও (এমন লোক সৃষ্টি করুন, যারা নামায কায়েম করবে)। হে আমার প্রতিপালক! এবং আমার দু'আ কবুল করুন।' (ইবরাহীম, ১৪: ৪০)

৬. নামায ত্যাগ করার ভয়াবহ পরিণতির কথা একবার ভাবুন-পরকালে কবরের আযাব ও জাহান্নামের ভয়াবহ শাস্তি তো অবশ্যম্ভাবী। তার আগে ইহকালে সকরুণ পরিণতির শিকার হতে হবে। নামায ত্যাগ করার কারণে অভাব-অনটন, বঞ্চনা-গঞ্জনা, দুঃখ-দুর্দশা, কাজেকর্মে ব্যর্থতাসহ ব্যক্তি-জীবনে নানা সংকট ও প্রতিকূলতা থেকে নিস্তার নেই।

৭. মাতা-পিতাকে নামাযের প্রতি যত্নবান হতে হবে, নিজের ও পরিবারের মঙ্গলের স্বার্থে। সন্তানদের জীবনে তারাই হলেন প্রথম ও প্রধান অনুসৃত ব্যক্তিত্ব। পিতা তার ছেলেকে মসজিদে নিয়ে যাবেন। মা তার মেয়েকে সাথে নিয়ে নামায আদায় করবেন। পিতা-মাতার সততা ও কল্যাণমুখিতা সন্তানদের জীবনে গভীর উৎসাহ উদ্দীপনা জোগাবে।

৮. একটি মহৎ অভ্যাসে নিজেকে অভ্যস্ত করুন, আযান শোনামাত্রই সমস্ত কাজ বন্ধ করে দিন। লেখাপড়া, আলোচনা-পর্যালোচনা, সভা-অনুষ্ঠান, যাবতীয় সবকিছু বন্ধ করে একমাত্র নামাযের জন্য প্রস্তুত হন। নামাযই হলো যাবতীয় কল্যাণ, সফলতা ও সৌভাগ্যের সোপান।

৯. মসজিদে পাঁচওয়াক্ত নামাযের নির্ধারিত সময় মনে রাখতে হবে। আযান শোনা মাত্রই নামাযের প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে। এক মুহূর্তও বিলম্ব করা যাবে না। কেননা তা অলসতা থেকে শুরু করে একপর্যায়ে অবহেলা ও নামায ত্যাগের অভ্যাসে পরিণত হয়।

১০. যে সময়টুকু নামাযে ব্যয় করছেন, জীবনের অন্যান্য ব্যতিব্যস্ততার তুলনায় তা নিতান্তই কম। তাই কখনো এমনটা ভাবা সমীচীন নয়, নামাযের কারণে আমার পেশা ও কাজকর্মের ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে।

১১. মনে রাখুন, যে নামায ছুটে যাবে, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আপনার ওপর তার কাযা আদায় করা ওয়াজিব। অন্যথায় মৃত্যুর পর প্রথমে কবরে, তারপর কেয়ামত দিবসে কঠিন হিসেবের সম্মুখীন হতে হবে।

১২. কর্মক্ষেত্রে ও শিক্ষাঙ্গনে, সর্বত্র নামাযের পরিবেশ গড়ে তুলুন। সহকর্মী ও সহপাঠীদের নামাযে উদ্বুদ্ধ করুন। যে কাজ করতে গিয়ে নামাযে অবহেলা হয় আল্লাহ তা'আলা তাতে বরকত দান করেন না। শুধু কর্মী ও কর্ম দ্বারা কাঙ্ক্ষিত সুফল অর্জিত হয় না।

১৩. নামাযের প্রতি যত্নবান-এমন ব্যক্তিদের সংস্পর্শে থাকুন। তাদের সংস্পর্শ আপনার জন্য সহায়ক হবে। নামাযে শৈথিল্যকারী অবহেলাকারী লোকদের থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখুন। তাদের অসৎ সঙ্গ আপনার ক্ষতির কারণ হবে। মানুষ হলো অনুকরণপ্রিয় জাতি। সঙ্গ দোষে কিংবা সঙ্গগুণে সে খুব দ্রুত প্রভাবিত হয়।

১৪. আপনি যদি ফরজ নামাযে রীতিমতো অভ্যস্ত হয়ে থাকেন তাহলে নফল নামাযে যত্নবান হোন। কেননা তা ফরজ নামাযের জন্য নিরাপত্তা-প্রাচীর স্বরূপ। দুটি কারণে সুন্নত ও নফল নামাযে যত্নবান হতে হবে। প্রথমত: মানুষ মাত্র অবসাদ ও অলসতাপ্রবণ। দীর্ঘ জীবনে কৃত অভ্যস্ত কাজে সে কখনো-সখনো উদাসীন হয়ে পড়ে। সুতরাং, ব্যক্তি যদি ফরজ নামাযের পাশাপাশি সুন্নত ও নফল নামাযেও যত্নবান হয়, তাহলে কখনো ব্যস্ততা কিংবা উদাসীনতার কারণে সুন্নত ও নফল নামায ছুটে যেতে পারে। প্রথমেই ফরজ ছুটে যাওয়ার আশঙ্কা নেই। আর যে ব্যক্তির মূল পুঁজিই হলো ফরজ নামায, অলসতা শৈথিল্যের কারণে প্রথম ধাপেই তার ফরজ নামায কাযা হয়ে যাবে। দ্বিতীয়ত: কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম বান্দার নামাযের হিসাব নেওয়া হবে। তখন ফরজ নামাযে ত্রুটি-বিচ্যুতি পাওয়া গেলে সুন্নত নফলের মাধ্যমে সে ঘাটতি পূরণ করা হবে। সহীহ হাদীসে রাসূল ﷺ বলেছেন:
"إِنَّ أَوَّلَ مَا يُحَاسَبُ بِهِ الْعَبْدُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ مِنْ عَمَلِهِ صَلَاتُهُ، فَإِنْ صَلُحَتْ فَقَدْ أَفْلَحَ وَأَنْجَحَ، وَإِنْ فَسَدَتْ فَقَدْ خَابَ وَخَسِرَ، فَإِنْ انْتَقَصَ مِنْ فَرِيضَتِهِ شَيْءٍ، قَالَ الرَّبُّ عَزَّ وَجَلَّ: اُنْظُرُوا هَلْ لِعَبْدِي مِنْ تَطَوُّع فَيُكَمَّلَ بِهَا مَا انْتَقَصَ مِنَ الفَرِيضَةِ، ثُمَّ يَكُونُ سَائِرُ عَمَلِهِ عَلَى ذَلِكَ".
অর্থ: 'নিশ্চয়ই কিয়ামতের দিন বান্দার (হুকুকুল্লাহর মধ্যে) যে কাজের হিসাব সর্বপ্রথম নেওয়া হবে তা হচ্ছে তার নামায। সুতরাং যদি তা সঠিক হয় তাহলে সে পারিত্রাণ পাবে। আর যদি (নামায) পণ্ড ও খারাপ হয় তাহলে সে ব্যর্থ ও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। যদি তার ফরজ (নামাযের) মধ্যে কিছু কম পড়ে যায় তাহলে আল্লাহ তা'আলা বলবেন, 'দেখ তো! আমার বান্দা কিছু নফল (নামায) আছে কি না, যা দিয়ে ফরজের ঘাটতি পূরণ করে দেওয়া হবে?' তারপর এ ভিত্তিতে বান্দার অবশিষ্ট আমলের হিসাব গ্রহণ করা হবে। (তিরমিজী, ২/২৭০)

১৫. দু'আর মাধ্যমে আল্লাহমুখী হোন। সাচ্চা নামাযী হওয়ার জন্য আল্লাহ তা'আলার তাওফীক প্রার্থনা করুন। মনোযোগের সাথে আযান শুনুন এবং আযানের জবাব প্রদানে সচেষ্ট হোন। বিশেষভাবে মুআজ্জিনের حَيَّ عَلَى الْفَلَاحِ حَيَّ عَلَى الصَّلَاةِ বাণীর মর্ম উপলব্ধি করার চেষ্টা করুন। لَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ বলে এর উত্তর প্রদান করুন।

১৬. যাবতীয় গুনাহ ও নাফরমানি থেকে বেঁচে থাকুন। কেননা পাপাচার মানুষকে সদাচার থেকে বিরত রাখে। তাকে অন্যায়-অকল্যাণের পথে ঠেলে দেয়। এক ব্যক্তি হাসান বসরী (রহ.)-এর নিকট অনুযোগ করলো: 'ফজর নামাযের জন্য ভোরে উঠতে চাই, কিন্তু পারি না।' তিনি বললেন: 'গুনাহ ও নাফরমানি তোমাকে বিরত রাখে।'

১৭. ইন্টারনেট, সোস্যাল মিডিয়া ও টেলিভিশন ইত্যাদি ক্ষেত্রে সতর্ক হোন। আনন্দ-ফুর্তি ও খেল-তামাশা পরিহার করুন। কেননা তা বান্দাকে নামায থেকে বিরত রাখে। বিষয়টি সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে:
فَخَلَفَ مِنْ بَعْدِهِمْ خَلْفٌ أَضَاعُوا الصَّلوةَ وَاتَّبَعُوا الشَّهَوَاتِ فَسَوْفَ يَلْقَوْنَ غَيَّا﴾ [مريم: ٥٩]
অর্থ: 'তারপর তাদের স্থলাভিষিক্ত হল এমন লোক, যারা নামায নষ্ট করল এবং ইন্দ্রিয়-চাহিদার অনুগামী হল। সুতরাং তারা অচিরেই তাদের পথভ্রষ্টতার সম্মুখীন হবে।' (সূরা মারইয়াম, ১৯: ৫৯)

১৮. সিজদায় পড়ে, নামাযের শেষে কায়মনো বাক্যে আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করুন। তিনি যেন আপনাকে নামায কায়েমের তাওফিক দান করেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ মুআয বিন জাবাল (রা.)-কে অসিয়ত করেছিলেন:
لَا تَدَعْ أَنْ تَقُولَ فِي كُلِّ صَلَاةٍ ... (المعجم الكبير للطبراني ٢٠ / ١٢٥)
অর্থ: প্রত্যেক নামাযের পর অবশ্যই এ দু'আ পাঠ করবে:
اللَّهُمَّ أَعِنِّي عَلَى ذِكْرِكَ وَشُكْرِكَ وَحُسْنِ عِبَادَتِكَ.
অর্থ: 'হে আল্লাহ, আমাকে আপনার যিকির শোকর ও ইবাদতের তাওফীক দান করুন।' (মুজামুল কাবীর লিততাবারানী: ২/১২৫)

১৯. নামাযে যত্নবান হোন। কেননা তা আপনার গুনাহ মাফের অন্যতম উপায়। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
مَنْ تَوَضَّأَ لِلصَّلَاةِ فَأَسْبَغَ الْوُضُوءَ، ثُمَّ مَشَى إِلَى الصَّلَاةِ الْمَكْتُوبَةِ، فَصَلَّاهَا مَعَ النَّاسِ أَوْ مَعَ الْجَمَاعَةِ أَوْ فِي الْمَسْجِدِ غَفَرَ اللهُ لَهُ ذُنُوبَهُ» (صحیح مسلم) ٢٠٨/١
অর্থ: 'নামাযের উদ্দেশ্যে যে ব্যক্তি ওযু করবে এবং যথাযথভাবে ওযু করবে, এরপর নামাযের উদ্দেশ্যে হেঁটে রওয়ানা হবে এবং লোকদের সাথে কিংবা জামাতবদ্ধ হয়ে, অথবা মসজিদে নামায আদায় করবে, আল্লাহ তা'আলা তার গুনাহ মাফ করে দিবেন।' (মুসলিম, ১/২০৮)

২০. বিশ্বাস করুন, নামায কায়েম করা ব্যতীত জীবনের পরম সুখ ও সৌভাগ্য অর্জন করা সম্ভব নয়। নামায হলো আপন রবের নিকট সাহায্য প্রার্থনা করার শ্রেষ্ঠ উপায়। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেন:
﴿وَاسْتَعِينُوا بِالصَّبْرِ وَالصَّلوة﴾ [البقرة : ٤٥]
অর্থ: 'এবং সবর ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা কর।'

২১. মনে রাখুন, প্রচণ্ড গরমে মসজিদে যাতায়াত আপনাকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করবে। জাহান্নামের "যামহারীর"-এর শীতের তীব্রতা থেকে উদ্ধার করবে।

২২. আপনি যদি আল্লাহ তা'আলার সামনে সিজদাবনত না হন, তবে আপনাকে কামপ্রবৃত্তি ও শয়তানের প্ররোচনার সামনে নতজানু হতে হবে। আর যদি নামাযে যত্নবান হন, আল্লাহর সামনে সিজদাবনত হন তাহলে অবশ্যই প্রবৃত্তির তাড়না ও শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে বাঁচতে পারবেন।

২৩. মনে রাখতে হবে, মানসিক সংকট ও অস্থিরতা থেকে মুক্তির অন্যতম উপায় হলো নামায। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: وَلَقَدْ نَعْلَمُ أَنَّكَ يَضِيقُ صَدْرُكَ بِمَا يَقُولُونَ ﴾ [الحجر: ৯৭] অর্থ: 'আমি অবশ্যই জানি, ওরা যা বলে তাতে আপনার মনটা ছোট হয়ে যায়।' (আল হিজর, ১৫: ৯৭) সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহ তা'আলা মুক্তির উপায় বাতলে দিয়েছেন। পবিত্র কুরআনের ভাষায়: فَسَبِّحُ بِحَمْدِ رَبِّكَ وَكُنْ مِّنَ السُّجِدِينَ ﴾ [الحجر: ৯৮] অর্থ: 'অতএব আপনি নিরঙ্কুশ প্রশংসা সহকারে আপনার প্রভুর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করুন এবং সিজদাকারীদের অন্তর্ভুক্ত হোন।' (আল হিজর, ১৫: ৯৮) পবিত্র কুরআনের সমাধানই শ্রেষ্ঠ সমাধান।

২৪. নামায ছাড়া বান্দার জীবন ব্যর্থ ক্ষতিগ্রস্ত। নামাযবিহীন জীবনে না আছে প্রাণ, না আছে প্রেরণা। এমন জীবনের কোনো সৌন্দর্য ও অর্থময়তা নেই। সালাতবিমুখ জীবনে চূড়ান্ত অধোগতি ও ধ্বংস অনিবার্য। সুতরাং নামাযের প্রতি যত্নবান হয়ে নিজেকে বাঁচান; নিজের জীবনটাকে বাঁচান।

২৫. যদি পাঁচওয়াক্ত ফরয নামাযে যত্নবান না হন তাহলে এ জীবনে অর্জিত মান-মর্যাদা, যশ-খ্যাতি, অর্থবিত্ত, সন্তান-সন্ততি ও বিলাসবহুল অট্টালিকা-এসবের কোনোটাই আপনার কাজে আসবে না। কিয়ামতের দিন সব নিমিষেই ধুলোয় মিশে যাবে।

২৬. কিয়ামতের দিন হাশরের ময়দানে কোনো ছায়ার অস্তিত্ব থাকবে না। মাথার কাছে সূর্য এসে দাঁড়াবে। প্রচণ্ড তাপে প্রাণ ওষ্ঠাগত হওয়ার উপক্রম হবে। তখন আল্লাহ তা'আলা সাত ব্যক্তিকে আরশের ছায়াতলে আশ্রয় দান করবেন। আপনি যদি নামাযের যত্নশীল হন তাহলে সুসংবাদ গ্রহণ করুন। কাল কিয়ামতের দিন আপনিও আল্লাহর আরশের ছায়াতলে আশ্রয় লাভ করবেন। হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, সাত ব্যক্তি আল্লাহর আরশের ছায়াতলে আশ্রয় লাভ করবে। তাদের মধ্যে একজন হলো (হাদীসের ভাষায়):
«وَرَجُلٌ قَلْبُهُ مُعَلَّقٌ فِي المَسَاجِدِ». (صحيح البخاري ١ /١٣٣)
অর্থ: 'এমন ব্যক্তি যার মন মসজিদের সাথে জুড়ে থাকে।' (বুখারী, ১/১৩৩)

২৭. বেশি রাত না করে সকাল-সকাল ঘুমিয়ে পড়ুন। তাতে দুটি উপকারিতা রয়েছে। এক, ফজর নামাযের জন্য সময়মতো জেগে ওঠা সহজ হয়। দুই, শরীর-স্বাস্থ্যের জন্যও তা উপকারী।

পরিশিষ্ট:
আপনি যদি পাঁচ ওয়াক্ত ফরয নামাযে যত্নবান হতে না পারেন তাহলে নীতি-নৈতিকতা, শালীনতা, শিষ্টাচার, মানবিক মূল্যবোধ, মহৎ উদ্দেশ্য ও হিতবাদী দর্শনের প্রচার-প্রসারে মুখর হওয়ার কোনো অর্থ নেই। এসবই তখন অন্তঃসারশূন্য ফাঁকা বুলি। তা শ্রোতাদের কানে পৌঁছাবে মাত্র; তাদের হৃদয়াত্মা স্পর্শ করতে পারবে না।

যে নামায ত্যাগ করে সে তো সর্বহারা মিসকিন। নিজেকে সে শেষ করে দিয়েছে। আক্ষরিক অর্থে সে বেঁচে আছে। কিন্তু পৃথিবীর বুকে তার অস্তিত্বের কোনো প্রভাব নেই, কার্যকারিতা নেই। অনেক লোককে দেখা যায়, বিয়ে ওলীমা, আকীকা, সামাজিক আচার-অনুষ্ঠান পালনে বেশ সজাগ-সচেতন। প্রতিটি উপলক্ষেই ঠিক সময়ে সমহিমায় উপস্থিত। কিন্তু নামাযের প্রতি তার কোনো গুরুত্ব নেই, কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই। ধর্মীয় এ অধঃপতন অধোগতির শেষ কোথায়?!

আযানের শুরুতেই 'আল্লাহু আকবার' বলে আল্লাহ তা'আলার বড়ত্ব ও মহিমার ঘোষণা করা হয়। প্রতিটি মানুষের মর্মে এ বাণী পৌঁছে দেওয়া উদ্দেশ্য-আপনার চাকরি-বাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্য, সামাজিক আচার-অনুষ্ঠান ইত্যাদি সমস্ত কিছু থেকে আল্লাহ বড়। তাঁর ইবাদত ও আনুগত্য গুরুত্বপূর্ণ। -আয়েয করনী

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
مَنْ حَافَظَ عَلَى الصَّلَاةِ كَانَتْ لَهُ نُورًا، وَبُرْهَانًا، وَنَجَاةً يَوْمَ الْقِيَامَةِ، وَمَنْ لَمْ يُحَافِظُ عَلَيْهَا لَمْ يَكُنْ لَهُ نُورُ، وَبُرْهَانٌ، وَنَجَاةٌ، وَكَانَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ مَعَ قَارُونَ، وَفِرْعَوْنَ، وَهَامَانَ، وَأُتِيَ بْنِ خَلَفٍ» (مسند أحمد) ١٤١/١١

অর্থ: 'যে ব্যক্তি নামাযে যত্নবান হবে কিয়ামতের দিন নামায তার জন্য নূর হবে। তার স্বপক্ষে দলিল হবে। জাহান্নামের আযাব থেকে মুক্তির উপায় হবে। আর যে নামাযে যত্নবান হবে না নামায তার জন্য নূর হবে না। তার স্বপক্ষে দলিলও হবে না। তার মুক্তির উপায়ও হবে না। কিয়ামতের দিন ফেরাউন, হামান, কারুন ও উবাই ইবনে খলফের সাথে তার হাশর হবে।' (মুসনাদে আহমাদ, ১১/১৪১)

টিকাঃ
২৭. কোন বান্দা যদি শীতকালে জাহান্নামের কথা স্মরণ করে আল্লাহ তা'আলার কাছে পানাহ চায়, তাহলে আল্লাহ তা'আলা তাকে জাহান্নামের শীতলতা থেকে মুক্তি দান করেন। এ ব্যাপারে হাদীস শরিফে এসেছে হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল ﷺ ইরশাদ করেন, 'যদি কোন বান্দা তীব্র ঠাণ্ডার সময় বলে, লা ইলাহা ইল্লাহ (আল্লাহ ব্যতীত কোন ইলাহ নেই)। আজকে দিনটি কতই না শীতল। হে আল্লাহ! আপনি আমাকে জাহান্নামের জামহারীর থেকে মুক্তি দান করুন। তখন আল্লাহ তায়ালা জাহান্নামকে লক্ষ্য করে বলেন, আমার এক বান্দা তোমার জামহারীর থেকে আমার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করেছে। আমি তোমাকে সাক্ষ্য রেখে বলছি, আমি তাকে মুক্তি দিলাম।' সাহাবীগণ বললেন, জামহারীর কী? উত্তরে রাসূল ﷺ বললেন: 'জামহারীর হলো এমন একটি ঘর, যেখানে কাফেরদেরকে নিক্ষেপ করা হবে। ফলে এর ঠাণ্ডার প্রচণ্ডতায় তারা বিবর্ণ হয়ে যাবে।' (অনুবাদক)

📘 আল হাল্লু জীবন সমস্যার সমাধান > 📄 কঠোরতা ও রূঢ়তা

📄 কঠোরতা ও রূঢ়তা


কঠোরতা ও রূঢ়তা একটি জঘন্য মানসিক ব্যাধি। ব্যক্তি যখন রাগে তেতে ওঠে, ক্রোধে ফুঁসে ওঠে, কারো কথাই কানে তোলে না। কোনো নীতি-নৈতিকতার ধার ধারে না। পরোয়া করে না ধর্মীয় বিধি-নিষেধের। জঘন্য অন্যায়-অনাচার করতেও কুণ্ঠাবোধ করে না।

রাগ ও কঠোরতার বিপরীত পিঠ হলো উদারতা, সদয়তা ও বিনম্রতা। যা আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে এক বিরাট নেয়ামত। রাসূল ﷺ-কে তিনি এ চারিত্রিক গুণটি বিশেষভাবে দান করেছেন। এমনকি পবিত্র কুরআনে রাসূল ﷺ-কে তা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন এবং এর বিপরীত পরিণতি সম্পর্কেও সতর্ক করে দিয়েছেন:
ফَبِمَا رَحْمَةٍ مِّنَ اللَّهِ لِنْتَ لَهُمْ ، وَلَوْ كُنْتَ فَظًّا غَلِيظَ الْقَلْبِ لَا نُفَضُّوا مِنْ حَوْلِكَ﴾ [آل عمران: ١٥٩]
অর্থ: 'আল্লাহর রহমতেই আপনি তাদের জন্য কোমল হৃদয় হয়েছেন। পক্ষান্তরে আপনি যদি রাগী ও কঠিন হৃদয় হতেন তাহলে তারা আপনার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত।' (সূরা আলে ইমরান, ৩: ১৫৯)

চারিত্রিক সদয়তা ও বিনম্রতার গুণ থেকে যে বঞ্চিত হবে, সে হবে আল্লাহ তা'আলার ক্রোধের পাত্র ও শাস্তিযোগ্য। আর যে হবে সদয় ও বিনম্র, একমাত্র আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে, সে হবে কল্যাণ ও আনুগত্যের পথে অগ্রগামী; গুনাহ ও নাফরমানির পথ বর্জনকারী। কঠোর স্বভাব, রুক্ষ মেজাজ-এমন লোকের মনে শয়তান ভর করে। তাকে রহমানের রহম থেকে বঞ্চিত করে ছাড়ে।

স্বভাবে রূক্ষ ও রূঢ় ব্যক্তি দুর্বলের প্রতি সদয় হতে জানে না। পারে না বন্ধুত্ব রক্ষা করতে। আচরণে-বিচরণে সে কঠোর স্বেচ্ছাচারী। তাকে দেখা যায় চিৎকার চেঁচামেচি করতে, লোকদের গালমন্দ করতে কিংবা অন্যায় অধিকার ফলাবার চেষ্টা করতে। সমাজের কেউ তার কাছে ঘেঁষতে চায় না। তার সাথে মিশতে চায় না। তার সংস্পর্শে প্রফুল্লতা বোধ করে না। স্ত্রী-সন্তান, আত্মীয়স্বজন-সবাই তার থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে চলে। পরিবার ও সমাজে সে নিতান্ত অনাকাঙ্ক্ষিত অসহনীয়।

আমাদের যদি সহজ সরল জীবনযাপন করতে হয়, সমাজে আদর্শবান হয়ে বেঁচে থাকতে হয় তাহলে অবশ্যই ক্রোধ দমন করতে হবে। স্বভাব-রুক্ষতা দূর করতে হবে। কিন্তু কীভাবে? এ ক্ষেত্রে আমাদের কর্তব্য কী? এ স্বভাব দোষ থেকে মুক্ত হওয়ার পথ কী?

সমাধান:
১. আল্লাহ তা'আলার নৈকট্য অর্জনে সচেষ্ট হোন। এর সর্বোত্তম পন্থা হলো, পাঁচ ওয়াক্ত নামায আদায়ে যত্নবান হওয়া। পর্যায়ক্রমে অন্যান্য নেক আমলে সচেষ্ট হওয়া। দান সদকা করা। এতিম, মিসকিন, অভাবী ও নিঃস্বদের দেখভাল করা। পাপাচার, অনাচার ও কুপ্রবৃত্তি থেকে বেঁচে থাকা। কেননা তা ব্যক্তিকে চারিত্রিক আদর্শ থেকে বিচ্যুত করে। তার স্বভাব চরিত্রে কঠোরতা ও রূঢ়তার বীজ বপন করে।

২. আল্লাহ তা'আলার যিকির, তাসবীহ, তাহলীল ও ইস্তেগফারে যবান সতেজ রাখুন। প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যার মাসনূন দু'আগুলো নিয়মিত পাঠ করুন। মানব হৃদয় মাত্রই রূঢ়তা ও রুক্ষতার ছাঁচে গড়া। আল্লাহর যিকির ও ইস্তেগফারই তাতে নম্রতা ও দয়ার্দ্রতা-সৃষ্টি করতে পারে। হাফেজ ইবনুল কাইয়্যিম জাওযী (রহ.) (৬৯১-৭৫১ হি.) বলেন, 'উদাসীনতা ও গুনাহের কারণে আত্মা কলুষিত হয়। যিকির ও ইস্তেগফারের মাধ্যমে তা শুদ্ধ-পরিশুদ্ধ হয়।'

৩. চিন্তা-ভাবনা ও গভীর নিমগ্নতার সাথে কুরআন তিলাওয়াত করুন। প্রতিটি আয়াতের মর্ম অনুধাবন করার চেষ্টা করুন। বিশেষ করে বিনয়, নম্রতা ও সদয়তার দীক্ষাসংবলিত আয়াতগুলো মনে রাখতে হবে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলার নির্দেশ:
﴿ادْفَعْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ﴾ [حم السجدة: ٣٤]
অর্থ: 'জওয়াবে তাই বলুন যা উৎকৃষ্ট।' (হা-মীম সেজদাহ, ৪১: ৩৪) অন্যত্র বলা হয়েছে:
﴿فَبِمَا رَحْمَةٍ مِّنَ اللَّهِ لِنْتَ لَهُمْ ، وَلَوْ كُنْتَ فَظًّا غَلِيظَ الْقَلْبِ لَا نُفَضُّوا مِنْ حَوْلِكَ ﴾ [آل عمران: ١٥٩]
অর্থ: 'আল্লাহর রহমতেই আপনি তাদের জন্য কোমল হৃদয় হয়েছেন। পক্ষান্তরে আপনি যদি, রাগ ও কঠিনপ্রাণ হতেন, তাহলে তারা আপনার কাছ থেকে দূরে সরে হয়ে যেত।' (সূরা আলে-ইমরান : ১৫৯)
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলার আদেশ-নিষেধ, পুরস্কারের সুসংবাদ ও শাস্তির সতর্কবাণী সম্পর্কে গভীর চিন্তা-ফিকির করতে হবে। যে ব্যক্তি নিমগ্ন চিত্তে কুরআন তিলাওয়াত করবে তার হৃদয় বিগলিত হবে, চোখ অশ্রুসিক্ত হবে, শিহরিত হবে দেহের প্রতিটি কোষ একমাত্র আল্লাহর ভয়ে।

৪. জানাযার নামাযে শরিক হোন। বেশি বেশি কবর যিয়ারত করুন। একটিবার ভেবে দেখুন, অন্ধকার কবরে আজ তাদের দেহগুলোর কী অবস্থা! মাটির সাথে মিশে একাকার হয়ে গেছে! অথচ কিছু কাল পূর্বেও তাদের দেহে কত দামি পোশাক-পরিচ্ছদ শোভা পেত! কত উপাদেয় বাহারি খাবার তাদের দেহে পুষ্টি জোগাত। স্মরণ করুন, যেকোনো মুহূর্তে আপনিও তাদের একজনে পরিণত হবেন। তাদের মতোই হবে আপনার পরিণতি। ক্ষণিকের এ পৃথিবী শুধু ধোঁকা প্রবঞ্চনার আখড়া।

৫. একটিবার কি ভেবে দেখেছেন, কাল কিয়ামতের ভয়াবহ অবস্থার কথা? ভেবেছেন কি জাহান্নামের শাস্তির কথা? এসব বিষয়ে সচেতন চিন্তা-ভাবনা আপনার অহমিকা-দাম্ভিকতা খর্ব করবে। রাগ-ক্রোধ ও রূঢ়তার স্থলে নম্রতা, সদয়তা ও উদারতা স্থান পাবে।

৬. রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর মহৎ জীবন-চরিত অধ্যয়ন করুন। তাঁর জীবনাদর্শের পাঠ গ্রহণ করুন। আল্লাহ তা'আলা নিজ তত্ত্বাবধানে রাসূল ﷺ-এর হৃদয়াত্মা পরিশুদ্ধ করিয়েছেন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা রাসূল ﷺ-এর মহান আদর্শের স্বীকৃতি দিয়েছেন:
﴿وَإِنَّكَ لَعَلَىٰ خُلُقٍ عَظِيمٍ ﴾ [القلم: ٤]
অর্থ: 'আর নিশ্চয়ই আপনি নৈতিক চরিত্রের সর্বোচ্চস্তরে অধিষ্ঠিত।' (কালাম, ৬৮: ৪) সুতরাং তাঁর যথার্থ অনুসরণেই আপনার স্বভাবশুদ্ধি ও চারিত্রিক পরিশুদ্ধি নিহিত।

৭. শ্রেষ্ঠ কল্যাণযুগের মহা মনীষী সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়ীন, তাবে-তাবেয়ীন ও অন্যান্য মুসলিম মনীষীগণের জীবনী অধ্যায়ন করুন, গভীর পর্যবেক্ষণমূলক অধ্যয়ন। তাঁদের মহান আদর্শের পাঠ গ্রহণ করুন।

৮. যথাসম্ভব ক্ষমা করুন। অন্যের মতামত মূল্যায়ন করতে শিখুন। রাগে-ক্ষোভে যখন অন্যের ওপর চড়াও হতে যাবেন, মনে রাখবেন, আপনার ওপরও আছেন একজন মহান কর্তৃত্ববান, যিনি সমস্ত ক্ষমতার অধিকারী, সকল শক্তিমত্তার অধিকারী।

৯. যমীনবাসীর ওপর রহম করুন। আসমানবাসী আপনার ওপর রহম করবেন। এটাই হাদীসের শিক্ষা। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«الرَّاحِمُونَ يَرْحَمُهُمُ الرَّحْمَنُ، ارْحَمُوا مَنْ فِي الْأَرْضِ يَرْحَمْكُمْ مَنْ فِي السَّمَاءِ» (سنن الترمذي) ٤ / ٣٢٤
অর্থ: 'যারা সদয় দয়ার্দ্র, আল্লাহ তাদের প্রতি দয়া করেন। (সুতরাং) তোমরা যমীনবাসীর ওপর রহম কর, আসমানবাসী তোমাদের ওপর রহম করবেন।' (তিরমিজী, ৪/৩২৪)

১০. সমাজের জ্ঞানী-গুণী ও ধর্মপরায়ণ ব্যক্তিবর্গের সাথে চলাফেরা করুন। নাফরমান, পাপাচারী লোকদের সঙ্গ ত্যাগ করুন। আচরণে-উচ্চারণে বিনম্র হোন। আল্লাহকে ভয় করুন। হাস্য-রসিকতা ও খেলতামাশা পরিহার করুন। কেননা তা আপনাকে আল্লাহর ভয় ও জীবনের কর্তব্য সম্পর্কে উদাসীন করে রাখবে।

১১. হতদরিদ্র, নিঃস্ব, বিধবা ও আত্মীয়-স্বজনের প্রতি সদাচারী হোন। দান-অনুদানের মাধ্যমে তাদের পাশে দাঁড়ান। হাসপাতাল পরিদর্শন করুন। রোগীদের সেবা-শুশ্রূষা করুন। এতে আপনার আত্মশুদ্ধি হবে এবং স্বভাবজাত কঠোরতা ও রূঢ়তা দূর হবে।

১২. ফরয ইবাদতের সঙ্গে সঙ্গে 'তাহাজ্জুদ নামায' ও কুরআন তিলাওয়াতে যত্নবান হোন। রাতের শেষভাগের ইবাদতে বিশেষ মহিমা ও তাৎপর্য রয়েছে। এ সময় আল্লাহ তা'আলা বান্দার জন্য দুনিয়ার আসমানে নেমে আসেন। রাসূল ﷺ-এর পবিত্র যবানেই শুনুন:
إِذَا مَضَى شَطْرُ اللَّيْلِ، أَوْ ثُلُثَاهُ، يَنْزِلُ اللَّهُ تَبَارَكَ وَتَعَالَى إِلَى السَّمَاءِ الدُّنْيَا، فَيَقُولُ: هَلْ مِنْ سَائِلٍ يُعْطَى؟ هَلْ مِنْ دَاعٍ يُسْتَجَابُ لَهُ؟ هَلْ مِنْ مُسْتَغْفِرٍ يُغْفَرُ لَهُ؟ حَتَّى يَنْفَجِرَ الصُّبْحُ (صحيح مسلم) ٥٢٢/١
অর্থ: 'যখন অর্ধরাত অতিবাহিত হয়, কিংবা রাতের দুই ভাগ শেষ হয়ে শেষ তৃতীয়াংশ শুরু হয় আল্লাহ তা'আলা দুনিয়ার নিকটবর্তী আসমানে নেমে আসেন। ঘোষণা করেন: 'কে আছে, যে আমাকে ডাকবে, আমি তার ডাকে সাড়া দিব? কে আছে, আমার কাছে প্রার্থনা করবে, আমি তার প্রার্থনা কবুল করব? আছে কোনো বান্দা, যে আমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবে, আমি তাকে ক্ষমা করে দিব?' এভাবে সুবহে সাদেক উদিত হওয়া পর্যন্ত (আল্লাহ তা'আলার ঘোষণা অব্যাহত থাকে)। (মুসলিম, ১/৫২২) রাতের এই শেষ প্রহরে অঘোর নিদ্রায় বিভোর না থেকে আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা করুন, নিজের যাবতীয় স্বভাবদোষ ও চারিত্রিক বিচ্যুতি থেকে শুদ্ধ-পরিশুদ্ধ লাভের জন্য।

১৩. লোকদের সাথে হাসিমুখে আন্তরিকভাবে সাক্ষাৎ করুন। আপনার আন্তরিক হাসি ও প্রফুল্লতা মানুষের মনে প্রশান্তি, ভালোবাসা ও দয়া-মায়ার বার্তা পৌঁছে দিবে। আপনি পাবেন সদকার প্রতিদান। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: تَبَسُّمُكَ فِي وَجْهِ أَخِيكَ لَكَ صَدَقَةٌ অর্থ: 'তোমার ভাইকে দেখে হাস্যবদন হওয়াও একটি সদকা।' (তিরমিজী, ৪/৩৪০)

১৪. মতবিনিময় ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে পক্ষাবলম্বন ও গোঁড়ামিপ্রবণতা অবাঞ্ছনীয়, নম্রতা ও সদয়তাই একান্ত কাম্য। উপস্থিত সকলের মতামতের যথার্থ মূল্যায়ন করার চেষ্টা করুন। ধীরস্থির চিত্তে, আলোচনা-পর্যালোচনার ভিত্তিতে এবং শরীয়তের দলিল-প্রমাণের আলোকে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করুন। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: مَنْ أُعْطِيَ حَظَّهُ مِنَ الرِّفْقِ فَقَدْ أُعْطِيَ حَظَّهُ مِنَ الخَيْرِ، وَمَنْ حُرِمَ حَظَّهُ مِنَ الرِّفْقِ فَقَدْ حُرِمَ حَظَّهُ مِنَ الخَيْرِ
অর্থ: 'যে ব্যক্তিকে নমনীয়তার অংশ দেয়া হয়েছে তাকে কল্যাণের অংশ দেয়া হয়েছে। নমনীয়তার অংশ হতে যে ব্যক্তিকে বঞ্চিত করা হয়েছে তাকে কল্যাণের অংশ হতে বঞ্চিত করা হয়েছে।' (তিরমিজী, ৪/৩৬৭)

১৫. নিজেকেই নিজে জিজ্ঞেস করুন, অন্যের আচার-আচরণে আপনি কি কঠোরতা ও রূঢ়তা প্রত্যাশা করবেন, না কি সদাচার ও সদয়তাই কামনা করবেন? অন্যদের ব্যাপারে আপনার যেমন বিশ্বাস, আশা-প্রত্যাশা, আপনার থেকেও অন্যরা একই আচরণ প্রত্যাশা করে। তাই সবার আগে আপনাকেই ন্যায়ানুগ হতে হবে। মহৎ আদর্শের ছাঁচে নিজেকে গড়ে তুলতে হবে।

১৬. মানুষের সাথে কঠোরতা ও দুর্ব্যবহারের কারণে আপনি যে সমালোচনা ও নিন্দার শিকার হবেন, তা কি ভেবে দেখেছেন? লোকসমাজে আপনি যে ভীতি ও শঙ্কার কারণ হবেন, তার পরিণতি চিন্তা করেছেন? এর কারণে চারপাশের মানুষ আপনার থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে চলবে। লোকসমাজে আপনি চক্ষুশূলে পরিণত হবেন।

১৭. মা-বাবার পারিবারিক বিবাদ এড়িয়ে যান। সন্তানদের সাথে দুর্ব্যবহার পরিহার করুন। তাদের কুরআন-সুন্নাহর নির্দেশিত আদর্শে ও শিক্ষা-দীক্ষায় গড়ে তুলুন। রাগ-ক্ষোভ, কঠোরতা, রূঢ়তা ও গা-জোয়ারি মনোভাব বর্জনে এবং নম্রতা, কোমলতা ও প্রফুল্লতা অর্জনে অনুপ্রাণিত করুন।

১৮. নিজে কুরআন তিলাওয়াত করুন। অথবা অন্যের সুমধুর তিলাওয়াত শুনুন। তাতে হৃদয় বিগলিত হয়। তাকওয়া ও আল্লাহভীতি বৃদ্ধি পাবে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: اللهُ نَزَّلَ أَحْسَنَ الْحَدِيثِ كِتَبًا مُّتَشَابِهًا مَّثَانِي تَقْشَعِرُّ مِنْهُ جُلُودُ الَّذِينَ يَخْشَوْنَ رَبَّهُمْ ثُمَّ تَلِينُ جُلُودُهُمْ وَقُلُوبُهُمْ إِلَى ذِكْرِ اللَّهِ অর্থ: 'আল্লাহর সর্বোত্তম বাণী অর্থাৎ, কিতাব নাযিল করেছেন, যার সমস্তটাই সামঞ্জস্যপূর্ণ, যার বিষয়বস্তু বারবার আলোচিত হয়েছে। যারা নিজেদের প্রভুকে ভয় করে তাদের দেহের চামড়া তাতে শিহরিত হয়, তারপর তাদের দেহের চামড়া ও অন্তর আল্লাহর স্মরণে বিনম্র হয়ে যায়।' (যুমার, ৩৯: ২৩)

১৯. প্রতিদিনের শুরুতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হোন, আজ কারো ওপর রাগ করবো না, কারো সাথে দুর্ব্যবহার করবো না। বাক-সংযম ও ক্রোধ দমনের চর্চা করুন। তা যেন আপনার সহজাত স্বভাবে পরিণত হয়।

২০. এক ব্যভিচারিণী নারী সামান্য কুকুরকে পানি পান করিয়ে জান্নাতের সুসংবাদ লাভ করেছে। আর এক সাধারণ নারী নগণ্য বিড়ালকে কষ্ট দিয়ে জাহান্নামের আযাব ভোগ করেছে। তাই পবিত্র কুরআনের এ নির্দেশই হোক আপনার আদর্শ:
﴿ادْفَعْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ ﴾ [ حم السجدة: ٣٤]
অর্থ: 'জওয়াবে তাই বলুন যা উৎকৃষ্ট।' (হামীম সেজদাহ, ৪১: ৩৪)

২১. কথাবার্তা ও আচার-আচরণে ভদ্র, মার্জিত ও সদয় হোন। অন্যের ওপর যে রহম করে, অন্যের ভুল-বিচ্যুতি গোপন রাখে আল্লাহ তা'আলাও তার ওপর রহম করেন, তার দোষ-ত্রুটি গোপন রাখেন। আর যে অন্যের দোষ গেয়ে বেড়ায়, পরনিন্দায় মেতে উঠে আল্লাহ তা'আলাও তার গোপনীয়তা ফাঁস করে দেন। সমাজের চোখে তাকে অপমানিত করেন। মূলত প্রতিটি মানুষ নিজ-নিজ কর্মফলই ভোগ করে।

পরিশিষ্ট:
'আপনাকে বাড়িতে আসতে দেখে, ঘরে প্রবেশ করতে দেখে আপনার শিশুসন্তানটি যদি আনন্দে নেচে না উঠে, লাফ দিয়ে কোলে না চড়ে তাহলে বুঝে নিবেন, আপনার স্বভাব-মাধুর্যতায় অপূর্ণতা আছে। যত দ্রুত সম্ভব, এ চারিত্রিক অপূর্ণতা দূর করা কর্তব্য।' -ড. আয়েয আল-কারনী

লোকমান হাকিম (রহ.) বলেছেন: 'সহাস্যবদনে সাক্ষাৎ করুন। মাধুর্যপূর্ণ কথা বলুন। সর্বজনের প্রিয় পাত্র হতে পারবেন। শত্রুও আপনাকে সাদরে গ্রহণ করবে।'

বিখ্যাত তাবেয়ী মালেক বিন দিনার (রহ.) (৭৪৮ খৃষ্টাব্দ) বলেছেন: 'মানুষের জীবনে স্বভাবজাত কঠোরতা ও নিষ্ঠুরতার মতো কঠিন সংকট দ্বিতীয়টি নেই। কোনো সম্প্রদায় যখন আল্লাহ তা'আলার ক্রোধের পাত্রে পরিণত হয় আল্লাহ তা'আলা তাদের দয়া-মায়া হতে বঞ্চিত করেন।'

ইমাম শাফেয়ী (রহ.) (১৫০-২০২ হি.) বলেছেন: 'হৃদয় যখন নির্দয় পাষাণ, চলার পথ যখন দুস্তর সংকীর্ণ, আপনার ক্ষমা লাভের আশাই পরম ভরসা হয়ে থাকল। আমার গুনাহ পাহাড়সম, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু আমার রবের ক্ষমা, সে তো আকাশসম।'

টিকাঃ
২৮. দয়ালু প্রভুর দয়া।

📘 আল হাল্লু জীবন সমস্যার সমাধান > 📄 অহমিকা -আত্মগরিমা

📄 অহমিকা -আত্মগরিমা


অহমিকা হলো, ব্যক্তি অতিমাত্রায় আত্মতুষ্ট ও আত্মতৃপ্ত হয়ে শিক্ষা-দীক্ষা, অর্থবিত্ত, সুনাম-সুখ্যাতি, বংশ-মর্যাদা, দৈহিক গঠন, রূপ-লাবণ্য ও রুচিপ্রকৃতি ইত্যাদি যাবতীয় ক্ষেত্রে অন্যদের থেকে নিজেকে শ্রেষ্ঠ জ্ঞান করে। কোনো ক্ষেত্রে নিজেকে পিছিয়ে থাকতে দেখে ভীষণ হীনম্মন্যতায় ভোগে এবং অন্যের শ্রেষ্ঠত্ব দেশে হিংসার আগুনে জ্বলে।

এমন লোককে দেখবেন অহংকারী চালে চলাফেরা করে। কোনো সদুপদেশ গ্রহণ করতে চায় না। নিন্দা ও সমালোচনার মুখে ক্ষিপ্ত হয়। প্রশংসা-স্তুতি শুনে তুষ্ট হয়। কথাবার্তা, আচার-আচরণে শুধু অহমিকা ও দাম্ভিকতার উৎকট বহিঃপ্রকাশ। অন্যদের সে থোড়াই কেয়ার করে। নিজেকে নিয়েই সদা ব্যতিব্যস্ত। নিজস্ব যোগ্যতা ও বৈশিষ্ট্যে মহাতুষ্ট। অকপটে স্বীকার করে, দোষ-গুণ-এ দু'য়ে মিলেই মানুষ। কিন্তু কখনো নিজের দোষ-ত্রুটি চোখে পড়ে না।

তার একটাই চাওয়া, সর্ব ক্ষেত্রে তাকে সর্বোচ্চ সম্মান দেওয়া হোক। সর্বক্ষেত্রে তাকে মাননীয়-বরণীয় হিসেবে নির্বাচিত করা হোক।
এমন লোক সমাজে অসহ্য, অসহনীয়। সমাজের কেউ তাকে সাদরে গ্রহণ করে না। সবাই তার থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে চলে।
অহমিকা ও আত্মগরিমা হলো একটি স্বভাবজাত বিচ্যুতির পরিণতি। এ বিচ্যুতি থেকে মুক্ত হওয়ার উপায় কী?

সমাধান:
১. ভুল স্বীকার করার মানসিকতা লালন করুন। নিয়ম করে প্রতিদিন আত্ম-সমালোচনা করুন। নিজের ভুল-ত্রুটিগুলো শনাক্ত করে তা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করুন।

২. একবার ভেবে দেখুন, আমাদের আসল পরিচয় কী? কীসের থেকে আমাদের উৎপত্তি, আর কোথায় গিয়ে আমাদের সমাপ্তি? প্রথমে মাটি থেকে, তারপর শুক্রাণু থেকে মানুষের উৎপত্তি। পর্যায়ক্রমে গর্ভাশয়ের দুর্গন্ধ পানিতে তার বসবাস। এরপর বাহ্যিক পৃথিবীর জীবনে পদার্পণ। মৃত্যুর পর আবার মাটিতে সমর্পণ।

৩. অতীতের পরাক্রমশালী রাজা-বাদশা, প্রতাপশালী ও অর্থ-প্রাচুর্যের অধিকারী, এক সময় যারা ক্ষমতার দোর্দণ্ড প্রতাপ দেখিয়েছে, আজ তাদের কী পরিণতি? আজ তাদের প্রতাপ-প্রতিপত্তি কোথায়? সবাই তো মাটিতে মিশে একাকার।

৪. আল্লাহ তা'আলার দরবারে সবসময় একটি বিষয় প্রার্থনা করুন, তিনি যেন আপনাকে সুস্থ বিচারবুদ্ধি ও সরল পথের দিশা দান করেন। সত্যকে সত্যরূপে দেখার এবং স্বতঃস্ফূর্তভাবে তা গ্রহণ করার তাওফিক দান করেন।

৫. জেনে রাখুন, অহংকারী ও দাম্ভিক লোকের প্রতি মানুষের মনে চাপা ক্ষোভ ও অসন্তোষ কাজ করে। তার নিন্দা, সমালোচনা ও দুর্নাম সবার মুখে-মুখে। এসব অসন্তোষ ও নিন্দা মৃত্যুর পরও তার পিছু ছাড়ে না।

৬. আপনার চেয়েও মহৎ শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিদের সম্পর্কে জানুন। নবী-রাসূল ও মহান পূর্বসূরিদের জীবন চরিত পাঠ করুন। তাহলে আপনার মনে হবে, ব্যক্তি এক জীবনে যতই উন্নতি সাধন করুক, যতই সফলতা অর্জন করুক তার চেয়েও সফল সার্থক ব্যক্তির তুলনায় সে নিতান্ত সাধারণ।

৭. নিজের দোষত্রুটি, ভুল-বিচ্যুতি, দুর্বলতা ও সংকীর্ণতার ক্ষেত্রগুলোর কথা মনে রাখুন। তাহলে নিজেকে তুচ্ছ ও নগণ্য মনে হবে। অন্যকে বড় ভাবার ও সম্মান করার মানসিকতা গড়ে উঠবে।

৮. আল্লাহকে ভয় করুন। মনে রাখুন, মানুষের গুরুতর ও খুঁটিনাটি-যাবতীয় বিষয় তিনি দেখছেন। সে যে অহমিকা-দাম্ভিকতা, অহংকার-আত্মগরিমা প্রদর্শন করে বেড়াচ্ছে, এর জন্য আল্লাহ তা'আলার দরবারে তাকে কঠিন হিসাবের সম্মুখীন হতে হবে। কাল কিয়ামতের দিন বান্দা কখনো হিসাব দিয়ে পার পাবে না।

৯. অন্যের মতামত ও সিদ্ধান্তের যথার্থ মূল্যায়ন করুন। মনে রাখুন, কোনো মানুষ ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। আপনিও নন। সমাজে এমন অনেক মানুষ আছে, যারা বিবেক-বুদ্ধি, চিন্তা-চেতনা, শিষ্টাচার ও আদর্শে আপনার চেয়ে উন্নত, আপনার চেয়ে শ্রেষ্ঠ।

১০. নিজেকে তুলনামূলক দৃষ্টিতে বিচার করুন। শক্তিমত্তার বিচারে নিজেকে তুলনা করেন, তাহলে একটি সাধারণ ষাঁড় আপনার চেয়ে কয়েকগুণ শক্তিশালী। দ্রুততা ও ক্ষিপ্রতায় যদি নিজেকে তুলনা করেন, তাহলে ঘোড়া বহু গুণ এগিয়ে। বাহ্যিক অবয়ব ও দৈহিক বিশালতায় হাতির সামনে আপনি নিতান্ত ক্ষুদ্র মানব।

১১. মনে রাখুন, যোগ্যতা ও প্রতিভা আল্লাহ প্রদত্ত। আল্লাহ তা'আলা যখন ইচ্ছা, যেভাবে ইচ্ছা তা ছিনিয়ে নিতে পারেন। সুতরাং যে জিনিস ধরে রাখার সাধ্য মানুষের নেই, তা নিয়ে সে কীভাবে গর্ব করে, বড়াই করে!

১২. জেনে রাখুন, বহু নৈতিক ও চারিত্রিক বিচ্যুতির প্রধান কারণ হলো অহমিকা ও দাম্ভিকতা। ন্যায় ও সত্যবিমুখতা, অন্যদের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা, নিজের ইতিবাচক দিকগুলো রং চড়িয়ে প্রচার করা, ক্ষমতা ও প্রভাব-প্রতিপত্তির মোহ, অন্যের ঘাড়ে দোষ চাপানোর মতো বহু জঘন্য স্বভাবের নেপথ্য কারণ হলো অহংকার ও আত্মগরিমা।

১৩. মানুষ কীভাবে ভুলে যায় যে, সে অতি সামান্য দুর্বল প্রাণী! যেকোনো মুহূর্তেই সে অসুস্থ হতে পারে। মুহূর্তের ব্যবধানে তার মৃত্যু হতে পারে।

১৪. রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
وَإِنَّ اللَّهَ أَوْحَى إِلَيَّ أَنْ تَوَاضَعُوا حَتَّى لَا يَفْخَرَ أَحَدٌ عَلَى أَحَدٍ، وَلَا يَبْغِي أَحَدٌ عَلَى أَحَدٍ» (صحيح مسلم ٤ / ٢١٩٨)
অর্থ: 'আল্লাহ তা'আলা আমার কাছে এ প্রত্যাদেশ পাঠিয়েছেন যে, তোমরা পরস্পর বিনয় নম্রতা বজায় রাখ। কেউ যেন কারো ওপর বড়াই না করে। কেউ যেন কারো ওপর অবিচার না করে।' (মুসলিম, ৪/২১৯৮)

১৫. আপনার উন্নতি অগ্রগতির পথে অন্যদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান ভুলে যাবেন না। নিজেই নিজেকে সর্বেসর্বা ভেবে বসবেন না। জীবনের এ পর্যায়ে এসে আপনি যে উন্নতি ও সফলতা অর্জন করেছেন, তার পেছনে আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুজনদের আন্তরিক অবদান ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা অনস্বীকার্য। তা ছাড়া আপনার একার পক্ষে কখনো এ পর্যায়ে পৌঁছনো সম্ভব ছিল না।

১৬. কোনো মানুষ ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। সুতরাং নিজের ভুল স্বীকারে কুণ্ঠাবোধ করবেন না। যা সঠিক ও যথার্থ, আপনার বিপক্ষে হলেও আন্তরিকভাবে তা মেনে নিন। মনে রাখুন, ভুল স্বীকার করা নিজের দুর্বলতা ও অপমানের কারণ নয়। তা তো আপনার সদিচ্ছা ও নৈতিক সাহসিকতার পরিচায়ক।

১৭. সবার সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখুন। মানুষের আন্তরিকতা ও ভালোবাসার কদর করুন। অহংকার ও নিজের বড়ত্ব জাহির করে সম্পর্কের অবমূল্যায়ন করা সমীচীন নয়।

১৮. মানুষের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি বদলে ফেলুন। চারপাশের মানুষজন ও সমাজ-তাদেরও রয়েছে এমন কল্যাণ ও শ্রেষ্ঠত্বের অবদান, যা হয়তো আপনার অজানা। কিন্তু তার বদৌলতেই তারা আল্লাহ তা'আলার দরবারে শ্রেষ্ঠ মহান।

১৯. নিত্যদিনের সাংসারিক কাজকর্মগুলো নিজেই করার চেষ্টা করুন। এটাই ছিল রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর অনুপম আদর্শ। নিজ হাতে বকরির দুধ দোহন করতেন। কাপড়ে তালি যুক্ত করতেন। জুতা সেলাই করতেন। হাট-বাজার থেকে সদাই কিনে আনতেন। গরিব মিসকিনদের সাথে চলাফেরা করতেন। স্বভাবতই এসব কাজের দ্বারা মনের অহংবোধ ও আত্মগরিমা দূর হয়।

পরিশিষ্ট:
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: «لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ مَنْ كَانَ فِي قَلْبِهِ مِثْقَالُ ذَرَّةٍ مِنْ كِبْرٍ» অর্থ: 'যার মনে বিন্দু পরিমাণ অহংকার থাকবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না।' (মুসলিম, ১/৯৩)

আব্বাসীয় খেলাফতকালের বিখ্যাত আরব কবি আবু নাওয়াস (৭৬২-৮১৩ খ্রিষ্টাব্দ) বলেন: فَقُل لِمَن يَدَّعِي فِي العِلْمِ فَلْسَفَةً حفظت شَيئاً وَغَابَت عَنكَ أَشياءُ অর্থ: 'নিজেকে যে জ্ঞানী বলে জাহির করে তাকে বলে দাও, "তুমি যা অর্জন করেছ তা এক বিন্দুসম। এখনও যা বাকি আছে তা তো সমুদ্রসম।”

প্রখ্যাত লেবানিজ কবি ও লেখক জিবরান খলীল জিবরান (১৮৮৩-১৯৩১) বলেন: 'আপাদ-মস্তকে বহিরাঙ্গের চাকচিক্যটাকে সর্বোচ্চ মূল্য দিয়ো না। তাহলে একটি পর্যায়ে দেখবে, শুধু বহিরাঙ্গটাই চকমক করছে। আর যোগ্যতা ও শ্রেষ্ঠত্বের জায়গাটুকু শূন্য পড়ে আছে।'

মিশরীয় লেখক ও সাহিত্যিক তাওফীক হাকীম (১৮৯৮-১৯৮৭ খ্রিষ্টাব্দ) বলেছেন: 'অহমিকা, আত্মগরিমা হলো অজ্ঞতা ও মূর্খতার উৎকট রূপ।'

বিখ্যাত তাবেয়ী ইমাম হাসান বসরী (রহ.) (৬৪২-৭২৮ খ্রিষ্টাব্দ) বলেছেন: 'অহংকারীর অবস্থা হলো পাহাড়ের শীর্ষ চূড়ায় অবস্থানকারীর মতো। সে অন্যদের ছোট আকারে দেখে। অন্যরাও তাকে ছোটরূপে দেখে।'

📘 আল হাল্লু জীবন সমস্যার সমাধান > 📄 স্বার্থপরতা

📄 স্বার্থপরতা


স্বার্থপরতা হলো অন্যের ভালোমন্দ-বিবেচনা না করে কিংবা জলাঞ্জলি দিয়ে নিজের প্রয়োজনটাকে মুখ্য করে দেখা, মতলবটা হাসিল করে নেওয়া।

স্বার্থপরতা হলো নিজেকে সমস্ত সুযোগ-সুবিধা ও কল্যাণের একমাত্র হকদার মনে করা। স্বার্থপর লোক সীমাহীন আত্মতৃপ্তিতে ভোগে। নিজের প্রতি তার মুগ্ধতা চূড়ান্ত পর্যায়ের। সর্বদা নিজেকে নিয়েই মেতে থাকে। নিজের প্রশংসা-স্তুতির গালগল্প মুখে লেগে থাকে। অন্যদের ব্যাপারে তার কোনো উদ্যোগ-উদ্দীপনা যে নেই, তা নয়; কিন্তু তা শুধু অন্যদের দমিয়ে রেখে নিজের স্বার্থ সাধনের উদ্দেশ্যে। অন্যদের ভাগ্যে ভালোমন্দ কী জুটল, কি গোটা দুনিয়া ভেসে গেল, তাতে তার কিছুই যায় আসে না। নিজের ঝুলিতে কতটুকুন পুড়লো-তার কাছে এটাই মুখ্য। দিন শেষে তার ঝুলি কতোটুকু ভরেছে, এটাই তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ।

স্বার্থপর লোকের অভিধানে শব্দ মাত্র তিনটি: আমি, আমি এবং আমি। এর বাইরে সে একটা অক্ষরও বোঝে না, বোঝার চেষ্টাও করে না। এ কারণেই মানুষ তার সঙ্গে মিশতে চায় না, তার সংস্পর্শে স্বস্তি পায় না।

ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে স্বার্থপরতা এক জটিল সমস্যা। কেননা মানুষ হলো সমাজবদ্ধ প্রাণী, সমাজ ছাড়া সে একাকী বাঁচতে পারে না। আর স্বার্থপরতা হলো সমাজবিরুদ্ধ স্বভাব। তাছাড়া বিষয়টা শারীরিক নয়, মানসিক। এতে কোনো সন্দেহ নেই, শারীরিক সমস্যার চেয়ে মানসিক সমস্যাই বেশি গুরুতর।

সুখময় সুন্দর জীবনযাপনের জন্য এমন গুরুতর মানসিক সমস্যা থেকে মুক্তির বিকল্প নেই। কিন্তু উপায় কী? এ সমস্যার সমাধান কী?

সমাধান:
১. অন্যকে অগ্রাধিকার দেওয়ার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। স্বার্থপরতা নয়, পরার্থপরতাই ঈমানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: لَا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى يُحِبَّ لِأَخِيهِ مَا يُحِبُّ لِنَفْسِهِ অর্থ: 'তোমাদের কেউ সাচ্চা মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে নিজের জন্য যা পছন্দ করে, তার ভাইয়ের জন্য তা পছন্দ না করতে পারবে।' (বুখারী, ১/১২)

২. অন্যদের স্বার্থ মূল্যায়ন করতে হবে। আলোচনা-পর্যালোচনায় সুস্থিরতাই বাঞ্ছনীয়। প্রত্যেকের মতামত যথাযোগ্য বিবেচনা করতে হবে। অন্যদের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে নিজের স্বার্থ সিদ্ধির মানসিকতা ত্যাগ করতে হবে। কেননা তা অন্যের জন্য যতটুকু ক্ষতিকর, ব্যক্তি নিজের জন্য তার চেয়ে বেশি ক্ষতিকর।

৩. সমস্ত বিষয়ে অন্যদের দৃষ্টিতে চিন্তা করুন। নিজেকে অন্যের স্থানে দাঁড় করান। অন্যরা কী ভাবছে-তা বোঝার চেষ্টা করুন। কোনো ক্ষেত্রে প্রয়োজনটা কার বেশি, আপনার না কি অন্যদের-বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করুন। একরোখা হয়ে নিজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা সমীচীন নয়। কাজেকর্মে অন্যদের সাথে শামিল হোন। তাদের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়ান।

৪. যে বস্তুটার প্রয়োজন নেই, তা পাওয়ার জন্য মাত্রাতিরিক্ত আগ্রহ মানুষের মধ্যে স্বার্থপরতার জন্ম দেয়। তাই যে কোনো বিষয় মৌলিক প্রয়োজনের দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করুন। মনের চাহিদা ও চোখের ক্ষুধা মেটাতে উদগ্রীব হবেন না।

৫. বোঝার চেষ্টা করুন, সর্বক্ষেত্রে আবশ্যক নয় যে, আপনাকেই সবার আগে থাকতে হবে। এর প্রয়োজনও নেই। যেমন: সড়কের পাশে অপেক্ষমাণ যাত্রীরা সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মসজিদে মুসল্লিগণ কাতারবদ্ধ হয়ে বসে আছে। কোনো প্রয়োজন নেই সবাইকে ডিঙিয়ে সামনে যাওয়ার।

৬. পবিত্র কুরআনের এ আয়াতটি মনে রাখুন। তাতে সাহাবায়ে কেরাম (রা.)-এর নিজেদের স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে অন্যদের স্বার্থ রক্ষার আদর্শ তুলে ধরা হয়েছে:
﴿وَيُؤْثِرُونَ عَلَى أَنْفُسِهِمْ وَلَوْ كَانَ بِهِمْ خَصَاصَةٌ﴾ [الحشر: ٩]
অর্থ: 'এবং নিজেরা অভাবগ্রস্ত হওয়া সত্ত্বেও তাদেরকে নিজেদের ওপর অগ্রাধিকার দেয়।' (হাশর, ৫৯: ৯)

৭. আল্লাহ তা'আলা আপনাকে যে নিয়ামত দান করেছেন, যে অর্থবিত্তের মালিক বানিয়েছেন তা থেকে অভাবী ও অভাবগ্রস্তকে দান করুন। এতে দু'টি কল্যাণ নিহিত: এক. আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে বিরাট প্রতিদান লাভ। দুই. স্বার্থপরতার মতো ঘৃণ্য স্বভাব থেকে নিস্তার।

৮. সমাজ-সেবামূলক কাজে উদ্যোগী হোন। সেবামূলক উদ্যোগ হলো আতরের মতো-আতরের সুবাসে ক্রেতা-বিক্রেতা ও বহনকারী প্রত্যেকেই সুবাসিত হয়। অনুরূপ সেবামূলক উদ্যোগে ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ সর্বশ্রেণি উপকৃত হয়।
যদি মানসিক অস্থিরতার শিকার হন তাহলে পরোপকারে সচেষ্ট হোন। স্বেচ্ছাসেবী দাতব্য সংস্থার কাজে অংশগ্রহণ করুন। দরিদ্রকে দান করুন। দুর্বলকে সাহায্য করুন। এসব কাজের মাধ্যমে আপনি অপার্থিব আনন্দ লাভ করতে পারবেন। মানুষের মুখে প্রশংসা, দু'আ ও কল্যাণ কামনা হবে আপনার বাড়তি পাওনা।
একটি বিষয় সুনিশ্চিত, আপনি যা ভোগ করছেন তা নিঃশেষ হয়ে যাবে। আর যা দান করছেন তা-ই শুধু অবশিষ্ট থাকবে। তাহলে কেন ক্ষণস্থায়ী বিষয় রেখে চিরস্থায়ী বিষয়ের পেছনে ছুটছেন?

৯. যারা আপনার উপকার করে, হোক না তাদের উপকার ক্ষুদ্র সামান্য, তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ হোন। আপনার প্রতি অন্যদের ভালোবাসার কদর করুন। এর ফলে আপনার প্রতি তাদের ভালোবাসা ও আন্তরিকতা অটুট থাকবে এবং স্বভাব-চরিত্র স্বার্থপরতার দোষমুক্ত হবে।

১০. আত্মীয়-স্বজন, বন্ধুমহল ও পাড়াপ্রতিবেশীর সাথে নানা উদ্যোগ-আয়োজনে অংশগ্রহণ করুন। সমাজের দশজনের সাথে এক হয়ে চলুন। সার্বিক ও সামাজিক উদ্যোগে পরস্পর বহু জিনিস আদান-প্রদান হয়। অন্যের স্বার্থে কাজ করার সুযোগ হয়। এর মাধ্যমে আত্মকেন্দ্রিকতা ও স্বার্থপরতা দূর হতে থাকে।

১১. সন্তানদের কুরআন-সুন্নাহর আদর্শে গড়ে তুলতে হবে। হিংসা-বিদ্বেষ ছেড়ে পরস্পর সহযোগিতা ও পরার্থপরতায় অনুপ্রাণিত করতে হবে।

১২. অন্যদের সামনে সন্তানের অপমান করা, তাদের ব্যক্তিত্ব খাটো করা ঠিক নয়। কেননা কখনো-কখনো এমন আচরণের কারণে সন্তানদের মনে স্বার্থপরতা দানা বাঁধতে শুরু করে। সমবয়সিদের প্রতি ঘৃণা জন্মাতে থাকে।

১৩. মনে রাখুন, স্বার্থপরতা নিছক স্বার্থপরতা-ই নয়; পর্যায়ক্রমে তা আপনার মনে অহংকার, হিংসা ও ঘৃণা-বিদ্বেষ সৃষ্টি করবে। সুতরাং নিজেকে এসব স্বভাবদোষে কলুষিত করা থেকে বিরত থাকুন।

১৪. স্বার্থপর লোক সবার কাছেই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘৃণিত। কেউ তাকে পছন্দ করে না। তার সংস্পর্শে স্বস্তিবোধ করে না। কেননা সর্বক্ষেত্রেই সে নিজেকে প্রাধান্য দিতে সচেষ্ট। নিজেরটা বাগিয়ে নিতে সিদ্ধহস্ত।

১৫. মা-বাবাকে সন্তানদের মধ্যে সমতা বজায় রাখতে হবে। আচার-আচরণে ও আদর-স্নেহে যেন পক্ষপাতিত্ব ও প্রান্তিকতার ছাপ না থাকে। কেননা তা সন্তানদের মাঝে বিভাজন সৃষ্টি করে। পারস্পরিক সম্প্রীতি ও ভালোবাসার সম্পর্কের অবনতি ঘটায়। তারা শুধু নিজেকে নিয়ে ভাবতে শুরু করে।

১৬. সামান্য বিষয়ে বাচ্চাদেরকে শাস্তি দেওয়ার মানসিকতা পরিহার করতে হবে। কখনো কখনো এ কারণে বড় হওয়ার পর তাদের মনে স্বার্থপরতা কাজ করে। নিজের মতো অন্যদেরকে শাস্তি পেতে দেখে তৃপ্তি বোধ করে।

১৮. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনচরিত ও শ্রেষ্ঠ কল্যাণ যুগের মহান পূর্বসূরি-সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়ীন ও তাবে তাবেয়ীন ও পরবর্তী যুগের মহামনীষীগণের জীবনচরিত পাঠ করুন। তাঁদের মহান আদর্শ ও মতাদর্শ থেকে পাঠ গ্রহণ করুন। নিজের স্বার্থকে প্রাধান্য না দিয়ে অন্যের স্বার্থে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁরাই হলেন আমাদের অনুপম আদর্শ।

পরিশিষ্ট:
বিশিষ্ট স্কটিশ দার্শনিক ও ঐতিহাসিক টমাস কার্লাইল (১৭৯৫-১৮৮১) বলেছেন: 'স্বার্থপরতা ও আত্মকেন্দ্রিকতা হলো যাবতীয় স্বভাব-বিচ্যুতির মূল কারণ।'

বিশ্ববিখ্যাত গ্রিক বিজ্ঞানী ও দার্শনিক অ্যারিস্টটল বলেছেন: 'মহান আদর্শবান ব্যক্তি অন্যের প্রয়োজন অনুভব করে এবং পরোপকারে সচেষ্ট থাকে।'

প্রখ্যাত লেবানিজ কবি ও লেখক জিবরান খলীল জিবরান (১৮৮৩-১৯৩১) বলেন: 'যে তোমার চেয়ে অধিক প্রয়োজনগ্রস্ত, তাকে দান করাই উদারতা নয়, নিজের প্রয়োজনটাকে উপেক্ষা করে প্রয়োজনীয় বস্তু দান করাই হলো প্রকৃত উদারতা।'

বিখ্যাত আরব দানবীর হাতেম তাঈ কবিতার ভাষায় বলেছেন:
أما وَالَّذِي لَا يَعْلَمُ الغَيبَ غَيرُهُ وَيُحْيِي العِظامَ البيضَ وَهِيَ رَمِيمُ
لَقَد كُنتُ أَطوي البطن والزاد يُسْتَهى مخَافَةَ يَوماً أَن يُقَالَ لَئِيمُ

অর্থ: 'অদৃশ্যের দ্রষ্টা ও পুনরুত্থানের স্রষ্টার শপথ করে বলছি, উপাদেয় খাবার খাওয়ার সাধ্য থাকার পরও সবার সাথে অভুক্ত থেকেছি; পাছে লোকে না আবার আমাকে নীচ-ইতর বলে।'

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00